Tuesday, January 10, 2023

কুরআন ও হাদিসে ইলম দ্বারা কী উদ্দেশ্য এবং দুনিয়াবি পড়াশোনাও কি এর অন্তর্ভুক্ত

 প্রশ্ন: কুরআন ও হাদিসে ইলম (জ্ঞান) অন্বেষণের উপর যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। প্রশ্ন হল, এই ‘ইলম’ (জ্ঞান) দ্বারা কী উদ্দেশ্য? দুনিয়াবি পড়াশোনাও কি এর অন্তর্ভুক্ত?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: ইলম শব্দের অর্থ: জ্ঞান, বিদ্যা, কোন বিষয়কে দৃঢ়ভাবে উপলব্ধি করা বা জানা। এর বিপরীত হল, জাহল। অর্থ: অজ্ঞতা বা মূর্খতা।
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় সাধারণভাবে ইলম বলতে ইলমে শরিয়ত তথা কুরআন-হাদিস থেকে উৎসারিত জ্ঞান উদ্দেশ্য। কুরআন হাদিসে ইলমের ফজিলত সংক্রান্ত যত বক্তব্য আছে সেগুলো দ্বারা এ প্রকার ইলমই উদ্দেশ্য। এক কথায় ইসলামি জ্ঞান। মোটকথা, ‘ইলম’ দ্বারা কুরআন, হাদিস থেকে উৎসারিত এবং এ সংশ্লিষ্ট সকল প্রকার জ্ঞান উদ্দেশ্য। যেমন: আকিদা, ফিকহ, উলুমুল কুরআন, উলুমুল হাদিস, আরবি ভাষা, আরবি ব্যাকরণ এবং এ সংক্রান্ত জ্ঞান।

❑ সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি ইমাম আব্দুল্লাহ বিন বায রাহ. বলেন,

العلم عند الإطلاق -كما سمعتُم في صلب المحاضرة وفي الأسئلة- عند أهل العلم، عند علماء الإسلام هو العلم الشرعي: قال الله، وقال رسوله، وما يتعلق بذلك.
ولا حرج في تعلم العلوم الأخرى النافعة؛ لقصد نفع الناس في دنياهم: من طبٍّ، وهندسةٍ، وجيولوجيا، وعلم العمارة، وغير ذلك مما يحتاجه الناس، لا حرج في ذلك، ومع النية الصالحة يُؤجر، مع النية الصالحة يُؤجَر في ذلك؛ لأنَّ الناس في حاجة إلى أطباء، وإلى مهندسين، وإلى محاسبين، وإلى مُقاولين معماريين، إلى غير ذلك مما يحتاجه الناسُ، وإلى جيولوجيين يعرفون حاجة البلاد وما فيها من الخير ومن الكنوز.
كل هذه العلوم مطلوبة، لكن ليست مُرادة عند الإطلاق، ليست داخلةً في قوله: وَأُولُو الْعِلْمِ [آل عمران:18] وأمثالها،

“যেমনটি বক্তৃতার মূল অংশে এবং প্রশ্নগুলোতে শুনেছেন যে, ইসলামি পণ্ডিতদের মতে ইলম হল, শরিয়ত সংক্রান্ত জ্ঞান: আল্লাহ বলেছেন, তাঁর রসুল বলেছেন এবং যা কিছু এর সাথে সম্পর্কিত। [যেমন: আরবি ভাষা ও নাহু-সরফ (আরবি ব্যাকরণ), ইলমুল বালাগাহ (আরবি ভাষার অলঙ্কার শাস্ত্র), ইলমুল উসুল (মূলনীতি সংক্রান্ত জ্ঞান), ইলমুল ফিকহ (ইসলামি আইন শাস্ত্র ইত্যাদি]

মানুষের কল্যাণের স্বার্থে অন্যান্য দরকারি জ্ঞান-বিজ্ঞান শেখায় কোনও সমস্যা নেই যেমন: ডাক্তারি , প্রকৌশল, ভূতত্ত্ব, স্থাপত্য এবং অন্যান্য বিষয় যেগুলো মানুষের প্রয়োজন। এগুলোতে কোনও অসুবিধা নেই। বরং সৎ নিয়তে (এসব বিষয়ে জ্ঞানার্জন করাতেও) সওয়াব রয়েছে। কারণ ডাক্তার, প্রকৌশলী, হিসাবরক্ষক, স্থপতি, ঠিকাদার ইত্যাদি প্রয়োজনীয় পেশার লোকজনের দরকার আছে। ভূতাত্ত্বিকদের দরকার আছে যারা দেশের প্রয়োজন এবং ভূ-সম্পদ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে।
এই সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রয়োজন কিন্তু (কুরআন ও হাদিসে যে ইলমের কথা বলা হয়েছে তা দ্বারা) সেগুলি মোটেও উদ্দেশ্য নয়৷ এসব জ্ঞান আল্লাহ তাআলার এ বাণীর অন্তর্ভুক্ত নয়: وَأُولُو الْعِلْمِ “যারা ইলম (জ্ঞান)-এর অধিকারী” [আল-ইমরান: 18] বা এ জাতীয় আয়াত।

তিনি আরও বলেন,

وأما مَن تعلَّمها للدنيا فهي مباحة، ما يتعلق بها أجرٌ، فإذا كان مع الإباحة نوى الخير: نوى أن ينفع الناس، نوى أن يُعين ولاة الأمور على الخير، نوى أن ينفع المجتمع؛ فله نيته الطيبة، وله أجره بهذه النية الطيبة

“যে ব্যক্তি দুনিয়ার জন্য এসব জ্ঞান শেখে তার জন্য তা জায়েজ। এর সাথে সওয়াবের সম্পৃক্ততা নেই। তবে বৈধতার পাশাপাশি যদি সৎ নিয়ত থাকে, মানুষের উপকার করার নিয়ত থাকে, ভালো কাজে সরকারকে সহায়তা করার নিয়ত থাকে, সমাজকে উপকৃত করার নিয়ত থাকে তাহলে এই সৎ নিয়তের কারণে সে সওয়াবের অধিকারী হবে।” [binbaz] আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

সাংগঠনিক জাহেলিয়াত এবং বিদআতি বাইয়াত

 ❑ প্রশ্ন-১: আমাদের গ্রামে একটা আহলে হাদিস মসজিদ আছে। এখানে এখন যারা মসজিদ কমিটিতে আছে তারা বলছে যে, সংগঠন করা বা না করা ব্যক্তিগত বিষয়। কেউ চাইলে সংগঠন করবে আর কেউ না চাইলে করবে না। এর জন্য বিভেদ করা যাবে না। মসজিদের ইমাম সংগঠন করেন কিন্তু তিনিও খুতবায় একই কথা বলেছেন। কিন্তু এক পক্ষ আছে, যারা আমির মানা ও সংগঠন করাকে ‘ফরজ’ বলছেন। তারা সংগঠনের কেন্দ্র থেকে নেতাদেরকে এনে নিজেদের মত করে দশ জনকে নিজেদের ইচ্ছে মত সাংগঠনিক পদ দিয়ে দিয়েছে-যাদের ভিতর এমন লোকও রয়েছে যারা আদতে নামাজই পড়ে না। এখন তারা বর্তমান মসজিদ কমিটিকে বাতিল করতে চাচ্ছে এবং বলছে, যারা সংগঠন করে না তারা যেন মসজিদে না আসে। কেউ সংগঠন না করলে সে মসজিদের কোনও দায়িত্বেও থাকতে পারবে না। এখন করণীয় কী? এ নিয়ে হয়তো বিশাল এক মারামারি হতে পারে। (আল্লাহ হেফাজত করুন।) আমিন।

উত্তর: ব্যবস্থাপনার ভাষায়, বিশেষ কোনও লক্ষ্য অর্জনের জন্য যখন কিছু ব্যক্তি একত্রিত হয় এবং ধারাবাহিকভাবে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থাকে তাকে সংগঠন (organisation) বলে।”
সংগঠনের উদ্দেশ্য হল, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে কোন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য কাজ করা। সংগঠনের ফলে অনেক বড় বড় জটিল ও ব্যয়বহুল কাজ খুব সহজে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। কারণ এখানে দক্ষ ও উপযুক্ত জনশক্তির মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হয় এবং উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সম্মিলিত শ্রম, দক্ষতা, জ্ঞান-বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা, কলাকৌশল, অর্থ ইত্যাদি কাজে লাগানো হয়।

সুতরাং পরিবেশ ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী দাওয়াতি কাজের ক্ষেত্রে কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে সাংগঠনিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করা জায়েজ। বিজ্ঞ আলেমদের মতে, আল্লাহ ভীতি ও সৎ কর্মে পারস্পারিক সাহায্য-সহযোগিতা, মানুষের কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে সংগঠন করা কল্যাণকর এবং এর পর্যাপ্ত উপকারিতা রয়েছে।

কিন্তু যারা সংগঠন করাকে ‘ফরজ’ বলেছেন তারা ভুলের উপরে প্রতিষ্ঠিত। তারা মুসলিমদের জামাআত এবং আমিরের আনুগত্য সংক্রান্ত হাদিসগুলোকে স্পষ্টই অপব্যাখ্যা করছে। কেননা হাদিসে বর্ণিত জামাআত দ্বারা উদ্দেশ্য, আল্লাহর কিতাব ও রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসরণকারী এবং শরিয়তের পাবন্দ মুসলিমগণ। তারা পৃথিবীর যে প্রান্তেই অবস্থান করুক না কেন। তাদের সংখ্যা কম বা বেশি যাই হোক না কেন। এমনকি চতুর্দিকে ফিতনা-ফ্যাসাদের সময় একজন ব্যক্তিও যদি আল্লাহর দীনকে আঁকড়ে থাকে তাকেও ‘জামাআত’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

আর আমির দ্বারা উদ্দেশ্য মুসলিম শাসক এবং তার প্রতিনিধি; তথাকথিত সংগঠনের আমির নয়।

“যারা সংগঠন করবে না তারা মসজিদে যেন না আসে” এমন বক্তব্য মানুষকে আল্লাহর ঘর থেকে বাধা দেওয়ার নামান্তর-যা স্পষ্টতই জুলুম এবং হারাম। আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّن مَّنَعَ مَسَاجِدَ اللَّهِ أَن يُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ وَسَعَىٰ فِي خَرَابِهَا
“আর তার চাইতে কে বড় জালিম (অত্যাচারী) আর কে আছে যে, আল্লাহর মসজিদ সমূহে আল্লাহর নামের জিকির করতে বাধা প্রদান করে আর সেগুলোর ক্ষতি সাধনের চেষ্টা করে?” [সূরা: বাকারা: ১১৪]
আল্লাহ তাআলা মুসলিম সমাজে জাহেলদেরকে ‘সাংগঠনিক জাহেলিয়াত’ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

❑ প্রশ্ন-২: কোন একটি ইসলামি সংগঠনের দীনী কর্মসূচী বাস্তবায়ন এবং ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে সমর্থন ও সহায়তার উদ্দেশ্যে আল্লাহর নামে শপথ করে সেই দলের সাথে বাইয়াত গ্রহণ করা হয়। অত:পর জানা গেল যে, সেই দলের আকিদা-মানহাজ ত্রুটিপূর্ণ এবং তারা বিদআত ও ভ্রান্ত পথের অনুসারী। এমতাবস্থায় সেই দলের বাইয়াত ত্যাগ করে ফিরে আসলে কি আল্লাহর নামে কসম ভঙ্গের কাফফারা দেওয়া কি জরুরি?

উত্তর: কোনও কথিত ইসলামি সংগঠন (চাই সুন্নাহ পন্থী হোক বা বিদআত পন্থী হোক) অথবা পীরের হাতে বাইয়াত করা বিদআত। বিশেষ কোনও তরিকার পীরের নিকট বাইয়াত গ্রহণ হল, ভ্রান্ত সুফিবাদি বিদআতি বাইয়াত আর কথিত ইসলামি সংগঠনের আমির বা সংগঠনের কোনও দায়িত্বশীলের নিকট বাইয়াত নেওয়া হল, আধুনিক বিদআত।

কেউ অজ্ঞতা বশত তা করে থাকলে তার জন্য তা প্রত্যাখ্যান করা/ভঙ্গ করা জরুরি। কারণ বিদআতি কাজের উপরে স্থির থাকা জায়েজ নাই। কেননা ইসলামি শরিয়তে বাইয়াতের একমাত্র হকদার হচ্ছে, ওলিউল আমর তথা মুসলিম শাসক বা তার পক্ষ থেকে তার নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি। সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রহ. বলেন, ওলিউল আমর (মুসলিম শাসক) ছাড়া আর কারও নিকট বাইয়াত নেওয়ার কোনও ভিত্তি আছে বলে আমাদের জানা নেই।
فلا نعلم أصلًا لهذه البيعة، إلا ما يحصل لولاة الأمور، فإن الله شرع سبحانه أن يبايع ولي الأمر على السمع والطاعة في المنشط والمكره والعسر واليسر، وفي الأثرة على المبايع، كما بايع الصحابة وأرضاهم نبينا -عليه الصلاة والسلام- فالبيعة تكون لولاة الأمور على مقتضى كتاب الله وسنة رسوله -عليه الصلاة والسلام- وأن يقولوا بالحق أينما كانوا، وألا ينازعوا الأمر أهله، إلا أن يروا كفرًا بواحًا عندهم من الله فيه برهان.
أما بيعة الصوفية بعضهم لبعض فلا أعلم لها أصلًا، وهذا قد يسبب مشاكل، فإن البيعة قد يظن المبايع أنه يلزم المبايع طاعته في كل شيء، حتى ولو قال بالخروج على ولاة الأمور، وهذا شيء، شيء منكر لا يجوز.
তবে যদি আল্লাহর নামে কসম করা হয়ে থাকে তাহলে কসম ভঙ্গ করার জন্য কাফফারা দেওয়া জরুরি।
আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

একাধিক বিয়ে সংক্রান্ত জরুরি প্রশ্নোত্তর

 প্রশ্ন: ক) পুরুষদের ৪টি বিয়ে করা তো জায়েজ। কিন্তু তা কি সুন্নত?

খ) কোনও স্ত্রী যদি চায় তার সাথে বিয়ের পর স্বামী আর বিয়ে না করুক, সে জন্য কি জোর করে বলতে পারবে?
গ) কিংবা বিয়ের কাবিনে কি উল্লেখ করা যাবে যে, প্রথম স্ত্রীর মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত আরেক বিয়ে করতে পারবে না?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর:
🔹 ক. একাধিক বিয়ে করা সুন্নত নাকি শুধু মুবাহ (বৈধ)-এ ব্যাপারে বিজ্ঞ আলেমদের বিভিন্ন ধরণের অভিমত পাওয়া যায়। যেমন:

◆ শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বায রাহ. বলেন,

النص يقتضي أنها سنة، أقل الأحوال أنها سنة: فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ [النساء:3] أمر، لكن بشرط العدل، والاستقامة.
وأما إذا خاف ألا يعدل لقلة ماله، أو لشيء يعرفه من نفسه من الضعف؛ فلا يتزوج إلا واحدة

“নস (কুরআনের আয়াত)-এর দাবি অনুযায়ী তা সুন্নত। এর সর্বনিম্ন অবস্থা হল, এটি সুন্নত। আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ

“অত:এব মহিলাদের মধ্যে থেকে যাদের ভাল লাগে তাদের বিয়ে করে নাও দুই, তিন, কিংবা চারটি পর্যন্ত।” [সূরা নিসা: ৩] এটি নির্দেশ। তবে শর্ত হল, ন্যায্যতা ও সততা প্রতিষ্ঠা করা। আর কেউ যদি অর্থের অভাব অথবা নিজের মধ্যে কোনও ধরণের দুর্বলতা সম্পর্কে জানে তাহলে সে একটার বেশি বিয়ে করবে না।” [binbaz]

◆ সৌদি আরবের আরেক প্রখ্যাত আলেম শাইখ নাসের আল বাররাক কে প্রশ্ন করা হয়, একাধিক বিয়ে করা সুন্নত নাকি মুবাহ? তিনি উত্তরে বলেন,

مباحٌ ومشروعٌ، معَ الحاجةِ يُشرَعُ التَّعدُّدُ

“প্রয়োজনে তা মুবাহ ও শরিয়ত অনুমোদিত।” [sh-albarrak]

একাধিক বিয়ে করা সুন্নত কি না এ বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে, তিনি উত্তরে আরও বলেন,

لا؛ مِن الجائز، التعدُّد جائز فقط، ليس فيه فضيلة، هذا لأنّه حسب الدّاعي، مِن الناس مَن يحتاج إلى أكثر مِن زوجة: فينبغي له يُستحبُّ له أن يتزوّج أكثر ما دام يحتاج وأنّ الواحدة لا تكفيه أو لا تحصنه، أمّا إذا كان الزّوجة الواحدة يحصل بها المقصود: فلا نقول تزوّج أخرى، هذا أفضل، فضيلة الزّواج بالثّانية فضيلة، لا، ليس الزّواج بالثانية فضيلة، هذا أمر يعني يرجع إلى الحاجة وتحصيل مقصود النكاح.

“না, এটা জায়েজ। একাধিক বিয়ে করা কেবল জায়েজ। এতে বিশেষ কোনও ফজিলত নেই। প্রয়োজন অনুযায়ী এর বিধান বর্তাবে। কারণ কিছু মানুষের একাধিক স্ত্রী প্রয়োজন। সুতরাং তার জন্য একাধিক বিয়ে করা মোস্তাহাব-যেহেতু তা তার প্রয়োজন এবং যেহেতু একজন স্ত্রী তার জন্য যথেষ্ট নয়, একজন স্ত্রী তাকে হেফাজত করে না। হ্যাঁ, যদি এক জন দ্বারাই তার উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যায় তাহলে তাকে বলবো না যে, আরেকটা বিয়ে করা, এটাই উত্তম, দ্বিতীয় বিয়ে করা মর্যাদার কাজ। না, দ্বিতীয় বিয়েতে কোনও ফজিলত নেই। অর্থাৎ বিষয়টা মানুষের প্রয়োজন ও উদ্দেশ্য পূর্ণ হওয়ার উপর নির্ভরশীল।”

◆ অন্য একদল আলেম বলেন, মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক বিয়ের বিধান প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ বিষয়টি মূল বিয়ের মতই। কখনো তা সুন্নত বা মোস্তাহাব, কখনো ওয়াজিব আবার কখনো তা হারাম।

ইসলামে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী শর্ত সাপেক্ষে একাধিক বিয়ে করা অনুমোদিত। কারণ দুনিয়ার সকল মানুষের প্রয়োজন ও সমস্যা এক রকম নয়। তাই ইসলামে এর সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর তা হল, দুই, তিন অথবা চার। ইসলাম পূর্ব যুগে এর কোন সীমা-সংখ্যা ছিল না। ইসলাম এর সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। সুতরাং এক সাথে চারের অতিরিক্ত বিয়ে করা জায়েজ নাই।

◯ একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে স্বামীর প্রতি অবশ্য পালনীয় শর্ত:

একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে ইসলাম কঠিন শর্ত আরোপ করেছে। তা হল, স্বামীর জন্য আবশ্যক হল, তার সকল স্ত্রীর সাথে ন্যায়-ইনসাফ ভিত্তিক আচরণ করা এবং তাদের মাঝে সমতা রক্ষা করা। কেউ যদি মনে করে যে, সে এই শর্ত পূরণ করতে সক্ষম হবে না তাহলে তাকে এক স্ত্রী নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে তার জন্য একটির অধিক বিয়ে করো নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً

“আর যদি তোমাদের আশঙ্কা হয় যে একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সমতা রক্ষা করতে পারবে না, তাহলে তোমাদের জন্য একটা স্ত্রী গ্রহণ করাই অনুমোদিত।” [সুরা নিসা: ৩]
এ শর্ত পূরণে ব্যর্থ পুরুষদের জন্য হাদিসে আখিরাতে খারাপ পরিণতির কথা বলা হয়েছে। যেমন: আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

مَنْ كَانَتْ لَهُ امْرَأَتَانِ فَمَالَ إِلَى إِحْدَاهُمَا، جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَشِقُّهُ مَائِلٌ

“যে ব্যক্তি দুই স্ত্রী থাকা অবস্থায় তাদের একজনের প্রতি ঝুঁকে পড়লো, কিয়ামতের দিন সে পঙ্গু অবস্থায় উপস্থিত হবে।” [সুনান আবু দাউদ, অধ্যায়: ৬/ বিয়ে, পরিচ্ছেদ: ৩৯. স্ত্রীদের মাঝে ইনসাফ পূর্ণ আচরণ করা]

◈◈ উল্লেখ্য যে, এই সমতা রক্ষার বিষয়টি স্ত্রীর শরিয়ত সম্মত হক আদায়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। (যেমন: রাত্রি বণ্টন, ভরণ-পোষণ তথা খাবার, পোশাক, বাসস্থান ইত্যাদি)। আন্তরিক টান, যৌন বাসনা বা সহবাসের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করা আবশ্যক নয়। কারণ কোন স্ত্রীর প্রতি আকর্ষণ ও ভালবাসার বিষয়টি অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত। আর অন্তর মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। এটিই আল্লাহ তাআলার এই আয়াতের অর্থ-আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلَن تَسْتَطِيعُوا أَن تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ

“তোমরা কখনও স্ত্রীদের মধ্যে সমতা রক্ষা করতে পারবে না যদিও তোমরা তা প্রত্যাশা করো।” [সূরা নিসা: ১২৯] (দেখুন: তাফসিরে ইবনে কাসির)

🔹 খ. বিয়ের সময় স্ত্রী যদি কাবিননামায় ‘প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত স্বামী বিয়ে করতে পারবে না’ বলে শর্ত জুড়ে দেয় আর স্বামী যদি তাতে সম্মতি দেয় তাহলে এই শর্ত পালন করা স্বামীর জন্য অপরিহার্য। স্বামী তা লঙ্ঘন করলে স্ত্রীর বিয়ে ভঙ্গ করার অধিকার আছে। কারণ, হাদিসের আলোকে মুসলিম তার শর্ত পালনে বাধ্য। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

المسلمونَ على شروطِهم

“মুসলিমরা নিজেদের (চুক্তিপত্রের) শর্তসমূহ পালন করতে বাধ্য।” [সুনান আবু দাউদ-১৯/ বিচার ব্যবস্থা, পরিচ্ছেদ: ১২. সন্ধি স্থাপন। হাসান-শাইখ আলবানি]

তাছাড়া হাদিসে এসেছে, ওয়াদা রক্ষা না করা মুনাফেকির আলামত।

◆ ইবনুল কুদামা বলেন,
” إذا اشترط لها أن لا يخرجها من دارها أو بلدها ، أو لا يسافر بها ، أو لا يتزوج عليها : فهذا يلزمه الوفاء به ، فإن لم يفعل فلها فسخ النكاح ، روي هذا عن عمر وسعد بن أبي وقاص وعمرو بن العاص رضي الله عنهم ” .
انتهى باختصار من “المغني” (9/483)

“যদি স্ত্রী শর্তারোপ করে যে, স্বামী তাকে তার নিজ বাড়ি থেকে অথবা নিজ এলাকা থেকে বাইরে কোথাও নিয়ে যেতে পারবে না বা তাকে নিয়ে সফর করতে পারবে না অথবা তার উপর অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবে না তাহলে স্বামীর জন্য এই শর্ত পালন করা আবশ্যক। যদি সে তা না করে তাহলে স্ত্রীর অধিকার আছে, বিয়ে ভঙ্গ করার। এমনটি উমর রা., সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রা., আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে।” [আল মুগনি থেকে সংক্ষেপায়িত, ৯/৪৮৩]

এ বিষয়ে আলেমদের মাঝে দ্বিমত থাকলেও এটিই অধিক বিশুদ্ধ অভিমত।
আধুনিক যুগের ইসলামি স্কলারদের মধ্যে সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদের সদস্য এবং প্রবীণ আলেম শাইখ সালেহ আল ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ)ও এই মত গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছেন, “বিয়েতে যে সকল শর্তারোপ করা শুদ্ধ সেগুলোর মধ্যে একটি হল, যদি সে স্বামীকে শর্ত দেয় যে, সে তার উপর অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবে না। স্বামী যদি তা পালন করে তাহলে তো ঠিক আছে। কিন্তু তা না করলে তার অধিকার আছে বিয়ে ভঙ্গ করার। কারণ হাদিসে এসেছে,

أَحَقُّ الشُّرُوطِ أَنْ تُوفُوا بِهِ مَا اسْتَحْلَلْتُمْ بِهِ الْفُرُوجَ

“শর্তসমূহের মধ্যে যা পূর্ণ করার সর্বাধিক দাবী রাখে তা হল, সেই শর্ত যার দ্বারা তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের হালাল করেছ।” [মুসলিম ১৬/৭ হাদিস নাম্বার: ১৪১৮]

🔹গ. বিয়ের পূর্বে ‘২য় বিয়ে করা যাবে না’ মর্মে কোন শর্ত না থাকলে স্বামীকে তার প্রয়োজনে ২য় বিয়ে করতে বাধা দেওয়া স্ত্রীর চরম অন্যায় এবং স্বামীকে মহান আল্লাহ প্রদত্ত অধিকার পালনে হস্তক্ষেপের শামিল। এ ক্ষেত্রে স্বামী বিপথে গিয়ে অন্যায়-অপকর্মে লিপ্ত হলে উভয়েই গুনাহগার হবে। কারণ বিয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য হল, নিজেকে পবিত্র রাখা। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

বিয়ের রাতে পাত্র-পাত্রীকে ক্ষীর, পায়েস ইত্যাদি খাওয়ানো এবং উপহার-সামগ্রী প্রদান করা

 প্রশ্ন: আমাদের দেশে বিয়ের পাত্র-পাত্রীকে তাদের আত্মীয় স্বজনগণ পায়েস বা মিষ্টান্ন খাওয়ায়, তারপর তাদেরকে কিছু টাকা বা উপহার-সামগ্রী দেয়। এটা কি ইসলামে জায়েজ?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: আমাদের দেশে বিভিন্ন এলাকায় বিয়ের আগের রাতে অথবা বিয়ের কয়েক দিন আগে থেকে পাত্র-পাত্রীকে পায়েস, ক্ষীর বা বিভিন্ন মিষ্টান্ন দ্রব্য খাওয়ানোর প্রথা প্রচলিত আছে। কোন কোন এলাকার আঞ্চলিক ভাষায় এটিকে ‘থুবড়া’ বলা হয়। তারপর আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবরা তাদের হাতে কিছু টাকা বা উপহার সামগ্রী দেয়। এগুলো সামাজিক প্রথা মাত্র। এর উদ্দেশ্য আনন্দ-বিনোদন করা। এটিকে হিন্দুদের ধর্মীয় প্রথা বলা সঙ্গত নয়।

সুতরাং এতে কোন আপত্তি নেই-এগুলোকে হারাম বলা যাবে না যতক্ষণ না তাতে শরিয়ত বিরুদ্ধ বা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কোন কিছু ঘটে। যেমন: নন মাহরাম কর্তৃক কনের মুখে তুলে খাওয়ানো, পর্দা হীনতা, মিউজিক, প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের উচ্চস্বরে গীত গাওয়া, নাচ-গান, নারী-পুরুষ একত্রিত হয়ে হৈ হুল্লোড় করা ইত্যাদি।

এছাড়াও আমাদের দেশের এলাকা ভেদে বিয়ের ক্ষেত্রে আরও বিভিন্ন ধরণের দেশাচার ও রীতি-নীতি প্রচলিত রয়েছে। প্রতিটি দেশেই অঞ্চল ভেদে এ জাতীয় নিজস্ব কতিপয় সংস্কৃতি ও রীতি-নীতি চালু আছে। আরব দেশেও তাদের বিয়েতে যুগ যুগ ধরে চলে আসা নানা ধরণের সংস্কৃতি ও প্রথা চালু আছে। বিজ্ঞ আলেমগণ সেগুলোকে হারাম বলেননি। মোটকথা, দেশাচার, সামাজকি প্রথা ও আঞ্চলিক রীতি-নীতি ইত্যাদি ইসলামে নিষিদ্ধ বা হারাম নয় যতক্ষণ না তাতে শরিয়ত বিরুদ্ধ বা হারাম কিছু মিশ্রণ ঘটে। যদি সেগুলোতে ইসলামের নিষিদ্ধ ও হারাম কিছুর মিশ্রণ ঘটে তাহলে তখন অবশ্যই তা হারাম হবে।
এই কারণে ফকিহগণ বলেন, العادة محكمة “মানুষের রীতি-নীতি শরিয়তের বিধান সাব্যস্ত কারী হিসেবে গণ্য হবে।” (তবে শর্ত হল, তাতে শরিয়ত বিরুদ্ধ বা হারাম কোনও কিছু থাকতে পারবে না।) এই মূলনীতির ব্যাপারে ফকিহগণ সকলেই একমত। আল্লাহু আলাম।▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

মহান আল্লাহর আরশে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ লেখা থাকা সংক্রান্ত কোনও হাদিসই বিশুদ্ধ নয়

 প্রশ্ন: আরশে লেখা আছে, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু-মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।”-এ কথা কি সঠিক?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর:
এ বিষয়ে একাধিক হাদিস বলা হয়ে থাকে। তবে সেগুলো কোনটি সহিহ নয়। নিম্নে এ জাতীয় ৪টি হাদিস তুলে ধরে বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের মতামতের আলোকে সেগুলোর মান সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে আলোকপাত করা হল: وبالله التوفيق

◆ ১. নিম্নোক্ত হাদিসটি প্রসিদ্ধ:

لما اقترف آدم الخطيئة، قال: يا ربِّ، أسألك بحق محمَّد لَمَا غفرتَ لي، فقال الله: يا آدم، وكيف عرفت محمدًا ولم أخلقْه؟ قال: يا رب، لأنَّك لما خلقتني بيدك، ونفخت فيَّ من رُوحك، رفعت رأسي، فرأيت على قوائم العرش مكتوبًا: لا إله إلا الله، محمد رسول الله، فعلمت أنك لم تضِفْ إلى اسمك إلا أحبَّ الخلق إليك، فقال الله: صدقتَ يا آدم، إنه لأحب الخلق إلي، ادعني بحقِّه، فقد غفرت لك، ولولا محمَّد ما خلقتك

“আদম আ. যখন (নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে) ভুল করে ফেলেন, তখন তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বলেন: হে আমার প্রতিপালক, আমি মুহাম্মাদের ওসিলা দিয়ে আপনার কাছে প্রার্থনা করছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।
তখন আল্লাহ বলেন, হে আদম, তুমি কিভাবে মুহাম্মাদকে চিনলে? আমি তো এখনো তাঁকে সৃষ্টিই করি নি? তিনি বলেন, হে আমার রব, আপনি যখন নিজ হাতে আমাকে সৃষ্টি করেন এবং আমার মধ্যে আপনার রূহ ফুঁ দিয়ে প্রবেশ করান তখন আমি মাথা তুলে দেখলাম আরশের খুঁটি সমূহের উপর লিখা রয়েছে: ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’। এতে আমি জানতে পারলাম যে, আপনার সবচেয়ে প্রিয় সৃষ্টি বলেই আপনি আপনার নামের সাথে তাঁর নামকে সংযুক্ত করেছেন।

তখন আল্লাহ বলেন, হে আদম, তুমি ঠিকই বলেছ। তিনিই আমার সবচেয়ে প্রিয় সৃষ্টি। তুমি আমার কাছে তার ওসিলা দিয়ে চাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। মুহাম্মদ না হলে আমি তোমাকে সৃষ্টি করতাম না।’’[হাকিম, আল-মুসতাদরাক ২/৬৭২]

❑ এ হাদিসটি বানোয়াট:

❂ এ হাদিসটিকে ইমাম হাকিম সহিহ বললেও একদল বিজ্ঞ মুহাদ্দিস তার সামালোচনা করে বলেছেন, সঠিক কথা হল, এটি বানোয়াট ও ভ্রান্ত হাদিস।

❂ ইমাম যাহাবি বলেন, এটি خبر باطل “এটি ভ্রান্ত হাদিস।” [মিযানুল ইতিদাল]
❂ ইবনে হাজার আসকালানি, ইমাম জাহাবির মতকে সমর্থন করেছেন। [লিসানুল মিযান]

এ হাদিসের বর্ণনা সূত্রে আব্দুর রহমান বিন যায়েদ (عبد الرحمن بن زيد) নামক একজন বর্ণনাকারী আছে। ইমাম হাকিম নিজেই তাকে তার আল মাদখাল (المدخل إلى معرفة الصحيح من السقيم) কিতাবে হাদিস বানানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। সুতরাং তা কীভাবে সহিহ হতে পারে? অত:এব ইমাম হাকেমের কথার মধ্যে বৈপরিত্য স্পষ্ট।
قال شيخ الإسلام ابن تيمية في “القاعدة الجليلة في التوسل والوسيلة” (ص 69) :
ورواية الحاكم لهذا الحديث مما أنكر عليه ، فإنه نفسه قد قال في كتاب “المدخل إلى معرفة الصحيح من السقيم” : عبد الرحمن بن زيد بن أسلم روى عن أبيه أحاديث موضوعة لا يخفى على من تأملها من أهل الصنعة أن الحمل فيها عليه ، قلت : وعبد الرحمن بن زيد بن أسلم ضعيف باتفاقهم يغلط كثيراً اهـ .
انظر سلسلة الأحاديث الضعيفة للألباني (1/38-47

❂ শাইখ আলবানি বলেন, এ হাদিসটি বানোয়াট। [সিলসিলা যাইফাহ/২৫]

—————

◆ ২. এ প্রসঙ্গে আরেকটি হাদিস বলা হয়। তা হল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
ليلةَ أُسري بي رأيتُ على العرشِ مكتوبًا : لا إلهَ إلَّا اللهُ محمَّدٌ رسولُ اللهِ ، أبو بكرٍ الصِّدِّيقُ ، عمرُ الفاروقُ ، عثمانُ ذو النُّورَيْن يُقتلُ مظلومًا

“মিরাজের রাতে আমি দেখলাম, আরশের গায়ে লেখা আছে,
لا إلهَ إلَّا اللهُ محمَّدٌ رسولُ اللهِ
“লা ইলাহ ইল্লাল্লাহ-মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। আবু বকর সিদ্দিক, উমর ফারুক এবং উসমান যিন নুরাইন জুলুমের শিকার হয়ে শহিদি মৃত্যু বরণ করবে।”

❑ এ হাদিসটিও বানোয়াট:

❂ ইবনুল জাওযি তার বিখ্যাত বানোয়াট হাদিস সংকলন আল মাউযুআত (الموضوعات) শীর্ষক গ্রন্থে এ হাদিসটি উল্লেখ করার পর বলেন, لا يصح “সহিহ নয়।” [আল মাউযুআত ২/৯১]

❂ শাইখ আলবানি বলেন, “এটি বানোয়াট।” [সূত্র: সিলসিলা যইফাহ, হা/ ৫৬১৭]

—————-

◆৩. অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, যে মেরাজের রাতে আমি দেখলাম, আরশের পায়ায় (খুঁটিতে) লেখা আছে,
لا إلهَ إلا اللهُ محمَّدٌ رسولُ اللهِ، أبو بَكرٍ الصِّدِّيقُ، وعُمَرُ الفاروقُ، وعُثمانُ ذو النُّورينِ
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। আবু বকর সিদ্দিক, উমর ফারুক এবং উসমান যিন নুরাইন।”

❑ এ হাদিসটিও বানোয়াট:

❂ ইবনে আদী তার বিখ্যাত ‘আল কামিল ফিয যুয়াফা’ (الكامل في الضعفاء) গ্রন্থে এ সম্পর্কে বলেন, ليس بصحيح “সহিহ নয়।” [৬/৬৩]

❂ শাইখ আলবানি বলেন, “এ হাদিসটি মওযু বা বানোয়াট।” [সূত্র: সিলসিলা যইফা/২৫]
——————–

◆◆ ৪. এ মর্মে আরেকটি যইফ হাদিস আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর কথা হিসাবে হাকিম সংকলন করেছেন। তিনি জানদাল ইবনে ওয়ালিক-এর সূত্রে বলেন, তাকে আমর ইবনে আউস আনসারি নামক দ্বিতীয় শতকের এক ব্যক্তি বলেছেন, তাকে তাবি-তাবিয়ী সাঈদ ইবনে আবু আরূবাহ (১৫৭ হি.) বলেছেন, তাকে তাবিয়ী কাতাদা ইবনে দিআমাহ আস-সাদুসী (১১৫ হি.) বলেছেন, তাকে তাবিয়ী সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব (৯১ হি.) বলেছেন, তাকে ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন,

أَوْحَى اللهُ إِلَى عِيْسَى يَا عِيْسَى آَمِنْ بِمُحَمَّدٍ وَأْمُرْ مَنْ أَدْرَكَهُ مِنْ أُمَّتِكَ أَنْ يُؤْمِنُوْا بِهِ فَلَوْلاَ مُحَمَّدٌ مَا خَلَقْتُ آَدَمَ وَلَوْلاَ مُحَمَّدٌ مَا خَلَقْتُ الْجَنَّةَ وَلاَ النَّارَ وَلَقَدْ خَلَقْتُ الْعَرْشَ عَلَى الْمَاءِ فَاضْطَرَبَ فَكَتَبْتُ عَلَيْهِ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ مُحَمَّدٌ رَسُوْلُ اللهِ فَسَكَنَ.
‘‘মহান আল্লাহ ঈসা আ. -এর প্রতি ওহী প্রেরণ করে বলেন, তুমি মুহাম্মাদের উপরে ঈমান আনয়ন কর এবং তোমার উম্মাতের যারা তাঁকে পাবে তাদেরকে তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নের নির্দেশ প্রদান কর। মুহাম্মাদ না হলে আদমকে সৃষ্টি করতাম না। মুহাম্মাদ না হলে জান্নাত ও জাহান্নামও সৃষ্টি করতাম না। আমি পানির উপরে আরশ সৃষ্টি করেছিলাম। তখন আরশ কাঁপতে শুরু করে। তখন আমি তার উপরে লিখলাম: ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’; ফলে তা শান্ত হয়ে যায়।’’ [হাকিম, আল-মুসতাদরাক ২/৬৭১।]

ইমাম হাকিম হাদিসটি উল্লেখ করে বলেন, হাদিসটির সনদ সহিহ। কিন্তু ইমাম যাহাবী প্রতিবাদ করে বলেন, ‘‘বরং হাদীসটি মাউযু (বানোয়াট) বলেই প্রতীয়মান হয়। কারণ এর একমাত্র বর্ণনাকারী এ ‘আমর ইবনে আউস আল-আনসারি’ নামক ব্যক্তি। সে প্রসিদ্ধ কয়েকজন মুহাদ্দিসের নামে হাদিসটি বর্ণনা করেছে। অথচ তাঁদের অন্য কোনও ছাত্র এ হাদিসটি তাঁদের থেকে বর্ণনা করে নি। এ লোকটি মূলত একজন অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি। তার কোনও পরিচয় পাওয়া যায় না। এ জানদাল ইবনে ওয়ালিক ছাড়া অন্য কোনও রাবী (বর্ণনাকারী) তার নাম বলেন নি বা তার কোনও পরিচয়ও জানা যায় না। এজন্য যাহাবি ও ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, “এটি ইবনে আববাসের নামে বানানো জাল হাদিস। [যাহাবী, মীযানুল ই’তিদাল ৫/২৯৯; ইবনে হাজার, লিসানুল মীযান ৪/৩৫৪।]
এই অর্থবোধক আরও একাধিক জাল হাদিস মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন।
[hdith ও hadithbd-থেকে সংকলিত ও সামান্য পরিমার্জিত]

আল্লাহ আমাদেরকে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন হাদিসের ব্যাপারে সচেতন হওয়ার তাওফিক দান করুন এবং ইসলাম সম্পর্কে সৃষ্ট সব ধরণের বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
▬▬▬🔹♦🔹▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
(লিসান্স, মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়)
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদী আরব।

Translate