Monday, October 23, 2023

কয়েকটি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট হাদিস

 উম্মতে মোহাম্মদির একটি সেজদা জিবরাঈল আ. এর তিরিশ হাজার বছরের সেজদার থেকে উত্তম, আরশের গায়ে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ লেখা থাকা এবং এই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য মুসা আ. এর কান্না বা আশা-আকাঙ্ক্ষা সংক্রান্ত হাদিসগুলো ভিত্তিহীন ও বানোয়াট:

▪️প্রশ্ন: নিম্নোক্ত ঘটনাটি ফেসবুকে প্রায় চোখে পড়ে। এর কি কোন ভিত্তি আছে?
ঘটনাটি নিম্নরূপ:
জিবরাঈল আ. কে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করলেন। অতঃপর জিবরাঈল আ. আল্লাহ তাআলাকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহ, আপনি কীসে খুশি হন? আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিলেন, আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হই, আমার বান্দা যখন আমাকে সেজদা করে। অত:পর জিবরাঈল আ. আল্লাহ তাআলাকে সেজদা করলেন তিরিশ হাজার বছর ধরে।
জিবরাঈল আ. মনে মনে খেয়াল করলেন, আমার থেকে এত বড় দামি, এত বড় লম্বা সেজদা আর কেউ করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা নিশ্চয় আমার প্রতি খুশি হবেন।

জিবরাঈল আ. আল্লাহ তাআলার দিকে মুতাহজ্জির হয়ে রইলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কোন খুশির বাণী জানান হল না। জিবরাঈল আ. আল্লাহ তাআলা কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহ, আমি যে এত লম্বা সেজদা করলাম কিন্তু আপনি কি আমার সেজদার প্রতি খুশি হননি?

আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিলেন: জিবরাঈল, তোমার জবাব আমি দেব। তার আগে তুমি একটু আরশে আজিমের দিকে তাকাও। জিবরাঈল আ. তাকিয়ে দেখলেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরশে আল্লাহর কুদরতি নূর দ্বারা লিখা রয়েছে, ”লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।” জিবরাইল আ. জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহ, আমার সেজদার সংগে এই কালিমার কী সম্পর্ক?

আল্লাহ তাআলা বললেন, ও জিবরাইল, শোন, আমি আল্লাহ এ দুনিয়া তৈরি করব। ওই দুনিয়ার মানব জাতি ও জিন জাতির হেদায়াতের জন্য লক্ষাধিক নবি-রাসূলকে পাঠাব। সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে পাঠাব। এই নবির উম্মতের উপরে আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করব। আর প্রতি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে সতেরটা করে রাকাত আমার জন্য ফরজ করব। প্রত্যেকটা রাকাতের মধ্যে দুটি করে সেজদা হবে। আর প্রত্যেকটা সেজদার মধ্যে ওই নবির উম্মত তিনবার করে “সুবহানা রাব্বিয়াল আলা” পাঠ করবে।

জিবরাইল, তুমি জেনে রাখ, আমার ওই মাহবুব নবির উম্মত যখন সেজদায় গিয়ে “সুবহা-না রাব্বিয়াল আলা” বলে আমাকে ডাক দিবে। জিবরাইল তুমি ৩০ হাজার বছর সেজদা করে যে নেকি পেয়েছ, আমি আল্লাহ আমার বান্দার আমলনামায় এর থেকেও ৪০ হাজার গুণ বেশি নেকি লিখে দিব। সুবহানাল্লাহ!

এই জন্য মুসা আ. কেঁদেছেন, আল্লাহ, আমাকে ওই নবির উম্মত বানাইয়া দাও, যে নবির উম্মত এক সেজদায় জিবরাঈল আ. এর সারা জীবনের ৩০ হাজার বছরের সেজদার নেকি নিয়ে গেল। আমরা সেই নবির উম্মত আমাদের কী করা উচিত আর আমরা কী করছি!
আল্লাহ আমাদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার তৌফিক দিন। আমিন।

▪️উত্তর: এই ঘটনা এবং তার মধ্যে যেসব কথা বলা হয়েছে সবকিছু মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এগুলো হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে মিথ্যাচার। বিদআতি ওয়াজ ব্যবসায়ী বক্তারা এইসব ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনী ওয়াজ মাহফিলগুলোতে মূর্খ শ্রোতাদের সামনে খুব সুর দিয়ে বয়ান করে থাকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর কোনও ভিত্তি নেই।

– আল্লাহর আরশের গায়ে, পায়ে বা জান্নাতের দরজায় কিংবা জান্নাতের গাছের পাতায় পাতায় “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” লেখা থাকার ব্যাপারে যত হাদিস বলা হয়, সেগুলোর কোনটাই সঠিক নয়। সবগুলোই জাল-জয়ীফ।

– অনুরূপভাবে মূসা আলাইহিস সালাম মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মত হওয়ার জন্য ক্রন্দন করা বা প্রত্যাশা করা বা দুআ সংক্রান্ত বর্ণিত হাদিসগুলো একটিও সহীহ নয়। (ইমাম জাহাবি, ইবনে হাজার আসকালানি, আলবানি প্রমুখ মুহাদ্দিসীনদের আলোচনা থেকে নেওয়া) অতএব এসব মিথ্যা, বানোয়াট ও অপ্রমাণিত হাদিস প্রচার করা মারাত্মক গুনাহের।
রাসূল সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّداً فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ” رواه البخاري
“যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত ভাবে আমার উপর মিথ্যারোপ করল (মিথ্যা হাদিস বর্ণনা করল), সে যেন জাহান্নামে নিজের ঠিকানা করে নিলো।” [সহিহ বুখারি, অনুচ্ছেদ: আম্বিয়াদের হাদিস, হা/ ৩২৭৪] আল্লাহ হেফাজত করুন। আমিন।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

সময়কে গালমন্দ করা আল্লাহকে গালমন্দ করা ও তাঁকে কষ্ট দেওয়ার নামান্তর

 আল্লাহর এক অমোঘ নিয়মে রাতের পরে দিন ও দিনের পরে রাতের আবির্ভাব ঘটে। এভাবে দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর, যুগ এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী অবিরত ধারায় বয়ে চলেছে। এ সময় আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। তার নিজস্ব কোনও ইচ্ছা ও ক্ষমতা নেই। সময় তার নিজস্ব ইচ্ছা বলে কোনও কিছু করতে সক্ষম নয়। সে মানুষের জীবনে কল্যাণ বা অকল্যাণ কোনও কিছুই করতে পারে না। সময়ের গতি-প্রকৃতি পরিবর্তিত না হলেও সময়ের সাথে মানুষের প্রকৃতি, আচার-আচরণ ও রীতি-নীতি ইত্যাদি পাল্টে যায়। তাই মানুষ খারাপ হতে পারে; সময় নয়। সুতরাং সময় খারাপ, যুগ খারাপ, দিনটা খারাপ, রাতটা খারাপ ইত্যাদি বাক্য বলা কিংবা সময়কে লানত বা অভিশাপ দেওয়াও জায়েজ নয়।

আর যেহেতু সময় আল্লাহর নির্দেশক্রমে আবর্তিত হয় তাই সময়কে গালি দেওয়া আল্লাহকে গালি দেওয়ার নামান্তর। আর আল্লাহকে গালি দেওয়া মানে তাকে কষ্ট দেওয়া। সুতরাং তা হারাম।

❑ বহু হাদিসে সময়কে গালমন্দ করতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন:

◆ ১. আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

لاَ تَسُبُّوا الدَّهْرَ فَإِنَّ اللهَ هُوَ الدَّهْرُ

“তোমরা সময়কে গালমন্দ করো না। কারণ আল্লাহই সময়।” [সহিহ মুসলিম, হা/৬০০৩]

◆ ২. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,

قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ يَسُبُّ ابْنُ آدَمَ الدَّهْرَ وَأَنَا الدَّهْرُ بِيَدِيَ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ

“আল্লাহ তাআলা বলেন (হাদিসে কুদসি), আদম সন্তান সময়কে গালমন্দ করে। অথচ আমি তো সময়। আমার হাতেই রাত ও দিন (এর বিবর্তন সাধিত হয়)।” [মুসলিম, হা/৬০০৩]

◆ ৩. হাদিসে কুদসিতে আরও বর্ণিত হয়েছে,

قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ يُؤْذِينِي ابْنُ آدَمَ يَسُبُّ الدَّهْرَ وَأَنَا الدَّهْرُ أُقَلِّبُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ

“আল্লাহ বলেছেন, আদম সন্তান আমাকে কষ্ট দেয়। সে সময়কে গালি দেয় অথচ আমিই তো সময়। আমি রাত-দিন আমিই আবর্তিত করে থাকি।” [সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৪২/ শব্দচয়ন ও শব্দ প্রয়োগে শিষ্টাচার, পরিচ্ছেদ: ১. সময় ও কালকে গালমন্দ করা নিষিদ্ধ]

◆ এর দিন-রাতের পরিবর্তন প্রসঙ্গে একমাত্র আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয়। মহাগ্রন্থ কুরআনে আল্লাহ তাআলা এ প্রসঙ্গে বলেন,

يُقَلِّبُ اللَّهُ الَّيْلَ وَالنَّهَارَ ۚ إِنَّ فِى ذٰلِكَ لَعِبْرَةً لِّأُولِى الْأَبْصٰرِ

“আল্লাহ রাত ও দিনের আবর্তন ঘটান। নিশ্চয় এতে শিক্ষা রয়েছে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নদের জন্য।” [সূরা নূর: ৪৪]

তাফসিরে বিন সাদিতে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, “অর্থাৎ তিনি (আল্লাহ) ঠাণ্ডা থেকে গরম, আবার গরম থেকে ঠাণ্ডা, দিন থেকে রাত আবার রাত থেকে দিন তিনিই পরিবর্তন করেন। অনুরূপভাবে তিনিই বান্দাদের মধ্যে দিনগুলো ঘুরিয়ে আনেন। যারা সত্যিকার বান্দা, বুদ্ধি ও বিবেকবান, তারা এগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিয়ে এগুলো কেন সৃষ্টি করা হয়েছে সেটা সহজেই বুঝতে পারে। কিন্তু তারা ব্যতিক্রম, যারা পশুদের মত এগুলোর দিকে তাকায়।” [তাফসিরে সাদী]

আর তাফসিরে আহসানুল বয়ানে বলা হয়েছে, “আল্লাহ তাআলা কখনো দিন বড়, রাত ছোট, আবার কখনো এর বিপরীত করে থাকেন। অথবা কখনো দিনের উজ্জ্বলতাকে কালো মেঘের (ছায়ায়) অন্ধকার দিয়ে এবং রাতের অন্ধকারকে চাদের জ্যোৎস্না দিয়ে বদলে দেন।”

◍ জাহেলি যুগের আরব মুশরিকরা সময় সম্পর্কে বিরূপ কথা বলত এবং সময়কে গালমন্দ করত। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, শুধু সময়ই তাদেরকে মৃত্যু দেয়:

◆ মহান আল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন,

وَقَالُوا مَا هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ ۚ وَمَا لَهُم بِذَٰلِكَ مِنْ عِلْمٍ ۖ إِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ

“তারা (কা ফের-মুশ রিকরা) বলে, শুধু পার্থিব জীবনই আমাদের জীবন। আমরা এখানেই মরি ও বাঁচি। সময় ছাড়া অন্যকিছুই আমাদেরকে ধ্বংস করতে পারে না। তারা কেবল অনুমান করে কথা বলে।” [সূরা জাসিয়া: ২৪]

অর্থাৎ তাদের বিশ্বাস ছিল, রাত-দিনের বিবর্তনে মানুষের বয়স শেষ হয়ে গেলে মানুষ এক সময় মরে যায়। অর্থাৎ মানুষের মৃত্যুর পেছনে একমাত্র অনুঘটক হল, সময়। আল্লাহ মানুষের জীবন-মৃত্যু নিয়ন্ত্রণ করে না, মৃত্যুর পরবর্তী জীবন বা আখিরাত বলেও কিছু নেই। কিন্তু তা তাদের ভ্রান্ত ধারণা ছাড়া অন্য কিছু নয়। প্রকৃতপক্ষে সময়ের নিজস্ব কোনও শক্তি নেই। সে কারও উপকার করতে পারে না, কোনও ক্ষতি করতে পারে না। বরং এ বিশ্ব চরাচরের নিয়ন্ত্রণ, সময়ের এ গতিধারার নিয়ন্ত্রণ, মানুষে জীবন, মৃত্যু সব কিছু আল্লাহর হাতে ন্যস্ত। জীবনের উত্থান-পতন, ভালো-মন্দ যা কিছু ঘটে সবই আল্লাহর আওতাধীন।

❑ সময়ের অবস্থা বর্ণনা করা জায়েজ; গালমন্দ করা জায়েজ নয়:

আনাস ইবনে মালিক রা. এর নিকট হাজ্জাজ কর্তৃক মানুষ যে জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছে সে সম্পর্কে অভিযোগ পেশ করা হলে তিনি বললেন,

اصْبِرُوا؛ فإنَّه لا يَأْتي علَيْكُم زَمَانٌ إلَّا الذي بَعْدَهُ شَرٌّ منه، حتَّى تَلْقَوْا رَبَّكُمْ. سَمِعْتُهُ مِن نَبِيِّكُمْ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ

“ধৈর্য ধর। কেননা, মহান প্রতিপালকের সাথে মিলিত হবার পূর্ব পর্যন্ত (অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্বে) তোমাদের উপর এমন কোন যুগ অতীত হবে না, যার পরের যুগ তার চেয়েও বেশি খারাপ নয়। তিনি বলেন, এ কথাটি আমি তোমাদের নবী থেকে শুনেছি।” [সহিহুল বুখারি]

আল্লাহ তাআলা বলেন,
هَٰذَا يَوْمٌ عَصِيبٌ ‎
“আজ অত্যন্ত কঠিন দিন।” [সূরা হুদ: ৭৭]

তিনি আরও আরও বলেন,

إِنَّا أَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا صَرْصَرًا فِي يَوْمِ نَحْسٍ مُّسْتَمِرٍّ

“নিঃসন্দেহে আমরা তাদের উপরে এক চরম দুর্ভাগ্যের দিনে পাঠিয়েছিলাম এক প্রচণ্ড ঝড়-তুফান।” [সূরা কামার: ১৯]

❑ আল্লামা বিন বায রাহ. বলেন,

فلا يجوز للمسلم أن يسبَّ الدهر، ولكن يُجاهد نفسه في طاعة الله ورسوله، وترك ما نهى الله عنه ورسوله، فما أصابه من الأذى هو بأسباب أعماله السيئة، لا بأسباب الدهر، الدهر ما له تصرُّفٌ، لكن وصفه بالشدة لا يضرُّ، يقول: هذا زمان شديد، أو هذا زمان حارٌّ أو بارد، ما يضرُّ هذا.

“অত:এব কোনও মুসলিমের জন্য সময়কে গালি দেওয়া জায়েজ নাই। বরং তার কর্তব্য, আল্লাহর ও রসুলের আনুগত্যের ক্ষেত্রে প্রচুর চেষ্টা-সাধনা করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুল যা নিষেধ করেছেন তা থেকে দূরে থাকা। সে যে সব কষ্ট-শ্লেষের সম্মুখীন হয় তা তার অপকর্মের কারণে; সময়ের কারণে নয়। সময়ের নিজস্ব কোনও কর্মক্ষমতা নেই। তবে সময়কে কঠিন বলায় সমস্যা নেই। যেমন: মানুষ বলে, সময়টা কঠিন বা সময়টা গরম বা ঠাণ্ডা। এতে কোনও ক্ষতি নেই।”

মোটকথা, সময় এবং কাল-মহাকাল মহান অধিপতি এক আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। তার নিজস্ব কোনও শক্তি বা ইচ্ছা-অনিচ্ছা নেই। সময়ের প্রভাবে কারও কোনও উপকার বা ক্ষতি হয় না আল্লাহর হুকুম ছাড়া। তাই সময়কে গালমন্দ করা মানে আল্লাহকে গালমন্দ করা ও তাকে কষ্ট দেওয়ার নামান্তর। তাই তাওহিদপন্থী মুসলিমের জন্য আবশ্যক হল, কথাবার্তায় আরও সতর্কতা অবলম্বন করা, জীবনে কোনও বিপদাপদ নেমে এলে সে জন্য সময়কে দোষারোপ না করা বরং এ ক্ষেত্রে বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, জীবনে ভালো-মন্দ যা কিছু ঘটুক সবই আল্লাহ নির্ধারিত তকদিরের আলোকেই ঘটে থাকে। এ বিশ্বাস ইমানের ৬টি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম। আল্লাহ আমাদেরকে তাওহিদ বিরোধী বিশ্বাস ও কথা ও কর্ম থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

প্রথম রোজার সংবাদ দিলে জাহান্নামের আগুন হারাম মর্মে বর্ণিত হাদিসটি বানোয়াট ও জাল

 প্রশ্ন: “যে ব্যক্তি প্রথম রোজার সংবাদ দিবে তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম হয়ে যাবে” বর্তমানে ফেসবুকে এই কথাটা বেশ প্রচার হচ্ছে। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে আপনার একটি পোস্ট চাই। যাতে করে সবাই সঠিকটা জানতে পারে।

উত্তর: এ কথা সত্য যে, রমজান ঘনিয়ে এলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় এই জাতীয় হাদিসটি প্রচারের হিড়িক পড়ে যায়। প্রচার করা হয় যে, এ বছর অমুক তারিখ থেকে রমজান মাসের রোজা শুরু হবে। অথচ তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা। অর্থাৎ এটি হাদিসের নামে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে মিথ্যাচার ছাড়া কিছু নয়। তাছাড়া রমজান মাসের সূচনা চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল-যা জানার জন্য সরকার নির্ধারিত চাঁদ দেখা কমিটি বা আদালতের ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করতে হয় । সুতরাং তা গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির হিসেবে অগ্রিম সংবাদ দেওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং কেউ যদি অনেক আগে থেকে এই ঘোষণা প্রচার করে তাহলে তা হবে আরেকটি মিথ্যাচার।

◆ এ প্রসঙ্গে বিশ্ব বিখ্যাত ফতোয়া বিষয়ক ওয়েবসাইট Islamqa-এ বলা হয়েছে,

لم يذكره من صنف في فضل رمضان من العلماء، ولو من باب التنبيه على عدم صحته، كما لم يذكره من صنف في الأحاديث الضعيفة والموضوعة؛ لذلك يبدو أنه وُضع حديثًا.

“যে সকল আলেমগণ রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বই লিখেছেন তাদের কেউ এই হাদিসটি উল্লেখ করেননি। এটি যে বিশুদ্ধ নয় সে ব্যাপারে সতর্ক করার জন্যও কেউ উল্লেখ করেননি। অনুরূপভাবে দুর্বল ও বানোয়াট হাদিস সংকলনকারীগণ ও তা (এ সংক্রান্ত কোনও গ্রন্থেই উল্লেখ করেননি।) এতেই প্রমাণিত হয় যে, এটি সাম্প্রতিক কালের বানানো হাদিস।”
এরপর আরও লেখা হয়েছে, “সুতরাং এর উপরে ভিত্তি করে বলবো, এই হাদিস প্রচার বা শেয়ার করা জায়েজ নেই মানুষকে এ বিষয়ে সতর্ক করার উদ্দেশ্য ছাড়া।”

◆ কারা এসব বানোয়াট হাদিস প্রচার করে? অজ্ঞতা বশত: কেউ তা করে থাকলে তার জন্য করণীয়:

প্রকৃতপক্ষে, খোঁজ নিলে দেখা যাবে, যারা শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় ও বিভিন্ন গ্রুপে মেসেজ ফরওয়ার্ড করে শর্টকাট পদ্ধতিতে জান্নাতে যেতে চায় এটি তাদের বানানো হাদিস। আর ধর্মীয় বিভিন্ন বক্তব্যের প্রতি মানুষের এক ধরণের দুর্বলতা রয়েছে। সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সস্তা লাইক-কমেন্ট কামানোর ধান্ধায় এসব কথা হাদিস বলে প্রচার করে এক শ্রেণির লোক। এভাবেই শয়তান দ্বীনের সঠিক জ্ঞান বঞ্চিত মানুষের সাথে ধর্মের নামে ধোঁকাবাজি করে চলেছে।

যাহোক কেউ যদি অজ্ঞতাবশত এই জাতীয় হাদিস ইতোপূর্বে প্রচার করে থাকে তাহলে তার জন্য আবশ্যক হলো, অনতিবিলম্বে তা ডিলিট করা এবং এটি যে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কথা সে বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা।

✪ আল্লাহর রসুলের নামে মিথ্যাচারে ভয়াবহতা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় হাদিস প্রচারের পূর্বে সতর্কতা অবলম্বন অপরিহার্য:

মনে রাখা কর্তব্য যে, মানুষের সাথে সাধারণ মিথ্যা কথা এবং আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামে মিথ্যা কথা এক নয়। সাধারণ মিথ্যা কথা হারাম, কবিরা গুনাহ এবং মুনাফেকির বৈশিষ্ট্য। কিন্তু হাদিসের নামে মিথ্যাচার করার পরিণতি এর থেকেও ভয়াবহ। কেউ জেনে বুঝে তা করলে তার পরিণতি জাহান্নাম।

إنَّ كَذِبًا عَلَيَّ ليسَ كَكَذِبٍ علَى أَحَدٍ، مَن كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا، فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ

“আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, আমার প্রতি মিথ্যারোপ করা তোমাদের কারো প্রতি মিথ্যারোপ করার মত নয়। যে ব্যক্তি জেনেশুনে ইচ্ছাকৃত ভাবে আমার প্রতি মিথ্যারোপ করে সে যেন জাহান্নামে তার বাসস্থান নির্ধারণ করে নেয়।” [সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)। মুকাদ্দামাহ (ভূমিকা), পরিচ্ছেদ: ২. রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর মিথ্যারোপ গুরুতর অপরাধ]

কেননা এর মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে ভুল বার্তা সমাজের ছড়িয়ে পড়ে এবং এভাবে ক্রমান্বয়ে ইসলামে বিকৃতি সাধিত হয়।
তাই বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইসলাম বিষয়ে কোন কিছু প্রচারের আগে তার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে যাচাই-বাছাই করা এবং তার বিশুদ্ধতার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া হওয়া অপরিহার্য। অন্যথায় ইসলাম সম্পর্কে ভুল বার্তা প্রচার ও ইসলাম বিকৃতির অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পাশাপাশি তা প্রচারকারীর আমলনামায় গুনাহের জারিয়া বা প্রবহমান গুনাহ হিসেবে লিপিবদ্ধ হবে। যত মানুষ এর দ্বারা বিভ্রান্ত হবে তাদের সমপরিমাণ গুনাহ প্রচারকারীর আমলনামায় লিপিবদ্ধ করা হবে। সুতরাং এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সর্তকতা অবলম্বন করা আবশ্যক।

আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং ইসলাম সম্পর্কে সব ধরনের বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

ইসলামের দৃষ্টিতে শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্বামীর পরিবারের সেবার বিধান

 ইসলামের দৃষ্টিতে শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্বামীর পরিবারের সেবার বিধান এবং সকল পরিবারের প্রতি বিশেষ বার্তা

প্রশ্ন: ইসলামের দৃষ্টিতে স্ত্রীর জন্য কি শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা বাধ্যতামূলক?

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: ইসলামের দৃষ্টিতে স্ত্রী তার স্বামীর মা, বাবা, ভাই-বোন ইত্যাদির কারও সেবা করতে বাধ্য নয়। তবে শ্বশুর-শাশুড়ি এবং তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সেবা করা একদিকে যেমন স্বামীর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ অন্যদিকে নেকির কাজ তাতে কোন সন্দেহ নাই। কোন স্ত্রী যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তার শ্বশুর-শাশুড়ি বা তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের খেদমত করে তবে আল্লাহ তাকে আখিরাতে পুরষ্কার প্রদান করবেন ইনশাআল্লাহ। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে যে যত বেশি মানুষের উপকার করবে সে তত বেশি উত্তম। বিশেষ করে যখন রোগ-ব্যাধি, শারীরিক অক্ষমতা, বয়োঃবৃদ্ধ হওয়া ইত্যাদি কারণে শশুর-শাশুড়ির প্রতি যত্ন নেওয়ার বিশেষ প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন কারণে মানুষ একে অন্যের সেবা বা সহযোগিতার মুখাপেক্ষী হয়।

এক্ষেত্রে স্বামীদেরও উচিত,‌ আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় তার শ্বশুর-শাশুড়িদের প্রতি যথাসম্ভব সুদৃষ্টি রাখা এবং প্রয়োজন দেখা দিলে যথাসম্ভব তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা। এতে তিনিও আল্লাহর কাছে পুরস্কৃত হবেন ইনশাআল্লাহ।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللهِ تَعَالَى أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ وَأَحَبُّ الأَعْمَالِ إِلَى اللهِ تَعَالَى سُرُورٌ تُدْخِلُهُ عَلَى مُسْلِمٍ أَوْ تَكَشِفُ عَنْهُ كُرْبَةً أَوْ تَقْضِي عَنْهُ دَيْنًا أَوْ تَطْرُدُ عَنْهُ جُوعًا, وَلأَنْ أَمْشِيَ مَعَ أَخِ فِي حَاجَةٍ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَعْتَكِفَ فِي هٰذَا الْمَسْجِدِ – يَعْنِي مَسْجِدَ الْمَدِينَةِ – شَهْرًا وَمَنَ كَفَّ غَضَبَهُ سَتَرَ اللهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ كَظَمَ غَيْظَهُ وَلَوْ شَاءَ أَنْ يُمْضِيَهُ أَمْضَاهُ مَلأَ اللهُ قَلْبَهُ رَجَاءً يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَنْ مَشَى مَعَ أَخِيهِ فِي حَاجَةٍ حَتّٰـى يُثْبِتَهَا لَهُ أَثْبَتَ اللهُ قَدَمَهُ يَوْمَ تَزُولُ الأَقْدَامِ وَإِنَّ سُوَّء الْخُلُقِ لَيُفْسِدُ الْعَمَلَ كَمَا يُفْسِدُ الْخَلّ الْعَسَل

“আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হল সে ব্যক্তি যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল হল, একজন মুসলিমের অন্তরে আনন্দ প্রবেশ করানো অথবা তার দুখ-কষ্ট লাঘব করা, অথবা তার পক্ষ থেকে তার ঋণ পরিশোধ করা ও তার ক্ষুধা নিবারণ করা। আর আমার এই মসজিদে (মদিনার মসজিদে নববীতে) একমাস ব্যাপী ইতিকাফ করার থেকে আমার একজন ভাইয়ের কোনও প্রয়োজন মেটানোর জন্য তার সাথে গমন করা আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়। যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সংবরণ করবে আল্লাহ তার দোষ-ত্রুটি গোপন করবেন। যে ব্যক্তি ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করবে অথচ সে ইচ্ছা করলে তা প্রয়োগ করতে পারত, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার অন্তরকে সন্তুষ্ট করবেন। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য তার সাথে গমন করবে এবং তা পূরণ করে দেবে, আল্লাহ সেদিন তার পদযুগলকে সুদৃঢ় রাখবেন, যে দিন মানুষের পাগুলো পিছলে যাবে। আর মন্দ চরিত্র আমলকে নষ্ট করে যেমন সিরকা (ভিনেগার) মধুকে নষ্ট করে দেয়।” [সহিহ তারগিব, হা/২০৯০, সিলসিলা সহীহা, হা/৯০৬, সহীহুল জামে, হা/১৭৬]
◆ আমাদের সমাজে শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করাকে একজন নারীর প্রশংসনীয় দিক বিবেচনা করা হয়। তাই সামাজিক এই সুন্দর রীতিটি বজায় রাখার ব্যাপারে আমাদের সচেষ্ট হওয়া উচিৎ।

◆ তাছাড়া এটাও মনে রাখা দরকার যে, একজন মহিলার জীবনেও একদিন এমন সময় আসতে পারে যখন তার পুত্রবধূর সেবার প্রয়োজন দেখা দিবে। তাই সে যদি এখন সন্তুষ্ট চিত্তে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তার শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করে তবে সে যখন শাশুড়ি হবে তখন আশা করা যায়, তার পুত্রবধূরা তার সেবা করবে।

❑ সৌদি আরবের ফতোয়া বোর্ডকে শাশুড়িকে সহায়তা করার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তারা বলেন,

ليس في الشرع ما يدل على إلزام الزوجة أن تساعد أم الزوج ، إلا في حدود المعروف ، وقدر الطاقة ؛ إحساناً لعشرة زوجها ، وبرّاً بما يجب عليه بره

“শরিয়তে এমন কিছু নেই যা নির্দেশ করে যে, স্ত্রী স্বামীর মাকে সাহায্য করতে বাধ্য। তবে স্বামীর প্রতি ইহসান এবং তার প্রতি অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্যপরায়ণতার স্বার্থে যতটুকু সামাজিকতার সীমার মধ্যে পড়ে সেটা ভিন্ন কথা।” [ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ, ১৯/২৬৪ ও ২৬৫]

❑ আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ. কে প্রশ্ন করা হয়, স্ত্রীর উপর কি স্বামীর মা’র কোনও হক আছে?

তিনি উত্তরে বলেন,

لا ، أم الزوج ليس لها حق واجب على الزوجة بالنسبة للخدمة ؛ لكن لها حق مِن المعروف ، والإحسان ، وهذا مما يجلب مودة الزوج لزوجته ، أن تراعي أمه في مصالحها ، وتخدمها في الأمر اليسير ، وأن تزورها من حين لآخر ، وأن تستشيرها في بعض الأمور ، وأما وجوب الخدمة : فلا تجب ؛ لأن المعاشرة بالمعروف تكون بين الزوج والزوجة .

“না, খেদমতের ব্যাপারে স্ত্রীর ওপর স্বামীর মায়ের কোনও হক নেই সামাজিকতা ও ইহসানের হক ছাড়া। এ জিনিসটা স্ত্রীর প্রতি স্বামীর প্রেম-ভালোবাসা সৃষ্টি যে, সে তার মায়ের প্রতি যত্ন নেয়, সাধারণ ছোটখাটো বিষয়ে সেবা করে, সময়ে সময়ে তার সাথে দেখা করে এবং তার বিভিন্ন বিষয়ে তার নিকট পরামর্শ নেয়। কিন্তু খেদমত আবশ্যক হওয়ার ব্যাপারে কথা হল, তা আবশ্যক নয়। কারণ সততা ও কল্যাণের সাথে দাম্পত্য জীবন হবে কেবল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে।” [লিকাআতুল বাবিল মাফতুহ, পৃষ্ঠা নং ৬৮, প্রশ্ন নং ১৪]

❂❂ আমাদের সামাজিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে পরিবারগুলোর প্রতি বিশেষ বার্তা:

যদি পুত্রবধূ তার শ্বশুর-শাশুড়ির এতটুকু সেবা করে বা কোনোভাবে তার উপকার করে তাহলে তাদের কর্তব্য, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করা এবং তার কাজের মূল্যায়ন করা। স্বামীর কর্তব্য, স্ত্রীর এ কাজের জন্য কৃতজ্ঞতা আদায়ের পাশাপাশি তার প্রশংসা করা এবং তার প্রতি আরও বেশি আন্তরিকতা, যত্ন, সম্মান ও ভালোবাসা বৃদ্ধি করা। মাঝে মধ্যে এ জন্য তাকে আলাদা উপহার দেওয়াও ভালো। এতে সে খুশি হবে এবং আরও বেশি সেবা দিতে উৎসাহ বোধ হবে। স্বামীদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

مَنْ لَم يَشْكُرِ اَلناسَ لَمْ يَشْكُرِ اللهِ

“যে ব্যক্তি (উপকারী) মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করল না, সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করল না।” [আহমদ, হ/১১২৮০, তিরমিযী ১৯৫৫-সহিহ]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

تَهَادُوا تَحَابُّوا

“তোমরা উপহার বিনিময় কর তাহলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে।’’ [বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/ ৫৯৪, সহীহুল জামে’, হা/ ৩০০৪]

কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, আমাদের সমাজে শ্বশুর-শাশুড়ি সহ পরিবারের সকল সদস্যের প্রতি পুত্রবধূর পক্ষ থেকে সেবা পাওয়াকে ‘অধিকার’ মনে করা হয়। যার কারণে তার এহেন ত্যাগ ও সেবাকে যথার্থ মূল্যায়ন তো করা হয়ই না বরং তার কাজে সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি হলে তার সাথে নানা অপমান সুলভ আচরণ করা হয়, তার প্রতি নানাভাবে জুলুম-অত্যাচার করা হয় ও কষ্ট দেওয়া হয়। যা সামাজিক ভাবে যেমন অমানবিক আচরণ তেমনি শরিয়তের দৃষ্টিতেও হারাম।

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

«الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يَخْذُلُهُ وَلَا يَحْقِرُهُ التَّقْوَى هَهُنَا» . وَيُشِير إِلَى صَدره ثَلَاث مرار بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ: دَمُهُ ومالهُ وَعرضه

“এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। কোনও মুসলিম অপর মুসলিমের ওপর অবিচার করবে না, তাকে অপদস্থ করবে না এবং অবজ্ঞা করবে না। আল্লাহ ভীতি এখানে! এ কথা বলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের বুকের দিকে তিনবার ইঙ্গিত করে বললেন, একজন মানুষের জন্য এতটুকু অন্যায়ই যথেষ্ট যে, সে নিজের মুসলিম ভাইকে হেয় জ্ঞান করবে। এক মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের রক্ত, ধন-সম্পদ ও মান-সম্মান হারাম।” [সহিহ মুসলিম]

❖ শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি অহংকার করা বা তাদের প্রতি কষ্ট দায়ক আচরণ করা হারাম:

এর বিপরীতেও আমাদের সমাজে আরেকটি কষ্ট দায়ক চিত্র দেখা যায়। তাহলো, কতিপয় মহিলা শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-যোগ্যতা, সৌন্দর্য বা বাবার বাড়ির অর্থ-সম্পদ বা বংশগত গৌরবের কারণে তার শ্বশুর-শাশুড়ি বা স্বামীর পরিবারকে অবজ্ঞা করে, তাদেরকে নানাভাবে অপমান সুলভ কথা বলে ও কষ্ট দেয়। এটিও হারাম।
অনুরূপভাবে অনেক স্বামীও তার শশুর-শাশুড়ির সাথে অসদাচরণ করে বা তাদেরকে অপমান-অপদস্থ করে। এটিও হারাম।

সর্বাবস্থায় শ্বশুর-শাশুড়ি সম্মান ও শ্রদ্ধা পাওয়া হকদার। কেননা তারা বয়সে বড়। আর বয়োঃবৃদ্ধ, মুরুব্বি বা বড়দেরকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করা ইসলামি শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

ﻟَﻴْﺲَ ﻣِﻨَّﺎ ﻣَﻦْ ﻟَﻢْ ﻳَﺮْﺣَﻢْ ﺻَﻐِﻴﺮَﻧَﺎ ﻭَﻳُﻮَﻗِّﺮْ ﻛَﺒِﻴﺮَﻧَﺎ

“যে ছোটদেরকে দয়া এবং বড়দেরকে শ্রদ্ধা করেনা সে আমাদের দলভুক্ত নয়।“ [তিরমিযী, সহিহুল জামে, হা/৫৪৪৫]

সুতরাং প্রতিটি মহিলার জন্য তার শ্বশুর-শাশুড়ি ও তার স্বামীর পরিবারের বড়দের প্রতি যথার্থ সম্মান-শ্রদ্ধা করা এবং ছোটদের প্রতি দয়া ও স্নেহশীল আচরণ করা আবশ্যক। কোন অবস্থায় কাউকে হেয় বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, অহংকার প্রদর্শন, অসম্মান জনক আচরণ করা বা কষ্ট দেওয়া জায়েজ নেই। নারী-পুরুষ সকলের জন্য একই কথা প্রযোজ্য।

▪️প্রশ্ন: পুত্র সন্তানকে জীবিকা অর্জনের জন্য বাইরে থাকতে হয়। কন্যা সন্তানও বিয়ের পরে শ্বশুর বাড়ি চলে যায়। এ অবস্থায় পুত্রবধূও যদি শ্বশুর-শাশুড়িকে দেখাশুনা না করে তাহলে বৃদ্ধ মানুষগুলোকে কে দেখাশুনা করবে?
উত্তর:
আল্লাহ তাআলা পিতামাতার সেবা করাকে তার সন্তানদের জন্য অপরিহার্য করেছেন; পুত্রবধূর জন্য নয়। সুতরাং স্বামী পিতামাতার সেবা এবং তার জীবন-জীবিকার মধ্যে সমন্বয় সাধন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে যদি তিনি তার এ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে না পারেন তাহলে এ ক্ষেত্রে একজন ভালো মনের দ্বীনদার স্ত্রী তার স্বামীর অবস্থা বিবেচনা করে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এবং স্বামীকে সহায়তার স্বার্থে তার শ্বশুর-শাশুড়ির যথাসাধ্য সেবা দিবে। এতে আল্লাহ তাকে পুরস্কৃত করবেন ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান ও বুঝ দান করুন এবং তাঁর নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনার তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি পুত্রবধূ ও জামাইদের দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং শ্বশুর-শাশুড়িকে খুশি করার ১০ উপায়

নিম্নে শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি পুত্রবধূ এবং জামাইদের কর্তব্য সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো:

১. শ্বশুর-শাশুড়ি অত্যন্ত সম্মান এবং শ্রদ্ধার পাত্র। সুতরাং চাই স্বামী হোক বা স্ত্রী হোক-সকলের কর্তব্য, তাদের শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি যথার্থ সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে আচরণ করা। কারণ তারা বয়সে বড় বা বয়স্ক মুরুব্বি। আর হাদিসে বয়সে বড় ও মুরব্বিদেরকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করার নির্দেশ এসেছে। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

ﻟَﻴْﺲَ ﻣِﻨَّﺎ ﻣَﻦْ ﻟَﻢْ ﻳَﺮْﺣَﻢْ ﺻَﻐِﻴﺮَﻧَﺎ ﻭَﻳُﻮَﻗِّﺮْ ﻛَﺒِﻴﺮَﻧَﺎ

“যে ছোটদেরকে দয়া এবং বড়দেরকে শ্রদ্ধা করে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়।“ [তিরমিযী, সহিহুল জামে, হা/৫৪৪৫]।
যে পিতা-মাতার মাধ্যমে আপনি আপনার জীবন সঙ্গী অথবা সঙ্গিনীকে পেয়েছেন তাদেরকে ভালোবাসা এবং সম্মান ও শ্রদ্ধা করার মাধ্যমে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করা হয়।
২. স্ত্রী যেভাবে স্বামীর পিতা-মাতাকে সম্মান-শ্রদ্ধা করে স্বামীরও কর্তব্য, স্ত্রীর পিতা-মাতাকে সম্মান এবং শ্রদ্ধা করা। এটি স্ত্রীর প্রতিও ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার শামিল।
৩. বয়সে বড় বা বয়োবৃদ্ধ-মুরব্বিদের সাথে উত্তম আচরণ করা একজন মুসলিমের উন্নত চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। এর বিপরীতটা হল, নিতান্তই অসৎ চরিত্রের প্রমাণ।

৪. প্রতিটি মানুষের উচিৎ, তাদের শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে নরম ও সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা। তাদের সাথে কর্কশ, কষ্টদায়ক ও অশালীন বাক্য সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য।
৫. আপনার কোন কথা বা আচরণে তারা কষ্ট পেলে তাদের নিকট ক্ষমা চাওয়া জরুরি। ক্ষমা চাওয়া ও ক্ষমা করা উভয়টি মানুষের মহত্ত্বের লক্ষণ।
৬. তারা কোনোভাবে কষ্ট দিলে সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া কর্তব্য। কারণ বয়োবৃদ্ধ অবস্থায় রোগ-ব্যাধি, ঘুম সমস্যা, জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে মানুষের ধৈর্য শক্তি হ্রাস পায় এবং মন-মানসিকতা কিছুটা খিটমিটে হয়ে যায়। তাই এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখা উচিৎ।
৭. বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, হৃদ্‌রোগ, স্মৃতি ভ্রম, ক্যানসার ইত্যাদি রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই ছেলেমেয়েদের পাশাপাশি পুত্রবধূ বা জামাইদের উচিত, যথাসাধ্য তাদের শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

৮. বার্ধক্যে মানুষের রুচির পরিবর্তন ঘটে, দেখা দেয় হজমের সমস্যা। খাদ্য গ্রহণে অনীহা হয়। তাই তাদের রুচির প্রতি খেয়াল রেখে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার-দাবারের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখা কর্তব্য।
৯. বয়স বাড়তে থাকলে মানুষের ঘুমের অসুবিধা দেখা দেয়। ঘুম কম হয় বা রাতে ঘুম আসে না। তাই তাদের আরাম দায়ক ঘুমের দিকটি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

১০. তাদের পোশাক-আশাক, বিছানা, ঘর, ঘরের আসবাব-পত্র ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুন্দরভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখা উচিত।

১১. তাদের একাকীত্ব কাটাতে তাদের সঙ্গ দেওয়া এবং তাদের পাশে বসে কিছু সময় দ্বীন ও দুনিয়াবি বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা বলা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

১২. প্রয়োজন দেখা দিলে তাদের ওজু, গোসল ও ইবাদত-বন্দেগিতে সাহায্য করা কর্তব্য।
১৩. শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে জোরপূর্বক যৌতুক বা বিভিন্ন ধরনের উপহার-উপঢৌকন দাবি করা এবং তার না পেলে তাদের প্রতি অসদাচরণ করা শুধু হীন চরিত্রের পরিচায়ক নয় বরং তা প্রচলিত আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ এবং শরিয়তে দৃষ্টিতে হারাম।
১৪. কোন জামাই কিংবা পুত্রবধূর জন্য তার শ্বশুর-শাশুড়ির উপরে অহংকার প্রকাশ করা বা তাদেরকে কোনোভাবে খাটো করা জায়েজ নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-গরিমা, বংশগত আভিজাত্য ও মর্যাদা ইত্যাদি কারণে অনেক পুত্রবধূ বা জামাই তাদের শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি উপরে অহংকার ও দাম্ভিকতা সুলভ আচরণ করে এবং নানাভাবে তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করে। যা কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

১৫. সর্বোপরি তারা যদি আর্থিক, শারীরিক, মানসিক বা সামাজিক ইত্যাদি কোন ভাবে অশান্তি বা কষ্টে থাকে তাহলে তা লাঘব করার চেষ্টা করা এবং তাদেরকে খুশি রাখার চেষ্টা করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ।

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللهِ تَعَالَى أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ وَأَحَبُّ الأَعْمَالِ إِلَى اللهِ تَعَالَى سُرُورٌ تُدْخِلُهُ عَلَى مُسْلِمٍ أَوْ تَكَشِفُ عَنْهُ كُرْبَةً أَوْ تَقْضِي عَنْهُ دَيْنًا أَوْ تَطْرُدُ عَنْهُ جُوعًا, وَلأَنْ أَمْشِيَ مَعَ أَخِ فِي حَاجَةٍ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَعْتَكِفَ فِي هٰذَا الْمَسْجِدِ – يَعْنِي مَسْجِدَ الْمَدِينَةِ – شَهْرًا وَمَنَ كَفَّ غَضَبَهُ سَتَرَ اللهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ كَظَمَ غَيْظَهُ وَلَوْ شَاءَ أَنْ يُمْضِيَهُ أَمْضَاهُ مَلأَ اللهُ قَلْبَهُ رَجَاءً يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَنْ مَشَى مَعَ أَخِيهِ فِي حَاجَةٍ حَتّٰـى يُثْبِتَهَا لَهُ أَثْبَتَ اللهُ قَدَمَهُ يَوْمَ تَزُولُ الأَقْدَامِ وَإِنَّ سُوَّء الْخُلُقِ لَيُفْسِدُ الْعَمَلَ كَمَا يُفْسِدُ الْخَلّ الْعَسَل

“আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হল সে ব্যক্তি যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল হল, একজন মুসলিমের অন্তরে আনন্দ প্রবেশ করানো অথবা তার দুখ-কষ্ট লাঘব করা, অথবা তার পক্ষ থেকে তার ঋণ পরিশোধ করা ও তার ক্ষুধা নিবারণ করা।
আর আমার এই মসজিদে (মদিনার মসজিদে নববীতে) একমাস ব্যাপী ইতিকাফ করার থেকে আমার একজন ভাইয়ের কোনও প্রয়োজন মেটানোর জন্য তার সাথে গমন করা আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়। যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সংবরণ করবে আল্লাহ তার দোষ-ত্রুটি গোপন করবেন। যে ব্যক্তি ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করবে অথচ সে ইচ্ছা করলে তা প্রয়োগ করতে পারত, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার অন্তরকে সন্তুষ্ট করবেন। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য তার সাথে গমন করবে এবং তা পূরণ করে দেবে, আল্লাহ সেদিন তার পদযুগলকে সুদৃঢ় রাখবেন, যে দিন মানুষের পাগুলো পিছলে যাবে। আর মন্দ চরিত্র আমলকে নষ্ট করে যেমন সিরকা (ভিনেগার) মধুকে নষ্ট করে দেয়।” [সহিহ তারগিব, হা/২০৯০, সিলসিলা সহীহা, হা/৯০৬, সহীহুল জামে, হা/১৭৬]

১৬. এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, আজ যদি কেউ শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে খারাপ ব্যবহার করে তাহলে সম্ভাবনা আছে, এর বদলা হিসেবে সে যদি ভবিষ্যতে শ্বশুর-শাশুড়ি হয় তাহলে তার জামাই/পুত্রবধূর পক্ষ থেকে খারাপ আচরণের শিকার হবে। যেমনটি বলা হয়,
كَمَا تَدِينُ تُدَانُ ، وَكَمَا تَزرَعُ تَحصُدُ
“যেমন কর্ম করবে তেমন ফল পাবে, যেমন চাষ করবে তেমন ফসল পাবে।” [ইকতিযাউল ইলমিল আমাল-খতিব বাগদাদি, পৃষ্ঠা নং ৯৮]
▪️বিশেষ দ্রষ্টব্য, ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তানদের জন্য পিতা-মাতার সেবা-শুশ্রূষা, অর্থ খরচ করা ও দেখভাল করা ফরজ। কিন্তু পুত্রবধূ বা জামাইয়ের জন্য তা ফরজ না হলেও অত্যন্ত নেকির কাজ। ‌তাই তাদের কর্তব্য, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যথাসাধ্য শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা ও সাহায্য-সহযোগিতা করার মাধ্যমে অবারিত নেকি অর্জনের চেষ্টা করা।
আর শ্বশুর-শাশুড়ির কর্তব্য, যদি তাদের পুত্রবধূ বা জামাই তাদেরকে কোনভাবে সাহায্য-সহযোগিতা ও উপকার করে তাহলে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। কারণ যে মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করে না সে আল্লাহরও কৃতজ্ঞতা আদায় করে না।
আল্লাহ তাআলা তওফিক দান করুন। আমিন।

🔸শ্বশুর-শাশুড়িকে খুশি করার ১০ উপায়:

প্রশ্ন: শ্বশুর-শ্বশুর-শাশুড়ির মন খুশি রাখতে কী করণীয়?
উত্তর:
১. মনে রাখা কর্তব্য যে, মানুষের সাথে সুন্দর আচরণ, নরম ভাষায় কথা বলা, ধৈর্যের সাথে সেবা ও সহযোগিতা করা, রাগ নিয়ন্ত্রণ করা, খারাপ আচরণের জবাব খারাপ আচরণের মাধ্যমে না দেওয়া-এগুলো হল, মানুষের মন জয় করার স্বীকৃত মূলমন্ত্র।
সুতরাং আপনি যদি আপনার শ্বশুর-শাশুড়িকে খুশি রাখতে চান তাহলে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এ সকল গুণ ও আচরণ প্র্যাকটিস করুন। এতে আপনি তাদের প্রিয় হয়ে উঠবেন।

২. তাদের পক্ষ থেকে খারাপ আচরণের সম্মুখীন হলে প্রতিশোধ পরায়ণ না হয়ে সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দিবেন এবং আল্লাহর নিকট তাদের হেদায়েতের জন্য দুআ করবেন।
৩. দূরে থাকলে তাদের সাথে নিয়মিত ফোনে যোগাযোগ রাখুন এবং খোঁজ-খবর নিন।
৪. বিভিন্ন বিষয়ে তার থেকে পরামর্শ নিন এবং বিশেষ ক্ষেত্রে তাদেরকে পরামর্শ দিন।
৫. তাদের সামনে অথবা তাদের অনুপস্থিতে তাদের জন্য আল্লাহর নিকট দুআ করুন।
৬. সম্ভব হলে, তাদেরকে অর্থিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করার পাশাপাশি কিছু উপহার দিন। উপহার মানুষের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
৭. তাদের প্রশংসনীয় দিকগুলো তুলে ধরে তাদের প্রশংসা করুন।
৮. তারা আপনার কোনও উপকার করলে কৃতজ্ঞতা আদায় করুন।
৯. তাদের সুখে সুখী হোন এবং তাদের দুঃখে দুঃখী হন।
১০. মাঝেমধ্যে কিছু সময়ের জন্যে হলেও তাদের নিকট সময় কাটানো এবং তাদের সেবা-যত্ন করুন। এতে আল্লাহ আপনার উপর সন্তুষ্ট হবেন এবং আখিরাতে এর উত্তম বিনিময় দান করবেন। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব। 

Translate