Monday, November 29, 2021

জেনে নিন কিছু বহুল প্রচলিত জাল হাদিস

 কটি জাল হাদিস মেনে চলা মানে মিথ্যা প্রচার করা বা মিথ্যা অনুসরণ করে নিজেকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে ফেলা। সুতরাং যে কোন হাদিস জানার আগে তার সূত্র এবং এটি সহিহ বা বিশুদ্ধ কিনা তা জেনে নেয়া খুব জরুরী। এর জন্য খুব কষ্ট করার দরকার নেই। কম্পিউটার থাকলে এক সার্চেই এর আদ্যোপান্ত বেরিয়ে আসবে। আর তা না থাকলে একজন ভালো আলিমের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে। আসুন দেখে নেয়া যাক কিছু প্রচলিত জাল হাদিস এবং মিলিয়ে দেখে নিন আপনার জানা হাদিসগুলো এর ভেতর পড়ে কিনা।

১। “জ্ঞানার্জনের জন্য সুদূর চীনে হলেও যাও”। (ইবন আদী ২/২০৭। ইবন জাওজী ও ইবন হিব্বান এটিকে জাল প্রমাণ করেছেন)
বহুল ব্যবহৃত ও বহুল প্রচারিত একটি জাল হাদিস। একটু খতিয়ে দেখলে সাধরণ চোখেই এই হাদিসটির জালিয়াতি চোখে পড়ে। রাসুলুল্লাহ সাঃ যদি সত্যিই এ কথা বলতেন তাহলে অত্যন্ত কষ্টকর হলেও চীনে অগণিত সাহাবাদের যাতায়াত থাকতো। তাছাড়া সে সময় চীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্য এমন কোন যায়গা ছিলোনা যে জ্ঞানার্জনের জন্য কাছাকাছি অনেক যায়গা ছেড়ে সেখানে যেতে রাসুলুল্লাহ সাঃ বলবেন।

২। “বিদ্বানের কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র”। (বাগদাদের ইতিহাস লিপিবদ্ধকালে খাতিব হাদিসটি লিপিবদ্ধ করেছেন, তবে তিনি নিজেই একে জাল বলেছেন)
শহীদদের মর্যাদা আর সকলের চেয়ে বেশী তা আল্লাহ্ নিজে কুরআনে বলেছেন। বহুল প্রচলিত এই জাল হাদিসটি দিয়ে মানুষকে শাহাদাতের বন্ধুর পথ থেকে অতি সূক্ষ্মভাবে দূরে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। একথা সত্য বলে মানার পর এমন কি কোন লোক থাকবে, যে বিদ্বান না হয়ে শহীদ হতে চাইবে?

৩। “মসজিদে অপ্রয়োজনীয় কথা বললে তা সৎকাজগুলিকে ধ্বংস করে, যেভাবে প্রাণী ঘাস সাবাড় করে”। (তাবাকাত আশ শাফি’ইয়া, চতুর্থ খন্ড, ১৪৫ পৃঃ)
মসজিদ হলো ইসলামের প্রাণকেন্দ্রের মতো। অন্যায় ও অশ্লীল কথা ছাড়া সকল ভালো কথা, কাজ, পরিকল্পনার যায়গা হিসাবে রাসুলুল্লাহ সাঃ এর সময় থেকেই ছিলো মসজিদ।

৪। “আরবদের তিন কারণে ভালোবেসো। প্রথমতঃ আমি একজন আরব, দ্বিতীয়তঃ কুরআন নাজিল হয়েছে আরবী ভাষায়, তৃতীয়তঃ জান্নাতের ভাষা হবে আরবী”। (মুসতাদরাক আল হাকিমঃ চথুর্থ খন্ড, পৃষ্ঠাঃ ৮৭। রিজাল শাস্ত্রের অন্যতম সেরা স্কলার আবু হাতিম একে জাল প্রমাণ করেছেন)।
এই হাদিসটিও ইসলামের ভেতর জাতীয়তাবাদের বিষবাষ্প ঢুকাবার জন্য ব্যবহার করা হয়। আরব-অনারব কোন পার্থক্য ইসলামে নেই বরং এমন করার অপচেষ্টা কবিরা গুনাহ।

৫। “মুসলিমদের ভেতর এমন একজন ব্যক্তিও নেই, যার গুনাহগুলো জুম্মার দিনে ক্ষমা করে দেয়া হয় না”। (তাবরানি বর্ণিত। এটি জাল প্রমাণ করেছেন ইবন নাজর আল আসকালানী ও আজ জাহাবী)
সামান্য আমলের অবিশ্বাস্য ফজিলতের বর্ণনা করে মানুষকে পথভ্রষ্ট বানাবার অপচেষ্টার অংশ হিসাবে এমন অনেক জাল হাদিস তৈরী করা হয়েছে। “আখেরী যুগে একটি সুন্নত পালন করলে সাতশ শহীদের সম্না সওয়াব পাওয়া যাবে” এটিও হলো বহুল প্রচারিত এমন আরেকটি জাল হাদিস।

৬। “আমি হলাম জ্ঞানের শহর আর আলী তার দরজা”। (লিপিবদ্ধ করেছেন আল হাকিম ৩/১২৬। ইমাম বুখারী এটিকে জাল প্রমাণ করেছেন)
আলী রাঃ এর প্রতি বাড়াবাড়ি দেখাতে গিয়ে শিয়াদের দ্বারা অগণিত জাল হাদিস ব্যবহৃত হয়, যার ভেতর এটি হলো বহুল ব্যবহৃত একটি জাল হাদিস। যদিও আলী রাঃ এর মর্যাদা সম্পর্কে বিশুদ্ধ হাদিস আছে।

সুন্নাত পরিপন্থী আমলকে সর্বদা অস্বীকৃতি জানানো অপরিহার্য

 মুমিন ব্যক্তি কেবলমাত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসের যথাযথ অনুসরণ করবে এবং কুরআন ও সহীহ হাদীস পরিপন্থী আমলকে নিঃশর্তভাবে প্রত্যাখ্যান করবে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ
‘মুমিনদের উক্তি তো এই যে, যখন তাদের মধ্যে ফায়ছালা করে দেওয়ার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে আহবান করা হয় তখন তারা বলে, আমরা শ্রবণ করলাম ও আনুগত্য করলাম। আর তারাই সফলকাম। যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর অবাধ্যতা হ’তে সাবধান থাকে তারাই সফলকাম’।
***সূরা আন-নূরঃ আয়াতঃ ৫১-৫২।
আল্লাহ অন্যত্র বলেছেনঃ
‘আমি তোমাকে দ্বীনের এক বিশেষ বিধানের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছি। সুতরাং তুমি তার অনুসরণ কর এবং যারা জানে না তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ কর না’।
***সূরা জাসিয়াঃ আয়াত-১৮।
সাহাবায়ে কেরাম অহি-র বিধান মানার ব্যাপারে যেমন কঠোর ছিলেন – অহি-র বিধান বহির্ভূত আমলের বিরুদ্ধে তেমনি কঠোর ছিলেন। যেমনঃ মু‘আবিয়া(রাঃ) যখন হজ্জ ও ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মদীনায় আসলেন। তখন তাঁর সাথে কিছু গম এসেছিল। তিনি দেখলেন যে, সিরিয়া থেকে আসা অর্ধ ছা‘ গমের মূল্য মদীনার এক ছা‘ খেজুরের মূল্যের সমান হয়। এমতাবস্থায় তিনি তাঁর ইজতিহাদী রায় প্রকাশ করলেন যে, কেউ গম দ্বারা ফেৎরা আদায় করলে অর্ধ ছা‘ দিতে পারে। সাথে সাথে বিশিষ্ট সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী(রাঃ) তার তীব্র প্রতিবাদ করে বলেছিলেনঃ
‘আমি যতদিন দুনিয়ায় বেঁচে থাকব ততদিন তা (অর্ধ ছা‘ গমের ফিৎরা) কখনোই আদায় করব না। বরং (রাসূলুল্লাহ(সাঃ)-এর যামানায়) আমি যা দিতাম তাই-ই দিয়ে যাব’।
***বুখারীঃ ১৫০৮; মুসলিমঃ ৯৮৫।

দ্রুত ইফতার করা, ছিয়ামের আদব

 ছিয়ামের আদব হচ্ছে, দ্রুত ইফতার করা। সূর্য অস্ত যাওয়া নিশ্চিত হলে বা অস্ত যাওয়ার অনুমান প্রবল হলেই সাথে সাথে দেরী না করে ইফতার করা। কেননা রাসুল ﷺ বলেন,

لَا يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ
-মানুষ কল্যাণের মাঝে থাকবে, যতদিন তারা দ্রুত ইফতার করবে।
[বুখারী, অধ্যায়: ছিয়াম, অনুচ্ছেদ: দ্রুত ইফতার করা হা/১৮২১;মুসলিম অধ্যায়: ছিয়াম, অনুচ্ছেদ: সাহুরের ফযীলত, হা/২৬০৮, হাদীসের শব্দাবলী ইভয়ের; তিরমিযী হা/৬৯৯; ইবনু মাজাহ হা/১৬৯৮; দরিমী হা/১৭৫২; আহমাদ হা/২২৮০৪; ইবনু খুযাইমাহ ইরওয়াউল গালীল হা/৯১৭]

আবু হুরায়রাহ (রা:) হতে বর্ণীত অপর হাদীসে রাসূল ﷺ বলেন,
-দ্বীন (ইসলাম) ততদিন পর্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে থাকবে যতদিন লোকেরা ইফতার জলদি করবে, নিশ্চয়ই ইয়াহুদী এবং নাসারা (ইফতার) বিলম্বে করে।
[ আবু দাউদ হা/২৩৫৩ -হাদীসের শব্দাবলী তার; ইবনু খুযাইমাহ হা/২০৬০;ইবনু হিব্বান হা/৩৫০৩; ইবনু মাজাহ হা/১৬৯৮;ইবনু বায়হাক্বী শু’আবুল ঈমান হা/৩৯১৬; আহমাদ হা/৯৮১০;সহীহ আত-তারগীব হা/১০৭৫]
.
অন্য বর্ণনায় রয়েছে:
-লোকেরা ততদিন কল্যাণে খাকবে যতদিন তারা ইফতার জলদি করবে।
[ইবুন মাজাহ হা/১৬৯৭; ইরওয়াউল গালীল হা/৯১৭]
সবাইকে অনুরোধ সহীহ ইফতারের ক্যালেন্ডার সংগ্রহের চেষ্টা করুন। ‘Sunset Dhaka’, ‘Sunset Chittagong’,,‘Sunset Sylhet’ ইত্যাদি মানে আপনি যে জেলায় অবস্থান করছেন সে জেলার নাম লিখে google.com এ Search দিন। সহীহ ইফতারের সময় আপনি নিজেই দেখতে পাবেন। আপনার বাসার ইফতারের ক্যালেন্ডারের সাথে Real-Time সূর্য্যাস্তের মিল খুঁজে নিন। মনে রাখবেন সূর্য্যাস্তের সাথে সাথেই ইফতার করা সুন্নাত। অবহেলায় এই সুন্নাতের অবহেলা কেন করবেন, যেটা ইহুদী নাসারাদের কাজ? আল্লাহ সবাইকে সঠিক ইসলামী জ্ঞান দান করুন এবং সঠিক দ্বীনের উপর অবিচল থাকার তৌফীক দান করুন।। আমীন ইয়া রাব্বাল আলামীন!!

ইসলামে স্ত্রীর সাথে সদাচরণের গুরুত্ব

 নিচের হাদিসগুলো একটু ভালো করে লক্ষ করুন:

হাদিস-১
আবুহুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত:
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ঈমানওয়ালাদের মধ্যে পরিপূর্ণ মুমিন সেই ব্যক্তি, যার আচার-আচরণ উত্তম। আর তোমাদের মাঝে তারাই উত্তম যারা আচার-আচরণে তাদের স্ত্রীদের কাছে উত্তম। [তিরমিযি, হাদিস নং ১০৭৯]

হাদিস-২
আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত:
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, মুমিন মু’মিনা(স্ত্রী)র প্রতি বিদ্বেষ রাখবে না। যদি তার একটি অভ্যাস অপছন্দনীয় হয় তবে আরেকটি অভ্যাস তো পছন্দনীয় হবে। [মুসলিম হাদিস নং- ১৪৬৯, ২৬৭২]

হাদিস-৩
আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত:
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ঈমানওয়ালাদের মধ্যে পরিপূর্ণ মুমিন সেই ব্যক্তি যার আচার-আচরণ উত্তম এবং নিজ পরিবারের জন্য অনুগ্রহশীল। [তিরমিযি, হাদিস নং- ২৫৫৫]

স্বামীর ভালবাসা অর্জনের উপায়

 নারীসুলভ আচরণ করুন (যেমনঃ কোমল হওয়া), স্বামীরা তাদের স্ত্রীর জায়গায় কোন পুরুষ চায় না!

সুন্দর/আকর্ষণীও পোশাক পরুন। আপনি যদি গৃহিণী হন, সারাদিন ধরে রাতের পোশাক (ঢিলাঢালা আরামদায়ক পোশাক) পরে থাকবেন না।
ঘাম/মশলা জাতীয় গন্ধ থেকে পরিচ্ছন্ন ও সুরভিত থাকুন।
আপানর স্বামী বাইরে থেকে ঘরে ঢোকার সাথে সাথে আপানার যাবতীয় সমস্যার কথা বলা শুরু করবেন না। তাকে কিছুটা মানসিক বিরতি দিন।
বার বার জিজ্ঞেস করবে না, ‘কি ভাবছ?’
অনবরত দোষারোপ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখুন, যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ আপনাকে আসলেই সত্যিকার অর্থে অভিযোগ করার মত কিছু দেন।
অন্যের কাছে নিজেদের স্বামী-স্ত্রীর সমস্যার কথা বর্ণনা করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন; এমনকি সাহায্য বা পরামর্শ চাওয়ার অজুহাতেও না! আপনি যদি মনে করেন আপনার বৈবাহিক সমস্যার আইনানুগ সমাধান প্রয়োজন, তাহলে এমন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে যান যেঃ
কোন অন্যায়ের ব্যপারে ভুল সংশোধনের মাধ্যমে মধ্যস্থতা করে দিতে পারে, যাতে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে আবার সুন্দর সমন্বয়ে মিল হয়ে যায়, অথবা
উভয়পক্ষের সম্মতিতে সৌহার্দপূর্ণভাবে বিচ্ছেদ করাতে পারেন।
আপানর শাশুড়ির সাথে ভাল আচরণ করুন, যেমনটি আপনি চান আপানার স্বামী আপানার মায়ের সাথে করুক।
ইসলামে স্বামী স্ত্রীর অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানুন। অধিকার আদায়ের চেয়ে আপনার দায়িত্ব সঠিকভাবে সম্পাদনের ব্যপারে আগে সজাগ হন।
যখন সে ঘরে আসে, দরজায় এমন ভাবে ছুটে যান যেন আপনি তারই অপেক্ষায় ছিলেন। হাসিমুখে তাকে সালাম দিন।
আপনার বাসস্থান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন; অন্তত আপনার স্বামী যতটুকু পরিচ্ছন্ন দেখতে পছন্দ করে।
তাকে এমন বিষয়ে প্রশংসা করুন যে বিষয়ে তিনি নিজে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী নন (যেমন, চেহারা, বা বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি)। এটা তার আত্মবিশ্বাস বাড়াবে।
তাকে বলুন, স্বামী হিসেবে তিনি শ্রেষ্ঠ।
তার পরিবার পরিজনের সাথে প্রায়ই যোগাযোগ করুন।
তাকে সহজ কোন গৃহস্থালি কাজ দিন, কাজটি করে ফেললে তাকে ধন্যবাদ জানান। এতে সে আরও উৎসাহিত হবে।
সে যখন কোন একঘেয়ে কথা বলে, তার কথা ধৈর্য ধরে শুনুন। মাঝে মাঝে তাকে প্রশ্নও করুন যাতে সে বুঝতে পারে আপনি তার কথা আগ্রহ নিয়ে শুনছেন।
তাকে ভাল কাজে উৎসাহিত করুন।
তার মেজাজ খারাপ থাকে, তাকে কিছুটা সময় একা থাকতে দিন। ইনশাআল্লাহ, একসময় তার মেজাজ ঠিক হয়ে যাবে।
আপানাকে খাদ্য ও আশ্রয় দেওয়ার জন্য তাকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানান। এটি অনেক বড় ব্যপার।
সে যদি আপানার সাথে রেগে গিয়ে চেঁচাতে থাকে, আপনি চুপ থেকে তাকে চেঁচাতে দিন। দেখবেন আপনাদের বিবাদ অনেক দ্রুত থেমে গেছে। পরে যখন সে শান্ত হবে, তখন আপনি আপনার কথা বোঝাবেন।
যখন আপনি তার উপর রেগে যান, তখন বলবেন না যে তিনি আপনাকে রাগিয়েছেন, বরং বলুন তার কাজে আপনি আপসেট হয়েছেন। আপনার রাগকে তার দিকে নির্দেশ না করে তার কাজ বা উদ্ভুত পরিস্থিতির দিকে নির্দেশ করুন।
মনে রাখবেন, আপনার স্বামীরও আবেগ অনুভুতি আছে, কাজেই সেদিকে লক্ষ্য রাখুন।
তাকে তার বন্ধুদের সাথে কোন রকম অপরাধবোধ ছাড়া কিছু সময় কাটাতে দিন, বিশেষতঃ যদি তারা ভাল মানুষ হয়। তাকে বাইরে যেতে উৎসাহ দিন যাতে সে নিজেকে ঘরের ভেতর ‘আবদ্ধ’ বোধ না করে।
স্বামী যদি আপনার কোন সামান্য কাজে বা অভ্যাসে বিরক্ত হয় (যেটি আপনি সহজেই নিয়ন্ত্রন করতে পারেন), সেটি করা বন্ধ করে দিন।
আপনার মনের কথা তাকে খোলাখুলি বলতে শিখুন; সে সবসময় বুঝে নেবে বা অনুমান করতে পারবে এমন চিন্তা করবেন না। আপনার অনুভূতি প্রকাশ করা শিখুন।
ছোট ছোট বিষয়ে রেগে যাবেন না।
তার সাথে হাসি মশকরা করুন, যাতে আপনাদের দুই জনের মনই প্রফুল্ল হয়।
তাকে বলুন, আপনি স্ত্রী হিসাবে সেরা, এবং এমন বিষয়ে নিজের উল্লেখ করুন যেটা আপনি জানেন আসলেই প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু অহংকার করে নয়, বিনয় এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে।
ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে- “The way to a man’s heart is through his stomach” তাই তার পছন্দের খাবার তৈরি করা শিখুন।
আপনার পরিচিত বা আত্মীয় স্বজনের কাছে কক্ষনও তার বদনাম করবেন না। তারা যদি একথা মেনে নেয় ও বিশ্বাস করা শুরু করে, তাহলে তা আপানকেই পাল্টা আহত করবে। আপনি নিজেই তখন হীনমন্যতায় ভুগবেন এই ভেবে যে আপনার স্বামী খারাপ, আবার অন্যরাও ভাববে যে আপনার স্বামী খারাপ। আল্লাহ বলেছেন –
وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لُّمَزَةٍ
“ধ্বংস ওই প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে পেছনে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে।” (সুরা হুমাজাঃ১)

বুদ্ধিমত্তার সাথে আপনার সময়টাকে কাজে লাগান, এবং আপনার দায়িত্ব সুন্দরভাবে সম্পাদন করুন। এতে আপনিও খুশি হবেন, আপনার স্বামীরও ভাল লাগবে।
উপরের সবগুলো কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করুন; দেখবেন আপনি যা করছেন আল্লাহ তায়ালা তাতে বরকত দেবেন।
স্বামী স্ত্রী একে অপরের পছন্দ-অপছন্দ, করণীও-বর্জনীয় বিষয়গুলো বিজ্ঞতার সাথে আলোচনা করবেন। স্বামীকে এমন ভাবে আদেশ বা নির্দেশ দেবেন না যেন মনে হয় সে আপনার ‘অধীনস্ত’। বরং কুরআনে বলা হয়েছে –
هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ
তারা তোমাদের জন্য আবরণ, এবং তোমরা তাদের জন্য আবরণ (সুরা বাকারাঃ১৮৭)

আপনার স্বামীকে বারবার বলুন আপনি তাকে কত ভালোবাসেন।
আপনার স্বামীর সাথে খেলাধুলায় প্রতিযোগিতা করুন, এবং তাকে জিততে দিন।
সুস্থ থাকুন, এবং নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নিন, যাতে বলিষ্ঠ ভাবে একজন মা, স্ত্রী ও গৃহিণীর দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ইনশাআল্লাহ এতে আপনি মোটা হবেন না।
আচার-আচরনে মার্জিত থাকুন (যেমনঃ ঘ্যানঘ্যান করা, অতি উচ্চস্বরে হাসা বা কথা বলা, থপথপ করে সশব্দে হাঁটাচলা করা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকুন।)
স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাড়ির বাইরে যাবেন না, আর তাকে না জানিয়ে তো অবশ্যই বের হবেন না।
খেয়াল রাখুন তার পরিধেয় কাপড়গুলো যেন নিয়মিত পরিষ্কার থাকে।
জরুরি অথবা বিতর্কিত বিষয়ে তার সাথে এমন সময় আলোচনা করবেন না যখন সে ক্লান্ত অথবা তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকে। সঠিক সময়ে সঠিক আলোচনা করুন।
আপনার স্বামী আপনার জন্য কষ্ট করে কাজ করে উপার্জন করছেন এবং আপনার খাওয়া-পরার বন্দোবস্ত করছেন- এই ব্যপারটির সবসময় প্রশংসা করুন। এতে তার কাজের স্পৃহা বাড়বে।
আপনার চুল সব সময় আঁচড়ানো রাখুন।
মাঝে মাঝে উপহার দিন। উপহার স্বরূপ তাকে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসও দিতে পারেন।
তার আগ্রহ ও শখের ব্যপারে আপনিও আগ্রহী হওয়ার চেষ্টা করুন।
অতিরিক্ত কেনাকাটা করবেন না…তার সমস্ত টাকা খরচ করে ফেলবেন না।
তার জন্য নিজেকে আকর্ষণীও করে সাজান, তার সাথে খুনসুটি করুন।
আপনার ত্বকের যত্ন নিন, বিশেষতঃ চেহারার। চেহারাই আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
অন্তরঙ্গ ব্যপারে যদি আপনার কোন অসন্তুষ্টি থাকে, তাকে জানান, তার সাথে কথা বলুন। তাকে বুঝতে সাহায্য করুন। নীরব থেকে পরিস্থিতি খারাপ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন না।
প্রতিদিন, প্রতি ওয়াক্তের নামাজে আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আপনাদের মধ্যকার ভালবাসার ও সহমর্মিতার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে দেন এবং শয়তানের অনিষ্ট থেকে হেফাজত করেন। দোয়ার মত কার্যকরী কিছুই নেই। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ভালবাসা তখনই থাকে যখন আল্লাহ তাদের মাঝে এটা দেন।
কক্ষনো নিজের স্বামীর সাথে অন্যদের স্বামীর তুলনা করবেন না। যেমনঃ কখনও বলবেন না, ‘অমুকের স্বামী তো এমন করে না, তুমি কেন এমন কর…’
আপনার স্বামী যেমন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করুন। কারণ, কেউ নিখুঁত নয়, আপনিও নন। আর যদি, ত্রুটিহীন, নিখুঁত সঙ্গী চান তাহলে জান্নাতে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। ইনশাআল্লাহ সেখানে আপনি এবং আপনার স্বামী দু’জনেই হবেন নিখুঁত ও ত্রুটিহীন।
তাহাজ্জুদ নামাজের সময় তাকে ডাকুন এবং আপনার সাথে তাকেও নামাজ পড়তে বলুন।
আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আপনাদের দুজনকেই মুত্তাকী হতে সাহায্য করেন।
সর্বাগ্রে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করুন। যদি সমস্ত স্ত্রীরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টায় রত থাকে, নিশ্চিতভাবেই তারা তাদের স্বামীদের ভালবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারবে। আর মনে রাখবেন, আল্লাহ যদি আপনার উপর সন্তুষ্ট থাকেন, তাহলে ফেরেশতারা আপানাকে ভালবাসবে, সমস্ত সৃষ্টি আপনাকে ভালবাসবে।
আল্লাহ যেন সকল স্বামী স্ত্রীর বন্ধনকে হেফাজত করেন, এবং দ্বীনের শ্রেষ্ঠ আদব সমূহ বোঝার এবং তা কাজে লাগিয়ে সংসার জীবনকে সুন্দর ভাবে পরিচালনা করার তৌফিক দেন। আমীন।

Translate