প্রশ্ন: কবরস্থানে সম্মিলিতভাবে মোনাজাত করার বিধান কী? এ বিষয়ে বিজ্ঞ আলেমদের ফতওয়া কি?
উত্তর: আমাদের সমাজে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমা, ঈদ, জানাজা ও দাফনের পর, রোজার ইফতারের পূর্বে কিংবা বাড়ি, দোকান ইত্যাদি যেকোনো শুভ উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে, বিয়ে অনুষ্ঠানে, এমনকি সিনেমার মহরত অনুষ্ঠানেও সম্মিলিত দুআ-মোনাজাত করার যে প্রথা প্রচলিত রয়েছে। অথচ তার পক্ষে পবিত্র কুরআন, সহিহ সুন্নাহ, সাহাবি ও তাবেয়িগণের আমল কিংবা চার মাজহাবের ইমামগণের কারো থেকে এই প্রথার বৈধতার সপক্ষে কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু সংযোজন করা বা এমন কোনও আমলকে ইবাদত হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যা রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁর সাহাবিগণ করেননি তা নিঃসন্দেহে বিদআত বা নবসৃষ্ট। ইসলামে দ্বীনের মধ্যে যেকোনো ধরনের নতুন প্রথা চালুর ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি তার কঠিন পরিণতির কথা বলা হয়েছে। যেমন:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
“مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ”
“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে নতুন কোনও এমন বিষয় সৃষ্টি করবে যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়তা প্রত্যাখ্যাত হবে।” [সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৭১৮]
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুতবা বা বিভিন্ন বক্তব্যের শুরুতে বলতেন,
“فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ، وَخَيْرَ الْهُدَى هُدَى مُحَمَّدٍ، وَشَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ”
“সবচেয়ে উত্তম বাণী আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম আদর্শ মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো নব সৃষ্ট বিষয়সমূহ (বিদআত)। আর প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা।” [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৮৬৭] অন্য বর্ণনায় আছে, “প্রতিটি ভ্রষ্টতার পরিণতি জাহান্নাম।”
নিম্নে আমাদের সমাজে প্রচলিত দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর বা কবর জিয়ারত করতে গিয়ে দলবল সহ সম্মিলিত দুআ-মুনাজাত সম্পর্কে কয়েকজন বিজ্ঞ আলেমের ফতওয়া উপস্থাপন করা হলো:
❑ ১. আল্লামা শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উসাইমিন (রহ.):
প্রশ্ন: দাফনের পর মৃত ব্যক্তির জন্য সম্মিলিতভাবে দোয়া করার হুকুম কী?
উত্তর:
الدُّعَاءُ الْجَمَاعِيُّ لِلْمَيِّتِ بَعْدَ دَفْنِهِ بِدْعَةٌ؛ لِأَنَّ الرَّسُولَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيْسَ يَدْعُو بِأَصْحَابِهِ، بَلْ يَقُولُ: «اسْتَغْفِرُوا لِأَخِيكُمْ وَسَلُوا لَهُ التَّثْبِيتَ».
وَأَمَّا أَنْ يَبْقَوْا مَثَلًا جَمِيعًا ثُمَّ يَدْعُوَ بِهِمْ وَاحِدٌ وَيُؤَمِّنُوا عَلَيْهِ فَهَذَا لَمْ تَأْتِ بِهِ السُّنَّةُ. نَعَمْ.
“দাফনের পর মৃত ব্যক্তির জন্য সম্মিলিত দোয়া করা একটি বিদআত। কারণ রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর সাহাবিদের নিয়ে (এভাবে) দোয়া করতেন না। বরং তিনি বলতেন:
«اسْتَغْفِرُوا لِأَخِيكُمْ وَسَلُوا لَهُ التَّثْبِيتَ
“তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য (আল্লাহর নিকট) ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তার জন্য (প্রশ্নোত্তরের সময়) অবিচল থাকার দোয়া করো।”
কিন্তু উদাহরণ স্বরপ সকলে মিলে দাঁড়িয়ে থাকবে, এরপর একজন দোয়া করবে আর অন্যরা তার দোয়ার ওপর ‘আমিন’ ’আমিন’ বলবে—এমনটি সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়।” [সূত্র: alathar]
❑ ২. আল্লামা শাইখ নাসির উদ্দিন আলবানি (রাহ.)
মাইয়েতকে দাফনের পর তার জন্য দোয়া করা কি দলবদ্ধভাবে হবে নাকি ব্যক্তিগতভাবে?
প্রশ্নকারী: হাদিসে এসেছে, «اسْتَغْفِرُوا لِأَخِيكُمْ وَاسْأَلُوا لَهُ التَّثْبِيتَ» “তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তার জন্য অবিচলতা (কবরের প্রশ্নোত্তের সময় ইমানের ওপর স্থির থাকা)-এর দোয়া করো।” নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এই নির্দেশটি কি এমন যে, সবাই মিলে করবে—অর্থাৎ একজন দোয়া করবে আর বাকিরা তাতে ‘আমিন’ বলবে—নাকি প্রত্যেকে আলাদা আলাদাভাবে দোঊ করবে?
উত্তর:
لَا، كُلٌّ لِحَالِهِ
“না, প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা দুআ করবে।”
❑ ৩. শাইখ সালেহ আল ফাউজান (হাফিযাহুল্লাহ)
কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দলবদ্ধভাবে দোয়া করার বিধান
প্রশ্ন: কবরের পাশে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে মাইয়েতের (মৃত ব্যক্তির) জন্য দোয়া করা এবং উপস্থিত অন্যরা সেই দোয়ার সাথে সম্মিলিতভাবে ‘আমিন’ বলা—এর বিধান কী?
উত্তর:
هَذَا السُّنَّةُ؛ إِذَا زَارَ الْمَيِّتَ وَسَلَّمَ عَلَيْهِ، أَنْ يَدْعُوَ لَهُ بِالْمَغْفِرَةِ وَالرَّحْمَةِ، وَكُلٌّ يَدْعُو لَهُ، وَلَا يَدْعُونَ بِصَوْتٍ جَمَاعِيٍّ، أَوْ يَدْعُوَ وَاحِدٌ وَالْبَقِيَّةُ يُؤَمِّنُونَ عَلَى ذَلِكَ؛ لِأَنَّ هَذَا الشَّيْءَ لَمْ يَرِدْ، لَكِنَّ كُلَّ وَاحِدٍ يَدْعُو لِلْمَيِّتِ بِمُفْرَدِهِ.
“এটি সুন্নাহসম্মত নয় বা এর কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। সুন্নাহ হল, কেউ যখন কবর জিয়ারত করতে যায় এবং সালাম দেয় তখন সে মাইয়েতের জন্য ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করবে। তবে এই দোয়া কোনও দলবদ্ধ রূপ নেবে না, এমনকি একজনের দোয়ায় বাকিরা ‘আমিন’ও বলবে না। বরং নিয়ম হল, প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে একা একাই মাইয়েতের জন্য দোয়া করবে। দলবদ্ধভাবে উচ্চস্বরে দোয়া করা বা একজনের দোয়ায় অন্যদের আমিন বলার কোনও প্রমাণ নেই;। তাই প্রত্যেকে আলাদাভাবে মাইয়েতের জন্য দোয়া করাই সঠিক পদ্ধতি।” আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল বিদআত থেকে বেঁচে থাকার এবং সুন্নাহর ওপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
No comments:
Post a Comment