Thursday, October 16, 2025

বিবাহের পূর্বে যদি পাত্রীপক্ষের সাথে ভবিষ্যতে দ্বিতীয় বিবাহ করবে না মর্মে চুক্তি করা হয় অতঃপর বিবাহের পর দ্বিতীয় বিবাহ করলে প্রথম স্ত্রী কি বিচ্ছেদ চাইতে পারবে

 প্রশ্ন: বিবাহের পূর্বে যদি পাত্রীপক্ষের সাথে ভবিষ্যতে দ্বিতীয় বিবাহ করবে না মর্মে চুক্তি করা হয়, অতঃপর বিবাহের পর দ্বিতীয় বিবাহ করলে প্রথম স্ত্রী কি বিচ্ছেদ চাইতে পারবেন?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর যদি পাত্র বিবাহের পূর্বে শরীয়তসম্মতভাবে পাত্রীপক্ষের সাথে এমন শর্তে সম্মত হন যে, প্রথম স্ত্রী থাকা অবস্থায় তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করবেন না এ শর্ত বৈধ কি না তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে প্রমাণ সমর্থিত শক্তিশালী কথা হলো: বিবাহের সময় স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে যে কোনো একজন আরেকজনের উপর যে শর্ত আরোপ করেন, তার মূলনীতি হলো বৈধতা এবং তা পূরণ করা আবশ্যক, যতক্ষণ না তা শরীয়তের পরিপন্থী হয়। এর প্রমাণ হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:”শর্তসমূহের মধ্যে যা পূর্ণ করার সর্বাধিক দাবী রাখে তা হল সেই শর্ত যার দ্বারা তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের হালাল করেছ।”(সহীহ বুখারী হা/২৭২১; সহীহ মুসলিম হা/১৪১৮)। সুতরাং যদি কোনো নারী প্রথম বিবাহের সময় শর্তারোপ করেন যে, স্বামী জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর অন্য কোনো নারীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন না, কিংবা অন্ততপক্ষে তার অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারবেন না এবং স্বামী যদি এ শর্ত মেনে নিয়ে তার সাথে বিবাহ সম্পাদন করেন, তাহলে এ শর্তের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা তার দায়িত্ব হবে। অতএব তিনি যদি স্ত্রীর সঙ্গে সমঝোতা ও অনুমতি ব্যতিরেকে দ্বিতীয় বিবাহ করেন, তবে তিনি একদিকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে গুনাহগার হবেন, অন্যদিকে প্রথম স্ত্রীর জন্য বৈবাহিক সম্পর্ক বাতিল (ফাসখ) করার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।ফলে স্ত্রী চাইলে স্বামীর সাথে বসবাস করতে পারেন অথবা শরীয়ত সম্মত পদ্ধতিতে বিচ্ছেদ নিতে পারেন।কারণ স্বামী তার চুক্তি লঙ্ঘন করেছেন।অথচ পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন:”আর অঙ্গীকার পূর্ণ কর, নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”(সূরা বনি ইসরাইল: ১৭/৩৪)। অপর আয়াতে আল্লাহ বলেন,”হে মুমিনগণ,তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর।”(সূরা মায়েদাহ; ৫/১)।উক্ত আয়াতের তাফসিরে যায়দ ইবনে আসলাম (রহ.) বলেছেন, এখানে ঐসব চুক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যা মানুষ পরস্পরে একে অন্যের সাথে সম্পাদন করে। যেমন, বিবাহ-শাদী ও ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি ইত্যাদি। [তাফসীরে বাগভী সূরা মায়েদার ১ নং আয়াতের তাফসির]। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘শর্তসমূহের মধ্যে যা পূর্ণ করার সর্বাধিক দাবী রাখে তা হল- সেই শর্ত যার দ্বারা তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের হালাল করেছ।’(সহীহ বুখারী, হা/২৭২১, ৫১৫১; মুসলিম, হা/১৪১৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৩০৪)। রাসূল (ﷺ) আরো বলেছেন, মুসলিমগণ তাদের পরস্পরের শর্তানুযায়ী কাজ করবে যদি তা হালাল হয়। (মুস্তাদরাক হাকেম হা/২৩১০ সহীহুল জামে‘ হা/৬৭১৫)। রাসূল (ﷺ) আরো বলেছেন, মুসলিমগণ পরস্পরের মধ্যে যে শর্ত করবে, তা অবশ্যই পালন করতে হবে। কিন্তু যে শর্ত ও চুক্তি হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করবে তা জায়েয হবে না।’ (আবু দাঊদ হা/৩৫৯৪; তিরমিযী হা/১৩৫২; মিশকাত হা/২৯২৩)।
.
সৌদি সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
واعلم أن الأصل في جميع الشروط في العقود الصحة حتى يقوم دليل على المنع؛ والدليل على ذلك عموم الأدلة الآمرة بالوفاء بالعقد: (ياأيها الذين آمنوا أوفوا بالعقود) [المائدة: 1] ، (وأوفوا بالعهد إن العهد كان مسؤولا) [الإسراء: 34] ، وكذلك الحديث الذي روي عن الرسول ـ عليه الصلاة والسلام : (المسلمون على شروطهم إلا شرطا أحل حراما أو حرم حلالا) . وكذلك قوله ـ عليه الصلاة والسلام : (كل شرط ليس فيه كتاب الله فهو باطل وإن كان مائة شرط) .فالحاصل: أن الأصل في الشروط الحل والصحة، سواء في النكاح، أو في البيع، أو في الإجارة، أو في الرهن، أو في الوقف، وحكم الشروط المشروطة في العقود إذا كانت صحيحة أنه يجب الوفاء بها في النكاح وغيره؛ لعموم قوله تعالى: (ياأيها الذين آمنوا أوفوا بالعقود) فإن الوفاء بالعقد يتضمن الوفاء به وبما تضمنه من شروط وصفات؛ لأنه كله داخل في العقد” .
“আর জেনে রাখুন যে, চুক্তির সমস্ত শর্তের মূলনীতি হলো তা বৈধ (বা হালাল হওয়া),যতক্ষণ না তা নিষিদ্ধ করার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়; এই নীতির প্রমাণ হিসেবে কুরআনের নিম্নলিখিত আয়াতসমূহ সাধারণ নির্দেশনা প্রদান করে: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ কর)”(সূরা মায়েদাহ: ১),”আর প্রতিশ্রুতি পালন করো;নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”(আল-ইসরা: ৩৪) এছাড়া, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে,”মুসলিমগণ পরস্পরের মধ্যে যে শর্ত করবে, তা অবশ্যই পালন করতে হবে। কিন্তু যে শর্ত ও চুক্তি হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করবে তা জায়েয হবে না।’ (আবু দাঊদ হা/৩৫৯৪) এবং তাঁর বাণী: “এমন কোন শর্ত, যা আল্লাহর কিতাবে নেই, তা বাতিল বলে গণ্য হবে; এমনকি সে শর্ত শতবার আরোপ করলেও।”(বুখারী হা/২৫৬৩) সুতরাং,সংক্ষেপে:শর্ত সম্পর্কিত মৌলিক নীতি হল বৈধতা। এটি প্রযোজ্য সকল ক্ষেত্রে—চাই তা বিবাহ হোক, বিক্রয়-বাণিজ্য, ভাড়া, বন্ধক,কিংবা ওয়াকফ।যদি কোনো চুক্তিতে শর্তগুলো বৈধ হয়, তবে সেই শর্তগুলো পালন করা আবশ্যক। যেমন, বিবাহ চুক্তি বা অন্যান্য চুক্তিতে, শর্ত পূরণ করা হল চুক্তি পূরণের অন্তর্ভুক্ত কারণ,আল্লাহ বলেছেন “হে মুমিনগণ,তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর।”(সূরা মায়েদাহ: ৫/১) চুক্তি ও এর সমস্ত শর্ত একত্রে চুক্তির অন্তর্গত। কারণ এসবই চুক্তির অংশ।”(ইবনু উসাইমীন; আল-শারহুল মুমতি; খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ১৬৩; মিশরীয় সংস্করণ: ৫/২৪১) .
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,إذا اشترط لها أن لا يخرجها من دارها أو بلدها ، أو لا يسافر بها ، أو لا يتزوج عليها : فهذا يلزمه الوفاء به ، فإن لم يفعل فلها فسخ النكاح ، روي هذا عن عمر وسعد بن أبي وقاص وعمرو بن العاص رضي الله عنهم “যদি পাত্রী তার জন্য শর্ত দেয় যে, বিবাহের পর স্বামী তাকে তার বাড়িতে রাখতে হবে অন্য কোথাও নিতে পারবে না, তার সাথে দূরে কোথাও ভ্রমন করবে না।স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করবে না এবং সে তার সাথে কোন ষড়যন্ত্র করবে না তাহলে তাকে অবশ্যই তা পূরণ করতে হবে, এবং যদি তিনি তা না করেন, তবে স্ত্রীর বিবাহ বাতিল করার অধিকার রয়েছে।”(ইমাম ইবনে কুদামাহ আল-মুগনী; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৪৮৩)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
إذا اشترطت أن لا يتزوج عليها فإن هذا يجوز .وقال بعض العلماء : إنه لا يجوز ؛ لأنه حجر على الزوج فيما أباح الله له ، فهو مخالف للقرآن : (فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلاثَ وَرُبَاعَ) النساء/3 .فيقال في الجواب على ذلك : هي لها غرض في عدم زواجه ، ولم تعتد على أحد ، والزوج هو الذي أسقط حقه ، فإذا كان له الحق في أن يتزوج أكثر من واحدة ، أسقطه ، فما المانع من صحة هذا الشرط ؟! ولهذا ؛ فالصحيح في هذه المسألة ما ذهب إليه الإمام أحمد رحمه الله من أن ذلك الشرط صحيح”
“যদি স্ত্রী এই শর্ত আরোপ করেন যে স্বামী তার সঙ্গে বিবাহের বাইরে আর কোনো নারীকে বিবাহ করবেন না, তবে এটি বৈধ। যদিও কিছু আলেম বলেছেন যে এটি বৈধ নয়, কারণ এতে স্বামীকে এমন বিষয়ে বাধ্য করা হয়েছে যা আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য বৈধ। তারা কুরআনের আয়াত উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন: “অতএব তোমরা নারীদের মধ্যে তোমাদের পছন্দমতো বিয়ে করো– দুই, তিন অথবা চারজনকে।”(সূরা নিসা:৩) এই যুক্তির জবাবে বলা যায় যে, বহুবিবাহ না করার বিষয়ে স্ত্রীর আরোপিত শর্তের একটি উদ্দেশ্য রয়েছে এবং এতে তিনি কারও প্রতি কোনো অন্যায় করেননি। বরং স্বামী নিজেই তার বৈধ অধিকার ত্যাগ করেছেন। সুতরাং, যেহেতু স্বামী তার একাধিক স্ত্রীর অধিকার রাখতে পারার ক্ষমতা রাখে, কিন্তু স্বেচ্ছায় তা ত্যাগ করছেন,তাহলে এই শর্তের বৈধ হওয়ার পথে বাধা কোথায়?অতএব,এই মাসয়ালার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য ও সঠিক মত হলো ইমাম আহমদের (রহঃ) মত: স্ত্রীর দ্বারা আরোপিত এই শর্ত বৈধ ও গ্রহণযোগ্য।”(ইবনু উসাইমীন;আশ-শারহুল মুমতি’,খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২৪৩)
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:
و لو شرط عليها أن تحافظ على الصلوات الخمس ، أو تلزم الصدق والأمانة فيما بعد العقد ، فتركته فيما بعدُ : فله الفسخ “
“যদি স্ত্রী পূর্বে চুক্তির শর্ত হিসেবে স্থির করে যে সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবে, বা চুক্তির পর সত্যবাদিতা ও আমানতদারী বজায় রাখবে; এবং পরে তা অবহেলা করে—তাহলে স্বামীর জন্য বিবাহ ভঙ্গ করার অধিকার রয়েছে।”(ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ;আল-ইখতিয়ারাত আল-ফিকহিয়্যা; পৃষ্ঠা: ২০৯)
.
সৌদি আরবের প্রথম গ্র্যান্ড মুফতি, ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম আলুশ শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৩৮৯ হি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:একজন মহিলাকে একজন পুরুষ প্রস্তাব দেয়, এবং মহিলাটি শর্ত করে যে সে ধূমপান করবে না, পুরুষটি তাতে রাজি হয় এবং মহিলা তাকে বিবাহ করে। পরে মহিলা জানতে পারে যে পুরুষটি ধূমপান করে, এখন তার কী করা উচিত?
তিনি উত্তর দেন:الحمد لله . إذا كان الأمر كما ذكر فإن للمرأة المذكورة الخيار في فسخ نكاحها منه ، أو البقاء معه “আলহামদুলিল্লাহ।যদি বিষয়টি যেমন উল্লেখ করা হয়েছে তেমনই হয়, তবে উল্লেখিত মহিলার অধিকার রয়েছে যে সে তার স্বামীর সঙ্গে বিবাহ বাতিল করতে পারে, অথবা স্বামীর সাথে থেকে যেতে পারে।”(ফাতাওয়া আশ-শাইখ মুহাম্মদ বিন ইব্রাহীম” খণ্ড: ১০; পৃষ্ঠা: ১৪৯)
.
ইমাম ইবনু উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “কিছু মহিলা বিবাহের প্রস্তাবের সময় তার স্বামীর কাছে চাকরানী রাখার শর্ত আরোপ করে। এই শর্তটি কি বৈধ? চাকরানীর বিষয়টি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করলে আমি কৃতজ্ঞ থাকব এটি কখন বৈধ হবে এবং কোন প্রয়োজন বা পরিস্থিতিতে অনুমোদিত? এছাড়াও, এই শর্ত কার্যকর হবে কি হবে না? একইভাবে, যদি কেউ বিবাহের সময় শিক্ষকতা বা চাকুরির শর্ত আরোপ করে, এবং ভবিষ্যতে এই শর্ত বিবাহবিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, তখন তার বৈধতা কেমন হবে?”
উত্তরে শাইখ বলেন:
ثبت في الحديث الصحيح عن النبي صلى الله عليه وآله وسلم أنه قال: (إن أحق الشروط أن توفوا بها ما استحللتم به الفروج) ومن المعلوم أن الوفاء بالشروط المذكورة في العقود واجب؛ لقول الله تعالى: (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ) [المائدة:1] ولقوله: (وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولاً) [الإسراء:34].فإذا اشترطت المرأة على الزوج شروطاً غير ممنوعة شرعا وجب عليه الوفاء بها، فإن لم يف بها فلها الفسخ ، أي: يكون الأمر بيدها، ومن ذلك إذا اشترطت عليه أن تبقى مدرسة ، أو أن تبقى طالبة ، والتزم بهذا الشرط ؛ فإنه يجب عليه الوفاء بذلك ، ولا يحل له أن يترك الوفاء به .فإن ترك الوفاء به ، ورغبت في الفسخ ، فلها حق الفسخ؛ لأنه لم يف بالشرط.وأما ما يتعلق بالخادم ، فأنا لا أحبذ جلب الخدم إلا عن الضرورة ، فإذا كان هناك ضرورة ، فلا بأس أن يأتي بالخادم .ولكن يلاحظ أنه لا بد من حضور محرمها معها؛ لقول النبي صلى الله عليه وسلم: (لا تسافر امرأة إلا مع ذي محرم) فإذا قال صاحب البيت: ماذا أصنع بمحرمها؟ ليس عندي له شغل؟ قلنا: من الممكن أن يخدمك في البيت بشراء الحوائج اليومية أو غير ذلك ، ومن الممكن أن تدعه حتى هو بنفسه يتكسب ويحصل خيراً لك وله ، المهم ألا تأتي بخادم إلا ومعها محرم “
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহ হাদীসে প্রমাণিত আছে যে তিনি বলেছেন:(শর্তসমূহের মধ্যে যা পূর্ণ করার সর্বাধিক দাবী রাখে তা হল সেই শর্ত যার দ্বারা তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের হালাল করেছ।”(সহীহ বুখারী হা/২৭২১) এবং এটা জানা কথা যে চুক্তিতে উল্লিখিত শর্তগুলো পূরণ করা ফরজ; মহান আল্লাহর বাণীর কারণে: (হে ইমানদারগণ! তোমরা চুক্তিসমূহ পূর্ণ কর) [আল-মায়িদাহ: ১], এবং তাঁর বাণী: আর অঙ্গীকার পূর্ণ কর, নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” [আল-ইসরা:৩৪] অতএব, যদি মহিলা স্বামীর কাছে শরীয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ নয় এমন শর্ত আরোপ করেন, তবে স্বামীর উপর তা পূরণ করা আবশ্যক। যদি তিনি (স্বামী) তা পূরণ না করেন, তবে তার (স্ত্রীর) বিবাহ ভঙ্গ করার অধিকার রয়েছে, অর্থাৎ সিদ্ধান্তটি তার হাতে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, যদি তিনি শিক্ষক বা ছাত্রী থাকার শর্ত করেন এবং স্বামী এই শর্ত মেনে নেন; তবে তার উপর তা পূরণ করা অবশ্যই করণীয়, এবং তা পূরণ না করা তার জন্য বৈধ নয়।যদি তিনি শর্ত পূরণ না করেন, এবং মহিলা বিবাহ ভঙ্গ করতে চান, তবে তার বিবাহ ভঙ্গ করার অধিকার রয়েছে; কারণ স্বামী শর্ত পূরণ করেননি। আর চাকর-এর বিষয়ে, আমি কেবল প্রয়োজনের সময় ছাড়া দাস/চাকর রাখার পক্ষে নই। যদি কোনো প্রয়োজন থাকে, তবে চাকর/চাকরানী রাখাতে কোনো সমস্যা নেই।তবে এটি মনে রাখতে হবে যে তার সাথে অবশ্যই একজন মাহরাম থাকতে হবে; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (কোনো মহিলা যেন মাহরাম ছাড়া সফর না করে)। যদি বাড়ির মালিক বলেন: আমি তার মাহরামকে দিয়ে কী করব? আমার তার জন্য কোনো কাজ নেই? আমরা বলব:সম্ভব হলে সে বাড়ির দৈনন্দিন কাজ যেমন জিনিসপত্র কেনা বা অন্যান্য সহায়তা করতে পারে। এছাড়াও, তাকে নিজের আয়ের সুযোগ দেওয়া যায়, যা উভয়ের জন্য উপকারী। মোট কথা: মাহরাম ছাড়া কোনো চাকরানী আনা নিষিদ্ধ।”(ইবনু উসাইমীন আল-লিক্বাউশ শাহরী, লিক্বা নং-৯/১২)
.
পাশাপাশি এটি জানা প্রয়োজন যে, স্বামী যদি এ শর্ত ভঙ্গ করেন, তবে শুধু এতটুকু কারণে স্ত্রী স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাকপ্রাপ্ত হবেন না। বরং এ অবস্থায় স্ত্রীর জন্য বিবাহ বিচ্ছেদের (ফাসখ) অধিকার প্রমাণিত হয়। এরপর তিনি চাইলে বিচ্ছেদ গ্রহণ করতে পারেন, অথবা শর্ত ত্যাগ করে স্বামীর কাজে সন্তুষ্ট থেকে তার স্ত্রী হিসেবেই থাকতে পারেন।
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.]
বলেছেন:
“من الشروط الصحيحة في النكاح : إذا شرطت عليه أن لا يتزوج عليها ، فإن وفّى ، وإلا فلها الفسخ ؛ لحديث : ( أَحَقُّ الشُّرُوطِ أَنْ تُوفُوا بِهِ مَا اسْتَحْلَلْتُمْ بِهِ الْفُرُوجَ ) .
وكذا لو شرطت أن لا يفرق بينها وبين أولادها أو أبويها ؛ صح هذا الشرط ، فإن خالفه ؛ فلها الفسخ .
ولو اشترطت زيادة في مهرها ، أو كونه من نقد معين ؛ صح الشرط ، وكان لازما ، ويجب عليه الوفاء به ، ولها الفسخ بعدمه ، وخيارها في ذلك على التراخي ، فتفسخ متى شاءت ؛ ما لم يوجد منها ما يدل على رضاها ، مع علمها بمخالفته لما شرطته عليه ؛ فحينئذ يسقط خيارها .
قال عمر بن الخطاب رضي الله عنه للذي قضى عليه بلزوم ما شرطته عليه زوجته ، فقال الرجل : إذاً يطلقننا ؟!
فقال عمر : مقاطع الحقوق عند الشروط . ولحديث : (الْمُؤْمِنُونَ عَلَى شُرُوطهمْ) .
قال العلامة ابن القيم : “يجب الوفاء بهذه الشروط التي هي أحق أن يوفيها ، وهو مقتضى الشرع والعقل والقياس الصحيح ؛ فإن المرأة لم ترض ببذل بضعها للزوج إلا على هذا الشرط ، ولو لم يجب الوفاء به ؛ لم يكن العقد عن تراض ، وكان إلزاماً بما لم يلزمها الله به ورسوله “
“বিবাহের সঠিক শর্তাবলীর মধ্যে একটি হলো: যদি স্ত্রী স্বামীর উপর অন্য বিবাহ না করার শর্ত আরোপ করেন, তবে যদি স্বামী তা পূরণ করেন (তো ভালো), অন্যথায় স্ত্রীর বিচ্ছেদ (ফাসখ) করার অধিকার রয়েছে; কারণ হাদীসে এসেছে: ‘(যে শর্তগুলো পূরণ করা তোমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী, তা হলো সেই শর্ত যার দ্বারা তোমরা যৌনাঙ্গকে হালাল করেছ)’। অনুরূপভাবে, যদি স্ত্রী শর্ত আরোপ করেন যে স্বামী তাকে তার সন্তানাদি বা তার পিতা মাতা থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন না, তবে এই শর্তটিও সঠিক হবে। যদি স্বামী তা লঙ্ঘন করেন; তবে স্ত্রীর বিচ্ছেদ (ফাসখ) করার অধিকার রয়েছে। যদি তিনি তার মোহরের মধ্যে কোনো বৃদ্ধি বা নির্দিষ্ট কোনো নগদ অর্থ শর্ত করেন; তবে শর্তটি সঠিক হবে এবং তা বাধ্যতামূলক হবে, এবং স্বামীর উপর তা পূরণ করা অবশ্য কর্তব্য হবে।স্বামী যদি এটি পূরণ না করেন,তাহলে স্ত্রীর জন্য বিচ্ছেদ (ফাসখ) করার অধিকার থাকবে,তবে এই অধিকারটি স্থগিত থাকবে,অর্থাৎ, স্ত্রীর ইচ্ছানুযায়ী যখন খুশি তা প্রয়োগ করতে পারবেন। কিন্তু যদি স্ত্রীর পক্ষ থেকে এমন কোনো আচরণ লক্ষ্য করা যায় যা স্বামীর প্রতি তার সন্তুষ্টি প্রকাশ করে,অথচ তিনি স্বামীর শর্ত লঙ্ঘনের বিষয়টি অবগত; তবে সে ক্ষেত্রে তার অধিকারটি বাতিল হয়ে যাবে।উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এক ব্যক্তিকে বলেছেন, যিনি তার স্ত্রীর আরোপিত শর্তের পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন:”তবে কি তারা আমাদের তালাক দিয়ে দেবে?” উমার (রাঃ) বললেন:”শর্ত পূরণের মাধ্যমে অধিকারের সমাপ্তি ঘটে।” এছাড়া হাদীসে এসেছে:“মুমিনগণ তাদের শর্তাবলীর প্রতি অটল থাকে।” আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:”এই শর্তগুলো পূরণ করা অবশ্যক, কারণ এটি সবচেয়ে উপযোগী এবং শরীয়ত, যুক্তি ও সঠিক কিয়াসের (অনুমানের) দাবি; কারণ নারী এই শর্তের উপর সম্মতি ছাড়া স্বামীর কাছে তার যৌন অধিকার সমর্পণ করতে রাজি হননি। যদি এই শর্ত পূরণ করা ওয়াজিব না হতো, তবে চুক্তিটি পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে হতো না এবং এটি এমন কিছু চাপিয়ে দেওয়া হতো যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল নারীর উপর বাধ্যতামূলক করেননি।”(ইমাম সালেহ আল-ফাওযান; ‘আল-মুলাখখাস আল-ফিকহী’ খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩৪৫-৩৪৬)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

যে বিষয় সম্পর্কে আপনার সঠিক জ্ঞান নেই সে বিষয়ের পিছনে পড়ে থাকবেন না

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর,আল্লাহ্‌ তাআলা বলছেন:( وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا )“আর যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তার অনুসরণ করো না; কান, চোখ, হৃদয় এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।”(সূরা বনী ইসরাঈল: ৩৬)

.
উল্লেখিত আয়াত (وَلَا تَقْفُ) শব্দটির সঠিক অর্থ, পিছু নেয়া,অনুসরণ করা। সে হিসেবে আয়াতের অর্থ হবে:যা তুমি জানো না, তা সম্পর্কে কিছু বলো না বা অভিযোগ করো না। একজন ব্যক্তির যে বিষয় সঠিক জ্ঞান নেই সে বিষয়ে কথা বলাকে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে সবচেয়ে বড় গুনাহের মধ্যে গণ্য করা হয়েছে।যেমন বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা আর পাপ এবং অসংগত বিরোধিতা এবং কোন কিছুকে আল্লাহর শরীক করা—যার কোন সনদ তিনি পাঠাননি, এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না।”(আল-আরাফঃ ৩৩] অনুরূপভাবে ধারণা করে কথা বলাও এর অন্তর্ভুক্ত। কুরআন ও হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনায় ধারনা করে কথা বলা সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। মহান আল্লাহ বলেন, “তোমরা বিবিধ ধারনা করা থেকে বেঁচে থাক; কেননা কোন কোন ধারনা করা গুনাহের পর্যায়ে পড়ে।” [সূরা আলহুজুরাতঃ ১২] হাদীসে এসেছে, “তোমরা ধারনা করা থেকে বেঁচে থাক; কেননা ধারনা করে কথা বলা মিথ্যা কথা বলা৷”সহীহ বুখারী হা/ ৫১৪৩, মুসলিম হা/২৫৬৩)
.
উক্ত আয়াতের তাফসিরে ইমাম মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানক্বীতি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
نهى جل وعلا في هذه الآية الكريمة عن اتباع الإنسان ما ليس له به علم، ويشمل ذلك قوله: رأيت، ولم ير. وسمعت، ولم يسمع، وعلمت، ولم يعلم. ويدخل فيه كل قول بلا علم، وأن يعمل الإنسان بما لا يعلم، وقد أشار جل وعلا إلى هذا المعنى في آيات أخر “
“মহান ও মহিমান্বিত আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা এই মহৎ আয়াতে মানুষকে নিষেধ করেছেন এমন কিছুর অনুসরণ করা থেকে যে বিষয়ে তার কোনো (নিশ্চিত) জ্ঞান নেই। এর অন্তর্ভুক্ত হলো: কেউ বলল ‘আমি দেখেছি’, অথচ সে দেখে নি; ‘আমি শুনেছি’, অথচ সে শোনে নি; ‘আমি জেনেছি’, অথচ সে জানে নি। এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসে প্রতিটি কথা যা অজ্ঞতার ভিত্তিতে বলা হয়, এবং প্রতিটি কাজ যা অজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে করা হয়। আর মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা কুরআনের অন্যান্য আয়াতেও এ একই অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।”
(আদ্বওয়াউল বায়ান; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৬৮২)
.
আয়াতটি থেকে মূল শিক্ষা হলো: অজানা বিষয় সম্পর্কে কথা বলা, অনুমান করে বলা বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া কবিরাহ গুনাহের মধ্যে পড়ে। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
_________________
✍️জুয়েল মাহমুদ সালাফি

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইলমের শহর ও আলী তার দরজা এই বর্ননার সনদ কি হাসান

ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইলমের শহর ও আলী (রা.) তার দরজা”।’ এ কথাটি আমাদের সমাজে বিভিন্ন ওয়াজ-মাহফিলে পথভ্রষ্ট বক্তাদের মুখে শোনা যায়। এমনকি কিছু ইসলামি বই-পুস্তকেও উল্লেখ করা হয় এবং সাধারণ মানুষও মাঝে মাঝে উদ্ধৃত করে। অথচ দুঃখজনকভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বক্তা বা লেখক এ কথাটি রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে প্রমাণিত কি না তার সত্যতা যাচাই করেন না।এতে কোনো সন্দেহ নাই যে, প্রখ্যাত সাহাবী আলী ইবনু আবি তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের একজন, হেদায়েতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের অন্তর্ভুক্ত এবং ইসলামের চতুর্থ খলিফা। তিনি এমন মহৎ সাহাবি, যাকে প্রকৃত মুমিন ছাড়া কেউ আন্তরিকভাবে ভালোবাসতে পারে না, আর মুনাফিক ছাড়া কেউ ঘৃণা করতে পারে না।তবে মনে রাখা জরুরি আলী (রা.) কিংবা অন্য কোনো নেককার বান্দার মর্যাদা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ যেভাবে নির্ধারণ করেছেন, তার বাইরে গিয়ে অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরা শরিয়তে অনুমোদিত নয়। কারণ, সৎকর্মশীলদের প্রতি ভালোবাসায় বাড়াবাড়ি মানুষকে বিদ‘আতে নিমজ্জিত করে এবং শেষ পর্যন্ত শিরকের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয় যেমনটা ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ ﷺ স্পষ্ট সতর্ক করে দিয়েছেন:“তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি থেকে সাবধান হও। নিশ্চয়ই পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছিল তাদের এই বাড়াবাড়ির কারণেই।”(সুনানে নাসায়ি হা/৩০৫৭, ইবনে মাজাহ হা/ ৩০২৯; ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদিসটি সহিহ বলেছেন)
.
❑ নিম্নে মূল হাদিস, তার উৎস এবং মান সম্পর্কে জগদ্বিখ্যাত হাদিস বিশারদগণের মতামত তুলে ধরা হলো:
.
যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুফাসসিরকুল শিরোমণি, উম্মাহ’র শ্রেষ্ঠ ‘ইলমী ব্যক্তিত্ব, সাহাবী ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) [মৃত: ৬৮ হি.] থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أَنَا مَدِينَةُ الْعِلْمِ وَعَلِيٌّ بَابُهَا ، فَمَنْ أَرَادَ الْعِلْمَ فَلْيَأْتِهِ مِنْ بَابِهِ
“আমি হলাম, ইলম বা জ্ঞানের শহর আর আলি তার দরজা। যে ব্যক্তি ইলম অর্জনের ইচ্ছে করে সে যেন তার দরজা দিয়ে প্রবেশ করে।” অর্থাৎ আলি রা. এর সূত্রে ইলম অর্জন করে।”(বর্ননাটির উৎস: আল মুজামুল কাবীর, হা/১১০৬১, মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪৬৩৭, ইবনে হিব্বান তার মাজরুহিন কিতাবে, ১/১৩০, ইবনে আদি তার তারিখ কিতাবে ৩/৬৫৫, উকাইলি তার যুয়াফা কিতাবে, ৩/১৪৯, কানযুল উম্মাল, হা/৩২৮৯০, সুনানে তিরমিজি/৩৭২৩ ইত্যাদি।]
.
তাহক্বীক: এই বর্ণনাটি বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখিত হলেও তার কোনো সূত্রই সহীহ নয়; বরং অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে এটি হাদীসের নামে রটানো মিথ্যা ও বানোয়াট। ইমাম বুখারী, আবু হাতিম, ইয়াহিয়া বিন সায়ীদ,যাহাবি (রাহিমাহুল্লাহ) প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ হাদিসটিকে ভিত্তিহীন ও জাল বলে উল্লেখ করেছেন।(বিস্তারিত জানতে দেখুন:ইবনুল জাওযী, আল-মাউদূ‘আত ১/২৬১-২৬৫; সুয়ূতী, আল-লাআলী ১/৩২৮-৩৩৬; মোল্লা আলী কারী, আল-আসরার, ৭১-৭২ পৃষ্ঠা নং ২৫১, সাখাবী, আল-মাকাসিদ, পৃষ্ঠা নং ১১৪-১১৬, যারকানী, মুখতাসারুল মাকাসিদ, পৃষ্ঠা নং ৬৯)
.
আমরা এখানে কয়েকজনের কথা উল্লেখ করছি’ যেমন: উকাইলী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:لَا يَصِحُّ فِي هَذَا الْمَتْنِ حَدِيثٌ “এই মর্মে কোনো হাদীসই সহীহ নয়।”(আয যু‘আফা; ৩/১৪৯)
.
ইবনুল কায়সারানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:هَذَا الْحَدِيثُ مِمَّا ابْتَكَرَهُ أَبُو الصَّلْتِ الهروي، وَالْكَذَبَةُ عَلَى مِنْوَالِهِ نَسَجُوا “এই হাদীসটি আবুস সালাত হারাউয়ি নিজেই উদ্ভাবন করেছে, আর মিথ্যাবাদীরা তার ধারা অনুসরণ করে রচনা করেছে।”(তাযকিরাতুল হুফফায পৃষ্ঠা: ১৩৭)
.
আবু বকর ইবনুল আরাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:هُوَ حَدِيثٌ بَاطِلٌ، النَّبِيُّ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – مَدِينَةُ عِلْمٍ وَأَبْوَابُهَا أَصْحَابُهَا؛ وَمِنْهُمْ الْبَابُ الْمُنْفَسِحُ، وَمِنْهُمْ الْمُتَوَسِّطُ عَلَى قَدْرِ مَنَازِلِهِمْ فِي الْعُلُومِ “এটি একটি বাতিল হাদীস। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন জ্ঞানের নগরী, আর তার দরজাগুলো হলেন সাহাবীগণ। তাঁদের মধ্যে আছেন কেউ প্রশস্ত দরজার মতো, আবার কেউ আছেন মধ্যম অবস্থায় তাদের জ্ঞানে অবস্থান অনুযায়ী।” (আহকামুল কুরআন; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৮৬)
.
ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:ذكر هذا الحديث ابن الجوزي في الموضوعات من طرق عدة، وجزم ببطلان الكل، وتابعه الذهبي وغيره”এই হাদীসটিকে ইবনুল জাওযী একাধিক সূত্রসহ আল‌ মাওযু‘আত‌ এ উল্লেখ করেছেন এবং সবকিছুরই বাতিল হওয়া নিশ্চিত করেছেন।ইমাম যাহাবী ও অন্যান্যরাও তাকে সমর্থন করেছেন।” (ফাওয়িদুল মাজমুআহ পৃষ্ঠা: ৩৪৯)
.
ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর আয যুআফাহ (হাদীস নং ২৯৫৫)-এ বলেছেন: “মাওযুআ (অর্থাৎ জাল হাদীস)। এ হাদীসটি তিরমিযী তাঁর সুনান (৩৭২৩) এ আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে মারফূ‘ আকারে এ বর্ণনায় এনেছেন: সুনান (৩৭২৩) কিন্তু ইমাম তিরমিযী এর পরেই মন্তব্য করেছেন: “এটি একটি গরীব (অপরিচিত) ও মুনকার (মনগড়া) হাদিস। তিনি আর আল ইলাল গ্রন্থে তিনি বলেছেন:سَأَلْتُ مُحَمَّدًا – يعني البخاري – عَنْهُ فَلَمْ يَعْرِفْهُ, وَأَنْكَرَ هَذَا الْحَدِيثَ “আমি মুহাম্মাদকে (অর্থাৎ ইমাম বুখারীকে) এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি একে চিনতে পারেননি এবং এ হাদীসটিকে অস্বীকার করেছেন।”(আল ইলাল পৃষ্ঠা: ৩৭৫)
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:
وَأَمَّا حَدِيثُ ( أَنَا مَدِينَةُ الْعِلْمِ ) فَأَضْعَفُ وَأَوْهَى ، وَلِهَذَا إنَّمَا يُعَدُّ فِي الْمَوْضُوعَاتِ الْمَكْذُوبَاتِ وَإِنْ كَانَ التِّرْمِذِيُّ قَدْ رَوَاهُ . وَلِهَذَا ذَكَرَهُ ابْنُ الْجَوْزِيِّ فِي الْمَوْضُوعَاتِ وَبَيَّنَ أَنَّهُ مَوْضُوعٌ مِنْ سَائِرِ طُرُقِهِ . وَالْكَذِبُ يُعْرَفُ مِنْ نَفْسِ مَتْنِهِ ؛ لَا يَحْتَاجُ إلَى النَّظَرِ فِي إسْنَادِهِ : فَإِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إذَا كَانَ مَدِينَةَ الْعِلْمِ ، لَمْ يَكُنْ لِهَذِهِ الْمَدِينَةِ إلَّا بَابٌ وَاحِدٌ ، وَلَا يَجُوزُ أَنْ يَكُونَ الْمُبَلِّغُ عَنْهُ وَاحِدًا ؛ بَلْ يَجِبُ أَنْ يَكُونَ الْمُبَلِّغُ عَنْهُ أَهْلَ التَّوَاتُرِ الَّذِينَ يَحْصُلُ الْعِلْمُ بِخَبَرِهِمْ لِلْغَائِبِ ، وَرِوَايَةُ الْوَاحِدِ لَا تُفِيدُ الْعِلْمَ إلَّا مَعَ قَرَائِنَ ، وَتِلْكَ الْقَرَائِنُ إمَّا أَنْ تَكُونَ مُنْتَفِيَةً ، وَإِمَّا أَنْ تَكُونَ خَفِيَّةً عَنْ كَثِيرٍ مِنْ النَّاسِ ، أَوْ أَكْثَرِهِمْ ؛ فَلَا يَحْصُلُ لَهُمْ الْعِلْمُ بِالْقُرْآنِ وَالسُّنَّةِ الْمُتَوَاتِرَةِ ؛ بِخِلَافِ النَّقْلِ الْمُتَوَاتِرِ: الَّذِي يَحْصُلُ بِهِ الْعِلْمُ لِلْخَاصِّ وَالْعَامِّ. وَهَذَا الْحَدِيثُ إنَّمَا افْتَرَاهُ زِنْدِيقٌ أَوْ جَاهِلٌ: ظَنَّهُ مَدْحًا؛ وَهُوَ مُطْرِقُ الزَّنَادِقَةِ إلَى الْقَدْحِ فِي عِلْمِ الدِّينِ – إذْ لَمْ يُبَلِّغْهُ إلَّا وَاحِدٌ مِنْ الصَّحَابَةِ .ثُمَّ إنَّ هَذَا خِلَافُ الْمَعْلُومِ بِالتَّوَاتُرِ؛ فَإِنَّ جَمِيعَ مَدَائِنِ الْمُسْلِمِينَ : بَلَغَهُمْ الْعِلْمُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ غَيْرِ طَرِيقِ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ “
“আর ‘আমি জ্ঞানের নগরী’ হাদিসটি অত্যন্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর;এই কারণেই এটিকে কেবল জাল ও মিথ্যা হাদিস হিসেবেই গণ্য করা হয়, যদিও তিরমিযি এটি বর্ণনা করেছেন। এই কারণেই ইবনুল জাওযি এটিকে তার ‘আল-মাওযু’আত’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন এবং দেখিয়েছেন যে এটি এর সকল সূত্রেই জাল। এর মিথ্যাবাদিতা মূল টেক্সট (মাতন) থেকেই বোঝা যায়; এজন্য এর সনদ যাচাই করারও প্রয়োজন পড়ে না; কারণ, যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘জ্ঞানের নগরী’ হন, তবে এই নগরীর কেবল একটি দরজা থাকা যুক্তিসঙ্গত নয়।তদুপরি, তাঁর পক্ষ থেকে দীন প্রচারের দায়িত্বও একজন মাত্র সাহাবীর ওপর সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; বরং আবশ্যক হলো তাঁর থেকে জ্ঞান প্রচারকারীরা হতে হবে তাওয়াতুরের পর্যায়ে পৌঁছানো বর্ণনাকারীগণ, যাদের খবরের মাধ্যমে অনুপস্থিত লোকদের নিকটও নিশ্চিত জ্ঞান পৌঁছে যায়। কেবল একজনের বর্ণনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত জ্ঞান দেয় না; বরং তা কেবল তখনই কার্যকর হয়, যখন বিশেষ কিছু আলামত যুক্ত থাকে। কিন্তু অনেক সময় সেই আলামতগুলো অনুপস্থিত থাকে, অথবা সেগুলো অধিকাংশ মানুষের কাছেই গোপন থেকে যায়। ফলে কুরআন ও সুন্নাহ মুতাওয়াতির (যা ব্যাপক সংখ্যক রাবী দ্বারা বর্ণিত) দ্বারা যে নিশ্চিত জ্ঞান পাওয়া যায়, তা এভাবে পাওয়া যায় না। এই হাদিসটি কোনো যিন্দীক (নাস্তিক) অথবা মূর্খ ব্যক্তিই রচনা করেছে—যে ভেবেছিল এটিকে নবী (ﷺ)-এর প্রশংসা হিসেবে উপস্থাপন করছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে এটি নাস্তিকদের জন্য দ্বীনের জ্ঞানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পথ খুলে দিয়েছে কারণ, এর দ্বারা বোঝানো হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে কেবল একজন সাহাবীই জ্ঞান প্রচার করেছেন। তাছাড়া এটি তো তাওয়াতুর দ্বারা প্রমাণিত সত্যেরও পরিপন্থী। কেননা সমগ্র মুসলিম জনপদে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে জ্ঞান পৌঁছেছে কেবল আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মাধ্যমেই নয়, বরং বহু অন্যান্য সাহাবীর বর্ণনার মাধ্যমেও।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৪১০-৪১১)
.
পরিশেষে, প্রিয় পাঠক উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইলমের শহর ও আলী (রা.) তার দরজা” এই বর্ণনার সনদ হাসান নয়; বরং অত্যন্ত দুর্বল কিংবা জাল। সম্ভবত আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহুর)-এর মর্যাদা ও মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে শিয়ারা এই হাদিসটি তৈরি করেছে। এমনকি এ উদ্দেশ্যে উক্ত হাদিস ছাড়াও তারা আরও বহু হাদিস তৈরি করেছে। প্রকৃতপক্ষে আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) অত্যন্ত মর্যাদাবান সাহাবি। তার মান-সম্মান প্রমাণের জন্য বহু বিশুদ্ধ হাদিস বিদ্যমান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সেগুলোই যথেষ্ট। সুতরাং এ জন্য কোনও জাল ও ভিত্তিহীন হাদিসের আদৌ প্রয়োজন নেই। আল্লাহ তাআলা জাল হাদিস রচনাকারীদেকে তাদের উপযুক্ত পাওনা বুঝিয়ে দিন। সুতরাং এই অপ্রমাণিত জাল ও বানোয়াট হাদিস সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করার উদ্দেশ্য ছাড়া তা বর্ণনা করা ও প্রচার করা হারাম ও কবিরা গুনাহ। কারণ জেনে-বুঝে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা/জাল হাদিস বর্ণনা করার পরিণতি জাহান্নাম। তাই তো রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বানোয়াট হাদিস বর্ণনার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী‎ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّداً فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত ভাবে আমার উপর মিথ্যা রোপ করল (মিথ্যা হাদিস বর্ণনা করল), সে যেন জাহান্নামে নিজের ঠিকানা করে নিলো।”(সহিহ বুখারী হা/ ৩৪৬১ মিশকাত হা/১৯৮) অপর বর্ননায় মুগীরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন,আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, يَقُولُ إِنَّ كَذِبًا عَلَيَّ لَيْسَ كَكَذِبٍ عَلَى أَحَدٍ مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنْ النَّارِ . আমার প্রতি মিথ্যারোপ করা অন্য কারো প্রতি মিথ্যারোপ করার মত নয়। যে ব্যক্তি আমার প্রতি মিথ্যারোপ করে সে যেন অবশ্যই তার ঠিকানা জাহান্নামে করে নেয়।”(সহীহ বুখারী হা/১২৯১, মুসলিম হা/৯৩৩)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:

জুয়েল মাহমুদ সালাফি। 

সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ তুসতারী রাহিমাহুল্লাহ এর কিছু নাসীহাহ

 1: সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ তুসতারী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত:২৮৩ হি.] বলেন, النَّاسُ كُلُّهُمْ سُكَارَى إِلَّا الْعُلَمَاءُ، وَالْعُلَمَاءُ كُلُّهُمْ حَيَارَى إِلَّا مَنْ عَمِلَ بِعِلْمِهِ، “আলেমগণ ছাড়া সকল মানুষ দিকভ্রান্ত। আর অর্জিত ইলম অনুযায়ী আমলকারী ছাড়া সকল আলেম দিশেহারা”।(আব্দুর রঊফ মুনাভী,ফায়যুল ক্বাদীর (মিসর: আল-মাকাবাতুত তিজারিইয়াহ আল-কুবরা, ১ম মুদ্রণ, ১৩৫৬হি.) ৫/৫১০) . এখানে সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ তুসতারী (রাহিমাহুল্লাহ) মানুষের জ্ঞান, অন্তরের অবস্থা ও আমলের পারস্পরিক সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মর্ম হলো—অধিকাংশ মানুষ দুনিয়ার মোহ, লোভ, কামনা-বাসনা ও নফসের খেয়ালের পেছনে ছুটতে ছুটতে প্রকৃত সত্য থেকে বিমুখ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় তারা হয়ে যায় মাতালের মতো—যারা না বাস্তবতাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারে, না সঠিক পথে অগ্রসর হতে সক্ষম হয়।কিন্তু আলেমগণ সাধারণ মানুষের তুলনায় অধিকতর সচেতন। তারা হক ও বাতিল, সত্য ও মিথ্যার ব্যবধান চিনতে পারে। তবুও কেবল জ্ঞান অর্জনই যথেষ্ট নয়; কারণ অনেক আলেমও দুনিয়ার চাপ, মতবিরোধ কিংবা অহংকারের কারণে পথ হারিয়ে ফেলতে পারেন।অতএব, প্রকৃত সফল আলেম তারা-ই, যারা প্রাপ্ত জ্ঞানকে আমলে রূপান্তরিত করে আল্লাহভীতির সাথে জীবন গড়ে তোলে। তারাই সত্যিকার অর্থে হেদায়াতপ্রাপ্ত; তারা বিভ্রান্ত মাতালের মতো নয়, বরং আল্লাহর সান্নিধ্যে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে অটল যাত্রী। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।

দ্বিতীয় বিবাহের ক্ষেত্রে কি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া আবশ্যক

 প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিবাহের ক্ষেত্রে কি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া আবশ্যক? যদি কেউ বলেন যে প্রথম স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ বৈধ নয়, তাহলে এই বিষয়ে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর:
.
প্রথমত দ্বিতীয় বিবাহ করার সময় প্রথম স্ত্রী থেকে অনুমতি নেওয়া আবশ্যক কিনা তা দুইটি ভিন্ন পরিস্থিতিতে বিবেচনা করা যেতে পারে।
.
▪️প্রথম অবস্থা: যদি কোনো নারী প্রথম বিবাহের সময় শর্তারোপ করেন যে, স্বামী জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর অন্য কোনো নারীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন না, কিংবা অন্ততপক্ষে তার অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারবেন না—এবং স্বামী যদি এ শর্ত মেনে নিয়ে তার সাথে বিবাহ সম্পাদন করেন, তাহলে এ শর্তের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা তার দায়িত্ব হবে। অতএব তিনি যদি স্ত্রীর সঙ্গে সমঝোতা ও অনুমতি ব্যতিরেকে দ্বিতীয় বিবাহ করেন, তবে তিনি একদিকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে গুনাহগার হবেন, অন্যদিকে প্রথম স্ত্রীর জন্য বৈবাহিক সম্পর্ক বাতিল (ফাসখ) করার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। ফলে স্ত্রী চাইলে স্বামীর সাথে বসবাস করতে পারেন অথবা বিচ্ছেদ নিতে পারেন। কারণ স্বামী তার চুক্তি লঙ্ঘন করেছেন অথচ পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন:”আর অঙ্গীকার পূর্ণ কর, নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”(সূরা বনি ইসরাইল: ১৭/৩৪)। অপর আয়াতে আল্লাহ বলেন,”হে মুমিনগণ, তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর।”(সূরা মায়েদাহ: ৫/১)।উক্ত আয়াতের তাফসিরে যায়দ ইবনে আসলাম (রহ.) বলেছেন, এখানে ঐসব চুক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যা মানুষ পরস্পরে একে অন্যের সাথে সম্পাদন করে। যেমন বিবাহ-শাদী ও ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি ইত্যাদি। [তাফসীরে বাগভী সূরা মায়েদার ১ নং আয়াতের তাফসির]। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘শর্তসমূহের মধ্যে যা পূর্ণ করার সর্বাধিক দাবী রাখে তা হল- সেই শর্ত যার দ্বারা তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের হালাল করেছ।’(সহীহ বুখারী, হা/২৭২১, ৫১৫১; মুসলিম, হা/১৪১৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৩০৪)।রাসূল (ﷺ) আরো বলেছেন, মুসলিমগণ তাদের পরস্পরের শর্তানুযায়ী কাজ করবে যদি তা হালাল হয়। (মুস্তাদরাক হাকেম হা/২৩১০ সহীহুল জামে‘ হা/৬৭১৫)। রাসূল (ﷺ) আরো বলেছেন, মুসলিমগণ পরস্পরের মধ্যে যে শর্ত করবে, তা অবশ্যই পালন করতে হবে। কিন্তু যে শর্ত ও চুক্তি হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করবে তা জায়েয হবে না।’(আবু দাঊদ হা/৩৫৯৪; তিরমিযী হা/১৩৫২; মিশকাত হা/২৯২৩)।
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,إذا اشترط لها أن لا يخرجها من دارها أو بلدها ، أو لا يسافر بها ، أو لا يتزوج عليها : فهذا يلزمه الوفاء به ، فإن لم يفعل فلها فسخ النكاح ، روي هذا عن عمر وسعد بن أبي وقاص وعمرو بن العاص رضي الله عنهم “যদি পাত্রী তার জন্য শর্ত দেয় যে বিবাহের পর স্বামী তাকে তার বাড়িতে রাখতে হবে অন্য কোথাও নিতে পারবে না, তার সাথে দূরে কোথাও ভ্রমন করবে না।স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করবেনা এবং সে তার সাথে কোন ষড়যন্ত্র করবেনা তাহলে তাকে অবশ্যই তা পূরণ করুন, এবং যদি তিনি তা না করেন, তবে স্ত্রীর বিবাহ বাতিল করার অধিকার রয়েছে।”(ইমাম ইবনে কুদামাহ আল-মুগনী; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৪৮৩)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:إذا اشترطت أن لا يتزوج عليها فإن هذا يجوز .وقال بعض العلماء : إنه لا يجوز ؛ لأنه حجر على الزوج فيما أباح الله له ، فهو مخالف للقرآن : (فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلاثَ وَرُبَاعَ) النساء/3 .فيقال في الجواب على ذلك : هي لها غرض في عدم زواجه ، ولم تعتد على أحد ، والزوج هو الذي أسقط حقه ، فإذا كان له الحق في أن يتزوج أكثر من واحدة ، أسقطه ، فما المانع من صحة هذا الشرط ؟! ولهذا ؛ فالصحيح في هذه المسألة ما ذهب إليه الإمام أحمد رحمه الله من أن ذلك الشرط صحيح“যদি স্ত্রী এই শর্ত আরোপ করেন যে স্বামী তার সঙ্গে বিবাহের বাইরে আর কোনো নারীকে বিবাহ করবেন না, তবে এটি বৈধ। যদিও কিছু আলেম বলেছেন যে এটি বৈধ নয়, কারণ এতে স্বামীকে এমন বিষয়ে বাধ্য করা হয়েছে যা আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য বৈধ। তারা কুরআনের আয়াত উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন:”অতএব তোমরা নারীদের মধ্যে তোমাদের পছন্দমতো বিয়ে করো– দুই, তিন অথবা চারজনকে।”(সূরা নিসা:৩) এই যুক্তির জবাবে বলা যায় যে, বহুবিবাহ না করার বিষয়ে স্ত্রীর আরোপিত শর্তের একটি উদ্দেশ্য রয়েছে এবং এতে তিনি কারও প্রতি কোনো অন্যায় করেননি। বরং স্বামী নিজেই তার বৈধ অধিকার ত্যাগ করেছেন। সুতরাং, যেহেতু স্বামী তার একাধিক স্ত্রীর অধিকার রাখতে পারার ক্ষমতা রাখে, কিন্তু স্বেচ্ছায় তা ত্যাগ করছেন,তাহলে এই শর্তের বৈধ হওয়ার পথে বাধা কোথায়?!অতএব,এই মাসয়ালার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য ও সঠিক মত হলো ইমাম আহমদের (রহঃ) মত: স্ত্রীর দ্বারা আরোপিত এই শর্ত বৈধ ও গ্রহণযোগ্য।”(ইবনু উসাইমীন; আশ-শারহুল মুমতি; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ২৪৩) [এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনাসহ আমরা স্বতন্ত্র একটি আর্টিকেল লিখবো ইনশাআল্লাহ]
.
▪️দ্বিতীয় অবস্থা: যদি কোনো নারী প্রথম বিবাহের সময় এমন কোনো শর্ত আরোপ না করেন যে—স্বামী তাঁর জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর অন্য কোনো নারীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন না—তাহলে দ্বিতীয় বিবাহের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া ওয়াজিব নয়। বরং স্বামী যদি শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম হন, তবে তাঁর জন্য দ্বিতীয় বিবাহ করা বৈধ,এতে কোনো আপত্তি নেই।অতএব, যদি কেউ এ দাবি করেন যে দ্বিতীয় বিবাহের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া আবশ্যক—তাহলে তাঁর দায়িত্ব হলো এ দাবির পক্ষে সুস্পষ্ট শরীয়তসম্মত দলিল উপস্থাপন করা। কেননা, শরীয়তের একটি মূলনীতি হলো: কোনো শর্ত আরোপকারীই তার প্রমাণ পেশ করবে। বিপরীতে, যে ব্যক্তি এ শর্তকে অস্বীকার করেন, তিনি মূলনীতির সাথেই একমত হচ্ছেন। আর মূলনীতি হলো: শর্ত তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তার প্রমাণ পাওয়া যায়; প্রমাণ ছাড়া নয়।কুরআন সুন্নাহ’র একাধিক স্থানে এই মূলনীতির দলিল পাওয়া যায়। এর মধ্যে প্রধান হলো: মহান আল্লাহ বলেন:وَ قَالُوۡا لَنۡ یَّدۡخُلَ الۡجَنَّۃَ اِلَّا مَنۡ كَانَ هُوۡدًا اَوۡ نَصٰرٰی ؕ تِلۡكَ اَمَانِیُّهُمۡ ؕ قُلۡ هَاتُوۡا بُرۡهَانَكُمۡ اِنۡ كُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ
“আর তারা বলে, ইয়াহুদী অথবা নাসারা ছাড়া অন্য কেউ কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না’। এটা তাদের মিথ্যা আশা। বলুন, “যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে তোমাদের প্রমাণ পেশ কর”।(সূরা বাকারা: ১১১) অপর আয়াতে মহান আল্লাহ আরও বলেন:أَمِ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ آلِهَةً ۖ قُلْ هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ ۖ هَٰذَا ذِكْرُ مَن مَّعِيَ وَذِكْرُ مَن قَبْلِي“তারা কি আল্লাহ ছাড়া উপাস্য গ্রহণ করেছে? বলুন: তোমরা তোমাদের প্রমাণ পেশ করো।”(সূরা আম্বিয়া: ২৪) এখানে মূর্তিপূজকদের দাবির খণ্ডনে সরাসরি তাদের কাছ থেকে প্রমাণ চাওয়া হয়েছে।
.
ইমাম তিরমিজি (রাহিমাহুল্লাহ) সুনানে তিরমিজিতে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন যার শিরোনাম হলো;باب مَا جَاءَ فِي أَنَّ الْبَيِّنَةَ عَلَى الْمُدَّعِي وَالْيَمِينَ عَلَى الْمُدَّعَى عَلَيْهِ
অর্থ: “বাদীর দায়িত্ব হচ্ছে সাক্ষ্য-প্রমাণ হাযির করা এবং বিবাদীর দায়িত্ব হচ্ছে শপথ করা। “অতঃপর তিনি হাদিস নিয়ে এসেছেন, আমর ইবনু শুআইব (রাহিমাহুল্লাহ) হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এক ভাষণে বলেছেনঃ:الْبَيِّنَةُ عَلَى الْمُدَّعِي وَالْيَمِينُ عَلَى الْمُدَّعَى عَلَيْهِ “বাদীর দায়িত্ব হচ্ছে সাক্ষী-প্রমাণ হাযির করা এবং বিবাদীর দায়িত্ব হচ্ছে শপথ করা।” (সুনানে তিরমিজি হা/১৩৪১; ইমাম আল-আলবানী ইরওয়ুল গালীল হা/১৯৩৮)
.
সহীহ বুখারীর অপর এক বর্ননায় এসেছে, ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: (لَوْ يُعْطَى النَّاسُ بِدَعْوَاهُمْ لاَدَّعَى نَاسٌ دِمَاءَ رِجَالٍ وَأَمْوَالَهُمْ وَلَكِنَّ الْيَمِينَ عَلَى الْمُدَّعَى عَلَيْهِ) “যদি লোকের দাবি অনুসারে তাদের দিয়ে দেয়া হতো তবে কোন কোন লোক অপর ব্যক্তির জান-মাল দাবি করে বসতো। তাই বিবাদীর জন্য শপথ নেয়ার বিধান রয়েছে।”(সহীহ বুখারী হা/৪৫৫২; সহীহ মুসলিম হা/৪৫৬৭)
.
বিশেষত ইসলামি শরিয়ত সুস্পষ্টভাবে বিবাহসংক্রান্ত বহু শর্ত নির্ধারণ করেছে। কিন্তু সেই শর্তগুলোর কোথাও উল্লেখ নেই যে, দ্বিতীয় বিবাহ করতে হলে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি আবশ্যক। বরং বাস্তবে দেখা যায়,রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একাধিক বিবাহ করেছেন, অথচ কোথাও প্রমাণ পাওয়া যায় না যে তিনি তাঁর স্ত্রীদের কারও অনুমতি নিয়েছিলেন। একইভাবে, সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) একাধিক বিবাহ করেছেন, কিন্তু তাঁদের ক্ষেত্রেও এ ধরনের কোনো অনুমতির শর্তের উল্লেখ নেই।অতএব, শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি সুস্পষ্ট প্রমাণ যে দ্বিতীয় বিবাহ করতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া ফরজ নয়। তবে সন্দেহাতীতভাবে উত্তম ও শোভনীয় হলো—যদি কেউ দ্বিতীয় বিবাহ করতে চায়, তবে সে আগে প্রথম স্ত্রীকে অবহিত করবে এবং তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করবে। কারণ, এতে পারিবারিক শান্তি-সৌহার্দ্য বজায় থাকে এবং পরিণতিও ইতিবাচক হয়। তবে এটিকে ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক বিধান বলা যাবে না।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে যখন দ্বিতীয় বিয়েতে প্রথম স্ত্রীর সম্মতি আবশ্যক কিনা তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তারা উত্তর দিয়েছিলেন:
ليس بفرض على الزوج إذا أراد أن يتزوج ثانية أن يرضي زوجته الأولى ، لكن من مكارم الأخلاق وحسن العشرة أن يطيِّب خاطرها بما يخفف عنها الآلام التي هي من طبيعة النساء في مثل هذا الأمر ، وذلك بالبشاشة وحسن اللقاء وجميل القول وبما تيسّر من المال إن احتاج الرضى إلى ذلك “
“স্বামী যদি দ্বিতীয় বিয়ে করতে চান, তবে প্রথম স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করা তার জন্য ফরয (আবশ্যিক) নয়। তবে এটি নিঃসন্দেহে সদাচরণ ও উত্তম চরিত্রের অংশ যে, স্বামী এমনভাবে তার মনকে প্রফুল্ল করার চেষ্টা করবেন, যাতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্ত্রীর স্বাভাবিক দুঃখ-কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়। আর তা হতে পারে— হাসিমুখে ভালো ব্যবহার, আন্তরিক ও কোমল কথাবার্তা, এবং প্রয়োজনে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু আর্থিক অনুগ্রহ প্রদানের মাধ্যমে।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ৫৩)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “যদি কোনো পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায়, তবে তার কি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া শর্ত? এবং তার অজান্তে বিয়ে করলে তার বিধান কী?
উত্তরে শাইখ বলেন:
أعتقد أنه لو استأذن منها لأبت أن يتزوج ، ولكن ليس من شرط النكاح أن يستأذن الزوجة الأولى بل حتى لو استأذنها وأَبَتْ فله الحق أن يتزوج ، ولكن مع هذا أرى أنه ينبغي أن يشاورها ويقنعها حتى تقتنع بذلك وتطمئن ، ويبين العلة التي من أجلها يريد أن يتزوج ، فإذا جاءتها الزوجة الجديدة جاءتها وهي على اطمئنانٍ بها وعلى علمٍ بها وعلى رضىً بها ، وحينئذٍ يمكن أن تعيش الزوجتان عيشةً حميدة بدون تنافرٍ ولا تباغض ، فمن أجل مراعاة هذه الفوائد ينبغي أن يستأذنها ويخبرها ، وأما أن يكون ذلك واجباً فليس بواجب ” .فسئل الشيخ”: لو أخفى عنها هذا الزواج ؟ فأجاب : ” لا حرج عليه ” .
“আমি মনে করি যে, যদি সে (স্বামী) তার কাছ থেকে (প্রথম স্ত্রীর কাছ থেকে) অনুমতি চাইত, তাহলে হয়তো সে (স্ত্রী) তার (স্বামীর দ্বিতীয়) বিয়েতে অসম্মতি জানাতো। তবে প্রথম স্ত্রীর কাছ থেকে অনুমতি চাওয়া বিবাহের শর্ত নয়; বরং স্বামী অনুমতি চাইলেও এবং সে (স্ত্রী) অসম্মতি জানালেও, তার (স্বামীর) বিয়ে করার অধিকার রয়েছে। তা সত্ত্বেও, আমি মনে করি তার উচিত হবে প্রথম স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করা এবং তাকে বোঝানো, যতক্ষণ না সে এতে সন্তুষ্ট ও আশ্বস্ত হয়। এবং সে যেন সেই কারণও পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করে, যার কারণে সে বিবাহ করতে চায়। ফলে, যখন নতুন স্ত্রী তার কাছে আসবে, তখন সে (প্রথম স্ত্রী) তা জানার পর, আশ্বস্ত মনে ও সন্তুষ্টি সহকারে তাকে গ্রহণ করবে।এর ফলে দুই স্ত্রী শান্তিপূর্ণভাবে, কোনো বিরোধ বা বিদ্বেষ ছাড়া একসাথে জীবনযাপন করতে পারবে। সুতরাং এসব কল্যাণকর ফলাফল অর্জনের জন্য স্বামীর উচিত হবে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি চাওয়া ও তাকে জানানো। কিন্তু একে যে ওয়াজিব (অবশ্য কর্তব্য) বলা যাবে না।”এরপর শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো: “যদি স্বামী দ্বিতীয় বিবাহটি প্রথম স্ত্রীর কাছ থেকে গোপন রাখে? তিনি উত্তর দিলেন: এতে তার উপর কোনো দোষ নেই।”(ইবনু উসাইমীন, ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব, শাইখের ওয়েবসাইট থেকে সংকলি) গৃহীত: ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া নং-২১৮৭৫৯)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

Translate