Saturday, September 3, 2022

পুরুষের মাথার চুল রাখার সুন্নাতী তরীকা

 প্রশ্ন: পুরুষের মাথার চুল রাখার সুন্নাতী তরীকা কি কি? চুলে সিঁথি করা এবং চুল লম্বা হলে রাবার ব্যান্ড ব্যবহার করা যাবে কি?

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পুরুষের মাথার চুল লম্বা ও খাটো উভয়টিই রাখা জায়েয। তবে চুলের নিদিষ্ট পরিমাপ আছে, সবচেয়ে বড় চুল হল কাঁধ বরাবর। এর চেয়ে বড় এবং বিভিন্ন স্টাইলে চুল রাখা রাসূল (ﷺ) এর তরীকার খিলাপ। যেমন: মাথার এক অংশ কামিয়ে ফেলা, অপর অংশে চুল রাখা। কোন বিধর্মীদের অনুকরণে চুল রাখা।কোন ফাসিক ব্যক্তির চুলের হেয়ার ষ্টাইল নকল করে চুল রাখা নাজায়েজ। চুল বড় বা ছোট করে রাখা ‘সুনানুয যাওয়ায়েদ’ বা ব্যবহারগত অতিরিক্ত সুন্নাত সমূহের অন্তর্ভুক্ত। যার উপর আমল করা উত্তম। তবে ছেড়ে দেওয়া অপছন্দনীয় নয়।’ (শরীফ জুরজানী, কিতাবুত তা‘রীফাত, বৈরূত ছাপা ১৪০৮/১৯৮৮ ‘সুন্নাতের বর্ণনা’ অনুচ্ছেদ, পৃঃ ১২২)।

বড় চুল তিন পদ্ধতিতে রাখা যায়,এটি মানুষের ব্যবহারগত অতিরিক্ত সুন্নাত সমূহের অন্তর্ভুক্ত।রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর মাথায় তিন ধরনের চুল থাকত। যেমনঃ

▪️[১] ওয়াফরা, যা কানের লতি পর্যন্ত [আবুদাঊদ হা/৪২০৬]।
▪️[২] লিম্মা, যা কাঁধের কাছাকাছি ঘাড়ের মধ্যস্থল পর্যন্ত ঝুলে পড়ত। [সহীহ মুসলিম হা/২৩৩৭]
▪️[৩] জুম্মা, সবচেয়ে বড় যা ঘাড়ের নীচ পর্যন্ত। [সুনানে নাসাঈ হা/ ৫০৬২, ৫০৬৬]।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর চুল সাধারণত জুম্মার চেয়ে ছোট এবং ওয়াফরার চেয়ে বড় থাকত। [ইবনু মাজাহ হা/৩৬৩৫]।

আয়েশা [রাঃ] থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি হায়েয [ঋতুবতী] অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর মাথার কেশ পরিপাটি করতাম। [মুসহীহ বুখারী, হা/২৯৫; নাসাঈ, হা/২৭৭সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/১৩৫৯ মিশকাত, হা/৪৪১৯]। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)চুল আঁচড়াবার সময় ডান দিক থেকে শুরু করতেন। [আবূ দাঊদ হা/৪১৬০]। তিনি তাঁর মাথার মাঝখানে সিঁথি করতেন। [আবূ দাঊদ হা/৪১৮৯, ইবনে মাজাহ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৩৬৩৩]।
.
আবু ইসহাক বলেন, আবু আব্দুল্লাহ [ইমাম আহমাদ] কে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল,যার মাথায় লম্বা চুল ছিল। তিনি বলেন, এটি উত্তম সুন্নাত। যদি আমরা সক্ষম হই,তাহলে আমরাও অনুরূপ লম্বা চুল রাখব। তিনি আরো বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জুম্মা চুল ছিল। তিনি আরো বলেন,রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর ৯ জন সাহাবীর লিম্মা চুল ছিল। ১০ জন সাহাবীর জুম্মা চুল ছিল। ইমাম আহমাদ নিজে মধ্যম সাইজের চুল রাখতেন। [ইবনু কুদামা, আল-মুগনী ১/৭৩-৭৪ পৃঃ চুল ছাঁটা ও মুন্ডনের হুকুম অনুচ্ছেদ]।

সাহাবী ওয়ায়েল বিন হুজর (রাঃ) একদিন লম্বা চুল নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে এলেন। তখন রাসূল (ﷺ) মাছি বসবে, মাছি বসবে বলে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন। ফলে তিনি ফিরে গিয়ে পরে চুল কেটে খাট করে এলেন। তখন রাসূল (ﷺ)বললেন, এটি সুন্দর (هذا أحسن)।[আবুদাঊদ হা/৪১৯০; ইবনু মাজাহ হা/৩৬৩৬; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী ১/৭৩-৭৪ পৃঃ]।

পূর্বে আমি উল্লেখ করেছি যে, পুরুষেরা মাথার মাঝখানে সিঁথি করতে পারে এটি মুস্তাহাব। এবং সিঁথি না করে ছেড়ে রাখা মকরূহ। যেহেতু তাতে আহলে কিতাবের সাদৃশ্য অবলম্বন করা হয়। অবশ্য চুল ছোট হলে সিঁথি না করে স্বাভাবিক অবস্থায় ছেড়ে রাখায় দোষ নেই। (শা’রুর রা’স ৫০ পৃঃ)।
.
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার কেশ নিম্নদেশে ঝুলিয়ে রাখতেন (অর্থাৎ প্রথমদিকে তিনি সিথি করতেন না)। আর মুশরিকরা তাদের মাথায় সিঁথি করত। পক্ষান্তরে আহলে কিতাব তাদের মাথার চুল ঝুলিয়ে রাখত। প্রথমদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে ব্যাপারে প্রত্যাদেশ না পেতেন, সেসব ব্যাপারে আহলে কিতাবদের অনুসরণ পছন্দ করতেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার কেশকে সিঁথি করতেন। (সহীহ বুখারী, হা/৩৫৫৮, নাসাঈ, হা/৫২৩৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬০৫ শামায়েলে তিরমিযি, হাদিস নং ২৫ ইবনু মাজাহ ৩৬৩২, মুসনাদে আহমাদ ২৩৬৪, মিশকাত হা/৪৪২৫) ।অপর বর্ণনায় রয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চুল বাবরী ছিল,তাতে সিঁথি হলে তিনি তা সিঁথি করতেন, না হলে ছেড়ে দিতেন। অতএব বিশুদ্ধ মত হলো,সিঁথি মুস্তাহাব। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৯১৭)।
.
পুরুষের চুলে ব্যান্ড, রাবার ব্যান্ড জুটি ইত্যাদি ব্যবহার করা শরীয়ত সম্মত নয়। কেননা এগুলো নারীদের সদৃশ হয়ে যায়। তাছাড়া যেহেতু পুরুষের চুল সোজা রাখার জন্য অন্য পদ্ধতিও রয়েছে। (টুপি পরিধান, নিয়মিত তৈল বা অন্য কিছু লাগিয়ে চুলের যত্ন নেওয়া ইত্যাদি)। সুতরাং ঘরে অথবা বাইরে কোথাও পুরুষের জন্য মহিলাদের সাদৃশ্য গ্রহণ বৈধ নয়। তাই মাথার লম্বা চুল বেঁধে রাখা মহিলাদের সাদৃশ্যগ্রহণ হওয়ায় তা করা পুরুষের জন্য জায়েজ হবে না। কেননা হাদিসে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লা’নত করেছেন নারীরূপী পুরুষ ও পুরুষরূপী নারীদের উপর এবং বলেছেন, তাদেরকে বের করে দাও তোমাদের ঘর হতে এবং তিনি অমুক অমুককে বের করে দিয়েছেন। (সহীহ বুখারী ২১৫২, ২১৫৪, ২২৩৩, মুসলিম ১৭০৩, ১৭০৪, তিরমিযী ১৪৩৩, ১৪৪০, আবু দাউদ ৪৪৬৯, ৪৪৭০, ইবনু মাজাহ ২৫৬৫, আহমাদ ৭৩৪৭, ৮৬৬৯, মালেক ১৫৬৪,বুলুগুল মারাম,১২১৮) উক্ত হাদীসের ব্যাখায় মুবারকপুরী (রহ,) তুহফাতুল আহওয়াহি গ্রন্থে বলেন, সুন্দর্য্যতা, পোশাক-আশাক, খেযাব, আওয়াজ, আকৃতি, কথাবার্তা, সহ সমস্ত নড়াচড়া ও উঠাবসায় পুরুষের জন্য মহিলার সাদৃশ্য গ্রহণ হারাম ও নাজায়েয। এবং হাদীসে সাদৃশ্য দ্বারা এই সর্বপ্রকার সাদৃশ্যই ধর্তব্য।(ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১৪৮০৫৯)।
.
এমনকি সালাতে ও পুরুষ তাদের চুল বেঁধে রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। সাঈদ ইবনু আবু সাঈদ আল-মাক্ববুরী থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুক্তদাস আবু রাফি‘কে হাসান ইবনু ‘আলী (রাঃ) এর পাশ দিয়ে যেতে দেখলেন। তখন তিনি [হাসান ইবনু ‘আলী (রাঃ)] গর্দানের পেছনে চুলের ঝুটি বেঁধে সলাত আদায় করছিলেন। আবূ রাফি’ (রাঃ) বাঁধন খুলে দিলে হাসান (রাঃ) তার প্রতি রাগের দৃষ্টিতে তাকালেন। আবূ রাফি বলেন, আগে সালাত আদায় শেষ করুন, রাগ করবেন না। কেননা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ এটা (চুলের ঝুটি) হচ্ছে শয়তানের ঘাঁটি বিশেষ, অর্থাৎ শয়তানের আড্ডাখানা। (সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং-৬৪৬)।
.
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীসের শেষাংশে বলা হয়েছে যে, وَلاَ نَكْفِتَ الثِّيَابَ وَالشَّعَرَ ‘এবং আমরা যেন সিজদাকালে আমাদের কাপড় ও চুল গুটিয়ে না নেই।’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা৮৮৭; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৮২৭ ‘সিজদা ও তার মাহাত্ম্য’ অনুচ্ছেদ; নায়লুল আওত্বার ৩/২২ পৃঃ)। উক্ত বিষয়টি পুরুষের জন্য খাছ,মহিলাদের জন্য নয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এই নিষেধাজ্ঞা না জানার কারণে অনেক পুরুষ মুসল্লী সালাতের সময়ে তাদের মাথার চুল বেঁধে নিতেন। একদা ইবনু আব্বাস (রাঃ) জনৈক বদরী সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনুল হারিছ (রাঃ) এর চুল খুলে দেন। (ইবনু মাজাহ, আবুদাঊদ, তিরমিযী, নায়লুল আওত্বার ৩/২৩৫ সহীহ ইবনু মাজাহ হা/৮৬১ সহীহ আবুদাঊদ হা/৬৪৬)। ইমাম শাওকানী উপরোক্ত হাদীস দু’টির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন,والحديثان يدلان علي كراهية صلاة الرجل وهو معقوص الشعر ‘হাদীস দু’টি পুরুষের জন্য চুল বাঁধা অবস্থায় সালাত আদায় করা মাকরূহ সাব্যস্ত করে। হাফেয ইরাকী বলেন, এটি পুরুষের জন্য খাছ, মেয়েদের জন্য নয়। কেননা তাদের চুলও সতরের অন্তর্ভুক্ত, যা সালাত অবস্থায় ঢেকে রাখা ওয়াজিব।
.
পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিষ্কার যে, চুল বড়-ছোট উভয় পদ্ধতিতেই রাখা জায়েজ। তবে সুন্দরভাবে রাখতে হবে এবং নিয়মিত চুলের পরিচর্যা করতে হবে। রাসূল (ﷺ) বলেন,‘যে ব্যক্তির চুল আছে, সে যেন তার যত্ন করে রাখে।’ (আবুদাউদ হা/৪১৬৩; মিশকাত হা/৪৪৫০; সহীহাহ হা/৫০০)।কোন অবস্থাতেই বেহায়াপনা করা যাবে না এবং অন্যদের অনুসরণ করা যাবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যারা অন্যদের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে,তারা তাদের মধ্যেই গণ্য হবে।’ (আবুদাঊদ হা/৪০৩১; মিশকাত হা/৪৩৪৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
________________________
উপস্থাপনায়,
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

নিজের চাচী-মামী বা দূর সম্পর্কের চাচী-মামী (আন্টি) কে বিয়ে করা যাবে কি

 প্রশ্ন: নিজের চাচী-মামী বা দূর সম্পর্কের চাচী-মামী (আন্টি) কে বিয়ে করা যাবে কি?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: আপন চাচার স্ত্রী (চাচী) এবং মামার স্ত্রী (মামী) আপনার জন্য মাহরাম নয়। অর্থাৎ চাচা/মামা যদি মারা যায় বা তাদেরকে তালাক দেয় তাহলে উক্ত চাচী/মামীকে বিয়ে করা জায়েজ। সুতরাং সর্বাবস্থায় চাচী ও মামী সাথে পর্দা রক্ষা করা ফরজ। আর দূর সম্পর্কের চাচী/মামী তো প্রশ্নাতীত ভাবেই মাহরাম নয়। কারণ এরা কেউই সুরা নিসা এর ২৩ নম্বর আয়াতে বর্ণিত যে সকল মহিলাদেরকে বিয়ে করা হারাম তাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং তাদেরকে শরিয়ত সম্মত পদ্ধতিতে বিয়ে করতে কোন বাধা নেই।

সুতরাং আপনার আপন চাচী, মামী বা দূর সম্পর্কীয় আন্টিকে যদি তার স্বামী তালাক দেয় অথবা তার স্বামী মারা যায় তাহলে আপনি চাইলে তাকে ইদ্দত পালনের পর ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক বিয়ে করতে পারেন। আল্লাহু আলম।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

বিবাহ করা সুন্নাত না ফরয এবং কেউ জীবনে বিবাহ না করার সিদ্ধান্ত নিলে কি গুনাহ হবে

 প্রশ্ন: বিবাহ করা সুন্নাত না ফরয? কেউ জীবনে বিবাহ না করার সিদ্ধান্ত নিলে কি গুনাহ হবে?

▬▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: ব্যক্তির অবস্থার আলোক বিয়ে করার বিধান ভিন্ন ভিন্ন হয়। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একই কথা। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে যার শক্তি-সামর্থ্য রয়েছে এবং নিজেকে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে নিরাপদ রাখার ক্ষমতা আছে, স্বাভাবিক ভাবে তার জন্য বিবাহ করা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, হে যুব সম্প্রদায়!তোমাদের মধ্যে যে বিবাহ করতে সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কারণ এটা তার দৃষ্টিকে অবনমিত রাখে,লজ্জাস্থানকে হেফাযত করে। যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে না তার উপর সিয়াম পালন করা কর্তব্য। কারণ এটা তার জন্য ঢালস্বরূপ। (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত হা/৩০৮০)। তবে একাকী জীবন-যাপনের চেয়ে বিবাহ করা উত্তম। কেননা ইসলামে সন্ন্যাসব্রত বা বৈরাগ্য নেই। (তিরমিজি ফিকহুস সুন্নাহ ৩/১৩০)। সুতরাং বিবাহ করা সুন্নাহ হলেও ক্ষেত্রবিশেষে কখনো বিবাহ করা ফরয আবার কখনো হারামও হতে পারে।যার অশ্লীল কর্মে লিপ্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে এবং যার শারীরিক শক্তিমত্তা, সক্ষমতা ও আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে এবং যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ ও পদস্খলনের আশংকা করে,তার জন্য বিবাহ করা ফরজ। (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা ১৮/ ৬)আল্লাহ বলেন, وَلْيَسْتَعْفِفِ الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحاً حَتَّى يُغْنِيَهُمْ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ ‘যাদের বিবাহের সামর্থ্য নেই,আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে।’ (সূরা নূর ২৪/৩৩)। কেননা আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং হারাম থেকে মুক্ত থাকা ওয়াজিব, যা বিবাহ ব্যতীত সম্ভব নয়।’ (সূরা নূর ৩৩)। আবার যার দৈহিক মিলনের সক্ষমতা ও স্ত্রীর ভরণ-পোষণের সামর্থ্য নেই তার জন্য বিবাহ করা হারাম। (ফিক্বহুস সুন্নাহ ৩/১৩১)। অনুরূপভাবে যিনি যুদ্ধের ময়দানে বা কাফির-মুশরিক দেশে যুদ্ধরত থাকেন তার জন্য বিবাহ হারাম। কেননা সেখানে তার পরিবারের নিরাপত্তা থাকে না। তদ্রূপ কোন ব্যক্তির স্ত্রী থাকলে এবং অন্য স্ত্রীর মাঝে ইনসাফ করতে না পারার আশংকা করলে দ্বিতীয় বিবাহ করা হারাম। যেমন আল্লাহ বলেন, فَإِنْ خِفْتُمْ أَلاَّ تَعْدِلُواْ فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ‘আর যদি আশংকা কর যে,সুবিচার করতে পারবে না তবে একজনকে অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীকে।’ (নিসা ৪/৩)। [ইবনে উসাইমিন রহঃ শরহুল মুমতে,১২/৯]।

◾কেউ জীবনে বিবাহ না করার সিদ্ধান্ত নিলে কি গুনাহ হবে?
___________________________________
কোন নারী-পুরুষের জন্য সারাজীবন বিবাহ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া শরীয়ত সম্মত নয়। কেননা বিবাহ ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধান। বিবাহ করা সমস্ত নবীদের সুন্নাহ এমনকি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে একাধিক বিয়ে করেছেন এবং তার উম্মতকে বিবাহ করতে উৎসাহিত করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন,তোমার পূর্বে আমরা অনেক রাসূল প্রেরণ করেছিলাম এবং তাদেরকে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দিয়েছিলাম।’ (সূরা রা‘দ ১৩/৩৮)। রাসূল ( ﷺ)-এর স্ত্রীদের নিকট আগত তিন ব্যক্তির এক ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত করার স্বার্থে বিবাহ না করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাসূল (ﷺ) বলেছেন, وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِىْ فَلَيْسَ مِنِّىْ ‘আমি নারীদেরকে বিবাহ করি (সুতরাং বিবাহ করা আমার সুন্নাত)। অতএব যে আমার সুন্নাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (বুখারী হা/৫০৬৩; মসুলিম হা/১৪০১; মিশকাত হা/১৪৫)। তাছাড়া বিবাহ না করে চিরকুমার ও নিঃসঙ্গ জীবন যাপনের অনুমতি ইসলামে নেই। সা‘আদ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) বলেন, রাসূল (ﷺ) উসমান ইবনু মাযঊনকে নিঃসঙ্গ জীবন যাপনের অনুমতি দেননি। তাকে অনুমতি দিলে আমরা নির্বীর্য হয়ে যেতাম।’ (বুখারী হা/৫০৭৩; মুসলিম, মিশকাত হা/৩০৮১)। আয়েশা (রাঃ) বলেন,‘নিশ্চয়ই রাসূল (ﷺ) নিঃসঙ্গ জীবন যাপনকে নিষেধ করেছেন।’ (সহীহ বুখারী হা/৫০৭৩; নাসাঈ হা/৩২১৩; মিশকাত হা/৩০৮১)।তাই কোন নারী-পুরুষ সার্বিক দিক থেকে সমর্থ হওয়া সত্ত্বেও রাসূল (ﷺ) এর সুন্নাতের প্রতি অনীহা ও অবহেলার কারণে বিয়ে পরিত্যাগ করে, তাহলে সে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ বা তরীকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কবিরা গুনাহগার হবে। (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৪৫)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সামর্থ্যবানদেরকে বিয়ে করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। (বুখারী, মিশকাত হা/৩০৮০)।
.
কিন্তু কোন নারী-পুরুষের যদি বিবাহ করার ইচ্ছা থাকা এবং সাধ্য অনুযায়ী সর্বদিক থেকে প্রচেষ্টা করা সত্বেও কোন কারণে বিয়ে করতে ব্যর্থ হয় বা বিশেষ কোন ওজর বা শারীরিক সমস্যার কারণে বিবাহ করতে না পারে তাহলে এতে তাদের কোন গুনাহ হবেনা ইনশাআল্লাহ।কারন, বিয়ে করার ক্ষেত্রে তার পক্ষ থেকে চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। আর আল্লাহ অন্তরের খবর জানেন। সে চেষ্টা করেছে তার চেষ্টা করার পরেও সম্ভব হয়নি। মহান আল্লাহ বলেন-আল্লাহ কারো উপর সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেন না। (সূরা বাকারা,২৮৬)। তিনি আরো বলেন, তুমি তোমার সাধ্য অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় কর।(সূরা তাগাবুন: ১৬)।
.
পরিশেষে, মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করার সাথে সাথে তার জীবন ধারণের জন্য কিছু চাহিদা দিয়েছেন এবং চাহিদা মিটানোর পদ্ধতিও বলে দিয়েছেন। মানব জীবনে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ন্যায় জৈবিক চাহিদাও গুরুত্বপূর্ণ। এই চাহিদা পূরণের জন্য ইসলাম বিবাহের বিধান দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদম (আঃ)-কে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন। পরবর্তী বংশ বৃদ্ধির জন্য হাওয়া (আঃ)-কে সৃষ্টি করে আদম (আঃ) এর সাথে বিবাহের ব্যবস্থা করেন। মানব জীবন প্রণালী পরিবর্তনের সাথে সাথে বিবাহের নিয়মেও পরিবর্তন ঘটেছে। অবশেষে শেষ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) জাহেলী যুগের সকল কুসংস্কার দূর করে নারীদেরকে বিবাহের মাধ্যমে মর্যাদা দান করেছেন। বিবাহ মানব বংশ রক্ষার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি চিরন্তন ব্যবস্থা। বিবাহ নবীগণের সুন্নাত। বিবাহ করার জন্য পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা নিসা: ৩, সূরা নূর: ৩২)। তাই ইসলামের বিধান এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত পালনের উদ্দেশ্যে বিয়ের চেষ্টা অব্যহত রাখা কতর্ব্য। আল্লাহ আমাদেরকে সাহায্য করুক। আমীন। আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী।
____________________
উপস্থাপনায়,
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

ইমাম ও মুক্তাদীর দাঁড়াবার স্থান ও নিয়ম এবং মুক্তাদীর সংখ্যা হিসাবে ইমাম ও মুক্তাদীর দাঁড়ানোর সঠিক পদ্ধতি

 প্রশ্ন: ইমাম ও মুক্তাদীর দাঁড়াবার স্থান ও নিয়ম এবং মুক্তাদীর সংখ্যা হিসাবে ইমাম ও মুক্তাদীর দাঁড়ানোর সঠিক পদ্ধতি কি?

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: মহান আল্লাহ তা‘আলা মানবজাতিকে একমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন (সূরা যারিয়াত: ৫৬) সুতরাং মানুষের কর্তব্য হ’ল ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য হাছিলের চেষ্টা করা। আর সালাত আল্লাহর নৈকট্য লাভের সবচেয়ে বড় মাধ্যম এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ বলেন, তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং রুকূকারীদের সাথে রুকূ‘ কর’ (সূরা বাক্বারাহ ২/৪৩)। অর্থাৎ জামা‘আতে সালাত আদায় কর। রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা বলেন,বান্দা যে সকল ইবাদত পালনের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করে তন্মধ্যে ফরয ইবাদত আমার নিকট অধিক প্রিয়’ (সহীহ বুখারী হা/৬৫০২; মিশকাত হা/২২৬৬)।

জামা‘আতে সালাত আদায় করার সময় কাতারে কেউ আগে-পিছে সরে থাকলে তাকে বরাবর হতে বলা, এমন কি নিজে কাছে গিয়ে কাতার সোজা করা ইমামের কর্তব্য। আর যতক্ষণ পর্যন্ত না কাতার পূর্ণ রুপে সোজা হয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত নামায শুরু করা উচিৎ নয়। (আলমুমতে’,শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৩/১৬)।ইমাম ছাড়া কম পক্ষে একজন নামাযী হলে জামাআত গঠিত হবে; চাহে সে নামাযী জ্ঞানসম্পন্ন শিশু হোক অথবা মহিলা।মহানবী (ﷺ) ইবনে আব্বাসকে নিয়ে জামাআত করে (তাহাজ্জুদ) নামায পড়েছেন।তিনি সফরে উদ্যত দুইজন লোককে বলেছিলেন, “নামাযের সময় উপস্থিত হলে তোমাদের একজন আযান দেবে এবং তোমাদের মধ্যে যে বড় সে ইমামতি করবে।” (সহীহ বুখারী ৬৩০)।

◾মুক্তাদীর সংখ্যা হিসাবে ইমাম ও মুক্তাদীর দাঁড়ানোর সঠিক পদ্ধতি হল:
_______________________________________
(১)। ইমামের সাথে মাত্র একজন মুক্তাদী (পুরুষ বা শিশু) হলে উভয়ে একই সাথে সমানভাবে দাঁড়াবে; ইমাম বাঁয়ে এবং মুক্তাদী হবে ডানে। এ ক্ষেত্রে ইমাম একটু আগে এবং মুক্তাদী একটু পিছনে আগাপিছা হয়ে দাঁড়াবে না। ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে মহানবী (ﷺ) নিজের বরাবর দাঁড় করিয়েছিলেন। (সহীহ বুখারী ৬৯৭)। মৃত্যুরোগের সময় তিনি আবু বাক্‌র (রাঃ)-এর বাম পাশে তাঁর বরাবর এসে বসেছিলেন। (সহীহ বুখারী, ১৯৮) নাফে বলেন, একদা আমি কোন নামাযে আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাঃ)-এর পিছনে দাঁড়ালাম,আর আমি ছাড়া তাঁর সাথে অন্য কেউ ছিল না। তিনি আমাকে তাঁর হাত দ্বারা তাঁর পাশাপাশি বরাবর করে দাঁড় করালেন।’ (মালেক, মুঅত্তা ১/১৫৪)। অনুরুপ বর্ণিত আছে হযরত উমার (রাঃ) কর্তৃকও। এ জন্যই ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে উক্ত বিষয়ক পরিচ্ছেদ বাঁধার সময় বলেন, ‘দুজন হলে (মুক্তাদী) ইমামের পাশাপাশি তার বরাবর ডান দিকে দাঁড়াবে।’ (সহীহ বুখারী ৬৯৭, সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ২৫৯০ নং, ৬/১৭৫-১৭৬) জ্ঞাতব্য যে, একক মুক্তাদীর ইমামের ডানে দাঁড়ানো সুন্নত বা মুস্তাহাব। অর্থাৎ যদি কেউ ইমামের বামে দাঁড়িয়ে নামায শেষ করে,তাহলে ইমাম-মুক্তাদী কারো নামাযের কোন ক্ষতি হবে না। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৩৭৫, সালাতুল জামাআতি হুকমুহা অআহকামুহা, ডক্টর সালেহ সাদলান ১১১পৃ:)।

(২)। মুক্তাদী ২ জন বা তার বেশী (পুরুষ) হলে ইমামের পশ্চাতে কাতার বাঁধবে।জাবের (রাঃ) বলেন, একদা মহানবী (ﷺ) মাগরিবের নামায পড়ার জন্য দাঁড়ালেন। এই সময় আমি এসে তাঁর বাম দিকে দাঁড়ালাম। তিনি আমার হাত ধরে ঘুরিয়ে তাঁর ডান দিকে দাঁড় করালেন। ইতিমধ্যে জাব্বার বিন সাখার (রাঃ) এলেন। তিনি তাঁর বাম দিকে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি আমাদের উভয়ের হাত ধরে ধাক্কা দিয়ে তাঁর পশ্চাতে দাঁড় করিয়ে দিলেন।(সহীহ মুসলিম, আবূদাঊদ, সুনান, মিশকাত ১১০৭) উল্লেখ্য
যে,দুই জন মুক্তাদী যদি ইমামের ডানে-বামে দাঁড়িয়ে নামায পড়ে তাহলে নামাযের কোন ক্ষতি হবে না। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৩৭০)। নামায হয়ে যাবে, কারণ ইবনে মাসঊদ আলক্বামাহ্‌ ও আসওয়াদের মাঝে দাঁড়িয়ে ইমামতি করেছেন এবং তিনি নবী (ﷺ) কে ঐরুপ দাঁড়াতে দেখেছেন।(আবুদাঊদ, সুনান, ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ৫৩৮)। অবশ্য মহানবী (ﷺ) এর সাধারণ সুন্নাহ্‌ হল,তিন জন হলে একজন সামনে ইমাম এবং দুই জনের পিছনে কাতার বাঁধা। পক্ষান্তরে আগে-পিছে জায়গা না থাকলে তো এক সারিতে দাঁড়াতে বাধ্যই হবে।

(৩)। মুক্তাদী একজন মহিলা হলে (সে নিজের স্ত্রী হলেও) ইমাম (স্বামীর) পাশাপাশি বরাবর না দাঁড়িয়ে তার পিছনে দাঁড়াবে। (আদাবুয যিফাফ, আলবানী ৯৬পৃ: দ্র:)।

(৪)। মুক্তাদী দুই বা ততোধিক পুরুষ হলে এবং একজন মহিলা হলে, ইমামের পিছনে পুরুষরা কাতার বাঁধবে এবং মহিলা সবশেষে একা দাঁড়াবে। একদা হযরত আনাস (রাঃ)-এর ঘরে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইমামতি করেন। আনাস (রাঃ) ও তাঁর ঘরের এক এতীম দাঁড়ান নবী (ﷺ) এর পিছে এবং তাঁর আম্মা দাঁড়ান তাঁদের পিছে (একা)। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ১১০৮-১১০৯নং)

(৫)। মুক্তাদী একজন শিশু ও একজন বা একাধিক পুরুষ হলে শিশুও পুরুষদের কাতারে শামিল হয়ে দাঁড়াবে।

(৬)। মুক্তাদী দুই বা দুয়ের অধিক পুরুষ, শিশু ও মহিলা হলে, ইমামের পিছনে পুরুষরা, অতঃপর শিশুরা এবং সবশেষে মহিলারা কাতার বাঁধবে।মহানবী (ﷺ) বলেন, “পুরুষদের শ্রেষ্ঠ কাতার হল প্রথম কাতার এবং নিকৃষ্ট কাতার হল সর্বশেষ কাতার। আর মহিলাদের শ্রেষ্ঠ কাতার হল সর্বশেষ কাতার এবং নিকৃষ্ট কাতার হল প্রথম কাতার।” (মুসলিম, আহমাদ, মুসনাদ, সুনানু আরবাআহ (আবূ দাঊদ, তিরমিযী,ও ইবনে মাজাহ্‌ মিশকাত ১০৯২) প্রকাশ থাকে যে,শিশু ছেলেদের পৃথক কাতার করার কোন সহীহ দলীল নেই। তাই শিশু ছেলেরাও পুরুষদের সঙ্গে কাতার করতে পারে। (তামামুল মিন্নাহ্‌, আলবানী ২৮৪পৃ:)।

(৭)। ইমামের সামনে কাতার বেঁধে নামায হয় না। অবশ্য ভিড়ের সময় ইমামের সামনে ছাড়া কোন দিকে জায়গা না থাকলে নিরুপায় অবস্থায় নামায হয়ে যাবে (আলমুমতে’,শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৩৭২-৩৭৩) প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে, জুমুআহ ও ঈদের নামাযের জামাআতে যদি এত ভিঁড় হয় যে সিজদার জন্য জায়গা না পাওয়া যায়, তাহলে সামনের মুসল্লীর পিঠে সিজদা করে নামায সম্পন্ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জায়গা নেই বলে অপেক্ষা করে দ্বিতীয় জামাআত কায়েম করা যাবে না। একদা হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) খুতবায় বলেন,‘ভিঁড় বেশী হলে তোমাদের একজন যেন অপরজনের পিঠে সিজদা করে।’ (আহমাদ, মুসনাদ ১/৩২, বায়হাকী ৩/১৮২-১৮৩, আব্দুর রাযযাক, মুসান্নাফ ৫৪৬৫, ৫৪৬৯নং, তামামুল মিন্নাহ্‌, আলবানী ৩৪১পৃ:)।

(৮)। ইমামের নিকটবর্তী দাঁড়াবে জ্ঞানী লোকেরা। যাতে তাঁরা ইমামের কোন ভুল চট করে ধরে দিতে পারেন এবং ইমাম নামায পড়াতে পড়াতে কোন কারণে নামায ছাড়তে বাধ্য হলে তাঁদের কেউ জামাআতের বাকী কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। বলা বাহুল্য, সাধারণ মূর্খ মানুষদের ইমামের সরাসরি পশ্চাতে দাঁড়ানো উচিৎ নয়। জ্ঞানী (আলেম-হাফেয-ক্বারী) মানুষদের জন্য ইমামের পার্শ্ববর্তী জায়গা ছেড়ে রাখা উচিৎ।মহানবী (ﷺ) বলেন, “সেই লোকদেরকে আমার নিকটবর্তী দাঁড়ানো উচিৎ,যারা জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান লোক। অতঃপর তারা যারা তাদের চেয়ে কম জ্ঞানের। অতঃপর তারা যারা তাদের থেকে কম জ্ঞানের। আর তোমরা বাজারের ফালতু কথা (হৈচৈ) থেকে দূরে থাক।” (মুসলিম আবূদাঊদ, মিশকাত ১০৮৯)।

(৯)। সামনের কাতারে জায়গা থাকতে পিছনে একাকী দাঁড়িয়ে নামায পড়লে নামায হয় না।এক ব্যক্তি কাতারের পিছনে একা দাঁড়িয়ে নামায পড়লে মহানবী (ﷺ) তাকে নামায ফিরিয়ে পড়তে বললেন। (আবু দাঊদ, সুনান ৬৮২, তিরমিযী, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান)।তিনি বলেন,“যে ব্যক্তি কাতারের পিছে একা নামায পড়ে, সে যেন নামায ফিরিয়ে পড়ে।” (ইবনে হিব্বান,সহীহ) অতএব যদি কোন ব্যক্তি জামাআতে এসে দেখে যে, কাতার পরিপূর্ণ, তাহলে সে কাতারে কোথাও ফাঁক থাকলে সেখানে প্রবেশ করবে। নচেৎ সামান্যক্ষণ কারো অপেক্ষা করে কেউ এলে তার সঙ্গে কাতার বাঁধা উচিৎ। সে আশা না থাকলে বা জামাআত ছুটার ভয় থাকলে (মিহ্‌রাব ছাড়া বাইরে নামায পড়ার সময়) যদি ইমামের পাশে জায়গা থাকে এবং সেখানে যাওয়া সম্ভব হয়, তাহলে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াবে এবং এ সব উপায় থাকতে পিছনে একা দাঁড়াবে না। পরন্তু কাতার বাঁধার জন্য সামনের কাতার থেকে কাউকে টেনে নেওয়া ঠিক নয়। এ ব্যাপারে যে হাদীস এসেছে তা সহীহ ও শুদ্ধ নয়।(যইফ জামে ২২৬১নং)।তাছাড়া এ কাজে একাধিক ক্ষতিও রয়েছে। যেমন: যে মুসল্লীকে টানা হবে তার নামাযের একাগ্রতা নষ্ট হবে, প্রথম কাতারের ফযীলত থেকে বঞ্চিত হবে, কাতারের মাঝে ফাঁক হয়ে যাবে, সেই ফাঁক বন্ধ করার জন্য পাশের মুসল্লী সরে আসতে বাধ্য হবে, ফলে তার জায়গা ফাঁক হবে এবং শেষ পর্যন্ত প্রথম বা সামনের কাতারের ডান অথবা বাম দিককার সকল মুসল্লীকে নড়তে-সরতে হবে। আর এতে তাদের সকলের একাগ্রতা নষ্ট হবে। অবশ্য হাদীস সহীহ হলে এত ক্ষতি স্বীকার করতে বাধা ছিল না। তদনুরুপ ইমামের পাশে যেতেও যদি অনুরুপ ক্ষতির শিকার হতে হয়,তাহলে তাও করা যাবে না। ঠিক তদ্রুপই জায়গা না থাকলেও কাতারের মুসল্লীদেরকে এক এক করে ঠেলে অথবা সরে যেতে ইঙ্গিত করে জায়গা করে নেওয়াতেও ঐ মুসল্লীদের নামাযের একাগ্রতায় বড় ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। সুতরাং এ কাজও বৈধ নয়।

বলা বাহুল্য, এ ব্যাপারে সঠিক ফায়সালা এই যে, সামনে কাতারে জায়গা না পেলে পিছনে একা দাঁড়িয়েই নামায হয়ে যাবে। কারণ, সে নিরুপায়। আর মহান আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে ভার দেন না। (লিকাউবাবিল মাফতূহ্‌,ইবনে উষাইমীন ২২৭পৃ:) প্রকাশ থাকে যে, মহিলা জামাআতের মহিলা কাতারে জায়গা থাকতে যে মহিলা পিছনে একা দাঁড়িয়ে নামায পড়বে তারও নামায পুরুষের মতই হবে না।(আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৩৮৭)। পক্ষান্তরে পুরুষদের পিছনে একা দাঁড়িয়ে মহিলার নামায হয়ে যাবে।

(১০)। ইমাম মুক্তাদী থেকে উঁচু জায়গায় দাঁড়াতে পারে না। কারণ মহানবী (ﷺ) কর্তৃক এরুপ দাঁড়ানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।(আবুদাঊদ,সুনান ৬১০-৬১১, হাকেম, মুস্তাদরাক, মিশকাত ১৬৯২, জামে ৬৮৪২) একদা হুযাইফা (রাঃ) মাদায়েনে একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে লোকেদের ইমামতি করতে লাগলেন। তা দেখে আবু মাসঊদ (রাঃ) তাঁর জামা ধরে টেনে তাঁকে নিচে নামিয়ে দিলেন। নামাযের সালাম ফেরার পর তিনি হুযাইফাকে বললেন, ‘আপনি কি জানেন না যে, এরুপ দাঁড়ানো নিষিদ্ধ?’ তিনি বললেন ‘জী হ্যাঁ, যখনই আপনি আমাকে টান দিলেন, তখনই আমার মনে পড়ে গেল।’ (আবুদাঊদ, সুনান ৫৯৭ ইবনে হিব্বান, সহীহ)।

অবশ্য শিক্ষা দেওয়ার জন্য উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে নামায পড়ানো যায়। যেমন নবী মুবাশ্‌শির (ﷺ) মিম্বরের উপর খাড়া হয়ে নামায পড়ে সাহাবাদেরকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। (বুখারী ৩৭৭নং, মুসলিম, সহীহ)। আর এই হাদীসকে ভিত্তি করেই উলামাগণ বলেন, মিম্বরের এক সিড়ি পরিমাণ (প্রায় একহাত) মত উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে ইমামতি করলে দোষাবহ্‌ নয়।(মাজমূআতু রাসাইল ফিস স্বালাহ্‌ ১০০পৃ:, আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৪২৪-৪২৬) পক্ষান্তরে মুক্তাদী ইমাম থেকে উঁচু জায়গায় দাঁড়াতে পারে। হযরত আবু হুরাইরা নিচের ইমামের ইক্তেদা করে মসজিদের ছাদের উপর জামাআতেনামায পড়েছেন। (শাফেয়ী, বায়হাকী, বুখারী তা’লীক)।

(১১)। প্রথম কাতারে দাঁড়িয়ে নামায পড়ার পৃথক মাহাত্ম আছে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, “লোকেরা যদি আযান ও প্রথম কাতারে নিহিত মাহাত্ম জানত, তাহলে তা অর্জন করার জন্য লটারি করা ছাড়া আর অন্য কোন উপায় না পেলে তারা লটারিই করত।” (বুখারী ৬১৫নং, মুসলিম, সহীহ ৪৩৭নং)। তিনি বলেছেন, “অবশ্যই আল্লাহ প্রথম কাতার ও সামনের কাতারসমূহের প্রতি রহ্‌মত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ তাদের জন্য দুআ করে থাকেন।” (মুসনাদে আহমাদ, সহিহ তারগিব,৪৮৯)
একদা তিনি সাহাবাদেরকে পশ্চাদপদ হতে দেখে বললেন, তোমরা অগ্রসর হও এবং আমার অনুসরণ কর। আর তোমাদের পিছনের লোক তোমাদের অনুসরণ করুক। এক শ্রেণীর লোক পিছনে থাকতে চাইবে, ফলে আল্লাহ তাদেরকে (নিজ রহ্‌মত থেকে) পিছনে ফেলে দেবেন।” (সহীহ মুসলিম, মিশকাত ১০৯০) আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, “কোন সম্প্রদায় প্রথম কাতার থেকে পিছনে সরে আসতে থাকলে অবশেষে আল্লাহ তাদেরকে জাহান্নামে পশ্চাদ্ববর্তী করে দেবেন।” অর্থাৎ জাহান্নামে আটকে রেখে সবার শেষে জান্নাত যেতে দেবেন, আর সে প্রথম দিকে জান্নাত যেতে পারবে না।(আউনুল মা’বূদ ২/২৬৪নং, আবূ দাউদ, ইবনে খুযাইমাহ্‌, ইবনে হিব্বান, সহীহ তারগীব ৫০৭)

(১২)। প্রথম কাতারে ডান দিকের জায়গা অপেক্ষাকৃত উত্তম। সাহাবী বারা বিন আযেব বলেন, ‘আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর ডান দিকে দাঁড়াবার চেষ্টা করতাম। যাতে তিনি আমাদের দিকে মুখ করে ফিরে বসেন।’ (মুসলিম, সহীহ ৭০৯, আবূদাঊদ, সুনান ৬১৫নং)।

(১৩)। ইমামের ডানে-বামে লোক যেন সমান-সমান হয়। অতএব কাতার বাঁধার সময় তা খেয়াল রাখা সুন্নত। যেহেতু ২ জন মুক্তাদী হলে এবং আগে-পিছে জায়গা না থাকলে একজন ইমামের ডানে ও অপরজন বামে দাঁড়াতে হয়। তাছাড়া ইমামের কাছাকাছি দাঁড়ানোরও ফযীলত আছে। সুতরাং সাধারণভাবে ইমামের ডান দিকে দাঁড়ানো উত্তম নয়। যেমন ইমামের বাম দিকে লোক কম থাকলে ডান দিকে দাঁড়ানো থেকে বাম দিকে দাঁড়ানো উত্তম। কারণ তখন বাম দিকটা ইমামের অধিক কাছাকাছি। পক্ষান্তরে ডানে-বামে যদি লোক সমান সমান থাকে,তাহলে বামের থেকে ডান দিক অবশ্যই উত্তম। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৩/১৯)।

(১৪)। (বিরল মাসআলায়) যদি কোন স্থান-কালে কোন জামাআতের দেহে সতর ঢাকার মত লেবাস না থাকে তাহলে ইমাম সামনে না দাঁড়িয়ে কাতারের মাঝে দাঁড়াবে। অবশ্য ঘন অন্ধকার অথবা মুক্তাদীরা অন্ধ হলে বিবস্ত্র ইমাম সামনে দাঁড়াবে। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৩৮৯) নোট সালাতে মুবাশ্বির আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
___________________________
উপস্থাপনায়,
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে সালাত আদায় করতেন

 প্রশ্ন: সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রাসূল (ﷺ) যেভাবে সালাত আদায় করতেন বিস্তারিত বর্ননা সহ জানতে চাই?

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পুরুষ-নারীন,ছোট-বড় নির্বিশেষে সকলের জন্যই বলেছেন, صَلُّوْا كَمَا رَأَيْتُمُوْنِيْ أُصَلِّيْ ‘তোমরা ঠিক সেভাবেই সালাত কর,যেভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখছ।’(সহীহ বুখারী, হা/৬৩১, ৬০০৮, ৭২৪৬) উক্ত হাদীসের আলোকে আমরা রাসূল (ﷺ) এর সালাত আদায়ের সঠিক পদ্ধতি তুলে ধরার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
.
সর্বপ্রথম সালাতের জন্য ওযু-গোসল করে পবিত্র হয়ে পরিচ্ছন্ন পোষাক ও দেহ-মন নিয়ে কা‘বা গৃহ পানে মুখ ফিরিয়ে মনে মনে সালাতের দৃঢ় সংকল্প করে স্বীয় প্রভুর সন্তুষ্টি কামনায় তাঁর সম্মুখে বিনম্রচিত্তে দাঁড়িয়ে যেতে হবে।কেননা সালাতের শুরুতে নিয়ত করা অপরিহার্য।আর সকল কাজ নিয়তের উপরে নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তাই-ই পাবে,যার জন্য সে নিয়ত করবে’ (সহীহ বুখারী: ১)। অতঃপর দুনিয়াবী সবকিছুকে হারাম করে দিয়ে স্বীয় প্রভুর মহত্ত্ব ঘোষণা করে বলবে ‘আল্লা-হু আকবার’ (আল্লাহ সবার চেয়ে বড়)’ বলে ‘তাকবীরে তাহরীমা’ সহ দু’হাত কান অথবা কাঁধ বরাবর উঠিয়ে বুকের উপর বাঁধবে। (মুসলিম হা/৯১২, ১/১৭০ পৃঃ, (ইফাবা হা/৭৬৯); বুখারী হা/৬৬৬৭, ২/৯৮৬ পৃঃ; মিশকাত হা/৭৯০)। এ সময় বাম হাতের উপরে ডান হাত কনুই বরাবর রাখবে অথবা বাম হাতের কব্জির উপরে ডান হাতের কব্জি রেখে বুকের উপরে হাত বাঁধবে। [সহীহ বুখারী হা/৭৪০, ১/১০২ পৃঃ, (ইফাবা হা/৭০৪, ২য় খন্ড, পৃঃ ১০২); নাসাঈ হা/৮৮৯, ১/১০২ পৃঃ; আবুদাঊদ হা/৭২৭, ১/১০৫ পৃঃ) জামা‘আতের সাথে সালাত আদায় করলে কাতারের মাঝে পরস্পরের পায়ের সাথে পা, টাখনুর সাথে টাখনু এবং কাঁধের সাথে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াবে।(আবু দাঊদ হা/৬৬৬, ১ম খন্ড, পৃঃ ৯৭, সনদ সহীহ; মিশকাত হা/১১০২, পৃঃ ৯৯)। সেই সাথে সিজদা বা তার এরিয়ার মধ্যে দৃষ্টি রাখবে।(মুস্তাদরাক হাকেম হা/১৭৬১; বায়হাক্বী, সনানুল কুবরা হা/১০০০৮)। অতঃপর সানা’ (الثناء) অর্থ ‘প্রশংসা’। এটা মূলতঃ ‘দো‘আয়ে ইস্তেফতা-হ’ (دعاء الاستفتاح) বা সালাত শুরুর দো‘আ। বুকে জোড় হাত বেঁধে সিজদার স্থানে দৃষ্টি রেখে বিনম্রচিত্তে নিম্নোক্ত দো‘আর মাধ্যমে মুসল্লী তার সর্বোত্তম ইবাদতের শুভ সূচনা করবে اَللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِىْ وَبَيْنَ خَطَايَاىَ كَمَا بَاعَدْتَ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ اَللَّهُمَّ نَقِّنِىْ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ اَللَّهُمَّ اغْسِلْ خَطَايَاىَ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَد. অনুবাদ: হে আল্লাহ! আপনি আমার ও আমার গোনাহ সমূহের মধ্যে এমন দূরত্ব সৃষ্টি করে দিন, যেমন দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে পরিচ্ছন্ন করুন গোনাহ সমূহ হতে,যেমন পরিচ্ছন্ন করা হয় সাদা কাপড় ময়লা হতে। হে আল্লাহ! আপনি আমার গুনাহ সমূহকে ধুয়ে সাফ করে দিন পানি দ্বারা,বরফ দ্বারা ও শিশির দ্বারা।’(বুখারী হা/৭৪৪, ১/১০২ পৃঃ, (ইফাবা হা/৭০৮, ২/১০৩ পৃঃ); মিশকাত হা/৮১২, পৃঃ ৭৭)। সানা পাঠ শেষ করে ‘আ‘ঊযুবিল্লাহি মিনাশ শায়ত্ব-নির রজীম মিন হামযিহী, ওয়া নাফখিহী ওয়া নাফছিহী। (আবু দাঊদ হা/৭৭৫, ১/১১৩ পৃঃ; তিরমিযী হা/২৪২) ও ‘বিসমিল্লা-হির রহমা-নির রহীম’ সহ সূরা ফাতিহা পাঠ করবে।(সহীহ বুখারী হা/৭৫৬, ১/১০৪ পৃঃ, (ইফাবা হা/৭২০, ২/১০৯ পৃঃ)। প্রকাশ থাকে যে, ‘আঊযুবিল্লাহ’ কেবল ১ম রাক‘আতে পড়বে।পরের রাক‘আতগুলো ‘বিসমিল্লা-হির রহমা-নির রহীম’ বলে সূরা ফাতিহা শুরু করবে। জেহরী-সির্রী উভয় সালাতে ‘বিসমিল্লাহ’ নীরবে পড়বে।(বুখারী হা/৭৪৩, ১/১০৩ পৃঃ. (ইফাবা হা/৭০৭, ২/১০৩ পৃঃ); মুসলিম হা/৯১৪; মিশকাত হা/৮২৪ ও ৮২৩) এবং ফাতিহা শেষে উচ্চৈঃস্বরে ‘আমীন’ বলবে। (বুখারী হা/৭৮০, ১ম খন্ড, পৃঃ ১০৭, (ইফাবা হা/৭৪৪ ও ৭৪৬, ২/১২১ পৃঃ)। জেহরী-সালাতে মুক্তাদীগণ ইমামের সাথে সাথে শুধু সূরা ফাতিহা পড়বে। (বুখারী হা/৭৫৬, ১/১০৪ পৃঃ, (ইফাবা হা/৭২০, ২/১০৯ পৃঃ) ক্বিরাআত শেষে ইমাম আমীন বলা শুরু করলে মুক্তাদীও তার সাথে মিলে এক সঙ্গে আমীন বলবে। (বুখারী হা/৭৮০, ১ম খন্ড, পৃঃ ১০৭, (ইফাবা হা/৭৪৪ ও ৭৪৬, ২/১২১ পৃঃ) উল্লেখ্য, ইমামের আমীন বলার আগেই মুক্তাদীর আমীন বলার যে অভ্যাস চালু তা বর্জন করতে হবে।

◾ক্বিরাআত: সূরা ফাতিহা পাঠ শেষে ইমাম হলে কিংবা মুসল্লী একাকী হলে প্রথম দু’রাক‘আতে কুরআন থেকে অন্য সূরা বা কিছু আয়াত পাঠ করবে। তবে মুক্তাদী হলে জেহরী সালাতে ইমামের সাথে সাথে শুধু সূরা ফাতিহা পড়বে। অতঃপর ইমামের ক্বিরাআত মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করবে। (বুখারী হা/৭৫৬, ১/১০৪ পৃঃ, (ইফাবা হা/৭২০, ২/১০৯ পৃঃ)। আর যোহর ও আসরের সালাতে ইমাম মুক্তাদী উভয়ে প্রথম দুই রাক‘আতে সূরা ফাতিহা সহ অন্য সূরা পড়বে। (ইবনু মাজাহ হা/৮৪৩, পৃঃ ৬১; সনদ ছহীহ, আলবানী, ইরওয়াউল গালীল হা/৫০৬, ২/২৮৮ পৃঃ)। আর শেষের দু’রাক‘আতে কেবল সূরা ফাতিহা পাঠ করবে। (বুখারী হা/৭৭৬, ১/১০৭ পৃঃ; মিশকাত হা/৮২৮, পৃঃ ৭৯)। অবশ্য মুক্তাদী প্রথম দুরাকাতে শুধু সূরা ফাতেহা পড়লেও সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ। (সহীহ বুখারী: ৭৫৬)।

◾রুকূ: ক্বিরাআত শেষে ‘আল্লা-হু আকবার’ বলে দু’হাত কান কিংবা কাঁধ পর্যন্ত উঠিয়ে ‘রাফ‘উল ইয়াদায়েন’ করে রুকূতে যাবে।(মুত্তাফাক্ব আলাইহ, সহীহ বুখারী হা/৭৩৫, ১ম খন্ড, পৃঃ ১০২)। হাঁটুর উপরে দু’হাতে ভর দিয়ে পিঠ ও মাথা সোজা রাখবে। এ সময় বাহুসহ দুই হাত ও হাঁটুসহ দুই পা শক্ত করে সোজা রাখবে।(মুসলিম হা/১১৩৮; মিশকাত হা/৭৯১; বুখারী হা/৮২৮; মিশকাত হা/৭৯২; আবুদাঊদ হা/৮৫৯)। আর নামাযে তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ হত সিজদার স্থানে। (মুস্তাদরাক, ইরওয়াউল গালীল,৩৫৪)। অতঃপর রুকূর দু‘আ পড়বে দোয়াটি হল سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيْمউচ্চারন: সুবহা-না রাব্বিয়াল আযীম।অর্থ:-আমি আমার মহান প্রতিপালকের পবিত্রতাঘোষণা করছি।এটি ৩ বার পাঠ করবে। (বুখারী হা/৭৯৪ ও ৮১৭; ইবনু মাজাহ হা/৮৮৮)। এছাড়া সাথে আরো দোয়া পড়তে পারেন দেখুন। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৮৭১)। নবী মুবাশ্‌শির (ﷺ) রুকূতে স্থিরতা অবলম্বন করতেন। এ ব্যাপারে তিনি নামায ভুলকারী সাহাবীকে আদেশও করেছেন। আর তিনি বলতেন, “তোমরা তোমাদের রুকূ ও সিজদাকে পরিপূর্ণরুপে আদায় কর। সেই সত্তার শপথ! যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে, আমি আমার পিঠের পিছন থেকে তোমাদের রুকু ও সিজদাহ করা দেখতে পাই। (সহীহ বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৮৬৮)।

◾কওমা: অতঃপর রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে প্রশান্তির সাথে দাঁড়াবে এবং কান বা কাঁধ বরাবর দুই হাত উঠিয়ে ‘রাফ‘উল ইয়াদায়েন’ করবে। (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, ছহীহ বুখারী হা/৭৩৫, ১ম খন্ড, পৃঃ ১০২) উক্ত কওমায় রাসূল( ﷺ) এরুপ খাড়া হতেন যে,মেরুদন্ডের প্রত্যেক (৩৩ খানা) হাড় নিজ নিজ জায়গায় ফিরে যেত। (বুখারী ৮২৮, আবূদাঊদ, সুনান, মিশকাত ৭৯২)। এ সময় ‘সামি‘আল্লা-হু লিমান হামিদাহ’ বলে দু‘আ পাঠ করবে। (বুখারী হা/৭৯৫)। তারপর বলবে رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ ‘রববানা লাকাল হাম্দ’ বলবে। অথবা বলবে رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ حَمْدًا كَثِيْرًا طَيِّبًا مُّبَارَكًا فِيْهِ ‘রববানা ওয়া লাকাল হাম্দু হাম্দান কাছীরান ত্বাইয়েবাম মুবা-রাকান ফীহি’। (বুখারী হা/৭৯৯; মিশকাত হা/৮৭৭)।সেই সাথে দুই হাত স্বাভাবিকভাবে ছেড়ে দিবে। (বুখারী হা/৮২৮, ১/১১৪ পৃঃ; মিশকাত হা/৭৯২)। উল্লেখ যে,বর্ণনা থেকে এ কথা বুঝা যায় যে, ইমাম ‘সামিআল্লাহু’ বললে মুক্তাদী ‘রাব্বানা অলাকালহাম্‌দ’ বলবে। তবে এখানে এ কথা নিশ্চিত নয় যে,মুক্তাদী ‘সামিআল্লাহু’ বলবে না। বরং মুক্তাদীও উভয় বাক্যই বলতে পারে। যেহেতু আল্লাহর নবী (ﷺ) উভয়ই বলেছেন। (দেখুন, মুসলিম, আবূদাঊদ,প্রভৃতি, মিশকাত ৭৯৩ সিফাতু স্বালাতিন নাবী (ﷺ), আলবানী ১৩৫-১৩৬পৃ:)
উল্লেখ্য যে,শাইখ ইবনে উসাইমীন ও বিন বাযসহ (রহঃ) কতিপয় বিদ্বানের অভিমত হ’ল ইমাম ‘সামি‘আল্লাহ’ এবং ‘রববানা’ ঊভয়টি বলবে। আর মুক্তাদী কেবল ‘রববানা লাকাল হামদ’ বললেই যথেষ্ট হবে (উসাইমীন,লিকাউল বাবিল মাফতুহ,৩২০/১; আল-মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়া ২৭/৯৩-৯৪)। তবে উভয়ের জন্য দু’টি বাক্য বলার বিষয়টিই সহীহ হাদীসের অধিক নিকটবর্তী (ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১৬২; আলবানী, ছিফাতু ছালাতিন্নবী ১৩৫ পৃ)।
.
◾সিজদা: অতঃপর ‘আল্লা-হু আকবর’ বলে প্রথমে দু’হাত ও পরে দু’হাঁটু মাটিতে রেখে সিজদায় যাবে ও দু‘আ পড়বে এই মর্মে হাদীসগুলো বেশি এবং সহীহ। (আবুদাঊদ হা/৮৪০, ১/১২২ পৃঃ; নাসাঈ হা/১০৯১, ১/১২৩ পৃঃ; মিশকাত হা/৮৯৯)। আবার প্রথমে হাঁটু রাখার হাদীসও বহু উলামার নিকট শুদ্ধ। তাই তাঁদের নিকট উভয় আমলই বৈধ। সুবিধামত হাত অথবা হাঁটু আগে রাখতে পারে নামাযী। (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ্‌ ২২/৪৪৯, ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ২/২৯১, উদ্দাহ্‌ ৯৬পৃ:)। এ সময় হাত দু’খানা ক্বিবলামুখী করে মাথার দু’পাশে কাঁধ বরাবর মাটিতে রাখবে।(আবুদাঊদ হা/৭৩৪, ১/১০৭ পৃঃ; তিরমিযী হা/২৭০, সনদ ছহীহ; মিশকাত হা/৮০১, পৃঃ ৭৬)।কপালের সাথে নাকটিকেও মাটি বা মুসাল্লার সঙ্গে লাগিয়ে দিতেন। (আবুদাঊদ, সুনান, ইরওয়াউল গালীল,৩০৯ )।হাতের আঙ্গুলগুলো মিলিয়ে রাখবে। (হাকেম হা/৮১৪;বালাগুল মারাম হা/২৯৭, সনদ সহীহ) কনুই উঁচু রাখবে ও বগল ফাঁকা রাখবে। (বুখারী হা/৮০৭, (ইফাবা হা/৭৭০, ২/১৩৫ পৃঃ), হাঁটু বা মাটিতে ঠেস দিবে না।(বুখারী হা/৮২২, (ইফাবা হা/৭৮৪, ২/১৪১ পৃঃ)। সিজদা লম্বা হবে ও পিঠ সোজা থাকবে। যেন নীচ দিয়ে একটি বকরীর বাচ্চা যাওয়ার মত ফাঁকা থাকে। (মুসলিম হা/১১৩৫; আবুদাঊদ হা/৮৯৮; মিশকাত হা/৮৯০, পৃঃ ৮৩)।দুই পা খাড়া করে এক সঙ্গে মিলিয়ে রাখবে।(সহীহ মুসলিম হা/১১১৮, ১/১৯২ পৃঃ, (ইফাবা হা/৯৭২) এ সময় আঙ্গুলগুলো ক্বিবলামুখী করে রাখবে। (বুখারী হা/৮২৮, ১/১১৪ পৃঃ; মিশকাত হা/৭৯২)।গোড়ালি দু’টিকে একত্রে মিলিয়ে রাখবে। (ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ ৬৫৪ নং,হাকেম, মুস্তাদরাক ১/২২৮)। অতঃপর سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى বলবে কমপক্ষে তিনবার বলবে। (ইবনু মাজাহ হা/৮৮৮; সনদ ছহীহ, ইরওয়াউল গালীল হা/৩৩৩) সিজদাতে পঠিতব্য আরো দু‘আ আছে। চাইলে পড়তে পারেন।(সহীহ মুসলিম,৪৮৩-৪৮৬) জেনে রাখা ভাল যে, ধীর-স্থিরভাবে সিজদাহ করা ওয়াজিব। তাড়াহুড়ো করে নামায শুদ্ধ হয় না। সিজদায় গিয়ে ধীরতা ও স্থিরতা অবলম্বন করে পিঠ সোজা না করলে এবং প্রত্যেক হাড় তার নিজের জোড়ে স্থিরভাবে বসে না গেলে মুরগীর দানা খাওয়ার মত নামায পড়া হয় ও নামায চুরি করা হয়। আর সিজদায় পিঠ সোজা না করলে নামাযও বাতিল পরিগণিত হয়। সিজদা থেকে উঠে বাম পায়ের পাতার উপরে বসবে ও ডান পায়ের পাতা খাড়া রাখবে। (বুখারী, বায়হাকী, সিফাতু স্বালাতিন নাবী (ﷺ), আলবানী ১৫১পৃ:)। আর এই পায়ের আঙ্গুল গুলোকে কেবলামুখী করে রাখতেন। (সহিহ, নাসাঈ, সুনান ১১০৯ )। আবার কখনো কখনো রাসূল (ﷺ) এই বৈঠকে দুই পায়ের পাতাকে খাড়া রেখে পায়ের দুই গোড়ালির উপর বসতেন। এই প্রকার বৈঠক প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, ‘এরুপ বসা সুন্নত।’ (মুসলিম, সহীহ ৫৩৬ আবূদাঊদ, ৮৪৫)।এ সময় প্রশান্তির সাথে বসবে এবং বলবেاَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِىْ وَارْحَمْنِىْ وَاجْبُرْنِىْ وَاهْدِنِىْ وَعَافِنِىْ وَارْزُقْنِىْ ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আমার উপরে রহম করুন, আমার অবস্থার সংশোধন করুন, আমাকে সৎপথ প্রদর্শন করুন, আমাকে সুস্থতা দান করুন ও আমাকে রূযী দান করুন।’(তিরমিযী হা/২৮৪, ১/৬৩ পৃঃ; আবুদাঊদ হা/৮৫০, ১/১২৩ পৃঃ; মিশকাত হা/৯০০; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৮৪০, ২/৩০১ পৃঃ)।প্রকাশ থাকে যে, এই বৈঠকে আঙ্গুল ইশারা করার হাদীস সহীহ নয়।(মুখালাফাত ফিত্বাহারাতি অসস্বালাহ্‌ ৮২পৃ)। অতঃপর ‘আল্লা-হু আকবর’ বলে দ্বিতীয় সিজদায় যাবে ও দু‘আ পড়বে। ২য় ও ৪র্থ রাক‘আতে দাঁড়ানোর সময় সিজদা থেকে উঠে শান্তভাবে বসবে। দ্বিতীয় সিজদাহ্‌ থেকে মাথা তুলে নবী মুবাশ্‌শির (ﷺ) পুনরায় বাম পায়ের উপর সোজা হয়ে বসে যেতেন। এতে তাঁর প্রত্যেক হাড় নিজ নিজ জায়গায় ফিরে যেত।(সহীহ বুখারী ৬৭৭, ৮২৩)।এই বৈঠক-কে ‘জালসা-এ ইস্তিরাহাহ্‌’ আরামের বৈঠক বলা হয়। কারণ, এতে প্রথম ও তৃতীয় রাক্‌আত শেষ করে দ্বিতীয় ও চতুর্থ রাকআত শুরু করার পূর্বে একটু আরাম নেওয়া হয় তাই। অবশ্য সুন্নতের এই বৈঠকটি দুই সিজদার মাঝের বৈঠকের মত লম্বা হবে না। কেবল সোজা হওয়ার মত হাল্কা একটু বসতে হবে। তবে এতে পঠনীয় কোন যিক্‌র বা দুআ নেই। অতঃপর মাটিতে দু’হাত রেখে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। (বুখারী হা/৮২৩, ১/১১৩ পৃঃ, (ইফাবা হা/৭৮৫ ও ৭৮৬, ২/১৪১ পৃঃ); মিশকাত হা/৭৯৬) উল্লেখ্য যে,রুকূ ও সিজদায় কুরআন থেকে কোন আয়াত পড়বে না।(মুসলিম হা/১১০২; মিশকাত হা/৮৭৩)।
.
◾বৈঠক: ২য় রাক‘আত শেষ করার পর বৈঠকে বসবে। ১ম বৈঠক হলে কেবল ‘আত্তাহিইয়া-তু’ পড়বে। (মুসলিম হা/১১৩৮; মিশকাত হা/৭৯১; সিফাতু সালাতিন নাবী, পৃঃ ১৬০)। তারপর মাটির উপর দুই হাত রেখে ভর দিয়ে ৩য় রাক‘আতের জন্য দাঁড়িয়ে যাবে।(বুখারী হা/৮২৩, ১/১১৩ পৃঃ, (ইফাবা হা/৭৮৫ ও ৭৮৬, ২/১৪১ পৃঃ); মিশকাত হা/৭৯৬)আর যদি শেষ বৈঠক হয়, তবে ‘আত্তাহিইয়া-তু’ পড়ার পরে দরূদ, দু‘আয়ে মাসূরাহ পড়বে। (বুখারী হা/৮৩৫, ‘আযান’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৫০; মুসলিম হা/১৩৫৪)। যে বৈঠকের শেষে সালাম ফিরাতে হয়,তাকে শেষ বৈঠক বলে। এটি ফরয, যা না করলে সালাত বাতিল হয়। তবে ১ম বৈঠকটি ওয়াজিব, যা ভুলক্রমে না করলে সিজদায়ে সাহু ওয়াজিব হয়। ২য় রাক‘আত শেষে বৈঠকে বসবে। ১ম বৈঠকে বাম পায়ের পাতার উপরে বসবে এবং শেষ বৈঠকে ডান পায়ের তলা দিয়ে বাম পায়ের অগ্রভাগ বের করে নিতম্বের উপরে বসবে এবং ডান পা খাড়া রাখবে ও আঙ্গুলগুলো ক্বিবলামুখী করবে। (বুখারী হা/৮২৮, ১ম খন্ড, পৃঃ ১১৪, (ইফাবা হা/৭৯০, ২/১৪৪ পৃঃ); মিশকাত হা/৭৯২)।এ সময় আঙ্গুলগুলো সাধারণভাবে খোলা রাখবে।(আবুদাঊদ হা/৭৩০; মিশকাত হা/৮০১) জোড়-বেজোড় যেকোন সালাতের সালামের বৈঠকে নারী-পুরুষ সকলকে এভাবেই বাম নিতম্বের উপর বসতে হয়। একে ‘তাওয়ার্রুক’ (التورك) বলা হয়।(সহীহ ইবনু হিববান হা/১৮৬২,৬৭,৭৩; বুখারী হা/৮২৮)। বৈঠকের সময় বাম হাতের আঙ্গুল বাম হাঁটুর উপর ক্বিবলামুখী করে রাখবে। আর ডান হাতের বৃদ্ধা আঙ্গুল মধ্যমা আঙ্গুলের পিঠে রেখে মুষ্টিবদ্ধ করে শাহাদাত আঙ্গুল দ্বারা সালাম ফিরানোর আগ পর্যন্ত ইশারা করবে। (সহীহ মুসলিম হা/১৩৩৬, ১৩৩৮, ১/২১৬ পৃঃ) অন্য হাদীছে এসেছে, ৫৩-এর ন্যায় মুষ্টিবদ্ধ রেখে সালাম ফিরানোর আগ পর্যন্ত শাহাদাত অঙ্গুলি দ্বারা ইশারা করতে থাকবে।(সহীহ মুসলিম হা/১৩৩৮, ১/২১৬ পৃঃ, (ইফাবা হা/১১৮৬); মিশকাত হা/৯০৬) এ সময় শাহাদাত আঙ্গুলের দিকে দৃষ্টি রাখবে। (নাসাঈ হা/১২৭৫, ১১৬০, ১/১৩০ পৃঃ ও ১/১৪২ পৃঃ)। দুই তাশাহ্হুদেই ইশারা করবে। (বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা হা/২৯০৩; সনদ সহীহ, সিফাতু সালাতিন নবী, পৃঃ ১৫৯) সুতরাং দুআ শেষ না করা (সালাম ফিরার পূর্ব) পর্যন্ত তর্জনী হিলানো সুন্নত। যেহেতু দুআ সালাম ফিরার পূর্বেই শেষ হয়ে থাকে। (সিফাতু স্বালাতিন নাবী (ﷺ), আলবানী ১৫৮-১৫৯ পৃ:) নাবী (ﷺ),বলতেন, “অবশ্যই ঐ তর্জনী শয়তানের পক্ষে লোহা অপেক্ষা অধিক কষ্টদায়ক (খোঁচার দন্ড)। (আহমাদ, মুসনাদ ২/১১৯, বাযযার, মাক্বদিসী,প্রমুখ)।ইবনে উমার (রাঃ) বলেন,‘ঐ আঙ্গুলটি শয়তানের জন্য আঘাত-দন্ড। যে এইভাবে ইশারা করে,সে (নামাযে) উদাসীন হয় না।’ ‘আত্তাহিইয়া-তু’, ‘দরূদ’, দু‘আ মাসূরা ও অন্যান্য দু‘আ পড়া শেষ করে ডানে ও বামে ‘আসসালামু আলায়কুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ বলে সালাম ফিরাবে। (বুখারী হা/৮৩৪ ‘আযান’ অধ্যায়, অনুচ্ছে-১৪৯; মিশকাত হা/৯৪২, পৃঃ ৮৭)। উল্লেখ্য যে, প্রথম সালামের সাথে ‘ওয়া বারাকা-তুহু’ যোগ করা যায়। (আলবানী, সহীহ আবু দাঊদ হা/৯১৫, ১/১৪৩ পৃঃ; উল্লেখ্য যে, আবু দাঊদের কোন ছাপায় ‘ওয়া বারাকাতুহু’ অংশটুকু নেই। (আবুদাঊদ হা/৯৯৭)। উল্লেখ্য যে, সালাম ফিরার সময় হাত দ্বারা ইশারা বৈধ নয়। একদা সাহাবাদেরকে এমন ইশারা করতে দেখলে তিনি বললেন, “কি ব্যাপার তোমাদের? দুরন্ত ঘোড়ার লেজের মত করে হাত দ্বারা ইশারা করছ? যখন তোমাদের কেউ সালাম ফিরবে, তখন সে যেন তার (পার্শ্ববর্তী) সঙ্গীর প্রতি চেহারা ফেরায় এবং হাত দ্বারা ইশারা না করে।” অতঃপর সাহাবাগণ এরুপ ইশারা করা হতে বিরত হয়ে যান। অন্য এক বর্ণনায় আছে,তিনি বললেন,“তোমাদের প্রত্যেকের জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, (সালাম ফিরার সময়) হাত নিজ ঊরুর উপর রাখবে। অতঃপর ডানে ও বামে (উপবিষ্ট) ভাই-এর প্রতি সালাম দেবে।” (মুসলিম, সহীহ ৪৩১, আহমাদ, মুসনাদ, সিরাজ, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ ৭৩৩ ত্বাবারানীরানী, মু’জাম)। উক্ত হাদীসে ইঙ্গিত রয়েছে যে,জামাআতের নামাযে নামাযী সালাম দেয় পাশের নামাযীকে। কিন্তু একা নামাযে সালাম দেওয়া হয় ফেরেশতাকে। পরন্তু পাশের নামাযী সালাম ফিরলে তার জওয়াব দিতে হয় না। কারণ, সে সময় সকলেই একে অপরকে সালাম দিয়ে থাকে। অতএব জওয়াব থাকে তাতেই। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৩/২৮৮-২৮৯)। সালাম ফিরেই নামাযের কাজ শেষ হয়ে যায়। তবে খেয়াল রাখার বিষয় যে, যে তরতীব ও পর্যায়ক্রমে মহানবী (ﷺ) নামায ও তার সকল আমল সম্পন্ন করেছেন, সেই পর্যায়ক্রমেই নামায পড়া নামায শুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত অথবা ফরয। (ফিকহুস সুন্নাহ্‌ উর্দু ৯৫পৃ:)। সালাম ফিরিয়ে প্রথমে সরবে তিনবার বলবে أَسْتَغْفِرُ الله আস্তাগফিরুল্লা-হ’। অর্থাৎ আমি আল্লাহ নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। সেই সাথে বলবে اَللَّهُمَّ أَنْتَ السَّلاَمُ وَمِنْكَ السَّلاَمُ تَبَارَكْتَ يَا ذَا الْجَلاَلِ وَالْإِكْرَامِ. ‘হে আল্লাহ আপনিই শান্তি,আপনার থেকেই আসে শান্তি। বরকতময় আপনি, হে মর্যাদা ও সম্মানের মালিক।’ (সহীহ মুসলিম হা/১৩৬২, ১/২১৮ পৃঃ; মিশকাত হা/৯৬১)। এ সময় ইমাম হলে প্রত্যেক সালাতে ডানে অথবা বামে ঘুরে সরাসরি মুক্তাদীদের দিকে মুখ করে বসবে।(সহীহ বুখারী হা/৮৪৫, ১/১১৭ পৃঃ (ইফাবা হা/৮০৫, ২/১৫২ পৃঃ)। অতঃপর ইমাম মুক্তাদী সকলে সালামের পরের যিকির সমূহ পাঠ করবে। (বুখারী হা/৮৪৪, ১/১১৭ পৃঃ; মুসলিম হা/১৩৬৬, ১/২১৮ পৃঃ; মিশকাত হা/৯৬২)।সালাম ফিরানোর পর পরই দ্রুত উঠে যাবে না। এটা বদ অভ্যাস। (আহমাদ হা/২৩১৭০; সনদ সহীহ, সিলসিলা সহীহাহ হা/২৫৪৯)। বরং এ সময় ‘আয়াতুল কুরসী’সহ অন্যান্য দু‘আ পাঠ করবে। (নাসাঈ, আল-কুবরা হা/৯৯২৮, ৬/৩০ পৃঃ; সনদ সহীহ, সিলসিলা ছহীহাহা হা/৯৭২)।দেশের অধিকাংশ মসজিদে ফরয সালাতের সালাম ফিরানোর পর পরই দুই হাত তুলে প্রচলিত সম্মিলিত মুনাজাত করা হয়। অথচ এই প্রথার শারঈ কোন ভিত্তি নেই। জমহুর ওলামাদের বিশুদ্ধ মত, এভাবে সম্মিলিত মুনাজাত করা বিদআত।বরং সবাই নিজের মত করে কুরআন সুন্নাহর দোয়াগুলো পড়বে।(ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়েমাহ, ৭/১০৩-১০৫ পৃ. ফৎওয়া নং-৩৫৫২ এবং ৫৭৬৩)।
___________________________
উপস্থাপনায়,
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Translate