Saturday, September 3, 2022

ইমাম ও মুক্তাদীর দাঁড়াবার স্থান ও নিয়ম এবং মুক্তাদীর সংখ্যা হিসাবে ইমাম ও মুক্তাদীর দাঁড়ানোর সঠিক পদ্ধতি

 প্রশ্ন: ইমাম ও মুক্তাদীর দাঁড়াবার স্থান ও নিয়ম এবং মুক্তাদীর সংখ্যা হিসাবে ইমাম ও মুক্তাদীর দাঁড়ানোর সঠিক পদ্ধতি কি?

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: মহান আল্লাহ তা‘আলা মানবজাতিকে একমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন (সূরা যারিয়াত: ৫৬) সুতরাং মানুষের কর্তব্য হ’ল ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য হাছিলের চেষ্টা করা। আর সালাত আল্লাহর নৈকট্য লাভের সবচেয়ে বড় মাধ্যম এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ বলেন, তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং রুকূকারীদের সাথে রুকূ‘ কর’ (সূরা বাক্বারাহ ২/৪৩)। অর্থাৎ জামা‘আতে সালাত আদায় কর। রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা বলেন,বান্দা যে সকল ইবাদত পালনের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করে তন্মধ্যে ফরয ইবাদত আমার নিকট অধিক প্রিয়’ (সহীহ বুখারী হা/৬৫০২; মিশকাত হা/২২৬৬)।

জামা‘আতে সালাত আদায় করার সময় কাতারে কেউ আগে-পিছে সরে থাকলে তাকে বরাবর হতে বলা, এমন কি নিজে কাছে গিয়ে কাতার সোজা করা ইমামের কর্তব্য। আর যতক্ষণ পর্যন্ত না কাতার পূর্ণ রুপে সোজা হয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত নামায শুরু করা উচিৎ নয়। (আলমুমতে’,শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৩/১৬)।ইমাম ছাড়া কম পক্ষে একজন নামাযী হলে জামাআত গঠিত হবে; চাহে সে নামাযী জ্ঞানসম্পন্ন শিশু হোক অথবা মহিলা।মহানবী (ﷺ) ইবনে আব্বাসকে নিয়ে জামাআত করে (তাহাজ্জুদ) নামায পড়েছেন।তিনি সফরে উদ্যত দুইজন লোককে বলেছিলেন, “নামাযের সময় উপস্থিত হলে তোমাদের একজন আযান দেবে এবং তোমাদের মধ্যে যে বড় সে ইমামতি করবে।” (সহীহ বুখারী ৬৩০)।

◾মুক্তাদীর সংখ্যা হিসাবে ইমাম ও মুক্তাদীর দাঁড়ানোর সঠিক পদ্ধতি হল:
_______________________________________
(১)। ইমামের সাথে মাত্র একজন মুক্তাদী (পুরুষ বা শিশু) হলে উভয়ে একই সাথে সমানভাবে দাঁড়াবে; ইমাম বাঁয়ে এবং মুক্তাদী হবে ডানে। এ ক্ষেত্রে ইমাম একটু আগে এবং মুক্তাদী একটু পিছনে আগাপিছা হয়ে দাঁড়াবে না। ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে মহানবী (ﷺ) নিজের বরাবর দাঁড় করিয়েছিলেন। (সহীহ বুখারী ৬৯৭)। মৃত্যুরোগের সময় তিনি আবু বাক্‌র (রাঃ)-এর বাম পাশে তাঁর বরাবর এসে বসেছিলেন। (সহীহ বুখারী, ১৯৮) নাফে বলেন, একদা আমি কোন নামাযে আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাঃ)-এর পিছনে দাঁড়ালাম,আর আমি ছাড়া তাঁর সাথে অন্য কেউ ছিল না। তিনি আমাকে তাঁর হাত দ্বারা তাঁর পাশাপাশি বরাবর করে দাঁড় করালেন।’ (মালেক, মুঅত্তা ১/১৫৪)। অনুরুপ বর্ণিত আছে হযরত উমার (রাঃ) কর্তৃকও। এ জন্যই ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে উক্ত বিষয়ক পরিচ্ছেদ বাঁধার সময় বলেন, ‘দুজন হলে (মুক্তাদী) ইমামের পাশাপাশি তার বরাবর ডান দিকে দাঁড়াবে।’ (সহীহ বুখারী ৬৯৭, সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ২৫৯০ নং, ৬/১৭৫-১৭৬) জ্ঞাতব্য যে, একক মুক্তাদীর ইমামের ডানে দাঁড়ানো সুন্নত বা মুস্তাহাব। অর্থাৎ যদি কেউ ইমামের বামে দাঁড়িয়ে নামায শেষ করে,তাহলে ইমাম-মুক্তাদী কারো নামাযের কোন ক্ষতি হবে না। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৩৭৫, সালাতুল জামাআতি হুকমুহা অআহকামুহা, ডক্টর সালেহ সাদলান ১১১পৃ:)।

(২)। মুক্তাদী ২ জন বা তার বেশী (পুরুষ) হলে ইমামের পশ্চাতে কাতার বাঁধবে।জাবের (রাঃ) বলেন, একদা মহানবী (ﷺ) মাগরিবের নামায পড়ার জন্য দাঁড়ালেন। এই সময় আমি এসে তাঁর বাম দিকে দাঁড়ালাম। তিনি আমার হাত ধরে ঘুরিয়ে তাঁর ডান দিকে দাঁড় করালেন। ইতিমধ্যে জাব্বার বিন সাখার (রাঃ) এলেন। তিনি তাঁর বাম দিকে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি আমাদের উভয়ের হাত ধরে ধাক্কা দিয়ে তাঁর পশ্চাতে দাঁড় করিয়ে দিলেন।(সহীহ মুসলিম, আবূদাঊদ, সুনান, মিশকাত ১১০৭) উল্লেখ্য
যে,দুই জন মুক্তাদী যদি ইমামের ডানে-বামে দাঁড়িয়ে নামায পড়ে তাহলে নামাযের কোন ক্ষতি হবে না। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৩৭০)। নামায হয়ে যাবে, কারণ ইবনে মাসঊদ আলক্বামাহ্‌ ও আসওয়াদের মাঝে দাঁড়িয়ে ইমামতি করেছেন এবং তিনি নবী (ﷺ) কে ঐরুপ দাঁড়াতে দেখেছেন।(আবুদাঊদ, সুনান, ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ৫৩৮)। অবশ্য মহানবী (ﷺ) এর সাধারণ সুন্নাহ্‌ হল,তিন জন হলে একজন সামনে ইমাম এবং দুই জনের পিছনে কাতার বাঁধা। পক্ষান্তরে আগে-পিছে জায়গা না থাকলে তো এক সারিতে দাঁড়াতে বাধ্যই হবে।

(৩)। মুক্তাদী একজন মহিলা হলে (সে নিজের স্ত্রী হলেও) ইমাম (স্বামীর) পাশাপাশি বরাবর না দাঁড়িয়ে তার পিছনে দাঁড়াবে। (আদাবুয যিফাফ, আলবানী ৯৬পৃ: দ্র:)।

(৪)। মুক্তাদী দুই বা ততোধিক পুরুষ হলে এবং একজন মহিলা হলে, ইমামের পিছনে পুরুষরা কাতার বাঁধবে এবং মহিলা সবশেষে একা দাঁড়াবে। একদা হযরত আনাস (রাঃ)-এর ঘরে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইমামতি করেন। আনাস (রাঃ) ও তাঁর ঘরের এক এতীম দাঁড়ান নবী (ﷺ) এর পিছে এবং তাঁর আম্মা দাঁড়ান তাঁদের পিছে (একা)। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ১১০৮-১১০৯নং)

(৫)। মুক্তাদী একজন শিশু ও একজন বা একাধিক পুরুষ হলে শিশুও পুরুষদের কাতারে শামিল হয়ে দাঁড়াবে।

(৬)। মুক্তাদী দুই বা দুয়ের অধিক পুরুষ, শিশু ও মহিলা হলে, ইমামের পিছনে পুরুষরা, অতঃপর শিশুরা এবং সবশেষে মহিলারা কাতার বাঁধবে।মহানবী (ﷺ) বলেন, “পুরুষদের শ্রেষ্ঠ কাতার হল প্রথম কাতার এবং নিকৃষ্ট কাতার হল সর্বশেষ কাতার। আর মহিলাদের শ্রেষ্ঠ কাতার হল সর্বশেষ কাতার এবং নিকৃষ্ট কাতার হল প্রথম কাতার।” (মুসলিম, আহমাদ, মুসনাদ, সুনানু আরবাআহ (আবূ দাঊদ, তিরমিযী,ও ইবনে মাজাহ্‌ মিশকাত ১০৯২) প্রকাশ থাকে যে,শিশু ছেলেদের পৃথক কাতার করার কোন সহীহ দলীল নেই। তাই শিশু ছেলেরাও পুরুষদের সঙ্গে কাতার করতে পারে। (তামামুল মিন্নাহ্‌, আলবানী ২৮৪পৃ:)।

(৭)। ইমামের সামনে কাতার বেঁধে নামায হয় না। অবশ্য ভিড়ের সময় ইমামের সামনে ছাড়া কোন দিকে জায়গা না থাকলে নিরুপায় অবস্থায় নামায হয়ে যাবে (আলমুমতে’,শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৩৭২-৩৭৩) প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে, জুমুআহ ও ঈদের নামাযের জামাআতে যদি এত ভিঁড় হয় যে সিজদার জন্য জায়গা না পাওয়া যায়, তাহলে সামনের মুসল্লীর পিঠে সিজদা করে নামায সম্পন্ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জায়গা নেই বলে অপেক্ষা করে দ্বিতীয় জামাআত কায়েম করা যাবে না। একদা হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) খুতবায় বলেন,‘ভিঁড় বেশী হলে তোমাদের একজন যেন অপরজনের পিঠে সিজদা করে।’ (আহমাদ, মুসনাদ ১/৩২, বায়হাকী ৩/১৮২-১৮৩, আব্দুর রাযযাক, মুসান্নাফ ৫৪৬৫, ৫৪৬৯নং, তামামুল মিন্নাহ্‌, আলবানী ৩৪১পৃ:)।

(৮)। ইমামের নিকটবর্তী দাঁড়াবে জ্ঞানী লোকেরা। যাতে তাঁরা ইমামের কোন ভুল চট করে ধরে দিতে পারেন এবং ইমাম নামায পড়াতে পড়াতে কোন কারণে নামায ছাড়তে বাধ্য হলে তাঁদের কেউ জামাআতের বাকী কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। বলা বাহুল্য, সাধারণ মূর্খ মানুষদের ইমামের সরাসরি পশ্চাতে দাঁড়ানো উচিৎ নয়। জ্ঞানী (আলেম-হাফেয-ক্বারী) মানুষদের জন্য ইমামের পার্শ্ববর্তী জায়গা ছেড়ে রাখা উচিৎ।মহানবী (ﷺ) বলেন, “সেই লোকদেরকে আমার নিকটবর্তী দাঁড়ানো উচিৎ,যারা জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান লোক। অতঃপর তারা যারা তাদের চেয়ে কম জ্ঞানের। অতঃপর তারা যারা তাদের থেকে কম জ্ঞানের। আর তোমরা বাজারের ফালতু কথা (হৈচৈ) থেকে দূরে থাক।” (মুসলিম আবূদাঊদ, মিশকাত ১০৮৯)।

(৯)। সামনের কাতারে জায়গা থাকতে পিছনে একাকী দাঁড়িয়ে নামায পড়লে নামায হয় না।এক ব্যক্তি কাতারের পিছনে একা দাঁড়িয়ে নামায পড়লে মহানবী (ﷺ) তাকে নামায ফিরিয়ে পড়তে বললেন। (আবু দাঊদ, সুনান ৬৮২, তিরমিযী, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান)।তিনি বলেন,“যে ব্যক্তি কাতারের পিছে একা নামায পড়ে, সে যেন নামায ফিরিয়ে পড়ে।” (ইবনে হিব্বান,সহীহ) অতএব যদি কোন ব্যক্তি জামাআতে এসে দেখে যে, কাতার পরিপূর্ণ, তাহলে সে কাতারে কোথাও ফাঁক থাকলে সেখানে প্রবেশ করবে। নচেৎ সামান্যক্ষণ কারো অপেক্ষা করে কেউ এলে তার সঙ্গে কাতার বাঁধা উচিৎ। সে আশা না থাকলে বা জামাআত ছুটার ভয় থাকলে (মিহ্‌রাব ছাড়া বাইরে নামায পড়ার সময়) যদি ইমামের পাশে জায়গা থাকে এবং সেখানে যাওয়া সম্ভব হয়, তাহলে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াবে এবং এ সব উপায় থাকতে পিছনে একা দাঁড়াবে না। পরন্তু কাতার বাঁধার জন্য সামনের কাতার থেকে কাউকে টেনে নেওয়া ঠিক নয়। এ ব্যাপারে যে হাদীস এসেছে তা সহীহ ও শুদ্ধ নয়।(যইফ জামে ২২৬১নং)।তাছাড়া এ কাজে একাধিক ক্ষতিও রয়েছে। যেমন: যে মুসল্লীকে টানা হবে তার নামাযের একাগ্রতা নষ্ট হবে, প্রথম কাতারের ফযীলত থেকে বঞ্চিত হবে, কাতারের মাঝে ফাঁক হয়ে যাবে, সেই ফাঁক বন্ধ করার জন্য পাশের মুসল্লী সরে আসতে বাধ্য হবে, ফলে তার জায়গা ফাঁক হবে এবং শেষ পর্যন্ত প্রথম বা সামনের কাতারের ডান অথবা বাম দিককার সকল মুসল্লীকে নড়তে-সরতে হবে। আর এতে তাদের সকলের একাগ্রতা নষ্ট হবে। অবশ্য হাদীস সহীহ হলে এত ক্ষতি স্বীকার করতে বাধা ছিল না। তদনুরুপ ইমামের পাশে যেতেও যদি অনুরুপ ক্ষতির শিকার হতে হয়,তাহলে তাও করা যাবে না। ঠিক তদ্রুপই জায়গা না থাকলেও কাতারের মুসল্লীদেরকে এক এক করে ঠেলে অথবা সরে যেতে ইঙ্গিত করে জায়গা করে নেওয়াতেও ঐ মুসল্লীদের নামাযের একাগ্রতায় বড় ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। সুতরাং এ কাজও বৈধ নয়।

বলা বাহুল্য, এ ব্যাপারে সঠিক ফায়সালা এই যে, সামনে কাতারে জায়গা না পেলে পিছনে একা দাঁড়িয়েই নামায হয়ে যাবে। কারণ, সে নিরুপায়। আর মহান আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে ভার দেন না। (লিকাউবাবিল মাফতূহ্‌,ইবনে উষাইমীন ২২৭পৃ:) প্রকাশ থাকে যে, মহিলা জামাআতের মহিলা কাতারে জায়গা থাকতে যে মহিলা পিছনে একা দাঁড়িয়ে নামায পড়বে তারও নামায পুরুষের মতই হবে না।(আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৩৮৭)। পক্ষান্তরে পুরুষদের পিছনে একা দাঁড়িয়ে মহিলার নামায হয়ে যাবে।

(১০)। ইমাম মুক্তাদী থেকে উঁচু জায়গায় দাঁড়াতে পারে না। কারণ মহানবী (ﷺ) কর্তৃক এরুপ দাঁড়ানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।(আবুদাঊদ,সুনান ৬১০-৬১১, হাকেম, মুস্তাদরাক, মিশকাত ১৬৯২, জামে ৬৮৪২) একদা হুযাইফা (রাঃ) মাদায়েনে একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে লোকেদের ইমামতি করতে লাগলেন। তা দেখে আবু মাসঊদ (রাঃ) তাঁর জামা ধরে টেনে তাঁকে নিচে নামিয়ে দিলেন। নামাযের সালাম ফেরার পর তিনি হুযাইফাকে বললেন, ‘আপনি কি জানেন না যে, এরুপ দাঁড়ানো নিষিদ্ধ?’ তিনি বললেন ‘জী হ্যাঁ, যখনই আপনি আমাকে টান দিলেন, তখনই আমার মনে পড়ে গেল।’ (আবুদাঊদ, সুনান ৫৯৭ ইবনে হিব্বান, সহীহ)।

অবশ্য শিক্ষা দেওয়ার জন্য উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে নামায পড়ানো যায়। যেমন নবী মুবাশ্‌শির (ﷺ) মিম্বরের উপর খাড়া হয়ে নামায পড়ে সাহাবাদেরকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। (বুখারী ৩৭৭নং, মুসলিম, সহীহ)। আর এই হাদীসকে ভিত্তি করেই উলামাগণ বলেন, মিম্বরের এক সিড়ি পরিমাণ (প্রায় একহাত) মত উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে ইমামতি করলে দোষাবহ্‌ নয়।(মাজমূআতু রাসাইল ফিস স্বালাহ্‌ ১০০পৃ:, আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৪২৪-৪২৬) পক্ষান্তরে মুক্তাদী ইমাম থেকে উঁচু জায়গায় দাঁড়াতে পারে। হযরত আবু হুরাইরা নিচের ইমামের ইক্তেদা করে মসজিদের ছাদের উপর জামাআতেনামায পড়েছেন। (শাফেয়ী, বায়হাকী, বুখারী তা’লীক)।

(১১)। প্রথম কাতারে দাঁড়িয়ে নামায পড়ার পৃথক মাহাত্ম আছে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, “লোকেরা যদি আযান ও প্রথম কাতারে নিহিত মাহাত্ম জানত, তাহলে তা অর্জন করার জন্য লটারি করা ছাড়া আর অন্য কোন উপায় না পেলে তারা লটারিই করত।” (বুখারী ৬১৫নং, মুসলিম, সহীহ ৪৩৭নং)। তিনি বলেছেন, “অবশ্যই আল্লাহ প্রথম কাতার ও সামনের কাতারসমূহের প্রতি রহ্‌মত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ তাদের জন্য দুআ করে থাকেন।” (মুসনাদে আহমাদ, সহিহ তারগিব,৪৮৯)
একদা তিনি সাহাবাদেরকে পশ্চাদপদ হতে দেখে বললেন, তোমরা অগ্রসর হও এবং আমার অনুসরণ কর। আর তোমাদের পিছনের লোক তোমাদের অনুসরণ করুক। এক শ্রেণীর লোক পিছনে থাকতে চাইবে, ফলে আল্লাহ তাদেরকে (নিজ রহ্‌মত থেকে) পিছনে ফেলে দেবেন।” (সহীহ মুসলিম, মিশকাত ১০৯০) আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, “কোন সম্প্রদায় প্রথম কাতার থেকে পিছনে সরে আসতে থাকলে অবশেষে আল্লাহ তাদেরকে জাহান্নামে পশ্চাদ্ববর্তী করে দেবেন।” অর্থাৎ জাহান্নামে আটকে রেখে সবার শেষে জান্নাত যেতে দেবেন, আর সে প্রথম দিকে জান্নাত যেতে পারবে না।(আউনুল মা’বূদ ২/২৬৪নং, আবূ দাউদ, ইবনে খুযাইমাহ্‌, ইবনে হিব্বান, সহীহ তারগীব ৫০৭)

(১২)। প্রথম কাতারে ডান দিকের জায়গা অপেক্ষাকৃত উত্তম। সাহাবী বারা বিন আযেব বলেন, ‘আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর ডান দিকে দাঁড়াবার চেষ্টা করতাম। যাতে তিনি আমাদের দিকে মুখ করে ফিরে বসেন।’ (মুসলিম, সহীহ ৭০৯, আবূদাঊদ, সুনান ৬১৫নং)।

(১৩)। ইমামের ডানে-বামে লোক যেন সমান-সমান হয়। অতএব কাতার বাঁধার সময় তা খেয়াল রাখা সুন্নত। যেহেতু ২ জন মুক্তাদী হলে এবং আগে-পিছে জায়গা না থাকলে একজন ইমামের ডানে ও অপরজন বামে দাঁড়াতে হয়। তাছাড়া ইমামের কাছাকাছি দাঁড়ানোরও ফযীলত আছে। সুতরাং সাধারণভাবে ইমামের ডান দিকে দাঁড়ানো উত্তম নয়। যেমন ইমামের বাম দিকে লোক কম থাকলে ডান দিকে দাঁড়ানো থেকে বাম দিকে দাঁড়ানো উত্তম। কারণ তখন বাম দিকটা ইমামের অধিক কাছাকাছি। পক্ষান্তরে ডানে-বামে যদি লোক সমান সমান থাকে,তাহলে বামের থেকে ডান দিক অবশ্যই উত্তম। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৩/১৯)।

(১৪)। (বিরল মাসআলায়) যদি কোন স্থান-কালে কোন জামাআতের দেহে সতর ঢাকার মত লেবাস না থাকে তাহলে ইমাম সামনে না দাঁড়িয়ে কাতারের মাঝে দাঁড়াবে। অবশ্য ঘন অন্ধকার অথবা মুক্তাদীরা অন্ধ হলে বিবস্ত্র ইমাম সামনে দাঁড়াবে। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৩৮৯) নোট সালাতে মুবাশ্বির আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
___________________________
উপস্থাপনায়,
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে সালাত আদায় করতেন

 প্রশ্ন: সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রাসূল (ﷺ) যেভাবে সালাত আদায় করতেন বিস্তারিত বর্ননা সহ জানতে চাই?

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পুরুষ-নারীন,ছোট-বড় নির্বিশেষে সকলের জন্যই বলেছেন, صَلُّوْا كَمَا رَأَيْتُمُوْنِيْ أُصَلِّيْ ‘তোমরা ঠিক সেভাবেই সালাত কর,যেভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখছ।’(সহীহ বুখারী, হা/৬৩১, ৬০০৮, ৭২৪৬) উক্ত হাদীসের আলোকে আমরা রাসূল (ﷺ) এর সালাত আদায়ের সঠিক পদ্ধতি তুলে ধরার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
.
সর্বপ্রথম সালাতের জন্য ওযু-গোসল করে পবিত্র হয়ে পরিচ্ছন্ন পোষাক ও দেহ-মন নিয়ে কা‘বা গৃহ পানে মুখ ফিরিয়ে মনে মনে সালাতের দৃঢ় সংকল্প করে স্বীয় প্রভুর সন্তুষ্টি কামনায় তাঁর সম্মুখে বিনম্রচিত্তে দাঁড়িয়ে যেতে হবে।কেননা সালাতের শুরুতে নিয়ত করা অপরিহার্য।আর সকল কাজ নিয়তের উপরে নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তাই-ই পাবে,যার জন্য সে নিয়ত করবে’ (সহীহ বুখারী: ১)। অতঃপর দুনিয়াবী সবকিছুকে হারাম করে দিয়ে স্বীয় প্রভুর মহত্ত্ব ঘোষণা করে বলবে ‘আল্লা-হু আকবার’ (আল্লাহ সবার চেয়ে বড়)’ বলে ‘তাকবীরে তাহরীমা’ সহ দু’হাত কান অথবা কাঁধ বরাবর উঠিয়ে বুকের উপর বাঁধবে। (মুসলিম হা/৯১২, ১/১৭০ পৃঃ, (ইফাবা হা/৭৬৯); বুখারী হা/৬৬৬৭, ২/৯৮৬ পৃঃ; মিশকাত হা/৭৯০)। এ সময় বাম হাতের উপরে ডান হাত কনুই বরাবর রাখবে অথবা বাম হাতের কব্জির উপরে ডান হাতের কব্জি রেখে বুকের উপরে হাত বাঁধবে। [সহীহ বুখারী হা/৭৪০, ১/১০২ পৃঃ, (ইফাবা হা/৭০৪, ২য় খন্ড, পৃঃ ১০২); নাসাঈ হা/৮৮৯, ১/১০২ পৃঃ; আবুদাঊদ হা/৭২৭, ১/১০৫ পৃঃ) জামা‘আতের সাথে সালাত আদায় করলে কাতারের মাঝে পরস্পরের পায়ের সাথে পা, টাখনুর সাথে টাখনু এবং কাঁধের সাথে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াবে।(আবু দাঊদ হা/৬৬৬, ১ম খন্ড, পৃঃ ৯৭, সনদ সহীহ; মিশকাত হা/১১০২, পৃঃ ৯৯)। সেই সাথে সিজদা বা তার এরিয়ার মধ্যে দৃষ্টি রাখবে।(মুস্তাদরাক হাকেম হা/১৭৬১; বায়হাক্বী, সনানুল কুবরা হা/১০০০৮)। অতঃপর সানা’ (الثناء) অর্থ ‘প্রশংসা’। এটা মূলতঃ ‘দো‘আয়ে ইস্তেফতা-হ’ (دعاء الاستفتاح) বা সালাত শুরুর দো‘আ। বুকে জোড় হাত বেঁধে সিজদার স্থানে দৃষ্টি রেখে বিনম্রচিত্তে নিম্নোক্ত দো‘আর মাধ্যমে মুসল্লী তার সর্বোত্তম ইবাদতের শুভ সূচনা করবে اَللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِىْ وَبَيْنَ خَطَايَاىَ كَمَا بَاعَدْتَ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ اَللَّهُمَّ نَقِّنِىْ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ اَللَّهُمَّ اغْسِلْ خَطَايَاىَ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَد. অনুবাদ: হে আল্লাহ! আপনি আমার ও আমার গোনাহ সমূহের মধ্যে এমন দূরত্ব সৃষ্টি করে দিন, যেমন দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে পরিচ্ছন্ন করুন গোনাহ সমূহ হতে,যেমন পরিচ্ছন্ন করা হয় সাদা কাপড় ময়লা হতে। হে আল্লাহ! আপনি আমার গুনাহ সমূহকে ধুয়ে সাফ করে দিন পানি দ্বারা,বরফ দ্বারা ও শিশির দ্বারা।’(বুখারী হা/৭৪৪, ১/১০২ পৃঃ, (ইফাবা হা/৭০৮, ২/১০৩ পৃঃ); মিশকাত হা/৮১২, পৃঃ ৭৭)। সানা পাঠ শেষ করে ‘আ‘ঊযুবিল্লাহি মিনাশ শায়ত্ব-নির রজীম মিন হামযিহী, ওয়া নাফখিহী ওয়া নাফছিহী। (আবু দাঊদ হা/৭৭৫, ১/১১৩ পৃঃ; তিরমিযী হা/২৪২) ও ‘বিসমিল্লা-হির রহমা-নির রহীম’ সহ সূরা ফাতিহা পাঠ করবে।(সহীহ বুখারী হা/৭৫৬, ১/১০৪ পৃঃ, (ইফাবা হা/৭২০, ২/১০৯ পৃঃ)। প্রকাশ থাকে যে, ‘আঊযুবিল্লাহ’ কেবল ১ম রাক‘আতে পড়বে।পরের রাক‘আতগুলো ‘বিসমিল্লা-হির রহমা-নির রহীম’ বলে সূরা ফাতিহা শুরু করবে। জেহরী-সির্রী উভয় সালাতে ‘বিসমিল্লাহ’ নীরবে পড়বে।(বুখারী হা/৭৪৩, ১/১০৩ পৃঃ. (ইফাবা হা/৭০৭, ২/১০৩ পৃঃ); মুসলিম হা/৯১৪; মিশকাত হা/৮২৪ ও ৮২৩) এবং ফাতিহা শেষে উচ্চৈঃস্বরে ‘আমীন’ বলবে। (বুখারী হা/৭৮০, ১ম খন্ড, পৃঃ ১০৭, (ইফাবা হা/৭৪৪ ও ৭৪৬, ২/১২১ পৃঃ)। জেহরী-সালাতে মুক্তাদীগণ ইমামের সাথে সাথে শুধু সূরা ফাতিহা পড়বে। (বুখারী হা/৭৫৬, ১/১০৪ পৃঃ, (ইফাবা হা/৭২০, ২/১০৯ পৃঃ) ক্বিরাআত শেষে ইমাম আমীন বলা শুরু করলে মুক্তাদীও তার সাথে মিলে এক সঙ্গে আমীন বলবে। (বুখারী হা/৭৮০, ১ম খন্ড, পৃঃ ১০৭, (ইফাবা হা/৭৪৪ ও ৭৪৬, ২/১২১ পৃঃ) উল্লেখ্য, ইমামের আমীন বলার আগেই মুক্তাদীর আমীন বলার যে অভ্যাস চালু তা বর্জন করতে হবে।

◾ক্বিরাআত: সূরা ফাতিহা পাঠ শেষে ইমাম হলে কিংবা মুসল্লী একাকী হলে প্রথম দু’রাক‘আতে কুরআন থেকে অন্য সূরা বা কিছু আয়াত পাঠ করবে। তবে মুক্তাদী হলে জেহরী সালাতে ইমামের সাথে সাথে শুধু সূরা ফাতিহা পড়বে। অতঃপর ইমামের ক্বিরাআত মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করবে। (বুখারী হা/৭৫৬, ১/১০৪ পৃঃ, (ইফাবা হা/৭২০, ২/১০৯ পৃঃ)। আর যোহর ও আসরের সালাতে ইমাম মুক্তাদী উভয়ে প্রথম দুই রাক‘আতে সূরা ফাতিহা সহ অন্য সূরা পড়বে। (ইবনু মাজাহ হা/৮৪৩, পৃঃ ৬১; সনদ ছহীহ, আলবানী, ইরওয়াউল গালীল হা/৫০৬, ২/২৮৮ পৃঃ)। আর শেষের দু’রাক‘আতে কেবল সূরা ফাতিহা পাঠ করবে। (বুখারী হা/৭৭৬, ১/১০৭ পৃঃ; মিশকাত হা/৮২৮, পৃঃ ৭৯)। অবশ্য মুক্তাদী প্রথম দুরাকাতে শুধু সূরা ফাতেহা পড়লেও সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ। (সহীহ বুখারী: ৭৫৬)।

◾রুকূ: ক্বিরাআত শেষে ‘আল্লা-হু আকবার’ বলে দু’হাত কান কিংবা কাঁধ পর্যন্ত উঠিয়ে ‘রাফ‘উল ইয়াদায়েন’ করে রুকূতে যাবে।(মুত্তাফাক্ব আলাইহ, সহীহ বুখারী হা/৭৩৫, ১ম খন্ড, পৃঃ ১০২)। হাঁটুর উপরে দু’হাতে ভর দিয়ে পিঠ ও মাথা সোজা রাখবে। এ সময় বাহুসহ দুই হাত ও হাঁটুসহ দুই পা শক্ত করে সোজা রাখবে।(মুসলিম হা/১১৩৮; মিশকাত হা/৭৯১; বুখারী হা/৮২৮; মিশকাত হা/৭৯২; আবুদাঊদ হা/৮৫৯)। আর নামাযে তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ হত সিজদার স্থানে। (মুস্তাদরাক, ইরওয়াউল গালীল,৩৫৪)। অতঃপর রুকূর দু‘আ পড়বে দোয়াটি হল سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيْمউচ্চারন: সুবহা-না রাব্বিয়াল আযীম।অর্থ:-আমি আমার মহান প্রতিপালকের পবিত্রতাঘোষণা করছি।এটি ৩ বার পাঠ করবে। (বুখারী হা/৭৯৪ ও ৮১৭; ইবনু মাজাহ হা/৮৮৮)। এছাড়া সাথে আরো দোয়া পড়তে পারেন দেখুন। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৮৭১)। নবী মুবাশ্‌শির (ﷺ) রুকূতে স্থিরতা অবলম্বন করতেন। এ ব্যাপারে তিনি নামায ভুলকারী সাহাবীকে আদেশও করেছেন। আর তিনি বলতেন, “তোমরা তোমাদের রুকূ ও সিজদাকে পরিপূর্ণরুপে আদায় কর। সেই সত্তার শপথ! যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে, আমি আমার পিঠের পিছন থেকে তোমাদের রুকু ও সিজদাহ করা দেখতে পাই। (সহীহ বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৮৬৮)।

◾কওমা: অতঃপর রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে প্রশান্তির সাথে দাঁড়াবে এবং কান বা কাঁধ বরাবর দুই হাত উঠিয়ে ‘রাফ‘উল ইয়াদায়েন’ করবে। (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, ছহীহ বুখারী হা/৭৩৫, ১ম খন্ড, পৃঃ ১০২) উক্ত কওমায় রাসূল( ﷺ) এরুপ খাড়া হতেন যে,মেরুদন্ডের প্রত্যেক (৩৩ খানা) হাড় নিজ নিজ জায়গায় ফিরে যেত। (বুখারী ৮২৮, আবূদাঊদ, সুনান, মিশকাত ৭৯২)। এ সময় ‘সামি‘আল্লা-হু লিমান হামিদাহ’ বলে দু‘আ পাঠ করবে। (বুখারী হা/৭৯৫)। তারপর বলবে رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ ‘রববানা লাকাল হাম্দ’ বলবে। অথবা বলবে رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ حَمْدًا كَثِيْرًا طَيِّبًا مُّبَارَكًا فِيْهِ ‘রববানা ওয়া লাকাল হাম্দু হাম্দান কাছীরান ত্বাইয়েবাম মুবা-রাকান ফীহি’। (বুখারী হা/৭৯৯; মিশকাত হা/৮৭৭)।সেই সাথে দুই হাত স্বাভাবিকভাবে ছেড়ে দিবে। (বুখারী হা/৮২৮, ১/১১৪ পৃঃ; মিশকাত হা/৭৯২)। উল্লেখ যে,বর্ণনা থেকে এ কথা বুঝা যায় যে, ইমাম ‘সামিআল্লাহু’ বললে মুক্তাদী ‘রাব্বানা অলাকালহাম্‌দ’ বলবে। তবে এখানে এ কথা নিশ্চিত নয় যে,মুক্তাদী ‘সামিআল্লাহু’ বলবে না। বরং মুক্তাদীও উভয় বাক্যই বলতে পারে। যেহেতু আল্লাহর নবী (ﷺ) উভয়ই বলেছেন। (দেখুন, মুসলিম, আবূদাঊদ,প্রভৃতি, মিশকাত ৭৯৩ সিফাতু স্বালাতিন নাবী (ﷺ), আলবানী ১৩৫-১৩৬পৃ:)
উল্লেখ্য যে,শাইখ ইবনে উসাইমীন ও বিন বাযসহ (রহঃ) কতিপয় বিদ্বানের অভিমত হ’ল ইমাম ‘সামি‘আল্লাহ’ এবং ‘রববানা’ ঊভয়টি বলবে। আর মুক্তাদী কেবল ‘রববানা লাকাল হামদ’ বললেই যথেষ্ট হবে (উসাইমীন,লিকাউল বাবিল মাফতুহ,৩২০/১; আল-মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়া ২৭/৯৩-৯৪)। তবে উভয়ের জন্য দু’টি বাক্য বলার বিষয়টিই সহীহ হাদীসের অধিক নিকটবর্তী (ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১৬২; আলবানী, ছিফাতু ছালাতিন্নবী ১৩৫ পৃ)।
.
◾সিজদা: অতঃপর ‘আল্লা-হু আকবর’ বলে প্রথমে দু’হাত ও পরে দু’হাঁটু মাটিতে রেখে সিজদায় যাবে ও দু‘আ পড়বে এই মর্মে হাদীসগুলো বেশি এবং সহীহ। (আবুদাঊদ হা/৮৪০, ১/১২২ পৃঃ; নাসাঈ হা/১০৯১, ১/১২৩ পৃঃ; মিশকাত হা/৮৯৯)। আবার প্রথমে হাঁটু রাখার হাদীসও বহু উলামার নিকট শুদ্ধ। তাই তাঁদের নিকট উভয় আমলই বৈধ। সুবিধামত হাত অথবা হাঁটু আগে রাখতে পারে নামাযী। (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ্‌ ২২/৪৪৯, ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ২/২৯১, উদ্দাহ্‌ ৯৬পৃ:)। এ সময় হাত দু’খানা ক্বিবলামুখী করে মাথার দু’পাশে কাঁধ বরাবর মাটিতে রাখবে।(আবুদাঊদ হা/৭৩৪, ১/১০৭ পৃঃ; তিরমিযী হা/২৭০, সনদ ছহীহ; মিশকাত হা/৮০১, পৃঃ ৭৬)।কপালের সাথে নাকটিকেও মাটি বা মুসাল্লার সঙ্গে লাগিয়ে দিতেন। (আবুদাঊদ, সুনান, ইরওয়াউল গালীল,৩০৯ )।হাতের আঙ্গুলগুলো মিলিয়ে রাখবে। (হাকেম হা/৮১৪;বালাগুল মারাম হা/২৯৭, সনদ সহীহ) কনুই উঁচু রাখবে ও বগল ফাঁকা রাখবে। (বুখারী হা/৮০৭, (ইফাবা হা/৭৭০, ২/১৩৫ পৃঃ), হাঁটু বা মাটিতে ঠেস দিবে না।(বুখারী হা/৮২২, (ইফাবা হা/৭৮৪, ২/১৪১ পৃঃ)। সিজদা লম্বা হবে ও পিঠ সোজা থাকবে। যেন নীচ দিয়ে একটি বকরীর বাচ্চা যাওয়ার মত ফাঁকা থাকে। (মুসলিম হা/১১৩৫; আবুদাঊদ হা/৮৯৮; মিশকাত হা/৮৯০, পৃঃ ৮৩)।দুই পা খাড়া করে এক সঙ্গে মিলিয়ে রাখবে।(সহীহ মুসলিম হা/১১১৮, ১/১৯২ পৃঃ, (ইফাবা হা/৯৭২) এ সময় আঙ্গুলগুলো ক্বিবলামুখী করে রাখবে। (বুখারী হা/৮২৮, ১/১১৪ পৃঃ; মিশকাত হা/৭৯২)।গোড়ালি দু’টিকে একত্রে মিলিয়ে রাখবে। (ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ ৬৫৪ নং,হাকেম, মুস্তাদরাক ১/২২৮)। অতঃপর سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى বলবে কমপক্ষে তিনবার বলবে। (ইবনু মাজাহ হা/৮৮৮; সনদ ছহীহ, ইরওয়াউল গালীল হা/৩৩৩) সিজদাতে পঠিতব্য আরো দু‘আ আছে। চাইলে পড়তে পারেন।(সহীহ মুসলিম,৪৮৩-৪৮৬) জেনে রাখা ভাল যে, ধীর-স্থিরভাবে সিজদাহ করা ওয়াজিব। তাড়াহুড়ো করে নামায শুদ্ধ হয় না। সিজদায় গিয়ে ধীরতা ও স্থিরতা অবলম্বন করে পিঠ সোজা না করলে এবং প্রত্যেক হাড় তার নিজের জোড়ে স্থিরভাবে বসে না গেলে মুরগীর দানা খাওয়ার মত নামায পড়া হয় ও নামায চুরি করা হয়। আর সিজদায় পিঠ সোজা না করলে নামাযও বাতিল পরিগণিত হয়। সিজদা থেকে উঠে বাম পায়ের পাতার উপরে বসবে ও ডান পায়ের পাতা খাড়া রাখবে। (বুখারী, বায়হাকী, সিফাতু স্বালাতিন নাবী (ﷺ), আলবানী ১৫১পৃ:)। আর এই পায়ের আঙ্গুল গুলোকে কেবলামুখী করে রাখতেন। (সহিহ, নাসাঈ, সুনান ১১০৯ )। আবার কখনো কখনো রাসূল (ﷺ) এই বৈঠকে দুই পায়ের পাতাকে খাড়া রেখে পায়ের দুই গোড়ালির উপর বসতেন। এই প্রকার বৈঠক প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, ‘এরুপ বসা সুন্নত।’ (মুসলিম, সহীহ ৫৩৬ আবূদাঊদ, ৮৪৫)।এ সময় প্রশান্তির সাথে বসবে এবং বলবেاَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِىْ وَارْحَمْنِىْ وَاجْبُرْنِىْ وَاهْدِنِىْ وَعَافِنِىْ وَارْزُقْنِىْ ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আমার উপরে রহম করুন, আমার অবস্থার সংশোধন করুন, আমাকে সৎপথ প্রদর্শন করুন, আমাকে সুস্থতা দান করুন ও আমাকে রূযী দান করুন।’(তিরমিযী হা/২৮৪, ১/৬৩ পৃঃ; আবুদাঊদ হা/৮৫০, ১/১২৩ পৃঃ; মিশকাত হা/৯০০; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৮৪০, ২/৩০১ পৃঃ)।প্রকাশ থাকে যে, এই বৈঠকে আঙ্গুল ইশারা করার হাদীস সহীহ নয়।(মুখালাফাত ফিত্বাহারাতি অসস্বালাহ্‌ ৮২পৃ)। অতঃপর ‘আল্লা-হু আকবর’ বলে দ্বিতীয় সিজদায় যাবে ও দু‘আ পড়বে। ২য় ও ৪র্থ রাক‘আতে দাঁড়ানোর সময় সিজদা থেকে উঠে শান্তভাবে বসবে। দ্বিতীয় সিজদাহ্‌ থেকে মাথা তুলে নবী মুবাশ্‌শির (ﷺ) পুনরায় বাম পায়ের উপর সোজা হয়ে বসে যেতেন। এতে তাঁর প্রত্যেক হাড় নিজ নিজ জায়গায় ফিরে যেত।(সহীহ বুখারী ৬৭৭, ৮২৩)।এই বৈঠক-কে ‘জালসা-এ ইস্তিরাহাহ্‌’ আরামের বৈঠক বলা হয়। কারণ, এতে প্রথম ও তৃতীয় রাক্‌আত শেষ করে দ্বিতীয় ও চতুর্থ রাকআত শুরু করার পূর্বে একটু আরাম নেওয়া হয় তাই। অবশ্য সুন্নতের এই বৈঠকটি দুই সিজদার মাঝের বৈঠকের মত লম্বা হবে না। কেবল সোজা হওয়ার মত হাল্কা একটু বসতে হবে। তবে এতে পঠনীয় কোন যিক্‌র বা দুআ নেই। অতঃপর মাটিতে দু’হাত রেখে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। (বুখারী হা/৮২৩, ১/১১৩ পৃঃ, (ইফাবা হা/৭৮৫ ও ৭৮৬, ২/১৪১ পৃঃ); মিশকাত হা/৭৯৬) উল্লেখ্য যে,রুকূ ও সিজদায় কুরআন থেকে কোন আয়াত পড়বে না।(মুসলিম হা/১১০২; মিশকাত হা/৮৭৩)।
.
◾বৈঠক: ২য় রাক‘আত শেষ করার পর বৈঠকে বসবে। ১ম বৈঠক হলে কেবল ‘আত্তাহিইয়া-তু’ পড়বে। (মুসলিম হা/১১৩৮; মিশকাত হা/৭৯১; সিফাতু সালাতিন নাবী, পৃঃ ১৬০)। তারপর মাটির উপর দুই হাত রেখে ভর দিয়ে ৩য় রাক‘আতের জন্য দাঁড়িয়ে যাবে।(বুখারী হা/৮২৩, ১/১১৩ পৃঃ, (ইফাবা হা/৭৮৫ ও ৭৮৬, ২/১৪১ পৃঃ); মিশকাত হা/৭৯৬)আর যদি শেষ বৈঠক হয়, তবে ‘আত্তাহিইয়া-তু’ পড়ার পরে দরূদ, দু‘আয়ে মাসূরাহ পড়বে। (বুখারী হা/৮৩৫, ‘আযান’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৫০; মুসলিম হা/১৩৫৪)। যে বৈঠকের শেষে সালাম ফিরাতে হয়,তাকে শেষ বৈঠক বলে। এটি ফরয, যা না করলে সালাত বাতিল হয়। তবে ১ম বৈঠকটি ওয়াজিব, যা ভুলক্রমে না করলে সিজদায়ে সাহু ওয়াজিব হয়। ২য় রাক‘আত শেষে বৈঠকে বসবে। ১ম বৈঠকে বাম পায়ের পাতার উপরে বসবে এবং শেষ বৈঠকে ডান পায়ের তলা দিয়ে বাম পায়ের অগ্রভাগ বের করে নিতম্বের উপরে বসবে এবং ডান পা খাড়া রাখবে ও আঙ্গুলগুলো ক্বিবলামুখী করবে। (বুখারী হা/৮২৮, ১ম খন্ড, পৃঃ ১১৪, (ইফাবা হা/৭৯০, ২/১৪৪ পৃঃ); মিশকাত হা/৭৯২)।এ সময় আঙ্গুলগুলো সাধারণভাবে খোলা রাখবে।(আবুদাঊদ হা/৭৩০; মিশকাত হা/৮০১) জোড়-বেজোড় যেকোন সালাতের সালামের বৈঠকে নারী-পুরুষ সকলকে এভাবেই বাম নিতম্বের উপর বসতে হয়। একে ‘তাওয়ার্রুক’ (التورك) বলা হয়।(সহীহ ইবনু হিববান হা/১৮৬২,৬৭,৭৩; বুখারী হা/৮২৮)। বৈঠকের সময় বাম হাতের আঙ্গুল বাম হাঁটুর উপর ক্বিবলামুখী করে রাখবে। আর ডান হাতের বৃদ্ধা আঙ্গুল মধ্যমা আঙ্গুলের পিঠে রেখে মুষ্টিবদ্ধ করে শাহাদাত আঙ্গুল দ্বারা সালাম ফিরানোর আগ পর্যন্ত ইশারা করবে। (সহীহ মুসলিম হা/১৩৩৬, ১৩৩৮, ১/২১৬ পৃঃ) অন্য হাদীছে এসেছে, ৫৩-এর ন্যায় মুষ্টিবদ্ধ রেখে সালাম ফিরানোর আগ পর্যন্ত শাহাদাত অঙ্গুলি দ্বারা ইশারা করতে থাকবে।(সহীহ মুসলিম হা/১৩৩৮, ১/২১৬ পৃঃ, (ইফাবা হা/১১৮৬); মিশকাত হা/৯০৬) এ সময় শাহাদাত আঙ্গুলের দিকে দৃষ্টি রাখবে। (নাসাঈ হা/১২৭৫, ১১৬০, ১/১৩০ পৃঃ ও ১/১৪২ পৃঃ)। দুই তাশাহ্হুদেই ইশারা করবে। (বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা হা/২৯০৩; সনদ সহীহ, সিফাতু সালাতিন নবী, পৃঃ ১৫৯) সুতরাং দুআ শেষ না করা (সালাম ফিরার পূর্ব) পর্যন্ত তর্জনী হিলানো সুন্নত। যেহেতু দুআ সালাম ফিরার পূর্বেই শেষ হয়ে থাকে। (সিফাতু স্বালাতিন নাবী (ﷺ), আলবানী ১৫৮-১৫৯ পৃ:) নাবী (ﷺ),বলতেন, “অবশ্যই ঐ তর্জনী শয়তানের পক্ষে লোহা অপেক্ষা অধিক কষ্টদায়ক (খোঁচার দন্ড)। (আহমাদ, মুসনাদ ২/১১৯, বাযযার, মাক্বদিসী,প্রমুখ)।ইবনে উমার (রাঃ) বলেন,‘ঐ আঙ্গুলটি শয়তানের জন্য আঘাত-দন্ড। যে এইভাবে ইশারা করে,সে (নামাযে) উদাসীন হয় না।’ ‘আত্তাহিইয়া-তু’, ‘দরূদ’, দু‘আ মাসূরা ও অন্যান্য দু‘আ পড়া শেষ করে ডানে ও বামে ‘আসসালামু আলায়কুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ বলে সালাম ফিরাবে। (বুখারী হা/৮৩৪ ‘আযান’ অধ্যায়, অনুচ্ছে-১৪৯; মিশকাত হা/৯৪২, পৃঃ ৮৭)। উল্লেখ্য যে, প্রথম সালামের সাথে ‘ওয়া বারাকা-তুহু’ যোগ করা যায়। (আলবানী, সহীহ আবু দাঊদ হা/৯১৫, ১/১৪৩ পৃঃ; উল্লেখ্য যে, আবু দাঊদের কোন ছাপায় ‘ওয়া বারাকাতুহু’ অংশটুকু নেই। (আবুদাঊদ হা/৯৯৭)। উল্লেখ্য যে, সালাম ফিরার সময় হাত দ্বারা ইশারা বৈধ নয়। একদা সাহাবাদেরকে এমন ইশারা করতে দেখলে তিনি বললেন, “কি ব্যাপার তোমাদের? দুরন্ত ঘোড়ার লেজের মত করে হাত দ্বারা ইশারা করছ? যখন তোমাদের কেউ সালাম ফিরবে, তখন সে যেন তার (পার্শ্ববর্তী) সঙ্গীর প্রতি চেহারা ফেরায় এবং হাত দ্বারা ইশারা না করে।” অতঃপর সাহাবাগণ এরুপ ইশারা করা হতে বিরত হয়ে যান। অন্য এক বর্ণনায় আছে,তিনি বললেন,“তোমাদের প্রত্যেকের জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, (সালাম ফিরার সময়) হাত নিজ ঊরুর উপর রাখবে। অতঃপর ডানে ও বামে (উপবিষ্ট) ভাই-এর প্রতি সালাম দেবে।” (মুসলিম, সহীহ ৪৩১, আহমাদ, মুসনাদ, সিরাজ, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ ৭৩৩ ত্বাবারানীরানী, মু’জাম)। উক্ত হাদীসে ইঙ্গিত রয়েছে যে,জামাআতের নামাযে নামাযী সালাম দেয় পাশের নামাযীকে। কিন্তু একা নামাযে সালাম দেওয়া হয় ফেরেশতাকে। পরন্তু পাশের নামাযী সালাম ফিরলে তার জওয়াব দিতে হয় না। কারণ, সে সময় সকলেই একে অপরকে সালাম দিয়ে থাকে। অতএব জওয়াব থাকে তাতেই। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৩/২৮৮-২৮৯)। সালাম ফিরেই নামাযের কাজ শেষ হয়ে যায়। তবে খেয়াল রাখার বিষয় যে, যে তরতীব ও পর্যায়ক্রমে মহানবী (ﷺ) নামায ও তার সকল আমল সম্পন্ন করেছেন, সেই পর্যায়ক্রমেই নামায পড়া নামায শুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত অথবা ফরয। (ফিকহুস সুন্নাহ্‌ উর্দু ৯৫পৃ:)। সালাম ফিরিয়ে প্রথমে সরবে তিনবার বলবে أَسْتَغْفِرُ الله আস্তাগফিরুল্লা-হ’। অর্থাৎ আমি আল্লাহ নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। সেই সাথে বলবে اَللَّهُمَّ أَنْتَ السَّلاَمُ وَمِنْكَ السَّلاَمُ تَبَارَكْتَ يَا ذَا الْجَلاَلِ وَالْإِكْرَامِ. ‘হে আল্লাহ আপনিই শান্তি,আপনার থেকেই আসে শান্তি। বরকতময় আপনি, হে মর্যাদা ও সম্মানের মালিক।’ (সহীহ মুসলিম হা/১৩৬২, ১/২১৮ পৃঃ; মিশকাত হা/৯৬১)। এ সময় ইমাম হলে প্রত্যেক সালাতে ডানে অথবা বামে ঘুরে সরাসরি মুক্তাদীদের দিকে মুখ করে বসবে।(সহীহ বুখারী হা/৮৪৫, ১/১১৭ পৃঃ (ইফাবা হা/৮০৫, ২/১৫২ পৃঃ)। অতঃপর ইমাম মুক্তাদী সকলে সালামের পরের যিকির সমূহ পাঠ করবে। (বুখারী হা/৮৪৪, ১/১১৭ পৃঃ; মুসলিম হা/১৩৬৬, ১/২১৮ পৃঃ; মিশকাত হা/৯৬২)।সালাম ফিরানোর পর পরই দ্রুত উঠে যাবে না। এটা বদ অভ্যাস। (আহমাদ হা/২৩১৭০; সনদ সহীহ, সিলসিলা সহীহাহ হা/২৫৪৯)। বরং এ সময় ‘আয়াতুল কুরসী’সহ অন্যান্য দু‘আ পাঠ করবে। (নাসাঈ, আল-কুবরা হা/৯৯২৮, ৬/৩০ পৃঃ; সনদ সহীহ, সিলসিলা ছহীহাহা হা/৯৭২)।দেশের অধিকাংশ মসজিদে ফরয সালাতের সালাম ফিরানোর পর পরই দুই হাত তুলে প্রচলিত সম্মিলিত মুনাজাত করা হয়। অথচ এই প্রথার শারঈ কোন ভিত্তি নেই। জমহুর ওলামাদের বিশুদ্ধ মত, এভাবে সম্মিলিত মুনাজাত করা বিদআত।বরং সবাই নিজের মত করে কুরআন সুন্নাহর দোয়াগুলো পড়বে।(ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়েমাহ, ৭/১০৩-১০৫ পৃ. ফৎওয়া নং-৩৫৫২ এবং ৫৭৬৩)।
___________________________
উপস্থাপনায়,
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

জীবনের যে কোনও ক্ষেত্রে সফলতা লাভের জন্য করণীয় আমল ও দুআ

 প্রশ্ন: কোনও কাজে ব্যর্থ হলে বা উদ্দেশ্য সাধনে বিলম্ব হলে- এ অবস্থায় এমন কোনও দুআ বা আমল আছে কি যা করলে সফল হওয়া যায়?

উত্তর: জীবনের যে কোনও ক্ষেত্রে সফলতা অর্জনের পূর্বশর্ত হল, সঠিক সময়ে সঠিক পদ্ধতিতে সু পরিকল্পিতভাবে কঠোর অধ্যবসায়, পরিশ্রম ও সাধনা করা। পাশাপাশি আল্লাহর উপর ভরসা করা এবং তাঁর সাহায্য ও দয়া লাভ করা।
শুধু চেষ্টা-পরিশ্রম দ্বারা প্রত্যাশিত সফলতা আশা করা যায় না যদি না মহান আল্লাহ তাঁর রহমত ও সাহায্য দ্বারা সিক্ত করেন। অনুরূপভাবে সফলতা লাভের জন্য কেবল আল্লাহর দয়ার আশায় হাত গুটিয়ে বসে থাকাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ, মহান আল্লাহ মানুষকে শ্রম নির্ভর করেই সৃষ্টি করেছেন।

◆ আল্লাহ তাআলা বলেন,

لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي كَبَدٍ

“নিশ্চয় আমি মানুষকে শ্রমনির্ভররূপে সৃষ্টি করেছি।” [সূরা বালাদ: ৪]

◆ তিনি আরও বলেন,

وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ

“এবং মানুষ তাই পায়, যা সে করে।” [সূরা নাজম: ৩৯]

◆ দুনিয়াবি ক্ষেত্রে সফলতা লাভ করার জন্য যেমন কষ্ট-পরিশ্রম করা জরুরি তেমনি আল্লাহর নৈকট্য হাসিল ও তাঁর সান্নিধ্য লাভের জন্যও প্রয়োজন কষ্ট ও পরিশ্রম। তাই তো আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الْإِنسَانُ إِنَّكَ كَادِحٌ إِلَىٰ رَبِّكَ كَدْحًا فَمُلَاقِيهِ

“হে মানুষ, তোমাকে তোমার পালনকর্তা পর্যন্ত পৌঁছতে কষ্ট স্বীকার করতে হবে। অতঃপর তার সাক্ষাৎ ঘটবে।” [সূরা ইনশিকাক: ৬]

◆ তবে পরিশ্রম করার পর আল্লাহর উপর ভরসা করাও অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ ۖ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
“কাজে-কর্মে তাদের পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তা’আলার উপর ভরসা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর উপর ভরসা কারীদেরকে ভালবাসেন।” [সূরা আল-ই ইমরান: ১৫৯]

এ বিষয়ে আরও বহু আয়াত রয়েছে।

◆ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

عن عمر بن الخطاب رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه قال: «لو أنكم كنتم توَكَّلُون على الله حق توَكُّلِهِ لرزقكم كما يرزق الطير، تَغْدُو خِمَاصَاً، وتَرُوحُ بِطَاناَ»

উমর ইবনুল খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “তোমরা যদি যথার্থভাবে আল্লাহ তাআলার ওপর তাওয়াককুল (ভরসা) করতে তাহলে তিনি পাখিদের যেভাবে রিজিক দেন সেভাবে তোমাদেরও রিজিক দিতেন। পাখিরা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।” [সহীহ-এটি তিরমিযি ও ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন]

এখানে লক্ষণীয় বিষয় যে, পাখিরা পেটে ক্ষুধা নিয়ে অলসতা করে বাসায় বসে থাকে না বরং তারা রোদ-বৃষ্টি, ঝড়, ঠাণ্ডা ও প্রতিকুল পরিবেশেও আল্লাহর উপর ভরসা করে রিজিকের সন্ধানে বের হয়, দীর্ঘ পথ উড়ে যায়, শিকারির ফাঁদে পড়ে জীবন নাশের ঝুঁকি নেয়। তারপর আল্লাহ তাদেরকে রিজিকের ব্যবস্থা করে দেন। ফলে তারা সকালে খালি পেটে বের হলেও সন্ধ্যা তারা তাদের নীড়ে ফিরে আসে পরিতৃপ্ত হৃদয়ে উদর ভর্তি করে। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ কতই না উত্তম রিজিক দাতা!

সুতরাং মানুষও যদি জীবনে সফলতা লাভ করতে চায় তাকে কষ্ট-পরিশ্রম করতে হবে, দৌড়-ঝাঁপ করতে হবে, ঝুঁকি মাথায় নিতে হবে এবং পরম ধৈর্য ও নিষ্ঠা সহ কাজে লেগে থাকতে হবে। তাহলে হয়তো দয়াময় আল্লাহ তাকে সফলতা দান করবেন। আরবিতে একটা কথা প্রচলিত আছে, من جد وجد “যে চেষ্টা করে সে পায়।”

যাহোক, দুনিয়া কিংবা আখিরাত উভয় ক্ষেত্রে সফলতা লাভের অন্যতম শর্ত হল, চেষ্টা ও সাধনা, কষ্ট ও পরিশ্রম করা। কিন্তু পাশাপাশি আল্লাহর রহমতও প্রয়োজন। আল্লাহর দয়া ছাড়া কেউ সফলতা পাবে না। তা না হলে, কৃষক অক্লান্ত পরিশ্রম করে ফসল ফলানোর পরও অনেক সময় ঘরে ফসল তুলতে পারে না, অনেক দম্পতি একটি সন্তানের অপেক্ষায় নিদারুণ কষ্ট বুকে নিয়ে সারাটা জীবন অতিবাহিত করে দেয় কিন্তু তাদের স্বপ্ন পূরণ হয় না। তাই আল্লাহর রহমত ও সাহায্য প্রাপ্তির জন্য আমাদের করণীয় হল, যেসব কাজে আল্লাহর সাহায্য ও রহমত প্রাপ্তির আশা করা যায় সেগুলো বেশি পরিমাণে করা।

❑ জীবনে সফলতার জন্য আল্লাহর সাহায্য ও রহমত প্রাপ্তির কতিপয় আমল:

◍ ১. রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ। কেননা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, একবার দরুদ পাঠ করলে দয়াময় আল্লাহর পক্ষ থেকে দশটি রহমত অবতীর্ণ হয়। [সহিহ বুখারি]

◍ ২. বেশি বেশি ইস্তিগফার তথা আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহ মোচনের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। ইস্তিগফার করার বিনিময়ে আল্লাহ বান্দাকে নানাভাবে সাহায্য করেন। [দেখুন: সূরা নূহ: ৯-১]

◍ ৩. ঈমান ও তাকওয়া (আল্লাহ ভীতি) অবলম্বন। এটি আল্লাহর রহমত, বরকত ও হেদায়েত প্রাপ্তির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। [দেখুন: সূরা আরাফ: ৬৯]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আরও বলেন,

وَمَن يَتَّقِ ٱللَّهَ يَجۡعَل لَّهُۥ مِنۡ أَمۡرِهِۦ يُسۡر
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে (আল্লাহ ভীতি অবলম্বন করে), আল্লাহ তার কাজ সহজ করে দেন।” [সূরা তালাক: ৪]

◍ ৪. দুআ করা। দুআ কবুলের অধিক সম্ভাবনাময় সময় ও ক্ষেত্রগুলোতে সফলতা প্রার্থনা করে আল্লাহর কাছে দুআ করা। যেমন: সালাতের সেজদা অবস্থায়, আজান ও ইকামতের মাঝামাঝি সময়, জুমার দিন আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়ের মাঝে, ভোর রাতে, সফর অবস্থায়, রোজা অবস্থায়, যে কোনও নেকির কাজ করে তার ওসিলা দিয়ে দুআ করা, পিতামাতা ও নেককার লোকদের নিকট থেকে দুআ নেওয়া ইত্যাদি।

◍ ৫. কুরআন তিলাওয়াত শুনাও আল্লাহর রহমত প্রাপ্তির অন্যতম মাধ্যম। [দেখুন: সূরা আরাফ: ২০৪]

◍ ৬. আল্লাহর সাহায্য লাভের নিমিত্তে আল্লাহর নাম নিয়ে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে কাজ শুরু করা।

❑ এ ছাড়াও যা করণীয়:

◍ ৭. যে কোনও কাজ করার পূর্বে সুন্দরভাবে পরিকল্পনা করা।
◍ ৮. অভিজ্ঞজনদের পরামর্শ গ্রহণ করা।
◍ ৯. কাজ শুরুর পূর্বে ইস্তিখারার সালাত আদায় করা।
◍ ১০. কাজে একবার ব্যর্থ হলে, ধৈর্যহারা না হয়ে তা বারবার চেষ্টা করা। কবি বলেন, “এক বার না পারিলে দেখো শত বার।” দীর্ঘ সময় অবিরাম ধারায় পানির ফোটা পতনের ফলে শক্ত শীল খণ্ডেও গর্ত সৃষ্টি হতে পারে।
◍ ১১. এক পদ্ধতি সফলতা না আসলে ভিন্ন উপায় ও ভিন্ন পথ খোঁজা। কারণ অনেক সময় পদ্ধতি পরিবর্তনের ফলে সফলতা আসে।

◍ ১২. পাশাপাশি নিম্নোক্ত দুআ দুটি অধিক পরিমাণে পাঠ করা:
ক.
اللَّهمَّ لا سَهلَ إلَّا ما جَعَلتَه سَهلًا، وأنتَ تَجعَلُ الحَزْنَ إذا شِئتَ سَهلًا

উচ্চারণ: ‘আল্লা-হুম্মা লা-সাহলা ইল্লা মা জাআলতাহু সাহলা, ওয়া আনতা তাজআলুল হাযনা ইযা শি’তা সাহলা।”

অর্থ: “হে আল্লাহ, আপনি যা সহজ করে দেন তা ছাড়া কোনও কিছুই সহজ নেই। আর আপনি চাইলে পেরেশানি যুক্ত কাজও সহজ করে দেন।” [সহিহ ইবনে হিব্বান: ৯৭৪, হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেছেন, এই হদিসটি সহীহ।]

খ. অলসতা থেকে মুক্তির জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন। এমন একটি দুআ হল:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الهَمِّ وَالحَزَنِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ العَجزِ وَالكَسَلِ
وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الجُبنِ وَالبُخلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ غَلَبَةِ الدَّينِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ

উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা ইন্নী আঊযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হুযনি, ওয়া আউযুবিকা মিনাল আজযি ওয়াল কাসালি, ওয়া আউযুবিকা মিনাল জুবনি ওয়াল বুখলি, ওয়া আউযুবিকা মিন গলাবাতিদ দাইনি ওয়া ক্বাহরির রিজাল।

অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা থেকে আশ্রয় চাই। আমি আশ্রয় চাই অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, আপনার কাছে আশ্রয় চাই ভীরুতা ও কার্পণ্য থেকে, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই ঋণের বোঝা ও মানুষের রোষানল থেকে।” [বুখারি: ২৮৯৩]

সর্বোপরি, মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তাআলা বান্দার কখনো অকল্যাণ করেন না। যদি কোনও কাজে সফলতা না আসে তাহলে বুঝতে হবে, হয়ত এতেই তার জন্য কল্যাণ নিহিত আছে-যদিও মানুষ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে না জানার কারণে ব্যর্থতায় হা-হুতাশ ও কান্নাকাটি করে। কিন্তু মহাবিশ্বের মহাপরিচালক আল্লাহ তাআলা অবশ্যই জানেন, কিসে আমাদের কল্যাণ আর কিসে আমাদের অকল্যাণ রয়েছে। তাই কাজে সফলতা না আসলেও আল্লাহর প্রতি কু ধারণা পোষণ করা যাবে না, হতাশা ও অস্থিরতায় ভোগা যাবে না বরং আল্লাহর তাকদির ও ফয়সালার প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস পোষণ করতে হবে। এটিই হল, একজন একনিষ্ঠ বিশ্বাসী মুমিনের পরিচায়ক।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দুনিয়াও আখিরাতের সফলতা দান করুন এবং সব ধরণের অকল্যাণ ও অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন। আমিন। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

অসুস্থতা এবং প্রচণ্ড শারীরিক ক্লান্তির কারণে ঘুমিয়ে যাওয়ার ফলে ইশার সালাত পড়া না হলে তা কি পরের দিন কাজা করা যাবে

 প্রশ্ন: অসুস্থতা এবং প্রচণ্ড শারীরিক ক্লান্তির কারণে ঘুমিয়ে যাওয়ার ফলে ইশার সালাত পড়া না হলে তা কি পরের দিন কি কাজা করা যাবে?

উত্তর: লা-বা’স ত্বাহুর ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আপনাকে সুস্থতা দান করুন। আমিন।

এ ক্ষেত্রে করণীয় হল, যখনই ঘুম থেকে জাগ্রত হবেন তখনই কাল বিলম্ব না করে পাক-পবিত্র হয়ে যথারীতি ছুটে যাওয়া সালাত কাজা করে নিবেন। এটাই তার জন্য কাফফারা হয়ে যাবে। অর্থাৎ অনিচ্ছাবশত: ঘুমিয়ে যাওয়ার ফলে সালাত ছুটে যাওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলা গুনাহ লিখবেন না। এটা দয়াময় আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ।

◆ আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

مَنْ نَسِيَ صَلَاةً أَوْ نَامَ عَنْهَا فَكَفَّارَتُهَا أَنْ يُصَلِّيَهَا إِذَا ذَكَرَهَا

“যে ব্যক্তি সালাত আদায় করতে ভুলে যায়, বা সালাত আদায় না করেই ঘুমিয়ে পড়ে তার কাফফারা হল, যখনই স্মরণ হবে তখনই তা আদায় করে নেওয়া” [সহীহ মুসলিম]

◆ অন্য হাদিসে আনাস রা. হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

مَنْ نَسِىَ صَلاَةً فَلْيُصَلِّهَا إِذَا ذَكَرَهَا لاَ كَفَّارَةَ لَهَا إِلاَّ ذَلِكَ

“যে ব্যক্তি কোন নামাজ পড়তে ভুলে যায়, সে যেন তা স্মরণ হওয়া মাত্র পড়ে নেয়। এ ছাড়া তার জন্য আর অন্য কোন কাফফারা নেই।” [বুখারী ৫৯৭, মুসলিম ১৫৯৮]

◆ হাদিসে আরও এসেছে, ইমরান ইবনে হুসাইন রা. সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোন এক সফরে ছিলেন। সে সময় লোকেরা ফজরের সালাতের ওয়াক্তে ঘুমিয়ে ছিল। অতঃপর সূর্যের তাপে তাদের ঘুম ভাঙ্গে। তারা কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর সূর্য উপরে উঠে গেলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুয়াজ্জিনকে নির্দেশ দিলে মুয়াজ্জিন আযান দেন। অতঃপর তিনি প্রথমে ফজরের পূর্বের দুই রাকআত সুন্নত আদায় করেন এবং একামত দেওয়ার পর ফজরের ফরজ সালাত আদায় করলেন।”
[বুখারী, অধ্যায়: মানাকিব, অনুচ্ছেদ: ইসলামের নবুওয়তের নিদর্শনা বলী, হা/ ৩৫৭১), মুসলিম, অধ্যায়: মসজিদ সমূহ, অনুচ্ছেদ: ছুটে যাওয়া সালাত কাজা করা…]

অত:এব আপনি যদি ফজরের সময় জাগ্রত হন, তাহলে ফজরের সালাতের পূর্বে ইশার সালাত আদায় করে তারপর ফজর সালাত আদায় করবেন। ইচ্ছাকৃত ভাবে মোটেও বিলম্ব করা যাবে না। আপনি যদি অলসতা বা অবহেলা বশত: সে সময় না পড়ে তা দিনের বেলায় পড়েন তাহলে ইচ্ছাকৃত বিলম্বের কারণে আপনাকে গুনাহগার হতে হবে।

➤ অবশ্য যদি সূর্য উঠার এতটুকু পূর্বে জাগ্রত হোন যে, সে সময় কেবল ফজর সালাত আদায় করা সম্ভব হবে তাহলে, সে ক্ষেত্রে আগে ফজর সালাত আদায় করবেন। কারণ ওয়াক্তের সালাত ওয়াক্তে পড়াটাই জরুরি। তারপর ছুটে যাওয়া ইশার সালাত কাজা করবেন- যদিও তখন সূর্য উদিত হওয়া শুরু করে। কারণ অধিক বিশুদ্ধ মতে, সূর্য উদিত হওয়ার সময় সাধারণ নফল সালাত পড়া নিষিদ্ধ; কাজা বা বিশেষ কারণ বশত: সালাত নয়। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন। الله أعلم

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

ভালো মৃত্যুর জন্য দুআ এবং একটি ভয়ানক বিষয়

 প্রশ্ন: এভাবে দোয়া করা যাবে কি যে, হে আল্লাহ, আমার মৃত্যু যেন নামাজের সিজদারত অবস্থায় হয় বা রমজান মাসে হয়?

উত্তর: সালাতের সেজদা অবস্থায়, রমজানের রোজা অবস্থায়, কুরআন তিলাওয়াত রত অবস্থায়, হজ-ওমরা সফরে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শহর মদিনায় মৃত্যুর জন্য দুআ করা জায়েজ। কেননা এগুলো ‘হুসনুল খাতিমা’ বা ভালো মৃত্যুর জন্য দুআ। আর ভালো মৃত্যুর পরিণতিও ভালো আশা করা যায়।

◆ উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি এ বলে দুআ করতেন,
اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي شَهَادَةً فِي سَبِيلِكَ، وَاجْعَلْ مَوْتِي فِي بَلَدِ رَسُولِكَ صلى الله عليه وسلم
“হে আল্লাহ্‌, আমাকে তোমার রাস্তায় শাহাদাত লাভের তাওফিক দান কর এবং আমার মৃত্যু তোমার রাসূলের শহরে প্রদান কর।” [সহিহ বুখারি/ ১৮৯০, অধ্যায় ২৯/১৩]

◆ আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
‏ إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدٍ خَيْرًا اسْتَعْمَلَهُ ‏”‏ ‏.‏ فَقِيلَ كَيْفَ يَسْتَعْمِلُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ ‏”‏ يُوَفِّقُهُ لِعَمَلٍ صَالِحٍ قَبْلَ الْمَوْتِ- قال الترمذي: حسن صحيح، قال الشيخ الألباني
“আল্লাহ তাআলা যখন তার বান্দা সম্পর্কে কল্যাণের ইচ্ছা করেন তখন তাকে আমল করতে দেন। বলা হল, হে আল্লাহর রাসূল, কিভাবে তিনি তাকে আমল করতে দেন? তিনি বললেন, “মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাকে নেক আমলের তাওফিক দিয়ে দেন।” [সুনান তিরমিজি (ইফা) অধ্যায়: ৩৫/ তকদির, পরিচ্ছেদ: আল্লাহ তাআলা জান্নাতিদের জন্য এবং জাহান্নামিদের জন্য একটি কিতাব (রেজিস্টার) লিখে রেখেছেন।-সহিহ]

➧ ইবনে হাজার রহ. বলেন,
ومن ثم شرع الدعاء بالثبات على الدين وبحسن الخاتمة
“এখান থেকেই দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং হুসনুল খাতিমা বা ভালো মৃত্যুর জন্য দুআ করা শরিয়ত সম্মত হওয়ার বিষয়টি সাব্যস্ত হয়েছে।” [ফাতহুল বারী ১১/৪৯১]

➧ মাজমাউল আনহার গ্রন্থের লেখক বলেন,
وأعظم الحاجات سؤال حسن الخاتمة وطلب المغفرة
“সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হল, কল্যাণের উপর মৃত্যু এবং ক্ষমার জন্য দুআ করা।”

❑ বিষয়টি ভয়ানক:

যার যে অবস্থার উপর মৃত্যু হবে কিয়ামতের দিন তাকে সে অবস্থার উপর উঠানো হবে।

জাবির রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
يُبعَثُ كلُّ عبدٍ على ما مات عليه المُؤمِنُ على إيمانِه والمُنافِقُ على نِفاقِه
“প্রত্যেক বান্দাকে ঐ অবস্থায় কিয়ামতের দিন উঠানো হবে যে অবস্থার উপর সে মৃত্যু বরণ করেছে। মুমিনকে উঠানো হবে ঈমানের উপর এবং মুনাফিককে উঠানো হবে নিফাকির উপর।” [সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৭৩১৩]

➧ ইমাম নওবী রহ. উক্ত হাদিসে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “উক্ত হাদিসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মর্মে খরব দিচ্ছেন যে, প্রত্যেক বান্দাকে -চাই সে পুরুষ হোক অথবা নারী হোক-কিয়ামতের দিন ঐ অবস্থায় উত্তোলন করা হবে যে অবস্থায় উপর সে মৃত্যু বরণ করেছিল। সে যদি ভালো কাজ ও কল্যণের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে তাহলে কল্যাণের উপরই তাকে উঠানো হবে। আর অকল্যাণ ও খারাপিতে লিপ্ত থাকা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করলে সে অবস্থায় উঠানো হবে। এই কল্যাণ ও অকল্যাণের যত অর্থ ও রূপ আছে সবই এখানে প্রযোজ্য।
সুতরাং প্রতিটি মানুষের এই আগ্রহ থাকা উচিৎ, যেন ভালো অবস্থায় (উত্তম কর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা অবস্থায়) মৃত্যু তার মৃত্যু হয়।
উক্ত হাদিসে এ মর্মে বান্দাকে উৎসাহিত করা হয়েছে যে, সে যেন সদা সর্বদাই কল্যাণ ও আমলে সালেহ বা সৎকর্মে লিপ্ত থাকে। কেননা, কেউ জানে না, সে কখন মৃত্যু বরণ করবে।”

পরিশেষ দুআ করি, মহান আল্লাহ যেন, আমাদেরকে ইমান, আল্লাহভীতি ও সৎকর্মের উপরে এবং তার সন্তুোষভাজন হয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় হওয়ার তওফিক দান করেন এবং পাপাচাররত অবস্থায় অপমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন। আমিন।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate