Saturday, February 5, 2022

ওয়াজ মাহফিলে বক্তৃতার জন্য বক্তার মধ্যে কী কী গুণ-বৈশিষ্ট্য থাকা আবশ্যক?

 ওয়াজ মাহফিলে বক্তৃতার জন্য বক্তার মধ্যে কী কী গুণ-বৈশিষ্ট্য থাকা আবশ্যক?

(বক্তা, শ্রোতা এবং মাহফিলের আয়োজক সকলের জানা জরুরি)
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
ওয়াজ মাহফিলে বক্তা নির্বাচন ও বক্তৃতার ক্ষেত্রে আমাদের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা খুবই শোচনীয়। এ ক্ষেত্রে চলছে চরম দুরাবস্থা ও ভয়াবহ শরিয়ত বহির্ভূত কার্যক্রম। তাই এ ব্যাপারে সর্বস্তরের মুসলিমদের সচেতন হওয়ার সময় এসেছে।
কারণ— আমাদের অজানা নয় যে, বর্তমান সময়ে কারও চাপার জোর, সুললিত কণ্ঠ, হাসানো, কাঁদানো, কৌতুক, ড্যান্স, অভিনয়, গান-গজল, ইত্যাদি দ্বারা মাহফিল জমানোর মত কৌশল, উস্কানি ও হুংকার মার্কা কথাবার্তা দিয়ে সাধারণ জনগণকে উত্তেজিত করার মত যোগ্যতা থাকলেই তিনি বিশাল বক্তা ও আন্তর্জাতিক মুফাসসিরে কুরআনে পরিণত হন। অনুরূপভাবে সার্টিফিকেট, পদবী, সুন্দর চেহারা, ইংরেজি বলার দক্ষতা থাকলে তিনি বিশাল আল্লামা!
মাহফিলগুলোতে বিদেশ থেকে আগত, রেডিও-টিভির ভাষ্যকার, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, ২৬ ইঞ্চি বক্তা, শিশু বক্তা, নারী থেকে পুরুষের রূপান্তরিত হওয়া বক্তা, নওমুসলিম বক্তা ইত্যাদি নানা অদ্ভুত উপাধি ও বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত বক্তার চাহিদা তুঙ্গে। যেন এগুলোই বক্তা নির্বাচনের মানদণ্ড! কিন্তু প্রকৃত পক্ষে বক্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে এগুলো আদৌ শরয়ী মানদণ্ডের মধ্যে পড়ে না।

যার কারণে— বিশাল বিশাল ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হচ্ছে, সেগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হচ্ছে, এ উপলক্ষে জমজমাট প্রচার-প্রচারণা চলছে, এলাকার যুবকদের মাঝে মাহফিল নিয়ে অনেক উত্তেজনা কাজ করে, মাহফিল উপলক্ষে এলাকায় বিরাজ করে উৎসবের আমেজ। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, এগুলো অধিকাংশই সামাজিক অনুষ্ঠান, বার্ষিক রুটিন ওয়ার্ক এবং অর্থ কালেকশনের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। ওয়াজ মাহফিল থেকে মানুষ প্রত্যাশিত উপকার লাভ করে না, সেগুলো থেকে হেদায়েতের আলো বিচ্ছুরিত হয় না এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সঠিক দিক নির্দেশনা মূলক বক্তব্য পাওয়া যায় না।

এর কারণ—অধিকাংশ ওয়াজ মাহফিল আয়োজন কারীদের নিয়ত ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সঠিক নয়। ফলে তারা বক্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে শরয়ী মানদণ্ড বিচার না করে মাহফিল জমানো ও আকর্ষণ সৃষ্টি করার মত বক্তা অনুসন্ধান করে। ফলশ্রুতিতে একশ্রেণীর তথাকথিত বাজারি ও পেশাদার বক্তা আরও দ্বিগুণ উৎসাহে মানুষকে কিভাবে আকর্ষণ করে স্টেজ মাতানো যায় সেই চেষ্টায় ব্যস্ত থাকে—যা খুবই দুর্ভাগ্য জনক এবং শরয়ী দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য।

যাহোক, নিম্নে আমরা ইসলামি আইন বিষয়ক বিশ্বকোষ ‘আল মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা আল কুয়েতিয়্যা’ থেকে ওয়ায়েজ বা ধর্মীয় বক্তার মধ্যে কী কী শর্তাবলী এবং শিষ্টাচার থাকা কর্তব্য সেগুলো উপস্থাপন করব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তওফিক দানকারী:

❑ ওয়াজ কারী বা বক্তার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে। যথা:

◈ এক. শরিয়তের বিধিবিধান আবশ্যিকভাবে অর্পিত হওয়ার মত উপযুক্ত হওয়া অর্থাৎ তিনি সুস্থ বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন এবং প্রাপ্ত বয়স্ক হবেন।
◈ দুই. ন্যায়-নীতি ও আদর্শবান হওয়া।
◈ তিন. মুহাদ্দিস হওয়া। অর্থাৎ তিনি হাদিস শাস্ত্রের সাথে গভীর সম্পর্ক রাখবেন, হাদিস পাঠ করবেন, হাদিসের শব্দাবলীর অর্থ বুঝবেন এবং তার শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখবেন-যদিও তা কোনও বড় মুহাদ্দিস অথবা কোনও ফিকহবিদের গবেষণালব্ধ তথ্যাদির ভিত্তিতে হয়।

◈ চার. মুফাসসির হওয়া। অর্থাৎ তিনি কুরআনের দুর্বোধ্য ও কঠিন শব্দাবলীর অর্থ জানবেন এবং (বাহ্যত) সমস্যাপূর্ণ বিষয়গুলোর সঠিক সমাধান জানবেন এবং সে সম্পর্কে পূর্বসূরি তাফসির কারকদের থেকে বর্ণিত তাফসির সম্পর্কে জ্ঞান রাখবেন।
– পাশাপাশি তার জন্য এমন বাগ্মী ও সুভাষী হওয়া উত্তম যে, তিনি মানুষের ধারণ ক্ষমতার বাইরে কথা বলবেন না। সেই সাথে তিনি হবেন নম্র, ভদ্র ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন।
– তিনি দীনের বিষয়গুলোকে মানুষের সামনে সহজভাবে উপস্থাপন করবেন; জটিলতা সৃষ্টি করবে না। [আবজাদুল উলুম ২/৫৩৬-প্রকাশনী: দারুল কুতুবুল ইলমিয়া]

❑ বক্তার কতিপয় শিষ্টাচার:

ওয়ায়েজ (বক্তা), আলেম এবং শিক্ষকের অন্যতম শিষ্টাচার হল, তিনি এমন সব কথাবার্তা, কার্যক্রম ও আচার-আচরণ পরিত্যাগ করবেন যা বাহ্যত ভুল মনে হয়- যদিও তিনি এ ক্ষেত্রে নির্ভুল হন। কারণ তিনি এমনটি করার কারণে (সাধারণ মানুষের মাঝে) বিভিন্ন সমস্যা ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। যেমন:

❂ কারও মধ্যে এমন বিষয় জানা গেলে অনেকেই ধারণা করে বসবে যে, এটা সর্বাবস্থায় জায়েজ। ফলে তা শরিয়তের বিধান বা আমল যোগ্য বিষয়ে পরিণত হবে- যে বিশেষ পরিস্থিতিতে তা করা হয়েছিলো তার মধ্যে তা সীমাবদ্ধ থাকবে না।
❂ বক্তা যদি নাজায়েজ কর্মে জড়িত হয় তাহলে মানুষ তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবে, তার সমালোচনা করবে এবং তার থেকে দূরে সরে যাবে।
❂ মানুষ তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা করে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে এবং মানুষকেও তার ব্যাপারে সাবধান করবে যেন তার থেকে কেউ ইলম গ্রহণ না করে।
❂ তার সাক্ষ্য ও বর্ণনা অগ্রহণযোগ্য হবে। তার দেওয়া ফতোয়ার আমল প্রত্যাখ্যাত হবে এবং তার ইলমি কথা-বার্তার ব্যাপারে মানুষের মন থেকে আস্থা চলে যাবে ইত্যাদি।

❑ ওয়াজ মাহফিলে অর্থ কালেকশন নাজায়েজ:

ফাতাওয়া হিন্দিয়াতে এসেছে, “বক্তার জন্য ওয়াজ মাহফিলে মানুষের কাছে কোনও কিছু চাওয়া জায়েজ নাই। কারণ তা ইলম এর মাধ্যমে দুনিয়া উপার্জন।” [ফাতাওয়া হিন্দিয়াহ ৫/৩১৯’
[উৎস: আল মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল কুয়েতিয়্যা বা কুয়েতি ফিকাহ বিশ্বকোষ, ৪৪/৮১-৮৩,অনলাইন ভার্সন-সংক্ষেপায়িত]
আল্লাহ তাআলা যেন, আমাদেরকে সবচেয়ে সঠিক ও সুন্দর পদ্ধতিতে আল্লাহর দীনের আহ্বানকে গণ মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়ার তাওফিক দান করেন আর আমরা যে সব হেদায়েতের কথা মানুষকে বলবো তা যেন কর্মে বাস্তবায়ন করতে পারি রাব্বুল আলামিনের নিকট সেই তাওফিক কামনা করি।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
লেখক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

যে মহিলার লম্বা চুল থাকবে কেয়ামতের দিন উক্ত চুল দ্বারা তার উলঙ্গ শরীর ঢাকা থাকবে। এ কথা কি সঠিক?

 প্রশ্ন: আমি অনেকবার শুনেছি যে, “যে মহিলার লম্বা চুল থাকবে কেয়ামতের দিন উক্ত চুল দ্বারা তার উলঙ্গ শরীর ঢাকা থাকবে।” এ কথার সত্যতা জানতে চাই।

উত্তর:
কিয়ামত দিবসের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। যেমন: আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে,
يُحْشَرُ النَّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلاً ‏
“কিয়ামতের দিন সকল মানুষকে একত্রিত করা হবে খালি পা, নগ্ন দেহ এবং খাতনা বিহীন অবস্থায়।”
এ কথা শুনে আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! পুরুষ এবং মহিলা এক সঙ্গেই উত্থিত হবে আর তারা পরস্পর একে অপরের প্রতি তাকাবে?
তিনি বললেন,
‏ يَا عَائِشَةُ الأَمْرُ أَشَدُّ مِنْ أَنْ يَنْظُرَ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ ‏‏ ‏
“হে আয়েশা, তখনকার অবস্থা এতো কঠিন ও ভয়ঙ্কর হবে যে, একে অপরের প্রতি তাকানোর কল্পনারও উদ্রেক হবে না।”
[সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ৫৩। জান্নাত, জান্নাতের নিয়ামত ও জান্নাতবাসীদের বর্ণনা, পরিচ্ছেদ: ১৪. দুনিয়ার নশ্বরতা ও কিয়ামতের বর্ণনা]
কিন্তু ‘কিয়ামতের দিন মহিলাদের মাথার লম্বা চুল দ্বারা তার উলঙ্গ শরীর ঢাকা থাকবে’-এমন কোন কথা হাদিসে বর্ণিত হয় নি।
কাতার ভিত্তিক ইসলামি প্রশ্নোত্তর বিষয়ক বিখ্যাত ওয়েব সাইট Islamweb এ বলা হয়েছে,
وأما القول بأنه يكون ساتراً لها يوم القيامة فلم نقف على دليل يدل عليه. والله أعلم
“কিয়ামতের দিন (মহিলাদের মাথার লম্বা চুল) তার দেহকে আবৃত করবে- এমন কথার পক্ষে আমরা কোনও দলিল জানতে পারি নি। আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।” [সূত্র: islamweb, ফতোয়া নং ৩৬৮৭৬]

– উল্লেখ্য যে, প্রয়োজন বোধে শর্ত সাপেক্ষে মহিলারা তাদের মাথার চুল খাটো করতে পারে। ইসলামি শরিয়তে এতে কোনও বাধা নেই।
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
(লিসান্স, মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সউদি আরব)।

বিয়েতে নারীর সাজসজ্জা: হালাল-হারাম

 প্রশ্ন: একজন মেয়ে বিয়েতে কোন কোন প্রসাধনী সামগ্রী ক্রয় ও ব্যবহার করতে পারবে? যেমন: স্নো, পাউডার, ক্রিম, আই লাইনার, মেকআপ, মাথায় টিপ পরা ইত্যাদি। আর ইসলামে নারীদের সাজগোজের ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়গুলো নিষিদ্ধ?

উত্তর:
মেয়েরা সৌন্দর্য অবলম্বনের জন্য যেকোনো ধরণের মেকআপ বা সাজগোজের উপকরণও প্রসাধনী সামগ্রী ব্যবহার করতে পারবে। শুধু সেটা নয় যেটাতে হারাম বস্তু (যেমন: শুকর বা হারাম প্রাণীর চর্বি) এর মিশ্রণ আছে বলে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ পাওয়া যাবে। এ্যালকোহল মিশ্রণ থাকলে তা ব্যবহার করা যাবে কি না তা দ্বিমত পূর্ণ। তবে বিকল্প থাকলে ব্যবহার না করাই নিরাপদ।

সুতরাং বিয়ে-শাদী অথবা যেকোনো হালাল উপলক্ষে তারা যেকোনো ধরণের প্রসাধনী ক্রয় ও ব্যবহার করতে পারবে। তবে শর্ত হল, সেগুলো ব্যবহার করে পর পুরুষের সামনে নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করা যাবে না। বরং কেবল স্বামী, নারী অঙ্গন বা মাহরাম পুরুষদের সামনে সেগুলো ব্যবহার করতে পারবে।

অনুরূপভাবে সৌন্দর্য চর্চা করতে গিয়ে এমন কোনও কিছু করা যাবে না যা ইসলামি শরিয়তে হারাম করা হয়েছে।

ইসলামে নারীদের সাজসজ্জার ক্ষেত্রে যেসব বিষয় হারাম সেগুলো হল:
১. ভ্রূ প্ল্যাক করা।
২. দাঁত চিকন করা।
৩. পরচুলা ব্যবহার করা।
৪. শরীরে উল্কি অংকন করা।
৫. চুলে কালো কলপ ব্যবহার করা।
৬. বাজনাদার নূপুর পরিধান করা।
৭. পরপুরুষদের নিকট গমনকালে সুগন্ধি দ্রব্য ব্যবহার করা।
৮. পুরুষদের জন্য নির্ধারিত জামা-কাপড় জুতা ইত্যাদি ব্যবহার করা।
৯. শরীরে উল্কি অঙ্কন করা।
১০. মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক বা হারাম উপাদান থেকে তৈরি কেমিক্যাল ও রং ব্যবহার করা।
১১. পরপুরুষের মাধ্যমে মেকআপ করা।
১২. এমন পাতলা পোশাক পরিধান করা যাতে তার চামড়া বোঝা যায়।
১৩. এমন টাইট-ফিট পোশাক পরিধান করা যাতে শরীরের বিভিন্ন গঠন ও আকৃতি ফুটে উঠে।
১৪. কাফের-ফাসেক নায়িকা বা মডেলদের অনুসরণ করা।
১৫. মাথার উপরে উঁচু করে চুলের খোঁপা বাঁধা
১৬. কৃত্রিম নখ, ভ্রূ, ও চোখে কালার লেন্স ব্যবহার করা।
১৭. হায়েজ না থাকলে এমন মেহেদি বা রং ব্যবহার করা যার ফলে ওজু-গোসলে শরীরে পানি পৌঁছুতে বাধাগ্রস্ত হয় ইত্যাদি। হায়েজ থাকলে এগুলো ব্যবহার করতে কোনও আপত্তি নাই।
আল্লাহু আলাম।
-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল-

ওজুতে সন্দেহ সৃষ্টি করা বা ওজু নষ্ট করার জন্য ‘ওয়ালহান’ নামক শয়তান নিযুক্ত থাকা সংক্রান্ত হাদিসটি সহিহ নয়

 ওজুতে সন্দেহ সৃষ্টি করা বা ওজু নষ্ট করার জন্য وَلْهَان ‘ওয়ালহান’ নামক শয়তান নিযুক্ত থাকার ব্যাপারে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞ হাদিস বিশারদগণের দৃষ্টিতে তা সহিহ নয়। সুতরাং জঈফ বা দুর্বল হাদিস দ্বারা এমন গায়েব (অদৃশ্য) বিষয়ের কোনও বিধান সাব্যস্ত করা সঙ্গত নয়।

নিম্নে এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদিসটি উল্লেখ পূর্বক সে সম্পর্কে বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের মতামত উপস্থাপন করা হল:

✪ হাদিসটি হল:
إنَّ للوُضوءِ شَيْطانًا يقالُ له: الوَلَهانُ، فاتَّقوا وَسْواسَ الماءِ
“ওজুর জন্য একটি শয়তান নির্ধারিত রয়েছে। এর নাম হল, ওয়ালহান। সুতরাং তোমরা পানির ব্যাপারে সন্দেহ প্রবণতা থেকে বেঁচে থাকবে।” [ইবনে মাজাহ, হা/৪২১, তিরমিজী, হা/৫-আল মাদানী প্রকাশনী]

✪ হাদিসটির মান: এটি জইফ (দুর্বল)

নিম্নে এ প্রসঙ্গে মুহাদ্দিসদের মতামত তুলে ধরা হল:

◈ ইমাম আবু ঈসা তিরমিযী রাহ. বলেন,

“উবাই ইবনে কাব রা. থেকে বর্ণিত এই হাদিসটি غريب
“হাদিস বিশারদগণের দৃষ্টিতে এ হাদিসটির সনদ শক্তিশালী এবং সহীহ নয়। কারণ, খারিজা ব্যতীত আর কেউ এটিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত মুসনাদ তথা অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় বর্ণনা করেছেন বলে আমাদের জানা নেই।”

তিনি আরও বলেন,
ولا يصح في هذا الباب عن النبي صلى الله عليه وسلم شيء ، وخارجة ليس بالقوي عند أصحابنا ، وضعفه ابن المبارك
“আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এই বিষয়ে সহীহ কিছু বর্ণিত নেই।
আমাদের সাথীদের (মুহাদ্দিসগণের নিকট) খারিজা শক্তিশালী রাবী (বর্ণনা কারী) বলে স্বীকৃত নন। ইবনে মুবারক তাঁকে জঈফ (দুর্বল) বলে আখ্যায়িত করেছেন।”

◈ এই খারিজা কে হাফেজ ইবনে হাজার রাহ. متروك (পরিত্যাজ্য) আর ইবনে মাঈন كذاب (মিথ্যুক) বলেছেন।
[সূত্র: মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) অধ্যায়-৩: পাক-পবিত্রতা, পরিচ্ছেদ: ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ: ওজুর নিয়ম-কানুন]

◈ আবু যুরআ রাযী বলেন,
رفعه إلى النبي صلى الله عليه وسلم منكر
“এ হাদিসটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত মারফু সূত্রে বর্ণনা করার বিষয়টি منكر” [আল ইলাল, ১/১৮৬]

➤ এ ছাড়াও প্রায় সকল মুহাদ্দিস এ হাদিসটিকে জইফ (দুর্বল) বলেছেন। যেমন:

◈ ইবনে ইরাক আল কিনানি [তানযিহুশ শারিয়াহ ২/৭২]
◈ বাগাভী [শারহুস সুন্নাহ ১/৩৬৭]
◈ নওবী [আল খুলাসা ১/১১৭]
◈ শাইখ আলবানি বলেন, এটি অত্যধিক দুর্বল। [জইফ ইবনে মাজাহ/ ৮৭]
◈ শুয়াইব আরনাবুতও আলবানির অনুরূপ মত ব্যক্ত করেছেন। [তাখরিজুল মুসনাদ, হা/২১২৩৮ للوُضوءِ شَيطانٌ يُقالُ له: الوَلْهانُ، فاتَّقوهُ، أو قال: فاحْذَروهُ.]

◍ দুটি জ্ঞাতব্য বিষয়:

ক. ওয়ালহান শব্দের অর্থ: অত্যধিক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, অত্যধিক দু:খ, কষ্ট ও দু:শ্চিন্তার ফলে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য, কিংকর্তব্যবিমূঢ় ইত্যাদি।
খ. বলা হয়ে থাকে যে, ‘ওয়ালহান’ শয়তানের একটি নাম। কিন্তু এ মর্মে হাদিসটি সহিহ বলে সাব্যস্ত না হওয়ায় এটিকে শয়তানের নাম হিসেবে প্রমাণ করার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

হোটেল-রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে ওয়েটারকে বখশিশ দেওয়া কি ঘুসের অন্তর্ভুক্ত?

 প্রশ্ন: রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে যে ওয়েটা আমাদেরকে আপ্যায়ন করায় তাকে খুশি হয়ে আমরা কিছু বখশিশ দিয়ে থাকি। এটা কি ঘুসের অন্তর্ভুক্ত?

উত্তর:
একজন ওয়েটার (Waiter) হোটেল-রেস্তোরাঁয় কাস্টমারকে অভ্যর্থনার পাশাপাশি খাবারের অর্ডার নেয়া, খাবার পরিবেশন করা ও তাদের সুবিধা-অসুবিধার দিকে খেয়াল রাখার কাজ করেন। আপনি হোটেল-রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে যদি ওয়েটারকে কিছু টাকা বখশিশ দেওয়ার মাধ্যমে হোটেল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বহির্ভূত অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ বা খাবারের বিল কম দেখানো অথবা এমন বাড়তি কিছু সুবিধা গ্রহণ করেন-যা মূলত: অনুমোদিত নয় (অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ বিষয়টা জানলে আপত্তি করবে) তাহলে তাকে বখশিশ দেওয়া এবং ওয়েটারের তা গ্রহণ করা-উভয়টাই অন্যায়। কারণ তা ঘুস। সুতরাং উভয়ের জন্যই তা হারাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

لعَن اللهُ الرَّاشيَ والمُرتشيَ
“ঘুস দাতা ও ঘুস গ্রহীতা উভয়ের উপর আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন।” [ইবনে হিব্বান, সহীহুল জামে হা/৫০৯]
পাশাপাশি এর মাধ্যমে রেস্তোরাঁর মালিককে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। অর্থাৎ এটি অন্যের হক নষ্ট করারও শামিল-যা নি:সন্দেহে কবিরা গুনাহ।

কিন্তু আপনি যদি যথারীতি খাবার গ্রহণের পর ওয়েটারকে খুশি হয়ে স্বেচ্ছায় কিছু টাকা বখশিশ দেন তাহলে তাতে দোষের কিছু নেই। বরং আপনি যদি একজন গরিব মানুষকে খুশি করা বা আর্থিক সহযোগিতা করার নিয়তে তা দেন তাহলে এতে সওয়াবও পাবেন ইনশাআল্লাহ।

প্রখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হল, সব চেয়ে উত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেন,

أفضلُ الأعمالِ أن تُدْخِلَ على أخيكَ المؤمنِ سُروراً أو تقضيَ عنهُ دَيناً ، أو تُطْعِمَهُ خُبزاً

“সবচেয়ে উত্তম আমল হল, তোমার কোন ইমানদার ভাইয়ের অন্তরে আনন্দ সঞ্চার করা বা তার ঋণ পরিশোধ করা বা তাকে একটি রুটি খাওয়ানো।” [সহীহুল জামে, আলবানী, হা/১০৯৬] এমনকি সে যদি অমুসলিমও হয় তারপরও সওয়াব রয়েছে।

এটি আপনার বদান্যতা এবং উত্তম চরিত্রেরও বহিঃপ্রকাশ।

এমনকি এই টাকা পেয়ে পরবর্তীতে যেন সে আপনাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে বা ভালোভাবে সার্ভ করে (যা মূলত: ওয়েটারের দায়িত্ব বরং কর্তৃপক্ষ সাধারণত: তা ওয়েটারদের থেকে প্রত্যাশা করে)-এ উদ্দেশ্য থাকলেও সমস্যা নেই। কিন্তু এ নিয়ত থাকলে দানের সওয়াব পাওয়া যাবে না। কিন্তু অন্যায়ভাবে কোন সুবিধা লাভ করার উদ্দেশ্য হলে এই লেনদেন অবশ্যই বৈধ নয়।

❑ শাইখ বিন বায রহ.:

প্রশ্ন: আমি একজন ডাক কর্মচারী। আমি যখন প্রাপকের নিকট চিঠির খাম বা মানি অর্ডারটি হস্তান্তর করি, তখন তিনি আমাকে কিছু টাকা দেন। এটি কি এমন উপহার হিসেবে বিবেচিত হবে যা আমার গ্রহণ করার অধিকার আছে? নাকি এটাকে ঘুষ বলে গণ্য হবে?
উত্তরে শাইখ ইবনে বায রাহ. বলেন,
“এতে কোনও সমস্যা আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ এই কাজটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই কথার অন্তর্ভুক্ত:
مَنْ صَنَعَ إِلَيْكُمْ مَعْرُوفاً فَكَافِئُوهُ
“যে তোমাদের উপকার করবে, তোমরা তাকে পুরস্কৃত করো।” [আবু দাউদ, নাসায়ী-সহিহ]

তিনি আরও বলেছেন,
كُلُّ مَعْرُوفٍ صَدَقَةٌ
“প্রতিটি ভালো কাজ সদকা।” হাদিসটি ইমাম বুখারি তার সহিহ বুখারিতে বর্ণনা করেছেন। (এটি সহিহ মুসলিমেও বর্ণিত হয়েছে)
আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এই সহায়তা ডাক কর্মচারীকে প্রাপকের কাছে যথাসম্ভব দ্রুত তাদের লেনদেন পৌঁছে দিতে উৎসাহিত করবে। আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।” [উৎস: শাইখের অফিসিয়াল ওয়েব সাইট]
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate