Saturday, October 1, 2022

পাঁচটি জিনিসের পূর্বে পাঁচটি জিনিসকে মূল্যায়ন করা সংক্রান্ত হাদীসটির সঠিক ব্যাখ্যা

 প্রশ্ন: পাঁচটি জিনিসের পূর্বে পাঁচটি জিনিসকে মূল্যায়ন করা সংক্রান্ত হাদীসটির সঠিক ব্যাখ্যা কি? বিস্তারিত জানতে চাই।

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পাঁচ জিনিসের পূর্বে পাঁচ জিনিসের মূল্যায়ন সম্পর্কিত হাদিসটি মুসলিম উম্মার প্রতি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর নসিহত এবং বিশেষ অসিয়ত। যেন উম্মতের প্রতিটি সদস্য সৌভাগ্যবান, সফল ও সর্বাঙ্গীণ সুন্দর জীবন লাভ করতে পারে। আমর ইবনু মায়মুন আল আওদী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জনৈক ব্যক্তিকে নাসীহাতস্বরূপ বললেন: পাঁচ জিনিসের পূর্বে পাঁচ জিনিসকে মূল্যায়ন করো। তা হল:
.
●(১) যৌবনকে মূল্যায়ন করো বার্ধক্যের আগে।
●(২) সুস্থতাকে মূল্যায়ন করো অসুস্থতা আসার আগে।
●(৩) স্বচ্ছলতাকে মূল্যায়ন করো দারিদ্র্যতা আসার আগে।
●(৪) অবসরকে মূল্যায়ন করো ব্যস্ততা আসার আগে।
●(৫) এবং জীবনকে মূল্যায়ন করো মৃত্যু আসার আগে।

(সহীহুল জামি ১০৭৭, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত তারহীব ৩৩৫৫, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ্ ৩৪৩১৯, শুআবুল ঈমান ১০২৪৮, আল মুসতাদরাক লিল হাকিম ৭৮৪৬, মিশকাত,৫১৭৪)।
.
হাদীসটির ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে মুমিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ৫টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যাপারে রাসূল (ﷺ) নসিহত করেছেন। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোকপাত করা হল:
.
❒ (১): شَبَابَكَ قَبْلَ هَرَمِكَ “বার্ধক্য আসার আগেই যৌবনকে গুরুত্ব দাও।”
.
উল্লেখিত হাদীসে বার্ধক্যের পূর্বে যৌবনকালকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মানব জীবনের তিনটি কালের মধ্যে যৌবনকাল নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ। একথা সর্বজন স্বীকৃত যে একজন মানুষের যৌবন হচ্ছে তার সমস্ত কর্ম তৎপরতার উৎস। যৌবন মানুষকে কর্মঠ, দৃঢ়চেতা ও সাহসী করে তোলে। যৌবনের এই সময়ে মানুষ কঠোর পরিশ্রম করতে পারে, দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে পারে, ইচ্ছা করলে সকল প্রকার ইবাদত-বন্দেগীও সে করতে পারে। কিন্তু বুড়ো হয়ে গেলে যেমন পরিশ্রম করতে পারে না, তেমনি ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে সঠিকভাবে আল্লাহর ইবাদতও করতে পারে না। যৌবন বয়সে মানুষের শরীরে যে শক্তি-সামর্থ থাকে বুড়ো হওয়ার সাথে সাথে সেটা নিঃশেষ হয়ে যায়, তখন অনেক চেষ্টা করেও কোন কাজ করতে পারে না। এজন্য রাসূল (ﷺ) বলেছেন যৌবনের এ শক্তিকে কাজে লাগাও। বার্ধক্য আসার পূর্বেই যৌবনের শক্তিকে আল্লাহর পথে ব্যয় কর। ইসলামের সুমহান আদর্শের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা কর, তাহলেই তুমি নাজাত পাবে। তাই মুমিনের উপর আবশ্যক যে, সে মহান আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর যৌবন ও শক্তির সদ্ব্যবহার করবে। সে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করবে, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ হতে বাঁধা প্রদান করবে, রাসূল (ﷺ) এর সুন্নাহ অনুসারে জীবনকে পরিচালনা করবে। আর এসব কিছু করবে বার্ধক্য আসার আগে – যখন সে ইবাদত আদায়ে অক্ষম হয়ে পড়বে। প্রিয় নবী রাসূল (ﷺ) বলেছেন, যৌবনকাল ইবাদতে কাটানো যুবক সেই সাত ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে মহান আল্লাহ কেয়ামতের কঠিন অবস্থায় তাঁর আরশের ছায়াতলে স্থান দান করবেন আর সেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া অন্য কোন ছায়া থাকবে না। (সহীহ বুখারী ৬৬০, মুসলিম ১০৩১, নাসায়ী ৫৩৮০, তিরমিযী ২৩৯১, আহমাদ ৯৬৬৫, সহীহ ইবনু হিব্বান ৪৪৮৬, ইরওয়া ৮৮৭, মিশকাত ৭০১)।
.
এমনকি আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন এই যৌবনকালের শক্তি-সামর্থ কোন পথে ব্যয় হয়েছে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) “পাঁচটি বিষয়ে প্রশ্ন না করা পর্যন্ত ক্বিয়ামত দিবসে আদম সন্তানের পদদ্বয় নড়বে নাঃ (১) তার বয়স সম্পর্কে কিভাবে তা ক্ষয় করেছে। (২) তার যৌবন সম্পর্কে কিভাবে তা অতিবাহিত করেছে। (৩) তার সম্পদ সম্পর্কে কিভাবে তা উপার্জন করেছে? (৪) কোন পথে তা খরচ করেছে। (৫) আর যা শিখেছে সে অনুযায়ী কি আমল করেছে?” (এ হাদীসটি ও বর্ণনা করেছেন তিরমিযী ২৪১৭, সহীহুল জামে ৭৩০০, সহিহ তারগিব ওয়াত তাহরিব হাদিস নং ১২৮)।
.
❒(২): وَصِحَّتَكَ قَبْلَ سَقَمِكَ “অসুস্থতার পূর্বেই সুস্থতাকে গুরুত্ব দাও।”
.
অত্র হাদীসে প্রতিটি সুস্থ মূহুর্তকে পরিপূর্ণভাবে সদ্ব্যবহার করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। সুস্থতা মানুষের জন্য মহান আল্লাহ তাআলার এক অপার মহিমা বিশাল নেয়ামত। সুস্থ অবস্থায় মানুষ আল্লাহর ইবাদত করার যে সামর্থ রাখে অসুস্থ হলে তার আর সামর্থ থাকেনা। কারণ মানুষের শরীর একটা স্বয়ংক্রীয় যন্ত্র বিশেষ। তাই এ যন্ত্রের একটু ব্যতিক্রম হলেই শরীরে নানা ধরণের বাহ্যিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, তার নাম অসুস্থতা। সুস্থতা আল্লাহর একটি বড় নিয়ামত। মানুষ সুস্থ থাকলে সবকিছু করতে পারে কিন্তু অসুস্থ হয়ে গেলে আর কোন কাজ করতে পারে না। তাই যখন সে সুস্থ থাকে তখন তাকে নেয়ামত মনে করে ইবাদতে মশগুল হওয়া প্রয়োজন। কেননা সে জানে না যে, বর্তমানে যে অবস্থায় আছে পরবর্তীতে অবস্থা আরো অবনতি হয়ে যেতে পারে। এই অবস্থা সম্পর্কে রাসূল (ﷺ) অন্য হাদীসে বলেছেন, যে ব্যক্তি তার দিনটি পারিবারিক নিরাপত্তাবোধ ও সুস্থতার মধ্য দিয়ে শুরু করতে পারলো এবং নিজের দিনটিকে কাজে লাগাতে পারলো সে যেন সমগ্র দুনিয়া অধিকার করলো।” (সুনানে তিরমিযি ২৩৪৬, ইবনে মাজা ৪১৪১)।
.
❒(৩): وَغِنَاكَ قَبْلَ فَقْرِكَ “দারিদ্রতার পূর্বেই স্বচ্ছলতাকে গুরুত্ব দাও।”।
.
অর্থনীতির পরিভাষায় ‘অভাব অফুরন্ত’। মানুষের অভাব একটি পুরণ হলে আর একটি এসে হাজির হয়। এজন্য সে মনে করে আর একটু স্বচ্ছল হলে অমুক ভালো কাজটি করব। কিন্তু সে জানে না বর্তমানের চেয়ে সে আরো দরিদ্র হয়ে যেতে পারে। মানব দেহে যেমন যে কোন সময় অসুস্থতা আসতে পারে, ঠিক তেমনি যে কোন সময় মানব জীবনে দারিদ্রতাও এসে যেতে পারে। কারণ স্বচ্ছলতা এবং অস্বচ্ছলতা এর কোনটাই মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে,মহান আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় তোমার রব যাকে ইচ্ছা করেন তার রিযিক বাড়িয়ে দেন। যাকে ইচ্ছা করেন তার রিযিক সংকীর্ণ করে দেন। তিনি অবশ্যই তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত, পূর্ণ দ্রষ্টা।” (সুরা বনী ইসরাইল ৩০)।
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, وَاللَّهُ يَرْزُقُ مَنْ يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ অর্থ: আর আল্লাহ যাকে চান, বেহিসাব রিয্ক দান করেন। (সূরা আল-বাকারা ২১২)। আল-কুরআনের ভাষ্যানুযায়ী আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা তাকে সম্মান দান করেন, রিযিক দান করেন, আবার যাকে ইচ্ছা তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেন। বল, ‘হে আল্লাহ, রাজত্বের মালিক, আপনি যাকে চান রাজত্ব দান করেন, আর যার থেকে চান রাজত্ব কেড়ে নেন এবং আপনি যাকে চান সম্মান দান করেন। আর যাকে চান অপমানিত করেন, আপনার হাতেই কল্যাণ। নিশ্চয় আপনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আপনি রাতকে দিনের মধ্যে প্রবেশ করান এবং দিনকে রাতের মধ্যে প্রবেশ করান। আর মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন এবং জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন। আর যাকে চান বিনা হিসাবে রিয্ক দান করেন। (সূরা আলে-ইমরান ২৬-২৭)।
.
এ কথা মনে রাখতে হবে, কখন আপনার অর্থ সম্পদ আপনার হাত থেকে চলে যাবে, কখন আপনি দরিদ্র হয়ে যাবেন তার কোন নিশ্চয়তা নেই। তাই যে কোন সময় দারিদ্রতা এসে যেতে পারে এই চিন্তা করে অর্থ-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করার চেষ্টা করতে হবে। কারণ আগামী কাল কি হবে এর কোন তথ্যই মানুষের কাছে নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন: নিশ্চয় আল্লাহর নিকট কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। আর তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং মাতৃগর্ভে যা আছে তা তিনি জানেন। আর কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন স্থানে সে মারা যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত। (সূরা লুকমান ৩৪)। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: ইবনে উমার (রা.) নবী করীম (ﷺ) হতে বর্ণনা করেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, গাইব বা অদৃশ্যের চাবিকাঠি পাঁচটি। যথা: ১. আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না যে মায়ের গর্ভে কি তৈরী হচ্ছে। ২. শুধু তিনিই জানেন যে, আগামী কাল কী হবে। ৩. বৃষ্টি কখন হবে তাও কেবল তারই জানা। ৪. কোন প্রাণী জানে না যে, কোথায় তার মৃত্যু হবে এবং ৫. এটাও জানে না যে, কিয়ামত কবে হবে। (সহীহ বুখারী:৪৭৭৭, মুসলিম: ৯, ১০)।
.
❒(৪) وَفَرَاغَكَ قَبْلَ شُغُلُكَ “ব্যস্ততা আসার পূর্বেই অবসরকে গুরুত্ব দাও।”।
.
হাদীসের এ অংশে অবসরকে গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। এবং ইসলামে অলস সময় কাটানোকে সম্পূর্ণভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে ব্যস্ততা ও অবসর দু’টোই বান্দাহর জন্য নেয়ামত। ব্যস্ততা এজন্য নেয়ামত যে, ব্যস্ততা মানুষের অনেক অন্যায় ও বেহুদা কাজ থেকে বিরত রাখে। আর অবসর এই অর্থে নিয়ামত যে, সে এই অবসরে অনেক ভালো কাজ সম্পন্ন করে নেকী লাভ করতে পারেন। ব্যস্ততা মানব জীবনের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। কার কখন ব্যস্ততা এসে যাবে এটা কেউ বলতে পারেনা। আর অত্যাধিক ব্যস্ততা মানুষকে অনেক প্রয়োজনীয় কাজ থেকে অপারগ বানিয়ে ফেলে। এটাকে মনে রেখেই মানুষকে কর্ম পরিকল্পনা করতে হবে। মানব জীবনের একটি দূর্বলতা বা প্রবণতা আছে কোন কাজ তার সামনে এলে মনে করে একটু পরে কাজটি করে ফেলব। কিন্তু দেখা যায় একটু পরেই তার সামনে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ উপস্থিত হয়ে গেল। সেটা শেষ করতে না করতেই আরো একটা উপস্থিত হলো। এভাবে প্রথম যে কাজটি অনায়াসে করা যেতো, সেটা করার কোন সুযোগই পাওয়া যায় না। তাই যখন সুযোগ পাওয়া যায় তখনই কাজটি সম্পন্ন করে ফেলা উচিত।অনুরূপভাবে আল্লাহর ইবাদতের ব্যাপারেও যদি কেউ মনে করে এখন না, একটু পরে ইবাদতটা করব, তার পরিণতিও অনুরূপ। সে ইবাদতটি করার সুযোগ আর নাও পেতে পারে। এভাবে প্রতিনিয়ত মানুষের যে সময় অতীত হয়ে যাচ্ছে সে সময় আর কখনও ভবিষ্যতে ফিরে আসবে না। তাই বর্তমানে যে সময়টা অবসর আছে এটাকে নেয়ামত মনে করে অপেক্ষাকৃত বেশী গুরুত্বপূর্ণ এবং অধিক লাভজনক কাজ গুলো সম্পন্ন করাই বুদ্ধিমানের কাজ। ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘এমন দুটি নিয়ামত আছে, বহু মানুষ সে দু’টির ব্যাপারে ধোঁকায় আছে। (তা হল) সুস্থতা ও অবসর।’ (সহীহুল বুখারী ৬৪১২, তিরমিযী ২৩০৪, ইবনু মাজাহ ৪১৭০, আহমাদ ২৩৩৬, ৩১৯৭, দারেমী ২৭০৭, রিয়াদুস সলেহিন হাদিস নং ৯৮)।
.
❒(৫) وَحَيَاتَكَ قَبْلَ مَوْتِكَ “মৃত্যু আসার পূর্বেই জীবনকে গুরুত্ব দাও।”।
.
মায়ের পেট থেকে পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্রই মানুষের জীবন শুরু হয় এবং মৃত্যুর মাধ্যমে তার জীবনের অবসান ঘটে। তবে পৃথিবী নামক এই গ্রহে কার অবস্থান কতটুকু সময় তা আমরা কেউ বলতে পারব না। কারণ জীবন-মৃত্যুর মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। কে কখন কিভাবে মৃত্যু বরণ করবে এটা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। আল্লাহ তাআলা আল-কুরআনে এ সম্পর্কে বলেছেন, قُلْ إِنَّ الْمَوْتَ الَّذِي تَفِرُّونَ مِنْهُ فَإِنَّهُ مُلَاقِيكُمْ অর্থ: বল যে মৃত্যু হতে তোমরা পলায়ন করছ তা অবশ্যই তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করবে। (সূরা জুমুআ ৮)। আর মৃত্যুর পরেই মানুষের পরকালীন জীবনের হিসাব-নিকাশ শুরু হয়ে যায়। আর প্রত্যেক আত্মাকে মরতেই হবে। আল্লাহ বলেন, كُلُّ نَفْسٍ ذَآئِقَةُ الْمَوْتِ ‘প্রত্যেক আত্মাকে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে’ (সূরা আলে ইমরান ১৮৫)। মরণের সময় মানুষের কৃতকর্মই তার সাথী হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَجَاءَتْ كُلُّ نَفْسٍ مَّعَهَا سَائِقٌ وَّشَهِيْدٌ ‘প্রত্যেক ব্যক্তি আগমন করবে, তার সাথে থাকবে চালক ও কর্মের সাক্ষী’ (সূরা কাফ ৫০/২১)। যে শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ দুনিয়াতে পাপাচার করে, সে আল্লাহর কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবী করে বলবে, আমি তাকে পাপ কাজে লিপ্ত করিনি; বরং সে নিজেই পাপ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, قَالَ قَرِيْنُهُ رَبَّنَا مَا أَطْغَيْتُهُ وَلَكِنْ كَانَ فِيْ ضَلاَلٍ بَعِيْدٍ ‘তার সঙ্গী শয়তান বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমি তাকে অবাধ্যতায় লিপ্ত করিনি। বস্ত্ততঃ সে নিজেই ছিল সুদূর পথভ্রান্তিতে লিপ্ত।’ (সূরা কাফ ৫০/২৭)। পরকালে প্রত্যেকে স্বীয় কর্ম দেখতে পাবে। আল্লাহ বলেন, ‘অতএব কেউ অণুপরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে এবং কেউ অণুপরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও দেখতে পাবে।’(সূরা যিলযাল ৯৯/৭-৮)। ইহকাল ক্ষণস্থায়ী ও পরকাল চিরস্থায়ী। আল্লাহ বলেন, وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى ‘অথচ আখেরাতের জীবনই উত্তম ও চিরস্থায়ী।’ (সূরা আ’লা ৮৭/১৭)। উপরোক্ত আয়াত অনুযায়ী মৃত্যু কখন আসবে সেটা একমাত্র আল্লাহ জানেন, তাই আমাদের সব সময় মৃত্যুর কথা স্মরণে রেখে পরকালীন পাথেয় সংগ্রহের জন্য চেষ্টা করে যেতে হবে, কারণ মৃত্যুর ঘন্টা বেজে গেলে আর কোন ভালো কাজ করা সম্ভব হবে না। আল-কুরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে,আর আমি তোমাদেরকে যে রিযক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় কর, তোমাদের কারো মৃত্যু আসার পূর্বে। কেননা তখন সে বলবে, হে আমার রব, যদি আপনি আমাকে আরো কিছু কাল পর্যন্ত অবকাশ দিতেন, তাহলে আমি দান-সদাকা করতাম। আর সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। আর আল্লাহ কখনো কোন প্রাণকেই অবকাশ দেবেন না, যখন তার নির্ধারিত সময় এসে যাবে। আর তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। (সূরা মুনাফিকুন ১০-১১) উপরের বক্তব্য থেকে অনুধাবন করা যায়, মানুষের মৃত্যুর কোন গ্যারান্টি নেই, তাই এখনই মৃত্যু এসে যেতে পারে এই চিন্তা করে জীবনের প্রতিটি মুহুর্তকে কাজে লাগানোই হচ্ছে মুমিন জীবনের প্রধানতম কাজ।
.
পরিশেষে, উপরোক্ত হাদীস থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা হচ্ছে, যৌবনই হলো পরকালীন সাফল্য অর্জন করার সর্বত্তোম সময়, কাজেই আমাদের উচিত এটাকে ভালো কাজে ব্যয় করে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা। সুস্থতা ও অবসর সময়কে কুরআন-হাদীসের জ্ঞান চর্চা ও দ্বীনের প্রচার-প্রসারে আত্মনিয়োগ করা। যে কোন সময় অস্বচ্ছল হয়ে যেতে পারি এই চিন্তা করে বেশী বেশী আল্লাহর পথে অর্থ খরচ করার চেষ্টা করা। সর্বোপরি মৃত্যুর কথা চিন্তা করে জীবনের প্রতিটা মুহুর্ত ‘আমলে সালেহ’ বা ভালো কাজে ব্যয় করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।আমাদের আরো মনে রাখা দরকার, উক্ত হাদীসে উল্লেখিত পাঁচটি বিষয়ের প্রত্যেকটিই গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি আর একটির পরিপূরক, তবে শেষের বিষয়টা সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মধ্যে অন্য ৪টি বিষয় বিদ্যমান রয়েছে। মানুষের সুস্থতা-অসুস্থতা, ব্যবস্ততা-অবসর, স্বচ্ছলতা-অস্বচ্ছলতা, যৌবন-বার্ধক্য সবই জীবনেরই একটা মুহুর্তের অংশ। তাই সর্ববস্থায় মৃত্যুকে স্মরণ করে নিজের জীবনের প্রতিটা কাজ করলে বাকী চারটার গুরুত্বও দেওয়া হয়ে যায়। মহান আল্লাহ আমাদেরকে উপলব্ধি করে কাজে পরিণত করার তাওফিক দান করুন। আমীন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬❂▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

মাগরিবের ফরজের পূর্বে দু’রাক‘আত সুন্নাত সালাত আদায় করার হুকুম

 প্রশ্ন: মাগরিবের ফরজের পূর্বে দু’রাক‘আত সুন্নাত সালাত আদায় করার হুকুম কি? অনেকে বলেন মাগরিবের পূর্বে কোন সালাত নেই, তাদের বক্তব্য কতটুকু সঠিক? আজ আমরা মাগরিবের সুন্নত সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো।

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: মাগরিবের ফরয সালাতের পূর্বে দুই রাকআত সালাত পড়া মুস্তাহাব এবং মাগরিবের ফরজ সালাতের পর দুই রাকআত সালাত আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। এগুলো রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) কাওলী, ফেয়লী এবং তাকরীরী হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য মাগরিবের ফরজের পরের দুই রাকআত আদায় করা হলেও পূর্বের দুই রাকআত নফল সালাতকে বর্তমানে দেশের অধিকাংশ মসজিদগুলোতে অবজ্ঞা করা হয়। এমনকি উক্ত সালাত সম্পর্কে অধিকাংশ মুসল্লী খবরই রাখে না।
.
◾আমরা প্রথমে মাগরিবের পূর্ব দুই রাকআত নফল সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবো।
_____________________________________
আব্দুল্লাহ ইবনু মুগাফফাল (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা মাগরিবের পূর্বে দুই রাক‘আত সালাত আদায় কর, তোমরা মাগরিবের পূর্বে দুই রাক‘আত সালাত আদায় কর। তৃতীয়বার বলেন, যার ইচ্ছা সে পড়বে। এজন্য যে লোকেরা যেন তাকে সুন্নাত হিসাবে গ্রহণ না করে। (সহীহ বুখারী, হা/১১৮৩, ১/১৫৭ পৃ., (ইফাবা হা/১১১২ ও ১১১৩, ২/৩২৩ পৃ.); সহীহ মুসলিম, হা/৮৩৬, ১/২৭৮ পৃ., (ইফাবা হা/১৮০৮); , হা/১১৬৫, পৃঃ ১০৪; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১০৯৭, ৩/৯২ পৃ.)।

এ হাদীসটি সূর্যাস্তের পর মাগরিবের সালাতের পূর্বে দুই রাক‘আত সালাত আদায় করা মুস্তাহাব হওয়ার দলীল। সহাবা (সাহাবা) ও তাবি‘ঈদের একদল আলিম এবং পরবর্তী যুগে ইমাম আহমাদ ও ইসহাক এবং আহলুল হাদীসগণ এই অভিমত গ্রহণ করেছেন। আর এটিই সঠিক। যারা বলেন, হাদীসটি মানসূখ তথা এর হুকুম রহিত হয়ে গেছে তাদের কথার কোন দলীল নেই।তাছাড়া নির্দেশটি তিনবার বলার মধ্যেই উক্ত নফল সালাতের গুরুত্ব বুঝা যায়। সাহাবী আনাস, আবদুর রহমান ইবনু আওফ, উবাই ইবনু কা‘ব, আবু আইয়ুব আল আনসারী, আবু দারদা, জাবির ইবনু আবদুল্লাহ, আবূ মূসা আল আশ‘আরী ও আবু হুরায়রাহ্, আবদুল্লাহ ইবনু মুগাফফাল (রাঃ) প্রমুখগণ সাহাবীগন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তিকালের পরও এ সালাত আদায় করতেন। অতএব তা মুস্তাহাব হওয়ার ক্ষেত্রে কোন সন্দেহ পোষণ করা যায় না। (মিশকাতুল মাসাবিহ ১৬৬৫ নং হাদীসের ব্যাখ্যা দৃষ্টব্য)।
.
অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমরা যখন মদীনায় থাকতাম তখন এমন হত যে, মুয়াযযিন মাগরিবের সালাতের যখন আযান দিত, তখন লোকেরা কাতারে দাঁড়িয়ে যেত। অতঃপর তারা দুই রাক‘আত দুই রাক‘আত করে সালাত আদায় করত। এমনকি কোন অপরিচিত লোক মসজিদে প্রবেশ করলে ধারণা করত, অবশ্যই মাগরিবের সালাত হয়ে গেছে। এতে মানুষ উক্ত দুই রাক‘আত সালাত আদায় করত। (সহীহ মুসলিম, হা/৮৩৭, ১/২৭৮ পৃ., (ইফাবা হা/১৮০৯); মিশকাত, হা/১১৮০, পৃঃ ১০৪; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১১১২, ৩/৯৭ পৃ, ‘ছালাত’ অধ্যায়, ‘সুন্নাত ও তার ফযীলত’ অনুচ্ছেদ)।
.
উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী (রহ:) বলেন, এ হাদীসের প্রকাশমান শিক্ষা এই যে, মাগরিবের আযানের পর মাগরিবের ফরয সালাতের পূর্বে দুই রাক‘আত সালাত আদায় করা এমন একটি বিষয় যা আদায় করতে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদের অনুমতি দিয়েছেন। ফলে তারা তা আদায় করেছেন এবং তা আদায় করতে দ্রুত ধাবমান হতেন। অতএব তা মুস্তাহাব হওয়ার প্রমাণ বহন করে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা আদায় না করাটা মুস্তাহাব না হওয়া বুঝায় না বরং তা নিয়মিত সুন্নাত নয় তাই বুঝায়। (মিশকাতুল মাসাবিহ,১১৮১ নং হাদীসের ব্যাখ্যা দৃষ্টব্য)।

হাফিয ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহ ইমাম তাবারী থেকে বর্ণনা করেন: এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাগরিবের পূর্বে দুই রাকআত সালাতকে মুস্তাহাব হওয়া অস্বীকার করা নয়। কারণ এমন হতেই পারেনা যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন কিছু করার জন্য আদেশ করছেন যা মুস্তাহাব নয়। বরং এই হাদীসটি মাগরিবের পূর্বে দুই রাকআত সালাত আদায় করা মুস্তাহাব হওয়ার পক্ষে শক্তিশালী প্রমানের মধ্যে একটি। (ফাতহুল বারী ৩: ৬০)।
.
ইমাম নাওয়াওয়ি রাহিমাহুল্লাহ [৬৭৬ হি.] বলেন: এসব সহীহ ও স্পষ্ট হাদীসের আলোকে এটাই প্রমাণিত হয় যে মাগরিবের পূর্বে দুই রাকআত নামায আদায় করা মুস্তাহাব। (শারহু মুসলিম, ১: ২৭৮)।
.
মারসাদ ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি একবার উক্ববাহ্ আল জুহানী (রাঃ) এর নিকট হাযির হয়ে বললাম। আমি কি আপনাকে আবু তামীম আদ্ দারীর (তাবি‘ঈ) একটি বিষ্ময়কর ঘটনা শুনাব না? তিনি (আবু তামীম আদ্ দারী) মাগরিবের সালাতের পূর্বে দু’ রাক‘আত নাফ্‌ল সলাত আদায় করেন। তখন ‘উক্ববাহ্ বললেন, এ সালাত তো আমরা রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর যামানায় আদায করতাম। তখন তিনি বললেন, তাহলে এ সালাত এখন আদায় করতে আপনাদেরকে বাধা দিচ্ছে কে? জবাবে তিনি বললেন (দুনিয়ার) কর্মব্যস্ততায়। (সহীহ বুখারী ১১৮৪, মিশকাতুল মাসাবিহ হাদিস নং ১১৮১)।

এ হাদীসটি মাগরিবের পূর্বে দু’ রাক্‘আত সালাত আদায় করা বিধিসম্মত হওয়ার একটি দলীল। এ হাদীস আবু বাকর ইবনুল আরাবীর এ দাবীকে প্রত্যাখ্যান করে যে, সাহাবীদের পরে আর কেউ এ সালাত আদায় করতেন না। কেননা আবু তামীম আবদুল্লাহ ইবনু মালিক প্রখ্যাত তাবি‘ঈ, যিনি তার উপনাম আবু তামীম হিসেবেই প্রসিদ্ধ। তিনি এ দু’ রাকআত আদায় করতেন। (মিশকাতুল মাসাবিহ হাদীসের ব্যাখ্যা নং ১১৮১)।
.
নিন্মলিখিত হাদীস থেকে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আমলও প্রমাণিত। তিনি শুধু অন্যদেরকে নির্দেশই দেননি বরং তিনি নিজেও এই নামায আদায় করেছেন। যেমন: আবদুল্লাহ আল মুযানী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাগরিবের ফরয সালাতেরবপূর্বে দুই রাকআত সালাত আদায় করেন। তারপর তিনি বলেন: তোমরা মাগরিবের ফরয সালাতের পূর্বে দুই রাকআত সালাত আদায় করবে। লোকেরা এ আমলকে সুন্নাত হিসেবে গ্রহণ করতে পারে, তাই তৃতীয়বারে তিনি বললেন: এ তার জন্য যে ইচ্ছা করে। [সহীহ ইবন হিব্বান: আল ইহসান, ১৫৮৮]। ইমাম ইবনে হিব্বান ও গুলাম মুস্তাফা যাহীর আমানপুরিসহ অনেক ইমাম এই হাদীসের সনদকে সহীহ বলেছেন। অপরদিকে শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেন, এ সালাত মহানবী (ﷺ) পড়েছেন বলে কোন সহীহ প্রমাণ নেই। (তামামুল মিন্নাহ্‌, আলবানী ২৪২পৃ:)। বরং আনাস বলেন, ‘আমরা আল্লাহর রাসুল (ﷺ) এর যুগে সূর্য ডোবার পর মাগরেবের নামাযের আগে ২ রাকআত নামায পড়তাম।’ এ কথা শুনে তাবেয়ী মুখতার বিন ফুলফুল তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কি ঐ ২ রাকআত নামায পড়তেন?’ উত্তরে আনাস (রাঃ) বললেন, ‘তিনি আমাদেরকে তা পড়তে দেখতেন। কিন্তু সে ব্যাপারে আমাদেরকে কিছু আদেশও করতেন না এবং নিষেধও করতেন না।’ (সহীহ মুসলিম, মিশকাত ১১৭৯)।
.
উল্লেখ্য যে মাগরিবের পূর্বে কোন নফল সালাত নেই মর্মে সমাজে যে কথা প্রচলিত আছে সে বর্ণনাটি মুনকার বর্ননাটি হলো: আব্দুল্লাহ ইবনু বুরায়দাহ (রাঃ) তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, নিশ্চয় প্রত্যেক আযানের পর দুই রাক‘আত সালাত রয়েছে। তবে মাগরিব ব্যতীত। (বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা হা/৪৬৬৯)।

তাহক্বীক্ব: বর্ণনাটি মুনকার। ‘মাগরিব ব্যতীত’ শেষের অংশটুকু ভুলক্রমে সংযোজিত হয়েছে। ইমাম বায়হাক্বী উক্ত বর্ণনা উল্লেখ করার পর বলেন, وَهَذَا مِنْهُ خَطَأٌ فِى الْإِسْنَادِ وَالْمَتْنِ جَمِيْعًا وَكَيْفَ يَكُوْنُ ذَلِكَ صَحِِيْحًا؟ ‘এর অতিরিক্ত অংশের সনদ ও মতন উভয়েই ভুল রয়েছে। কিভাবে সহীহ হতে পারে?’ অতঃপর তিনি বলেন, ইবনু বুরায়দা নিজেই মাগরিবের পূর্বে দুই রাক‘আত সালাত আদায় করতেন। (বায়হাক্বী, সুনানুস ছুগরা হা/৫৬৮; সনদ সহীহ, সহীহ ইবনে হিববান হা/১৫৫৭; সিলসিলা যঈফাহ হা/৫৬৬২-এর আলোচনা দৃষ্টব্য)।
.
◾মাগরিবের ফরজ সালাতের পর দুই রাকআত সালাত আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ:
______________________________________
পূর্বের পর্বে ও উল্লেখ হয়েছে যে, মাগরিবের পর ২ রাকআত সুন্নত মহানবী (ﷺ) ত্যাগ করতেন না। তবে এই সুন্নত তিনি ঘরে পড়তেন।যেমন কা‘ব ইবনু ‘উজরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (আনসার গোত্র) বানী আবদুল আশহাল-এর মাসজিদে আসলেন এবং এখানে মাগরিবের সালাত আদায় করেছেন। সালাত সমাপ্ত করার পর তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কিছু মানুষকে নফল সালাত আদায় করতে দেখলেন। তিনি বললেন: এসব (নফল) সালাত বাড়িতে পরার জন্য। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী ও নাসায়ীর এক সূত্রে পাওয়া যায়, লোকেরা ফারয সলাত আদার করার পর নাফল সালাত আদায়ের জন্যে দাঁড়ালে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এসব সালাত তোমাদের বাড়ীতে আদায় করা উচিত’। (আবু দাঊদ ১৩০০, আত্ তিরমিযী ৬০৪, নাসায়ী ১৬০০, ইবনু খুযায়মাহ্ ১২০১,সহীহ আল জামি‘ ৭০১০। মিশকাতুল মাসাবিহ,১১৮২)।
.
মাগরিবের সুন্নতেও ফজরের সুন্নতের মতই প্রথম রাকআতে সূরা কাফিরুন এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরা ইখলাস পড়া সুন্নত। আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে মাগরিবের পরের দুই রাক’আতে এবং ফজরের পূর্বের দুই রাক’আতে “কুল ইয়া আয়্যুহাল কাফিরূন” এবং “কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ” সূরা দুটি এত সংখ্যকবার পাঠ করতে শুনেছি যে, তা গণনা করে শেষ করতে পারব না। এ অনুচ্ছেদে ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে। (তিরমিযী ৪৩১, ইবনে মাজাহ্‌ ১১৬৬)।
.
পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা প্রমানিত যে, মাগরিবের তিন রাকাআত ফরজ সালাতের পূর্বে দুই রাকআত নফল সালাত রয়েছে কেউ চাইলে আদায় করতে পারে কিন্তু নেই মর্মে যে কথা চালু আছে উক্ত বক্তব্য ভিত্তিহীন যেটা দলিলের আলোকে প্রমান করার চেষ্টা করেছি। অতএব সুযোগ ও সাধ্যমত উক্ত দুই রাকআত নফল সালাতের উপর আমল করা কর্তব্য। (আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন)।
▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

আল্লাহ তা‘আলা প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে প্রথম আকাশে নেমে আসেন এর সঠিক ব্যাখ্যা

 প্রশ্ন: মহান আল্লাহ তা‘আলা প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে প্রথম আকাশে নেমে আসেন। কিন্তু পৃথিবীর সর্বত্র একসাথে শেষ রাত হয় না। তাহলে হাদীসটির সঠিক ব্যাখ্যা কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: মহান আল্লাহ তা‘আলা আমাদের রব। তিনি শোনেন ও জানেন আমরা যা প্রকাশ করি আর যা গোপন করি। বান্দার কোনো ডাকই তাঁর জানার বাইরে নয়। তিনি সর্বাবস্থায় আমাদের আকুতি শোনেন। তবে কিছু সময় আছে যখন দু‘আ করলে তিনি সে ডাকে সাড়া দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তেমনই একটা সময়ের কথা আমরা জানতে পারি রাসুলুল্লাহ(ﷺ) এর একটি হাদিস থেকে যেখানে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,প্রতি রাত্রে শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের মর্যাদাবান বারাকাতপূর্ণ রব দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, ‘যে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেব। যে আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করবে আমি তাকে তা দান করব। যে আমার নিকট মাফ চাইবে আমি তাকে মাফ করে দেব।’মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, তারপর তিনি হাত বাড়িয়ে দেন এবং বলেন, কে আছে যে এমন লোককে করয দেবে যিনি ফকীর নন, না অত্যাচারী এবং সকাল পর্যন্ত এ কথা বলতে থাকেন। (সহীহ বুখারী হা/১১৪৫, সহীহ মুসলিম হা/৭৫৮ মিশকাত হা/১২২৩)।
.
হাদীসটি ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা‘আলা শেষ তৃতীয়াংশে প্রতি রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। তারপর তিনি বলেন,কে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেব?কে আমার কাছে চাইবে আমি তাকে দান করব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আমি তাকে ক্ষমা করব? অর্থাৎ রাতের এ সময়ে আল্লাহ তার বান্দাদের থেকে এ কামনা করেন যে, তারা যেন তাকে ডাকে এবং তার প্রতি তিনি তাদের উৎসাহ প্রদান করেন। যে তাকে ডাকে তিনি তার ডাকে সাড়া দেন। তিনি তাদের থেকে চান যে, তারা যেন তাদের চাওয়া-পাওয়া তার কাছেই চায়। যে তার কাছে চায়, তিনি তাকে দেন। আর তিনি তাদের কাছে চান যে, তারা যেন তাদের গুনাহসমূহ হতে তার কাছে ক্ষমা চায়, তিনি তার মু’মিন বান্দাদের ক্ষমা করে দেবেন। আর চাওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তাদের উৎসাহ প্রদান ও আহ্বান করা। আর অবতরণটি হলো বাস্তব অবতরণ। তার মহত্ব ও কামালিয়্যাতের সাথে প্রযোজ্যভাবে। এটি মাখলুকের অবতরণের মতো নয়। তিনি কিভাবে নেমে আসেন তা অজ্ঞাত। এগুলি অদৃশ্য বিষয়ক জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। যা স্রেফ আল্লাহর ইলমে রয়েছে। অতএব হাদীসে যেভাবে এসেছে সেভাবেই বিশ্বাস করতে হবে।মোটকথা আল্লাহ তা‘আলার প্রথম আসমানে অবতরণের ধরণ ও প্রকৃতি হলো তার পবিত্র স্বকীয় সত্ত্বার জন্য যেভাবে শোভন সেভাবেই। এর অর্থ এতটুকু গ্রহণ করাটাই সবচেয়ে নিরাপদ।কিন্তু মহান আল্লাহর অবতরণকে রহমত বা ফিরিশতা ইত্যাদি অবতরণ করেছে বলে ব্যখ্যা করা সহীহ নয়। যেমনটি প্রাচীন পথভ্রষ্ট ফির্কা জাহমিয়া ও মুতাযিলারা করতো। তাদের বক্তব্যঃ স্থান পরিবর্তন আল্লাহর অতুলনীয়ত্বের সাথে সাংঘর্ষিক। তিনি আরশ থেকে অবতরণ করলে আরশ কি শূন্য থাকে? তারা আরো বলেঃ অবতরণ অর্থ নৈকট্য বা বিশেষ করুণা। (আল ফিকহুল আকবর পৃষ্ঠা ২৬৩) অথচ এগুলো ভ্রান্ত আকিদা। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের বক্তব্য হল, আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে তার শানের সাথে যেভাবে প্রযোজ্য সেভাবে অবতরণ করেন। এ কথার ওপর কোন প্রকার বিকৃতি, অকার্যকর করা, ধরণ এবং তুলনা করা ছাড়া ঈমান আনা ওয়াজিব।
.
উপরোক্ত হাদীসটি সম্পর্কে প্রখ্যাত তাবেঈ আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ) কে প্রশ্ন করা হ’লে তিনি বলেন, তিনি (আল্লাহ) প্রতি রাতেই অবতরণ করেন। তখন জিজ্ঞেস করা হ’ল, অবতরণের ফলে কি আরশ খালি হয়ে যায় না? জবাবে ইবনুল মুবারাক বললেন, ‘রে যঈফ! তিনি যেভাবে ইচ্ছা অবতরণ করেন’ (আক্বীদাতুস সালাফ পৃঃ ২৯)। শায়খুল হাদীস আল্লামা মুবারকপূরী (রহঃ) আরো বলেন, আমাদের নিকট হক হলো জমহূর সালাফগণ যা গ্রহণ করেছেন। কিতাবুল্লাহ এবং সুন্নাতে সহীহায় ইজমালীভাবে যা বিধৃত হয়েছে আমরা তার প্রতি ঈমাণ আয়নায় করি, আর আল্লাহ সুবহানাহূ ওয়াতা‘আলাকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য দেয়া এবং তার ধরণ প্রকৃতি ইত্যাদি থেকে পবিত্র মনে করি। আমরা অহেতুক তাবিল থেকে বিরত থেকে তার প্রতি ঈমান রাখাই জরুরী মনে করি। আল্লাহ তা‘আলার নাযিল হওয়া সংক্রান্ত হাদীস এবং সাদৃশ্য বিষয়ক বর্ণনাগুলো নিয়ে আমাদের পূর্বসুরী ইমামগণ যেমন ইমাম ইবনু তায়মিয়্যাহ্, হাফিয ইবনুল ক্বইয়্যূম হাফিয যাহাবী বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। প্রত্যেক রাতেই অবতরণ বলতে রাতের নির্দিষ্ট কিছু সময় আর সেটা হলো রাতের শেষ প্রহর যদিও একাধিক মতামত রয়েছে। (মিশকাতুল মাসাবিহ, ১২২৩ নং হাদীসের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)।
.
বিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, সৌদি ফাতাওয়া বোর্ডের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী, শাইখুল ইসলাম, ইমাম আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] কে মহান আল্লাহর অবতরণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে শাইখ বলেন: আল্লাহর অবতরণ ঘটে প্রত্যেক দেশের হিসেব অনুযায়ী। কারণ আল্লাহর অবতরণ সৃষ্টি জীবের অবতরণের মতো নয়। আল্লাহর বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে অবতরণ করেন সমগ্র বিশ্বব্যাপী যেভাবে তার মর্যাদার জন্য উপযুক্ত। তার অবতরণের ধরন তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না যেমন ভাবে তার সত্তা সম্পর্কে তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না। (আল্লাহ বলেছেন), “তার মত আর কোন কিছু নেই। তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা।” তিনি আরো বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর সাদৃশ্য পেশ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ জানেন; তোমরা জানো না।” (মাজমু ফাতওয়া ইবনে বায ৪/৪২০)।
.
পরিশেষে, উপরোক্ত হাদীসটি যেভাবে বর্ণিত হয়েছে ঠিক সেভাবেই হাদীসের ভাষ্য মেনে নিতে হবে। এ বিষয়ে বিতর্ক উত্থাপন করা সহীহ হাদীস সন্দেহ করার শামিল। যা নেহায়েতই অন্যায় এবং অযৌক্তিক।ঈমানদারের জন্য যরূরী হ’ল, আল্লাহ অবতরণ করেন একথা বিশ্বাস করা এবং কিভাবে করেন সেকথা বলা থেকে বিরত থাকা। কারণ আল্লাহর কাজ তাঁর মতই হয় মানুষের মত নয়। সারা পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে রাত হয় এটা আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয় এবং তাঁর অবতরণ তাঁর ইচ্ছাতেই হয়। পৃথিবীর যে অংশে যখন রাত হয়, সে অংশে তাঁর মর্যাদা অনুযায়ী তাঁর অবতরণ ঘটে। যা অনুভব করার ক্ষমতা মানুষ রাখে না (ছাবূনী, আক্বীদাতুস সালাফ, পৃঃ ২৯)। আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
______________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

এশার ফরয সালাতের পর সর্বমোট কত রাকাআত সুন্নত বা নফল সালাত আদায় করা যায়

 প্রশ্ন: এশার ফরয সালাতের পর সর্বমোট কত রাকাআত সুন্নত বা নফল সালাত আদায় করা যায়? আজ আমরা সেই উত্তরটি খোঁজার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: মহান আল্লাহ মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য-কে তাদের মধ্যে আমলের দিক দিয়ে সর্বোত্তম। মহান আল্লাহর নিকটবর্তী ও আখিরাতে কৃতকার্য হওয়ার জন্য সর্বোত্তম আমলের বিকল্প নেই। এ কারণে শরী‘আতে সর্বশ্রেষ্ঠ আমলের কথা বলে দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে সে যেন সৎকর্ম করে ও তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকেও শরীক না করে।’ (সূরা আল-কাহফ: ১১০)। ইসলামে কালিমাতুশ শাহাদাহ পাঠ করার পর সালাতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত আর নাই। প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক সুস্থ ব্রেইনের অধিকারী মুসলিমের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথা সময়ে যথা নিয়মে আদায় করা ফরজ। সব ওয়াক্তের সলাতই মর্যাদাপূর্ণ। তবে বিশেষভাবে আসর, ইশা ও ফরজ সালাতের মর্যাদা ও ফযিলত স্বতন্ত্র। যেমন: আবু হুরাইরা রাযি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “মুনাফিকদের উপর ফজর ও এশার নামাজ অপেক্ষা অধিক ভারী নামাজ আর নেই। যদি তারা এর ফজিলত ও গুরুত্ব জানত, তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে বা পাছার ভরে অবশ্যই তাতে আসত।” (বুখারি ৬৫৭, ৬৪৪, ৬৫৭, ২৪২০, ৭২২৪, মুসলিম ৬৫১)। আবু মুসা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি দুই ঠাণ্ডা নামায (আসর ও ইশার নামায) পড়ে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সহীহুল বুখারী ৫৭৪, মুসলিম ৬৩৫)।

উসমান বিন আফফান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি জামা‘আতের সাথে এশার সালাত আদায় করল সে যেন অর্ধরাত্রি পর্যন্ত সালাতে রত থাকল। আর যে ব্যক্তি ফজরের সালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করল সে যেন সারা রাত্রি সালাত আদায় করল’। (সহীহ মুসলিম, হা/৬৫৬; মিশকাত, হা/৬৩০)। রবীআ ইবনু কা‘ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি রাতের বেলা নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাথে থাকতাম। ওযুর পানিসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এগিয়ে দিতাম। একদিন তিনি আমাকে বললেন, (দ্বীন-দুনিয়ার কল্যাণের জন্য যা কিছু চাও) চেয়ে নাও। আমি নিবেদন করলাম, আমি শুধু জান্নাতে আপনার সহচর্য লাভ করতে চাই। তিনি বললেন, এছাড়া আর কিছু চাও? আমি বললাম, এটাই আমার একমাত্র আবেদন। তিনি বললেন, তুমি বেশি বেশি সেজদার মাধ্যমে আমাকে সাহায্য করো।’
.
পাচঁ ওয়াক্ত সালাতের মধ্যে এক ওয়াক্ত সালাত হল সালাতুল এশা। এশার সালাত বিশুদ্ধ দলিলের আলোকে ৬ রাকাআত যার ৪ রাক‘আত ফরয। অতঃপর ২ রাক‘আত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। পূর্বের পর্বগুলোতে একাধিক হাদীসে উল্লেখ হয়েছে যে, এশার পরে মহানবী (ﷺ) ২ রাকআত সুন্নত নিজের ঘরে পড়তেন।কিন্তু সুন্নত সালাত ঘরে পড়ার সুযোগ না থাকলে অথবা সংসারের ব্যস্ততায় পড়ার অবসর না হলে তা মসজিদেই পড়ে নেওয়া যায়। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি দিনে ও রাতে ১২ রাক‘আত সালাত আদায় করবে, তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর তৈরি করা হবে। সেগুলো হল যোহরের পূর্বে চার পরে দুই, মাগরিবের পরে দুই, এশার পরে দুই এবং ফজরের পূর্বে দুই। অন্য বর্ণনায় ১০ রাক‘আতের কথা এসেছে। সেখানে যোহরের পূর্বে দুই রাক‘আত বলা হয়েছে। (বুখারী হা/১১৬৫; মিশকাত হা/১১৫৯, ১১৬০)। আওয়াল ওয়াক্তে আাদায় নামায উত্তম হলেও এক তৃতীয়াংশ বা মধ্যরাতে (শেষ অক্তে) এশার নামায পড়া আফযল। মহানবী (ﷺ) বলেন, “আমার উম্মতের জন্য কষ্টসাধ্য না জানলে আমি এশার নামাযকে এক তৃতীয়াংশ অথবা অর্ধরাত পর্যন্ত দেরী করে পড়তে তাদেরকে আদেশ দিতাম।” (আহমাদ, মুসনাদ, তিরমিযী, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান, মিশকাত ৬১১) প্রিয় রাসূল (ﷺ) এশার নামাযকে এক তৃতীয়াংশ রাত্রি পর্যন্ত দেরী করে পড়তে পছন্দ করতেন এবং এশার পূর্বে ঘুমানো ও পরে কথাবার্তা বলাকে অপছন্দ করতেন। (বুখারী ৫৯৯, মুসলিম, প্রমুখ)। যাতে এশা, তাহাজ্জুদ, বিতর ও ফজরের নামায যথা সময়ে পড়া সহজ হয়।
.
সুতরাং আমাদের করণীয় হলো,জামাআতের সাথে এশার ফরজ সালাত আদায়ের পরে দু’রাক‘আত সুন্নাতে মুওয়াক্কাদা আদায় করা। (বুখারী হা/১১৬৫; মুসলিম হা/৭২৮; মিশকাত হা/১১৫৯)। এরপরে বাড়িতে গিয়ে কেউ চাইলে চার রাক‘আত নফল সালাত আদায় করতে পারে। (ইবনু কুদামাহ, মুগনী ২/৯৬)। কিন্তু এই চার রাক‘আত সালাত বিশেষ কোন সালাত নয় এবং এশার সালাতের সাথেও সংশ্লিষ্ট নয়। বরং এটি তাহাজ্জুদের সালাতের অংশ হিসাবে গণ্য। (ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী ২/৯৬)।যেমন, ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি আমার খালা নবী করীম (ﷺ)ভএর সহধর্মিনী মায়মুনা (রাঃ) এর ঘরে এক রাতে ছিলাম। রাসূল (ﷺ) ও সেই রাতে সেখানে ছিলেন। নবী করীম (ﷺ) জামা‘আতে এশার সালাত আদায় করে তাঁর ঘরে চলে আসলেন এবং চার রাক‘আত সালাত আদায় করে শুয়ে পড়লেন । (সহীহ বুখারী হা/১১৭;সহীহ মুসলিম হা/৯০১)। উক্ত চার রাক‘আত সালাতের ফযীলতে বলা হয়েছে যে, তা ক্বদর রাতের সালাত আদায়ের সমতুল্য। (ইবনু আবী শায়বাহ হা/৭৩৫১-৭৩৫৭; মারওয়াযী, মুখতাছার ক্বিয়ামুল লাইল হা/১৯২)। তবে উক্ত মর্মে বর্ণিত মারফূ‘ হাদীসগুলোর সবই অত্যন্ত জয়ীফ বা দুর্বল। তবে প্রায় একই মর্মে সহীহ সূত্রে বেশ কিছু মওকূফ হাদীস বর্ণিত হওয়ায় আলবানী (রহঃ) বলেন, এই আমলের ফযীলত সম্পর্কিত বর্ণনাটি মারফূ‘র পর্যায়ভুক্ত। (সিলসিলা যঈফাহ হা/৫০৬০ এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)।অর্থাৎ কেউ চাইলে উক্ত ৪ রাকাআত নফল সালাত আদায় করতে পারেন ইনশাআল্লাহ।পরিশেষে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সালাতের সাথে সাথে নফল সালাতের প্রতি যত্নবান হওয়ার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

ফরজ সালাতের পর সর্বশ্রেষ্ঠ সালাত তাহাজ্জুদ

 প্রশ্ন: ফরজ সালাতের পর সর্বশ্রেষ্ঠ সালাত তাহাজ্জুদ। এ কথা কতটুকু সঠিক? এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাই?

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: ফরজ সালাতের পর সর্বশ্রেষ্ঠ সালাত তাহাজ্জুদ। আজ আমরা তাহাজ্জুদ সালাতের পরিচয়, আদায়ের সঠিক সময়, সঠিক পদ্ধতি ও রাকআত সংখ্যা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবো।

ভূমিকা: রাতের নিঃঝুম পরিবেশে যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকে, নিদ্রার আবেশে মানুষ যখন মহান সৃষ্টিকর্তা ও প্রতিপালকের কথা বিস্মৃত হয়, সেই সময় আল্লাহর কিছু খাস বান্দা নিদ্রা, আরাম-আয়েশ ও স্ত্রীর শয্যা ত্যাগ করে তাহাজ্জুদ সালাতের মাধ্যমে আল্লাহকে বিশেষভাবে স্মরণ করে। তাহাজ্জুদ’ শব্দটি আরবি মূল ধাতু هُجُوْدٌ (হুজূদুন) এর অর্থ হল: রাত্রিজাগরণ, ঘুম থেকে ওঠা, রাত্রিকালীন ইবাদত ইত্যাদি। সেখান থেকে تَهَجُّدٌ (তাহাজ্জুদুন) পারিভাষিক অর্থে রাত্রিতে ঘুম থেকে জেগে ওঠা বা রাত্রি জেগে ছালাত আদায় করা (আল-মুনজিদ)।
.
পরিভাষায়, তাহাজ্জুদ মূলত ওই নামাজকে বলা হয়, যা রাতের বেলায় ঘুম থেকে ওঠে আদায় করা হয়৷ ফায়দ্বুল বারিতে এসেছে, ‘ঘুম থেকে জাগার পর যদি নামাজ পড়ে, তখন তাকে তাহাজ্জুদ নামে নামকরণ করা হয়৷’[কাশমিরি, ফায়দ্বুল বারি: ২/৪০৭]। ইমাম কুরতুবি (রাহ.)-ও একথা বলেছেন। (তাফসীরে কুরতুবী ১০/৩০৮।) অধিকাংশ আলিমের বক্তব্য এটিই। তাছাড়া দলিলের আলোকে এই মতটিই অগ্রগণ্য। এর বাইরে কোনো কোনো আলিম বলেছেন, মধ্য রাতের পর যে নামাজ পড়া হয়, সেটি তাহাজ্জুদ। আবার কারও মতে, ইশার পরই তাহাজ্জুদ আদায় করা যায়। তবে, অধিকতর সঠিক মত সেটিই, যা আমরা প্রথমে উল্লেখ করেছি। তা হলো, রাতের বেলা ঘুম থেকে ওঠে নামাজ পড়া।
.
◾তাহাজ্জুদ নামাজের গুরুত্ব,ফজিলত মর্যাদা:
____________________________________
রাত্রির সালাত বা ‘সালাতুল লায়েল’ নফল হলেও তা খুবই ফযীলতপূর্ণ। এই নামাযের কথা উল্লেখ করত: মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ) কে সম্বোধন করে বলেন-রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ নামায পড়; এ তোমার জন্য একটি অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায় তোমার প্রতিপালক তোমাকে মাকামে মাহ্‌মূদে (প্রশংসিত স্থানে) প্রতিষ্ঠিত করবেন। (সূরা ইসারা, ১৭/৭৯)। তাহাজ্জুদ আদায়কারীর মর্যাদা তার চেয়ে বেশি, যে তাহাজ্জুদ আদায় করে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি রাতের বেলা সিজদারত থাকে বা (ইবাদতে) দাঁড়ানো থাকে, আখিরাতের ব্যাপারে শঙ্কিত থাকে এবং নিজ রবের অনুগ্রহ প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে এমনটি করে না?’’ [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৯]।

রাত্রি জাগরণ করে ইবাদত করা রহ্‌মানের বান্দাগণের গুণ। মহান আল্লাহ বলেন, রহমানের বান্দা তারা, যারা ভূপৃষ্ঠে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে তখন তারা প্রশান্তভাবে জবাব দেয়। আর তারা তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে ও দন্ডায়মান থেকে রাত্রি অতিবাহিত করে। (কুরআন মাজীদ ২৫/৬৩-৬৪)।
.
❖ তাহাজ্জুদ নামাজ নফসের প্ররোচনায় গুনাহ সংঘটিত হতে বাধা দানকারী: আল্লাহ বলেন, ‘‘নিশ্চয়ই রাত্রিজাগরণ প্রবৃত্তি দমনে অত্যন্ত কার্যকর।’’ [সূরা মুযযাম্মিল, আয়াত: ৬]
.
❖ তাহাজ্জুদ জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম উপায়: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘হে লোকসকল! তোমরা সালামের প্রচলন করো, খাদ্য খাওয়াও, আত্মীয়তা রক্ষা করো এবং মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন নামাজ আদায় করো। তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’’ [তিরমিযি, আস-সুনান: ২৪৮৫; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ১৩৩৪; হাদিসটি হাসান সহিহ]।
.
❖ আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য লাভের সুযোগ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘আল্লাহ তা‘আলা রাতের শেষভাগে বান্দার সবচেয়ে কাছে চলে আসেন। কাজেই যদি পারো, তবে তুমি ওই সময়ে আল্লাহর স্মরণকারীদের মধ্যে শামিল হয়ে যেও। কেননা ওই সময়ের নামাজে ফেরেশতাগণ সূর্যোদয় পর্যন্ত উপস্থিত থাকেন।’’ [নাসাঈ, আস-সুনান: ৫৭২; তিরমিযি, আস-সুনান: ৩৫৭৯]।
.
❖ গুনাহের কাফফারা ও শারীরিক রোগমুক্তির উপায় তাহাজ্জুদের নামাজ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘তোমাদের নিয়মিত তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া উচিত। এটি তোমাদের পূর্ববর্তী নেককার লোকদের অভ্যাস। এই নামাজ তোমাদেরকে আল্লাহর নিকটে পৌঁছে দেবে, ভুল-ত্রুটিগুলো মিটিয়ে দেবে, গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখবে এবং শরীর থেকে রোগ দূর করবে।’’ [তিরমিযি, আস-সুনান: ৩৫৪৯; হাদিসটি সহিহ]।
.
❖ ফরজ নামাজের পর সর্বশ্রেষ্ঠ নামাজ এটি: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘ফরজ নামাজের পর সর্বশ্রেষ্ঠ নামাজ হলো, রাতের (তাহাজ্জুদের) নামাজ।’’ [মুসলিম, আস-সহিহ: ১১৬৩, তিরমিযি: ৪৩৮]।
.
❖ রাসূলের চিরাচরিত অভ্যাস: আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, ‘‘কিয়ামুল লাইল (রাতের নামাজ) ত্যাগ করবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা (কখনো) ত্যাগ করতেন না। যখন তিনি অসুস্থ থাকতেন বা ক্লান্তি অনুভব করতেন, তখন বসে আদায় করতেন। [আবু দাউদ, আস-সুনান: ১৩০৯, আহমাদ, আল-মুসনাদ: ২৪৯১৯; হাদিসটি সহিহ]।

◈ দাউদি নামাজ আল্লাহর কাছে প্রিয়: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট প্রিয়তম নামাজ হলো দাউদ (আ.) এর নামাজ। তিনি অর্ধরাত পর্যন্ত ঘুমোতেন। এরপর রাতের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত নামাজে কাটাতেন। অতঃপর, আবার রাতের এক ষষ্ঠাংশ ঘুমোতেন।’’ [বুখারি, আস-সহিহ: ১০৭৯]।

◈রাসূল (ﷺ) কে জিবরীল আঃ এর নসিহা: মহানবী (ﷺ) বলেন, “আমার কাছে জিবরীল এসে বললেন, হে মুহাম্মাদ! যত ইচ্ছা বেঁচে থাকুন, আপনি মারা যাবেনই। যাকে ইচ্ছা ভালো বাসুন, আপনি তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হবেন। যা ইচ্ছা তাই আমল করুন, আপনি তার বদলা পাবেন। আর জেনে রাখুন, মুমিনের মর্যাদা হলো তাহাজ্জুদের নামাযে এবং তার ইজ্জত হলো লোকেদের অমুখাপেক্ষী থাকায়।” (ত্বাবরানী, হাকেম, মুস্তাদরাক, বায়হাকী, সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ৮৩১ নং)।

◈ স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে জাগিয়ে রাতের বেলায় ইবাদতের বিরাট ফজিলত: রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “আল্লাহ সেই ব্যক্তির প্রতি দয়া করুন, যে রাতে উঠে ইবাদত করে এবং নিজ স্ত্রীকেও জাগায়। অতঃপর যদি সে (জাগতে) অস্বীকার করে, তাহলে তার মুখে পানির ছিটা দেয়। একইভাবে, আল্লাহ সেই নারীর প্রতি দয়া করুন, যে রাতে উঠে ইবাদত করে এবং নিজ স্বামীকেও জাগায়। অতঃপর যদি সে (জাগতে) অস্বীকার করে, তাহলে সে তার মুখে পানির ছিটা দেয়।” [আবু দাউদ, আস-সুনান: ১৩০৮; নাসায়ি, আস-সুনান: ১৬১০; হাদিসটির সনদ সহিহ] অন্য হাদিসে এসেছে, ‘‘তাদের (নাম) যিকিরকারী ও যিকিরকারিনীর মধ্যে লিপিবদ্ধ করা হয়।” [আবু দাউদ, আস-সুনান: ১৩০৯, ইবনু মাজাহ, আস-সুনান:১৩৩৫; হাদিসটির সনদ সহিহ]।

◾তাহাজ্জুদের ব্যাপারে পূর্বসূরি নেককার ব্যক্তিদের চমৎকার কিছু অভিজ্ঞতা ও মন্তব্য:
_________________________________
◈ তাহাজ্জুদ নামাজে চেহারা সুন্দর হয়: ইবনুল কায়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ্) বলেন, ‘কিছু সংখ্যক নারী অধিক পরিমাণে রাতের নামাজ আদায় করতো। তাদেরকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা বলে, ‘‘রাতের নামাজ চেহারা সৌন্দর্যময় করে; আমি আমার চেহারাকে লাবণ্যময় করতে পছন্দ করি।’’ ’ [ইবনুল কায়্যিম, রাওদ্বতুল মুহিব্বিন: ২২১]। তবে, কেউ যদি কেবল চেহারা সুন্দর হওয়ার জন্য তাহাজ্জুদ আদায় করেন, তার কোনো নেকি তো হবেই না, চেহারা সুন্দর হওয়ারও সম্ভাবনা থাকবে না। উপরে যে নারীদের কথা বলা হয়েছে, তারা মূলত ইবাদতের নিয়তেই তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। চেহারা সুন্দর হওয়ার বিষয়টি ছিলো বোনাস হিসেবে।
.
ইমাম হাসান আল বাসরি (রাহ.) কে জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়কারীরা কেনো জ্যোতির্ময় চেহারার অধিকারী হয়?’ উত্তরে তিনি বলেন, ‘তাঁরা আল্লাহর সাথে নিভৃতে অবস্থান করেন, ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে বিশেষ জ্যোতির্ময় পোষাক পরিধান করান।’ [ইবনুল জাওযি, আল-মাওয়া‘ইয: ১২১]।
.
◈ মানুষের ভালোবাসা অর্জিত হয়: তাবিয়ি সায়িদ ইবনুল মুসায়্যিব (রাহ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রাতে নামাজ আদায় করে, আল্লাহ্ তার চেহারায় নূর (জ্যোতি) উদ্ভাসিত করে দেন। প্রত্যেক মুসলিম তাকে ভালোবাসে; যদিও পূর্বে কখনও তাকে না দেখে থাকে। তারা বলে, ‘‘এই লোকটিকে আমার ভালো লাগে।’’ [আবদুল হক, কিতাবুত তাহাজ্জুদ]।
.
◈ গুনাহের কারণে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় থেকে মানুষ বঞ্চিত হয়: ইমাম সুফিয়ান সাওরি (রাহিমাহুল্লাহ্) বলেন, ‘আমি একটি মাত্র গুনাহের কারণে পাঁচ মাস কিয়ামুল লাইল থেকে বঞ্চিত হয়েছি।’ তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘সেটি কী গোনাহ ছিলো?’ তিনি বলেন, ‘এক ব্যক্তি কাঁদছিলো, আমি তাকে ‘লোক দেখানো কান্নাকারী’ বলেছিলাম।’ [আবু নু‘আইম, হিলয়াতুল আউলিয়া: ৭/১৮]।
.
◈ বিশেষত হারাম ইনকাম এবং কুদৃষ্টির ফলে তাহাজ্জুদ নসিব হয় না অনেকের: আবু সুলায়মান আদ-দারানি (রাহ.) বলেন, ‘এমন কত (হারাম) লোকমা আছে, যা কিয়ামুল লাইলে বাধা দিয়েছে! এমন কত (হারাম) দৃষ্টি আছে, যা সূরা তিলাওয়াত থেকে বঞ্চিত করেছে।’ [আবু নু‘আইম, হিলয়াতুল আউলিয়া: ২/৩০৭]।
.
❑ তাহাজ্জুদ নামাজের সঠিক সময়:
__________________________________
তাহাজ্জুদ নামাযের সময় শুরু হয় এশার নামাযের পর থেকে এবং শেষ হয় ফজর উদয় হওয়ার সাথে সাথে। রাতের প্রথমাংশে, মধ্য রাতে এবং শেষাংশে যে কোন সময়ে তাহাজ্জুদ পড়া যায়। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, ‘আমরা রাতের যে কোন অংশে নবী (ﷺ)-কে নামায পড়তে দেখতে চাইতাম, সেই সময়ই দেখতে পেতাম, তিনি নামায পড়ছেন। আবার রাতের যে কোন অংশে আমরা তাঁকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে চাইতাম, তখনই আমরা দেখতে পেতাম, তিনি ঘুমিয়ে আছেন।’(সহীহ বুখারী মুসনাদে আহমাদ নাসাঈ, মিশকাত ১২৪১) সুতরাং এ কথা স্পষ্ট যে, এশার পর থেকে নিয়ে ফজর পর্যন্ত সময়ের ভিতরে তাহাজ্জুদের জন্য কোন নির্দিষ্ট সময় নেই। অবশ্য আফযল বা উত্তম সময় হল, রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। বিশেষত রাতের অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশে তাহাজ্জুদ পড়া উত্তম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের রব দুনিয়ার আসমানে অবতীর্ণ হন এবং বলেন ডাকার জন্য কেউ আছে কি, যার ডাক আমি শুনবো? চাওয়ার জন্য কেউ আছে কি, যাকে আমি দেব? গুনাহ থেকে মাফ চাওয়ার কেউ আছে কি, যার গুনাহ আমি মাফ করব?’’ [বুখারি, আস-সহিহ: ১০৯৪; মুসলিম, আস-সহিহ ১৮০৮]। সূর্য অস্ত যাওয়ার পর থেকে ফজর উদয় হওয়ার আগের সময়কে তিন ভাগে ভাগ করলে রাত্রির শেষ তৃতীয়াংশ বুঝা যায়। রাত্রের শেষাংশে মোরগ যখন বাং দেয় তখন উঠলেও তাহাজ্জুদ পড়া যায়। মহানবী (ﷺ) কখনো কখনো এই সময় উঠতেন। (সহীহ বুখারী, মিশকাত ১২০৭)।

❑ তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ের পদ্ধতি:
________________________________
তাহাজ্জুদের সালাতের বিশেষ কোনো নিয়ম নেই। সাধারণ সুন্নাত বা নফল নামাজের মতই এই নামাজ পড়তে হয়। তবে, চাইলে এটি যেমন দুই রাকাত করে আদায় করা যায় আবার চার রাকাত করেও আদায় করা যায়। চার রাকাত করে আদায় করলে, যোহরের ফরজের পূর্বের চার রাকাত সুন্নাতের মতো করে পড়তে হয়। বিশেষ কোনো সূরা দিয়ে এই নামাজ পড়তে হয় না। এটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ নফল নামাজ।
.
❑ তাহাজ্জুদ নামাজের রাকাতসংখ্যা:
___________________________________
রাতের নামাযের কোন নির্দিষ্ট রাকআত সংখ্যা নেই। তাহাজ্জুদের নামাজ সর্বনিম্ন ২ রাকাত থেকে শুরু করে ৪, ৬, ৮, ১০ রাকাতও পড়া যায়। এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত। [আবু দাউদ, আস-সুনান: ১৩৫৭ ও ১৩৬২; আহমাদ, আল-মুসনাদ: ২৫১৫৯]। তবে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাধারণ আমল ছিলো, তিনি অধিকাংশ সময় রাতে ৮ রাকাত তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তেন। [বুখারি, আস-সহিহ: ১১৪৭]। জেনে রাখা ভাল যে, রাক‘আত গণনার চেয়ে ছালাতের খুশূ-খুযূ ও দীর্ঘ সময় ক্বিয়াম, কু‘ঊদ, রুকূ, সুজূদ অধিক যরূরী। যা আজকের মুসলিম সমাজে প্রায় লোপ পেতে বসেছে। ফলে রাত্রির নিভৃত সালাতের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে।
.
◾তাহাজ্জুদ সালাতের কিরাআত:
_________________________________
তাহাজ্জুদ সালাতের ক্বিরাআত লম্বা হওয়া বাঞ্ছনীয়। মহানবী (ﷺ) বলেন, “শ্রেষ্ঠ নামায হল লম্বা কিয়াম।”(সহীহ মুসলিম,মিশকাত ৪৬, ৮০০)। ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলেন, এক রাতে নবী (ﷺ) এর সাথে নামায পড়লাম। তিনি কিয়াম করতেই থাকলেন, পরিশেষে আমি মন্দ ইচ্ছা করে ফেলেছিলাম। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, সে মন্দ ইচ্ছাটি কি? তিনি বললেন, আমি ইচ্ছা করেছিলাম যে, তাঁকে ছেড়ে দিয়ে বসে যাব! (সহীহ বুখারী,১১৩৫ মুসলিম,১৮৫১)। নবী (ﷺ) এই নামাযে এত দীর্ঘ কিয়াম করতেন যে, তার ফলে তাঁর পা ফুলে যেত। তাঁকে বলা হল যে, আপনার তো আগে-পিছের সকল ত্রুটি আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন? (তাও আপনি এত কষ্ট করে ইবাদত করেন কেন)? তিনি বললেন, “আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হ্‌ব না?” (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ১২২০)। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ১০টি আয়াত নামাযে পড়ে সে উদাসীনদের তালিকাভুক্ত হয় না, যে ১০০টি আয়াত নামাযে পড়ে সে আবেদদের তালিকাভুক্ত হয়। আর যে ১০০০টি আয়াত নামাযে পড়ে সে অজস্র সওয়াব অর্জনকারীদের তালিকাভুক্ত হয়।” (আবু দাঊদ, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ তারগীব ৬৩৩)। কখনো তিনি তাহাজ্জুদের নামাযে সূরা বানী ইসরাঈল ও যুমার পড়তেন। (আহমাদ, মুসনাদ) কখনো প্রায় ৫০ আয়াতের মত বা তার থেকে বেশী আয়াত তেলাওয়াত করতেন। (বুখারী, আবূদাঊদ, সুনান)। কখনো বা সূরা মুযাম্মিলের মত লম্বা সূরা পাঠ করতেন। (মুসনাদ, আহমেদ তিরমিজি,৩৪০৫)। একদা তিনি সূরা মায়িদার ১১৮নং আয়াত বারবার পাঠ করতে করতে ফজর করে দিয়েছেন। (ইবনে মাজাহ্‌,ইবনে খুযাইমাহ্‌, মিশকাত ১২০৫)।

◾তাহাজ্জুদ সালাতের ক্বাযা:
______________________________
যে তাহাজ্জুদ-গুযার বান্দার কোন কারণবশত রাতের ১১ রাকআত নামায ছুটে যায় সে তা দিনে বিশেষ করে চাশতের সময় ১২ রাকআত কাযা করতে পারে। মহানবী (ﷺ) এর তাহাজ্জুদ ঘুম বা ব্যথা-বেদনার কারণে ছুটে গেলে দিনে ১২ রাকআত কাযা পড়তেন। (মির‘আত ৪/২৬৬; মুসলিম, মিশকাত হা/১২৫৭, ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫) উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) প্রমুখাৎ বর্ণিত, তিনি বলেন- আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার (পূর্ণ) অযীফা (তাহাজ্জুদের নামায, কুরআন ইত্যাদি) অথবা তার কিছু অংশ রেখে ঘুমিয়ে যায়, কিন্তু তা যদি ফজর ও যোহরের নামাযের মধ্যবর্তী সময়ে আদায় করে নেয় তবে তার জন্য পূর্ণ সওয়াবই লিপিবদ্ধ করা হয়, যেন সে ঐ অযীফা রাত্রেই সম্পন্ন করেছে।”(সহীহ মুসলিম,৭৪৭)। তাহাজ্জুদ বা বিতর ক্বাযা হয়ে গেলে ‘উবাদাহ বিন সামিত, আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস প্রমুখ সাহাবীগণ ফজর সালাতের আগে তা আদায় করে নিতেন। (ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৮৩)।

◾তাহাজ্জুদ নামাজকে সুন্দর ও যথার্থ করতে যে বিষয়গুলো জেনে ভাল:
_________________________________
◈(১) ঘুমাবার আগে তাহাজ্জুদের নিয়ত করে ঘুমাতে হবে। এতে সে শেষ রাত্রে ঘুম থেকে জেগে নামায পড়তে সক্ষম না হলেও তার জন্য তাহাজ্জুদের সওয়াব লিখা হবে। (নাসাঈ, ইবনে মাজাহ্‌, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ তারগীব ৫৯৮)।

(২) যদি কেউ আগ রাতে বিতরের পর দু’রাক‘আত নফল সালাত আদায় করে এবং শেষরাতে তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে সক্ষম না হয়, তাহ’লে উক্ত দু’রাক‘আত তার জন্য যথেষ্ট হবে’। (দারেমী, মিশকাত হা/১২৮৬; ছহীহাহ হা/১৯৯৩)।

◈(৩)রাতে ঘুম থেকে জাগার পর নির্দিষ্ট দু‘আ পড়া। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি রাতে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে এই দু‘আ পাঠ করবেবদু’আটি দেখুন [বুখারি, আস-সহিহ: ১১৫৪]।
.
◈(৪) ঘুম থেকে জেগে সূরা আলে ইমরানের শেষ দশ আয়াত পাঠ করা উত্তম। একটি হাদিসে এসেছে, একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে ঘুম থেকে জেগে ঘুমের ঘোর কাটানোর পর সূরা আ-লে ইমরানের শেষ দশ আয়াত পাঠ করেন। এরপর অজু করেন এবং নামাজ পড়েন। [বুখারি, আস-সহিহ: ১৮৩; মুসলিম, আস-সহিহ: ৭৮৩]। এই হাদিসের আলোকে ইমাম নববি (রাহ.) বলেন, ঘুম থেকে জেগে সূরা আলে ইমরানের শেষ দশ আয়াত পড়া উত্তম। (বিশেষত কিয়ামুল লাইলের জন্য জাগলে)।
.
◈(৫) তাহাজ্জুদের জন্য উঠে অজুর পূর্বে মিসওয়াক করা মুস্তাহাব। হুযাইফা (রা.) হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, ‘নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের বেলা যখন তাহাজ্জুদ নামাজের জন্য উঠতেন, তখন মিস্ওয়াক দ্বারা তাঁর মুখ পরিষ্কার করে নিতেন।’ [বুখারি, আস-সহিহ: ১০৭০]।
.
◈(৬)তাহাজ্জুদের নামাজ প্রথমে স্বল্প-পরিসরে দুই রাকআত দিয়ে শুরু করা উত্তম; নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যখন তোমাদের কেউ রাতে নামাজ পড়ার জন্য উঠবে, সে যেন হালকাভাবে দুই রাকাত পড়ার মাধ্যমে নামাজ শুরু করে।” [মুসলিম, আস-সহিহ: ৭৬৮, আবু দাউদ, আস-সুনান: ১৩২৩]।
.
(৭) তাহাজ্জুদের সালাতে রাসূল (ছাঃ) বিভিন্ন ‘ছানা’ পড়েছেন। তন্মধ্য হ’তে যে কোন ‘ছানা’ পড়া চলে। (মুসলিম, আবুদাঊদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/১২১২, ১৪, ১৭; নাসাঈ হা/১৬১৭ ইত্যাদি)।

◈(৮) তাহাজ্জুদে দীর্ঘ কিয়াম করে অধিক পরিমাণে কুরআন পড়া উত্তম: জাবির (রা.) হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘কোন নামাজ সর্বোত্তম?’ তিনি বলেন, ‘‘যে নামাজে দীর্ঘ কিয়াম (দাঁড়িয়ে থাকা) হয়।’’ [মুসলিম, আস-সহিহ: ৭৫৬]। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে আরেকটি বর্ননা দেখুন। [বুখারি, আস-সহিহ: ১০৬৯]।
.
◈(৮) তাহাজ্জুদের ক্বিরাআত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কখনো সশব্দে কখনো নিঃশব্দে পড়েছেন।(আবুদাঊদ হা/২২৬; তিরমিযী হা/৪৪৯; মিশকাত হা/১২০২-০৩)। তিনি বলেন, সরবে ও নীরবে পাঠকারী প্রকাশ্যে ও গোপনে সাদাক্বাকারীর ন্যায়।

◈(৯) যাদের বড় সূরা মুখস্থ নেই, তারা অনেকগুলো ছোট সূরা প্রতি রাকাতে পড়তে পারেন। তাহলে কিয়াম দীর্ঘ হবে।
.
◈(১০) তাহাজ্জুদের নামাজ ২ রাকাত করে আদায় করা উত্তম; তবে, একত্রে চার রাকাত পড়াও বৈধ। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘রাতের নামাজ দুই দুই রাকাত করে।’’ [বুখারি, আস-সহিহ: ৪৭২; মুসলিম, আস-সহিহ: ৭৪৯]।
.
◈(১১) রুকু-সিজদার তাসবিহ ৫/৭ বার অথবা আরও বেশি করে পড়ে রুকু-সিজদাকে দীর্ঘ করুন। সিজদায় তাসবিহ পাঠের পর আল্লাহর কাছে দু‘আও করতে পারেন।
.
◈(১২) নামাজের স্থানটি নিরিবিলি হওয়া উচিত। মনোযোগ ঠিক থাকে। অন্ধকারে তাহাজ্জুদ পড়া জায়েয। তবে, সামান্য আলো থাকলে সেটা উত্তম। বিশেষত সিজদার স্থানটি। তাহলে, কোনো পোকা-মাকড় বা অন্য কিছুর ভয় থাকে না।

পরিশেষ, উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে, ফরয সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত রাতের সালাত। আর এই তাহাজ্জুদের গুরুত্ব উপলব্ধির জন্য একটি আয়াত ও একটি হাদিস জানা উচিত। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি রাতের বেলা সিজদারত থাকে বা (ইবাদতে) দাঁড়ানো থাকে, আখিরাতের ব্যাপারে শঙ্কিত থাকে এবং নিজ রবের অনুগ্রহ প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে এমনটি করে না?’’ [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৯]। আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, ‘কিয়ামুল লাইল (রাতের নামাজ) ত্যাগ করবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (কখনো) এটি ত্যাগ করতেন না। যখন তিনি অসুস্থ থাকতেন বা ক্লান্তি অনুভব করতেন, তখন বসে আদায় করতেন।’ [আবু দাউদ, আস-সুনান: ১৩০৯, আহমাদ, আল-মুসনাদ: ২৪৯১৯; হাদিসটি সহিহ]। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Translate