প্রশ্ন: কোন বিশিষ্ট জন বা কোন বড় নেতাকে ‘মহান’ বলা কি জায়েজ? এতে কি গুনাহ হবে?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
Wednesday, February 22, 2023
কোন বিশিষ্ট জন বা কোন বড় নেতাকে মহান বলা কি জায়েজ
শরিফ শব্দের সঠিক ও ভুল ব্যবহার এবং এ ব্যাপারে বিভ্রান্তি নিরসন
শরিফ (شريف) শব্দের অর্থ: সম্মানিত, উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন, মর্যাদাবান, সম্ভ্রান্ত, অভিজাত ইত্যাদি। যেমন: আরবি অভিধানে বলা হয়েছে:
যুগে যুগে আলেমদের নামের সাথে ইমাম, শাইখুল ইসলাম, আল্লামা, শাইখ, মাওলানা, হযরত ইত্যাদি শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়। এগুলোর উদ্দেশ্য কেবল সম্মান সূচক সম্বোধন। যদিও আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবিদের নামের সাথে এই ধরনের বিশেষণ ব্যবহারের রীতি প্রচলিত ছিল না।
– তদ্রুপ কুরআনের ক্ষেত্রে শরিফ শব্দের ব্যবহারও নাজায়েজ নয়। কারণ অর্থগতভাবে কোন সমস্যা নেই। কুরআন শরিফ অর্থ, মর্যাদাবান কুরআন। এটি মূলত কুরআন মাজীদ বা কুরআন কারীম-এর সমার্থক বোধক। অর্থাৎ শব্দ ভিন্ন হলেও অর্থ প্রায় এক। তবে নিঃসন্দেহে কুরআনের সাথে মাজিদ (মর্যাদাবান), কারিম (সম্মানিত), হাকিম (প্রজ্ঞার আধার), মুবিন (সুস্পষ্ট) ইত্যাদি কুরআনে ব্যবহৃত আল্লাহর দেওয়া বিশেষণ ব্যবহার করা উত্তম।
– একইভাবে অর্থগত দৃষ্টিকোণ থেকে হাদিস এবং হাদিসের কিতাবাদী তথা বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈ ইত্যাদির সাথে শরিফ শব্দযুক্ত করতে কোন আপত্তি নেই। যেমন: হাদিস শরিফ, বুখারি শরিফ, মুসলিম শরিফ ইত্যাদি। তবে আমাদের সালাফ বা পূর্বসূরীগণ এ সকল ক্ষেত্রে ‘শরিফ’ শব্দটি ব্যবহার করতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই ব্যবহার না করাই ভালো। কিন্তু কেউ ব্যবহার করলেও তাকে হারাম বা বিদআত বলার সুযোগ নাই। কারণ এটি ইবাদতের বিষয় নয় এবং অর্থগতভাবেও এতে কোন সমস্যা নেই।
– মিলাদ, কিয়াম, মাজার, ওরশ, পীরের খানকা ও দরবার ইত্যাদি শব্দের সাথে শরিফ শব্দের ব্যবহার জায়েজ নয়। কারণ এগুলো বিদআতি কার্যক্রম এবং বিদআত চর্চা কেন্দ্র। আর বিদআত কখনো শরিফ হতে পারে না। পথভ্রষ্ট লোকেরা এই সকল বিদায়াতি কার্যক্রমের আবরণ হিসেবে এবং মানুষের সামনে এগুলোকে মহিমান্বিত করার উদ্দেশ্যে এগুলোতে শরিফ শব্দ ব্যবহার করে থাকে।
– শব্দের অর্থ বিবেচনায়, মানুষের নামের ক্ষেত্রে শরিফ বা শরিফা শব্দের ব্যবহারও আপত্তিজনক নয়। আল্লাহু আলম।
মক্কার সাথে মুকাররামা এবং মদিনার সাথে মুনাওয়ারা বিশেষণ ব্যবহারের বিধান
মক্বা শব্দের সাথে ‘মুকাররমা” (সম্মানিত) আর মদিনা শব্দের সাথে ‘মুনাওয়ারা’ (আলোকিত) শব্দের ব্যবহার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা সাহাবিদের যুগে পরিচিত ছিল না। পরবর্তীতে মানুষ মুসলিম জাতির সবচেয়ে সম্মান ও আবেগের এই দুই জায়গার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে এই শব্দগুলো যুক্ত করেছে। ফলে মক্কা মুকাররামা বা মক্কাতুল মুকাররমা (مكة المكرمة) এবং মদিনা মুনাওয়ারা (المدينة المنورة) নামগুলো সর্বত্র ব্যাপক ভাবে প্রচলিত হয়ে গেছে। কিন্তু যুগ পরম্পরায় আলিমগণ কখনো এই শব্দগুলোর ব্যাপারে শক্ত আপত্তি করেননি বা এগুলোকে বিদআত হিসাবে আখ্যায়িত করেননি।
অবশ্য কোন কোন আলেম বলেছেন, ‘মদিনা মুনাওয়ারা’-এর পরিবর্তে ‘মদিনাতুন নবী’ (مدينة النبي صلى الله عليه وسلم নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শহর), বা (المدينة النبوية) মদিনাহ নববিয়াহ ব্যবহার করা উত্তম। কারণ মদিনা মুনোয়ারা (আলোকিত শহর)-এর মধ্যে ভ্রান্ত অর্থ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর তা হল, বিদআতিরা বিশ্বাস করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নূরের সৃষ্টি এবং তার কবর থেকে নূর বা আলো বিচ্ছূরিত হয়ে এই শহরকে আলোকিত করেছে। তবে আমরা বলব, আল্লাহর নবীর কবরের নূর নয় বরং মক্কা এবং মদিনা উভয়টি আল্লাহর নবীর উপরে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ইলমে ওহি তথা ঐশী জ্ঞানের আলোয় আলোকিত শহর। আসমানি জ্ঞানের আলোর বিচ্ছুরণে এই শহরদ্বয় থেকে অজ্ঞতার অমানিশা বিদূরিত হওয়ার পাশাপাশি সেই আলো আলোকিত করেছে অন্ধকারাচ্ছন্ন সমগ্র পৃথিবীকে।
🔸আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ.-কে প্রশ্ন করা হয় যে, মক্কার বিশেষণ হিসেবে ‘মুকাররামা’ (সম্মানিত) এবং মদিনার বিশেষণ হিসেবে ‘মুনাওয়ারা’ (আলোকিত) শব্দ ব্যবহার কি বিদআতের অন্তর্ভূক্ত? ‘মক্কা মুকাররামা মুহাররামা’ এবং ‘মদিনা নববিয়া’ বলা কি অধিক উত্তম? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
উত্তরে তিনি বলেন,
কেমন আছেন বনাম আল্লাহ আপনাকে কেমন রেখেছেন এবং ভালো আছি বনাম আল্লাহ আমাকে ভালো রেখেছেন বিষয়ে বিভ্রান্তি নিরসন
বর্তমানে কাউকে কাউকে বলতে শুনা যাচ্ছে যে, “কেমন আছেন/কেমন আছো” বলা যাবে না এবং এর উত্তরে “ভালো আছি” বলা যাবে না। বরং বলতে হবে যে, “আল্লাহ আপনাকে কেমন রেখেছেন?” আর উত্তরে বলতে হবে, “আল্লাহ আমাকে ভালো রেখেছেন।” “কেমন আছেন” বলা নাকি নাকি আশআরি আকিদা (!), আবার কেউ বলে, এতে নাকি মানুষ আল্লাহর সমকক্ষ হয়ে যায়! কারণ মানুষ নিজে নিজে ভালো থাকে না ইত্যাদি।▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: ইসলাম সম্পর্কে সঠিক গবেষণা না থাকা কিংবা ইসলাম সম্পর্কে ভুল বুঝের কারণে কিংবা বিজ্ঞ আলেমদের সংস্পর্শ থেকে ইলম অর্জন না কারণে বর্তমানে অনেক মানুষ, এমনকি আমাদের দেশীয় কোনও কোনও আলেম/বক্তাও এ সব নতুন নতুন দর্শনের আবির্ভাব ঘটিয়ে যুগযুগ ধরে চলে আসা বৈধ বিষয়ে মানুষের মাঝে অযথা বিভ্রান্তি তৈরি করছে- যা কোনও কোনভাবেই কাম্য নয়।
যাহোক, আমরা দেখি, মানুষকে “কেমন আছেন/কেমন আছো” বলে প্রশ্ন করা এবং উত্তরে “ভালো আছি” বলার ব্যাপারে শরিয়তের কোনও আপত্তি আছে কি না।
মূলত: “কেমন আছেন/কেমন আছো?” “ভালো আছি” এই সকল বাক্য ব্যবহারে শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনও সমস্যা নেই। কেননা হাদিসে এই বাক্যগুলো ব্যবহৃত হয়েছে। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিকে প্রশ্ন করেছেন, “কেমন আছেন? কী অবস্থা আপনাদের?” আর সাহাবি উত্তর দিয়েছেন, “ভালো আছি!”
সাহাবিদের মাঝেও এ জাতীয় বাক্য ব্যবহারের প্রচলন ছিল। (তবে “ভালো আছি” বলার পর “আলহামদুলিল্লাহ’ বলা বা আল্লাহর প্রশংসা করা উচিত)
নিম্নে এ বিষয়ে কয়েকটি হাদিস পেশ করা হল:
উল্লেখ্য যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর সাথে তো সুন্দর আচরণ করতেনই, স্ত্রীর পরিবার ও স্বজনদের প্রতিও সুন্দর ও উত্তম আচরণ করতেন। এমনকি তার স্ত্রীর বয়োবৃদ্ধ সঙ্গিনীদের প্রতিও সদয় ও যত্নবান ছিলেন৷ তাদের খোঁজখবর নিতেন৷ প্রয়োজনে সাহায্য করতেন৷ উপরোক্ত হাদিসটি তার একটি উদাহরণ।
◆ ২. অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
عن عبد الله بن عمرو قال: قال رسول الله -صلى الله عليه وسلم- لرجل: “كيف أصبحت يا فلان؟”. قال: أحمد الله إليك، يا رسول الله. فقال رسول الله -صلى الله عليه وسلم-: “ذلك الذي أردت منك”
◆ ৩. অন্য একটি হাদিসে এসেছে,
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ: أَنَّهُ سَمِعَ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَسَلَّمَ عَلَيْهِ رَجُلٌ فَرَدَّ السَّلَامَ، ثُمَّ سَأَلَ عُمَرُ الرَّجُلَ: كَيْفَ أَنْتَ؟ فَقَالَ: أَحْمَدُ اللَّهَ إِلَيْكَ، فَقَالَ عُمَرُ: “هَذَا الَّذِي أَرَدْتُ مِنْكَ”.
লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ এর মধ্যে লা অক্ষরটি টেনে না পড়লে কি তা সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ প্রকাশ করবে
প্রশ্ন: ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ এর মধ্যে ‘লা’ অক্ষরটি টেনে না পড়লে কি অর্থ পরিবর্তন হয়ে যাবে? কারণ ফেসবুকে একটা পোস্ট দেখা যায়, যেখানে বলা হচ্ছে যে, ‘লা’ টেনে না পড়লে তার অর্থ সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে যাবে। তা হল, “অবশ্যই আল্লাহ ছাড়া উপাস্য আছে।” এ কথা কি সঠিক? আর লাম অক্ষরটি কি তিন আলিফ পরিমাণ টেনে পড়তে হবে?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: “লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ” (আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই) হল, বিশ্ব চরাচরের মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় এবং মর্যাদার দিক দিয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ বাক্য। এটি সর্বোত্তম জিকির এবং জান্নাতের চাবি। কারণ তা আল্লাহর তাওহিদ বা একত্ববাদের স্বীকৃতি জ্ঞাপক বাক্য। তাই আমাদের উচিত, এটিকে সঠিক নিয়মে নির্ভুলভাবে পাঠ করা এবং এর মর্মার্থ উপলব্ধি করে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।
সুতরাং যেমনটি বলা হচ্ছে যে, ‘লা’ অক্ষরটি টান ছাড়া পড়লে অর্থ হবে, “অবশ্যই আল্লাহ ছাড়া উপাস্য আছে”-এ কথা সঠিক নয়। কেউ কেউ আরও একধাপ বাড়িয়ে বলে যে, লাম অক্ষর টেনে না পড়লে কাফের হয়ে যাবে! এটা নিতান্তই বাড়াবাড়ি ছাড়া কিছু নয়।