Tuesday, March 14, 2023

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমণ কিয়ামতের সর্বপ্রথম আলামত

 প্রশ্ন: আমি কোন এক ওয়াজে শুনেছিলাম যে, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগমন’ কিয়ামতের একটি আলামত। এটা কি সঠিক?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: হ্যাঁ, এটি হাদিস সম্মত সঠিক কথা। নিঃসন্দেহে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ নবী। তারপরে কিয়ামতের পূর্বে আর কোন নবির আগমন ঘটবে না‌। অর্থাৎ এর পরেই কেয়ামত সংঘটিত হবে।
সুতরাং তাঁর আগমন নিশ্চিতভাবেই কিয়ামতের একটি আলামত। এটি সর্বপ্রথম আলামত যার মাধ্যমে কিয়ামত ঘনিয়ে আসার আলামতের সূচনা হয়েছে এবং হাদিসে বর্ণিত অন্যান্য আলামতগুলো একের পর এক ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

◆ প্রখ্যাত সাহাবি সাহল রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةَ هَكَذَا وَيُشِيرُ بِإِصْبَعَيْهِ فَيَمُدُّ بِهِمَا

“আমাকে পাঠানো হয়েছে কিয়ামতের সঙ্গে এভাবে। এ কথা বলে তিনি তাঁর দু আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করে সে দুটোকে প্রসারিত করলেন।” [সহীহুল বুখারী, অধ্যায়: ৮১/ কোমল হওয়া, পরিচ্ছেদ: ২৭২১. নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী: “আমাকে পাঠানো হয়েছে কিয়ামতের সাথে এ দুটি আঙ্গুলের ন্যায়।” (আল্লাহ তাআলার বাণী:)
وَمَا أَمْرُ السَّاعَةِ إِلاَّ كَلَمْحِ الْبَصَرِ أَوْ هُوَ أَقْرَبُ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

“আর কিয়ামতের ব্যাপার তো চোখের পলকের ন্যায় বরং তা অপেক্ষাও সত্ত্বর। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” [সূরা নাহল: ৭৭]

◆ জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

إِذَا خَطَبَ احْمَرَّتْ عَيْنَاهُ وَعَلاَ صَوْتُهُ وَاشْتَدَّ غَضَبُهُ حَتَّى كَأَنَّهُ مُنْذِرُ جَيْشٍ يَقُولُ ‏”‏صَبَّحَكُمْ وَمَسَّاكُمْ”: وَيَقُولُ ‏”‏ بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةَ كَهَاتَيْنِ ‏”‏‏ وَيَقْرُنُ بَيْنَ إِصْبَعَيْهِ السَّبَّابَةِ وَالْوُسْطَى

“রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খুতবা দিতেন তখন তার চক্ষুদ্বয় রক্তিম বর্ণ হতো, স্বর উঁচু হতো এবং কঠোর রাগ প্রকাশ পেত। মনে হতো, তিনি যেন আক্রমণকারী বাহিনী সম্পর্কে সতর্ক করেছেন আর বলছেন, তারা তোমাদের উপর সকালে আক্রমণ করবে এবং বিকেলে আক্রমণ করবে।
আর তিনি বলতেন, আমি প্রেরিত হয়েছি এমন অবস্থায় যে, আমি ও কিয়ামত এ দুটির ন্যায়: অতঃপর তিনি মধ্যমা ও তর্জনী (শাহাদত) অংগুলী মিলিয়ে দেখাতেন।” [সহিহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৮/ জুমা, অনুচ্ছেদ: ৮. সালাত ও খুতবা সংক্ষিপ্তকরণ]
এই মমার্থবোধক আরও একাধিক হাদিস রয়েছে।

◍ ইমাম কুরতুবি বলেন,

أولها النبي ﷺ لأنه نبي آخر الزمان، وقد بُعِثَ ليس بينه وبين القيامة نبي

“কিয়ামতের প্রথম আলামত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। কেননা, তিনি শেষ জমানার নবি। তিনি এমন সময় প্রেরীত হয়েছেন যে, তাঁর মাঝে এবং কিয়ামতের মাঝে আর কোনও নবি নেই।” [আত তাযকিরাহ ফী আলামাতিস সাআহ, (কিয়ামতের আলামত বার্তা) পৃষ্ঠা নম্বর: ১২১৯]

◍ সহিহ বুখারির ভাষ্যকার হাফেজুল হাদিস ইবনে হাজার আসকালানি বলেন,

قال الضحاك: أول أشراطها بعثة محمد صلى الله عليه وسلم. والحكمة في تقدم الأشراط إيقاظ الغافلين وحثهم على التوبة والاستعداد

“যাহহাক (বিশিষ্ট মুফাসসির এবং তাবেঈ-মৃত্যু:১০২, মতান্তরে ১০৫ বা ১০৬] বলেছেন, “কিয়ামতের প্রথম আলামত হল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমন। আর কিয়ামতের পূর্বে তার আলামত সমূহ প্রকাশিত হওয়ার উদ্দেশ্য হল, অসচেতনদেরকে সচেতন করা এবং তাদেরকে তওবা ও কিয়ামতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণে উৎসাহ প্রদান।” [ফাতহুল বারী]
➤ আলেমগণ এটি কেয়ামতের ছোট আলামতসমূহের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ থেকে প্রতিয়মান হয় যে, কিয়ামতের সব আলামত খারাপ বা অকল্যাণকর নয়। বরং কিছু কিছু আলামত ভালো ও কল্যাণকর। হে আল্লাহ, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বে তুমি আমাদেরকে তওবা করে কিয়ামতের প্রস্তুতি গ্রহণের তাওফিক দান করো। আমিন।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ এর মাধ্যমে ভিক্ষা চাওয়ার বিধান

 প্রশ্ন: আমাদের দেশে ফকির-মিসকিনরা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ বলে ভিক্ষা চায়। এটা কতটুকু শরিয়ত সম্মত?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ অর্থ: “আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নাই; মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর প্রেরিত দূত।”
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এমন এমন একটি বাণী যার মধ্যে বিবৃত হয়েছে, মানুষ আর জিন সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য। এটি ইসলামের মূল কথা। এটি কালিমাতুত তাওহিদ বা একত্ববাদের বাণী।
ভিক্ষার জন্য ইসলামে এই কালিমার আবির্ভাব ঘটেনি। বরং এটি এসেছে, ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও সমগ্র পৃথিবীর পরিবর্তনের জন্য। এর মর্মবাণী বাস্তবায়িত হওয়া ও না হওয়ার উপরই নির্ভর করছে মানব জাতির সাফল্য ও ব্যর্থতা, জান্নাত ও জাহান্নাম।

অথচ অজ্ঞতা বশত: এক শ্রেণীর মূর্খ মানুষ এটিকে ভিক্ষার মাধ্যম বানিয়ে ছেড়েছে! এরা এই মহান কালিমার মাধ্যমে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে বেড়ায়, মানুষের কাছে হাতপাতে!! যা খুবই দুর্ভাগ্য ও লজ্জা জনক।

এভাবে তাওহিদের এই মহান বাণী দ্বারা ভিক্ষাবৃত্তি করা নাজায়েজ। কারণ এতে কালিমার মানহানি হয়, মানুষের নিকট এটিকে তুচ্ছ প্রতিপন্ন করা হয় এবং নষ্ট হয় এর ভাবগাম্ভীর্যতা। অবশ্য কাউকে যদি সত্যিই নিদারুণ আর্থিক সংকটে পড়ে অনন্যোপায় হয়ে ভিক্ষার আশ্রয় নিতে হয় তাহলে সে বলতে পারে, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে দান করুন’ ‘দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন’ বা এ জাতীয় ভাষা। কিন্তু উক্ত কালিমাতুত তাওহিদকে ভিক্ষার মাধ্যম বানানো কোনভাবেই উচিৎ নয়।
আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

কুরআন শুধু মুত্তাকিদের জন্য হেদায়েত না কি সমগ্র মানবজাতির জন্য হেদায়েত

 প্রশ্ন: সুরা বাকারার ২য় আয়াতে বলা হচ্ছে “এই কিতাব মুত্তাকিদের জন্য হেদায়েত বা পথপ্রদর্শক।” কিন্তু আমরা জানি, কুরআন তো পুরো মানব জাতির জন্য এসেছে। তাহলে এই আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা কী হবে?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: আল্লাহ তাআলা বলেন,
ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ
“এ সেই কিতাব যাতে কোনই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী মুত্তাকি বা পরহেজগারদের জন্য।” [সূরা বাকারা: ২]
আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন,
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ
“রমজান মাসই হল সে মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানবজাতির জন্য পথপদর্শক।” [সূরা বাকারা: ১৮৫]
উক্ত দুই আয়াতে দু রকম বলার ব্যাখ্যা কী?
উত্তর হল, হিদায়েত বা পথপ্রদর্শন দু প্রকার। যথা:
– ক. সমগ্র মানবজাতির জন্য উন্মুক্ত (আম)।
– খ. আল্লাহর বিশেষ বান্দা, পরহেজগার ও মুত্তাকিদের জন্য -(খাস)।
প্রথম প্রকার হেদায়েত (যা সমগ্র মানব জাতির জন্য উন্মুক্ত) মানে হল, আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরআনের মাধ্যমে শুধু সঠিক পথের সন্ধার দেওয়া। যে কোন ব্যক্তি কুরআন অধ্যয়ন করবে সে তাতে সত্য ও সুন্দরের পথ খুঁজে পাবে। কিন্তু সে তা গ্রহণ নাও করতে পারে। হয়তো সে কুরআন থেকে সঠিক পথের সন্ধান পেল বা সঠিক জিনিসটি জানতে পারল ঠিকই কিন্তু তা গ্রহণ করার সুযোগ হল না।
পক্ষান্তরে ২য় প্রকার হেদায়েত মানে হল, শুধু সঠিক পথ দেখানোই নয় বরং তাকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দেওয়া বা তাকে সত্যের সন্ধান দেওয়ার পর তাকে সে পথে চলার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া এবং তাকে এ পথে টিকে থাকার তওফিক দান করা। এই প্রকার হেদায়েত কেবল আল্লাহভীরু-মুত্তাকিদের জন্য খাস। যারা আল্লাহকে ভয় করে কুরআন অধ্যয়ন করবে আল্লাহ তাদেরকে কুরআনের মাধ্যমে সঠিক পথ দেখাবেন তারপর সে পথের উপর অবিচল থাকার সুযোগ সৃষ্টি করে দিবেন। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য বিশেষ নিয়ামত। যা থেকে অন্য মানুষরা বঞ্চিত হবে।
সুতরাং দু আয়াত সাংঘর্ষিক নয়। আল হামদুলিল্লাহ। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

কুরআন তিলাওয়াতের সময় আজান হলে

 প্রশ্ন: আমি জানতে চাই, যখন আজান দেয় তখন আমরা যদি কুরআন তিলাওয়াতে রত থাকি তখন কুরআন তিলাওয়াত বন্ধ করে আজানের উত্তর দিব নাকি কুরআন পড়া শেষ হলে আজানের উত্তর দিব?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: কুরআন তিলাওয়াতের সময় আজান শুনলে করণীয় হল, কুরআন তিলাওয়াত বন্ধ রেখে আজানের জবাব দেওয়া। কারণ, আজানের সময় তার জবাব দেওয়া অধিক উত্তম অন্যান্য নফল ইবাদতের চেয়ে। কেননা আজানের সময় সংক্ষিপ্ত আর কুরআন তিলাওয়াতের সময় প্রশস্ত। আজানের জবাব দেওয়ার পর পূণরায় কুরআন তিলাওয়াত করার সুযোগ রয়েছে। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

এক কালেমায় রুটি-রুজি আর এক কালেমায় ফাঁসি শীর্ষক কথাটির বাস্তবতা কতটুকু

 মিসরের ব্রাদারহুড নেতা সাইয়েদ কুতুব-এর নামে প্রচলিত “এক কালেমায় রুটি-রুজি আর এক কালেমায় ফাঁসি” শীর্ষক কথাটির বাস্তবতা কতটুকু?

▬▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬▬
বর্তমানে “এক কালেমায় রুটি রুজি আর এক কালেমায় ফাঁসি” শীর্ষক একটি কথা বা গানের কলি নিয়ে ফেসবুকে চলছে তুমুল আলোচনা-পর্যালোচনা ও তর্ক-বিতর্ক।

জামায়াতে ইসলামী পন্থীদের মধ্যে এটি খুবই প্রসিদ্ধ কথা। দাবি করা হয় যে, মিসরের ব্রাদারহুড নেতা সাইয়েদ কুতুবের ফাঁসির ১ ঘণ্টা আগে জেলখানার ইমাম এসে যখন তাকে কালিমা পড়তে বলেন, তখন তিনি নাকি তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “আমাকে কালিমা পড়ানো লাগবে না। আমি তা জানি। যে কালিমা পড়ানোর কারণে সরকার তোমাকে বেতন দেয় সেই কালিমার কারণে আজ আমাকে ফাঁসি দেওয়া হচ্ছে।” জামায়াতে ইসলামীর বিখ্যাত বক্তা মিজানুর রহমান আজহারি এভাবেই তার বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন। এ কথাটি মোহাম্মদ রহমত উল্লাহর কথামালা এবং শিল্পী মশিউর রহমান-এর কণ্ঠের গানে ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে। যা আমার দেখা মতে, দেলোয়ার হোসেন সাইদির ছেলে মাসউদ সাঈদি, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বাশার সহ অনেকেই শেয়ার করেছেন। শুধু তাই নয়, জামায়াত পন্থী বহু বক্তাও এ কথাটা উল্লেখ করার মাধ্যমে যে সব আলেমগণ জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিকে সমর্থন করেন না তাদের কালিমাকে কটাক্ষ ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে থাকে।

◍ এবার দেখা যাক, এ বিষয়টির বাস্তবতা কতটুকু?

প্রকৃত পক্ষে জামায়াতে ইসলামী ও শিবির নেতা-কর্মী এবং সমর্থকদের পক্ষ থেকে উক্ত কথাটি সাইয়েদ কুতুবের নামে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হলেও এর সপক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং বলা হয়ে থাকে, যে, ইতালীয় দখলদার কর্তৃক লিবিয়ার কিংবদন্তী নেতা ও মুজাহিদ ওমর আল-মুখতার রহ. এর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে তিনি প্রায় এমন একটি কথা বলেছিলেন।

গবেষকগণ বলেন, সাইয়েদ কুতুবের ফাঁসি কার্যকর করার তারিখ ও সময় সম্পর্কে কয়েকজন দায়িত্ব রত সরকারী কর্মকতা, আর্মি ও পুলিশ অফিসার ছাড়া কাউকে জানতে দেওয়া হয়নি। সাইয়েদ কুতুব নিজেও জানতেন না কখন তার ফাঁসি হবে। কারণ খুবই গোপনীয়তার সাথে তা বাস্তবায়ন করা হয়। যার কারণে কোনও মসজিদের ইমাম বা আজহার থেকে কোনও আলেমকেও কালিমা পড়ানোর জন্য ডাকা হয়নি। কোনও নির্ভরযোগ্য ইতিহাস বা ডকুমেন্টে এমন তথ্য পাওয়া যায় না।

– বিখ্যাত লেখিকা জয়নাব গাল গজালির লেখা «أيام من حياتى» (আমার জীবনের দিনগুলো) শীর্ষক বইয়ে (যা বাংলা ভাষায় ‘কারাগারে রাত দিন” নামে মগবাজার, ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে) সাইয়েদ কুতুবের কালিমা পড়ানোর বিষয়ে কোনও কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। অথচ তিনি সে সময় সাইয়েদ কুতুবের বোন হামিদা কুতুবের সাথে একই জেলখানায় বন্দি ছিলেন এবং তিনি তার বইয়ে তখনকার বিভিন্ন ঘটনাবলি ও জুলুম-নির্যাতনের কথা উল্লেখ করেছেন। হ্যাঁ, ধরে নিলাম হয়ত, ফাঁসির সময় ব্রাদারহুডের কোনও নেতা-বা কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত ছিল না। যার কারণে তিনি হয়ত তা জানতে পারেননি। কিন্তু সাইয়েদ কুতুবের ফাঁসির শেষ মুহূর্তের ঘটনাবলীর বিস্তারিত বিবরণ সহ বই লিখেছেন, একমাত্র ব্যক্তি মেজর জেনারেল ফুয়াদ আল্লাম। (তিনি বাস্তবেও এসব ঘটনাবলীর চাক্ষুষ সাক্ষী ছিলেন)। বইটির নাম: “ব্রাদারহুড এবং আমি…মানশিয়া থেকে মানাসসা পর্যন্ত”
«الإخوان وأنا.. من المنشية إلى المنصة
এই বইয়ের মধ্যে তিনি ফাঁসির শেষ মুহূর্তের প্রতিটি ঘটনাবলী সবিস্তারে আলোচনা করেছেন। সেখানেও কালেমা পড়ানোর বিষয়টি লিখেননি। বরং মিসরের দৈনিক ‘আল ইয়াউমুস সাবি”-এর এক সাক্ষাৎকারে উক্ত মেজর জেনারেল বলেন,

«سيد قطب لم يفتح فمه بكلمة واحدة منذ أن تسلمته من السجن الحربى وحتى تنفيذ حكم الإعدام فيه داخل سجن الاستئناف، وكنت أجلس بجواره طوال الطريق» وتابع: «عندما سأله وكيل النيابة انت عايز حاجة ؟ لم يرد عليه، وتمتم بكلمات غير مفهومة»

“সাইয়েদ কুতুবকে সামরিক কারাগার থেকে গ্রহণ করার সময় থেকে আপিল কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত একটি শব্দও মুখ খোলেননি এবং আমি সারা পথ তার পাশে বসে ছিলাম।” তিনি আরও বলেন, “যখন প্রসিকিউটর জিজ্ঞাসা করলেন সে, তোমার কি কিছু লাগবে? তিনি তাকে উত্তর দেননি, এবং অ বোধগম্য শব্দগুলি বিড়বিড় করছিলেন।”
[সূত্র: আল ইয়াওমুস সাবি পত্রিকার অনলাইন ভার্সন, প্রবন্ধ: সাইয়েদ কুতুব-এর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পূর্বে শাহাদাহ বাণী পাঠের বাস্তবতা-অনুদিত, সংক্ষেপায়িত ও পরিমার্জিত]
অত:এব যারা এই কথা নিয়ে মাতামাতি করছেন, তারা তাদের কথার সপক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা কর্তব্য, অন্যথায় মিথ্যা রটনা থেকে বিরত থাকা।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬

লেখক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate