Saturday, October 1, 2022

ইমামের পিছনে দাঁড়ানোর সঠিক নিয়ম কি

 প্রশ্ন: ইমামের পিছনে দাঁড়ানোর সঠিক নিয়ম কি? প্রথম কাতারে ডান পাশে দাঁড়ানোর বিশেষ কোন ফযীলত আছে কি?

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: জামা‘আতে সালাত আদায় করা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের জন্য ওয়াজিব।বিনা ওজরে জামায়াত ত্যাগ করা কবিরা গুনাহ।জামাআতে সালাত আদায় করার সময় কাতারে কেউ আগে-পিছে সরে থাকলে তাকে বরাবর হতে বলা, এমনকি নিজে কাছে গিয়ে কাতার সোজা করা ইমামের কর্তব্য। আর যতক্ষণ পর্যন্ত না কাতার পূর্ণ রুপে সোজা হয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত নামায শুরু করা উচিৎ নয়।(আলমুমতে’,শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৩/১৬)। ইমাম ছাড়া কম পক্ষে একজন নামাযী হলে জামাআত গঠিত হবে; চাহে সে নামাযী জ্ঞানসম্পন্ন শিশু হোক অথবা মহিলা। মহানবী (ﷺ) ইবনে আব্বাসকে নিয়ে জামাআত করে (তাহাজ্জুদ) নামায পড়েছেন। তিনি সফরে উদ্যত দুইজন লোককে বলেছিলেন, “নামাযের সময় উপস্থিত হলে তোমাদের একজন আযান দেবে এবং তোমাদের মধ্যে যে বড় সে ইমামতি করবে।” (সহীহ বুখারী ৬৩০)।
.
সালাতে প্রথম কাতারে দাঁড়ানোর রয়েছে বিশেষ ফযিলত। যেমন: বারা বিন আযিব (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বলতে শুনেছি, নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ প্রথম কাতারের লোকের উপর রহমত বর্ষণ করেন। (নাসায়ী ৮১১, আবু দাঊদ ৬৬৪, আহমাদ ১৮০৪৫, ১৮১৪২, ১৮১৪৭, ১৮১৬৬, ১৮১৭২; দারিমী ১২৬৪। তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ। তাখরীজ আলবানী: সহীহ আবী দাউদ ৬৭০, মিশকাত ১১০১, সুনানে ইবনে মাজাহ, ৯৯৭)।

অপর হাদীসে আবু হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ সালাতে পুরুষদের জন্যে সবচেয়ে ভাল হলো প্রথম সারি এবং নিকৃষ্টতম হলো পেছনের সারি। আর মহিলাদের জন্য সবচেয়ে ভাল হলো পেছনের কাতার এবং সবচেয়ে খারাপ হলো প্রথম কাতার। (সহীড় মুসলিম ৪৪০, মিশকাতুল মাসাবিহ ১০৯২)।

সুতরাং মুক্তাদীর সংখ্যা হিসাবে ইমাম ও মুক্তাদীর দাঁড়ানোর নিয়ম-পদ্ধতি বিভিন্ন রকম হয়। যেমন: ইমামের সাথে একাকী একজন মুক্তাদী সালাত আদায়কালে ইমামের ডান দিকে দাঁড়াতে হবে। (বুখারী হা/৬৯৯, ১১৭; মুসলিম হা/৬৬০; মিশকাত হা/১১০৬)। এছাড়া যখন ইমামের পিছনে দু’পার্শ্ব সমান হবে, তখন কাতারের ডানে দাঁড়ানো মুস্তাহাব। কিন্তু ডান পাশ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে বামে দাঁড়ানো উত্তম হবে। (উসাইমীন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১২/১৮৪)। তবে কোনক্রমেই ডান প্রান্ত থেকে বা মসজিদের উত্তর দেওয়াল থেকে দ্বিতীয় কাতার বা পরবর্তী কাতার সমূহ শুরু করা যাবে না। বরং সুন্নাত হল ইমামের পিছন থেকে কাতার সোজা করা। ডান দিক থেকে কাতার পূরণ করার কোন শারঈ ভিত্তি নেই। প্রত্যেকটি কাতার ইমামের পিছন থেকে পূরণ করতে হবে। আনাস ইবনু মালেক (রাঃ) বলেন, একদা নবী করীম (ﷺ) উম্মু সুলাইমের বাড়ীতে সালাত আদায় করলেন। আমি এবং একজন ইয়াতীম তাঁর পিছনে দাঁড়ালাম। আর উম্মু সুলাইম আমাদের পিছনে দাঁড়ালেন। (সহীহ বুখারী হা/৮৭৪, ১/১২০ পৃঃ, (ইফাবা হা/৮২৯, ২/১৬৩ পৃঃ); মিশকাত হা/১১০৮; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১০৪০, ৩/৬৩ পৃঃ)। উক্ত হাদীস প্রমাণ করে ডান দিক থেকে কাতার সোজা না করে ইমামের পিছন থেকেই কাতার করতে হবে।

উল্লেখ্য, কাতারের ডানদিকে দাঁড়ালে ফজিলত রয়েছে মর্মে বর্ণিত হাদীসটি যঈফ। হাদীসটি হল আম্মাজান আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ কাতারসমূহের ডান দিকের (মুসল্লিদের) উপর রহমত বর্ষণ করেন। (আবু দাঊদ ৬৭৬ জামি সগীর ১৬৬৮, মিশকাত ১০৯৬ আত তারগহীব,২৫৯ রিয়াদুস সালিহীনর ১১০১ সুনানে ইবনে মাজাহ, হ ১০০৫)। তাহক্বীক্ব আলবানী:সনদ যঈফ।কারন উক্ত হাদিসের রাবী মুআবিয়াহ বিন হিশাম সম্পর্কে মুহাম্মাদ বিন সা’দ বলেন, তিনি হাদিস বর্ণনায় সত্যবাদী। ইবনু হিব্বান বলেন, তিনি হাদিস বর্ণনায় কখনো কখনো ভুল করেন। আস-সাজী বলেন, তিনি সত্যবাদী কিন্তু হাদিস বর্ণনায় সন্দেহ করেন। (বিস্তারিত দেখুন সিলসিলা যঈফাহ হা/৫৬৮৬)। আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
__________________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

সালাতে দাঁড়ানোর সময় মুছল্লীর দুই পায়ের মাঝে কতটুকু ফাঁকা থাকবে

 প্রশ্ন: সালাতে দাঁড়ানোর সময় মুছল্লীর দুই পায়ের মাঝে কতটুকু ফাঁকা থাকবে? দু’জনের মাঝে ফাঁকা রেখে দাঁড়ালে সালাতের কোন ক্ষতি হবে কি?

▬▬▬▬▬▬▬◖🌻◗▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: সালাতে দাঁড়ানোর সময় একজন মুছল্লীর দুই পায়ের মাঝে কতটুকু ফাঁকা থাকবে এ বিষয়ে কুরআন সুন্নায় স্পষ্ট কোন বর্ণনা নেই।তবে হাদীসে ইঙ্গিত রয়েছে যে, কাতারে দাঁড়িয়ে শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য অনুযায়ী পায়ে পা ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াতে যতটুকু ফাঁকা রাখার প্রয়োজন হয়, একজন মুসুল্লি ঠিক ততটুকু ফাঁকা রাখবে (সহীহ বুখারী হা/৭২৫; আবুদাঊদ হা/৬৬২; ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা ৫/৩৫৭)। জামাআতে সালাত আদায়ের সময় কাতার সোজা করা ওয়াজিব (ইবনে উসাইমীন, আশ-শারহুল মুমতে‘ ৬/৩, ৭/৩-১৩)। রাসূল (ﷺ) একাধিক হাদীসে কাতার সোজা করার নির্দেশ দিয়েছেন (বুখারী হা/৭২৩; মুসলিম হা/৪৩৩; মিশকাত হা/১০৮৭)।
.
কাতার সোজা হবে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় এক অপরের কাঁধ ও পায়ের গাঁট বরাবর সোজা রেখে সীসাঢালা প্রাচীরের মত একে অপরের সাথে মিলে দাঁড়াতে হবে যাতে একজনের কাঁধ আগে এবং অপর জনের পিছে না হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে পায়ের কনিষ্ঠা আঙ্গুলে আঙ্গুল মিলিয়ে কাতার সোজা হবে না। কারণ, পা ছোট-বড় থাকার ফলে কাতার বাঁকা থেকে যাবে। আর বসা অবস্থায় বাহুমূল বা কাঁধের সাথে বাহুমূল বা কাঁধ বরাবর থাকলে কাতার সোজা বলে ধরা যাবে।যেমন মসজিদে কাতারের দাগ থাকলে দাগের মাথায় বুড়ো আঙ্গুল রেখে কাতার সোজা হয় না। কারণ, এতে যার পা লম্বা সে কাতার থেকে পিছনের দিকে এবং যার পা ছোট সে কাতারের সামনের দিকে বের হয়ে থাকবে। সুতরাং পায়ের গোড়ালিকে দাগের মাথায় রাখলে তবেই কাতার বাঞ্ছনীয় সোজা হবে।
সুতরাং জামা‘আতের সাথে সালাত আদায় করার সময় কাতারের মাঝে পরস্পরের মধ্যে ফাঁক রাখা সুন্নাতের বরখেলাফ। উক্ত মর্মে কোন হাদীস বর্ণিত হয়নি। পরস্পরের পায়ের মাঝে ‘চার আঙ্গুল’ পরিমাণ ফাঁক রাখতে হবে এবং পায়ে পা মিলালে অন্যকে অপমান করা হয় মর্মে সমাজে যে কথা প্রচলিত আছে, তা এক প্রকার জাহেলিয়াত। এটি সুন্নাতকে অবজ্ঞা করার অপকৌশল এবং চূড়ান্ত মিথ্যাচার। কারণ যারা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, তারা যদি পরস্পরে দাঁড়িয়ে পায়ে পা মিলিয়ে সালাত পড়তে পারেন, তাহলে আমাদের সম্মানের হানি হবে কেন? আমাদেরকেও তাঁদের পদাংক অনুসরণ করতে হবে। কারণ পায়ে পা, টাখনুর সাথে টাখনু ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছালাতে দাঁড়াতে হবে মর্মে একাধিক হাদীস বর্নিত হয়েছে। তাই কোন ভাবেই কাতারে পাক রাখা উচিত নয় কেননা কাতারের মধ্যে ফাঁকা রাখলে শয়তান প্রবেশ করে এবং মুছল্লী রহমত হ’তে বঞ্চিত হয়। ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তোমরা কাতার সোজা করবে, বাহু সমূহ সমপর্যায়ে রাখবে, ফাঁকা সমূহ বন্ধ করবে এবং তোমাদের ভাইদের সাথে নরম হয়ে থাকবে। মধ্যখানে শয়তানের জন্য ফাঁক রাখবে না। যে ব্যক্তি কাতারকে মিলিয়ে দাঁড়ায়, আল্লাহ তাকে স্বীয় রহমতের সাথে মিলান। আর যে ব্যক্তি কাতারে ফাঁকা রাখে আল্লাহ তাকে স্বীয় রহমত হ’তে পৃথক রাখেন। (আবূদাঊদ, মিশকাত হা/১১০২)।
.
আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের কাতার সোজা কর। নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে আমার পিছন থেকে দেখতে পাই। আনাস (রাঃ) বলেন, আমাদের একজন অপরজনের কাঁধে কাঁধ ও পায়ে পায়ে মিলিয়ে দাঁড়াতেন।(সহীহ বুখারী হা/৭২৫, ১ম খন্ড, পৃঃ ১০০, (ইফাবা হা/৬৮৯, ২/৯৫ পৃঃ) ইমাম বুখারী (রহঃ) উক্ত হাদীস বর্ণনা করার পূর্বে নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন,بَابُ إِلْزَاقِ الْمَنْكِبِ بِالْمَنْكِبِ وَالْقَدَمِ بِالْقَدَمِ فِي الصَّفِّ وَقَالَ النُّعْمَانُ بْنُ بَشِيْرٍ رَأَيْتُ الرَّجُلَ مِنَّا يُلْزِقُ كَعْبَهُ بِكَعْبِ صَاحِبِهِ.‘সালাতে কাতারের মধ্যে কাঁধে কাঁধ ও পায়ে পা মিলানো অনুচ্ছেদ’। নু‘মান ইবনু বাশীর (রাঃ) বলেন, আমি মুছল্লীকে দেখতাম, সে তার টাখনুকে তার পার্শ্বের ভাইয়ের টাখনুর সাথে মিলিয়ে দিত। (সহীহ বুখারী ‘আযান’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪৭, ১ম খন্ড, পৃঃ ১০০, (ইফাবা অনুচ্ছেদ-৪৬৮, ২/৯৫ পৃঃ)।
.
অন্য বর্ণনায় রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি শয়তানকে কাতার সমূহের ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করতে দেখছি, যেন সে কালো ছাগলের বাচ্চা। কাজেই তোমরা প্রাচীরের মত কাতার মিলিয়ে দাড়াও। (নাসাঈ হা/৮১৫; আবূদাঊদ হা/৬৭৩)। অন্য বর্ণনায় রাসূল (ﷺ) বলেন, যে ব্যক্তি কাতারের ফাঁকা বন্ধ করবে আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। (ইবনু মাজাহ হা/৯৯৫, সিলসিলা সহীহাহ হা/১৮৯২, ২৫৩২)। রাসূল (ﷺ)বলেন, যে ব্যক্তি কাতারের ফাঁকা বন্ধ করবে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে ঘর নির্মাণ করবেন এবং তার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। (সিলসিলা সহীহাহ হা/১৮৯২)। অন্য বর্ণনায় আছে, ‘যখন বান্দা কাতার মিলিয়ে দাঁড়ায় আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন আর ফেরেশতা তার উপর নেকী ছিটিয়ে দেন (সিলসিলা সহীহাহ হা/৪৫১৬ পৃঃ ১৮৯২ নং হাদীছের অধীনে)।
.
শায়খ আলবানী (রহঃ) দুঃখ প্রকাশ করে বলেন,দুঃখজনক বিষয় হল, কাতার সোজা করার সুন্নাতকে মুসলিমরা অবজ্ঞা করে চলেছে; বরং কিছু সংখ্যক মানুষ ব্যতীত অন্যরা সবাই এই সুন্নাতকে নষ্ট করেছে। নিশ্চয় আমি সেই দলগুলোর মধ্যে ‘আহলেহাদীস’ ব্যতীত অন্য কারো মধ্যে উক্ত সুন্নাত দেখিনি। আমি মক্কায় (১৩৬৮ হিঃ) তাদেরকে দেখেছি, তারা রাসূল (ﷺ) এর অন্যান্য সুন্নাতকে যেমন আকঁড়ে ধরে আছে, তেমনি এই সুন্নাতকেও আকঁড়ে ধরার প্রতি অতীব অনুরাগী। চার মাযহাবের অনুসারীদের বিপরীতে তারাই একে আঁকড়ে ধরে আছে। হাম্বলীদেরকেও আমি এদের মধ্য থেকে পৃথক করি না। কারণ তাদের মধ্য হতে এটা সম্পূর্ণই উঠে গেছে। বরং তারা এই সুন্নাতকে পরিত্যাগ করা এবং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার পথ অবলম্বন করছে। অধিকাংশ মাযহাব এই সুন্নাহর বিরুদ্ধে দলীল পেশ করছে যে, কাতারে দাঁড়ানোর সময় উভয় মুছল্লীর পায়ের মাঝে ‘চার আঙ্গুল’ ফাঁক রাখতে হবে। যদি এর অতিরিক্ত ফাঁক হয় তবে অপছন্দনীয়। যেমন ‘আল-ফিক্বহু আলাল মাযাহিবিল আরবা‘আহ’ (১/২০৭ পৃঃ) গ্রন্থের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা এসেছে। অথচ সুন্নাহর মধ্যে উক্ত পরিমাণের কোন ভিত্তি নেই; স্রেফ কল্পনা মাত্র’। (সিলসিলা সহীহাহ হা/৩২-এর আলোচনা দ্রঃ)।

শায়খ মুহসিন আল-আব্বাদ বলেন, ‘যে ব্যক্তি সালাতে পায়ে পা মিলাবে আল্লাহ তার সাথে সাওয়াবের মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখবেন। আর যে ব্যক্তি সালাতে পায়ে পা মিলায় না আল্লাহ তাকে সাওয়াব থেকে বঞ্ছিত করেন (শারহে আবূ দাঊদ, পৃ. ১৪)।

পরিশেষে সুধী পাঠক! কাতারে দাঁড়ানোর সময় পায়ের সাথে পা, টাখনুর সাথে টাখনু এবং কাঁধের সাথে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। উপরোক্ত হাদীস সমূহ জানার পরও কেউ যদি এই সুন্নাতকে প্রত্যাখ্যান করে, তবে সে সরাসরি রাসূল (ﷺ) এর আদেশ লংঘন করবে।এমন ব্যক্তি সম্পর্কে রাসূল (ﷺ) ১৫ শত বছর আগে বলে গেছেন যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত হ’তে মুখ ফিরিয়ে নিল, সে আমার দলভুক্ত নয়’(বুখারী হা/৫০৬৩; মুসলিম হা/১৪০১; মিশকাত হা/১৪৫) হাদীসে সীসা ঢালা প্রাচীরের মত দাঁড়াতে বলা হয়েছে, যেমন একটি ইট আরেকটি ইটের উপর রেখে প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। সুতরাং পরস্পরের পায়ের মাঝে কোন ফাঁক থাকবে না। উল্লেখ্য, অনেক মসজিদে শুধু কনিষ্ঠা আঙ্গুলের সাথে মিলানো হয়। উক্ত মর্মেও কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। আল্লাহ সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুক। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
________________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

সালাতুল ইশরাক, দোহা, চাশত এবং সালাতুল আওয়াবীন সালাত

 প্রশ্ন: সালাতুল ইশরাক, দোহা, চাশত এবং সালাতুল আওয়াবীন এর পরিচয় ও ফজিলত কি? উক্ত সালাত গুলো কি একই সালাত?

▬▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: আজকে আমরা সালাতুল ইশরাক, দোহা, চাশত এবং সালাতুল আওয়াবীন এর পরিচয় ও ফজিলত এবং এসব সালাতের সময়, নিয়ম ও রাকাত সংখ্যা সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করব ইন শাহ্ আল্লাহ।

নফল আরবী শব্দ অর্থ: অতিরিক্ত, বাড়তি, ঐচ্ছিক ইত্যাদি। ফরয সালাত ছাড়া অন্য যে সালাত মানুষ আদায় করে, তাই নফল সালাত। সুন্নাত, নফল, মানদূব ও মুস্তাহাব এসবই সমার্থক। সবগুলো শব্দই কাছাকাছি একই অর্থ বহন করে। নফল সালাত আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার একটি বড় মাধ্যম। এর মাধ্যমে হাশরের মাঠের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তাই আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে চাইলে ফরজ সালাতের পাশাপাশি নফল সালাত আদায় করা উচিত। ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিকোন থেকে সালাতুল ইশরাক, দোহা, চাশত এবং সালাতুল আওয়াবীনের সালাত আদায় করা মুস্তাহাব। এই সালাতগুলে বাড়ীতে পড়া উত্তম’। এবং সর্বদা পড়া এবং আবশ্যিক গণ্য করা ঠিক নয়। কেননা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কখনও পড়তেন, কখনো ছাড়তেন।(মির‘আত শরহ মিশকাত সালাতুয যোহা’ অনুচ্ছেদ-৩৮; ৪/৩৪৪-৫৮) আমরা উপরোক্ত তিনটি সালাত সম্পর্কে আলাদা আলাদা জানার চেষ্টা করব।

❖ ইশরাক নামাজের পরিচয় ও ফজিলত:
____________________________________
ইশরাক মানে প্রভাত,সকাল, সূর্যোদয়। আনাস (রা.) বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ জামাতে পড়বে, এরপর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে যিকির করবে, এরপর সূর্যোদয় হলে (সূর্যোদয়ের ১৫/২০ মিনিট পর) দুই রাকাত নামাজ পড়বে, তার জন্য পরিপূর্ণ হজ্ব ও উমরার সওয়াব লেখা হবে।’’ কথাটি তিনি জোর দিয়ে তিনবার বলেন। (তিরমিযী, হা/৫৮৬; মিশকাত, হা/৯৭১; সনদ হাসান, সিলসিলা সহীহাহ, হা/৩৪০৩)। এই হাদিসে এই নামাজের কোনো নাম বর্ণিত হয়নি। তবে, বিদ্বানগণের নিকট এই নামাজ ইশরাকের নামাজ বা সূর্যোদয়ের নামাজ হিসেবে পরিচিত।
.
❖ দোহা ও চাশতের নামাজের পরিচয়:
___________________________________
দোহা’ শব্দটি আরবি। এর অর্থ হল, দিনের প্রথম প্রহর। ফার্সিতে একে বলা হয় ‘চাশত’। অতএব, দোহা এবং চাশত একই নামাজ। পরিভাষায় সূর্যোদয়ের পর সূর্যের তাপ কিছুটা প্রখর হওয়ার পর যে নামাজ পড়া হয়, সেটিকেই দোহার নামাজ বলা হয়। সময়ের হিসেবে যোহর সালাতের দেড় বা দু ঘণ্টা পূর্বে এটি আদায় করা সবচেয়ে উত্তম।
.
❖ সলাতুল আওয়াবীন পরিচয়:
____________________________
আওয়াবীন (أَوَّابٌ) শব্দের অর্থ হল বারবার প্রত্যাবর্তনকারী। অর্থাৎ, আল্লাহর দিকে বারবার প্রত্যাবর্তনকারী আল্লাহমুখী ব্যক্তি। সালাতুল আওয়াবিন হল, আল্লাহর দিকে বারবার প্রত্যাবর্তনকারীদের নামাজ। এটিই সালাতুয যোহা বা চাশতের অপর নাম। যেমন: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “সালাতুয যোহা (চাশতের নামায) এর প্রতি কেবল সেই যত্নবান হতে পারে যে, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। সুতরাং এটাই হল ‘সালাতুল আওয়াবীন’ বা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারীদের সালাত।” (সহিহ ইবনে খুযায়মা, শাইখ আলবানী এটিকে হাসান বলেছেেন। দ্রষ্টব্য: সহিহ তারগীব তারহীব ১/১৬৪)। অপর বর্ননায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—.صلاة الأوابين إذا رمضت الفصال (رواه مسلم)‘
আওয়াবিন নামাজ (এর সময়) হল, যখন উটের বাচ্চা (সূর্যের) প্রখর উত্তাপ অনুভব করে।’’ [মুসলিম, আস-সহিহ: ১৬৩১]। ইমাম আহমাদের ‘মুসনাদ’ এবং ইবনু আবি শাইবার ‘মুসান্নাফে’ আরো বর্ধিত বর্ণনা এসেছে, ‘‘আওয়াবিন নামাজ (এর সময়) হলো, দোহার (চাশতের) সময়ে যখন উটের বাচ্চা (সূর্যের) প্রখর উত্তাপ অনুভব করে।’’।
.
❖ সালাতুর দোহা, ইশরাক, আওয়াবীন তিনটি সালাত কি এক সালাত নাকি ভিন্ন?
__________________________________
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশুদ্ধ হাদিসের বর্ণনা অনুসারে সালাতুল ইশরাক্ব, সালাতুল দোহা এবং সালাতুল আওয়াবীন উক্ত তিনটি সালাত একই সালাত। আদায় করার সময় ভিন্ন থাকার কারনে নাম ভিন্ন যেমন: সূর্যোদয়ের পরপরই প্রথম প্রহরের শুরুতে পড়লে তাকে ‘সালাতুল ইশরাক্ব’ বলা হয় এবং কিছু পরে দ্বিপ্রহরের পূর্বে পড়লে তাকে সালাতুল দোহা বা চাশতের সালাত বলা হয়। (মির‘আতুল মাফাতীহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৪৪-৩৫৮)। আর দুপুরের পূর্বে পড়লে সালাতুল আওয়াবীন বলা হয়। (সহীহ মুসলিম, হা/৭৪৮; মিশকাত, হা/১৩১২)। এই সালাত বাড়ীতে আদায় করা মুস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কখনো পড়তেন আবার কখনো ছাড়তেন। (সহীহ মুসলিম, হা/৭১৭-৭১৮; মির‘আতুল মাফাতীহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৪৫)। মসজিদেও পড়া যাবে। (মির‘আতুল মাফাতীহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৪৬)।
.
প্রখ্যাত ফকিহ ও হাদিস বিশারদ ইমাম আবু বকর জাসসাস (রাহ.) বলেন, অধিকাংশ আলিমের মতে, ইশরাক এবং দোহার নামাজ একই। [আহকামুল কুরআন: ৩/৫৫৯] মুহাদ্দিসগণ দোহা এবং ইশরাকের সালাতকে একই সালাত গণ্য করেছেন। তবে, সুফিগণ আলাদা গণ্য করেছেন। [যাকারিয়া কান্ধলভি, ফাতহুল মুলহিম: ৪/৬৩৪]। ইমাম ত্বিবি তাঁর শারহুল মিশকাতে বলেছেন, ইশরাক হল দোহার প্রথম সময়। মূলত দুটো একই সালাত।
.
শাইখ আব্দুল আযীয ইবন আবদুল্লাহ ইবন বায রহ. বলেন, ইশরাকের সালাত ও সালাতুল দোহা একই সালাত। প্রথম ওয়াক্তের মধ্যে সালাতুল দোহা আদায় করাকেই ইশরাক বলে। (মাজমু‘উল ফাতাওয়া: ৪০১/১১)।
.
শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ ইবন উসাইমীন রহ. বলেন, ইশরাকের সালাতই হল সালাতুল দোহা তবে যদি তুমি তা সূর্য উজ্জ্বল হওয়া ও এক ধনুক পরিমাণ উপরে উঠার পর সকাল সকাল আদায় কর, তবে তা হবে ইশরাকের সালাত। আর যদি তা শেষ ওয়াক্তে বা মাঝামাঝি সময়ে আদায় করা হয় তখন তা হবে সালাতুল দোহা। (লিকায়ুল বাব আল-মাফতুহ)।
.
ফাতওয়া লাজনাহ আদ-দায়িমাহ আলেমগন বলেন, সালাতুল আওয়াবীন নামে আলাদা কোনো সালাত নেই, তবে সূর্যের রশ্মি প্রখর হওয়ার সময় থেকে নিয়ে সূর্য ঢলার পূর্ব পর্যন্ত যে সালাতুল দোহা পড়া হয় তাকেই হাদীসে সালাতুল আওয়াবীন বলা হয়েছে। (আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ: ১৫৪/৬)।

❖ দোহার (চাশতের) সালাতের মহান ফজিলত:
_______________________________________
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
মানুষের শরীরে ৩৬০টি জোড় রয়েছে। অতএব মানুষের কর্তব্য হল প্রত্যেক জোড়ের জন্য একটি করে সাদাক্বাহ করা। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! কার শক্তি আছে এই কাজ করার? তিনি বললেন, দু’রাক‘আত সালাতুয যুহাই এজন্য যথেষ্ট।’ (আবু দাঊদ, হা/৫২৪২; মিশকাত, হা/১৩১৫, সনদ সহীহ; সহীহ মুসলিম, হা/৭২০; মিশকাত, হা/১৩১১)। এই সালাত ২, ৪, ৮ রাক‘আত পর্যন্ত পড়া যায় (সহীহ বুখারী, হা/১১৭৬; আবু দাঊদ, হা/১২৯১; মিশকাত, হা/১৩০৯; মির‘আতুল মাফাতীহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৪৪-৩৪৫)।
.
আব্দুল্লাহ বিন আম্‌র বিন আস (রাঃ) প্রমুখাৎ বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এক যোদ্ধাবাহিনী প্রেরণ করেন। এই যুদ্ধ সফরে তারা বহু যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করে খুব শীঘ্রই ফিরে আসে। লোকেরা তাদের যুদ্ধক্ষেত্রের নিকটবর্তিতা, লব্ধ সম্পদের আধিক্য এবং ফিরে আসার শীঘ্রতা নিয়ে সবিময় বিভিন্ন আলোচনা করতে লাগল। তা শুনে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, “আমি কি তোমাদেরকে ওদের চেয়ে নিকটতর যুদ্ধক্ষেত্র, ওদের চেয়ে অধিকতর লব্ধ সম্পদ এবং ওদের চেয়ে শীঘ্রতর ফিরে আসার কথার সন্ধান বলে দেব না? যে ব্যক্তি সকালে ওযু করে চাশতের নামাযের উদ্দেশ্যে মসজিদে যায় সে ব্যক্তি ওদের চেয়ে নিকটতর যুদ্ধক্ষেত্রে যোগদান করে, ওদের চেয়ে অধিকতর সম্পদ লাভ করে এবং ওদের চেয়ে অধিকতর শীঘ্র ঘরে ফিরে আসে।” (আহ্‌মদ, ত্বাবারানী, সহীহ তারগীব ৬৬৩)।

হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘আদম সন্তান, তুমি দিনের প্রথম ভাগে আমার জন্য চার রাকাত আদায় করো; আমি তোমার (দিনের) শেষ ভাগের জন্য যথেষ্ট হবো।’’ [তিরমিযি, আস-সুনান: ৪৩৭; হাদিসটি সহিহ]। এই হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসগণ বলেন, আল্লাহ তার বাকি দিনের প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট হবেন এবং তার অপছন্দনীয় বিষয়গুলো তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখবেন। [মুবারকপুরী, তুহফাতুল আহওয়াযি: ২/৪৭৮]।
.
❖ দোহার (চাশতের) সালাতের সময় ও রাকআত সংখ্যা:
______________________________________
সূর্যোদয়ের ১৫/২০ মিনিট পর থেকেই দোহার (চাশতের) সালাত পড়া যায়। তবে, দোহার (চাশতের) সালাতের উত্তম সময় হল, সূর্যের তাপ যখন প্রখর হয়। এই সময় থেকে নিয়ে দিনের দ্বিপ্রহর শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দোহার (চাশতের) সালাতের সময় থাকে। আয়িশা (রা.) বলেন, ‘নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত দোহার সালাত ৪ রাকাত পড়তেন। তবে, আল্লাহ চাহেতো কখনো তা বৃদ্ধি করতেন।’ [মুসলিম, আস-সহিহ: ৭১৯]।
.
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিনে দোহার (চাশতের) ৮ রাকাত সালাত পড়েছেন। [মুসলিম, আস-সহিহ: ৭৯১]। শারহুল জামি আস সহীহ গ্রন্থে এসেছে, সাহাবিদের মধ্যে আম্মাজান আয়িশা পড়তেন ৬ রাকাত; ইবনু উমার ২ রাকাত, সা’দ ও আম্মাজান উম্মু সালামাহ ৮ রাকাত, আলি ইবনু আবি তালিব ৪ রাকাত পড়তেন। রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমা‘ইন।
.
আলিমগণের বড় অংশের মতে, উপরোক্ত সালাতগুলোর সর্বনিম্ন ২ রাকআত এবং সর্বোচ্চ ১২ রাকআত পড়া যায়। তবে সঠিক মতানুসারে এর সর্বোচ্চ সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়। সুতরাং ইচ্ছা অনুযায়ী দু রাকআত করে, ২, ৪, ৬, ৮, ১০, ১২ বা তার চেয়ে বেশি যতখুশি এই সালাত আদায় করা যায়। শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু সলিহ আল উসাইমিন (রাহ.) বলেন, ‘‘(দোহার সালাতের) সর্বোচ্চ রাকআত নির্ধারিত নয়। কেননা আয়িশা (রা.) হতে (উপরে) বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, ‘‘আল্লাহ চাহেতো এর চেয়ে অধিক পড়তেন (নির্দিষ্ট বাউন্ডারি দেওয়া হয়নি)।’’ [শারহুল মুমতি’: ৪/৮৫]। তবে, হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ সময় ৪ রাকাত আদায় করতেন, যেমনটি আমরা পূর্বেই পড়লাম। প্রতি দু’রাক‘আত অন্তর সালাম ফিরাতে হয়।
.
উল্লেখ্য, অনেকে মাগরিব ও ইশার সালাতের মধ্যবর্তী সময়ে ছয় রাকাআত নফল সালাতকে সালাতুল আওয়াবীন হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। কিন্তু উপরোক্ত হাদীসের আলোকে প্রমাণিত হয় যে, এ কথা ঠিক নয়। যদিও মাগরিব ও ইশার সালাতের মধ্যবর্তী সময়ে নফল সালাত আদায় করা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। তবে তা ছয় রাকআতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং যতখুশি পড়া যায়। আর সেটিকে সালাতুল আওয়াবীন বলাটা ভুল বা উক্ত হাদীস পরিপন্থী। যেমন বলা হয় মাগরিব সালাতের পরে বিশ রাকাত পড়বে, তার জন্য জান্নাতে একটি বাড়ি তৈরি করা হবে বা যেকোন পরিমাণ নফল সালাতকে ‘আওয়াবীন’ বলার হাদীগুলো যঈফ। (যঈফ তিরমিযী, হা/১১৬৭; সিলসিলা যঈফাহ, হা/৪৬৯)।

অন্য হাদিসে এসেছে, ‘‘যে ব্যক্তি মাগরিবের সালাতের পর ছয় রাকাত নফল সালাত পড়বে, এসবের মাঝখানে খারাপ কোনো কথা বলবে না, আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে ১২ বছরের নফল ইবাদাত করার নেকি দান করবেন।’’ [তিরমিযি, আস-সুনান: ৪৩৫; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ১১৬৭; হাদিসটি বেশ দুর্বল]। তাবি‘ঈ মুহাম্মাদ ইবনু মুনকাদির (রাহ.) বলেন, রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে সালাত পড়ে, সে আওয়াবিনের সালাত পড়ে।’’ [ইবনু মুবারক, আয যুহদ; হাদিসটি দুর্বল]।
.
প্রকাশ থাকে যে, যুহার সালাত পড়ে ‘বাবুয যুহা’ দিয়ে জান্নাতে যাওয়ার হাদীস সহীহ নয়। (দেখুন: যাদুল মাআদ, ইবনুল কাইয়েম ১/৩৪৯ টীকা নং ১)।

❖ উপসংহার: উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে, ইশরাক এবং দোহা (চাশত) আওয়াবীন একই সালাত। শুধু সময়ের পার্থক্যের কারণে এদের নাম ভিন্ন হয়েছে। ইশরাক হলো দোহার প্রথম সময়। যদি জামায়াতে ফজর আদায় করে, সালাতের স্থানে বসে থেকে যিকর করে, অতঃপর সূর্যোদয়ের ১৫/২০ মিনিট পর আদায় করা হয়, তবে এটিকে ইশরাক বলা হয়। আর সূর্য কিছুটা প্রখর হওয়ার পর (সকালের নাস্তার সময়ে) আদায় করলে এটিকে ‘দোহা’ (চাশত) বলা হয়। আওয়াবীন অর্থ, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কারীদের সালাত। সূর্যের রশ্মি প্রখর হওয়ার সময় থেকে নিয়ে সূর্য ঢলার পূর্ব পর্যন্ত যে সালাতুল দোহা পড়া হয় তাকেই হাদীসে সালাতুল আওয়াবীন বলা হয়েছে। মৌলিকভাবে তিনটি একই নামাজ। একই দিনে ইশরাক ও দোহার (চাশতের) সালাত আদায় করাও জায়েয। কোনো (ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত বা নফল) নামাজের নিয়ত যেহেতু মুখে পড়তে হয় না (শুধু অন্তরে ইচ্ছাপোষণ করতে হয়), সেহেতু ইশরাক এবং দোহার (চাশতের) সালাতেও অন্তরে ইচ্ছাপোষণ করাই যথেষ্ট। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

নারীদের নাক ছিদ্র করে সেখানে নাকফুল পরা কি জায়েয

 প্রশ্ন: নারীদের নাক ছিদ্র করে সেখানে নাকফুল পরা কি জায়েয? এই সম্পর্কে ইসলাম কি বলে?

▬▬▬▬▬▬◖🌻◗▬▬▬▬▬▬
উত্তর: নারীদের নাক ছিদ্র করে নাকফুল পরিধান করা জায়েজ নাকি নাজায়েজ এই মর্মে কুরআন-সুন্নাহয় সুস্পষ্ট কোনো বর্ণনা পাওয়া যায়না এমনকি সাহাবায়ে কেরাম থেকেও কোনো আছার বর্ণিত হয়নি। তবে দেশীয় সংস্কৃতির প্রথা হিসাবে কিছু শর্তসাপেক্ষে নারীরা তাদের নাক ফুড়িয়ে তাতে কোন অলঙ্কার ব্যবহার করতে পারে।এতে কোন সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ। শর্তগুলো হল:

▪️(১) উগ্রতার বহিপ্রকাশ ঘটে এমন অলঙ্কার ব্যবহার করা যাবে না।
▪️(২) অমুসলিম সংস্কৃতি ও ধর্ম বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত অলঙ্কার ব্যবহার করা যাবে না।
▪️(৩) প্রাণীর ছবি অঙ্কন করা হয়েছে এমন অলঙ্কার ব্যবহার করা যাবে না।
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ,শাইখুল ইসলাম, ইমাম আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,ويباح للنساء من حلي الذهب والفضة والجواهر كل ما جرت عادتهن بلبسه ‘নারীদের জন্য সোনা রুপা ও যে কোনো ধাতুর অলঙ্কার (যেমন, হিরা, চুনী, পান্না, রুবী, মার্বেল, মুক্তা ইত্যাদি) যেগুলো তারা সাধারণত পরিধান করে থাকে; ব্যবহার করা বৈধ।’ (ইবনে কুদামাহ আল মুগনী ২/৩২৫)।
.
সৌদি আরবের ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) আলিমগণকে নারীদের নাকফুল ব্যবহার করা জায়েজ কিনা এমন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হলে তাঁরা উত্তর দিয়েছেন, حكم وضع الزمام في الأنف : يجوز ؛ لأن ثقب الأنف للزينة وليس للإيذاء أو تغيير خلق الله‘নারীদের জন্য নাকে ফুল পরা জায়েয। নারীর নাক ফোঁড়া হয় সৌন্দর্যের জন্য; নারীকে কষ্ট দেওয়া অথবা আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করার জন্য নয়।’ (ফতোয়া ও গবেষণা বিষয়ক স্থায়ী কমিটি শাইখ আব্দুল আযিয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায, শাইখ আব্দুল্লাহ বিন গাদইয়ান, শাইখ সালেহ আল-ফাওযান, শাইখ আব্দুল আযিয আলে শাইখ, শাইখ বকর আবু যাইদ।ফাতাওয়াল লাজনাদ দায়িমা লিল বুহুসিল ইলমিয়্যা ওয়াল ইফতা ২৪/৩৬ ইসলামিক সওয়াল জবাব ফাতাওয়া নং ১০৫৪১৫)।
.
বিগত শতাব্দীতে সৌদি আরবের শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] কে একই প্রশ্ন করা হলে শাইখ বলেছেন, মহিলার নাক ফুড়িয়ে তাতে কোন অলঙ্কার ব্যবহার করতে পারে এবং ব্যবহার করতে পারে লাগামের মত নাকের নথ।(মাজমূউ ফাতাওয়া ইবনে উষাইমীন ৪/১৩৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
___________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Saturday, September 3, 2022

আমানতের অর্থ-সম্পদ মালিকের অনুমতি ছাড়া খরচ করার বিধান

 প্রশ্ন: যদি আমার কাছে কারও টাকা আমানত হিসেবে জমা থাকে। আর আমি যদি বিশেষ দরকারে সেখান থেকে ঋণ হিসেবে টাকা নিয়ে প্রয়োজনে খরচ করি তাহলে কি তা হারাম হবে? দলিলের ভিত্তিতে জানতে চাই।

———————————————————
উত্তর: কেউ যদি কারও কাছে টাকা-পয়সা বা অন্য কোনও অর্থ-সম্পদ আমানত হিসেবে জমা রাখে তাহলে তার অনুমতি ছাড়া তা ব্যবহার করা বৈধ নয়। কারণ হতে পারে, সে মৃত্যু বরণ করবে অথবা সে দেউলিয়া হয়ে যাবে। তখন উক্ত আমানত বিনষ্ট হওয়ার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। ইমাম মালিক রাহ. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন,

“من استُودِع مالاً، أو بُعث به معه، فلا أرى أن يَتَّجر به، ولا أن يسلفه أحدًا، ولا يحرِّكه عن حاله؛ لأني أخاف أن يُفلس، أو يموت؛ فيتلف المال، وتضيع أمانته”. اهـ.
“কারও কাছে যদি অর্থ-সম্পদ গচ্ছিত রাখা হয় বা তার মাধ্যমে কোথাও কোথাও পাঠানো হয় তাহলে তা দ্বারা তার ব্যবসা করা বা অন্য কাউকে তা ধার দেওয়া বা তা তার নিজ অবস্থা থেকে সরানোকে আমি বৈধ মনে করি না। কারণ আশঙ্কা আছে যে, সে দেউলিয়া হয়ে যাবে বা মৃত্যু বরণ করবে। ফলে সম্পদ নষ্ট হবে এবং আমানত ভঙ্গ হবে।” [আল মুদাওয়ানা]।

হ্যাঁ তার উক্ত আমানত গ্রহণকারীর যদি টাকার বিশেষ প্রয়োজন হয় তাহলে মূল মালিকের কাছে তার গচ্ছিত অর্থ ব্যবহারের অনুমতি নিবে। যদি অনুমতি দেয় তাহলে ভালো। অন্যথায় তার সম্পদ যেমন ছিল তেমন থাকবে। তাতে কোনও ধরণের হস্তক্ষেপ করা যাবে না। সে যদি অনুমতি ছাড়া উক্ত গচ্ছিত সম্পদ নিজের দরকারে ব্যবহার করে ফেলে তাহলে সে আমানতকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করলো না। আর ব্যবহার করতে গিয়ে যদি উক্ত আমানত হারিয়ে ফেলে বা তাতে কোনও ক্ষয়-ক্ষতি করে ফেলে তাহলে সে তার ক্ষতিপূরণ দিবে। ইমাম ইবনে আবু যায়েদ আল মালিকি রহ. বলেন,
“ومن تَعدَّى على وَديعة، ضَمِنها”
“যে ব্যক্তি আমানত লঙ্ঘন করবে সে তার জিম্মাদার হবে।” [আর রিসালাহ]

➤ অবশ্য কতিপয় আলেম বলেন, যদি গচ্ছিত সম্পদ হয় টাকা-পয়সা আর তার অন্যান্য সম্পদ থেকে পরিশোধের ব্যবস্থা থাকে তাহলে বিশেষ দরকারে মালিকের অনুমতি ছাড়া তা ব্যবহার করতে পারে। তবে শর্ত হল, সে বিষয়ে সাক্ষ্য রাখতে হবে। ইমাম মালিক রাহ-কে এ ব্যাপারে পুনরায় প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,
“إن كان له مالٌ فيه وفاءٌ، وأَشهَدَ، فأرجو أن لا بأس به”
“যদি তার কাছে এমন অর্থ থাকে যা দ্বারা গৃহীত ঋণ পরিশোধ করা যাবে তাহলে আশা করি তাতে কোনও সমস্যা নেই।”

الباجيّ: “وهذا في الدنانير والدراهم. ووَجهُ الجواز، إذا قلنا: إن الدنانير والدراهم لا تَتعيَّن، كأنه لا مَضرَّة على المُودِع
في انتفاع المُودَع بها إذا ردَّ مِثلها،

তবে এ কথায় কোনও সন্দেহ নাই যে, সতর্কতার স্বার্থে আমানত দাতা যেভাবে আমানত জমা রেখেছিলো তা হুবহু সেভাবেই রেখে দেওয়া এবং তাতে কোনও ধরণের হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকাই অধিক উত্তম। কারণ আমানত দাতা আমানত জমা রেখেছিলো নিরাপত্তার স্বার্থে; আমানত গ্রহীতা ইচ্ছামত তা ব্যবহার করবে বা তার দ্বারা ফায়দা উঠাবে এ জন্য নয়।

❑ ইসলামের দৃষ্টিতে আমানত রক্ষা করার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:

কুরআন-হাদিসে আমানত রক্ষার ব্যাপারে অনেক বক্তব্য এসেছে। যেমন:

◍ কুরআনে এটিকে ইমানদারের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ

“এবং যারা আমানত ও অঙ্গীকারের প্রতি যত্নবান হয়।” [সূরা মুমিনূন: ৮]।

◍ আল্লাহ তাআলা আমানতকে তার প্রাপকদের বুঝিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন,

إِنَّ اللَّـهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌছে দাও।” [সূরা নিসা: ৫৮]।

◍ হাদিসে আমানতের খেয়ানত করাকে মুনাফিকের একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
آيَةُ المُنَافِقِ ثَلاَثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ [متفقٌ [عَلَيْهِ
زَادَ في رِوَايةٍ لمسلم: وإنْ صَامَ وَصَلَّى وَزَعَمَ أنَّهُ مُسْلِمٌ

‘‘মুনাফিকের চিহ্ন হল তিনটি। যথা: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে।” [সহিহ বুখারি ও মুসলিম] সহিহ মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, ‘‘…যদিও সে রোজা রাখে এবং নামাজ পড়ে ও ধারণা করে যে, সে মুসলিম।’’ মহান আল্লাহ আমাদেরকে আমানত রক্ষার ব্যাপারে আরও বেশি সচেতন ও সতর্ক হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন। আল্লাহু আলাম।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate