Tuesday, August 19, 2025

সফর এবং কসর সম্পর্কে বিস্তারিত

 প্রশ্ন: সফর এবং কসর কাকে বলে? সফর কত প্রকার ও কি কি? কতটুকু দূরত্বে সফর করলে সালাত কসর করা বৈধ?

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি। অতঃপর: سفر আরবী এক বচনের শব্দ। বহুবচনে أسفار। আভিধানিক অর্থ হল- ভ্রমণ, যাত্রা, প্রস্থান, রওয়ানা ইত্যাদি। আর যিনি সফর করেন তাকে বলা হয় মুসাফির। ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে সফরের সংজ্ঞা: সফর বলতে একজন ব্যক্তি যখন তার শহরের সীমানা ছেড়ে ৮৮.৭ কিলোমিটার (প্রায় ৮৯ কিমি) বা তার চেয়ে বেশি দূরত্বের ভ্রমণে যায়, তখন তাকে শরীয়ত অনুযায়ী মুসাফির (ভ্রমণকারী) বলা হয়। এ অবস্থায় তার জন্য কিছু বিধান সহজ করা হয়, যেমন: চার রাকাতের ফরজ নামাজ কসর করে দুই রাকাআত পড়া। রোজা রাখা না রাখার অনুমতি ইত্যাদি।
.
সফর বা ভ্রমণের প্রকারভেদ: সফর বা ভ্রমণকে কুরআন-হাদীছের আলোকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়।
(১).হারাম বা নিষিদ্ধ সফর। (২).মাকরূহ বা অপসন্দনীয় সফর। (৩). মুবাহ বা জায়েয সফর।(৪). মুস্তাহাব বা পসন্দনীয় সফর। (৫). ওয়াজিব বা আবশ্যকীয় সফর।
.
(১).হারাম বা নিষিদ্ধ সফর: এটি এমন সফর যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদেশ-নিষেধের বিরোধিতা করে কিংবা শরিয়তে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ কাজ সম্পাদনের উদ্দেশ্যে করা হয়। যেমন: কুরআন ও সহীহ হাদীসে যেসব কাজ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে, সেগুলো করতে কোনো স্থানে গমন করা; অথবা এমন কোনো স্থানে সফর করা, যেখানে মহামারী (plague) শুরু হয়েছে যা শরীয়তে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।রাসূল (ﷺ) বলেন: “যদি তোমরা শুনতে পাও (কোন স্থানে মহামারী আক্রান্ত হয়েছে) তাহ’লে সেখানে যেয়ো না। আর তোমরা যেখানে আছ সেখানে আক্রান্ত হ’লে সেখান থেকে বের হয়ো না”।(বুখারী হা/৫৭২৮-৩০) এছাড়া কোন মহিলার মাহরাম ছাড়া সফর করা। রাসূল (ﷺ) বলেন,”মহিলারা মাহরাম (যার সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ) ব্যতীত অন্য কারো সাথে সফর করবে না। মাহরাম কাছে নেই এমতাবস্থায় কোন মহিলার নিকট কোন পুরুষ গমন করতে পারবে না”।(বুখারী হা/১৮৬২; মুসলিম হা/১৩৪১)
.
(২).মাকরূহ বা অপসন্দনীয় সফর: এটি সেই সফর, যা ইসলামী আদর্শ অনুসরণ না করে সম্পাদিত হয়। যেমন রাতের বেলা একা সফর করা, অথবা তিন জনের বেশি হলে তাদের মধ্য থেকে কাউকে আমীর (দলনেতা) নিযুক্ত না করা।ইবনু ওমর (রাঃ) নবী করীম (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন:”যদি লোকেরা একা সফরে কি ক্ষতি আছে তা জানত, যা আমি জানি, তবে কোন আরোহী রাতে একাকী সফর করত না”।(সহীহ বুখারী হা/২৯৯৮)
.
(৩).মুবাহ বা বৈধ সফর: এমন সফর যা দুনিয়ার বৈধ ও হালাল কাজের উদ্দেশ্যে করা হয় যেমন বিশ্রাম বা মানসিক প্রশান্তির জন্য ভ্রমণ, ব্যবসায়িক প্রয়োজনে সফর, কিংবা কোনো দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে সফর ইত্যাদি।
.
(৪).মুস্তাহাব বা পছন্দনীয় সফর: এটি এমন একটি সফর, যা মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী এবং মসজিদে আকসা-এ সফর করার উদ্দেশ্যে করা হয়। রাসূল (ﷺ) বলেন:”মসজিদুল হারাম, মসজিদুর রাসূল (ছাঃ) এবং মসজিদুল আক্বছা (বাইতুল মাক্বদিস) তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না”।(বুখারী হা/১১৮৯; মুসলিম হা/৮২৭) ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,”উপদেশ গ্রহণের জন্য, পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ধ্বংসাবশেষ ও তাদের স্মৃতিসমূহ দেখার জন্য সফর করা মুস্তাহাব”।(তাফসীরে কুরতুবী, সূরা আন‘আম-১১ নং আয়াতে তাফসীর দ্রষ্টব্য)
.
(৫).ওয়াজিব বা অবশ্যিক সফর: এটি সেই সফর, যা আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কোন নির্দেশ পালনের উদ্দেশ্যে করা হয়। যেমন হজ্জ আদায়ের জন্য মক্কায় সফর করা, কিংবা মুসলিম শাসক যদি জিহাদের নির্দেশ দেন, তবে তার নির্দেশনা পালনার্থে জিহাদের ময়দানে রওনা হওয়া ইত্যাদি। যেমন আল্লাহ বলেন,وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوْكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَّأْتِيْنَ مِنْ كُلِّ فَجٍّ عَمِيْقٍ- ‘আর তুমি জনগণের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা প্রচার করে দাও। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সকল প্রকার (পথশ্রান্ত) কৃশকায় উটের উপর সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত হ’তে’ (সূরা হজ্জ: ২২/২৭)। ফরয ইলম অর্জন করার জন্য যে কোন স্থানে ভ্রমণ করা।রাসূল (ﷺ) বলেন,”কোন ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের জন্য কোন পথ অবলম্বন করলে,আল্লাহ এই অসীলায় তার জন্য জান্নাতের একটি পথ সুগম করে দেন”।(ইবনু মাজাহ হা/২২৩; তিরমিযী হা/২৬৪৬; সহীহুল জামি‘ হা/৬২৯৮)
.
অপরদিকে ক্বসর (قصر) আরবী শব্দ। এর অর্থ সংক্ষিপ্ত করা, কমানো ইতাদি। পারিভাষিক অর্থে চার রাক‘আত বিশিষ্ট সালাত দু’রাক‘আত করে পড়াকে ক্বসর বলে। অর্থাৎ যোহর, আসর ও এশার এই তিন ওয়াক্ত ফরজ সালাত ৪ রাক‘আতের পরিবর্তে ২ রাক‘আত আদায় করা। ফজর ও মাগরিবের সালাতে কছর নেই। সফরে সালাত ক্বসর করা জায়েজ এটি কুরআন-সুন্নাহ এবং সালাফদের ইজমা (সম্মিলিত ঐক্যমত) রয়েছে। কুরআন সুন্নাহ থেকে দলিল হচ্ছে,আল্লাহ তা‘আলা বলেন:وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِي الأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَقْصُرُواْ مِنَ الصَّلاَةِ إِنْ خِفْتُمْ أَن يَفْتِنَكُمُ الَّذِينَ كَفَرُواْ إِنَّ الْكَافِرِينَ كَانُواْ لَكُمْ عَدُوّاً مُّبِيناً-“যখন তোমরা সফর কর, তখন তোমাদের সালাতে ক্বছর করায় কোন দোষ নেই। যদি তোমরা আশংকা কর যে, কাফেররা তোমাদেরকে উত্যক্ত করবে। নিশ্চয়ই কাফেররা তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু”।(সূরা নিসা/১০১)। উক্ত আয়াত থেকে যদিও এই কথা বুঝা যায় যে, কেবল ভয়ের সময় সালাত কসর করা বৈধ, তবুও ভয় ছাড়া নিরাপদ সময়েও কসর করা যায়। মহানবী (ﷺ) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-গণ ভয়-অভয় উভয় অবস্থাতেই কসর করেছেন বলে প্রমাণিত। প্রখ্যাত সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) [মৃত: ৭৩ হি.] বলেন,صَحِبْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَكَانَ لاَ يَزِيدُ فِي السَّفَرِ عَلَى رَكْعَتَيْنِ، وَأَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ وَعُثْمَانَ كَذَلِكَ- رضى الله عنهم‏ “আমি রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম,তিনি সফরে দু’রাক‘আতের অধিক সালাত আদায় করতেন না। আবূ বকর, ওমর ও উসমান (রাঃ)-এরও এই রীতি ছিল।”(সহীহ বুখারী হা/১১০২) অপর বর্ননায় যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ,মুফাসসিরকুল শিরোমণি, সাহাবী ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) [মৃত: ৬৮ হি.] বলেন:فَرَضَ اللَّهُ الصَّلَاةَ عَلَى لِسَانِ نَبِيِّكُمْ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْحَضَرِ أَرْبَعًا وَفِي السَّفَرِ رَكْعَتَيْنِ وَفِي الْخَوْف رَكْعَة “আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের নবী (ﷺ)-এর যবানীতে মুক্বীম অবস্থায় চার রাক‘আত, সফরকালে দু’রাক‘আত এবং ভয়ের সময় এক রাক‘আত সালাত ফরয করেছেন”।(সহীহ মুসলিম হা/৬৮৭; নাসাঈ হা/১৫৩২; মুসনাদে আহমাদ হা/২২৯৩; মিশকাত হা/১৩৪৯)
.
সফর অবস্থায় কসরের বিধান মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা কছর করতেন। তাই কছর করাই উত্তম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কসর হলো সাদাক্বা, যা আল্লাহ তোমাদের জন্য সাদাক্বা করেছেন। সুতরাং তোমরা তার সাদাক্বা গ্রহণ করো’ (সহীহ মুসলিম, হা/৬৮৬)। আর আল্লাহর দেওয়া ছাড় গ্রহণ করাই উত্তম। কিন্তু কেউ কসর না করলে সে সুন্নাত পরিত্যাগ করল, তবে সে গুনাহগার হবে না। আর সফরে সালাত কসর করা জায়েজ এই মর্মে ইজমা বর্ননা করেছেন শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন:قصر الصلاة للمسافر سنة مؤكدة لا ينبغي تركها ، باتفاق الأئمة ، إلا ما يُحكى عن الشافعي في أحد قوليه : أن الإتمام أفضل ، ولكن الصحيح من مذهبه : أن القصر أفضل .وانظر”মুসাফিরের জন্য সালাত কসর করা (চার রাকাআতের সালাত দুই রাকাআত পড়া) একটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা, যা পরিত্যাগ করা উচিত নয় এ বিষয়ে ইমামগণের ঐকমত্য রয়েছে। তবে ইমাম শাফেয়ীর একটি বক্তব্যে ব্যতিক্রম পাওয়া যায়, যেখানে তিনি বলেছেন: পূর্ণভাবে সালাত আদায় করাই উত্তম। তবে তাঁর মাজহাব অনুযায়ী সঠিক মত হচ্ছে কসর করাই উত্তম।”(ইমাম নববী আল-মাজমু‘ খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২১৮-২২৩) হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,ولا خلاف بين الأئمة في قصر الصلاة في السفر”সফরে সালাত কসর করার ব্যাপারে ইমামদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই।”(ইবনু কুদামা, আল-মুগনি, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২৭৪)।
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
প্রশ্ন: কতটুকু দূরত্বে সফর করলে সালাত কসর করা বৈধ এবং এর সময়সীমা কতদিন?
.
▪️(১).সফরের নিদিষ্ট কোন দূরত্ব আছে?
.
সফরে সালাত কসর করে আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট দূরত্ব কত হওয়া উচিত এই বিষয়ে কুরআন ও সহীহ হাদীসে কোনো সুস্পষ্ট পরিমাণ বা দূরত্ব উল্লেখিত হয়নি।তাই এ বিষয়ে উলামায়ে কিরামের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। সাধারণভাবে তাঁদের মতামত দুটি প্রধান অভিমত হিসেবে পরিগণিত।
.
(১).একদল আলেমের মতে শরিয়তে অনুমোদিত সফর হলো প্রচলিত অর্থে ভ্রমণ, যার দূরত্ব অন্তত প্রায় ৮০ কিমি (৪৮ মাইল)। এই দূরত্ব বা তার বেশি ভ্রমণে মুসাফিরের জন্য রুখসত (ছাড়) গুলো বৈধ যেমন, তিনদিন তিনরাত মোজার উপর মাসেহ, চার রাকাআত বিশিষ্ট সালাত দুই রাকাতে (কসর) আদায়, দুই ওয়াক্তের সালাত একত্রে জমা করে আদায় করা, এবং রমজানের রোযা ভঙ্গ করা।সুতরাং মুসাফির ব্যক্তি যে স্থানের উদ্দেশ্যে সফর করেছেন সে স্থানে পৌঁছে যদি সেখানে চারদিনের বেশি সময় অবস্থান করার নিয়ত করেন তাহলে তিনি সফরকালীন ছাড়গুলো গ্রহণ করবেন না,বরং পরিপূর্ণ সালাত আদায় করবেন। কিন্তু যদি চারদিন বা তার চেয়ে কম সময় অবস্থান করার নিয়ত করেন তাহলে তিনি সফরকালীন ছাড়গুলো গ্রহণ করতে পারেন।আর যে মুসাফির কোন একটি স্থানে অবস্থান করছেন; অথচ তিনি জানেন না যে, কখন তার প্রয়োজন শেষ হবে এবং তিনি সেখানে অবস্থানের জন্য সুনির্দিষ্ট কোন সময় নির্ধারণ করেননি; এভাবে তিনি যদি দীর্ঘদিন সেখানে থেকে যান তবুও তিনি সফরকালীন ছাড়গুলো গ্রহণ করতে পারবেন।সাহাবাদের মধ্যে এ ব্যাপারে বিভিন্ন মত পরিলক্ষিত হয়। তবে প্রখ্যাত সাহাবী ইবনে আব্বাস ও ইবনে উমার (রাঃ) ৪৮ মাইল দূরে গিয়ে কসর করতেন এবং সিয়াম রাখতেন না। জেনে রাখা ভাল যে,এই সফর পায়ে হেঁটে হোক অথবা উটের পিঠে, সাইকেলে হোক বা বাসে-ট্রেনে, পানি-জাহাজে হোক অথবা এরোপ্লেনে, কষ্টের হোক অথবা আরামের, বৈধ কোন কাজের জন্য হলে তাতে কসর বৈধ।পাশাপাশি দূরবর্তী সফর থেকে যদি একদিনের ভিতরেই ফিরে আসে অথবা নিকটবর্তী সফরে ২/৩ দিন অবস্থান করে তবুও তাতে কসর-জমা চলবে।(মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্যাহ্; খণ্ড: ২০; পৃষ্ঠা: ১৫৭; এবং ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৯৯)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,مَذْهَبُ أَبِي عَبْدِ اللَّهِ (يعني الإمام أحمد) أَنَّ الْقَصْرَ لا يَجُوزُ فِي أَقَلِّ مِنْ سِتَّةَ عَشَرَ فَرْسَخًا، وَالْفَرْسَخُ: ثَلاثَةُ أَمْيَالٍ، فَيَكُونُ ثَمَانِيَةً وَأَرْبَعِينَ مِيلا. وَقَدْ قَدَرَهُ ابْنُ عَبَّاسٍ، فَقَالَ: مِنْ عُسْفَانَ إلَى مَكَّةَ، وَمِنْ الطَّائِفِ إلَى مَكَّةَ، وَمِنْ جُدَّةَ إلَى مَكَّةَ.فَعَلَى هَذَا تَكُونُ مَسَافَةُ الْقَصْرِ يَوْمَيْنِ قَاصِدَيْنِ. وَهَذَا قَوْلُ ابْنِ عَبَّاسٍ وَابْنِ عُمَرَ. وَإِلَيْهِ ذَهَبَ مَالِكٌ، وَاللَّيْثُ، وَالشَّافِعِيُّ ا“আবু আব্দুল্লাহ (অর্থাৎ ইমাম আহমাদ) এর মত হল ১৬ ফারসাখ এর কম দূরত্বে ক্বসর (সালাত সংক্ষিপ্ত করা) জায়েয নয়। এক ফারসাখ হল তিন মাইল। সুতরাং ১৬ ফারসাখ দূরত্ব হল ৪৮ মাইল। ইবনু আব্বাস (রা.) এই দূরত্ব নির্ধারণ করেছেন। তিনি বলেছেন: এই দূরত্ব উসফান থেকে মক্কা পর্যন্ত, তায়েফ থেকে মক্কা পর্যন্ত, জেদ্দা থেকে মক্কা পর্যন্ত। এর উপর ভিত্তি করে বলা যায়, ক্বসর (সালাত সংক্ষিপ্ত করা) বৈধকারী দূরত্ব হল সেই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে দুই দিনের ভ্রমণ। এটি হল ইবনু আব্বাস ও ইবনু উমর এর মত। এই মতটি গ্রহণ করেছেন ইমাম মালেক, আল-লাইস ও শাফেয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) প্রমুখ।’’(ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৪৮)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন,”যে সফরের মধ্যে সফরের ছাড়গুলো গ্রহণ করা শরিয়তসম্মত সেটা হচ্ছে প্রচলিত প্রথায় যেটাকে সফর বলা হয়। এর পরিমাণ হচ্ছে প্রায় ৮০ কিঃমিঃ। যে ব্যক্তি এ পরিমাণ বা এতোর্ধ দূরত্ব অতিক্রমের উদ্দেশ্য নিয়ে সফরে বের হবে সে ব্যক্তি সফরের ছাড়গুলো গ্রহণ করতে পারবেন; যেমন- মোজার ওপর তিন দিন তিন রাত মাসেহ করা, দুই ওয়াক্তের সালাত একত্রে আদায় করা ও নামাযগুলো কসর (সংখ্যাহ্রাস) করে আদায় করা, রমযানের রোযা না রাখা। এ মুসাফির ব্যক্তি যদি কোন স্থানে চারদিনের বেশি সময় অবস্থান করার নিয়ত করেন তাহলে তিনি আর সফরের ছাড়গুলো গ্রহণ করতে পারবেন না। যদি তিনি চারদিন বা এর চেয়ে কম সময় অবস্থানের নিয়ত করেন তাহলে সফরের ছাড়গুলো গ্রহণ করতে পারবেন। আর যে মুসাফির কোন এক স্থানে অবস্থান করছেন কিন্তু তিনি জানেন না যে, কখন তার প্রয়োজন শেষ হবে এবং অবস্থানের জন্য কোন সময় তিনি নির্দিষ্ট করেননি তিনিও সফরের ছাড়গুলো গ্রহণ করতে পারবেন; এমনকি সে অবস্থান অনেক দীর্ঘ হলেও। এক্ষেত্রে স্থলপথে সফর ও জল পথে সফরের মাঝে কোন পার্থক্য নেই।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৯৯)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] সফরের দূরত্ব সম্পর্কে বলেন:الذي عليه جمهور أهل العلم أن ذلك يقدر بنحو ثمانين كيلو تقريبا بالنسبة لمن يسير في السيارة، وهكذا الطائرات، وفي السفن والبواخر، هذه المسافة أو ما يقاربها تسمى سفرا، وتعتبر سفرا في العرف فإنه المعروف بين المسلمين، فإذا سافر الإنسان على الإبل، أو على قدميه، أو على السيارات، أو على الطائرات، أو المراكب البحرية، هذه المسافة أو أكثر منها فهو مسافر“অধিকাংশ আলেম যে মতের উপর রয়েছেন তা হচ্ছে- যারা গাড়িতে, প্লেনে, জাহাজে, স্টিমারে ভ্রমণ করে তাদের ক্ষেত্রে এই দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার ধরে হিসাব করা।এই দূরত্ব বা তার কাছাকাছি দূরত্বে ভ্রমণকে (শরিয়তের দৃষ্টিতে) সফর বলা হবে এবং মুসলিমদের মাঝে প্রচলিত প্রথা অনুসারেও তা সফর হিসেবে বিবেচিত। অতএব কেউ যদি উটে করে অথবা পায়ে হেঁটে অথবা গাড়িতে অথবা প্লেনে অথবা সামুদ্রিক যানে করে এই দূরত্ব বা তার বেশি অতিক্রম করে তবে সে মুসাফির হিসেবে গণ্য হবে।”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ২৬৭)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে প্রশ্ন করা হয় :ক্বসর (সালাত সংক্ষিপ্ত করা) বৈধকারী দূরত্ব সম্পর্কে এবং ভাড়ায়চালিত গাড়িচালক ৩০০ কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করলে সে কি সালাত ক্বসর (সালাত সংক্ষিপ্ত) করবে? তাঁরা উত্তরে বলেন:مقدار المسافة المبيحة للقصر ثمانون كيلو متر تقريبا على رأي جمهور العلماء، ويجوز لسائق سيارة الأجرة أو غيره أن يصليها قصرا؛ إذا كان يريد قطع المسافة التي ذكرناها في أول الجواب أو أكثر منها.“অধিকাংশ ‘আলেমের রায় অনুসারেক্বসর (সালাত সংক্ষিপ্ত করা) বৈধকারীদূরত্বের পরিমাণ হল প্রায় ৮০ কিলোমিটার। তাই ভাড়ায়চালিত গাড়িচালক অথবা অন্যদের জন্য এক্ষেত্রে সালাত সংক্ষিপ্ত করা জায়েয। যদি সে এ উত্তরের প্রথমে উল্লেখিত দূরত্ব বা তার চেয়ে বেশি পথ অতিক্রমের নিয়তে বের হয়।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৯০)
.
(২).অন্যদিকে কিছু ‘আলেম এই মত ব্যক্ত করেন যে, ইসলামি শরীয়তে সফরের কোন নির্দিষ্ট দূরত্ব নির্ধারণ করা হয়নি। বরং এ ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রথার উপরে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। প্রচলিত প্রথায় একজন মানুষ যতদূর গমন করলে সফর হিসেবে বিবেচনা করা হয় সেটাই সফর হিসেবে বিবেচিত হবে। যার উপর ভিত্তি করে একজন মুসাফিরের জন্য দুই সালাত জমা করে আদায়,ক্বসর (সালাত সংক্ষিপ্ত) করাও সিয়াম ভঙ্গ করা ইত্যাদি বিধিবিধান প্রযোজ্য হয়। এই মতটি অধিক বিশুদ্ধ এবং নিরাপদ। এমনকি এ মতটি বহু গবেষক আলেম বেছে নিয়েছেন; তাঁদের মধ্যে আছেন ইবনু কুদামাহ আল-মাকদিসি ও শাইখুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ, ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুমুল্লাহ)সহ আরও অনেকে।আহালুল আলেমদের মধ্যে ইমাম ইবনে হাযম (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ), শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ্ (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম ইবনে ক্বুদামাহ্ (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ), আল্লামাহ্ শানক্বিত্বী (রাহিমাহুল্লাহ),ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) ও ইমাম আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,”সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মতানুযায়ী যে কোন ধরনের সফরে ক্বছর করা জায়েয, যতক্ষণ পর্যন্ত তাকে সফর বলা হবে, চাই সে সফর দীর্ঘায়িত হোক বা সংক্ষিপ্ত, এর কোন নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। কেননা কুরআন ও সহীহ হাদীসের মধ্যে সফরের কোন নির্দিষ্ট দূরত্ব ও সময় নির্ধারণ করা হয়নি। তাই এ ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রথার উপরে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। প্রচলিত প্রথায় একজন মানুষ যতদূর গমন করলে সফর হিসাবে বিবেচনা করা হয় সেটাই সফর হিসাবে বিবেচিত হবে। যার উপর ভিত্তি করে একজন মুসাফিরের জন্য দুই সালাত জমা ও ক্বসর করবে (আল-মাহাল্লা, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৬-২১; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৬৮; আল-মাজমূঊ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩২৫; মাজমুউল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ, ২৪তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৫, ৩৫, ৪৮, ৪৯; আল-ইখতিয়ারাতুল ফিক্বহিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৪৩৪; আল-মুগনী, ২য় খণ্ড,পৃষ্ঠা: ১৯০; যাদুল মা‘আদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪৬৩; আস-সাইলুল জারার, পৃষ্ঠা: ১৮৮; আযওয়াউল বায়ান, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৭৩; আশ-শারহুল মুমতি‘, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৫১-৩৫৩; সিলসিলা সহীহাহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩১১)।
.
এই মতের পক্ষে দলিল হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তোমরা যখন দেশ-বিদেশে সফর করবে, তখন যদি তোমাদের আশংকা হয় যে, কাফিররা তোমাদেরকে বিপন্ন করবে, সেক্ষেত্রে সালাত ক্বসর করাতে তোমাদের কোন দোষ নেই। নিশ্চয় কাফিররা তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু (সূরা আন-নিসা: ১০১)। ঈসা বিন হাফস বিন ‘আসিম (রাহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবনু ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেছেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম, তিনি সফরে দু’ রাক‘আতের অধিক আদায় করতেন না। আবূ বাকর, ‘উমার ও ‘উসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)-এর একই রীতি ছিল (সহীহ বুখারী, হা/১১০২; সহীহ মুসলিম, হা/৬৮৯)।ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,”এখানে সফরকে কোন নির্দিষ্ট দূরত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়নি। বরং সাধারণ সফরের কথা বলা হয়েছে (আল-মাজমূঊ, ৪র্থ খণ্ড: পৃষ্ঠা: ৩২৬)।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:وَالْحُجَّةُ مَعَ مَنْ جَعَلَ الْقَصْرَ وَالْفِطْرَ مَشْرُوعًا فِي جِنْسِ السَّفَرِ وَلَمْ يَخُصَّ سَفَرًا مِنْ سَفَرٍ. وَهَذَا الْقَوْلُ هُوَ الصَّحِيحُ“যারা যে কোন ধরনের সফরে ক্বসর (সালাত সংক্ষিপ্ত) করা ও সিয়াম ভঙ্গ করাকে শরিয়তসম্মত মত দিয়েছেন, বিশেষ কোন সফরের সাথে নির্দিষ্ট করেননি দলীল তাঁদের পক্ষেই এবং এটাই সঠিক মত।”(ইবনু তাইমিয়া; আল-ফাতাওয়া খণ্ড: ২৪; পৃষ্ঠা: ১০৬)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: মুসাফির ব্যক্তি কতটুকুদূরত্বের ক্ষেত্রে সালাত ক্বসর (সংক্ষিপ্ত করা) করতে পারবে এবং ক্বসর না করে দুই সালাত একত্রিত করা জায়েয কিনা। তিনি উত্তরে বলেন:
المسافة التي تقصر فيها الصلاة حددها بعض العلماء بنحو ثلاثة وثمانين كيلو مترا، وحددها بعض العلماء بما جرى به العرف أنه سفر وإن لم يبلغ ثمانين كيلو مترا، وما قال الناس عنه: إنه ليس بسفر، فليس بسفر ولو بلغ مائة كيلو متر. وهذا الأخير هو اختيار شيخ الإسلام ابن تيمية رحمه الله ، وذلك لأن الله تعالى لم يحدد مسافة معينة لجواز القصر وكذلك النبي صلى الله عليه وسلم لم يحدد مسافة معينة.وقال أنس بن مالك رضي الله عنه: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا خَرَجَ مَسِيرَةَ ثَلاثَةِ أَمْيَالٍ أَوْ ثَلاثَةِ فَرَاسِخَ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ. رواه مسلم (691).وقول شيخ الإسلام ابن تيمية رحمه الله تعالى أقرب إلى الصواب.ولا حرج عند اختلاف العرف فيه أن يأخذ الإنسان بالقول بالتحديد؛ لأنه قال به بعض الأئمة والعلماء المجتهدين، فلا بأس به إن شاء الله تعالى، أما مادام الأمر منضبطا فالرجوع إلى العرف هو الصواب.
“সালাত ক্বসর (সংক্ষিপ্ত) করার দূরত্বকে কিছু আলেম প্রায় ৮৩ কিলোমিটারে নির্দিষ্ট করেছেন। আবার কিছু আলেম প্রচলিত প্রথার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। সফরের দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার না হলেও মানুষ যদি এটাকে সফর গণ্য করে তাহলে সেটা সফর। আর মানুষ যেটাকে সফর হিসেবে গণ্য করে না সেটা ১০০ কিলোমিটার দূরত্বে হলেও সফর নয়। শেষের এই মতটি শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বেছে নিয়েছেন। কেননা আল্লাহ তা‘আলা সালাত ক্বসর করা বৈধ হওয়ার জন্য কোন নির্দিষ্ট দূরত্ব নির্ধারণ করেননি। একইভাবে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও কোন নির্দিষ্ট দূরত্ব নির্ধারণ করেননি। আনাস ইবনে মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন “রাসূলুল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিন মাইল অথবা তিন ফারসাখ দূরত্বের পথে বের হলে সালাত দুই রাকাত আদায় করতেন (অর্থাৎ সালাত সংক্ষিপ্ত করতেন)।”(হাদিসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন হা/৬৯১) শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহর এই বক্তব্যটি সঠিকতর।প্রচলিত প্রথায় দ্বিমত দেখা গেলে যদি কোন ব্যক্তি নির্দিষ্ট দূরত্বের মতটি (অর্থাৎ প্রথম মতটি) গ্রহণ করেন এতে দোষের কিছু নেই। কারণ এটি অনেক ইমাম ও মুজতাহিদ ‘আলেমগণের বক্তব্য। তাই এতে কোন সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ্‌। আর যদি প্রচলিত প্রথায় স্পষ্ট দিক নির্দেশনা পাওয়া যায় তবে তা অনুসারে আমল করাই সঠিক।”(ফাতওয়া আরকানুল ইসলাম পৃষ্ঠা: ৩৮১)
.
▪️(২).ব্যক্তি কোথা থেকে সালাত কসর এবং জমা শুরু করবেন?
.
সফরে সালাত কসর বা একত্রিত করা এবং রোজা ভঙ্গ করার শর্তাবলী নিয়ে ইমামদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। তবে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জমহুর (বৃহৎ সংখ্যক) আলেমদের অধিক গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী, যিনি সফরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবেন, তিনি তার নিজ শহরের জনবসতি এলাকা বা নগর সীমা অতিক্রম না করা পর্যন্ত সালাত কসর, একত্রিতকরণ এবং রোজা ভঙ্গের ছাড় পাওয়ার অধিকারী নয়। অর্থাৎ, যাত্রা শুরুর পর যখন সে তার শহরের জনবসতি এলাকা পেরিয়ে বাহিরে প্রবেশ করবে, তখনই তার উপর সফরের বিধি-নিষেধ এবং সফর সংক্রান্ত ছাড় (রুকসাত) প্রযোজ্য হবে। কেননা সহীহ হাদিস থেকে জানা যায়, মহানবী (ﷺ) যখন কোনো শহর বা জনপদ ত্যাগ করতেন, তখনই কসর সালাত শুরু করতেন এর আগে নয়। যেমন আনাস (রাঃ) বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর সাথে মক্কা থেকে মদিনার পথে মদীনায় যোহরের ৪ রাকআত এবং যুল-হুলাইফা (মদীনা থেকে প্রায় ৬ মাইল দূরে) পৌঁছে আসরের ২ রাকআত সালাত পড়তাম। (সহীহ বুখারী, হা/হা/১০৮৯) সুতরাং, সফরের ক্ষেত্রে শহর বা গ্রাম ত্যাগ করার আগেই কসর সালাতশুরু করা যাবে না। সালাতের নির্ধারিত সময় এসে গেলে যদি সফরে থাকেন, তাহলে পথেই কসর সালাত আদায় করতে পারেন। আর যদি সফরের সময় সালাতের সময় শেষে বাসায় ফিরে আসেন, তাহলে বাড়িতে পূর্ণ সালাত আদায় করতে হবে। যখন সফর শুরু করে শহরের বাইরে পৌঁছান যেমন বিমানবন্দর, স্টেশন বা বাস স্ট্যান্ডে তখন থেকে কসর সালাত চালু থাকবে। সেখানে কসর সালাত আদায়ের পর যদি কোন কারণে প্লেন বা গাড়ি না এসে বাধাগ্রস্ত হন এবং বাড়ি ফিরতে হয়, তবুও ওই কসর সালাত পুনরায় পূর্ণ পড়তে হবে না। আরও কথা হলো, যদি সফররত অবস্থায় প্লেন বা গাড়ি মুসাফিরের নিজ শহর বা গ্রাম অতিক্রম করেও যাত্রা চালিয়ে যায়, তবুও বিমানবন্দর বা স্টেশন বা বাস-স্ট্যান্ডে কসর সালাত আদায় বৈধই হবে।(বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইমাম ইবনু উসামীন আশ-শারহুল মুমতি‘,আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৫১৪-৫২৩; ইবনু উসামীন লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-৭৯)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ,শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,ليس لمن نوى السفر القصر حتى يخرج من بيوت قريته، ويجعلها وراء ظهره. وبهذا قال مالك، والشافعي، والأوزاعي، وإسحاق، وأبو ثور، وحكي ذلك عن جماعة من التابعين. وحكي عن عطاء، وسليمان بن موسى، أنهما أباحا القصر في البلد لمن نوى السفر,قال ابن المنذر: أجمع كل من نحفظ عنه من أهل العلم، أن للذي يريد السفر أن يقصر الصلاة إذا خرج من بيوت القرية التي يخرج منها” ا”যে ব্যক্তি সফরের ইচ্ছা পোষণ করে, সে তখনই সালাত কসর করতে পারে যখন সে নিজের গ্রামের (অথবা শহরের) ঘরবাড়ি থেকে বের হয়ে যায় এবং সেগুলোকে পেছনে ফেলে আসে। এই মত মালিক, শাফঈ, আওজাঈ, ইসহাক এবং আবু সাওর সহ অনেক ইমামদের। এছাড়া তাবেঈদের একদল আলেমও এ অবস্থান গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে, আতা ও সুলায়মান ইবন মূসা শহরের ভেতর থেকেই সফর ইচ্ছুক ব্যক্তির জন্য কসর করার অনুমতি দিয়েছেন। ইবনুল মুনযির বলেন: “আমরা যে আলেমদের কথা সংরক্ষণ করেছি, তারা সবাই একমত যে, যে ব্যক্তি সফরের উদ্দেশ্যে গ্রামের ঘরবাড়ি অতিক্রম করবে, তখন তার জন্য সালাত কসর করা বৈধ।”(ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৯১) ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) ও অনুরূপ কথা বলেছেন।(নববী; আল মাজমূ; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২২৮)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেন: আল্লাহর জন্য সমস্ত প্রশংসা, আর আল্লাহর রাসূলের ওপর শান্তি ও দোয়া বর্ষিত হোক।অতঃপর; অধিকাংশ আলেমের মতে, ভ্রমণকারী শহরের সীমানা অতিক্রম করার পরই সালাত কসর করে আদায় করতে পারবে। এর প্রমাণ হলো, নবী ﷺ মদীনা থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত কসর শুরু করতেন না। এরপর তিনি দুই রাকআত সালাত আদায় করতেন। মূল বিবেচ্য বিষয় হলো কাজ কখন সম্পাদিত হচ্ছে। সুতরাং, যদি মুয়াজ্জিন যোহর বা আসরের আযান দেয় এবং ভ্রমণকারী শহরের সীমানা অতিক্রম করে, তবে তার উচিত চার রাকআতের সালাত কসর করে দুই রাকআত আদায় করা। কারণ এখানে আসল বিষয় হলো কাজ সম্পাদনের সময়কাল শহর ত্যাগের সময় নয় যেহেতু সালাত আদায়ের সময় সে ভ্রমণ অবস্থায় রয়েছে।” (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ও মাকালাত মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১২, পৃষ্ঠা: ২৯৮)
.
▪️(৩).মুসাফির যখন সফর থেকে স্থানীয় বাসভূমিতে (ঘরে) আসবেন তখন তার বিধান কি হবে?
.
যখন কোনো মুসাফির (ভ্রমণকারী) তার নিজ শহর বা স্থায়ী বসবাসের এলাকায় প্রবেশ করে, তখন সফরের বিশেষ বিধান আর প্রযোজ্য থাকে না, বরং বাতিল হয়ে যায় এবং সে মুকীম (অবস্থানকারী) হিসেবে গণ্য হবে। সে নিজ শহরে স্থায়ীভাবে থাকার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করুক, কিংবা কেবলমাত্র অতিক্রম করার জন্য, অথবা কোনো প্রয়োজনে যেকোনো কারণে হোক না কেন, তা প্রযোজ্য। সফরের বিধান শেষ হওয়ার মানে হচ্ছে, সে সেই জায়গায় ফিরে এসেছে যেখান থেকে সালতের কসর শুরু করেছিল। অতএব, যদি সে তার শহরের কাছাকাছি এসে পৌঁছায় আর সালাতের সময় হয়ে যায়, তবে সে তখনও মুসাফির বিবেচিত হবে যতক্ষণ না সে নিজ শহরে প্রবেশ করে।(বিস্তারিত জানতে দেখুন; আল মাওসুয়াতুল ফিক্বহিয়্যাহ; খণ্ড: ২৭; পৃষ্ঠা: ২৮৭)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: আমি ভ্রমণে ছিলাম এবং ভ্রমণ থেকে ফেরার সময় নিয়ত করেছিলাম যে, আমি আমার বাসায় পৌঁছে যোহর ও আসরের নামাজ জমা (একত্র) করে আদায় করব। এখন প্রশ্ন হলো, আমি কি এই দুই নামাজ কসর করে পড়তে পারব? আমি কিন্তু আসরের পর বাসায় পৌঁছেছি। উত্তরে তাঁরা বলেছিলেন:إذا وصل المسافر إلى بلده ، فإنه لا يجوز له قصر الصلاة ؛ لانتهاء السفر بدخوله إلى بلده ، ولو كانت الصلاة قد وجبت عليه قبل وصوله ؛ لأن العبرة بحالة أداء الصلاة، لا بحالة وجوبها عليه في هذه الحالة”যখন একজন মুসাফির তার নিজ শহরে পৌঁছে যায়, তখন তার জন্য নামাজ কসর করা জায়েজ নেই। কারণ, সে তার শহরে প্রবেশ করার মাধ্যমে মুসাফির হওয়া শেষ হয়ে গেছে। যদিও সে সালাত তার ওপর ফরজ হয়েছিল শহরে পৌঁছানোর আগে, তবুও বিচার হবে সালাত আদায়ের সময় অবস্থার ওপর, ফরজ হওয়ার সময়ের ওপর নয়। (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমাহ; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৪৪৯)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: যদি কেউ তার পরিবার থেকে দূরে এমন এক জায়গায় যায় যেখানে সে থেকে যাওয়ার (স্থায়ী হওয়ার) নিয়ত করে এবং আগের শহরে ফেরার কোনো ইচ্ছা না থাকে, তারপর কোনো এক সময় সে তার পরিবারকে দেখতে আগের শহরে ফিরে আসে তাহলে সে কি নিজেকে মুসাফির মনে করবে?
উত্তরে শাইখ বলেন:إذا خرج الإنسان عن وطنه الأول بنية الاستقرار في البلد الثاني فإنه إذا رجع إلى وطنه الأول يكون مسافراً ، ما دام على نيته الأولى ، والدليل على ذلك : أن الرسول عليه الصلاة والسلام كان وطنه الأول مكة ولما فتح مكة قصر وفي حجة الوداع قصر .السائل : يا شيخ وإن كان في نفس هذا البلد – بلده الأول – زوجته وأولاده ؟ الشيخ : إي : نعم . حتى وإن كان زوجته وأولاده فيه “যদি কেউ নিজের প্রথম শহর (মূল বাসস্থান) ছেড়ে দ্বিতীয় শহরে স্থায়ীভাবে থাকার নিয়তে চলে যায়, তাহলে সে যখন তার প্রথম শহরে ফিরে আসে, তখনো সে মুসাফির হিসেবে গণ্য হবে যতক্ষণ না তার সেই প্রথম নিয়ত পরিবর্তিত হয়। এর প্রমাণ হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রথম শহর ছিল মক্কা, এবং তিনি যখন মক্কা বিজয়ের সময় ফিরে আসেন, তখন তিনি সালাত কসর করেছিলেন, হজ্জ্বে বিদায়ের সময়ও কসর করেছিলেন। প্রশ্নকারী জিজ্ঞেস করলেন: হে শাইখ! যদি ঐ শহরেই তার স্ত্রী-সন্তান বসবাস করে, তাহলেও? শাইখ উত্তর দিলেন: হ্যাঁ, তাহলেও। এমনকি যদি তার স্ত্রী ও সন্তানরাও সেখানে থাকে, তবুও সে মুসাফিরই থাকবে।”(ইবনু উসাইমীন; লিক্বাউল বাবিল মাফতুহ; ২৩/৮২)
.
▪️(৪).মুসাফিরের জন্য সালাত কসরের সময়য়সীমা কতদিন?
.
জমহুর উলামাদের বিশুদ্ধ মত অনুসারে,যদি কোনো মুসাফির ৪ দিনের বেশি সময়ের জন্য অবস্থান করার নিয়ত করে, তাহলে সে সালাতগুলো পূর্ণ সংখ্যায় (কাদাহ পূর্ণ করে) আদায় করবে। অন্যদিকে, যদি কোনো মুসাফির সফরে গিয়ে নির্দিষ্ট কোনো দিনের অবস্থানের সংকল্প না করে, অর্থাৎ যেই কাজে গিয়েছে সেটি শেষ হয়ে গেলে ফিরে আসার নিয়ত থাকে, অথবা পথে কোনো বাধা বা অসুবিধা দেখা দিলে সেই বাধা কাটিয়ে ওঠা পর্যন্ত নামায কসর করে আদায় করা জায়েজ। দলিল মহানবী ﷺ) একবার একটি সফরে ১৯ দিন ছিলেন এবং ততদিন সালাত কসর করেছেন।(সহীহ বুখারী হা/১০৮০) আনাস (রাযি.) শুআনূতে দুই বছর অবস্থান করেছিলেন এবং সে সময়ও কসর নামায আদায় করে গিয়েছিলেন। (মুওয়াত্ত্বা মালেক খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৪৮৮; ফিকহুস সুন্নাহ; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২৮৬) আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাযি. শুআনূতে বরফের কারণে ছয় মাস পর্যন্ত আযার বাইজানে আটকা পড়ে ছিলেন এবং ততদিন কসর করে নামায আদায় করেছিলেন। (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক; ২/৪৩৩৯, বায়হাকী খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৫২) অন্যদিকে, বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে গিয়ে বসবাস শুরু করলে যেমন ব্যবসা, চাকুরি বা পড়াশোনার জন্য দীর্ঘদিন অবস্থান করা হয়, তখন আর কসর নামায চলবে না। তবে যদি কোনো সফরকারী নির্দিষ্ট দিনের অবস্থানের সংকল্প নিয়ে না থাকে, এবং কাজ শেষ না হয়, ততদিন পর্যন্ত সে মুসাফিরই এবং কসর নামায করতে পারে। এজন্য ৪ কিংবা তারও অধিক দিনের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত স্থায়ী বসবাসের নিয়ত না করে, ততদিন সে সফরকারীই গণ্য। এখানে এক ব্যতিক্রমমূলক দৃষ্টিকোণ হলো, যারা প্রতিদিন ভাড়া গাড়ি, বাস, ট্রেন বা প্লেনে যাতায়াত করেন, তারা ও মুসাফির হিসেবে গণ্য হবেন এবং তাদের জন্যও নামায কসর করা যথাযথ।”( বিস্তারিত জানতে দেখুন; ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪০৬-৪০৭; মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্যাহ; ২২/১০৩; ইবনু উসাইমীন; আশ শারহুল মুমতি; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৫৩২-৫৩৯)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেনمَنْ لَمْ يُجْمِعْ الْإِقَامَةَ مُدَّةً تَزِيدُ عَلَى إحْدَى وَعِشْرِينَ صَلَاةً، فَلَهُ الْقَصْرُ، وَلَوْ أَقَامَ سِنِينَ، مِثْلُ أَنْ يُقِيمَ لِقَضَاءِ حَاجَةٍ يَرْجُو نَجَاحَهَا، أَوْ لِجِهَادِ عَدُوٍّ، أَوْ حَبَسَهُ سُلْطَانٌ، أَوْ مَرَضٌ، وَسَوَاءٌ غَلَبَ عَلَى ظَنِّهِ انْقِضَاءُ الْحَاجَةِ فِي مُدَّةٍ يَسِيرَةٍ، أَوْ كَثِيرَةٍ، بَعْدَ أَنْ يَحْتَمِلَ انْقِضَاؤُهَا فِي الْمُدَّةِ الَّتِي لَا تَقْطَعُ حُكْمَ السَّفَرِ.قَالَ ابْنُ الْمُنْذِرِ: أَجْمَعَ أَهْلُ الْعِلْمِ أَنَّ لِلْمُسَافِرِ أَنْ يَقْصُرَ مَا لَمْ يُجْمِعْ إقَامَةً، وَإِنْ أَتَى عَلَيْهِ سِنُونَ”যে ব্যক্তি ২১ ওয়াক্ত সালাতের চেয়ে বেশি সময় অবস্থানের মনস্থির করেনি সে ব্যক্তি কসর করতে পারেন। এমনকি তিনি যদি কোন কাজ শেষ করার তাগিদে কিংবা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে কিংবা শাসক তাকে আটক রাখার কারণে কিংবা অসুস্থতার কারণে বছরের পর বছর থেকে যান তবুও। কসরের সময়ের চেয়েও কম সময়ের মধ্যে কাজটি নিষ্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকার পর যদি স্বল্প সময়ে কিংবা বেশি সময়ে কাজটি নিষ্পন্ন হওয়ার প্রবল ধারণা হয় তবুও হুকুমে হেরফের হবে না। ইবনুল মুনযির (রহঃ) বলেন: আলেমগণ ইজমা করেছেন যে, মুসাফির যদি মুকীম হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেয় তাহলে সে যদি বছর বছর থেকে যায় তবুও সে মুসাফির।”(ইবনে কুদামাহ আল-মুগনি’ খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২১৫)
.
▪️(৫).যখন কোনো মুসাফির কোনো মুকীম (অবস্থানকারী) এর পিছনে সালাত আদায় করবে তখন সে কী করবে?
.
যখন কোনো মুসাফির কোনো মুকীম (অবস্থানকারী) এর পিছনে সালাত আদায় করবে তখন মুসাফিরের উপর কর্তব্য হবে সে সালাতটি পূর্ণরূপে আদায় করা। সে সালাতের শুরু থেকে পেলো নাকি কেবল এক রাকা‘আত পেলো অথবা দুই রাকা‘আত বা তিন রাকা‘আত পেলো এতে কোনো তারতম্য হবে না। তখন মুসাফিরের জন্য কসর করা জায়েয হবে না। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যেমনটি বুখার ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে;إنما جعل الإمام ليؤتم به فلا تختلفوا عليه“ইমাম তো নির্ধারণ করা হয়েছে তাকে অনুসরণ অনুকরণ করার জন্য, সুতরাং তোমরা তার সাথে ভিন্নমত করো না”।(সহীহ বুখারী হা/৭২২) তাছাড়া ইমাম মুসলিম ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন, যখন তাক জিজ্ঞেস করা হলো, মুসাফিরের বিধান এমন কেনো যে সে যখন একা পড়ে তখন কসর করে কিন্তু (মুকীম) ইমামের পিছনে চার রাকা‘আত পড়ে? তখন তিনি বললেন,«تلك هي السنة”এটাই হচ্ছে সুন্নাহ তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ”। তাছাড়া জামাতের সাথে সালাত আদায় করা অন্যদের মত মুসাফিরের ওপরও ওয়াজিব।(বিস্তারিত জানতে দেখুন ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৮২৬৫৮)।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: যদি একজন ব্যক্তি জেদ্দায় ভ্রমণ করে, উদাহরণস্বরূপ, তাকে কি তার নামায সংক্ষিপ্ত করার অনুমতি দেওয়া হবে নাকি তাকে মসজিদে জামাতের সাথে সালাত আদায় করতে হবে? তিনি জবাবে বলেন:إذا كان المسافر في الطريق فلا بأس ، أما إذا وصل البلد فلا يصلي وحده ، بل عليه أن يصلي مع الناس ويتم ، أما في الطريق إذا كان وحده وحضرت الصلاة فلا بأس أن يصلي في السفر وحده ويقصر الرباعية اثنتين”
“মুসাফির যদি পথেই থাকে তবে তাতে কিছু আসে যায় না, তবে যদি সে তার গন্তব্যে পৌঁছে থাকে তবে তার নিজের নামায পড়া উচিত নয়, বরং তাকে লোকদের সাথে জামআতে সালাত আদায় করতে হবে এবং পূর্ণরূপে সালাত আদায় করতে হবে। কিন্তু যদি সে রাস্তায় থাকে এবং একা থাকে এবং সালাতের সময় হয়ে যায়, তবে তার নিজের সালাত পড়া এবং সফর অবস্থায় সালাত সংক্ষিপ্ত করে চার রাকাআত সালাত দুই রাকাআত পড়ায় কোন দোষ নেই।”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ খন্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ২৯৭)
.
সৌদি সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: শাইখ আমি যদি সফরে থাকি এবং সালাতের আযান শুনতে পাই, তাহলে কি আমাকে মসজিদে সালাত আদায় করতে হবে? আমি যেখানে অবস্থান করছি সেখানে যদি সালাত পড়ি, তাতে কি দোষ আছে? যদি আমার সফরের সময়কাল টানা চার দিনের বেশি হয়, তাহলে আমি কি আমার সালাত সংক্ষিপ্ত করব নাকি পূর্ণ আদায় করব?
তিনি উত্তর দিলেনঃ “আপনি যেখানে অবস্থান করছেন সেখানে যদি আপনি আযান শুনতে পান, তাহলে আপনাকে মসজিদে উপস্থিত হতে হবে, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন এক ব্যক্তিকে বলেছিলেন যে তার কাছে বাড়িতে সালাত আদায়ের অনুমতি চেয়েছিল। রাসূল ﷺ তাকে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কি আযান শুনতে পাও? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহলে সালাতে এসো।(মুসলিম হা/৬৫৩; নাসাঈ হা/৮৫০; মিশকাত হা/১০৫৪) এবং নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বহু সংখ্যক সাহাবী হতে বর্ণিত আছে, তারা বলেছেন, যে ব্যক্তি আযান শুনার পরও জামা’আতে উপস্থিত হয়নি তার কোন সালাত নেই।(অর্থাৎ তার সালাত সহীহ নয়), একমাত্র যার একটি অজুহাত রয়েছে সে ব্যক্তি ছাড়া।(সুনানে তিরমিজি হা/২১৭ সনদ সহীহ) শরীয়তে এমন কোন প্রমাণ নেই যে এই বিধানটি শুধুমাত্র সফরকারীর জন্য প্রযোজ্য, যদি না মসজিদে যাওয়া আপনার সফরে কিছু সমস্যা সৃষ্টি করে, যেমন আপনার বিশ্রাম ও ঘুমের প্রয়োজন হলে এবং আপনি যেখানে আছেন সেখানে সালাত পড়তে চান। এমনভাবে থাকা যাতে আপনি ঘুমাতে পারেন, অথবা আপনি ভয় পাচ্ছেন যে আপনি মসজিদে গেলে ইমাম সালাত পড়তে দেরি করবেন এবং আপনি চলে যেতে চান এবং আপনি ভয় পাচ্ছেন যে আপনি ট্রেন বা প্লেন মিস করতে পারেন। (উসাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খন্ড: ১৫; পৃষ্ঠা: ৪২২)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬◐✪◑▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

সহীহ হাদীস দ্বারা কি কুরআনের কোনো আয়াতের হুকুম রহিত করা বা কোনো সাধারণ বিধানকে নির্দিষ্ট করা সম্ভব

 প্রশ্ন: সহীহ হাদীস দ্বারা কি কুরআনের কোনো আয়াতের হুকুম রহিত (নাসিখ) করা বা কোনো সাধারণ বিধানকে নির্দিষ্ট (মুকাইয়্যাদ) করা সম্ভব?

▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি। অতঃপর:
▪️প্রথমত: কুরআন এবং সুন্নাহ উভয়ই ইসলামী শরিয়তের উৎস হিসেবে একই মর্যাদায় অবস্থান করে। কারণ উভয়ই শরিয়তের উৎসগুলোর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন:وَ مَا یَنۡطِقُ عَنِ الۡهَوٰی اِنۡ هُوَ اِلَّا وَحۡیٌ یُّوۡحٰی ۙ”আর তিনি নিজের খেয়াল-খুশি অনুযায়ী কিছু বলেন না। এটা তো কেবল ওহী, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়।”(সূরা আন-নাজম: ৫৩: ৩-৪)
ইমাম খতীব বাগদাদী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর মূল্যবান গ্রন্থ “আল কিফায়াহ ফী ‘ইলমির-রিওয়ায়াহ পৃষ্ঠা: ২৩-এ একটি অধ্যায় রচনা করেছেন এই শিরোনামে:“আল্লাহর কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহর হুকুম সমমর্যাদার, এবং এ দুটোর অনুসরণ করা ওয়াজিব ও দায়িত্বস্বরূপ এরপর তিনি হাদীস উল্লেখ করেন: মিকদাম ইবনু মাদীকারিব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সাবধান! খুব শীঘ্রই এমন ব্যক্তির আগমন ঘটবে যে, সে তার সুসজ্জিত গদিতে হেলান দিয়ে বসে থাকবে, তখন তার নিকট আমার কোন হাদীস পৌছলে সে বলবে, আমাদের ও তোমাদের সামনে তো আল্লাহ তা’আলার কিতাবই আছে। আমরা তাতে যা হালাল পাব সেগুলো হালাল বলে মেনে নিব এবং যেগুলো হারাম পাব সেগুলো হারাম বলে মনে নিব। সাবধান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা হারাম ঘোষণা করেছেন তা আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক হারামকৃত বস্তুর মতোই হারাম।” (তিরমিযী হা/২৬৬৪; সিলসিলাহ সহীহা হা/২৮৭০ সনদ হাসান)।
.
আর সুন্নাহ হচ্ছে আল্লাহর কিতাব, কুরআনে যা সংক্ষেপে এসেছে, তা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে; যা সাধারণভাবে এসেছে, তা নির্দিষ্ট করে দেয়; যা মুক্ত তথা অবাধভাবে বলা হয়েছে, তাকে সীমাবদ্ধ করে; এবং কুরআনের কোন আয়াত রহিতকারী (নাসিখ), আর কোনটি রহিত (মানসুখ)—তাও স্পষ্ট করে দেয়।তাই তাবেঈদের ইমাম মাখহূল (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:القرآن أحوج إلى السنة من السنة إلى القرآن “সুন্নাহ যতটা না কুরআনের মুখাপেক্ষী, কুরআন বরং সুন্নাহর অধিক মুখাপেক্ষী।”(আল কিফায়াহ, পৃষ্ঠা: ৩০)
.
▪️দ্বিতীয়ত: কুরআনের সাধারণ বিধানকে সুন্নাহ দ্বারা নির্দিষ্ট (তাখসীস) করা এ ব্যাপারে অধিকাংশ উসূলী আলেমগণ তা বৈধ মনে করেন।
ইবনুন নাজ্জার ফাতূহী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
يخصَّصُ الكتابُ ببعضه ، وبالسنة مطلقا ، سواء كانت متواترة أو آحاد :مثال تخصيص الكتاب بالسنة – حتى مع كونها آحادا ، عند أحمد ومالك والشافعي رضي الله عنهم – : قوله سبحانه وتعالى : ( وأحل لكم ما وراء ذلكم )، فإنه مخصوص بقوله صلى الله عليه وسلم : ( لا تنكح المرأة على عمتها ، ولا على خالتها ) متفق عليه ، ونحوه تخصيص آية السرقة بما دون النصاب ، وقتل المشركين بإخراج المجوس ، وغير ذلك .
قال ابن مفلح : وعند الحنفية إن كان خص بدليل مجمع عليه جاز ، وإلا فلا . وقيل : بالوقف . وقيل : يجوز ولم يقع “
কুরআনের এক অংশকে অপর অংশ দ্বারা নির্দিষ্ট করা যায়, এবং সুন্নাহ দ্বারা নির্দিষ্ট করা যায় তা হাদীস মুতাওয়াতির হোক বা আহাদ হোক,উভয় অবস্থায়ই। উদাহরণ: কুরআনে আল্লাহ বলেন:”উল্লিখিত নারীগণ ব্যতীত আর সকলকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে…”।(সূরা নিসা: ২৪) এই সাধারণ বিধানকে রাসূল (ﷺ)-এর এই হাদীস দ্বারা নির্দিষ্ট করা হয়েছে: এক নারীর সঙ্গে তার ফুফু বা খালাকে একসাথে বিয়ে করো না। (সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত।) এর অনুরূপ আরও উদাহরণ রয়েছে, যেমন চুরির আয়াতকে মালের পরিমাণ নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট করা এবং কাফের হত্যার আয়াতকে অগ্নি উপাসকদের (মজুসদের) ব্যতিক্রম করা ইত্যাদি। ইবনু মুফলিহ বলেন: হানাফী মাযহাব মতে, যদি এটি এমন প্রমাণ দ্বারা নির্দিষ্ট করা হয় যে বিষয়ে সকলের ইজমা তথা ঐকমত্য আছে, তবে তা বৈধ; আর না হলে কেউ কেউ বিরত থাকার কথা বলেছেন,কেউ বলেছেন বৈধ তবে বাস্তবে এমন হয়নি।”(শারহুল কাওকাবুল মুনীর; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩৫৯-৩৬৩)
.
ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: আল-কুরআনুল কারীমকে ‘খবরুল-ওয়াহিদ’ (একজন বর্ণনাকারীর বর্ণিত হাদীস) দ্বারা খাস (বিশেষ) করা যাবে কি না এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে: জামহুর আলেমগণ: তারা বলেন, এটি সর্বদা বৈধ। কিছু হানাবিলা (حنابلة): তারা বলেন, এটি একেবারেই বৈধ নয়। ইমাম গাযযালী ‘আল-মুনখুল’ গ্রন্থে এই মতটি মুতাযিলা ফেরকার পক্ষ থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবনু বুরহান এটি কিছু কালামবিদ ও ফকীহদের থেকে বর্ণনা করেছেন। আবুল হুসাইন ইবনু কাত্তান একদল ইরাকি আলেমের পক্ষ থেকেও এই মতটি উল্লেখ করেছেন। কারখী: তিনি বলেন, কুরআনের সাধারণ নির্দেশ (عام) যদি আগে থেকেই কোনো আলাদা দলীল দ্বারা খাস (বিশেষ) করা হয়ে থাকে তা সে দলীল কাত’ঈ (নিশ্চিত) হোক বা ظني (ধারণাপ্রসূত) তাহলে খবরুল-ওয়াহিদ দিয়ে খাস করা যাবে। কিন্তু যদি তা কোনো সংযুক্ত দলীল (مثل الاستثناء বা الشرط) দ্বারা খাস করা হয়ে থাকে, বা আদৌ খাস করা না হয়ে থাকে তবে খবরুল-ওয়াহিদ দ্বারা খাস করা যাবে না। কাযী আবু বকর: তিনি এই ব্যাপারে ‘ওয়াকফ’ অর্থাৎ নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেছেন (না বৈধ বলেছেন, না অবৈধ)।ইমাম ফখরুদ্দিন রাজী তার ‘আল-মাহসূল’ গ্রন্থে জামহুরদের মতের সমর্থনে দলীল হিসেবে বলেছেন:”আল্লাহর কিতাবের সাধারণ হুকুম (عام) ও খবরুল-ওয়াহিদ দুটিই দলীল। কিন্তু খবরুল-ওয়াহিদ হচ্ছে সাধারণ হুকুমের তুলনায় বেশি নির্দিষ্ট তাই খবরুল-ওয়াহিদকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।” ইবনুস সামআনী এই জায়েজ হওয়ার পক্ষে সাহাবাদের ইজমা (সামূহিক সম্মতি) দ্বারা দলীল দিয়েছেন। যেমন:তাঁরা আল্লাহর বলেন:”আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে তোমাদেরকে অসিয়ত করেন.. (সূরা নিসা: ১১) এই আয়াতকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর এই হাদীস দ্বারা খাস করেছেন:”إنا معشر الأنبياء لا نورث”(‘আমরা নবীগণ উত্তরাধিকারী রাখি না।’) তেমনি তাঁরা মুসলমানদের উত্তরাধিকারকে সীমিত করেছেন এই হাদীসের মাধ্যমে:”لا يرث المسلم الكافر”(‘মুসলমান কাফেরের উত্তরাধিকারী হয় না।’) তাঁরা এই আয়াত فاقتلوا المشركين (অতএব, মুশরিকদের হত্যা করো।(সূরা তওবা: ৫) এই আয়াতকে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ
(রাযি.)-থেকে বর্ণিত, মাজুসদের (অগ্নিপূজকদের) বিষয়ে আগত হাদীস দ্বারা খাস করেছেন। এরকম আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে। এছাড়াও স্পষ্ট একটি দলীল হলো: আল্লাহর পক্ষ থেকে বারবার এমন নির্দেশ এসেছে যে, তাঁর নবীর অনুসরণ করতে হবে কোনো সীমাবদ্ধতা ছাড়া। সুতরাং যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে কোনো দলীল পাওয়া যায়, তখন তা মান্য করা ফরজ। যদি তা কুরআনের কোনো সাধারণ হুকুমের বিরোধিতা করে, তাহলে عام (সাধারণ) হুকুমকে خاص (বিশেষ) হাদীসের আলোকে ব্যাখ্যা করাই কর্তব্য। কারণ, কুরআনের সাধারণ নির্দেশ কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর প্রয়োগ করা হবে এ ধারণাটি ‘ظني’ অর্থাৎ ধারণার উপর ভিত্তি করে, নিশ্চিত নয়। এজন্য সহীহ ‘আহাদ’ হাদীস দ্বারা খাস করায় কোনো বাধা নেই।”(ইরশাদুল ফুহূল; পৃষ্ঠা: ২৬৭–২৮৬)
.
আল্লামা আল আমীন শানক্বীতি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: اعلم أن التحقيق أنه يجوز تخصيص المتواتر بأخبار الآحاد ؛ لأن التخصيص بيان ، وقد قدمنا أن المتواتر يبيَّن بالآحاد ، قرآنًا أو سنة “জেনে রাখো, সঠিক মত হলো মুতাওয়াতির (নিশ্চিতভাবে প্রচলিত) দলীলকে ‘খবরুল-ওয়াহিদ’ দ্বারা খাস করা বৈধ। কারণ, খাস করা মানেই ব্যাখ্যা করা,আর আমরা আগেই বলেছি যে, মুতাওয়াতির দলীলকে আহাদ হাদীস দ্বারাও ব্যাখ্যা করা বৈধ তা কুরআন হোক বা সুন্নাহ।”(মুযাক্কিরা ফি উসূলিল ফিকহ: ২২২)
.
▪️তৃতীয়ত: কুরআনের কোনো আয়াত সুন্নাহর দ্বারা রহিত (নাসখ) হতে পারে কি না এই বিষয়ে আলেমের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, যা প্রধানত দুটি দৃষ্টিভঙ্গিতে বিভক্ত।”
প্রথম মত: আহাদ হাদীসের দ্বারা কুরআনের আয়াত নাসখ (বাতিল বা রহিত) করা বৈধ নয় এটাই অধিকাংশ উসূলবিদের মতামত। বরং ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আর-রিসালাহ (পৃষ্ঠা ১০৬–১০৯)-এ এবং ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) উভয়েই মত দিয়েছেন যে, কুরআনের আয়াতকে এমনকি মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারাও নাসখ রহিত করা জায়েয নয়।এই মতকে ইমাম ইবনু কুদামাহ এবং ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ ও সমর্থন করেছেন। এই বিষয়ে অধিক বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যাবে ইমাম যারকশী আল-শাফি‘ঈর গ্রন্থ আল-বাহরুল মুহীত (খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ২৬২–২৭২)-এ।
দ্বিতীয় মত: আহাদ হাদীস দ্বারা কুরআনের আয়াত নাসখ করা জায়েজ। এই মত কিছু হানাফি উসূলবিদ গ্রহণ করেছেন, যেমন ” (৩/৬২)” গ্রন্থে রয়েছে। এটি সুবকী তাঁর “জামউল জাওয়ামি” (পৃষ্ঠা: ৫৭) গ্রন্থে গ্রহণ করেছেন, যেখানে তিনি বলেন: “কুরআন দ্বারা কুরআন ও সুন্নাহ নাসখ হয়, আর সুন্নাহ দ্বারা কুরআনও। বলা হয়েছে: আহাদ দ্বারা নাসখ জায়েজ নয়। আর সত্য হলো নাসখ কেবল মুতাওয়াতির দ্বারাই ঘটেছে। এটি আল্লামা মুহাম্মাদ আল আমীন শানকিতি (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতও,
.
মুহাম্মাদ আল আমীন শানকিতি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
الذي يظهر لنا أنه الصواب : هو أن أخبار الآحاد الصحيحة يجوز نسخ المتواتر بها إذا ثبت تأخرها عنه ، وأنه لا معارضة بينهما ; لأن المتواتر حق ، والسنة الواردة بعده إنما بينت شيئا جديدا لم يكن موجودا قبل ، فلا معارضة بينهما البتة لاختلاف زمنهما .
فقوله تعالى : ( قل لا أجد في ما أوحي إلي محرما على طاعم يطعمه إلا أن يكون ميتة أو دما مسفوحا أو لحم خنزير فإنه رجس أو فسقا أهل لغير الله به فمن اضطر غير باغ ولا عاد فإن ربك غفور رحيم )
يدل بدلالة المطابقة دلالة صريحة على إباحة لحوم الحمر الأهلية ; لصراحة الحصر بالنفي والإثبات في الآية في ذلك .
فإذا صرح النبي صلى الله عليه وسلم بعد ذلك يوم خيبر في حديث صحيح بأن لحوم الحمر الأهلية غير مباحة ، فلا معارضة البتة بين ذلك الحديث الصحيح ، وبين تلك الآية النازلة قبله بسنين ; لأن الحديث دل على تحريم جديد ، والآية ما نفت تجدد شيء في المستقبل كما هو واضح .
فالتحقيق – إن شاء الله – هو جواز نسخ المتواتر بالآحاد الصحيحة الثابت تأخرها عنه ، وإن خالف فيه جمهور الأصوليين “
“আমাদের কাছে যেটি সঠিক মনে হয়,তা হলো: সহীহ ‘আহাদ’ হাদীস দ্বারা ‘মুতাওয়াতির’ দলীলকে নাসখ (বাতিল বা রহিত) করা বৈধ, যদি তা প্রমাণিত হয় যে ঐ ‘আহাদ’ হাদীসটি ‘মুতাওয়াতির’ দলীলের পরে অবতীর্ণ হয়েছে। এতে কোনো দ্বন্দ্ব বা বিরোধ নেই; কারণ মুতাওয়াতির দলীল তো সত্য এবং তার পরবর্তী সুন্নাহ কেবল একটি নতুন হুকুম বা বিধান জানাচ্ছে, যা পূর্বে ছিল না। ফলে, উভয়ের মধ্যে কোনো বিরোধের অবকাশ নেই, কারণ তারা সময় ও প্রেক্ষিতভেদে অবতীর্ণ হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ,আল্লাহ তাআলার এই বাণী: “বলুন, আমার প্রতি যে ওহী হয়েছে তাতে, লোকে যা খায় তার মধ্যে আমি কিছুই হারাম পাই না, মৃত, বহমান রক্ত ও শুকরের মাংস ছাড়া।কেননা এগুলো অবশ্যই অপবিত্র অথবা যা অবৈধ, আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য উৎসর্গের কারণে। তবে যে কেউ অবাধ্য না হয়ে এবং সীমালংঘন না করে নিরুপায় হয়ে তা গ্রহণে বাধ্য হয়েছে, তবে নিশ্চয় আপনার রব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”(সূরা আন‘আম, আয়াত: ১৪৫) এই আয়াত সরাসরি ও স্পষ্টভাবে গৃহপালিত গাধার মাংস বৈধ হওয়াকে প্রমাণ করে; কারণ এই আয়াতে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ জিনিসগুলোকে নির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অতঃপর বহু বছর পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বার যুদ্ধের দিন, একটি সহীহ হাদীসে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে গৃহপালিত গাধার মাংস খাওয়া হারাম তাহলে এই হাদীস ও পূর্বের কুরআনি আয়াতের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। কারণ হাদীসটি একটি নতুন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এসেছে, এবং আয়াতটি ভবিষ্যতে নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা অবতীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনাকে নাকচ করেনি যা স্পষ্ট।সুতরাং সঠিক গবেষণালব্ধ মতামত ইনশাআল্লাহ হলো, মুতাওয়াতির (আয়াত) কে সহীহ আহাদ দ্বারা নাসখ (বাতিল) করা বৈধ, যদি সহীহভাবে প্রমাণিত হয় যে, ঐ হাদীসটি মুতাওয়াতির দলীলের পরে এসেছে যদিও অধিকাংশ উসূলবিদ এতে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।”(আজওয়াউল ঈমান; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৪৫১-৪৫২)
.
আবু হামিদ মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ আল-গাজালি আত-তুসি,(রাহিমাহুল্লাহ) “আল মুস্তাসফা” গ্রন্থে বলেন:وأما نسخ القرآن بالسنة فنسخ الوصية للوالدين والأقربين بقوله صلى الله عليه وسلم: ألا لا وصية لوارث. لأن آية الميراث لا تمنع الوصية للوالدين والأقربين إذ الجمع ممكن…কুরআনের আয়াতের হুকুমকে সুন্নাহ দ্বারা নাসখ (বাতিল/প্রতিস্থাপন) করার উদাহরণ হলো মৃত্যুর সময় পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য ওসিয়ত করার বিষয়ে কুরআনের নির্দেশকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণী দ্বারা নাসখ ধরা:সাবধান! উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য কোনো ওসিয়ত নেই।”(ইবনু মাজাহ হা/২৭১৪) কারণ, কুরআনের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আয়াতে ওয়ারিস পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য নির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণ করা হলেও,তা ওসিয়ত দেয়ার নিষেধাজ্ঞা প্রমাণ করে না।বরং উভয় হুকুমকে একত্রে গ্রহণ করাও সম্ভব..।”(গাজালি আল মুস্তাসফা; পৃষ্ঠা: ১০০)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:সুন্নাহ কি কুরআনকে নাসখ (বাতিল) করতে পারে নাকি পারে না?
উত্তরে শাইখ বলেন:
:السنة تخصصه، أو تقيد مطلقه، ولا تنسخه عند أهل العلم، والنسخ يختلف فيه العلماء في معناه، فعند السلف والقدماء يسمون التخصيص نسخًا، وهذا يقع في السنة تنسخ بمعنى تخصص، وتقيد. أما أنها ترفع حكم الآية بالكلية الذي هو المصطلح الأخير عند الأصوليين، فإن السنة لا ترفع أحكام القرآن، وإنما تخصص، قد تكون الآية عامة، فتأتي السنة فتخصص كما في قوله -جل وعل-ا: يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ [النساء:11] هذه الآية خصصها قول النبي ﷺ: لا يرث المسلم الكافر فهي عامة مقيدة مخصصة بهذا الحديث مع آيات أخرى بالمعنى.
“সুন্নাহ কুরআনের কোনো হুকুমকে তাখসীস (নির্দিষ্ট) করে অথবা কুরআনের মুক্ত হুকুমকে তাক্বয়ীদ (সীমাবদ্ধ) করে। কিন্তু তা কুরআনের হুকুমকে নাসখ (সম্পূর্ণভাবে বাতিল) করে না আহলুল ইলমদের মতে। ‘নাসখ’ শব্দের অর্থ ও প্রয়োগ বিষয়ে আলেমদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। সলফে সালিহীন ও প্রাচীন উসূলবিদদের কাছে ‘তাখসীস’ (নির্দিষ্টকরণ)-কেও ‘নাসখ’ বলা হতো। এই অর্থে বলা যায়, সুন্নাহ কখনো কখনো (কুরআনকে) নাসখ করে (অর্থাৎ, তা তাখসীস ও তাক্বয়ীদ করে।)” কিন্তু পরবর্তীকালের উসূলবিদদের পরিভাষায় ‘নাসখ’ বলতে বোঝানো হয়: কোনো আয়াতের হুকুম সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করে দেওয়া। এই অর্থে সুন্নাহ কুরআনের হুকুমকে বিলুপ্ত করে না। বরং এটি কোনো আয়াতকে নির্দিষ্ট করে দেয়।উদাহরণস্বরূপ,আল্লাহ তাআলা বলেন;يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ “আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে তোমাদেরকে অসিয়ত করছেন।”(সূরা আন-নিসা: ১১) এই আয়াতটি সাধারণভাবে সকল সন্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:«لا يَرِثُ المسلمُ الكافرَ“মুসলিম কাফেরের উত্তারাধিকারী হয় না”(সহীহ বুখারী হা/৬৭৬৪) এই হাদীসটি ঐ আয়াতের সাধারণতা কমিয়ে দিয়েছে; অর্থাৎ এই হাদীস দ্বারা সেই আয়াতকে সীমাবদ্ধ ও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এমন আরও কিছু আয়াত রয়েছে, যেগুলোকে অর্থের দিক দিয়ে হাদীস দ্বারা নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।”(বিন বায অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফাতওয়া নং-৩৫৩৭) এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া-১৩৮৭৪২)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬◐✪◑▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

এই উম্মতের জন্য কোন ফিতনা অধিক মারাত্মক দাজ্জালের ফিতনা নাকি নারীদের ফিতনা

ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। অতঃপর এই উম্মতের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর ফিতনা দাজ্জাল নাকি নারীরা এই প্রশ্নটি গভীরভাবে ব্যাখ্যার দাবি রাখে। কারণ আমরা সহীহ হাদীসসমূহে ফিতনা সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরনের বর্ণনা দেখতে পাই, যা এই বিষয়টিকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করে।কুরআন সুন্নাহর আলোকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়; নারী-সংক্রান্ত ফিতনার প্রভাব মূলত ব্যক্তির নৈতিকতা, চরিত্র ও কামনা-বাসনার জগতে সীমাবদ্ধ। এটি মানুষের আত্মসংযম, চরিত্র গঠন এবং তাক্বওয়ার জন্য এক বিশাল পরীক্ষা। এই ফিতনা বাহ্যিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও এর অন্তর্নিহিত বিপদ লুকিয়ে থাকে নফসের দুর্বলতা, প্রবৃত্তির কাছে পরাজয় এবং সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়ের মধ্যে। অন্যদিকে দাজ্জালের ফিতনা একেবারে ঈমান, তাওহীদ এবং দ্বীনের মৌলিক আকীদার উপর সরাসরি আঘাত হানে। এটি মানুষের ঈমানকে ধ্বংস করে দেওয়ার মতো ভয়াবহ এক পরীক্ষা, যা শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়েই নয়, বরং সমগ্র উম্মাহ নারী পুরুষ উভয়ের আকীদাগত ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এই ফিতনা চাক্ষুষ মু‘জিযা ও ধোঁকায় পরিপূর্ণ, যা কেবল আল্লাহর সাহায্য, দৃঢ় ঈমান ও সুগভীর ইলম ছাড়া মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সুতরাং এ দুই ফিতনার প্রকৃতি একে অপরের থেকে ভিন্ন। নারীদের ফিতনা মূলত শারীরিক ও নৈতিক পরীক্ষা, আর দাজ্জালের ফিতনা হলো চূড়ান্ত ঈমানি ও আক্বীদাগত পরীক্ষা। এই পার্থক্য আমাদেরকে ফিতনা চেনার ও তা থেকে আত্মরক্ষার পদ্ধতিকে ভিন্নভাবে নির্ধারণ করার দিকে আহ্বান জানায়। উদাহরণস্বরূপ:
.
আদম (আলাইহিস সালাম) সৃষ্টি থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে দাজ্জালের ফিতনা হচ্ছে সবচেয়ে বড় ফিতনা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সংবাদ দিয়েছেন। এজন্য নূহ আলাইহিস সালাম থেকে আরম্ভ করে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সকল নবীই তাদের সম্প্রদায়কে দাজ্জালের ভয় দেখিয়েছেন। যাতে তারা সাবধান থাকতে পারে এবং দাজ্জালের বিষয়টি তাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে যায়। রাসূলদের দায়িত্ব ছিল উম্মতকে সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে সাবধান করা। যেমন আবূ দাহমা, আবূ কাতাদাহ্ (রাযি:) ও অনুরূপ আরো কতক ব্যক্তি থেকে বর্ণিত, তাঁরা বলেন, হিশাম ইবনু ‘আমির এর সামনে দিয়ে আমরা ‘ইমরান ইবনু হুসায়নের কাছে যেতাম। একদিন হিশাম (রা.) বললেন, তোমরা আমাকে অতিক্রম করে এমন লোকের কাছে যাচ্ছ, যারা আমার চেয়ে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট বেশী উপস্থিত হয়নি এবং যারা রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদীসের ব্যাপারে আমার চেয়ে বেশি জানে না। আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, আদম (‘আ:)-এর সৃষ্টির পর হতে কিয়ামাত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দাজ্জালের চেয়ে মারাত্মক আর কোন সৃষ্টি হবে না।”(সহিহ মুসলিম হা/৭২৮৫; ই.ফা. ৭১২৮, ই.সে. ৭১৮১) কাযী ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন;( أمر أكبر من الدجال ) فهو كبر الشأن وعظم الفتنة، لا كبر الجسم، هذا الأظهر، وقد يحتمل أنه يشير إلى عظم الجسم “এটি দজ্জালের চেয়েও বড় বিষয় অর্থাৎ গুরুত্ব ও ফিতনার দিক থেকে বড়, শরীরের আকারে বড় নয়, এটিই সবচেয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা। তবে এটি শরীরের আকার বড় হওয়ার দিকেও ইঙ্গিত করতে পারে, এমন সম্ভাবনাও থাকতে পারে।” (ইকমালুল মু‘আল্লিম; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৫০৪)।
.
অপরদিকে নারীদের ফিতনা সম্পর্কে উসামা ইবনে যায়েদ (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন,“পুরুষ জাতির জন্য নারীদের অপেক্ষা অধিক ক্ষতিকর কোনো ফিতনা আমি রেখে গেলাম না।”(সহীহ বুখারী, হা/৫০৯৬; সহীহ মুসলিম, হা/২৭৪০; তিরমিযী, হা/২৭৮০; ইবনু মাজাহ, হা/৩৯৯৮; আহমাদ, হা/২১৭৪৬) তিনি (ﷺ) আরও বলেছেন, “সুতরাং তোমরা দুনিয়ার মোহ থেকে বেঁচে থাক এবং নারীদের ব্যাপারে সাবধান থাক। কেননা বানী ইসরাঈল জাতির মধ্যে সর্বপ্রথম নারীদের মাঝেই ফিতনা সংঘটিত হয়েছিল।” (সহীহ মুসলিম, হা/২৭৪২; তিরমিযী, হা/২১৯১; ইবনু হিব্বান, হা/৩২২১; আহমাদ, হা/১১১৪৩; বাইহাক্বী, হা/৬৭৪৬) হাদীস দুটি থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, নারীর চেয়ে ভয়ংকর ফিতনা পুরুষের জীবনে আর নেই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বাণী কখনো মিথ্যা হতে পারে না। পুরুষের পরীক্ষার জন্য বা বিপদে ফেলার জন্য নারী সবচেয়ে বড় অস্ত্র। একজন বিজ্ঞ-সচেতন পুরুষকে নারী যত দ্রুত তার বশে আনতে পারে পৃথিবীতে তা আর কেউ পারে না। নারী পুরুষের জ্ঞান-বুদ্ধি বিকল করে ফেলতে পারে। তাকে ইচ্ছা মতো তার পিছনে পিছনে ঘুরাতে পারে। প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাকে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। তার মোহিনী জালে যে কাউকে আটকে ফেলতে পারে। আল্লাহ যাকে হেফাযত করবেন তা ভিন্ন কথা। বিধায় তাদের থেকে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
.
উপরোক্ত হাদিসের ব্যাখ্যা ইবনে বাত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وفى حديث أسامة أن فتنة النساء أعظم الفتن مخافة على العباد؛ لأنه عليه السلام عمم جميع الفتن بقوله: (ما تركت بعدى فتنة أضر على الرجال من النساء) ، ويشهد لصحة هذا الحديث قول الله تعالى: ( زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ ) الآية، فقدم النساء على جميع الشهوات. وقد روى عن بعض أمهات المؤمنين أنها قالت: من شقائنا قدمنا على جميع الشهوات. فالمحنة بالنساء أعظم المحن، على قدر الفتنة بهن، وقد أخبر الله مع ذلك أن منهن لنا عدوًا، فينبغى للمؤمن الاعتصام بالله، والرغبة إليه في النجاة من فتنتهن، والسلامة من شرهن “উসামার (রা.) হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, নারীদের ফিতনা অন্যান্য সকল ফিতনার তুলনায় সবচেয়ে ভয়ানক ও আশঙ্কাজনক বান্দাদের জন্য। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই হাদীসে সবধরনের ফিতনাকে সাধারণভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন তাঁর এই বাণীর মাধ্যমে: ‘আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কোনো ফিতনা রেখে যাইনি।”হাদীসের সত্যতার প্রমাণ কুরআনের এই আয়াত থেকেও মেলে:زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ”মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে প্রবৃত্তির ভালবাসা- নারী, সন্তানাদি”…(সূরা আলে ইমরান: ১৪)
এই আয়াতে আল্লাহ নারীকে সকল কামনার শীর্ষে স্থান দিয়েছেন। এ বিষয়ে মুমিনদের একজন মাতা (উম্মুল মুমিনীন) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছিলেন: “আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে, আমাদেরকেই সমস্ত কামনার আগে স্থান দেওয়া হয়েছে।” অতএব, নারীদের মাধ্যমে পরীক্ষা (মিহনাহ) সবচেয়ে কঠিন ও বড় ধরনের পরীক্ষা এটি নির্ভর করে তাদের ফিতনার মাত্রার উপর।আর আল্লাহ তাআলা এটাও জানিয়েছেন যে, তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু। তাই একজন মুমিন ব্যক্তির উচিত আল্লাহর আশ্রয়ে থাকা, এবং এই ফিতনা থেকে মুক্তি ও নারীদের অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তার জন্য তাঁর কাছে প্রার্থনা করা”।(ইবনু বাত্তাল, শারহু সহীহিল বুখারী, খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ১৮৮)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
: وفي قول الرسول صلوات الله وسلامه عليه : ( ما تركت بعدي فتنة أضر على الرجال من النساء ) دليل على عظم فتنة النساء وأنه يجب علينا التحرز بقدر المستطاع من الوقوع في فتنتهن لأن المرأة تفتن الرجل حتى ربما يكفر بالله العظيم من أجلها وقد ذكر مرّ بي في أحد الكتب أظنه لابن الجوزي أن مؤذناً صعد المنارة ليؤذن فرأى امرأة جميلة على سطح فأعجبته وتعلقت نفسه بها فاتصل بها فقالت له إنها نصرانية ولا تقبل أن تتزوج به حتى يتنصر فحاولها فأبت إلا أن يتنصر ، فتنصر والعياذ بالله فلما تنصر قالت له إذا كان هذا دينك وعقيدتك بهذا الرخص عندك فأنا قد أكون أرخص من ذلك عندك وتطلقني بأدني سبب ولا رغبة لي فيك شوف كيف الآن خسر الدنيا والآخرة والعياذ بالله ففتنة النساء عظيمة لأنها تدخل على الإنسان التقي والعالم والجاهل والفاسق وعلى كل أحد فيجب على الإنسان أن يحرص غاية الحرص من درء هذه الفتنة ، ليس في نفسه فقط بل حتى في مجتمعه بناءً على ذلك يجب علينا أن نبصر أولئك القوم الذين يدعون إلى سفور المرأة وتبرجها ومخالطتها للرجال وأن نبين لهم أن هذا هدم للأخلاق والأديان والمستقبل أيضاً لأن الشعوب إذا أصبحت بهيمية ليس لها إلا شهوة الفرج وملء البطن أصبحت لا قيمة لها وأصبحت ذليلة ، ذليلة أمام الدنيا وأمام جبابرة الخلق ولهذا ما استولى أعداء المسلمين على المسلمين إلا بهذه الوسائل ، زجوا لهم بالنساء كما نسمع في نكبات وقعت بالمسلمين أنهم أي الأعداء قالوا اغزوهم بالنساء يسروا لهم أمور النساء أطلقوا النساء الجميلات ووفروا لهن كل ما يفتن الرجال وسهلوا الوصول إليهن ، وحينئذٍ تملكون عقول الرجال وتملكون ديارهم وأموالهم وهذا هو الذي حصل ، وقوله عليه الصلاة والسلام : ( ما تركت بعدي فتنة أضر ) لو قال قائل إن الرسول صلى الله عليه وسلم قال : إنه ما حصلت فتنة منذ خلق آدم إلى أن تقوم الساعة أشد من فتنة المسيح الدجال فكيف نجمع بينهما نقول : لكل واحد منهما مصب فهذا فيما يتعلق بالأخلاق والعفة وذاك فيما يتعلق بالأديان فإن أعظم فتنة على الدين هي فتنة المسيح الدجال التي مرّ عليكم شيئاً منها وأن من فتنته أنه يدعو القوم إلى عبادته فيأبون فينصرف عنهم ثم يصبحون ممحلين ما عندهم زرع ولا ضرع ، ويأتي للقوم فيدعوهم فيستجيبون دعوته فيقول للسماء أمطري فتمطر ويقول للأرض أنبتي فتنبت فتصبح مواشيهم أسمن ما يكون وأكثر ما يكون لبناً وضرع هذه فتنة ولا لا ؟ والله فتنة من أعظم الفتن ، فتنة لا يسلم منها إلا من سلمه الله عز وجل .
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ বাণীতে: “আমি আমার পরে পুরুষদের ওপর নারীদের ফিতনার চেয়ে অধিক ক্ষতিকর আর কোনো ফিতনা রেখে যাইনি।” এই হাদীসে নারীদের ফিতনার ভয়াবহতা ও গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, আমাদের উচিত নারীদের ফিতনায় পতিত হওয়া থেকে যথাসম্ভব নিজেকে রক্ষা করা। কারণ, একজন নারী পুরুষকে এমনভাবে ফিতনায় ফেলতে পারে যে, সে তার কারণে মহান আল্লাহর সাথে কুফরিও করে বসতে পারে। আমি একটি বইয়ে (সম্ভবত ইবনুল জাওযীর কোনো গ্রন্থে) এমন একটি ঘটনা পড়েছি: এক মুয়াযযিন (আজান দানকারী) মিনারে উঠে আজান দিতে গিয়ে একটি সুন্দরী নারীকে ছাদে দেখল। সে নারীতে মুগ্ধ হয়ে গেল এবং তার প্রতি মন আকৃষ্ট হলো। পরে তার সাথে যোগাযোগ করলে নারীটি জানায় যে, সে একজন খ্রিস্টান এবং সে কখনোই মুসলিমের সাথে বিয়ে করবে না যতক্ষণ না সে (পুরুষটি) খ্রিস্টান হয়ে যায়। সে চেষ্টা করল, কিন্তু নারী তাতে রাজি হয়নি যতক্ষণ না সে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে। অবশেষে সে (পুরুষ) খ্রিস্টান হয়ে গেল আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন! এরপর নারীটি তাকে বলে: “যদি তোমার ধর্ম ও আকীদা এতটাই তোমার কাছে সস্তা হয় যে, আমার কারণে তুমি তা ছেড়ে দিতে পারো, তবে আমি তো তোমার কাছে আরও সস্তা হতে পারি! তুমি সামান্য কারণেই আমাকে তালাক দিতে পারো, তাই আমার আর তোমার মধ্যে কোনো আগ্রহ নেই। দেখো, সে ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই হারিয়ে ফেলল! আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। নারীদের ফিতনা খুবই ভয়ংকর, কারণ এটি ধার্মিক, আলেম, অজ্ঞ, পাপী সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যেই প্রবেশ করে। তাই মানুষের উচিত নিজের এবং তার সমাজের মধ্যেও এই ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। এর আলোকে আমাদের উচিত: যারা নারীকে প্রকাশ্যে আনতে, তাকে সাজিয়ে-গুজিয়ে পুরুষদের সাথে মেলামেশার দিকে আহ্বান জানায়, তাদেরকে সতর্ক করা। তাদের বোঝানো উচিত যে, এটি নৈতিকতা, ধর্ম ও ভবিষ্যতের ধ্বংসের পথ। কারণ, যখন কোনো জাতি পশুবৎ হয়ে পড়ে তাদের লক্ষ্য থাকে কেবল যৌন সুখ ও পেট পূরণ তখন সে জাতির আর কোনো মূল্য থাকে না, তারা লাঞ্ছিত হয়ে পড়ে। তারা দুনিয়ার সামনে ও দুনিয়ার জালিমদের সামনে অপমানিত হয়ে পড়ে। এ কারণেই মুসলিমদের শত্রুরা মুসলিমদেরকে পরাজিত করতে নারীদেরকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। যেমন আমরা মুসলিমদের দুর্যোগে শুনে থাকি, শত্রুরা বলেছে: “তাদেরকে নারীদের মাধ্যমে আক্রমণ করো। নারীদের বিষয় সহজ করে দাও। সুন্দরী নারীদের সামনে আনো, তাদের এমনভাবে সাজাও যা পুরুষদের ফিতনায় ফেলবে এবং তাদের কাছে পৌঁছানো সহজ করে দাও। এইভাবে তারা পুরুষদের মস্তিষ্ককে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় এবং তাদের ঘরবাড়ি ও সম্পদও দখল করে নেয়।এটাই বাস্তবে ঘটেছে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ বাণী: “আমি আমার পরে পুরুষদের ওপর নারীদের ফিতনার চেয়ে অধিক ক্ষতিকর আর কোনো ফিতনা রেখে যাইনি।” এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারে রাসূল (ﷺ) তো বলেছেন, আদম (আঃ) থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ফিতনা হবে দাজ্জালের ফিতনা তাহলে এই দুটি কথার মধ্যে সমন্বয় কীভাবে করা যাবে?” উত্তর হবে: দুইটি ফিতনার ক্ষেত্র ভিন্ন। নারীর ফিতনা হলো নৈতিকতা ও চরিত্রের ক্ষেত্রে। আর দাজ্জালের ফিতনা হলো ধর্ম ও আকীদার ক্ষেত্রে। দাজ্জালের ফিতনা ধর্মের উপর সবচেয়ে ভয়ানক ফিতনা। তোমরা তার কিছু বিবরণ শুনেছো: সে কিছু জাতিকে ডেকে বলবে তাকে ইবাদত করতে, তারা অস্বীকার করবে। তখন সে তাদের ছেড়ে চলে যাবে, এবং পরদিন তারা দুর্ভিক্ষে পড়বে তাদের কোনো ফসল বা পশু থাকবে না। সে আরেক জাতিকে ডেকে বলবে, তারা রাজি হয়ে যাবে। তখন সে আকাশকে বলবে বৃষ্টি দাও বৃষ্টি হবে। সে মাটিকে বলবে উদ্ভিদ ফলাও মাটি ফলাবে। তাদের গবাদিপশু সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান হয়ে যাবে এবং সবচেয়ে বেশি দুধ দেবে। এটা কি ফিতনা নয়? আল্লাহর কসম, এটা অন্যতম বড় ফিতনা। এমন ফিতনা যার থেকে কেবল আল্লাহ যাকে রক্ষা করবেন, সেই বাঁচতে পারবে।”(ইবনু উসাইমিন,https://alathar.net/home/esound/index.php?op=codevi…; এবং ইবনু উসাইমীন; শারহু রিয়াজুস সলিহিন; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৫১-১৫৩)
.
শায়খ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:
فظاهر حديث أسامة هو عن فتن الشهوات التي تعترض المؤمن في حياته وعيشه، دائما، وهي كانت على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم، وبقيت بعد أن توفاه الله ، ثم لا تزال مستمرة في كل زمن، من الافتتان بالنساء والأموال والجاه ونحو هذا، فهذه الفتن أخطرها فتنة النساء. وأما فتنة الدجال فليست داخلة في هذا النوع من الفتن؛ لأنها فتنة لم يتركها النبي صلى الله عليه وسلم موجودة فهي لم تأت بعد، وهي ليست من جنس فتن الشهوات، بل هي من فتن الشبهات.كما أن حديث أسامة عن الفتن المختصة بالرجال دون النساء، أما الدجال فهو فتنة للجميع.
উসামা (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) বর্ণিত হাদীসের বাহ্যিক প্রমাণে বোঝা যায়, এখানে এমন সব কামনামূলক (شهوات) ফিতনার কথা বলা হয়েছে, যা একজন মুমিন তার জীবনধারণ ও জীবিকার পথে সদা-সর্বদা সম্মুখীন হয়। এসব ফিতনা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগেও ছিল, তিনি ওফাত লাভ করার পরও তা বিদ্যমান ছিল, এবং তা এখনো প্রতিটি যুগে অব্যাহত রয়েছে। এই ফিতনাগুলোর মধ্যে রয়েছে নারী, ধন-সম্পদ, পদমর্যাদা ও খ্যাতি প্রভৃতির প্রতি আসক্তি। আর এ সকল ফিতনার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক হলো নারীদের ফিতনা। অন্যদিকে দাজ্জালের ফিতনা এই শ্রেণিভুক্ত নয়; কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ওফাত লাভ করেন, তখনও এ ফিতনা উদ্ভূত হয়নি। এটি এখনো আগত এবং এটি কামনামূলক ফিতনা নয়, বরং এটি সংশয় ও বিভ্রান্তির (شبهات) ফিতনার অন্তর্ভুক্ত। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উসামা (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) বর্ণিত হাদীসে যেসব ফিতনার কথা এসেছে, সেগুলো মূলত পুরুষদের প্রতি কেন্দ্রীভূত, পক্ষান্তরে দাজ্জালের ফিতনা নারী-পুরুষ সকলের জন্যই বিপজ্জনক এবং সর্বব্যাপী।”(ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া নং-৪৩৪২৩৯) মহান আল্লাহ আমাদেরকে যাবতীয় ফেতনা থেকে হেফাজত করুন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬◐✪◑▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।

অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব। 

হাদিসে উল্লেখিত নজদ এর অর্থ

 হাদিসে উল্লেখিত ‘নজদ’ এর অর্থ: সঠিক ব্যাখ্যা জানুন এবং বিভ্রান্তি থেকে বাঁচুন।

প্রশ্ন: হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, “ফিতনা নজদ থেকে বের হবে অথবা দজ্জাল নজদের ভূমি থেকে বের হবে।” ‘নজদ’ শব্দের অর্থ কী? এই হাদিসের উদ্দেশ্য কী? নজদ কী? এবং (আরবের) নজদ কি অন্য কোনও হাদিসে উল্লেখ হয়েছে? আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, এবং সালাত ও সালাম আল্লাহর রসুল এবং তাঁর পরিবার ও সাহাবীদের ওপর। অতঃপর:
ইমাম বুখারি তাঁর সহীহ গ্রন্থে ‘কিতাবুল ফিতান’ অধ্যায়ে ইবনে উমর রা. এর হাদিস বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন:
“الفتنة ها هنا، الفتنة ها هنا، من حيث يطلع قرن الشيطان، أو قال: قرن الشمس”
“ফিতনা এখান থেকে আসবে, ফিতনা এখান থেকে আসবে, যেখান থেকে শয়তানের শিং উদিত হয়।” অথবা তিনি বললেন: “সূর্যের শিং উদিত হয়।” অন্য এক বর্ণনায় তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পূর্ব দিকে মুখ করে বলতে শুনেছেন:
“ألا إن الفتنة ها هنا من حيث يطلع قرن الشيطان”
“ সাবধান! ফিতনা এখান থেকে আসবে, যেখান থেকে শয়তানের শিং উদিত হয়।”
– আরেকটি বর্ণনায় তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি (ইবনে উমর রা.) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
“اللهم بارك لنا في شامنا، اللهم بارك لنا في يمننا”
“ হে আল্লাহ! আমাদের শামে বরকত দিন, হে আল্লাহ! আমাদের ইয়েমেনে বরকত দিন।” লোকেরা বলল: “وفي نجدنا؟” “এবং আমাদের নজদে?” তিনি বললেন: “اللهم بارك لنا في شامنا، اللهم بارك لنا في يمننا” “হে আল্লাহ! আমাদের শামে বরকত দিন, হে আল্লাহ! আমাদের ইয়েমেনে বরকত দিন।” লোকেরা আবার বলল: “يا رسول الله، وفي نجدنا؟” “হে আল্লাহর রসুল! এবং আমাদের নজদে?”
বর্ণনাকারী বলেন, আমার ধারণা, তৃতীয়বার তিনি বললেন:
“هناك الزلازل، والفتن، وبها يطلع قرن الشيطان”
“ সেখানে ভূমিকম্প, ফিতনা এবং সেখান থেকেই শয়তানের শিং বের হবে।”
❑ ইমামদের ব্যাখ্যা:
◈ হাফিজ ইবনে হাজার ফাতহুল বারীতে বলেছেন:
«وقال الخطابي: نجد من جهة المشرق، ومن كان بالمدينة كان نجده بادية العراق، ونواحيها، وهي شرق أهل المدينة، وأصل النجد: ما ارتفع من الأرض وهي خلاف الغور، فإنه ما انخفض من الأرض، وتهامة كلها من الغور، ومكة من تهامة. انتهى.»
“ইমাম খাত্তাবি বলেন: নজদ পূর্ব দিক থেকে। যে মদিনায় ছিল, তার জন্য নজদ ছিল ইরাকের মরুভূমি এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল, যা মদিনা বাসীর পূর্ব দিকে অবস্থিত। নজদের মূল অর্থ: যা ভূমি থেকে উঁচু আর এটি ‘গাওর’-এর বিপরীত, যা ভূমি থেকে নিচু। পুরো তিহামা গাওর-এর অন্তর্ভুক্ত এবং মক্কা তিহামার অন্তর্ভুক্ত।”
«وعرف بهذا وهاء ما قاله الداودي إن نجدًا من ناحية العراق، كأنه توهم أن نجدًا موضع مخصوص، وليس كذلك، بل كل شيء ارتفع بالنسبة إلى ما يليه يسمى نجدًا، والمنخفض غورًا. اهـ.»
“এর মাধ্যমে দাউদির কথা দুর্বল প্রমাণিত হয় যে, নজদ ইরাকের দিক থেকে। যেন তিনি ধারণা করেছিলেন যে, নজদ একটি নির্দিষ্ট স্থান। কিন্তু বিষয়টি এমন নয়। বরং যা কিছু তার পাশের স্থানের তুলনায় উঁচু তাকে নজদ বলা হয়। আর নিচু স্থানকে গাওর বলা হয়।”
সুনানের হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, ফিতনা প্রাচ্য থেকে বেশি আসে এবং ইতিহাসও এর সাক্ষী।
◈ হাফিজ ইবনে হাজার ফাতহুল বারীতে আরও বলেছেন:
«وقال غيره ـ أي: غير الخطابي ـ كان أهل المشرق يومئذ أهل كفر، فأخبر صلى الله عليه وسلم أن الفتنة تكون من تلك الناحية، كما أخبر، وأول الفتن كان من قبل المشرق، فكان ذلك سببًا للفرقة بين المسلمين، وذلك ما يحبه الشيطان، ويفرح به، وكذلك البدع نشأت من تلك الجهة. اهـ.»
“অন্যরা (অর্থাৎ খাত্তাবি ছাড়া) বলেছেন: সেই সময়ে প্রাচ্যের অধিবাসীরা কাফের ছিল। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খবর দিয়েছিলেন যে, ফিতনা সেই দিক থেকে আসবে-যেমনটি তিনি খবর দিয়েছিলেন। আর প্রথম ফিতনা প্রাচ্য থেকেই এসেছিল এবং তা মুসলিমদের মধ্যে বিভেদের কারণ হয়েছিল। শয়তান এটিই পছন্দ করে এবং এতে আনন্দিত হয়। একইভাবে, বিদআতও সেই দিক থেকেই উদ্ভূত হয়েছিল।”
◈ ইমাম নববী বলেছেন:
«والمراد بذلك اختصاص المشرق بمزيد من تسلط الشيطان، ومن الكفر، كما قال في حديث آخر: “رأس الكفر نحو المشرق”، وكان ذلك في عهده صلى الله عليه وسلم حين قال ذلك، ويكون حين يخرج الدجال من المشرق، وهو فيما بين ذلك منشأ الفتن العظيمة، ومثار لكفرة الترك الفاسقة العاتية الشديدة البأس. اهـ.»
“এর উদ্দেশ্য হল, প্রাচ্যের ওপর শয়তানের অধিক আধিপত্য এবং কুফর। যেমন তিনি অন্য হাদিসে বলেছেন: رأسُ الكفْرِ نحوَ المشرِقِ “কুফরের কেন্দ্র প্রাচ্য মুখী।” [বুখারি ও মুসলিম]। এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে যখন তিনি এ কথা বলেছিলেন এবং এটি ঘটবে যখন দাজ্জাল প্রাচ্য থেকে বের হবে। এর মধ্যবর্তী সময়েও এটি বড় বড় ফিতনার উৎস এবং বিদ্রোহী ও শক্তিশালী তুর্কি কাফেরদের উত্থান স্থল।”
◈ ইমাম কাসতাল্লানি বলেছেন:
«إنما أشار عليه الصلاة والسلام إلى المشرق؛ لأن أهله يومئذ أهل كفر، فأخبر أن الفتنة تكون من تلك الناحية، وكذا وقع، فكان وقعة الجمل، ووقعة صفين، ثم ظهور الخوارج في أرض نجد، والعراق، وما وراءها، وكان أصل ذلك كله وسببه قتل عثمان بن عفان -رضي الله عنه-، وهذا علم من أعلام نبوته صلى الله عليه وسلم، وشرف، وكرم.»
“তিনি অর্থাৎ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রাচ্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। কারণ সেই সময়ে সেখানকার অধিবাসীরা কাফের ছিল। তাই তিনি জানিয়েছিলেন যে, ফিতনা সেই দিক থেকে আসবে। এবং তেমনই ঘটেছে। ওয়াকেয়ায়ে জামাল (উটের ঘটনা/উষ্ট্রের যুদ্ধ) ও সিফফিন যুদ্ধ, তারপর নজদ, ইরাক এবং তার বাইরের অঞ্চলে খারেজিদের আবির্ভাব। এই সবকিছুর মূল কারণ ছিল, উসমান ইবনে আফফান রা. এর হত্যা। এটি তাঁর নবুয়তের অন্যতম নিদর্শন, সম্মান ও মর্যাদা।” এই ইমামদের কথাকে সমর্থন করে যে, অধিকাংশ ফিতনা ও বিদআত প্রাচ্য থেকে এসেছে। যেমন: কাদিয়ানি, বাহাই, বাবিয়া, নুসাইরিয়া, দ্রজ, শিয়া-রাফেজি, মঙ্গলীয় ফিতনা, কারামিতা এবং অন্যান্য। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আছে:
“رأس الكفر نحو المشرق، والفخر، والخيلاء في أهل الخيل، والإبل، الفدادين أهل الوبر، والسكينة في أهل الغنم.”
“কুফরের কেন্দ্র প্রাচ্য মুখী। অহংকার ও দাম্ভিকতা ঘোড়া ও উটওয়ালাদের মধ্যে যারা রূঢ়ভাষী পশমওয়ালা লোক আর প্রশান্তি বকরীওয়ালাদের মধ্যে।”
◈ হাফিজ ইবনে হাজার তার ফাতহুল বারী গ্রন্থে ‘কিতাবুল বাদউল খালক (সৃষ্টির সূচনা) অধ্যায়ে বলেছেন:
«وفي ذلك إشارة إلى شدة كفر المجوس؛ لأن مملكة الفرس، ومن أطاعهم من العرب، كانت من جهة المشرق بالنسبة إلى المدينة، وكانوا في غاية القوة، والتكبر، والتجبر؛ حتى مزق ملكهم كتاب النبي صلى الله عليه وسلم، كما سيأتي في موضعه، واستمرت الفتن من قبل المشرق، كما سيأتي واضحًا في الفتن. اهـ.»
“এতে অগ্নি উপাসকদের কুফরের তীব্রতার ইঙ্গিত রয়েছে। কারণ পারস্য সাম্রাজ্য এবং তাদের অনুগত আরবরা মদিনার দিক থেকে প্রাচ্যে ছিল। তারা চরম শক্তি, অহংকার ও জুলুমে লিপ্ত ছিল। এমনকি তাদের রাজা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিঠি ছিঁড়ে ফেলেছিল, যে বিষয়ে আলোচনা যথাস্থানে আসবে। এবং ফিতনা প্রাচ্য থেকেই অব্যাহত ছিল, যেমনটি ‘ফিতান’ অধ্যায়ে স্পষ্ট হবে।”
❑ সারসংক্ষেপ:
মোটকথা: ‘নজদ’ বলতে কোনও নির্দিষ্ট স্থানকে বোঝানো হয়নি। বরং ভূমির যে কোনও উঁচু অংশই ‘নজদ’। কিন্তু হাদিস অনুযায়ী, প্রাচ্য দিকটিই এই হাদিসগুলোতে উদ্দেশ্য। আর যারা এটিকে ইরাকের নজদের সাথে সম্পর্কিত করেছেন, তা সেখানকার ফিতনার আধিক্যের কারণে। ইবনে আব্বাস রা. এর হাদিস এর প্রমাণ। তিনি বলেন:
«دعا نبي الله صلى الله عليه وسلم، فقال: اللهم بارك لنا في صاعنا، ومدنا، وبارك لنا في شامنا، ويمننا. فقال رجل من القوم: يا نبي الله، وعراقنا؟ قال: إن بها قرن الشيطان، وتهيج الفتن، وإن الجفاء بالمشرق. رواه الطبراني في الكبير، ورواته ثقات.»
“আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ করলেন এবং বললেন: হে আল্লাহ! আমাদের সা’ ও মুদ্দ-এ বরকত দিন এবং আমাদের শামে ও ইয়েমেনে বরকত দিন। তখন লোকদের মধ্য থেকে একজন বলল: হে আল্লাহর নবী! এবং আমাদের ইরাকে?
তিনি বললেন: সেখানে শয়তানের শিং এবং ফিতনা তীব্র হয় আর কঠোরতা প্রাচ্যে।” [এটি তাবারানি তাঁর ‘আল কাবির’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন এবং এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য।]
– মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থে ফুযাইল ইবনে গাজওয়ানের সূত্রে বর্ণনা করেছেন: তিনি বলেন, আমি সালিম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. কে বলতে শুনেছি:
«يا أهل العراق، ما أسألكم عن الصغيرة، وأركبكم للكبيرة! سمعت أبي، يقول: سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: “إن الفتنة تجيء من ها هنا، وأومأ بيده نحو المشرق، من حيث يطلع قرن الشيطان”.»
“হে ইরাক বাসীরা! আমি তোমাদের ছোট বিষয় নিয়ে জিজ্ঞাসা করি না, আর তোমরা বড় বিষয় নিয়ে জড়িয়ে পড়ো!
আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন: আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “ফিতনা এখান থেকে আসবে,” এবং তিনি তাঁর হাত দিয়ে প্রাচ্যের দিকে ইশারা করলেন, “যেখান থেকে শয়তানের শিং উদিত হয়।”
এটি জেনে রাখা উচিত যে, এর অর্থ এই নয় যে, এই ভূখণ্ডে বসবাসকারী বা জন্ম নেওয়া প্রত্যেককে নিন্দা করা হচ্ছে। কোনও বুদ্ধিমান ব্যক্তি এমন কথা বলবে না। কত বড় বড় জ্ঞানী, মুহাদ্দিস, ফকিহ এবং আবেদ এই অঞ্চল থেকে উঠে এসেছেন! তাঁদের মধ্যে আবু হানিফা, আহমদ, সুফিয়ান সাওরী এবং অন্যান্য অনেক মহান ব্যক্তি রয়েছেন। কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে তার স্থানের মর্যাদা বা নিকৃষ্টতার ভিত্তিতে প্রশংসা বা নিন্দা করা হয় না। বরং তার কথা ও কাজের ভিত্তিতেই বিচার করা হয়। কত মানুষ আছে যারা মক্কা, মদিনা ও শামের মতো সম্মানিত স্থানে বসবাস করেও কোনও ফজিলত, জ্ঞান, এমনকি ইমানও রাখে না। আল্লাহু আলাম। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। [সোর্স: islamweb]
❑ শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. এর ফতোয়া:
শইখের নিকট প্রশ্ন করা হয়, হাদিসে এসেছে, “হে আল্লাহ, আমাদের জন্য আমাদের শাম (সিরিয়া) ও ইয়েমেনে বরকত দিন” তারা বলল: “আর আমাদের নজদেও?” তিনি নীরব রইলেন। শয়তানের শিং কি সত্যিই নজদ থেকে বের হবে?
উত্তরে তিনি বলেন,
هذا صحيح، حديث صحيح اللهم بارك لنا في شامنا ويمننا قالوا: وفي نجدنا، فأعادها مرات، ثم قال: هناك قرن الشيطان يعني في الشرق، وأنه في نجد، وفي الشرق كله، ونجد بين الرسول ﷺ أن هناك مضر وربيعة عندهم من الشر والجفاء، قال: أصحاب الإبل.
بين -عليه الصلاة والسلام- أن قبائل العرب عندها من الجهل، وعندها من الشر ما عندها، إلا من هداه الله، وليس المقصود نجد فقط، المقصود به الشرق هاهنا من حيث يطلع قرن الشيطان، يعني من الشرق كله، شرق المدينة، وشرق الدنيا كلها، لأنه هناك وجد أصناف البدع، وأصناف الشرور، وظهرت الشيوعية، وظهر الفساد هناك في الشرق.
وكذلك يوجد في الجزيرة هذه من الشرور، وارتد كثير من العرب بعد موته ﷺ وشر في بني حنيفة، وبني أسد، وفي بني تميم، وادعى بعضهم النبوة، مسيلمة في بني حنيفة، وسجاح في بني تميم، وطليحة في بني أسد، وعماها شر كبير، ثم هداهم الله، ودخلوا في دين الله، ولكن الشر من جهة خراسان، ومن جهة ما وراء ذلك من جهة الصين، ومن جهة البلاد …. فيها شر كثير
“এটি সহিহ (বিশুদ্ধ) হাদিস। নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন: “হে আল্লাহ, আমাদের জন্য আমাদের শাম (সিরিয়া) ও ইয়েমেনে বরকত দিন।” তখন সাহাবারা বললেন: “আর আমাদের নজদেও?” তিনি কয়েকবার এর পুনরাবৃত্তি করলেন, তারপর বললেন: “সেখানে শয়তানের শিং (বা দল) বের হবে।” অর্থাৎ পূর্ব দিক থেকে এবং তা নজদে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট করে বলেছেন যে, নজদে এবং সমগ্র পূর্ব দিকে শয়তানের শিং বের হবে। তিনি আরও বলেছেন যে মুদার ও রাবিয়া গোত্রের মধ্যে মন্দ ও কঠোরতা বিদ্যমান এবং তিনি তাদের “উট পালনকারী” বলে উল্লেখ করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও স্পষ্ট করেছেন যে, আরবের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে অজ্ঞতা ও মন্দ বিদ্যমান। তবে আল্লাহ যাকে হেদায়েত দিয়েছেন সে ব্যতীত। এখানে কেবল নজদকে উদ্দেশ্য করা হয়নি বরং সমগ্র পূর্ব দিক থেকে শয়তানের শিং বের হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ মদিনার পূর্ব দিক এবং পৃথিবীর সমগ্র পূর্ব দিক। কারণ সেই পূর্ব দিকে বিভিন্ন ধরনের বিদআত ও মন্দ দেখা গেছে এবং সেখানে কমিউনিজম ও নানা বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছে।
তেমনিভাবে, এই উপদ্বীপেও অনেক মন্দ বিদ্যমান ছিল। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মৃত্যুর পর অনেক আরব মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে গিয়েছিল। বনু হানিফা, বনু আসাদ এবং বনু তামিম গোত্রের মধ্যে মন্দ ছড়িয়ে পড়েছিল। তাদের কেউ কেউ নবুয়তের দাবি করেছিল, যেমন: বনু হানিফাতে মুসায়লামা, বনু তামিমে সাজাহ এবং বনু আসাদে তুলাইহা। এর ফলে বড় ধরনের মন্দ দেখা দিয়েছিল।
পরবর্তীতে আল্লাহ তাদের হেদায়েত দান করেন এবং তারা আল্লাহর দ্বীনে ফিরে আসে। তবে খোরাসান থেকে এবং এর বাইরে, যেমন চীন ও অন্যান্য দেশ থেকে অনেক মন্দ এসেছে, যেখানে অনেক মন্দ বিদ্যমান ছিল।”
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate