Sunday, April 21, 2024

নাটক-সিনেমা নির্মাণকারী ও নায়ক-নায়িকা ও অভিনেতা এবং কলা-কুশলী ইত্যাদির প্রতি সতর্কবার্তা

 হারাম নাটক-সিনেমা, মিউজিক ভিডিও ইত্যাদি তৈরিতে যেসব নায়ক-নায়িকা, অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, কলা-কুশলী প্রমুখগণ জড়িত তারা সকলেই মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কারণ যারা সমাজে পাপ কর্মের প্রসার ঘটায় এবং মানুষকে প্রকাশ্যে পাপাচারে উদ্বুদ্ধ করে তাদের অপরাধ অত্যন্ত ভয়ানক। আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন না বলে ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি তিনি তাদেরকে দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় জগতে কঠিন শাস্তির হুমকি দিয়েছেন। যেমন: মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ

“যারা পছন্দ করে যে, ইমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতা প্রসার লাভ করুক, তাদের জন্যে ইহ ও পরকালে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” [সূরা নূর: ১৯]

অশ্লীল, হারাম কার্যক্রম ও পাপকর্ম করা আল্লাহর নিকট ঘৃণিত এবং শাস্তিযোগ্য গুনাহ হলেও আল্লাহ চাইলে এসব গুনাহগারকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। কিন্তু পাপ বিস্তারে জড়িত লোকদের কোন ক্ষমা নেই।

সুতরাং আমাদের সমাজে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হারাম স্টেজ শো, কনসার্ট, গান-বাজনার প্রতিযোগিতা, ছেলে-মেয়েদের মডেলিং, মিউজিক ও নাচ-গান শিক্ষা, মিউজিক ভিডিও, অশ্লীল ওয়েব সিরিজ, নোংরা রোমান্টিক ভিডিও, নাটক-সিনেমা, কাছে আসার গল্প ইত্যাদি নানা ধরনের হারাম জিনিস বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, youtube ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে সমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছে তারা সবাই উক্ত আয়াতের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। কারণ তারা সমাজে অশ্লীলতা প্রসারকারী।
কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ তাদের এই কাজের কারণে গুনাহ অর্জন করবে এর পেছনের কলাকুশলী, চ্যানেলের মালিক, নির্মাতা, ক্যামেরাম্যান, ভিডিও এডিটর, ডিরেক্টর, প্রযোজক, নায়ক-নায়িকা অভিনেতা, স্পন্সর এবং নানাভাবে সহায়তাকারী ইত্যাদি সকলের আমলনামায় তাদের সকলের সমপরিমাণ গুনাহ অবিরাম ধারায় জমা হতেই থাকবে যদি না তারা জীবদ্দশায় আল্লাহর নিকট লজ্জিত অন্তরে তওবা করে এবং তাদের হারাম কার্যক্রম গুলোকে সাধ্য অনুযায়ী মুছে ফেলার চেষ্টা করে।

▪️পাপকর্ম প্রকাশকারীরা আল্লাহর ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে না:

মহান আল্লাহ বান্দার অনেক পাপ গোপন রাখেন এবং তিনি চান মানুষ যেন তাদের গোপন পাপাচার প্রকাশ না করে। যারা গোপন পাপ জনসম্মুখে প্রকাশ করে তাদেরকে তিনি ক্ষমা করবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

كُلُّ أُمَّتِي مُعَافىَ إِلاَّ الْمُجَاهِرِيْنَ، وَإِنّ مِنَ المُجَاهَرَةِ أنْ يَّعْمَلَ الرَّجُلُ بِاللَّيْلِ عَمَلًا ثُمَّ يُصْبِحُ وَقَدْ سَتَرَهُ اللهُ عَلَيهِ فَيقُولُ : يَا فُلَانُ عَمِلتُ الْبَارِحَةَ كَذَا وَكَذَا وَقَدْ بَاتَ يَسْتُرُهُ رَبُّهُ وَيُصبِحُ يَكْشِفُ سِتْرَ اللهِ عَنْه

“পাপকর্ম প্রকাশকারীরা ছাড়া আমার সকল উম্মত ক্ষমা প্রাপ্ত হবে। আর পাপকর্ম প্রকাশ করার অর্থ হলো, কোন ব্যক্তি রাতে কোন পাপকাজ করে, যা আল্লাহ গোপন রাখেন। কিন্তু সকাল হলে সে বলে বেড়ায়, ’হে অমুক, আমি আজ রাতে এই এই কাজ করেছি।’ অথচ সে এমন অবস্থায় রাত অতিবাহিত করেছিল যে, আল্লাহ তার পাপ গোপন রেখেছিলেন। কিন্তু সকালে উঠে সে নিজেই আল্লাহ যা গোপন রেখেছিলেন তা প্রকাশ করে দেয়।” [বুখারী, হা/ ৬০৬৯, মুসলিম, হা/৭৬৭৬]

যারা প্রকাশ্যে পাপাচার করে তারাও সমাজে পাপ ও অশ্লীলতা প্রসারকারী হিসেবে পরিগণিত হবে। কারণ তাদের দেখে অন্যান্য মানুষ আল্লাহর নাফরমানি ও পাপকর্মের পথ খুঁজে পাবে, তাদের দেখে অন্যরা অন্যায়-অপকর্মে অনুপ্রাণিত হয়, যারা সে বিষয়ে জানতো না‌ তারা জানে এবং এর কলা-কৌশল শিখে নেয়। তাদের দেখাদেখি অন্যান্য মানুষের কাছে আল্লাহর শরিয়ত লঙ্ঘন করা সহজ হয়ে যায়।

▪️আল্লাহ তাআলা তার ঈমানদার বান্দাদের অনেক পাপরাশি গোপন রাখেন:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

‏ يُدْنَى الْمُؤْمِنُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ رَبِّهِ عَزَّ وَجَلَّ حَتَّى يَضَعَ عَلَيْهِ كَنَفَهُ فَيُقَرِّرُهُ بِذُنُوبِهِ فَيَقُولُ هَلْ تَعْرِفُ فَيَقُولُ أَىْ رَبِّ أَعْرِفُ ‏.‏ قَالَ فَإِنِّي قَدْ سَتَرْتُهَا عَلَيْكَ فِي الدُّنْيَا وَإِنِّي أَغْفِرُهَا لَكَ الْيَوْمَ ‏.‏ فَيُعْطَى صَحِيفَةَ حَسَنَاتِهِ وَأَمَّا الْكُفَّارُ وَالْمُنَافِقُونَ فَيُنَادَى بِهِمْ عَلَى رُءُوسِ الْخَلاَئِقِ هَؤُلاَءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى اللَّهِ

“কিয়ামতের দিন ঈমানদার ব্যক্তিকে তাদের রবের খুব কাছে নিয়ে আসা হবে। তারপর তিনি তার উপর পর্দা ফেলে দিবেন। এবং তার গুনাহ সম্পর্কে তার থেকে স্বীকারোক্তি গ্রহণ করবেন।
তিনি জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি (তোমার গুনাহ) স্বীকার কর কি? সে বলবে, হে রব! আমি স্বীকার করছি। তারপর তিনি বলবেন, তোমার এ গুনাহ দুনিয়ায় আমি গোপন রেখেছিলাম। আজ তোমার এ গুনাহগুলোকে আমি ক্ষমা করে দিলাম।বিতারপর তার নেকির আমলনামা তার নিকট দেওয়া হবে। আর কা/ফি/র ও মু/না/ফিকদেরকে উপস্থিত সমস্ত মানুষের সামনে ডেকে ঘোষণা দেওয়া হবে, এরাই তারা যারা আল্লাহ তাআলার উপর মিথ্যারোপ করেছিল।”
[সহিহ বুখারী। ‌সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৫১/ তাওবা, পরিচ্ছেদ: ৮. হত্যাকারীর তাওবা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য; যদিও সে বহু হত্যা করে থাকে]

▪️কেউ যদি চায় যে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার গুনাহগুলো প্রকাশ না করুন তাহলে সে যেন দুনিয়াতে তার নিজের বা অন্যের গুনাহগুলো প্রকাশ না করে:

হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«لاَ يَسْتُرُ عَبْدٌ عَبْداً في الدُّنْيَا إلاَّ سَتَرَهُ اللهُ يَوْمَ القِيَامَةِ»
“যে দুনিয়াতে কোনো বান্দার দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।’’ [মুসলিম, হা/২৫৯০, রিয়াদুস সালেহীন, অধ্যায়: বিবিধ, পরিচ্ছেদঃ ২৮: মুসলিমদের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখা জরুরি এবং বিনা প্রয়োজনে তা প্রচার করা নিষিদ্ধ]

▪️কেউ পাপ করলে আল্লাহ চান সে যেন তা প্রকাশ না করে:

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ حَلِيمٌ حَيِيٌّ سِتِّيرٌ يُحِبُّ الْحَيَاءَ وَالسَّتْرَ
“আল্লাহ তাআলা সহনশীল, লজ্জাশীল, তিনি (মানুষের পাপ) ঢেকে রাখেন। তিনি লজ্জাশীলতাকে এবং মানুষের গুনাহগুলোকে ঢেকে রাখতে পছন্দ করেন।” [সহীহ-আবু দাউদ ৪০১২, ইরওয়াউল গালীল ২৩৩৫, মিশকাত ৪৪৭]

– শাইখ আব্দুল হক দেহলভি বলেন, সিত্তীর নামটির অর্থ, মহান আল্লাহ তার বান্দাদেরকে অপদস্থ করেন না এবং তাদের অপকর্মগুলো ঢেকে রাখেন।” [লুময়াতুত তাহকিক ফী শারহে মিশকাতিল মাসাবিহ, ২/১৭৯]

– ইমাম বায়হাকি বলেন,

” ستير ” يعني أنه ساتر يستر على عباده كثيرا ، ولا يفضحهم في المشاهد .
كذلك يحب من عباده الستر على أنفسهم ، واجتناب ما يشينهم ، والله أعلم

“সিত্তীর অর্থ: আল্লাহ মানুষের প্রচুর পরিমাণ (দোষত্রুটি ও গুনাহ) ঢেকে রাখেন। সেগুলোকে জনসম্মুখে প্রকাশ করে দিয়ে তাদেরকে অপদস্থ করেন না। অনুরূপভাবে তিনি এটাও পছন্দ করেন যে, বান্দাগণ কোনও পাপকর্ম করে ফেললে তা যেন ঢেকে রাখে এবং নোংরা ও অশালীন কাজ থেকে দূরে থাকে। আল্লাহ সবচেয়ে বেশি জানেন।” [আল আসমা ওয়াসিফাত, পৃষ্ঠা নাম্বার ১৪৮]
আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

নাটক-সিনেমার নায়ক-গায়ক ও অভিনেতা ও মিউজিক কম্পোজিশনার ও মডেল ইত্যাদির ভয়াবহ পরিণতি এবং তাদের এসব কাজ থেকে উপার্জিত অর্থ হারাম

 ইসলামের দৃষ্টিতে অশ্লীলতা, গান, বাদ্যযন্ত্র বা মিউজিকের ব্যবহার সম্পূর্ণ হারাম এবং আল্লাহর আজাবের কারণ। কুরআন হাদিসে এ ব্যাপারে পর্যাপ্ত সতর্ক বাণী উচ্চারিত হয়েছে।

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করে দিয়েছেন যে, কিয়ামতের পূর্বে এমন একটি সময় আসবে যখন মানুষ গান-বাজনাকে হালাল মনে করবে। তিনি বলেন,

لَيَكُوْنَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّوْنَ الْحِرَ وَالْحَرِيْرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ

“আমার উম্মতের মধ্য থেকে এমন কিছু লোক আসবে যারা জিনা-ব্যভিচার, রেশমি কাপড়, মদ এবং বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।” [বুখারি, হা/৫৫৯০-আবু মালেক আল আশআরী রা. হতে বর্ণিত]

তিনি আরও বলেন,

فِي هَذِهِ الْأُمَّةِ خَسْفٌ وَمَسْخٌ وَقَذْفٌ فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَتَى ذَاكَ قَالَ إِذَا ظَهَرَتِ الْقَيْنَاتُ وَالْمَعَازِفُ وَشُرِبَتِ الْخُمُورُ

‘‘এই উম্মতের মধ্যে ভূমিধ্বস, চেহারা বিকৃতি এবং উপর থেকে নিক্ষেপ করে ধ্বংস করার শাস্তি আসবে।”
জনৈক সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রসুল, কখন এরূপ হবে?
তিনি বললেন, “যখন ব্যাপক হারে গায়িকা, বাদ্যযন্ত্র এবং মদ্যপানের প্রসার ঘটবে।” [তিরমিযী, অধ্যায়: আবওয়াবুল ফিতান। সহীহুল জামে আস্ সাগীর, হাদিস নাম্বার: ৪১১৯]

সুতরাং
– যে সব শিল্পীরা গান গায়,
– যারা বাদ্যযন্ত্র বাজায়,
– যারা গান-বাজনা শিক্ষা দেয় ,
– যারা মিউজিক ভিডিও বানায়,
– যারা অভিনয় করে (নায়ক-নায়িকা ও অন্যান্য অভিনেতাগণ),
– যারা এসব প্রযোজনা, পরিচালনা ও দিকনির্দেশনা দেয়,
– যারা এগুলোর গল্প লিখে ও স্ক্রিপ্ট তৈরি করে,
– যারা ক্যামেরার মাধ্যমে এসব দৃশ্য ধারণ করে,
– যারা মিউজিক কম্পিটিশন করে ও ভিডিও এডিট করে,
– যারা জেনে-বুঝে এ সব কাজের জন্য ঘর বা সরঞ্জাম ভাড়া দেয়,
– যারা এসব প্রচার ও প্রসার করে,
– যারা এগুলো বাজারজাত করে,
– এবং যারা নানাভাবে তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করে তাদের সকলের এই কাজের বিনিময়ে এবং এ সংশ্লিষ্ট ব্যবসা থেকে উপার্জিত সমূদয় অর্থ হারাম। আর হাদিসে এসেছে, হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ جَسَدٌ غُذِّيَ بِالْحَرَامِ

“হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট শরীর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” [বায়হাক্বী, মিশকাত/২৭৮৭; সিলসিলা সহীহাহ হা/২৬০৯।]

◈ এ সকল লোক নিজেরা যেমন পাপ দ্বারা তাদের জীবনকে কুলষিত করে তেমনি সমাজকেও তারা কুলষিত করে। চতুর্দিকে পাপাচার ছড়িয়ে দেয়। এরা সকলেই যুবক-যুবতীদের চরিত্র ধ্বংস এবং অশ্লীলতা ছড়ানোর জন্য দায়ী।

এ সমস্ত লোকের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ

“যারা পছন্দ করে যে, ইমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতা প্রসার লাভ করুক, তাদের জন্যে ইহা ও পরকালে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” [সূরা নূর: ১৯]

যারা কেবল অশ্লীলতার প্রসার লাভ করাকে পছন্দ করে তাদের জন্য যদি এই শাস্তির হুমকি হয় তাহলে যারা এগুলো উৎপাদন ও প্রচার-প্রসার করে তাদের কী পরিণতি হবে তা সহজেই অনুমেয়। আল্লাহ তুমি ক্ষমা করো। আমীন।

◈ আরও আতঙ্কজনক বিষয় হল, বর্তমান ইউটিউব আর ফেসবুকের যুগে এ সকল গান-বাজনা ও নাটক-সিনেমা থেকে যত মানুষ গুনাহ কামাবে, যুগযুগান্তরে যতদিন এগুলো টিভিতে প্রদর্শিত হবে, সোশ্যাল মিডিয়া ও নেট জগতে শেয়ার, আপলোড-ডাউনলোড ইত্যাদি হতে থাকবে, মোবাইল ম্যামরি থেকে ম্যামরিতে কপি-পেস্ট হতে থাকবে ততদিন এর সংশ্লিষ্ট সকলের আমলনামায় অবিরত ধারায় গুনাহ জমা হতেই থাকবে। এমনকি এরা মারা যাওয়ার পরও এ গুনাহের ধারা অব্যাহত থাকবে। (আল্লাহ ক্ষমা করুন)

জারির রা. বলেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

مَنْ سَنَّ فِيْ الإِسْلاَمِ سُنَّةً سَيِّئَةً كَانَ عَلَيْهِ وِزْرُهَا وَ وِزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ بَعْدِهِ مِنْ غَيْرِ أَنْ يُّنْقَصَ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَيْئٌ

“যে ব্যক্তি ইসলামে কোন মন্দ রীতি-নীতি চালু করবে তার উপরই তার গুনাহ বর্তাবে। আর ঐ মন্দ কাজ করে যত মানুষ যে পরিমাণ গুনাহ অর্জন করবে সবার সমপরিমাণ গুনাহ তার আমলনামায় লেখা হবে। কিন্তু তাদের কারো গুনাহ এতটুকুও কম করা হবে না।” [সহিহ মুসলিম]
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

مَنْ سَنَّ سُنَّة سَيِّئَة فعَلَيْهِ مِثْل وِزْر كُلّ مَنْ عمل بِهَا إِلَى يَوْم الْقِيَامَة

”যে ব্যক্তি কোন খারাপ রীতি-নীতি চালু করলো কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ সে কাজ করবে তাদের সমপরিমাণ গুনাহ তার উপর পতিত হতে থাকবে।” [সহিহ মুসলিম: ১৬৯১]

সুতরাং গান-বাজনা, সিনেমা, নাটক, টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন মডেলিং, অভিনয় পেশা, মিউজিক ভিডিও নির্মাণ ইত্যাদি কর্মের সাথে জড়িত প্রত্যেক শিল্পীর জন্য তাদের জীবদ্দশায় লজ্জিত অন্তরে খাঁটি ভাবে তওবা করত আল্লাহর পথে ফিরে আসা আবশ্যক।
তারা যদি তওবা করে এবং তাদের প্রকাশিত পূর্বের সকল গানবাজনা ও ভিডিও ইত্যাদি যথাসম্ভব ধ্বংস কিংবা বন্ধ করার ব্যবস্থা করে তাহলে আশা করা যায়, আল্লাহ তাদের সকল গুনাহ মোচন করে দিবেন ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ আমাদেরকে সব ধরণের পাপাচার, অশ্লীলতা ও আল্লাহর অসন্তোষ মূলক কার্যক্রম থেকে হেফাজত করুন এবং অতীতের সকল গুনাহ থেকে মুক্ত করুন। আমিন।
▬▬▬▬◆◈◆ ▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি। দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

তারাবীহ এর রাকাত সংখ্যা ৮ না ২০

 লেখক: আল্লামা উসাইমীন রহ.

বিংশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ বিশ্ববরেণ্য আলেম সম্মানিত শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রহ. বলেন,

সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব জগতের প্রভু আল্লাহ তায়ালার জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক সর্বশেষ নবী মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর পরিবার এবং তাঁর সকল সাহাবির উপর। অতঃপর আমি তারাবির নামাজ বিষয়ে একটি লিফলেট দেখতে পেলাম, যা মুসলমানদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। আমি আরও জানতে পারলাম যে, প্রবন্ধটি কতিপয় মসজিদে পাঠ করা হয়েছে। প্রবন্ধ বা লিফলেটটি খুবই মূল্যবান। কেননা লেখক তাতে তারাবির নামাজে খুশু-খুজু এবং ধীরস্থিরতা অবলম্বনের উপর উৎসাহ দিয়েছেন। আল্লাহ তাকে ভালো কাজের বিনিময়ে ভালো পুরস্কার দান করুন।

তবে প্রবন্ধটির মধ্যে বেশ কিছু আপত্তি রয়েছে, যা বর্ণনা করা ওয়াজিব মনে করছি। লেখক সেখানে উল্লেখ করেছেন যে, ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান মাসে বিশ রাকাত তারাবি পড়তেন।

এর জবাব হচ্ছে এই হাদিসটি জইফ। ইবনে হাজার আসকালানী সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যা ফতহুল বারীতে বলেন,
وأما ما رواه ابن أبي شيبة” من حديث ابن عباس كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يصلي في رمضان عشرين ركعة والوتر، فإسناده ضعيف، وقد عارضه حديث عائشة هذا الذي في الصحيحين مع كونها أعلم بحال النبي صلى الله عليه وسلم ليلاً من غيرها.

“যে হাদিসটি ইবনে আবী শায়বা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান মাসে বিশ রাকাত তারাবি ও বিতর পড়তেন-তার সনদ দুর্বল। আর এটি বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আয়েশা রা. এর হাদিসের বিরোধী। আয়েশা রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাতের অবস্থা অন্যদের চেয়ে বেশি জানতেন।”

আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত যে হাদিসটির প্রতি ফতহুল বারীর ভাষ্যকার ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. ইঙ্গিত করেছেন, তা ইমাম বুখারী এবং মুসলিম স্বীয় কিতাব দ্বয়ে উল্লেখ করেছেন। আবু সালামা আব্দুর রাহমান আয়েশা রা. কে জিজ্ঞেস করলেন: রমজান মাসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর নামাজ কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বললেন, “রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান কিংবা অন্য মাসে রাতের নামাজ ১১ রাকাতের বেশি পড়তেন না।” (বুখারী) মুসলিমের শব্দে বর্ণিত হয়েছে, তিনি প্রথমে আট রাকাত পড়তেন। অতঃপর বিতর পড়তেন।

আয়েশা রা. এর হাদিসে জোরালো ভাবে এই সংখ্যার উপর যে কোন সংখ্যা অতিরিক্ত করার প্রতিবাদ করা হয়েছে।

ইবনে আব্বাস রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রাতের নামাজের ধরণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন যে, তিনি দুই রাকাত নামাজ পড়তেন, অতঃপর আরও দুই রাকাত পড়তেন। তারপর আরও দুই রাকাত, এভাবে ১২ রাকাত পূর্ণ করে বিতর পড়তেন। (সহীহ মুসলিম) এতে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, তাঁর রাতের নামাজ ১১ রাকাত বা ১৩ রাকাতের মধ্যেই ঘূর্ণয়মান ছিল।
• এখন যদি বলা হয় রাতের নামাজ (তাহাজ্জুদ) আর তারাবির নামাজ এক নয়। কেননা তারাবি হচ্ছে উমর রা. এর সুন্নত। তাহলে উত্তর কী হবে?

এ কথার উত্তর হচ্ছে, রমজান মাসে রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর রাতের নামাজই ছিল তারাবি। সাহাবিগণণ এটিকে তারাবিহ নাম দিয়েছেন। কেননা তারা এটা খুব দীর্ঘ করে পড়তেন। অতঃপর তারা প্রত্যেক দুই সালামের পর বিশ্রাম নিতেন। তারাবিহ অর্থ বিশ্রাম নেওয়া। তারাবিহ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরই সুন্নত ছিল।

সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে, আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, কোন এক রাতে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে নামাজ পড়লেন। তাঁর নামাজকে অনুসরণ করে কিছু লোক নামাজ পড়ল। অতঃপর দ্বিতীয় রাতেও নামাজ পড়লেন। এতে লোক সংখ্যা বৃদ্ধি পেল। অতঃপর তৃতীয় বা চতুর্থ রাতে প্রচুর লোকের সমাগম হল। কিন্তু রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবার ঘর থেকে বের হয়ে তাদের কাছে আসলেন না। সকাল হলে তিনি বললেন: আমি তোমাদের কাজ-কর্ম প্রত্যক্ষ করেছি। আমাকে তোমাদের কাছে বের হয়ে আসতে কোন কিছুই বারণ করে নি, কিন্তু আমি ভয় করলাম যে, তা তোমাদের উপর ফরজ করে দেওয়া হয় কি না? আর এটি ছিল রমজান মাসে। (বুখারী ও মুসলিম)

• আর যদি বলা হয়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ১১ রাকাত পড়েছেন। তার চেয়ে বেশি পড়তে নিষেধ করেননি। সুতরাং রাকাত বাড়ানোর মধ্যে বাড়তি ছাওয়াব ও কল্যাণ রয়েছে।

তার উত্তরে আমরা বলবো যে, কল্যাণ ও ছাওয়াব হয়ত ১১ রাকাতের মধ্যেই সীমিত। কারণ এটি রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর আমল দ্বারা প্রমাণিত। আর সর্বোত্তম হেদায়েত হচ্ছে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হেদায়েত। সুতরাং তাই যদি হয় তাহলে কল্যাণ ও বরকত ১১ রাকাতের মধ্যেই। আর যদি বিশ্বাস করেন যে বাড়ানোর মধ্যেই কল্যাণ, তাহলে বুঝা যাচ্ছে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কল্যাণ অর্জনে ত্রুটি করেছেন এবং উত্তম বিষয়টি তার উম্মতের জন্য গোপন করেছেন। নাউযুবিল্লাহ। এ ধরণের বিশ্বাস রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর ক্ষেত্রে অসম্ভব।

• যদি বলা হয় ইমাম মালিক তার মুআত্তা গ্রন্থে ইয়াজিদ বিন রুমান থেকে বর্ণনা করেছেন যে,
عن يزيد بن رومان قال: كَانَ النَّاسُ يَقُومُونَ فِي زَمَانِ عُمَرَ بنِ الخَطَّابِ فِي رَمَضَانَ بِثَلاثٍ وَعِشرِينَ رَكعةً
ইয়াজিদ বিন রুমান থেকে বর্ণিত, লোকেরা উমর বিন খাত্তাব রা. এর আমলে রমজান মাসে কিয়ামুল লাইল (বিতরসহ) ২৩ রাকাত আদায় করতেন। এই হাদিসের জবাবে কি বলবেন?

এর জবাব হচ্ছে, হাদিসটি দুর্বল ও সহীহ হাদিসের বিরোধী।

দুর্বল হওয়ার কারণ হচ্ছে:

◇ (১) তার সনদে ইনকিতা রয়েছে। অর্থাৎ কোন একজন রাবী বাদ পড়েছে। কারণ ইয়াজিদ বিন রুমান উমর রা. এর যুগ পায়নি। যেমন ইমাম নববী ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ ঘোষণা করেছেন।

◇ (২) ইয়াজিদ বিন রুমানের হাদিসটি ইমাম মালিক (রহ.) তাঁর মুআত্তা গ্রন্থে নির্ভরযোগ্য রাবী মোহাম্মাদ বিন ইউসুফ সায়েব বিন ইয়াজিদ থেকে বর্ণিত সহীহ হাদিসের বিরোধী। সায়েব বিন ইয়াজিদ বলেন,
أمر عمر بن الخطاب أبي بن كعب وتميماً الداري أن يقوما للناس بإحدى عشرة ركعة
উমর বিন খাত্তাব রা. উবাই বিন কা’ব এবং তামীম দারীকে মানুষের জন্য ১১ রাকাত তারাবির নামাজ পড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন। দেখুন: (দেখুন শরহুয যুরকানী ১/১৩৮)

সুতরাং সায়েব বিন ইয়াজিদের হাদিস তিনটি কারণে ইয়াজিদ বিন রুমানের হাদিসের চেয়ে অধিক গ্রহণযোগ্য। কয়েকটি কারণে-

◆ ক) সায়েব বিন ইয়াজিদের হাদিস নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত সহীহ হাদিসের মোতাবেক। উমর রা. এ ব্যাপারে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নত জানা সত্ত্বে কখনই তা বাদ দিয়ে অন্যটি নির্বাচন করতে পারেন না।

◆ খ) ১১ রাকাতের ব্যাপারে সায়েব বিন ইয়াজিদের হাদিসটি সরাসরি উমর রা. এর আদেশের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। আর ইয়াজিদ বিন রুমানের হাদিসটি উমর রা. এর জামানার দিকে নিসবত করা হয়েছে। সুতরাং ইয়াজিদ বিন রুমানের হাদিসে বর্ণিত ২০ রাকাতের উপর উমর রা. এর সমর্থন বুঝায়। আর আদেশ সমর্থনের চেয়ে অধিক শক্তিশালী হয়। কেননা ১১ রাকাত তাঁর সরাসরি আদেশ দ্বারা প্রমাণিত। আর সমর্থন কখনও বৈধ বিষয়ের ক্ষেত্রেও হতে পারে, যদিও তা পছন্দের বাইরে হয়।

সুতরাং উমর রা. ২৩ রাকাতের প্রতি সমর্থন দিয়ে থাকতে পারেন। কেননা রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এ ব্যাপারে নিষিদ্ধতা পাওয়া যায় না। সাহাবিগণণ এ ব্যাপারে ইজতেহাদ করেছিলেন। আর তিনি তাদের ইজতেহাদকে সমর্থন করেছেন। অথচ তিনি ১১ রাকাতই নির্বাচন করে তা আদায় করার আদেশ দিয়েছিলেন।

◆ গ) ১১ রাকাতের ব্যাপারে সায়েব বিন ইয়াজিদের হাদিসটি দোষ থেকে মুক্ত। তার সনদ মুত্তাসিল। আর ইয়াজিদ বিন রুমানের হাদিস দুর্বল। সায়েব বিন ইয়াজিদ থেকে বর্ণনা করেছেন মুহম্মাদ বিন ইউসুফ। তিনি ইয়াজিদ বিন রুমান থেকে অধিক নির্ভর যোগ্য। কেননা মোহাম্মাদ বিন ইউসুফ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তিনি ছিলেন ثقة ثبت (সিকাহ-সাবেত)। আর ইয়াজিদ বিন রুমান সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণ বলেছেন যে, তিনি শুধু ثقة (সিকাহ)।
আর উসুলে হাদিসের পরিভাষায় সিকাহ সাবেত রাবীর বর্ণনা শুধু সিকাহ রাবীর বর্ণনা থেকে অধিক গ্রহণযোগ্য।

الذي قيل فيه ثقة ثبت مرجح على الذي قيل فيه ثقة فقط كما في مصطلح الحديث
আর যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, ২৩ রাকাতের ব্যাপারে ইয়াজিদ বিন রুমানের হাদিসটি প্রমাণিত এবং সায়েব বিন ইয়াজিদের বিরোধী নয়, তারপরও রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত ১১ রাকাতের উপর ইয়াজিদ বিন রুমানের হাদিসে বর্ণিত ২৩ রাকাতকে প্রাধান্য দেওয়া কোন ভাবেই সম্ভব নয়। কারণ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান কিংবা অন্য মাসে রাতের নামাজ ১১ রাকাতের বেশি কখনই পড়েননি।

সর্বোপরি বিষয়টি নিয়ে যেহেতু আমাদের মধ্যে মতবিরোধ হয়ে গেছে, তাই মত বিরোধপূর্ণ বিষয়ে আমাদের করণীয় কী? অবশ্যই আল্লাহ তাআলা এরূপ বিষয়ে আমাদের জন্য সমাধানের ব্যবস্থা করেছেন এবং আমাদেরকে তার কিতাবের দিকে ফেরত যেতে বলেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّـهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّـهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّـهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا

“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ্‌র নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ্‌ ও তার রসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর যদি তোমরা আল্লাহ্‌ ও কেয়ামত দিবসের ওপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম।” (সূরা নিসা: ৫৯)

সুতরাং মতবিরোধের সময় আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবের দিকে ফিরে যাওয়া আবশ্যক করে দিয়েছেন এবং রসুলের জীবদ্দশায় তাঁর কাছে এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সুন্নতের দিকে ফিরে আসতে বলেছেন। আর এটাকেই তিনি কল্যাণ এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ তআলা আরও বলেন,

فَلا وَرَبِّكَ لا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجاً مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيماً

“অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, সে লোক ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায় বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোন রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা সন্তুষ্ট চিত্তে কবুল করে নেবে।” [সূরা নিসা: ৬৫]

এখানে আল্লাহ তাআলা মানুষের পারস্পরিক বিরোধের সময় আল্লাহ এবং তাঁর রসুলের হুকুমের দিকে ফিরে যাওয়াকে ঈমানের দাবী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আর আল্লাহ কসম করে বলেছেন যে, যারা রসুলের হুকুমের সামনে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ না করবে এবং খুশি মনে তা না মানবে, নিঃসন্দেহে তাদের ঈমান চলে যাবে।

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর খুতবা সমূহে সবসময় বলতেন: “সর্বোত্তম কালাম হচ্ছে আল্লাহর কিতাব আর সর্বোত্তম সুন্নত হচ্ছে, রসুলরে সুন্নত।” মুসলমানগণ এ ব্যাপারে একমত যে মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর সুন্নত হচ্ছে সর্বোত্তম পথ। মানুষ জ্ঞানে ও আমলে যতই বড় হোক না কেন, কোন অবস্থাতেই তার কথাকে রসুলের কথার উপর প্রাধান্য দেওয়া যাবে না এবং তার কথাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর কথার চেয়ে উত্তম মনে করা যাবে না।
সাহাবিগণণ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর কথার বিরোধিতা করতে কঠোর ভাষায় নিষেধ করতেন। এ ব্যাপারে ইবনে আব্বাস রা. এর কথাটি কতই না বলিষ্ঠ। তিনি বলেন, আমি বলছি, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন আর তোমরা আমার কথার বিরোধিতা করে বলছ আবু বকর ও উমর বলেছেন। আমার আশঙ্কা হচ্ছে তোমাদের এই কথার কারণে আকাশ থেকে প্রস্তর বর্ষণ করে তোমাদেরকে ধ্বংস করা হয় কি না। (দেখুন: যাদুল মাআদঃ ২/১৯৫)

➤ এখন যদি কোন মুসলিমকে বলা হয় রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষকে নিয়ে ১১ রাকাত তারাবি পড়তেন। আর উমুক ইমাম মানুষকে নিয়ে ২৩ রাকাত পড়াচ্ছেন, তার জন্য রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নত বাদ দিয়ে কোন ক্রমেই অন্যের সুন্নত গ্রহণ করা বৈধ হবে না। কেননা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত মোতাবেক আমল করাই অধিক উত্তম। আর অধিক উত্তম আমলের জন্যই মানুষ, আসমান-জমিন এবং সকল বস্তু সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلاً
“যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন- কে তোমাদের মধ্যে কর্মে অধিক উত্তম?” (সূরা মূলক: ২)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلاً
“তিনিই আসমান ও জমিন ছয় দিনে তৈরি করেছেন, তার আরশ ছিল পানির উপরে, তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চান যে, তোমাদের মধ্যে কে সবচেয়ে ভালো কাজ করে।” (সূরা হুদ: ৭)

আল্লাহ তাআলা এ কথা বলেন নি যে, তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চান যে, তোমাদের মধ্যে কে সবচেয়ে বেশি আমল করে? এটি জানা কথা যে, আমলের মধ্যে ইখলাস অর্থাৎ একনিষ্ঠতা যত বেশি হবে এবং সুন্নতের অনুসরণ যত বেশি করা হবে, আমলটি তত বেশি উত্তম হবে।

সুতরাং ১১ রাকাত রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নতের মোতাবেক হওয়ার কারণে বাড়ানোর চেয়ে ১১ রাকাত পড়াই উত্তম। বিশেষ করে যখন ধীর স্থীরভাবে, ইখলাসের সাথে এবং খুশু-খুযুর সাথে এই ১১ রাকাত পড়া হবে। যাতে ইমাম ও মুক্তাদী সকলেই দুআ এবং জিকিরগুলো সুন্দরভাবে পড়তে পারবে।

➤ যদি বলা হয় ২৩ রাকাত পড়া তো আমিরুল মুমিনিন খলিফা উমর রা. এর সুন্নত। তিনি খোলাফায়ে রাশেদার একজন। তাদের অনুসরণ করার জন্য আমাদেরকে আদেশ দেওয়া হয়েছে। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা আমার পরে আমার সুন্নত ও সঠিক পথপ্রান্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতের অনুসরণ করবে।
এ কথার জবাবে বলবো যে, ঠিক আছে। উমর রা. খোলাফায়ে রাশেদার অন্তর্ভুক্ত। তাদের অনুসরণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে আমাদের ভালোভাবে জানতে হবে তারাবির রাকাত সংখ্যার ব্যাপারে উমর রা. এর সুন্নতটি কী?

অনুসন্ধান করে আমরা যা জানতে পারলাম, তা হচ্ছে ২৩ রাকাতের বর্ণাগুলো দুর্বল ও রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত সহীহ হাদিসের বিরোধী। বরং সহীহ সনদে উমর রা. উবাই বিন কা’ব ও তামীম দারীকে ১১ রাকাত পড়ানোর আদেশ দিয়েছেন বলেই প্রমাণ পাওয়া যায়।

আর যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই যে উমর রা. ২৩ রাকাত নির্ধারণ করেছেন, তারপরও রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর আমলের বিরুদ্ধে তাঁর কথা দলীল হতে পারে না। আল্লাহর কিতাব, রসুলের সুন্নত, সাহাবিদের কথা এবং মুসলমানদের ইজমা দ্বারা প্রমাণিত যে, কারও কথা রসুলের সুন্নতের সমান হতে পারে না। সে যত বড়ই হোক না কেন? কারও কথা টেনে এনে রসুলের সুন্নতের বিরুদ্ধে দাঁড় করা যাবে না।
ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন,
أجمع المسلمون على أن من استبانت له سنة عن رسول الله صلى الله عليه وسلم لم يحل له أن يدعها لقول أحد
“মুসলমানদের সর্বসম্মতিক্রমে কারও কাছে রসুলের সুন্নত সুস্পষ্ট হয়ে যাওযার পর তা ছেড়ে দিয়ে অন্যের কথা গ্রহণ করা জায়েজ নয়।”

➤ যারা বলেন, সাহাবিদের জামানা থেকে আজ পর্যন্ত মুসলমানগণ ২৩ রাকাত পড়ে আসছেন। সুতরাং তা ইজমার মত হয়ে গেছে।

তাদের এই কথা সঠিক নয়। সাহাবিদের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত মুসলমানদের মাঝে তারাবির রাকাত সংখ্যার ব্যাপারে খেলাফ (মতবিরোধ) চলেই আসছে। হাফেজ ইমাম ইবনে হাজার আসকালী (রহ.) ফতহুল বারীতে এ ব্যাপারে মতপার্থক্যের কথা আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, আবান বিন উসমান এবং উমর বিন আব্দুল আজীজের আমলে মদীনাতে ৩৩ রাকাত তারাবি পড়া হতো। ইমাম মালিক (রহ.) বলেন একশ বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত চলমান ছিল। (দেখুন ফতহুল বারী আলমাকতাবা সালাফীয়া ৪/২৫৩)
সুতরাং যেহেতু মুসলমানদের মধ্যে এ ব্যাপারে মতভেদ চলে আসছে, তাই কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে আসাতেই রয়েছে এর সমাধান। আল্লাহ তাআলা বলেন,
فإن تنازعتم في شيء فردوه إلى الله والرسول إن كنتم تؤمنون بالله واليوم الآخر ذلك خير وأحسن تأويلا
“তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ্‌ ও তার রসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর- যদি তোমরা আল্লাহ্‌ ও কেয়ামত দিবসের ওপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম।” (সূরা নিসা: ৫৯)

সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব জগতের প্রভু আল্লাহ তায়ালার জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক সর্বশেষ নবী, তার পরিবার এবং সকল সাহাবির উপর।

মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন: ০৮/০৯/১৩৯৫ হিজরি।
—————-
একটি সংযোজন:

হানাফী মাজহাবের যে সমস্ত বিজ্ঞ আলেম ২০ রাকাত তারাবি পড়ার পক্ষের হাদিসগুলাকে জইফ বলেছেন, তাদের নামের একটি বিশাল তালিকা:
১) মুআত্তা ইমাম মুহাম্মাদ, অধ্যায়ঃ কিয়ামে শাহরে রমজান, পৃষ্ঠা নং-১৩৮। মুস্তফায়ী ছাপা, ১২৯৭ হিঃ।
২) নাসবুর রায়া, (২/১৫৩)আল্লামা যায়লাঈ হানাফী,মাজলিসুল ইলমী ছাপা, ভারত।
৩) মিরকাতুল মাফাতীহ,(৩/১৯৪) মোল্লা আলী কারী হানাফী, এমদাদীয়া লাইব্রেরী, মুলতান, ভারত।
৪) উমদাতুল কারী শরহে সহীহ আল-বুখারী,(৭/১৭৭)প্রণেতা আল্লামা বদরুদ দীন আইনী হানাফী মিশরী ছাপা।
৫) ফতহুল কাদীর শরহে বেদায়া (১/৩৩৪) প্রণেতা ইমাম ইবনুল হুমাম হানাফী।
৬) হাশিয়ায়ে সহীহ বুখারী (১/১৫৪) প্রণেতা মাওলানা আহমাদ আলী সাহরানপুরী।
৭) আল-বাহরুর রায়েক (২/৭২) প্রণেতা ইমাম ইবনে নুজাইম হানাফী।
৮)হাশিয়ায়ে দুররে মুখতার (১/২৯৫) প্রণেতা আল্লামা তাহাভী (রঃ)হানাফী।
৯) দুররুল মুখতার (ফতোয়া শামী)(১/৪৯৫) প্রণেতা আল্লামা ইবনে আবেদীন হানাফী।
১০) হাশিয়াতুল আশবাহ পৃষ্ঠা নং-৯ প্রণেতা সায়্যেদ আহমাদ হামুভী হানাফী।
১১) হাশিয়ায়ে কানযুদ দাকায়েক পৃষ্ঠা নং-২৬, প্রণেতা মাওলানা মুহাম্মাদ আহমাদ নানুতুভী।
১২) মারাকীউল ফালাহ শরহে নুরুল ইজাহ পৃষ্ঠা নং- ২৪৭, প্রণেতা আবুল হাসান শরানবালালী।
১৩) মা ছাবাতা ফিস সুন্নাহ,পৃষ্ঠ নং- ২৯২, প্রণেতা শাইখ আব্দুল হক মুহাদ্দিছ দেহলবী।
১৪) মাওলানা আব্দুল হাই লাখনুভী হানাফী বিভিন্ন কিতাবের হাশিয়াতে ২০ রাকাতের হাদিসগুলোকে জইফ বলেছেন। উদাহরণ স্বরূপ দেখুন উমদাতুর রেআয়া (১/২০৭)।
১৫) তালীকুল মুমাজ্জাদ, পৃষ্ঠা নং-১৩৮।
১৬) তুহফাতুল আখয়ার পৃষ্ঠা নং-২৮,লাখনু ছাপা।
১৭)হাশিয়ায়ে হেদায়া (১/১৫১) কুরআন মহল, করাচী ছাপা।
১৮) ফাইযুল বারী,(১/৪২০) প্রণেতা মাওলানা আনোয়ার শাহ কাশমীরী।
১৯) আলউরফুয্ শাযী পৃষ্ঠা নং- ৩০৯।
২০) কাশফুস সিতর আন সালাতিল বিতর পৃষ্ঠা নং- ২৭।
২১) শরহে মুআত্তা ফারসী,(১/১৭৭) প্রণেতা শাহ অলীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী। কুতুব খান রাহীমিয়া, দিল্লী, ১৩৪৬ হিঃ।
উপরোক্ত আলেমগণ ছাড়া আরও অনেকেই ২০ রাকাত তারাবির হাদিসগুলোকে জইফ বলেছেন। আশা করি উপরোক্ত তথ্যগুলো জানার পর কেউ ২০ রাকাত তারবীর পক্ষের হাদিসগুলো সহীহ বলা থেকে সকলেই বিরত থাকবেন এবং অন্যদেরকেও বিরত রাখার চেষ্টা করবেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে সহীহ হাদিসের উপর আমল করার এবং জাল ও জইফ হাদিস বর্জন করার তাওফিক দিন। আমিন।

▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহ শাহেদ মাদানি।
সম্পাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

ইসলামে মেসওয়াক ব্যবহারের গুরুত্ব কতটুকু এবং ব্রাশ ও টুথপেস্ট দ্বারা কি সুন্নত আদায় হবে

 প্রশ্ন: ইসলামের মেসওয়াকের গুরুত্ব কেমন? আধুনিক যুগের ব্রাশ ও টুথপেস্ট কি মেসওয়াকের বিকল্প হতে পারে? আর টুথপেস্ট ছাড়া শুধু ব্রাশ ব্যবহার করা দ্বারা কি সুন্নত আদায় হবে?

উত্তর: ইসলাম অত্যন্ত পবিত্র-পরিচ্ছন্ন জীবনাদর্শের নাম। এতে পাক-পবিত্রতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব অপরিসীম। বরং পাক-পবিত্রতাকে ইমানের একটি অংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। যাহোক, একদিকে আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জন, অন্যদিকে দাঁত ও মুখের পরিচ্ছন্নতা এবং দুর্গন্ধ মুক্ত শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বার্থে ইসলামে মেসওয়াকের অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে।

নিম্নে ইসলামে মেসওয়াকের গুরুত্ব এবং আধুনিক যুগের ব্রাশ ও টুথপেস্ট মেসওয়াকের বিকল্প হতে পারে কিনা এ বিষয়ে বিজ্ঞ আলেমদের ফতোয়া উল্লেখপূর্বক অতি সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

✪ ক. মেসওয়াক করা মুখের পরিচ্ছন্নতা অর্জনের পাশাপাশি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম:

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

السواك مطهرة للفم مرضاة للرب

“মেসওয়াক মুখের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যম ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উপায়।” [সুনান নাসায়ী ১/৫০, সহীহ ইবনে হিব্বান হা/১০৬৭, সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব- ১/১৩৩]
✪ খ. রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
لولا أن أشق على أمتي أو على الناس لأمرتهم بالسواك مع كل صلاة
“আমি যদি উম্মতের উপর (কষ্ট হবার) আশংকা না করতাম তাহলে প্রত্যেক সালাতের সাথেই মেসওয়াক করার আদেশ দিতাম।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নাম্বার ৮৮৭, সহীহ মুসলিম, হাদিস নাম্বার ২৫২]
✪ গ. এ ছাড়াও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাহির থেকে বাড়িতে প্রবেশের পূর্বে এবং রাতে ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর সর্বপ্রথম মেসওয়াক করতেন।

এসব হাদিস এবং রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যবহারিক জীবন থেকে দাঁত ও মুখের পরিচ্ছন্নতায় মেসওয়াকের অপরিসীম গুরুত্ব প্রতীয়মান হয়।

❒ আধুনিক যুগের ব্রাশ ও টুথপেস্ট কি মেসওয়াকের বিকল্প হতে পারে বা এর দ্বারা কি সুন্নত আদায় হবে?

এ বিষয়ে আধুনিক যুগের দু জন বড় আলেমের ফতোয়া তুলে ধরা হল:

◈ ১. বর্তমান শতকের অন্যতম বড় আলেম ও বিশিষ্ট ফকিহ আল্লামা মোহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ. কে প্রশ্ন করা হয় যে, মুখের পরিচ্ছন্নতা অর্জনের নিয়তে ব্রাশ এবং টুথপেস্ট ব্যবহার করলে কি হাদিসে বর্ণিত মেসওয়াকের সওয়াব পাওয়া যাবে?

উত্তরে তিনি বলেন,

نعم ؛ استعمال الفرشاة والمعجون يغني عن السواك ، بل وأشد منه تنظيفاً وتطهيراً ، فإذا فعله الإنسان حصلت به السنة ؛ لأنه ليس العبرة بالأداة ، العبرة بالفعل والنتيجة ، والفرشاة والمعجون يحصل بها نتيجة أكبر من السواك المجرد .

“হ্যাঁ, ব্রাশ এবং টুথপেস্ট ব্যবহার করলে মেসওয়াক ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। বরং এতে আরও ভালোভাবে মুখের পরিছন্নতা অর্জিত হয়।
সুতরাং কেউ তা ব্যবহার করলে সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। কেননা উপকরণ নয় বরং কাজ ও ফলাফলটাই মূল ধর্তব্য বিষয়। আর (এটা স্বতঃসিদ্ধ যে), শুধু মেসওয়াকের তুলনায় টুথপেস্ট ও ব্রাশ ব্যবহারে (মুখের পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে) আরও ভালো ফলাফল অর্জিত হয়।” [নূরুন আলাদ দারব শীর্ষক ইসলামী প্রশ্ন-উত্তর বিষয়ক রেডিও প্রোগ্রাম]

◈ ২. সৌদি আরবের আরেক বড় আলেম শায়খ হাতিয়া সালেম বলেন,

إذا نظرنا إلى الغرض من استعمال السواك ، وهو كما في الحديث : ( مطهرة للفم مرضاة للرب ) فأي شيء طهَّر الفم فإنه يؤدي المهمة ، ولكن ما كان عليه السلف فهو أولى وأصح طبياً ” انتهى من ” شرح بلوغ المرام ” (13/ 5، بترقيم الشاملة آليا) .

“আমরা যদি মেসওয়াক ব্যবহারের উদ্দেশ্যের দিকে তাকাই তাহলে তা হলো, যেমনটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “মেসওয়াকের মাধ্যমে মুখের পরিচ্ছন্নতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।” অতএব যে জিনিস দ্বারা মুখের পরিচ্ছন্নতা অর্জিত হবে সেটা দ্বারাই উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হবে। তবে আমাদের সালাফ বা পূর্বসূরিগণ যা ব্যবহার করতেন সেটা বেশি উত্তম এবং স্বাস্থ্যসম্মত।” [বুলুগুল মারাম-এর শারহ]

আমরা আরও বলতে পারি যে, মেসওয়াক সহজে বহনযোগ্য। তা যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় ব্যবহার করা যায়। পক্ষান্তরে ব্রাশ ও টুথপেস্ট সব জায়গায় ব্যবহার করা সম্ভব নয়। তাছাড়া ব্রাশ ও টুথপেস্ট ব্যয় সাপেক্ষ। আর ভালো মানের ব্রাশ বা টুথপেস্ট না হলে অনেক সময় দাঁত ও মুখ গহ্বরে ক্ষয়ক্ষতিরও সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু ব্রাশ ও টুথপেস্ট-এর দ্বারা যেহেতু ভালোভাবে মুখের পরিচ্ছন্নতা অর্জিত হয় সেহেতু তা মেসওয়াকের বিকল্প হিসেবে গণ্য হবে এবং এর দ্বারা মেসওয়াকের ফজিলত অর্জিত হবে ইনশাআল্লাহ। তবে মেসওয়াক ব্যবহার করা অধিক উত্তম এবং স্বাস্থ্যের জন্যও অধিক উপযোগী।

আর আপনি যেমনটি প্রশ্ন করেছেন যে, টুথপেস্ট ছাড়া শুধু ব্রাশ ব্যবহার করা করা দ্বারা সুন্নত আদায় হবে কিনা? এর এর উত্তরে আমরা বলব, টুথপেস্ট ছাড়া শুধু ব্রাশ দ্বারা মুখের পরিচ্ছন্নতার মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয় না। তাই ব্রাশ করলে টুথপেস্ট সহকারে করা উচিত। কিন্তু যদি কখনো তা না থাকে তাহলে সেটা ভিন্ন কথা। সে ক্ষেত্রে শুধু ব্রাশ ব্যবহার করলেও আল্লাহ চাহে তো উক্ত মর্যাদা পাওয়া যাবে নিয়তের কারণে। আল্লাহু আলাম-আল্লাহ সব চেয়ে ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Thursday, April 4, 2024

রোজা সংক্রান্ত জরুরি ১০টি প্রশ্নের উত্তর

 ◈ ১) প্রশ্ন: স্ত্রীকে যৌন উত্তেজনার সাথে স্পর্শ বা আলিঙ্গন করার সময় যদি লজ্জা স্থান থেকে পানি জাতীয় পদার্থ বের হয় তাহলে কি নামাজ-রোজা হবে?

উত্তর: স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে যৌন উত্তেজনার সাথে স্পর্শ বা আলিঙ্গন করার সময় যদি লজ্জা স্থান থেকে মনি/বীর্য (যৌন উত্তেজনা বশত: সুখানুভূতি সহকারে সবেগে স্খলিত ধাতু) নির্গত হয় তাহলে গোসল ফরজ হবে।
আর গোসল ফরজ হলে গোসল করা ছাড়া সালাত পড়া বৈধ নয়। পড়লেও কবুল হবে না।
রোজা অবস্থায় এমন হলে (বীর্যপাত হলে) রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর নিকট তওবা করত: পরবর্তীতে উক্ত রোজাটি কাজা করাই যথেষ্ট।

কিন্তু যৌন চিন্তা বা যৌন উত্তেজনা বশত: মযি/কামরস (হালকা আঠালো ও পিচ্ছিল পানি জাতীয় ধাতু) নির্গত হলে তাতে গোসল ফরজ হবে না এবং এতে রোজাও ভঙ্গ হবে না। তবে ওজু অবস্থায় নির্গত হলে ওজু ভঙ্গ হয়ে যাবে।

এটি নাপাক। সুতরাং ওযুর পূর্বে লজ্জা স্থান ধৌত করা আবশ্যক। আর কাপড়ে লাগলে এক অঞ্জলী পানি নিয়ে কাপড়ের যেখানে তা লেগেছে তার উপর ছিটিয়ে দিলেই পবিত্র হয়ে যাবে। অর্থাৎ মযি নাপক হলেও হালকা নাপাক। কাপড়ে লাগলে তা ধৌত করা আবশ্যক নয় বরং উক্ত স্থানে এক অঞ্জলী পানির ছিটা দিলে তা পবিত্র হয়ে যাবে।

উল্লেখ্য যে, রোজা অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করলে-বীর্যপাত হোক না হোক-তাতে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। রমাযানের দিনের বেলা স্ত্রী সহবাসে লিপ্ত হওয়া কবিরা গুনাহ। কেউ এমনটি করলে তার জন্য আল্লাহর নিকট লজ্জিত অন্তরে তওবা করার পাশাপাশি কাফফারা দেয়া ওয়াজিব। তা হল:
● একটি রোজার বিনিময়ে একটি দাস মুক্ত করা।
● তা সম্ভব না হলে একটানা (বিরতি হীনভাবে) ৬০টি রোজা রাখা।
● তাও সম্ভব না হলে ৬০জন মিসকিনকে একবেলা খাবার খাওয়ানো বা প্রতিটি রোজার বিনিময়ে অর্ধ সা তথা সোয়া বা দেড় কিলোগ্রাম চাল দেয়া। (টাকা দেয়া ঠিক নয়)।
(সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

◈ ২) প্রশ্ন: গতকাল হায়েজ বন্ধ হয়েছে কিন্তু এখনো গোসল করা হয় নি। এমন অবস্থায় আজ কি রোজা রাখা যাবে?
উত্তর: হায়েজ বা ঋতুস্রাব বন্ধ হলে গোসলের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করে ওই ওয়াক্তের সালাত পড়া ফরজ। এমনকি এক রাকআত সালাতের সময় থাকলেও তা পড়তে হবে এবং সে দিন ভোর রাত থেকে রোজা রাখাও ফরজ।
সুতরাং কোন মহিলা যদি হায়েজ বন্ধ হওয়ার পর পরের দিন পর্যন্ত গোসল না করে থাকে এবং নামায না পড়ে থাকে তাহলে সে কবিরা গুনাহগার হবে। এ ক্ষেত্রে তার জন্য আবশ্যক হল:
● আল্লাহর নিকট তওবা করা এবং গোসল করে সালাতের সময় হলে সালাত শুরু করা।
● ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ার পর থেকে যে কয় ওয়াক্তের সালাত পড়া হয় নি সেগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কাজা করা।
● ভোর রাতে সেহরি খেয়ে আজকের রোজা রাখা।

◈ ৩) প্রশ্ন: বমি করলে কি রোজা ভঙ্গ হবে?

উত্তর: কোন লোক যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে বমি করে তবে তার রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। কিন্তু অনিচ্ছাকৃত ভাবে বমি হলে রোজা ভঙ্গ হবেনা। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ ذَرَعَهُ الْقَيْءُ فَلَيْسَ عَلَيْهِ قَضَاءٌ وَمَنِ اسْتَقَاءَ عَمْدًا فَلْيَقْضِ
“অনিচ্ছাকৃত যার বমি হবে তার কোন কাজা নেই আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত বমি করবে সে যেন রোজা কাজা করে। ” (সহিহ আবু দাউদ, হা/২৩৮০) কিন্তু যদি অপারগ অবস্থায় বমি বের হয়েই যায় তবে রোজা ভঙ্গ হবে না। মানুষ যদি পেটের মধ্যে খিচুনি অনুভব করে- মনে হয় যেন ভিতর থেকে সব কিছু বের হয়ে আসবে, তখন তাতে বাধা দিবে না। সাধারণভাবে থাকার চেষ্টা করবে। ইচ্ছা করে কোন কিছু বের করার চেষ্টা করবে না। নিজে নিজে বের হয়ে আসলে কোন ক্ষতি হবেনা এবং রোজাও নষ্ট হবে না।
(ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম-উসাইমীন রহ.)

◈ ৪) প্রশ্ন: রোজা অবস্থায় শ্বাসকষ্টের কারণে স্প্রে (Nabulijer) ব্যবহার করার বিধান কি? এ দ্বারা কি রোজা ভঙ্গ হবে?
উত্তর: এই স্প্রে নাকে প্রবেশ করে কিন্তু পেট পর্যন্ত পৌঁছে না। তাই রোজা রেখে ইহা ব্যবহার করতে কোন অসুবিধা নেই। এতে রোজা ভঙ্গও হবে না। কেননা এটা এমন বস্তু যা উড়ে নাকে প্রবেশ করে এবং বিলীন হয়ে যায়। এর অংশ বিশেষ পাকস্থালীতে মধ্যে প্রবেশ করে না। তাই এ দ্বারা রোজা ভঙ্গ হবে না।
(ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম-উসাইমীন রহ. প্রশ্ন নং ৪১৪)

◈ ৫) প্রশ্ন: যেকোনো খেলাধুলা করে সিয়াম পালন করলে সিয়াম পালন হবে কি? বিশেষ করে ক্রিকেট খেলা করে?
উত্তর: রোজা রাখার পরে রোজা ভঙ্গের কোনও কারণ না ঘটলে কোন সমস্যা নেই। খেলাধুলা করতে গিয়ে কেউ যদি পিপাসায় পানি পান করে বা ইচ্ছাকৃত ভাবে কোন কিছু খায় তাহলে রোজা ভঙ্গ হবে; অন্যথায় নয়।
তবে মনে রাখতে হবে, রমাযানের প্রতিটি মূহুর্ত আমাদের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ মর্যাদাপূর্ণ সময়গুলোকে কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, দুআ-তসবিহ ও বিভিন্ন সৎকর্ম সম্পাদনের মাধ্যম নেকি অর্জন ও কল্যাণকর কাজে ব্যয় করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা জরুরি এবং খেলাধুলায় অতিরিক্ত সময় ব্যায়, নাটক-সিনেমা দেখা বা অন্যান্য অর্থহীন কাজে যেন সময়গুলো অতিবাহিত না হয়ে যায় সে দিকে লক্ষ্য রাখা কর্তব্য। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমীন।

◈ ৬) প্রশ্ন: আমি অসুস্থ। রোজা রেখে কি মেডিসিন নেয়া যাবে? আমাকে দিন-রাতে ৯ বার ওষুধ খেতে হবে। কিন্তু রোজার সময়ও কি ওষুধ খেতে পারি?
উত্তর: লা বা’স ত্বাহুর ইনশাআল্লাহ-আল্লাহ আপনাকে সুস্থতা দান করুন। আমিন।
অত:পর কথা হল, রোজা অবস্থায় ওষুধ সেবন করলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। যদি ডাক্তার পরামর্শ দেয় যে, দিনরাতে কিছুক্ষণ পরপর ওষুধ খেতে হবে, অন্যথায় রোগ বৃদ্ধি পাবে বা আরগ্য বিলম্বিত হবে তাহলে আপনার জন্য এখন রোজা রাখা আবশ্যক নয়। বরং রোজা না রেখে ডাক্তারি নির্দেশনা মেতাবেক আপনি প্রয়োজন মত ওষুধ সেবন করবেন।
তবে পরে সুস্থ হলে রমাযানের পরের ছুটে যাওয়া রোজাগুলো আপনার সুবিধা জনক সময়ে কাজা করে নিবেন। (সূরা বাকারা: ১৮৪)

◈ ৭) প্রশ্ন: রোজা অবস্থায় ব্যথার কারণে মাথায় বাম বা তৈল লাগানো যাবে কি?
উত্তর: জি, সমস্যা নেই। এতে রোজার কোন ক্ষতি হবে না ইনশাআল্লাহ।

প্রশ্ন: সিয়ামরত অবস্থায় নখ-চুল বা শরীরের অবাঞ্ছিত লোম কাটা যাবে কি?

উত্তর: নখ কাটা, মাথার চুল ছাটা বা মুণ্ডন করা, মোচ খাটো করা, বগলের পশম তোলা, নাভির নিচের অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করা ইত্যাদির সাথে রোজার কোন সম্পর্ক নাই। সুতরাং রোজা অবস্থায় এগুলো করলে রোজার উপর কোন প্রভাব পড়বে না।

◈ ৮) প্রশ্ন: রোজা রেখে হারাম ভিডিও গেইম খেললে কি রোজা কি কবুল হবে?

উত্তর: এতে রোজা ভঙ্গ না হলেও সময় অপচয় ও হারাম কাজ করার কারণে তার সওয়াব কমে যাবে। তাই রোজা অবস্থায় হারাম ভিডিও গেইম খেলা, গান-বাদ্য শোনা, নাটক-সিনেমা ইত্যাদি দেখা, খেলাধুলায় অতিরিক্ত সময় অপচয় করা থেকে বিরত থাকা জরুরি। এমনকি ইফতার করার পর এগুলো বৈধ হয়ে যাবে না বরং সর্বাবস্থায় এগুলো হারাম।

◈ ৯) প্রশ্ন: রোজা অবস্থায় কান, চোখ ও নাকে ড্রপ ব্যাবহারের বিধান কি?
উত্তর: নাক, কান ও চোখে ড্রপ ব্যবহার করলে রোজা ভঙ্গ হবে কি না এ বিষয়ে আলেমদের মাঝে দ্বিমত রয়েছে। তবে অধিক বিশুদ্ধ মতে এতে রোজা ভঙ্গ হবে না যদি গলায় ওষুধের সাধ পেলে তা গিলে না খায়। আর গিলে খেলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। তাই সতর্কতা হিসেবে যদি সম্ভব হয় তাহলে এগুলো দিনে ব্যবহার না করে রাতে ব্যবহার করা ভালো। এটাই ইসলমি ফিকহ একাডেমী এর সিদ্ধান্ত।
جاء في قرار ” مجمع الفقه الإسلامي
” الأمور الآتية لا تعتبر من المفطرات : قطرة العين ، أو قطرة الأذن ، أو غسول الأذن ، أو قطرة الأنف ، أو بخاخ الأنف ، إذا اجتنب ابتلاع ما نفذ إلى الحلق ” انتهى
তবে নাকের ছিদ্র দিয়ে ওষুধ দেয়ার ক্ষেত্রে অধিক সতর্কতা কাম্য। কেননা নাকের ছিদ্র দিয়ে পানি পাকস্থালীতে পৌঁছার সম্ভাবনা বেশি। তাই তো হাদিসে রোজা অবস্থায় অজু বা গোসল করার সময় নাকের ভেতরে বেশি করে পানি টেনে নাক ঝাড়তে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা এতে নাসারন্ধ্রের মাধ্যমে পাকস্থলীতে পানি পৌঁছে যেতে পারে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«وَبَالِغْ فِي الِاسْتِنْشَاقِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ صَائِمًا»
“(অজু ও গোসলে) নাকে পানি টেনে ভালোভাবে নাক ঝেড়ে পরিষ্কার করো যদি রোজা অবস্থায় না থাকো।” (সহিহ আবু দাউদ-আলবানী, হা/১৪২০)

◈ ১০) প্রশ্ন: রোজা অবস্থায় যদি মুখ থেকে রক্ত বের হয় তাহলে রোজার কোনও সমস্যা হবে কি?
উত্তর: মুখ, নাক বা শরীরের কাটা বা ক্ষতস্থান থেকে রক্ত নির্গত হওয়া রোজা ভঙ্গের কারণ নয়। এতে রোজা ভঙ্গ হবে না। তবে মুখ থেকে নির্গত রক্ত যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে গিলে ফেলা হয় তাহলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। অবশ্য অসতর্কতা বশত: থুথুর সাথে তা গিলে ফেললে রোজার কোন ক্ষতি হবে না ইনশাআল্লাহ। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬◈◍◈▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
(মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়)
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সউদি আরব।

Translate