Tuesday, February 11, 2025

কবর জিয়ারত এর বিধান

 প্রশ্ন ১ – কবর দৃষ্টিগোচর হলে বা কবরের দেয়াল অতিক্রম করলে কবরবাসীদেরকে সালাম করতে হবে কি?

উত্তর – পথিক হলেও সালাম দেয়া উত্তম, এরূপ ব্যক্তির যিয়ারতের নিয়ত করে নেয়া উত্তম।

প্রশ্ন ২ – যিয়ারতকারীর নির্দিষ্ট কবরের পাশে গিয়ে যিয়ারত করার হুকুম কি?

উত্তর – গোরস্থানের প্রথম কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দো‘আ করাই যথেষ্ট, তবুও যদি নির্দিষ্ট কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দো‘আ ও সালাম করতে চায় করতে পারবে।

প্রশ্ন ৩ – মৃত ব্যক্তি যিয়ারতকারীকে চিনতে পারে?

উত্তর – কতিপয় হাদিসে এসেছে যে, যিয়ারতকারী যদি এমন হয় যে দুনিয়াতে তার সাথে পরিচয় ছিল তাহলে আল্লাহ যিয়ারতকারীর সালামের উত্তর দেয়ার জন্য তার রুহ ফিরিয়ে দেন । কিন্তু এ হাদিসের সনদে কিছু ত্রুটি রয়েছে। অবশ্য আল্লামা ইবনে আব্দুল বার রাহিমাহুল্লাহ হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।

প্রশ্ন ৪ – উম্মে আতিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত,
«نهينا عن اتباع الجنائز ولم يعزم علينا»
“আমাদেরকে জানাযার সাথে চলতে নিষেধ করা হয়েছে, কিন্তু কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি”। হাদিসটির ব্যাখ্যা কি?

উত্তর – আবস্থা দৃষ্টে প্রতিয়মান হচ্ছে যে, বর্ণনাকারীর  মতে নিষেধটি কঠোর নয়, তবে আমাদের জেনে রাখা উচিত যে প্রত্যেক নিষেধ হারাম। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন।

«ما نهيتكم عنه فاجتنبوه وما أمرتكم به فأتوا منه ما استطعتم» (متفق عليه)

“আমি যার থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করি, তোমরা তা পরিত্যাগ কর, আর আমি তোমাদেরকে যার আদেশ দেই, তোমরা তা সাধ্যানুসারে পালন কর”। (বুখারি ৩৯১)

এ হাদিস দ্বারা প্রতিয়মান হয় যে, মহিলাদের জানাযার সাথে কবর পর্যন্ত যাওয়া হারাম, তবে পুরুষদের ন্যায় তারা জানাযায় অংশ গ্রহণ করতে পারবে।

প্রশ্ন ৫ – একটি হাদিসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তিকে কবরের উপর জুতা নিয়ে হাটতে দেখে বললেন, হে জুতা ওয়ালা! তোমার জুতাদ্বয় খুলে নাও। এ হাদিসের উপর কি আমল করা যাবে? জুতা নিয়ে কেউ কবরের উপর হাটা-চলা করতে চাইলে তাকে কি নিষেধ করা হবে?

উত্তর – হ্যাঁ, বর্ণিত হাদিসের উপর আমল করা যাবে, সুতরাং কোন অবস্থাতেই কবরের উপর জুতা নিয়ে হাটা-চলা করা জায়েয হবে না। হ্যাঁ, বিশেষ প্রয়োজনে যেমন কবরের উপর যদি কাঁটাদার গাছ থাকে বা মাটি অত্যন্ত গরম হয়, যে কারণে খালিপায়ে চলা অসম্ভব হয়, এমতাবস্থায় জুতা নিয়ে কবরের উপর হাঁটা যেতে পারে, এরূপ কোন বিশেষ প্রয়োজন না হলে তাকে অবশ্যই নিষেধ করা হবে, যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন। তাকে শরি‘আতের হুকুম জানিয়ে দেবে।

প্রশ্ন ৬ – গোরস্থানে প্রবেশকালে জুতা খুলার বিধান কি?

উত্তর – কবরের উপর দিয়ে হেঁটে গেলে জুতা অবশ্যই খুলতে হবে, আর যদি কবরের উপর দিয়ে না হেটে গোরস্থানের প্রথম কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়, তা হলে জুতা খুলতে হবে না।

প্রশ্ন ৭ – জনৈক মহিলাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কবরের পাশে ক্রন্দরত আবস্থায় দেখে বলেছিলেন,
«اتقي الله واصبري»
“আল্লাহকে ভয়কর ও ধৈর্যধারণ কর”। (বুখারি ও মুসলিম) এ হাদিস কি মহিলাদের কবর যিয়ারত বৈধ প্রমাণ করে না?

উত্তর – সম্ভবত উল্লিখিত ঘটনাটি নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য কবর যিয়ারত বৈধ থাকাকালিন সময়ের ঘটনা। আর মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত নিষিদ্ধকারী হাদিস এ হাদিসের জন্যে নাসেখ বা এ হাদিসকে রহিতকারী।

প্রশ্ন ৮ – কিছু কিছু শহরে অনেক মানুষ কববের উপর ঘর তৈরি করে সেখানে বসবাস করে। এটা কতটুকু শরিয়ত সম্মত?

উত্তর – এটা নেহায়েত গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ, এ কাজের দ্বারা কবরবাসীদের অপমান করা হয়, তাই তাদেরকে এ কাজ হতে বারণ করা এবং শরি‘আতের বিধান সম্পর্কে অবহিত করা জরুরী। তারা এসব কবরের উপর যেসব সালাত আদায় করেছে, তা সব বাতিল ও বৃথা। এ অবস্থায় কবরের উপর বসাও অত্যন্ত গর্হিত কাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম বলেছেন,

« لا تصلوا إلى القبور ولا تجلسوا عليها » (رواه مسلم)

“কবরের দিকে মুখ করে নামাজ পড়বে না এবং কবরের উপর বসবে না”। (মুসলিম ২১২২)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লম আরো বলেছেন,

«لعن الله اليهود والنصارى اتخذوا قبور أنبيائهم مساجد» (رواه البخاري)

“আল্লাহ ইয়াহূদী ও নাসারাদের উপর লানত করেছেন, কারণ তারা তাদের নবীদের কবরসমূহকে মসজিদে পরিণত করেছে”। (মুসলিম ১০৭৯)

এ হাদিস সম্পর্কে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বাণী দ্বারা তাদেরকে তাদের গর্হিত কাজের জন্য সতর্ক করেছেন।

প্রশ্ন ৯ – জনৈক ব্যক্তির কবরের উপর একটি ব্রিজ নির্মাণ করা হল, আর ঐ ব্রিজের উপর দিয়ে একটি যাত্রিবাহী গাড়ি যাওয়ার সময় বিরত দিল, যাত্রীদের মাঝে একজন মহিলাও রয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে গাড়িটির যাত্রা বিরতির কারণে সে মহিলা কি কবর যিয়ারতকারীদের অন্তর্ভূক্ত হবে, সে মহিলা কি কবরবাসীদের সালাম করবে?

উত্তর – না, মহিলা কবর যিয়ারতকারীদের অন্তর্ভূক্ত হবে না, ব্রিজ কেন কবরের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও কবর যিয়ারতকারী বলে গণ্য হবে না। মহিলা যদি পথচারী হয়, তবুও তার পক্ষে কবরবাসীদের সালাম না করা উত্তম।

প্রশ্ন ১০ – একটি হাদিস প্রচলিত আছে,
« اذا مررتم بقبر كافر فبشروه بالنار »
“যখন তোমরা কোন কাফেরের কবরের পাশ দিয়ে যাও, তখন তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দাও”। এ হাদিসটি কতটুকু শুদ্ধ?

উত্তর – আমার জানা মতে এ হাদিসের বিশুদ্ধ কোন সনদ নেই।

প্রশ্ন ১১- মহিলারা কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবরবাসীদের সালাম দেবে কি?

উত্তর – আমার জানা মতে কবরবাসীদেরকে মহিলাদের সালাম না-করা উচিৎ। কারণ সালাম বিনিময় কবর যিয়ারতের রাস্তা উম্মুক্ত করবে, দ্বিতীয়ত সালাম দেয়া কবর জিয়ারতের অন্তর্ভুক্ত। তাই মহিলাদের উপর ওয়াজি হচ্ছে সালাম বর্জন করা, তারা যিয়ারত ব্যতীত মৃতদের জন্য শুধু দো‘আ করবে।

প্রশ্ন ১২ – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারতের নিয়ম কি?

উত্তর – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারতের সুন্নত তরিকা এই যে, কবরের দিকে মুখ করে সালাম দেবে, অতঃপর তাঁর দু’সাথী আবু-বকর ও ওমরকে সালাম দেবে, অতঃপর ইচ্ছা করলে অন্য জায়গায় গিয়ে কিবলামুখী হয়ে নিজের জন্য দো‘আ করবে।

প্রশ্ন ১৩ – মহিলাগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর যিয়ারত করতে পারবে কি?

উত্তর – মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত করা নিষেধ, যেসব হাদিসে মহিলাদের কবর যিয়ারত থেকে বারণ করা হয়েছে, সেখানে রাসূলের কবরও অন্তর্ভুক্ত, তাই তাদের জন্য জরুরী হচ্ছে রাসূলের কবর যিয়ারত না-করা। মহিলাদের জন্য রাসূলের কবর যিয়ারত বৈধ না অবৈধ এ সম্পর্কে ওলামায়ে কেরাম দু’ভাগে বিভক্ত, তাই সুন্নতের অনুসরণ ও মতানৈক্য থেকে বাঁচার জন্য মহিলাদের জন্য যে কোন কবর যিয়ারত ছেড়ে দেয়াই শ্রেয়। তা ছাড়া মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত নিষেধ সংক্রান্ত হাদিসে রাসূলের কবরকে বাদ দেয়া হয়নি। এমতাবস্থায় হাদিসের ব্যাপকতার উপর আমল করাই ওয়াজিব, যতক্ষণ না এর বিপরীত কোন সহিহ হাদিস পাওয়া যায়।

প্রশ্ন ১৪ – মসজিদে প্রবেশকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর যিয়ারত করতে পারবে কি?

উত্তর – মসজিদে প্রবেশকালে রাসূলকে শুধু সালাম করবে, শুধু কবর জিয়াতর উদ্দেশ্যে যাবে না, তবে মাঝে-সাজে যেতে পারে।

প্রশ্ন ১৫ – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা কি জায়েয?

উত্তর – মসজিদে নববি জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা জায়েয। তাই মসজিদে নববির যিয়ারত মূল উদ্দেশ্য করে সফর করবে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় হিসেবে নবীর কবর যিয়ারত করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لاتشد الرحال إلا إلى ثلاثة مساجد: المسجد الحرام ومسجدي هذا والمسجد الاقصى» (رواه البخاري)

“তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথাও সফর করা যাবে নাঃ মাসজিদে হারাম, আমার এ মসজিদ ও মসজিদে আকসা”। (বুখারি ২৮১)

প্রশ্ন ১৬ – কবর জিয়ারতের জন্য জুমার দিনকে নির্দিষ্ট করা কেমন?

উত্তর – এর কোন ভিত্তি নেই। যিয়ারতকারী সুযোগ বুঝে যখন ইচ্ছা যিয়ারত করবে। জিয়ারতের জন্য কোন দিন বা রাতকে নির্ধারিত করা বিদ‘আত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«من احدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد» (متفق عليه)
“আমাদের এ দ্বীনে যে কেউ নতুন কিছু আবিষ্কার করল, তা পরিত্যক্ত”। (বুখারি ৮৬১)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন,

«من عمل عملا ليس عيه أمرنا فهو رد» (رواه مسلم)

“যে এমন কোন কাজ করল যা আমাদের আদর্শ নয়, তা পরিত্যক্ত”।হাদিসটি ইমাম মুসলিম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

প্রশ্ন ১৭ – মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত নিষেধ হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে কিভাবে কবর জিয়ারতের দো‘আ শিক্ষা দিয়েছেন?

উত্তর – কবর যিয়ারত প্রথমে সবার জন্য নিষেধ ছিল, অতঃপর সবার জন্য জায়েয হয়, অতঃপর শুধু মহিলাদের জন্য নিষেধ হয়। এ ব্যাখ্যার পরিপেক্ষিতে বলা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আহাকে কবর জিয়ারতের আদব তখন শিক্ষা দিয়েছিলেন যখন তা সবার জন্য জায়েয ছিল।

প্রশ্ন ১৮ – কবরের পাশে দো‘আ কি দু’হাত তুলে করতে হবে?

উত্তর – কবরের পাশে দু’হাত তুলে দো‘আ করা জায়েয আছে, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করে কবরবাসীদের জন্য দু’হাত তুলে দো‘আ করেছেন। (মুসলিম)

প্রশ্ন ১৯ – কবরের পাশে সম্মিলিত দোয়ার কি হুকুম?

উত্তর – কাউকে দো‘আ করতে দেখে শ্রোতাদের আমিন আমিন বলায় কোন বাঁধা নেই। তবে পরিকল্পিতভাবে সম্মিলিত দো‘আ করা যাবে না। অকস্মাৎ কাউকে দো‘আ করতে দেখে তার সাথে সাথে আমিন আমিন বলা যাবে, কারণ এটাকে সম্মিলিত দো‘আ বলা হয় না।

প্রশ্ন ২০ – গোরস্থানের প্রথমাংশে সালাম দিলে সমস্ত কবরবাসীর জন্য সালাম বিবেচ্য হবে?

উত্তর – এ সালামই যথেষ্ট, সে ইনশাল্লাহ জিয়ারতের সাওয়াব পেয়ে যাবে। যদি গোরস্থান অনেক বড় হয় আর সে ঘুরে ঘুরে সব দিক দিয়ে সালাম বিনিময় করতে চায় তাও করতে পারবে।

প্রশ্ন ২১ – অমুসলিমের কবর যিয়ারত করা কি জায়েয?

উত্তর – শিক্ষা গ্রহণের জন্য হলে অমুসলিমের কবর যিয়ারত করা জায়েয। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করে তাঁর জন্যে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চেয়ে ছিলেন, কিন্তু তাঁকে এ বিষয়ে অনুমতি দেয়া হয়নি। শুধু জিয়ারতের অনুমতি দেয়া হয়েছে।

প্রশ্ন ২২ – দু’ঈদের দিনকে কবর জিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট করার কোন ভিত্তি আছে কি?

উত্তর – আমার জানামতে এর কোন ভিত্তি নেই, যিয়ারতকারীর যখন সুযোগ হবে তখন সে যিয়ারত করবে, এটাই সুন্নত।

প্রশ্ন ২৩ – মৃতের জন্য দো‘আ করার সময় কবর মুখী হয়ে দো‘আ করা কি নিষেধ?

উত্তর – না, নিষেধ নয়, মৃতের জন্য দো‘আ করার সময় কেবলামুখী ও কবরমুখী উভয় বৈধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তির দাফন শেষে বললেন,

«استغفروا لأخيكم واسألوا له التثبيت فإنه الآن يسأل» (رواه أبوداود)

“তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রর্থনা কর এবং তার ইস্তেকামাতের দো‘আ কর, কেননা তাকে এখন প্রশ্ন করা হবে”।

এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বলেননি যে, কিবলামুখী হয়ে দো‘আ কর।

সুতরাং কিবলামুখী হয়ে দো‘আ করুক আর কবরমুখী হয়ে দো‘আ করুক উভয়ই জায়েয। রাসূলের সাহাবিগণ কবরের চতুর্পাশে দাঁড়িয়ে মৃতের জন্য দো‘আ করতেন।

প্রশ্ন ২৪- দু’হাত তুলে মৃতের জন্য দো‘আ করা কি জায়েয?

উত্তর – কিছু কিছু হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কবর যিয়ারত করে দো‘আ করতেন তখন দু’হাত তুলেই দো‘আ করতেন। যেমন ইমাম মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করে তাদের জন্য দো‘আ করার সময় দু’হাত তুলেছেন।

প্রশ্ন ২৫ – আমাদের এখানে কিছু সৎকর্মী যুবক বাস করে, তারা নিজেদের সাথে কতক গাফেল লোকদেরকে কবর জিয়ারতের জন্য নিয়ে যেতে চায়, হয়ত তাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় সঞ্চার হবে। এ ব্যাপারে আপনাদের মত কি?

উত্তর – এটা একটি মহৎ কাজ, এতে কোন বাঁধা নেই। এটা ভাল কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করার অন্তর্ভূক্ত। আল্লাহ তাদেরকে উত্তম বিনিময় দান করুন।

প্রশ্ন ২৬ – কবরের উপর কোন চিহ্ন স্থাপন করার হুকুম কি?

উত্তর – লিখা বা নাম্বারিং করা ব্যতীত শুধু পরিচয়ের জন্য কবরের উপর চিহ্ন স্থাপন করা যেতে পারে। বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের উপর কিছু লিখতে নিষেধ করেছেন, আর নাম্বারিং করাও লিখার অন্তর্ভূক্ত। তবে কবরস্থ লোকের পরিচয়ের জন্য শুধু পাথর ইত্যাদি রাখা যাবে, কালো বা হলুদ রঙের পাথরও রাখা যাবে। বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবি উসমান ইবন মাজউন রাদিয়াল্লাহু আনহুর কবরের উপর চিহ্ন স্থাপন করেছিলেন।

লেখকঃ শায়খ আব্দুল আযীয ইব্‌ন আব্দুল্লাহ ইব্‌ন বায রাহিমাহুল্লাহ

অনুবাদঃ শিহাবউদ্দিন হোসাইন

কৃতঞ্জতায়: কুরআনের আলো ডট কম

Thursday, January 23, 2025

বিদাতিদের সাথে সখ্যতা ও সম্পর্ক এবং মেলামেশা

 বিদাতিদের সাথে সখ্যতা, সম্পর্ক ও মেলামেশা

(সাথে রয়েছে দাঈদের জন্য বিশেষ নসিহত)

প্রশ্ন: আমরা জানি যে, ইমামদের মধ্যেও ইখতেলাফ (মতবিরোধ) ছিল। তারপরেও তারা একে অপরকে বন্ধু হিসেবে মেনে নিতো। আমার প্রশ্ন হলো, এখনকার মানুষরা যে বিভিন্ন মাজহাব মেনে চলেন তারা তো কোনও না কোনও ইমামকেই অনুসরণ করেন। তারা যা করেন সেটা তো আহলে হাদিস তথা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মতে অনেক কিছুই বিদাতত। আর যতটুকু জানি, হাদিসে বিদাতিদের সাথে বন্ধুত্ব রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। তাহলে ইমামদের মধ্যে পরস্পর বন্ধুত্ব রাখা আর আমাদের সাধারণ মানুষদের মধ্যে বিদাতিদের সাথে বন্ধুত্ব না রাখা টা কেমন সাংঘর্ষিক মনে হচ্ছে না? বিষয় টা একটু বুঝিয়ে বললে উপকৃত হবো ইনশাআল্লাহ।
উত্তর: শাখাগত বিভিন্ন মাসআলা বিষয়ে আমাদের পূর্বসূরি ইমামগণ মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছেন। আকিদাগত ও দ্বীনের মৌলিক বিষয়ে মতবিরোধ ছিল খুবই সীমিতG তারপরও তাদের একে অপরের সাথে সম্পর্ক বজায় ছিল। এর কারণ হলো, তারা কুরআন-সুন্নাহর দলিলকে কেন্দ্র করে মতবিরোধ করেছেন। তাদের প্রত্যেকের উদ্দেশ্য ছিল, সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। এখানে তাদের ব্যক্তিগত কোন উদ্দেশ্য বা স্বার্থ ছিল না। তবে যারা আকিগতভাবেই পথভ্রষ্ট ও বিদাতি ছিল আমাদের পূর্বসূরিগণ তাদের সাথেও কথা বলেছেন, তাদের কাছে গেছেন এবং তাদের সাথে বিতর্ক করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল, তাদেরকে সঠিক পথে ফিরিয়ে নিয়ে আনা বা তাদের বাতিল আকিদাকে মানুষের কাছে প্রকাশ করে দেওয়া। যাতে অন্যরা তাদের ভ্র্রষ্টতা সম্পর্কে সচেতন হয়। যেমন: আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. খারেজি সম্প্রদায়ের সাথে বিতর্ক করেছেন, ইবনে তায়মিয়া রাহ. বিভিন্ন বিদাতি গোষ্ঠীর সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল যেন, তারা সঠিক পথে ফিরে আসে বা অন্য মানুষ যেন তাদের মাধ্যমে প্রতারিত না হয়।

বিদাতিদের সাথে এ ধরণের সম্পর্ক বর্তমানেও অব্যাহত রাখা যাবে। তবে সাধারণ মানুষ নয় বরং যারা দ্বীনের বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখেন এবং বাতিলের সাথে মোকাবেলা করার যোগ্যতা রাখেন কেবল তারা। সাধারণ মানুষ তাদের সাথে সম্পর্ক রাখার ফলে নিজেরাই গোমরাহির দিকে ধাবিত হতে পারে।

কিন্তু যদি তাদের সাথে সম্পর্ক রাখায় কোন কল্যাণের আশা না থাকে তাহলে তাদের সাথে কথা বলা যাবে না বা তাদের সাথে উঠবস করা যাবে না। শরয়ি স্বার্থ ছাড়া তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা হলে এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّىٰ يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ ۚ وَإِمَّا يُنسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَىٰ مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ

“যখন আপনি তাদেরকে দেখেন, যারা আমার আয়াত সমূহে ছিদ্রান্বেষণ করে, তখন তাদের কাছ থেকে সরে যান যে পর্যন্ত তারা অন্য কথায় প্রবৃত্ত না হয়, যদি শয়তান আপনাকে ভুলিয়ে দেয় তবে স্মরণ হওয়ার পর জালেমদের সাথে উপবেশন করবেন না।” [সূরা আনআম: ৬৮]

হাসান রহ. বলেন,

لا تجالسوا أهل الأهواء ولا تجادلوهم ولا تسمعوا منهم

“প্রবৃত্তির অনুসারীদের সাথে উঠবস করো না, তাদের সাথে বিতর্ক করো না এবং তাদের কথা শুনিও না।” [লালাকাঈ]

মোটকথা, যোগ্য আলেমগণ বিদাতি ও বাতিল আকিদাপন্থী লোকদের সাথে বন্ধুত্ব নয় বরং তাদেরকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বা মানুষকে তাদের গোমরাহি মূলক আকিদা ও আমল সম্পর্কে সচেতন করার উদ্দেশ্যে সম্পর্ক ও যোগাযোগ রাখা যাবে। তবে সাধারণ মানুষ তাদের সাথে আন্তরিক বন্ধুত্ব রাখা, তাদের সাথে উঠবস করা, তাদের বক্তব্য শোনা, তাদের ভিডিও দেখা, তাদের দরসে বসা এবং তাদের লিখিত বই-পুস্তক পড়া ইত্যাদি থেকে যথাসম্ভব দূরত্ব বজায় রাখবে যেন তারা বিদাতিদের বাতিল আকিদা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। আল্লাহ তাওফিক দানকারী।

❑ বিদাতিদের সাথে সখ্যতা ও সম্পর্ক:

সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন আল্লামা শাইখ বিন বায রাহ. কে প্রশ্ন করা হয় যে, বিদাতপন্থীদের সঙ্গে উঠবস করা এবং তাদের দরসে অংশ গ্রহণ করা কি বৈধ?

উত্তরে তিনি বলেন,
لا يجوز مجالستهم ولا اتخاذهم أصحابًا، ويجب الإنكار عليهم وتحذيرهم من البدع، نسأل الله العافية

“তাদের সঙ্গে উঠবস বা মেলামেশা করা অথবা তাদেরকে বন্ধু বানানো বৈধ নয় বরং তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা এবং তাদের বিদাত থেকে সাবধান করা আবশ্যক। আল্লাহ আমাদের নিরাপত্তা দিন। আমিন। [মাজল্লাতুল ফুরকান, সংখ্যা ১০০, রবিউস সানি ১৪১৯ হিজরি-তে প্রকাশিত। শাইখ ইবন বায-এর ফতোয়া ও প্রবন্ধসমূহ, ২৮/২৬৭]

❑ দাঈদের জন্য বিশেষ নসিহত:

বিন বায রাহ. বিদাতিদের সাথে সম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে দাঈদের উদ্দেশ্যে বলেন,
الدعاة عليهم البلاغ والبيان والنصيحة، والله يهدي من يشاء، وإذا دعوتهم إلى الخير، إلى التوحيد والإيمان والسنة، وترك البدع، فلم يستجيبوا؛ فقاطعهم، لا تكن صاحبًا لهم، قاطعهم، واهجرهم، ولا تدعهم إلى بيتك، ولا تجب دعوتهم حتى يدعوا ما هم عليه من الباطل؛ لأنك إذا صحبتهم ودعوتهم، وأجبت دعوتهم؛ أظهرت الرضا بأعمالهم.

فلا ترضى بأعمالهم، لكن النصيحة، استمر فيها، النصيحة والدعوة والتوجيه، وإرسال من ترى أنهم يقدرون ترسله إليهم؛ لعله يدعوهم إلى الله، ولعلهم يستجيبون

“দাঈদের দায়িত্ব হলো, পরিষ্কারভাবে বার্তা পৌঁছে দেওয়া, উপদেশ দেওয়া এবং সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়েত দিবেন। আপনি যদি তাদেরকে কল্যাণ, তাওহিদ, ঈমান ও সুন্নাহর পথে ডাকেন এবং বিদাত পরিত্যাগে আহ্বান করেন, তবুও তারা সাড়া না দিলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করুন। তাদের বন্ধু হবেন না। তাদের সঙ্গে মেলামেশা ত্যাগ করুন। তাদেরকে বাড়িতে আমন্ত্রণ করবেন না এবং তাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন না যতক্ষণ না তারা তাদের ভুল পথ পরিত্যাগ করে। তাদের কাজকে অনুমোদন করবেন না। তবে উপদেশ অব্যাহত রাখুন। দাওয়াত, দিকনির্দেশনা ও সঠিক পথে ফেরানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। এমন কাউকে পাঠান যাকে আপনি উপযুক্ত মনে করেন। হয়তো সে তাদেরকে আল্লাহর পথে ডাকবে এবং হয়তো তারা সাড়া দেবে।” [binbaz]
▬▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

বিদআতিদের সাথে বসার বিধান উপকারিতার ওপর নির্ভরশীল

 প্রশ্ন: সম্মানিত শায়েখ, দাওয়াতের প্রয়োজনের জন্য-বিশেষত সুফিদের সাথে যারা দেশে অনেক বেড়ে গিয়েছে এবং সঠিক আকিদাধারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তাদের সাথে বসা কি জায়েজ? আমাদের দয়া করে জানান। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

উত্তর: সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য এবং দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি।

মূলতঃ বিদআতিদের (দ্বীনে সংযোজন-বিয়োজনকারীদের) সাথে ওঠাবসা জায়েজ নয়। কারণ এতে তাদের বাতিল কর্মকাণ্ডকে সমর্থন দেওয়া হয় এবং তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। তবে যদি এর পেছনে কোনো শরয়ি উপকার থাকে, যেমন: তাদের জবাব দেওয়া বা তাদের বাতিল কর্মকাণ্ড প্রকাশ করে দেওয়া তাহলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। তবে এটি শুধুমাত্র সেই ব্যক্তি করতে পারে, যার গভীর ইলম (জ্ঞান) রয়েছে এবং যারা তাদের ভুল যুক্তি খণ্ডন করতে সক্ষম।

যেমন: ইবনে আব্বাস রা. খারিজিদের সাথে মোনাজারা (তর্ক-বিতর্ক) করেছিলেন এবং শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াও বিদআতিদের সাথে মোনাজারা করেছেন।
তবে সাধারণ মানুষ এ ধরনের কাজে প্রবেশ করতে পারবে না।‌ কারণ এতে তারা তাদের ভুল যুক্তি দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।
তাই তাদের সাথে বসা বা তাদের কথা শোনা শরয়ি মুনাফার উপর নির্ভর করে। যদি এতে কোনো মুনাফা না থাকে তবে তাদের কথা শোনা বা তাদের সাথে বসা উচিত নয়। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّىٰ يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ ۚ وَإِمَّا يُنسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَىٰ مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
“আর যখন তুমি তাদেরকে দেখতে পাবে যারা আমার আয়াতসমূহ নিয়ে তর্ক করছে, তখন তুমি তাদের থেকে ফিরে যাও যতক্ষণ না তারা অন্য কথায় লিপ্ত হয়। আর যদি শয়তান তোমাকে ভুলিয়ে দেয়, তবে স্মরণ হওয়ার পর তুমি তাদের জালিম সম্প্রদায়ের সাথে বসবে না।” [সূরা আনআম: ৬৮]

ইমাম হাসান রহ. বলেছেন,

يقول الحسن رحمه الله يقول: لا تجالسوا أهل الأهواء ولا تجادلوهم ولا تسمعوا منهم
“বিদআতিদের সাথে উঠাবসা করো না, তাদের সাথে তর্ক করো না এবং তাদের কথা শুনো না।”
(ইমাম লালাকাই কর্তৃক বর্ণিত)। আল্লাহু আলাম‌
সোর্স: ইসলাম ওয়েব।
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

রমজান মাসে রোজা অবস্থায় বা সেজদারত অবস্থায় মৃত্যুর জন্য দুআ করার বিধান

 প্রশ্ন: এভাবে দুআ করা যাবে কি যে, হে আল্লাহ, আমার মৃত্যু যেন রমজান মাসে হয় বা নামাজের সেজদারত অবস্থায় হয়?

উত্তর: সালাতের সেজদারত অবস্থায়, রোজা অবস্থায়, আল্লাহর পথে জিহাদে লিপ্ত থাকা, কালিমা পাঠ, হজের তালবিয়া উচ্চরণ, কুরআন তিলাওয়াত বা অন্য যে কোনো ইবাদতরত অবস্থায় অথবা রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শহর মদিনায় মৃত্যুর জন্য দুআ করা শরিয়ত সম্মত। কেননা এগুলো ‘হুসনুল খাতিমা’ বা কল্যাণের উপর মৃত্যুর জন্য দুআর অন্তর্ভুক্ত।

❂ উমর ইবনুল খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি এ বলে দুআ করতেন:

اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي شَهَادَةً فِي سَبِيلِكَ، وَاجْعَلْ مَوْتِي فِي بَلَدِ رَسُولِكَ صلى الله عليه وسلم

“হে আল্লাহ, আমাকে তোমার রাস্তায় শাহাদাত লাভের তাওফিক দান কর এবং আমার মৃত্যু তোমার রসুলের শহরে প্রদান কর।” [বুখারি: ১৮৯০, অধ্যায়: ২৯/১৩]

❂ আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

‏ إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدٍ خَيْرًا اسْتَعْمَلَهُ ‏”‏ فَقِيلَ كَيْفَ يَسْتَعْمِلُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ ‏”‏ يُوَفِّقُهُ لِعَمَلٍ صَالِحٍ قَبْلَ الْمَوْتِ

“আল্লাহ তাআলা যখন তার বান্দা সম্পর্কে কল্যাণের ইচ্ছা করেন তখন তাকে আমল করতে দেন। বলা হল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কীভাবে তিনি তাকে আমল করতে দেন?

তিনি বললেন, “মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাকে নেক আমলের তাওফিক দিয়ে দেন।” [সুনান তিরমিজি (ইফা), অধ্যায়: ৩৫/ তকদির, পরিচ্ছেদ: আল্লাহ তাআলা জান্নাতিদের জন্য এবং জাহান্নামিদের জন্য একটি কিতাব (রেজিস্টার) লিখে রেখেছেন। সহিহ]

◆ সহিহ বুখারির ভাষ্যকার ইবনে হাজার রহ. আসকালানি বলেন,

ومن ثم شرع الدعاء بالثبات على الدين وبحسن الخاتمة

“এখান থেকেই দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং হুসনুল খাতিমা বা কল্যাণের উপর মৃত্যুর জন্য দুআ করা শরিয়ত সম্মত হওয়ার বিষয়টি সাব্যস্ত হয়েছে।” [ফাতহুল বারি ১১/৪৯৯]

◆ মাজমাউল আনহার গ্রন্থের লেখক বলেন,

وأعظم الحاجات سؤال حسن الخاتمة وطلب المغفرة

“সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হল, কল্যাণের উপর মৃত্যু এবং ক্ষমার জন্য দুআ করা।”

❑ মানুষ যে অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে কেয়ামত দিন তাকে সে অবস্থায় উত্থিত করা হবে:

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মানুষ যে অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে কেয়ামতের দিন তাকে সে অবস্থায় উঠানো হবে। অর্থাৎ কেউ যদি পাপ-পঙ্কিলতা ও আল্লাহর নাফরমানিতে ডুবে থাকা অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে তাহলে কেয়ামতের দিন তাকে এই অবস্থাতেই উঠানো হবে আর কেউ যদি আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি ও সৎকর্মে লিপ্ত থাকা অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে তাহলে পরকালে এই অবস্থাতেই তাকে উঠানো হবে।
আর এ কথায় কোন সন্দেহ নেই যে, কেয়ামতের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মহান আল্লাহর ইবাদতরত অবস্থায় আল্লাহর দরবারে দণ্ডায়মান হওয়ার মত মর্যাদা ও সৌভাগ্যের বিষয় আর কিছু হতে পারে না।

জাবির রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

يُبعَثُ كلُّ عبدٍ على ما مات عليه المُؤمِنُ على إيمانِه والمُنافِقُ على نِفاقِه

“প্রত্যেক বান্দাকে ঐ অবস্থায় কিয়ামতের দিন উঠানো হবে যে অবস্থার উপর সে মৃত্যু বরণ করেছে। মুমিনকে উঠানো হবে ঈমানের উপর এবং মুনাফিককে উঠানো হবে নিফাকির উপর।” [সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৭৩১৩]

ইমাম নওয়াবি রহ. উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, উক্ত হাদিসে আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মর্মে খবর দিচ্ছেন যে, প্রত্যেক বান্দাকে চাই সে পুরুষ হোক অথবা নারী হোক কিয়ামতের দিন ঐ অবস্থায় উত্তোলন করা হবে যে অবস্থায় উপর সে মৃত্যু বরণ করেছিল। সে যদি ভালো কাজ ও কল্যণের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে তাহলে কল্যাণের উপরই তাকে উঠানো হবে। আর অকল্যাণ ও খারাপিতে লিপ্ত থাকা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করলে সে অবস্থায় উঠানো হবে। এই কল্যাণ ও অকল্যাণের যত অর্থ ও রূপ আছে সবই এখানে প্রযোজ্য।
সুতরাং প্রতিটি মানুষের এই আগ্রহ থাকা উচিৎ, যেন ভালো অবস্থায় (সৎকর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা অবস্থায়) তার মৃত্যু হয়। উক্ত হাদিসে এ মর্মে বান্দাকে উৎসাহিত করা হয়েছে যে, সে যেন সদা সর্বদাই কল্যাণ ও আমলে সালেহ বা সৎকর্মে লিপ্ত থাকে। কেননা, কেউ জানে না, সে কখন মৃত্যু বরণ করবে।”

হে আল্লাহ, আপনি আমাদেরকে হুসনুল খাতিমা তথা কল্যাণময় মৃত্যু দান করুন এবং এমন অবস্থার উপর মৃত্যু দান করুন, যে অবস্থায় মৃত্যু হলে তোমার সন্তুষ্টি অর্জন করে চির সুখের নীড় জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। নিশ্চয় তুমি দুআ কবুল কারী। আমিন। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

মহিলাদের মাথার চুল কাটার বিধান

 প্রশ্ন: মহিলাদের মাথার চুল কাটার বিধান সম্পর্কে জানতে চাই।

উত্তর: আমাদের সমাজে নারীদের চুল কাটা নিয়ে বিভিন্ন ভুল ধারণার প্রচলন রয়েছে। কারো ধারণা, নারীরা একেবারেই চুল কাটতে পারবে না। কেউ মনে করে, চার আঙ্গুলের বেশি কাটা যাবে না। কেউ বলে, মাথার সামনের দিক থেকে কাটা বা ছোট করা যাবে না, খুব বেশি দরকার হলে, কেবল পেছন দিক থেকে সামান্য কাটা যাবে। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করে যে, বিশেষ সময় ছাড়া নারীদের জন্য চুল কাটা নিষিদ্ধ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইসলামি শরিয়তে এসব কথার কোনও ভিত্তি নেই। নিম্নে হাদিস এবং আলেমদের ফতোয়ার আলোকে মহিলাদের চুল কাটার বিধান অতি সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো:

নিম্নোক্ত অবস্থায় মহিলাদের মাথার চুল কাটা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। যথা:

◈ যদি কাফের-ফাসেক নারীদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা উদ্দেশ্য হয়।
◈ যদি এমন স্টাইলে চুল কাটা হয় যা অবিকল পুরুষদের মত বুঝা যায়।
◈ যদি পর পুরুষের মাধ্যমে চুল কাটা হয় (যেমনটি বর্তমান যুগে কিছু কিছু সেলুনে ঘটে থাকে।)
◈ যদি বিবাহিত নারীর স্বামীর অনুমতি ছাড়া হয় তাহলে তা হারাম। হারাম হওয়ার কারণও স্পষ্ট। কিন্তু যদি স্বামীর সামনে নিজের চুলের সৌন্দর্য অবলম্বন করা উদ্দেশ্য হয় বা লম্বা চুলের কষ্ট লাঘবের উদ্দেশ্যে হয় বা এ জাতীয় গ্রহণযোগ্য উদ্দেশ্যে হয় তাহলে সঠিক মতানুযায়ী চুল ছোট করা জায়েজ আছে।

এ মর্মে হাদিস বর্ণিত হয়েছে যে,

كَانَ أَزْوَاجُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْخُذْنَ مِنْ رُءُوسِهِنَّ حَتَّى تَكُونَ كَالْوَفْرَةِ

“রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্ত্রীগণ এমনভাবে তাদের মাথার চুল কাটতেন যে, তা কাঁধ থেকে একটু নিচে যেত বা কান বরাবর হত।” [সহীহ মুসলিম, হা/৩২০]

❂ ইমাম নওয়াবি রহ. উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন,

فيه دليل على جواز تخفيف الشعور للنساء

“এতে প্রমাণিত হয় যে, নারীদের চুল কেটে হালকা করা জায়েজ।” [শরহে মুসলিম, ৫/৪]

❂ আল্লামা উসাইমিন রাহ. বলেন, এই মূহুর্তে আমার এমন কোন দলিল জানা নাই যা দ্বারা নারীদের চুল কাটা হারাম প্রমাণিত হয়। হারাম বলার মত দুর্বল; এর কোন যৌক্তিকতা নেই। মকরুহ বলার মতটিও প্রশ্নবিদ্ধ। আর বৈধ হওয়ার মতটিই দলিল এবং মূলনীতির কাছাকাছি। যেহেতু রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর তার এর স্ত্রীদের চুল কাটার হাদিস সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। (শাইখের বক্তব্যের সার সংক্ষেপ)

❂ সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. কে প্রশ্ন করা হয়, সামনের দিক থেকে চুল কাটা কি হারাম যদি তা শুধুমাত্র সৌন্দর্যের জন্য হয়?

তিনি উত্তরে বলেন,

لا حرج في ذلك، الحمد لله، المهم صيانة ذلك عن الأجنبي، فإذا كان عندما يظهر الزوج والنساء والمحارم، فلا حرج في ذلك

“এতে কোনও সমস্যা নেই, আলহামদুলিল্লাহ। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুরুষদের থেকে তা গোপন রাখা। যদি এটি কেবল স্বামী, মহিলা এবং মাহরাম পুরুষদের (যেসব পুরুষদের সামনে স্থায়ীভাবে বিবাহ হারাম, যেমন: পিতা, সন্তান, দাদা, চাচা মামা ইত্যাদি) সামনে প্রকাশিত হয় তাহলে এতে কোনও অসুবিধা নেই।”

❂ হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত দুটি ফতোয়ার কিতাবে বলা হয়েছে, “পুরুষদের সঙ্গে, বিধর্মী বা ফাসেকদের সঙ্গে সাদৃশ্য না হলে সৌন্দর্য বাড়াতে নারীদের জন্য তুলনামূলক চুল ছোট করা জায়েজ আছে।” [ফাতাওয়া শামি ৯/৫৮৩, ফাতাওয়া আলমগিরি, ৫/৩৫৮]

মোটকথা, একজন নারী যদি মাথার চুল ছোট করার প্রয়োজন মনে করে তাহলে উপরোক্ত শর্তসাপেক্ষে তা কাটতে বা ছাটতে কোনও সমস্যা নেই। তবে উদ্দেশ্যে যেন হয়, কেবল সৌন্দর্য বর্ধন বা লম্বা চুলের কষ্ট লাঘব। কোনও কাফের-ফাসেক নায়িক বা তথাকথিত মডেলের সাদৃশ্য অবলম্বন করা উদ্দেশ্য নয়। আর এতটা ছোট যেন না করে যাতে পুরুষদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে যায়।

উল্লেখ্য যে, মাথার বিশেষ কোনও সমস্যায় মাথার চুল মুণ্ডন করা অপরিহার্য না হলে মহিলাদের মাথার চুল মুণ্ডন করা হারাম।
আল্লাহু আলাম (আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন)।
▬▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate