Thursday, December 9, 2021

পাত্র পাত্রী দেখাশোনার মধ্যে পাত্রী দের কেই বেশি বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়

 পাত্র পাত্রী দেখাশোনার মধ্যে পাত্রী দের কেই বেশি বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়। বিড়ম্বনা বলা কি ঠিক? অশালীন ও অশোভোন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়। সবসময় যে জেনে বুঝে পাত্র রা এমন আচরণ করেন তা কিন্ত নয়। কিছু তাদের পারিবারিক চাপ ও কিছু ব্যাক্তিগত জ্ঞানের অভাব। আর সবাই যে এমন তা ও বলছি না। তবে বাস্তব সমাজের চিত্র তো অন্ধ ও দেখতে পায়।

সামাজিক রীতি গুলোকে যেকোন মেয়েপক্ষই অনিছাসতবেও অনেক সময় মেনে নেয়। যেমন হেঁটে দেখা ও, এটা পার, ওটা পার, নাক ফুটো করনাই কেন? ব্লা ব্লা ব্লা। কিন্ত কোন পাত্র যদি সরাসরি পাত্রীর সাথে অশোভোন কিছু করে কি মেনে নেয়া যায় নাকি মেনে নেয়া উচিত?

যেকোন ছেলেদের ই এই লেখাটা পক্ষপাতমূলক মনে হবে। কিন্ত এটা অপ্রিয় সত্য।
একটা মেয়ে হিজাব পরে আপনার সামনে আসবে আর আপনি তাকে জায়েজ আছে বলে আপনার সামনে হিজাব খুলিয়ে তার চুল ঘাড়, গলা দেখতে চাইবেন এটা কে কি বলা যায়? আপনার চেহারা পছন্দ হলে আপনি বিনীত ভাবে বলতেই পারেন বাসায় ইনফরমাল ঘরোয়া ভাবে দেখা করার। কিন্ত প্রথম মিটিং এ এমন আচরণ কি করে শোভোন হয়?

ইদানিং কিছু রিপ্লাই পাচ্ছি যে, প্রথম মিটিং পাত্র পাত্রীর কাছে জানতে চান যে “বিয়ের পর সে তার স্বামী কে কিভাবে খুশি করবে? আরে ভাই দাম্পত্য জীবন নিয়ে সবার মনের মধ্যেই অনেক ইচ্ছা, বাসনা থাকে। তাই এই ফালতু প্রশ্ন কেন? এটা শুনে কোন মেয়ে আর যাই হোক আপনাকে সভ্য আচরনের মানুষ মনে করবেন না। আপনি প্রথম দিনেই নির্লজ্জ আচরণ করে ফেলেছেন।

আর ও আছে, যদি আপনি দ্বীন দেখে বিয়ে করেন তাহলে জাহির সি বাত আপনার সন্তান রা একজন দ্বীনদার মা পাচ্ছেন। তাহলে আপনি যদি একজন দ্বীনদার পাত্রী দেখতে গিয়ে এক পৃথিবীর এত বিষয় থাকতে সে তার সন্তান কে কোন স্কুলে পড়াবে এমন প্রশ্ন করেন তাহলে কেমনে কি হয় !!!! আরে ভাই তারে আগে স্ত্রী হওয়ার সুযোগ দেন। তারপর মা এর রোল।

জানি, বলবেন আপনি আপনার জন্য শুধু স্ত্রী না, আপনার সন্তানের মা কে খুঁজছেন। তাহলে একটা ছোট্ট কথা একজন চোর ও তার সন্তান রে চোর বানাতে চায় না, সাধু বানাতে চায়।

তাই প্রশ্ন যদি করতে হয় আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, নবীর প্রতি ভালোবাসা, দ্বীন এর প্রতি অনুরাগ, জান্নাতের প্রস্তুতি, এসব নিয়ে কথা বলুন। দ্বীন এর কোন কোন বিষয়ে আপনারা একমত গল্পচ্ছলে জেনে নিন। ভাই বোন আত্মীয় পরিজন এর সাথে তার সম্পর্ক কেমন তা গল্পে গল্পে বুঝুন। দৈনন্দিন জীবনের অনেক বিষয় আছে কথা বলার । সেগুলো নিয়ে কথা বলুন। প্রাথমিক ভাবে পাত্রী পছন্দ হলে তখন পাত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে মানে যদি সে সহজভাবে নেয় তখন তার সাথে উক্ত বিষয়ে কথা বলতে পারেন।

ভাইদের কে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি, সংবেদনশীল বিষয় গুলো নিয়ে কথা বলবে না। নির্লজ্জতা, লজ্জাহীনতা দ্বীন এর বৈশিষ্ট না। যাকে প্রথমদিন সম্মান দিয়ে কথা বলতে পারলেন না তাকে সারা জীবন সম্মান ও মর্যাদার সাথে রাখার প্রতিশ্রুতি কিভাবে দিবেন।

আবারো বলছি, এটা আমার Learning. কোন পক্ষপাতমূলক পোস্ট নয়।।

যাদুটোনা থেকে নিরাময়ের উপায়

 যাদুটোনা থেকে নিরাময়ের উপায়                                                                                                               ***********************************

গ্রন্থঃ ইসলাম কিউ এ ফতোয়া সমগ্র
অধ্যায়ঃ আকীদা

↔যাদুটোনা থেকে নিরাময়ের উপায় ↔
↔↔↔
প্রশ্ন: যিনি বিদ্বেষন, বশীকরণ বা অন্য কোন যাদুটোনা দ্বারা আক্রান্ত তার চিকিৎসার উপায় কি? মুমিন ব্যক্তি যাদুটোনা থেকে কিভাবে মুক্তি পেতে পারেন অথবা কোন পদ্ধতি অবলম্বন করলে যাদুটোনা তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। কুরআন ও হাদিসে এ সম্পর্কিত কোন দুআ-দরুদ বা যিকির-আযকার আছে কি?

উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

যাদুটোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে:

এক: যাদুকর কিভাবে যাদু করেছে সেটা আগে জানতে হবে। উদাহরণতঃ যদি জানা যায় যে, যাদুকর কিছু চুল নির্দিষ্ট কোন স্থানে অথবা চিরুনির মধ্যে অথবা অন্য কোন স্থানে রেখে দিয়েছে। যদি স্থানটি জানা যায় তাহলে সে জিনিসটি পুড়িয়ে ফেলে ধ্বংস করে ফেলতে হবে যাতে যাদুর কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়, যাদুকর যা করতে চেয়েছে সেটা বাতিল হয়ে যায়।

দুই: যদি যাদুকরকে শনাক্ত করা যায় তাহলে তাকে বাধ্য করতে হবে যেন সে যে যাদু করেছে সেটা নষ্ট করে ফেলে। তাকে বলা হবে: তুমি যে তদবির করেছ সেটা নষ্ট কর নতুবা তোমার গর্দান যাবে। সে যাদুর তদবিরটি ধ্বংস করে ফেলার পর মুসলিম শাসক তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিবেন। কারণ বিশুদ্ধ মতানুযায়ী, যাদুকরকে তওবার আহ্বান জানানো ছাড়া হত্যা করা হবে। যেমনটি করেছেন- উমর (রাঃ)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: “যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তরবারির আঘাতে তার গর্দান ফেলে দেয়া।” যখন হাফসা (রাঃ) জানতে পারলেন যে, তাঁর এক বাঁদি যাদু করে তখন তাকে হত্যা করা হয়।

তিন: যাদু নষ্ট করার ক্ষেত্রে ঝাড়ফুঁকের বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে: এর পদ্ধতি হচ্ছে- যাদুতে আক্রান্ত রোগীর উপর অথবা কোন একটি পাত্রে আয়াতুল কুরসি অথবা সূরা আরাফ, সূরা ইউনুস, সূরা ত্বহা এর যাদু বিষয়ক আয়াতগুলো পড়বে। এগুলোর সাথে সূরা কাফিরুন, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়বে এবং রোগীর জন্য দোয়া করবে। বিশেষতঃ যে দুআটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাব্যস্ত হয়েছে:

“আল্লাহুম্মা, রাব্বান নাস! আযহিবিল বা’স। ওয়াশফি, আনতাশ শাফি। লা শিফাআ ইল্লা শিফাউক। শিফাআন লা য়ুগাদিরু সাকামা।”

(অর্থ- হে আল্লাহ! হে মানুষের প্রতিপালক! আপনি কষ্ট দূর করে দিন ও আরোগ্য দান করুন। (যেহেতু) আপনিই রোগ আরোগ্যকারী। আপনার আরোগ্য দান হচ্ছে প্রকৃত আরোগ্য দান। আপনি এমনভাবে রোগ নিরাময় করে দিন যেন তা রোগকে নির্মূল করে দেয়।)

জিব্রাইল (আঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে দোয়া পড়ে ঝাড়ফুঁক করেছেন সেটাও পড়া যেতে পারে। সে দুআটি হচ্ছে- “বিসমিল্লাহি আরক্বিক মিন কুল্লি শাইয়িন য়ুযিক। ওয়া মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনিন হাসিদিন; আল্লাহু ইয়াশফিক। বিসমিল্লাহি আরক্বিক।”

(অর্থ- আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ঝাড়ফুঁক করছি। সকল কষ্টদায়ক বিষয় থেকে। প্রত্যেক আত্মা ও ঈর্ষাপরায়ণ চক্ষুর অনিষ্ট থেকে। আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য করুন। আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ঝাড়ফুঁক করছি।)

এই দোয়াটি তিনবার পড়ে ফুঁ দিবেন। সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস তিনবার পড়ে ফুঁ দিবেন।

আমরা যে দোয়াগুলো উল্লেখ করলাম এ দোয়াগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিতে হবে। এরপর যাদুতে আক্রান্ত ব্যক্তি সে পানি পান করবে। আর অবশিষ্ট পানি দিয়ে প্রয়োজনমত একবার বা একাধিক বার গোসল করবে। তাহলে আল্লাহর ইচ্ছায় রোগী আরোগ্য লাভ করবে। আলেমগণ এ আমলগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন। শাইখ আব্দুর রহমান বিন হাসান (রহঃ) ‘ফাতহুল মাজিদ শারহু কিতাবিত তাওহিদ’ গ্রন্থের ‘নাশরা অধ্যায়ে’ এ বিষয়গুলো ও আরো কিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন।

চার: সাতটি কাঁচা বরই পাতা সংগ্রহ করে পাতাগুলো গুড়া করবে। এরপর গুড়াগুলো পানিতে মিশিয়ে সে পানিতে উল্লেখিত আয়াত ও দোয়াগুলো পড়ে ফুঁ দিবে। তারপর সে পানি পানি করবে; আর কিছু পানি দিয়ে গোসল করবে। যদি কোন পুরুষকে স্ত্রী-সহবাস থেকে অক্ষম করে রাখা হয় সেক্ষেত্রেও এ আমলটি উপকারী। সাতটি বরই পাতা পানিতে ভিজিয়ে রাখবে। তারপর সে পানিতে উল্লেখিত আয়াত ও দোয়াগুলো পড়ে ফুঁ দিবে। এরপর সে পানি পান করবে ও কিছু পানি দিয়ে গোসল করবে।

যাদুগ্রস্ত রোগী ও স্ত্রী সহবাসে অক্ষম করে দেয়া ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য বরই পাতার পানিতে যে আয়াত ও দোয়াগুলো পড়তে হবে সেগুলো নিম্নরূপ:

১- সূরা ফাতিহা পড়া।

২- আয়াতুল কুরসি তথা সূরা বাকারার ২৫৫ নং আয়াত পড়া।

اَللّٰهُ لَآ اِلٰهَ اِلَّا ھُوَ ۚ اَلْـحَيُّ الْقَيُّوْمُ لَا تَاْخُذُهٗ سِـنَةٌ وَّلَا نَوْمٌ ۭ لَهٗ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ۭ مَنْ ذَا الَّذِيْ يَشْفَعُ عِنْدَهٗٓ اِلَّا بِاِذْنِهٖ ۭ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ اَيْدِيْهِمْ وَمَا خَلْفَھُمْ ۚ وَلَا يُحِيْطُوْنَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهٖٓ اِلَّا بِمَا شَاۗءَ ۚ وَسِعَ كُرْسِـيُّهُ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضَ ۚ وَلَا يَـــــُٔـــوْدُهٗ حِفْظُهُمَا ۚ وَھُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيْمُ

(আয়াতটির অর্থ হচ্ছে-“আল্লাহ্; তিনি ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না, নিদ্রাও নয়। আসমানসমূহে যা কিছু রয়েছে ও জমিনে যা কিছু রয়েছে সবই তাঁর। কে সে, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের সামনে ও পিছনে যা কিছু আছে সে সবকিছু তিনি জানেন। আর যা তিনি ইচ্ছে করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কোনো কিছুকেই তারা পরিবেষ্টন করতে পারে না। তাঁর ‘কুরসী’ আকাশসমূহ ও পৃথিবীকে পরিব্যাপ্ত করে আছে; আর এ দুটোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁর জন্য বোঝা হয় না। তিনি সুউচ্চ সুমহান।)

৩- সূরা আরাফের যাদু বিষয়ক আয়াতগুলো পড়া। সে আয়াতগুলো হচ্ছে-

قَالَ إِنْ كُنْتَ جِئْتَ بِآيَةٍ فَأْتِ بِهَا إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِينَ (106) فَأَلْقَى عَصَاهُ فَإِذَا هِيَ ثُعْبَانٌ مُبِينٌ (107) وَنَزَعَ يَدَهُ فَإِذَا هِيَ بَيْضَاءُ لِلنَّاظِرِينَ (108) قَالَ الْمَلَأُ مِنْ قَوْمِ فِرْعَوْنَ إِنَّ هَذَا لَسَاحِرٌ عَلِيمٌ (109) يُرِيدُ أَنْ يُخْرِجَكُمْ مِنْ أَرْضِكُمْ فَمَاذَا تَأْمُرُونَ (110) قَالُوا أَرْجِهْ وَأَخَاهُ وَأَرْسِلْ فِي الْمَدَائِنِ حَاشِرِينَ (111) يَأْتُوكَ بِكُلِّ سَاحِرٍ عَلِيمٍ (112) وَجَاءَ السَّحَرَةُ فِرْعَوْنَ قَالُوا إِنَّ لَنَا لَأَجْرًا إِنْ كُنَّا نَحْنُ الْغَالِبِينَ (113) قَالَ نَعَمْ وَإِنَّكُمْ لَمِنَ الْمُقَرَّبِينَ (114) قَالُوا يَا مُوسَى إِمَّا أَنْ تُلْقِيَ وَإِمَّا أَنْ نَكُونَ نَحْنُ الْمُلْقِينَ (115) قَالَ أَلْقُوا فَلَمَّا أَلْقَوْا سَحَرُوا أَعْيُنَ النَّاسِ وَاسْتَرْهَبُوهُمْ وَجَاءُوا بِسِحْرٍ عَظِيمٍ (116) وَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنْ أَلْقِ عَصَاكَ فَإِذَا هِيَ تَلْقَفُ مَا يَأْفِكُونَ (117) فَوَقَعَ الْحَقُّ وَبَطَلَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (118) فَغُلِبُوا هُنَالِكَ وَانْقَلَبُوا صَاغِرِينَ (119) وَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سَاجِدِينَ (120) قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ الْعَالَمِينَ (121) رَبِّ مُوسَى وَهَارُونَ (122)

(অর্থ- সে বলল, তুমি যদি কোন নিদর্শন নিয়ে এসে থাক, তাহলে তা পেশ কর যদি তুমি সত্যবাদী হয়ে থাক। তখন তিনি নিজের লাঠিখানা নিক্ষেপ করলেন এবং তৎক্ষণাৎ তা জলজ্যান্ত এক অজগরে রূপান্তরিত হয়ে গেল। আর বের করলেন নিজের হাত এবং তা সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের চোখে ধবধবে উজ্জ্বল দেখাতে লাগল। ফেরাউনের সাঙ্গ-পাঙ্গরা বলতে লাগল, নিশ্চয় লোকটি বিজ্ঞ-যাদুকর। সে তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বের করে দিতে চায়। এ ব্যাপারে তোমাদের মতামত কি? তারা বলল, আপনি তাকে ও তার ভাইকে অবকাশ দান করুন এবং শহরে বন্দরে সংগ্রাহক পাঠিয়ে দিন। যাতে তারা পরাকাষ্ঠাসম্পন্ন বিজ্ঞ যাদুকরদের এনে সমবেত করে। বস্তুতঃ যাদুকররা এসে ফেরাউনের কাছে উপস্থিত হল। তারা বলল, আমাদের জন্যে কি কোন পারিশ্রমিক নির্ধারিত আছে, যদি আমরা জয়লাভ করি? সে বলল, হ্যাঁ এবং অবশ্যই তোমরা আমার নিকটবর্তী লোক হয়ে যাবে। তারা বলল, হে মূসা! হয় তুমি নিক্ষেপ কর অথবা আমরা নিক্ষেপ করছি। তিনি বললেন, তোমরাই নিক্ষেপ কর। যখন তারা বান নিক্ষেপ করল তখন লোকদের চোখগুলো যাদুগ্রস্ত হয়ে গেল, মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলল এবং মহাযাদু প্রদর্শন করল। তারপর আমি ওহীযোগে মূসাকে বললাম, এবার নিক্ষেপ কর তোমার লাঠিখানা। অতএব সঙ্গে সঙ্গে তা সে সমুদয়কে গিলতে লাগল, যা তারা যাদুর বলে বানিয়েছিল। এভাবে সত্য প্রকাশ হয়ে গেল এবং ভুল প্রতিপন্ন হয়ে গেল যা কিছু তারা করেছিল। সুতরাং তারা সেখানেই পরাজিত হয়ে গেল এবং অতীব লাঞ্ছিত হল। এবং যাদুকররা সেজদায় পড়ে গেল। বলল, আমরা ঈমান আনছি মহা বিশ্বের প্রতিপালকের প্রতি। যিনি মূসা ও হারুনের প্রতিপালক।)[সূরা আরাফ, আয়াত: ১০৬-১২২]

৪- সূরা ইউনুসের যাদুবিষয়ক আয়াতগুলো পড়া। সেগুলো হচ্ছে-

وَقَالَ فِرْعَوْنُ ائْتُونِي بِكُلِّ سَاحِرٍ عَلِيمٍ (79) فَلَمَّا جَاءَ السَّحَرَةُ قَالَ لَهُمْ مُوسَى أَلْقُوا مَا أَنْتُمْ مُلْقُونَ (80) فَلَمَّا أَلْقَوْا قَالَ مُوسَى مَا جِئْتُمْ بِهِ السِّحْرُ إِنَّ اللَّهَ سَيُبْطِلُهُ إِنَّ اللَّهَ لَا يُصْلِحُ عَمَلَ الْمُفْسِدِينَ (81) وَيُحِقُّ اللَّهُ الْحَقَّ بِكَلِمَاتِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُجْرِمُونَ

(অর্থ- আর ফেরাউন বলল, আমার কাছে নিয়ে এস সুদক্ষ যাদুকরদিগকে। তারপর যখন যাদুকররা এল, মূসা তাদেরকে বললেন: নিক্ষেপ কর, তোমরা যা কিছু নিক্ষেপ করে থাক। অতঃপর যখন তারা নিক্ষেপ করল, মূসা বললেন, যা কিছু তোমরা এনেছ তা সবই যাদু-এবার আল্লাহ এসব ভণ্ডুল করে দিচ্ছেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ দুস্কর্মীদের কর্মকে সুষ্ঠুতা দান করেন না। আল্লাহ সত্যকে সত্যে পরিণত করেন স্বীয় নির্দেশে যদিও পাপীদের তা মনঃপুত নয়।)[সূরা ইউনুস, আয়াত: ৭৯-৮২]

৫- সূরা ত্বহা এর আয়াতগুলো পড়া। সেগুলো হচ্ছে-

قَالُوا يَا مُوسَى إِمَّا أَنْ تُلْقِيَ وَإِمَّا أَنْ نَكُونَ أَوَّلَ مَنْ أَلْقَى (65) قَالَ بَلْ أَلْقُوا فَإِذَا حِبَالُهُمْ وَعِصِيُّهُمْ يُخَيَّلُ إِلَيْهِ مِنْ سِحْرِهِمْ أَنَّهَا تَسْعَى (66) فَأَوْجَسَ فِي نَفْسِهِ خِيفَةً مُوسَى (67) قُلْنَا لَا تَخَفْ إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعْلَى (68) وَأَلْقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوا إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سَاحِرٍ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى (69)

(অর্থ-তারা বললঃ হে মূসা, হয় তুমি নিক্ষেপ কর, না হয় আমরা প্রথমে নিক্ষেপ করি। মূসা বললেনঃ বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর। তাদের যাদুর প্রভাবে হঠাৎ তাঁর মনে হল, যেন তাদের রশিগুলো ও লাঠিগুলো ছুটাছুটি করছে। অতঃপর মূসা মনে মনে কিছুটা ভীতি অনুভব করলেন। আমি বললামঃ ভয় করো না, তুমি বিজয়ী হবে। তোমার ডান হাতে যা আছে তুমি তা নিক্ষেপ কর। এটা তারা করেছে যা কিছু সেগুলোকে গ্রাস করে ফেলবে। তারা যা করেছে তা তো কেবল যাদুকরের কলাকৌশল। যাদুকর যেখানেই থাকুক, সফল হবে না।)[সূরা ত্বহা, আয়াত: ৬৫-৬৯]

৬- সূরা কাফিরুন পড়া।

৭- সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস ৩ বার করে পড়া।

৮- কিছু দোয়া দরুদ পড়া। যেমন-

“আল্লাহুম্মা, রাব্বান নাস! আযহিবিল বা’স। ওয়াশফি, আনতাশ শাফি। লা শিফাআ ইল্লা শিফাউক। শিফাআন লা য়ুগাদিরু সাকামা।” [৩ বার]

এর সাথে যদি এ দোয়াটিও পড়াও ভাল “বিসমিল্লাহি আরক্বিক মিন কুল্লি শাইয়িন য়ুযিক। ওয়া মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনিন হাসিদিন; আল্লাহু ইয়াশফিক। বিসমিল্লাহি আরক্বিক।”[৩ বার]

পূর্বোক্ত আয়াত ও দোয়াগুলো যদি সরাসরি যাদুতে আক্রান্ত ব্যক্তির উপরে পড়ে তার মাথা ও বুকে ফুঁক দেয় তাহলে আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাময় হবে।

শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বাযের বিবিধ ফতোয়া ও প্রবন্ধ সংকলন সমগ্র (৮/১৪৪)

যিহার (জাহেলী যুগের এক প্রকার তালাক প্রথা)

 নিজের স্ত্রীকে অথবা তার কোন অঙ্গকে ‘মা’-এর সাথে অথবা ‘স্থায়ীভাবে বিবাহ হারাম’ এমন কোন মহিলার পৃষ্ঠদেশ তুল্য বলে আখ্যায়িত করাকে যিহার বলে। একথা বলার উদ্দেশ্য হল, মায়ের সঙ্গে মেলামেশা যেমন হারাম স্ত্রীর সঙ্গে মেলামেশাও তদ্রুপ হারাম করা। ভারতীয় উপমহাদেশে যিহারের প্রচলন খুব একটা নেই। আরবে জাহেলী যুগ হতে যিহার প্রথা চলে আসছে। জাহেলী যুগে যিহারকে তালাক বলে গণ্য করা হ’ত। যিহারের পর স্ত্রীকে আর ফিরিয়ে নেয়ার অবকাশ ছিল না। কিন্তু ইসলামী বিধানে যিহার দ্বারা তালাক হয় না; কেবল কাফফারা ফরয হয়। কাফফারা পরিশোধ না করা পর্যন্ত স্ত্রী সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ থাকে। কাফফারা পরিশোধের পর যথারীতি ঘর সংসার করা যায়।

জাহেলী যুগ থেকে চলে আসা যা কিছু এই উম্মতের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়েছে ‘যিহার তার একটি।

যেসব শব্দে যিহার হয় তার কতগুলি নিম্নরূপ:

স্বামী স্ত্রীকে বলবে, ‘তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পৃষ্ঠতুল্য’। ‘আমার বোন যেমন আমার জন্য হারাম, তুমিও তেমনি আমার জন্য হারাম’। ‘তোমার এক চতুর্থাংশ আমার জন্য আমার ধাত্রীমায়ের মত হারাম’ ইত্যাদি।

যিহারের ফলে নারীরা ভীষণভাবে অত্যাচারিত হয়। যিহার একটি অমানবিক কাজ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

اَلَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِنْكُمْ مِنْ نِسَائِهِمْ مَا هُنَّ أُمَّهَاتِهِمْ إِنْ أُمَّهَاتُهُمْ إِلاَّ اللاَّئِي وَلَدْنَهُمْ وَإِنَّهُمْ لَيَقُولُونَ مُنْكَرًا مِنَ الْقَوْلِ وَزُورًا وَإِنَّ اللهَ لَعَفُوٌّ غَفُورٌ–

‘তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদের সঙ্গে যিহার করে তারা যেন জেনে রাখে যে, তারা তাদের মা নয়। তাদের মা তো তারাই যারা তাদের প্রসব করেছে। তারা তো কেবল অসঙ্গত ও মিথ্যা কথা বলে। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মার্জনাকারী’ (মুজাদালাহ ২)।

ইসলাম রামাযান মাসে দিনের বেলায় স্বেচ্ছায় সহবাসে ছিয়াম ভঙ্গের কাফফারা, ভুলক্রমে হত্যার কাফফারা যেভাবে দিতে বলেছে, যিহারের জন্যও ঠিক একইভাবে কাফফারা দিতে বলেছে। কাফফারা পরিশোধ না করা পর্যন্ত যিহারকারী স্ত্রীকে স্পর্শ করতে পারবে না। আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন,

وَالَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِنْ نِسَائِهِمْ ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا قَالُوا فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَتَمَاسَّا ذَلِكُمْ تُوعَظُونَ بِهِ وَاللهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ- فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَتَمَاسَّا فَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَإِطْعَامُ سِتِّينَ مِسْكِينًا ذَلِكَ لِتُؤْمِنُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ وَتِلْكَ حُدُودُ اللهِ وَلِلْكَافِرِينَ عَذَابٌ أَلِيمٌ–

‘যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে, তারপর তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে নেয়, তাদের জন্য পারস্পরিক স্পর্শের পূর্বে একজন দাস মুক্তির বিধান দেয়া হল। এটা তোমাদের জন্য নির্দেশ। আর তোমরা যা কিছু কর তৎসম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। অনন্তর যে উহার সামর্থ্য রাখে না তাকে পারস্পরিক স্পর্শের পূর্বে একটানা দু’মাস ছিয়াম রাখতে হবে। যে তারও সামর্থ্য রাখে না তাকে ষাটজন মিসকীনকে খাওয়াতে হবে। এই বিধান এজন্য যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপরে তোমরা যেন ঈমান রাখ। এটা আল্লাহর সীমারেখা। আর কাফিরদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি’ (মুজাদালা ৩-৪)।

– মুহাম্মাদ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ।।

সকল মুহাদ্দিছই কি ফক্বীহ

 সকল মুহাদ্দিছই কি ফক্বীহ

বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময় কমেন্ট করি। বাট কমেন্ট গুলো সময়ের গর্ভে হারিয়ে যায়। অথচ কমেন্ট গুলো করতেও কিছু পরিশ্রম ও সময় ব্যয় হয়েছে। তাই এক ভাইয়ের পরামর্শে কমেন্ট সংরক্ষণ করার চিন্তা মাথায় আসে। সেখান থেকে আজকের করা কয়েকটা কমেন্টকে মার্জিত করে নোটটি লিখলাম।
প্রথমে একটা উদাহরণ দেখি। নিজেরই উদাহরণ দেই। আমি ছোট বেলায় কোরআন পড়া শিখেছি, তারপর আব্বুর কাছে উর্দু পড়া শিখেছি, তারপর আম্মার কাছে বাংলা ও ইংরেজী পড়া শিখেছি। তারপর টানা ৯ বছর বাংলা, ইংরেজী, আরবী, হাদীছ, কুরআন সব একসাথে পড়েছি। ক্লাস ভিত্তিক নওদাপাড়া মাদরাসাতে। দাখিল দিয়েছি, আলিম দিয়েছি। একটাতে গোল্ডেন একটাতে শুধু এ প্লাস। জি ডব্লিউ ও সাইফুরস দুই ইংলিশ কোচিং সেন্টারে ইংলিশ কোচিং করেছি। কোর্স শেষে একমাত্র মাদরাসার ছাত্র হিসেবে পঞ্চাশোর্ধ স্কুলের ছাত্রদের মাঝে প্রথম স্থান অধিকার করি। ফালিল্লাহিল হামদ। এছাড়া ইংরেজী প্রাইভেট পড়েছি বহু বছর শাহীন স্যার, দিপু স্যার, শফিক স্যার। গণিত (পাটি গণিত, বীজ গণিত, ত্রিকোনমিতি, পরিমিত, জ্যামিতি) প্রাইভেট পড়েছি ইকবাল স্যারের কাছে। গণিতে খুব কম সময় গেছে ফুল মার্ক পাইনি। আমি জন সম্মুখে প্রথম বক্তব্যও দিয়েছিলাম ইংলিশে। আমার ভিতর এতটুকু হিম্মাত ছিল যে, কোন স্কুলের ছাত্র আমার সম ক্লাসের যদি হয় তাহলে গণিত ও ইংলিশে একদম হারিয়ে দিবে এমন হবেনা কিছুটা হলেও লড়াই হবে। বাংলা শিখেছি ইন্তাজ স্যারের কাছে । বাংলা সাহিত্য প্রচুর পড়তাম। সৈয়দ মুজতবা আলী, নজরুল, হুমায়েন আহমেদ, এই যুগের যত কলামিস্ট আছে তাদের লেখা পড়তাম নিয়মিত। সবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে রাজশাহীতে ইসলামিক স্টাডিজে ফাস্ট হয়েছিলাম। একমাস ক্লাস করে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিলাম। আব্দুল খালেক্ব ছালাফী হাফিঃ ও বদিউজ্জামান (রহঃ) দুই উস্তাদের নিকট আবার মিযান থেকে শুরু করলাম। এক বছরে প্রচুর বই পড়লাম। দুরুসুল বালাগাত, মুখতাসারুল মাআনী, তাফসীরে বায়যাভী, উসূলে তাফসীর, উসূলে হাদীছ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ সহ যত বই পড়া সম্ভব হল দুই উস্তাদের নিকট ব্যক্তিগতভাবে পড়লাম। উল্লেখ্য যে আরবী গ্রামারের বইগুলো প্রথমেই আব্বুর কাছে একবার এবং মাদরাসার ক্লাসে একবার মোট দুইবার করে শেষ করা ছিল। তারপর আমার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হল। উস্তাদদ্বয়ের পরামর্শে ভারত চলে গেলাম। কুরআন হিফয করে, দেওবান্দ গেলাম। চারমাসের আরবী সাহিত্য কোর্স করলাম। দেওবান্দে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। মাত্র দেড় মাসের প্রস্তুতী ছিল। এই জন্য টেনশনে ছিলাম চান্স হবে কিনা? আলহামদুলিল্লাহ চান্স হয়। তারপর শুরু হয় আরেক যুগ। মিশকাত আগে দুইবার পড়েছি। আব্বুর কাছে বাড়ীতে ও মাদরাসায়। তাই তৃতীয় বারের মত মিশকাত পড়তে ভাল লাগছিল না। নিজে থেকে বুঝি না বুঝি ক্লাসের পড়ার পাশাপাশি মিশকাতের তাহক্বীক্ব করা শুরু করলাম। নিজে তাহক্বীক্ব করতাম আবার তাহক্বীক্ব শেষে আলবানী রহঃ-এর তাহক্বীক্ব-এর সাথে মিলিয়ে দেখতাম। কিতাবুল লিবাস পর্যন্ত তাহক্বীক্ব করি। যা এখনো ৫ টা খাতায় হাতে লিখা আমার কাছে আছে। তারপর আসে দাওরার বছর। শায়খ নিয়ামাতুল্লাহ আজমী, মুফতী হাবিবুর রহমান আজমী ও সাঈদ আহমাদ পালানপুরী হাফিজাহুমুল্লাহ তিনজনের নিকট সীমাহীন ইস্তিফাদা করি। মিশকাতের বছর নাম্বার ভাল থাকায় দাওরার বছর ১৫০০ ছাত্রের মধ্যে প্রথম বেঞ্চে বসার সুযোগ পেয়েছিলাম অফিসের পক্ষ থেকে। এই জন্য ইস্তিফাদা আরো মযবূত হয়। দেওবান্দ শেষে হতেই যখন আমি হতাশার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। সিদ্ধান্তে নিতে পারছিলাম না কি করব? তখন আসল মদীনায় চান্স পাওয়ার খবর। এখানে এসে অধিকাংশ ছাত্র প্রথমে ভাষায় ভর্তি হয়। কিন্তু ভাষার বইগুলো আব্বু আমাকে ছোটবেলায় বিভিন্ন ছুটিতে ছুটিতে অগণিতবার শেষ করিয়েছেন। তাই সরাসরি কুল্লিয়া হাদীছে ভর্তি হলাম। দেওবান্দের দুই বছর ও মদীনার আড়াই বছর এই মাত্র সাড়ে চার বছর আমার ইলমে হাদীছ নিয়ে চর্চার বয়স। এখনো ধ্যান-জ্ঞান, নেশা-পেশা ইলমে হাদীছ। আল্লাহর নিকট দুয়া করি যেন ইলমে হাদীছ চর্চা করতে করতেই মৃত্যু হয়।
এত লম্বা কাহিনী কেন বললাম? এখন মানুষ যদি আমার হাদীছ নিয়ে পড়াশোনা দেখে বলে আমি বাংলা জানিনা, যদি বলে ইংরেজী জানিনা, গণিত জানিনা। তাহলে কেমন দেখাবে ? আমি অন্তত আলহামদুলিল্লাহ দশম শ্রেণী পর্যন্ত স্কুলের ছাত্রদের বাংলা, ইংরেজী, গণিত পড়াতে পারব। তাহলে এই জাতীয় মন্তব্য অবশ্যই জুলুম হবে। তাহলে কল্পনা করেন আমার মত একজন অধম ও সাধারণ তালেবে ইলমের ক্ষেত্রে যদি এমন হয় । তাহলে আপনি কি বলবেন একজন মুহাদ্দিছ ইমাম তিনি এক লাফে মুহাদ্দিছ হয়েছেন? তিনি ফিক্বহ বুঝেন না। আল্লাহু আকবার। আমাদের যুগে আমরা যে সময়টা বাংলা-ইংরেজীতে দিয়েছি তাদের যুগে তারা সে সময় কিসে দিয়েছেন জানেন? সকল মুহাদ্দিছের জীবনী পড়ুন! তাদের পাঠ শুরু হত কুরআন হিফয দিয়ে। তারপর উস্তাদের কাছে তারা তাফসীর পড়তেন, হাদীছ পড়তেন, হাদীছের ব্যাখ্যা পড়তেন। তারপর হয়তো ধীরে ধীরে সব কিছু ছেড়ে তারা হাদীছের তাহক্বীক্বে মনোনিবেশ করেন। তার মানে যদি কেউ বলে তারা হাদীছের ফিক্বহ জানতেন না তাহলে কথাটা কেমন হবে? কল্পনা করেন।
এবার আসি সকল মুহাদ্দিছ ফক্বীহ এই কথাটা আমি গতকাল কেন বললাম? গতকাল নোটটি লেখার জন্য পড়াশোনা করতে গিয়ে মুহাদ্দিছ হওয়ার সংজ্ঞার উপর আমার চোখ যায়। বহুবার সংজ্ঞাটা মুখস্থ করেছি বাট এভাবে কোনদিন ভাবিনি।
المُحَدِّث: من يشتغل بعلم الحديث رواية ودراية ويطلع على الكثير من الروايات وأحوال رواتها.
এখানে রিওয়ায়েত ও দিরায়াত দুটি শব্দ আছে। এই দুটি শব্দের ব্যাখ্যা কি তা নিয়ে হালকা ইখতিলাফ আছে । ইমাম ইবনুল আকফানী বলেছেন রিওয়ায়াত তথা মাতান মুখস্থ আর দিরায়াত তথা সানাদ ও রাবীদের অবস্থা মুখস্থ । কিন্তু বেশী বিশুদ্ধ এটাই যে রিওয়ায়াত দ্বারা রিজাল সানাদ উদ্দেশ্য আর দিরায়াত দ্বারা হাদীছের ফিক্বহ বা ফাহম উদ্দেশ্য। তাহলে কি দাড়াল যিনি এই দুটি বিষয়ে পারদর্শী হবেন তিনি মুহাদ্দিছ।
যেহেতু এই পরিভাষার বিষয়ে সকলেই একমত সেহেতু পরিভাষা ঠিক রাখতে বাধ্যতা মূলত বলতে হবে সকল মুহাদ্দিছ ফক্বীহ। যদি কখনো কারো মনে হয় ইনি মুহাদ্দিছ বাট ফক্বীহ নন তাহলে তার জন্য মুহাদ্দিছ পরিভাষা ব্যবহার না করাই ভাল অন্য পরিভাষা ব্যবহার করা যায়- যেমন হাফিয, নাকিদ . . . . ইত্যাদী।
দারুল উলুম দেওবান্দের সম্মানিত শিক্ষক উস্তাদে মুহতারাম সাঈদ আহমাদ পালানপুরী হাফিযাহুল্লাহ আমাদের দারসে বলেছিলেন, ইমাম বুখারী ফক্বীহ নন। দলীল হিসেবে পেশ করেছেন ইমাম তিরমিযী তার থেকে শুধু রিজালের বিষয়ে মন্তব্য নকল করেন বাট মাসালা নকল করেন না। আহলুর রায়গণের মাঝে সেই আদি কাল থেকে এটা প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছগণ ফক্বীহ হননা। ইমাম আহমাদ রহ: কে আবু বকর আল-জাসসাস ফক্বীহ মনে করতেন না। এমনকি হানাফী মাযহাবের ফিক্বহ ও উসূলের কিতাবগুলোতে কালে ভদ্রে ইমাম আহমাদের নাম থাকে। সবাই বাকী তিন ইমামের কওল নিয়ে ব্যস্ত। ইমাম ইবনু রজব আলী বিন মাদিনীকে গইর ফক্বীহ বলেছেন। ইবনু হাজার তার জবাব দিয়েছেন। তেমনি অনেকেই ইয়াহিয়া বিন মাঈন ও আব্দুর রহমান বিন মাহদীকে গইর ফক্বীহ বলেছেন কিন্তু পরে দেখা গেছে তারাও ফক্বীহ বাট তাদের ফিক্বহ ইমাম শাফেয়ীর ফিক্বহের মত উচু ছিলনা। আর এটাই সবচেয়ে ইনসাফ পূর্ণ সমাধান। সকল মুহাদ্দিছ (ইছতিলাহান ) ফক্বীহ বাট তাদের কারো ফিক্বহ উচূ কারো ফিক্বহ অত উচু নয়। আল্লাহ যাকে যেমন ফিক্বহ দিয়েছেন। ইমাম মাজিশুনের একটি কথা দিয়ে শেষ করছি- ابن الماجشون يقول: كانوا يقولون: لا يكون إماما في الفقه مَن لم يكن إماما في القرآن والآثار، ولا يكون إماما في الآثار مَن لم يكن إماما في الفقه. তথা কেউ ফক্বীহ ইমাম হতে পারেনা যতক্ষণ না সে কুরআন ও হাদীছে ইমাম হয় তেমনি কেউ হাদীছে ইমাম হতে পারেনা যতক্ষণ না সে ফিক্বহে ইমাম হয়।
আলবানী (রহঃ) বলেন
لأن المحدث فقيه بطبيعة الحال، هل كان أصحاب النّّبي صلى الله عليه و سلم يدرسون الفقه أم لا ؟ و ما هو الفقه الذي كانوا يدرسونه ؟ هو ما كانوا يأخذونه من رسول الله صلى الله عليه و سلم؛ إذن هم يدرسون الحديث. أما هؤلاء الفقهاء الذين يدرسون أقوال العلماء و فقههم !! و لا يدرسون حديث نبيهم؛ الذي هو منبع الفقه، فهؤلاء يقال لهم : يجب أن تدرسوا علم الحديث، إذ إننا لا نتصور فقها صحيحاً بدون معرفة الحديث؛ حفظا و تصحيحاً و تضعيفاً، و في الوقت نفسه لا نتصور محدثاً غير فقيه! فالقرآن و السنة هما مصدر الفقه؛ كل الفقه. أما الفقه المعتاد اليوم هو فقه العلماء، و ليس فقه الكتاب و السنة. نعم؛ بعضه موجود في الكتاب و السنة، و بعضه عبارة عن آراء و اجتهادات، لكن في الكثير منها مخالفة منهم للحديث؛ لأنهم لم يحيطوا به علماً )).
সারর্মম হচ্ছে মুহাদ্দিছগণ অটোমেটিক ফক্বীহ হন। ছাহাবীরা কার কাছে ফিক্বহ পড়েছেন؟ তারা রাসূলের হাদীছে পড়েছেন। আজকের ফিক্বহ তো ওলামাদের ইখতিলাফ জানা তাদের কওল পড়া কিন্তু আসল ফিক্বহ তো হাদীছেই আছে।
আবু বকর ওমর রা: তাদের কোন মন্তব্য বা ফতোয়া কি কোন বইয়ে পাবেন? পাবেন না। অথচ ইবনু ওমর ও ইবনু আব্বাস রা: -এর ফতোয়ায় বই ভর্তি। তার মানে কি তারা ফক্বীহ ছিলেন না ? এটা ভাবাও ভয়াবহ রকমের বেয়াদবী মনে হয় আমার কাছে। তেমনি আবু হুরাইরা রা: ফক্বীহ কিনা এগুলো নিয়ে যুগে যুগে কত ইখতিলাফ হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নাই। বাট বর্তমানে মুহাক্কিকগণ এমনকি হানাফী ওলামারাও এই সিদ্ধান্তে পৌছেছেন তার মত মহান ছাহাবীকে গয়র ফক্বীহ বলা বেয়াদবী। হ্যাঁ বুঝ ও সুক্ষ্মতার পার্থক্য আল্লাহ প্রদত্ত। আর আমি আলবানী রহঃ-এর কওল থেকে যেটা বুঝেছি সেটা হচ্ছে ছাহাবীগণ (যারা সর্ব সম্মতিক্রমে ফক্বীহ) আলাদা ভাবে ফিক্বহ পড়েননি। বরং হাদীছ ও কুরআন রাসূলের সহচর্য আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান দ্বারা তারা ফক্বীহ হয়েছেন। তেমনি একজন মুহাদ্দিছ কিভাবে মুহাদ্দিছ হতে পারে? একলাফে তো আর মুহাদ্দিছ হন নি। তিনি অবশ্যই উস্তাদগণের নিকট হাদীছ পড়েছেন, হাদীছ বুঝেছেন, ছাহাবাদের কওল পড়েছেন, মুখস্থ করেছেন, উস্তাদের কাছে কুরআন বুঝেছেন । সকলেই তো সর্বাগ্রে কুরআনের হাফিয হন . . ফক্বীহ হওয়ার জন্য আর কি লাগবে ? সুতরাং মুহাদ্দিছগণ স্বভাবজাত ভাবে ফক্বীহ । তবে হ্যা আল্লাহ প্রদত্ত সুক্ষ্মতার পার্থক্য সবার মাঝে আছে। ওয়াল্লাহ আলামু মিন্না।
আজকের পোস্টে আরো একটা কথা যোগ করতে চাই। মুহাদ্দিছগণ শুধু ফক্বীহ নন বরং বলা যায় বর্তমান যে ফিক্বহ শাস্ত্র তার জন্ম তারা দিয়েছেন। আপনি যদি দেখেন সর্ব প্রথম ফিক্বহের মাসায়েল নিয়ে কোন গ্রন্থ লিপিবদ্ধ হয়েছিল। আপনি খুজলে দেখবেন হাদীছের গ্রন্থ গুলোই ফিক্বহী অধ্যায় অনুযায়ী সাজিয়ে মুহাদ্দিছগণই সবার প্রথম লিখেছেন। সুনানে আবু দাঊদ শুধু ফিক্বহী মাসায়েল কে উদ্দেশ্য করে ফিক্বহী অধ্যায় অনুযায়ী সাজিয়ে লেখা। তেমনি সুনানে তিরমিযী সহ হাদীছের অধিকাংশ কিতাব ফিক্বহী মাসায়েল-কে সামনে রেখে সেই অনুযায়ী অধ্যায় সাজিয়ে লেখা। আমি আরেকটু খুলে বলি মুহাদ্দিছগণের খুব কম বই এমন পাবেন যেগুলোতে লেখা আছে ছহীহ হাদীছের অধ্যায়, দুর্বল হাদীছের অধ্যায়, মযবূত রাবীগণের অধ্যায়, দুর্বল রাবীগণের অধ্যায়। অধিকাংশ বইয়ে তাদের অধ্যায়ের নাম অযুর অধ্যায়, অযুতে বিসমিল্লাহ বলা অধ্যায়, পবিত্রতা অধ্যায়, জানাযা অধ্যায়, ছালাতে হাত বাধা অধ্যায়, . ….ইত্যাদী । তথা প্রত্যেকটি হাদীছের গ্রন্থ মূলত একটি ফিক্বহের গ্রন্থ। তাদের এই বইগুলোর অনেক পরে আলাদা ভাবে ফিক্বহী গ্রন্থ রচনা করা হয়েছে। সুতরাং মুহাদ্দিছগণ শুধু ফক্বীহ নন বরং ফিক্বহ শাস্ত্রের জন্মদাতা বললে অত্যুক্তি হবেনা।।
লেখকঃ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক।
ছাত্রঃ মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা, সৌদিআরব।।

ইমাম আলবানী (রহঃ) কি ফক্বীহ নন?

 ইমাম আলবানী (রহঃ) কি ফক্বীহ নন?

বাংলাদেশের জনৈক আলেম তার বক্তব্যে বলেছেন, ইমাম অালবানী শুধু মুহাদ্দিছ তিনি ফক্বীহ নন। তার কথার সারমর্মে বুঝা যায় আলবানী (রহঃ) কোন হাদীছকে ছহীহ বা যঈফ বললে সেটা গ্রহণ করা যাবে বাট তিনি কোন ফৎওয়া দিলে সেটা গ্রহণ করা হবেনা।
প্রথমত আমি বলতে চাই এই মন্তব্যটি শুধু আলবানী (রহঃ)-এর ক্ষেত্রে নয় বরং যুগে যুগে মুহাদ্দিছগণের শানে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। একদল মানুষের দাবী অনুযায়ী মুহাদ্দিছগণ ফক্বীহ নন। তাদের এই কথার জবাবে আমি ‘আমরা হাদীছ মানতে বাধ্য’ বইয়ে বলেছি, যথা-
“মুহাদ্দিছগণ ফিক্বহী জ্ঞান রাখেন না এই জাতীয় মন্তব্য ভিত্তিহীন। আমরা জানি পৃথিবী বিখ্যাত ফকীহ হচ্ছেন ৪ জন। ইমাম নুমান বিন ছাবিত আবু হানীফা (রহঃ) (মৃ.১৫০ হি.)। ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইদরীস শাফেয়ী (রহঃ) (মৃ.২০৪হি.)। ইমাম মালিক বিন আনাস (রহঃ) (মৃ.১৭৯হি.)। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রহঃ) (মৃ.২৪১হি.)।
অত্র ৪ জন বিখ্যাত মুজতাহিদ ফক্বীহের মধ্যে তিন জনই নিজ নিজ যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছ হিসেবে পরিচিত। আজও তাদের পরিচিতি যতটা না তাদের ফিক্বহের জন্য তার চেয়ে বেশী তাদের হাদীছের খিদমাতের জন্য। তারাই জ্বলন্ত প্রমাণ বহন করেন যে, মুহাদ্দিছগণ ফকীহ। মুহাদ্দিছগণের সম্পর্কে বিখ্যাত হানাফী আলেম আল্লামা আব্দুল হাই লাক্ষৌভী (রহঃ)-এর একটি মন্তব্যই যথেষ্ট। তিনি বলেন,
ومن نظر بنظر الإنصاف وغاص في بحار الفقه والأصول، متجنباً عن الإعتساف، يعلم علما يقيناً أن أكثر المسائل الفرعية والأصلية التي اختلف العلماء فيها، فمذهب المحدثين فيها أقوى من مذاهب غيرهم، وإني كلما أسير في شعب الاختلاف أجد قول المحدثين فيه قريبا من الإنصاف فلله دّرُّهُم، كيف لا وهم ورثة النبي حقاً ونُوَّاب شرعه صدقاً
আর যে ব্যক্তি গোড়ামী থেকে দূরে থেকে ইনসাফের দৃষ্টিতে দেখবে এবং ফিকাহ ও উসূলে ফিকাহের সাগরে ডুব দিবে সে নিশ্চিতভাবে জানতে পারবে, নিশ্চয় শাখাগত ও মৌলিক যে সমস্ত মাসালায় ওলামায়ে কেরাম ইখতিলাফ করেছেন তাতে অন্যদের তুলনায় মুহাদ্দিছগণের মাযহাবই বেশী মযবূত। আর আমি যতবার মতভেদপূর্ণ মাসালাগুলো গবেষণা করেছি ততবার মুহাদ্দিছগণের মন্তব্যকে ইনসাফের সবচেয়ে নিকটে পেয়েছি। তারা কতইনা মহান! আর কেনইবা হবেনা তারাই তো মুহাম্মদ (ছাঃ)-এর প্রকৃত উত্তরসূরী এবং তার শরীয়তের সত্যিকার প্রতিনিধিত্বকারী। (ইমামুুল কালাম,পৃ.২১৬)” (আমরা হাদীছ মানতে বাধ্য, পৃ.৫৫)
এছাড়া ‘হাদীছ ও সুন্নাতের মধ্যে পার্থক্যঃ হাদীছ অস্বীকারেরর নতুন চোরাগলি ”বক্তব্যে বলেছিলাম,
ইমাম ইবন খালদুন তার মুকাদ্দামায় (১/৫৬৪) বলেছেন,
وانقسم الفقه فيهم إلى طريقتين: طريقة أهل الرّأي والقياس وهم أهل العراق وطريقة أهل الحديث وهم أهل الحجاز
তথা ফিক্বহ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। আহলুর রায়ের পদ্ধতি ও আহলুল হাদীছের পদ্ধতি।
তিনি এখানে আহলুল হাদীছ বা মুহাদ্দিছগণের ফিক্বহকে স্বীকার করেছেন। বক্তব্যটির লিংক- https://www.youtube.com/watch?v=wc5… ।
মুহাদ্দিছগণের ফিক্বহ বেশী মযবূতঃ
মুহাদ্দিছগণ যে ফক্বীহ এটা প্রমাণ করার পর আমি বলতে চাই, মুহাদ্দিছগণের ফিক্বহটাই বেশী মযবূত। যেমন আমরা দেখেছি আব্দুল হাই (রহঃ)-এর মন্তব্যে। কেননা অনেক সময় এমন ফক্বীহ যার হাদীছের জ্ঞান তেমন নাই সে হয়তো নিজের বিবেক বুদ্ধি খাটিয়ে একটা ফৎওয়া দিল। পরবর্তীতে দেখা গেল সেই বিষয়ে সরাসরি রাসূল (ছাঃ) থেকে বিপরীত মন্তব্য রয়েছে। অপর পক্ষে মুহাদ্দিছ এই ঝুকি থেকে মুক্ত। তেমনি কোন ফক্বীহ যার হাদীছের জ্ঞান তেমন নাই সে হয়তো এমন একটি হাদীছ দিয়ে কোন ফৎওয়া দিল যে হাদীছটি হয়তো দুর্বল বা জাল। অপর পক্ষে মুহাদ্দিছ এই ঝুকি থেকে মুক্ত। এই জন্য মুহাদ্দিছের ফিক্বহ সর্বদা বেশী মযবূত। মুহাদ্দিছগণের ফিক্বহ যে সুক্ষ্মও হয়ে থাকে তা বুঝতে চাইলে ছহীহ বুখারী পড়তে হবে। ইমাম বুখারী তার ছহীহ বুখারীতে যেভাবে অধ্যায় রচনা করেছেন এবং হাদীছ থেকে ইস্তিদলাল করেছেন তা বুঝতে ওলামারা হিমশিম খান।
একটি ভূল ধারণাঃ আমাদের দেশের ওলামায়ে কেরামের মধ্যে অন্যতম একটি ভুল ধারণা হচ্ছে তারা হাদীছের বর্ণনাকারী এবং মুহাদ্দিছের মধ্যে পার্থক্য করেননা। মনে করেন হাদীছের প্রত্যেক বর্ণনাকারী মুহাদ্দিছ। অসম্ভব! এই ভূলের কারণেই তারা বলে ফেলে মুহাদ্দিছগণ হচ্ছেন ফারমাসিস্ট। মনে রাখতে হবে, যে ব্যক্তি একটি হাদীছ মুখস্থ করেছে ও বর্ণনা করেছে সেও হাদীছের রাবী তেমনি ইমাম মালেক (রহঃ)ও হাদীছের রাবী। কিন্তু একটি হাদীছ বর্ণনাকারী কোন সময় মুহাদ্দিছ নয় আর ইমাম মালেক নিঃসন্দেহে মুহাদ্দিছ। শুধু তাই নয় যুগে যুগে মুহাদ্দিছ হওয়ার যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে সেখানে শুধু হাদীছ মুখস্থ করলেই কেউ মুহাদ্দিছ হয়ে যাবে এমনটি বলা হয়নি। বরং হাদীছের সানাদ ও টেক্সট সব বিষয়ে যে জ্ঞান রাখে তাকে মুহাদ্দিছ বলা হয়েছে। সুতরাং প্রত্যেক যে মুহাদ্দিছ হবে সে নিশ্চিত ফক্বীহ।
ইমাম আমাশের মন্তব্যের জবাবঃ ইমাম আমাশের পূর্ণ নাম হচ্ছে সুলায়মান বিন মিহরান অাল-আমাশ। তার বিষয়ে সুফিয়ান বিন উয়ায়না বলেন
كَانَ الأَعْمَشُ أَقْرَأَهُم لِكِتَابِ اللهِ، وَأَحْفَظَهُم لِلْحَدِيْثِ، وَأَعْلَمَهُم بِالفَرَائِضِ
তথা আমাশ একাধারে কুরআনের বিষয়ে সবচেয়ে জ্ঞানী, হাদীছের সবচেয়ে হাফিয, এবং ফারায়েয বিষয়ে সবচেয়ে জ্ঞানী। (সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৬/২২৮ )
অামাদের মনে রাখতে হবে ইসলামে যত মাসালা-মাসায়েল রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন মাসায়েল হচ্ছে ফারায়েয। মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীগণের মাঝে সম্পদ বন্টন সংক্রান্ত জ্ঞানকে বলা হয় ফারায়েয। যে ফারায়েযের জ্ঞান রাখবে সে ফক্বীহ নয় এটা কল্পনা করা অসম্ভব। শুধু তাই নয় ইমাম আমাশ হচ্ছেন ইবরাহীম নাখয়ী (রহঃ)-এর বিখ্যাত ছাত্র। অর ইবরাহীম নাখয়ী একজন বিখ্যাত মুহাদ্দিছ ও ফক্বীহ। শুধু তাই নয় হানাফী ভাইগণের নিকট সানাদের যে সিলসিলার রাবীগণ খুবই প্রিয় এবং ফক্বীহ হিসেবে স্বীকৃত সেই সিলসিলাটি হচ্ছে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে আলকামা রহঃ তার থেকে ইবরাহীম নাখয়ী রহ তার থেকে হাম্মাদ তার থেকে ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) । এই ফিক্বহী সিলসিলার অন্যতম একজন হচ্ছেন আমাশ (রহঃ) । এমনকি পৃথিবীতে সর্ব বিশুদ্ধ সানাদ হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে আলকামা রহঃ তার থেকে ইবরাহীম নাখয়ী রহ তার থেকে আমাশ রহঃ। সুতরাং ইমাম আমাশ রহঃ নিঃসন্দেহে একজন ফক্বীহ। তারপরেও কেন তিনি ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-কে বললেন ‘আপনারা ডাক্তার আর আমরা হচ্ছি ফারমাসিস্ট’। এটা মূলত ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর সামনে তার বিনয় বৈ কিছুই নয়। তার এই বিনয়কে পুঁজি বানিয়ে দুনিয়ার সকল মুহাদ্দিছকে গইর ফক্বীহ ছাবিত করা। ধৃষ্টতা। বোকামী। তাহলে দুনিয়ার তিনটি মাযহাবই ফিক্বহ থেকে খারিজ হয়ে যাবে। যা আমরা আগেই প্রমাণ করেছি।
ইমাম আলবানী নিঃসন্দেহে ফক্বীহঃ
এবার আসি ইমাম নাসিরুদ্দিন আলবানী (রহঃ)-এর বিষয়ে – প্রথমত আমরা দেখব তিনি কি ফিক্বহী বিষয়ে কোন গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করেছেন? না শুধু হাদীছের তাহক্বীক্ব বিষয়ে গ্রন্থ লিখেছেন।
ক. সিফাতু ছলাতিন নাবী – ছালাত নিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত বই এটি।
খ. আহকামুল জানায়েয – জানাযার হুকুম-আহকাম নিয়ে অসাধারণ একটি বই।
গ. আদাবুয যিফাফ – বাসর রাতের হুকুম-আহকাম নিয়ে লিখিত গ্রন্থ।
ঘ. তামামুল মিন্নাহ – ফিক্বহুস সুন্নাহ-এর উপর লিখিত অসাধারণ একটি গ্রন্থ।
এই বইগুলো স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে ইমাম আলবানী (রহঃ)-এর ফিক্বহী জ্ঞান ছিল। শুধু তাই নয় তার বিখ্যাত গ্রন্থ সিলসিলা ছহীহা-এর পূর্ণ নাম কি জানেন ?
سلسلة الأحاديث الصحيحة وشيء من فقهها وفوائدها
তথাঃ ছহীহ হাদীছের সিলসিলা ও সেই হাদীছগুলোর ফিক্বহ ও উপকারিতা। তার এই নাম প্রমাণ করে তিনি ফক্বীহ ছিলেন।
এইবার আসি ওলামায়ে কেরাম তার বিষয়ে কি মন্তব্য করেছেন?
শায়খ সলিহ আল মুনাজ্জিদ স্পষ্টভাষায় বলেছেন,

الشيخ الألباني رحمه الله محدث كبير وفقيه مجتهد

তথা আলবানী রহঃ অনেক বড় মুহাদ্দিছ ও ফক্বীহ মুজতাহিদ। দেখুন!https://islamqa.info/ar/113687
শায়খ সলেহ আল উসাইমীন (রহঃ) বলেছেন
أنه ذو علم جم في الحديث رواية ودراية .
তথা তিনি হাদীছ শাস্ত্রে সানাদগত ও মাতানগত উভয় দিকে থেকে অনেক জ্ঞানের অধিকারী। (রাদউল জানী, ত্বরেক আওজুল্লাহ-১ম অধ্যায়)
এখানে স্পষ্টভাবে শায়খ সলেহ আল উসাইমীন (রহঃ) বলেছেন হাদীছের সানাদ শুধু নয় বরং মূল টেক্সট বিষয়েও শায়খের জ্ঞান অনেক গভীর।
সুতরাং আলবানী (রহঃ) নিঃসন্দেহে একজন মুজতাহিদ ফক্বীহ । ওয়াল্লাহু আলামু মিন্না।
পরিশেষে বলতে চাই, ইমাম আলবানী যে ফক্বীহ নন এই মন্তব্য করতে আগে তার মত মুহাদ্দিছ ও ফক্বীহ হওয়া লাগবে। যিনি ফক্বীহ মুজতাহিদ নন আমার মনে হয় তার এই ধরণের মন্তব্য করা উচিৎ নয়। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সুমতি দান করুন!!
লেখকঃ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক।
ছাত্রঃ মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা, সৌদিআরব।।
Share This Post

Translate