Sunday, April 21, 2024

ঈদের বিধি-বিধান

 ❑ ঈদের প্রকৃত অর্থ কি?

শুধু দামী পোশাক, রঙ্গিন জামা, হরেক রকম সুস্বাদু খাবার আর নানা ধরণের আনন্দ-উৎসবের নাম ঈদ নয়। ঈদের উদ্দেশ্য কি তা আল্লাহ তা’আলা নিন্মোক্ত আয়াতের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন:

وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

“আর যেন তোমরা নির্ধারিত সংখ্যা পূরণ করতে পার এবং তোমাদেরকে যে সুপথ দেখিয়েছেন, তার জন্যে তোমরা আল্লাহর মমত্ব প্রকাশ কর এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা হও।” [সূরা বাকারা: ১৮৫] এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হচ্ছে, ঈদের উদ্দেশ্য হল দুটি:
১) আল্লাহর বড়ত্ব মমত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা।
২) আল্লাহ যে নেয়ামত দান করেছেন তার জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করা।

❑ ঈদ সংক্রান্ত কতিপয় বিধান:

নিন্মে আমরা অতি সংক্ষেপে কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে ঈদ সংক্রান্ত কতিপয় বিধান আলোচনা করার চেষ্টা করব যাতে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের নির্দেশিত পদ্ধতি অনুসারে আমরা আমাদের ঈদ উদযাপন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি।

◉ ১. ঈদের দিন রোজা রাখা নিষেধ:

প্রখ্যাত সাহাবি আবু সাঈদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা এ দু দিন রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন।” [বুখারি, হাদিস নং ১৮৫৫]

◉ ২. ঈদের রাত থেকে তাকবির পাঠ করা:

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَاذْكُرُوا اللَّهَ فِي أَيَّامٍ مَعْدُودَاتٍ
“আর তোমরা আল্লাহকে স্মরণ কর নির্দিষ্ট দিন সমূহে।” [সূরা বাকারা: ২০৩]

ঈদুল ফিতরের ক্ষেত্রে রমজানের শেষ সূর্য ডোবার পর ঈদের রাত থেকে আরম্ভ করে ঈদের সালাত শুরু করা পর্যন্ত তাকবির পড়তে হয়। পুরুষগণ মসজিদ, হাট-বাজার, রাস্তা-ঘাট তথা সর্বত্র উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করবে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন ঈদের আনন্দ প্রকাশ করা হয় অন্যদিকে আল্লাহর আনুগত্যের স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। আর ঈদুল আজহার ক্ষেত্রে আরাফার দিনের ফজর থেকে শুরু করে তাশরিকের দিনের শেষ পর্যন্ত তথা জিলহজ মাসের তেরো তারিখের আসর পর্যন্ত তাকবির বলা।

তাকবির বলার পদ্ধতি:

الله أكبر، الله أكبر، لا إله إلا الله والله أكبر، الله أكبر ولله الحمد
“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।”

আল্লাহর মহত্মের ঘোষণা এবং তাঁর ইবাদত ও কৃতজ্ঞতার বর্হি:প্রকাশের উদ্দেশ্যে পুরুষদের জন্য মসজিদে, বাজারে, বাড়িতে ও পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পরে উচ্চ স্বরে তাকবির পাঠ করা সুন্নত।

◉ ৩. ঈদ উপলক্ষে পরস্পরে শুভেচ্ছা বিনিময় করা:

মুসলিমদের উদ্দেশ্যে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা উত্তম। কারণ সাহাবিগণ তা করতেন।
মুহাম্মদ বিন যিয়াদ আল আলহানী রহ. বলেন, আমি সাহাবি আবু উমামা আল বাহেলী রা. কে ঈদের দিন তার সাথীদের উদ্দেশ্যে বলতে দেখেছি: “তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম” (অর্থ: আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের (নেক কাজগুলো) কবুল করুন) [বায়হাকী (২/৩১৯)-সনদ হাসান।

তবে ঈদ মোবারক, ঈদ সাঈদ, ঈদের শুভেচ্ছা, কনগ্রাচুলেশন, কুল্লু আম ওয়া আনতুম বি খাইর ইত্যাদি যে সব শব্দ বা বাক্য দ্বারা মানুষ পরস্পরকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করে আর মানুষও তাতে খুশি হয় সে শব্দ/বাক্য ব্যবহারে কোন আপত্তি নেই। কারণ ইসলামে দেশীয় সংস্কৃতি ও প্রচলিত রীতিনীতিকে নিন্দা করা হয় নি যদি তাতে শরিয়ত বিরোধী কিছু না থাকে।

◉ ৪. ভালো পোশাক ও ভালো খাবারের আয়োজন করা:

ঈদ উপলক্ষে যথাসম্ভব পরিবারের সদস্যদেরকে ভালো খাবার ও সুন্দর পোশাক দেয়ার ব্যবস্থা করা উত্তম। তবে অপচয় যাতে না হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখা জরুরী। অনুরূপভাবে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের সাথে দেখা-সাক্ষাত করা কর্তব্য। সেই সাথে প্রতিবেশীর খোঁজ-খবর রাখতে হবে। দরিদ্রদের যথাসম্ভব সাহায্য-সহযোগিতা করতে হবে। যাতে ঈদের আনন্দ থেকে তারা বঞ্চিত না হয়।

◉ ৫. ঈদের সালাতের প্রতি যত্নশীল হওয়া:

ঈদুল ফিতরের সালাত বিলম্বে পড়া সুন্নত, যেন ঈদের দিন সকালবেলা ফিতরা বন্টণ করার পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে ঈদুল আজহার সালাত সূর্য উদিত হওয়ার প্রায় ১৫ মি. পর যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি পড়া সুন্নত।

◉ ৬. গোসল ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা:

ঈদের সালাতে যাওয়ার পূর্বে গোসল করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হবে। তারপর সুগন্ধি ব্যবহার করে ও সাধ্যানুযায়ী সবচেয়ে সুন্দর কাপড় পরিধান করে ঈদগাহ অভিমুখে যাত্রা করবে। তবে কাপড় পরিধান করার সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, যেন পুরুষের কাপড় টাখনুর নিচে না যায়। কেননা, পুরুষের জন্য টাখনুর নিচে কাপড় পরিধান করা হারাম। আর মহিলাকে তার সর্বাঙ্গ আবৃত করতে হবে এবং রূপ-সৌন্দর্য পরপুরুষের সামনে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সাবধানতা অবলম্বন করা আবশ্যক। কেননা মহান আল্লাহ বলেন,
وَلا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ الآية
“আর তারা (মহিলাগণ) তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না তাদের স্বামী, পিতা,স্বামীর পিতা…..ছাড়া অন্যের নিকট।” [সূরা নূর: ৩১]
মহিলাদের জন্য বাইরে যাওয়ার সময় আতর-সুগন্ধি ব্যবহার করা হারাম।

◉ ৭. ঈদের মাঠে যাওয়ার আগে কোন কিছু খাওয়া সুন্নত:

ঈদুল ফিতরে ঈদের মাঠে যাওয়ার আগে কোন কিছু খাওয়া সুন্নত। আনাস (রা:) বলেন, “নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদুল ফিতরের দিন কয়েকটা খেজুর না খেয়ে ঈদের মাঠে যেতেন না। আর তিনি তা বেজোড় সংখ্যায় খেতেন।” (বুখারি)। পক্ষান্তরে ঈদুল আজহায় তিনি ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে কিছুই খেতেন না। ঈদগাহ থেকে ফিরে এসে কুরবানির গোস্ত খেতেন।

◉ ৮. মহিলাদের ঈদগাহে যাওয়া:

মহিলাদেরকে সাথে নিয়ে ঈদের সালাত পড়তে যাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ প্রদান করেছেন। তিনি বলেন,
لِيَخْرُجْ الْعَوَاتِقُ ذَوَاتُ الْخُدُورِوَالْحُيَّضُ وَيَعْتَزِلُ الْحُيَّضُ الْمُصَلَّى وَلْيَشْهَدْنَ الْخَيْرَ وَدَعْوَةَ الْمُؤْمِنِينَ
“কর্তব্য হল, পর্দানশীন কুমারী মেয়েরা; এমন কি ঋতুমতী মহিলারাও ঈদগাহে যাবে। তবে ঋতুমতী মহিলাগণ নামাযের স্থান থেকে দূরে অবস্থান করে কল্যাণময় কাজ এবং মুমিনদের দুআতে শরিক হবে।” [বুখারি: হাদিস নং ৯২৭]
এ সুন্নত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এবং বাংলাদেশের কিছু কিছু এলাকায় আজো প্রচলিত আছে। সুতরাং যে সব এলাকায় তা চালু নেই সেসব স্থানের সচেতন আলেম সমাজ এবং নেতৃস্থানীয় মুসলমানদের কর্তব্য হল, আল্লাহর রাসূলের সুন্নতকে পুনর্জীবিত করার লক্ষ্যে মহিলাদেরকেও ঈদের এই আনন্দঘন পরিবেশে অংশ গ্রহণের সুযোগ প্রদানের জন্য এগিয়ে আসা। তবে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, পর্দা হীনতা, উচ্ছৃঙ্খলতা ইত্যাদি যাতে না ঘটে তার জন্য আগে থেকে সকলকে সচেতন ও সাবধান করা জরুরী। মহিলাগণ যখন বাড়ি থেকে বের হবে সর্বাঙ্গ কাপড় দ্বারা আবৃত করবে এবং সুগন্ধি ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে। কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

أَيُّمَا امْرَأَةٍ اسْتَعْطَرَتْ فَمَرَّتْ عَلَى قَوْمٍ لِيَجِدُوا مِنْ رِيحِهَا فَهِيَ زَانِيَةٌ

“যে মহিলা সুগন্ধি ব্যবহার করে অন্য মানুষের নিকট দিয়ে গমন করার ফলে তারা তার ঘ্রাণ পেল সে মহিলা ব্যভিচারিণী।” [নাসাঈ: হাদিস নং ৫০৩৬]

◉ ৯. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে গমন করা:

পায়ে হেঁটে ঈদগাহে গমন করা এবং ভিন্ন পথে ঈদগাহ থেকে ফিরে আসা সুন্নত। [বুখারি: হাদিস নং ৯৩৩]

◉ ১০. ঈদের সালাত আদায় করা:

ঈদ সংক্রান্ত কতিপয় বিধান:

● ক. ঈদের সালাতে আজান ও একামত নেই: জাবের ইবনে সামুরা (রা:) বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাথে একবার নয়-দু বার নয় একাধিক বার ঈদের সালাত পড়েছি তাতে আজান ও একামত ছিল না।” [সহীহ মুসলিম: হাদিস নং ১৪৭০]
● খ. ঈদের মাঠে ঈদের সালাতের আগে বা পরে নফল সালাত পড়া শরিয়ত সম্মত নয়।
حديث ابن عباس أن النبي صلى الله عليه وسلم صلى يوم العيد ركعتين لم يصل قبلها ولابعدها))أخرجه البخاري(964)ومسلم(884)
ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দু রাকআত সালাত আদায় করেন। এর পূর্বে ও পরে কোন সালাত আদায় করেননি।” [বুখারি ও মুসলিম]
তবে মসজিদে পড়া হলে তাহিয়াতুল মসজিদ (দুখুলুল মসজিদ) এর দু রাকআত পড়া জায়েজ আছে। তবে ঈদের মাঠ থেকে বাড়িতে ফিরে এসে বাড়িতে দু রাকআত সালাত পড়া সুন্নত। যেমন: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ – صلى الله عليه وسلم – لَا يُصَلِّي قَبْلَ الْعِيدِ شَيْئًا, فَإِذَا رَجَعَ إِلَى مَنْزِلِهِ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ. رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ بِإِسْنَادٍ حَسَنٍ
رواه ابن ماجه (1293) ولا يظن ظان أن بين هذا الحديث وبين حديث ابن عباس السابق (491) تعارض فحديث ابن عباس خاص بالصلاة في المصلى، وبهذا الجمع قال غير واحد

আবু সাঈদ আল-খুদরি রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের সালাতের আগে কোন সালাত আদায় করতেন না। তবে তিনি তার বাড়িতে ফিরে আসার পর দু’ রাক’আত সালাত আদায় করতেন।” [ইবনে হাজার তার দিরায়াহ ১/২১৯ গ্রন্থে, ইমাম শাওকানী নাইলুল আওতার (৩/৩৭০) গ্রন্থে, আলবানী সহীহ ইবনে মাজাহ (১০৭৬), সহীহুল জামে (৪৮৫৯) গ্রন্থে, ইমাম সুয়ূতী জামেউস সগীর (৬৮৯৭) গ্রন্থে হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। ইমাম শাওকানী বলেন, এর সনদে আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন উকাইল রয়েছেন আর তার সম্পপর্কে সমালোচনা রয়েছে।]

● গ. সর্বপ্রথম ঈদের সালাত হবে তারপর খুতবা: আবু সাঈদ খুদরী (রা:) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদের মাঠে গিয়ে সর্বপ্রথম নামাজ আদায় করতেন তারপর জনগণের দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে ওয়াজ করতেন, কোন উপদেশ থাকলে উপদেশ দিতেন বা কোন নির্দেশ থাকলে নির্দেশ দিতেন। আর জনগণ নামাযের কাতারে বসে থাকতেন। কোথাও কোন বাহিনী প্রেরণের ইচ্ছা থাকলে তার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতেন অথবা অন্য কোন নির্দেশ জারী করার ইচ্ছা করলে তা জারী করতেন। [সহীহ বুখারি, হাদিস নং ৯০৩]

● ঘ. ঈদের সালাতের রাকাত সংখ্যা: ঈদের সালাত দু রাকাত। [বুখারি, হাদিস নং ১৩৪১]

● ঙ. ঈদের সালাতে তাকবির সংখ্যা: তাকবিরে তাহরিমা ছাড়া প্রথম রাকাতে অতিরিক্ত সাত তাকবির এবং দ্বিতীয় রাকাতে অতিরিক্ত পাঁচ তাকবির।(মতান্তরে কববিরে তাহরিমা সহ ১ম রাকাতে মোট সাত তাকবির)
عن عَائِشَة أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُكَبِّرُ فِي الْفِطْرِ وَالْأَضْحَى فِي الْأُولَى سَبْعَ تَكْبِيرَاتٍ وَفِي الثَّانِيَةِ خَمْسًا…قَالَ سِوَى تَكْبِيرَتَيْ الرُّكُوعِ

“আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহার প্রথম রাকাতে সাত তাকবির এবং দ্বিতীয় রাকাতে পাঁচ তাকবির দিতেন।” অন্য সনদে আছে, উল্লেখিত তাকবিরগুলো রুকুর তাকবির ছাড়া। [আবুদাঊদ হাদিস নং ৩৭০]

● চ. ঈদের সালাতে কেরাআত: প্রখ্যাত সাহাবি নুমান ইবনে বাশীর রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুই ঈদ ও জুমার নামাজে প্রথম রাকআতে ‘সাব্বিহিস্মা রাব্বিকাল আ’লা’ এবং দ্বিতীয় রাকায়াতে ‘হাল আতাকা হাদীসুল গাশিয়াহ্’ পাঠ করতেন। [নাসাঈ, হাদিস নং ১৫৫০ সনদ সহীহ-আলবানি] সূরা ক্বাফ এবং সূরা ইক্বতারাবতিস্ সা’আহ্’ পড়ার কথাও হাদিস পাওয়া যায়। (নাসাঈ: হাদিস নং ১৫৪৯, সনদ সহীহ-আলবানি)

● ছ. ঈদের খুতবা শোনা: ঈদের খুতবা প্রসঙ্গে নবী সায়েব ইবনে ইয়াজিদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ঈদের সালাতে উপস্থিত হলাম। তিনি ঈদের সালাত শেষ করার পর বললেন, আমরা এখন খুতবা দিব। সুতরাং
فَمَنْ أَحَبَّ أَنْ يَجْلِسَ لِلْخُطْبَةِ فَلْيَجْلِسْ , وَمَنْ أَحَبَّ أَنْ يَرْجِعَ فَلْيَرْجِعْ
“যে চলে যেতে চায় সে যেতে পারে আর যে (খুতবা শোনার জন্য) বসতে চায় সে বসতে পারে।” [নাসাঈ, অধ্যায়: দু ঈদ, অনুচ্ছেদ: দুই ঈদের খুতবা শুনা ইচ্ছাধীন বিষয়, হা/ ১৫৫৩, মুস্তাদরাক হাকিম, হা/১০৪৩, ইমাম হাকেম বলেন, হাদিসটি ইমাম বুখারি ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ তবে তারা তাদের কিতাবে বর্ণনা করেন নি। ইমাম যাহাবী ইমাম হাকিমের কথায় একমত পোষণ করেছেন। অনুরূপভাবে ইমাম আলবানিও হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন, সহীহ আবু দাউদ, হা/১০৪৮, ইরওয়াউল গালীল, হা/৬২৯]

অর্থাৎ ঈদের খুতবা শুনার মুস্তাহাব; ওয়াজিব নয়। তাই বলে, এটির প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করা উচিৎ নয়। কেননা, খুতবার মধ্যে মুসলিম জাতির কল্যাণের জন্য দুয়া করা হয়, ওয়ায-নসিহত করা হয়, বিভিন্ন বিষয়ে করণীয়-বর্জনীয় বিষয়ে দিক নির্দেশনা পেশ করা হয়।

❑ ঈদ ও সামাজিক জীবন:

ঈদের আনন্দ নির্মল, পবিত্র এবং অত্যন্ত মধুময়। ঈদ উপলক্ষে যখন নিজ নিজ গৃহে আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু বান্ধব একে অপরকে দাওয়াত দেয়, পরস্পরে শুভেচ্ছা বিনিময় করে, একে অপরকে উপহার সামগ্রী আদান-প্রদান করে তখন ঈদের আনন্দ আরও মধুময় হয়ে উঠে। সুদৃঢ় হয় সামাজিক বন্ধন। মনের মধ্যে জমে থাকা হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ ও তিক্ততা দূর হয়ে পারস্পারিক ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা ও সম্মানবোধ জাগ্রত হয়। জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে বয়ে যায় শান্তির সুবাতাস যা প্রভাতের আলোর মতই স্বচ্ছ, নির্মল ও নিষ্কলুষ।

❑ ঈদ ও পাপাচারিতা:

ঈদের পবিত্রতা ম্লান হয়ে যায় যখন দেখা যায়, ঈদ উৎসব ও ঈদ মেলার নামে অশ্লীলতা-বেহায়াপনার মেলা বসে। তরুণ-তরুণীরা নানারকম আপত্তিকর পোষাকে চলাফেরা করে। একশ্রেণির উদ্ভট যুবক বাড়িতে, রাস্তার ধারে ও বিভিন্ন ক্লাবে বড় বড় ডেকসেটে অডিও সিডি চালু করে উচ্চ আওয়াজে গান বাজাতে থাকে। সরকারী-বেসরকারি বিভিন্ন টিভি চ্যানেলগুলোতে ঈদ উপলক্ষে বিশেষ বিশেষ অশ্লীল ফিল্ম সম্প্রচার করে। সিনেমা হলগুলোতে নতুন নতুন ছবি জাঁকজমক ভাবে প্রদর্শিত হয়। মনে হয় এরা যেন এ ধরণের একটি সময়েরই প্রতীক্ষায় ছিল এত দিন!
দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনা করার পর যে একটা ঈমানি পরিবেশ তৈরি হয়ে ছিল, কুরবানি করার মাধ্যমে যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রতিযোগিতার লিপ্ত হয়েছিল মুসলিম সমাজ তারা কি এসব ক্রিয়া-কাণ্ডের মাধ্যমে তার চিহ্ন মুছে ফেলতে চায়? এসব অপসংস্কৃতিকে পরিত্যাগ করে আমরা যদি ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে ধারণ করতে পারি তাহলে আমাদের সার্বিক জীবন সুন্দর ও পবিত্রতার আলোক রশ্মিতে ভাস্বর হয়ে উঠবে। পরিশেষে, কামনা করি ঈদ আমাদের জীবনে রংধনুর মত রং ছড়িয়ে বার বার ফিরে আসুক। আর সে রঙ্গে রঙ্গিন হয়ে উঠুক আমাদের জীবনের প্রতিটি মূহুর্ত। ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে যাক সকল পাপ ও পঙ্কিলতা। আমিন।
▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

গ্রন্থনা: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদি আরব।

ঈদে মেয়েদের মেহেদি রঙ্গে সাজ কতিপয় ইসলামি নির্দেশনা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা

 ঈদে মেয়েদের মেহেদি রঙ্গে সাজ: কতিপয় ইসলামি নির্দেশনা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা

(মেহেদি ব্যবহারের কতিপয় জরুরি নির্দেশনা-যা জানা জরুরি প্রতিটি নারীর)
▬▬▬◆◯◆▬▬▬
আমাদের বাঙ্গালী সমাজে মেহেদি ছাড়া নারীদের ঈদ কল্পনা করা যায় না। মেহেদির রং যেন ঈদ উৎসবে আনে এক ভিন্ন মাত্রা। ছোট শিশু, কিশোরী, যুবতী, মধ্যবয়স্কা ইত্যাদি প্রায় সব নারীদের মধ্যে এর ব্যবহার দেখা যায়। তারা চুলে, হাতে, পায়ে, হাত বা পায়ের আঙ্গুলে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে মেহেদির মাধ্যমে নকশা অঙ্গন ও ডিজাইন করে। বর্তমানে টিউব মেহেদির কল্যাণে খুব সূক্ষ্ম কারুকাজ করা হয়।
যাহোক, মেহেদি সজ্জা আমাদের নারীদের এক চির চেনা রীতি। সত্যিকার আর্থে এই সাজসজ্জা নারীদের স্বভাবজাত প্রবণতা। ইসলাম তাতে নিষেধ করে না। তবে এ ক্ষেত্রে কতিপয় বিষয় লক্ষ রাখা জরুরি। যথা:

◈ ১. সাধারণ মেহেদি, রং ইত্যাদি ব্যবহার করলে তাতে কোন সমস্যা নেই। কারণ এগুলো ব্যবহার করলেও ওজু-গোসলের ক্ষেত্রে অনায়াসে চামড়ায় পানি পৌঁছে যায়। তবে বর্তমানে বাজারে একপ্রকার ক্যামিক্যাল যুক্ত কৃত্রিম টিউব মেহেদি পাওয়া যায় যা ব্যবহার করলে চামড়ার উপর একটা পাতলা আবরণ পড়ে। এতে ওজু-গোসলে সমস্যা হবে। তাই নামাজি নারীগণ অবশ্যই এসব মেহদি ব্যবহার থেকে দূরে থাকবে। কখনো ব্যবহার করলেও এগুলো অবশ্যই সাবান, শ্যাম্পু, ক্যামিক্যাল বা অন্য কোন উপায়ে তুলে ফেলতে হবে। অন্যথায় ওজু-গোসল শুদ্ধ হবে না।
তবে যে সব নারীদের সালাত নেই (যেমন: ঋতুমতী ও প্রসূতি মহিলা বা ছোট বাচ্চা)। তাদের জন্য এগুলো ব্যবহারে সমস্যা নেই।

◈ ২. বাজারের মেহেদি ক্রয়ের সময় তাতে হারাম বা ক্ষতিকারক কেমিক্যাল মিশানো আছে কি না তা নিশ্চিত হতে হবে। কারণ বর্তমানে বাজারে এমন অনেক নকল ও ভেজাল মেহেদি পাওয়া যায় যা ব্যবহার করলে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা নানা ধরণের চর্মরোগ সৃষ্টি হয়। হাতে মেহেদির সুন্দর আল্পনা আঁকতে গিয়ে তা বীভৎস রূপ ধারণ করতে পারে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ বলেন, ‘সরাসরি মেহেদি গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করে যারা নিজেরা মেহেদি ব্যবহার করে তাদের এ ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি থাকে না। কিন্তু বাজারের নকল ও ভেজাল অনেক টিউব মেহেদি বেচা-কেনা হয়। এসবের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক মেহেদির লেশমাত্র থাকে না বরং বিষাক্ত নানা রাসায়নিক রং দিয়ে এই মেহেদি তৈরি করে বাজারজাত করা হয়। এগুলোর মধ্যে এসিড জাতীয় ক্ষতিকর উপাদান থাকে, যা মানুষের ত্বক ঝলসে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে বাজারের সব মেহেদি ব্র্যান্ডই যে বিষাক্ত বা ক্ষতিকর তা ঢালাওভাবে বলা যাবে না। তাই দেখে-শুনে পরীক্ষিত ও ভালো ব্যান্ডের মেহদি ক্রয়ের চেষ্টা করতে হবে।

এ ক্ষত্রে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ পরামর্শ দিয়েছেন, একবারে পুরো হাত বা নির্দিষ্ট নকশা ধরে মেহেদি না লাগিয়ে শুরুতে সামান্য একটু মেহেদি কোথাও লাগিয়ে স্কিন টেস্ট করা যেতে পারে। যদিও এ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখতে না-ও পাওয়া যেতে পারে। অনেকের স্কিনে তাৎক্ষণিক ক্ষতির লক্ষণ দেখা দিলেও, অনেকেরই ধীরে ধীরে কিংবা কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পরেও ক্ষতি হতে পারে। তাই মেহেদি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক ও সচেতন থাকা খুবই জরুরি। এ ছাড়া যাদের ত্বকে এলার্জির সমস্যা আছে তাদেরও মেহেদি পরিহার করা উচিত।

◈ ৩. মেহেদির মাধ্যমে ট্যাটু বা উল্কি অঙ্কনের মত করে শরীরে অমুসলিমদের ধর্মীয় প্রতীক, প্রাণীর ছবি, ড্রাগনের মাথা, প্রাণীর কার্টুন, নারী-পুরুষের ছবি, বয় ফ্রেন্ড-গার্ল ফ্রেন্ড এর নাম, অশ্লীল বাক্য ইত্যাদি ব্যবহার করা অথবা বিপরীত লিঙ্গের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন স্থানে মেহদি লাগানো জায়েজ নাই।

◈ ৪. অন্য মহিলাকে মেহেদি দ্বারা সাজানোর সময় তার লজ্জা স্থানের দিকে তাকানো বা তার স্পর্শকাতর স্থান স্পর্শ করা হারাম।

◈ ৫. যখন আপনি জানতে পারবেন যে, কোন মহিলা সাজগোজ করে পরপুরুষের সামনে প্রদর্শনী করে বেড়াবে তখন তাকে এ ক্ষেত্রে কোনও ধরণের সাহায্য-সহযোগিতা করা যাবে না। অর্থের বিনিময়ে হোক বা বিনামূল্যে হোক। কারণ তা গুনাহের কাজে সহযোগিতার শামিল। অথচ আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহায়তা করতে নিষেধ করেছেন।
আল্লাহ বলেন,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّـهَ
“সৎকর্ম ও তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতির কাজে একে অন্যের সহায়তা কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর।” [সূরা মায়িদা: ২] আল্লাহ ঐ সকল মহিলাকে হেদায়েত করুন। আমিন।
▬▬▬◆◯◆▬▬▬
লেখক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড সেন্টার, সৌদি আরব।

ঈদের সালাতে তাকবির সংখ্যা ৬ নাকি ১২

 ঈদের সালাতে তাকবির সংখ্যা: ৬ না কি ১২? (১২ তাকবির উত্তম; ৬ তাকবির জায়েজ)

প্রশ্ন: সহীহ হাদিসের আলোকে কয় তাকবীরে ঈদের সালাত পড়তে হয়? ৬ তাকবীর না কি ১২ তাকবির? ৬ তাকবিরে ঈদের সালাত পড়ায় এমন ঈমামের পেছনে কি ঈদের সালাত পড়া বৈধ হবে?
উত্তর: ঈদের তাকবির কতটি এ মর্মে ওলামাদের মাঝে দ্বিমত পরিলক্ষিত হয়। তবে সর্বাধিক বিশুদ্ধ অভিমত হল, তাকবীরে তাহরিমা ছাড়া প্রথম রাকাতে অতিরিক্ত সাত তাকবির (মতান্তরে ৬ তাকবির) এবং দ্বিতীয় রাকাতে ১ম রাকাত থেকে উঠার তাকবির ছাড়া পাঁচ তাকবির দেওয়া অধিক হাদিস সম্মত।
এ ব্যাপারে হাদিসের কিতাবগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

✪ তন্মধ্যে একটি হাদিস নিম্নরূপ:
عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يُكَبِّرُ فِي الْفِطْرِ وَالأَضْحَى فِي الأُولَى سَبْعَ تَكْبِيرَاتٍ وَفِي الثَّانِيَةِ خَمْسًا ‏.‏

আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সালাতে প্রথম রাকআতে সাতবার এবং দ্বিতীয় রাক‘আতে পাঁচবার তাকবির বলতেন।” [সুনানে আবু দাউদ, অধ্যায়: সালাত, অনুচ্ছেদ: দুই ঈদের তাকবীর, হা/১১৪৯, সনদ সহিহ]

✪ আরেকটি হাদিস:

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ، قَالَ قَالَ نَبِيُّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ التَّكْبِيرُ فِي الْفِطْرِ سَبْعٌ فِي الأُولَى وَخَمْسٌ فِي الآخِرَةِ وَالْقِرَاءَةُ بَعْدَهُمَا كِلْتَيْهِمَا ‏”‏ ‏
আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “ঈদুল ফিতরের সালাতের তাকবির হচ্ছে প্রথম রাকআতে সাতটি এবং দ্বিতীয় রাকাতে পাঁচটি এবং উভয় রাকাতেই তাকবিরের পর কিরাত পড়তে হবে।” [সুনানে আবু দাউদ, অধ্যায়: সালাত, অনুচ্ছেদ: দুই ঈদের তাকবির, হা/১১৫১, সনদ সহিহ]

এ মর্মে আরও অনেক হাদিস বিদ্যমান।

◉ ইরাকি‌ বলেন, এটি অধিকাংশ সাহাবি, তাবেয়ি ও ইমামদের অভিমত।

◉ ইবনে আব্দুল বার রহ. বলেন,‌ দুই ঈদের নামাজের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে ‘হাসান’ সনদে বহু রেওয়ায়েত রয়েছে যে, তিনি প্রথম রাকাতে ৭ তাকবির ও দ্বিতীয় রাকাতে ৫ তাকবির দিয়েছেন। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম এ নিয়ে তীব্র মতানৈক্য করেছেন। অনুরূপভাবে তাবেয়ীণ এ নিয়ে মতভেদ করেছেন। [তামহীদ (১৬/৩৭-৩৯) থেকে সমাপ্ত]

🔸৬ তাকবিরে ঈদের সালাত পড়া কি বৈধ?
প্রথম রাকাতে তাকবিরে তাহরিমার পর কিরাতের আগে ৩ তাকবির এবং দ্বিতীয় রাকাতে কিরাতের পর ৩ তাকবীর। এটি একদল সাহাবি, ইবনে মাসউদ রা., আবু মুসা রা. ও আবু মাসউদ আনসারি‌ রা. থেকে বর্ণিত আছে এবং এটি ইমাম সাওরি রহ. ও ইমাম আবু হানিফা রহ. এর অভিমত।” [নাইলুল আওতার (৩/৩৫৫) থেকে সমাপ্ত]। মোটকথা, ঈদের সালাত ১২ তাকবিরে পড়া হোক অথবা ৬ তাকবিরে উভয়টি সহীহ। তবে ১২ তাকবীরের হাদিস সংখ্যা প্রচুর এবং অধিক শক্তিশালী হওয়া এটি অধিক উত্তম। (যেমনটি শাইখ আলবানী বলেছেন)।
আরেকটি বিষয় হল, এই অতিরিক্ত তাকবিরগুলো সুন্নত; রোকন বা ওয়াজিব নয়।
সুতরাং ইমাম ৬ তাকবিরে ঈদের সালাত পড়ুক অথবা ১২ তাকবিরে পড়ুন সকল অবস্থায় তার পেছনে সালাত পড়া জায়েজ। কেবল তাকবিরের সংখ্যাকে কেন্দ্র করে ঈদের মাঠে ঝগড়া-মারামারি করা বা ঈদের মাঠ ভাগ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

ঈদের সেলামি বা টাকা আদান-প্রদান কি জায়েজ

 উত্তর: সেলামি/সেলামী (বিশেষ্য পদ)। শাব্দিক অর্থ: নজরানা, উপঢৌকন; জমিদার, বাড়িওয়ালা ইত্যাদিকে উপহারস্বরূপ দেয় টাকা। (English & Bengali Online Dictionary & Grammar) আর ‘ঈদ সেলামি’ বলতে বুঝায়, ঈদ উপলক্ষে বড়দের পক্ষ থেকে ছোটদেরকে উপহার, উপঢৌকন-বিশেষ করে উপহারস্বরূপ দেয় টাকা। ইসলামের দৃষ্টিতে এতে কোনও আপত্তি নেই। এটি একটি সুস্থ ও সুন্দর সামাজিক রীতি এবং চারিত্রিক সৌন্দর্য। ‌এতে ছোটদের প্রতি স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।ঈদ সেলামি পেলে ছোটরা আনন্দিত হয়। এতে তাদের ঈদের উৎসব আরও বেড়ে যায়। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষকে খুশি করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ। তাছাড়া ইসলামে উপহার লেনদেন করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। কেননা এতে পারস্পারিক ভালোবাসার বন্ধন সুদৃঢ় হয়। বিশেষ করে ছোটরা বড়দের স্নেহ-মমতা ও ভালবাসা পাওয়ার বেশি হকদার। তবে ঈদ সেলামি দেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য রাখা দরকার। যথা:

◉ ১. আমাদের দেশে ঈদ সেলামি পাওয়ার জন্য ছোটরা বড়দের পা ছুয়ে সালাম করে। এটি সম্পূর্ণ অনৈসলামিক কালচার। এর সম্প্রসারণ রোধ করা জরুরি। কেউ এমনটি করলে তাকে নিষেধ করতে হবে।
◉ ২. সেলামি দেওয়ার ক্ষেত্রে ছোট ভাই, বোন ও সন্তানদের কাউকে দেওয়া দেওয়া হবে আর কাউকে বঞ্চিত করা হবে-এমনটি যেন না হয়। কেননা এতে পারস্পারিক হিংসা-বিদ্বেষ ও মনোমালিন্য সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
◉ ৩. সবাইকে সমানভাবে উপহার দেওয়া জরুরি নয় বরং বয়স ও অবস্থা অনুযায়ী কম-বেশি করা যাবে। যেমন: বড়কে বেশি আর ছোটকে কম, বিবাহিতকে এক রকম অবিবাহিতকে অন্য রকম। এতে কোন আপত্তি নাই।

◉ ৪. তারা কীভাবে তা খরচ করছে সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখা জরুরি। কেননা অনেক সময় বাচ্চারা হাতে টাকা পেয়ে নানা আজেবাজে ও অনর্থক কাজে ব্যয় করে। অনেকে বিভিন্ন গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়। তাই অভিভাবকদের এ বিষয়টি লক্ষ্য রাখা জরুরি। আল্লাহু আলাম।▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

আমল কবুলের কতিপয় উপায় এবং রমজানের পরে করণীয়

 যে কোন সৎ আমল করার পর আমাদের নিকট যে বিষয়টি মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় তা হল: আমল কবুলের বিষয়; কবুল হল কি হল না। নিশ্চয়ই সৎ আমল করতে পারা বড় একটি নেয়ামত; কিন্তু অন্য একটি নেয়ামত ব্যতীত তা পূর্ণ হয় না, যা তার চেয়ে বড়। তা হল, কবুলের নিয়ামত। এটি নিশ্চিত যে, রমজানের পর এত কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে তা যদি কবুল না হয় তবে অবশ্যই এক মহা বিপদ। এর চেয়ে আর বড় ক্ষতি কী রয়েছে যদি আমলটি প্রত্যাখ্যাত হয়, আর দুনিয়া আখিরাতের স্পষ্ট ক্ষতিতে প্রত্যাবর্তন করে?

বান্দা যেহেতু জানে, অনেক আমলই রয়েছে যা বিভিন্ন কারণে গ্রহণযোগ্য হয় না। অতএব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আমল কবুলের কারণ ও উপায় সম্পর্কে জানা। যদি কারণগুলো তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে তবে যেন আল্লাহর প্রশংসা করে এবং ক্রমাগত তার উপর অটল থাকে ও আমল করে যায়। আর যদি তা বিদ্যমান না পায় তবে এ মুহূর্তেই যে বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিতে হবে তা হল, ইখলাসের সাথে সেগুলোর মাধ্যমে আমল করায় সচেষ্ট হওয়া।

❒ আমল কবুলের কতিপয় উপায়:

১. স্বীয় আমলকে বড় মনে না করা ও তার উপর গর্ব না করা:
মানুষ যত আমলই করুক না কেন, আল্লাহ তার দেহ থেকে শুরু করে সার্বিকভাবে যত নেয়ামত তাকে প্রদান করেছেন, সে তুলনায় আল্লাহর সে মূলত: কিছুই হক আদায় করতে পারেনি।
সুতরাং একনিষ্ঠ ও খাঁটি মুমিনের চরিত্র হল, তারা তাদের আমল সমূহকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে, বড় মনে করে গর্ব-অহংকার করবে না; যার ফলে তাদের সওয়াব নষ্ট হয়ে যায় ও অলসতা এসে যায় সৎ আমল করার ক্ষেত্রে।

❒ স্বীয় আমলকে তুচ্ছ জ্ঞান করার সহায়ক বিষয়:

(১) আল্লাহ তাআলাকে যথাযথভাবে জানা ও চেনা।
(২) তাঁর নিয়ামত সমূহ উপলব্ধি করা
(৩) ও নিজের গুনাহ-খাতা ও অসম্পূর্ণতাকে স্মরণ করা। যেমন: আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে গুরু দায়িত্ব অর্পণের পরে অসিয়ত করেন:
“(নবুয়তের বোঝা বহন করত:) তুমি (তোমার রবের প্রতি) অনুগ্রহ প্রকাশ কর না যার ফলে বেশি কিছু আশা করবে।” [সূরা মুদ্দাসসির: ৬]
২. আমলটি কবুল হবে কিনা, এ মর্মে আশঙ্কিত থাকা: সালাফে সালেহীন-সাহাবায়ে কিরাম আমল কবুল হওয়ার ব্যাপারটিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন। এমনকি তাঁরা ভয় ও আশঙ্কায় থাকতেন। যেমন: আল্লাহ তাঁদের অবস্থা বর্ণনা করে বলেন, “যারা ভীত-কম্পিত হয়ে দান করে যা দান করার।‌কেননা তারা তাদের রবের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে।” [মুমিনুন: ৬০]

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আয়াতের ব্যাখ্যা করেন যে, “তারা রোজা রাখে, নামাজ আদায় করে, দান-খয়রাত করে আর ভয় করে যে, মনে হয় তা কবুল হয় না।” আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, “তোমাদের পক্ষ হতে তোমাদের আমল সমূহ কবুল হওয়ার ব্যাপারে তোমরা খুব বেশি গুরুত্ব প্রদান কর। তোমরা কি আল্লাহর বাণী শ্রবণ কর না। “নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের পক্ষ হতেই কবুল করে থাকেন।” [সূরা: মায়েদা: ২৭]

৩. আমল কবুলের আশা পোষণ ও দুআ করা:
আল্লাহর প্রতি ভয়ই যথেষ্ট নয়।‌বরং অনুরূপ তাঁর নিকট আশা পোষণ করতে হবে। কেননা আশা বিহীন ভয় নিরাশ হওয়ার কারণ এবং ভয় বিহীন আশা আল্লাহর শাস্তি হতে নিজেকে মুক্ত মনে করার কারণ।‌অথচ উভয়টিই দোষনীয়, যা মানুষের আকিদা ও আমলে মন্দ প্রভাব বিস্তার করে।

জেনে রাখুন! আমল প্রত্যাখ্যান হয়ে যাওয়ার ভয়-আশঙ্কার সাথে সাথে আমল কবুলের আশা পোষণ মানুষের জন্যে বিনয়-নম্রতা ও আল্লাহ ভীতি এনে দেয়। যার ফলে তার ঈমান বৃদ্ধি পায়। যখন বান্দার মধ্যে আশা পোষণের গুণ সাব্যস্ত হয় তখন সে অবশ্যই তার আমল কবুল হওয়ার জন্য তার প্রভুর নিকট দু হাত তুলে প্রার্থনা করে। যেমন করেছিলেন আমাদের পিতা ইবরাহিম খলিল ও তাঁর পুত্র ইসমাইল (আলাইহিমাস সালাম)। যা আল্লাহ তাআলা তাদের কাবা গৃহ নির্মাণের ব্যাপারটি উল্লেখ করে বর্ণনা করেন।

“যখন ইবরাহিম ও ইসমাইল (আলাইহিমাস সালাম) বায়তুল্লাহর ভিত্তি বুলন্দ করেন (দুআ করেন): “হে আল্লাহ, আমাদের প্রতিপালক তুমি আমাদের দুআ কবুল করেনিও।নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ।” [সূরা বাকারা: ১২]

৪. বেশি বেশি ইস্তেগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করা:
মানুষ তার আমলকে যতই পরিপূর্ণ করার জন্য সচেষ্ট হোক না কেন, তাতে অবশ্যই ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা থেকেই যাবে। এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে শিক্ষা দান করেছেন, কিভাবে আমরা সে অসম্পূর্ণতাকে দূর করব।
তাইতো তিনি আমাদেরকে ইবাদত-আমলের পর ইস্তেগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনার শিক্ষা দান করেন। যেমন: আল্লাহ তাআলা হজের হুকুম বর্ণনার পর বলেন, “অত:পর তোমরা (আরাফাত) হতে প্রত্যাবর্তন করে, এসো যেখান থেকে লোকেরা প্রত্যাবর্তন করে আসে। আর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাক,নিশ্চয়ই আল্লাহ মহা ক্ষমাশীল ও দয়াবান।” [সূরা বাকারা: ১৯৯] আর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রত্যেক নামাজের পর তিন বার করে “আস্তাগফিরুল্লাহ” (আমি তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি) বলতেন।

৫. বেশি বেশি সৎ আমল করা:নিশ্চয়ই সৎ আমল একটি উত্তম বৃক্ষ। বৃক্ষের প্রয়োজন পরিচর্যা, যেন তা বড় এবং শক্ত হয়ে ওঠে এবং ফল দিতে পারে। সৎ আমলের পর সৎ আমল করে যাওয়া অবশ্যই আমল কবুলের একটি অন্যতম আলামত। আর এটি আল্লাহর বড় অনুগ্রহ ও নেয়ামত, যা তিনি তার বান্দাকে প্রদান করে থাকেন। যদি বান্দা উত্তম আমল করে ও তাতে ইখলাস বজায় রাখে তখন আল্লাহ তার জন্য অন্যান্য উত্তম আমলের দরজা খুলে দেন। যার ফলে তার নৈকট্যের ও বৃদ্ধি পায়।
৬. সৎ আমলের উপর অবিচল থাকা এবং এতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা:

যে ব্যক্তি নেকি অর্জনের মৌসুম অতিবাহিত করার পর সৎআমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চায়, তার জন্য জরুরি হল, সে যেন সৎ আমলের ওর অবিচল থাকার গুরুত্ব, ফজিলত, উপকারিতা, তার প্রভাব, তা অর্জনের সহায়ক বিষয়ে সালাফে-সালেহীনের অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করে।

– সৎ আমলের উপর অবিচল থাকার গুরুত্ব:

ইসলামি শরিয়তে সৎ আমলের উপর অবিচল থাকার গুরুত্ব নিন্মের বিষয়গুলো হতে ফুটে ওঠে:

১. আল্লাহ তাআলার ফরজ সমূহ। যা অবশ্যই ধারাবাহিতকতার ভিত্তিতেই ফরজ করা হয়েছে এবং তা আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল।
২. সৎ আমলের স্থায়িত্ব ও ধারাবাহিকতা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর অন্যতম তরিকা ও নীতি।
৩. ক্রমাগত আমল ও তার ধারাবাহিকতা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিকট উত্তম আমলের অন্তর্ভুক্ত। রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল হল, যা নিয়মিতৎভাবে করে যাওয়া হয়, যদিও তা অল্প হয়।” [বুখারী-মুসলিম]

– সৎ আমলের উপর অবিচল থাকার প্রভাব ও উপকারিতা:

আল্লাহ তাআলা তাঁর সৎ আমলের হেফাজত কারী বান্দাদেরকে বহুভাবে সম্মানিত ও উপকৃত করে থাকেন। যেমন:
১. স্রষ্টার সাথে তার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ; যা তাকে অগাধ শক্তি, দৃঢ়তা, আল্লাহর সাথে নিবিড় সম্পর্ক ও তার উপর বিশাল আস্থা তৈরি করে দেয়। এমনকি তার দুঃখ-কষ্ট ও চিন্তা-ভাবনায় আল্লাহই যথেষ্ট হয়ে যান। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করবে আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট।” [সূরা তালাক: ৩ ]

২. অলসতা-উদাসীনতা হতে অন্তরকে ফিরিয়ে রেখে সৎ আমলকে আঁকড়ে ধরার প্রতি অভ্যস্ত করা যেন ক্রমান্বয়ে তা সহজ হয়ে যায়। যেমন কথিত রয়েছে: “তুমি তোমার অন্তরকে যদি সৎআমলে পরিচালিত না কর, তবে সে তোমাকে গুনাহর দিকে পরিচালিত করবে।”

৩. এ নীতি অবলম্বন হল, আল্লাহর মোহব্বত ও অভিভাবকত্ব লাভের উপায়। যেমন হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, “আমার বান্দা নফল ইবাদতসমূহ দ্বারা আমার নৈকট্য অর্জন করতেই থাকে, এমনকি তাকে আমি মহব্বত করতে শুরু করি।” (বুখারী)

৪. সৎআমলে অবিচল থাকা বিপদ-আপদে মুক্তির একটি কারণ। যেমন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) কে উপদেশ দেন: “আল্লাহকে হেফাজত কর (অর্থাৎ তার হুকুম-আহকামগুলো পালন কর) তবে তিনিও তোমাকে হেফাজত করবেন, আল্লাহকে হেফাজত কর তবে তুমি তাঁকে তোমার সামনে পাবে। সুখ ও সচ্ছল অবস্থায় তাঁকে চেন তাহলে তিনি তোমাকে বিপদে চিনবেন।” [মুসনাদে আহমদ]

৫. সৎ আমলে অবিচলতা অশ্লীলতা ও মন্দ আমল হতে বিরত রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও অন্যায় কাজ হতে বিরত রাখে।” [সূরা আনকাবূত: ৪৫]

৬. সৎ আমলে অবিচল থাকা গুনাহ-খাতা মিটে যাওয়ার একটি মাধ্যম। যেমন: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: “তোমাদের কারো দরজায় যদি একটি নদি থাকে, আর সে তাতে প্রতিদিন পাঁচবার করে গোসল করে, তবে তার দেহে কি কোন ময়লা অবশিষ্ট থাকবে? সাহাবিগণ বলেন, না। তখন তিনি বলেন, ঠিক এমনই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ।‌ আল্লাহ যার দ্বারা গুনাহ সমূহকে মিটিয়ে দেন।” (বুখারী-মুসলিম)

৭. সৎ আমলে অবিচল থাকা, শেষ পরিণাম ভাল হওয়ার মাধ্যম। যেমন: আল্লাহ বলেন,
“যারা আমার পথে চেষ্টা-সাধনা করবে অবশ্যই আমি তাদেরকে আমার পথ দেখিয়ে দিব,নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎ‌ আমল কারীগণের সাথে আছেন।” [সূরা আনকাবূত: ৬৯]

৮. এটি কিয়ামতের দিন হিসাব সহজ হওয়া ও আল্লাহর ক্ষমা লাভের অন্যতম উপায়।

৯. এ নীতি মুনাফেকি হতে অন্তরের পরিশুদ্ধতা ও জাহান্নামের আগুন হতে পরিত্রাণের একটি উপায়।
যেমন: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন (ক্রমাগত) জামায়াতের সাথে প্রথম তাকবির পেয়ে নামাজ আদায় করবে তার জন্য রয়েছে দু প্রকার মুক্তির ঘোষণা:
(১) জাহান্নামের আগুন হতে মুক্তি ও
(২) মুনাফেকি হতে মুক্তি। [তিরমিযী-হাসান]

১০. এটি জান্নাতে প্রবেশের উপায়:

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “যে ব্যক্তি কোন জিনিসের দু প্রকার আল্লাহর রাস্তায় খরচ করল, তাকে জান্নাতের দরজাসমূহ হতে আহ্বান করা হবে। জান্নাতের রয়েছে আটটি দরজা। সুতরাং যে ব্যক্তি নামাজি তাকে নামাজের দরজা দিয়ে আহ্বান করা হবে, যে ব্যক্তি জিহাদ কারী তাকে জিহাদের দরজা দিয়ে আহ্বান করা হবে, যে ব্যক্তির দান কারী তাকে দানের দরজা দিয়ে আহ্বান করা হবে এবং যে ব্যক্তি রোজাদার তাকে রাইয়ান নামক দরজা দিয়ে আহ্বান করা হবে।” [বুখারী-মুসলিম]

১১. যে ব্যক্তি নিয়মিত সৎ আমল করে অতঃপর অসুস্থতা, সফর বা অনিচ্ছাকৃত ঘুমের কারণে যদি সে আমল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে তার জন্য উক্ত আমলের সওয়াব লিখা হবে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “বান্দা যখন অসুস্থ হয় বা সফর করে, তবে তার জন্য অনুরূপ সওয়াব লিখা হয় যা সে গৃহে অবস্থানরত অবস্থায় ও সুস্থ অবস্থায় করত।” [সহিহ বুখারি]

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “যে ব্যক্তির রাতে নামাজ ছিল কিন্তু ঘুমের কারণে তা আদায় করতে পারল না আল্লাহ তার জন্য সে নামাজের সওয়াব লিখে দিবেন এবং তার তার ঘুম হবে তার জন্য সদকা স্বরূপ। [নাসায়ী ও মুয়াত্তা মালিক-সহীহ]

❒ রমজানের পর করণীয়:

মাহে রমজান হতে আমরা কী উপকারিতা লাভ করলাম? আমরা তো কোরআনের মাস কে বিদায় জানালাম। অমরা অতিবাহিত করলাম তাকওয়ার মাস। আমরা বিদায় জানালাম ধৈর্যের মাস। যাতে আমরা আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ ও পাপাচার হতে বিরত থাকার মাধ্যমে ধৈর্যের অনুশীলন করেছি। আমরা অতিবাহিত করলাম জিহাদের মাস। ২য় হিজরির এ মাসেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল, হক ও বাতিলের পার্থক্য নিরূপণ কারী ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ। আমরা অতিবাহিত করলাম রহমতের মাস, বরকতের মাস, মাগফিরাতের মাস ও জাহান্নামের আগুন হতে মুক্তির মাস (উল্লেখ্য উক্ত বিষয়গুলো একমাত্র রমজানের জন্যই নির্ধারিত নয় বরং সব সময়ের জন্য। তবে এ মাসে এ গুলোর গুরুত্ব ও ফজিলত বেশি)।

যেহেতু আমরা রমজানের প্রতিষ্ঠান হতে মুত্তাকির সনদ নিয়ে বের হলাম, তবে কি আমরা যথাযথ তাকওয়া অর্জন করতে পেরেছি?

আমরা কি আত্মা ও প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদে বিজয় লাভ করতে পেরেছি? না অপসংস্কৃতি, কুসংস্কার, বদভ্যাস, যত অনৈসলামি কৃষ্টি-কালচার আমাদের মাঝে ছেয়ে বসেছ?

আমরা কি রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও মুক্তি পাওয়ার মাধ্যমগুলোর অনুশীলন করেছি? বহু জিজ্ঞাসা…এর উত্তর নিজেই তালাশ করি।
রমজান হল ঈমান বৃদ্ধির এক মহাবিদ্যালয়। এটি অবশিষ্ট বছরের আত্মিক পাথেয় সংগ্রহের এক মহাকেন্দ্র। সুতরাং যে এই রমজান হতে উপদেশ ও উপকার গ্রহণ করতে পারল না এবং স্বীয় জীবনকে পরিবর্তন করতে পারল না তবে কখন?

আসুন, আমরা এই মহাবিদ্যালয় হতে আমাদের আমল, আখলাক চরিত্র, অভ্যাস ও ব্যবহারকে ইসলামি শরিয়ত সম্মত করি। আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ اللّهَ لاَ يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُواْ مَا بِأَنْفُسِهِمْ

“আল্লাহ কোন জাতির অবস্থান পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা তাদেরনিজেদের অবস্থাননিজে পরিবর্তন না করে।” (আর রাদ: ১১)

❒ রমজান কেন্দ্রিক মানুষের প্রকারভেদ:

১. রমজানের পূর্বেও তারা আল্লাহর অনুগত হয়ে ইবাদত-বন্দেগি করত। রমজান মাসের আগমনে এর ফজিলত ও গুরুত্ব উপলব্ধি করে তারা আরও তৎপর হয়। তাঁদের প্রতি আমাদের আহ্বান তাঁরা যেন রমজানের পরেও আল্লাহর আনুগত্য ও অনুসরণে এবং ইবাদত- বন্দেগিতে সদা অটল থাকেন।

২. রমজানের পূর্বে তারা ছিল গাফেল-উদাসীন। রমজান মাসের আগমনে এর ফজিলত ও গুরুত্ব উপলব্ধি করে তারা তৎপর হয়। এদেরকে আমরা আহ্বান জনাই , তারা যেন রমজানের পর ইবাদত-বন্দেগি হতে পুনরায় গাফেল না হয়ে আজীবন ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।

৩. রমজান আগমন করল ও বিদায় হয়ে গেল তাদের কোন উপলব্ধি ও পরিবর্তন ঘটল না। তাদেরকে আমরা উদাত্ত আহ্বান জানাই, আল্লাহরনিকট তওবা করতে ও তাঁর আনুগত্যের পথে ফিরে আসতে।

প্রিয় পাঠক, আপনি যদি রমজান হতে যারা উপকৃত তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে মুত্তাকি-পরেহেযগারদের গুণে গুণান্বিত হন এবং যথাযথ রোজা পালন করে থাকেন। প্রকৃত ভাবেই ইবাদত-বন্দেগি করে থাকেন এবং কু প্রবৃত্তিকে যথাযথ দমন করে থাকেন তবে আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন এবং তার উপর মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য আল্লাহরনিকট প্রার্থনা করুন।
পক্ষান্তরে আপনাকে সতর্ক থাকার আহবান জানাই, আপনি ঐ ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত হবেন না যেমন এক বুড়ি উত্তমরূপে চরকায় সূতা, কেটে সুন্দর একটি পোশাক তৈরি করল যার ফলে সবাই তার প্রশংসা করল ও মুগ্ধ হল এবং সেনিজেও আনন্দিত হল। হঠাৎ করে একদিন অকারণেই উক্ত পোশাকটি একটি একটি করে সুতা খুলে নষ্ট করে ফেলল। অতএব মানুষ তাকে কি বলতে পারে?

ঠিক অনুরূপ ঐ ব্যক্তির অবস্থা যে রমজানোত্তর পুনরায় পাপাচার ও অন্যায়ে ফিরে আসে এবং সৎ আমল পরিত্যাগ করে এরা কতইনানিকৃষ্ট যারা আল্লাহকে শুধুমাত্র রমজানেই স্মরণ করে।

এ মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلاَ تَكُونُواْ كَالَّتِي نَقَضَتْ غَزْلَهَا مِن بَعْدِ قُوَّةٍ أَنكَاثًا
” তোমরা সেই নারীর মত হয়ো না , যে তার সূতা মজবুত করে পাকাবার পর তার পাক খুলে নষ্ট করে দেয়।” (সূরা নাহাল: ৯২)

❒ রমজানের পর অঙ্গিকার ভঙ্গ করে পাপাচারে ফিরে যাওয়ার লক্ষণ:

রমজান মাসে সৎ আমলের যথাযথ অনুশীলন করা সত্ত্বেও কৃত অঙ্গিকার ভঙ্গ করার বহু লক্ষণ রয়েছে দৃষ্টান্ত স্বরূপ:

(১) ঈদের দিনই জামাতের সাথে নামাজ আদায় না করা বা পূর্ণ পাঁচ ওয়াক্ত আদায় না করা।
(২) ঈদের খুশির নামে গান বাজনা, ছায়াছবি, ডিশ ও ভিডিও তে অবৈধ অনুষ্ঠানমালা দর্শনে মেতে ওঠা এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে বেহায়াপনা ও অশ্লীলতার চর্চা।
(৩) ঈদ উপলক্ষে বেপর্দা ও অবাধে নারীদের বিচরণ করা এবং পার্ক, বিভিন্ন অনুষ্ঠান কেন্দ্র ও খেল-তামাশার স্থানে নারী-পুরুষের অবাধ সংমিশ্রণ।

তবে এ গুলোই কি রমজানের আমলগুলো কবুলের আলামত? না বরং এ সব হচ্ছে তার আমল কবুল না হওয়ার আলামত। কেননা প্রকৃত রোজাদার ঈদের দিন আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আদায় করে। খুশি হবে যে সে দীর্ঘ একমাস আল্লাহর হুকুম পালন করে আজ অনেক কিছু হতে মুক্ত। এবং সাথে সাথে সে ভয়ে ভিত থাকবে যে আল্লাহ আমার আমল নাও কবুল করতে পারেন। এ জন্য সে তাঁরনিকট প্রার্থনা করবে যাতে উক্ত আমল কবুল হয়। যেমন আমাদের মহান উত্তর সূরীগণ ছয়মাস পর্যন্ত রমজানের আমলগুলো কবুল হওয়ার জন্য আল্লাহরনিকট প্রার্থনা করতেন।
সুতরাং রমজানের আমল কবুলের আলামত হল, বান্দানিজেকে তার পূর্বের অবস্থার চেয়ে উত্তমাবস্থায় পৌঁছাবে এবং সৎ কর্মে পূর্বের চেয়ে অগ্রগামী হবে। অতএব আমরা শুধু মৌসুম ভিত্তিক এবাদত করেই বিরত থাকব না বরং আমরা সব সময়ের জন্য এবাদত জারি রাখব। কেননা আল্লাহ বলেন,

وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ

” তুমি মৃত্যু অবধি তোমার রবের এবাদত করতে থাক।” (সুরা হিজর: ৯৯)

❒ রমজানের পর আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষা:

রমজান অতিবাহিত হয়ে গেলেও মুমিনদের জন্য মৃত্যু পর্যন্ত আমলের ধারাবাহিকতা ছিন্ন হবে না:

✪ প্রথমত: রমজানের রোজা শেষ হলেও অবশিষ্ট মাসগুলোতে বহু নফল রোজা রয়েছে। যেমন:

(১) শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি রমজান মাসের রোজা রাখার পর শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা মিলিয়ে নিলো তার পুরা বছরের রোজা রাখার সমতুল্য হল।” (মুসলিম)

কেননা সাওবান (রা.) হতে মারফু হিসেবে বর্ণিত হয়েছে, রমজান মাসের রোজা দশ মাসের তুল্য আর শাওয়ালের ছয় দিনের রোজা দুই মাসের সমান। এভাবেই পূর্ণ বছরের রোজা। [ইবনে খুজাইমা ও ইবনে হিব্বান আর ইবনে জারুল্লাহর রিসালায়ে রমজান হতে গৃহীত]

আর প্রত্যেক আমলের নেকি দশগুণ বৃদ্ধি পায়। অতএব রমজান মাসের রোজা তিন শত দিনের সমান এবং শাওয়ালের ছয়টি রোজা ৬০দিনের সমান। অতএব সর্বমোট ৩৬০দিন আর হিজরি বছর হয় ৩৬০ দিনে।

(২) প্রতি চন্দ্র মাসের তিন দিন রোজা রাখা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “প্রতি মাসের তিন দিন এবং এক রমজান হতে অন্য রমজানের রোজা পূর্ণ বছর রোজা রাখার সমতুল্য। (মুসলিম) আর এ রোজা প্রতিমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রাখা উত্তম যা অন্য হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত।

(৩) প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবার ও সোমবার রোজা রাখা: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, সোম ও বৃহস্পতিবার আমলনামা আল্লাহরনিকট পেশ হয়। সুতরাং আমি পছন্দ করি যে, আমার আমল পেশ হচ্ছে এমতাবস্থায় আমি রোজা আছি।”(তিরমিযী: ৭৪৭, তিনি হাদিসটি হাসান বলেছেন)

(৪) আরাফা দিনের রোজা: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম))কে আরাফা দিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, “এই রোজা বিগত বছর ও আগামী বছরের (ছোট গুনাহের) কাফফারা হয়।” (মুসলিম)।

(৫) আশুরার রোজা: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে আশুরার রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, “বিগত বছরের (ছোট) গুনাহের কাফফারা।” (মুসলিম)

(৬) শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রাখা: শবে বরাত ধারণা করে ১৫ই শাবানকে নির্ধারণ না করে এ মাসে বেশি বেশি রোজা রাখা যায়। কেননা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রমজানের পর এ মাসেই বেশি রোজা রাখতেন। ১৫ই শাবান খাস করেননি।

✪ দ্বিতীয়ত: রমজানের তারাবির নামাজ শেষ, তবে এই নামাজ তথা কিয়ামুল লাইল তাহাজ্জুদ হিসেবে সারা বছর পড়া যায়। নবী (সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ফরজ ব্যতীত সর্বোত্তম নামাজ হল রাত্রির নামাজ- তাহাজ্জুদ। (মুসলিম)

✪ তৃতীয়ত: ফরজ নামাজ সংশ্লিষ্ট ১২ রাকাত সুন্নতে মুয়াকাদা আদায়: জহরের পূর্বে চার রাকাত পরে দুই রাকাত, মাগরিবের পর দুই রাকাত, এশার পর দুই রাকাত এবং ফজরের পূর্বের দুই রাকাত। নবী (সাল্লাল্লাহু আলই হি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “যে ব্যক্তি ফরজ ছাড়াও ১২ রাকাত দিবা রাত্রিতে সুন্নত আদায় করল আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদনির্মাণ করবেন।” (মুসলিম)

✪ চতুর্থত: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ইরশাদ কৃত নামাজের পরে ও সকাল সন্ধ্যার দোয়া জিকির।

✪ পঞ্চমত: সাদাকাতুল ফিতর শেষ হলেও সারা বছর সাধারণ দান-সদাকা করা যায়।

✪ ষষ্ঠত: কুরআন তেলাওয়াতের ফজিলত সব সময়ের জন্য; শুধু রমজানের জন্য নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যারা কুরআন হতে একটি অক্ষর পড়ল তার জন্য একটি নেকি, আর একটি নেকি দশগুণে বর্ধিত হয়। আমি বলি না যে “আলিফ লাম মিম” মাত্র একটি অক্ষর বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর, ও মিম একটি অক্ষর।” [তিরমিযী:২৯১০, তিনি হাদিসটি সহীহ হাসান বলেছেন] তিনি আরও বলেছেন: “তোমরা কুরআন পাঠকর, কেননা তা কিয়ামতের দিন পাঠকারীদের জন্য শাফায়াত কারী হিসেবে আসবে।” (মুসলিম)

সম্মানিত পাঠক, এ ভাবে সব সময়ের জন্য সৎ আমলের দ্বার উন্মুক্ত রয়েছে। অতএব আপনি যথাযথ প্রচেষ্টা জারি রাখুন, অলসতা বর্জন করুন। যদিও নফল সুন্নতে আপনার দূর্বলতা থাকে কিন্তু কোন ক্রমেই যেন ফরজ আদায়ে ত্রুটি না হয়। যেমন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা ইত্যাদি।
পরিশেষে, আল্লাহর নিকট প্রার্থনা তিনি যেন আমাদেরকে সহীহ আকিদাও সৎ আমলের উপর সুদৃঢ় রাখেন এবং এমতাবস্থায় মৃত্যু দান করেন। আমিন।

লেখক: মুহাম্মাদ আব্দুর রব আফ্ফান
সম্পাদনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

Translate