Tuesday, November 30, 2021

বিদআতীদের সাথে বন্ধুত্ব রাখা যাবে কি?

 প্রশ্ন : আমরা জানি যে ইখতেলাফ ইমামদের মধ্যেও ছিলো। তারপরেও তারা একে অপরকে বন্ধু হিসেবে মেনে নিতো। আমার প্রশ্ন হলো, বর্তমানে যারা বিভিন্ন মাজহাব মেনে চলেন তারা তো কোনো না কোনো ইমামকেই অনুসরণ করেন, তারা যা করেন, সেটা তো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মতে অনেক কিছুই বিদআত …আর যতটুকু জানি হাদিসে বিদাতিদের সাথে বন্ধুত্ব রাখতে নিষেদ করা হয়েছে। তাহলে ইমামদের মধ্যে পরস্পর বন্ধুত্ব রাখা আর আমাদের সাধারণ মানুষদের মধ্যে বিদাতিদের সাথে বন্ধুত্ব না রাখা টা কেমন সাংঘর্ষিক মনে হচ্ছে না? বিষয় টা একটু বুঝিয়ে বললে উপকৃত হবো।

==========================

উত্তর : শাখাগত বিভিন্ন মাসআলা বিষয়ে আমাদের পূর্বসূরী ইমামগণ মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছেন। (আকীদাগত ও দ্বীনের মৌলিক বিষয়ে মতবিরোধ ছিল খুবই সীমীত) তারপরও তাদের একে অপরের মাঝে বন্ধুত্ব বজায় ছিল। এর কারণ ছিল তারা দলীলকে কেন্দ্র করে মতবিরোধ করেছেন। প্রত্যেকের উদ্দেশ্য ছিল সঠিক সিদ্ধান্তে উপণিত হওয়া। এখানে তাদের ব্যক্তিগত কোনও উদ্দেশ্য ছিল না।
তবে যারা আকীগতভাবেই বিদআতী ছিল আমাদের পূর্বসূরীগণ তাদের সাথেও কথা বলেছেন, তাদের কাছে গেছেন ও তাদের সাথে বির্তক করেছেন। এর কারণ ছিল, তাদেরকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা বা তাদের বাতিল আকীদাকে মানুষের কাছে প্রকাশ করে দেয়া- যাতে অন্যরা সচেতন হয়। যেমন, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. খারেজী সম্প্রদায়ের সাথে বির্তক করেছেন, ইবনে তাইমিয়া রাহ. বিভিন্ন বিদআতী গোষ্ঠির সাথে বির্তকে লিপ্ত হয়েছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল যেন, তারা সঠিক পথে ফিরে আসে বা অন্য মানুষ যেন তাদের মাধ্যমে প্রতিরিত না হয়।

বিদআতীদের সাথে এ ধরণের সম্পর্ক বর্তমানেও অব্যহত রাখা যাবে। তবে সাধারণ মানুষ নয় বরং যারা দ্বীনের বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখেন এবং বাতিলের সাথে মোকাবেলা করার যোগ্যতা রাখেন কেবল তারা। সাধারণ মানুষ তাদের সাথে সম্পর্ক রাখার ফলে নিজেরাই গোমারাহীর দিকে ধাবিত হতে পারে।
কিন্তু যদি তাদের সাথে সম্পর্ক রাখায় কোন কল্যাণের আশা না থাকে তাহলে তাদের সাথে কথা বলা যাবে না, তাদের সাথে উঠাবসা করা যাবে না। শরঈ স্বার্থ ছাড়া তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা হলে এই আয়াতের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন:
وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّىٰ يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ ۚ وَإِمَّا يُنسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَىٰ مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
*“যখন আপনি তাদেরকে দেখেন, যারা আমার আয়াত সমূহে ছিদ্রান্বেষণ করে, তখন তাদের কাছ থেকে সরে যান যে পর্যন্ত তারা অন্য কথায় প্রবৃত্ত না হয়, যদি শয়তান আপনাকে ভূলিয়ে দেয় তবে স্মরণ হওয়ার পর জালেমদের সাথে উপবেশন করবেন না।”* (সূরা আনআম: ৬৮)
হাসান রহ. বলেন: لا تجالسوا أهل الأهواء ولا تجادلوهم ولا تسمعوا منهم. رواه اللالكائي
“প্রবৃত্তির অনুসারীদের সাথে উঠাবসা করো না, তাদের সাথে বির্তক করো না এবং তাদের কথা শুনিও না।” (লালকাঈ)
*মোটকথা*, যোগ্য আলেমগণ বিতআতী ও বাতিল আকীদপন্থী লোকদের সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ রাখতে পারেন তাদেরকে সহীহ পথে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বা মানুষকে তাদের গোমরাহী মূলক আকীদা ও আমল সম্পর্কে সচেতন করার উদ্দেশ্যে। তবে সাধারণ মানুষরা তাদের সাথে উঠাবসা করা, তাদের বক্তব্য শুনা ও তাদের লিখিত বই-পুস্তক পড়া থেকে যথাসম্ভ দূরত্ব বজায় রাখবে যেন তারা বিদআতীদের বাতিল আকীদা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। আল্লাহ তাওফিক দানকারী।

উত্তর দিয়েছেন শাইখ Abdullahil Hadi Bin Abdul Jalil

বাড়িতে সুন্নত ও নফল সালাত এবং মসজিদে দু রাকআত তাহিয়াতুল মসজিদ: যে দুটি সুন্নত অধিকাংশ মুসলিমের নিকট চরম উপেক্ষিত

 প্রশ্ন:

ক. হাদিসের আলোকে বাড়িতে সুন্নত ও নফল সালাত পড়ার গুরুত্ব কতটুকু?
খ. ফজরের সুন্নত সালাত বাড়িতে পড়ার পর মসজিদে গিয়ে সময় থাকলে কি তাহিয়াতুল মসজিদ/দুখুলুল মসজিদ এর দু রাকআত আদায় করতে হবে?
গ. মসজিদে প্রবেশ করার পর যদি জামাআত দাঁড়ানোর সামান্য সময় বাকি থাকে (যেটুকু সময়ে সাধারণত: দু রাকআত সালাত পড়া সম্ভব নয়) তাহলে কী করা উচিৎ? তাহিয়াতুল মসজিদের সালাত শুরু করা না কি দাঁড়িয়ে থাকা?

উত্তর:

নিম্নে উপরোক্ত প্রশ্ন সমূহের উত্তর প্রদান করা হল:

◐◐ (ক) প্রশ্ন: বাড়িতে সুন্নত ও নফল সালাত পড়ার গুরুত্ব কতটুকু?

উত্তর: বহু সংখ্যক হাদিস দ্বারা সু প্রমাণিত যে, পুরুষদের জন্য ফরজ ছাড়া সকল প্রকার সুন্নত, নফল ইত্যাদি বাড়িতে পড়া অধিক উত্তম।
কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, বর্তমানে বাড়িতে সুন্নত ও নফল সালাত পড়ার আমলটি নেই বললেই চলে। যারা নিয়মিত সালাত আদায় করে তারাও অধিকাংশই মসজিদে গিয়ে সুন্নত সালাতগুলো পড়ে থাকে অথচ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এগুলো নিয়মিত তাঁর ঘরেই আদায় করতেন।

নিম্নে এ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদিস পেশ করা হল:

❖ ১) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

فَعَلَيْكُمْ بِالصَّلاَةِ فِىْ بُيُوْتِكُمْ فَإِنَّ خَيْرَ صَلاَةِ الْمَرْءِ فِىْ بَيْتِهِ إِلاَّ الصَّلاَةَ الْمَكْتُوْبَةَ

“বাড়িতে সালাত আদায় করাকে তোমরা নিয়ম বানিয়ে নাও। কেননা পুরুষের জন্য ফরয সালাত ব্যতীত ঘরে সালাত আদায় করা উত্তম।” [বুখারী হা/৭৩১; মুসলিম হা/৭৮০]

❖ ২) তিনি আরও বলেন:

إِذَا قَضَى أَحَدُكُمْ صَلاَتَهُ فَلْيَجْعَلْ لِبَيْتِهِ مِنْهَا نَصِيبًا فَإِنَّ اللهَ جَاعِلٌ فِىْ بَيْتِهِ مِنْ صَلاَتِهِ خَيْرًا

“তোমাদের কেউ যখন সালাত আদায় করে, তখন সে যেন ঘরের জন্য সালাতের কিয়দাংশ রেখে দেয়। কেননা ঘরে সালাত আদায়ের ফলে আল্লাহ তাতে কল্যাণ দান করেন।” [ইবনে মাজাহ হা/১৩৭৬; সিলসিলা সহীহাহ হা/১৩৯২।]

❖ ৩) আব্দুল্লাহ ইবনে সা‘দ রা. হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন,

سَأَلْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَيُّمَا أَفْضَلُ الصَّلاَةُ فِى بَيْتِى أَوِ الصَّلاَةُ فِى الْمَسْجِدِ قَالَ أَلاَ تَرَى إِلَى بَيْتِى مَا أَقْرَبَهُ مِنَ الْمَسْجِدِ فَلأَنْ أُصَلِّىَ فِى بَيْتِى أَحَبُّ إِلَىَّ مِنْ أَنْ أُصَلِّىَ فِى الْمَسْجِدِ إِلاَّ أَنْ تَكُونَ صَلاَةً مَكْتُوبَةً.
“আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলাম:
কোনটি উত্তম, আমার ঘরে সালাত আদায় করা না কি মসজিদে?

তিনি বললেন: তুমি কি দেখ না আমার ঘর মসজিদের কত নিকটে? তা সত্ত্বেও মসজিদে সালাত আদায় করার চেয়ে ঘরে সালাত আদায় করা আমার নিকটে অধিক প্রিয়; ফরয সালাত ব্যতীত’। [ইবনে মাজাহ হা/১৩৭৮; সহীহ আত-তারগীব হা/৪৩৯।]

❖ ৪) তিনি আরও বলেন,
اجْعَلُوْا فِىْ بُيُوْتِكُمْ مِنْ صَلاَتِكُمْ، وَلاَ تَتَّخِذُوْهَا قُبُوْرًا
“তোমাদের ঘরেও কিছু সালাত আদায় করবে এবং ঘরকে তোমরা কবর বানিয়ে নিও না’। [বুখারী হা/৪৩২, ১১৮৭; আবু দাউদ হা/১০৪৩, ১৪৪৮; তিরমিযী হা/৪১৫; ইবনে মাজাহ হা/১১৪১; মিশকাত হা/৭১৪।]

উপরোক্ত হাদিস সমূহ থেকে ফরয সালাত ছাড়া অন্যান্য সাধারণ নফল-সুন্নত ইত্যাদি সালাত বাড়িতে পড়ার গুরুত্ব ও ফযিলত সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আমল করার তওফিক দান করুন। আমীন।

▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
◐◐ (খ) প্রশ্ন: ফজরের সুন্নত সালাত বাড়িতে পড়ার পর মসজিদে গিয়ে সময় থাকলে কি তাহিয়াতুল মসজিদ/দুখুলুল মসজিদ এর দু আকআত আদায় করতে হবে?

উত্তর: কেউ যদি ফজরের সুন্নত বাড়িতে পড়ে তবে নিঃসন্দেহে তা উত্তম। অত:পর মসজিদে গিয়ে জামাআত শুরু হতে যদি কিছুটা বিলম্ব থাকায় সে যদি বসতে চায় তাহলে প্রথমে তাহিয়াতুল মসজিদ/ দুখুলুল মসজিদের দু রাকআত আদায় করবে। কেননা মসজিদে প্রবেশের পর বসার পূর্বে দু রাকআত সালাত আদায় ব্যতিরেকে বসতে নিষেধ করা হয়েছে। এ মর্মে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তম্মধ্যে একটি হল:
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন
إِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمُ الْمَسْجِدَ فَلاَ يَجْلِسْ حَتَّى يُصَلِّيَ رَكْعَتَيْنِ
“ যখন তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করে তখন দু রাকআত সালাত আদায়ের পূর্বে বসবে না।” (সহীহ বুখারী)
▬▬▬▬▬▬▬▬▬
◐◐ (গ) প্রশ্ন: মসজিদে প্রবেশ করার পর যদি জামাআত দাঁড়ানোর সামান্য সময় বাকি থাকে (যেটুকু সময়ে সাধারণত: দু রাকআত সালাত শেষ করা সম্ভব নয়) তাহলে কী করা উচিৎ? তাহিয়াতুল মসজিদের সালাত শুরু করা না কি দাঁড়িয়ে থাকা?

উত্তর: কেউ যদি এমন সময় মসজিদে প্রবেশ করে যখন জামাআত শুরু হওয়ার সামান্য সময় বাকি আছে (এক বা দুই মিনিট) তাহলে এ ক্ষেত্রে তাহিয়াতুল মসজিদের সালাত শুরু করবে না বরং দাঁড়িয়ে থাকবে এবং ইকামত হলে ইমামের সাথে তাকবীরে তাহরিমা সহকারে জামাআত ধরবে।
এ মর্মে ইমাম নওবী রহ. বলেন:
” وَإِنْ دَخَلَ وَالْإِمَامُ فِي آخِرِ الْخُطْبَةِ وَغَلَبَ عَلَى ظَنِّهِ أَنَّهُ إنْ صَلَّى التَّحِيَّةَ فَاتَهُ تَكْبِيرَةُ الْإِحْرَامِ مَعَ الْإِمَامِ لَمْ يُصَلِّ التَّحِيَّةَ ، بَلْ يَقِفُ حَتَّى تُقَامَ الصَّلَاةُ ، وَلَا يَقْعُدُ ، لِئَلَّا يَكُونَ جَالِسًا فِي الْمَسْجِدِ قَبْلَ التَّحِيَّةِ ، وَإِنْ أَمْكَنَهُ الصَّلَاةُ وَإِدْرَاكُ تَكْبِيرَةِ الْإِحْرَامِ صَلَّى التَّحِيَّةَ ، هَكَذَا فَصَّلَهُ الْمُحَقِّقُونَ ” انتهى من “المجموع” (4/ 551)
“আর যদি কেউ মসজিদে প্রবেশ করে এমন সময় যে, (জুমার দিন) ইমাম খুতবার শেষ দিকে রয়েছে এবং মনে এ ধারণা প্রবল হয় যে, যদি তাহিয়াতুল মসজিদ পড়ে তাহলে ইমামের সাথে তাকবিরাতুল ইহরাম (তাকবীরে তাহরিমা) ছুটে যাবে তাহলে তাহিয়াতুল মসজিদ পড়বে না। বরং একামত হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকবে; বসবে না-যেন সে তাহিয়াতুল মসজিদ পড়া ব্যতিরেকে মসজিদে উপবেশন কারী না হয়ে যায়।
আর যদি সালাত পড়ে তাকবীরে তাহরিমা ধরা সম্ভব হয় তাহলে তাহিয়াতুল মসজিদ পড়বে। এভাবেই বিশ্লেষকগণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।” (আল মাজমু ৪/৫৫১)

আল্লাহু আলম।।
▬▬▬▬◆◈◆ ▬▬▬▬
উত্তর প্রদান:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব

ইন্সুরেন্স কোম্পানীতে চাকুরী করার বিধান

 ইন্সুরেন্স কোম্পানীতে চাকুরী করার বিধান:

আমাদের দেশে ইনস্যুরেন্স বা বীমা কোম্পানিগুলো অধিকাংশই বাণিজ্যিক, যা সবই প্রতারণা ও সুদ নির্ভর। তাই এ সকল কোম্পানিতে চাকুরী করা বা তাতে অর্থ লগ্নি করা হারাম।

আন্তর্জাতিক ফিকহ একাডেমি (ওআইসির একটি শাখা সংস্থা) এবং সউদী আরবের উচ্চ উলামা পরিষদ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, সব ধরণের বাণিজ্যিক বীমা হারাম। চাই তা জীবন বীমা হোক বা সম্পদের বীমা হোক।

তার কারণ সমূহ নিম্নে উল্লেখ করা হল:

প্রথমত: বাণিজ্যিক জীবন বীমা হচ্ছে এমন একটি চুক্তি যাতে অর্থের বিনিময় হয়ে থাকে। কিন্তু তাতে আছে কঠিন ধোঁকার সম্ভাবনা। কেননা বীমাকারীর পক্ষে চুক্তির সময় একথা জানা সম্ভব নয় যে, কি পরিমাণ অর্থ সে প্রদান করবে এবং কি পরিমাণ গ্রহণ করবে। এমনও হতে পারে যে, সে হয়তো এক বা দু কিস্তি অর্থ প্রদান করল এবং তারপরেই কোন দুর্ঘটনা ঘটল। তখন বীমা কর্তৃপক্ষ শর্ত অনুযায়ী বিরাট পরিমাণ অর্থ দিতে বাধ্য থাকবে। হতে পারে কোন দুর্ঘটনাই ঘটল না। তখন বীমাকারী সকল কিস্তি পরিশোধ করতেই থাকবে। অথচ বেঁচে থাকতে সে শেষে কিছুই পাবে না; তার মৃত্যুর পর তার ওয়ারিছগণ পাবে।

সহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘বাই গারার’বা প্রতারণা ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা থেকে নিষেধ করেছেন।(মুসলিম)

দ্বিতীয়ত: বাণিজ্যিক বীমা মূলত: এক ধরণের জুয়া। কেননা এখানে অর্থ আদান-প্রদানে ঝুঁকি ও প্রতারণার সুযোগ আছে। বিনা অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ আছে আবার বিনা প্ররিশ্রমে ও বিনিময় ছাড়াই অধিক লাভবান হওয়ারও সুযোগ আছে। কেননা বীমাকারী কয়েক কিস্তি দেয়ার পর কোন দুর্ঘটনায় পতিত হল, তখন কর্তৃপক্ষ বীমার যাবতীয় অর্থ দিতে বাধ্য থাকবে, ফলে কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর যদি কোন দুর্ঘটনা না ঘটে তবে কর্তৃপক্ষ বীমার কিস্তির মাধ্যমে লাভবান হতেই থাকবে। অথচ তাদের এই লাভ বিনিময় ছাড়াই হচ্ছে। অতএব এখানে যখন অজ্ঞতা সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তখন তা নিষিদ্ধ জুয়ার পর্যায়ে পড়ে যাচ্ছে। আর আল্লাহ কুরআনে জুয়াকে হারাম করেছেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য ব্যতীত অন্য কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও।” (মায়েদাঃ ৯০)

তৃতীয়ত: বাণিজ্যিক বীমায় তাৎক্ষণিক ও বিলম্বে সুদের ব্যবস্থা আছে। কেননা বীমা কোম্পানি গ্রাহককে বা তার উত্তরাধিকারকে বা অনুমোদিত ব্যক্তিকে জমা কৃত অর্থের চেয়ে বেশী প্রদান করবে, ফলে তা তাৎক্ষণিক সুদের পর্যায়ভুক্ত গণ্য হবে। আর এই প্রদানটি নির্দিষ্ট একটি সময় অতিবাহিত হওয়ার পর দেয়ার কারণে তা বিলম্ব সুদেরও অন্তর্ভুক্ত হবে। আর উভয় প্রকার সুদ হারাম।

চতুর্থত: বাণিজ্যিক বীমা নিষিদ্ধ বাজির অন্তর্ভুক্ত। কেননা উভয় ক্ষেত্রে (বীমা ও বাজিতে) অজ্ঞতা, ধোঁকা ও জুয়ার সুযোগ আছে। আর ইসলামের উপকার ও সহযোগিতার উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য কোন ক্ষেত্রে বাজি ধরাকে শরীয়ত নিষেধ করেছে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাজি ধরার বৈধতাকে শুধু তিনটি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, “উট ও ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতা এবং তীর নিক্ষেপ ব্যতীত অন্য কোন ক্ষেত্রে বাজী ধরা চলবে না।” (আবু দাউদ)

পঞ্চমত: বাণিজ্যিক বীমার মাধ্যমে অন্যের সম্পদ বিনিময় ব্যতীত অর্জন করার সুযোগ আছে। আর বাণিজ্যিক চুক্তিতে বিনিময় ছাড়া অর্থ উপার্জন হারাম। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ।” (নিসাঃ ২৯)

ষষ্ঠত: বাণিজ্যিক বীমায় এমন কিছু নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য করা হয়, শরীয়তে যা বাধ্য করা হয়নি। এই চুক্তিতে বীমা কর্তৃপক্ষ থেকে কোন দুর্ঘটনা আসেনি বা দুর্ঘটনার কোন কারণও হয়নি, তবু শুধু বামী কারীর সাথে চুক্তির কারণে ‘দুর্ঘটনা হতে পারে’এমন অনুমানের ভিত্তিতে বিমাকারীর কিছু অর্থের বিনিময়ে তাকে অর্থ দিতে বাধ্য থাকবে। এই জন্য এটা হারাম লেনদেন।

ইসলামী শরীয়ত মানুষকে হালাল ভাবে অর্থ উপার্জন ও খরচ করতে যেমন আদেশ করেছে, তেমনি সকল প্রকার হারাম উপার্জনকে বর্জন করতে কঠোরভাবে তাগিদ দিয়েছে। অন্যতম হারাম উপার্জন হচ্ছে সুদ, যা বিশেষভাবে এই বাণিজ্যিক বীমায় প্রদান করা হয়। এই সুদকে শরীয়ত যেমন হারাম করেছে, তেমনি সুদের সাথে জড়িত সকলকেই অপরাধী সাব্যস্ত করেছে। আল্লাহ বলেন, وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا “আল্লাহ বেচা-কেনা হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (বাকারাঃ ২৭৫)

عَنْ جَابِرٍ قَالَ لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ آكِلَ الرِّبَا وَمُؤْكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ

জাবের রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লা’নত করেছেন তার উপর যে সুদ খায়, যে সুদ দেয়, যে সুদ লেখে এবং সুদের ব্যাপারে যারা সাক্ষী থাকে। তারা সকলেই সমান অপরাধী।” (মুসলিম)

অনুবাদক: আবদুল্লাহ আল কাফী

দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদী আরব।

নির্দিষ্ট অঙ্কে ক্রয় করে দ্বিগুন অঙ্কে বিক্রি করা

 প্রশ্ন : জনৈক ব্যক্তি বাকিতে ও নির্দিষ্ট মূল্যে আমার কাছ থেকে কম্পিউটার ক্রয় করে। কিন্তু সে তা অন্য ক্রেতাদের নিকট দ্বিগুন মূল্যে বিক্রি করে। অতঃপর সে আমার পূর্ণ টাকা পরিশোধ করে। এ বিকিকিনি কি জায়েজ ?   উত্তর : আল-হামদুলিল্লাহ প্রথমত : আপনার যাকে ইচ্ছা তার কাছে নির্দিষ্ট মূল্যে ও বাকিতে মাল বিক্রি করতে পারেন। অতঃপর সে যে দামে ইচ্ছা বিক্রি করবে, এবং আপনার পাওনা পরিশোধ করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন : (وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا) البقرة/275 {এবং আল্লাহ ব্যবসা হালাল করেছেন, এবং সূদ হারাম করেছেন।} বাকারা : (২৭৫)   ব্যবসায়ীদের মাঝে এ পক্রিয়াটি খুব বেশী সচারচর। কারণ, খুচরা বিক্রেতারা প্রথমে বাকিতে ক্রয় করে, অতঃপর তা বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করে। তবে এ ধরণের লেনদেনের জন্য শর্ত হচ্ছে, ক্রেতার তা গ্রহণ করতে হবে। এবং বিক্রির পূর্বে আপনার দোকান থেকে অথবা আপনার জায়গা থেকে তা নিয়ে নিতে হবে। কারণ, জায়েদ বিন সাবেত -রাদিআল্লাহ আনহু – থেকে বর্ণিত, (نَهَى أَنْ تُبَاعَ السِّلَعُ حَيْثُ تُبْتَاعُ حَتَّى يَحُوزَهَا التُّجَّارُ إِلَى رِحَالِهِمْ) . والحديث حسنه الألباني في صحيح أبي داود যেখানে মাল ক্রয় করা হয়, ঠিক সেখানেই মাল বিক্রি করতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন, যতক্ষণ না ক্রেতা তা নিজ জিম্মাদারিতে নিয়ে নেয়। দারা কুতনী; আবু দাউদ : (৩৪৯৯), আল-বানী সহিহ আবু দাউদে হাদিসটি হাসান বলেছেন। দ্বিতীয়ত : শরিয়তে লাভ করার কোন নির্দিষ্ট সীমা নেই। আপনার কাছ থেকে ক্রয়কৃত পণ্য, সে তার ইচ্ছে মত বর্ধিত মূল্যে বিক্রি করতে পারবে। তবে শর্ত হচ্ছে, ক্রেতার উদাসীনতা, অনভিজ্ঞতা ও মূল্য সম্পর্কে তার অজ্ঞতাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। আল্লাহ ভাল জানেন। সূত্র: islamqa.info

নবী-ওলীর অসীলায় দুআ করা যায় কি

 প্রশ্নঃ নবী-ওলীর অসীলায় দুআ করা যায় কি?

উত্তরঃ

না। নবি-আলীর আসীলায় দু’আ করা যায় না। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সরাসরি দু’আ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
আর আমার দাসগণ যখন আমার সম্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞেসা করে, তখন তুমি বল, আমি তো কাছেই আছি। যখন কোন প্রার্থনাকারী আমাকে ডাকে, তখন আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিই। অতএব তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমাতে বিশ্বাস স্থাপন করুক, যাতে তাঁরা ঠিক পথে চলতে পারে। (বাকারাহঃ ১৮৬)
আর মুহাম্মাদ (সঃ)-এর অসীলায় আদম (আঃ)-এর দুআ করার কথা প্রমাণিত নয়।
পরন্ত প্রমাণের ভিত্তিতে তিন প্রকার আসীলায় দুআ করা যায়ঃ-
১। মহান আল্লাহ্‌র নাম ও গুণাবলীর আসীলায় দুআ।
২। স্বীকৃত নেক আমলের আসীলায় দুআ।
৩। জীবিত ও উপস্থিত ব্যক্তির দুআর আসীলায় দুআ।
এ সবের দলীল রয়েছে আকীদার বইগুলিতে। পক্ষান্তরে শেষ নবী (সঃ)-এর আসীলায় আদম (আঃ)-এর দু’আর হাদীস সহীহ নয়। দলিল-সহ সবিস্তার দ্রষ্টব্য ‘তাওহীদ-কৌমুদী’।

গ্রন্থের নামঃ দ্বীনী প্রশ্নোত্তর
বিভাগের নামঃ আকিদা’হ ও তাওহীদ
লেখকের নামঃ আবদুল হামীদ ফাইযী।।

Translate