Saturday, September 3, 2022

জীবনের যে কোনও ক্ষেত্রে সফলতা লাভের জন্য করণীয় আমল ও দুআ

 প্রশ্ন: কোনও কাজে ব্যর্থ হলে বা উদ্দেশ্য সাধনে বিলম্ব হলে- এ অবস্থায় এমন কোনও দুআ বা আমল আছে কি যা করলে সফল হওয়া যায়?

উত্তর: জীবনের যে কোনও ক্ষেত্রে সফলতা অর্জনের পূর্বশর্ত হল, সঠিক সময়ে সঠিক পদ্ধতিতে সু পরিকল্পিতভাবে কঠোর অধ্যবসায়, পরিশ্রম ও সাধনা করা। পাশাপাশি আল্লাহর উপর ভরসা করা এবং তাঁর সাহায্য ও দয়া লাভ করা।
শুধু চেষ্টা-পরিশ্রম দ্বারা প্রত্যাশিত সফলতা আশা করা যায় না যদি না মহান আল্লাহ তাঁর রহমত ও সাহায্য দ্বারা সিক্ত করেন। অনুরূপভাবে সফলতা লাভের জন্য কেবল আল্লাহর দয়ার আশায় হাত গুটিয়ে বসে থাকাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ, মহান আল্লাহ মানুষকে শ্রম নির্ভর করেই সৃষ্টি করেছেন।

◆ আল্লাহ তাআলা বলেন,

لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي كَبَدٍ

“নিশ্চয় আমি মানুষকে শ্রমনির্ভররূপে সৃষ্টি করেছি।” [সূরা বালাদ: ৪]

◆ তিনি আরও বলেন,

وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ

“এবং মানুষ তাই পায়, যা সে করে।” [সূরা নাজম: ৩৯]

◆ দুনিয়াবি ক্ষেত্রে সফলতা লাভ করার জন্য যেমন কষ্ট-পরিশ্রম করা জরুরি তেমনি আল্লাহর নৈকট্য হাসিল ও তাঁর সান্নিধ্য লাভের জন্যও প্রয়োজন কষ্ট ও পরিশ্রম। তাই তো আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الْإِنسَانُ إِنَّكَ كَادِحٌ إِلَىٰ رَبِّكَ كَدْحًا فَمُلَاقِيهِ

“হে মানুষ, তোমাকে তোমার পালনকর্তা পর্যন্ত পৌঁছতে কষ্ট স্বীকার করতে হবে। অতঃপর তার সাক্ষাৎ ঘটবে।” [সূরা ইনশিকাক: ৬]

◆ তবে পরিশ্রম করার পর আল্লাহর উপর ভরসা করাও অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ ۖ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
“কাজে-কর্মে তাদের পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তা’আলার উপর ভরসা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর উপর ভরসা কারীদেরকে ভালবাসেন।” [সূরা আল-ই ইমরান: ১৫৯]

এ বিষয়ে আরও বহু আয়াত রয়েছে।

◆ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

عن عمر بن الخطاب رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه قال: «لو أنكم كنتم توَكَّلُون على الله حق توَكُّلِهِ لرزقكم كما يرزق الطير، تَغْدُو خِمَاصَاً، وتَرُوحُ بِطَاناَ»

উমর ইবনুল খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “তোমরা যদি যথার্থভাবে আল্লাহ তাআলার ওপর তাওয়াককুল (ভরসা) করতে তাহলে তিনি পাখিদের যেভাবে রিজিক দেন সেভাবে তোমাদেরও রিজিক দিতেন। পাখিরা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।” [সহীহ-এটি তিরমিযি ও ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন]

এখানে লক্ষণীয় বিষয় যে, পাখিরা পেটে ক্ষুধা নিয়ে অলসতা করে বাসায় বসে থাকে না বরং তারা রোদ-বৃষ্টি, ঝড়, ঠাণ্ডা ও প্রতিকুল পরিবেশেও আল্লাহর উপর ভরসা করে রিজিকের সন্ধানে বের হয়, দীর্ঘ পথ উড়ে যায়, শিকারির ফাঁদে পড়ে জীবন নাশের ঝুঁকি নেয়। তারপর আল্লাহ তাদেরকে রিজিকের ব্যবস্থা করে দেন। ফলে তারা সকালে খালি পেটে বের হলেও সন্ধ্যা তারা তাদের নীড়ে ফিরে আসে পরিতৃপ্ত হৃদয়ে উদর ভর্তি করে। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ কতই না উত্তম রিজিক দাতা!

সুতরাং মানুষও যদি জীবনে সফলতা লাভ করতে চায় তাকে কষ্ট-পরিশ্রম করতে হবে, দৌড়-ঝাঁপ করতে হবে, ঝুঁকি মাথায় নিতে হবে এবং পরম ধৈর্য ও নিষ্ঠা সহ কাজে লেগে থাকতে হবে। তাহলে হয়তো দয়াময় আল্লাহ তাকে সফলতা দান করবেন। আরবিতে একটা কথা প্রচলিত আছে, من جد وجد “যে চেষ্টা করে সে পায়।”

যাহোক, দুনিয়া কিংবা আখিরাত উভয় ক্ষেত্রে সফলতা লাভের অন্যতম শর্ত হল, চেষ্টা ও সাধনা, কষ্ট ও পরিশ্রম করা। কিন্তু পাশাপাশি আল্লাহর রহমতও প্রয়োজন। আল্লাহর দয়া ছাড়া কেউ সফলতা পাবে না। তা না হলে, কৃষক অক্লান্ত পরিশ্রম করে ফসল ফলানোর পরও অনেক সময় ঘরে ফসল তুলতে পারে না, অনেক দম্পতি একটি সন্তানের অপেক্ষায় নিদারুণ কষ্ট বুকে নিয়ে সারাটা জীবন অতিবাহিত করে দেয় কিন্তু তাদের স্বপ্ন পূরণ হয় না। তাই আল্লাহর রহমত ও সাহায্য প্রাপ্তির জন্য আমাদের করণীয় হল, যেসব কাজে আল্লাহর সাহায্য ও রহমত প্রাপ্তির আশা করা যায় সেগুলো বেশি পরিমাণে করা।

❑ জীবনে সফলতার জন্য আল্লাহর সাহায্য ও রহমত প্রাপ্তির কতিপয় আমল:

◍ ১. রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ। কেননা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, একবার দরুদ পাঠ করলে দয়াময় আল্লাহর পক্ষ থেকে দশটি রহমত অবতীর্ণ হয়। [সহিহ বুখারি]

◍ ২. বেশি বেশি ইস্তিগফার তথা আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহ মোচনের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। ইস্তিগফার করার বিনিময়ে আল্লাহ বান্দাকে নানাভাবে সাহায্য করেন। [দেখুন: সূরা নূহ: ৯-১]

◍ ৩. ঈমান ও তাকওয়া (আল্লাহ ভীতি) অবলম্বন। এটি আল্লাহর রহমত, বরকত ও হেদায়েত প্রাপ্তির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। [দেখুন: সূরা আরাফ: ৬৯]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আরও বলেন,

وَمَن يَتَّقِ ٱللَّهَ يَجۡعَل لَّهُۥ مِنۡ أَمۡرِهِۦ يُسۡر
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে (আল্লাহ ভীতি অবলম্বন করে), আল্লাহ তার কাজ সহজ করে দেন।” [সূরা তালাক: ৪]

◍ ৪. দুআ করা। দুআ কবুলের অধিক সম্ভাবনাময় সময় ও ক্ষেত্রগুলোতে সফলতা প্রার্থনা করে আল্লাহর কাছে দুআ করা। যেমন: সালাতের সেজদা অবস্থায়, আজান ও ইকামতের মাঝামাঝি সময়, জুমার দিন আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়ের মাঝে, ভোর রাতে, সফর অবস্থায়, রোজা অবস্থায়, যে কোনও নেকির কাজ করে তার ওসিলা দিয়ে দুআ করা, পিতামাতা ও নেককার লোকদের নিকট থেকে দুআ নেওয়া ইত্যাদি।

◍ ৫. কুরআন তিলাওয়াত শুনাও আল্লাহর রহমত প্রাপ্তির অন্যতম মাধ্যম। [দেখুন: সূরা আরাফ: ২০৪]

◍ ৬. আল্লাহর সাহায্য লাভের নিমিত্তে আল্লাহর নাম নিয়ে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে কাজ শুরু করা।

❑ এ ছাড়াও যা করণীয়:

◍ ৭. যে কোনও কাজ করার পূর্বে সুন্দরভাবে পরিকল্পনা করা।
◍ ৮. অভিজ্ঞজনদের পরামর্শ গ্রহণ করা।
◍ ৯. কাজ শুরুর পূর্বে ইস্তিখারার সালাত আদায় করা।
◍ ১০. কাজে একবার ব্যর্থ হলে, ধৈর্যহারা না হয়ে তা বারবার চেষ্টা করা। কবি বলেন, “এক বার না পারিলে দেখো শত বার।” দীর্ঘ সময় অবিরাম ধারায় পানির ফোটা পতনের ফলে শক্ত শীল খণ্ডেও গর্ত সৃষ্টি হতে পারে।
◍ ১১. এক পদ্ধতি সফলতা না আসলে ভিন্ন উপায় ও ভিন্ন পথ খোঁজা। কারণ অনেক সময় পদ্ধতি পরিবর্তনের ফলে সফলতা আসে।

◍ ১২. পাশাপাশি নিম্নোক্ত দুআ দুটি অধিক পরিমাণে পাঠ করা:
ক.
اللَّهمَّ لا سَهلَ إلَّا ما جَعَلتَه سَهلًا، وأنتَ تَجعَلُ الحَزْنَ إذا شِئتَ سَهلًا

উচ্চারণ: ‘আল্লা-হুম্মা লা-সাহলা ইল্লা মা জাআলতাহু সাহলা, ওয়া আনতা তাজআলুল হাযনা ইযা শি’তা সাহলা।”

অর্থ: “হে আল্লাহ, আপনি যা সহজ করে দেন তা ছাড়া কোনও কিছুই সহজ নেই। আর আপনি চাইলে পেরেশানি যুক্ত কাজও সহজ করে দেন।” [সহিহ ইবনে হিব্বান: ৯৭৪, হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেছেন, এই হদিসটি সহীহ।]

খ. অলসতা থেকে মুক্তির জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন। এমন একটি দুআ হল:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الهَمِّ وَالحَزَنِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ العَجزِ وَالكَسَلِ
وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الجُبنِ وَالبُخلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ غَلَبَةِ الدَّينِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ

উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা ইন্নী আঊযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হুযনি, ওয়া আউযুবিকা মিনাল আজযি ওয়াল কাসালি, ওয়া আউযুবিকা মিনাল জুবনি ওয়াল বুখলি, ওয়া আউযুবিকা মিন গলাবাতিদ দাইনি ওয়া ক্বাহরির রিজাল।

অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা থেকে আশ্রয় চাই। আমি আশ্রয় চাই অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, আপনার কাছে আশ্রয় চাই ভীরুতা ও কার্পণ্য থেকে, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই ঋণের বোঝা ও মানুষের রোষানল থেকে।” [বুখারি: ২৮৯৩]

সর্বোপরি, মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তাআলা বান্দার কখনো অকল্যাণ করেন না। যদি কোনও কাজে সফলতা না আসে তাহলে বুঝতে হবে, হয়ত এতেই তার জন্য কল্যাণ নিহিত আছে-যদিও মানুষ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে না জানার কারণে ব্যর্থতায় হা-হুতাশ ও কান্নাকাটি করে। কিন্তু মহাবিশ্বের মহাপরিচালক আল্লাহ তাআলা অবশ্যই জানেন, কিসে আমাদের কল্যাণ আর কিসে আমাদের অকল্যাণ রয়েছে। তাই কাজে সফলতা না আসলেও আল্লাহর প্রতি কু ধারণা পোষণ করা যাবে না, হতাশা ও অস্থিরতায় ভোগা যাবে না বরং আল্লাহর তাকদির ও ফয়সালার প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস পোষণ করতে হবে। এটিই হল, একজন একনিষ্ঠ বিশ্বাসী মুমিনের পরিচায়ক।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দুনিয়াও আখিরাতের সফলতা দান করুন এবং সব ধরণের অকল্যাণ ও অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন। আমিন। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

অসুস্থতা এবং প্রচণ্ড শারীরিক ক্লান্তির কারণে ঘুমিয়ে যাওয়ার ফলে ইশার সালাত পড়া না হলে তা কি পরের দিন কাজা করা যাবে

 প্রশ্ন: অসুস্থতা এবং প্রচণ্ড শারীরিক ক্লান্তির কারণে ঘুমিয়ে যাওয়ার ফলে ইশার সালাত পড়া না হলে তা কি পরের দিন কি কাজা করা যাবে?

উত্তর: লা-বা’স ত্বাহুর ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আপনাকে সুস্থতা দান করুন। আমিন।

এ ক্ষেত্রে করণীয় হল, যখনই ঘুম থেকে জাগ্রত হবেন তখনই কাল বিলম্ব না করে পাক-পবিত্র হয়ে যথারীতি ছুটে যাওয়া সালাত কাজা করে নিবেন। এটাই তার জন্য কাফফারা হয়ে যাবে। অর্থাৎ অনিচ্ছাবশত: ঘুমিয়ে যাওয়ার ফলে সালাত ছুটে যাওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলা গুনাহ লিখবেন না। এটা দয়াময় আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ।

◆ আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

مَنْ نَسِيَ صَلَاةً أَوْ نَامَ عَنْهَا فَكَفَّارَتُهَا أَنْ يُصَلِّيَهَا إِذَا ذَكَرَهَا

“যে ব্যক্তি সালাত আদায় করতে ভুলে যায়, বা সালাত আদায় না করেই ঘুমিয়ে পড়ে তার কাফফারা হল, যখনই স্মরণ হবে তখনই তা আদায় করে নেওয়া” [সহীহ মুসলিম]

◆ অন্য হাদিসে আনাস রা. হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

مَنْ نَسِىَ صَلاَةً فَلْيُصَلِّهَا إِذَا ذَكَرَهَا لاَ كَفَّارَةَ لَهَا إِلاَّ ذَلِكَ

“যে ব্যক্তি কোন নামাজ পড়তে ভুলে যায়, সে যেন তা স্মরণ হওয়া মাত্র পড়ে নেয়। এ ছাড়া তার জন্য আর অন্য কোন কাফফারা নেই।” [বুখারী ৫৯৭, মুসলিম ১৫৯৮]

◆ হাদিসে আরও এসেছে, ইমরান ইবনে হুসাইন রা. সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোন এক সফরে ছিলেন। সে সময় লোকেরা ফজরের সালাতের ওয়াক্তে ঘুমিয়ে ছিল। অতঃপর সূর্যের তাপে তাদের ঘুম ভাঙ্গে। তারা কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর সূর্য উপরে উঠে গেলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুয়াজ্জিনকে নির্দেশ দিলে মুয়াজ্জিন আযান দেন। অতঃপর তিনি প্রথমে ফজরের পূর্বের দুই রাকআত সুন্নত আদায় করেন এবং একামত দেওয়ার পর ফজরের ফরজ সালাত আদায় করলেন।”
[বুখারী, অধ্যায়: মানাকিব, অনুচ্ছেদ: ইসলামের নবুওয়তের নিদর্শনা বলী, হা/ ৩৫৭১), মুসলিম, অধ্যায়: মসজিদ সমূহ, অনুচ্ছেদ: ছুটে যাওয়া সালাত কাজা করা…]

অত:এব আপনি যদি ফজরের সময় জাগ্রত হন, তাহলে ফজরের সালাতের পূর্বে ইশার সালাত আদায় করে তারপর ফজর সালাত আদায় করবেন। ইচ্ছাকৃত ভাবে মোটেও বিলম্ব করা যাবে না। আপনি যদি অলসতা বা অবহেলা বশত: সে সময় না পড়ে তা দিনের বেলায় পড়েন তাহলে ইচ্ছাকৃত বিলম্বের কারণে আপনাকে গুনাহগার হতে হবে।

➤ অবশ্য যদি সূর্য উঠার এতটুকু পূর্বে জাগ্রত হোন যে, সে সময় কেবল ফজর সালাত আদায় করা সম্ভব হবে তাহলে, সে ক্ষেত্রে আগে ফজর সালাত আদায় করবেন। কারণ ওয়াক্তের সালাত ওয়াক্তে পড়াটাই জরুরি। তারপর ছুটে যাওয়া ইশার সালাত কাজা করবেন- যদিও তখন সূর্য উদিত হওয়া শুরু করে। কারণ অধিক বিশুদ্ধ মতে, সূর্য উদিত হওয়ার সময় সাধারণ নফল সালাত পড়া নিষিদ্ধ; কাজা বা বিশেষ কারণ বশত: সালাত নয়। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন। الله أعلم

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

ভালো মৃত্যুর জন্য দুআ এবং একটি ভয়ানক বিষয়

 প্রশ্ন: এভাবে দোয়া করা যাবে কি যে, হে আল্লাহ, আমার মৃত্যু যেন নামাজের সিজদারত অবস্থায় হয় বা রমজান মাসে হয়?

উত্তর: সালাতের সেজদা অবস্থায়, রমজানের রোজা অবস্থায়, কুরআন তিলাওয়াত রত অবস্থায়, হজ-ওমরা সফরে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শহর মদিনায় মৃত্যুর জন্য দুআ করা জায়েজ। কেননা এগুলো ‘হুসনুল খাতিমা’ বা ভালো মৃত্যুর জন্য দুআ। আর ভালো মৃত্যুর পরিণতিও ভালো আশা করা যায়।

◆ উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি এ বলে দুআ করতেন,
اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي شَهَادَةً فِي سَبِيلِكَ، وَاجْعَلْ مَوْتِي فِي بَلَدِ رَسُولِكَ صلى الله عليه وسلم
“হে আল্লাহ্‌, আমাকে তোমার রাস্তায় শাহাদাত লাভের তাওফিক দান কর এবং আমার মৃত্যু তোমার রাসূলের শহরে প্রদান কর।” [সহিহ বুখারি/ ১৮৯০, অধ্যায় ২৯/১৩]

◆ আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
‏ إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدٍ خَيْرًا اسْتَعْمَلَهُ ‏”‏ ‏.‏ فَقِيلَ كَيْفَ يَسْتَعْمِلُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ ‏”‏ يُوَفِّقُهُ لِعَمَلٍ صَالِحٍ قَبْلَ الْمَوْتِ- قال الترمذي: حسن صحيح، قال الشيخ الألباني
“আল্লাহ তাআলা যখন তার বান্দা সম্পর্কে কল্যাণের ইচ্ছা করেন তখন তাকে আমল করতে দেন। বলা হল, হে আল্লাহর রাসূল, কিভাবে তিনি তাকে আমল করতে দেন? তিনি বললেন, “মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাকে নেক আমলের তাওফিক দিয়ে দেন।” [সুনান তিরমিজি (ইফা) অধ্যায়: ৩৫/ তকদির, পরিচ্ছেদ: আল্লাহ তাআলা জান্নাতিদের জন্য এবং জাহান্নামিদের জন্য একটি কিতাব (রেজিস্টার) লিখে রেখেছেন।-সহিহ]

➧ ইবনে হাজার রহ. বলেন,
ومن ثم شرع الدعاء بالثبات على الدين وبحسن الخاتمة
“এখান থেকেই দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং হুসনুল খাতিমা বা ভালো মৃত্যুর জন্য দুআ করা শরিয়ত সম্মত হওয়ার বিষয়টি সাব্যস্ত হয়েছে।” [ফাতহুল বারী ১১/৪৯১]

➧ মাজমাউল আনহার গ্রন্থের লেখক বলেন,
وأعظم الحاجات سؤال حسن الخاتمة وطلب المغفرة
“সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হল, কল্যাণের উপর মৃত্যু এবং ক্ষমার জন্য দুআ করা।”

❑ বিষয়টি ভয়ানক:

যার যে অবস্থার উপর মৃত্যু হবে কিয়ামতের দিন তাকে সে অবস্থার উপর উঠানো হবে।

জাবির রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
يُبعَثُ كلُّ عبدٍ على ما مات عليه المُؤمِنُ على إيمانِه والمُنافِقُ على نِفاقِه
“প্রত্যেক বান্দাকে ঐ অবস্থায় কিয়ামতের দিন উঠানো হবে যে অবস্থার উপর সে মৃত্যু বরণ করেছে। মুমিনকে উঠানো হবে ঈমানের উপর এবং মুনাফিককে উঠানো হবে নিফাকির উপর।” [সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৭৩১৩]

➧ ইমাম নওবী রহ. উক্ত হাদিসে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “উক্ত হাদিসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মর্মে খরব দিচ্ছেন যে, প্রত্যেক বান্দাকে -চাই সে পুরুষ হোক অথবা নারী হোক-কিয়ামতের দিন ঐ অবস্থায় উত্তোলন করা হবে যে অবস্থায় উপর সে মৃত্যু বরণ করেছিল। সে যদি ভালো কাজ ও কল্যণের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে তাহলে কল্যাণের উপরই তাকে উঠানো হবে। আর অকল্যাণ ও খারাপিতে লিপ্ত থাকা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করলে সে অবস্থায় উঠানো হবে। এই কল্যাণ ও অকল্যাণের যত অর্থ ও রূপ আছে সবই এখানে প্রযোজ্য।
সুতরাং প্রতিটি মানুষের এই আগ্রহ থাকা উচিৎ, যেন ভালো অবস্থায় (উত্তম কর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা অবস্থায়) মৃত্যু তার মৃত্যু হয়।
উক্ত হাদিসে এ মর্মে বান্দাকে উৎসাহিত করা হয়েছে যে, সে যেন সদা সর্বদাই কল্যাণ ও আমলে সালেহ বা সৎকর্মে লিপ্ত থাকে। কেননা, কেউ জানে না, সে কখন মৃত্যু বরণ করবে।”

পরিশেষ দুআ করি, মহান আল্লাহ যেন, আমাদেরকে ইমান, আল্লাহভীতি ও সৎকর্মের উপরে এবং তার সন্তুোষভাজন হয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় হওয়ার তওফিক দান করেন এবং পাপাচাররত অবস্থায় অপমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন। আমিন।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

সালাতে হাত বাঁধার বিশুদ্ধ নিয়ম

 প্রশ্ন: সালাতে হাত বাঁধার বিশুদ্ধ নিয়ম কোনটি?নাভীর নিচে বাঁধতে হবে না-কি বুকের উপর?

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: সালাতে হাত বাঁধার নিয়মের ব্যাপারে সমাজে দু’টি পদ্ধতি চালু রয়েছে। যেমন, নাভীর নীচে হাত বাঁধা এবং বুকের উপর হাত বাঁধা। তবে নাভীর নীচে হাত বেঁধে সালাত আদায় করার পক্ষে যতগুলো বর্ণনা পেশ করা হয়, সেগুলো সবই ত্রুটিপূর্ণ। অর্থাৎ নাভীর নীচে হাত বাঁধার নিয়ম আমলযোগ্য নয়। বরং হাত বুকের উপর বাঁধার কথা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।সালাতে রাসূল (ﷺ) তাঁর দুই হাতের আংগুল সমূহ ক্বিবলামুখী খাড়াভাবে কাঁধ অথবা কান পর্যন্ত উঠিয়ে দুনিয়াবী সবকিছুকে হারাম করে দিয়ে স্বীয় প্রভুর মহত্ত্ব ঘোষণা করে ‘আল্লা-হু আকবার’ (আল্লাহ সবার চেয়ে বড়)’ বলে ‘তাকবীরে তাহরীমা’ দিয়ে দু’হাত কান অথবা কাঁধ বরাবর উঠিয়ে বুকের উপর বাঁধবে।(মুসলিম হা/৯১২, ১/১৭০ পৃঃ, (ইফাবা হা/৭৬৯); বুখারী হা/৬৬৬৭, ২/৯৮৬ পৃঃ; মিশকাত হা/৭৯০)। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন,রাসূল (ﷺ) বলেছেন-নিশ্চয় আমরা নবীদের দল। আমাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আমরা যেন দ্রুত ইফতার করি এবং দেরিতে সাহারী করি। আর সালাতের মধ্যে আমাদের ডান হাত বাম হাতের উপর যেন রাখি। (ইবনু হিববান হা/১৭৬৭; সনদ সহীহ, ছিফাতু ছালাতিন নাবী, পৃঃ ৮৭; ইবনু ক্বাইয়িম, তাহযীব সুনানে আবী দাঊদ ১/১৩০)।
.
সাহল বিন সা‘দ (রাঃ) বলেন, লোকদেরকে নির্দেশ দেওয়া হতো যেন তারা সালাতের সময় ডান হাত বাম হাতের উপরে রাখে। আবু হাযেম বলেন যে,সাহাবী সাহল বিন সা‘দ এই আদেশটিকে রাসূল (ﷺ)-এর দিকে সম্পর্কিত করতেন বলেই আমি জানি।’ (সহীহ বুখারী হা/৭৪০, ১/১০২ পৃঃ, ইফাবা হা/৭০৪, ২য় খন্ড, পৃঃ ১০২, ‘আযান’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৮৭, মিশকাত হা/৭৯৮, সালাতের বিবরণ’ অনুচ্ছেদ-১০)। ইমাম বুখারী (রহঃ) অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন, بَابُ وَضْعِ الْيُمْنَى عَلَى الْيُسْرَى সালাতের মধ্যে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা অনুচ্ছেদ।’ (সহীহ বুখারী ১/১০২ পৃঃ)।
.
ওয়ায়েল বিন হুজর (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাথে সালাত আদায় করলাম। এমতাবস্থায় দেখলাম যে, তিনি বাম হাতের উপরে ডান হাত স্বীয় বুকের উপরে রাখলেন।’ (সহীহ ইবনু খুযায়মা হা/৪৭৯; আবুদাঊদ হা/৭৫৫, ইবনু মাস‘ঊদ হ’তে; ঐ, হা/৭৫৯, ত্বাঊস বিন কায়সান হ’তে; সালাত’ অধ্যায়-২, সালাতে বাম হাতের উপর ডান হাত রাখা’ অনুচ্ছেদ-১২০)।

বুকে হাত বাঁধার তাৎপর্য:ত্বীবী বলেন, ‘হৃৎপিন্ডের উপরে বুকে হাত বাঁধার মধ্যে হুঁশিয়ারী রয়েছে এ বিষয়ে যে, বান্দা তার মহা পরাক্রান্ত মালিকের সম্মুখে দাঁড়িয়েছে হাতের উপর হাত রেখে মাথা নিচু করে পূর্ণ আদব ও আনুগত্য সহকারে,যা কোনভাবেই ক্ষুণ্ণ করা যাবে না’। (মির‘আত ৩/৫৯ পৃঃ, হা/৮০৪-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)।

◾এবার যুগ শ্রেষ্ঠ কয়েকজন আলেমের ফতোয়া লক্ষ করুনঃ
_______________________________________
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন,من السنة وضع كف اليمنى على كف اليسرى والرسغ والساعد فوق الصدر أثناء القراءة في القيام. দণ্ডায়মান অবস্থায় ক্বিরআত পাঠকালে ডান হাতকে বাম হাতের পাতা, কব্জি ও বাহুর উপর রেখে বুকের উপর হাত বাঁধা সুন্নাত।’ (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৬/৩৭০-৩৭২ পৃ.)।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন, সালাতের মধ্যে বাম হাতের উপর ডান হাত রাখা সুন্নাত। সাহল ইবনু সা‘দ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, كانَ النَّاسُ يُؤْمَرُوْنَ أنْ يَضَعَ الرَّجُلُ اليَدَ اليُمْنَى علَى ذِرَاعِهِ اليُسْرَى في الصَّلَاةِ قَالَ أَبُوْ حَازِمٍ لَا أَعْلَمُهُ إِلَّا يَنْمِي ذَلِكَ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ قَالَ إِسْمَاعِيْلُ يُنْمَى ذَلِكَ. ‘লোকদের নির্দেশ দেয়া হত যে,সালাতে প্রত্যেকে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখবে।’ আবু হাযিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, সাহল (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এ হাদীসটি নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করতেন বলেই জানি। ইসমাঈল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসটি নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতেই বর্ণনা করা হত।’ (সহীহ বুখারী, হা/৭৪০; মুওয়াত্তা মালিক, হা/৪৩৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৮৪৯)। এখন প্রশ্ন হল, হস্তদ্বয়কে কোথায় রাখতে হবে?বিশুদ্ধতার সর্বাধিক নিকটবর্তী ও অধিক গ্রহণযোগ্য মতানুযায়ী হস্তদ্বয়কে বুকের উপর রাখতে হবে, যা ওয়াইল ইবনু হুজর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর বর্ণিত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। তিনি বলেন, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর ডান হাত বাম হাতের উপর স্থাপন করে বুকের উপর রাখতেন। (সহীহ ইবনু খুযায়মাহ, হা/৪৭৯, ১/২৪৩ পৃ.; বুলূগুল মারাম, হা/২৭৫)। অন্যান্য হাদীসের তুলনায় এটিই বিশুদ্ধতার সর্বাধিক নিকটবর্তী। অপরদিকে নাভীর নিচে হস্তদ্বয়কে রাখার ব্যাপারে আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে যে আছার বর্ণিত হয়েছে, তা যঈফ। বরং ওয়াইল ইবনু হুজর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হাদীসই এর চেয়ে অধিক শক্তিশালী। (মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল ইবনে উসাইমীন, ১৩/৯৭ ও ৭৩ পৃ.; আশ-শারহুল মুমতি‘, ৩/৩৬-৩৭ পৃ.)।

ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, وَلَا شَيْءَ فِي الْبَابِ أَصَحُّ مِنْ حَدِيْثِ وَائِلِ بْنِ حُجْرٍ الْمَذْكُوْرِ فِيْ صَحِيْحِ ابْنِ خُزَيْمَةَ. হাত বাঁধা বিষয়ে সহীহ ইবনু খুযায়মাতে ওয়াইল ইবনু হুজর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হাদীসের চাইতে বিশুদ্ধতম কোন হাদীছ আর নেই।’ (নায়লুল আওত্বার, ৩/২৫ পৃ.)।

আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, যিরার উপর ডান হাত রাখার আদেশ থেকেও প্রমাণিত হয় যে, হাত বুকের উপরেই বাঁধতে হবে। নচেৎ তার নিচে ঐভাবে হাত রাখা সম্ভব নয়। তিনি আরো বলেন, ‘বুকের উপরে হাত বাঁধার পদ্ধতি সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত। আর এর বিপরীত হয় যঈফ, না হয় ভিত্তিহীন।’ (সিফাতু সালাতিন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, পৃ. ৮৮)। এছাড়া আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) আবু দাঊদের তাহক্বীক্বে বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীস সহীহ বলেছেন (হা/৭৫৯)। তিনি তাঁর ‘সিফাতু সালাতিন নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)’ গ্রন্থে হাত বাঁধা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে শিরোনাম দিয়েছেন, وضعهما على الصدر ‘বুকের উপর দু’হাত রাখা’। অতঃপর হাদীস উল্লেখ করে নিচে টীকা লিখেছেন। যা বন্ধনীর মধ্যে দেখানো হল। ‘নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাম হাতের পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর ডান হাত রাখতেন।’ (আবূ দাঊদ, হা/৭২৩, ৭২৬-৭২৭, ৭৫৫, ৭৫৯, ৯৫৭; নাসাঈ, হা/৮৮৭-৮৮৮; ইবনু মাজাহ, হা/৮০৯-৮১১)। এ বিষয়ে তিনি স্বীয় সাহাবীগণকেও আদেশ প্রদান করেছেন। (সহীহ বুখারী, হা/৭৪০; মুওয়াত্তা মালিক, হা/৪৩৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৮৪৯)। তিনি কখনো ডান হাত দ্বারা বাম হাত আঁকড়ে ধরতেন। (নাসাঈ, হা/৮৮৭-৮৮৮, দারাকুত্বনী)।
.
শায়খ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, বুকের উপর হাত বাঁধার বিষয়টি সুন্নাত থেকে প্রমাণিত। (সহীহ ইবনু খুযায়মাহ, হা/৪৭৯, ১/২৪৩ পৃ.; বুলূগুল মারাম, হা/২৭৫; ছিফাতু ছালাতিন নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), পৃ. ৬৯)। এর বিপরীতে নাভীর নিচে হাত বাঁধার বিষয়টি হয় যঈফ না হয় ভিত্তিহীন। সুনানু ইবনু মাজার ভাষ্যকার মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল হাদী আস-সিন্দী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, সুন্নাত অনুযায়ী হাত বাঁধার স্থান বুকের উপর ব্যতীত অন্য কোন স্থান নয়। পক্ষান্তরে সালাতের মধ্যে নাভীর নিচে হাতের পাতার উপর হাতের পাতা রাখা হাদীসটি সর্বসম্মতিক্রমে যঈফ।’ (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৫৯৯৫৭)।
.
উল্লেখ্য যে, বাম হাতের উপরে ডান হাত রাখা সম্পর্কে ১৮ জন সাহাবী ও ২ জন তাবিঈ থেকে মোট ২০টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ইবনু আব্দিল বার্র (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে এর বিপরীত কোন আমল বর্ণিত হয়নি এবং এটাই অধিকাংশ সাহাবী ও তাবিঈনের অনুসৃত পদ্ধতি (নায়লুল আওত্বার, ৩/২২ পৃ.; ফিক্বহুস সুন্নাহ, ১/১০৯ পৃ., কায়রো ১৪১২ হি./১৯৯২ খ্রি.)।পক্ষান্তরে নাভীর নিচে হাত বাঁধা সম্পর্কে আহমাদ, আবু দাঊদ, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ প্রভৃতি গ্রন্থে চারজন সাহাবী ও দু’জন তাবিঈ থেকে যে চারটি হাদীস ও দু’টি আছার বর্ণিত হয়েছে,সেগুলো সম্পর্কে মুহাদ্দিছীনের বক্তব্য হল, لَا يَصْلُحُ وَاحِدٌ مِنْهَا لِلْاِسْتِدْلَالِ ‘যঈফ হওয়ার কারণে এগুলোর একটিও দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়।’ (মির‘আতুল মাফাতীহ, ৩/৬৩ পৃ.; তুহফাতুল আহওয়াযী, ২/৮৯ পৃ.; ফিক্বহুস সুন্নাহ, পৃ,১০৯) বাজারে প্রচলিত ‘নামায শিক্ষা’ বইগুলোতে উক্ত যঈফ, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বর্ণনা দ্বারা নাভীর নীচে হাত বাঁধার দলীল পেশ করা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে মাওলানা আব্দুল মতিন প্রণীত ‘দলিলসহ নামাযের মাসায়েল’ একটি। উক্ত লেখক শুধু বানোয়াট বর্ণনাই পেশ করেননি, বরং রীতি মত সহীহ হাদীসের অপব্যাখ্যা করে রাসূল (ﷺ)-এর আমলকে যবাই করে নিজেদেরকে ‘প্রকৃত আহলে হাদীস’ বলে দাবী করেছেন। (দলিলসহ নামাযের মাসায়েল , পৃঃ ২৪) কথায় বলে ‘অন্ধ ছেলের নাম পদ্মলোচন’। কারণ অন্ধ মাযহাবের মরণ ফাঁদে পড়ে কেউ আহলে হাদীস পরিচয় ব্যক্ত করতে পারে না। এ জন্য ‘আহলে হাদীস’ পরিচয় দেয়ার সাহস হয় না। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)
___________________________
উপস্থাপনায়,
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

চেয়ারে বসে সালাত আদায়

 প্রশ্ন: চেয়ারে বসে সালাত আদায় করা যাবে কি? জৈনক আলেম বলেন বসে ফরজ সালাত আদায়ের ইমামতি করা যাবেনা উক্ত বক্তব্য কতটুকু সঠিক?

▬▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: সালাত আদায়ের অবস্থা সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমরা সালাতসমূহ ও মধ্যবর্তী সালাতের হেফাযত কর এবং আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠচিত্তে দাঁড়িয়ে যাও’ (সূরা বাক্বারাহ ২/২৩৮)। এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, একজন সুস্থ মানুষ ফরয সালাত দাঁড়িয়ে আদায় করবে। কারণ এটি সালাতের রুকন,যা ইচ্ছাকৃত বা ভুলক্রমে পরিত্যাগ করলে সালাত বাতিল হয়ে যাবে। বসে সালাত আদায় করলে সালাত হবে না। তবে নফল সালাত বসে আদায় করাতে কোন বাধা নেই। কিন্তু বসে নফল সালাত আদায়কারী দাঁড়িয়ে সালাত আদায়কারীর অর্ধেক সওয়াব পাবে। (সহীহ বুখারী হা/১১১৫; মিশকাত হা/১২৪৯)।
.
কিন্তু শরীয়তী ওজর থাকলে অসুস্থ বা মা‘যূর ব্যক্তি অসুস্থতা, শরীর দুর্বলতা বা অন্য কোন কারণে ইমাম যদি দাঁড়িয়ে নামায পড়াতে অক্ষম হয় তাহলে তার জন্য বসে ইমামতি করা বৈধ। এ ব্যাপারে সম্মানিত ফকীহদের মাঝে কোন দ্বিমত নাই। সবাই একমত।তবে এ ক্ষেত্রে মুক্তাদিগণ দাঁড়িয়ে তার অনুসরণ করবে না কি বসে অনুসরণ করবে ইমামের অবস্থার আলোকে তা নির্ধারিত হবে। কারণ রাসূল (ﷺ) ওযরের কারণে বসে সালাতে ইমামতি করেছিলেন। আর আবুবকর (রাঃ) তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে এবং অন্যান্য সাহাবীগণ তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে ইকতেদা করেছিলেন (সহীহ বুখারী হা/৬৮৭; মুসলিম হা/৪১৮; মিশকাত হা/১১৪৭)।
.
হুমায়দী বলেন, যখন ইমাম বসে সালাত আদায় করবে তখন তোমরা বসে সালাত আদায় কর। এই অবস্থা ছিল রাসূল (ﷺ) এর পূর্বের রোগের কারণে। এরপর রাসূল( ﷺ) বসে সালাত আদায় করেছেন এবং সাহাবীগণ তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করেছেন। তিনি তাদেরকে বসার আদেশ দেননি (সহীহ বুখারী হা/৬৮৯-এর সাথে সংযুক্ত; মির‘আত ৪/৮৯)।
.
নবী করীম (ﷺ) মৃত্যু অবধি তাঁর অধিকাংশ (নফল) সালাত বসে আদায় করেছেন। (সহীহ মুসলিম হা/৭৩২; নাসাঈ হা/১৬৫৬)।
.
রাসূল (ﷺ) একদা ঘোড়া থেকে পড়ে আহত হ’লে ফরয সালাতও বসে আদায় করেছেন।(সহীহ বুখারী হা/১১১৪; মুসলিম হা/৪১১; মিশকাত হা/১১৩৯)।
.
রাসূল (ﷺ) শেষ বয়সে অসুস্থ হয়ে পড়লে ফরয সালাত বসে আদায় করতেন। (সুনানে নাসাঈ হা/৭৯৭; আহমাদ হা/২৬১৫৬)।
.
ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, ‘কোন অসুস্থ ব্যক্তি বসে সালাত আদায় করলে দাঁড়িয়ে সালাত আদায়কারীর ন্যায় সওয়াব পাবে’ (আল-মাজমূ‘ ৪/৩১০)।
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন, أجمع أهل العلم على أن من لا يطيق القيام له أن يصلي جالساً- ‘বিদ্বানগণ এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, দাঁড়াতে অক্ষম ব্যক্তি বসে সালাত আদায় করবে’। (আল মুগনী ২/১০৬)।
.
ইমাম নববী (রহঃ) আরো বলেন, أجمعت الأمة على أن من عجز عن القيام في الفريضة صلاها قاعداً ولا إعادة عليه- ‘মুসলিম উম্মাহ এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছে যে, ফরয সালাতে দাঁড়াতে অক্ষম ব্যক্তি বসে সালাত আদায় করবে এবং তাকে পুনরায় সালাত ঘুরিয়ে পড়তে হবে না’ (মাজমূ‘ ৪/৩১০; ছালেহ মুনাজ্জিদ, ফাতাওয়া ইসলাম ১/৫০০৯, প্রশ্ন নং ৫০৬৮৪)।
.
বিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, সৌদি ফাতাওয়া বোর্ডের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেন, যে ব্যক্তি মাটি বা চেয়ারে বসে সালাত আদায় করবে তার জন্য আবশ্যক হ’ল- সে রুকূর তুলনায় সিজদায় বেশী মাথা নিচু করবে। আর তার জন্য সুন্নাত হ’ল রুকূ অবস্থায় তার দু’হাত হাঁটুতে রাখা। আর সিজদা অবস্থায় আবশ্যক হ’ল- সাধ্যমত হাত দু’টিকে মাটিতে রাখা। তাতে সক্ষম না হ’লে হাতদ্বয় হাঁটুর উপর রাখতে হবে। কারণ রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘আমি সাতটি অঙ্গের উপর সিজদা করতে আদিষ্ট হয়েছি- কপাল, দু’হাত, হাঁটুদ্বয় ও দু’পায়ের অগ্রভাগ।আর যে ব্যক্তি এতেও অপারগ হবে এবং চেয়ারে বসে সালাত আদায় করবে, তাতে কোন অসুবিধা নেই। (বুখারী হা/৮১২; মিশকাত হা/৮৮৭মাজমূ‘ ফাতাওয়া বিন বায ১২/২৪৫-২৪৬; ফাতাওয়া ইসলাম ১/৫০০৯, প্রশ্ন নং ৫০৬৮৪)।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি ‘আরবের আরেক শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন, অসুস্থ অবস্থায় চেয়ারে বসে সালাত আদায়ে কোন বাধা নেই। প্রথমতঃ দাঁড়িয়ে সালাত করতে হবে। না পারলে সালাতে বসার ন্যায় বসে আদায় করবে। তাতে অক্ষম হ’লে চারজানু হয়ে বসে। এতেও সক্ষম না হ’লে হাতে হেলান দিয়ে বসে সালাত আদায় করবে। আল্লাহকে সাধ্যমত ভয় করতে হবে। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَاتَّقُوا اللهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ ‘সুতরাং তোমরা সাধ্যানুযায়ী আল্লাহকে ভয় কর’ (তাগাবুন ৬৪/১৬) । তাছাড়া আল্লাহ আরও বলেন, لاَ يُكَلِّفُ اللهُ نَفْساً إِلاَّ وُسْعَهَا ‘আল্লাহ কোন ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না’ (বাক্বারাহ ০২/২৮৫; ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব ৩/১৮৪, ৫/১৮৪)।
.
উল্লেখ যে, ইমাম দাঁড়িয়ে সালাত শুরু করার পর যদি অসুস্থতার কারণে বসে সালাত আদায় করেন, তবে মুছল্লীরা বাকী সালাত দাঁড়িয়ে আদায় করবে।আর যদি এমন হয় যে, ইমাম প্রথম থেকেই বসে সালাত শুরু করেছে তাহল পেছনে মুক্তাদিগণও তার অনুসরণে প্রথম থেকে বসে সালাত আদায় করবে। (সহীহ বুখারী, হাদিস নম্বর ৬৫৩-৬৫৪)।
.
অতএব উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা প্রমানিত যে,অসুস্থ অবস্থায় ইমাম বসে সালাতে ইমামতি করতে পারবেন। জুতায় অপবিত্রতা না থাকলে জুতা পরিধান করে সালাত আদায় করা জায়েয। আনাস ইবনু মালেক (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নবী করীম (ﷺ,) কি তাঁর জুতা পরে সালাত আদায় করতেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ (সহীহ বুখারী হা/৩৮৬)। সুতরাং উক্ত মুফতি সাহেবের বক্তব্য ভিত্তিহীন সেটাও প্রমানিত। আশা করি উত্তরটি পেয়েছেন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
_____________________
উপস্থাপনায়,
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Translate