Tuesday, December 21, 2021

মা-বাবার মৃত্যুর পর তাদের জন্য করণীয় আমলসূমহ

 রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

 

লেখকঃ হাবিবুল্লাহ মুহাম্মাদ ইকবাল | অনুবাদক : আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া | প্রকাশনায় : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ

إن الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد

মা-বাবা ছোট শব্দ, কিন্তু এ দুটি শব্দের সাথে কত যে আদর, স্নেহ, ভালবাসা রয়েছে  তা পৃথিবীর কোন মাপযন্ত্র দিয়ে নির্ণয় করা যাবে না। মা-বাবা কত না কষ্ট করেছেন, না খেয়ে থেকেছেন, অনেক সময় ভাল পোষাকও পরিধান করতে পারেন নি, কত না সময় বসে থাকতেন সন্তানের অপেক্ষায়। সেই মা বাবা যাদের চলে গিয়েছেন, তারাই বুঝেন মা বাবা কত বড় সম্পদ। যেদিন থেকে মা বাবা দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন সেদিন থেকে মনে হয় কী যেন হারিয়ে গেল,তখন বুক কেঁপে উঠে, চোখ থেকে বৃষ্টির মত পানি ঝরে, কী শান্তনাই বা তাদেরকে দেয়া যায়!  সেই মা বাবা যাদের চলে গিয়েছে তারা কি মা-বাবার জন্য কিছুই করবে না?। এত কষ্ট করে আমাদের কে যে মা-বাবা লালন পালন করেছেন তাদের জন্য আমাদের কি কিছুই করার নেই? অবশ্যই আছে। আলোচ্য প্রবন্ধে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মৃত মা-বাবা জন্য কী ধরনের আমল করা যাবে এবং যে আমলের সওয়াব তাদের নিকট পৌছবে তা উল্লেখ করা হলো:

১. বেশী বেশী দু‘আ করা 

মা-বাবা দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পর সন্তান মা-বাবার জন্য বেশী বেশী দু‘আ করবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে দু‘আ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং কী দু‘আ করবো তাও শিক্ষা দিয়েছেন । আল-কুরআনে এসেছে,

 رَبِّ ٱرۡحَمۡهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرٗا ٢٤ ﴾ [الاسراء: ٢٤]

‘‘হে আমার রব, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন’’ [সূরা বানী ইসরাঈলঃ ২৪]

رَبَّنَا ٱغۡفِرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيَّ وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ يَوۡمَ يَقُومُ ٱلۡحِسَابُ ٤١﴾ [ابراهيم: ٤١]

‘‘হে আমাদের রব, রোজ কিয়ামতে আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সকল মুমিনকে ক্ষমা করে দিন’’ [সুরা ইবরাহীমঃ৪১]

এছাড়া আলস্নাহ রাববুল আলামীন পিতা-মাতার জন্য দূ‘আ করার বিশেষ নিয়ম শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেনঃ

 رَّبِّ ٱغۡفِرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيۡتِيَ مُؤۡمِنٗا وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتِۖ وَلَا تَزِدِ ٱلظَّٰلِمِينَ إِلَّا تَبَارَۢا ٢٨ ﴾ [نوح: ٢٨

‘হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যে আমার ঘরে ঈমানদার হয়ে প্রবেশ করবে তাকে এবং মুমিন নারী-পুরুষকে ক্ষমা করুন এবং ধ্বংস ছাড়া আপনি যালিমদের আর কিছুই বাড়িয়ে দেবেন না ’[সূরা নুহ: ২৮] ।

 

মা-বাবা এমন সন্তান রেখে যাবেন যারা তাদের জন্য দোয়া করবে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

« إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ ».

অর্থ: মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার যাবতীয় আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে ৩ টি আমল বন্ধ হয় না-১. সদকায়ে জারিয়া  ২. এমন জ্ঞান-যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় ৩. এমন নেক সন্তান- যে তার জন্য দু‘আ করে [সহিহ মুসলিম: ৪৩১০]

মূলত: জানাযার নামায প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মৃত ব্যক্তির জন্য দু‘আ স্বরূপ।

২. দান-ছাদকাহ করা, বিশেষ করে সাদাকায়ে জারিয়াহ প্রদান করাঃ

মা-বাবা বেচে থাকতে দান-সাদকাহ করে যেতে পারেন নি বা বেচে থাকলে আরো দান-সদকাহ করতেন, সেজন্য তাদের পক্ষ থেকে  সন্তান দান-সদকাহ করতে পারে। হাদীসে এসেছে,

عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ رَجُلاً أَتَى النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم- فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أُمِّىَ افْتُلِتَتْ نَفْسَهَا وَلَمْ تُوصِ وَأَظُنُّهَا لَوْ تَكَلَّمَتْ تَصَدَّقَتْ أَفَلَهَا أَجْرٌ إِنْ تَصَدَّقْتُ عَنْهَا قَالَ « نَعَمْ »

অর্থ: আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেনঃ ‘‘জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমার মা হঠাৎ মৃতু বরণ করেছেন। তাই কোন অছিয়ত করতে পারেন নি। আমার ধারণা তিনি যদি কথা বলার সুযোগ পেতেন তাহলে দান-ছাদকা করতেন। আমি তাঁর পক্ষ থেকে ছাদকা করলে তিনি কি এর ছাওয়াব পাবেন ? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন হ্যাঁ, অবশ্যই পাবেন।’’ [সহীহ মুসলিম:২৩৭৩]

তবে সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে সাদাকায়ে জারিয়া বা প্রবাহমান ও চলমান সাদাকা প্রদান করা। যেমন পানির কুপ খনন করা, (নলকুপ বসানো, দ্বীনী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, কুরআন শিক্ষার জন্য মক্তব ও প্রতিষ্ঠান তৈরী করা, স্থায়ী জনকল্যাণমূলক কাজ করা। ইত্যাদি।

৩. মা-বাবার পক্ষ থেকে সিয়াম  পালনঃ

মা-বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় যদি তাদের কোন মানতের সিয়াম কাযা থাকে, সন্তান তাদের পক্ষ থেকে সিয়াম পালন করলে তাদের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

«مَنْ مَاتَ  وَعَلَيْهِ صِيَامٌ صَامَ عَنْهُ وَلِيُّهُ»

অর্থ: ‘‘যে ব্যক্তি মৃত্যু বরণ করল এমতাবস্থায় যে তার উপর রোজা ওয়াজিব ছিল। তবে তার পক্ষ থেকে তার ওয়ারিসগণ রোজা রাখবে’’ [সহীহ বুখারী:১৯৫২]।

অধিকাংশ আলেমগণ এ হাদীসটি শুধুমাত্র ওয়াজিব রোযা বা মানতের রোযার বিধান হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তাদের পক্ষ থেকে নফল সিয়াম রাখার পক্ষে দলীল নাই।

৪. হজ্জ বা উমরাহ করাঃ

মা-বাবার পক্ষ থেকে হজ্জ বা উমরাহ করলে তা আদায় হবে এবং তারা  উপকৃত হবে। ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত হাদীসে এসেছে,

«أَنَّ امْرَأَةً مِنْ جُهَيْنَةَ جَاءَتْ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَتْ إِنَّ أُمِّي نَذَرَتْ أَنْ تَحُجَّ فَلَمْ تَحُجَّ حَتَّى مَاتَتْ أَفَأَحُجُّ عَنْهَا قَالَ نَعَمْ حُجِّي عَنْهَا أَرَأَيْتِ لَوْ كَانَ عَلَى أُمِّكِ دَيْنٌ أَكُنْتِ قَاضِيَةً اقْضُوا اللَّهَ فَاللَّهُ أَحَقُّ بِالْوَفَاءِ»

অর্থ: ‘‘ জুহাইনা গোত্রের একজন মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আগমণ করে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমার মা হজ্জ করার মানত করেছিলেন কিন্তু তিনি হজ্জ সম্পাদন না করেই মারা গেছেন। এখন আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করতে পারি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘তুমি তোমার মায়ের পক্ষ থেকে হজ্জ কর। তোমার কি ধারণা যদি তোমার মার উপর ঋণ থাকতো তবে কি তুমি তা পরিশোধ করতে না ? সুতরাং আল্লাহর জন্য তা আদায় কর। কেননা আল্লাহর দাবী পরিশোধ করার অধিক উপযোগী’’ [সহীহ বুখারী: ১৮৫২]

তবে মা-বাবার পক্ষ থেকে যে লোক হজ্জ বা ওমরাহ করতে চায় তার জন্য শর্ত হলো সে আগে নিজের হজ্জ-ওমরাহ করতে হবে।

৫. মা-বাবার পক্ষ থেকে কুরবানী করাঃ

মা-বাবার পক্ষ থেকে কুরবানী করলে তার ছাওয়াব দ্বারা তারা উপকৃত হবে। এ বিষয়ে হাদীসে এসেছে,

عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَمَرَ بِكَبْشٍ أَقْرَنَ يَطَأُ فِى سَوَادٍ وَيَبْرُكُ فِى سَوَادٍ وَيَنْظُرُ فِى سَوَادٍ فَأُتِىَ بِهِ لِيُضَحِّىَ بِهِ فَقَالَ لَهَا « يَا عَائِشَةُ هَلُمِّى الْمُدْيَةَ » ثُمَّ قَالَ « اشْحَذِيهَا بِحَجَرٍ ». فَفَعَلَتْ ثُمَّ أَخَذَهَا وَأَخَذَ الْكَبْشَ فَأَضْجَعَهُ ثُمَّ ذَبَحَهُ ثُمَّ قَالَ « بِاسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنْ مُحَمَّدٍ وَآلِ مُحَمَّدٍ وَمِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ ». ثُمَّ ضَحَّى بِهِ.

অর্থ: আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন একটি শিংযুক্ত দুম্বা উপস্থিত করতে নির্দেশ দিলেন, যার পা কালো, চোখের চতুর্দিক কালো এবং পেট কালো। অতঃপর তা কুরবানীর জন্য আনা হলো। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বললেন, হে আয়েশা! ছুরি নিয়ে আস, তারপর বললেন, তুমি একটি পাথর নিয়ে তা দ্বারা এটাকে ধারালো কর। তিনি তাই করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুরি হাতে নিয়ে দুম্বাটিকে শুইয়ে দিলেন। পশুটি যবেহ্ করার সময় বললেন, বিসমিল্লাহ, হে আল্লাহ তুমি এটি মুহাম্মাদ, তাঁর বংশধর এবং সকল উম্মাতে মুহাম্মাদীর পক্ষ থেকে কবুল কর”। এভাবে তিনি তা দ্বারা কুরবানী করলেন। [ সহীহ মুসলিম:৫২০৩]

৬. মা-বাবার ওসিয়ত পূর্ণ করা

মা-বাবা শরীয়াহ সম্মত কোন ওসিয়ত করে গেলে তা পূর্ণ করা সন্তানদের উপর দায়িত্ব। রাশীদ ইবন সুয়াইদ আসসাকাফী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

«قُلْتُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، إِنَّ أُمِّي أَوْصَتْ أَنْ نُعْتِقُ عَنْهَا رَقَبَةً ، وَعِنْدِي جَارِيَةٌ سَوْدَاءُ ، قَالَ : ادْعُ بِهَا ، فَجَاءَتْ ، فَقَالَ : مَنْ رَبُّكِ ؟ قَالَتِ : اللَّهُ ، قَالَ : مَنْ أَنَا ؟ قَالَتْ : رَسُولُ اللَّهِ ، قَالَ : أَعْتِقْهَا ، فَإِنَّهَا مُؤْمِنَةٌ».

অর্থ: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম হে আল্লাহর রাসুল, আমার মা একজন দাসমুক্ত করার জন্য ওসিয়ত করে গেছেন। আর আমার নিকট কালো একজন দাসী আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে ডাকো, সে আসল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে প্রশ্ন করলেন, তোমার রব কে ? উত্তরে সে বলল, আমার রব আল্লাহ। আবার প্রশ্ন করলেন আমি কে ? উত্তরে সে বলল, আপনি আল্লাহর রাসুল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে মুক্ত করে দাও; কেন না সে মু’মিনা । [সহীহ ইবন হিববান :১৮৯]

৭. মা-বাবার বন্ধুদের সম্মান করা 

মা-বাবার বন্ধুদের সাথে ভাল ব্যবহার করা, সম্মান করা, তাদেরকে দেখতে যাওয়া,তাদেরকে হাদিয়া দেয়া। এ বিষয়ে হাদীসে উল্লেখ আছে,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ دِينَارٍ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ أَنَّ رَجُلاً مِنَ الأَعْرَابِ لَقِيَهُ بِطَرِيقِ مَكَّةَ فَسَلَّمَ عَلَيْهِ عَبْدُ اللَّهِ وَحَمَلَهُ عَلَى حِمَارٍ كَانَ يَرْكَبُهُ وَأَعْطَاهُ عِمَامَةً كَانَتْ عَلَى رَأْسِهِ فَقَالَ ابْنُ دِينَارٍ فَقُلْنَا لَهُ أَصْلَحَكَ اللَّهُ إِنَّهُمُ الأَعْرَابُ وَإِنَّهُمْ يَرْضَوْنَ بِالْيَسِيرِ. فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ إِنَّ أَبَا هَذَا كَانَ وُدًّا لِعُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ وَإِنِّى سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- يَقُولُ « إِنَّ أَبَرَّ الْبِرِّ صِلَةُ الْوَلَدِ أَهْلَ وُدِّ أَبِيهِ ».

অর্থ: আব্দুল্লাহ ইবনে দীনার রাদিয়াল্লাহু আনহু আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, একবার মক্কার পথে চলার সময় আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর এক বেদুঈন এর সাথে দেখা হলে তিনি তাকে সালাম দিলেন এবং তাকে সে গাধায় চড়ালেন যে গাধায় আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা উপবিষ্ট ছিলেন এবং তাঁর (আব্দুল্লাহ) মাথায় যে পাগড়িটি পরা ছিলো তা তাকে প্রদান করলেন। আব্দুল্লাহ ইবান দীনার রাহেমাহুল্লাহ বললেন, তখন আমরা আব্দুল্লাহকে বললাম: আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুক! এরা গ্রাম্য মানুষ: সামান্য কিছু পেলেই এরা সন্তুষ্ট হয়ে যায়-(এতসব করার কি প্রয়োজন ছিলো?) উত্তরে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তার পিতা, (আমার পিতা) উমার ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর বন্ধু ছিলেন। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি “পুত্রের জন্য পিতার বন্ধু-বান্ধবের সাথে ভাল ব্যবহার করা সবচেয়ে বড় সওয়াবের কাজ’’ [সহীহ মুসলিম:৬৬৭৭]।

মৃতদের বন্ধুদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আমলও আমাদেরকে উৎসাহিত করে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে,

«إِذَا ذَبَحَ الشَّاةَ فَيَقُولُ « أَرْسِلُوا بِهَا إِلَى أَصْدِقَاءِ خَدِيجَةَ »

অর্থ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোন বকরী যবেহ করতেন, তখনই তিনি বলতেন, এর কিছু অংশ খাদীজার বান্ধবীদের নিকট পাঠিয়ে দাও [সহীহ মুসলিম: ৬৪৩১]

৮. মা-বাবার আত্নীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখা

সন্তান তার মা-বাবার আত্নীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَنْ أَحَبَّ أَنْ يَصِلَ أَبَاهُ فِي قَبْرِهِ ، فَلْيَصِلْ إِخْوَانَ أَبِيهِ بَعْدَهُ»

‘যে ব্যক্তি তার পিতার সাথে কবরে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে ভালবাসে, সে যেন পিতার মৃত্যুর পর তার ভাইদের সাথে সু-সম্পর্ক রাখে’ [সহীহ ইবন হিববান:৪৩২]

৯. ঋণ পরিশোধ করা

মা-বাবার কোন ঋণ থাকলে তা দ্রুত পরিশোধ করা সন্তানদের উপর বিশেষভাবে কর্তব্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণের পরিশোধ করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। আবু হুরায়রা  রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«نَفْسُ الْمُؤْمِنِ مُعَلَّقَةٌ بِدَيْنِهً حَتَّى يُقْضَى عَنْهُ».

অর্থ: ‘‘মুমিন ব্যক্তির আত্মা তার ঋণের সাথে সম্পৃক্ত থেকে যায়; যতক্ষণ তা তা তার পক্ষ থেকে পরিশোধ করা হয়”। [সুনান ইবন মাজাহ:২৪১৩]

ঋণ পরিশোধ না করার কারণে জান্নাতের যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়; এমনকি যদি আল্লাহর রাস্তায় শহীদও হয় । হাদীসে  আরো এসেছে,

«مَا دَخَلَ الْجَنَّةَ حَتَّى يُقْضَى دَيْنُهُ»

অর্থ: যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দার ঋণ পরিশোধ না করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। [নাসায়ী ৭/৩১৪; তাবরানী ফিল কাবীর ১৯/২৪৮; মুস্তাদরাকে হাকিম ২/২৯]

১০. কাফফারা আদায় করা   

মা-বাবার কোন শপথের কাফফারা,ভুলকৃত হত্যাসহ কোন কাফফারা বাকী থাকলে সন্তান তা পূরণ করবে। আল-কুরআনে বলা হয়েছে,

﴿وَمَن قَتَلَ مُؤۡمِنًا خَطَ‍ٔٗا فَتَحۡرِيرُ رَقَبَةٖ مُّؤۡمِنَةٖ وَدِيَةٞ مُّسَلَّمَةٌ إِلَىٰٓ أَهۡلِهِۦٓ إِلَّآ أَن يَصَّدَّقُواْۚ ﴾ [النساء: ٩٢] 

অর্থ: যে ব্যক্তি ভুলক্রমে কোন মুমিনকে হত্যা করবে, তাহলে একজন মুমিন দাসকে মুক্ত করতে হবে এবং দিয়াত (রক্ত পণ দিতে হবে) যা হস্তান্তর করা হবে তার পরিজনদের কাছে। তবে তারা যদি সদাকা (ক্ষমা) করে দেয় (তাহলে সেটা ভিন্ন কথা) [ সূরা আন-নিসা:৯২]

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

« مَنْ حَلَفَ عَلَى يَمِينٍ فَرَأَى غَيْرَهَا خَيْرًا مِنْهَا فَلْيَأْتِهَا وَلْيُكَفِّرْ عَنْ يَمِينِهِ ».

অর্থ: ‘‘ যে ব্যক্তি কসম খেয়ে শপথ করার পর তার থেকে উত্তম কিছু করলেও তার কাফফারা অদায় করবে’’ [সহীহ মুসলিম: ৪৩৬০] ।

এ বিধান জীবিত ও মৃত সবার ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। দুনিয়ার বুকে কেউ অন্যায় করলে তার কাফফারা দিতে হবে। অনুরূপভাবে কেউ অন্যায় করে মারা গেলে তার পরিবার-পরিজন মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কাফফারা প্রদান করবেন।

১১. ক্ষমা প্রার্থনা করাঃ

মা-বাবার জন্য আল্লাহর নিকট বেশী বেশী ক্ষমা প্রার্থনা করা গুরুত্বপূর্ণ আমল। সন্তান মা-বাবার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করায় আল্লাহ তা‘আলা তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। হাদীসে বলা হয়েছে,

«عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ : تُرْفَعُ لِلْمَيِّتِ بَعْدَ مَوْتِهِ دَرَجَتُهُ . فَيَقُولُ : أَيْ رَبِّ ، أَيُّ شَيْءٍ هَذِهِ ؟ فَيُقَالُ : وَلَدُكَ اسْتَغْفَرَ لَكَ»

অর্থ: আবু হুরায়রা  রাদিয়াল্লাহু আনহু  হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মৃত্যুর পর কোন বান্দাহর মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়। তখন সে বলে হে আমার রব, আমি তো এতো মর্যাদার আমল করিনি, কীভাবে এ আমল আসলো ? তখন বলা হবে, তোমার সন্তান তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করায় এ মর্যাদা তুমি পেয়েছো’’ [আল-আদাবুল মুফরাদ:৩৬]।

মা-বাবা দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার পর তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার বিষয়ে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে এসেছে,

«عَنْ عُثْمَانَ ، قَالَ : وَقَفَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى قَبْرِ رَجُلٍ وَهُوَ يُدْفَنُ فَلَمَّا فَرَغَ مِنْهُ قَالَ : اسْتَغْفِرُوا لأَخِيكُمْ وَسَلُوا اللَّهَ لَهُ بالثَّبَاتِ ؛ فَإِنَّهُ يُسْأَلُ الآنَ».

অর্থ: উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন এক মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার কবরের পার্শ্বে দাঁড়ালেন এবং বললেন ‘‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তার জন্য ঈমানের উপর অবিচলতা ও দৃঢ়তা কামনা কর, কেননা এখনই তাকে প্রশ্ন করা হবে’’ [মুসনাদুল বাজ্জার :৪৪৫]।

তাই সুন্নাত হচ্ছে, মৃত ব্যক্তিকে কবরে দেয়ার পর তার কবরের পার্শ্বে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তার জন্য প্রশ্নোত্তর সহজ করে দেয়া, প্রশ্নোত্তর দিতে সমর্থ হওয়ার জন্য দো‘আ করা।

১২. মান্নত পূরণ করা 

মা-বাবা কোন মান্নত করে গেলে সন্তান তার পক্ষ থেকে পূরণ করবে। ইবন আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে,

«أَنَّ امْرَأَةً نَذَرَتْ أَنْ تَصُومَ شَهْرًا فَمَاتَتْ فَأَتَى أَخُوهَا النَّبِىَّ -صلى الله عليه وسلم- فَقَالَ :« صُمْ عَنْهَا ».

অর্থ: কোন মহিলা রোজা রাখার মান্নত করেছিল, কিন্তু সে তা পূরণ করার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করল। এরপর তার ভাই এ বিষয়ে  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলে তিনি বলরেন, তার পক্ষ থেকে সিয়াম পালন কর। [সহীহ ইবন হিববান:২৮০]

১৩. মা-বাবার ভাল কাজসমূহ জারী রাখা 

মা-বাবা যেসব ভাল কাজ অর্থাৎ মসজিদ তৈরী করা, মাদরাসা তৈরী করা, দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরীসহ যে কাজগুলো করে গিয়েছেন সন্তান হিসাবে তা যাতে অব্যাহত থাকে তার ব্যবস্থা করা। কেননা এসব ভাল কাজের সওয়াব তাদের আমলনামায় যুক্ত হতে থাকে। হাদীসে এসেছে,

«مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ »

‘‘ভাল কাজের পথপ্রদর্শনকারী এ কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ সাওয়াব পাবে’’। [সুনান আততিরমীযি : ২৬৭০]

«مَنْ سَنَّ فِى الإِسْلاَمِ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا بَعْدَهُ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَىْءٌ»

যে ব্যক্তির ইসলামের ভাল কাজ শুরু করল, সে এ কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ সাওয়াব পাবে। অথচ তাদেও সওয়াব থেকে কোন কমতি হবে না’’ [সহীহ মুসলিম:২৩৯৮]।

১৪. কবর যিয়ারত করা  

সন্তান তার মা-বাবার কবর যিয়ারত করবে। এর মাধ্যমে সন্তান এবং মা-বাবা উভয়ই উপকৃত হবে। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُورِ فَقَدْ أُذِنَ لِمُحَمَّدٍ فِى زِيَارَةِ قَبْرِ أُمِّهِ فَزُورُوهَا فَإِنَّهَا تُذَكِّرُ الآخِرَةَ»

অর্থ: আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম,অত:পর মুহাম্মাদের মায়ের কবর যিয়ারতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এখন তোমরা কবর যিয়রাত কর, কেননা তা আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয় [সুনান তিরমীযি :১০৫৪]।

যিয়রাত কর, কেননা তা আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয় [সুনান তিরমীযি :১০৫৪]।

কবর যিয়ারত কোন দিনকে নির্দিষ্ট করে করা যাবে না। কবর যিযারত করার সময় বলবে,

«السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ ، وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لاَحِقُونَ ، نَسْأَلُ اللَّهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ».

অর্থ: কবরবাসী মুমিন-মুসলিম আপনাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক । নিশ্চয় আমরা আপনাদের সাথে মিলিত হবো। আমরা আল্লাহর কাছে আপনাদের এবং আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি। [সুনান ইবন মাজাহ :১৫৪৭]

১৫. ওয়াদা করে গেলে তা বাস্তবায়ন করা    

মা-বাবা কারো সাথে কোন ভাল কাজের ওয়াদা করে গেলে বা এমন ওয়াদা যা তারা বেচে থাকলে করে যেতেন, সন্তান যথাসম্ভব তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে,

وَأَوۡفُواْ بِٱلۡعَهۡدِۖ إِنَّ ٱلۡعَهۡدَ كَانَ مَسۡ‍ُٔولٗا ٣٤ ﴾ [الاسراء: ٣٤] 

অর্থ: আর তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ কর, নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। [ সূরা বনী ইসরাঈল:৩৪]

১৬.কোন গুনাহের কাজ করে গেলে তা বন্ধ করা

মা-বাবা বেচে থাকতে কোন গুনাহের কাজের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে তা বন্ধ করবে বা শরীয়াহ সম্মতভাবে সংশোধন করে দিবে। কেননা আবু হুরায়রা  রাদিয়াল্লাহু আনহু  হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«وَمَنْ دَعَا إِلَى ضَلاَلَةٍ كَانَ عَلَيْهِ مِنَ الإِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ تَبِعَهُ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ آثَامِهِمْ شَيْئًا ».

এবং যে মানুষকে গুনাহের দিকে আহবান করবে, এ কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ গুনাহ তার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে। অথচ তাদের গুনাহ থেকে কোন কমতি হবে না’’ [সহীহ মুসলিম:৬৯৮০]।

১৭.মা-বাবার পক্ষ থেকে মাফ চাওয়া 

মা-বাবা বেচে থাকতে কারো সাথে খারাপ আচরণ করে থাকলে বা কারো উপর যুলুম করে থাকলে বা কাওকে কষ্ট দিয়ে থাকলে মা-বাবার পক্ষ থেকে তার কাছ থেকে মাফ মাফ চেয়ে নিবে অথবা ক্ষতি পূরণ দিয়ে দিবে।  কেননা হাদীসে এসেছে,

«عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ : أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : أَتَدْرُونَ مَنِ الْمُفْلِسُ ؟ قَالُوا : الْمُفْلِسُ فِينَا يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ لاَ دِرْهَمَ لَهُ ، وَلاَ مَتَاعَ لَهُ ، فَقَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : الْمُفْلِسُ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلاَتِهِ وَصِيَامِهِ وَزَكَاتِهِ ، فَيَأْتِي وَقَدْ شَتَمَ هَذَا ، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا ، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا وَضَرَبَ هَذَا ، فَيَقْعُدُ ، فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ ، وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُعْطِيَ مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ ، فَطُرِحَ عَلَيْهِ ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ».

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা কি জান নিঃস্ব ব্যক্তি কে? সাহাবীগণ বললেন, আমাদের মধ্যে যার সম্পদ নাই সে হলো গরীব লোক। তখন তিনি বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে সে হলো গরীব যে, কিয়ামতের দিন নামায, রোযা ও যাকাত নিয়ে আসবে অথচ সে অমুককে গালি দিয়েছে, অমুককে অপবাদ দিয়েছে, অন্যায়ভাবে লোকের মাল খেয়েছে, সে লোকের রক্ত প্রবাহিত করেছে এবং কাউকে প্রহার করেছে। কাজেই এসব নির্যাতিত ব্যক্তিদেরকে সেদিন তার নেক আমল নামা দিয়ে দেয়া হবে। এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। [সুনান আততিরমিযি :২৪২৮]

সুতরাং এ ধরনের নিঃস্ব ব্যক্তিকে মুক্ত করার জন্য তার হকদারদের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়া সন্তানের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

অল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে মা বাবার জন্য আমলগুলো করার তাওফীক দিন। আমীন!

وصلى الله على نبينا محمد وعلي اله وأصحابه ومن تبعهم بإحسان إلى يوم الدين- وأخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين


Monday, December 20, 2021

সালাতে কাতার সোজা করা ও পায়ের সাথে পা মিলানোর গুরুত্ব

 সলাত পৃথিবীর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত। যেকোন অবস্থায় এটি ফারয। অসুস্থ হলেও এটি আদায় করতে হবে। এর কোন কাযা বা কাফফারা নেই। এর কাফফারা হলো যখন স্মরণ হবে তখনই পড়ে নিবে। বর্তমানে সলাত আদায়কারী যেমন কমে গেছে। তেমনি সলাত সঠিক ভাবে আদায় কারীও কমে গেছে। যেমন রুকু সাজদাহতে এখন আর পিঠ সোজা রাখা হচ্ছে না। অথছ হাদীসে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশ এসেছে। (আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ,দারেমী, মিশকাত হা/৮১৮)।

আত-তাহরীকে শ্রদ্ধেয় মুজাফফর বিন মুহসীন জাল হাদীসের কবলে সলাত নিয়ে ধারাবাহিক প্রকাশ করছেন। কিন্ত আমি লক্ষ্য করেছি যে, এমন কিছু নিয়ম আমাদের সমাজে মাজহাবের দোহাই দিয়ে রয়েছে যেগুলো কোন যইফ হাদীস কেন জাল হাদীসেও নেই। শুধুমাত্র অজ্ঞতা, অন্য মতের বিরোধিতা করেই এগুলো না করাই সুন্নাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অথচ এগুলোর বিপরীতে সহীহ হাদীস আছে যেগুলো মুতাওয়াতির পর্যায়ের। মুতাওয়াতির পর্যায়ের হাদীস অমান্য করা কুফরির শামিল।( হাদীস চর্চ্চায় মহিলা সাহাবীদের অবদান, ড: মুহাম্মদ শফিকুল্লাহ, পৃষ্ঠা ৬৭). যেমন সলাতে কাতার সোজা করা ও পায়ের সাথে পা মিলানো।  এ দুটি বিষয় নিয়েই আমি আজ আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

সলাত এমন একটি ইবাদাত যা দিনে পাঁচবার আমাদের একত্রিত হওয়ার সুযোগ দেয়। এটি সৌহার্দ্য সৃষ্টি করে, একে অন্যের কাছাকাছি আনে। খোঁজখবর জানা যায়। যেমন আমি আগে যে মাসজিদে সলাত আদায় করতাম, একজন নিয়মিত মুসুল্লি ছিলেন। আমি লক্ষ্য করলাম তিনদিন হলো তবুও তাঁকে পেলাম না মনটা খচখচ করছিলো। পরে খোঁজ নিয়ে দেখলাম তিনি বাড়ী বিক্রি করে অন্য জায়গায় চলে গেছেন। তেমনি যখন আমার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো এবং আমি মেস ছেড়ে বাড়ি গিয়েছিলাম পরে আসার পর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে আমি এতদিন বাড়িতে ছিলাম নাকি? কেমন দিনকাল গেলো? সত্যি বলতে কি তাঁর সাথে আমার আন্তরিকতা গড়ে উঠেছিলো। রাজশাহীতে এসে স্থানীয়দের মধ্যে যাদের সাথে আমার হৃদতা বা আন্তরিকত গড়ে উঠেছে তাদের সবার সাথে আমার যোগাযোগ শুরু হয়েছিলো মাসজিদে।

আমি মাদ্রাসায় পড়া ছাত্র না। যখন ইসলাম শিক্ষা পড়তাম তখন একটি প্রশ্ন বারবারই আসতো সেটা হলো, নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলত বর্ণনা কর। এর উত্তর যা নোটে ও গাইডে পাওয়া যেত তাতে পয়েন্ট আকারে সামাজিক গুরুত্ব লেখা থাকতো । তাতে উল্লেখ থাকতো, সলাত সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে থাকে। সলাতের মাধ্যমে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়। এখানে কোন ধনী গরীবের ব্যবধান থাকে না। কিন্ত সলাত আদায় করতে গিয়ে দেখেছি যে, ধনী গরীব এর ব্যবধান না থাকলেও মতের ব্যবধান আছেই।  সলাত আদায় করতে গিয়ে কাতার সোজা করা হয় না। পায়ের সাথে পা মিলালেই পা সটান করে সরিয়ে নেয়। এটা কিসের ইঙ্গিত! এটা কি হিন্দু সমাজের অস্পৃশ্যতার ইঙ্গিত দেয় না। এখানে ব্যবধান কি? না ধর্মের না ঐশ্বর্যতার না অন্য কিছুর। কিছুই না এখানে বিরোধিতা অন্য মতকে বিরোধিতার।

সহীহ হাদীসে কাতার সোজা করার ও পায়ের সাথে পা মিলানোর কথা বলা আছে। কিন্ত তা আমল করা হচ্ছে না। এটার বিরোধিতা করা হচ্ছে। প্রধানত হানাফী মাযহাবের মাসজিদগুলোতে এটা বেশী করা হচ্ছে। এটার প্রভাব এমন পড়েছে যে আহলে হাদীসের মাসজিদগুলোতে এমনকি আহলে হাদীসের সন্তানগুলোও আজ পায়ের সাথে পা মিলানো ভুলতে বসেছে। এটা না করানোটাই তাদের কাছে সুন্নাহ হয়েগেছে নাউযুবিল্লাহ।

আমি হানাফী মাযহাবের মুখতাসারুল কুদরী, হিদায়া পড়েছি কোথাও পায়নি যে, সলাতের সময় পায়ের সাথে পা মিলানো যাবে না। তবে এসব কিতাবে সলাত কাতার সোজা করার গুরুত্ব উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু কাতার সোজা কিভাবে হবে তা বলা নেই। এর অর্থ হলো যে, সলাতে কাতার সোজা তখনই হবে যখন পায়ের সাথে মিলানো হবে। আল্লাহর  নাবী (সা) বলেছেন, সলাতে কাতার সোজা করতে হবে । কিন্তু কিভাবে করতে হবে বলেন নি, এটা ডাহা মিথ্যা কথা। কিভাবে কাতার সোজা করতে হবে তাও বলেছেন, তিনি বলেছেন কাঁধে কাঁধ পায়ের সাথে পা মিলানো’র কথা বলেছেন। অথচ এ হাদীসের উপর আমল নেই। মাদ্রাসায় আলিম ক্লাসে পড়ানো মিশকাতের কাতার সোজা করার অধ্যায়-এ হাদীসগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্ত ব্যাখ্যা করার সময় একবারও পায়ের সাথে পা মিলানোর ব্যাখ্যা করেননি। একটা হাদীসও নেই তা জাল,যইফ হোক যে পায়ের সাথে পা মিলানো যাবে না। এটা কিভাবে আসলো ? এটা এসেছে আহলে হাদীসদের বিরোধিতা করে। আহলে হাদীসরা পায়ের সাথে পা মিলায়। অতএব আমরা তো আহলে হাদীস না, আমরা হানাফী অতএব আমাদের জন্য পা ফাঁক করে দাড়ানো ও পা না মিলানোই সুন্নাত। নাউযুবিল্লাহ। আল্লাহর রাসূল (সা) কি আমাদের আহলে হাদীসদের বিরোধিতা করতে বলেছেন নাকি ইয়াহুদী খ্রিস্টানদের বিরোধিতা করতে বলেছেন। আহলে হাদীসদের বিরোধিতা করতে গিয়ে আপনার হিন্দু ধর্মের জাতপাতের ব্যবধানকে নিয়ে আসছেন। যেখানে এক জাতের ব্যক্তির অন্য জাতকে স্পর্শ করাও পাপ। একটু ভাববেন কি, আমরা যারা সলাতে পা ফাঁক করে দাড়াই এবং কেউ পা মিলালে সটান করে পা টান দিই। তাদের এই আচরণের সাথে হিন্দুদের আচরণের কি মিল নেই ? নাউযুবিল্লাহ আমরা সহীহ হাদীসের বিরোধিতা করতে গিয়ে বিধর্মীদের অনুসরণ করছি। ধিক্‌ ধিক্।

পায়ের সাথে পা না মিলানোর যুক্তি হিসেবে বলে থাকে যে হাদীসে আছে দুপায়ের ব্যবধানে শুধুমাত্র চার আঙ্গুল ব্যবধান রাখতে হবে। আমি জানতে চাই কোন হাদীসে আছে? এমন কথা যে দু পায়ের ব্যবধান চার আঙ্গুল রাখতে হবে। প্রকৃত পক্ষে কাতারে দাড়াতে হবে স্বাভাবিক ভাবে। সুনানে আবু দাউদে উল্লেখ রয়েছে, কেউ সলাত জুতা জোড়া উভয় পায়ের মাঝখানে রাখার কথা রয়েছে। একজোড়া জুতা রাখলে কি চার আঙ্গুল ব্যবধান হবে কি? এই চার আঙ্গুল ব্যবধান রাখার কথা বেশী বলে থাকে ইলিয়াসী তাবলীগীরা। এরাই আবার মজলিসে বসে বয়ান করলে আর হুয়াহু জিকর করলে বলে ফাকা হয়ে বসবেন না। মাঝে শয়তান প্রবেশ করবে। অথচ এই শয়তান প্রবেশ করার কথা তাদের সলাতের ক্ষেত্রে মনে থাকে না। অথচ হাদীসটি মজলিসের ক্ষেত্রে যতটা না উল্লেখ হয়েছে সলাতের ক্ষেত্রে অনেক বার  উল্লেখিত হয়েছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে আমি এ সামান্য (?) ব্যাপার নিয়ে এত কথা লিখছি কেন। ব্যাপারটি সামান্য যে নয় নিম্নোক্ত হাদীসগুলো পড়লেই জানা যাবে। এখন আমি কাতার সোজা করা ও পায়ের সাথে পা মিলানোর হাদীসগুলো উল্লেখ করছি।

মিশকাত শরীফের বঙ্গানুবাদ থেকেই হাদীসগুলোর উদ্ধৃতি দিচ্ছি। মিশকাতুল মাসাবীহ’র “কাতার সোজা করা” নামক অধ্যায়ে যেসব হাদীস উল্লেখিত রয়েছে তা হলো-

হযরত নোমান ইবনে বশীর(রা:) হইতে বর্ণিত।তিনি বলেন,রাসূলুল্লাহ (সা:)আমাদের সারিসমূহ সোজা করতেন এমনভাবে যে উহার সহিত তিনি তীর সোজা করতেছেন।তিনি এরূপ করতেন যতক্ষণ না তিনি বুঝতে পারতেন যে আমরা বিষয়টি তাহার নিকট হতে পুরাপুরি বুঝতে পেরেছি।একদা তিনি ঘর হতে বাহির এয় আসলেন এবং নামাযে দাড়ালেন, তাকবীরে তাহরীমা বলিলেন, এমন সময় দেখতে পেলেন এক ব্যক্তি সারি হতে সামনে সিনা বাড়িয়ে দাড়িয়েছে।তখন রাসূল (ষঅ:) বলিলেন, আল্লাহর বান্দাগণ!হয় তোমার তোমাদের সারি সোজা করে দাড়াবে নতুবা আল্লাহ তোমার মুখমন্ডলসমূহে অর্থ্যাত অন্তরসমূহে পার্থক্য করে দিবেন।–মুসলিম (মিশকাত ২য় খন্ড-হাদীস নং-১০১৭,মাদ্রাসায় আলিম ক্লাসে পাঠ্য,মিশকাত শরীফ ৩য় খন্ড-এমদাদিয়া লাইব্রেরী,হাদীস নং-১০১৭)।

নুমান ইবনে বাশীর (রাযি) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, তোমরা অবশ্যই কাতার সোজা করে নিবে, তা না হলে আল্লাহ তাআলা তোমাদের মাঝে বিরোধ সৃস্টি করে দিবেন। (বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হা/৬৬২, প্রথম খন্ড)।

দেখুন কতবড় হাদীস কি বড় কথা । মাঝে মাঝে এমন হাদীস এসে যায় যা পড়ে স্তম্ভিত হয়ে যাই।

আরো বর্ণিত আছে,

হযরত আনাস (রা:) হতে বর্ণিত।তিনি বলেন,একদিন নামাযের ইকামত বলা হলো তখন, রাসূলুল্লাহ (সা:) আমাদের দিকে মুখ ফিরালেন  এবং বললেন, তোমরা কাতার সোজা কর এবং পরষ্পর মিলিত হয়ে দাড়াও। নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে পিছনের দিকেও দেখতে পাই।–বুখারী (মিশকাত হা/১০১৮)।

বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে,রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন,তোমরা তোমাদের ছফসমূহকেপূর্ণ কর।নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে আমার পিছন দিক হতেও দেখতে পাই। (মিশকাত হা/১০১৮ শেষাংশ)

হযরত আনাস (রা:) হতে বর্ণিত।তিনি বলেন,রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, তোমরা নামাযের সারিসমূহকে সোজা করিবে।কেননা সারি সোজা করা নামায প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীভুত।–বুখারী ও মুসলিম।আর মুসলিমের বর্ণনায় আছে যে, ছফ সোজা করা বা কাতার সোজা করা নামায পূর্ণ করারই অন্যতম কাজ।( মিশকাত হা/১০১৯)।

হযরত আবু মাসউদ আনসারী (রা) হতে বর্ণিত।তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা)নামাযে (দাড়ালে) আমাদের বাহুমূলসমূহে হাত স্পর্শ করে পরষ্পর মিলিয়ে দিতেন এবং বলতেন তোমরা সোজা হয়ে দাড়াও, বিভিন্নরুপে দাড়িও না, তা হলে তোমাদের অন্তরসমূহও প্রভেদ হয়ে যাবে। আর তোমাদের মধ্যে যারা প্রবীণ ও বিজ্ঞ তারাই যেন আমার কাছাকাছি দাড়ায়।অত:পর যাহারা বয়স ও বিজ্ঞতায় তাদের কাছাকাছি তারা দাড়ায় অনুরুপভাবে বয়স ও জ্ঞান কম অনুসারে তার পরবর্তীগণ দাড়ায়। আবু মাসউদ (দু:খ করে) বলেন, আজ তোমরা এই ব্যাপারে অত্যন্ত বিভিন্নমুখী। (মুসলিম,মিশকাত হা/১০১৯)।

আমি কেন কথাগুলোর গুরুত্ব দিয়েছি তাদের জওয়াব এই হাদীসটি।

হযরত আনাস (রাযি) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত তোমরা সারিসমূহকে পরষ্পর মিশে দাড়াও।সারিগুলোকে কাছাকাছি রাখ এবং তোমাদের ঘাড়গুলিকে সমভাবে সোজা রাখ। যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, তার কসম, নিশ্চয় আমি কালো ভেড়ার বাচ্চার মত শয়তানকে দেখি,যে সারির ফাকে প্রবেশ করে।–আবু দাউদ।(মিশকাত হা/১০২৫)।

হযরত আনাস (রাযি) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, তোমরা প্রথমে সম্মুখের সারি পূর্ণ করবে। অত:পর তার সংলগ্ন পিছনের সারিকে পূর্ণ করবে। যদি কম্‌তি-ঘাটতি কিছু থাকে, তা থাকবে  সর্বশেষ সারিতে।

অথচ আমাদের সমাজে দেখা যায় আগের সারি পূর্ণই হয় নি। অথচ পরের কাতার অর্ধেক হয়ে গেছে। কিভাবে আমরা সুন্নাতে বরখেলাপ করছি !

হযরত নোমান ইবনে বাশীর (রাযি) হতে বর্ণিত। যখন আমরা সলাতের উদ্দেশ্যে দাড়াতাম, রাসুলুল্লাহ (সা) আমাদের সারি সোজা করতেন। আর যখন আমরা সোজা হয়ে  যেতাম তখন তিনি তাকবীরে তাহরীমা বলতেন। (আবু দাউদ, মিশকাত হা/১০২৯)।

এই হাদীসেরও বিরোধিতা আমাদের সমাজে প্রচলিত। আমাদের ইমাম সাহেবরা এটা বিরোধিতা করে থাকেন। তারা কাতার সোজা করতে বলেন না। অথচ এটা সুন্নাত। কেউ কেউ কাতার সোজা করতে বলেন। আমি জিজ্ঞেস করি, সালাতে কি কাতার সোজা হবে আকাশ থেকে? নাকি পায়ের সাথে পা মিলাতে।

এজন্যই শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ) তাঁর “সিফাতু সলাতিন নাবী” বইয়ের দ্বিতীয় খন্ডে সলাতে প্রচলিত ভুল গুলো উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সলাতের ইকামতের পর কাতার সোজা করার কথা না বলা একটি ভুল। কারণ বুখারী সহ অন্যান্য হাদীস গ্রন্থগুলোতে এটার উপর আমল করার কথা রয়েছে। বুখারী শরীফে রয়েছে। সলাতের ইকামত বলার পর রাসূলুল্লাহ (সা) বলতেন, কাতার সোজা কর ও নিরবচ্ছিন্নভাবে দাড়াও। ( রাসুলুল্লাহ এর নামায, অনুবাদ-এ এন এম সিরাজুল ইসলাম,বিশ্ব প্রকাশনী, পৃষ্ঠা-১৬৫-১৬৭)।

অথচ আমাদের ইমাম সাহেবরা এই হাদীসের উপর কোন আমল করছেন না। তাই ইকামত শেষে কাতার সোজা করার কথা  ইমামকে বলতেই হবে বলে শায়খ আলবানী বলেছেন।

মুসনাদে আহমাদে রয়েছে, হযরত আবু উমামা বাহেলী (রাযি) হতে বর্ণিথ। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতাগণ (সলাতের) প্রথম সারির উপরে সলাত প্রেরণ করেন অর্থ্যাত অনুগ্রহ বর্ষণ করেন। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা)! দ্বিতীয় সারির উপরেও ? তিনি বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা ও তার ফেরেশতাগণ (সলাতের ) প্রথম সারির উপর অনুগ্রহ বর্ষণ করেন। সাহাবীগণ পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা)! দ্বিতীয় সারির উপরেও ? রাসূলুল্লাহ (সা) আবারও বললেন,নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা ও তার ফেরেশতাগণ (সলাতের ) প্রথম সারির উপর অনুগ্রহ বর্ষণ করেন। সাহাবীগণ পুন: জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা)! দ্বিতীয় সারির উপরেও ? রাসূল বললেন, হ্যাঁ, দ্বিতীয় সারির উপরেও। অত:পর রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, তোমরা তোমাদের সারি সোজা করবে, তোমাদের বাহুমূলসমূহকে পরষ্পর সমান রাখবে এবং তোমাদের ভাইদের হাতে বাহুমূলকে নরম রাখবে। (অর্থ্যাত কেউ ধরে সোজা করতে চাইলে তাহার আনুগত্য করবে) এবং তোমাদের মধ্যকার ফাকঁসমূহকে ভরে ফেলবে। কেননা, শয়তান তোমাদের মধ্যে হাযফের মত ঢুকে পড়ে। হায্‌ফ হলো ছোট কাল ভেড়ার বাচ্চা। (মিশকাত হা/১০৩৩)।

আরও হাদীসে আছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাযি) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমরা সারিসমূহকে পরষ্পরের সমান কর, সারির মধ্যে ফাঁকা জায়গা ভরে ফেল, তোমাদের ভাইদের হাত নরম থাকবে। এবং শয়তানের জন্য মাঝখানে ফাকা স্থান রাখবেন না। যেই ব্যক্তি  সারিকে মিলান, আল্লাহ তাআলাও তাহাকে (অনুগ্রহের সাথে) মিলান। আর যেই ব্যক্তি সারিকে বিচ্ছিন্ন করে, আল্লাহ তাআলাও তাকে ( নিজ অনুগ্রহ হতে) বিচ্ছিন্ন করেন।–আবু দাউদ, নাসায়ীতেও অনুরূপ এসেছে। (মিশকাত হা/১০৩৪ )।

আবুল ক্বাসিম আল-জাদালী সুত্রে বর্ণিত।তিনি বলেন, আমি নু’মান ইবনে বাশীর (রাযি) বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ (সা) সমবেত লোকদেরকে দিকে ঘুরে দাড়িয়ে তিনবার বলিলেন: তোমরা তোমাদের কাতারসমূহ সোজা কর।আল্লাহর শপথ! অবশ্যই তোমরা তোমাদের কাতারসমূহকে সোজা করে দাড়াও। অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের অন্তরে মতানৈক্য সৃষ্টি করে দিবেন। বর্ণনাকারী নুমান (রাযি) বলেন, অত:পর আমি এক লোককে দেখলাম, সে তার সঙ্গীর কাঁধের সাথে নিজের কাঁধ, তার হাটুর সাতে নিজের হাটু এবং তার গোড়ালির সাথে নিজের গোড়ালি মিলিয়ে দাড়াচ্ছে। (আবু দাউদ হা/৬৬২)।

দেখুন সাহাবীগণ ও তাবেয়ীগণ এ ব্যাপারে কত সতর্ক ছিলেন। বুখারী শরীফে পায়ের সাথে পা, কাধেঁর সাথে কাঁধ এবং গিটের সাথে গিটের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

আবু দাউদে কাতার সোজা করার কথা বলা হয়েছে তীরের মতো করে। ( আবু দাউদ হা/৬৬৩)

কাতার সোজা সম্পর্কে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস:

আল-বারাআ ইবনে আযিব (রাযি) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কাতারের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে গিয়ে আমাদের বুক ও কাঁধ সোজা করে দিতেন।, আর বলতেন: তোমরা কাতারে বাঁকা হয়ে দাড়িও না। অন্যথায় তোমাদের অন্তরে বৈপরিত্য সৃষ্টি হবে। তিনি আরো বলতেন, নিশ্চয় প্রথম কাতারসমূহের প্রতি আল্লাহর রাহমাত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ দুআ করেন। (আবু দাউদ হা/৬৬৫)

এ রকম অনেক হাদীস রয়েছে যা উল্লেখ করলে কলেবরই বৃদ্ধি হবে। এসব হাদীস থেকে আমাদের শিক্ষা:

১. সলাতে ধনী গরীবের বা অন্য কোন মতের পার্থক্যে কোন বালাই নেই।

২. সলাতে কাতার সোজা করতে হবে কেননা কাতার সলাতের সৌন্দর্যের অন্তর্ভূক্ত।

৩. সলাতে কাধেঁ কাধঁ, পায়ের সাথে পা মিলাতে হবে।

৪. যারা মিলিয়ে দাড়ায় আল্লাহ তাদের উপর রহমত প্রদর্শন করেন।

৫. যারা মিলায় না তাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ হতে বিচ্ছিন্ন করেন।

৬. ঈমাম হিসেবে সলাত আদায় করলে কাতার সোজা করতে বলা ইমামের কর্তব্য ও এটা রাসূলুল্লাহ (সা) এর সুন্নাত।

৭. সলাতে ফাঁক হয়ে দাড়ালে শয়তান ফাক জায়গায় বসে।

৮. কেউ কাতার সোজা করতে চাইলে তাকে সহযোগীতা করা অবশ্যই কর্তব্য।

৯. কাতার সোজা করা সলাতের সৌন্দর্য।

আল্লাহ আমাদের  কুরআন ও সহীহ হাদীসের উপর আমল করার তওফিক দিন।

শাহাদাত হুসাইন

তড়িত কৌশল ও ইলেকট্রনিক বিভাগ

রুয়েট, রাজশাহী।

Translate