Tuesday, July 14, 2026

ডোনারের মাধ্যমে গর্ভধারণ ও টেস্টটিউব বেবি ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি

 বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার এই যুগে ডোনার দ্বারা গর্ভধারণ বা টেস্টটিউব বেবি গ্রহণের বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এ ব্যাপারে ইসলামের শরিয়তের সঠিক অবস্থান জানা অপরিহার্য। তাই এ ব্যাপারে ইসলাম কী বলে তা সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:

ডোনার বা দাতার শুক্রাণু, ডিম্বাণু বা ভ্রূণ ব্যবহার করে সন্তান নেওয়া চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটি পদ্ধতি হলেও ইসলামি শরিয়তে তা সম্পূর্ণ হারাম। স্বামী-স্ত্রীর বাইরে অন্য কারো প্রজনন উপাদান ব্যবহারের কারণে সমকালীন প্রায় সকল আলেম ও রাবেতায়ে আলম আল ইসলামের ফিকহ একাডেমি একে নিষিদ্ধ বলে স্পষ্ট ফতোয়া দিয়েছেন।
হারাম হওয়ার মূল কারণসমূহ:
১. নসব বা বংশ পরিচয়ের সংমিশ্রণ —ডোনার শুক্রাণু বা ডিম্বাণু ব্যবহার করলে সন্তানের প্রকৃত বংশপরিচয় অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর হয়ে পড়ে, যা শরিয়তে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ”
“তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকো।‌ এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সংগত।” [সূরা আহযাব: ৫]
২. এটি মূলত পরনারী বা পরপুরুষের প্রজনন উপাদান স্ত্রীর গর্ভাশয়ে বা ভ্রূণে প্রবেশ করানোর শামিল, যা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বিধায় নিষিদ্ধ, যদিও এতে সরাসরি শারীরিক সংসর্গ ঘটে না।
৩. নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
“لَا يَحِلُّ لِامْرِئٍ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ يَسْقِيَ مَاءَهُ زَرْعَ غَيْرِهِ”
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস রাখে তার জন্য বৈধ নয় যে সে তার পানি অন্যের চারাগাছে সিঞ্চন করবে।” [আবু দাউদ, হাদিস নং ২১৫৮]
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট যে, একজন পুরুষের বীর্য কেবল তার নিজ স্ত্রীর গর্ভাশয়েই বৈধ; অন্য কোনো নারীর ক্ষেত্রে নয়।
৪. এতে উত্তরাধিকার, মাহরাম নির্ধারণ, বিবাহ-নিষিদ্ধতা ইত্যাদি সংক্রান্ত জটিলতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যা শরিয়তের মূল লক্ষ্য তথা বংশ সংরক্ষণের (হিফযুন নসব) সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
তবে স্বামী-স্ত্রীর নিজস্ব শুক্রাণু ও ডিম্বাণু ব্যবহার করে কৃত্রিম প্রজনন (আইভিএফ) বা টেস্ট-টিউব পদ্ধতিতে সন্তান লাভ করা (যেখানে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির প্রজনন উপাদান সংমিশ্রিত হয় না) তা বিশুদ্ধ মতানুসারে জায়েজ। কেননা তখন বংশ পরিচয় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
মোটকথা, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।‌কিন্তু ডোনার কনসেপশনের মতো পদ্ধতি বংশ পরিচয়ের সংমিশ্রণ ও শরিয়তবহির্ভূত উপায়ে গর্ভধারণের দরজা উন্মুক্ত করে দেয় বিধায় তা হারাম। এ বিষয়ে বিজ্ঞ আলেমদের মাঝে কোন দ্বিমত নেই। আলহামদুলিল্লাহ।
আল্লাহু আলাম-আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।
▪️টেস্ট টিউব-এর মাধ্যমে সন্তান গ্রহণ সংক্রান্ত বিধান
-আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রহ.
প্রশ্ন: সুলতানাত অব ওমান থেকে আমাদের এক ভাই একটি প্রশ্ন পাঠিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, প্রথমবার আপনাদের কাছে প্রশ্ন পাঠাতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। প্রশ্নটি হলো, পত্রপত্রিকায় আমরা প্রায়ই টেস্ট টিউব বা ইনজেকশনের মাধ্যমে গর্ভধারণের কথা পড়ি। কোনো কোনো হাসপাতালে নারীর গর্ভধারণের জন্য এভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। বিশেষ করে স্বামী যদি অক্ষম হয় তবে ডাক্তার অন্য কোনো পুরুষের বীর্য নিয়ে ওই নারীর গর্ভে স্থাপন করে।
এখন প্রশ্ন হলো, ইসলামে কি এই পদ্ধতি বৈধ? আর যদি বৈধ না হয় তবে যারা এটি করবে বা তাতে সন্তুষ্ট থাকবে, তাদের শাস্তি কী? আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন।
(সম্ভবত তিনি ‘টেস্ট টিউব বেবি’র কথা বুঝিয়েছেন।)
উত্তর: এটি একটি বিস্তারিত বিষয়। মক্কার ‘ইসলামিক ফিকহ একাডেমি’ (রাবেতা)-এর সদস্যগণ অতীতে একটি সভায় এটি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেছেন এবং কোন পদ্ধতি নিষিদ্ধ আর কোনটি বৈধ তা স্পষ্ট করেছেন।
প্রশ্নকারী যে বিষয়ের কথা বলেছেন তা প্রধানত দুই ধরনের হতে পারে:
▪️প্রথমটি: যা ফিকহ একাডেমি বৈধ বলেছে।
▪️দ্বিতীয়টি: যা নিষিদ্ধ এবং সমস্ত মুসলিম আলেমদের ঐকমত্যে হারাম।
ফিকহ একাডেমি যা বৈধ বলেছে, তা হল, যদি নারী বা পুরুষ বন্ধ্যা না হন কিন্তু স্ত্রীর ডিম্বাশয় বা ডিম্বাণু বহনের নালীতে কোনো রোগের কারণে গর্ভধারণে সমস্যা হয় অথবা পুরুষের বীর্য স্ত্রীর গর্ভ পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারে তবে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে স্বামীর শরীর থেকে বীর্য সংগ্রহ করে তা স্ত্রীর গর্ভে ইনজেকশন বা টেস্ট টিউবের মাধ্যমে স্থাপন করা যেতে পারে। আল্লাহ চাইলে এর মাধ্যমে গর্ভ সঞ্চার হতে পারে।
– উপস্থাপক: অর্থাৎ বীর্যটি স্বামীর নিজেরই হতে হবে?
– শায়খ (আব্দুল আজিজ ইবনে বায (রহ.):
হ্যাঁ, বীর্যটি অবশ্যই স্বামীর নিজের হতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা চিকিৎসিকা সম্পন্ন করবেন। যদি সম্ভব হয় তবে একজন মহিলা ডাক্তারই এটি করা উত্তম। তিনি স্বামীর শরীর থেকে সংগৃহীত বীর্য স্ত্রীর গর্ভে স্থাপন করবেন।
যদি মহিলা ডাক্তার পাওয়া না যায় তবে প্রয়োজনে পুরুষ ডাক্তারও এটি করতে পারবেন। ফিকহ একাডেমি এই পদ্ধতিটিকে বৈধ বলেছে এবং এটি সফল হওয়ার কথাও উল্লেখ করেছে। তবে এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়, তাই পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। এটি অবশ্যই স্বামী, স্ত্রী এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের উপস্থিতিতে হতে হবে। অন্য কেউ থাকা যাবে না। কারণ এ প্রক্রিয়ায় মহিলার সতরের (লজ্জাস্থান) অংশ প্রকাশ হয়ে পড়ে তাই স্বামী ছাড়া অন্য কারোরই (এমনকি মাহরাম বা আত্মীয়দেরও) সেখানে উপস্থিত থাকার অনুমতি নেই। কারণ মাহরামরাও নাভির নিচ থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ দেখার অধিকার রাখেন না।
সুতরাং বিশেষজ্ঞ ডাক্তার যদি মনে করেন যে, এটিই গর্ভধারণের একমাত্র উপায় এবং স্বামী-স্ত্রীর অন্য কোনো সমস্যা নেই তবেই কেবল এটি করা যেতে পারে।
তবে আমি বলব, এটি বৈধ হওয়া সত্ত্বেও সতর্কতা হিসেবে তা বর্জন করাই উত্তম; যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির উদ্ভব না হয়।
– উপস্থাপক: স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের মধ্যে হলেও কি বর্জন করা উত্তম?
– শায়খ (রহ.): হ্যাঁ, স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রে হলেও এটি বর্জন করা শ্রেয়। কারণ এতে অনেক জটিলতা বা শঙ্কার অবকাশ থাকে। মানুষ অসাবধানতাবশত ভুল পথে পরিচালিত হতে পারে। তাই আলেমদের মতে, পূর্ণ সতর্কতা ছাড়া এটি না করাই ভালো।
আর যদি কোনো স্ত্রী তার স্বামীর বাইরের অন্য কোনো পুরুষের বীর্য গ্রহণ করে তবে তা মুসলিমদের ঐকমত্যে হারাম ও অবৈধ। এটি ব্যভিচারের শামিল। এ ধরণের কাজ জঘন্য অপরাধ। যদি এমনটি প্রমাণিত হয় তবে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব হলো, যারা এর সাথে জড়িত অর্থাৎ যারা তা করেছে এবং যারা এতে সন্তুষ্ট ছিল তাদের সবাইকে যথাযথ শাস্তি (তাজির) দেওয়া, যেন ভবিষ্যতে এমন দুঃসাহস আর কেউ না করে।
তৃতীয় চিত্র: এটি ফিকহ একাডেমির বৈধতার তালিকার দ্বিতীয় পদ্ধতি। অর্থাৎ স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের বীজ (বীর্য ও ডিম্বাণু) সংগ্রহ করে একটি টেস্ট টিউবে নির্দিষ্ট নিয়মে মিশিয়ে তা স্ত্রীর গর্ভে স্থাপন করা। এটি প্রথম পদ্ধতির চেয়েও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ চিকিৎসকদের গবেষণাগারে অনেক সময় বিভিন্ন মানুষের নমুনা রাখা থাকে। ফলে বিভ্রান্তি বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের আশঙ্কা থেকে যায়।
সারকথা হলো, ফিকহ একাডেমির অধিকাংশ সদস্য উল্লিখিত দুটি পদ্ধতিকে (স্বামীর বীর্য স্ত্রীর গর্ভে স্থাপন করা অথবা উভয়ের মিশ্রণ টেস্ট টিউবে রেখে পরে স্থাপন করা) বৈধ বলেছেন।
তবে কিছু সদস্য এতে সতর্কাবস্থান নিয়েছেন বা নিষিদ্ধ বলেছেন। আমিও এ ব্যাপারে সতর্কাবস্থান নিয়েছি। কারণ এতে ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেশি।
সুতরাং মূল কথা হলো—এই পদ্ধতি কেবল স্বামী ও স্ত্রীর ক্ষেত্রেই বৈধ। কিন্তু স্বামী বা স্ত্রীর বাইরের কারো বীর্য বা ডিম্বাণু ব্যবহার করা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম ও অবৈধ। এতে কোনো বিতর্ক নেই। বিতর্কের জায়গা কেবল ওই দুই পদ্ধতিতেই, যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাও তা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে করার শর্ত রয়েছে।
– উপস্থাপক: আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন। তাহলে এর একাধিক রূপ রয়েছে এবং প্রত্যেকটির বিধান ভিন্ন।
– শায়খ (রহ.): হ্যাঁ, ফিকহ একাডেমি কেবল ওই দুটি পদ্ধতিই বৈধ বলেছে।
– উপস্থাপক: যা স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের মধ্যে হয়।
– শায়খ (রহ.): হ্যাঁ, ঠিক তাই।
– উপস্থাপক: আল্লাহ আপনাদের বরকত দান করুন।
(সূত্র: শায়খ আব্দুল আজিজ ইবনে বায (রহ.)-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, ‘নূরুন আলাদ দারব’ অনুষ্ঠান)
অনুবাদ: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

জানাজার ক্ষেত্রে নারীর জন্য যা করা জায়েজ আর যা করা জায়েজ নয়

 প্রশ্ন: ইরাকের বাগদাদ থেকে এক নারীর প্রশ্ন। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,

لَيْسَ لِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ فِي الْجِنَازَةِ
“জানাজায় নারীদের কোনও অংশ নেই।” তাহলে জানাজার ক্ষেত্রে নারী কোন কোন বিষয় থেকে বিরত থাকবে?
উত্তর:
هَذَا الْحَدِيثُ الَّذِي ذَكَرَتْهُ السَّائِلَةُ: «لَيْسَ لِلْمَرْأَةِ نَصِيبٌ فِي الْجِنَازَةِ» لَا نَعْلَمُ لَهُ أَصْلًا، وَلَا نَعْلَمُ أَحَدًا أَخْرَجَهُ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ، وَإِنَّمَا الْوَارِدُ عَنِ الرَّسُولِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي هَذَا: أَنَّهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَعَنَ زَائِرَاتِ الْقُبُورِ وَالْمُتَّخِذِينَ عَلَيْهَا الْمَسَاجِدَ وَالسُّرُجَ، وَلَعَنَ أُنَاسًا آخَرِينَ كَالْبِنَاءِ عَلَى الْمَسَاجِدِ كَبِنَاءِ مَسْجِدٍ عَلَى الْقُبُورِ وَنَحْوِ ذَلِكَ، وَنَهَى عَنِ اتِّبَاعِ الْجَنَائِزِ لِلنِّسَاءِ مِنْ دُونِ لَعْنٍ، بَلْ نَهَى عَنِ اتِّبَاعِ الْجَنَائِزِ، قَالَتْ أُمُّ عَطِيَّةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا: «نُهِينَا عَنِ اتِّبَاعِ الْجَنَائِزِ، وَلَمْ يُعْزَمْ عَلَيْنَا» يَعْنِي: لَمْ يُؤَكَّدْ عَلَيْنَا، فَدَلَّ ذَلِكَ عَلَى أَنَّهَا لَا تَتْبَعُ الْجِنَازَةَ إِلَى الْمَقْبَرَةِ، وَلَا تَزُورُ الْقُبُورَ، وَإِنَّمَا هَذَا مِنْ خَصَائِصِ الرِّجَالِ، لَكِنَّهَا تُصَلِّي عَلَى الْجِنَازَةِ، إِذَا صُلِّيَ عَلَيْهَا فِي الْبَيْتِ أَوْ فِي الْمَسْجِدِ تُصَلِّي الْمَرْأَةُ مَعَ الرِّجَالِ عَلَى الْجَنَائِزِ، كَمَا صَلَّتْ عَائِشَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا عَلَى جِنَازَةِ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ فِي مَسْجِدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
فَالْحَاصِلُ أَنَّ الْمَرْأَةُ تُصَلِّي عَلَى الْجَنَائِزِ مَعَ الرِّجَالِ لَا بَأْسَ، أَمَّا ذَهَابُهَا مَعَ الْجِنَازَةِ إِلَى الْمَقْبَرَةِ أَوْ زِيَارَةُ الْقُبُورِ فَهَذَا هُوَ الَّذِي نُهِيَ عَنْهُ فَلَا يَجُوزُ لَهَا ذَلِكَ، نَعَمْ.
প্রশ্নকারিণী যে হাদিসটির উল্লেখ করেছেন,
لَيْسَ لِلْمَرْأَةِ نَصِيبٌ فِي الْجِنَازَةِ
“জানাজায় নারীর কোনও অংশ নেই” —এর কোনও ভিত্তি আমাদের জানা নেই এবং কোনও আহলে ইলম এটি বর্ণনা করেছেন বলেও আমাদের জানা নেই।
এ বিষয়ে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে যা বর্ণিত হয়েছে তা হলো—তিনি কবর জিয়ারতকারিণী নারীদের এবং যারা কবরের উপর মসজিদ ও বাতি স্থাপন করে তাদের অভিশাপ দিয়েছেন।
এছাড়া আরও কিছু বিষয়ে তিনি অভিশাপ দিয়েছেন, যেমন: কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করা এবং এ জাতীয় অন্যান্য কাজ। তবে জানাজার সাথে (কবরস্থান পর্যন্ত) যাওয়ার ব্যাপারে নারীদের তিনি অভিশাপ ছাড়া নিষেধ করেছেন; বরং সাধারণভাবে জানাজার সাথে যাওয়া থেকেই নিষেধ করেছেন।
উম্মে আতিয়া (রা.) বলেন,
نُهِينَا عَنِ اتِّبَاعِ الْجَنَائِزِ، وَلَمْ يُعْزَمْ عَلَيْنَا
“আমাদেরকে জানাজার সাথে যেতে নিষেধ করা হয়েছিল। তবে তা সে ব্যাপারে কঠোরতা আরোপ করা হয়নি।” [সহিহ বুখারি ও মুসলিম] অর্থাৎ জানাজায় সাথে যাওয়ার বিষয়ে আমাদের উপর জোরালো ভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি।
এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, নারী জানাজার সাথে কবরস্থান পর্যন্ত যাবে না এবং কবর জিয়ারতও করবে না। এটি পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত।
তবে জানাজার নামাজ নারী পড়তে পারে। যদি বাড়িতে বা মসজিদে জানাজার নামাজ পড়া হয় তাহলে নারী পুরুষদের সাথে জানাজার নামাজে অংশগ্রহণ করতে পারবে, যেমনটি আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মসজিদে সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর জানাজার নামাজ পড়েছিলেন।
সারকথা হলো, নারী পুরুষদের সাথে জানাজার নামাজ পড়তে পারবে। এতে কোনও অসুবিধা নেই। তবে জানাজার সাথে কবরস্থান পর্যন্ত যাওয়া কিংবা কবর জিয়ারত করা—এ বিষয় থেকেই নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং নারীর জন্য তা করা জায়েজ নয়।
আল্লাহু আলাম-আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
ফতওয়া প্রদানে: আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায (রাহ.)
সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি এবং প্রধান, হাইয়াতু কিবারিল উলামা (সিনিয়র ওলামা পরিষদ) সৌদি আরব। [উৎস: binbaz org]
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

সফর অবস্থায় জামাত পরিত্যাগ করে একাকী সালাত আদায় করার বিধান

 প্রশ্ন: সফর অবস্থায় জামাত পরিত্যাগ করত একাকী সালাত আদায় করা কি জায়েজ?

উত্তর: সফর অবস্থায় জামাতে সালাত আদায়ের সম্পর্কে আল্লামা শায়খ ইবনে বায (রহ.) বলেন,
“যেখানে জামাতে নামাজ কায়েম হয় এমন স্থানে অবস্থান করলে কোনও ব্যক্তির জন্য একা নামাজ পড়া জায়েজ নয়-সে মুসাফির হোক বা মুকিম (স্থায়ীভাবে অবস্থানকারী)। বরং তার কর্তব্য হলো, অন্যান্য লোকজনের সাথে জামাতে শরিক হওয়া এবং পূর্ণ নামাজ আদায় করা। কারণ—
১. নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«مَنْ سَمِعَ النِّدَاءَ فَلَمْ يَأْتِهِ فَلَا صَلَاةَ لَهُ إِلَّا مِنْ عُذْرٍ»
“যে ব্যক্তি আজান শুনল অথচ তাতে উপস্থিত হলো না তার নামাজ হবে না—অবশ্য কোনও ওজর (যুক্তিযুক্ত কারণ) থাকলে ভিন্ন কথা।” [সুনানে ইবনে মাজাহ, দারাকুতনি, ইবনে হিব্বান ও হাকেম। ইমাম মুসলিমের শর্তানুযায়ী এটি সহিহ]।
২. ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘ওজর’ বলতে কী বোঝায়? তিনি বলেছিলেন: “ভয় বা অসুস্থতা।”
৩. একবার এক অন্ধ ব্যক্তি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে আবেদন করলেন, “হে আল্লাহর রসুল, আমার জন্য কি ঘরে নামাজ পড়ার কোনও সুযোগ আছে?”
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে জিজ্ঞেস করলেন:
«هَلْ تَسْمَعُ النِّدَاءَ بِالصَّلَاةِ؟»
“তুমি কি নামাজের আজান শুনতে পাও?”
লোকটি উত্তর দিলেন, “জি, পাই।”
তখন রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন:
«فَأَجِبْ»
“তবে আজানের ডাকে সাড়া দাও (অর্থাৎ মসজিদে উপস্থিত হও)।” [সহিহ মুসলিম]।
৪. নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেছেন:
«لَقَدْ هَمَمْتُ أَنْ آمُرَ بِالصَّلَاةِ فَتُقَامَ، ثُمَّ آمُرَ رَجُلًا فَيُصَلِّيَ بِالنَّاسِ، ثُمَّ أَنْطَلِقَ مَعِي بِرِجَالٍ مَعَهُمْ حُزَمٌ مِنْ حَطَبٍ إِلَى قَوْمٍ لَا يَشْهَدُونَ الصَّلَاةَ، فَأُحَرِّقَ عَلَيْهِمْ بُيُوتَهُمْ بِالنَّارِ»
“আমার ইচ্ছা হয় যে, নামাজের নির্দেশ দেই এবং তা কায়েম করা হোক। এরপর একজনকে আদেশ করি সে যেন মানুষকে নামাজ পড়ায়। তারপর আমি একদল লোক সাথে নিয়ে যাদের কাছে কাঠের আটি থাকবে, সেই সব মানুষের কাছে যাই যারা জামাতে উপস্থিত হয় না আর তাদের ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেই।” [বুখারি ও মুসলিম]।
৫. ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন:
مَن سَرَّه أن يَلقى اللَّهَ غَدًا مُسلِمًا فليُحافِظْ على هؤلاء الصَّلَواتِ حَيثُ يُنادى بهِنَّ؛ فإنَّ اللَّهَ شَرَعَ لنَبيِّكُم صلَّى اللهُ عليه وسلَّم سُنَنَ الهُدى، وإنَّهُنَّ مَن سُنَنَ الهُدى، ولو أنَّكُم صَلَّيتُم في بُيوتِكُم كما يُصَلِّي هذا المُتَخَلِّفُ في بَيتِه لَتَرَكتُم سُنَّةَ نَبيِّكُم، ولو تَرَكتُم سُنَّةَ نَبيِّكُم لَضَلَلتُم، وما مِن رَجُلٍ يَتَطَهَّرُ فيُحسِنُ الطُّهورَ، ثُمَّ يَعمِدُ إلى مَسجِدٍ مِن هذه المَساجِدِ، إلَّا كَتَبَ اللهُ له بكُلِّ خَطوةٍ يَخطوها حَسَنةً، ويَرفَعُه بها دَرَجةً، ويَحُطُّ عنه بها سَيِّئةً، ولقد رَأيتُنا وما يَتَخَلَّفُ عَنها إلَّا مُنافِقٌ مَعلومُ النِّفاقِ، ولقد كان الرَّجُلُ يُؤتى به يُهادى بينَ الرَّجُلَينِ حتَّى يُقامَ في الصَّفِّ
“যে ব্যক্তি আগামীকাল (কিয়ামতের দিন) আল্লাহর সাথে মুসলিম হিসেবে সাক্ষাৎ করে আনন্দিত হতে চায়, সে যেন আজান হওয়া মাত্রই এই নামাজগুলোর প্রতি যত্নবান হয়। আল্লাহ তাআলা তোমাদের নবীর জন্য হেদায়েতের পথসমূহ (সুন্নাহ) নির্ধারণ করে দিয়েছেন আর এই নামাজগুলো সেই হেদায়েতের অন্তর্ভুক্ত। তোমরা যদি জামাত ত্যাগ করে এই পিছপা হওয়া লোকটির মতো ঘরে নামাজ পড়ো তবে তোমরা তোমাদের নবীর সুন্নাহ ত্যাগ করলে। আর যদি নবীর সুন্নাহ ত্যাগ করো তবে তোমরা পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। আমরা দেখেছি, আমাদের সময়ে প্রকাশ্য মুনাফিক বা অসুস্থ ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ জামাত থেকে পিছিয়ে থাকত না। এমনকি অসুস্থ ব্যক্তিকে দুই মানুষের কাঁধে ভর দিয়ে এনে কাতারে দাঁড় করানো হতো।” [সহিহ মুসলিম]।
এই মর্মে আরও অনেক হাদিস রয়েছে।
তাই মুসাফির বা মুকিম—প্রত্যেক মুসলিমের জন্যই ওয়াজিব হলো জামাতের সাথে নামাজ পড়া। আজান শুনতে পেলে একা নামাজ পড়া থেকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। আল্লাহই তাওফিক দাতা।
[মাজমুউ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত আশ শায়খ ইবনে বায ১২/৩৯]
❑ আল্লামা উসাইমিন (রাহ.) বলেন,
ولا تسقط صلاة الجماعة عن المسافر ؛ لأن الله تعالى أمر بها في حال القتال فقال : (وَإِذَا كُنْتَ فِيهِمْ فَأَقَمْتَ لَهُمُ الصَّلاةَ فَلْتَقُمْ طَائِفَةٌ مِنْهُمْ مَعَكَ وَلْيَأْخُذُوا أَسْلِحَتَهُمْ فَإِذَا سَجَدُوا فَلْيَكُونُوا مِنْ وَرَائِكُمْ وَلْتَأْتِ طَائِفَةٌ أُخْرَى لَمْ يُصَلُّوا فَلْيُصَلُّوا مَعَكَ ) النساء/102 . وعلى هذا فإذا كان المسافر في بلد غير بلده وجب عليه أن يحضر الجماعة في المسجد إذا سمع النداء إلا أن يكون بعيداً أو يخاف فوت رفقته, لعموم الأدلة الدالة على وجوب صلاة الجماعة على من سمع النداء أو الإقامة ” اهـ
“মুসাফিরের ওপর থেকে জামাতে সালাত আদায় করার বিধান রহিত হয় না। কারণ আল্লাহ তাআলা যুদ্ধের অবস্থাতেও জামাতে সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন:
وإِذَا كُنْتَ فِيهِمْ فَأَقَمْتَ لَهُمُ الصَّلَاةَ فَلْتَقُمْ طَائِفَةٌ مِنْهُمْ مَعَكَ وَلْيَأْخُذُوا أَسْلِحَتَهُمْ فَإِذَا سَجَدُوا فَلْيَكُونُوا مِنْ وَرَائِكُمْ وَلْتَأْتِ طَائِفَةٌ أُخْرَى لَمْ يُصَلُّوا فَلْيُصَلُّوا مَعَكَ
“আর যখন আপনি তাদের মধ্যে থাকবেন এবং তাদের সাথে সালাত কায়েম করবেন তখন যেন তাদের একটি দল আপনার সাথে দাঁড়ায় এবং তারা যেন নিজেদের অস্ত্র সাথে রাখে। অতঃপর যখন তারা সিজদা সম্পন্ন করবে তখন যেন তারা আপনাদের পেছন থেকে চলে যায়। আর অন্য যে দলটি এখনো সালাত আদায় করেনি তারা যেন আসে এবং আপনার সাথে সালাত আদায় করে।” [সূরা নিসা: ১০২]
এর ওপর ভিত্তি করে, মুসাফির ব্যক্তি যখন নিজের এলাকা ছাড়া অন্য কোনও এলাকায় অবস্থান করবে তখন আজান শুনতে পেলে মসজিদে গিয়ে জামাতে উপস্থিত হওয়া তার ওপর ওয়াজিব। তবে মসজিদ যদি বেশি দূরে হয় কিংবা জামাতে গেলে তার সফরসঙ্গী বা কাফেলা ছুটে যাওয়ার ভয় থাকে তবে ভিন্ন কথা। কারণ আজান বা ইকামতের আওয়াজ যে শুনতে পাবে, তার ওপর জামাতে সালাত আদায় ওয়াজিব হওয়ার সাধারণ দলিলগুলো সবার জন্যই প্রযোজ্য।”
[মাজমু ফাতাওয়া ওয়া রাসায়িল শাইখ ইবনে উসাইমিন, ১৫/২৫২]
❑ শাইখ ইবনে উসাইমিন রাহ.-কে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়:
আমি যদি সফরে থাকি এবং সালাতের আজান শুনতে পাই তবে কি আমার জন্য মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করা ওয়াজিব? আর আমি যদি আমার অবস্থানস্থলেই সালাত আদায় করে নিই তবে কি কোনও গুনাহ হবে? সফরের মেয়াদ যদি একটানা চার দিনের বেশি হয় তবে কি আমি সালাত কসর করব নাকি পূর্ণ আদায় করব?
তিনি উত্তরে বলেন:
«إِذَا كُنْتُ فِي سَفَرٍ وَسَمِعْتُ النِّدَاءَ لِلصَّلَاةِ فَهَلْ يَجِبُ عَلَيَّ أَنْ أُصَلِّيَ فِي الْمَسْجِدِ، وَلَوْ صَلَّيْتُ فِي مَكَانِ إِقَامَتِي فَهَلْ فِي ذَلِكَ شَيْءٌ؟ إِذَا كَانَتْ مُدَّةُ السَّفَرِ أَكْثَرَ مِنْ أَرْبَعَةِ أَيَّامٍ مُتَوَاصِلَةٍ فَهَلْ أَقْصُرُ الصَّلَاةَ أَمْ أُتِمُّهَا؟»
فَأَجَابَ قَائِلًا: «إِذَا سَمِعْتَ الْأَذَانَ وَأَنْتَ فِي مَحَلِّ الْإِقَامَةِ وَجَبَ عَلَيْكَ أَنْ تَحْضُرَ إِلَى الْمَسْجِدِ، لِأَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِلرَّجُلِ الَّذِي اسْتَأْذَنَهُ فِي تَرْكِ الْجَمَاعَةِ: (أَتَسْمَعُ النِّدَاءَ؟ قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: فَأَجِبْ) رَوَاهُ مُسْلِمٌ (653). وَقَالَ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ: (مَنْ سَمِعَ النِّدَاءَ فَلَمْ يَأْتِ فَلَا صَلَاةَ لَهُ إِلَّا مِنْ عُذْرٍ) رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ (217). وَصَحَّحَهُ الْأَلْبَانِيُّ فِي صَحِيحِ التِّرْمِذِيِّ.
وَلَيْسَ هُنَاكَ دَلِيلٌ يَدُلُّ عَلَى تَخْصِيصِ الْمُسَافِرِ مِنْ هَذَا الْحُكْمِ إِلَّا إِذَا كَانَ فِي ذَهَابِكَ لِلْمَسْجِدِ تَفْوِيتُ مَصْلَحَةٍ لَكَ فِي السَّفَرِ مِثْلَ أَنْ تَكُونَ مُحْتَاجًا إِلَى الرَّاحَةِ وَالنَّوْمِ فَتُرِيدُ أَنْ تُصَلِّيَ فِي مَقَرِّ إِقَامَتِكَ مِنْ أَجْلِ أَنْ تَنَامَ، أَوْ كُنْتَ تَخْشَى إِذَا ذَهَبْتَ إِلَى الْمَسْجِدِ أَنْ يَتَأَخَّرَ الْإِمَامُ فِي الْإِقَامَةِ
“আপনি যখন অবস্থানস্থলে থাকা অবস্থায় আজান শুনতে পাবেন তখন মসজিদে উপস্থিত হওয়া আপনার ওপর ওয়াজিব। কারণ আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জামাতে উপস্থিত না হওয়ার অনুমতি প্রার্থনাকারী ব্যক্তিকে বলেছিলেন:
أَتَسْمَعُ النِّدَاءَ ؟ قَالَ : نَعَمْ ، قَالَ : فَأَجِبْ
“তুমি কি আজান শুনতে পাও? সে বলল: হ্যাঁ। তিনি বললেন: তাহলে সাড়া দাও।” [সহিহ মুসলিম: ৬৫৩]
এবং তিনি (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) আরও বলেছেন:
مَنْ سَمِعَ النِّدَاءَ فَلَمْ يَأْتِ فَلَا صَلَاةَ لَهُ إِلَّا مِنْ عُذْرٍ
“যে ব্যক্তি আজান শুনল অথচ (মসজিদে) এল না, ওজর ছাড়া তার সালাতই হবে না।” [সুনানে তিরমিজি: ২১৭, আলবানি সহিহ তিরমিজিতে এটিকে সহিহ বলেছেন]
আর এই বিধান থেকে মুসাফিরকে সুনির্দিষ্টভাবে বাদ দেওয়ার মতো কোনও দলিল নেই। তবে মসজিদে যাওয়ার কারণে যদি সফরে আপনার কোনও কল্যাণ বা জরুরি বিষয়ে ব্যাঘাত ঘটে—যেমন আপনার বিশ্রাম ও ঘুমের খুব প্রয়োজন, তাই আপনি নিজের অবস্থানস্থলে সালাত আদায় করে ঘুমিয়ে নিতে চাচ্ছেন; কিংবা আপনার ভয় হচ্ছে যে মসজিদে গেলে ইমাম সাহেব ইকামত দিতে দেরি করবেন আর আপনার সফরের গাড়ি বা ফ্লাইট ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—তবে ভিন্ন কথা।”
(মাজমু ফাতাওয়া ওয়া রাসায়িল শাইখ ইবনে উসাইমিন, ১৫/৪২২)
[সোর্স: islamqa]
➧ উল্লেখ্য যে, পুরুষদের জন্য জামাতে নামাজ পড়া ওয়াজিব নাকি সুন্নতে মুয়াক্কাদা এ বিষয়টি আলেমদের মাঝে দ্বিমত পূর্ণ। তবে জুমহুর বা অধিকাংশ আলেমের মতে তা সুন্নতে মুয়াক্কাদা; ওয়াজিব নয়।
❑ নির্জন স্থানে একাকী নামাজ ও আজানের মর্যাদা:
আপনি যদি এমন স্থানে গমন করেন যেখানে স্থানীয় কোন মসজিদ না থাকে বা নামাজ পড়ার মত কোন সফর সঙ্গী না থাকে তাহলে সেখানে একাকী নামাজ আদায় করবেন। তবে সে ক্ষেত্রে আজান দিয়ে নামাজ পড়া অধিক উত্তম। যেমনটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«يَعْجَبُ رَبُّكَ مِنْ رَاعِي غَنَمٍ فِي رَأْسِ شَظِيَّةٍ بِجَبَلٍ، يُؤَذِّنُ بِالصَّلَاةِ وَيُصَلِّي، فَيَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: انْظُرُوا إِلَى عَبْدِي هَذَا يُؤَذِّنُ وَيُقِيمُ الصَّلَاةَ يَخَافُ مِنِّي، قَدْ غَفَرْتُ لِعَبْدِي وَأَدْخَلْتُهُ الْجَنَّةَ»
“তোমাদের প্রতিপালক পাহাড়ের চূড়ায় থাকা সেই বকরির রাখালকে দেখে আনন্দিত হন (বা আশ্চর্যান্বিত হন), যে নামাজের জন্য আজান দেয় এবং নামাজ আদায় করে। তখন আল্লাহ তাআলা (ফেরেশতাদের) বলেন: তোমরা আমার এই বান্দার প্রতি লক্ষ করো, সে আজান দিচ্ছে এবং নামাজ কায়েম করছে; সে কেবল আমাকেই ভয় পায়। আমি আমার এই বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালাম।”
[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ১২০৩; সুনানে নাসায়ি, হাদিস নম্বর: ৬৬৬; মুসনাদে আহমদ, হাদিস নম্বর: ১৭৪৬১; আলবানী রহ. হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Tuesday, July 7, 2026

নামাজের ইস্তিফতাহ রুকু কওমা সিজদা ও দুই সিজদার মাঝখানে বসার সুন্নাহসম্মত দোয়াসমূহ

 ❑ ১. ইস্তিফতাহ বা সালাত শুরুর দুআ যা তাকবিরে তাহরিমার পর পঠিতব্য:

◈ দোয়া-১
وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا، وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ، إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ، لَا شَرِيكَ لَهُ، وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ، اللَّهُمَّ أَنْتَ الْمَلِكُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، أَنْتَ رَبِّي وَأَنَا عَبْدُكَ، ظَلَمْتُ نَفْسِي، وَاعْتَرَفْتُ بِذَنْبِي، فَاغْفِرْ لِي ذُنُوبِي جَمِيعًا، إِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ، وَاهْدِنِي لِأَحْسَنِ الْأَخْلَاقِ، لَا يَهْدِي لِأَحْسَنِهَا إِلَّا أَنْتَ، وَاصْرِفْ عَنِّي سَيِّئَهَا، لَا يَصْرِفُ عَنِّي سَيِّئَهَا إِلَّا أَنْتَ، لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ، وَالْخَيْرُ كُلُّهُ فِي يَدَيْكَ، وَالشَّرُّ لَيْסَ إِلَيْكَ، أَنَا بِكَ وَإِلَيْكَ، تَبَارَكْتَ وَتَعَالَيْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
উচ্চারণ: ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাযী ফাত্বারাস সামাওয়াাতী ওয়াল আরদ্বা হানীফান্, ওয়া মাা আনা মিনাল মুশরিকীন।
ইন্না সালাাতী ওয়া নুসুকী ওয়া মাহইয়ায়া ওয়া মামাাতী লিল্লাাহি রাব্বিল আালামীন, লাা শারীকা লাহু, ওয়া বিযাালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমীন।
আল্ল-হুম্মা আনতাল মালিকু লাা ইলাাহা ইল্লাা আনতা, আনতা রাব্বী ওয়া আনা আবদুকা, যালামতু নাফসী, ওয়া’তারাফতু বিযাম্বী, ফাগফিরলী যুনূবী জামী’আন্, ইন্নাহু লাা ইয়াগফিরুজ যুনূবা ইল্লাা আনতা, ওয়াহদিনী লিআহসানিল আখলাা ক্ব, লাা ইয়াহদী লিআহসানিহাা ইল্লাা আনতা, ওয়াসরিফ আন্নী সাইয়িআহাা, লাা ইয়াসরিফু আন্নী সাইয়িআহাা ইল্লাা আনতা,
লাব্বাইকা ওয়া সা’দাইকা, ওয়াল খাইরু কুল্লুহু ফী ইয়াদাইকা, ওয়াশ শাররু লাইসা ইলাইকা, আনা বিকা ওয়া ইলাইকা, তাবারাকতা ওয়া তা’আালাইতা,
আসতাগফিরুকা ওয়া আতূবু ইলাইকা।
অর্থ: আমি একনিষ্ঠভাবে আমার চেহারা সেই সত্তার দিকে ফিরিয়ে নিলাম, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।
নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য — তাঁর কোনো শরিক নেই।
আমাকে এরই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।
হে আল্লাহ! আপনি বাদশাহ, আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আপনি আমার প্রতিপালক এবং আমি আপনার বান্দা। আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি এবং আমার গুনাহ স্বীকার করছি। সুতরাং আমার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিন। নিশ্চয় আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না। আমাকে উত্তম চরিত্রের দিকে হেদায়েত দিন। আপনি ছাড়া কেউ উত্তম চরিত্রের দিকে হেদায়েত দিতে পারে না।
আমার থেকে মন্দ চরিত্র দূর করে দিন। আপনি ছাড়া কেউ তা দূর করতে পারে না।
আমি হাজির, আপনার আনুগত্যে প্রস্তুত। সকল কল্যাণ আপনার হাতে, আর অকল্যাণ আপনার দিকে সম্বন্ধিত নয়। আমি আপনার মাধ্যমেই টিকে আছি ও আপনার দিকেই আমার প্রত্যাবর্তন। আপনি বরকতময়, আপনি মহিমান্বিত। আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আপনার দিকে তওবা করছি।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৭৭১ — আলি ইবনে আবি তালিব রা. থেকে বর্ণিত; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ৭৬০; জামে তিরমিজি, হাদিস নম্বর: ৩৪২১ — হাদিসের মান: সহিহ]
◈ দোয়া-২ (ইস্তিফতাহ-এর দোয়াগুলোর মধ্যে সর্বাধিক সহিহ)
اللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِي وَبَيْنَ خَطَايَايَ كَمَا بَاعَدْتَ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ، اللَّهُمَّ نَقِّنِي مِنَ الْخَطَايَا كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ، اللَّهُمَّ اغْسِلْنِي مِنْ خَطَايَايَ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা বাা’ইদ বাইনী ওয়া বাইনা খাত্বাায়াায়া কামাা বাা’আদতা বাইনাল মাশরিক্বি ওয়াল মাগরিব, আল্লাহুম্মা নাক্ব ক্বিনী মিনাল খাত্বাায়াা কামাা ইউনাক্ব ক্বাস সাউবুল আবইয়াদু মিনাদ দানাস, আল্লাহুম্মাগসিলনী মিন খাত্বাায়াায়া বিল মাা’ই ওয়াস সালজি ওয়াল বারাদ।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমার ও আমার গুনাহসমূহের মাঝে তেমন দূরত্ব সৃষ্টি করে দিন, যেমন আপনি পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন। হে আল্লাহ! আমাকে গুনাহ থেকে এমনভাবে পরিষ্কার করে দিন, যেমন সাদা কাপড়কে ময়লা থেকে পরিষ্কার করা হয়। হে আল্লাহ! আমার গুনাহসমূহ পানি, বরফ ও শিলাবৃষ্টি দিয়ে ধুয়ে দিন।
[সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৭৪৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৫৯৮ — আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, মুত্তাফাকুন আলাইহি। হাফেজ ইবনে হাজার ও ইবনুল হুমাম রহ. একে ইস্তিফতাহ-এর দোয়াগুলোর মধ্যে সর্বাধিক সহিহ বলে উল্লেখ করেছেন]
◈ দোয়া-৩ (সংক্ষিপ্ততম ইস্তিফতাহ,যা উমর রা. মানুষকে শিক্ষা দিতেন)
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، وَتَبَارَكَ اسْمُكَ، وَتَعَالَى جَدُّكَ، وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ
উচ্চারণ: সুবহাানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবাারাকাসমুকা, ওয়া তা’আালাই জাদ্দুকা, ওয়া লাা ইলাাহা গাইরুক।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনার প্রশংসাসহ আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। আপনার নাম বরকতময়, আপনার মহিমা সুউচ্চ, এবং আপনি ব্যতীত সত্য কোনো ইলাহ নেই।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৩৯৯ — উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর আমল হিসেবে বর্ণিত, সহিহ; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ৭৭৫-৭৭৬; জামে তিরমিজি, হাদিস নম্বর: ২৪২-২৪৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নম্বর: ৮০৬ — আয়িশা ও আবু সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত সনদগুলো পৃথকভাবে দুর্বল (জইফ)। তবে পরস্পরকে শক্তিশালী করায় সম্মিলিতভাবে হাসান/সহিহ লি গাইরিহি। আল্লামা আলবানী রহ. একে সহিহ বলেছেন (ইরওয়াউল গালিল, হাদিস নম্বর: ৩৪০) (উমর রা.-এর বর্ণনাসূত্রে)।
হাসান লি গাইরিহী অন্যান্য সূত্রে]
➧ মনে রাখা জরুরি: উপরের তিনটি দোয়ার যেকোনো একটি প্রতি রাকাতের শুরুতে (শুধু প্রথম রাকাতে) একবার পড়া সুন্নাহ; একসাথে সবগুলো মিলিয়ে পড়া সুন্নাহসম্মত নয়। বৈচিত্র্য আনার উদ্দেশ্যে ভিন্ন ভিন্ন নামাজে ভিন্ন ভিন্ন দোয়া পড়া মুস্তাহাব। ইস্তিফতাহ ছুটে গেলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে না পড়লেও নামাজ সহিহ হয়ে যায়, কেননা এটি ওয়াজিব নয় বরং সুন্নাহ।
❑ ২. রুকুতে পাঠ করার দোয়া:
◈ দোয়া-১ (সবচেয়ে প্রচলিত)
سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ
উচ্চারণ: সুবহাানা রাব্বিয়াল আযীম।
অর্থ: আমার মহান প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা করছি।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৭৭২]
◈ দোয়া-২ (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুকু ও সিজদায় সবচেয়ে বেশি পড়তেন)
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي
উচ্চারণ: সুবহাানাকাল্ল-হুম্মা রাব্বানাা ওয়া বিহামদিকা আল্ল-হুম্মাগফিরলী।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের প্রতিপালক! আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করছি। হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন।
[সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৭৯৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৪৮৪]
◈ দোয়া-৩
سُبُّوحٌ قُدُّوسٌ، رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ
উচ্চারণ: সুব্বূহুন কুদ্দূসুন, রাব্বুল মালাা’ইকাতি ওয়ার রূুহ।
অর্থ: ফেরেশতাকুল ও রুহ (জিবরাইল)-এর প্রতিপালক অত্যন্ত পবিত্র, মহিমান্বিত।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৪৮৭]
◈ দোয়া-৪ (বিশেষভাবে নফল বা তাহাজ্জুদে পঠিত)
اللَّهُمَّ لَكَ رَكَعْتُ، وَبِكَ آمَنْتُ، وَلَكَ أَسْلَمْتُ، خَشَعَ لَكَ سَمْعِي وَبَصَرِي، وَمُخِّي وَعَظْمِي وَعَصَبِي
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা রাকা’তু, ওয়া বিকা আামানতু, ওয়া লাকা আসলামতু, খাশা’আ লাকা সাম’ঈ ওয়া বাসারী, ওয়া মুখ্খী ওয়া আজমী ওয়া আসাবী।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনার জন্যই রুকু করলাম, আপনার প্রতিই ইমান আনলাম, আপনার নিকটই আত্মসমর্পণ করলাম। আপনার সমীপে বিনীত হলো আমার কান, চোখ, মগজ, অস্থি ও স্নায়ুমণ্ডলী।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৭৭১]
➧ মনে রাখা জরুরি: রুকুতে ওয়াজিব একবার “সুবহানা রব্বিয়াল আযীম” বলা; বাকি সব দোয়া ও পুনরাবৃত্তি (৩/৫/৭ বার) সুন্নাহ।
❑ ৩. রুকু থেকে ওঠার সময় ও পরের দোয়া (কওমা):
মাথা তোলার সময় ইমাম ও একা নামাজ আদায়কারী বলবেন:
سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ
উচ্চারণ: সামি’আল্লাহু লিমান হামিদাহ।
অর্থ: আল্লাহ তার প্রশংসা শুনলেন যে তাঁর প্রশংসা করলো।
[সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৭৩৬]
এরপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মুক্তাদি, ইমাম ও একা নামাজ আদায়কারী নিচের যেকোনো একটি বা একাধিক দোয়া পড়বেন:
◈ দোয়া-১
رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ
উচ্চারণ: রাব্বানাা ওয়া লাকাল হামদ।
অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার জন্যই সমস্ত প্রশংসা।
[সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৭৯৬]
◈ দোয়া-২
رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ
উচ্চারণ: রাব্বানাা লাকাল হামদ।
অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার জন্যই প্রশংসা (ওয়াও ছাড়া)।
[সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৭৯৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৩৯২]
◈ দোয়া-৩
اللَّهُمَّ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বানাা লাকাল হামদ।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের প্রতিপালক! আপনার জন্যই প্রশংসা।
[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ৮৪৮ — হাদিসের মান: সহিহ]
◈ দোয়া-৪:
اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বানাা ওয়া লাকাল হামদ।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের প্রতিপালক! আপনার জন্যই সমস্ত প্রশংসা।
[সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৭৯৬ (অন্য বর্ণনা)]
দোয়া-৫ (অধিক ফজিলতপূর্ণ):
حَمْدًا كَثِيرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيهِ
উচ্চারণ: হামদান কাসীরান ত্বাইয়্যিবাম মুবাারাকান ফীহ।
অর্থ: এমন প্রশংসা যা প্রচুর, পবিত্র ও বরকতময় (উপরের “রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ”-এর সাথে যুক্ত করে পড়া হয়)।
[সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৭৯৯]
◈ দোয়া-৬
اللَّهُمَّ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ مِلْءَ السَّمَوَاتِ وَمِلْءَ الْأَرْضِ، وَمِلْءَ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বানাা লাকাল হামদু মিলআস সামাাওয়াাতি ওয়া মিলআল আরদ্বি, ওয়া মিলআ মাা শি’তা মিন শাইয়িন বা’দু।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের প্রতিপালক! আকাশমণ্ডলী পূর্ণ, পৃথিবী পূর্ণ এবং এরপর আপনি যা চান তা পূর্ণ করার মতো সমস্ত প্রশংসা আপনারই।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৪৭৬]
◈ দোয়া-৭ (দীর্ঘতম ও সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ)
رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ مِلْءَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ، وَمِلْءَ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ، أَهْلَ الثَّنَاءِ وَالْمَجْدِ، أَحَقُّ مَا قَالَ الْعَبْدُ، وَكُلُّنَا لَكَ عَبْدٌ، اللَّهُمَّ لَا مَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ، وَلَا مُعْطِيَ لِمَا مَنَعْتَ، وَلَا يَنْفَعُ ذَا الْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ
উচ্চারণ: রাব্বানাা লাকাল হামদু মিলআস সামাাওয়াাতি ওয়াল আরদ্বি, ওয়া মিলআ মাা শি’তা মিন শাইয়িন বা’দু, আহলাস সানাা’ই ওয়াল মাজদি, আহাক্ক্বু মাা ক্বাালাল আবদু, ওয়া কুল্লাহনাা লাকা আবদুন, আল্লাহুম্মা লাা মাানি’আ লিমাা আ’তাইতা, ওয়া লাা মু’তিয়া লিমাা মানা’তা, ওয়া লাা ইয়ানফাউ যাল জাদ্দি মিনকাল জাদ্দ।
অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আকাশ-জমিন পূর্ণ এবং এরপর আপনি যা চান তা পূর্ণ করার মতো সমস্ত প্রশংসা আপনারই। আপনিই প্রশংসা ও মহিমার যোগ্য অধিকারী। বান্দা যা বলেছে তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে সত্য কথা, আর আমরা সবাই আপনার বান্দা।
হে আল্লাহ! আপনি যা দেন তা রোধ করার কেউ নেই, আর আপনি যা রোধ করেন তা দেওয়ার কেউ নেই। আর কোনো ধনবান বা প্রতাপশালীর ধন-প্রতাপ আপনার সামনে তাকে উপকৃত করতে পারে না।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৪৭৭]
❑ ৪. সিজদায় পাঠ করার দোয়া:
◈ দোয়া-১ (সবচেয়ে প্রচলিত)
سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى
উচ্চারণ: সুবহাানা রাব্বিয়াল আ’লাা।
অর্থ: আমার সর্বোচ্চ প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা করছি।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৭৭২]
◈ দোয়া-২
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي
উচ্চারণ: সুবহাানাকাল্ল-হুম্মা রাব্বানাা ওয়া বিহামদিকা আল্ল-হুম্মাগফিরলী।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের প্রতিপালক! আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করছি। হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন।
[সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ७৯৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৪৮৪]
◈ দোয়া-৩
سُبُّوحٌ قُدُّوسٌ، رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ
উচ্চারণ: সুব্বূহুন ক্বুদ্দূসুন, রাব্বুল মালাা’ইকাতি ওয়ার রূুহ।
অর্থ: ফেরেশতাকুল ও রুহ (জিবরাইল)-এর প্রতিপালক অত্যন্ত পবিত্র, মহিমান্বিত।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৪৮৭]
◈ দোয়া-৪
اللَّهُمَّ لَكَ سَجَدْتُ، وَبِكَ آمَنْتُ، وَلَكَ أَسْلَمْتُ، سَجَدَ وَجْهِيَ لِلَّذِي خَلَقَهُ وَصَوَّرَهُ، وَشَقَّ سَمْعَهُ وَبَصَرَهُ، تَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা সাজাদতু, ওয়া বিকা আামানতু, ওয়া লাকা আসলামতু, সাজাদা ওয়াজহী লিল্লাযী খালাক্বাহু ওয়া সোয়াউওয়ারাহু, ওয়া শাক্ব ক্বা সাম’আহু ওয়া বাস্বারাহু, তাবাারাকাল্লাাহু আহসানুল খ্বাালিক্বীন।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনার জন্যই সিজদা করলাম, আপনার প্রতিই ইমান আনলাম, আপনার নিকটই আত্মসমর্পণ করলাম। আমার চেহারা সিজদা করলো সেই সত্তার জন্য, যিনি একে সৃষ্টি করেছেন, আকৃতি দিয়েছেন এবং এর কান ও চোখ প্রকাশ করেছেন। মহান, বরকতময় আল্লাহ, সর্বোত্তম স্রষ্টা।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৭৭১]
◈ দোয়া-৫
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي كُلَّهُ: دِقَّهُ وَجِلَّهُ، وَأَوَّلَهُ وَآخِرَهُ، وَعَلَانِيَتَهُ وَسِرَّهُ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফিরলী যাম্বী কুল্লাহু: দিক্ব ক্বাহু ওয়া জিল্লাহু, ওয়া আউয়ালাহু ওয়া আাখিরাহু, ওয়া আলাানিইয়াতাহু ওয়া সিররাহু।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দিন — ছোট ও বড়, প্রথম ও শেষ, প্রকাশ্য ও গোপন।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৪৮৩]
➧ মনে রাখা জরুরি: সিজদায় ওয়াজিব একবার “সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা” বলা; বাকি সব দোয়া ও পুনরাবৃত্তি সুন্নাহ। সিজদায় যত ইচ্ছা দোয়া করা মুস্তাহাব — কারণ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, বান্দা তার প্রতিপালকের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় সিজদারত অবস্থায়। সুতরাং তোমরা সিজদায় বেশি বেশি দোয়া করো।
❑ ৫. দুই সিজদার মাঝখানে বসার দোয়া:
◈ দোয়া-১
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، وَارْحَمْنِي، وَاهْدِنِي، وَعَافِنِي، وَارْزُقْنِي
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফিরলী, ওয়ারহামনী, ওয়াহদিনী, ওয়া আাফিনী, ওয়ারযুক্বনী।
অর্থ: হে আল্লাহ! তুমি আমাকে মাফ করো, রহম করো, হেদায়েত দাও, নিরাপত্তা দাও এবং রিজিক দাও।
[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ৮৫০; জামে তিরমিজি, হাদিস নম্বর: ২৮৪ — হাদিসের মান: হাসান]
◈ দোয়া-২
رَبِّ اغْفِرْ لِي، رَبِّ اغْفِرْ لِي
উচ্চারণ: রাব্বিগফিরলী, রাব্বিগফিরলী।
অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করুন। হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করুন।
[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ৮৭৪; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নম্বর: ৮৯৭ — হাদিসের মান: সহিহ]
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এ দুআগুলোর উপর আমল করার তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate