Thursday, August 17, 2023

নাটক-সিনেমা নির্মাণকারী এবং নায়ক-নায়িকা, অভিনেতা, কলা-কুশলী ইত্যাদির প্রতি সতর্কবার্তা

 হারাম নাটক-সিনেমা, মিউজিক ভিডিও ইত্যাদি তৈরিতে যেসব নায়ক-নায়িকা, অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, কলা-কুশলী প্রমুখগণ জড়িত তারা সকলেই মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কারণ যারা সমাজে পাপ কর্মের প্রসার ঘটায় এবং মানুষকে প্রকাশ্যে পাপাচারে উদ্বুদ্ধ করে তাদের অপরাধ অত্যন্ত ভয়ানক। আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন না বলে ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি তিনি তাদেরকে দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় জগতে কঠিন শাস্তির হুমকি দিয়েছেন। যেমন: মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
“যারা পছন্দ করে যে, ইমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতা প্রসার লাভ করুক, তাদের জন্যে ইহা ও পরকালে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” [সূরা নূর: ১৯]

অশ্লীল, হারাম কার্যক্রম ও পাপকর্ম করা আল্লাহর নিকট ঘৃণিত এবং শাস্তিযোগ্য গুনাহ হলেও আল্লাহ চাইলে এসব গুনাহগারকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। কিন্তু পাপ বিস্তারে জড়িত লোকদের কোন ক্ষমা নেই।

সুতরাং আমাদের সমাজে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হারাম স্টেজ শো, কনসার্ট, গান-বাজনার প্রতিযোগিতা, ছেলে-মেয়েদের মডেলিং, মিউজিক ও নাচ-গান শিক্ষা, মিউজিক ভিডিও, অশ্লীল ওয়েব সিরিজ, নোংরা রোমান্টিক ভিডিও, নাটক-সিনেমা, কাছে আসার গল্প ইত্যাদি নানা ধরনের হারাম জিনিস বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, youtube ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে সমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছে তারা সবাই উক্ত আয়াতের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। কারণ তারা সমাজে অশ্লীলতা প্রসারকারী।
কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ তাদের এই কাজের কারণে গুনাহ অর্জন করবে এর পেছনের কলাকুশলী, চ্যানেলের মালিক, নির্মাতা, ক্যামেরাম্যান, ভিডিও এডিটর, ডিরেক্টর, প্রযোজক, নায়ক-নায়িকা অভিনেতা, স্পন্সর এবং নানাভাবে সহায়তাকারী ইত্যাদি সকলের আমলনামায় তাদের সকলের সমপরিমাণ গুনাহ অবিরাম ধারায় জমা হতেই থাকবে যদি না তারা জীবদ্দশায় আল্লাহর নিকট লজ্জিত অন্তরে তওবা করে এবং তাদের হারাম কার্যক্রম গুলোকে সাধ্য অনুযায়ী মুছে ফেলার চেষ্টা করে।

▪️পাপকর্ম প্রকাশকারীরা আল্লাহর ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে না:

মহান আল্লাহ বান্দার অনেক পাপ গোপন রাখেন এবং তিনি চান মানুষ যেন তাদের গোপন পাপাচার প্রকাশ না করে। যারা গোপন পাপ জনসম্মুখে প্রকাশ করে তাদেরকে তিনি ক্ষমা করবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

كُلُّ أُمَّتِي مُعَافىَ إِلاَّ الْمُجَاهِرِيْنَ، وَإِنّ مِنَ المُجَاهَرَةِ أنْ يَّعْمَلَ الرَّجُلُ بِاللَّيْلِ عَمَلًا ثُمَّ يُصْبِحُ وَقَدْ سَتَرَهُ اللهُ عَلَيهِ فَيقُولُ : يَا فُلَانُ عَمِلتُ الْبَارِحَةَ كَذَا وَكَذَا وَقَدْ بَاتَ يَسْتُرُهُ رَبُّهُ وَيُصبِحُ يَكْشِفُ سِتْرَ اللهِ عَنْه

“পাপকর্ম প্রকাশকারীরা ছাড়া আমার সকল উম্মত ক্ষমা প্রাপ্ত হবে।
আর পাপকর্ম প্রকাশ করার অর্থ হলো, কোন ব্যক্তি রাতে কোন পাপকাজ করে, যা আল্লাহ গোপন রাখেন। কিন্তু সকাল হলে সে বলে বেড়ায়, ’হে অমুক, আমি আজ রাতে এই এই কাজ করেছি।’ অথচ সে এমন অবস্থায় রাত অতিবাহিত করেছিল যে, আল্লাহ তার পাপ গোপন রেখেছিলেন। কিন্তু সে সকালে উঠে সে নিজেই আল্লাহ যা গোপন রেখেছিলেন তা প্রকাশ করে দেয়।” [বুখারী, হা/ ৬০৬৯, মুসলিম, হা/৭৬৭৬]

যারা প্রকাশ্যে পাপাচার করে তারাও সমাজে পাপ ও অশ্লীলতা প্রসারকারী হিসেবে পরিগণিত হবে। কারণ তাদের দেখে অন্যান্য মানুষ আল্লাহর নাফরমানি ও পাপকর্মের পথ খুঁজে পাবে, তাদের দেখে অন্যরা অন্যায়-অপকর্মে অনুপ্রাণিত হয়, যারা সে বিষয়ে জানতো না‌ তারা জানে এবং এর কলা-কৌশল শিখে নেয়। তাদের দেখাদেখি অন্যান্য মানুষের কাছে আল্লাহর শরিয়ত লঙ্ঘন করা সহজ হয়ে যায়।

▪️আল্লাহ তাআলা তার ঈমানদার বান্দাদের অনেক পাপরাশি গোপন রাখেন:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

‏ يُدْنَى الْمُؤْمِنُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ رَبِّهِ عَزَّ وَجَلَّ حَتَّى يَضَعَ عَلَيْهِ كَنَفَهُ فَيُقَرِّرُهُ بِذُنُوبِهِ فَيَقُولُ هَلْ تَعْرِفُ فَيَقُولُ أَىْ رَبِّ أَعْرِفُ ‏.‏ قَالَ فَإِنِّي قَدْ سَتَرْتُهَا عَلَيْكَ فِي الدُّنْيَا وَإِنِّي أَغْفِرُهَا لَكَ الْيَوْمَ ‏.‏ فَيُعْطَى صَحِيفَةَ حَسَنَاتِهِ وَأَمَّا الْكُفَّارُ وَالْمُنَافِقُونَ فَيُنَادَى بِهِمْ عَلَى رُءُوسِ الْخَلاَئِقِ هَؤُلاَءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى اللَّهِ

“কিয়ামতের দিন ঈমানদার ব্যক্তিকে তাদের রবের খুব কাছে নিয়ে আসা হবে। তারপর তিনি তার উপর পর্দা ফেলে দিবেন। এবং তার গুনাহ সম্পর্কে তার থেকে স্বীকারোক্তি গ্রহণ করবেন।
তিনি জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি (তোমার গুনাহ) স্বীকার কর কি? সে বলবে, হে রব! আমি স্বীকার করছি।
তারপর তিনি বলবেন, তোমার এ গুনাহ দুনিয়ায় আমি গোপন রেখেছিলাম। আজ তোমার এ গুনাহগুলোকে আমি ক্ষমা করে দিলাম।
তারপর তার নেকির আমলনামা তার নিকট দেওয়া হবে। আর কাফির ও মুনাফিকদেরকে উপস্থিত সমস্ত মানুষের সামনে ডেকে ঘোষণা দেওয়া হবে, এরাই তারা যারা আল্লাহ তাআলার উপর মিথ্যারোপ করেছিল।” [সহি বুখারী ও মুসলিম। ‌সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৫১/ তাওবা, পরিচ্ছেদ: ৮. হত্যাকারীর তাওবা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য; যদিও সে বহু হত্যা করে থাকে]

▪️কেউ যদি চায় যে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার গুনাহগুলো প্রকাশ না করুন তাহলে সে যেন দুনিয়াতে তার নিজের বা অন্যের গুনাহগুলো প্রকাশ না করে:

হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«لاَ يَسْتُرُ عَبْدٌ عَبْداً في الدُّنْيَا إلاَّ سَتَرَهُ اللهُ يَوْمَ القِيَامَةِ»
“যে দুনিয়াতে কোনো বান্দার দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।’’ [মুসলিম, হা/২৫৯০, রিয়াদুস সালেহীন, অধ্যায়: বিবিধ, পরিচ্ছেদঃ ২৮: মুসলিমদের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখা জরুরি এবং বিনা প্রয়োজনে তা প্রচার করা নিষিদ্ধ]

▪️কেউ পাপ করলে আল্লাহ চান সে যেন তা প্রকাশ না করে:

হাদিস চেয়ে বর্ণিত হয়েছে,
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ حَلِيمٌ حَيِيٌّ سِتِّيرٌ يُحِبُّ الْحَيَاءَ وَالسَّتْرَ
“আল্লাহ তাআলা সহনশীল, লজ্জাশীল, তিনি (মানুষের পাপ) ঢেকে রাখেন। তিনি লজ্জাশীলতাকে এবং মানুষের গুনাহগুলোকে ঢেকে রাখতে পছন্দ করেন।” [সহীহ-আবু দাউদ ৪০১২, ইরওয়াউল গালীল ২৩৩৫, মিশকাত ৪৪৭]

– শাইখ আব্দুল হক দেহলভি বলেন, সিত্তীর নামটির অর্থ, মহান আল্লাহ তার বান্দাদেরকে অপদস্থ করেন না এবং তাদের অপকর্মগুলো ঢেকে রাখেন।” [লুময়াতুত তাহকিক ফী শারহে মিশকাতিল মাসাবিহ, ২/১৭৯]

– ইমাম বায়হাকি বলেন,
” ستير ” يعني أنه ساتر يستر على عباده كثيرا ، ولا يفضحهم في المشاهد .
كذلك يحب من عباده الستر على أنفسهم ، واجتناب ما يشينهم ، والله أعلم

“সিত্তীর অর্থ: আল্লাহ মানুষের প্রচুর পরিমাণ (দোষত্রুটি ও গুনাহ) ঢেকে রাখেন। সেগুলোকে জনসম্মুখে প্রকাশ করে দিয়ে তাদেরকে অপদস্থ করেন না। অনুরূপভাবে তিনি এটাও পছন্দ করেন যে, বান্দাগণ কোনও পাপকর্ম করে ফেললে তা যেন ঢেকে রাখে এবং নোংরা ও অশালীন কাজ থেকে দূরে থাকে। আল্লাহ সবচেয়ে বেশি জানেন।” [আল আসমা ওয়াসিফাত, পৃষ্ঠা নাম্বার ১৪৮]। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। আমিন।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

মুহররম মাসের ফজিলত ও করণীয় সম্পর্কে বর্ণিত ১৪টি সহিহ হাদিস

 নিম্নে মহররম মাসের ফজিলত ও করণীয় সম্পর্কে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত ১৪টি হাদিস পেশ করা হল:

◆১. প্রখ্যাত সাহাবী আবু বাকরা রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা আসমান সমূহ এবং জমিন সৃষ্টির দিন যে আকৃতিতে সময়কে সৃষ্টি করেছিলেন সেটা আবার তার নিজস্ব কৃতিতে ফিরে এসেছে। এবং বারো মাসে এক বছর। তম্মধ্যে চারটি মাস অতি সম্মানিত। তিনটি মাস ধারাবাহিক। সেগুলো হল: যুল কা’দাহ [যিলকদ], যুল হিজ্জা [যিলহজ্জ] এবং মুহররম এবং আরেকটি হল মুযার সম্প্রদায়ের রজব মাস যা জুমাদাল ঊলা এবং শাবানের মধ্যখানে রয়েছে। [বুখারি ও মুসলিম]
◆২. আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হল আল্লাহর মাস মুহররমের রোজা। আর ফরজ নামাযের পর সর্বোত্তম নামায হল রাতের নামায।” [মুসলিম]
◆৩. আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, “জাহেলি যুগে কুরাইশগণ আশুরার রোজা পালন করত। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় এসে নিজে আশুরারা রোজা রাখলেন এবং সাহাবীদেরকেও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু‘ যখন রমজানের রোজা ফরজ হল তখন তা পরিত্যাগ করা হল। যার ইচ্ছা রাখত যার ইচ্ছা রাখত না।” [বুখারি]
◆৪. ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনা আগমন করার পর দেখলেন, সেখানকার ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা পালন করছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: তোমরা কিসের রোজা রাখ? তারা বলল: এটি একটি কল্যাণময় দিন। এ দিন বনী ইসরাইলকে আল্লাহ তাআলা তাদের শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। তাই মুসা (আ.) এ দিন রোজা পালন করেছিলেন। (বিধায় আমরাও মুসা আ. এর অনুসরণে এ দিনটিতে রোজা পালন করি)।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আমি তোমাদের চেয়ে মুসাকে অনুসরণ করার বেশি হকদার।” অতঃপর তিনি এ দিন রোজা রাখলেন এবং সাহাবীদেরকে রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। [বুখারি-মুসলিম]
◆৫. আবু মুসা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইহুদিরা আশুরার দিনকে ঈদ মনে করত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “অতএব তোমরা এ দিন রোজা রাখ।” [বুখারি-মুসলিম)
◆৬. হুমাইদ বিন আব্দুর রহমান হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মুয়াবিয়া রা. কে হজ্জের বছর আশুরার দিন মিম্বারের উঠে বক্তব্য দিতে শুনেছি। তিনি বলছেন, “হে মদিনা বাসী, তোমাদের আলেমগণ কোথায়? আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, আজ আশুরার দিন। আল্লাহ এ দিন রোজা রাখা ফরজ করেন নি। কিন্তু আমি রোজা রেখেছি। অতএব, তোমাদের কেউ চাইলে রোজা রাখতে পারে, নাও রাখতে পারে।” [বুখারি ও মুসলিম]
◆৭. ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে এই আশুরার দিনের উপর অগ্রাধিকার দিয়ে এত গুরুত্ব সহকারে অন্য কোন দিন রোজা পালন করতে দেখি নি। (অর্থাৎ রমজান মাস ছাড়া) [বুখারি]
◆ ৮. রুবাই বিনতে মুআউওয়ায রা. বলেন, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশুরার দিন সকাল বেলা আনসারদের মহল্লায় মহল্লায় এ ঘোষণা দেয়ার জন্য লোক পাঠালেন যে, যে ব্যক্তি রোজা রাখেনি সে যেন দিনের বাকি অংশ রোজা অবস্থায় থাকে আর যে রোজা রেখেছে সে যেন রোজা পূর্ণ করে।”
রুবাই রা. বলেন, আমরা নিজেরা রোজা রাখতাম এবং আমাদের বাচ্চাদেরকে রোজা রাখাতাম। আর তাদের জন্য রঙ্গিন পশম দ্বারা খেলনা বানিয়ে রাখতাম। কেউ কান্নাকাটি করলে সেটা তাকে দিতাম যেন ইফতারের সময় পর্যন্ত রোজা অবস্থায় থাকে।” [বুখারি ও মুসলিম]
◆ ৯. সালামা বিন আকওয়া রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসলাম গোত্রের এক ব্যক্তিকে এ ঘোষণা দেয়ার জন্য দায়িত্ব দিয়েছিলেন যে, “যে ব্যক্তি খেয়ে ফেলেছে সে যেন দিনের বাকী অংশ রোজা থাকে আর যে খায়নি সেও যেন রোজা অবস্থায় থাকে। কারণ, আজ আশুরার দিন।” [বুখারি-মুসলিম]
◆ ১০. আবু কাতাদা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন, “প্রতি মাসে তিন দিন এবং এক রমজান থেকে আরেক রমজান পর্যন্ত রোজা রাখলে সারা বছর রোজা রাখার সাওয়াব অর্জিত হয়। আরাফার দিন রোজা রাখলে আল্লাহর নিকট আশা করি যে তিনি এর বিনিময়ে আগের ও পরের এক বছরের গুনাহ মোচন করে দিবেন। আর আশুরার দিন রোজা রাখলে আল্লাহর নিকট আশা করি যে, তিনি এর বিনিময়ে পূর্বের এক বছরের গুনাহ মোচন করবেন।” [সহিহ মুসলিম]
◆ ১১. আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন, জাহেলি জামানার লোকেরা আশুরার দিন রোজা পালন করত। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং মুসলমানগণও এ দিন রোজা পালন করতেন। পরবর্তীতে রমজানের রোজা ফরজ হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আশুরার দিন আল্লাহ তাআলার দিন সমূহের মধ্য থেকে একটি দিন। যার ইচ্ছা সে এ দিন রোজা রাখতে পারে আর যার ইচ্ছা রোজা বাদও দিতে পারে।” [সহিহ মুসলিম]
◆ ১২. জাবির বিন সামুরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে আশুরার দিন রোজা রাখতে আদেশ করতেন, উৎসাহিত করতেন-এমনকি রোজা রাখার ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতেন। অতঃপর রমজানের রোজা ফরজ হলে তিনি এ রোজার ব্যাপারে আদেশ করতেন না, নিষেধও করতেন না এবং এ ব্যাপারে খোঁজ-খবরও নিতেন না। [সহিহ মুসলিম]
◆ ১৩. ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আশুরার দিন রোজা রাখলেন এবং অন্যদেরকে রাখার জন্য আদেশ করলেন তখন সাহাবিগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বললেন, হে আল্লাহর রসূল, এ দিনটিকে তো ইহুদিরা সম্মান করে?! তিনি বললেন, ইনশাআল্লাহ আমি আগামী বছর নয় তারিখে রোজা রাখব।” অন্য বর্ণনায় রয়েছে, (তিনি বলেছেন), ” আগামীতে বেঁচে থাকলে নয় তারিখে রোজা রাখব।” [সহিহ মুসলিম]
◆১৪. ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আশুরার দিন রোজা রাখ এবং এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের বিরোধিতা করে এর আগের দিন বা পরের দিন রোজা রাখ।” [মুসনাদ আহমদ, সহীহ ইবনে খুযায়মা ইত্যাদি]
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন, “মাসের শুরু চিনতে অসুবিধা হলে (নয়, দশ ও এগার এ) তিন দিন রোজা রাখবে। যেন নয় ও দশ তারিখে রোজা নিশ্চিতভাবে সম্পন্ন করা যায়।” [মুগনী ৩/১৭৪]
——সমাপ্ত——-

সংকলনে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

কবর পূজার নানা রূপ এবং কবর পূজারীদেরকে চেনার আলামত

 প্রশ্ন: কবর পূজা বলতে কী বুঝায়? কবর কেন্দ্রিক শিরক ও বিদআতি কাজগুলো কী কী? কবর পূজারীদেরকে সহজে চেনার কোনও আলামত আছে কী?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: নিম্নে অতি সংক্ষেপে এই সকল প্রশ্নের উত্তর প্রদান করা হলো: وبالله التوفيق

▪️কবর পূজা বলতে কী বুঝায়?

কবর পূজা বলতে বুঝায়, কবরে শায়িত ওলি বা বুজুর্গের উদ্দেশ্যে কোন ধরনের ইবাদত-বন্দেগি করা যার হকদার কেবল আল্লাহ তাআলা।

▪️কবর পূজার কতিপয় উদাহরণ (শিরকি কার্যক্রম):

ওলি বা বুজুর্গদের কবরে রুকু ও সেজদা করা, তাজিম ও বিনম্রতার সাথে তাদের কবরের সামনে সালাতের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা, বরকত লাভের উদ্দেশ্যে কবরের দেওয়াল স্পর্শ করা বা তাতে শরীর লাগানো বা কাপড় ঘষে তা নিজের বা বাচ্চাদের শরীরে লাগানো, কবরে শায়িত কথিত ওলির-বুজুর্গদের উদ্দেশ্যে গরু, ছাগল, হাস-মুরগি ইত্যাদি মানত করা বা তাদেরকে খুশি করার উদ্দেশ্যে পশু জবেহ করা এবং টাকা-পয়সা, সোনা-গহনা ইত্যাদি দান করা।

অনুরূপভাবে কবরের শায়িত ওলি-বুজুর্গের তার কাছে সন্তান চাওয়া, রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তি চাওয়া, তার কাছে মনোবাসনা তুলে ধরে কাকুতি-মিনতি ও ফরিয়াদ জানানো, বিপদ-আপদে সাহায্য প্রার্থনা করা অথবা দূর থেকে যে কোন সমস্যা, সংকট ও বিপদ-মসিবতে কবরে শায়িত ওলি-বুজুর্গের কথা স্মরণ করে তার নাম জপ করা বা তার কাছে সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য প্রার্থনা জানানো।

তদ্রুপ কবরের উপরে মসজিদে নির্মাণ করা, কবরে শায়িত কথিত ওলি বা বুজুর্গের উসিলা ধরে দুআ করা, তার নামে কসম খাওয়া, কবরের ওয়াল বা মাটি ছুঁয়ে কসম করা, কবরের ওলি বা বুজুর্গেরউদ্দেশ্যে মুরাকাবা বা ধ্যানমগ্ন থাকা, কবরের চারপাশে তওয়াফ করা, কবরকে নামাজের স্থান বানিয়ে নেওয়া, কবরকে তাজিম তথা বিনয়-নম্রতা সহকারে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা করা, কবরে শায়িত ওলিকে বিপদ-মসিবতে ত্রাণকর্তা বলে বিশ্বাস করা এবং তার কাছেই বিপদ মুক্তির জন্য আরধনা করা অথবা তাকে উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতাবান বলে বিশ্বাস করা ইত্যাদি। এগুলো সবাই একমাত্র মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর হক। কোন মাখলুকের উদ্দেশ্যে এগুলো করা শিরকে আকবর বা বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত।‌ ওলি-বুজুর্গদের প্রতি সম্মান-শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ক্ষেত্রে এগুলো চরম পর্যায়ের বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন। ‌কেউ জেনে-বুঝে এসব কবর পূজা ও শিরকি কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করলে করলে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে এবং মুশরিক বলে পরিণত হবে। ফলে তার জীবনের সকল নেক আমল বরবাদ হয়ে যাবে, তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যাবে এবং মূর্তি পূজারী মুশরিকদের মত চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামি হয়ে যাবে।‌ (আল্লাহ হেফাজত করুন। আমিন)

▪️কবর কেন্দ্রিক কতিপয় বিদআতি কার্যক্রম:

মাটি থেকে অনেক উঁচু করে কবর দেওয়া, কবরের উপরে বিল্ডিং নির্মান করা, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কবরের চারপাশে প্রাচীর বা ওয়াল তৈরি করা, তাতে চুনকাম করা, কবরে মৃত অলি বা বুজুর্গের নাম ফলক লাগানো, ঢোল-তবলা ও নানা ধরনের বাজনা বাজাতে বাজাতে লাশ কবরস্থানে নেওয়া, কবরের উপরে সামিয়ানা টাঙ্গানো বা চাদর চড়ানো, গম্বুজ স্থাপন করা, ফুল দেওয়া, তাতে আতর-সুগন্ধি ও গোলাপ জল ইত্যাদি ছিটানো, কবরে মোমবাতি-আগরবাতি জ্বালানো।

অনুরূপভাবে কথিত বুজুর্গ ও ওলির কবরে বার্ষিক ওরস মাহফিল বা আনন্দ উৎসব করা, ওরসের নামে নাচ-গান করা, নারী-পুরুষ একাকার হয়ে বাজনার তালে তালে গাঞ্জা টানা‌ ও জিকির করা, কবরকে মাজার বলে অভিহিত করা।

মৃতের উদ্দেশ্যে সবিনাখানি, কুলখানি, ফাতেহাখানি, মিলাদ মাহফিল ও দুআ মাহফিলের আয়োজন করা, মৃত্যুবরণের তিন দিন বা সাত দিন পরে জাঁকজমক ভাবে ভোজসভার আয়োজন করা, চল্লিশা পালন করা, মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন করা, কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে দূর দুরান্ত থেকে সফর করা, জানাজা ও দাফনের পরে কিংবা কবর জিয়ারতে গিয়ে দলবদ্ধ ভাবে মোনাজাত করা, লাশ কবরে দাফন করার পরে কবরের সওয়াল-জওয়াবের জন্য উপর থেকে তালকিন দেওয়া ইত্যাদি সবই বিদআতি কাজ ও হারাম।

যারা এই বিষয়গুলোকে জায়েজ মনে করে এবং নিজেরা করে ও অন্যদেরকেও আহ্বান জানায় তারা বিদআতি।

হ্যাঁ, মৃত্যু ও আখেরাতের কথা স্মরণ করার উদ্দেশ্যে যে কোনও কবরে যেকোনো সময় জিয়ারত করা জায়েজ। ইসলামের প্রথম যুগে তাও নিষিদ্ধ ছিল কিন্তু পরবর্তীতে মানুষ তাওহিদ ও শিরক-বিদআত সম্পর্কে দৃঢ় জ্ঞান অর্জন করার পর ইসলামে তা অনুমোদন করা হয়েছে। কিন্তু কবর জিয়ারত করতে গিয়ে সেখানে হাদিসে বর্ণিত সালাম প্রদান এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ ছাড়া সূরা ফাতিহা এত বার, তিন কুল ইত্যাদি পাঠ করা বিদআত।

▪️কবর পূজারী চেনার কিছু আলামত:

কবর পূজারীদের পূজার চেনার আলামত হল, তারা‌ যারা কবর পূজা এবং মাজার কেন্দ্রিক শিরক, বিদআত ও অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বলে তাদের সাথে চরম মাত্রার শত্রুতা পোষণ করে এবং তাদেরকে ওয়াহাবি, ইয়াজিদের বংশধর, জারজ, গোস্তাখে রাসুল সহ বাপ-দাদা ও চৌদ্দগোষ্ঠী তুলে নানা ধরনের অপবাদ মূলক ও অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মহব্বতের ক্ষেত্রে অতিভক্তি ও শরিয়তের সীমাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে, তাদের কথিত ওয়াজ মাহফিলগুলোতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিংবা অলি-বুজুর্গদের উদ্দেশ্যে নানা ধরনের শান, গান ও‌ গজল গায়, এই সময় তারা হেলে-দুলে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে নাচানাচি করে বা চিল্লা-ফাল্লা করে, তারা প্রচুর পরিমাণ আজগুবি কিচ্ছা-কাহিনী, বুজুর্গদের কেরামত এবং জাল ও যেই হাদিস বর্ণনা করে।
এরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম-এর প্রতি প্রতিভক্তি দেখাতে গিয়ে তাঁর নাম শোনার সাথে সাথে দুই হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল জমা করে ঠোঁটে লাগিয়ে দু চোখে বুলায়, তাদের অনেকেই, বিশেষ করে তাদের মৌলভিরা মাথায় বড়সড়ো সবুজ পাগড়ি পরিধান করে অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথিত জুতার আকৃতি (যাকে নালাইন শরীফাইন বলা হয়) সম্বলিত সবুজ বা বিভিন্ন রংবেরঙের টুপি পরে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বত্র হাজির নাজির বলে বিশ্বাস করে, তাঁর উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে মিলাদ-কিয়াম করে, তিনি অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সব অদৃশ্যের খবর জানে বলে বিশ্বাস করে, হায়াতুন্নবী তথা তিনি কবরে দুনিয়ার জীবনের মতই জীবিত আছে বলে বিশ্বাস করে, তাঁকে নুরের তৈরি বলে বিশ্বাস করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মা-বাবা এবং চাচা আবু তালেবকে পাক্কা মুমিন এবং জান্নাতি বলে বিশ্বাস করে ইত্যাদি।

🔸প্রিয় বন্ধুগণ, এলাকাভিত্তিক কবর ও মাজার কেন্দ্রিক আরও নানা ধরনের‌ শিরক ও বিদআতি কার্যক্রম থাকতে পারে। আপনারা সেগুলো নিচের কমেন্টে উল্লেখ করতে পারেন।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

পরিশেষে, মহান আল্লাহর কাছে দুআ‌ করি, তিনি যেন আমাদেরকে সব ধরনের শিরক, বিদআত ও কুসংস্কার মূলক কার্যক্রম থেকে হেফাজত করে করেন এবং যে সকল পথভ্রষ্ট মানুষ এই সকল কার্যক্রম নিজেরা করার পাশাপাশি অন্যান্য মুসলিমদেরকে সেদিকে আহবান করে তাদেরকে জাহান্নামের পথে আহবান করছে তাদের অনিষ্ট থেকে জাতিকে হেফাজত করেন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

মুহররম মাসে বিয়ে-শাদি কি নিষিদ্ধ

 প্রশ্ন: লোকমুখে শোনা যায় যে, মুহররম মাসে না কি বিয়ে-শাদি নিষিদ্ধ? এ কারণে অনেক মানুষ এ মাসে বিয়ে করে না এবং বিয়ে দেয়ও না। এটা কি সঠিক?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: ইসলামের দৃষ্টিতে মুহররম মাসে বিয়ে-শাদি নিষিদ্ধ নয়। বরং বছরের কোন মাসেই কোন সময়ই বিয়ে-শাদি নিষিদ্ধ নয়। এ মর্মে যে সব কথা প্রচলিত রয়েছে সব‌ই ভিত্তিহীন ও কুসংস্কার।

◆◆ মুহররম মাস নিয়ে শিয়াদের বাড়াবাড়ি:

মুহররম মাসে বিয়ে-শাদি করা ঠিক নয়- মর্মে প্রচলিত কথাটি শিয়া-রাফেযি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে মিথ্যা প্রচারণা হতে পারে। কেননা, এ মাসে (মুহররম মাসের ১০ তারিখে) হুসাইন রা. কারবালার প্রান্তরে শাহাদাত বরণ করেছিলেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে তারা মিথ্যা মায়াকান্না আর অতিভক্তি দেখিয়ে এ মাসে অনেক বিদআতি কার্যক্রম করে থাকে এবং শরিয়তের অনেক বৈধ জিনিসকে অবৈধ করে থাকে। যেমন তারা বলে, মুহররম মাসে নতুন জামা পড়া যাবে না, গোস্ত-মাছ ইত্যাদি ভালো খাবার খাওয়া যাবে না বরং কেবল নিরামিষ খেতে হবে, বিছানায় না শুয়ে মাটিতে শুতে হবে, বিয়াশাদী দেয়া বা করা বৈধ নয়…ইত্যাদি। অথচ এ সব কথা শুধু দলীল বহির্ভূত নয় বরং দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন ছাড়া অন্য কিছু নয়। ইসলামি শরিয়ত যা নিষেধ করে নি তা নিষেধ করা মানে দ্বীনের মধ্যে সীমালঙ্ঘন এবং ধৃষ্টতা প্রদর্শন।

নি:সন্দেহে হুসাইন রা. এর মৃত্যুতে আমরা বেদনাহত ও মর্মাহত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদেরকে সবরের পরিচয় দিতে হবে এবং তাদের জন্য দুআ করতে হবে। কারণ হুসাইন রা. এর পূর্বে তার পিতা আলি ইবনে তালিব রা., উসমান বিন আফফান রা., উমর ইবনুল খাত্তাব রা. সহ অসংখ্য সাহাবি শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করে দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেছেন। অথচ তাদের মৃত্যুতে মুসলিম বিশ্ব মর্মাহত হলেও এ সব নিয়ে কোন ধরণের বাড়াবড়ি মূলক কার্যক্রম করে না। কেননা ইসলাম কারো মৃত্যু/শাহাদতকে কেন্দ্র করে বিলাপ করা, শরীরে আঘাত করা, শরীর রক্তাক্ত করা, পরিধেয় কাপড় ছেঁড়া, মাটিতে গড়াগড়ি করা, উচ্চস্বরে কান্নাকাটি করা, শোক দিবস পালন করা, কালো পোশাক ও কালো ব্যাজ ধারণ করে শোক র‍্যালী ও তাজিয়া মিছিল করা…ইত্যাদি কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ হারাম ও জাহেলিয়াতের কাজ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

◈ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ ضَرَبَ الْخُدُودَ ، وَشَقَّ الْجُيُوبَ ، وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ
“সে ব্যক্তি আমাদের লোক নয় যে গালে চপেটাঘাত করে, জামার পকেট ছিঁড়ে এবং জাহেলিয়াতের মত ডাকে। “ [সহীহ বুখারি: অনুচ্ছেদ: সে আমাদের লোক নয় যে, গালে চপেটাঘাত করে। হাদিস নম্বর ১২৯৭, মাকতাবা শামেলা]

◈ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন,
النِّيَاحَةُ عَلَى الْمَيِّتِ مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ
“বিলাপ করা (কারও মৃত্যুতে চিৎকার করে কান্নাকাটি করা, মৃত ব্যক্তির বিভিন্ন গুণের কথা উল্লেখ করে মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি করা, শরীরে আঘাত করা, জামা-কাপড় ছেঁড়া ইত্যাদি) জাহেলি যুগের কাজ।” [ইবনে মাজাহ, অনুচ্ছেদ: মৃতকে কেন্দ্র করে চিৎকার করে বিলাপ করা নিষিদ্ধ। আল্লামা আলবানি হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। দেখুন: সহীহ ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১২৮৬, মাকতাবা শামেলা]

আল্লাহ হেফাজত করুন। আমিন।

সুতরাং মুহররম মাসকে কেন্দ্র করে, আমাদের সমাজে যে সেকল বাতিল ও বিদআতি কার্যক্রম এবং ভিত্তিহীন বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে সেগুলো থেকে আমাদেরকে অবশ্যই বের হয়ে আসতে হবে এবং সামাজিকভাবে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তাহলে ইনশাআল্লাহ একদিন আমাদের সমাজ বিদআত ও কুসংস্কারের পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হবে ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ধর্মের নামে সকল অধর্মের বিরুদ্ধে কাজ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
▬▬▬◈◆◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

আমার যতটুকু করার তা আমি করেছি বাকিটা আল্লাহর উপর এ কথা বলার হুকুম

 প্রশ্ন: “আমার যতটুকু করার তা আমি করেছি- বাকিটা আল্লাহর উপর।” এ কথা বলার হুকুম কী?

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর:
الحمد لله، رب العالمين والصلاة السلام على رسول الله، وبعد:
فمن يقول هذا العبارة مراده أني فعلت السبب الذي أقدر عليه في الأمر الذي أريد تحقيقه، وأما حصول المقصود، وتحقيق النتائج فذلك إلى الله، وهذا المعنى حق، فإن العبد لا يملك تحقيق مقاصده، وبلوغ آماله إلا بتوفيق الله وتيسيره، فمعنى هذه العبارة يرجع إلى ما جاء في الحديث “اعقلها وتوكل”. أخرجه الترمذي (2517)، وابن حبان (731). وهذا هو الذي يليق بالمسلم أن يفعل السبب المشروع ويعتمد في حصول المطلوب على ربه، فيجتهد في فعل الأسباب المشروعة، ويستعين بربه في حصول مطلوبه كما قال صلى الله عليه وسلم “احرص على ما ينفعك، واستعن بالله ولا تعجِز”. صحيح مسلم (2664).
ولكن ينبغي أن يقول المتكلم بهذه العبارة (والباقي إلى الله)، بدل (على الله)، والله أعلم
“সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসুলের উপর। অত:পর, যে ব্যক্তি এই বাক্যটি বলে তার কথার মানে হল যে, আমি যে বিষয়টি অর্জন করতে চাই তার জন্য আমি সাধ্যানুযায়ী উপায় অবলম্বন করেছি (অর্থাৎ আমার যা করণীয় আমি তা করেছি)। কিন্তু লক্ষ্য হাসিল বা ফলাফল অর্জনের জন্য আল্লাহর উপর নির্ভর করছি। আর এ অর্থটি সত্য। কারণ আল্লাহর রহমত ও তওফিক ছাড়া বান্দা তার লক্ষ্য অর্জন এবং প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না। সুতরাং উক্ত বাক্যটির অর্থ সেটাই, যা এ হাদিসে এসেছে:
اعقلها وتوكل
“আগে উঁট বাধো, তারপর আল্লাহর উপর ভরসা কর।” (অর্থাৎ উটকে না বেঁধে ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করে বসে থেকো না। অন্যথায় উট পালিয়ে যাবে)। এটি তিরমিজি (২৫১৭) এবং ইবনে হিব্বান (৭৩১) বর্ণনা করেছেন। একজন মুসলিমের জন্য কর্তব্য হলো, সে যা চায় তা অর্জনের জন্য তার প্রতিপালকের উপর ভরসা করবে। ফলে সে বৈধ উপায় অবলম্বন করার করার পাশাপাশি তার প্রতিপালকের সাহায্য প্রার্থনা করবে। যেন সে তার প্রত্যাশা অনুযায়ী তা অর্জন করতে পারে। যেমন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
احرص على ما ينفعك، واستعن بالله ولا تعجِز
“যা তোমার জন্য কল্যাণকর তা গুরুত্ব সহকারে করো এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো। অক্ষম হয়ো না।” [সহীহ মুসলিম, ২৬৬৪]

তবে যে এমন কথা বলবে, তার “বাকিটা আল্লাহর উপর” না বলে উচিৎ, “বাকিটা আল্লাহর নিকটে।” আল্লাহু আলাম-আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।”
▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

শাইখ আব্দুর রহমান বিন নাসের আল বাররাক, (লেকচারার, ইমাম মুহাম্মদ বিন সাউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব)
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

Translate