Thursday, August 17, 2023

আশুরার দিন সংক্রান্ত বানোয়াট হাদিস এবং কিছু বিদআতি কার্যক্রম

 “আশুরার দিন গোসল করলে সারা বছর রোগ-ব্যাধি থেকে সুরক্ষিত থাকবে” এবং “যে ব্যক্তি আশুরার দিন চোখে সুরমা লাগাবে সে সারাবছর চোখের পীড়াতে আক্রান্ত হবে না।” বানোয়াট হাদিস এবং এ সংক্রান্ত আরো কিছু বিদআতি কার্যক্রম:

বর্তমানে নিম্নোক্ত হাদিসটি সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক মানুষ প্রচার করে থাকে। কিন্তু বাস্তবে তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়। বরং তা হাদিসের নামে মিথ্যাচার:

“যে ব্যক্তি আশুরার দিন গোসল করবে, সে সারাবছর রোগ-ব্যাধি থেকে সুরক্ষিত থাকবে। কেননা সেদিন জমজমের পানি সমগ্র পৃথিবীর পানির সাথে মিশে যায়!” [তাফসিরে রুহুল বয়ান, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা ১৪২]

বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণ, এই মর্মে প্রচলিত হাদিসটিকে হাদিসের নামে মিথ্যাচার, বানোয়াট বা জাল বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং তাদের সংকলিত ‘প্রচলিত বানোয়াট ও জাল হাদিস শীর্ষক গ্রন্থগুলোতে এটিকে জাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যেমন:

◈ আল্লামা সুয়ুতী তার আল লায়ালি আল মাসনুয়াহ গ্রন্থে (২/৯৩),
◈ আল্লামা কিনানী তার তানযীহুশ শরীয়াহ গ্রন্থে (২/১৫২),
◈ ইবনুল জাওযী তার আল মাউযুয়াত গ্রন্থে (২/১১৩),
◈ আব্দুল হাই লাখনভি তার আল আখবারুল মাউযুয়াহ গ্রন্থে (১/৯৭)
◈ মারয়ী বিন ইউসুফ আল কারমী তার আল ফাওয়ায়েদুল মাউযুয়াহ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা নাম্বার ৭৫) ইত্যাদি।
◈ আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ, নিম্নোক্ত হাদিসটিকে মউযু বা বানোয়াট বলে আখ্যায়িত করেছেন:
منِ اغتسلَ يومَ عاشوراءَ لم يَمرضْ ذلك العامَ، ومن اكتحلِ يومَ عاشوراءَ لم يَرمدْ ذلك العامَ
“যে ব্যক্তি আশুরার দিন গোসল করবে সে সে বছর রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হবে না, আর যে ব্যক্তি আশুরার দিন চোখে সুরমা লাগাবে সে সারা বছর চোখের পীড়াতে আক্রান্ত হবে না।” [আত তুহফাতুল কারীমা, পৃষ্ঠা নম্বর: ৯০]

❂ আল্লামা ইবনুল ইয আল হানাফী বলেন,

لم يصح عن النبي – صلى الله عليه وسلم – في يوم عاشوراء غير صومه، وإنما الروافض لما ابتدعوا المأتم وإظهار الحزن يوم عاشوراء لكون الحسين رضي الله عنه قتل فيه ابتدع جهلة أهل السنة إظهار السرور واتخاذ الحبوب والأطعمة والاكتحال، ورووا أحاديث موضوعة في الاكتحال والتوسعة على العيال
ص271 – كتاب الإبداع في مضار الابتداع – ما يقع من الناس في يوم عاشوراء

“আশুরার দিন রোজা রাখা ব্যতিরেকে অন্য কোনও কিছু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়নি। যখন শিয়া রাফেজীরা হুসাইন রা. এর নিহত হওয়ার প্রেক্ষিতে এ দিন মাতম-বিলাপ ও শোক পালনের বিদআত চালু করল তখন আহলুস সুন্নাহ-এর জাহেলরা এ দিনকে আনন্দ উদযাপন, পরিবার-পরিজনকে ভালো খাবার-দাবার খাওয়ানো, চোখে সুরমা লাগানোর বিদআত চালু করল এবং এ দিন চোখে সুরমা ব্যবহার ও পরিবারকে ভালো খাবার খাওয়ানোর পক্ষে বানোয়াট হাদিস বর্ণনা করল।” [আল ইবদা ফী মাযারিল ইবতিদা, পৃষ্ঠা নাম্বার: ২৭১]

❂ শাইখুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া রাহ. আশুরার দিন চোখে সুরমা ব্যবহার করা, গোসল করা, শরীরে মেহেদী ব্যবহার লাগানো, কলপ ব্যবহার করা, পরস্পরে দেখা-সাক্ষাত করা, মাজার জিয়ারতে যাওয়া, ভালো খাবার রান্না করা, আনন্দ প্রকাশ করা ইত্যাদিকে অপর পক্ষে এ দিন শোক প্রকাশ, মাতম করা, পিপাসায় থাকা, বিলাপ করা, মাটিতে গড়াগড়ি করা, গায়ের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা ইত্যাদি কার্যক্রমকে বিদআত হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন,

لَمْ يَرِدْ فِي شَيْءٍ مِنْ ذَلِكَ حَدِيثٌ صَحِيحٌ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَلا عَنْ أَصْحَابِهِ، وَلا اسْتَحَبَّ ذَلِكَ أَحَدٌ مِنْ أَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ لا الأَئِمَّةِ الْأَرْبَعَةِ، وَلا غَيْرِهِمْ. وَلا رَوَى أَهْلُ الْكُتُبِ الْمُعْتَمَدَةِ فِي ذَلِكَ شَيْئًا، لَا عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَلا الصَّحَابَةِ، وَلا التَّابِعِينَ، لا صَحِيحًا وَلا ضَعِيفًا، لا فِي كُتُبِ الصَّحِيحِ، وَلا فِي السُّنَنِ، وَلا الْمَسَانِيدِ، وَلا يُعْرَفُ شَيْءٌ مِنْ هَذِهِ الأَحَادِيثِ عَلَى عَهْدِ الْقُرُونِ الْفَاضِلَةِ

“এগুলোর কোন বিষয়েই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবিদের থেকে সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়নি। মুসলিমদের ইমামদের মধ্যে চার ইমাম বা অন্য কোনও ইমামও এ কাজগুলোকে মুস্তাহাব বলেননি। কোনও নির্ভরযোগ্য কিতাবের লেখকগণও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবি ও তাবেঈদের থেকে এগুলো বর্ণনা করেননি। না কোনও সহিহ হাদিস, না জয়ীফ হাদিস। না কোনও সহিহ হাদিসের কিতাবে, না সুনান বা মুসনাদের কিতাবে। এসব হাদিস বিষয়ে শ্রেষ্ঠ যুগ সমূহে কোনও কিছুই জানা যায় না।
তারপর তিনি, “আশুরার দিন গোসল করলে সারা বছর রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকবে, “কেউ এ দিন তার পরিবারকে ভালো খাবারের ব্যবস্থা করবে সারা বছর ভালো খাবার খাবে” মর্মে বর্ণিত হাদিসগুলোর ব্যাপারে বলেন,
هَذَا كُلِّهِ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم كَذِبٌ
“এসব কিছুই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যাচার।” [আল ফাতাওয়াল কুবরা-ইবনে তায়মিয়া-সংক্ষেপায়িত]
আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

ইয়াযীদের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ’র অবস্থান

 সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফতোয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটি (আল-লাজনাতুদ দা’ইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) প্রদত্ত ফতোয়ায় বলা হয়েছে—

وأما يزيد بن معاوية فالناس فيه طرفان ووسط، وأعدل الأقوال الثلاثة فيه أنه كان ملكًا من ملوك المسلمين له حسنات وسيئات ولم يولد إلاَّ في خلافة عثمان رضي الله عنه، ولم يكن كافرًا ولكن جرى بسببه ما جرى من مصرع الحسين وفعل ما فعل بأهل الحرة، ولم يكن صاحبًا ولا من أولياء الله الصالحين. قال شيخ الإِسلام ابن تيمية رحمه الله : وهذا قول عامة أهل العقل والعلم والسنة والجماعة، وأما بالنسبة للعنه فالناس فيه ثلاث فرق: فرقة لعنته، وفرقة أحبته، وفرقة لا تسبه ولا تحبه، قال شيخ الإِسلام ابن تيمية رحمه الله تعالى: وهذا هو المنصوص عن الإِمام أحمد وعليه المقتصدون من أصحابه وغيرهم من جميع المسلمين، وهذا القول الوسط مبني على أنه لم يثبت فسقه الذي يقتضي لعنه أو بناء على أن الفاسق المعين لا يلعن بخصوصه إما تحريمًا وإما تنزيهًا، فقد ثبت في [ صحيح البخاري ] عن عمر في قصة عبد الله بن حمار الذي تكرر منه شرب الخمر وجلده رسول الله صلى الله عليه وسلم لما لعنه بعض الصحابة قال النبي صلى الله عليه وسلم: لا تلعنه، فإنه يحب الله ورسوله ، وقال صلى الله عليه وسلم: لعن المؤمن كقتله متفق عليه.
وهذا كما أن نصوص الوعيد عامة في أكل أموال اليتامى والزنا والسرقة فلا يشهد بها على معين بأنه من أصحاب النار لجواز تخلف المقتضى عن المقتضي لمعارض راجح: إما توبته، وإما حسنات، وإما مصائب مكفرة، وإما شفاعة مقبولة، وغير ذلك من المكفرات للذنوب هذا بالنسبة لمنع سبه ولعنه. وأما بالنسبة لترك المحبة فلأنه لم يصدر منه من الأعمال الصالحة ما يوجب محبته، فبقي واحدًا من الملوك السلاطين، ومحبة أشخاص هذا النوع ليست مشروعة، ولأنه صدر عنه ما يقتضي فسقه وظلمه في سيرته، وفي أمر الحسين وأمر أهل الحرة. وبالله التوفيق. وصلى الله على نبينا محمد، وآله وصحبه وسلم.

“ইয়াযীদ বিন মু‘আউয়িয়াহর ব্যাপারে মানুষ দুটো প্রান্তিক ও একটি মধ্যপন্থি দলে বিভক্ত। ইয়াযীদের ব্যাপারে তিনটি অভিমতের মধ্যে সবচেয়ে ন্যায়নিষ্ঠ মত হলো—সে মুসলিমদের একজন রাজা ছিল, তার ভালোকর্ম ছিল, আবার মন্দকর্মও ছিল। সে ‘উসমান (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু)’র খেলাফত-আমলে জন্মগ্রহণ করে। সে কাফির ছিল না। কিন্তু তার কারণে হুসাইন (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু)’র হত্যাকাণ্ড ও হার্রাহ’র যুদ্ধের মতো ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। সে না ছিল সাহাবী, আর না ছিল সৎকর্মপরায়ণ আল্লাহ’র ওলি।

শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, “এটাই অধিকাংশ প্রাজ্ঞ ও বিবেকবান আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের অভিমত।” [১]

আর ইয়াযীদকে লানত করার ব্যাপারেও মানুষ তিনটি দলে বিভক্ত। একদল ইয়াযীদকে লানত করে। একদল ইয়াযীদকে ভালোবাসে। আরেক দল ইয়াযীদকে গালি দেয় না, আবার ভালোও বাসে না। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, “ইমাম আহমাদ এই মত ব্যক্ত করেছেন। আর এই মতের ওপরই রয়েছেন ইমাম আহমাদের অনুসারী ও অন্যান্য মুসলিমদের মধ্য থেকে মধ্যপন্থি ব্যক্তিবর্গ।”

এই মধ্যপন্থি মত এ বিষয়ের ওপর ভিত্তিশীল যে, ইয়াযীদের এমন কোনো পাপকাজ প্রমাণিত হয়নি, যা তাকে লানত করার দাবি করে; অথবা নির্দিষ্টভাবে একজন পাপী লোককে লানত করা হয় হারাম আর নাহয় মাকরূহে তানযীহী (অপছন্দনীয় কর্ম)। সাহীহ বুখারীতে ‘উমার (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত হয়েছে, সাহাবী ‘আব্দুল্লাহ বিন হিমার (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) বেশ কয়েকবার মদ্যপান করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে বেত্রাঘাত করেছিলেন। এ কারণে জনৈক সাহাবী ওই মদ্যপায়ী সাহাবীকে লানত করেন। তখন নাবী ﷺ বলেন, “তুমি ওকে লানত কোরো না। নিশ্চয় সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে।” [২]

নাবী ﷺ অন্যত্র বলেছেন, “মুমিনকে লানত করা হত্যার সমতুল্য।” [৩]

ইয়াতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা, জেনায় লিপ্ত হওয়া, চুরি করা প্রভৃতি পাপের ক্ষেত্রে যেসব ব্যাপকার্থবোধক ও শাস্তি দেওয়ার প্রতিজ্ঞাযুক্ত দলিল বর্ণিত হয়েছে, সেসব দলিলের ভিত্তিতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যাপারে এরকম সাক্ষ্য দেওয়া যায় না যে, সে ব্যক্তি জাহান্নামী। কেননা বিভিন্ন অগ্রাধিকারযোগ্য কারণে এরকম বিষয় বিমোচিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। হয়তো সে তওবা করেছে, অথবা তার পুণ্যকর্ম আছে, কিংবা সে পাপমোচনকারী দুর্যোগে পতিত হয়েছে, অথবা তার জন্য কারও কৃত শাফায়াত (সুপারিশ) গৃহীত হয়েছে, কিংবা এগুলো ছাড়াও তার অন্য কোনো পাপমোচনকারী বিষয় সংঘটিত হয়েছে। এটা গেল গালি না দেওয়া ও লানত না করার প্রসঙ্গ।
পক্ষান্তরে ইয়াযীদকে না ভালোবাসার কারণ—তার থেকে এমন কোনো ভালো কাজ প্রকাশিত হয়নি, যা তার ভালোবাসাকে জরুরি করে। সে একজন শাসক বা রাজা মাত্র। এ ধরনের লোককে ভালোবাসা শরিয়তসম্মত (বিধেয়) নয়। তাছাড়া ইয়াযীদের জীবনীতে এবং হুসাইন ও হার্রাহ-সংক্রান্ত ব্যক্তিবর্গের ঘটনায় তার নিকট থেকে যা প্রকাশিত হয়েছে, তা দাবি করে যে, সে একজন ফাসেক ও জালেম ছিল।
আর আল্লাহই তৌফিকদাতা। হে আল্লাহ, আমাদের নাবী মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবার পরিজন ও সাহাবীগণের ওপর আপনি দয়া ও শান্তি বর্ষণ করুন।”

ফতোয়া প্রদান করেছেন—
চেয়ারম্যান: শাইখ ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ)।
ডেপুটি চেয়ারম্যান: শাইখ ‘আব্দুর রাযযাক্ব ‘আফীফী (রাহিমাহুল্লাহ)।
মেম্বার: শাইখ ‘আব্দুল্লাহ বিন গুদাইয়্যান (রাহিমাহুল্লাহ)।
পাদটীকা:
▂▂▂▂▂▂▂▂▂
[১] মাজমূ‘উ ফাতাওয়া; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৪০৯ ও ৪১৪; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৪৪৩, ৪৮৪ ও ৫০৬।
[২] সাহীহ বুখারী, হা/৬৭৮০।
[৩] সাহীহ বুখারী, হা/৬১০৫; সাহীহ মুসলিম, হা/১১০।
তথ্যসূত্র:
ফাতাওয়া লাজনাহ দাইমাহ, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ২৮৫-২৮৬; ফতোয়া নং: ১৪৬৬; ফতোয়ার আরবি টেক্সট আজুর্রি (ajurry) ডট কম থেকে সংগৃহীত।

অনুবাদক: মুহাম্মাদ ‘আব্দুল্লাহ মৃধা
সালাফী: ‘আক্বীদাহ্ ও মানহাজে।

ফকির-মিসকিনকে খাওয়ালে বা দান করলে আসলেই কি জান্নাত কিনে নেওয়া যায়

 প্রশ্ন: আমাদের এক শাইখ সূরা তওবার ১১১ নাম্বার আয়াতের রেফারেন্স উল্লেখ করে বলেছেন যে, সালাত, সিয়াম, হজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার ইত্যাদি দ্বারা জান্নাত পাওয়া যায়; কেনা যায় না। কিন্তু ফকির-মিসকিনকে খাওয়ালে বা অসহায় মানুষকে দান করলে জান্নাত কেনা যায়। আর আল্লাহ বলেছেন যে, তোমাদের কাছে বিক্রি করার জন্যই আমি জান্নাত বানিয়েছি। টাকা দাও (দান করো) আর কিনে নাও-এ কথাগুলো কুরআন-সুন্নাহর আলোকে কতটুকু সঠিক?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: এ বক্তব্য সঠিক নয়। এ সব কথাবার্তা কুরআন ও হাদিসের অপব্যাখ্যা। মূলত: কুরআন-হাদিসে কোথাও এমন কথা বলা হয়নি।

নিম্নে এ ব্যাপারে বিশ্লেষণ পেশ করা হল:

❑ কোন আমলের বিনিময়েই জান্নাত লাভ করা সম্ভব সম্ভব নয়:

প্রকৃতপক্ষে নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, জিহাদ এমনকি দান-সদকা ইত্যাদি কোন কিছুর বিনিময়েই জান্নাত লাভ করা সম্ভব নয়।
জান্নাত লাভ করার জন্য শিরক মুক্ত ইমান এবং বিদআত মুক্ত আমল করা অপরিহার্য কিন্তু এসব ইমান-আমল জান্নাতের মূল্য নয়। বান্দা যদি জান্নাতে প্রবেশ করে তাহলে তা হবে শুধুমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহ; এটা তার কোনও আমলের বিনিময় নয়। যেমন: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لَنْ يُدْخِلَ الْجَنَّةَ أَحَدًا عَمَلُهُ ‏”‏ ‏.‏ قَالُوا وَلاَ أَنْتَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ ‏”‏ وَلاَ أَنَا إِلاَّ أَنْ يَتَغَمَّدَنِيَ اللَّهُ مِنْهُ بِرَحْمَةٍ

“কারো আমলই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না। তারা বললেন, হে আল্লাহর রসুল! আপনিও কি নন? তিনি বললেন, আমিও নই। তবে যদি আল্লাহ তাআলা আমাকে তার রহমত দ্বারা ঢেকে নেন।” [সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৫৩/ কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ, পরিচ্ছেদ: ১৭. কোন ব্যক্তিই তার আমলের বিনিময়ে জান্নাতে যাবে না, বরং জান্নাতে যাবে আল্লাহর রহমতের মাধ্যমে]

❑ জান্নাতের মূল্য কত যে তা কিছু টাকা দান করেই তা কিনে নেওয়া সম্ভব?

জান্নাতের মূল্য কি এত কম যে, কিছু টাকা দান করলেই তার মূল্য পরিশোধ হয়ে যাবে বা তার বিনিময়ে তা ক্রয় করে নেওয়া যাবে? একশত, দুশ, এক হাজার, পাঁচ হাজার, পঞ্চাশ হাজার, পঞ্চাশ লক্ষ, একশ কোটি, হাজার কোটি, হাজার মিলিয়ন, বিলিয়ন, ট্রিলিয়ন ইত্যাদি পরিমাণ টাকা আল্লাহর পথে দান করে কি জান্নাত কি কিনে নেওয়া সম্ভব? সারা দুনিয়ার সকল ধন-সম্পদ দ্বারাও কি জান্নাতের ক্ষুদ্রতম অংশ কেনা সম্ভব? কস্মিনকালেও তা কখনো সম্ভব নয়। কেননা জান্নাতের মূল্য কোন কিছু দ্বারা পরিশোধ যোগ্য নয়। সাহল ইবনে সাদ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি,

مَوْضِعُ سَوْطٍ فِي الْجَنَّةِ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا، وَلَغَدْوَةٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوْ رَوْحَةٌ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا

“জান্নাতের মধ্যে একটা চাবুক পরিমাণ জায়গা দুনিয়া এবং তার মধ্যে যা কিছু আছে তার চাইতে উত্তম।” [সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৬৮/ কোমল হওয়া, পরিচ্ছেদ: ২৬৮৪. আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার দৃষ্টান্ত। আল্লাহ তাআলার বাণী: তোমরা জেনে রেখো, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া কৌতুক … ছলনাময়য় ভোগ, ৫৭: ২০]

– যদি টাকা দান করে জান্নাত ক্রয়ে করে নেওয়া সম্ভব হত তাহলে ধনীরা টাকার বিনিময়ে জান্নাত ক্রয় করে নিত। তাদের এত বেশি নেকির কাজ করার প্রয়োজন হতো না।

❑ সূরা তওবার ১১১ নাম্বার আয়াতে কী বলা হয়েছে?

মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّ ٱللَّهَ ٱشۡتَرَىٰ مِنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ أَنفُسَهُمۡ وَأَمۡوَٰلَهُم بِأَنَّ لَهُمُ ٱلۡجَنَّةَۚ يُقَٰتِلُونَ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَيُقْتَلُونَ

“নিশ্চয় আল্লাহ্‌ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন (এর বিনিময়ে) যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা আল্লাহর পথে যু/দ্ধ করে, অতঃপর তারা হ/ত্যা করে এবং নি/হ/ত হয়” [সূরা তওবা: ১১১ ]

অর্থাৎ যে সব ইমানদার ব্যক্তিগণ আল্লাহর দ্বীনকে বুলন্দ করার উদ্দেশ্যে জিহাদের ময়দানে তাদের ধন-সম্পদ সব কিছু বিলীন করে নিজেদের জীবনটাকে পর্যন্ত বিলিয়ে দেয় তাদেরকে তিনি তাদের এই জান ও মালের প্রতিদান হিসেবে তাকে জান্নাত প্রদান করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যদিও এই জান-মাল আল্লাহর এবং জান্নাতও আল্লাহর। কিন্তু এর বিনিময়ে জান্নাত প্রদান করাও তাঁর অনুগ্রহ; এটি তার মূল্য নয়। মূলত: পুরস্কার ঘোষণার মাধ্যমে তিনি মুমিনদেরকে জিহাদে জান-মাল কুরবানি করার প্রতি উৎসাহিত করেছেন।

❂ তাফসিরে ইবনে কাসিরে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে,

خبر تعالى أنه عاوض عباده المؤمنين عن أنفسهم وأموالهم إذ بذلوها في سبيله بالجنة ، وهذا من فضله وكرمه وإحسانه ، فإنه قبل العوض عما يملكه بما تفضل به على عباده المطيعين له
“আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, মুমিন বান্দাগণ যখন তাদের জান ও মাল আল্লাহর পথে ব্যয় করবেন তখন তিনি এর বিনিময়ে তাদেরকে জান্নাত দিবেন। এটা তাঁর অনুগ্রহ, বদান্যতা এবং দানশীলতা।” [তাফসিরে ইবনে কাসির]

❂ আল মুখতাসার ফিত তাফসিরে বলা হয়েছে,

إن الله سبحانه اشترى من المؤمنين أنفسهم – مع أنهم ملكه؛ تفضُّلًا منه – بثمن غال هو الجنة، حيث يقاتلون الكفار لتكون كلمة الله هى العليا

“নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের নিকট উচ্চ মূল্যে তথা জান্নাতের বিনিময়ে তাদের জীবন ক্রয়ে করে নিয়েছেন-যদিও এর মালিকানা তাঁরই। কিন্তু এটি তাঁর অনুগ্রহ। কারণ তারা আল্লাহর বাণীকে উচ্চকিত করার উদ্দেশ্যে কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করে। ফলে তারা কাফেরদেরকে হ/ত্যা করে আর কাফেররাও তাদেরকে হ/ত্যা করে।”

মোটকথা, জান্নাত হল, আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। আল্লাহ যে বান্দার উপর রাজি-খুশি হবেন তিনি তাকে দয়া করে তাতে প্রবেশ করার সুযোগ দিবেন। কিন্তু বান্দা কখনো কোন আমলের বিনিময়ে জান্নাত ক্রয় করে নিতে পারে না। তা সম্ভব নয়। অতএব “গরিব-মিসকিনকে খাওয়ালে বা দান-সদকা করলে জান্নাত কিনে নেওয়া যায়, আর আল্লাহ বলেছেন যে, তোমাদের কাছে বিক্রি করার জন্যই আমি জান্নাত বানিয়েছি, টাকা দাও আর কিনে নাও”-এসব কথাবার্তা কুরআন-সুন্নাহর অপব্যাখ্যা শামিল।

আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

ঋতুমতী বা প্রসূতি নারীর জন্য মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া, কাফন পরানো, লাশের ঘরে প্রবেশ ও মৃত্যু ব্যক্তিকে স্পর্শ করার বিধান

 প্রশ্ন: হায়েজ অবস্থায় মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া, তাদের কাছে যাওয়া বা তাদেরকে স্পর্শ করা কি জায়েজ? এতে মৃত ব্যক্তির কোনো সমস্যা হবে কি না? অথবা মৃত ব্যক্তির বাড়িতে হায়েজ অবস্থায় গেলে হায়েজ রত মহিলাদের হায়েজ সংশ্লিষ্ট কোনো সমস্যা হয় কি না?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: ঋতুমতী অথবা প্রসূতি মহিলা যদি পূর্ণ পর্দা রক্ষা করে‌ ও সব ধরনের ফিতনা থেকে সতর্কতা অবলম্বন করে নিকটাত্মীয় কিংবা প্রতিবেশী মৃতের বাড়িতে তাদেরকে সান্ত্বনা দেওয়া, খাবার দিয়ে আসা, তাদেরকে কোন কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করা বা বিশেষ কোনো প্রয়োজনে যায় তাতে শরিয়তে কোন বাধা নেই। অনুরূপভাবে দরকার বোধে যে ঘরে লাশ রয়েছে সে ঘরে প্রবেশ করতে বা লাশের নিকটে যেতে কোন সমস্যা নেই।

তদ্রূপ সে যদি অপর কোন মৃত মহিলাকে কাফন পরায় বা তাতে সহযোগিতা করে কিংবা গোসল দেয় বা তাতে সহযোগিতা করে, মৃত স্বামী বা ছোট বাচ্চাকে গোসল দেয় অথবা সন্তান,‌ পিতা, ভাই, দাদা ইত্যাদি মাহরাম পুরুষদেরকে হাত দ্বারা স্পর্শ করে বা কপালে চুমু খায় তাহলে তাতেও কোন সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ। (নন মাহরাম লাশকে স্পর্শ করা জায়েজ নয় জরুরি প্রয়োজনে ছাড়া‌ এমনকি তাদের চেহারা দেখাও ঠিক নয়)।
ইসলামি শরিয়তে এসব ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞা আসেনি। আমরা জানি, ঋতুবতী বা প্রসূতি নারীদের জন্য প্রয়োজনে মসজিদে প্রবেশ করা, স্বামীর শরীরের সাথে শরীর লাগানো বা সব ধরনের বিনোদনমূলক কার্যক্রম করা (সহবাস ছাড়া), রান্নাবান্না, গৃহস্থালি ইত্যাদি সব কাজ স্বাভাবিক ভাবে করা জায়েজ। এমনকি কাপড়ের আবরণ বা হ্যান্ড গ্লাভস সহকারে কুরআন স্পর্শ করতে পারে এবং জরুরি প্রয়োজন বোধে তিলাওয়াতও করতে পারে (এ বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও এটাই অধিক বিশুদ্ধ মত)। শুধু নামাজ, রোজা করা বা কাবাঘরের তাওয়াফ করার ব্যাপারে হাদিসে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।‌ কিন্তু মৃত ব্যক্তির ঘরে প্রবেশ করা, মাহরাম মৃত ব্যক্তিকে স্পর্শ করা বা নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া ইত্যাদির ব্যাপারে কোন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আসেনি। বিশেষ করে মৃত মহিলা যদি নির্দিষ্ট কোন মহিলাকে কাফন পরানো বা গোসলের জন্য ওসিয়ত করে যায় তাহলে তা পালন করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যদিও সে সময় সে হায়েজ বা নেফসের কারণে নাপাক অবস্থায় থাকে। তবে এইসব ক্ষেত্রে হায়েজের রক্ত মাটিতে পড়ে যেন পরিবেশ নষ্ট না করে সে ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক।
মোটকথা, তাদের জন্য এই কাজগুলো করাকে নাজায়েজ বা মাকরুহ বলা যাবে না। যদিও কোন কোন ফকিহ তাদের জন্য এসব কিছুকে মাকরূহ বা অপছন্দনীয় বলেছেন। এর স্বপক্ষে কুরআন-সুন্নাহ থেকে কোন দলিল না থাকলেও তারা এই কারণে অপছন্দ করেছেন যে, হতে পারে তাদের শরীর থেকে নির্গত হায়েজ বা নেফসের রক্ত পড়ে পরিবেশ নোংরা হতে পারে। আর কাফন বা গোসল করানো যেহেতু ফরজে কেফায়া তাই অন্য কোন উপযুক্ত ব্যক্তি থাকলে তাদের সেখানে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে তা হারাম কোন আলেম বলেনি।

সুতরাং এ কারণে মৃত ব্যক্তি বা ঋতুমতী মহিলার কোন এই ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা নেই ইনশাআল্লাহ।

▪️সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি বিশ্বনন্দিত আলেমে দ্বীন আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বাযকে প্রশ্ন করা হয় যে, ঋতুমতী নারীর জন্য কোন মৃতকে গোসল দেওয়া জায়েজ আছে কি?
তিনি জবাবে বলেন,
إذا دعت الحاجة لا بأس، والأمر ما فيه شيء، كَمَيّت، تُغَسّل ميتًا، أو زوجها
“যদি প্রয়োজন হয় তাহলে তাতে কোন সমস্যা নেই। এতে দোষের কিছু নেই। ঋতুমতী মহিলা তার স্বামীকে বা অন্য কোন (মহিলা) মাইয়েতকে গোসল দিতে পারে।”

▪️সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড-এর ফতোয়া হল,

يجوز للمرأة وهي حائض أن تغسل النساء وتكفنهن ، ولها أن تغسل من الرجال زوجها فقط ، ولا يعتبر الحيض مانعاً من تغسيل الجنازة
“ঋতুমতী মহিলার জন্য অন্য মৃত মহিলাদের গোসল এবং কাফন পরানো জায়েজ রয়েছে। আর পুরুষদের মধ্যে কেবল তার স্বামীকে গোসল দিতে পারে। ঋতুস্রাব হওয়া মৃতকে গোসল দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক নয়।”
আল্লাহু আলাম-আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

কবরের উপর নাম ফলক স্থাপন, গাছ লাগানো এবং কবরের চারপাশে খেজুরের কাঁচা ডাল পুঁতার বিধান

 প্রশ্ন: কবরের উপর মৃত ব্যক্তির নাম, পরিচয়, ঠিকানা ইত্যাদি লেখা, কবরের নিকট গাছ লাগানো এবং কবরে দেয়ার পর তার চারপাশে খেজুরের কাঁচা ডাল পুঁতা সম্পর্কে ইসলামের বিধান কি দয়া করে জানাবেন।

উত্তর:

🔸 কবরের উপর লেখা:
কবরের সাথে সাইনবোর্ড লাগিয়ে তাতে মৃত ব্যক্তির নাম, ঠিকানা, জন্ম-মৃত্যু তারিখ, কুরআনের আয়াত, হাদিস, কবিতার ছন্দ, দুআ, প্রশংসা বাণী, হে পথিক, একটু দাঁড়াও….এ জাতীয় কিছু লিখে রাখা বিদআত। কোন কবরে এমটি করা হলে কবরস্থান কর্তৃপক্ষ বা তার জীবিত উত্তরাধিকারী ব্যক্তিদের জন্য তা উঠিয়ে ফেলা আবশ্যক। কেননা হাদিসে কবরের উপর কোন কিছু লিখতে নিষেধ করা হয়েছে।যেমন,
نَهَى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ تُجَصَّصَ الْقُبُورُ وَأَنْ يُكْتَبَ عَلَيْهَا وَأَنْ يُبْنَى عَلَيْهَا وَأَنْ تُوطَأَ
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরে চুনা লাগাতে, লিখতে, তার উপর ঘর নির্মাণ করতে ও তা পদদলিত করতে নিষেধ করেছেন।” [তিরমিযী ১০৫২ (হাদিসের মান: সহীহ)]।

🔸 কবরের পাশে গাছ লাগানো:
গোরস্থানে মধ্যে কবরের আশেপাশে গাছ-গাছাড়ি লাগানোও ঠিক নয়। কেননা তাতে গাছের শিকড় ও ডালপালার কারণে নতুন কবর খনন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। অথবা গাছ-পালা, কাঁটা, খোঁচ ইত্যাদির কারণে কবরস্থান জঙ্গলে পরিণত হয়ে যেতে পারে। কেননা, সেখানে সাপ, বিচ্ছু, শৃগাল বা অন্যান্য ক্ষতিকারক প্রাণী বসবাস করবে যা জিয়ারতকারীদের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। সে কারণে এমনি এমনি সেখানে গাছ-পালা, ঝোপ-জঙ্গল গজিয়ে উঠলে সেগুলো কেটে পরিষ্কার রাখা উচিৎ।

তবে আশেপাশে আরও কবর না থাকলে গাছ লাগানো যেতে পারে। চাই তা খেজুরের গাছ হোক বা অন্য কোন গাছ। তবে সে ক্ষেত্রে সে জায়গাটা পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, যেন তা জঙ্গলে পরিণত না হয়।

💠 কবরের চারপাশে খেজুরের ডাল পুঁতা:
কবর দেয়ার পর আমাদের দেশে অনেক স্থানে কবরের চারপাশে খেজুরের চারটি কাঁচা ডাল পূতে দেয়ার যে রীতিটি চালু আছে তা ঠিক নয়। কারণ মুহাদ্দিসগণ বলেন, এটি কেবল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্য খাস (নির্দিষ্ট)। কেননা, তিনি মাত্র একবারই এক সাহাবির কবরে খেজুরের কাঁচা ডাল পুঁতেছিলেন। অন্য কারো কবরে এমনটি করেননি। কারণ হয়ত তিনি ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে বিশেষভাবে ওহির মাধ্যমে নির্দেশিত হয়ে এমনটি করেছিলেন। অন্যথায় তিনি অন্যান্য করবের ক্ষেত্রেও এমনটি করতেন। কারণ তিনি তাঁর জীবদ্দশায় অসংখ্য সাহাবীর দাফন প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ করেছিলেন।
আর সে কারণে সাহাবিগণও এটিকে সুন্নত হিসেবে গ্রহণ করেননি। অর্থাৎ পরবর্তীতে কোন সাহাবি মৃত ব্যক্তির কবরে খেজুরের কাচা ডাল পুঁতেছেন বলে প্রমাণিত হয়নি। তাই মুহাক্কিক মুহাদ্দিসগণ কবরের আজাব লাঘব হওয়ার আশায় তাতে খেজুরের কাঁচা ডাল পুঁতাকে উম্মতের জন্য পালনীয় সুন্নত হিসেবে সমর্থন করেননি।

🔸 কবরকে চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে বিশেষ চিহ্ন রাখা:
কারণে কবরকে চিহ্নিত রাখার প্রয়োজন হলে হলে তখন সেখানে ইট, পাথর বা এ জাতীয় বিশেষ কোন চিহ্ন রাখা জায়েজ রয়েছে যাতে কবরটি চেনা যায়। যেমন: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
وضع صخرة عند رأس عثمان بن مظعون وقال : أتعلم بها قبر أخي ، وأدفن إليه من مات من أهلي
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (তাঁর দুধভাই) উসমান বিন মাযঊন রা. এর কবরের মাথার নিকট একটি বড় পাথর রেখেছিলেন। তিনি বলেন, যেন আমি বুঝতে পারি যে, এটি আমার ভাইয়ের কবর আর আমার পরিবারের কেউ মারা গেলে তার নিকট দাফন দিতে পারি।” (সুনান আবু দাউদ-সহীহ)
তবে কোন কোন আলেম পরিচয়ের জন্য কবরের নিকট কেবল মৃত ব্যক্তির নামটি লিখার অনুমতি দিয়েছেন; অন্য কিছু নয়। হানাফি মাজহাব এবং শাফেয়ী মাজহাবের ইমাম সুবকী উক্ত মত ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহু আলাম।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate