Wednesday, May 8, 2024

দুর্বল ঈমান: লক্ষণ, কারণ ও প্রতিকার!

দুর্বল ঈমান: লক্ষণ, কারণ ও প্রতিকার!

উস্তাদ হাশিম হাদ্দাদ

একজন মানুষের জন্য তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান সম্পদ হচ্ছে ঈমান, আর এই ঈমান কখনো মজবুত থাকে আবার কখনো দূর্বল হয়ে যায়।

রাসূল (সঃ) কে মজবুত ঈমান সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেনঃ

“তুমি বলো আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি অতঃপর তার ওপর অবিচল থাক।”

অর্থাৎ ঈমানের হক আদায় করে তার ওপর অটল থাক। সৎ কর্মের মাধ্যমে ঈমান মজবুত হয় আর অসৎ কর্মের মাধ্যমে ঈমান দুর্বল হয়।

অতএব আমাদের ঈমান মজবুত করা খুবই জরুরী যার বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে আমরা সামনে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

আমরা এই লেখাটিকে ৪ভাগে বিভক্ত করেছি আল্লাহর সাহায্যে।

যথাঃ
১. দূর্বল ঈমানের লক্ষণ সমূহঃ
২. ঈমান দূর্বল হওয়ার কারণ সমূহঃ
৩. ঈমান উন্নতির পথে প্রতিবন্ধক বিষয় সমূহঃ
৪. ঈমান মজবুতির উপায় সমূহ বা প্রতিকারঃ

(১) দুর্বল ঈমানের লক্ষন সমূহঃ

আত্ম-সচেতনতার জন্য দুর্বল ঈমানের লক্ষনগুলো ভালোভাবে জেনে রাখা আবশ্যক; দুর্বল ঈমানের কিছু লক্ষন হলঃ

১. পাপ করা সত্ত্বেও মনে পাপবোধ সৃষ্টি না হওয়া, যার ফলে এক সময় অন্তর পাষাণ্ড হয়ে যায়।

আর অনেক সময় মানুষ বিভিন্ন পাপকর্মে এতটাই মগ্ন হয়ে যায় যে, তার বুদ্ধিশুদ্ধি সহ পাপের হাতে বন্দী হয়ে যায়, সে ঢাকা পড়ে পাপের আবরণে ফলে কোন ওয়াজ-নসিহত ইত্যাদী তার কোন কাজে আসেনা এবং তার মাঝে কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে না, একটা সময় তার মৃত্যু এসে যায় সেই সময় কেউ যদি তাকে বারবার কালিমা পড়াতে চায় তখন সে ওটা শুনতে পায় না এবং বুঝতেও পারে না তার মর্ম, এভাবে তার শেষ পরিনতি হয় খুবই মন্দ।

আল্লাহ তালা বলেনঃ

ثُمَّ قَسَتۡ قُلُوۡبُكُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِكَ فَهِیَ كَالۡحِجَارَةِ اَوۡ اَشَدُّ قَسۡوَةً

অনুবাদঃ “অতঃপর এ ঘটনার পরে তোমাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেছে, তা পাথরের মত অথবা তদপেক্ষাও কঠিন”। (সূরাঃ বাকারা, আয়াতঃ ৭৪)

২. ইবাদাতে আলসতা ও অবহেলা বোধ করা বা ঢিলেমি করা এবং ইবাদতে মনযোগ না থাকা।

যেমনঃ কোরআন তেলাওয়াত না করা, নির্ধারিত সময়ে সলাত আদায় না করা বা করলেও তাতে কোন মজা না পওয়া ইত্যাদি।

আল্লাহ তালা মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেনঃ

وَ اِذَا قَامُوۡۤا اِلَی الصَّلٰوةِ قَامُوۡا كُسَالٰی

অনুবাদঃ “তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন দাঁড়ায়, একান্ত শিথিল ভাবে ও আলসেমি ভাব নিয়ে (সূরাঃ নিসা, আয়াতঃ ১৪২)

৩. খামখেয়ালী মেজাজ।

যেমনঃ সামান্য বিষয়েই তুলকালাম করে ফেলা বা মেজাজ সবসময় তিরিক্ষে বা খিটমিটে হয়ে থাকা।

৪. কুরআনের তেলাওয়াত শুনে বিশেষ করে পাপের জন্য শাস্তি কিংবা সৎকাজের জন্য পুরুস্কারের কথা বলা হয়েছে এমন আয়াতগুলো শুনেও হৃদয়ে  কোন রকমের কোন প্রভাব বা অনুভূতির তৈরি না হওয়া।

৫. আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের স্মরণ থেকে বিমুখ হওয়া এবং তাঁকে স্মরণ করা কঠিন মনে হওয়া।

৬. শারীয়াহ্‌ বিরুদ্ধ কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়ার পরও মনে কোন অনুশোচনা বা অনুতাপ বোধ না হওয়া।

৭. ধন-সম্পদ, সন্তানাদি, প্রভাব-প্রতিপত্তি, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি এসব কিছুর পিছনেই সারাক্ষন ছুটে চলা এবং এগুলো নিয়ে পরস্পরে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠা।

আল্লাহ তালা বলেনঃ

اِعۡلَمُوۡۤا اَنَّمَا الۡحَیٰوةُ الدُّنۡیَا لَعِبٌ وَّ لَهۡوٌ وَّ زِیۡنَةٌ وَّ تَفَاخُرٌۢ بَیۡنَكُمۡ وَ تَكَاثُرٌ فِی الۡاَمۡوَالِ وَ الۡاَوۡلَادِ ؕ كَمَثَلِ غَیۡثٍ اَعۡجَبَ الۡكُفَّارَ نَبَاتُهٗ ثُمَّ یَهِیۡجُ فَتَرٰىهُ مُصۡفَرًّا ثُمَّ یَكُوۡنُ حُطَامًا ؕ وَ فِی الۡاٰخِرَةِ عَذَابٌ شَدِیۡدٌ ۙ وَّ مَغۡفِرَةٌ مِّنَ اللّٰهِ وَ رِضۡوَانٌ ؕ وَ مَا الۡحَیٰوةُ الدُّنۡیَاۤ اِلَّا مَتَاعُ الۡغُرُوۡرِ.

অনুবাদঃ তোমরা জেনে রাখ, পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক, সাজ-সজ্জা, পারস্পরিক অহমিকা এবং ধন ও জনের প্রাচুর্য ব্যতীত আর কিছু নয়, যেমন এক বৃষ্টির অবস্থা, যার সবুজ ফসল কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, এরপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তাকে পীতবর্ণ দেখতে পাও, এরপর তা খড়কুটা হয়ে যায়। আর পরকালে আছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন প্রতারণার উপকরণ বৈ কিছু নয়।
(সূরাঃ হাদীদ, আয়াতঃ ২০)

তিনি আরও বলেনঃ

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّ مِنۡ اَزۡوَاجِكُمۡ وَ اَوۡلَادِكُمۡ عَدُوًّا لَّكُمۡ فَاحۡذَرُوۡهُمۡ

অনুবাদঃ হে মুমিনগণ, তোমাদের কোন কোন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের দুশমন। অতএব তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাক।
(সূরাঃ তাগাবুন, আয়াতঃ ১৪)

৮. ক্রমাগত মানসিক দৈন্যতার পাশাপাশি আর্থিক কৃপণতা বাড়তে থাকা, ধনসম্পদ আঁকড়ে ধরে রাখার প্রবনতা, উম্মাহ’র বিপদ-আপদে তাদের কল্যাণার্থে সাহায্য করার জন্য কোন প্রকারের অস্থিরতা তৈরী না হওয়া।

আল্লাহ তালা বলেনঃ

هٰۤاَنۡتُمۡ هٰۤؤُلَآءِ تُدۡعَوۡنَ لِتُنۡفِقُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ ۚ فَمِنۡكُمۡ مَّنۡ یَّبۡخَلُ ۚ وَ مَنۡ یَّبۡخَلۡ فَاِنَّمَا یَبۡخَلُ عَنۡ نَّفۡسِهٖ ؕ وَ اللّٰهُ الۡغَنِیُّ وَ اَنۡتُمُ الۡفُقَرَآءُ ۚ وَ اِنۡ تَتَوَلَّوۡا یَسۡتَبۡدِلۡ قَوۡمًا غَیۡرَكُمۡ ۙ ثُمَّ لَا یَكُوۡنُوۡۤا اَمۡثَالَكُمۡ.

অনুবাদঃ শুন, তোমরাই তো তারা, যাদেরকে আল্লাহর পথে ব্যয় করার আহবান জানানো হচ্ছে, অতঃপর তোমাদের কেউ কেউ কৃপণতা করছে। যারা কৃপণতা করছে, তারা নিজেদের প্রতিই কৃপণতা করছে। আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্থ। যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, এরপর তারা তোমাদের মত হবে না।
(সূরাঃ মুহাম্মদ, আয়াতঃ ৩৮)

৯. নিজে না করে অন্যকে ভাল কাজের আদেশ দেওয়া।

আল্লাহ তালা বলেনঃ

اَتَاۡمُرُوۡنَ النَّاسَ بِالۡبِرِّ وَ تَنۡسَوۡنَ اَنۡفُسَكُمۡ وَ اَنۡتُمۡ تَتۡلُوۡنَ الۡكِتٰبَ ؕ اَفَلَا تَعۡقِلُوۡنَ.

অনুবাদঃ “তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের নির্দেশ দাও আর নিজেরা নিজেদেরকে ভূলে যাও, অথচ তোমরা কিতাব পাঠ কর? তবুও কি তোমরা চিন্তা কর না? (সূরাঃ বাকারা, আয়াতঃ ৪৪)

১০. অন্যের অবনতি, ক্ষয়-ক্ষতি দেখে তাদের সাহায্যে এগিয়ে না যাওয়া বরং উল্টো মানসিক তৃপ্তি বোধ হওয়া।

১১. যেসব বিষয় মাকরুহ্‌ (অপছন্দনীয়) সেগুলোকে হালকা ভাবে নেওয়া, এবং সন্দেহপূর্ণ বিষয়গুলো থেকে দূরে না থাকা।

এদের উপমা দিতে গিয়ে রাসূল (সাঃ) এক রাখালের কথা বলেছেন যে, যার বকরিগুলো নিষিদ্ধ এলাকা কাছেই ছড়ায়, যার ফলে একসময় সেগুলো নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করে ফেলে। (বুখারী, মুসলিম)

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রঃ) বলেনঃ “মুমিনের কাছে তার গুনাহকে মনে হয় পাহাড়ের মতো, যা এক্ষুনি তার মাথায় ভেঙ্গে পড়বে, আর মুনাফিকের কাছে মনে হয় নাকের কাছে উড়া মাছির ন্যায়, যাকে সে হাতের এক ঝটকায় তাড়িয়ে দিবে” (ফতহুল বারী)

এরকমভাবে ছোটখাটো (ভালো) নেকির কাজগুলোকে গুরুত্ব না দেওয়া বা সেগুলোর দিকে ভ্রূক্ষেপ না করা, হোক না কাউকে পানি পান করানো বা কোন মুসলিম ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলা বা মসজিদ হতে ময়লা পরিস্কার করা।

এক ব্যাক্তি রাস্তায় একটি গাছের ঢাল পড়ে থাকতে দেখে বলল; আল্লাহর কসম! আমি এটা সরিয়ে দেব যাতে মুসলিমদের চলাফেরা করতে অসুবিধা না হয়, অতপর সে সেটা সরিয়ে দেয় এবং জান্নাতে প্রবেশ করে। (মুসলিম)

রাসুল (সঃ) বলেনঃ মুসলমানদের পথ হতে একটি কষ্টদায়ক বস্তু যে সরিয়ে দিবে তার জন্য একটি “হাসানাহ” বা পুণ্য লেখা হবে, আর যার একটি হাসানাহ কবুল হয়ে যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (আদাবুল মুফরাদঃ ৫৯৩)

১২. বিপদে ধৈর্য ধারন করতে না পারা, বিপদ-আপদ আসলে আতঙ্কে উদভ্রান্ত হয়ে পড়া, এটি দুর্বল ঈমানের ফলাফল কারণ, আল্লাহর উপর তার তাওয়াক্কুল নেই। যেমনঃ কেউ মারা গেলে উচ্চস্বরে বিলাপ করে, বুক চাপড়িয়ে কান্নাকাটি করা ইত্যাদি।

আল্লাহ তালা বলেনঃ

قُلۡ لَّنۡ یُّصِیۡبَنَاۤ اِلَّا مَا كَتَبَ اللّٰهُ لَنَا ۚ هُوَ مَوۡلٰىنَا ۚ وَ عَلَی اللّٰهِ فَلۡیَتَوَكَّلِ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ.

অনুবাদঃ আপনি বলুন! আমাদের কাছে কিছুই পৌঁছবে না, কিন্তু যা আল্লাহ আমাদের জন্য লিখেছেন (তা’ই পৌছবে); তিনি আমাদের কার্যনির্বাহক, আল্লাহর উপরই মুমিনদের ভরসা
করা উচিত। (সূরাঃ তাওবাহ, আয়াতঃ ৫১)

১৩. দুনিয়ার মোহে অন্ধ হয়ে যাওয়া। দুনিয়ার মোহে অন্ধ হওয়ার একটি লক্ষন হল পার্থিব কোন কিছুর ক্ষতি হলেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়া।

১৪. সবসময় নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকা। নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই শুধু বেঁচে থাকা। চরম আত্ন-কেন্দ্রিক জীবন যাপন করা।

(২) যে সকল কারণে ঈমান দুর্বল হয়ে যায়ঃ

ঈমানের দুর্বলতা হলো বর্তমানে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি রোগ। যার কারণে প্রায়ই মানুষকে নালিশ করতে শোনা যায় ‘আমার অন্তর কঠিন হয়ে গেছে,’ ‘আমি ইবাদতে কোনো প্রশান্তি পাই না,’ ‘আমার ঈমান যেন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে,’ ‘কুরআন তিলাওয়াত আমার অন্তর বিগলিত করে না,’, ‘আমি সহজেই গুনাহে জড়িয়ে পড়ি’ ইত্যাদি।

অন্তর বা হৃদয়কে আরবিতে বলা হয় ক্বল্ব্। তাক্বাল্লুব অর্থ হলো পরিবর্তন, বৈচিত্র্য, ওঠানামা। তাক্বাল্লুব থেকেই কলব নামটি এসেছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “কলব হলো গাছের গোড়ায় পড়ে থাকা পাতার মতো, যা বাতাসে বারবার ওলটপালট হয়।” (আহমাদ ৪/৪০৮)

আনাস বিন মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পর্যাপ্ত পরিমাণে বলতেন : “হে আল্লাহ্‌! আমার অন্তরকে তোমার দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখো।” এক ব্যক্তি বলেন, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আমাদের ব্যাপারে আশংকা করেন? আমরা তো আপনার উপর ঈমান এনেছি এবং আপনি যা নিয়ে এসেছেন সেই বিষয়ে আমরা আপনাকে সত্যবাদী বলে স্বীকার করে নিয়েছি। তিনি বলেন, “অন্তরসমূহ মহামহিমান্বিত করুণাময়ের দু’ আঙ্গুলের মাঝে অবস্থিত। তিনি সেগুলোকে ওলট-পালট করেন।” (ইবনে মাজাহ, ৩৮৩৪)

নিন্মে ঈমান দূর্বল হয়ে যাওয়ার কিছু কারণ বর্ণনা করা হচ্ছেঃ

১. ঈমানী পরিবেশ হতে দূরে থাকে এবং জিকিরের মজলিস ও সালেহীনদের মজলিস হতে দূরে থাকা এবং জামাতের সহিত নামাজ আদায় করা হতে বিরত থাকা।

হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “আমাদের (দ্বীনি) ভাইয়েরা আমাদের নিকট নিজ পরিবার পরিজন হতে অধিক উত্তম, কেননা আমাদের পরিবার- পরিজন আমাদেরকে দুনিয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় আর আমাদের (দ্বীনি) ভাইয়েরা আমাদেরকে আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়”

২. সৎ অবিভাবক বা রাহবাদের অবিদ্যমানতা।

তাই সাহাবায়ে কেরাম (রাযিঃ) রাসুল (সঃ)কে কবরে রাখার পর দুনিয়াতে তিনার (যুগ্য সৎ রাহবারের) শূন্যতা অনুভব করেছিলেন।

৩. ফাসেক-ফুজ্জার (পাপাচারী)দের সঙ্গ দেওয়া।

এটি ঈমান দুর্বল হওয়ার অন্যতম একটি কারণ,
তাই এক ফার্সি কবি এটিকে খুব সুন্দরভাবে কবিতার ভাষায় এরূপ ব্যাক্ত করেছেনঃ

صحبت صالح ترا صالح کند+صحبت طالح ترا کند

অর্থাৎ সৎলোকের সান্নিধ্য তোমাকে সৎ বানিয়ে দিবে, আর অসৎ লোকের সান্নিধ্যে তোমাকে মন্দ বানিয়ে দিবে।

৪. দুনিয়াবী বিষয়ে গভীর ভাবে নিমগ্ন হওয়া (ডুবে যাওয়া), আর দুনিয়ার প্রতি অশক্ত হওয়া ও আখেরাত হতে বিমুখ হওয়া শেষ পরিণতি মন্দ হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ যেই শেষ পরিণতির উপর আমল সমূহ নির্ভর করে।

রাসূল (সাঃ) এই বিষয়টির গুরুতর নিন্দা করেছেন এবং এমন ব্যক্তিদেরকে দিনারের গোলাম বলে গণ্য করেছেন,

তিনি বলেনঃ “ধ্বংস হোক দেরহামরের গোলামরা, ধ্বংস হোক দিনারের গোলামরা। (বুখারী)

৫. পরিবার, সন্তান-সন্তানাদি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে আল্লাহর আনুগত্য হতে বিরত থাকা।

আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

اِنَّمَاۤ اَمۡوَالُكُمۡ وَ اَوۡلَادُكُمۡ فِتۡنَةٌ ؕ وَ اللّٰهُ عِنۡدَهٗۤ اَجۡرٌ عَظِیۡمٌ.

অনুবাদঃ “তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষাস্বরূপ। আর আল্লাহর কাছে রয়েছে মহাপুরস্কার। (সূরাঃ তাগাবুন, আয়াতঃ ১৫)

৬. খুব দীর্ঘ আশা রাখা (দুনিয়া ভোগের জন্য)।

ذَرۡهُمۡ یَاۡكُلُوۡا وَ یَتَمَتَّعُوۡا وَ یُلۡهِهِمُ الۡاَمَلُ فَسَوۡفَ یَعۡلَمُوۡنَ.

অনুবাদঃ “আপনি ছেড়ে দিন তাদেরকে, খেয়ে নিক এবং ভোগ করে নিক এবং আশায় ব্যাপৃত থাকুক। অতি সত্বর তারা জেনে নেবে”। (সূরাঃ হিজর, আয়াতঃ ৩)

হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ “আমি তোমাদের ব্যাপারে দুটি জিনিসকে অধিক ভয় করি, এক. প্রবৃত্তির অনুসরণ। দুই. দীর্ঘ আসা, কেননা, প্রবৃত্তির অনুসরণ হক থেকে বাধা প্রদান করে, আর দীর্ঘ আশা আখেরাতকে ভুলিয়ে দেয়।

৭. অধিকহারে পানাহার করা এবং অধিক ঘুমানো ও কথাবার্তা বলা, আখেরাত হতে গাফেল করে দেয়।

৮. খুবই স্বল্প ইলম বা জ্ঞান অন্বেষণ করা।

আল্লাহ তালা বলেনঃ

قُلۡ هَلۡ یَسۡتَوِی الَّذِیۡنَ یَعۡلَمُوۡنَ وَ الَّذِیۡنَ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ؕ

অনুবাদঃ “বলুন! যারা জানে (আলেম) এবং যারা জানে (আলেম) না; তারা কি সমান হতে পারে”। (সূরাঃ যুমার, আয়াতঃ ৯)

এক কথায় বলতে গেলে ঈমান মজবুত হওয়ার যে সকল কারণ বা উপায়সমূহ রয়েছে ঐ সকল কারণসমূহের প্রতি যত্নবান না হওয়া।

(৩) চারটি জিনিস ঈমান উন্নতির পথে প্রতিবন্ধকঃ

১. অহংকার বা দাম্ভিকতা, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য হতে বিরত রাখে।

২. হিংসা, যা নাসিহা বা উপদেশ গ্রহণ করা হতে বিরত রাখে।

৩. ক্রোধ, যা ইনসাফ ও বিনয়ী হওয়া থেকে বিরত রাখে

৪. প্রবৃত্তি, যা এবাদত এর উপর ধৈর্য ধারনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক।

তাই এই চারটি ব্যাধী হতে আগে নিজেকে মুক্ত করতে হবে তারপর (নিম্নে আগত ৪র্থ ভাগের ) ১৫ টি টিপস গ্রহণ করতে হবে, তাহলে আশা করা যায় দূর্বল ঈমানের প্রতিকার করা ও ঈমানকে মজবুত করা সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ।

(৪) ঈমান মজবুত করার উপায় বা প্রতিকার সমূহঃ

ঈমান মজবুত করার অনেক উপায় রয়েছে তবে এই লেখায় আমরা গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপায় নিয়ে আলোচনা করব যা ঈমানকে মজবুত করতে সহায়তা করবে ইনশাআল্লাহ, এসব উপায়গুলো দৈনন্দিন অভ্যাস এর সাথে সংযুক্ত বা জড়িত বাকি সব কথার অন্যতম একটি কথা হলো ঈমান মজবুত রাখার জন্য সব সময় খোলা থাকে বেঁচে থাকা জরুরি।

১. গভীর চিন্তা ভাবনার শহিত অধিক পরিমাণে কোরআন তেলাওয়াত করা।

আল-কুরআনের- আখেরাত, জান্নাত, জাহান্নাম, আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্বলিত -আয়াত সমূহ নিয়ে চিন্তা গবেষণা করা, নবী- রাসূল ও তাদের উম্মতদের মহান মহান কাহিনী সম্বলিত আয়াত সমূহ মনযোগ দিয়ে পাঠ করা। কারণ, তাতে আমাদের জন্য নিদর্শন রয়েছেঃ

আল্লাহ তালা বলেনঃ

لَقَدۡ كَانَ فِیۡ قَصَصِهِمۡ عِبۡرَةٌ لِّاُولِی الۡاَلۡبَابِ

অনুবাদঃ তাদের কাহিনীতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়।
(সূরাঃ ইউসূফ, আয়াতঃ ১১১)

আর তেলাওয়াত এবং চিন্তা-গবেষণা উভয়টি দুর্বল ঈমানের কার্যকরী ও উত্তম চিকিৎসা।

আল্লাহ তালা বলেনঃ

وَ اِذَا تُلِیَتۡ عَلَیۡهِمۡ اٰیٰتُهٗ زَادَتۡهُمۡ اِیۡمَانًا وَّ عَلٰی رَبِّهِمۡ یَتَوَكَّلُوۡنَ.

অনুবাদঃ আর যখন তাদের সামনে আল্লাহর কালাম পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় পরওয়ার দেগারের প্রতি ভরসা পোষণ করে। (সূরাঃ আনফাল, আয়াতঃ ২)

২. আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত ফরজ ও ওয়াজিব সমূহ যথাযথভাবে পালন করা এবং সাথে সাথে নফল সমূহের প্রতিও যত্নবান হওয়া।

কেননা, তা (নফল) আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হাদীসে এসেছেঃ “ফরজ ওয়াজিব এর মধ্যে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি হয় সুন্নত ও নফল এর মাধ্যমে তা পূরণ করে দেওয়া হয়”। (তিরমিজি)

৩. হাদিস অধ্যায়নের প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং সাহাবায়ে কেরাম ও স্বর্ণযুগের লোকদের চরিত্র ও আমল সম্পর্কে জেনে সে অনুযায়ী নিজের চরিত্র গঠন করা।

আল্লাহ তালা বলেনঃ

لَقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِیۡهِمۡ اُسۡوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَنۡ كَانَ یَرۡجُوا اللّٰهَ وَ الۡیَوۡمَ الۡاٰخِرَ ؕ وَ مَنۡ یَّتَوَلَّ فَاِنَّ اللّٰهَ هُوَ الۡغَنِیُّ الۡحَمِیۡدُ.

তোমরা যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা কর, তোমাদের জন্য তাদের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। আর যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জানা উচিত যে, আল্লাহ বেপরওয়া, প্রশংসার মালিক।
(সূরাঃ মুমতাহিনা, আয়াতঃ ৬)

৪. সর্বাবস্থায় অধিক পরিমাণে আল্লাহর (সকল প্রকারের) জিকিরে নিমগ্ন থাকা।

কেননা, জিকির হলো ইবাদতের রুহ, এবং আল্লাহ তালার আনুগত্য ও ইবাদতের প্রতি মনোযোগ দেয়া।

আল্লাহ তালা বলেনঃ

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ تَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُهُمۡ بِذِكۡرِ اللّٰهِ ؕ اَلَا بِذِكۡرِ اللّٰهِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ.

অনুবাদঃ যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর যিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে; জেনে রাখ, আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তর সমূহ শান্তি পায়। (সূরাঃ রা’দ, আয়াতঃ ২৮)

৫. হাঁটাচলা- সর্বাবস্থায় নিজের উপর আল্লাহর নেয়ামত-রাজি উপলব্ধি করা এবং তিনার সকল সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করা এবং সাথে সাথে তার প্রশংসা জ্ঞাপন করা।

الَّذِیۡنَ یَذۡكُرُوۡنَ اللّٰهَ قِیٰمًا وَّ قُعُوۡدًا وَّ عَلٰی جُنُوۡبِهِمۡ وَ یَتَفَكَّرُوۡنَ فِیۡ خَلۡقِ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ۚ رَبَّنَا مَا خَلَقۡتَ هٰذَا بَاطِلًا ۚ سُبۡحٰنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.

اِنَّ فِیۡ خَلۡقِ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ وَ اخۡتِلَافِ الَّیۡلِ وَ النَّهَارِ لَاٰیٰتٍ لِّاُولِی الۡاَلۡبَابِ.

অনুবাদঃ যাঁরা দাঁড়িয়ে, বসে, ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা গবেষণা করে আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষযে, (তারা বলে) পরওয়ারদেগার! এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি। সকল পবিত্রতা তোমারই, আমাদিগকে তুমি দোযখের শাস্তি থেকে বাঁচাও।

অনুবাদঃ নিশ্চয় আসমান ও যমীন সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিনের আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে বোধ সম্পন্ন লোকদের জন্যে। (সূরাঃ আল ইমরান, আয়াতঃ১৯০-১৯১)

বলা হয়ে থাকে যে, “মালুমাত” তথা জানা বিষয়ের মাঝে ফিকির করার দ্বারা ইলম বাড়ে আর “মাখলিক্বাত” তথা সৃষ্টি নিয়ে ফিকির করার দ্বারা ঈমান বাড়ে।

৬. শেষ রাত্রিতে —যখন হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে অবতরণ করেন —আল্লাহর সামনে দন্ডায়মান ও মুনাজাত করার জন্য নির্জনতা অবলম্বন করা।

وَ مِنَ الَّیۡلِ فَتَهَجَّدۡ بِهٖ نَافِلَةً لَّكَ ٭ۖ عَسٰۤی اَنۡ یَّبۡعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحۡمُوۡدًا.

অনুবাদঃ রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করুন, এটি আপনার জন্যে অতিরিক্ত কর্তব্য। হয়ত বা আপনার পালনকর্তা আপনাকে মোকামে মাহমুদে পৌঁছাবেন।
(সূরাঃ বনী ইসরাঈল, আয়াতঃ ৭৯)

৭. আল্লাহ ওয়ালা ও সাদেকিন (যারা সর্বদা নির্ভয়ে নির্দ্বিধায় আল্লাহর সকল আদেশ-নিষেধ পালন করে নিজেকে সত্যবাদী প্রমাণ করে) ‘দের সংস্পর্শে যাওয়া এবং তাদের সাথে উঠাবসা করা এবং তাদের ইলম ও আখলাক হতে উপকৃত হওয়া, এবং যারা আবেদ, যাহেদ, আমলী উলামা রয়েছেন তাদের বিভিন্ন প্রবন্ধ পাঠ করা।

আল্লাহ তালা বলেনঃ

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ وَ كُوۡنُوۡا مَعَ الصّٰدِقِیۡنَ.

অনুবাদঃ হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক। (সূরাঃ তাওবাহ, আয়াতঃ ১১৯)

৭. প্রত্যেক ঐসকল হেতু বা কারণ যা মানুষের ক্বলব ও আল্লাহর মাঝে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে সেগুলোর হতে দূরে থাকা।

তন্মধ্যে একটি হলো (যেটি কোরআনে এসেছে) যে, জিহাদ ফরজ অবস্থায় তা বাস্তবায়নের সুযোগ ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও জিহাদে শরীক না হওয়া এবং জিহান হতে দূরে বসে থাকা, ফলে আল্লাহ তাআলা তার মাঝে এমন প্রতিবন্ধকতা বা পর্দা তৈরি করে দিবেন যে, আর জিহাদ করার মত তার তৌফিক ঝুটবেনা। (নাউযুবিল্লাহ)

আর এটি শুধু জিহাদের সাথেই খাস নয় বরং সকল ইবাদতের ক্ষেত্রেই (এই হুমকি) প্রযোজ্য।

আল্লাহ তালা বলেনঃ

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اسۡتَجِیۡبُوۡا لِلّٰهِ وَ لِلرَّسُوۡلِ اِذَا دَعَاكُمۡ لِمَا یُحۡیِیۡكُمۡ ۚ وَ اعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰهَ یَحُوۡلُ بَیۡنَ الۡمَرۡءِ وَ قَلۡبِهٖ وَ اَنَّهٗۤ اِلَیۡهِ تُحۡشَرُوۡنَ.

অনুবাদঃ হে ঈমানদারগণ, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নির্দেশ মান্য কর, যখন তোমাদের সে কাজের প্রতি আহবান করা হয়, যাতে রয়েছে তোমাদের জীবন। জেনে রেখো, আল্লাহ মানুষের এবং তার অন্তরের মাঝে অন্তরায় হয়ে যান। বস্তুতঃ তোমরা সবাই তাঁরই নিকট সমবেত হবে। (সূরাঃ আনফাল, আয়াতঃ ২৪)

৮. নিজের আত্মা ও অভ্যন্তরিন অবস্থাকে সংশোধন করা।

কেননা সেসব লোকদের শেষ পরিণতি মন্দ হয় না যাদের প্রকাশ্য আমল ভালো হয় এবং অভ্যন্তরীন অবস্থা পরিশুদ্ধ হয়,

আর সর্বাবস্থায় মুসলমানদের’কে ভালোবাসা ও তাদের কল্যাণকামী হওয়া এবং মুসলিমদের মাঝে যারা বদকার রয়েছে তাদের হেদায়াতের জন্য দোয়া করা।

৯. মৃত্যুকে (অধিক পরিমাণে) স্মরণ করা যা আকস্মিকভাবে এসে পড়বে, এবং (সুন্নাহ ও আদব ঠিক রেখে) বেশি বেশি কবর যেয়ারত করা কারণ, এতে দিল নরম হয় এবং মৃত্যুর স্বরণ’কে বাড়িয়ে দেয়।

রাসূল (সঃ) বলেনঃ আমি তোমাদেরকে ইতিপূর্বে কবর যেয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম কিন্তু এখন তোমারা কবর যেয়ারত কর কেননা, কবর যেয়ারতে মৃত্যুর স্বরণ রয়েছে। (আবু দাউদ)

এবং প্রতিনিয়ত “মুহাসাবা” (আত্মসমালচনা) তথা নিজের হিসেব নিকেশ করা যে, “আমি কি আমল করলাম”? “মৃত্যুর জন্য কেমন প্রস্তুতি নিলাম”আখেরাতের জন্য কি প্রেরণ করলাম ইত্যাদি।

আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ وَ لۡتَنۡظُرۡ نَفۡسٌ مَّا قَدَّمَتۡ لِغَدٍ ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ.

অনুবাদঃ মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ তা’আলাকে ভয় কর। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামী কালের জন্যে সে কি প্রেরণ করে, তা চিন্তা করা। আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করতে থাক। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা’আলা সে সম্পর্কে খবর রাখেন।
(সূরাঃ হাশর, আয়াতঃ ১৮)

যেমন হযরত উমর (রঃ) বলেনঃ

حاسبوا أنفسكم قبل أن تحاسبوا

অর্থাৎ “আল্লাহ তোমার হিসাব নেয়ার পূর্বেই নিজের হিসাব নাও”।

“মুহাসাবা” এর বহু উপকারীতা রয়েছে; যথা- নিজের ভুল-ত্রুটি সংশোধন করা সম্ভব হয় এবং হায়াত শেষ হওয়ার পূর্বে পূর্বেই প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়, যথাযথ আখেরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করা সম্ভব হয়, পরিশেষে মৃত্যুর আগে আগে তওবা করার সুযোগ পাওয়া যায়, অতএব মুহাসাবা অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল।

১০. ইলমি হালাকা বা মজলিস সমূহে বসা এবং গুরুত্বপূর্ণ বয়ান, ওয়াজ-নাসিহা ইত্যাদি শ্রবণ করে সেগুলো থেকে উপকৃত হওয়া, যার ফলে অন্তর বিগলিত হবে, ঈমান মজবুত হবে এবং জরুরী ইলমও অর্জন হবে।

দ্বীনি মজলিসে বসার ফজিলতঃ

রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ‘আল্লাহর একদল ফেরেশতা রয়েছেন, যাঁরা আল্লাহর স্মরণে মগ্ন লোকেদের খুঁজে বের করতে (সারা ‍দুনিয়া) পরিভ্রমণ করে বেড়ান। যখন তাঁরা কোথাও আল্লাহর জিকিরে মগ্ন লোকেদের দেখতে পান, তখন ফেরেশতারা পরস্পরকে ডেকে বলেন-
‘তোমরা আপন আপন কাজ করার জন্য এগিয়ে এসো। তখন তাঁরা তাঁদের ডানাগুলো দিয়ে নিকটবর্তী আকাশ পর্যন্ত সেই লোকদের ঢেকে দেন।’

তখন তাঁদের প্রতিপালক তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন যদিও ফেরেশতাদের চেয়ে তিনিই অধিক জানেন-
مَا يَقُوْلُ عِبَادِيْ؟
‘আমার বান্দারা কি বলছে?’
তখন তাঁরা (ফেরেশতারা) বলেন- তারা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছে, আপনার শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দিচ্ছে। আপনার গুণগান করছে এবং আপনার মহত্ত্ব প্রকাশ করছে।

তখন তিনি (আল্লাহ) জিজ্ঞাসা করেন-
هَلْ رَأَوْنِي؟ ‘তারা কি আমাকে দেখেছে?
তখন তাঁরা (ফেরেশতারা) বলেন- ‘হে আমাদের রব! আপনার শপথ! তারা আপনাকে দেখেনি।

তিনি বলেন-
وَكَيْفَ لَوْ رَأَوْنِي؟
‘আচ্ছা, যদি তারা আমাকে দেখতো তাহলে কী করতো?
তাঁরা (ফেরেশতারা) বলেন-
‘যদি তারা আপনাকে দেখতো, তবে তারা আরও অধিক পরিমাণে আপনার ইবাদত করতো, আরো অধিক আপনার মাহাত্ম্য ঘোষণা করতো, আরো অধিক পরিমাণে আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করতো।’

বর্ণনাকারী বলেন, ‘আল্লাহ বলেন-
فَمَا يَسْأَلُونِيْ؟
‘তারা আমার কাছে কী চায়?
ফেরেশতারা বলেন-
তারা আপনার কাছে জান্নাত চায়।

তিনি জিজ্ঞাসা করবেন-
‘তারা কি জান্নাত দেখেছে?’
ফেরেশতারা বলেন-
‘না’, আপনার সত্তার কসম! হে আমাদের রব! তারা তা দেখেনি।’

তিনি (আল্লাহ) জিজ্ঞাসা করেন-
‘যদি তারা দেখতো তবে তারা কী করতো?’
তাঁরা (ফেরেশতা) বলেন-
‘যদি তারা তা (জান্নাত) দেখতো তাহলে জান্নাতের জন্য আরো অধিক লোভ করত, আরো বেশি কামনা করতো এবং জান্নাতের প্রতি আরও বেশি আকৃষ্ট হতো।’

তখন আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞাসা করেন-
‘তারা কী থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায়?’
ফেরেশতারা বলেন-
‘জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চায়।’

আল্লাহ জিজ্ঞাসা করেন-
‘তারা কি জাহান্নাম দেখেছে?’
তাঁরা জবাব দেন-
‘আল্লাহর কসম! হে আমাদের প্রতিপালক! তারা জাহান্নাম দেখেনি।

তিনি জিজ্ঞাসা করেন-
‘যদি তারা তা দেখতো তখন তাদের কী অবস্থা হতো?
তাঁরা বলেন-
যদি তারা তা (জাহান্নাম) দেখতো তাহলে তারা তা থেকে দ্রুত পালিয়ে যেতো এবং একে সবচেয়ে বেশি ভয় করতো।

তখন আল্লাহ বলেন-
فَأُشْهِدُكُمْ أَنِّيْ قَدْ غَفَرْتُ لَهُمْ

‘আমি তোমাদের সাক্ষী রাখছি, আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম।’
তখন ফেরেশতাদের একজন বলেন-
তাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি আছে, যে তাদের অন্তর্ভুক্ত নয় বরং সে কোনো প্রয়োজনে এসেছে।
তখন আল্লাহ তাআলা বলেন-
তারা এমন উপবেশনকারী; যাদের মজলিসে (কোনো) উপবেশনকারীই বিমুখ হয় না।’ (বুখারি)

১১. (সকল প্রকার) গুনাহের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকা এবং তাতে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকা, এবং আল্লাহকে ভয় করা, এটি দুর্বল ঈমানের চিকিৎসা হিসেবে অনেক উপকারী পদক্ষেপ।

وَ مَنۡ یُّطِعِ اللّٰهَ وَ رَسُوۡلَهٗ وَ یَخۡشَ اللّٰهَ وَ یَتَّقۡهِ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الۡفَآئِزُوۡنَ.

অনুবাদঃ যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর শাস্তি থেকে বেঁচে থাকে তারাই কৃতকার্য। (সূরাঃ নূর আয়াতঃ ৫২)

১২. আল্লাহর মহত্ত্বকে উপলব্ধি করা এবং তিনার তাওহিদ বা একত্ববাদকে জানা এবং তিনার সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করা।

আল্লাহ তালা বলেনঃ

فَاعۡلَمۡ اَنَّهٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللّٰهُ

অনুবাদঃ জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। (সূরাঃ মুহাম্মদ, আয়াতঃ ১৯)

উপরুক্ত আয়াতে আল্লাহর তাওহীদের ইলম অর্জন করার জন্য আদেশ দেয়া হয়েছে..

আর অন্তরের সাথে সম্পর্কিত আমল সমূহ যেমন; ভয়, আসা, মুহাব্বত, তাওয়াক্কুল, সু-ধারণা, বিশ্বাস, রিযা বিল ক্বাযা (আল্লাহর ফয়সালার উপর সন্তুষ্টি), শুকর, সত্যবাদিতা, তওবা, (সকল ইবাদতে) একনিষ্ঠতা, খুশু-খুযু, দোয়া, বশ্যতা ও আত্মসমর্পণ ইত্যাদিকে একমাত্র আল্লাহর জন্য করা, তার সাথে অন্য কাউকে শরিক না করা। আল্লাহ তালা বলেনঃ

وَ مَاۤ اُمِرُوۡۤا اِلَّا لِیَعۡبُدُوا اللّٰهَ مُخۡلِصِیۡنَ لَهُ الدِّیۡنَ ۬ۙ حُنَفَآءَ وَ یُقِیۡمُوا الصَّلٰوةَ وَ یُؤۡتُوا الزَّكٰوةَ وَ ذٰلِكَ دِیۡنُ الۡقَیِّمَةِ.

অনুবাদঃ তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর এবাদত করবে, নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। এটাই সঠিক ধর্ম। (সূরাঃ বাইয়্যিনাহ, আয়াতঃ ৫)

১৩. জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ তথা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। এর মাধ্যমে আত্মার পরিশুদ্ধি হয় যেমন; আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

سَیَهۡدِیۡهِمۡ وَ یُصۡلِحُ بَالَهُمۡ.

অনুবাদঃ তিনি তাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করবেন (দুনিয়া ও আখেরাতে) এবং তাদের (বাহ্যিক ও অন্তরের) অবস্থা ভাল করবেন।
(সূরাঃ মুহাম্মদ, আয়াতঃ ৫)

তাছাড়া জিহাদের ময়দানে এমন অগণিত অলৌকিক ঘটনা বা কারামত প্রকাশ পায় যার দ্বারা ঈমান তাজা ও মজবুত হয়, এমনকি একজন কাফির যদি জিহাদের ময়দানের অবস্থা সরাসরি প্রত্যক্ষ করে, তাহলে (এসব কারামাত দেখে) সে আল্লাহর উপর ঈমান আনতে মানতে বাধ্য হবে।

১৪. এই সবগুলোর সাথে সাথে (এবং সেগুলোর উপর অটল থাকার জন্য) আল্লাহর কাছে বিনয়ের সাথে, ভাংগা অন্তর নিয়ে দোয়া করা। রাসূল (সঃ) নিম্নোক্ত দোয়াটি অধিকহারে করতেন।

يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ.

অর্থাৎ “হে অন্তরকে পরিবর্তনকারী আল্লাহ! আমার অন্তরকে তোমার দ্বীনের ওপর অটল রাখ”। (আহমদ)

এরকম ভাবে নিজের ঈমানকে নবায়ন করার জন্যও আল্লাহর নিকট দোয়া করা।

মুস্তাদরাকে হাকেমে এসেছে, হযরত ইবনে ওমর (রাদিঃ) হতে বর্ণিত রাসূল (সাঃ) বলেনঃ

إن الإيمان ليخلق في جوف أحدكم كما يخلق الثوب. فاسألوا الله تعالى : أن يجدد الإيمان في قلوبكم.

অর্থাৎ নিশ্চয়ই তোমাদের সিনার (ভেতরের) ঈমান এমনভাবে পুরাতন (পঁচে) হয়ে যায় যেমনিভাবে কাপড় পুরাতন হয়ে যায়, তাই তোমাদের প্রত্যেকে আল্লাহর নিকট দোয়া করবে তিনি যেন তোমাদের অন্তরে ঈমদনকে নবায়ন (মজবুত) করে দেন।

তদ্রূপ সাহাবায়ে কেরাম (রাযিঃ) ‘দের ব্যাপারে এসেছে যে, তিনারা একত্রে বসতেন এবং (একে অপরকে ডেকে) বলতেন;

اجلس بنا نؤمن ساعة

অর্থাৎ ” আস! আমরা কিছুক্ষনের জন্য ঈমানকে আবার নবায়ন (তাজা,মজবুত) করি”

১৫. হাদীসে বর্ণিত ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করার তিনটি বিষয়ে খুবই গুরুত্ব দেওয়া।

রাসূল (সঃ) বলেনঃ

তিনটি গুণ যার মাঝে থাকবে সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে।
(১) আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূল (সঃ) যার নিকট অন্য সবকিছুর চেয়েও অধিক প্রিয় বা প্রাধান্য।

(২) যে ব্যাক্তি কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্য ভালোবাসা এবং আল্লাহ তালার জন্যই ঘৃণা করে।

(৩) কুফরীতে প্রবেশ করাকে যে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো অপছন্দ করে। (বুখারী)
এই তিন প্রকারের লোক নিজের ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারবে ইনশাআল্লাহ।

১৬. আল ওয়ালা ওয়াল বারা ঠিক রাখা।

আল ওয়ালা ওয়াল বারা (বন্ধুত্ব এবং শত্রুতা) এটি একটি হারানো আকিদা, এই আকিদাটি’র কথা মুসলমানরা প্রায় ভূলেই গেছে, তাই তাদের আজ এই দুরবস্থা,

অতএব এটার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি অর্থাৎ মুমিনদের সাথে বন্ধুত্ব রাখা চাই সে পৃথিবীর যে কোনো স্থানেই বসবাস করুক না কেন, আর কুফরের সাথে বিদ্বেষ রাখা কারণ, দ্বীনের শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব রাখলে ঈমান দুর্বল হয়ে পড়ে এমনকি একসময় ঈমান হারা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।

আল্লাহ তালা বলেনঃ

مُحَمَّدٌ رَّسُوۡلُ اللّٰهِ ؕ وَ الَّذِیۡنَ مَعَهٗۤ اَشِدَّآءُ عَلَی الۡكُفَّارِ رُحَمَآءُ بَیۡنَهُمۡ

অনুবাদঃ মুহাম্মদ আল্লাহর রসূল এবং তাঁর সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল।
(সূরাঃ ফাতহ, আয়াতঃ ২৯)

তিনি আরো বলেনঃ

اِنَّمَا وَلِیُّكُمُ اللّٰهُ وَ رَسُوۡلُهٗ وَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا الَّذِیۡنَ یُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوةَ وَ یُؤۡتُوۡنَ الزَّكٰوةَ وَ هُمۡ رٰكِعُوۡنَ.

অনুবাদঃ তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ তাঁর রসূল এবং মুমিনগণ-যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনম্র। (সূরাঃ মায়িদাহ, আয়াতঃ ৫৫)

রাসূল (সঃ) বলেনঃ যে কেউ আল্লাহ তা’আলার (সন্তুষ্টি) জন্য কাউকে ভালোবাসো এবং আল্লাহ তালার জন্যই কাউকে ঘৃণা করলো এবং আল্লাহর জন্যই কাউকে কিছু দান করে আবার আল্লাহর জন্যই কাউকে দান করা হতে বিরত থাকে -সে তার ঈমান পরিপূর্ণ করেছে। (আবু দাউদ)

পরিশে কথা হলো; ঈমানের মজবুতি এমন একটি বিষয় যেই ঈমানের মজবুতির উপর আল্লাহর সাহায্য ও সঙ্গ নির্ভর করে, তাই যার ঈমান যত বেশি মজবুত হবে, সে ততো বেশি আল্লাহর সাহায্য পাবে, আর বিপরীতে যে নিজের ঈমানের প্রতি যতটুকু গাফেল হবে এবং নিজের ঈমান বৃদ্ধি করার ফিকির ছেড়ে দেবে, তার থেকে আল্লাহর নুসরাত বা সাহায্য ততটুকু দূর হয়ে যাবে। অতএব এটি (আল্লাহর সাহায্য) ঈমানের সাথে জড়িত বিষয়।

তাই আমরা ঈমান মজবুতির জন্য আল্লাহ তায়ালার নিকট বেশি বেশি দোয়া করব এবং সাথে সাথে সকল প্রকারের বাহ্যিক প্রচেষ্টাও চালিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তালা সর্বপ্রথম আমি অধমকে অতঃপর সকল মুসলিম ভাই বোনদের’কে এসবের উপর আমল করার তাওফিক দান করুন, আমিন

Monday, May 6, 2024

প্রচণ্ড গরমের সময় নামাজ সংক্রান্ত ১০টি জরুরি মাসায়েল

 দেশব্যাপী স্মরণকালের ভয়াবহ দাবদাহ চলছে। প্রচণ্ড উত্তাপের কারণে মানুষ ও পশুপাখি অতিষ্ঠ। প্রখর সূর্যের কিরণ এবং লু হাওয়ায় জনজীবনের বেহালদশা। (আল্লাহ হেফাজত করুন।‌ আমিন)। এমতবস্থায় সালাত আদায় সম্পর্কে, বিশেষভাবে দ্বিপ্রহরের জোহর সালাত আদায় করার ব্যাপারে ইসলাম কী দিকনির্দেশনা দিয়েছে সেটি আমরা জানার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

নিম্নে এ সংক্রান্ত জরুরি কিছু মাসায়েল উল্লেখ করা হলো:

▪️১. হাদিসে কি প্রচণ্ড গরমের সময় কি বেশি করে নামাজ পড়তে বলা হয়েছে?
উত্তর: প্রচণ্ড গরমের সময় বেশি বেশি নামাজ পড়ার ব্যাপারে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা হাদিস ব্যাপকভাবে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, হাদিস গ্রন্থ সমূহে এমন কোনও হাদিস নেই। অন্য কোনও হাদিসের মমার্থ থেকেও তা প্রমাণিত হয় না। বরং কিছু মানুষ একটি হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এমনটি বলছে।
উক্ত হাদিসটি হলো, আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«إِذَا اشْتَدَّ الْحَرُّ فَأَبْرِدُوا بِالصَّلَاةِ, فَإِنَّ شِدَّةَ الْحَرِّ مِنْ فَيْحِ جَهَنَّمَ»
“যখন প্রচণ্ড গরম পড়ে তখন সালাতকে ঠাণ্ডা করবে। কেননা প্রচণ্ড গরম জাহান্নামের আগুনের নিঃশ্বাস থেকে আসে।” [বুখারি ও মুসলিম]

এ হাদিস অনুযায়ী কেউ কেউ বলছে যে, যখন খুব গরম পড়ে তখন সালাতের মাধ্যমে গরমকে ঠাণ্ডা করো। অর্থাৎ বেশি করে সালাত আদায় করো! কিন্তু এটা সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা। হাদিসের ভাষাগত দিক খেয়াল করলেও এমন অর্থ বুঝা যায় না।
কারণ এখানে বলা হয়নি, فَأَبْرِدُوه بِالصَّلَاةِ “তোমরা গরমকে সালাতের মাধ্যমে ঠাণ্ডা করো।”

▪️২. তাহলে উক্ত হাদিসে উল্লেখিত হাদিসে সালাতকে ঠাণ্ডা করার অর্থ কী?
উত্তর:
– ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রাহ. এর ব্যাখ্যায় বলেন,
( فأبردوا ) بقطع الهمزة وكسر الراء ، أي أخروا إلى أن يبرد الوقت
”ঠাণ্ডা করো” অর্থ: সময়টা ঠাণ্ডা হওয়া পর্যন্ত বিলম্ব করো।” [ফাতহুল বারি]
– তিনি অন্যত্র বলেন,
«الإبراد» تأخير صلاة الظهر إلى أن يبرد الوقت
ইবরাদ «الإبراد» শব্দের অর্থ, “সময় ঠাণ্ডা হওয়া পর্যন্ত জোহর সালাত বিলম্ব করা।” [বুলুগুল মারাম]
এ ব্যাখ্যাটি সঠিক।‌ কেননা তা অন্য হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়। তা হলো, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

“أَبْرِدُوا بِالظُّهْرِ فَإِنَّ شِدَّةَ الْحَرِّ مِنْ فَيْحِ جَهَنَّمَ
“জোহরের সালাতকে ঠাণ্ডা করে আদায় করো। কেননা প্রচণ্ড গরম জাহান্নামের নিঃশ্বাস।” [সহীহ মুসলিম]

তাহলে এখান থেকে প্রমাণিত হলো যে, হাদিসে মূলত প্রচণ্ড গরমের সময় জোহরের সালাত বিলম্ব করার কথা বলা হয়েছে।
এই হাদিসের মর্মার্থ অনুযায়ী,‌ প্রচণ্ড গরমের সময় অধিক পরিমাণ সালাত পড়ার কথা পূর্ববর্তী আলেমগণ কেউ বলেছেন বলে জানা নেই।

▪️৩. প্রচণ্ড গরমের সময় জোহরের সালাত বিলম্ব করে পড়ার বিধান কী?

এ ব্যাপারে ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন,

جمهور أهل العلم يستحب تأخير الظهر في شدة الحر إلى أن يبرد الوقت وينكسر الوهج
“বেশির ভাগ আহলে ইলমের মতে, প্রচণ্ড গরমের সময় জোহরের সালাত দেরিতে আদায় করা উত্তম যতক্ষণ না সময় ঠাণ্ডা হয় এবং সূর্যের কিরণের তিব্রতা কমে যায়।” [ফাতহুল বারী)

▪️৪. উক্ত হাদিসের আলোকে প্রচণ্ড গরমের কারণে কেবল জোহরের সালাত বিলম্ব করা যাবে; আসর, মাগরিব, ইশা, ফজর ইত্যাদি অন্য কোনো সালাত নয়। কেননা হাদিসে ষ্পষ্টভাবে কেবল জোহরের সালাতের কথা এসেছে।
অতএব অন্যান্য সালাত যথাসময়ে আদায় করতে হবে।

▪️ ৫. অনুরূপভাবে এ হাদিস কেবল গ্রীষ্মকালেই প্রযোজ্য; শীতকালে নয়।‌যেমটি বলেছেন ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রাহ.
تؤخر في الصيف دون الشتاء
“গ্রীষ্মকালে বিলম্ব করা যাবে; শীতকালে নয়।”‌ [ফাতফুল বারি]

▪️৬. পুরুষগণ মসজিদে জামাতে সালাত পড়ুক কিংবা মহিলারা বাড়িতে পড়ুক সর্বাবস্থায় গ্রীস্মকালে যদি প্রচণ্ড দাবাদহ পড়ে তবে জোহরের সালাত বিলম্ব করা মুস্তাহাব (মতান্তরে ওয়াজিব)। কেননা হাদিসটি আম বা ব্যাপক যা নারী-পুরুষ উভয়কেই শামিল করে। এটি অধিক বিশুদ্ধ মত।

▪️৭. মসজিদে বা বাড়িতে ফ্যান বা এয়ার কন্ডিশন থাকলেও উক্ত বিধানের পরিবর্তন হবে না। অর্থাৎ হাদিস পালনার্থে এ ক্ষেত্রেও বিলম্বে জোহরের সালাত আদায় করা উচিত।

▪️৮. প্রচণ্ড গরম না থাকলে বা স্বাভাবিক অবস্থায় কিংবা শীত মওসুমে আওয়াল ওয়াক্তে তথা সালাতের সময় হওয়ার পর কাল বিলম্ব না করে আদায় করবে। কেননা তখন সালাত বিলম্ব করার মূল কারণ অনুপস্থিত।
আর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বাভাবিক অবস্থায় আওয়াল ওয়াক্তে জোহরের সালাত আদায় করতেন। যেমন: আয়েশা রা. বলেন,

ما رأيت أحدا كان أشد تعجيلا للظهر من رسول الله صلى الله عليه وسلم، ولا من أبي بكر، ولا من عمر

“আগেভাগে‌ (আওয়াল ওয়াক্তে) জোহরের সালাত আদায় করার ক্ষেত্রে আমি রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আর কাউকে এতটা তাড়াহুড়া করতে দেখিনি। আবু বকর ওমর রা. থেকেও নয় (অর্থাৎ তাদের থেকেও তিনি আগেভাগে জোহরের সালাত আদায় করতেন)। ” [তিরমিজী হাদিস নম্বর: ১৫৫ (আল মাদানী প্রকাশনী)]

▪️৯. যে সব অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে আবহাওয়া খুব বেশি উত্তপ্ত হয় না বা নাতিশীতোষ্ণ এলাকায় উক্ত হাদিস প্রযোজ্য হবে না। অর্থাৎ সে সব অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে যথাসময়েই জোহরের সালাত আদায় করবে; বিলম্ব করবে না।

▪️১০. প্রচণ্ড গরমের সময়েও যদি কোথাও যথাসময়েই আজান দেওয়া হয় (বিলম্ব না করা হয়) তাহলে কষ্ট হলেও পুরুষগণ জামাতের সাথে সালাত আদায় করার উদ্দেশ্যে মসজিদে গমন করবে। শরিয়ত সম্মত ওজর ছাড়া জামাত পরিত্যাগ করবে না। কেননা ঐক্যবদ্ধভাবে জীবন যাপন করা ফরজ। বিচ্ছিন্নতা ও দ্বিমত করা হারাম। [সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড]। আল্লাহ আমাদেরকে তার রহমতের বারিধারায় সিক্ত করুন এবং জাহান্নামের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। আমিন। আল্লাহু আলম।
– আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল –

ইস্তিসকার সালাতে‌র পর বৃষ্টি হওয়া না‌ হওয়া সম্পর্কে যে বিশ্বাস রাখা জরুরি

 অনাবৃষ্টির সময় সালাতুল ইস্তিসকা বা বৃষ্টি প্রার্থনার নামাজ পড়া সুন্নত।‌ কেননা আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদেরকে নিয়ে সালাতুল ইস্তিসকা আদায় করেছেন। কেউ যদি পড়ে তাহলে সে সুন্নত পালন করার কারণে সওয়াব পাবে। বিশেষ করে যখন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি মৃত প্রায় সুন্নতকে পুনর্জীবিত করা হয় এবং শেষ জমানায় সুন্নত অনুযায়ী আমল করা হয় তখন এর মর্যাদা ও নেকি অনেকগুণ বৃদ্ধি পায়। যেমন: হাদিসে এসেছে,আবু সা’লাবাহ খুশানি রা. থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

إِنَّ مِنْ وَرَائِكُمْ أَيَّامَ الصَّبْرِ الصَّبْرُ فِيهِ مِثْلُ قَبْضٍ عَلَى الْجَمْرِ لِلْعَامِلِ فِيهِمْ مِثْلُ أَجْرِ خَمْسِينَ رَجُلاً يَعْمَلُونَ مِثْلَ عَمَلِهِ قَالَ يَا رَسُولَ اللهِ أَجْرُ خَمْسِينَ مِنْهُمْ قَالَ أَجْرُ خَمْسِينَ مِنْكُمْ

“তোমাদের পরবর্তীতে আছে ধৈর্যের যুগ। সে (যুগে) ধৈর্যশীল হবে মুষ্টিতে অঙ্গার ধারণকারীর মতো। সে যুগের আমলকারীর হবে পঞ্চাশ জন পুরুষের সমান সওয়াব। জিজ্ঞাসা করা হল, হে আল্লাহর রসুল, পঞ্চাশ জন পুরুষ আমাদের মধ্য হতে, নাকি তাদের মধ্য হতে? তিনি বললেন, “তোমাদের মধ্য হতে।” [আবু দাউদ ৪৩৪৩, তিরমিযী ৩০৫৮, ইবনে মাজাহ ৪০১৪, ত্বাবারানী ১৮০৩৩, সহীহুল জামে’ ২২৩৪]

উল্লেখ্য যে, উম্মতের বিশৃঙ্খলার সময় সুন্নতকে আঁকড়ে ধরবে তার জন্য রয়েছে একশ শহিদের সমপরিমাণ সওয়াব।” এ হাদিসটি জইফ।

➤ ইস্তিসকার সালাত আদায় করলে বৃষ্টি হওয়া আবশ্যক নয়। কেননা এটি কিছুটা ব্যতিক্রমী ও বিশেষ পদ্ধতিতে মহান আল্লাহর কাছে একটি দুআ। আল্লাহ চাইলে দুআ কবুল করবেন অথবা করবেন না। এটি সম্পূর্ণ তাঁর ইচ্ছাধীন বিষয়।

অতএব কোথাও ইস্তিসকার নামাজ পড়ার পরও যদি বৃষ্টি না হয় তখন এ ধারণা করা যাবে না যে, দুআ কারীদের মধ্যে ইমান ও ইখলাসের ত্রুটি ছিল বা আল্লাহ তাদের দুআ প্রত্যাখ্যান করেছেন কিংবা তারা ব্যর্থ হয়েছে…ইত্যাদি।

আবার ইস্তিসকার নামাজের পরে বৃষ্টি বর্ষিত হলে যেন এই ধারণা না করা হয় যে, যিনি নামাজ পড়িয়েছেন তিনি আল্লাহর কামেল ওলি, বিরাট বুজুর্গ বা আল্লাহর খুব পছন্দনীয় মানুষ। তিনি আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্কের কারণে আল্লাহর নিকট থেকে বৃষ্টি নিয়ে এসেছেন!
বৃষ্টি হলেও এই বিশ্বাস করার সুযোগ নাই। কেননা বৃষ্টি দেওয়া-না দেওয়া সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছার উপরে নির্ভরশীল। আমাদের কর্তব্য তো কেবল, নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে দুআ করা। ইস্তিসকার নামাজ পড়ার পর বৃষ্টি না হলেও সুন্নত আদায়ের কারণে সওয়াব অর্জিত হবে ইনশাআল্লাহ।

তাছাড়া এ সালাতের মাধ্যমে এই স্বীকৃতি প্রদান করা হয় যে, মহান আল্লাহ এ বিশ্ব চরাচরের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক ও পরিচালক। তিনি সর্বময় দয়ালু ও দাতা। তার দয়া ও অনুগ্রহ ছাড়া সৃষ্টি জগত নিতান্তই অচল। আমরা অতিশয় দুর্বল, অসহায় এবং তাঁর করুণার ভিখারি। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ – وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ
“হে মানবজাতি, তোমরা আল্লাহর মুখাপেক্ষী আর আল্লাহ হলেন অভাব মুক্ত ও সর্বময় প্রশংসিত।” [সূরা ফাতির: ১৫]

ইস্তিসকার সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর অনুগ্রহ চাওয়ার পাশাপাশি এই অনাবৃষ্টির ফলে আরও বড় ধরনের বিপদ-বিপর্যয় ও ক্ষয়ক্ষতি থেকেও আল্লাহর নিকট পরিত্রাণ কামনা করা হয়।
আবু সাঈদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
ما من مسلم يدعو بدعوة، ليس فيها إثم ولا قطيعة رحم إلا أعطاه الله بـها إحدى ثلاث : إما أن يعجل له دعوته، وإما أن يدخرها له في الآخرة وإما أن يصرف عنه من السوء مثلها. قالوا : إذا نكثر قال : الله أكثر
“যখন কোনও মুমিন ব্যক্তি দুআ করে, যে দুআতে কোনও পাপ থাকে না ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় থাকে না, তাহলে আল্লাহ তিন পদ্ধতির কোনও এক পদ্ধতিতে তার দুআ অবশ্যই কবুল করে নেন। যে দুআ সে করেছে হুবহু সেভাবে তা কবুল করেন অথবা তার দুআর প্রতিদান আখিরাতের জন্য সংরক্ষণ করেন কিংবা এ দুআর মাধ্যমে তার ওপর আগত কোনও বিপদ তিনি দূর করে দেন। এ কথা শুনে সাহাবিগণ বললেন, আমরা তাহলে অধিক পরিমাণে দুআ করতে থাকবো। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা যত প্রার্থনাই করবে আল্লাহ তার চেয়ে অনেক বেশি কবুল করতে পারেন।” [বুখারী : আল-আদাবুল মুফরাদ ও আহমদ, সহীহ-আলবানি]

এ হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে কোনো মুসলিম ব্যক্তির দুআ কখনো বৃথা যায় না।

সুতরাং আল্লাহর নবির সুন্নত পালনের মাধ্যমে সওয়াব অর্জন, নিজেদের অসহায়ত্ব তুলে ধরে মহান দয়ালু ও দাতা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের করুণা প্রার্থনা এবং অনাবৃষ্টির ফলে অনাগত বিপদ-বিপর্যয়, ক্ষয়-ক্ষতি, দুর্ভিক্ষ, রোগব্যাধী-মহামারী ইত্যাদি থেকে পরিত্রাণ কামনা ইত্যাদি উদ্দেশ্যে আমাদের ইস্তিসকার সালাত আদায় করা উচিত।
মোটকথা, এখানে প্রাপ্তি ছাড়া ব্যর্থতা এবং লাভ ছাড়া ক্ষতির কিছু নাই। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

প্রচণ্ড গরম ও ঠাণ্ডার উৎস কী এবং এ সময় কি বিশেষ কোন দুআ পাঠ করা যায়

 প্রচণ্ড গরম ও ঠাণ্ডার উৎস কী? এ সময় কি বিশেষ কোন দুআ পাঠ করা যায়? (সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচলিত একটি দুর্বল হাদিস সম্পর্কে পর্যালোচনা)।

প্রতিবারই গরমের মওসুমে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি হাদিস ব্যাপকভাবে প্রচারিত হতে দেখা যায়। কিন্তু হাদিস বিশারদগণের দৃষ্টিতে তা বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত নয়।
নিম্নে এ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা পেশ করা হলো

প্রচলিত হাদিসটি নিম্নরূপ:

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

“إذا كانَ يومٌ حارٌّ ألقى اللهُ تعالى سمعَه وبصرَه إلى أهلِ السماءِ وأهل الأرضِ فإذا قال العبدُ فقالَ الرَّجلُ لا إلَه إلَّا اللَّهُ ما أشدَّ حرَّ هذا اليومِ اللَّهمَّ أجرني من حرِّ جَهنَّمَ، قالَ اللَّهُ عزَّ وجلَّ لجَهنَّمَ إنَّ عبدًا من عبادي استجارني منك وإنِّي اشهدِك أنِّي قد أجرتُه، فإذا كانَ يومٌ شديدُ البردِ ألقى الله تعالى سمعَه وبصرَه إلى أهلِ السماء والأرض، فإذا قالَ العبدُ لا إلَه إلَّا اللَّهُ ما أشدَّ بردَ هذا اليومِ اللَّهمَّ أجرني من زمهريرِ جَهنَّمَ، قالَ اللَّهُ عزَّ وجلَّ لجَهنَّم، إنَّ عبدًا من عبادي استجارني من زمهريرِك وإنِّي أشهدُك أنِّي قد أجرتُه، فقالوا وما زمهريرُ جَهنَّمَ، قالَ بيتٌ يلقى فيهِ الكافرُ فيتميَّزُ من شدَّةِ بردِها بعضُه من بعضٍ”

“গরমের সময় যখন কঠিন গরম পড়ে তখন আল্লাহ জমিনবাসীর প্রতি কর্ণ ও দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। যখন কোনো বান্দা বলে যে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ! আজ কত গরম পড়েছে!! اللَّهمَّ أجرني من حرِّ جَهنَّمَ (আল্লাহুম্মা আজিরনী মিন হাররি জাহান্নাম) “হে আল্লাহ, তুমি আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দাও।” তখন আল্লাহ জাহান্নামকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমার বান্দাদের মধ্য থেকে এক বান্দা আমার নিকট তোমার শাস্তি থেকে আশ্রয় চেয়েছে। আমি তোমাকে সাক্ষী রাখছি যে, আমি তাকে মুক্তি দিলাম।

আবার যখন কঠিন ঠাণ্ডা পড়ে তখন আল্লাহ আল্লাহ জমিনবাসীর প্রতি স্বীয় কর্ণ ও দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। যখন কোন বান্দা বলে যে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ! আজ প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়েছে!!
اللَّهمَّ أجرني من زمهريرِ جَهنَّمَ
(আল্লাহুম্মা আজিরনী মিন যামহারিরে জাহান্নাম) “হে আল্লাহ, তুমি আমাকে যামহারির (জাহান্নামের প্রচণ্ড ঠাণ্ডা) থেকে মুক্তি দাও।” তখন আল্লাহ জাহান্নামকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমার বান্দাদের মধ্য থেকে এক বান্দা আমার নিকট তোমার যামহারির থেকে আশ্রয় চেয়েছে। আমি তোমাকে সাক্ষী রাখছি যে, আমি তাকে মুক্তি দিলাম।

সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে রসুল, জাহান্নামের যামহারির কী?

তিনি বললেন, এটি এমনটি ঘর যেখানে কাফেরকে নিক্ষেপ করা হবে। ফলে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় তার এক অংশ অন্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।”
[বায়হাকী-আসমা ওয়াস সিফাত ১/৪৫৯, ইবনুস সুন্নি-আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লায়লা, আন নিহায়া ফিল ফিতানে ওয়াল মালাহিম, দ্বিতীয় খণ্ড, হাদিস নং ৩০৭]”

❑ উক্ত হাদিসটির মান:

বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে উক্ত হাদিসটি সহিহ নয়। যেমন:

– ইমাম সাখাবি বলেন, سنده ضعيف “এর সনদ দুর্বল।” [আল মাকাসিদুল হাসানা, ৭/১১৪]
– আজলুনিও এটিকে জইফ (দুর্বল) বলে আখ্যায়িত করেছে। [কাশফুল খাফা, ২/৪২৬]
– শাইখ আলবানি বলেন, এটি মুনকার বা মারাত্মক দুর্বল। [সিলসিলা যাইফা, হা/৬৪২৮]

❑ প্রচণ্ড গরম ও প্রচণ্ড ঠাণ্ডার উৎস কী?

হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী গ্রীষ্মের দাবদাহ এবং শীতের হিমশীতল ঠাণ্ডা জাহান্নামের নিঃশ্বাস থেকে উৎসারিত। যেমন: হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

اشْتَكَتِ النَّارُ إِلَى رَبِّهَا فَقَالَتْ يَا رَبِّ أَكَلَ بَعْضِي بَعْضًا ‏.‏ فَأَذِنَ لَهَا بِنَفَسَيْنِ نَفَسٍ فِي الشِّتَاءِ وَنَفَسٍ فِي الصَّيْفِ فَهُوَ أَشَدُّ مَا تَجِدُونَ مِنَ الْحَرِّ وَأَشَدُّ مَا تَجِدُونَ مِنَ الزَّمْهَرِيرِ

“জাহান্নামের আগুন তার রবের কাছে অভিযোগ করে বলল, হে রব, আমার একাংশ আরেকাংশকে খেয়ে ফেলল। তখন তিনি তাকে দুটি নিঃশ্বাস ফেলার অনুমতি দিলেন। একটি নিঃশ্বাস শীতকালে এবং আরেকটি নিঃশ্বাস গ্রীষ্মকালে। এ কারণেই তোমরা গ্রীষ্মের প্রখরতা ও ঠাণ্ডার তীব্রতা (যামহারির) অনুভব করে থাক।” [ সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৫/ মসজিদ ও সালাতের স্থান, পরিচ্ছেদ: ৩২. তীব্র গ্রীষ্মের সময় তাপ কমে আসলে জোহর আদায় করা মোস্তাহাব]

❑ প্রচণ্ড উত্তাপ বা ঠাণ্ডার সময় কি বিশেষ কোন দুআ পাঠ করা যায়?

সাধারণভাবে প্রচণ্ড গরম কিংবা আগুনের উত্তাপ দেখে জাহান্নামের আগুনের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করত: তা থেকে মুক্তি কামনা করে আল্লাহর কাছে দুআ করা শরিয়ত সম্মত। কেননা কুরআন ও হাদিসে জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপায় সম্পর্কে পর্যাপ্ত আয়াত-হাদিস রয়েছে। বিশেষভাবে জাহান্নামের আগুনের শাস্তি থেকে মুক্তির জন্য মহান আল্লাহ দুআ শিক্ষা দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন,

رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ ۖ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا إِنَّهَا سَاءَتْ مُسْتَقَرًّا وَمُقَامًا

“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তিকে দূরে সরিয়ে দিন। কারণ এর শাস্তি তো নিশ্চিতভাবে ধ্বংসাত্মক। বসবাস ও অবস্থানস্থল হিসেবে তা কত নিকৃষ্ট জায়গা!” [সূরা ফুরকান: ৬৫-৬৬]

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

مَنْ سَأَلَ اللَّهَ الْجَنَّةَ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ قَالَتْ الْجَنَّةُ اللَّهُمَّ أَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ وَمَنْ اسْتَجَارَ مِنْ النَّارِ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ قَالَتْ النَّارُ اللَّهُمَّ أَجِرْهُ مِنْ النَّارِ

“যে ব্যক্তি তিনবার আল্লাহর নিকট জান্নাত প্রার্থনা করে, জান্নাত বলে, হে আল্লাহ, আপনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। আর যে ব্যক্তি তিনবার জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ চায়, জাহান্নাম বলে, হে আল্লাহ, আপনি তাকে জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ দিন।” [সুনানে নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৫১/ আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করা, পরিচ্ছেদ: ৫৫. জাহান্নামের আগুনের উত্তাপ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করা-সহিহ]

সুতরাং কেউ যদি প্রচণ্ড গরমের সময় কিংবা আগুনের উত্তাপ দেখে জাহান্নামের কথা স্মরণ করে উপরোক্ত হাদিসে বর্ণিত দুআ দুটি পাঠ করে তাহলে তাতে কোনও সমস্যা নেই-যদিও হাদিসটি সনদগতভাবে দুর্বল। তবে হাদিসে তার যে ফজিলত বর্ণিত হয়েছে তা বিশ্বাস করা যাবে না। কারণ সনদগতভাবে বিশুদ্ধ সূত্রে তা প্রমাণিত নয়।

দুআ দুটি হলো:

● ১. প্রচণ্ড গরমের সময়:

اللَّهمَّ أجرني من حرِّ جَهنَّمَ
(আল্লাহুম্মা আজিরনী মিন হাররি জাহান্নাম)
“হে আল্লাহ, তুমি আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দাও।”

● ২. প্রচণ্ড ঠাণ্ডার সময়:

اللَّهمَّ أجرني من زمهريرِ جَهنَّمَ
(আল্লাহুম্মা আজিরনি মিন যামহারিরে জাহান্নাম)
“হে আল্লাহ, তুমি আমাকে যামহারির (জাহান্নামের প্রচণ্ড ঠাণ্ডা) থেকে মুক্তি দাও।”

জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষার জন্য এ দুআগুলো কেবল গরম বা ঠাণ্ডার মওসুম নয় বরং যে কোনও সময় পাঠ করা যায়।

উল্লেখ্য যে, উক্ত দুআগুলো গরম ও ঠাণ্ডার প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নয় বরং জাহান্নামের শাস্তি থেকে পরিত্রাণের দুআ।

➤ বি. দ্র. যামহারির শব্দের অর্থ: প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। যেমন: মহান আল্লাহ বলেন,

مُّتَّكِئِينَ فِيهَا عَلَى الْأَرَائِكِ ۖ لَا يَرَوْنَ فِيهَا شَمْسًا وَلَا زَمْهَرِيرًا

“তারা (জান্নাতবাসীগণ) সেখানে সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসবে। সেখানে রৌদ্র ও শৈত্য অনুভব করবে না।” [সূরা দাহার: ১৩]

روي عن ابن مسعود قال: الزمهرير: لون من العذاب . وعن عكرمة ، قال: هو البرد الشديد

ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, যামহারির হল, এক প্রকার শাস্তি। ইকরিমা রাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে, তা হলো, প্রচণ্ড ঠাণ্ডা।” [তাফসিরে ইবনে রজব, পৃষ্ঠা নং ৫৩১]
আল্লাহ আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। আমিন।▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate