Saturday, May 16, 2026

পূর্ণাঙ্গ হজ কোর্স

 সংকলন: মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ আল কাফী (রহ.)।

সম্পাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সউদি আরব।
হজ হলো ইসলামের ৫টি রোকনের মধ্যে সর্বশেষ তথা পঞ্চম রোকন। এটি এমন একটি ইবাদত যাতে রয়েছে আত্মিক, মৌখিক, দৈহিক ও আর্থিক ত্যাগের সমন্বয়। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের উপর তা জীবনে একবার সম্পাদন করা ফরজ।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا
“মানুষের উপর আল্লাহর অধিকার এই যে, যারা এই ঘর পর্যন্ত আসার সামর্থ্য রাখে তারা ইহার হজ পালন করবে।” [আলে ইমরান: ৯৭]
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
مَنْ حَجَّ لِلَّهِ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ
“যে ব্যক্তি (হজ ওমরা করার জন্য) এ ঘরে আসবে, অতঃপর স্ত্রী সহবাসে লিপ্ত হবে না এবং পাপাচারে লিপ্ত হবে না, সে এমন (নিষ্পাপ) অবস্থায় ফিরে আসবে যেমন তার মাতা তাকে ভূমিষ্ঠ করেছিল।” [মুসলিম]
তিনি আরও বলেন:
صَلَاةٌ فِي مَسْجِدِي هَذَا أَفْضَلُ مِنْ أَلْفِ صَلَاةٍ فِيمَا سِوَاهُ إِلَّا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ
“মসজিদে হারামে এক সালাত অন্য মসজিদে এক লক্ষ সালাতের চাইতে বেশি উত্তম।” [বুখারি ও মুসলিম]। এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতটি বিশুদ্ধভাবে আদায়ের চেষ্টা করা একান্তভাবে অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে কুরআন-হাদিসের নির্যাস থেকে হজের কার্যাবলী ধারাবাহিকভাবে অতি সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করা হল। যেগুলো সকল হজ সম্পাদনকারীর জন্য অনুসরণীয়।
◆ ১. একনিষ্ঠতার সাথে শুধুমাত্র আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য হজ পালন করা।
◆ ২. সেটি পালনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তরিকা ও পদ্ধতি অনুসরণ করা।
◆ ৩. হালাল বা বৈধ উপার্জন থেকে হজ পালন করা।
◆ ৪. হজের বিধান সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জন করা।
◆ ৫. যাবতীয় শিরক, বিদআত ও পাপাচার থেকে বিরত থাকা।
❑ হজ ফরজ হওয়ার শর্তাবলি (৬টি):
হজ ফরজ হওয়ার জন্য কিছু মৌলিক শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক। নিম্নে সেগুলো উল্লেখ করা হল:
❖ ১. ইসলাম: কেবল মুসলিমদের ওপর হজ ফরজ। অমুসলিমদের ওপর ইসলামের কোনও বিধানই প্রযোজ্য নয়। [সূরা তওবা: ৫৪]
❖ ২. জ্ঞান সম্পন্ন হওয়া: হজ পালনের জন্য মানসিকভাবে সুস্থ হওয়া আবশ্যক। কোনও অপ্রকৃতিস্থ বা পাগল ব্যক্তির ওপর হজ ফরজ নয়। কারণ তার ভালো-মন্দের বোধ শক্তি নেই। [আহমদ, আবু দাউদ, নাসায়ী]
❖ ৩. স্বাধীন হওয়া: হজ কেবল স্বাধীন ব্যক্তির ওপর ফরজ; দাস-দাসীর উপর নয়। [আহমদ, আবু দাউদ, নাসায়ী]
❖ ৪. বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া: ছোট শিশু যদি তার বাবা-মার সাথে হজ করে তবে তা নফল হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সামর্থ্য থাকলে তাকে পুনরায় ফরজ হজ আদায় করতে হবে। [আহমদ, আবু দাউদ, নাসায়ী]
❖ ৫. আর্থিক ও শারীরিক ক্ষমতা সম্পন্ন হওয়া: এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। এতটা আর্থিক সক্ষমতা থাকা আবশ্যক যে, সে ব্যক্তি হজে যাতায়াত সহ সব আনুষঙ্গিক খরচ বহনের পাশাপাশি তার অনুপস্থিত কালীন তার পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি শারীরিকভাবেও এই দীর্ঘ সফর করার সক্ষমতা থাকতে হবে। অনুরূপভাবে রাস্তার নিরাপত্তা থাকাও অপরিহার্য শর্ত। [আলে ইমরান: ৯৭]
❖ ৬. মহিলার জন্য মাহরাম থাকা: অধিক বিশুদ্ধ মতে, একজন মহিলার জন্য হজে যাওয়ার ক্ষেত্রে তার স্বামী অথবা এমন কোনও পুরুষ আত্মীয় (মাহরাম) থাকা শর্ত, যার সাথে তার বিয়ে চিরস্থায়ীভাবে হারাম (যেমন: বাবা, ভাই, ছেলে প্রমুখ)। মাহরাম ছাড়া মহিলাদের জন্য হজের দীর্ঘ সফর করা বৈধ নয়। [বুখারী ও মুসলিম]
এই শর্তগুলো পূরণ হলে একজন ব্যক্তির ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ বা আবশ্যক হয়ে যায়।
হজ ও উমরার কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে নিম্নরূপ:
❑ মিকাতে করণীয়:
১. ইহরামের পূর্বে শারীরিকভাবে পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা তথা—নাভিমূল, বগলের লোম পরিষ্কার করা, নখ কাটা।
২. মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধা (ওয়াজিব)।
৩. মিকাতে গিয়ে ইহরামের উদ্দেশ্যে প্রথমে গোসল করা।
৪. মাথা, দাড়ি বা শরীরে আতর-সুগন্ধি ব্যবহার করা।
৫. সেলাইবিহীন দুটি কাপড়ে ইহরাম বাঁধা (শুধু পুরুষদের জন্য)। মহিলাগণ তাদের স্বাভাবিক পোশাকেই থাকবে।
৬. কাপড় দুটি সাদা হওয়া উত্তম।
৭. হজ বা উমরার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট মিকাত অতিক্রমের পূর্বে (অন্তরে) নিয়ত করত: ইহরাম বাঁধা (রোকন)।
৮. তামাত্তু হজের জন্য প্রথমে উমরা আদায় করা।
৯. উমরার ইহরাম বাঁধার সময় বলা: ‘আল্ল-হুম্মা লাব্বাইকা উমরাতান’।
১০. কিরান হজের ইহরাম বাঁধার সময় বলা: ‘আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা হাজ্জান ওয়া উমরাতান’
১১. ইফরাদ হজের ইহরাম বাঁধার সময় বলা: ‘আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা হাজ্জান’ (হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে হাজের জন্য উপস্থিত)”
❑ মিকাত থেকে ইহরাম সম্পন্ন করে মক্কায় পৌঁছা পর্যন্ত করণীয়:
১২. রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পঠিত তালবিয়া জোরে জোরে পাঠ করা:
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ
“আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা, লাব্বাইকা লা-শারিকা লাকা লাব্বাইকা, ইন্নাল হামদা ওয়ানি’য়মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা-শারিকা লাকা”।
অর্থ: “আমি হাজির। হে আল্লাহ, আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই। আমি হাজির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা, নেয়ামত এবং রাজত্ব কেবল আপনারই। আপনার কোনো শরিক নেই।” [সহিহ বুখারি, ১৫৪৯]
১৩. পবিত্র অবস্থায় মসজিদুল হারামে প্রবেশ করা।
১৪. মসজিদে হারামে প্রবেশের পূর্বে তালবিয়া বলা বন্ধ করা।
১৫. তওয়াফের জন্য সরাসরি হাজরে আসওয়াদের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
❑ কাবা ঘরে তওয়াফ:
১৬. তওয়াফ শুরুর পূর্বে ইযতিবা করা (শুধু পুরুষের জন্য)। (ইহরামের কাপড় ডান বগলের নিচ দিয়ে নিয়ে বাম কাঁধের উপর রাখাকে ইযতিবাহ বলা হয়)। তবে নামাজের সময় উভয় কাঁধ ঢেকে রাখা জরুরি।
১৭. ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ (بِسْمِ اللهِ، اللهُ أَكْبَرُ) বলে হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথরে চুমু দিয়ে কিংবা ডান হাত তুলে এক বার ইশারা করে তওয়াফ শুরু করা।
১৮. প্রথম তিন চক্করে রমল করা (দ্রুতবেগে চলা)।
১৯. আল্লাহর ঘর বাম দিকে রেখে তওয়াফ করা।
২০. হাতিমে কাবার বাহির দিয়ে তওয়াফ করা।
২১. রোকনে ইয়েমেনি (হাজরে আসওয়াদ কাবা ঘরের যে কোণায় রয়েছে তার আগের কোণা) স্পর্শ করা। তা সম্ভব না হলে স্বাভাবিকভাবেই চলতে থাকব। এখানে চুমু খাওয়া বা হাত দ্বারা ইশারা করার প্রয়োজন নাই।
২২. তওয়াফ অবস্থায় রোকনে ইয়েমেনি ও হাজরে আসওয়াদের মাঝখানে বিশেষ একটি দুআ ছাড়া অন্য কোনো দুআ সাব্যস্ত নেই। তাই এ ক্ষেত্রে যে কোনও দুআ-জিকির পাঠ করা যায়।
২৩. রোকনে ইয়েমেনি এবং হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে এই দোয়া পড়া:
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণ: “রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়া ক্বিনা আযাবান্নার”।
অর্থ: “হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করো এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করো এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করো।” [সূরা বাকারা: ২০১]
২৪. একাধারে সাত চক্কর পূর্ণ করা (রোকন)।
২৫. মাকামে ইবরাহিমের পিছনে দু রাকাত নামাজ পড়া। (সেখানে সম্ভব না হলে মসজিদুল হারামের যে কোনও স্থানে তা আদায় করা। আর বর্তমানে হাজিদের ভিড়ের কারণে আদৌ তা সম্ভব নয়)।
২৬. সূরা ফাতিহার পর প্রথম রাকাতে সূরা কাফিরূন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়া।
২৭. জমজমের পানি পান করা এবং সম্ভব হলে কিছু মাথায় ঢালা।
২৮. পুনরায় হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথরে চুমু দেওয়া বা সে দিকে হাত দ্বারা ইশারা করা।
❑ সাফ-মারওয়ার মাঝে সাঈ:
২৯. إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ “ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শাআইরিল্লাহ” (সাফা ও মারওয়াহ (পাহাড় দ্বয়) আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম) [সূরা বাকারা: ১৫৯] বলতে বলতে সাফা পাহাড়ে আরোহণ করা।
৩০. কিবলার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে পাঠ করা: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, আল হামদুলিল্লাহ ইত্যাদি।
অতঃপর তিনবার বলবে:
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ. لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ أَنْجَزَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ইউহয়ি ওয়া ইয়ুমিতু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বদীর। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু আনজাযা ওয়া’দাহু ওয়া নাসারা আবদাহু ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহ।
অর্থ: “আল্লাহ ছাড়া কোনও সত্য ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনও শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই এবং প্রশংসা মাত্রই তাঁর। তিনিই জীবিত করেন এবং মৃত্যু দান করেন। আর তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাশালী। আল্লাহ ছাড়া কোনও সত্য ইলাহ নেই। তিনি একক। তিনি তাঁর ওয়াদা পূর্ণ করেছেন, তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং তিনি একাই সকল সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেছেন।”
এরপর যে কোনও দুআ-তাসবিহ ও জিকির-আজকার পাঠ করা যাবে।
৩১. সবুজ বাতি দ্বারা চিহ্নিত স্থানে (যে স্থানটার নাম বাতনে ওয়াদি) দৌড়ানো। তবে মহিলাগণ স্বাভাবিক গতিতে চলবে।
৩২. সাফা-মারওয়া পাহাড় দ্বয়ের মধ্যে সাঈ করার সময় বিশেষ কোনও দুআ-তাসবিহ নেই। তবে এ ক্ষেত্রে যে কোনও দুআ-তাসবিহ, জিকির-আজকার ইত্যাদি পাঠ করা যায়।
৩৩. মারওয়া পাহাড়ে আরোহণ করা।
৩৪. সেখানেও সাফা পাহাড়ের ন্যায় দুআ ও জিকিরগুলো পাঠ করা।
৩৫. সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাত চক্করে সাঈ সম্পাদন করা। (রোকন)।
৩৬. সাফা থেকে মারওয়া গমন করলে তা হবে ১ম চক্কর, মারওয়া থেকে সাফা ফিরে আসলে তা হবে ২য় চক্কর। এভাবে ৭ম চক্কর মারওয়ায় গিয়ে শেষ হবে।
৩৭. তামাত্তু কারীদের জন্য মাথার চুল মুড়িয়ে বা খাটো করে হালাল হয়ে যাওয়া। (মহিলাগণ চুলের শেষ প্রান্ত থেকে আঙ্গুলের এক গিরা পরিমাণ কাটবে)।
এর মাধ্যমে ইহরাম অবস্থায় বিশেষভাবে যেসব বিষয় নিষিদ্ধ ছিল (যেমন: সেলাই যুক্ত কাপড় পরিধান করা, আতর-সুগন্ধি ব্যবহার করা, পুরুষদের জন্য মুখমণ্ডল ঢাকা ইত্যাদি) সেগুলোর নিষিদ্ধতা উঠে যাবে শুধু স্ত্রী সহবাস ছাড়া।
৩৮. কিরান ও ইফরাদ কারী হাজিগণ ইহরাম অবস্থাতেই থাকবে। (তারা তামাত্তু কারীর মত ইহরাম থেকে হালাল হবে না)।
❑ ৮ই জিলহজ (ইয়াউমুত তারবিয়াহ)-এর কার্যাবলী:
৩৯. এদিন সকাল বেলা তামাত্তুকারী তার নিজ অবস্থান থেকেই আগের নিয়মে (সম্ভব হলে গোসল করে) হজের জন্য ইহরাম বাঁধবে। এ সময় বলবে ‘আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা হাজ্জান’। (এই এহরাম বাধাটা হজের একটি রোকন।)
৪০. মিনায় গমন করে জোহর থেকে ফজর এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কসর করে (৪ রাকাত বিশিষ্ট ফরজ নামাজ দু রাকাত) আদায় করা। (এ ক্ষেত্রে দু ওয়াক্তের নামাজ জমা করা সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত নয়।)
৪১. সেখানে রাত যাপন করা।
❑ ৯ই জিলহজ (আরাফাত দিবস)-এর কার্যাবলী:
৪২. এদিন সূর্যোদয়ের পর আরাফাতের উদ্দেশ্যে গমন করা। এসময় অধিক পরিমাণে তালবিয়া (লাব্বাইক) ও তাকবির (আল্লাহু আকবার) পাঠ করা।
৪৩. সম্ভব হলে দুপুর পর্যন্ত আরাফাতের সীমানার বাইরে ‘নামেরা’ নামক স্থানে অবস্থান করা।
৪৪. সেখানে অবস্থান করে মসজিদে নামিরায় প্রদত্ত আরাফার খুতবা শোনা।
৪৫. জোহর ও আসরের নামাজ জোহরের সময়েই এক আজান ও দুই ইকামতের মাধ্যমে জমা ও কসর করা। (অর্থাৎ প্রথমে ইকামত দিয়ে দু রাকাত জোহর নামাজ আদায় করা। অতঃপর পূনরায় ইকামত দিয়ে দু রাকাত আসর নামাজ আদায় করা। জামাতের সাথে পড়ার চেষ্টা করতে হবে। কোনও সুন্নত ও নফল নামাজ পড়বে না।)
৪৬. এই দুই নামাজের মাঝে সুন্নত বা কোনও নফল নামাজ না পড়া।
৪৭. আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা।(রোকন)
এ ক্ষেত্রে সুন্নত হল, সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে যাওয়ার পরে আরাফাত ময়দানে প্রবেশ করা।
৪৮. আরাফাত ময়দানে অবস্থানকালে বেশি বেশি তালবিয়া (লাব্বাইক) ও তাকবির (আল্লাহু আকবার) পাঠ করা এবং কিবলা মুখী হয়ে হাত তুলে দুআয় মশগুল থাকা।
বিশেষ করে এই দুআটি অধিক পরিমাণে পাঠ করা:
لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
উচ্চারণ: “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।”
অর্থ: “আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই এবং প্রশংসা মাত্রই তাঁর। তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাশীল।” [তিরমিজি: ৩৫৮৫]
৪৯. সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাত ময়দানে অবস্থান করা (ওয়াজিব)।
৫০. আরাফাত ময়দানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থানের পর মুজদালিফার উদ্দেশ্যে গমন করা। এ ক্ষেত্রে ধীর স্থিরতা বজায় রাখবে।
❑ মুজদালিফায় করণীয়:
৫১. ৯ম জিলহজের দিবাগত রাতে মুজদালিফায় পৌঁছে সেখানে সর্বপ্রথম মাগরিব ও ইশার নামাজ এক আজানে ও দুই ইকামতে জমা ও কসর সহকারে আদায় করা। অর্থাৎ মাগরিব নামাজ যথারীতি তিন রাকাত এবং ইশার নামাজ শুধু দু রাকাত আদায় করবে। এর আগে-পরে কোনও সুন্নত বা নফল নামাজ আদায় করবে না। (তবে কিছু আলেমের মতে, ইশার পরে বিতর এবং ফজরের দু রাকাত সুন্নত পড়া যায়)।
৫২. মুজদালিফায় রাত যাপন করা (ওয়াজিব)।
৫৩. এ রাতে কোনও প্রকার ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল না হয়ে সরাসরি ঘুমিয়ে পড়া।
৫৪. ফজর দু রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করে মাশআরুল হারাম নামক স্থানে কিবলা মুখী হয়ে দু হাত উত্তোলন করে প্রত্যেকেই নিজে নিজে দুআ করা।
❑ ১০ জিলহজের কার্যাবলী: (মুজদালিফা থেকে মিনার গমন এবং সেখানে করণীয়সমূহ)
৫৫. সূর্যোদয়ের পূর্বে মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করা।
৫৬. ‘বাতনে মুহাসসার’ বা মুহাসসার উপত্যকায় (যা মুজদালিফা ও মিনার মাঝামাঝিতে অবস্থিত) দ্রুত গতিতে চলা।
১০ই জিলহজের কার্যাবলী:
৫৭. মুজদালিফা বা মিনার যে কোনও স্থান থেকে ৭টি কঙ্কর সংগ্রহ করা।
৫৮. বড় জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্বে তালবিয়া পাঠ বন্ধ করা।
৫৯. সূর্যোদয়ের পর বড় জামরায় (যেটাকে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ অজ্ঞতা বশত: ‘বড় শয়তান’ বলে থাকে) একে একে ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করা (ওয়াজিব)।
পাথর মারার সময় পুরুষগণ উচ্চস্বরে আর মহিলাগণ নিম্নস্বরে ‘আল্লাহু আকবার’ বলবে।
৬০. মিনা বা হারামের সীমানার মধ্যে যে কোনও স্থানে হাদি জাবাই করা (কুরবানি করা)। এটা তামাত্তু এবং কিরান কারীর জন্য ওয়াজিব।
৬১. নিজ হাতে কুরবানি করা। (কুরবানির টাকা নির্ধারিত ব্যাংকে দেওয়াও বৈধ)। সম্ভব হলে কুরবানি কিছু মাংস ভক্ষণ করা।
৬২. জিলহজের ১০ তারিখ এবং তার পরবর্তী আরও তিন দিন তথা ১১, ১২, ১৩ তারিখেও কুরবানি করাও বৈধ।
৬৩. মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করে হালাল হওয়া (মহিলাগণ চুলের শেষ প্রান্ত থেকে আঙ্গুলের এক গিরা সমপরিমাণ কাটবে) (ওয়াজিব)।
৬৪. মক্কায় গমন করে তওয়াফে ইফাযাহ করা। (রোকন)
এ ক্ষেত্রে রমল করার প্রয়োজন নাই।
৬৫. তওয়াফের পর দু রাকাত নামাজ পড়া।
৬৬. তামাত্তুকারীর জন্য সাফা-মারওয়া সাঈ করা (রোকন)। আর কিরানকারী জন্য তার আগের সাঈই যথেষ্ট হবে। ১০ তারিখে তার জন্য পুনরায় সাঈ করা আবশ্যক নয়। আর ইফরাদকারী যদি মক্কায় এসে তওয়াফে কুদুম করার পর সাঈ করে থাকে তাহলে ১০ তারিখে তার জন্য পুনরায় সাঈ করা আবশ্যক নয়। কিন্তু আগে তা না করে থাকলে তখন করা আবশ্যক।
বিশেষ দ্রষ্টব্য, অধিক বিশুদ্ধ মতে, ১০ তারিখের চারটি কাজ তথা বড় জমরায় কঙ্কর নিক্ষেপ, কুরবানির পশু (হাদি) জবাই, মাথা মুণ্ডন এবং তওয়াফে ইফাযাহ আদায়ের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ভালো। কিন্তু ধারাবাহিকতা ঠিক না থাকলেও অর্থাৎ এগুলোর আগে-পিছে হয়ে গেলেও তাতে হজের কোনও ক্ষতি হবে না ইনশাআল্লাহ।
❑ ১১, ১২ ও ১৩ই জিলহজের কার্যাবলী:
৬৭. মক্কা থেকে প্রত্যাবর্তন করে মিনায় ১০, ১১ তারিখের দিবাগত দু রাত অতিবাহিত করা (ওয়াজিব)। [১২ তারিখের দিবাগত অতিবাহিত করা ওয়াজিব নয়]।
৬৮. জিলহজের ১১ ও ১২ তারিখে পশ্চিমাকাশে সূর্য ঢলার পর (জোহর নামাজের পর) বড়, মধ্যম ও ছোট জামরার প্রতিটিতে তাকবির (আল্লাহু আকবার) সহ একে একে সাতটি করে (মোট ২১টি) কঙ্কর নিক্ষেপ করা। (ওয়াজিব)।
৬৯. তিনটি জামরায় পাথর মারার ক্ষেত্রে ছোট ও মধ্যম জামরার পর একটু সামনে এগিয়ে কিবলার দিকে মুখ করে দু হাত উঠিয়ে দুআ করা।
৭০. কিন্তু বড় জামরাতে পাথর মেরে দাঁড়াবে না এবং দুআও করবে না।
৭১. ১২ তারিখে মিনা ত্যাগ করার ইচ্ছা করলে সূর্যাস্তের পূর্বেই তা করতে হবে।
৭২. সূর্য ডোবার পর মিনায় থেকে গেলে সেই রাত (মিনায়) যাপন করা ওয়াজিব এবং পরবর্তী ১৩ তারিখ পশ্চিমাকাশে সূর্য ঢলার পর তিনটি জামরায় পাথর মারাও ওয়াজিব।
৭৩. মক্কায় এসে বিদায়ী তওয়াফ করা (ওয়াজিব)। এ ক্ষেত্রে রমল (দৌড়ানো) নেই।
✪ কতিপয় জরুরি বিষয়:
◈ ক. অনেকে ইহরাম বাঁধার সময় থেকেই ইযতিবা করে অর্থাৎ ইহরামের কাপড় ডান বগলের নিচ দিয়ে নিয়ে বাম কাঁধের উপর রেখে দেয়। এমনকি সালাতের সময়ও সেভাবেই থাকে। এরূপ করা সুন্নতের পরিপন্থী। ইযতিবা শুধু তওয়াফের সময় করা সুন্নত; অন্য সময় নয়।
◈ খ. কাবা ঘরের তওয়াফ এবং সাফা-মারওয়া সাঈ করার জন্য নির্দিষ্ট কোনও দুআ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। তবে কতিপয় সালাফ থেকে নিম্নোক্ত দুআটি প্রমাণিত আছে।
رَبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ، إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعَزُّ الْأَكْرَمُ
উচ্চারণ: রব্বিগফির ওয়ারহাম, ইন্নাকা আনতাল আ’আযযুল আকরাম।
অর্থ: “হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন এবং দয়া করুন। নিশ্চয়ই আপনিই সবচেয়ে সম্মানিত ও মর্যাদাবান।”
সুতরাং কেউ চাইলে এই দুআটা পাঠ করতে পারে। এ ছাড়া যে কোনও দুআ নিজ ভাষায় করা যাবে বা যে কোনও দুআ, জিকির-তাসবিহ, ইস্তিগফার ইত্যাদি পাঠ করা যাবে ইনশাআল্লাহ।
তবে কেবল রোকনে ইয়েমেনি এবং হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে নিম্নোক্ত দোয়াটি পড়া সুন্নত:
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণ: “রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়া ক্বিনা আযাবান্নার”।
সতর্কতা: হজ-উমরা সংক্রান্ত বিভিন্ন কিতাবে তওয়াফের সময় পড়ার জন্য যে সকল দুআ লেখা আছে নির্দিষ্ট ভাবে সেগুলো পড়া সঠিক নয়। কেননা এভাবে প্রতিটি চক্করের জন্য বিশেষ কোনও দুআ না রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পড়েছেন, না তিনি পড়তে বলেছেন, না কোনও সাহাবি এরূপ করেছেন। তাই এগুলো পড়া সুন্নত মনে করা হলে তা বিদআত হিসেবে গণ্য হবে।
◈ গ. অনেকে ইহরাম বাঁধার উদ্দেশ্যে দু রাকাত সালাত আদায় করে থাকে। এটি সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত নয়। কারণ ইহরামের বিশেষ কোনও সালাত নেই। তবে কোনও ফরজ সালাতের সময় হয়ে গেলে উক্ত সালাত আদায়ের পর কিংবা মসজিদে প্রবেশ করলে তাহিয়াতুল মসজিদ হিসেবে দু রাকাত সালাত আদায়ের পর ইহরাম বাঁধবে।
◈ ঘ. ১০ তারিখে তওয়াফে ইফাযাহ করতে না পারলে পরবর্তীতে যে কোনও সময় তা করতে পারবে। তবে ১৩ তারিখের মধ্যে আদায় করা উত্তম। প্রয়োজনে তওয়াফে ইফাযাহর সাথে বিদায়ী তওয়াফের নিয়ত করলে উভয়টিই আদায় হয়ে যাবে।
◈ ঙ. কোনও অবস্থাতেই আরাফাতের ময়দান থেকে সূর্য ডোবার পূর্বে ময়দান ছেড়ে যাওয়া জায়েজ নয়। (এটিই অধিক বিশুদ্ধ মত)।
◈ চ. তামাত্তুকারীর জন্য কোনও অবস্থাতেই এক সাঈ যথেষ্ট নয়। বরং তার জন্য উমরার সাঈ এবং হজের সাঈ দু বার সাঈ করা আবশ্যক।
◈ ছ. ১০ তারিখের পূর্বে তওয়াফে ইফাযাহ করলে তা আদায় হবে না। বরং তা ১০, ১১, ১২, ১৩ বা তারপরে যে কোনও সময় আদায় করা যাবে। তবে উত্তম হলো, ১৩ তারিখের মধ্যে আদায় করা।
◈ জ. তানঈম (যাকে মসজিদে আয়েশা বা ওমরা মসজিদ বলা হয়) থেকে ইহরাম বেঁধে এসে নিজের জন্য বা আত্মীয়স্বজনের পক্ষ থেকে একাধিক ওমরা পালন করা শরিয়ত সম্মত নয়। কেননা একই সফরে একাধিক ওমরা করা রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ও তাবেঈদের কারো থেকেই সাব্যস্ত নেই। [বিস্তারিত দেখুন: আল মুগনী, ৫/১৭]
❑ মসজিদে নববীরর উদ্দেশ্যে সফর এবং রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর করব জিয়ারত:
মসজিদে নববীতে সালাত আদায়ের সওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে মদিনা মুনাওয়ারার সফর করা জায়েজ ও বরকতময়। কিন্তু মদিনা সফর বা জিয়ারত করা হজ বা ওমরার সাথে সম্পর্কিত নয়। বরং এটি একটি স্বতন্ত্র আমল, যা বছরের যেকোনো সময় করা যায়। মসজিদে নববী জিয়ারতে গেলে করণীয় হল, মসজিদে প্রবেশ করে প্রথমে দুই রাকাত ‘তাহিয়্যাতুল মসজিদ’ আদায় করা অথবা নামাজের সময় হয়ে গেলে তা আদায় করা। সম্ভব হলে রিয়াজুল জান্নাতে এই সালাত আদায় করা উত্তম। অতঃপর, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবর মোবারক জিয়ারত করা মুস্তাহাব। কবরের সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে সালাত ও সালাম পেশ করতে হয়। বলবে:
الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللهِ
“আসসালাতু ওয়াসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ।”
“হে আল্লাহর রসুল! আপনার ওপর সালাত ও সালাম (শান্তি) বর্ষিত হোক।”
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সালামের পর ডানে সরে গিয়ে আবু বকর সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কবরে সালাত ও সালাম পেশ করবে। বলবে:
السَّلَامُ عَلَيْكَ يَا أَبَا بَكْرٍ الصِّدِّيقَ خَلِيْفَةَ رَسُوْلِ اللهِ
উচ্চারণ: “আসসালামু আলাইকা ইয়া আবা বাকরিনিস সিদ্দীক খালীফাতা রাসূলিল্লাহ।”
অর্থ: “হে আবু বকর সিদ্দিক, আল্লাহর রসুলের খলিফা! আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।”
এবং এরপর উমর ফারুক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কবরের সামনে দাঁড়িয়ে সালাম পেশ করবে। বলবে,
السَّلَامُ عَلَيْكَ يَا عُمَرَ الْفَارُوْقَ خَلِيْفَةَ خَلِيْفَةِ رَسُوْلِ اللهِ
উচ্চারণ: “আসসালামু আলাইকা ইয়া উমারাল ফারূক খালীফাতা খালীফাতি রাসূলিল্লাহ।”
অর্থ: “হে উমর ফারুক, আল্লাহর রাসুলের খলিফার খলিফা! আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।”
এগুলোই সহজ ও সক্ষিপ্ত সালামের শব্দ। তবে আরও বিভিন্ন সালাম পেশ করা যায়।
❑ হজের রোকন ৪টি:
১. ইহরাম বাঁধা।
২. আরাফায় অবস্থান করা।
৩. তওয়াফে ইফাযাহ করা।
৪. সাঈ করা।
❑ হজের ওয়াজিব ৮টি:
১) মিকাত হতে ইহরাম বাঁধা।
২) সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় অবস্থান করা।
৩) মুজদালিফায় রাত যাপন করা।
৪) ১১ ও ১২ জিলহজের দু রাত মিনায় যাপন করা।
৫) জামরায় পাথর মারা।
৬) কুরবানি করা। (তামাত্তু ও কিরান কারীদের জন্য)।
৭) চুল কামানো বা ছোট করা।
৮) বিদায়ী তওয়াফ করা। (তবে ঋতুমতী ও প্রসূতি নারীদের জন্য তা আবশ্যক নয়)।
❑ কোনও রোকন বা ওয়াজিব ছুটে গেলে কী করণীয়?
হজের কার্যাবলী মূলত দুই ভাগে বিভক্ত: রোকন (মৌলিক স্তম্ভ) এবং ওয়াজিব (অপরিহার্য কাজ)।
✪ ১. রোকন হলো হজের এমন কাজ যা পালন না করলে হজ সম্পন্ন হয় না। (যেমন: ইহরাম বাঁধা, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা, তওয়াফে ইফাযাহ এবং সাঈ করা।) কোনও রোকন বাদ পড়লে শুধু পশু কুরবানি (দম) দিলেই হবে না বরং সেই কাজটি অবশ্যই পূর্ণ করতে হবে। যদি সেই কাজ করার সময় পার হয়ে যায় (যেমন: আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হতে না পারা) তবে সেই বছরের হজ বাতিল হয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে তা পুনরায় কাজা করতে হবে।
✪ ২. ওয়াজিব হলো হজের সেই কাজগুলো যা পালন করা আবশ্যক। কিন্তু কোনও কারণে বাদ পড়লে হজ বাতিল হয় না। (যেমন: মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধা, মুজদালিফায় রাত কাটানো বা জামরায় পাথর মারা) ইচ্ছা করে হোক বা ভুলে হোক, কোনও ওয়াজিব বাদ পড়লে তার বদলে একটি দম বা পশু কুরবানি (ছাগল বা দুম্বা) জবাই করে তার গোশত অথবা গরু বা উটের এক সপ্তমাংশ হারাম এলাকার দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে। নিজে খাওয়া যাবে না এবং পরিবার কিংবা কোনও ধনী মানুষকে তা খাওয়ানো যাবে না। কেননা এটি সম্পূর্ণরূপে সদকা হিসেবে গণ্য।
যদি কেউ পশু পশু জবাই করতে অক্ষম হয় তবে তাকে ১০টি রোজা রাখতে হবে। ৩টি রোজা হজের সময় (মক্কায়) এবং বাকি ৭টি রোজা বাড়িতে ফিরে এসে।
বর্তমান যুগে সরকারীভাবে নির্বাচিত কিছু ব্যাংক এই দায়িত্ব পালন করে থাকে। সুতরাং এসব ব্যাংকে ‘দম’ হিসেবে একটি ছাগল/ভেড়া/দুম্বার টাকা জমা দিলেও তা যথেষ্ট হবে।
❑ ইহরাম অবস্থায় যে সব কাজ করা হারাম: (১০টি)
১) পুরুষদের জন্য সেলাইকৃত পোশাক পরিধান করা। যেমন: জুব্বা, পাঞ্জাবি, পায়জামা, প্যান্ট, গেঞ্জি, হাফপ্যান্ট (আন্ডার ওয়্যার), টুপি, মোজা ইত্যাদি। মহিলাগণ তাদের স্বাভাবিক পোশাকে থাকবে।
২) পুরুষদের জন্য মুখ ঢাকা। তবে মহিলাগণ পরপুরুষের সামনে মাথার উপর থেকে ওড়না ফেলে মুখমণ্ডল ঢাকবে। (নিকাব পরবে না)।
৩) পুরুষদের মাথা ঢাকা।
৪) হাতমোজা পরিধান করা। তবে মহিলাগণ পরপুরুষের সামনে বোরকার লম্বা আস্তিন দ্বারা তাদের হস্ত দ্বয় ঢাকবে। অনুরূপভাবে তারা পা মোজাও পরিধান করতে পারে। (পুরুষদের জন্য পা মোজা পরিধান করা জায়েজ নাই)
৫) নখ, চুল ইত্যাদি কাটা।
৬) স্থলচর প্রাণী শিকার করা বা সেটি শিকার করার জন্য ইঙ্গিত করা।
৭) বিয়ে করা বা বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া।
৮) স্বামী-স্ত্রী সহবাস করা।
৯) কোনও জিনিস কুড়ানো (হারাম এলাকায়)। তবে মূল্যবান কোনও বস্তু মালিকের নিকটে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তর করতে পারে।
১০) সুগন্ধি ব্যবহার করা।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে কেবল মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পবিত্র কুরআন এবং সহিহ সুন্নাহ অনুযায়ী হজ পালন করে সৌভাগ্যশালীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন!! (সমাপ্ত)
[এটি মূলতঃ শাইখ আব্দুল্লাহ আল কাফী (রাহ.) কর্তৃক রচিত জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন (সৌদি আরব)-এর হজ কোর্সের সংক্ষিপ্ত সিলেবাস। তবে তাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ও পরিমার্জন করা হয়।-সম্পাদক]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
সম্পাদনা ও পরিমার্জনা:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

গোপনীয়তা রক্ষা প্রসঙ্গে সালাফ ও মনিষীদের একগুচ্ছ অমূল্য বাণী

 ◈ ১. আলি ইবনে আবু তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,

(سِرُّك أسيرُك، فإن تكَلَّمْتَ به صِرْتَ أسيرَه)
“তোমার গোপন কথাটি যতক্ষণ তোমার কাছে আছে ততক্ষণ সে তোমার বন্দি। কিন্তু যখনই তুমি তা বলে ফেলবে তখনই তুমি তার বন্দি হয়ে যাবে।”
[আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন, পৃষ্ঠা নং ৩০৬]
◈ ২. মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) বলেন,
(الحازِمُ مَن كَتَم سِرَّه مِن صديقِه؛ مخافةَ أن تُبَدَّلَ صداقتُه عَداوةً، فيُذيعَ سِرَّه)
“বিচক্ষণ সেই ব্যক্তি, যে তার বন্ধুর কাছ থেকেও নিজের গোপন কথা লুকিয়ে রাখে—এই ভয়ে যে বন্ধুত্ব একদিন শত্রুতায় পরিণত হতে পারে এবং সে তার গোপন কথা ফাঁস করে দিতে পারে।”
[আল মুওয়াশশা, পৃষ্ঠা নং ৪৭]
◈ ৩. মুআবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এবং তার ভাতিজা ওয়ালিদ ইবনে উতবার মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথন:
(يا أبتِ، إنَّ أميرَ المُؤمِنين أسَرَّ إليَّ حديثًا، وما أراه يطوي عنك ما بسَطه إلى غيرِك. قال: فلا تحَدِّثْني به؛ فإنَّ مَن كتَم سِرَّه كان الخيارُ إليه، ومَن أفشاه كان الخيارُ عليه. قال: فقُلتُ: يا أبتِ، وإنَّ هذا ليَدخُلُ بَيْنَ الرَّجُلِ وبَينَ ابنِه؟! فقال: لا واللهِ يا بُنَيَّ، ولكِنْ أحِبُّ ألَّا تُذَلِّلَ لسانَك بأحاديثِ السِّرِّ، قال: فأتيتُ مُعاويةَ فأخبَرْتُه. فقال: يا وَليدُ، أعتَقَك أخي من رِقِّ الخَطَأِ)
ওয়ালিদ: (পিতার কাছে এসে) হে আব্বাজান! আমিরুল মুমিনিন আমার কাছে একটি গোপন কথা বলেছেন। আমার মনে হয় না যে, তিনি আপনার কাছে এমন কোনো কথা গোপন রাখবেন যা তিনি অন্যের কাছে প্রকাশ করেছেন। (অর্থাৎ আমি চাইলে আপনাকে গোপন কথাটি বলতে পারি)।
ওয়ালিদের পিতা (উতবা): না বৎস, তুমি আমাকে সেই কথাটি বলো না। কারণ, যে ব্যক্তি নিজের গোপন কথা গোপন রাখে তার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে। কিন্তু যে তা প্রকাশ করে দেয় বিষয়টি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং এর দায়ভার তার ওপরই বর্তায়।
ওয়ালিদ: আব্বাজান! পিতা ও পুত্রের সম্পর্কের মাঝেও কি এই রাখঢাক থাকতে পারে?
উতবা: আল্লাহর কসম, হে বৎস! বিষয়টি তেমন নয়। কিন্তু আমি চাই না যে তুমি তোমার জিহ্বাকে অন্যের গোপন কথা প্রকাশে অভ্যস্ত করে ফেলো (যাতে ভবিষ্যতে তোমার জিহ্বা শিথিল না হয়ে যায়)।
(পরবর্তীতে ওয়ালিদ ঘটনাটি তার চাচা আমিরুল মুমিনিন মুআবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে জানালেন)
মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু: হে ওয়ালিদ! আমার ভাই (উতবা) তোমাকে ভুলের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন। (অর্থাৎ তোমাকে গোপন কথা ফাঁসের মতো চারিত্রিক স্খলন ও বড় ধরনের ভুল থেকে রক্ষা করে সঠিক পথের দিশা দিয়েছেন।)
[আস সমত (৪০৭) এবং তারিখে দেমাশক ৩৮/২৭১]
◈ ৪. উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রাহ.) বলেন,
الْقُلُوبُ أَوْعِيَةُ الأَسْرَارِ، وَالشِّفَاهُ أَقْفَالُهَا، وَالأَلْسُنُ مَفَاتِيحُهَا، فَلْيَحْفَظْ كُلُّ امْرِئٍ مِفْتَاحَ سِرِّهِ
“অন্তর হলো গোপন কথার আধার, ঠোঁট হলো তার তালা এবং জিহ্বা হলো সেই তালার চাবি। সুতরাং প্রত্যেকের উচিত, তার নিজের গোপনীয়তার চাবিকাঠি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংরক্ষণ করা।”
[আস সমত (৪০৭) এবং তারিখে দেমাশক ৩৮/২৭১]
◈ ৫. মুহাল্লাব ইবনে আবু সুফরা বলেন,
مَن ضاق قَلبُه اتَّسع لِسانُه
“যার অন্তর সংকীর্ণ তার জিহ্বা বিস্তৃত হয়ে যায় (অর্থাৎ সে আবোল-তাবোল বা অনর্থক কথা বেশি বলে)।” [আল মুওয়াশশা পৃষ্ঠা নং ৪৬]
◈ ৬. আবু হাতিম ইবনে হিব্বান বলেন,
مَنْ حَصَّنَ بِالْكِتْمَانِ سِرَّهُ تَمَّ لَهُ تَدْبِيرُهُ، وَكَانَ لَهُ الظَّفَرُ بِمَا يُرِيدُ، وَالسَّلامَةُ مِنَ الْعَيْبِ وَالضَّرَرِ، وَإِنْ أخطأَه التَّمَكُّنُ وَالظَّفَرُ، وَالْحَازِمُ يَجْعَلُ سِرَّهُ فِي وِعَاءٍ، وَيَكْتُمُهُ عَنْ كُلِّ مُسْتَوْدَعٍ، فَإِنِ اضْطَرَّهُ الأَمْرُ وَغَلَبَهُ أَوْدَعَهُ الْعَاقِلَ النَّاصِحَ لَهُ؛ لأَنَّ السِّرَّ أَمَانَةٌ، وَإِفْشَاؤُهُ خِيَانَةٌ، وَالْقَلْبُ لَهُ وِعَاؤُهُ، فَمِنَ الأَوْعِيَةِ مَا يَضِيقُ بِمَا يُودَعُ، وَمِنْهَا مَا يَتَّسِعُ لِمَا اسْتُودِعَ
“যে ব্যক্তি গোপনীয়তা রক্ষার মাধ্যমে নিজের রহস্যকে সুরক্ষিত রাখে, তার পরিকল্পনা পূর্ণতা পায়, সে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সফল হয় এবং দোষ ও ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকে—এমনকি যদি সে সুযোগ বা বিজয় লাভে ব্যর্থও হয় (তবুও সে বিপদমুক্ত থাকে)।
একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি তার গোপন কথাকে একটি পাত্রে (অন্তরে) আবদ্ধ রাখে এবং তা গচ্ছিত রাখার মতো সবার কাছে প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে। তবে যদি সে পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়, তবে যেন কেবল এমন একজন বুদ্ধিমান ও কল্যাণকামী ব্যক্তির কাছে তা ব্যক্ত করে যে তাকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারে। কারণ গোপন কথা হলো একটি আমানত, আর তা প্রকাশ করে দেওয়া হলো খিয়ানত (বিশ্বাসঘাতকতা)।
অন্তর হলো গোপন কথার পাত্র—কোনো পাত্র সংকীর্ণ হয়, কোনোটি আবার প্রশস্ত।”
[রওযাতুল উকালা পৃষ্ঠা নং ১৮৯]
◈ ৭. আবু হাতিম ইবনে হিব্বান আরও বলেন,
الإِفْرَاطُ فِي الاسْتِرْسَالِ بِالأَسْرَارِ عَجْزٌ، وَمَا كَتَمَهُ الْمَرْءُ مِنْ عَدُوِّهِ فَلا يَجِبُ أَنْ يُظْهِرَهُ لِصَدِيقِهِ، وَكَفَى لِذَوِي الأَلْبَابِ عِبَرًا مَا جَرَّبُوا! وَمَنِ اسْتُودِعَ حَدِيثًا فَلْيَسْتُرْ، وَلا يَكُنْ مِهْتَاكًا وَلا مِشْيَاعًا؛ لأَنَّ السِّرَّ إِنَّمَا سُمِّيَ سِرًّا؛ لأَنَّهُ لا يُفْشَى، فَيَجِبُ عَلَى الْعَاقِلِ أَنْ يَكُونَ صَدْرُهُ أَوْسَعَ لِسِرِّهِ مِنْ صَدْرِ غَيْرِهِ، بِأَلَّا يُفْشِيَهُ
“অযথা সব গোপন কথা বলে বেড়ানো এক ধরনের দুর্বলতা। মানুষ তার শত্রুর কাছে যা গোপন রাখে তা বন্ধুর কাছেও প্রকাশ করা উচিত নয়। বুদ্ধিমানদের জন্য তাদের অভিজ্ঞতাই শিক্ষা হিসেবে যথেষ্ট! যাকে কোনো কথা আমানত হিসেবে বলা হয়েছে, সে যেন তা ঢেকে রাখে; সে যেন গোপনীয়তা ভঙ্গকারী কিংবা রটনাকারী না হয়। কেননা গোপন বিষয়কে ‘গোপন’ এ কারণেই বলা হয় যে তা প্রকাশ করা যায় না। সুতরাং একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির কর্তব্য হলো—অন্যের হৃদয়ের তুলনায় নিজের হৃদয়ে নিজের গোপন কথার জন্য অধিক প্রশস্ত স্থান রাখা, যাতে সে তা ফাঁস না করে দেয়।”
[রওযাতুল উকালা পৃষ্ঠা নং ১৯০]
৮. তিনি আরও বলেছেন,
الظَّفَرُ بِالْحَزْمِ، وَالْحَزْمُ بِإِجَالَةِ الرَّأْيِ، وَالرَّأْيُ بِتَحْصِينِ الأَسْرَارِ، وَمَنْ كَتَمَ سِرَّهُ كَانَتِ الْخِيَرَةُ فِي يَدِهِ، وَمَنْ أَنْبَأَ النَّاسَ بِأَسْرَارِهِ هَانَ عَلَيْهِمْ وَأَذَاعُوهَا، وَمَنْ لَمْ يَكْتُمِ السِّرَّ اسْتَحَقَّ النَّدَمَ، وَمَنْ اسْتَحَقَّ النَّدَمَ صَارَ نَاقِصَ الْعَقْلِ، وَمَنْ دَامَ عَلَى هَذَا رَجَعَ إِلَى الْجَهْلِ؛ فَتَحْصِينُ السِّرِّ لِلْعَاقِلِ أَوْلَى بِهِ مِنَ التَّلَهُفِ بِالنَّدَمِ بَعْدَ خُرُوجِهِ مِنْهُ، وَلَقَدْ أَحْسَنَ الَّذِي يَقُولُ: خَشِيتُ لِسَانِي أَنْ يَكُونَ خَؤُونَا، فَأَوْدَعْتُهُ قَلْبِي فَكَانَ أَمِينَا، فَقُلْتُ لِيَخْفَى دُونَ شَخْصِي وَنَاظِرِي، أَيَا حَرَكَاتِي كُنَّ فِيَّ سُكُونَا
“সফলতা আসে দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে, সংকল্প আসে চিন্তাশীল মতামতের মাধ্যমে, আর সঠিক মতামত আসে গোপনীয়তা রক্ষার মাধ্যমে। যে ব্যক্তি নিজের গোপন কথা গোপন রাখে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের চাবিকাঠি তার হাতেই থাকে। কিন্তু যে মানুষকে নিজের গোপন কথা বলে বেড়ায়, সে মানুষের কাছে তুচ্ছ হয়ে যায় এবং তারা তা ছড়িয়ে দেয়। যে ব্যক্তি গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারে না, সে অনুশোচনার যোগ্য হয়; আর যে অনুশোচনার যোগ্য হয়, তার বুদ্ধি লোপ পায়। যে ব্যক্তি এই পথেই চলতে থাকে, সে শেষ পর্যন্ত মূর্খতায় ফিরে যায়। তাই বুদ্ধিমানের জন্য গোপন কথা প্রকাশ হয়ে যাওয়ার পর অনুতপ্ত হওয়ার চেয়ে আগে থেকেই তা সংরক্ষণ করা অনেক বেশি শ্রেয়।
কবি কতই না চমৎকার বলেছেন!
خَشِيتُ لِساني أن يكونَ خَؤونَا
فأودَعْتُه قلبي فكان أمينَا
فقُلتُ لِيَخفى دونَ شخصي وناظِري
أيا حَرَكاتي كُنَّ فيَّ سُكونَا
‘আমি আমার জিহ্বাকে বিশ্বাসঘাতক হওয়ার ভয় করেছিলাম,
তাই আমি কথাকে হৃদয়ে জমা রাখলাম—ফলে তা আমানতদার হয়ে রইল।
আমি মনে মনে বললাম, যেন তা আমার সত্তা ও দৃষ্টির আড়ালে লুকানো থাকে;
হে আমার প্রাণের স্পন্দন! তোমরা আমার ভেতরে নীরব হয়ে যাও (প্রকাশ পেয়ো না)।'” [রওযাতুল উকালা পৃষ্ঠা নং ১৯১]

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

পশ্চিমা দেশে পর্যটন ও বিনোদনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণের বিধান

 পশ্চিমা দেশে পর্যটন ও বিনোদনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণের বিধান: বরেণ্য আলেমদের ফতওয়া ও দিকনির্দেশনা:

ইসলামের দৃষ্টিতে অমুসলিম দেশগুলোতে পর্যটন ও বিনোদনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণের বিধান সম্পর্কে বর্তমান সময়ের বরেণ্য চারজন ফকিহ ও আলেমের গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়া নিচে উপস্থাপন করা হলো। এই সংকলনে শায়খ বিন বায, শায়খ নাসিরুদ্দিন আলবানি , শায়খ সালেহ আল ফাওজান, শায়খ ইবনে উসাইমিন (রহিমাহুল্লাহ)-এর দিকনির্দেশনা ও শর্তাবলি বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
❑ ১. আনন্দ-বিনোদনের উদ্দেশ্যে বিদেশ ভ্রমণের বিধান:
— শায়খুল ইসলাম ইমাম আব্দুল আজিজ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ)
প্রশ্ন ১: কিছু মানুষ ‘পর্যটন’ বলতে বিনোদন ও আনন্দ উপভোগের জন্য বিদেশ ভ্রমণকে বোঝায়— এ বিষয়ে ইসলামের বিধান কী?
উত্তর:
هَذَا فِيهِ تَفْصِيلٌ. هَذَا السَّيْرُ فِي الْأَرْضِ، قَالَ تَعَالَى: ﴿أَوَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ﴾ [الرُّومِ: ٩]. إِنْ كَانَ السَّفَرُ لِمَصْلَحَةٍ شَرْعِيَّةٍ، وَدَعْوَةٍ إِلَى اللهِ، وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِ اللهِ، وَتَعْلِيمِ الْعِلْمِ وَالدَّعْوَةِ، مِنْ غَيْرِ وُقُوعٍ فِي الْمَحَارِمِ؛ فَلَا بَأْسَ. أَمَّا إِذَا كَانَتِ السِّيَاحَةُ قَدْ تُفْضِي إِلَى الشَّرِّ وَالْفَسَادِ وَإِضَاعَةِ الدِّينِ؛ فَمَا تَجُوزُ. لَا بُدَّ مِنَ النَّظَرِ لِلْمَقْصُودِ وَقُدْرَتِهِ عَلَيْهِ: فَإِذَا كَانَ الْمَقْصُودُ الدَّعْوَةَ إِلَى اللهِ وَتَعْلِيمَ الْجَاهِلِ وَإِرْشَادَ الضَّالِّ، عِنْدَهُ عِلْمٌ وَعِنْدَهُ بَصِيرَةٌ، يَنْشُرُ دِينَهُ وَلَا يَخْشَى الْفِتْنَةَ؛ فَلَا بَأْسَ، هَذِهِ دَعْوَةٌ إِلَى اللهِ كَالْجِهَادِ، مِنَ الْجِهَادِ. أَمَّا إِذَا كَانَ يَتَّبِعُ الشَّهَوَاتِ أَوْ فِي بِلَادِ الْكُفْرِ؛ فَهَذَا خَطَرٌ عَظِيمٌ، نَسْأَلُ اللهَ الْعَافِيَةَ، مَا يَجُوزُ.
“এটি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ বিষয়। পৃথিবীতে ভ্রমণ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: “তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি এবং দেখেনি যে, তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণতি কী হয়েছিল?” [সূরা রূম: ৯]
যদি সফরের উদ্দেশ্য হয় শরিয়তসম্মত কোনো কল্যাণ— যেমন:
– আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়া,
– আল্লাহর পথে জিহাদ করা,
– ইলম শেখানো বা ইসলাম প্রচার করা— এবং এতে কোনো হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা না থাকে তাহলে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু যদি সফর অনিষ্ট, ফাসাদ ও দ্বীন নষ্টের দিকে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে তাহলে তা জায়েজ নয়। এ বিষয়ে সফরকারীর উদ্দেশ্য এবং সেই উদ্দেশ্য পূরণের সামর্থ্য—উভয়টি বিবেচনা করা জরুরি। যদি উদ্দেশ্য হয়, আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়া, অজ্ঞকে শেখানো ও পথহারাকে পথ দেখানো— এবং তার কাছে ইলম আছে, দূরদর্শিতা আছে, সে দ্বীন প্রচার করতে পারে এবং ফিতনার ভয় নেই— তাহলে কোনো অসুবিধা নেই। এটি আল্লাহর পথে দাওয়াত বরং জিহাদেরই একটি অংশ। কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয়, কেবল প্রবৃত্তির অনুসরণ—বিশেষত কাফেরদের দেশে—তাহলে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। (আল্লাহর কাছে আমরা নিরাপত্তা চাই।) এটা জায়েজ নয়।
– প্রশ্ন: আপনার মত কি এই যে, শুধু ইলমদার ব্যক্তিই কাফেরদের দেশে সফর করবেন?
উত্তর:
إِلَى بِلَادِ الْكُفْرِ لَا شَكَّ، عِنْدَهُ عِلْمٌ وَقُدْرَةٌ عَلَى إِظْهَارِ دِينِهِ
“কাফেরদের দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে—নিঃসন্দেহে—তার কাছে ইলম থাকতে হবে এবং নিজের দ্বীন প্রকাশ করার সামর্থ্য থাকতে হবে।”
– প্রশ্ন : কেউ যদি বিনোদনের জন্য সফর করে কিন্তু তার ইমান মজবুত?
উত্তর:
إِذَا كَانَ بَيْنَ الْمُسْلِمِينَ؛ فَلَا بَأْسَ، فِي بِلَادِ الْمُسْلِمِينَ مَا يَضُرُّ.
“যদি মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সফর হয়— তাহলে কোনো অসুবিধা নেই। মুসলিম দেশে সফরে কোনো ক্ষতি নেই।” [source: binbaz org]
❑ ২. পর্যটন ও বিনোদনের উদ্দেশ্যে কাফের রাষ্ট্রগুলোতে সফর করা কি জায়েজ?
—আল্লামা মুহাদ্দিস নাসিরুদ্দিন আলবানি (রহ.)
প্রশ্নকারী: শায়খ, আমার প্রশ্নের একটি সম্পূরক অংশ ছিল—পর্যটনের উদ্দেশ্যে কাফের রাষ্ট্রগুলোতে সফর করা কি এই নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত হবে?
শায়খ উত্তরে বলেন:
إِذَا كَانَ أَوَّلًا الْقَصْدُ كَمَا ذَكَرْتَ لِلسِّيَاحَةِ دُونَ الِاعْتِبَارِ وَالنَّظَرِ كَمَا هُوَ أَدَبُ الْقُرْآنِ، وَتَوْجِيهُ الْقُرْآنِ فَفِيهِ تَعْرِيضٌ لِلسَّائِحِ الْمُسْلِمِ لِيُفْتَتَنَ، وَلِذَلِكَ فَنَحْنُ نَشْتَرِطُ فِيمَنْ ذَهَبَ لِلسِّيَاحَةِ أَوْ لِيَتَعَلَّمَ عِلْمًا هُوَ مِنَ الْعُلُومِ الْكِفَائِيَّةِ: أَنْ يَكُونَ مُحَصَّنًا بِالْمَعْنَيَيْنِ: الْمَادِيِّ وَالْمَعْنَوِيِّ، أَيْ: بِأَخْلَاقِهِ الْإِسْلَامِيَّةِ وَبِزَوْجَتِهِ الْمُسْلِمَةِ الَّتِي يَصُونُ نَفْسَهُ بِهَا وَيَصُونُ نَفْسَهَا أَيْضًا بِهِ، فَإِذَا كَانَ هَكَذَا جَازَ لَهُ أَنْ يَذْهَبَ مِنْ أَجْلِ السِّيَاحَةِ وَالْفُرْجَةِ، أَوْ لِتَعَلُّمِ الْعِلْمِ الْكِفَائِيِّ شَرِيطَةَ أَنْ يَنْوِيَ الْعَوْدَةَ فَوْرَ مَا تَنْتَهِي الْغَايَةُ الَّتِي هُوَ مِنْ أَجْلِهَا سَافَرَ إِلَى تِلْكَ الْبِلَادِ.
“প্রথমত: আপনি যেভাবে উল্লেখ করলেন, উদ্দেশ্য যদি হয় কেবলই পর্যটন বা ঘুরে বেড়ানো এবং সেখানে কুরআনি আদব ও নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষা গ্রহণ নেওয়ার বিষয়টি না থাকে তবে এমন ভ্রমণ একজন মুসলিমকে ফিতনায় পড়ার ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। এই কারণেই যারা পর্যটনের উদ্দেশ্যে কিংবা ‘ফরজে কিফায়া’ পর্যায়ের কোনো জ্ঞান অর্জনের জন্য সেখানে যেতে চায় তাদের ক্ষেত্রে আমরা দুটি শর্তারোপ করি: তাকে বস্তুগত এবং চারিত্রিক—উভয় দিক থেকেই ‘সুরক্ষিত’ হতে হবে। অর্থাৎ তিনি যেন ইসলামি আখলাক বা চরিত্রের মাধ্যমে এবং একজন মুসলিম স্ত্রীর মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকেন যার দ্বারা তিনি নিজেকে হেফাজত করবে এবং স্ত্রীও তাঁর মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকবে। যদি বিষয়টি এমন হয় তবে পর্যটন, ঘোরাঘুরি কিংবা প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে তাঁর সেখানে যাওয়া জায়েজ। তবে শর্ত হলো—যে উদ্দেশ্যে তিনি সফর করেছেন, সেটি পূরণ হওয়া মাত্রই দ্রুত ফিরে আসার নিয়ত থাকতে হবে।”
❑ ৩. পশ্চিমা দেশে পর্যটনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণের বিধান:
—আল্লামা শায়খ সালেহ আল ফাওজান (হাফিযাহুল্লাহ) (বর্তমান সৌদি প্রধান মুফতি)
প্রশ্ন: হে শায়খ, আমার মনে হয়, স্বল্প সময়ের জন্য পশ্চিমা দেশে পর্যটনে যাওয়াতে কোনো অসুবিধা নেই— যদি নিষিদ্ধ জায়গাগুলো এড়িয়ে চলা যায় এবং উদ্দেশ্য থাকে কেবল প্রকৃতি, আবহাওয়া ও আল্লাহ প্রদত্ত বৈধ নিয়ামতগুলো উপভোগ করা। এতে কি আমার কোনো গুনাহ হবে?
উত্তর:
نَعَمْ، هَذَا لَا يَجُوزُ.
فَالسَّفَرُ إِلَى بِلَادِ الْكُفَّارِ مِنْ أَجْلِ السِّيَاحَةِ وَالنُّزْهَةِ لَا يَجُوزُ، لِأَنَّ الْمَضَرَّةَ فِيهِ أَكْثَرُ مِنَ الْمَنْفَعَةِ.
وَإِنَّمَا يَجُوزُ السَّفَرُ إِلَيْهَا فِي أَحْوَالٍ مَحْدُودَةٍ، وَهِيَ:
١. السَّفَرُ لِلتِّجَارَةِ، ثُمَّ الرُّجُوعُ.
٢. السَّفَرُ لِلْعِلَاجِ مِمَّا لَا يُوجَدُ فِي بِلَادِ الْمُسْلِمِينَ، ثُمَّ الرُّجُوعُ.
٣. السَّفَرُ لِتَعَلُّمِ تَخَصُّصٍ لَا يُوجَدُ فِي بِلَادِ الْمُسْلِمِينَ وَهُمْ بِحَاجَةٍ إِلَيْهِ، ثُمَّ الرُّجُوعُ.
٤. السَّفَرُ لِلدَّعْوَةِ إِلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ.
فَهَذِهِ أَغْرَاضٌ صَحِيحَةٌ يَجُوزُ السَّفَرُ مِنْ أَجْلِهَا، مَعَ التَّمَسُّكِ بِالدِّينِ، وَالْعِزَّةِ بِهِ، وَالْحَذَرِ الشَّدِيدِ مِنْ مَوَاطِنِ الْفِتَنِ.
أَمَّا السَّفَرُ لِمُجَرَّدِ السِّيَاحَةِ فَالْأَصْلُ فِيهِ التَّحْرِيمُ، لِمَا يَنْطَوِي عَلَيْهِ مِنَ الْفِتْنَةِ وَالشَّرِّ.
وَمَنْ قَالَ: “أَنَا أَضْبِطُ نَفْسِي”، فَلْيَعْلَمْ أَنَّ الْإِنْسَانَ لَا تُؤْمَنُ عَلَيْهِ الْفِتْنَةُ مَا دَامَ حَيًّا، فَلَا تُزَكِّ نَفْسَكَ، وَلَا تُعَرِّضْهَا لِلْفِتَنِ.
“হ্যাঁ, এটা জায়েজ নয়। পর্যটন ও বিনোদনের উদ্দেশ্যে কাফেরদের দেশে সফর করা বৈধ নয়। কারণ এতে যে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে তা যেকোনো উপকারের চেয়ে অনেক বেশি। তবে সীমিত কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে সেখানে সফরের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো:
◆ ১. ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনে সফর করা। তারপর ফিরে আসা।
◆ ২. এমন চিকিৎসার জন্য সফর করা যা মুসলিম দেশগুলোতে পাওয়া যায় না। তারপর ফিরে আসা।
◆ ৩. এমন বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জনের জন্য সফর করা যা মুসলিম দেশগুলোতে নেই।অথচ মুসলিম উম্মাহর তা প্রয়োজন— এবং অর্জন শেষে ফিরে আসা।
◆ ৪. আল্লাহর পথে দাওয়াত ও ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সফর করা।
এগুলো সঠিক ও গ্রহণযোগ্য উদ্দেশ্য, যার জন্য সফর জায়েজ। তবে অবশ্যই শর্ত হলো— দ্বীনের উপর দৃঢ় থাকতে হবে, দ্বীন নিয়ে গর্বিত ও অবিচল থাকতে হবে এবং ফিতনার স্থানগুলো থেকে কঠোরভাবে দূরে থাকতে হবে।
আর যে ব্যক্তি কেবল পর্যটনের নিয়তে সফর করে তার বিষয়ে মূল বিধান হলো হারাম‌। কেননা এতে ফিতনা ও অনিষ্ট লুকিয়ে থাকে। যে বলে, “আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব”— সে যেন জেনে রাখে, মানুষ যতদিন জীবিত থাকে ততদিন সে ফিতনার ব্যাপারে নিরাপদ নয়। তাই নিজের নফসকে অতি পবিত্র ভেবো না আর তাকে ফিতনার সামনে উন্মুক্ত করে দিও না।” [youtube channel]
❑ ৪. বিনোদন ও পর্যটনের উদ্দেশ্যে বিদেশ সফরের বিধান:
(আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন (রহ.)-এর ফতোয়া সহ)
প্রশ্ন: বিনোদন ও পর্যটনের উদ্দেশ্যে দুই থেকে তিন সপ্তাহের জন্য পশ্চিমা দেশগুলোতে সফর করার বিধান কী?
উত্তর:
الْحَمْدُ لِلَّهِ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ، وَبَعْدُ:
السَّفَرُ إِلَى بِلَادِ الْكُفَّارِ لِمُجَرَّدِ النُّزْهَةِ لَا يَجُوزُ عِنْدَ جَمْعٍ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ؛ لِمَا فِيهِ مِنَ التَّعَرُّضِ لِلْمُنْكَرَاتِ وَالْفِتَنِ، مَعَ عَدَمِ وُجُودِ الضَّرُورَةِ أَوِ الْحَاجَةِ لِذَلِكَ.
قَالَ الشَّيْخُ ابْنُ عُثَيْمِينَ رَحِمَهُ اللَّهُ: “السَّفَرُ إِلَى بِلَادِ الْكُفَّارِ مُحَرَّمٌ إِلَّا بِثَلَاثَةِ شُرُوطٍ:
الْأَوَّلُ: أَنْ يَكُونَ عِنْدَ الْإِنْسَانِ عِلْمٌ يَدْفَعُ بِهِ الشُّبُهَاتِ.
وَالثَّانِي: أَنْ يَكُونَ عِنْدَهُ دِينٌ يَحْمِيهِ مِنَ الشَّهَوَاتِ.
وَالثَّالِثُ: أَنْ يَكُونَ مُحْتَاجًا إِلَى ذَلِكَ… إِمَّا لِعِلْمٍ لَا يُوجَدُ لَهُ نَظِيرٌ فِي الْمَمْلَكَةِ، أَوْ ذَهَبَ لِمَرَضٍ يَتَدَاوَى، أَوْ لِتِجَارَةٍ لَا بُدَّ مِنْهَا، وَأَمَّا إِذَا لَمْ يَكُنْ لَهُ حَاجَةٌ فَلَا يَذْهَبُ، وَكَمْ مِنْ أُنَاسٍ يَذْهَبُونَ إِلَى الْخَارِجِ بِاسْمِ التَّمَشِّي وَالنُّزْهَةِ فَتَفْسُدُ أَخْلَاقُهُمْ وَتَنْحَلُّ عَقَائِدُهُمْ -وَالْعِيَاذُ بِاللَّهِ- وَيَرْجِعُونَ مَمْسُوخِينَ، وَلَا شَكَّ أَنَّ هَذَا لَا يَحِلُّ لِلْمُسْلِمِ أَنْ يَتَعَرَّضَ لَهُ لِمَا فِيهِ مِنَ الشَّرِّ وَالْفَسَادِ.”
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য এবং দরুদ ও সালাম আল্লাহর রাসূলের উপর। অধিকাংশ আলেমের মতে, শুধু বিনোদনের উদ্দেশ্যে কাফেরদের দেশে সফর করা জায়েজ নয়। কারণ এতে অশ্লীলতা ও ফিতনার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা থাকে অথচ এ সফরের কোনো শরিয়তসম্মত প্রয়োজনীয়তাও নেই।
✪ শায়খ ইবনে উসাইমিন (রাহ.) বলেছেন:
“কাফেরদের দেশে সফর করা হারাম। তবে তিনটি শর্ত পূরণ হলে ভিন্ন কথা। যথা:
◈ প্রথম শর্ত: তার কাছে এমন ইলম বাদ দ্বীনের জ্ঞান থাকতে হবে যা দিয়ে সে (ইসলাম সম্পর্কে) সন্দেহ-সংশয় দূর করতে পারবে।
◈দ্বিতীয় শর্ত: তার মধ্যে এমন দ্বীনদারি থাকতে হবে যা তাকে প্রবৃত্তির কামনা থেকে রক্ষা করবে।
◈ তৃতীয় শর্ত: তার সেই সফরের প্রকৃত প্রয়োজন থাকতে হবে— যেমন: এমন কোনো বিদ্যা অর্জনের জন্য যার সমকক্ষ জ্ঞান তার নিজ দেশে পাওয়া যায় না অথবা চিকিৎসার জন্য অথবা অপরিহার্য ব্যবসায়িক কাজে। কিন্তু কোনো প্রয়োজন না থাকলে সে যাবে না। কত মানুষ বিদেশে যায় বেড়ানো ও বিনোদনের নাম করে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তাদের চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়, আকিদা-বিশ্বাসে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়, (আল্লাহর কাছে আমরা আশ্রয় চাই) এবং তারা বিকৃত বা পরিবর্তন হয়ে ফিরে আসে। নিঃসন্দেহে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ নয়। কারণ এতে রয়েছে অনিষ্ট এবং ফিতনা-ফ্যাসাদ।”
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। [মাসিক বৈঠক, নং ৬, islamqa info, প্রশ্ন নং: ১১১৯৩৪]
সারাংশ: আলেমদের এই ফতোয়াগুলোর মূল কথা হলো—অমুসলিম দেশগুলোতে শুধু পর্যটন বা শখের বসে সফর করার ব্যাপারে ইসলাম আমাদের সতর্ক করেছে। কারণ সেখানে পরিবেশ ও অপসংস্কৃতির প্রভাবে নিজের ইমান ও আখলাক প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এসব দেশে না যাওয়াই নিরাপদ। তবে যদি বিশেষ প্রয়োজনে (যেমন: চিকিৎসা, দাওয়াতি কাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য বা এমন শিক্ষা গ্রহণ যা মুসলিম দেশে নেই ইত্যাদি) যেতেই হয় তবে অবশ্যই নিজের ইমানি শক্তি মজবুত রাখা, এবং সাথে স্ত্রীকে রাখার চেষ্টা করতে হবে, যেন চারিত্রিক সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।
মোটকথা, একজন মুমিনের কাছে নিজের ইমান ও আমলকে ফিতনা থেকে বাঁচিয়ে রাখাটাই সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত। আল্লাহ আমাদেরকে ইমান-আকিদা ও আখলাককে সব ধরণের অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

জিন বা জাদু ইত্যাদি সমস্যায় সেলফ রুকিয়া করার পদ্ধতি ও করণীয়

 প্রশ্ন: একজন মহিলা গর্ভাবস্থায় জিন ও জাদু দ্বারা আক্রান্ত। জিনের আছরে খুব আগেই আক্রান্ত হয়েছেন। জিনটা তার ওপর খুব জুলুম করে। তিনি খুব দ্রুত রুকইয়াহ করতে চান। তার তিলাওয়াত কিছুটা শুদ্ধ। তিনি কোনও রাক্বির (রুকিয়া বা ঝাড়ফুঁক কারী) কাছে যেতে পারছেন না এবং পরিবারের মানুষের সাহায্যও পাচ্ছেন না। তিনি অনেক বিপদে আছেন। এমতাবস্থায় তিনি কি নিজে নিজে রুকইয়াহ করতে পারবেন? আর সেলফ রুকইয়াহ করার ক্ষেত্রে নিয়ত কেমন হবে?

উত্তর: গর্ভাবস্থায় একজন মহিলার জন্য জাদুর চিকিৎসা বা রুকইয়াহ করা কেবল বৈধই নয় বরং এটি তার এবং গর্ভস্থ সন্তানের সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু তিনি কোনও রাকির কাছে যেতে পারছেন না বা পরিবারের সাহায্য পাচ্ছেন না তাই তিনি সেলফ রুকইয়াহ বা নিজের ওপর নিজে রুকইয়াহ অবশ্যই করতে পারবেন। নিচে তার করণীয় ও রুকিয়া করা পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেওয়া হলো:
আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায (রাহ.)-কে নিজের ওপর রুকইয়াহ করার পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,
“নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে নির্দেশনা দিয়েছেন মানুষ সেটিই বলবে। তা হলো:
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَأْسَ، وَاشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لاَ شِفَاءَ إِلاَّ شِفَاؤُكَ
بِاسْمِ اللهِ أَرْقِي نَفْسِي، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِينِي، وَمن شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللهُ يَشْفِينِي
উচ্চারণ: “আল্ল-হুম্মা রব্বান-নাসি আজহিবিল বা’সা, ওয়াশফি আন্তাশ-শাফি, লা শিফায়া ইল্লা শিফাউকা। বিসমিল্লাহি আরক্বী নাফসী, মিন কুল্লি শাইয়িন ইউ’যীনী, ওয়া মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনিন হাসিদিন, আল্লাহু ইয়াশফীনী।
অর্থ: “আল্লাহর নামে আমি নিজের ওপর ঝাড়ফুঁক করছি এমন প্রতিটি বিষয় থেকে যা আমাকে কষ্ট দেয়; আর প্রতিটি প্রাণীর অনিষ্ট কিংবা হিংসুক চোখের মন্দ দৃষ্টি থেকে। আল্লাহ আমাকে শিফা দান করুন।
হে মানুষের প্রতিপালক! আপনি কষ্ট দূর করে দিন এবং আরোগ্য দান করুন। আপনিই আরোগ্য দানকারী, আপনার শিফা ছাড়া আর কোনও শিফা নেই।” [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন অসুস্থতা অনুভব করতেন তখন ঘুমানোর সময় নিজের দুই হাতের তালুতে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক এবং সূরা নাস (তিনবার) পড়ে ফুঁ দিতেন। এরপর উভয় হাত দিয়ে তাঁর মাথা, মুখমণ্ডল এবং শরীরের যতটুকু অংশে সম্ভব হাত বুলিয়ে নিতেন—এভাবে তিনি তিনবার করতেন।” [মাজমু ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত শাইখ ইবনে বাজ (৮/৩৪৫)]
আরও কিছু করণীয়:
✪ পাশাপাশি ঘরে নিয়মিত সুরা বাকারা তিলাওয়াত করবেন। নিজে সম্ভব না হলে অন্তত অডিও ছেড়ে রাখবেন। তবে নিজে তেলাওয়াত করা অধিক উত্তম।
✪ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ
“সুরা বাকারা তিলাওয়াত করলে শয়তান সেই ঘর থেকে পালিয়ে যায়।” [সহিহ মুসলিম: ৭৮০]]
✪ জিন ভয় দেখানোর চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু মনে রাখবেন, আল্লাহর জিকিরের সামনে শয়তানের চক্রান্ত অত্যন্ত দুর্বল। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বোত্তম সুরক্ষা দানকারী।
✪ সবসময় ওজু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করা এবং সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন দোয়াগুলো নিয়মিত পড়া।
✪ বাড়ি থেকে বের হওয়ার, বাড়িতে প্রবেশ, টয়লেট, ঘুমানো, স্বামী-স্ত্রী মিলন ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে হাদিস সম্মত দুআ ও জিকিরগুলো পাঠ করা।
✪ বেশি বেশি দরুদ ও ইস্তিগফার পড়া।
✪ ঘরে কোনও প্রাণীর ছবি বা কুসংস্কারমূলক কিছু থাকলে তা সরিয়ে ফেলা। কারণ এগুলো রহমতের ফেরেশতা আসার পথে বাধা সৃষ্টি করে।
আল্লাহ তাআলা তাকে এবং তার সন্তানকে দ্রুত পূর্ণ সুস্থতা এবং নিরাপত্তা দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদ আরব।

অমুসলিমদেরকে দাওয়াত দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাদের ধর্মীয় কিতাব পড়ার বিধান

 প্রশ্ন: এক মুসলিম যুবক অমুসলিম প্রধান একটি দেশে হিজরত করছেন যেখানে হিন্দু ও খ্রিস্টানদের সংখ্যা অনেক। তিনি দ্বীনের জন্য সামান্য কিছু কাজ করার অর্থাৎ তাদের ইসলামের দিকে দাওয়াত দেওয়ার নিয়ত করেছেন। তিনি প্রখ্যাত দাঈদের নিকট শুনেছেন যে, যদি কেউ নিজ ধর্মের ওপর দৃঢ় বিশ্বাসী হয় এবং কাফিরদের সাথে বিতর্ক করতে চায় তবে যেন তাদের কিতাব থেকেই বিতর্ক করে। প্রশ্ন হল—তিনি কি অমুসলিমদের কিতাবগুলো দেখতে পারেন? তাঁর উদ্দেশ্য সেই ধর্ম শেখা নয় বরং সেখানের ভুলগুলো খুঁজে বের করা এবং তারা যে বাতিলের ওপর আছে তা শনাক্ত করা। আলহামদুলিল্লাহ, তিনি নিজের দ্বীনের ওপর অটল এবং এই কিতাবগুলো তাঁর বিশ্বাস পরিবর্তন করতে পারবে না।

উত্তর: সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদের ওপর। অতপর-
✪ ১. মুসলিম দেশ থেকে অমুসলিম দেশে হিজরত করা জায়েজ নয়। তবে ওই ব্যক্তির জন্য অনুমতি আছে যে, নিজের দ্বীনের আহকামগুলো পালন করতে সক্ষম হবে এবং ফিতনায় পড়ার ভয় থেকে নিরাপদ থাকে। যদিও সব অবস্থাতেই মুসলিমদের মাঝে বসবাস করা উত্তম। কারণ অমুসলিমদের দেশে বসবাস করার মাঝে অনেক ঝুঁকি ও সতর্কতা রয়েছে।
✪ ২. অমুসলিমদের ইসলামের দিকে দাওয়াত দেওয়া এবং তাদের ধর্মের অসারতা ও বাতুলতা প্রমাণের উদ্দেশ্যে তাদের ধর্মীয় কিতাব পাঠ করার বিষয়টি শরিয়তসম্মত। তবে এটি কেবল ওই ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য যিনি এ কাজের যোগ্য এবং যার ইলম ও ইমানের কারণে কোনও ধরনের সংশয় বা ফিতনায় পড়ার আশঙ্কা নেই।
◈ সৌদি আরবের ‘ফাতাওয়ায়ে লাজনা দায়িমাহ’ (স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড)-এ বলা হয়েছে:
لَا يَجُوزُ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَدْرُسَ الْفَلْسَفَةَ وَالْقَوَانِينَ الْوَضْعِيَّةَ وَنَحْوَهُمَا، إِذَا كَانَ لَا يَقْوَى عَلَى تَمْيِيزِ حَقِّهَا مِنْ بَاطِلِهَا؛ خَشْيَةَ الْفِتْنَةِ وَالِانْحِرَافِ عَنِ الصِّرَاطِ الْمُسْتَقِيمِ، وَيَجُوزُ لِمَنْ يَهْضَمُهَا وَيَقْوَى عَلَى فَهْمِهَا بَعْدَ دِرَاسَةِ الْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ، لِيُمَيِّزَ خَبِيثَهَا مِنْ طَيِّبِهَا، وَلِيُحِقَّ الْحَقَّ وَيُبْطِلَ الْبَاطِلَ، مَا لَمْ يَشْغَلْهُ ذَلِكَ عَمَّا هُوَ أَوْجَبُ مِنْهُ شَرْعًا.
“কোনও মুসলিমের জন্য দর্শন বা মানবরচিত আইন ও এই জাতীয় বিষয়গুলো পড়া জায়েজ নয় যদি তার সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করার ক্ষমতা না থাকে; যাতে সে ফিতনা বা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে না পড়ে। তবে যারা কুরআন ও সুন্নাহ অধ্যয়নের পর এই বিষয়গুলো বোঝার ও আয়ত্ত করার ক্ষমতা রাখেন, তাদের জন্য এটি জায়েজ—যাতে তারা ভালো ও মন্দের পার্থক্য করতে পারেন এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত ও মিথ্যাকে বাতিল করতে পারেন। তবে শর্ত হল, এই কাজ যেন তাকে এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কোনও শারঈ দায়িত্ব থেকে বিমুখ না করে।” [ফাতাওয়ায়ে লাজনা দায়িমাহ]
✪ ৩. প্রশ্নকারীর জন্য আমাদের পরামর্শ হল—সরাসরি তাদের কিতাবগুলো না ধরে বরং মুসলিম আলেমদের লেখা ‘তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব’ (Comparative Religion) বিষয়ক বইগুলোর সাহায্য নেওয়া। এতে একদিকে যেমন সংশয় থেকে নিরাপদ থাকা যাবে, তেমনি সময় ও শ্রমের সাশ্রয় হবে এবং অভিজ্ঞ আলেমদের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হওয়া সহজ হবে। আল্লাহই ভালো জানেন। ফতোয়া নং: ৩০৬৮৫০ | তারিখ: ২৩ জিলকদ ১৪৩৬ হিজরি (০৬-০৯-২০১৫ ইং)
❑ আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. এর ফতওয়া: অন্য ধর্মের কিতাব পড়ার বিধান-
প্রশ্ন: এই প্রশ্নকারীর শেষ প্রশ্নটি হল— কৌতূহল বশত এবং অন্য ধর্ম সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্যে ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মের কিতাব পড়া কি জায়েজ?
উত্তর: না, এটা উচিত নয়। তাওরাত, ইনজিল বা অন্য কোনও ধর্মগ্রন্থ পড়া উচিত নয়। কারণ এগুলো পড়লে মনে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি জন্ম নিতে পারে।
রসুলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি একবার উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে তাওরাতের কিছু অংশ পড়তে দেখে বললেন:
«أَفِي شَكٍّ يَا ابْنَ الْخَطَّابِ؟ لَقَدْ جِئْتُكُمْ بِهَا بَيْضَاءَ نَقِيَّةً، لَوْ كَانَ مُوسَى حَيًّا مَا وَسِعَهُ إِلَّا اتِّبَاعِي»
“হে ইবনুল খাত্তাব! তুমি কি সন্দেহে পড়ে গেছ? আমি তোমাদের কাছে একটি পরিষ্কার ও নির্ভেজাল দ্বীন নিয়ে এসেছি। মুসা (আলাইহিস সালাম) যদি আজ জীবিত থাকতেন তাহলে তাঁর জন্যও আমার অনুসরণ করা ছাড়া কোনও উপায় থাকত না।”
মোটকথা হল, একজন মুসলিমের জন্য তাওরাত, ইনজিল বা অন্য কোনও ধর্মগ্রন্থ পড়া উচিত নয়—তবে যাদের প্রয়োজন আছে তারা ব্যতিক্রম। যেমন: এমন আলেমগণ, যারা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের তাদের নিজেদের কিতাব থেকেই জবাব দিতে চান। এ ধরনের প্রয়োজনে, যে আলেম তাদের ভুল-ভ্রান্তি খণ্ডন করতে চান এবং তাদের কিতাব থেকেই দলিল দিতে চান, তাঁর জন্য প্রয়োজনের সময় এটি পড়তে কোনও অসুবিধা নেই — তবে এটি কেবল ইলম ও দূরদর্শিতা সম্পন্ন আলেমদের জন্য।” (শাইখ বিন বায রহ.) [binbaz org]
✪ হাফেজ ইবনে হাজার রহ. বলেন,
بِخِلَافِ الرَّاسِخِ؛ فَيَجُوزُ لَهُ النَّظَرُ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ، وَلَا سِيَّمَا عِنْدَ الِاحْتِيَاجِ إِلَى الرَّدِّ عَلَى الْمُخَالِفِ، وَيَدُلُّ عَلَى ذَلِكَ نَقْلُ الْأَئِمَّةِ قَدِيمًا وَحَدِيثًا مِنَ التَّوْرَاةِ، وَإِلْزَامُهُمُ الْيَهُودَ بِالتَّصْدِيقِ بِمُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَا يَسْتَخْرِجُونَهُ مِنْ كِتَابِهِمْ، وَلَوْلَا اعْتِقَادُهُمْ جَوَازَ النَّظَرِ فِيهِ، لَمَا فَعَلُوهُ وَتَوَارَدُوا عَلَيْهِ.
“তবে যার জ্ঞান সুগভীর, তার জন্য তাওরাত ও ইঞ্জিল পাঠ করা জায়েজ। বিশেষ করে যখন বিরোধীদের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ইমামগণের তাওরাত থেকে উদ্ধৃতি প্রদান এবং ইহুদিদের কিতাব থেকেই প্রমাণ বের করে তাদেরকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়তের সত্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করা—এ বিষয়টিকেই প্রমাণ করে। তারা যদি এটি দেখা বা পাঠ করাকে জায়েজ মনে না করতেন। তবে তারা এমনটি করতেন না এবং এ ব্যাপারে একমত হতেন না।” [ফাতহুল বারী: ১৩/৫২৫-৫২৬]
✪ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন,
وَإِذَا حَصَلَ مِنْ مَسْلَمَةِ أَهْلِ الْكِتَابِ، الَّذِينَ عَلِمُوا مَا عِنْدَهُمْ بِلُغَتِهِمْ، وَتَرْجَمُوا لَنَا بِالْعَرَبِيَّةِ: انْتُفِعَ بِذَلِكَ فِي مُنَاظَرَتِهِمْ وَمُخَاطَبَتِهِمْ، كَمَا كَانَ عَبْدُ اللهِ بْنُ سَلَامٍ، وَسَلْمَانُ الْفَارِسِيُّ، وَكَعْبُ الْأَحْبَارِ، وَغَيْرُهُمْ، يُحَدِّثُونَ بِمَا عِنْدَهُمْ مِنَ الْعِلْمِ، وَحِينَئِذٍ يُسْتَشْهَدُ بِمَا عِنْدَهُمْ عَلَى مُوَافَقَةِ مَا جَاءَ بِهِ الرَّسُولُ، وَيَكُونُ حُجَّةً عَلَيْهِمْ مِنْ وَجْهٍ، وَعَلَى غَيْرِهِمْ مِنْ وَجْهٍ آخَرَ، كَمَا بَيَّنَّاهُ فِي مَوْضِعِهِ.
“আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং নিজেদের ভাষায় তাদের কিতাব সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন তারা যখন আমাদের জন্য আরবিতে অনুবাদ করে দেন তখন তাদের সাথে বিতর্ক ও আলোচনায় তা থেকে উপকার গ্রহণ করা যায়। যেমন: আব্দুল্লাহ বিন সালাম, সালমান ফারসি, কাব আল আহবার (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এবং অন্যান্যরা তাদের কাছে থাকা জ্ঞান থেকে বর্ণনা করতেন। এমতাবস্থায় রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা নিয়ে এসেছেন তার সত্যতার সপক্ষে তাদের কিতাবের উদ্ধৃতি সাক্ষ্য হিসেবে পেশ করা যায়। এটি একদিকে যেমন তাদের বিরুদ্ধে দলিল, তেমনি অন্য দিক থেকে অন্যদের জন্যও দলিল হিসেবে গণ্য হয় যা আমরা সংশ্লিষ্ট স্থানে বিস্তারিত বর্ণনা করেছি।” [মাজমুউল ফাতাওয়া: ৪/১০৯-১১০]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate