Tuesday, July 14, 2026

ইসলামে ধীরস্থিরতা ও দ্রুততা কখন কোথায়

 ইসলামী জীবনদর্শনে ধীরস্থিরতা অত্যন্ত প্রশংসনীয় গুণ। পক্ষান্তরে, বিশেষে কিছু ক্ষেত্র ছাড়া অহেতুক তাড়াহুড়ো বা অস্থিরতা মানুষকে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত করে। এ বিষয়ে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

আনাস ইবনে মালিক ও সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«الأَنَاةُ مِنَ اللَّهِ، وَالعَجَلَةُ مِنَ الشَّيْطَانِ»
“ধীরস্থিরতা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর তাড়াহুড়ো হলো শয়তানের পক্ষ থেকে।” [সুনান তিরমিজি, হাদিস নম্বর ২০১২; হাদিসটি হাসান, যুরকানি মুখতাসারুল মাকাসিদ, হা/২৮৭-যদিও কিছূ মুহাদ্দিসের মতে এ হাদিসটি জইফ। তবে অন্যান্য দলিল আলোকে এর মমার্থ গ্রহনযোগ্য ]
❑ ধীরস্থিরতা বলতে কী বুঝায়?
ধীরস্থিরতা মানে হলো, যেকোনো বিষয়ে যাচাই-বাছাই ও সতর্কতা অবলম্বন করা। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা অনেক সময় তাড়াহুড়া সিদ্ধান্ত মানুষকে লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়।
আল্লাহ তাআলা তাই তো সতর্ক করে বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ
“হে মুমিনগণ! যদি কোনও ফাসেক (পাপাচারী ব্যক্তি) তোমাদের কাছে কোনও বার্তা নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও, যাতে অজ্ঞতাবশত কোনও জাতিকে তোমরা আক্রান্ত না করে বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদের লজ্জিত হতে না হয়।” [সূরা হুজুরাত: ৬]
ইবনুল কাইয়্যিম (রাহ.) বলেন:
“إِنَّ الْعَجَلَةَ خِفَّةٌ وَطَيْشٌ وَحِدَّةٌ لِلْعَبْدِ تَمْنَعُهُ مِنَ التَّثَبُّتِ وَالْوَقَارِ وَالْحِلْمِ، وَتُوجِبُ وَضْعَ الشَّيْءِ فِي غَيْرِ مَحَلِّهِ، وَتَجْلِبُ الشُّرُورَ وَتَمْنَعُ الْخَيْرَ”
“তাড়াহুড়ো করলে মানুষের বিচারবুদ্ধি লোপ পায়। এতে মানুষ অস্থির ও চঞ্চল হয়ে পড়ে, যা তাকে কোনও কিছু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে দেয় না। তাড়াহুড়োর কারণে মানুষ কাজ ঠিকমতো করতে পারে না, বরং সঠিক জায়গায় সঠিক কাজটি না করে উল্টো ভুল করে ফেলে। এতে শেষ পর্যন্ত নিজেরই ক্ষতি হয় এবং ভালো কিছু অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে।”
[মাদারিদুস সালিকীন]
ধৈর্য ও ধীরস্থিরতা মুমিনের এমন বৈশিষ্ট্য যা আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পছন্দ করেন। যেমন: আশাজ্জ আব্দুল কাইস রা. কে উদ্দেশ্য করে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
إِنَّ فِيكَ لَخَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ: الْحِلْمُ وَالأَنَاةُ
“তোমার মধ্যে এমন দুটি গুণ রয়েছে যা আল্লাহ ও তাঁর রসুল পছন্দ করেন: সহনশীলতা ও ধীরস্থিরতা।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ১৭]
এসব কারণে আমাদের ধীরস্থিরতা গুণটি চর্চা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নিচের ক্ষেত্রগুলোতে অস্থিরতা পরিহার করা জরুরি:
১. গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ: জীবনের বড় কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় তাড়াহুড়ো করলে ভুলের ঝুঁকি থাকে, যা দীর্ঘস্থায়ী দুঃখের কারণ হতে পারে।
২. ইবাদত: নামাজ বা অন্যান্য ইবাদতে তাড়াহুড়ো করা ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য ও প্রশান্তিকে নষ্ট করে।
৩. দোয়া: দোয়া কবুলের জন্য অস্থির না হয়ে ধৈর্য ও স্থিরতা বজায় রাখা কাম্য। অস্থির হৃদয়ের দুআ আল্লাহর নিকট প্রত্যাখ্যাত হয়।
৪. মন্তব্য: কোনও বিষয়ে পর্যাপ্ত তদন্ত ও যাচাই-বাছায় ছাড়া তাড়াহুড়া করে মন্তব্য করা সামাজিক অস্থিরতা ও ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে এবং পরবর্তীতে তথ্য ভুল প্রমাণিত হলে লজ্জিত হতে হয়।
❑ যে সব কাজ যথাসম্ভব দ্রুততার বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করা উচিত:
কিছু ক্ষেত্রে যেসব কাজে সময়ক্ষেপণ না করে যথাসম্ভব দ্রুততার সাথে বাস্তবায়ন করেই প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচায়কই শুধু নয় বরং তা রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নত। এর মূল নীতি হল, আখিরাতের কাজে বিলম্ব না করা। যেমন: হাদিসে এসেছে,
◈ সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
التُّؤَدَةُ فِي كُلِّ شَيْءٍ إِلَّا فِي عَمَلِ الْآخِرَةِ
“সবকিছুতেই ধীরস্থিরতা অবলম্বন করা উচিত। কিন্তু পরকালের কাজের ক্ষেত্রে নয়।”
[আস সিলসিলাতুস সাহিহা, হাদিস নম্বর ১৭৯৪। এটি ইমাম মুসলিমের শর্তানুসারে সহিহ]
◈ বিশেষ তিনটি কাজে বিলম্ব করা নিষেধ:
আলি (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«ثَلَاثَةٌ لَا تُؤَخِّرُهَا: الصَّلَاةُ إِذَا أَتَتْ، وَالْجَنَازَةُ إِذَا حَضَرَتْ، وَالْأَيِّمُ إِذَا وَجَدْتَ كُفُؤًا»
“তিনটি কাজ বিলম্ব করবে না: নামাজ যখন ওয়াক্ত হয়, জানাজা যখন উপস্থিত হয় এবং অবিবাহিতা নারী যখন উপযুক্ত পাত্র পায়।” [সুনান তিরমিজি, হাদিস নম্বর ১৭১; হাদিসটির সনদ হাসান]
◈ দ্রুতগতিতে হাঁটা রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য ছিল:
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَسْرَعَ فِي مِشْيَتِهِ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَأَنَّمَا الْأَرْضُ تُطْوَى لَهُ، وَإِنَّا لَنُجْهِدَ أَنْفُسَنَا وَإِنَّهُ لَغَيْرُ مُكْتَرِثٍ
“আমি রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চেয়ে দ্রুতগতিতে হাঁটতে আর কাউকেই দেখিনি—মনে হতো যেন তাঁর জন্য জমিন গুটিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা তাঁর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে নিজেদের কষ্ট দিতাম অথচ তিনি স্বাভাবিকভাবেই চলতেন। তাতে তাঁর বিন্দুমাত্র ক্লান্তি ছিল না।”
[সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস নম্বর ৩৬৪০; হাদিসটি হাসান]
ইবনুল কাইয়িম (রাহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন: “হাঁটার সময় পা মাটি থেকে জোরালো ভাবে তোলা হলো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও উদ্যমী মানুষের বৈশিষ্ট্য। এটি সবচেয়ে সুষম চলন, যা কৃত্রিমতা ও অস্থিরতা থেকে মুক্ত।”
◈ সালাফগণ ব্যক্তি জীবনের তিনটি কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা করতেন:
বলা হয়ে থাকে, সালাফ বা পূর্বসূরি পুণ্যবান ব্যক্তিগণ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ধীরস্থির ছিলেন। তবে জীবনের কিছু সাধারণ কাজ, যেমন—
ক. গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য হাঁটা।
খ. ইলম সংরক্ষণের জন্য লেখা।
গ. এবং পরিমিতভাবে কাজ সম্পন্ন করার জন্য খাওয়া। —তারা এসব ক্ষেত্রে তৎপরতা বা দ্রুততা পছন্দ করতেন।
❑ আরও যেসব ক্ষেত্রে কাল বিলম্ব করা উচিৎ নয়:
◈ ১. হজ পালন: হজ ফরজ হওয়ার পর তা আদায় করার ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ না করা মুমিনের দায়িত্ব। কেননা সে জানে না, ভবিষ্যতে তার জন্য কোন সমস্যা অপেক্ষা করছে।
◈ ২. গুনাহ থেকে তওবা: গুনাহ হয়ে গেলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত তওবা করা এবং নিজেকে সংশোধন করা কর্তব্য। কেননা হয়তো তওবার পূর্বেই মৃত্যু দূত তার সামনে এসে হাজির হবে।
◈ ৩. ঋণ পরিশোধ: কারোর পাওনা বা ঋণ থাকলে তা কাল বিলম্ব না করে পরিশোধ করা কর্তব্য।
◈ ৪. ওয়াদা, প্রতিশ্রুতি ও ওসিয়াত পূরণ: বৈধ বিষয়ে কারও সাথে ওয়াদা করা হলে বা কাউকে কোনও বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে বা ওসিয়ত থাকলে সময় মত তা পূরণ করা কর্তব্য। ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করা ইমানদারের বৈশিষ্ট্য নয়।
◈ ৫. জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করা: মানুষ মারা গেলে যথাসম্ভব দ্রুত তার কাফন-দাফন সম্পন্ন করা জরুরি।
◈ ৬. মেহমানদারি করা: বাড়িতে মেহমান আসলে যথাসম্ভব দ্রুত তার প্রয়োজন পূরণ ও আপ্যায়নে মনোযোগী হওয়া উচিত।
◈ ৭. ইফতার করা: রোজা ইফতারের সময় হওয়া মাত্র ইফতার করা হাদিসের নির্দেশ।
◈ ৮. সন্তানের আকিকা করা: সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে নির্দিষ্ট সময়ে (সপ্তম দিনে) তার আকিকা দেওয়া সুন্নত।
◈ ৯. কুরআন তিলাওয়াত: কুরআন তিলাওয়াতে তারতিল বা ধীরস্থিরতা অবলম্বন করার পাশাপাশি বুঝে তেলাওয়াত করা উত্তম কাজ।
◈ ১০. বিপদগ্রস্তকে যথাসাধ্য দ্রুত বিপদ থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করা মানবিক দায়িত্ব।
মোটকথা, জীবনের আসল সৌন্দর্য হলো, ভারসাম্য রক্ষা করা। পার্থিব সিদ্ধান্ত, গুরুত্বপূর্ণ বিচারকার্য এবং ব্যক্তিগত আচরণে ধীরস্থিরতা অবলম্বন করুন কিন্তু ইবাদত-বন্দেগি ও মানব কল্যাণে অগ্রগামী থাকুন। সর্বোপরি কাজের প্রকৃতি বুঝে সঠিক সময়ে সঠিক গতিতে চলাই মুমিনের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ আমাদের প্রতিটি কাজে প্রজ্ঞা ও ভারসাম্য বজায় রাখার তাওফিক দান করুন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

No comments:

Post a Comment

Translate