Wednesday, February 22, 2023

সচেতনতা মূলক পোস্ট: তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়া-ঝাটি করা পথভ্রষ্টতার কারণ

 বর্তমানে মুসলমানদের মাঝে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মাসআলা-মাসায়েল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও মতভেদ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এক পক্ষ অপর পক্ষকে ভয়ানক আক্রমণাত্মক ভাষায় আঘাত করছে। চলছে গালাগালি আর হিংসার উদগীড়ন। একে অপরকে কুরুচিপূর্ণ শব্দ প্রয়োগে ধোলাই করছেন। সব চেয়ে ভাবনার বিষয় হচ্ছে, একেবারে সাধারণ মানুষও ইলম ছাড়াই আলেমদের সাথে বিতর্ক জড়িয়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে তারা ভদ্রতার সীমা অতিক্রম করে বক্তব্য দিচ্ছেন। এ পরিস্থিতি কোনভাবেই মুসলিম উম্মাহর জন্য কল্যাণকর নয়। বরং তা গোমরাহির আলামত ও ভ্রষ্টতার পূর্বাভাষ। তাই আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া (তাও শর্ত সাপেক্ষ) নিজেদের মাঝে বিতর্ক পরিহার করা প্রয়োজন।

কারণ আবু উমারা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَا ضَلَّ قَوْمٌ بَعْدَ هُدًى كَانُوا عَلَيْهِ إِلَّا أُوتُوا الْجَدَلَ ثُمَّ تَلَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هَذِهِ الْآيَةَ ((مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلًا بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُونَ
“কোন জাতি হেদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার পরে গোমরাহ হয় না যতক্ষণ না তারা তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়। অত:পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই আয়াতটি পাঠ করলেন:
مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلًا – بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُونَ
“তারা আপনার সামনে যে উদাহরণ উপস্থাপন করে তা কেবল বিতর্কের জন্যেই করে। বস্তুত: তারা হল এক বিতর্ককারী সম্প্রদায়।” [তিরমিযি হা/৩১৭৬, ইবনে মাজাহ হা/৪৭, সহীহ তারগীব- হাসান, আলবানি]
সত্য জানার পরেও শুধু প্রতিপক্ষের উপর বিজয়ী হওয়ার উদ্দেশ্যে অথবা ব্যক্তি, দল, মত, বংশ ইত্যাদির স্বার্থে অন্যায় জেনেও তার সমর্থনে তর্ক-বিতর্ক গোমরাহির একটি কারণ।ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, “শরিয়তে ঐ তর্ককে তিরস্কার করা হয়েছে যা ইলম ছাড়া অন্যায়ভাবে করা হয়। অথবা সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও করা হয়। সুতরাং এখান থেকে বুঝা যায়, ঝগড়া-ঝাটি ও অন্যায় বিতর্ক গোমরাহির আলামত। পক্ষান্তরে বিতর্কের উদ্দেশ্য যদি হয়, সত্যকে সমর্থন করা বা অন্যায় কে অন্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা তবে তা কখনো ফরজে আইন; কখনো ফরজে কেফায়াহ। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ – وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ- إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِ
“ডাক তোমার রবের পথে প্রজ্ঞা এবং সুন্দর উপদেশ বাণীর মাধ্যমে আর তাদের সাথে বিতর্ক কর সুন্দরতম পন্থায়। নিশ্চয় তোমার রব সব চেয়ে বেশি জানেন, কে তার পথে থেকে বিচ্যুত হয়েছে।” [সূরা নাহল: ১২৫]
উক্ত আয়াতে দাওয়াতের দুটি চমৎকার মূলনীতি বলা হয়েছে। যথা:
🔹 এক. হেকমত তথা কুরআন-সুন্নাহর দলিল দ্বারা দাওয়াত দেয়া।
🔹 দুই. সুন্দর উপদেশ বাণী অর্থাৎ কুরআন-সুন্নাহয় যে সকল উৎসাহ ব্যঞ্জক, সতর্ক বাণী, জান্নাতের নেয়ামতরাজি ও জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে সেগুলোর মাধ্যমে দাওয়াত দেওয়া।
অনুরূপভাবে এখানে বিতর্ক করার একটি চমৎকার মূলনীতিও বলা হয়েছে। তা হল: যদি বিতর্কের প্রয়োজন হয় তবে সুন্দরতম পন্থায় তথা নম্রতা, ভদ্রতা, শালীনতা, প্রমাণ উপস্থাপন, ইলম (শরিয়তের জ্ঞান) এবং যৌক্তিক বক্তব্য পেশের মাধ্যমে বিতর্ক করতে হবে। গালাগালি ও চিৎকার-চেঁচামেচি করা হলে বিতর্কের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। বিতর্কের উদ্দেশ্য মানুষকে হেদায়েত করা; প্রতিপক্ষের উপর বিজয় প্রমাণ করা নয়। (তাফসিরে ইবনে কাসির ও তাফসীরে ইবনে সাদি থেকে সংক্ষেপায়িত)
আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করুন। আমীন।▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
লেখক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদি আরব।

নাস্তিকের জন্য বদদুআ করার বিধান

 প্রশ্ন: একজন নাস্তিক আল্লাহর রাসূল সহ অনেক মুসলিমকে গালাগালি দিচ্ছে এবং নানাভাবে অনেক কষ্ট দিচ্ছে। এতে আমিও কষ্ট পাচ্ছি।‌ আমি কি তার জন্য বদদুআ করতে পারবো?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরুদ্ধাচারণ বা তাকে কটুক্তি করা নতুন কোন বিষয় নয়। তাঁর জীবদ্দশায় তাকে কাফের-মুশরিক ও মুনাফিকদের পক্ষ থেকে এ সবের মুখোমুখি হতে হয়েছে। আর তাতে মুসলিমগণ কষ্টপাবেন তা স্বাভাবিক। এটি ঈমানের আলামত। সাধারণভাবে কাফের-মুশরিক, নাস্তিক ও ফাসেক লোকদের প্রতি বদদুআ বা লানতের দুআ করা যাবে। এটি ওলামাদের সর্বসম্মত মত। তবে ব্যক্তি বিশেষকে নির্দিষ্ট করে লানত করা বা তার জন্য বদদুআ যাবে কি না তা দ্বিমতপূর্ণ। সঠিক কথা হল, ব্যক্তি বিশেষকে নির্দিষ্ট করে বদদুআ করা যাবে না। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নির্দিষ্ট কতিপয় ব্যক্তির নাম ধরে ধরে লানত করেছিলেন তখন কুরআনে আয়াত নাজিলের মাধ্যমে তাকে নিষেধ করা হয়েছে এই আয়াত দ্বারা:

لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظَالِمُونَ

“হয় আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন কিংবা তাদেরকে আযাব দেবেন। এ ব্যাপারে আপনার কোন করণীয় নাই। কারণ তারা রয়েছে অন্যায়ের উপর।” [সূরা আলে ইমরান: ১২৮]
উল্লেখ্য যে, ওহুদ যুদ্ধের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু সুফিয়ান, হারিস ইবনে হিশাম ও সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া প্রমূখ কাফেরদের লিডারদের নাম ধরে ধরেে লানত করেছিলেন। তখন এই আয়াত নাজিলের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে নিষেধ করা হয়। [দ্র: তাফসীরুল কাবীর/মাফাতিহুল গায়ব] আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

বাবা-মা যদি ভুল ধারণার উপরে ভিত্তি করে বা অন্যায় ভাবে সন্তানের উপর বদদুআ করেন তাহলে কি সন্তান এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে

 প্রশ্ন: অনিচ্ছা বশত আমার‌ দ্বারা একটি ভুল কাজ ঘটে গেছে। কিন্তু আম্মা মনে করেছেন, আমি ইচ্ছাকৃত ভাবে এ কাজ করেছি। যার কারণে তিনি আমাকে বদদুআ করেন এবং বলেন, যেন আমার আশায় ছাই পড়ে। এখন আমি কি তার বদদুআর শিকার হব এবং দুআ করলেও আমার কোনও আশা পূরণ হবে না?

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: নিম্নে চারটি পয়েন্টে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:
🔸প্রথমত: বাবা-মার বদদুআ সন্তানের জন্য বিপদজনক। তাই সন্তানের কর্তব্য, পিতা-মাতাকে খুশি রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা। আর পিতা-মাতার কর্তব্য হলো, সন্তানের জন্য কখনো বদদুআ না করা।‌ কেননা হাদিসে‌ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। যেমন:
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لَا تَدْعُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ وَلَا تَدْعُوا عَلَى أَوْلَادِكُمْ وَلَا تَدْعُوا عَلَى خَدَمِكُمْ وَلَا تَدْعُوا عَلَى أَمْوَالِكُمْ، لَا تُوَافِقُوا مِنَ اللهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى سَاعَةَ نَيْلٍ فِيهَا عَطَاءٌ فَيَسْتَجِيبَ لَكُمْ ‏”‏ ‏
“তোমরা নিজেদের উপর বদদুআ করো না, তোমাদের সন্তানদের উপর বদদুআ করো না, তোমাদের খাদেমদের (সেবক বা কাজের মানুষদের) উপর বদদুআ করো না এবং তোমাদের ধন-সম্পদের উপর উপর বদদুআ করো না। কেননা হতে পারে, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুগ্রহ প্রাপ্তির সময়ের সাথে (দুয়া কবুলের সময়ের সাথে) তোমাদের মিল হয়ে যাবে ফলে তিনি‌ তোমাদের (বদদুআও) কবুল করে নিবেন।” [মুসলিম, অধ্যায়: যুহুদ]

🔸 দ্বিতীয়ত: বান্দার অনিচ্ছাকৃত ভুল স্বয়ং আল্লাহও ক্ষমা করে দিয়েছেন। যেমন: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْه».
‘নিশ্চয় আল্লাহ আমার উম্মতের অনিচ্ছা বশত: এবং ভুলে যাওয়ার কারণে ঘটে যাওয়া গুনাহ এবং জোর জবরদস্তি মূলক কৃত গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন।” [আবু দাউদ, হা/৭২১৯-সহিহ]
সুতরাং আমাদেরও উচিত, মানুষের অনিচ্ছা বশত: ঘটে যাওয়া ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়া। এটি নিঃসন্দেহে উন্নত চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ।

🔸 তৃতীয়ত: যদি কোনও ব্যক্তির আচার-আচরণ, চরিত্র ও কার্যক্রম অধিকাংশই ভালো ও সন্তোষজনক হয় তাহলে তার দ্বারা হঠাৎ কোনও অন্যায় কর্ম ঘটে গেলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া উচিৎ। হাদিসে এ ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। অবশ্য ইসলামি আইনে‌ দণ্ডবিধি প্রযোজ্য হয় এমন অপরাধ হলে‌ ভিন্ন কথা। যেমন: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
أقيلوا ذَوي الهيئاتِ عثَراتِهم إلا الحدودَ
“তোমরা সম্মানিত ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী লোকদের হঠাৎ ঘটে যাওয়া ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দাও দণ্ড যোগ্য অপরাধ ব্যতীত।” [আবু দাউদ, ৪৩৭৫, আহমদ, ২৫৪৭৪, সহীহাহ্ ৬৩৮, সহীহ আল জামি‘ ১১৮৫]

🔸চতুর্থত: মা অথবা বাবা যদি সন্তানের ‘অনিচ্ছাকৃত’ ঘটে যাওয়া কোনও ভুলকে ‘ইচ্ছাকৃত’ মনে করে বদ দুআ করে তাহলে তা আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না। কারণ এই বদদুআ যথার্থ হয়নি। কুরআন-হাদিসে মানুষের প্রতি কু ধারণা করতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু তিনি সুস্পষ্ট প্রমাণ ব্যতিরেকে ধারণার উপরে ভিত্তি করে সন্তানকে বদদুআ দিয়েছে। এ কারণে তার দুআ আল্লাহর দরবারে প্রত্যাখ্যাত তো হবেই বরং এতে তিনি গুনাহগার বলে গণ্য হবেন। কারণ, ইসলামে সন্তান-সন্ততির উপরে বদদুআ করাই নিষিদ্ধ। তারপরে আবার যদি দুআর মধ্যে গুনাহের বিষয় থাকে তা আল্লাহ কবুল করবেন না। (সুস্পষ্ট প্রমাণ ব্যতিরেকে শুধু ভুল ধারণার উপরে ভিত্তি করে বদদুআ করা নিঃসন্দেহে জুলুম, সীমালঙ্ঘন এবং গুনাহ)।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّهُۥ لَا یُحِبُّ ٱلۡمُعۡتَدِینَ
“নিশ্চয় তিনি (মহান আল্লাহ) সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না।” [সুরা আরাফ: ৫৫]
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু সাইদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
ما من مسلم يدعو بدعوة، ليس فيها إثم ولا قطيعة رحم إلا أعطاه الله بـها إحدى ثلاث : إما أن يعجل له دعوته، وإما أن يدخرها له في الآخرة وإما أن يصرف عنه من السوء مثلها. قالوا : إذا نكثر قال : الله أكثر
“যখন কোনও মুমিন ব্যক্তি দুআ করে, যে দুআতে কোনও গুনাহ থাকে না এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় থাকে না, তখন আল্লাহ তিন পদ্ধতির কোনও এক পদ্ধতিতে তার দুআ অবশ্যই কবুল করে নেন। যে দুআ সে করেছে হুবহু সেভাবে তা কবুল করেন অথবা তার দুআর প্রতিদান আখিরাতের জন্য সংরক্ষণ করেন কিংবা এ দুআর মাধ্যমে তার অনাগত কোনও বিপদ-মুসিবত তিনি দূর করে দেন। এ কথা শুনে সাহাবিগণ বললেন, আমরা তাহলে অধিক পরিমাণে‌ (দুআ) করব। তিনি বললেন, “আল্লাহ আরও অধিক দাতা” [বুখারি: আদাবুল মুফরাদ ও আহমদ, সহীহ-আলবানি]

তবে আপনার কর্তব্য, আপনার মাকে শান্তভাবে‌ যুক্তি-প্রমাণের আলোকে অনিচ্ছা বশত: ভুল হয়ে যাওয়ার বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা যেন আপনার ব্যাপারে তার ভুল ধারণা ভেঙ্গে যায় এবং তিনি নিজের অবস্থান থেকে ফিরে আসেন। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

দুআ কবুলের শর্ত

 প্রশ্ন: দুআ কবুলের শর্তগুলো কী কী? কার দুআ কবুল হয় না?

••••••••••••••••••••••
উত্তর: দুআ কবুলের শর্ত তিনটি:
১. খালিস ভাবে একমাত্র আল্লাহর নিকট দুআ করা।
২. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পদ্ধতির আলোকে দুআ করা।
৩. হালাল উপার্জন ও হালাল খাদ্য গ্রহণ করা।

❑ কাদের দুআ কবুল হয় না?
উপরে বর্ণিত শর্তগুলো যার মধ্যে পাওয়া যাবে না তার দুআ আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না। এ ছাড়াও আরও তিনজন ব্যক্তির কথা হাদিসে বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে যাদের দুআ কবুল করা হবে না। তারা হল: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
” ثلاثة يدعون فلا يستجاب لهم : رجل كانت تحته امرأة سيئة الخلق فلم يطلقها , و رجل كان له على رجل مال فلم يشهد عليه ، و رجل آتى سفيها ماله و قد قال الله: وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ
“তিন ব্যক্তি এমন যে তাদের দুআ কবুল করা হয় না। যথা:
– এক. যে ব্যক্তির অধীনে দুশ্চরিত্রা নারী আছে কিন্তু সে তাকে তালাক দেয় না।
– দুই. যে ব্যক্তি অন্য লোকের কাছে তার পাওনা আছে কিন্তু সে তার সাক্ষী রাখেনি।
– তিন. যে ব্যক্তি নির্বোধ ব্যক্তিকে সম্পদ দিয়ে দেয়। অথচ আল্লাহ বলেন,
وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ
“তোমরা নির্বোধদেরকে তোমাদের সম্পদ দিও না।”
হাদিসটি ইমাম হাকিম তার মুস্তাদরাক কিতাবে উল্লেখ করে তাকে ইমাম বুখারি ও মুসলিমের শর্ত মোতাবেক সহিহ বলেছেন, আর ইমাম যাহাবি তাতে ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি বলেন, এটি মাউকুফ বা সাহাবির উক্তি। আর ইমাম আলবানি বলেন, হাদিসটি সহিহ-মারফু বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উক্তি। [সিলসিলা সহীহা ৪/৪২০]

◈ হাদিসটির ব্যাখ্যা:

◆ এই হাদিসের অর্থ হল, কেউ যদি নিজের দুশ্চরিত্রা স্ত্রীর বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বদদুআ করে তাহলে তা গৃহীত হবে না। কারণ তার ক্ষমতা ছিল, তাকে তালাক দেওয়ার কিন্তু সে তা করেনি।
◆ কেউ যদি সাক্ষী এবং প্রমাণ ছাড়া কাউকে ঋণ দেয় এবং সে ঋণগ্রহীতা তা অস্বীকার করে তাহলে সে ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে ঋণদাতা যদি আল্লাহর কাছে বদদুআ করে তাহলে গৃহীত হবে না। কারণ আল্লাহ ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সে তা পালন করেনি।
◆ অনুরূপভাবে, কেউ যদি নির্বোধের হাতে তার অর্থ-সম্পদ তুলে দেয় ফলে সে তা আত্মসাৎ করে বা নষ্ট করে তাহলে সে ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে বদদুআ আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না। কারণ আল্লাহ নিজেদের হাতে সম্পদ তুলে দেওয়া বারণ করেছেন।
মোটকথা এই ব্যক্তি আল্লাহর বিধান উপেক্ষা করে নিজের উপরে নিজেই শাস্তি চাপিয়ে নিয়েছে। যার ফলে এই সকল ক্ষেত্রে তার দুআ আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না। [ইমাম মুনাবি]
এই হাদিস দ্বারা এটা বোঝায় না যে, তার অন্য কোন দুআ কবুল হবে না। অন্যান্য দু্আ ক্ষেত্রে এই হাদিস প্রয়োগ করা ঠিক নয়।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

সালাত রত অবস্থায় ভয়াবহ ভূমিকম্প শুরু হলে সালাত ভঙ্গ করা এবং মানুষের জীবন রক্ষার জন্য সালাত ভঙ্গ বা কাজা করার বিধান

 প্রশ্ন: ভূমিকম্পের সময় সালাতের বিধান কী? এ সময় সালাত চলমান রাখা জরুরি নাকি সালাত ছেড়ে দেওয়া জায়েজ? অনুরূপভাবে ভয়াবহ বিপদের সময় জানমাল রক্ষা জন্য সালাত পরিত্যাগ করা কি বৈধ? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর: শরিয়ত সম্মত কারণ ব্যতিরেকে সালাত শুরু করার পর তা ভঙ্গ করা জায়েজ নাই। এ ব্যাপারে সকল আলেম একমত। কারণ

✪ আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلَا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ

“তোমরা তোমাদের আমলগুলো নষ্ট করো না।” [সূরা মুহাম্মদ: ৩৩]

তবে ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস, অগ্নিকাণ্ড, প্রচণ্ড ঝড়, হিংস্রপ্রাণীর আক্রমণ ইত্যাদিতে জানমালের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে ফরজ অথবা নফল যে কোনও সালাত পরিত্যাগ করে জীবন বাঁচানো জায়েজ। এটি শরিয়ত সম্মত বৈধ কারণ। কেননা ইসলামের দৃষ্টিতে জীবনকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করা জায়েজ নাই।

✪ মহান আল্লাহ বলেন,

وَلا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ

“তোমারা নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ কর না।” [সূরা বাকরা: ১৯৫]

হাদিসে সালাত রত অবস্থায় যদি সাপ-বিচ্ছুর আগমন ঘটে তাহলে সালাত পরিত্যাগ করে তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন:

✪ আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন,

أَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِقَتْلِ الأَسْوَدَيْنِ فِي الصَّلاَةِ الْحَيَّةُ وَالْعَقْرَبُ ‏

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতরত অবস্থায়ও সাপ-বিচ্ছু হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছেন।” [সুনান আত তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ২/ সালাত, পরিচ্ছেদ: সালাতে সাপ-বিচ্ছু হত্যা করা]

وجاء في كشاف القناع ويجب إنقاذ غريق ونحوه كحريق فيقطع الصلاة لذلك فرضاً كانت أو نفلاً، وظاهره ولو ضاق وقتها لأنه يمكن تداركها بالقضاء بخلاف الغريق ونحوه

❑ মানুষকে ভয়াবহ বিপদ থেকে রক্ষা করতে গিয়ে সালাত ছেড়ে দেওয়া বা সালাত কাজা করার বিধান:

মানুষকে ভয়াবহ বিপদ থেকে রক্ষার জন্য সালাত পরিত্যাগ করা, এমনকি উদ্ধার কাজে নিয়োজিত থাকার কারণে সালাতের সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও সমস্যা নাই। কেননা ইসলামে মানুষের প্রাণ রক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।

✪ আল্লাহ তাআলা বলেন,

مَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَآ أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا

“আর যে মানুষের প্রাণ বাঁচালো, সে যেন সকল মানুষকে বাঁচালো।” [সূরা মায়িদাহ: ৩২]

✪ ইসলামের দৃষ্টিতে যদি কেউ খাদ্যাভাবে মারা যাওয়ার আশঙ্কা করে তাহলে তার জন্য বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু হারাম খাবারকেও সাময়িকভাবে হালাল করে দেওয়া হয়েছে। [সূরা আনআম: ১৪৫]

◆ ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রাহ. বলেন,
إذَا رَأَى صَبِيَّيْنِ يَقْتَتِلَانِ ، يَتَخَوَّفُ أَنْ يُلْقِيَ أَحَدُهُمَا صَاحِبَهُ فِي الْبِئْرِ ، فَإِنَّهُ يَذْهَبُ
إلَيْهِمَا فَيُخَلِّصُهُمَا ، وَيَعُودُ فِي صَلَاتِهِ .
“(সালাতরত ব্যক্তি) যদি দেখে যে, দু জন শিশু মারামরিতে লিপ্ত হয়েছে এবং এ আশঙ্কা হয় যে, একজন অন্যজনকে কুপে নিক্ষেপ করবে তাহলে (সালাত পরিত্যাগ করে) তাদের নিকটে গিয়ে তাদেরকে রক্ষা করে পূণরায় সালাতে ফিরে আসবে।” [ আল মুগনি ৩/৯৭]

◆ ইমাম শাওকানি বলেন,

لا شك أن إنقاذ الغريق من أهم الواجبات على كل قادر على إنقاذه ، فإذا أخذ في إنقاذه ، فتعلق به حتى خشي على نفسه أن يغرق مثله : فليس عليه في هذه الحالة وجوب ، لا شرعا ، ولا عقلا، فيخلص نفسه منه ، ويدعه، سواء كان قد أشرف على النجاة أم لا، بل ظاهر قوله تعالى: ( وَلا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ ) [البقرة: 195]، أنه يجب عليه تخليص نفسه-(.. السيل الجرار المتدفق على حدائق الأزهار (ص: 892))
“নিঃসন্দেহে ডুবন্ত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব (অবশ্যপালনীয়) এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু উদ্ধার করতে গিয়ে যদি আশঙ্কা থাকে যে, ডুবন্ত ব্যক্তি তাকে জাপটে ধরবে এবং সেও তার মতোই ডুবে মরবে তাহলে এই অবস্থায় তার জন্য এটি ওয়াজিব নয়। শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকেও নয় বা জ্ঞান-বুদ্ধির বিচারেও নয়। এই অবস্থায় সে তাকে ছেড়ে নিজেকে রক্ষা করবে। চাই তার বাঁচার সম্ভাবনা থাকুক অথবা না থাকুক। বরং মহান আল্লাহর বাণী:

وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ

“আর তোমরা নিজেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না।” [সূরা বাকরা: ১৯৫]-এর প্রকাশ্য অর্থ এটাই যে, ডুবন্ত ব্যক্তিকে ছেড়ে নিজেকে রক্ষা করা তার জন্য ওয়াজিব।” [আস সাইলুল জাররার,পৃষ্ঠা নং ৮৯২]
আল্লাহু আলাম।

◆ শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বায রাহ. বলেন,

إذا وجد حادثًا، غرقًا أو حرقًا؛ تخشى منه على أولادك أو على المسلمين تقطعها وتساهم في إنقاذ المسلمين أو إنقاذ أهلك، ثم تعود إلى الصلاة تصلي تبدأ فيها من جديد

“যদি কোনও দুর্ঘটনা, ডুবে যাওয়া বা অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে যাতে আপনি আপনার সন্তান-সন্তুতি বা মুসলিমদের ক্ষয়-ক্ষতির আশঙ্কা করেন তাহলে সালাত ভঙ্গ করে মুসলিমদেরকে বা আপনার পরিবারকে রক্ষার কাজে অংশ গ্রহণ করুন। তারপর আপনি সালাতে ফিরে যান এবং নতুন করে শুরু করুন।” [binbaz]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate