Saturday, February 5, 2022

সাম্প্রদায়িকতা কী? ইসলাম “সাম্প্রদায়িকতা’ ও ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ সম্পর্কে কী বলে?

 প্রশ্ন: সাম্প্রদায়িকতা কী? ইসলাম “সাম্প্রদায়িকতা’ ও ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ সম্পর্কে কী বলে?

উত্তর:
সাম্প্রদায়িকতা (Sectarianism) অর্থ: ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, জাতি, গোষ্ঠী, ভাষা, দেশ, অঞ্চল, লিঙ্গ, দল ইত্যাদি দিক-বিবেচনায় অন্যায়-অবিচারকে সমর্থন করা এবং অপর পক্ষের ক্ষতি সাধন করা। অন্য কথায় এটা হল, গ্রুপবাজি বা গোষ্ঠী তন্ত্র। এর বিপরীতটাই অসাম্প্রদায়িকতা।
ইসলামে এ জাতীয় সাম্প্রদায়িকতা বা গোষ্ঠী তন্ত্রের কোনও স্থান নেই। বরং ইসলাম সবসময় এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং সাম্য ও ন্যায়-নীতির পক্ষে অবস্থান করে। সুতরাং ইসলামের দৃষ্টিতে সাম্প্রদায়িকতা অবশ্যই হারাম।

▪️ইসলাম নিজের নিকটাত্মীয়ও যদি অপরাধ করে তবুও তাকে শাস্তি দিতে বলে। তাই তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُهَا
“তাঁর শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! যদি ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদও চুরি করতো, আমি তারও হাত কেটে দিতাম।” [সুনান আন-নাসায়ী, অধ্যায়: ৪৭/ চোরের হাত কাটা-সহিহ]
সুবহানাল্লাহ! পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষের মুখ থেকে এমন ইনসাফ দীপ্ত শক্ত ঘোষণা সত্যি ইসলামের বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা প্রমানের পাশাপাশি স্বজন প্রীতি, গোষ্ঠী প্রীতি এবং অন্যায়-অবিচারের পথকে রুদ্ধ করে দেয়।
▪️ইসলাম নিজের জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর বিপক্ষে গেলেও সত্য ও ন্যায়ের কথা বলার নির্দেশ দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَىٰ
“যখন তোমরা কথা বলবে তখন ইনসাফ করবে যদিও তা নিকটাত্নীয়ের ব্যাপারে হয়।” [সূরা আনআম: ১৫২]

▪️নির্যাতিত ব্যক্তি ন্যায় বিচার পাবে যদিও সে অমুসলিম হয় এবং অপরাধী শাস্তি পাবে যদিও সে মুসলিম হয়।

▪️ইসলাম জাতি ও গোষ্ঠীগত সাম্প্রদায়িকতাকে ‘জাহেলিয়াত’ বলে আখ্যায়িত করেছে। যেমন: হাদিসে এসেছে,
সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রাহ. বলেন যে, আমর রাহ. জাবির রা. কে বলতে শুনেছেন,
আমরা এক যুদ্ধে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে ছিলাম। তখন একজন মুহাজির সাহাবি এক আনসারি সাহাবির পশ্চাদ্দেশে আঘাত করেছিল।
সে সময় আনসারি সাহাবি চীৎকার করে বলল: হে আনসাররা (তোমরা কে কোথায় আছো, ছুটে আসো)! অন্য দিকে মুহাজির ব্যক্তি ডাক দিল, হে মুহাজিরগণ! (তোমরা কে কোথায় আছো ছুটে আসো)।
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
‏ مَا بَالُ دَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ؟
“কী ব্যাপার! জাহেলি যুগের মতো হাঁক-ডাক করছ কেন?”
তারা বলল, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! একজন মুহাজির একজন আনসারির পশ্চাতে আঘাত করেছে। তখন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
‏دَعُوهَا فَإِنَّهَا مُنْتِنَةٌ ‏
“তোমরা এ ধরনের হাঁক-ডাক পরিত্যাগ করো। কেননা তা দুর্গন্ধময় (নিন্দনীয়) কাজ।” [সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ৪৬। সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও শিষ্টাচার, পরিচ্ছেদ: ১৬. ভাইকে সাহায্য করা জালিম হোক কিংবা মাজলুম হোক] এ মর্মে আরও হাদিস আছে।

▪️অন্য হাদিসে এসেছে,

لَيْسَ مِنَّا مَنْ دَعَا إِلَى عَصَبِيَّةٍ وَلَيْسَ مِنَّا مَنْ قَاتَلَ عَلَى عَصَبِيَّةٍ وَلَيْسَ مِنَّا مَنْ مَاتَ عَلَى عَصَبِيَّةٍ ). وهو حديث ضعيف كما قال الألباني في ضعيف أبي داود
“যে ব্যক্তি আসাবিয়াহ তথা গোষ্ঠীগত গোঁড়ামির দিকে ডাকে বা গোত্রের দিয়ে আহ্বান করে লোক-জন জমায়েত করে করে সে আমার দলভুক্ত নয়। আর ঐ ব্যক্তিও আমাদের দলভুক্ত নয় যে গোষ্ঠীগত গোঁড়ামির ভিত্তিতে যুদ্ধ করে এবং সেও নয় যে গোষ্ঠীগত গোঁড়ামি উপর মারা যায়।”
[সুনান আবু দাউদ, ৩৬/ শিষ্টাচার, পরিচ্ছেদ: ১২২. দল প্রীতি বা পক্ষপাতিত্ব-দুর্বল, মিশকাত হা/ ৪৯০৭, গায়াতুল মারাম, হা/ ৩০৪।]
এ হাদিসটি জঈফ হলেও তার মমার্থটা সহিহ হাদিস দ্বারা সমর্থিত-যেমনটি উপরের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

▪️ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَلَا إِنَّ رَبَّكُمْ وَاحِدٌ وَإِنَّ أَبَاكُمْ وَاحِدٌ ، أَلَا لَا فَضْلَ لِعَرَبِيٍّ عَلَى أَعْجَمِيٍّ وَلَا لِعَجَمِيٍّ عَلَى عَرَبِيٍّ وَلَا لِأَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ وَلَا أَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ إِلَّا بِالتَّقْوَى
“হে লোক সকল! তোমাদের প্রতিপালক এক এবং তোমাদের পিতা এক (আদম আ.)।
শুনে রাখো, আরবির উপর অনারবির এবং অনারবির উপর আরবির, কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের এবং শ্বেতাঙ্গের উপর কৃষ্ণাঙ্গের কোন শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নেই। শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা আছে তো কেবল ‘তাকওয়া’ (আল্লাহ ভীতি)’র ভিত্তিতে।”
(মুসনাদে আহমদ, হা/২২৩৯১, সিলসিলা সহিহা, ৬/১৯৯)

▪️ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত যে, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। বললেন,

“হে লোক সকল! আল্লাহ্ তাআলা জাহেলি যুগের অন্ধ অহমিকা এবং পিতৃপুরুষদের নিয়ে গর্ব করার প্রথা ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন। মানুষ হল দু ধরনের।
– এক প্রকার হল সৎ, পরহেজগার এবং আল্লাহর নিকট মর্যাদাবান।
– আরেক প্রকার হল অসৎ, বদবখন এবং আল্লাহর নিকট নিকৃষ্ট।
মানুষ হল আদম-এর সন্তান। আল্লাহ্ তা’আলা আদমকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,
يا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
“হে মানুষ, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে। পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে। যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাবান যে অধিক আল্লাহভীরু। আল্লাহ্ সবকিছু জানেন। সব খবর রাখেন [সূরা হুজুরাত ৪৮: ১৩]।
মোটকথা ইসলাম হল, ন্যায়-ইনসাফ ভিত্তিক জীবনাদর্শের নাম। এখানে সাম্প্রদায়িকতা, স্বজনপ্রীতি, দল বা গোষ্ঠীপ্রীতির কোনও স্থান নেই। সুতরাং যারা ইসলামকে সাম্প্রদায়িক বলে গালমন্দ করে তারা মূলত ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ বিদ্বেষবশত বলে। ইসলামের প্রকৃত পরিচয় ও সৌন্দর্য সম্পর্কে তারা নিতান্তই অজ্ঞ। আল্লাহ তাদেরকে সুপথ দেখান। আমিন।
আল্লাহু আলাম।
-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল-

কোনও দুআয় ৪০ জন ব্যক্তি আমিনবললে তা কি কবুল হয়?

 প্রশ্ন: নিউজ ফিডে দেখা যাচ্ছে যে, ৪০ জন ‘আমিন’ বললে নাকি দুআ কবুল হয় -এটা কতটুক সত্য?

উত্তর:
বাস্তবেই এমন স্ট্যাটাসে ফেসবুক ভরপুর। ফেসবুকে উক্ত হাদিস তুলে ধরে কেউ বিয়ের জন্য, কেউ মনের মানুষকে পাওয়ার জন্য, কেউ পরীক্ষায় পাসের জন্য…এভাবে একেকজন একেক উদ্দেশ্যে দুআ চাচ্ছে। আর জনগণ কমেন্ট অপশন ‘আমিন’ এর জোয়ারে ভাসিয়ে দিচ্ছে!
অথচ এটা একটা ভ্রান্ত কথা। এমন কোনও হাদিস নেই যে, চল্লিশ জন ব্যক্তি কোনও দুআয় ‘আমিন’ বললে তা কবুল হয়ে যাবে। তাহলে তো আমাদের দেশের বড় বড় ওয়াজ মাহফিল, মিলাদ মাহফিল, দুআ মাহফিল এবং মসজিদে নামাজের পরে সম্মিলিত দুআয় যত মানুষ শরিক হয় তাদের কোন দুআই বাদ যেত না; সবই কবুল হয়ে যেতো।
আমরা বলি না যে, ফেসবুকের মাধ্যমে দুআ চাওয়া নাজায়েজ। কিন্তু ৪০জন ব্যক্তি আমিন বললে দুআ কবুল হওয়ার কোনও হাদিস নেই।
এই সব বানোয়াট হাদিসকে কেন্দ্র করেই আমাদের দেশের তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতিমায় লক্ষ লক্ষ মানুষ নামাজ না পড়লেও ‘আখেরি মুনাজাতে’ শরিক হওয়ার জন্য তোলপাড় লাগিয়ে দেয়!
এই সব বানোয়াট হাদিস দ্বারাই অনেকেই সম্মিলিত দুআ সাব্যস্ত করার চেষ্টা করে।
আল্লাহ আমাদেরকে দীনের সঠিক জ্ঞান দান করুন এবং ক্ষমা করুন। আমিন।
▬▬▬✪✪✪▬▬▬
-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল-

গোরস্থানে কবরের মাটি সমান করে তার উপর মসজিদ নির্মাণ বা সম্প্রসারণ এবং তাতে সালাত আদায়ের বিধান

 প্রশ্ন: আমাদের গ্রামের মসজিদের পাশে কবর ছিল। তো মসজিদ বড় করার জন্য জায়গার মালিকের অনুমতি নিয়ে কবরস্থানের মাটি সমান করে তার উপর মসজিদ বড় করা হয়েছে। এখন ওই মসজিদে কি নামাজ শুদ্ধ হবে? কয়েকজন আলেম হাদিস গ্রন্থের দলিল দেখিয়ে বলেছেন যে, এখানে নামাজ হবে। এখন আপনাদের কাছেও এ বিষয় জানতে চাই কুরআন-হাদিসের আলোকে।

উত্তর:
কবরস্থানের কবরের মাটি সমান করে তার উপর মসজিদ নির্মাণ করলে বা মসজিদ সম্প্রসারণ করলে সে মসজিদ বা সম্প্রসারিত স্থানে সালাত শুদ্ধ হবে না। কারণ—

◈ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
أَلاَ فَلاَ تَتَّخِذُوا الْقُبُورَ مَسَاجِدَ إِنِّي أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ
“সাবধান! তোমরা কবরসমূহকে মসজিদ বা সেজদার স্থান বানাবে না। আমি এরূপ করতে তোমাদেরকে নিষেধ করছি।” [সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী), অধ্যায়: ৫। মসজিদ ও সালাতের স্থানসমূহ, পরিচ্ছেদ: ৩. কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ, মসজিদে ছবি বানানো, কবরকে সেজদার স্থান নির্ধারণ করার প্রতি নিষেধাজ্ঞা]

◈ জাবির রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنْ يُجَصَّصَ الْقَبْرُ وَأَنْ يُقْعَدَ عَلَيْهِ وَأَنْ يُبْنَى عَلَيْهِ ‏.‏
“রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের উপর চুনা লাগানো, তার উপর বসা, কবরের উপর গৃহনির্মাণ বা পাকা করতে নিষেধ করেছেন।” [সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ১২/ জানাজা সম্পর্কিত, পরিচ্ছেদ: ২৬. কবর পাকা করার নিষেধাজ্ঞা]

❑ কোন পরিস্থিতিতে কবরস্থানে মসজিদ নির্মাণ বা সম্প্রসারণ করা বৈধ?

পরিস্থিতি যদি এমন হয় যে, মসজিদে মুসল্লিদের স্থান সংকুলান না হওয়ার কারণে তা সম্প্রসারণ করা নিতান্ত জরুরি হয়ে পড়েছে কিন্তু মসজিদের পার্শ্বে কবর থাকার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না আর অন্য দিকে মসজিদ বাড়ানোর মত জায়গাও নাই। তাহলে এমন জরুরি প্রয়োজন বশত: মসজিদ সম্প্রসারণের জন্য কবরস্থানের যতটুকু জায়গা প্রয়োজন ততটুকু স্থান থেকে কবরগুলো খনন করে অত্যন্ত সম্মানের সাথে মৃত মানুষের লাশ বা অবশিষ্ট হাড়-হাড্ডি যা পাওয়া যায় সেগুলো অন্য কোনও কবরস্থানে দাফন করতে হবে। তারপর উক্ত স্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও মাটি সমান করে সেখানে মসজিদ সম্প্রসারণ করা বৈধ হবে।

স্মর্তব্য যে, মুসলিম ব্যক্তির কবরের সম্মান বজায় রাখা জরুরি। কারণ মৃত ব্যক্তির কবর মূলত তার জন্যই ওয়াকফ কৃত স্থান। সুতরাং তাতে কারও হস্তক্ষেপ করা বৈধ নয়। কিন্তু একান্ত জরুরি প্রয়োজনে হলে এবং বিকল্প কোনও উপায় না থাকলে কবর খনন করে তার লাশ বা অবশিষ্ট হাড়-হাড্ডি অন্য কোথাও কবর খনন করে সেখানে স্থানান্তরিত করার পর তদস্থলে মসজিদ নির্মাণ, মসজিদ সম্প্রসারণ অথবা বসত বাড়ি নির্মাণ বা অন্যান্য কাজে লাগানো জায়েজ আছে।
কিন্তু লাশ বা লাশের অবশিষ্টাংশ অন্যত্র স্থানান্তরিত না করে সে অবস্থায় শুধু কবরের মাটি সমান করে তার উপর মসজিদ নির্মাণ করা জায়েজ নয়। বরং এমনটি করা হলে উক্ত মসজিদে সালাত আদায় করা বৈধ নয় বরং তা ভেঙ্গে ফেলা আবশ্যক। এমনটি বড় আলেমদের ফতোয়া।

❑ সৌদি স্থায়ী ফতোয়া কমিটির ফতোয়া:

প্রশ্ন: আমাদের শহরের মাঝখানে একটি পুরানো কবরস্থান ছিল। পৌরসভা তার ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে তদস্থলে একটি আবাসিক এলাকা ও সীমিত আয়ের লোকদের জন্য ভবন নির্মাণ করেছে। কিন্তু সেখানে একটি বিশাল এলাকা রয়ে যাওয়ায় সৎ ও দানশীল ব্যক্তিরা সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন-যেন এলাকার বাসিন্দারা তাতে নামাজ পড়তে পারে।
মসজিদটি নির্মিত হওয়ার পর এই মসজিদে নামায পড়া জায়েজ আছে কি না তা নিয়ে শহরের মানুষের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় এবং তারা সমর্থক ও বিরোধী দু ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই মসজিদের হুকুম কি? এটা কি ধ্বংস করা জরুরি না কি রাখা যাবে? এই মসজিদে নামায জায়েজ কি না?
উত্তর:
“الأرض التي بني عليها مسجد إذا كانت خالية من القبور صحت الصلاة فيها ، وإلا فيجب هدم المسجد الذي بني عليها” انتهى
الشيخ عبد العزيز بن عبد الله بن باز ، الشيخ عبد الرزاق عفيفي ، الشيخ عبد الله بن غديان .
” فتاوى اللجنة الدائمة ” ( 1 / 418 ، 419 )
“যে জমিতে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে তা যদি কবর মুক্ত হয় তাহলে তাতে সালাত শুদ্ধ হবে। অন্যথায় ঐ মসজিদ ভেঙ্গে ফেলতে হবে যা কবরের উপর নির্মাণ করা হয়েছ।”
উত্তর প্রদানে:
১. শাইখ আব্দুল আযিয বিন বায রাহ.
২. শাইখ আব্দুর রাযযাক আফিফি রাহ.
৩. ও শাইখ আব্দুল্লাহ গুদাইয়ান রাহ.
[ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা, ১/৪১৮ ও ৪১৯]

অবশ্য হারবি তথা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত কাফির-মুশরিকদের কবর খনন করা এবং তার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করত: মাটি সমান করে তার উপর মসজিদ নির্মাণ করা অথবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা বৈধ। কারণ তাদের কবরের কোনও সম্মান নেই। যেমনটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় হিজরত করার পর সেখানে মসজিদে নববি নির্মাণ করেছেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ أَنَسٍ قَدِمَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الْمَدِينَةَ وَأَمَرَ بِبِنَاءِ الْمَسْجِدِ فَقَالَ يَا بَنِي النَّجَّارِ ثَامِنُونِي فَقَالُوا لاَ نَطْلُبُ ثَمَنَهُ إِلاَّ إِلَى اللهِ فَأَمَرَ بِقُبُورِ الْمُشْرِكِينَ فَنُبِشَتْ ثُمَّ بِالْخِرَبِ فَسُوِّيَتْ وَبِالنَّخْلِ فَقُطِعَ فَصَفُّوا النَّخْلَ قِبْلَةَ الْمَسْجِدِ
আনাস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় এসে মসজিদ নির্মাণের আদেশ দেন। অতঃপর বলেন, “হে বনী নাজ্জার! আমার নিকট হতে মূল্য নিয়ে (জমি) বিক্রি করো।
তারা বললেন, আমরা এর মূল্য কেবল আল্লাহর নিকটই চাই।
এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে মুশরিকদের কবর খুঁড়ে ফেলা হল, ধ্বংসাবশেষ সমতল করা হল, খেজুর গাছগুলো কেটে ফেলা হল। কেবল মসজিদের কিবলার দিকে কিছু খেজুর গাছ সারিবদ্ধভাবে রাখা হল।” [সহীহ বুখারি (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৯/ মদিনার ফযিলত, পরিচ্ছেদ: ২৯/১. মদিনা হারাম (পবিত্র স্থান) হওয়া]
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬✪✪✪▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলিল।
(লিসান্স, মদিনা ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়)
দাঈ, জুবাইল দাওয়া এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

ওজু-গোসল ও পাক-পবিত্রতা বিষয়ক জরুরি ২৫টি মাসআলা

 প্রশ্ন-১: নাপাক (গোসল ফরজ) অবস্থায় দুআ, তাসবিহ, জিকির-আজকার ইত্যাদি পাঠ করা জায়েজ আছে কি?

উত্তর:
স্ত্রী সহবাস, স্বপ্নদোষ, বীর্যপাত ইত্যাদি কারণে শরীর নাপাক হলে (গোসল ফরজ হলে) কুরআন তিলাওয়াত এবং আবরণহীন ভাবে মুসহাফ (গ্রন্থাকারে লিখিত কুরআন) স্পর্শ করা ব্যতীত সব ধরণের দুআ, তাসবিহ, জিকির-আজকার, ইস্তিগফার, রুকিয়া বা ঝাড়-ফুঁক, হাদিস, ইসলামি বই-পুস্তক ও তাফসির পাঠ ইত্যাদি জায়েজ আছে।
(কেবল তাফসিরের মধ্যে কুরআনের আয়াতগুলো স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে)

অনুরূপভাবে হায়েজ-নেফাস জনিত নাপাক অবস্থায়ও উপরোক্ত বিধান প্রযোজ্য হবে। তবে এ অবস্থায় কুরআন স্পর্শ বা তিলাওয়াত করা যাবে কি না তা দ্বিমত পূর্ণ। সঠিক কথা হল, সর্তকতার স্বার্থে একান্ত জরুরি না হলে (যেমন: কুরআন ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা, ছাত্রীদের কুরআনের পরীক্ষা ইত্যাদি) কুরআন তিলাওয়াত করা উচিৎ নয়। আর এ অবস্থায় মুসহাফ (গ্রন্থাকারে লিখিত কুরআন) স্পর্শ করার প্রয়োজন হলে, হাতমোজা, কুরআনের গিলাফ, কাপড় বা অন্য কোনও কিছুর আবরণ সহকারে তা স্পর্শ করা যাবে। কিন্তু মোবাইল, ল্যাপটপ ইত্যাদি ডিভাইসে কুরআন থাকলে সে ক্ষেত্রে হাতমোজা বা আবরণ সহকারে ধরা আবশ্যক নয়। কারণ তা মূলত: মুসহাফ নয়।

প্রশ্ন-২: ওজু ব্যতীত হাদিসের কোন বই, তাফসির গ্রন্থ বা যে কোনও ইসলামিক বই-পুস্তক হাতে নিয়ে পড়া যাবে কি?

উত্তর:
ছোট নাপাকি (ওজু না থাকা) অবস্থায় কুরআনের তাফসির, হাদিস, ইসলামি বই-পুস্তক স্পর্শ বা পাঠ করতে কোন অসুবিধা নেই। তবে অধিক বিশুদ্ধ মতে এ অবস্থায় সরাসরি কুরআন স্পর্শ করা যাবে না।কিন্তু মুখস্থ পড়তে দোষ নেই।

অনুরূপভাবে এ অবস্থায় জিকির, দুআ, তাসবিহ, ইস্তিগফার ইত্যাদি পাঠ করতেও কোন সমস্যা নাই।

প্রশ্ন-৩: আমার কোল্ড এলার্জি। এর ফলে প্রায় দিনই আমার হাঁচি-কাশি থাকে, পানি স্পর্শ করলে হাঁচি এবং কানের ব্যথা বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে আমি কি ওজু ও ফরজ গোসলের পরিবর্তে তায়াম্মুম করতে পারি? আমি খুব দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছি। উত্তর দিলে উপকৃত হব।

উত্তর:
যদি ঠাণ্ডা পানি ব্যবহার করলে আপনি রোগ বৃদ্ধি, আরোগ্য বিলম্বিত হওয়া বা শারীরিক সমস্যার আশঙ্কা করেন তাহলে পানি গরম করে ব্যবহার করবেন। তাতেও সমস্যা হলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করবেন। তাহলে তা ওজু এবং ফরজ গোসল উভয় ক্ষেত্রেই পবিত্রতা অর্জনের জন্য যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ।

প্রশ্ন-৪: হাতে যদি ফেবিকুইক লেগে যায় তাহলে কি অজু বা গোসল শুদ্ধ হবে?

উত্তর:
শরীরে যদি ফেবিকুইক, সুপার গ্লু, অন্য কোনও আঠা বা এমন বস্তু লাগে যা চামড়ার উপর শক্ত প্রলেপ ফেলে তাহলে তা দূর করা পর্যন্ত ওজু বা গোসল সহিহ হবে না। কেননা এগুলো চামড়ায় পানি পৌঁছুতে বাঁধা দেয়।

তাই ওজু-গোসলের পূর্বে তা যে কোনোভাবে উঠিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু যদি চেষ্টা করার পরও তা ওঠানো সম্ভব না হয় তাহলে সে অবস্থায়ই ওজু বা গোসল সমাপ্ত করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে উক্ত আবরণ পড়া স্থানের উপর দিয়ে পানি বইয়ে দিতে হবে বা ভেজা হাত দিয়ে উক্ত স্থানের উপর হাত মাসেহ করে নিতে হবে। তাহলেই যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ। কারণ এটা অপারগ অবস্থা। অপারগ অবস্থায় আল্লাহ তাআলা বান্দার উপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَا يُكَلِّفُ اللَّـهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
“আল্লাহ কারো উপর তার সাধ্যাতীত কোন কাজের দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না।” [সূরা বাকারা: ২৮৬]
তিনি আরও বলেন,
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ
“অতএব, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যতটুকু তোমাদের সাধ্যের মধ্যে থাকে।” [সূরা তাগাবুন: ১৬]

তবে এসব আঠা জাতীয় জিনিস ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, যেন তা সরাসরি শরীরে না লাগে। তা ছাড়া এটা স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর।
আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।

প্রশ্ন-৫: দরুদ পড়ার জন্য কি ওজু থাকা জরুরি? নাকি ওজু ছাড়াও পড়া যায়?
উত্তর:
মুমিন ব্যক্তির সর্বদা ওজু ও পাক-পবিত্র অবস্থায় থাকা খুব ভালো। তবে দুআ, দরুদ, তাসবিহ, জিকির-আজকার, ইস্তিগফার, মুখস্থ কুরআন তিলাওয়াত, ইসলামি বই-পুস্তক পাঠ, তাফসির ও হাদিসের কিতাব পাঠ, সেহেরি ও ইফতার খাওয়া, মসজিদে প্রবেশ, সালাম, মুসাফাহা ইত্যাদির জন্য ওজু থাকা জরুরি নয়। ওজু থাকুক বা না থাকুক সর্বাবস্থায় এসব কাজ করা জায়েজ আছে।

তবে সালাত আদায়, (অধিক বিশুদ্ধ মতে) সরাসরি মুসহাফ (কুরআন) হাত দ্বারা স্পর্শ করা, কাবা ঘরের তওয়াফ ইত্যাদির জন্য ওজু থাকা জরুরি।

প্রশ্ন-৬: মল মূত্র ত্যাগের পর ওজু করার ব্যাপারে কি কোনও বাধ্যবাধকতা রয়েছে? অনেকেই বলে, মল ত্যাগের পর ওজু না করে খাদ্য-পানীয় স্পর্শ করা যাবে না। তাহলে কি দিনে যতবার মল মূত্র ত্যাগ করা হবে ততবার ওজু করতে হবে?
উত্তর:
প্রতিবার মল-মূত্র ত্যাগের পরে ওজু করার ব্যাপারে ইসলামে কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। তবে যতবার ওজু নষ্ট হবে ততবার ওজু করা এবং সবসময় পবিত্র অবস্থায় থাকা নিঃসন্দেহে উত্তম।
সে হিসেবে কেউ যদি টয়লেট সারার পরে অজু করে নেয় তবে নিঃসন্দেহে তা উত্তম। তাহলে পাক-পবিত্র অবস্থায় আল্লাহর জিকির করা হবে, ইচ্ছা হলেই নফল সালাত পড়া যাবে এবং সফরে বা মসজিদ থেকে দূরে থাকা অবস্থায় সালাতের সময় হলে যে কোন স্থানে সালাত আদায় করে নেয়া যাবে। কিন্তু সালাতের পূর্বে এবং অধিক বিশুদ্ধ মতে কুরআন সরাসরি হাত দ্বারা স্পর্শ করতে চাইলে ওজু করা আবশ্যক।

প্রশ্ন-৭: ওজু করার মধ্যে যদি কারো পায়ু পথে বাতাস বের হয় তাহলে কি সে ওজু চালিয়ে যাবে নাকি পুনরায় প্রথম থেকে ওজু করবে?
উত্তর:
ওজু চলাকালীন পায়ুপথে বাতাস বের হলে যতটুকু ওজু করা হয়েছিল ততটুকু বাতিল বলে গণ্য হবে। তাই প্রথম থেকে পুনরায় ওজু করা আবশ্যক। এ অবস্থায় প্রথম থেকে ওজু না করে সেভাবেই ওজু শেষ করলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। এ অবস্থায় সালাত আদায় করলে তা সহিহ হবে না।

প্রশ্ন-৮: ওজু করার সময় মাঝখানে ওজু নষ্ট হয়ে গেলে পুনরায় ওজু করতে হবে কি?
উত্তর:
হ্যাঁ, বিসমিল্লাহ বলে পুনরায় প্রথম থেকে ওজু করবেন।

প্রশ্ন-৯: ওজুর শুরুতে “বিসমিল্লাহ না বলে ” বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম ” বলে ওজু করলে কি সহিহ হবে নাকি বিদআত হয়ে যাবে?
উত্তর:
ওজু, পানাহার বা যে কোন কাজের শুরুতে কেবল ‘বিসমিল্লাহ’ (আল্লাহর নামে শুরু করছি) বলাই যথেষ্ট। কেননা হাদিসে কেবল এতটুকুই এসেছে। পুরো “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পাঠের কথা আসে নি। তাই পুরোটা না বলাই ভালো। কোন কোন আলেম, পুরোটা বলাকে বিদআত বলেছেন। (যেমন: শাইখ আলবানি রাহ.)

যা হোক, কেউ যদি কখনো ভুল বশত: পুরোটা বলেও ফেলে তাহলে তা বিদআত হবে না। তবে ইচ্ছাকৃত ভাবে না বলাই উত্তম। আল্লাহু আলাম।

প্রশ্ন-১০: বিভিন্ন সময় পায়ের আঙ্গুলের অসুখের জন্য ভায়োডিন (গাঢ় নীল রঙ্গের ঔষধ বিশেষ) ব্যবহার করা হয় এবং তা ৭-৮ দিন স্থায়ী থাকে। এতে করে কি ওজুর সমস্যা হবে?
উত্তর:
ওজুর ক্ষেত্রে নিয়ম হল, ওজুর অঙ্গে যদি শক্ত আবরণ বিশিষ্ট এমন কিছু লেগে থাকে যার কারণে চামড়ায় পানি পৌঁছুতে বাঁধাগ্রস্ত হয় তাহলে কেমিক্যাল বা অন্য যে কোনভাবে তা দূর করতে হবে। অন্যথায় ওজু শুদ্ধ হবে না। (চেষ্টা করার পরও সম্ভব না হলে ভিন্ন কথা)। কিন্তু রোগ-ব্যাধির চিকিৎসা হিসেবে যদি শরীরে এমন কিছু লাগানো হয় তাহলে তাতে কোন আপত্তি নাই। বরং উক্ত আবরণের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত করলে বা ভেজা হাত দ্বারা উক্ত স্থান মাসেহ করলেই যথেষ্ট হবে।

অনুরূপভাবে যদি মেহেদি, সাধারণ রং বা রং জাতীয় ওষুধ (যা চামড়ার উপর আবরণ ফেলে না) লাগানো হয় তাহলে তাতেও ওজুতে কোন সমস্যা নেই। কেননা এতে ওজুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চামড়ায় পানি পৌঁছতে বাঁধাগ্রস্ত হয় না।

প্রশ্ন-১১: ওজু করার পর মুখে স্নো অথবা হাত-পায়ে লোশন লাগালে কি ওজু ভঙ্গ হয়?
উত্তর:
না, এতে ওজু ভঙ্গ হবে না। ওজুর পর শরীরে তেল, লোশন, ক্রিম, ভ্যাসলিন, মলম, মেহেদি, রং ইত্যাদি ব্যবহার ওজু ভঙ্গের কোন কারণ নয়।

প্রশ্ন-১২: ওজুর সময় কি মহিলাদের মাথায় ওড়না দেওয়া জরুরি?
উত্তর:
পরপুরুষ দেখার সম্ভাবনা না থাকলে ওজুর সময় মহিলাদের মাথায় ওড়না বা কাপড় দেওয়া আবশ্যক নয়।

প্রশ্ন-১৩: ওজু করে নামাজ শেষে দেখতে পেলাম পায়ের নিচে একটু জায়গায় কালো রঙের ময়লা। অনেকটা চুইংগামের মত। পরে তা টেনে উঠালাম। এখন কি পুনরায় ওজু করে নামাজ পরতে হবে?
উত্তর:
যদি মনে হয় যে, পায়ের তলায় লাগানো বস্তুটি এতটা শক্ত ছিল যে, ওজু করার সময় উক্ত স্থানে পানি পৌঁছেনি তাহলে এতে ওজুও বিশুদ্ধ হয় নি। তাই এ ক্ষেত্রে আপনার করণীয় হল, এখন ওই জিনিসটা উঠিয়ে ফেলে নতুনভাবে ওজু করে পুনরায় সালাত আদায় করা। কারণ ওজু শুদ্ধ না হলে সালাতও শুদ্ধ হবে না।

প্রশ্ন-১৪: শারীরিক সমস্যার কারণে শরীরের কোনও অংশে পানি দিতে না পারলে তাতে ওজু-গোসলের বিধান কি? শুধু উক্ত অংশ না ভিজিয়ে বাকিটা স্বাভাবিক ভাবে ধৌত করলে কি ওজু-গোসল শুদ্ধ হবে?
উত্তর:
ওজু বা গোসলের কোন অঙ্গ পানি দ্বারা ভেজালে যদি ক্ষয়-ক্ষতি বৃদ্ধি পাওয়ার বা ক্ষত শুকাতে বিলম্ব হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে ভেজা হাত দ্বারা সে স্থানটা মাসেহ করে নিবেন। অর্থাৎ হাত ভিজিয়ে তা আহত বা সমস্যা গ্রস্ত স্থানের উপর আলতো করে বুলিয়ে নিবেন। আর বাকি অঙ্গ পানি দ্বারা যথারীতি ধৌত করবেন। তাহলে তাই যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ।

প্রশ্ন-১৫: ফরজ গোসলের পর যদি হাঁটুর ওপর এবং নাভির নিচে কাপড় থাকে আর এমতাবস্থায় যদি আমার মা, চাচী, বাবা বা এরকম কেউ দেখে তাহলে কি পুনরায় কি ওজু করতে হবে না কি তাতেই হবে?
উত্তর:
নাভির নিচে কাপড় থাকা অবস্থায় মা, চাচী বা অন্য কেউ দেখলে তাতে ওজুর কোন ক্ষতি হবে না। সুতরাং এতে পুনরায় ওজু করার দরকার নাই। তবে মানুষের সামনে নাভি খোলা রাখা বৈধ নয়। কারণ তা সতরের অন্তর্ভুক্ত।

প্রশ্ন-১৬: এক্সিডেন্টের কারণে হাত-পায়ের চামড়া ছিলে গেছে। এখন ক্ষতস্থানে পানি লাগানো যাবে না। যার কারণে ওজু করা সম্ভব নয়। আশেপাশে মাটিও নেই যে তায়াম্মুম করবো। এখন কি নিয়তের মাধ্যমে ইশারায় ওজু করে সালাত আদায় করা যাবে? না কী করণীয় আছে? কয়েক ওয়াক্ত সালাত মিস হয়ে গেছে। সেগুলা সহ কাজা আদায় করে নেয়া যাবে কি না?
উত্তর:
আল্লাহ আপনাকে দ্রুত সুস্থতা দান করুন। আমিন।
অত:পর, হাত-পা আহত হওয়ার ফলে ক্ষতস্থানে যদি পানি লাগানো সম্ভব না হয় অর্থাৎ এতে আরোগ্য বিলম্বিত হওয়া বা সমস্যা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকে তাহলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে সালাত আদায় করতে হবে। কিন্তু যদি কোন কারণে পবিত্র মাটিও সংগ্রহ করা সম্ভব না হয় তাহলে ঐ অবস্থায় (ওজু বা তায়াম্মুম ছাড়াই) সালাত আদায় করতে হবে। তাতে ইনশাআল্লাহ পরিপূর্ণ সওয়াব পাওয়া যাবে। পরবর্তীতে উক্ত সালাত পুনরায় কাজা করার প্রয়োজন নাই।
আল্লাহ বলেন, “তোমরা যতটকু সাধ্যে কুলোয় ততটুকু আল্লাহকে ভয় করো।” তিনি আরও বলেন, “আল্লাহ কারো উপর তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না।”

ইবনে হাযাম রহ. এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
قال ابن حزم :
ومن كان محبوساً في حضَرٍ أو سفرٍ بحيث لا يجد تراباً ولا ماءً أو كان مصلوباً وجاءت الصلاة فليصلِّ كما هو وصلاته تامة ولا يعيدها ، سواء وجد الماء في الوقت أو لم يجده إلا بعد الوقت
প্রশ্ন-১৭: বীর্য নির্গত হওয়ার পর অঙ্গ ধৌত করে ওজু ছাড়াই পবিত্র বিছানায় শয়ন করা যাবে কী?
উত্তর:
হ্যাঁ, শোয়া যাবে। তবে বিছানার চাদরে বীর্য লাগলে তা ধৌত করে নেয়া ভালো।

প্রশ্ন-১৮: যাদের প্রস্রাবের খুব সমস্যা আছে-এক রকম অসুখ বলতে পারেন-তারা কাপড় পবিত্র রাখতে পারে না। হাঁচি বা কাশি দিলে কাপড় নষ্ট হয়ে যায়। নামাজের মধ্যেও এই সমস্যা হয়। বার বার অজু করাও কষ্টসাধ্য। তবে তাদের জন্য কী করণীয়? তারা কিভাবে সালাত আদায় করবে?
উত্তর:
ফোটা-ফোটা পেশাব পড়া বা বহুমূত্র রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য বিধান হল, সে প্রত্যেক ওয়াক্তে ওজু করে নিম্নদেশে আন্ডার ওয়্যার বা কাপড় বেধে সালাত আদায় করবে যেন, পেশাব পা বেয়ে নিচে গড়িয়ে না পড়ে। নামাজরত অবস্থায় হাঁচি বা কাশি দিলে কাপড় নষ্ট হলে বা পেশাব নির্গত হলেও তাতে সালাতে কোনও ক্ষতি হবে না ইনশাআল্লাহ। কেননা সে অসুস্থ (অপারগ)। মহান আল্লাহ বলেন,
اتَّقُوا اللَّـهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ
“তোমরা সাধ্য অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় করো।” [সূরা তাগাবুন: ১৬]

তিনি আরও বলেন,
يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلاَّ وُسْعَهَا

“আল্লাহ তা’আলা কারো উপর তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব চাপান না।” [সূরা বাকারা: ২৮৬ নং আয়াত]

উল্লেখ্য যে, এ অবস্থায় পেশাব নির্গত হলে বারবার ওজু করার প্রয়োজন নাই বরং কাপড় পরিবর্তন করবে এবং একবার ওজু করে এক ওয়াক্তের পুরো সালাত আদায় করবে। নতুন ওয়াক্ত এলে পুনরায় নতুনভাবে ওজু করে সালাত আদায় করবে। এক ওজুতে একাধিক ওয়াক্তের সালাত আদায় করবে না। তবে এ সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।

আল্লাহই রোগ-ব্যাধি থেকে শিফা দানকারী।

প্রশ্ন-১৯: ওজু করার সময় ভুলে যাই যে, হাত ৩ বার ধৌত করলাম নাকি ২ বার। মুখমণ্ডল ৩ বার ধৌত করলাম না কি ২ বার। এ রকম হলে কি ওজু শুদ্ধ হবে? আর ওই ওজু দ্বারা কি সালাত শুদ্ধ হবে?
উত্তর:
অজুতে যে সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ধৌত করতে হয় সেগুলো পরিপূর্ণভাবে ভিজলেই ওজু শুদ্ধ হবে। সে ক্ষেত্রে পানি নেওয়ার সর্বোচ্চ পরিমাণ হল, তিন বার। কিন্তু একবার অথবা দু বার পানি দ্বারাই যদি ওজুর অঙ্গটি পরিপূর্ণভাবে ভিজে যায় তাহলে তাতেই যথেষ্ট হবে। অনুরূপভাবে হাত-পা ধোয়ার ক্ষেত্রে যদি পানি ব্যবহারের সংখ্যায় কমবেশি হয় অর্থাৎ কোনও অঙ্গে একবার অপরটিতে দু বার বা তিন বার পানি নেওয়া হয় তাহলে তাতেও কোনও সমস্যা নেই।

মোটকথা, ওজুর অঙ্গগুলো পরিপূর্ণভাবে ভেজাতে হবে। তবে তিন বারের বেশি পানি নেওয়া ঠিক নয়।

প্রশ্ন-২০: এক বোনের প্রেগনেন্সির কারণে ঘন ঘন বাথরুমে যেতে হয়। পাশাপাশি বারবার কাপড় নষ্ট করে ফেলে। ফলে তার জন্য প্রতিবার কাপড় চেঞ্জ করাও কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে সে কি প্রতিবার কাপড় পরিবর্তন করবে নাকি ভেতরে কিছু কাপড় নিতে পারে?
উত্তর:
আল্লাহ তাআলা উক্ত বোনের বিষয়টিকে সহজ করে দিন। আমিন।
এই পরিস্থিতিতে বারবার কাপড় পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। বরং কেবল নামাজের পূর্বে পরিচ্ছন্নতা অর্জন করার পর ভিতরে আন্ডারওয়্যার বা প্যাড পরিধান করবে বা একটি কাপড় বেঁধে নিবে। যেন নাপাকি পা বেয়ে নিচে গড়িয়ে না পড়ে। তারপর পবিত্র কাপড় পড়ে অজু করে সালাত আদায় করবে।

প্রশ্ন-২১ ওজু করার পর কালেমা শাহাদাত এবং একাধিক দুআ আছে যেগুলো পাঠ করায় অনেক ফজিলত রয়েছে! এই দুআগুলো ওজুর স্থানেই বসে পড়া আবশ্যক নাকি ওজু করে ঘরে আসার সময় হাঁটতে হাঁটতে পড়তে পারবো? তা কীভাবে পড়া উত্তম?

উত্তর:
ওজুর পরে পঠিতব্য কালিমা শাহাদাত পাঠ করার হাদিসে ‘ওজুর স্থানে বসে পাঠ করতে হবে’ এমন কোনও কথা বলা হয়নি।

সুতরাং অজু করার পর যথাস্থানে বসে পাঠ করুন অথবা দাঁড়িয়ে বা হাঁটতে হাঁটতে পাঠ করুন তাতে কোন সমস্যা নেই।

ওজু শেষ করার পর পরই তা পাঠ করলে হাদিস অনুযায়ী জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হবে। সে তার ইচ্ছা অনুযায়ী যেকোনো দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে ইনশাআল্লাহ-যে অবস্থায়ই তা পাঠ করা হোক না কেন।

ওজুর করার পর সুন্নত হল, ওজু শেষের দুআ পাঠ করা। যেমন: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পরিপূর্ণ রূপে ওজু করার পর পাঠ করবে:

أَشْهَدُ أَنْ لاَّ إِلهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ

“আশহাদু আল লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু অহ্‌দাহু লা শারীকা লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসূলুহ্‌।” তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা উন্মুক্ত করা হবে সে যে কোনও দরজা দিয়ে ইচ্ছে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।

দুআটির অর্থ: “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন উপাস্য নেই। তিনি একক। তাঁর কোন শরিক নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বান্দা ও রাসূল।” [সহিহ মুসলিম]

এ ছাড়াও হাদিসে ওজুর পরে পাঠ করার একাধিক দুআ বর্ণিত হয়েছে। সেগুলো থেকে এক বা একাধিক দুআ পাঠ করা যাবে। তা ওজুর স্থানে বসে পাঠ করা হোক অথবা হাঁটতে হাঁটতে পাঠ করা হোক তাতে কোনও আপত্তি নাই ইনশাআল্লাহ।

প্রশ্ন-২২: হাত দ্বারা কুকর ধরলে কিংবা হাত বা কাপড়ে কুকুরের শরীরের স্পর্শ লাগলে কি ওজু নষ্ট হয়ে যাবে?
উত্তর:
এতে ওজু নষ্ট হবে না। কেননা নাপাক বস্তু স্পর্শ করা ওজু ভঙ্গের কারণ নয়।

প্রশ্ন-২৩: অনেক সময় দেখা যায়, মসজিদের ভেতর এবং নিজের রুমের ভেতর টিকটিকির বিষ্ঠা পড়ে থাকে। ওজু অবস্থায় যদি এই বিষ্ঠা পায়ের নিচে বা শরীরে কোথাও স্পর্শ লাগে তাহলে কি ওজু নষ্ট হয়ে যাবে বা বিষ্ঠা পড়া জায়গাটি অপবিত্র হয়ে যাবে?
উত্তর:
টিকটিকি একটি ক্ষতিকারক ও বিষাক্ত প্রাণী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লাম একে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন [বুখারী ও মুসলিম]। এটি খাওয়া হারাম। কেননা আল্লাহ বলেন, তিনি তাদের জন্য পবিত্র বিষয় সমূহ হালাল করেছেন ও অপবিত্র বিষয় সমূহ নিষিদ্ধ করেছেন’ [আ‘রাফ ৭/১৫৭]
আর ইসলামের মূলনীতি হল, যে প্রাণী খাওয়া হারাম, তার মল-মূত্র নাপাক। অতএব তা কাপড়ে, শরীরে বা মসজিদের মেঝেতে লেগে গেলে তা নাপাক হয়ে যাবে। সুতরাং তা ধৌত করা বা পরিষ্কার করা আবশ্যক।

প্রশ্ন-২৪: বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করালে কি ওজু নষ্ট হবে?
উত্তর:
বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করালে ওজু নষ্ট হয় না। এটা ওজু ভঙ্গের কোনও কারণ নয়। পেশাব-পায়খানার রাস্তা ছাড়া শরীরের অন্য কোনও স্থান থেকে পবিত্র বস্তু বের হলে ওজু নষ্ট হয় না-এ ব্যাপারে আলেমদের মাঝে কোনও দ্বিমত নাই আল হামদুলিল্লাহ।

প্রশ্ন-২৫: ইমাম যদি বিনা ওজুতে জামাআতে সালাত পড়িয়ে ফেলে তাহলে ইসলামে তার কাফফারা কি?
উত্তর:
ইমাম যদি ভুল বশত: ওজু ছাড়া সালাত আদায় করেন এবং সালাত শেষ হওয়ার পর স্মরণ হয় তাহলে তার গুনাহ হবে না। কারণ সে তা ইচ্ছাকৃত ভাবে করে নি। তবে এ ক্ষেত্রে তার করণীয় হল, তৎক্ষণাৎ ওজু করে নিজে নিজে উক্ত সালাত পড়ে নেওয়া।

কিন্তু ইচ্ছাকৃত ভাবে এমনটি করলে সে গুনাহগার হবে। কারণ ওজু ছাড়া সালাত আদায় করা হারাম। এ ক্ষেত্রে তার করণীয় হল, আল্লাহর কাছে লজ্জিত অন্তরে তওবা করত: ওজু করে নিজে নিজে উক্ত সালাত পড়ে নেওয়া।

কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই মুক্তাদিদের জন্য উক্ত সালাত পুনরায় পড়ার প্রয়োজন নাই। কারণ তারা যথারীতি পবিত্র অবস্থায় সালাত আদায় করেছে। এ ক্ষেত্রে ইমামের ত্রুটি মুসল্লিরা বহন করবে না।

অনুরূপভাবে সালাত রত অবস্থায় যদি ইমামের স্মরণ হয় যে, তার ওজু ছিল না তাহলে তার পেছনের একজন মুক্তাদিকে তার স্থানে স্থলাভিষিক্ত করে ওজু করার জন্য মসজিদ থেকে বের হয়ে যাবে। এতেও মুক্তাদির সালাতের কোনও সমস্যা হবে না।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

শরীর থেকে রক্ত নির্গত হলে ওজু নষ্ট হবে কি? মতবিরোধ এবং সমাধান

 শরীর থেকে রক্ত নির্গত হলে তাতে ওজু ভঙ্গ হবে কি না-সে বিষয়ে বিজ্ঞ আলেমদের মাঝে দ্বিমত সৃষ্টি হয়েছে। তবে অধিক বিশুদ্ধ মতে, তা ওজু ভঙ্গের কারণ নয়।

নিম্নে এ বিষয়ে বিংশ শতকের অন্যতম দুই শ্রেষ্ঠ ফকিহ সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি আল্লামা আব্দুল্লাহ বিন বায রাহ. এবং আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ. এর ফতোয়া তুলে ধরা হল:

❑ শাইখ উসাইমিন রাহ এর ফতোয়া:

প্রশ্ন: আহত স্থান থেকে রক্ত বের হলে কি ওজু নষ্ট হবে? না কি যে স্থান থেকে রক্ত বের হয়েছে তা পরিষ্কার করাই যথেষ্ট?
উত্তর:
“সঠিক কথা হল, পেশাব-পায়খানার স্থান ছাড়া শরীরের অন্য কোনও স্থান থেকে রক্ত বের হলে ওজু ভঙ্গ হবে না-চাই নাক থেকে বের হোক (এপিসট্যাক্সিস) বা আহত স্থান থেকে বের হোক বা রক্ত পরীক্ষার জন্য ইচ্ছাকৃত বের করা হোক। বেশি হোক বা কম হোক। এসব কারণে ওজু ভঙ্গ হবে না-এটাই অগ্রাধিকার যোগ্য মত। কারণ এতে ওজু ভঙ্গ হওয়ার কোন দলিল নেই। আর ওজু ভঙ্গ হওয়া শরিয়তের একটি বিধান- যার পক্ষে দলিল থাকা প্রয়োজন। ওজু সাব্যস্ত হয়েছে শরিয়তের দলিলের মাধ্যমে। আর যা শরিয়তের দলিলের মাধ্যমে সাব্যস্ত হয়েছে তা শরিয়তের দলিল ছাড়া বাতিল হবে না। কিন্তু পেশাব-পায়খানার রাস্তা ছাড়া শরীরের অন্য কোন স্থান থেকে রক্ত বের হলে ওজু ভঙ্গ হওয়ার পক্ষে কোনও দলিল নাই। চাই তা রক্ত হোক বা পুঁজ হোক বা বমি হোক।

যেহেতু তা পেশাব-পায়খানার রাস্তা দিয়ে বের হয় নি তাই তাতে ওজু নষ্ট হবে না-চাই কম হোক বা বেশি হোক। তবে শরীরের কোনও অঙ্গ থেকে বেশি পরিমাণে রক্ত বের হলে তাহলে তা ধুয়ে ফেলবে। যেমনটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ফাতিমা রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মুখমণ্ডল থেকে রক্ত ধুয়ে দিতেন যখন উহুদ যুদ্ধে তিনি আহত হয়েছিলেন।”
[উৎস: নূরুন আলাদ দারব (সৌদি আরবে বিখ্যাত ইসলামি প্রশ্নোত্তর বিষয়ক রেডিও প্রোগ্রাম]

❑ শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বায রাহ. বলেন,

“যদি রক্ত স্বল্প পরিমাণে হয়-যেমন: সামান্য আহত হওয়া-তাহলে তাতে ওযু ভঙ্গ হবে না। তার ওযু সহিহ। কিন্তু রক্ত বেশি পরিমাণে হলে এ ব্যাপারে আলেমগণ মতভেদ করেছেন। কেউ কেউ মনে করেন, এতে অজু ভঙ্গ হয়ে যাবে। কারো কারো মতে শরীর আহত হলে বা তাতে ক্ষত সৃষ্টি হলে ওজু বাতিল হয়ে যাবে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন যে, এতে ওযু বাতিল হবে না। অর্থাৎ এ সংক্রান্ত হাদিসগুলো স্পষ্ট নয় এবং যেগুলো স্পষ্ট সেগুলো সহিহ নয়।

তাই মুমিনের জন্য নিরাপদ হল, যদি প্রচুর পরিমাণে রক্ত নির্গত হয় তাহলে সালাত কাজা করে নিবে (অর্থাৎ ঐ অবস্থায় সালাত পড়ে থাকলে ওজু করে পুনরায় সালাত কাজা করে নিবে) মতানৈক্য থেকে দূরে থাকার স্বার্থে এবং দীনের ব্যাপারে সতর্কতা হিসেবে। তবে রক্ত হালকা ও সামান্য হলে তা ক্ষমার্হ।”

◯ শরীর থেকে রক্ত নির্গত হলে ওজু নষ্ট না হওয়ার পক্ষে হাদিসের দলিল:

ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক, মদিনার সাত ফকিহ প্রমুখ ফকিহগণ রক্ত নির্গত হওয়ার কারণে ওজু ভঙ্গ না হওয়ার পক্ষে নিম্নোক্ত হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করেন:

সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে, জাবের বিন আব্দুল্লাহ হতে বর্ণিত তিনি বলেন, যাতুর রিকা যুদ্ধের পরে গাতফান থেকে মদিনা ফেরত আসার পথে রাতের বেলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিম সৈন্যদের প্রহরায় আম্মার বিন ইয়াসের রা. এবং আব্বাদ বিন বিশর রা. কে নিযুক্ত করে সকলে ঘুমিয়ে পড়লেন। আব্বাদ রা. প্রহরায় নিয়োজিত থাকার সময়টা আল্লাহর ইবাদতে কাটানোর উদ্দেশ্যে সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন। ইত্যবসরে, এক মুশরিক তাকে উদ্দেশ্য করে পরপর তিনটি তীর নিক্ষেপ করলো। কিন্তু তিনি প্রতিবার শরীর থেকে তীর বের করে সালাত অব্যাহত রাখলেন। তারপর সালাত সমাপ্ত করার পর তার সঙ্গী আম্মার বিন ইয়াসের রা. আব্বাদ রা. এর শরীর থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে দেখে বললেন, প্রথম তীর নিক্ষিপ্ত হওয়ার সাথে সাথে তুমি কেন আমাকে জাগিয়ে দাও নি? তিনি বললেন, “আমি এমন একটি সূরা তিলাওয়াত করছিলাম যা বন্ধ করতে চাই নি।”
[রাগিব সারজানি-সিরাতে নববী ৩৫ তম খণ্ড ৮ম পৃষ্ঠা-অনলাইন ভার্সন]

ঘটনাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জেনেছেন। কিন্তু রক্ত প্রবাহিত হওয়া স্বত্বেও সালাত অব্যাহত রাখার বিষয়ে তিনি আপত্তি করেন নি। এতে ওজু নষ্ট হলে তিনি অবশ্যই তাকে বলতেন যে, শরীর থেকে রক্ত বের হওয়ার কারণে তোমার ওজু ভঙ্গ হয়ে গিয়েছিলো। তাই এভাবে তোমার সালাত শুদ্ধ হয় নি। কিন্তু তিনি তা বলেন নি।

কিন্তু হানাফি মাজহাব সহ অন্যান্য আলেম যারা বলেছেন, শরীর থেকে রক্ত নির্গত হলে ওজু নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের কথার পক্ষ কোনও হাদিসের দলিল নাই কিয়াস বা যুক্তি ছাড়া। তাদের মতে, শরীর থেকে পেশাব-পায়খানা বের হলে যদি ওজু নষ্ট হয় তাহলে রক্ত বের হলেও ওজু নষ্ট হবে। কারণ প্রবাহিত রক্তও নাপাক। কিন্তু হাদিসের বিপরীতে কিয়াস বা যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।

সুতরাং অধিক বিশুদ্ধ মতে, পেশাব-পায়খানার রাস্তা ছাড়া শরীরের অন্য কোনও স্থান থেকে রক্ত নির্গত হলে তাতে ওজু নষ্ট হবে না। বরং তা ধৌত করা বা কাপ, টিস্যু ইত্যাদি দ্বারা ভালোভাবে তা পরিষ্কার করে নেওয়াই যথেষ্ট। তবে সতর্কতা এবং মতবিরোধ থেকে বাঁচার স্বার্থে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণ রক্ত নির্গত হলে কেউ যদি পুনরায় ওজু করে নেয় তাহলে তা উত্তম-যেমনটি বলেছেন, শাইখ বিন বায রাহ.।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate