Sunday, June 4, 2023

ঝড়-বৃষ্টিতে যে দুআ পাঠ করতে হয়

 ❒ ঝড় ও বায়ু প্রবাহের সময় দুআ:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَا تَسُبُّوا الرِّيحَ فَإِذَا رَأَيْتُمْ مِنْهَا مَا تَكْرَهُونَ فَقُولُوا: اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ خَيْرَ هَذِهِ الرِّيحِ، وَخَيْرَ مَا فِيهَا وَخَيْرَ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ، وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ هَذِهِ الرِّيحِ، وَشَرِّ مَا فِيهَا وَشَرِّ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ
“তোমরা বাতাসকে গালি দিও না। যখন এমন বাতাস দেখবে যা তোমরা অপছন্দ করো তখন বলবে:
উচ্চারণ:
“আল্লা-হুম্মা ইন্নী আস্আলুকা খায়রাহা ওয়া খায়রা মা ফীহা ওয়া খায়রা মা উরসিলাত বিহী; ওয়া আ‘ঊযুবিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররি মা ফীহা ওয়া মিন শাররি মা উরসিলাত বিহী।”
অর্থ: “হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট এই বায়ুর কল্যাণ, এর মধ্যে যে কল্যাণ নিহীত আছে এবং যা নিয়ে তা প্রেরিত হয়েছে তার কল্যাণ প্রার্থনা করছি এবং আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি এই বায়ুর অনিষ্ট, এর মধ্যে যে অনিষ্ট নিহীত রয়েছে এবং যা নিয়ে তা প্রেরিত হয়েছে তার অনিষ্ট থেকে।”
[সুনান তিরমিযী, অনুচ্ছেদ: বাতাসকে গালি দেয়া নিষেধ, হা/২১৭৮, সহীহ-আলবানী রহ.]

❒ বৃষ্টির সময় দুআ:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বৃষ্টি দেখতেন তখন বলতেন,
اللّهُمَّ صَيِّـباً نافِـعاً
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাইয়িবান নাফিয়ান।
অর্থ: “আল্লাহ, (এই মেঘকে) তুমি কল্যাণময় বৃষ্টি বৃষ্টিতে পরিণত করো।”
[সহীহ বুখারী, অনুচ্ছেদ: বৃষ্টির সময় যা পাঠ করতে হয়] হে আল্লাহ, তুমি ধেয়ে আসা ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, টর্নেডো ইত্যাদির ভয়াবহ কবল থেকে আমাদেরকে হেফাজত করো। রক্ষা করো তোমার আজাব ও গজব থেকে। আমরা তোমার নিকট আমাদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তোমার নিকটই প্রত্যাবর্তন করছি। আমিন।▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল

পরীক্ষা কেন্দ্রিক বিদআত এবং পরীক্ষার পূর্বে দু রাকআত সালাত আদায়ের বিধান

  প্রশ্ন-১: অনেকে পরীক্ষার পরে খাতায় বিভিন্ন দুআ পড়ে ফুঁ দেয়। তারা মনে করে যে, এটা করলে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল লাভ করা যাবে, পরীক্ষার খাতায় ভুল থাকলে তা ঠিক হয়ে যাবে, লেখায় কাটাকাটি থাকলে তা সংশোধিত হয়ে যাবে ইত্যাদি। হ্যাঁ, আমিও বিশ্বাস করি, সব কিছুতে দুআ-দরুদের প্রভাব আছে। কিন্তু এটা আমার কাছে অযৌক্তিক মনে হয়। এখন আমি যদি বিশ্বাস করি যে, এতে কোনও উপকার হবে না তাহলে কি আমি কা/ফি/র হয়ে যাবো? আর এক্ষেত্রে কেমন বিশ্বাস রাখা উচিৎ?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: পরীক্ষার খাতায় একজন পরীক্ষার্থী যেভাবে যা লিখবে তাই থাকবে। কোন দুআ-দরুদ পাঠের মাধ্যমে তা কখনো পরিবর্তিত হবে না। কুরআন ও হাদিসে এমন কোন দুআ নেই যা পড়ে পরীক্ষার খাতায় ফুঁ দিলে ভুলটা ঠিক হয়ে যাবে বা পরীক্ষার খাতায় কাটাকাটি থাকলে তা সংশোধন হয়ে যাবে কিংবা হাতের লেখা এলোমেলো বা খারাপ হলে তা সুন্দর হয়ে যাবে। এটা নিতান্তই ভিত্তিহীন চিন্তা ও উদ্ভট বিশ্বাস। ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ মানুষেরাই এই ধরনের কথা ভাবতে পারে। পরীক্ষার উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা, কৃতিত্ব, বুদ্ধিমত্তা এবং দৃষ্টিভঙ্গি যাচায় ও পরিমাপ করা। সুতরাং শিক্ষার্থীর কর্তব্য, সঠিক পদ্ধতিতে পড়াশোনা করা এবং জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি পরীক্ষার জন্য যথাযথভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করা। এ জন্য তাকে পর্যাপ্ত কষ্ট ও পরিশ্রম করতে হবে। তাহলেই আল্লাহর রহমতে সে পরীক্ষায় তাঁর প্রতিভা বিকাশ ও মেধার সাক্ষর রাখতে পারবে এবং অর্জিত জ্ঞানগত যোগ্যতার ও দক্ষতার পরিস্ফুটন ঘটিয়ে অবশেষে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল লাভ করতে সক্ষম হবে ইনশাআল্লাহ।
মোটকথা, যে যেমন পড়াশোনা করবে ও পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিবে পরীক্ষার খাতায় তেমন তার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে।

পড়াশোনার প্রতি অমনোযোগিতা, অনর্থক সময় অপচয় বা অলসতা করে‌ যারা বছর পার করে তারাই পরীক্ষা পাশের এমন উদ্ভট দোয়া ও তদবির খুঁজে বেড়ায়। কোথাও না পেলে শেষ পর্যন্ত নিজেরাই আবিষ্কার করে ফেলে। আসলে এসব আবিষ্কার দ্বারা কোন উন্নতি হয় না। বরং ভালো পরীক্ষা না দেওয়ার ফলে একদিকে পরীক্ষায় দুর্বল ফলাফল লাভ করে অথবা অকৃতকার্য হয় অন্যদিকে মনগড়া পন্থায় পরীক্ষার খাতায় দুআ-দরুদ পড়ে ফুঁ দেওয়ার‌ মাধ্যমে বিদআত করে। এটি কুরআন ও হাদিসের দুআর অপব্যবহারের শামিল। এতে সে দ্বীন ও দুনিয়া উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আল্লাহ হেফাজত করুন। আমিন।

একজন পরীক্ষার্থীর উচিত, পরীক্ষার জন্য আগে থেকেই সঠিক পদ্ধতিতে যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে দুআ করা যেন, আল্লাহ তাকে সঠিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার তৌফিক দান করেন, শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখেন, তার মেধা ও স্মৃতিশক্তিকে প্রখর করেন এবং পরীক্ষার খাতায় সঠিকভাবে লেখার শক্তি দেন। পরীক্ষা শেষেও আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারে যে, আল্লাহ যেন পরীক্ষকের অন্তর নরম করে দেন যেন, তিনি তার উত্তরপত্র দেখে খুশি হন এবং তাকে আশানুরূপ নাম্বার দেন।

কিন্তু পরীক্ষার খাতায় ভুল লিখে ভুল ঠিক করার জন্য পরীক্ষার খাতায় দুআ-দরুদ পাঠ করে ফুঁ দেওয়া নিতান্ত মূর্খতা সুলভ কাজ এবং কুরআন-হাদিসের দুআর অপব্যবহারের শামিল। এটিকে দুআর মধ্যে ‘বাড়াবাড়ি’ও বলা যায়।

❑ প্রশ্ন-২: অনেককে দেখা যায়, পরীক্ষার আগে দুই রাকাত সালাত আদায় করে যেতে। তাই অনেকে প্রশ্ন করে পরীক্ষার আগে দুই রাকাত সালাত আদায় করে যাওয়া যাবে কি? এটা কি শরিয়ত সম্মত?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: ইসলামে বিশেষভাবে পরীক্ষার আগে দু রাকাত নামাজ পড়ার কোনও নির্দেশনা আসেনি। তবে কুরআনে ধৈর্য এবং সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করার কথা এসেছে। যেমন: আল্লাহ বলেন,
اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلاةِ
“তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা কারো।” [সূরা বাকারা: ৪৫] সুতরাং কেউ যদি আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা উদ্দেশ্যে পরীক্ষার পূর্বে দুই রাকাত সালাত আদায় করে এবং সেজদা রত অবস্থায় বা সালাম ফেরানোর পূর্বে আল্লাহর কাছে ভালোভাবে পরীক্ষা দেওয়ার তৌফিক কামনা করে এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য দোয়া করে তাহলে তাতে কোন সমস্যা নেই।
আল্লাহু আলম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

মনে মনে কুরআন তিলাওয়াত করলে কি পূর্ণ সাওয়াব পাওয়া যাবে

 প্রশ্ন: মনে মনে কুরআন তিলাওয়াত করলে কি পূর্ণ সাওয়াব পাওয়া যাবে?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لاَ أَقُولُ الم حَرْفٌ وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلاَمٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব থেকে একটি অক্ষর পাঠ করবে তার জন্য একটি সওয়াব রয়েছে। আর একটি সওয়াব দশটি সওয়াবের অনুরূপ। আমি বলি না যে, “আলিফ-লাম-মীম” একটি হরফ; বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম আরেকটি হরফ। (অর্থাৎ তিনটি হরফে রয়েছে তিনটি সওয়াব যা ত্রিশটি সওয়াবের সমান)।” [সুনান তিরমিজি, হা/২৯১০, অনুচ্ছেদ: যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পড়বে তার সাওয়াব কী হবে? অধ্যায়: ৪৮/ কুরআনের ফজিলত-সনদ সহিহ]
সুতরাং কেউ যদি কুরআন তিলাওয়াতের উক্ত সওয়াব লাভ করতে চায় তাহলে তার জন্য আবশ্যক হল, জিহ্বা ও ঠোঁট নাড়িয়ে কুরআন তিলাওয়াত করা। কারণ জিহ্বা ও ঠোঁট নাড়ানো ছাড়া قراءة বা পাঠ হয় না।

মাওয়াহিবুল জালীল-এর গ্রন্থকার আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আত তরাবলুসি আল মালেকি [মৃত্যু: ৯৫৪ হিজরি] বলেন,
ولا يجوز إسرار من غير حركة لسان، لأنه إذا لم يحرك لسانه لم يقرأ وإنما فكر
“জিহ্বা নড়ানো ছাড়া নীরবে কুরআন পাঠ করা জায়েজ নয়। কারণ যদি কেউ জিহ্বা না নড়ায় তাহলে সে কুরআন পাঠ করল না বরং চিন্তা করল।” [মাওয়াহিবুল জালীল ফী মুখতাসারিল খালীল]। হ্যাঁ, জিহ্বা নড়ানো ছাড়া কুরআন পাঠ করলে এতে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব অর্জিত না হলেও কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনার কারণে ইনশাআল্লাহ সওয়াবের অধিকারী হবে বলে আশা করা যায়। কারণ এটিও একটি ইবাদত। যেহেতু মহান আল্লাহ আমাদেরকে কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا
“তারা কি কুরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?” [সূরা মুহাম্মদ: ২৪]
🔹মাসয়ালা: উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় যে, কেউ যদি সালাতে জিহ্বা ও ঠোঁট না নাড়িয়ে কুরআন পড়ে তাহলে তার সালাত শুদ্ধ হবে না। কারণ সে মূলত: কুরআন পাঠ করেনি। আর সালাতে কমপক্ষে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত ছাড়া সালাত শুদ্ধ হবে না। আল্লাহু আলাম।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

জিলকদ মাসের বৈশিষ্ট্য সমূহ এবং এ মাসের সুন্নতি আমল

 হিজরি ক্যালেন্ডারের ১১ তম মাস হল, জিলকদ মাস। এর পরের মাসই জিলহজ মাস-যাতে ঐতিহাসিক আরাফার ময়দানে মুসলিম বিশ্বের সর্ব বৃহৎ গণ জমায়েত এবং ইসলামের ৫ম স্তম্ভ হজ অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু হজের প্রস্তুতি শুরু হয় আরও বহু আগে থেকে।

যাহোক, এ মাসটি ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদায় সমুজ্জ্বল। নিম্নে এ বিষয়ে অতি সংক্ষেপে আলোকপাত করা হল:
وبالله التوفيق وهو المستعان

❑ জিলকদ মাসের তিনটি অনন্য বৈশিষ্ট্য:
◈ ১. এ মাসের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হল, এটি হজের তিনটি মাসের মধ্যে অন্যতম। আশহুরুল হজ বা হজের মাস হল, তিনটি। যথা:
ক. শাওয়াল,
খ. জিলকদ
গ. ও জিলহজ।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَعْلُومَاتٌ
“হজ অনুষ্ঠিত হয়, সুপরিচিত কয়েকটি মাসে।” [সূরা বাকারা: ১৯৭]

ইবনে উমর রা. বলেন,
” أَشْهُرُ الحَجِّ: شَوَّالٌ، وَذُو القَعْدَةِ، وَعَشْرٌ مِنْ ذِي الحَجَّةِ”
“হজের মাস হল, শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজের দশ দিন।”

ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
” مِنَ السُّنَّةِ: أَنْ لاَ يُحْرِمَ بِالحَجِّ إِلَّا فِي أَشْهُرِ الحَجِّ”
” সুন্নত হল, হজের মাস ছাড়া অন্য মাসে হজের ইহরাম না বাধা।” [সহিহ বুখারি]

◈ ২. এর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, এটি চারটি হারাম (সম্মানিত ও নিষিদ্ধ মাস) মাসের মধ্যে একটি।
হারাম চারটি মাস হল:
ক. জিলকদ
খ. জিলহজ
গ. মুহাররম
ঘ. রজব
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ ۚ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ
“নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি হল, হারাম (সম্মানিত ও নিষিদ্ধ)। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম (পাপাচার) করো না।” [সূরা তওবা: ৩৬]
প্রখ্যাত সাহাবি আবু বাকরা রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,
إن الزَّمَان قَدْ اسْتَدَارَ كَهَيْئَتِهِ يَوْمَ خَلَقَ اللَّهُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ، السَّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا، مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ، ثَلاَثَةٌ مُتَوَالِيَاتٌ: ذُو القَعْدَةِ وَذُو الحِجَّةِ وَالمُحَرَّمُ، وَرَجَبُ مُضَرَ، الَّذِي بَيْنَ جُمَادَى وَشَعْبَانَ” (رواه البخاري ومسلم).
“আল্লাহ তাআলা আসমান সমূহ এবং জমিন সৃষ্টির দিন যে আকৃতিতে সময়কে সৃষ্টি করেছিলেন সেটা আবার তার নিজস্ব আকৃতিতে ফিরে এসেছে। বারো মাসে এক বছর। তম্মধ্যে চারটি মাস হল, হারাম (অতি সম্মানিত ও নিষিদ্ধ)। তিনটি মাস ধারাবাহিক। সেগুলো হল: জিলকদ, জিলহজ এবং মুহররম এবং আরেকটি হল মুযার সম্প্রদায়ের রজব মাস যা জুমাদাল ঊলা এবং শাবানের মধ্যখানে রয়েছে।” [বুখারি ও মুসলিম]

❑ এ মাসগুলো হারাম হওয়ার কারণ:

ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
اختص الله أربعة أشهر جعلهن حرمًا، وعظَّم حرماتهن، وجعل الذنب فيهن أعظم، وجعل العمل الصالح والأجر أعظم
“আল্লাহ তাআলা বারো মাসের মধ্যে বিশেষভাবে চার মাসকে হারাম হিসেবে নির্ধারণ করেছেন এবং সেগুলোর বিশাল মর্যাদা দিয়েছেন, এগুলোতে পাপাচার করাকে আরও বেশি ভয়ানক করেছেন এবং নেক আমলের বিশাল প্রতিদানও নির্ধারণ করেছেন।” [তাফসিরে ইবনে কাসির]

◈ ৩. এ মাসের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের পরে মোট চারটি ওমরা আদায় করেছেন। সেগুলোর মধ্যে হজের সাথে যে ওমরা করেছেন সেটি ছাড়া বাকি সবগুলোই আদায় করেছেন জিলকদ মাসে।

কাতাদা রা. হতে বর্ণিত, আনাস রা. তাকে এ তথ্য দিয়েছেন যে,

اعْتَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَرْبَعَ عُمَرٍ كُلُّهُنَّ فِي ذِي الْقَعْدَةِ، إِلاَّ الَّتِي كَانَتْ مَعَ حَجَّتِهِ‏.‏ عُمْرَةً مِنَ الْحُدَيْبِيَةِ فِي ذِي الْقَعْدَةِ، وَعُمْرَةً مِنَ الْعَامِ الْمُقْبِلِ فِي ذِي الْقَعْدَةِ، وَعُمْرَةً مِنَ الْجِعْرَانَةِ حَيْثُ قَسَمَ غَنَائِمَ حُنَيْنٍ فِي ذِي الْقَعْدَةِ، وَعُمْرَةً مَعَ حَجَّتِهِ‏.‏
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারটি ওমরা পালন করেছেন। তিনি হজের সাথে যে ওমরাটি পালন করেছিলেন সেটি ব্যতীত সবকটিই জিলকদ মাসে পালন করেছেন।
– হুদায়বিয়া নামক স্থানে যে ওমরাটি পালন করেছিলেন সেটি ছিল জিলকদ মাসে,
– তার পরের মাসে যে ওমরা পালন করেছেন সেটাও জিলকদ মাসে
– এবং হুনাইনের গনিমত (যুদ্ধ লব্ধ সম্পদ) যে জিরানা নামক স্থানে বণ্টন করেছিলেন, সেখান থেকে যে ওমরাটি করা হয়েছিল তাও ছিল জিলকদ মাসে।
– আর তিনি হজের সাথে একটি ওমরা পালন করেন।”
[সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৫১/ মাগাযী (যুদ্ধ-অভিযান), পরিচ্ছেদ: ২১৯৯. হুদায়বিয়ার যুদ্ধ। মহান আল্লাহর বাণী: لَّقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ “মুমিনগণ যখন গাছের নিচে আপনার নিকট বয়াত গ্রহণ করল তখন আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন…।” [সূরা আল ফাতহ: ১৮]

◍ জিলকদ মাসে ওমরা করার কারণ কী?
আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজের সাথে যে ওমরা আদায় করেছেন সেটা ছাড়া বাকি ৩টি ওমরা আদায় করেছেন জিলকদ মাসে। এর কারণ হিসেবে আলেমগণ বলেছেন, ইসলাম পূর্ব জাহেলি যুগে এ মাসে ওমরা করাকে খুবই গুনাহের কাজ মনে করা হত। তাই তিনি এ মাসে একাধিক ওমরা করার মাধ্যমে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেছেন যে, জাহেলি যুগের ধারণা ভ্রান্ত-বাতিল এবং এ মাসে ওমরা করা জায়েজ।
وقال النووي :
قال العلماء : وإنما اعتمر النبي صلى الله عليه وسلم هذه العُمَر في ذي القعدة لفضيلة هذا الشهر ولمخالفة الجاهلية في ذلك فإنهم كانوا يرونه ( أي الإعتمار في ذي القعدة ) من أفجر الفجور كما سبق ففعله صلى الله عليه وسلم مرات في هذه الأشهر ليكون أبلغ في بيان جوازه فيها وأبلغ في إبطال ما كانت الجاهلية عليه ، والله أعلم .
” شرح مسلم ” ( 8 / 235 ) .

◍ জিলকদ মাসে ওমরা করা কি সুন্নত?
আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক এ মাসে একাধিক ওমরা করার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। সে কারণে অনেক আলেম জিলকদ মাসে ওমরা করাকে সুন্নত বলেছেন। যদিও তা যে কোনও সময় করা জায়েজ।
– শাইখ বিন বায রাহ. বলেন, সবচেয়ে মর্যাদা পূর্ণ রোজা হল, রমজান মাসে রোজা করা। কেননা তা হজের সমান। এর পরেই জিলকদ মাসে ওমরা করা উত্তম।

فضل زمان تؤدي فيه العمرة شهر رمضان؛ لقول النبي صلى الله عليه وسلم “عمرة في رمضان تعدل حجة”. متفق على صحته، وفي رواية أخرى في البخاري “تقضي حجة معي”، وفي مسلم “تقضي حجة أو حجة معي” ــ هكذا بالشك ــ يعني معه عليه الصلاة والسلام، ثم بعد ذلك العمرة في ذي القعدة؛ لأن عمره كلها، صلى الله عليه وسلم، وقعت في ذي القعدة، وقد قال الله سبحانه (لقد كان لكم في رسول الله أسوة حسنة). وبالله التوفيق
– আল্লামা উসাইমিন, হজের মাসগুলোতে ওমরা করাকে সুন্নত বলেছেন।
وتسن أيضاً في أشهر الحج، وهي شوال وذو القعدة وذو الحجة؛ لأن النبي صلّى الله عليه وسلّم خصها بالعمرة.
আল্লাহু আলাম।
– আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল –

Saturday, June 3, 2023

ইখলাস অর্জনের দশ উপায়

 প্রশ্ন: আমরা কীভাবে ইখলাস অর্জন করতে পারব?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: মূল প্রশ্নের উত্তরে যাওয়ার পূর্বে আমাদের জেনে রাখা আবশ্যক যে, যেকোনো ইবাদত কবুলের জন্য দুটি শর্ত রয়েছে। যথা:
১. ইখলাস তথা একনিষ্ঠভাবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইবাদত করা।
২. ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখানো পদ্ধতি অনুসরণ করা।
এই শর্তদ্বয় পূর্ণ না হলে মহান আল্লাহর কাছে কোন ইবাদত কবুল হবে না। ইখলাস হলো ইবাদতের প্রাণশক্তি। এ ছাড়া একজন মানুষ যতই এবাদত করুক না কেন তা হবে প্রাণহীন-অকার্যকর। তাই আমাদের প্রত্যেকটি ইবাদত-বন্দেগি ও সৎকর্মে ইখলাস অর্জনের চেষ্টা করা অপরিহার্য। এটি যেহেতু মানুষের মনের সাথে সম্পৃক্ত তাই বিষয়টি খুবই সূক্ষ্ম ও বিপদজনক। মনের অজান্তেই মনের মধ্যে ইখলাস পরিপন্থী বিষয় রিয়া তথা লোক দেখানো মনোভাব, মানুষের প্রশংসা পাওয়া বা নানা ধরনের দুনিয়াবি স্বার্থচিন্তা ঢুকে পড়ে। তাই এ ব্যাপারে আমাদেরকে সর্বোচ্চ সজাগ থাকতে হবে। অন্যথায় ইবাদত করে সওয়াবের পরিবর্তে আমাদের আমলনামায় গুনাহ লেখা হবে। কেননা যে ইবাদতের মধ্যে রিয়া প্রবেশ করে হবে তা শিরকে আসগর বা ছোট শিরক হিসেবে পরিগণিত হয়। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। আমিন।

এখন প্রশ্ন হল, আমরা ইবাদতের মধ্যে কীভাবে ইখলাস অর্জন করতে পারি?

🔹নিম্নে এর ১০টি উপায় বর্ণনা করা হলো:
১. যেকোনো ইবাদত করার পূর্বে অন্তরকে‌ সব ধরনের দুনিয়াবি স্বার্থচিন্তা ও লোক দেখানো মনোভাব থেকে মুক্ত করে একমাত্র আল্লাহমুখী করা এবং একমাত্র মহান আল্লাহর কাছে তার প্রতিদান আশা করা।

২. এই কথা মাথায় রাখা যে, ইবাদতের মধ্যে ইখলাস না থাকলে তা আল্লাহর কাছে প্রত্যাখ্যাত হবে।

৩. ইখলাস বিহীন আমলের পরিণতি মনে জাগ্রত রাখা। আর তা হলো, ইখলাস হীন আমল (বা রিয়া যুক্ত আমল) শিরকে আসগর।

৪. মনের মধ্যে দুনিয়ার স্বার্থ চিন্তা জাগ্রত হলে মনে করতে হবে, কুপ্রবৃত্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে অথবা শয়তান অন্তরে কুমন্ত্রণা দিচ্ছে। তাই তৎক্ষণাৎ অন্তরের অনিষ্ট এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে।

৪. যথাসম্ভব ইবাদত-বন্দেগির ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষা করবে। (যে সকল ইবাদত প্রকাশ্যে করতে হয় সেগুলো ছাড়া)। যেমন: রাতের শেষ প্রহরে উঠে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করা, যখন কোন মানুষ দেখার সম্ভাবনা না থাকে তখন নির্জনে সালাত আদায় করা, গোপনে দান-সদকা করা, নির্জনে দোয়া, জিকির-আজকার, কুরআন তেলাওয়াত ইত্যাদি করার চেষ্টা করা ইত্যাদি। হাদিসে যেসব ঈমানদার ব্যক্তিগণ নিভৃতে চোখের পানি ফেলে ক্রন্দন করে এবং গোপনে এমন ভাবে দান করে যে ডান হাত দান করলে বাম হাত জানতে পারে না এমন ব্যক্তিদেরকে কেয়ামতের দিন আরশের ছায়া তলে আশ্রয় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

৫. ইখলাস অর্জনের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা। যেমন: ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. ইখলাস অর্জনের জন্য এই দোয়াটি পাঠ করতেন:
اللَّهُمَّ اجْعَلْ عَمَلِي كُلَّهُ صَالِحًا وَاجْعَلْهُ لِوَجْهِكَ خَالِصًا، وَلَا تَجْعَلْ لِأَحَدٍ فِيهِ شَيْئًا
“হে আল্লাহ, আপনি আমার সমস্ত আমলকে নেক বানিয়ে নিন এবং তা আপনার সন্তুষ্টির জন্য কবুল করে নিন। এতে মানুষের জন্য কোন কিছুই অবশিষ্ট রাখবেন না।” [আদ‌ দা ওয়াদ দাওয়া (আল‌ জাওয়াবুল‌ কাফী)- ইমাম ইবনুল কাইয়েম রহ.]

৬. দ্বীনদারি এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে আপনার থেকে যারা এগিয়ে আছেন তাদের দিকে দেখুন। বিশেষ করে সাহাবি এবং তাবেঈদের জীবনী থেকে ঈমান এবং আমলে তাদের অগ্রগামীতার বিষয়টি জানার চেষ্টা করুন। এতে আপনার নিজের আমল আপনার কাছে তাদের তুলনায় তুচ্ছ মনে হবে।

৭. ইবাদত-বন্দেগি করার পরে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন যে, তিনি আপনাকে তা করার তৌফিক দান করেছেন। তবে তা যেন আপনার অন্তরে অহংকার বা আত্মম্ভরিতা সৃষ্টি না করে সেদিকে সজাগ থাকুন। অন্যথায় উক্ত আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে।

৮. ইবাদত করার পরে অন্তরে এই ভয় জাগ্রত রাখুন যে, কোন ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে আল্লাহ তাআলা হয়তো এই ইবাদত প্রত্যাখ্যান করবেন।

৯. মানুষের প্রশংসায় গলে যাবেন না। আপনার ইবাদত-বন্দেগি, নামাজ, রোজা, হজ, ওমরা, পর্দা, সুন্দরভাবে কুরআন তেলাওয়াত, ইসলামের সেবায় অবদান, দান-সদকা ইত্যাদি দেখে মানুষ হয়তো আপনার প্রশংসা করতে পারে। সে ক্ষেত্রে তার প্রশংসায় গলে যাবেন না। অন্যথায় তা অন্তরের ইখলাকে ধ্বংস করে দেবে।

১০. এই বিশ্বাস রাখুন যে, আপনার কবরে শুধু আপনি যাবেন আর সাথে যাবে আপনার কিছু সৎ আমল। যদি সেগুলো আল্লাহর কাছে গৃহীত হয় তবেই তা কবরে কাজে লাগবে; অন্যথায় তা হবে পণ্ডশ্রম। এই মনোভাব অন্তরে ইখলাস সৃষ্টিতে সহায়ক হবে ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তৌফিক দান করুন। আমিন।
الله اعلم
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate