প্রশ্ন: “আমার যতটুকু করার তা আমি করেছি- বাকিটা আল্লাহর উপর।” এ কথা বলার হুকুম কী?
Thursday, August 17, 2023
আমার যতটুকু করার তা আমি করেছি বাকিটা আল্লাহর উপর এ কথা বলার হুকুম
মানুষের মধ্যে সর্ব প্রথম সৃষ্টি আদম আ. নাকি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
প্রশ্ন: আল্লাহ তাআলা সর্ব প্রথম আদম আ. কে সৃষ্টি করেছেন না কি নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে? শুনেছি যে, আল্লাহ তাআলা সর্ব প্রথম নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নুর সৃষ্টি করেছেন। সে নুর থেকে তিনি এই বিশ্বচরাচরের সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। এ কথার বাস্তবতা কতটুকু?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: মানব জাতির মধ্যে আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম আদম আ. কে সৃষ্টি করেছেন। এরপর পৃথিবীতে যত মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে ও ঘটবে তারা সকলে আদম ও তাঁর স্ত্রী হাওয়া আ. এর মাধ্যমেই হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً ۚ
“হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী।” [সূরা নিসা: ১]
মানব জাতির এ ধারা পরম্পরায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৫৭০/৬৭১ খৃষ্টাব্দে মক্কার কুরাইশ বংশে পিতা আব্দুল্লাহ ও মা আমিনার মাধ্যমে দুনিয়ার বুকে আগমন করেছেন।
❑ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নুর আল্লাহ প্রথম সৃষ্টি হওয়ার হাদিস জাল ও ভিত্তিহীন:
আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নুর সৃষ্টি করেছেন আর তার নুর থেকে তামাম জাহান সৃষ্টি করেছেন, আদম আ. কে সৃষ্টি করার পর তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা নুর দেখতে পেলেন আর সে নুর হল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইত্যাদি। এ ধরণের যত কথা আমাদের সমাজে লোকমুখে প্রচলিত সবই ভিত্তিহীন ও ভ্রান্ত কথা। এ সব কথায় বিশ্বাস করা বৈধ নয়।
◈ যারা বলে যে, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নুর থেকে বিশ্ব ভুবন সৃষ্টি হয়েছে তাদের প্রতি প্রশ্ন:
তাঁদের এই কথার ফলাফল অনুযায়ী পৃথিবীর সবকিছু নুরে মুহাম্মদি দ্বারা তৈরি। তাহলে আল্লাহর শত্রু ফেরাউন, নমরূদ, হামান, আবু জাহেল, আবু লাহাব, জেনাকারি এবং জেনাকারিনী, মদ্যপান কারী এবং মদ, জুয়াড়ি এবং জুয়া, মূর্তি এবং মন্দির, জাহান্নাম এবং জাহান্নামি, শুকর, কুকুর, ইঁদুর, বিড়াল ইত্যাদি সবই কি নুরে মুহাম্মদি হতে তৈরি?! নাউযু বিল্লাহ! এটাই কি আপনাদের দৃষ্টিতে নবীর মর্যাদা এবং নবীর মহব্বত?! বরং এই বর্ণনা অনুযায়ী তো এর থেকেও জঘন্য আকিদা প্রমাণ হয়। তা হল, এ সবও আল্লাহর নুর! কারণ নুরে মুহাম্মদি হচ্ছে, প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর নুর যা দ্বারা এসব কিছু তৈরি হয়েছে। এটা কোন ধরণের আকিদা?!
◈ যারা বলে যে, আল্লাহ তাআলা সর্ব প্রথম আল্লাহর নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নুর সৃষ্টি করেছেন তাদের এ কথা নিম্নোক্ত সহিহ হাদিস পরিপন্থী:
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
হাদিসটিকে ইবনে আসেম আস্ সুন্নাহ গ্রন্থে (১০৮), আল আওয়ায়েল্ গ্রন্থে (৩), আবু ইয়ালা তার মুসনাদ গ্রন্থে (১/ ১২৬), বায়হাকি সুনান আল কুবরাতে (৯/৩) এবং আল্ আসমা ওয়াস সিফাত গ্রন্থে (২৭১)এ বর্ণনা করেন। [দেখুন সিলসিলা সহীহাহ, প্রথম খণ্ড হা/১৩৩]
শাইখ আলবানি, এ হাদিসের ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন,
“এ হাদিসে এই ইঙ্গিত রয়েছে যে, লোকজন যে বিষয়টি নিজেদের মধ্যে আলোচনা-পর্যালোচনা করে থাকে এমনকি যেটা অনেক মানুষের অন্তরে শক্ত বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে যে, নুরে মুহাম্মদি (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নুর) হল, আল্লাহর সর্বপ্রথম সৃষ্টি। কিন্তু তা সঠিক নয়।” [ajurry]
মাটি নাকি নুর
মাটি না কি নুর? (সত্যানুসন্ধিৎসু হৃদয়ে প্রজ্জ্বলিত হোক সত্যের আলো)
আমাদের সমাজে ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাটির তৈরি নাকি নুরের তৈরি’ এ বিষয়ে প্রচুর দ্বন্দ্ব, তর্ক-বিতর্ক, ঝগড়াঝাটি, গালাগালি ও নানা বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ যুগ পরম্পরায় চলে আসছে-যা অদ্যাবধি বিদ্যমান। কিন্তু মূলত: এসব কার্যক্রম নিছক গোঁড়ামি ও মূর্খতা সুলভ আচরণ ছাড়া আর কিছু নয়। প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষও ছিলেন আবার নুর বা আলোও ছিলেন। এটা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও বাদানুবাদে লিপ্ত হওয়ার কোন সুযোগ নেই।
▪️আসুন, এ বিষয়টি পরিস্কার করা যাক: وبالله التوفيق
প্রথমত আমাদেরকে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে যে, তিনি কি মানুষ ছিলেন, নাকি জিন ছিলেন, নাকি ফেরেশতা ছিলেন। যদি মানুষ জাতির অন্তর্ভুক্ত হন তাহলে মানুষ যে উপাদান থেকে যে পদ্ধতিতে সৃজিত হয়েছে তিনিও সে পদ্ধতিতে সে উপাদান থেকেই সৃজিত হয়েছেন।
তাহলে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষ ছিলেন কি না তা কুরআন-হাদিস থেকে জানা যাক:
◆ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষ ছিলেন; ফেরেশতা ছিলেন না। এ বিষয়ে কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন,
وَقَالُوا مَالِ هَٰذَا الرَّسُولِ يَأْكُلُ الطَّعَامَ وَيَمْشِي فِي الْأَسْوَاقِ ۙ لَوْلَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مَلَكٌ فَيَكُونَ مَعَهُ نَذِيرًا
“তারা (কাফেরেরা) বলে, এ কেমন রসুল যে, খাদ্য আহার করে এবং হাটে-বাজারে চলাফেরা করে? তাঁর কাছে কেন কোন ফেরেশতা নাজিল করা হল না যে, তাঁর সাথে সতর্ক কারী হয়ে থাকত?” [সূরা ফুরকান: ৭]
– এই আয়াতের তাফসিরে ইমাম বাগাভি বলেন,
◆ আল্লাহ আরও বলেন,
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَىٰ إِلَيَّ
يقول تعالى ذكره قل لهؤلاء المشركين يا محمد: إنما أنا بشر مثلكم من بني آدم لا علم لي إلا ما علمني الله وإن الله يوحي إليّ أن معبودكم الذي يجب عليكم أن تعبدوه ولا تشركوا به شيئا، معبود واحد لا ثاني له، ولا شريك
“আল্লাহ তাআলা (এই আয়াতে) বলেছেন, “হে মুহাম্মদ, আপনি ঐ সকল মুশরিকদেরকে বলে দিন যে, আমি তোমাদের মতই আদম সন্তানদের মধ্য থেকে একজন মানুষ মাত্র। আমার কোনও জ্ঞান নেই আল্লাহ যা আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন তা ছাড়া। আর আল্লাহ আমার নিকট এ মর্মে ওহি নাজিল করেন যে, তোমাদের মাবুদ-যার ইবাদত করা এবং তার সাথে কোনও কিছুকে শরিক না করা তোমাদের জন্য আবশ্যক-তিনি হলেন, একমাত্র মাবুদ যার দ্বিতীয় বা অংশীদার কেউ নেই।” [তাফসিরে ত্ববারি]
❑ মানব সৃষ্টির উপাদান:
◆ মা-জননী আয়েশা রা. রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,
«خُلِقَتِ الْمَلَائِكَةُ مِنْ نُورٍ وَخُلِقَ الْجَانُّ مِنْ مَارِجٍ مِنْ نَارٍ وَخُلِقَ آدَمُ مِمَّا وصف لكم»
“ফেরেশতাদের কে নুর (আলো) দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। আর জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে ধোঁয়া মিশ্রিত অগ্নিশিখা হতে এবং আদম আ. কে সৃষ্টি করা হয়েছে ঐ বস্তু দ্বারা, যার বর্ণনা (কুরআনে) তোমাদেরকে বলা হয়েছে।” [সহিহ মুসলিম] অর্থাৎ কুরআনে বিভিন্ন স্থানে আদম সৃষ্টির যে উপাদানগুলোর কথা বলা হয়েছে সেগুলো। যেমন: কাদা-মাটি, বিশুষ্ক ঠনঠনে মাটি, এঁটেল মাটি ইত্যাদি, দেখুন: সুরা আর রহমান-এর ১৪ এবং সূরা স্বদ-এর ৭ নম্বর আয়াত।
◆আদম আলাইহিস সালাম ছাড়া অন্যান্য মানব সৃষ্টির উপাদান সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ مِنَ الْمَاءِ بَشَرًا
“তিনিই পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন মানবকে।” [সূরা ফুরকান: ৫৪]
◆ তিনি আরও বলেন,
خُلِقَ مِن مَّاءٍ دَافِقٍ
“সে (মানুষ) সৃজিত হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি (বীর্য) থেকে।” [সূরা ত্বারিক: ৬]
◆তিনি আরো বলেন,
وَبَدَأَ خَلْقَ الْإِنسَانِ مِن طِينٍ - ثُمَّ جَعَلَ نَسْلَهُ مِن سُلَالَةٍ مِّن مَّاءٍ مَّهِين
“এবং কাদামাটি থেকে মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন। অতঃপর তিনি তার বংশধর সৃষ্টি করেন দুর্বল পানির নির্যাস (বীর্য) থেকে।” [সূরা সাজদা: ৭ ও ৮]
উল্লেখ যে, কুরআনে মানব সৃষ্টির উপাদান হিসেবে যেসব স্থানে কাদা-মাটি, বিশুষ্ক ঠনঠনে মাটি, এঁটেল মাটি ইত্যাদি কথা বলা হয়েছে সেগুলো মূলতঃ আদম আলাইহিস সালাম-এর সৃষ্টি প্রসঙ্গে। [দেখুন: সুরা আর রাহমান-এর ১৪, সূরা আনআম-এর ২, সূরা সফফাত-এর ১১ এবং সূরা হিজর-এর ২৬ নম্বর আয়াত]
অতএব বলা যায় যে, মানব সৃষ্টি সূচনা হয়েছে মাটি থেকে। তবে আদম আ. ছাড়া অন্য কাউকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়নি। সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সরাসরি ‘মাটি থেকে সৃষ্টি’ বলা সঙ্গত নয়। হ্যাঁ, প্রথম মানুষ আদম আলাইহিস সালামকে যেহেতু মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে সেহেতু মানব সৃষ্টির মূল উপাদান হিসেবে তাঁকেও মাটির তৈরি বললেও অত্যুক্তি হবে না। তবে বিতর্ক এড়াতে না বলাই ভালো।
যাহোক, প্রমাণিত হল যে, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষ ছিলেন। অত:এব (আদম আ., হাওয়া আ. এবং ঈসা আ. ছাড়া) পৃথিবীর অন্যান্য সকল মানুষ যে উপাদান থেকে সৃষ্টি এবং স্বামী-স্ত্রীর মিলনের মাধ্যমে মাতৃগর্ভে জন্মগ্রহণ করেছে তিনিও সেভাবেই মাতৃগর্ভে জন্মগ্রহণ করে দুনিয়ার বুকে পদার্পণ করেছেন।
তিনি জিন ছিলেন না যে, বলা হবে তিনি আগুন থেকে সৃষ্ট আর ফেরেশতাও ছিলেন না যে, বলা হবে তিনি নুর বা আলো থেকে সৃষ্ট।
❂ তিনি মানুষ হলেও অন্য সব মানুষের তুলনায় ছিলেন অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী:
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষ হলেও তিনি সাধারণ কোনও মানুষ ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তিনি চরিত্র মাধুরী, সুন্দর আচার-আচরণ, ক্ষমা, উদারতা, বিনয়-নম্রতা, অহংকার মুক্ত জীবন, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা, রাগ নিয়ন্ত্রণ, যৌন কামনা সংবরণ, দয়া ও ক্ষমা প্রদর্শন, সাহসিকতা, ন্যায়-ইনসাফ, লজ্জাশীলতা, দানশীলতা, হাসি-কৌতুক ইত্যাদি মানবিক গুণাবলীর ক্ষেত্রে এক অনন্য-অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন তিনি। তার কথা বলার ধরণ, খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, দুনিয়ার সম্পদের প্রতি অনাগ্রহ, শিশুদের সাথে আচরণ, দাম্পত্য জীবন ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই তিনি বিশ্ব মানবতার সামনে এক বিশাল প্রেরণার উৎস ও অনুকরণীয় মহান আদর্শ।
▪️তিনি কতটা সহজ-সরল ও সাংসারিক মানুষ ছিলেন তা আয়েশা রা. এর এ কথাটি থেকে প্রতীয়মান হয়:
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كان يَخيطُ ثوبَه ويخصِفُ نعلَه ويعمَلُ ما يعمَلُ الرِّجالُ في بيوتِهم
❝রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কাপড় সেলাই করতেন, জুতা মেরামত করতেন এবং লোকজন যেভাবে বাড়িতে গৃহস্থালির কাজ-কর্ম করে থাকে তেমনি তিনিও বাড়িতে গৃহস্থালির কাজ-কর্ম করতেন।” [সহিহ ইবনে হিব্বান-সহিহ]
তিনি অন্যত্র বলেছেন,
كان بشرًا من البشرِ : يَفْلِي ثوبَه ، و يحلبُ شاتَه ، و يخدم نفسَه
“তিনি মানুষের মধ্য থেকে একজন মানুষ ছিলেন। তিনি কাপড়ে উকুন খুঁজতেন, বকরীর দুধ দোহন করতেন এবং নিজের কাজ নিজেই করতেন।❞ [মুসনাদে আহমদ, ইবনে হিব্বান, সিলসিলা সহিহা, হা/৬৭১]
সুবহানাল্লাহ!! মানবজাতির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হয়েও কত সহজ-সরল ও সাধারণ জীবন যাপন করতেন আমাদের প্রাণের নবী ভালোবাসার নবি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সত্যি তিনি ছিলেন এক মহান আদর্শ ও অনুকরণীয় জীবনের প্রতিচ্ছবি!
❑ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মানবিক বৈশিষ্ট্য সমূহ:
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে অধিকাংশই মানবিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল। তিনি হাসতেন, কাঁদতেন, আনন্দিত হতেন, রাগান্বিত হতেন, কষ্ট পেতেন, ভয় পেতেন (ওহি নাজিলের ঘটনা), ক্ষুধার্ত হতেন, ঘুমাতেন, পরিশ্রান্ত হতেন, তাঁর বিশ্রামের প্রয়োজন হত, তিনি ঘর্মাক্ত হতেন। রাস্তা চলাচলের সময় সূর্যের আলোতে তাঁর ছায়া পড়ত।
তিনি বিয়ে করেছেন। স্ত্রী সহবাস করতেন। তাঁর বীর্য নির্গত হত। তিনি মাঝেমধ্যে কিছু বিষয় ভুলে যেতেন। সালাতেও একাধিক বার তার ভুল হয়েছে (যেমন: যুল ইয়াদাইনের হাদিস)। তিনি ভুলে গেলে সাহাবিদেরকে বলতেন যে, তারা যেন তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি আহত হয়েছেন। তাঁর শরীর থেকে রক্ত নির্গত হয়েছে (তায়েফের ঘটনা)। যুদ্ধে তাঁর দাঁত ভেঙ্গেছে (উহুদের যুদ্ধ)। তিনি যুদ্ধে যাওয়ার আগে আত্মরক্ষার জন্য শিরস্ত্রাণ ব্যবহার করেছেন।
তিনি গায়েব বা অদৃশ্যের খবর জানতেন না আল্লাহ তাকে বিশেষভাবে যা জানিয়েছেন তা ছাড়া। যার প্রমাণ উহুদের যুদ্ধে পরাজয়, ইহুদি মহিলা কর্তৃক বিষ মেশানো গোশত খাওয়ানো, ইফক তথা আয়েশা রা. এর প্রতি অপবাদের ঘটনা, বিরে মাউনায় ৭০ জন সাহাবির মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি।
তবে মানবিক বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রেও আল্লাহ তাআলা তাঁর মধ্যে ব্যতিক্রমী কিছু বৈশিষ্ট্য দিয়েছিলেন। যেগুলো ছিল তাঁর মুজিযা ও তাঁর প্রতি মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। যেমন: আল্লাহ তাআলা তাকে ৩০ বা ৪০ জন স্ত্রীর সহবাস করার ক্ষমতা দিয়েছিলেন, সালাতরত অবস্থায় তাঁর পেছনের অবস্থা দেখতে পেতেন, তিনি একটানা নিরবিচ্ছিন্নভাবে রোজা রাখার শক্তি রাখতেন। কেননা আল্লাহ তাকে পানাহার করাতেন ইত্যাদি। এছাড়াও তাঁর মোজেজা সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনা এর প্রমাণ।
ইসলামের কিছু বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে তার জন্য ব্যতিক্রমী বিধান ছিল। তাহাজ্জুদের সালাত তাঁর জন্য ফরজ হওয়া, সওমে বিসাল বা একটানা অবিচ্ছিন্নভাবে রোজা পালনের অনুমতি, চারের অধিক বিয়ে ইত্যাদি। এই জাতীয় আরো কিছু বিষয়ে তার জন্য স্বতন্ত্র বিধান ছিল যেগুলো তার উম্মতের জন্য প্রযোজ্য ছিল না।
❑ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নুর বা আলো ছিলেন:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক দিকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুওয়ত ও রিসালাত প্রাপ্তির মাধ্যমে সম্মান ও মর্যাদায় সমগ্র মানব জাতির মধ্যে তুলনাবিহীন এবং জ্ঞান-প্রজ্ঞা, উত্তম চরিত্র এবং অন্যান্য মানবিক বৈশিষ্ট্যে ছিলেন এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত মহামানব। অন্যদিকে তিনি ছিলেন নুর বা আলো। কুরআনে তাঁকে নুর বা আলো বলা হয়েছে। হ্যাঁ, সত্যিই তিনি ছিলেন আলো। আলোকিত মানুষ। আলোর দিশা। তাঁর নিকট থেকে জ্ঞানের আলোয় বিশ্ব-ভুবন আলোকিত হয়েছে। মানুষ জাহেলিয়াত ও গোমরাহির গাঢ় অমানিশায় তাওহিদ ও হেদায়েতের আলো পেয়েছে। তিনি সত্যের আলো ছড়িয়েছেন। মূর্খতার অন্ধকারে তিনি জ্বেলেছেন জ্ঞানের মশাল। কেননা জ্ঞান হল, আলো আর অজ্ঞতা হল, অন্ধকার। তাওহিদ হল, আলো আর শিরক ও ভ্রষ্টতা হল, অন্ধকার। এই অর্থে তিনি অবশ্যই নুর বা আলো ছিলেন।
◆ এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِّمَّا كُنتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ ۚ قَدْ جَاءَكُم مِّنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُّبِينٌ
“হে আহলে-কিতাবগণ, তোমাদের কাছে আমার রসুল আগমন করেছেন। কিতাবের যেসব বিষয় তোমরা গোপন করতে, তিনি তার মধ্য থেকে অনেক বিষয় প্রকাশ করেন এবং অনেক বিষয় মার্জনা করেন। তোমাদের কাছে একটি নুর বা আলো এবং একটি সমুজ্জ্বল গ্রন্থ এসেছে।” [সূরা মায়িদা: ১৫]
এই আয়াতের তাফসিরে ত্বাবারিতে বলা হয়েছে,
يعني بالنور، محمدًا صلى الله عليه وسلم الذي أنار الله به الحقَّ، وأظهر به الإسلام، ومحق به الشرك، فهو نور لمن استنار به يبيِّن الحق. ومن إنارته الحق، تبيينُه لليهود كثيرًا مما كانوا يخفون من الكتاب.
“নুর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। যার মাধ্যমে তিনি সত্যকে প্রস্ফুটিত ও ইসলামকে বিকশিত করেছেন এবং শিরককে করেছেন নিশ্চিহ্ন। সুতরাং তিনি তার জন্য আলো যে তার দ্বারা আলোকিত হয়েছে। তিনি সত্যকে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সত্যকে আলোর মত ফুটিয়ে তুলেছেন। এর একটি দিক হল, ইহুদিরা আল্লাহর কিতাব (তাওরাতের) যা কিছু গোপন করেছিলো তিনি তার অনেক কিছুই প্রকাশ করে দিয়েছেন।” [তাফসিরে ত্বাবারি]
আল্লাহ তাআলা আল কুরআনকেও নুর বা আলো বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন:
◆ মহান আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَكُم بُرْهَانٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَأَنزَلْنَا إِلَيْكُمْ نُورًا مُّبِينًا
“হে মানুষেরা, তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট শক্তিশালী প্রমাণ হাজির হয়ে গেছে। আর আমি তোমাদের প্রতি সুস্পষ্ট নুর বা আলো অবতীর্ণ করেছি।” [সূরা নিসা: ১৭৪]
এখানে নুর বা আলো দ্বারা উদ্দেশ্য কুরআন। যেমন: তাফসিরে কুরতুবিতে বলা হয়েছে,
النور المنزل هو القرآن ؛ عن الحسن ؛ وسماه نورا لأن به تتبين الأحكام ويهتدى به من الضلالة ، فهو نور مبين ، أي واضح بين
“(আল্লাহর পক্ষ থেকে) অবতরণ কৃত নুর বা আলো হচ্ছে, কুরআন। তিনি কুরআনকে নুর বলেছেন এ কারণে যে, এর মাধ্যমে বিধিবিধান প্রস্ফুটিত হয় এবং গোমরাহির মধ্যে হেদায়েত লাভ করা যায়। সুতরাং তা نور مبين তথা সুস্পষ্ট ও পরিষ্কার আলো।” [তাফসিরে কুরতুবি]
তাফসিরে ইবনে কাসিরে বর্ণিত হয়েছে,
“আর আমি প্রকৃষ্ট নুর (আলো) অবতীর্ণ করেছি।” অর্থাৎ সত্যের উপর স্পষ্ট জ্যোতি। ইবনে জুরাইজ প্রমুখ বলেছেন, তা হল, কুরআন।”
◆ আল্লাহ তাআলা আল্লাহর কিতাব তাওরাতের ব্যাপারেও বলেছেন যে, তাতে রয়েছে নুর বা আলো:
إِنَّا أَنزَلْنَا التَّوْرَاةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ
“আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছি। এতে হেদায়েত তথা সঠিক পথের দিশা ও নুর (আলো) রয়েছে।” [সূরা মায়িদা: ৪৪]
◆ আল্লাহ তাআলা আল্লাহর কিতাব ইঞ্জিলের ব্যাপারেও একই কথা বলেছেন,
وَآتَيْنَاهُ الْإِنجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورٌ
“আমি তাঁকে ইঞ্জিল প্রদান করেছি। এতে সঠিক পথের দিশা ও আলো রয়েছে।” [সূরা মায়িদা: ৪৬]
ইমাম ত্ববারি বলেন,
ونور “، يقول: وضياء من عَمَى الجهالة
“নুর অর্থ: অজ্ঞতার অন্ধত্বের মধ্যে আলোর জ্যোতি।” [তাফসিরে ত্বাবারি]
❑ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রশংসা ও সম্মান প্রদর্শনে বাড়াবাড়ি করা নিষিদ্ধ:
ওমর রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لاَ تُطْرُونِي ، كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ ، فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ ، فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ ، وَرَسُولُهُ
‘‘তোমরা আমার মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা করো না যেমনিভাবে প্রশংসা করেছিলো খৃষ্টানরা মরিয়ম তনয় ঈসা আ. এর। আমি আল্লাহ তাআলার বান্দা মাত্র। তাই তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রসুল বলবে।’’ [বুখারি ও মুসলিম]
কোন ভির্ভোসি মেয়ে বিয়ে করতে না চাইলে তার কীভাবে চলাফেরা করা উচিত
প্রশ্ন: কোন ভির্ভোসি মেয়ে বিয়ে করতে না চাইলে তার কীভাবে চলাফেরা করা উচিত?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
আশুরার দিন সংক্রান্ত বানোয়াট হাদিস এবং কিছু বিদআতি কার্যক্রম
“আশুরার দিন গোসল করলে সারা বছর রোগ-ব্যাধি থেকে সুরক্ষিত থাকবে” এবং “যে ব্যক্তি আশুরার দিন চোখে সুরমা লাগাবে সে সারাবছর চোখের পীড়াতে আক্রান্ত হবে না।” বানোয়াট হাদিস এবং এ সংক্রান্ত আরো কিছু বিদআতি কার্যক্রম:
বর্তমানে নিম্নোক্ত হাদিসটি সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক মানুষ প্রচার করে থাকে। কিন্তু বাস্তবে তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়। বরং তা হাদিসের নামে মিথ্যাচার:
“যে ব্যক্তি আশুরার দিন গোসল করবে, সে সারাবছর রোগ-ব্যাধি থেকে সুরক্ষিত থাকবে। কেননা সেদিন জমজমের পানি সমগ্র পৃথিবীর পানির সাথে মিশে যায়!” [তাফসিরে রুহুল বয়ান, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা ১৪২]
বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণ, এই মর্মে প্রচলিত হাদিসটিকে হাদিসের নামে মিথ্যাচার, বানোয়াট বা জাল বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং তাদের সংকলিত ‘প্রচলিত বানোয়াট ও জাল হাদিস শীর্ষক গ্রন্থগুলোতে এটিকে জাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যেমন:
❂ আল্লামা ইবনুল ইয আল হানাফী বলেন,
“আশুরার দিন রোজা রাখা ব্যতিরেকে অন্য কোনও কিছু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়নি। যখন শিয়া রাফেজীরা হুসাইন রা. এর নিহত হওয়ার প্রেক্ষিতে এ দিন মাতম-বিলাপ ও শোক পালনের বিদআত চালু করল তখন আহলুস সুন্নাহ-এর জাহেলরা এ দিনকে আনন্দ উদযাপন, পরিবার-পরিজনকে ভালো খাবার-দাবার খাওয়ানো, চোখে সুরমা লাগানোর বিদআত চালু করল এবং এ দিন চোখে সুরমা ব্যবহার ও পরিবারকে ভালো খাবার খাওয়ানোর পক্ষে বানোয়াট হাদিস বর্ণনা করল।” [আল ইবদা ফী মাযারিল ইবতিদা, পৃষ্ঠা নাম্বার: ২৭১]
❂ শাইখুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া রাহ. আশুরার দিন চোখে সুরমা ব্যবহার করা, গোসল করা, শরীরে মেহেদী ব্যবহার লাগানো, কলপ ব্যবহার করা, পরস্পরে দেখা-সাক্ষাত করা, মাজার জিয়ারতে যাওয়া, ভালো খাবার রান্না করা, আনন্দ প্রকাশ করা ইত্যাদিকে অপর পক্ষে এ দিন শোক প্রকাশ, মাতম করা, পিপাসায় থাকা, বিলাপ করা, মাটিতে গড়াগড়ি করা, গায়ের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা ইত্যাদি কার্যক্রমকে বিদআত হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন,
لَمْ يَرِدْ فِي شَيْءٍ مِنْ ذَلِكَ حَدِيثٌ صَحِيحٌ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَلا عَنْ أَصْحَابِهِ، وَلا اسْتَحَبَّ ذَلِكَ أَحَدٌ مِنْ أَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ لا الأَئِمَّةِ الْأَرْبَعَةِ، وَلا غَيْرِهِمْ. وَلا رَوَى أَهْلُ الْكُتُبِ الْمُعْتَمَدَةِ فِي ذَلِكَ شَيْئًا، لَا عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَلا الصَّحَابَةِ، وَلا التَّابِعِينَ، لا صَحِيحًا وَلا ضَعِيفًا، لا فِي كُتُبِ الصَّحِيحِ، وَلا فِي السُّنَنِ، وَلا الْمَسَانِيدِ، وَلا يُعْرَفُ شَيْءٌ مِنْ هَذِهِ الأَحَادِيثِ عَلَى عَهْدِ الْقُرُونِ الْفَاضِلَةِ