Saturday, September 3, 2022

সালাতের সুতরা সম্পর্কে বিস্তারিত

 প্রশ্ন: সুতরা কাকে বলে? সুতরার বিধান কি?সুতরাহ্‌ কিসের হবে? মুসল্লির সামনে দিয়ে পারাপারের বিধান কি? মুসল্লীর সামনে সুতরা রেখে চলে যাওয়া যাবে কি? সুতরা বিহীন অবস্থায় একজন মুসুল্লীর কতটুকু সামনে দিয়ে অতিক্রম করা যাবে বিনা সুতরায় নামায কখন বাতিল হবে?

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: সুতরাহ (আরবি: سترة‎‎): সুতরাহ শব্দের অর্থ আড়াল করার বস্তু। অর্থাৎ এটা হলো নামাজের সময় ব্যবহৃত একটি বস্তু,যা তার সামনে দিয়ে চলমান সবকিছু থেকে নামাজ অবস্থাকালীন তাকে আলাদা করে রাখে কমপক্ষে তিন হাত বা এর কম দুরত্বে সুতরা রেখে নামাজ পড়া হয়। এর উচ্চতা হয় কমপক্ষে এক হাত। প্রস্থে যেকোনো পরিমাণ হতে পারে।

➤সালাতে সুতরার রাখার বিধান কি?
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
সালাত আদায়ের সময় নামাযীর সামনে বেয়ে কেউ পার হবে না, এমন ধারণা থাকলেও সামনে সুতরাহ্‌ রেখে নামায পড়া কারো মতে ওয়াজিব আবার কারো মতে সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ।[সিফাতু স্বালাতিন নাবী (ﷺ), আলবানী ৮২পৃ: ইবনে উসাইমিন ফতোয়ায় আরকানুল ইসলাম]।

যেমন সফরে, বাড়িতে, মসজিদে, হারামের মসজিদদ্বয়ে সর্বস্থানে একাকী ও ইমামের জন্য সুতরাহ্‌ ব্যবহার করা জরুরী। মহানবী (ﷺ) বলেন,“সুতরাহ্‌ ছাড়া নামায পড়ো না।” [সহীহ ইবনে খুযাইমাহ্‌, ৮০০]।

➤সুতরাহ্‌ কিসের হবে?
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কর্তৃক বিভিন্ন প্রকার সুতরাহ্‌ প্রমাণিত। যেমন: কখনো তিনি মসজিদের থামকে সামনে করে নামায পড়তেন।[সিফাতু স্বালাতিন নাবী (ﷺ), আলবানী ৮২পৃ:]।

ফাঁকা ময়দানে নামায পড়লে এবং আড়াল করার জন্য কিছু না পেলে সামনে বর্শা গেড়ে নিতেন। আর লোকেরা তাঁর পিছনে বিনা সুতরায় নামায পড়ত। [বুখারী ৪৯৪, ৪৯৮] কখনো বা নিজের সওয়ারী উটকে আড়াআড়ি দাঁড় করিয়ে তাকে সুতরাহ্‌ বানিয়ে নামায পড়তেন। [বুখারী ৫০৭]। কখনো জিনপোশ (উটের পিঠে বসবার আসন) কে সামনে রেখে তার কাষ্ঠাংশের সোজাসুজি নামায পড়তেন।[বুখারী ৫০৭]।

তিনি বলতেন,“তোমাদের কেউ যখন তার সামনে জিনপোশের শেষে সংযুক্ত কাষ্ঠখন্ডের মত কিছু রেখে নেয় তখন তার উচিৎ (তার পশ্চাতে) নামায পড়া এবং এরপর তার সম্মুখ বেয়ে কেউ পার হয়ে গেলে কোন পরোয়া না করা।” [সহীহ মুসলিম ৪৯৯]।

একদা তিনি একটি গাছকে সুতরাহ্‌ বানিয়ে নামায পড়েছেন। (নাসাঈ, সুনান, আহমাদ, মুসনাদ)। কখনো তিনি আয়েশা (রাঃ) এর খাটকে সামনে করে নামায পড়েছেন। আর ঐ সময় আয়েশা (রাঃ) তার উপর চাদর ঢাকা দিয়ে শুয়ে থাকতেন। [বুখারী ৫১১]।

সুফয়্যান বিন উয়াইনাহ্‌ বলেন, তিনি শারীককে কোন ফরয নামায পড়ার সময় তাঁর টুপীকে সামনে রেখে সুতরাহ্‌ বানাতে দেখেছেন। [আবূদাঊদ, সুনান ৬৯১]।

প্রকাশ যে, কিছু না পেলে দাগ টেনে নেওয়ার হাদীস সহীহ নয়। (যইফ আবূদাঊদ, সুনান ১৩৪, যইফ ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ১৯৬, ৯৪৩, যইফ জামে ৫৬৯নং)।

সুতরাহ্‌ হবে উটের পিঠে স্থাপিত জিনপোশের পেছনে সংযুক্ত কাষ্ঠখন্ডের মত (কম-বেশী একহাত, আধ মিটার বা ৪৭ সেমি. উঁচু) কোন বস্তু । কোন দাগ সুতরাহ্‌ বলে গণ্য হবে না। তবে যে বস্তু মাটি বা মুসাল্লা থেকে একটুও উঁচু হয়ে থাকে তাকেই সুতরাহ্‌ বলে ধরে নেওয়া যাবে।[আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৩/৩৮৪) প্রকাশ যে, মুসাল্লা, চাটাই বা কার্পেটের শেষ প্রান্তকে সুতরাহ্‌ বলে গণ্য করা যাবে না। [ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ্‌, সঊদী উলামা-কমিটি ১/৩১৭ সালাতে মুবাশ্বির]।

➤মুসল্লীর সামনে দিয়ে পারাপারের বিধান কি?
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
মুসল্লীর সম্মুখ দিয়ে যাওয়া নিষেধ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, মুসল্লীর সম্মুখ দিয়ে অতিক্রমকারী যদি জানত যে, এতে তার কত বড় পাপ রয়েছে, তাহলে তার জন্য সেখানে চল্লিশ দিন বা চল্লিশ বছর দাঁড়িয়ে থাকা উত্তম হতো অতিক্রম করে চলে যাওয়ার চাইতে। [মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৭৭ সালাত’ অধ্যায়-৪, ‘সুৎরা’ অনুচ্ছেদ-৯]।

ইমাম ও সুতরার মধ্য দিয়ে অতিক্রমকারীকে হাদীসে ‘শয়তান’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।[বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৭৭৭]। এজন্য কিবলার দিকে লাঠি, দেওয়াল, মানুষ বা যেকোন বস্ত্ত দ্বারা মুসল্লীর সম্মুখে সুতরা বা আড়াল করতে হয়। [সহীহ বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৭৭৩,৭৭৯,৭৭৭ ‘সুৎরা’ অনুচ্ছেদ-৯]।

তবে জামা‘আত চলা অবস্থায় অনিবার্য কারণে মুক্তাদীদের কাতারের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করা জায়েয আছে। [মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৭৮০]।

সিজদার স্থান থেকে সুতরার মধ্যে একটি বকরী যাওয়ার মত ফাঁকা রাখা আবশ্যক। [বুখারী হা/৪৯৬; মুসলিম হা/১১৩৪; ছিফাত, পৃঃ ৬২]।অতএব মসজিদে বা খোলা স্থানে মুসল্লীর সিজদার স্থান হতে একটি বকরী যাওয়ার মত দূরত্ব রেখে অতিক্রম করা যেতে পারে। তবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করাই উত্তম।

➤মুসল্লীর সামনে সুতরা রেখে চলে যাওয়া:
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
দুঃখজনক হলেও সত্য বর্তমানে বিশেষ করে শহরের মসজিদ গুলোতে মুসল্লীর সামনে সুতরা রেখে চলে যাওয়ার প্রবণতা বেশী দেখা যায়।অথচ শরীআতে এর কোন অনুমোদন নেই বা প্রমান নেই। কারণ রাসূল (ﷺ)-এর যুগে এ ধরনের কৌশলের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং মুসল্লীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করার চেয়ে ৪০ বছর যাবৎ বসে থাকা উত্তম বলা হয়েছে। বর্তমান পদ্ধতিতে যাওয়া বৈধ হলে রাসূল (ﷺ) তা বলে যেতেন। সুতরাং মুসল্লীর সামনে সুতরা দিয়ে অতিক্রম করা আর এমনি চলে যাওয়া একই সমান। এই অপরাধ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। তবে যদি মুসল্লীর অবস্থান দূরে থাকে, সেক্ষেত্রে সুতরা না থাকলেও মুসল্লীর সিজদার স্থান থেকে একটি বকরী যাবার দূরত্ব রেখে অথবা তিন হাত দূর থেকে অতিক্রম করলে দোষ নে। [সহীহ বুখারী, আহমাদ, মুসলিম, ছিফাত পৃঃ ৬২]। তবে অপেক্ষা করাই উত্তম।

➤সুতরা বিহীন সালাতরত অবস্থায় একজন মুসল্লীর কতটুকু সামনে দিয়ে অতিক্রম করা যাবে?
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬

উক্ত অবস্থায় যরূরী প্রয়োজনে মুসল্লীর সিজদার স্থানের বাহির দিয়ে অতিক্রম করা যাবে। [সহীহ বুখারী হা/৫০৯, মুসলিম হা/৫০৫)। উক্ত হাদীছে بين يدي المصلي দ্বারা মুসল্লীর সিজদার স্থান পর্যন্ত বুঝানো হয়েছে। [ইবনু হাজার, ফৎহুলবারী ঐ হাদীছের ব্যাখ্যা দ্রঃ; ফাতাওয়া ওছায়মীন, মাসআলা নং ৬২৪]।

মসজিদ ছাড়া অন্যত্র একাকী সালাত আদায়কারী মুসল্লী সামনে সুতরা রেখে সালাত আদায় করবেন। [আবুদাঊদ হা/৬৯৮; ছহীহুল জামে‘ হা/৬৪১]। যদি সুতরা না রেখে সালাত আদায় করেন, তবে তার সিজদার স্থান পর্যন্ত জায়গার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করা যাবে না।[সহীহ বুখারী হা/৫১০; মুসলিম হা/৫০৭; মিশকাত হা/৭৭৬]।

রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘যখন তোমাদের কেউ কোন বস্ত্তকে সম্মুখে রেখে সালাত আদায় করবে যা তাকে লোকদের থেকে সুৎরা বা পর্দা স্বরূপ হবে, এমন অবস্থায় তার সম্মুখ থেকে যদি কেউ অতিক্রম করতে চায়,তাহলে সে যেন তাকে বাধা দেয়।’[সহীহবুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৭৭৭ সালাত’ অধ্যায় ‘সুতরা’ অনুচ্ছেদ। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য; মির‘আতুল মাফাতীহ হা/৭৮৬-এর ব্যাখ্যা; উছায়মীন, আরকানুল ইসলাম ২/৪৯৩ পৃঃ, প্রশ্নোত্তর সংখ্যা ২৬৭]। নোট আত তাহরীক]।

➤বিনা সুতরায় কখন সালাত বাতিল হবে?
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
সুতরা রেখে নামায পড়লে এবং তার পশ্চাৎ বেয়ে কেউ পার হয়ে গেলে নামাযীর নামাযে কোন ক্ষতি হয় না। [সহীহ বুখারী ৪৯৯, সহীহ মুসলিম ২২৫]।

সুতরার ভিতর দিয়েও কোন পুরুষ, শিশু বা পশু পার হয়ে গেলে নামাযীর মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটে ঠিকই, তবে নামায একেবারে নষ্ট হয়ে যায় না।পরন্তু বিনা সুতরায় নামায পড়লে এবং সামনে দিয়ে সাবালিকা মেয়ে, গাধা বা মিশমিশে কালো কুকুর পার হয়ে গেলে নামায বাতিল হয়ে যায়।

মহানবী (ﷺ) বলেন, “(সুতরাহ্‌ না হলে) সাবালিকা মেয়ে, গাধা ও কালো কুকুর নামায নষ্ট করে ফেলে।” আবূ যার বললেন,‘হে আল্লাহর রসূল! হ্‌লুদ ও লাল না হয়ে কালো কুকুরেই নামায নষ্ট করে তার কারণ কি?’বললেন, “কারণ, কালো কুকুর শয়তান।” [সহীহ মুসলিম ৫১০, তিরমিজি ৩৩৮, আবু দাউদ৭০২]।

ইমাম তিরমিজি রহঃ বলেন, আবু যার-এর হাদীসটি হাসান সহীহ। কিছু সংখ্যক বিদ্বান এ হাদিসের ভিত্তিতে বলেছেন, গাধা, স্ত্রীলোক ও কালো কুকুর নামাযীর সামনে দিয়ে গেলে নামায নষ্ট হয়ে যায়। ইমাম আহমাদ বলেন, এ ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই যে, কালো কুকুর নামায নষ্ট করে দেয়; কিন্তু গাধা এবং স্ত্রীলোকের ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে। ইমাম ইসহাক বলেন, কালো কুকুর নামায নষ্ট করে দেয়। এছাড়া আর কোন কিছু নামায নষ্ট করতে পারে না। [টিকা জামে’ আত-তিরমিজি, হাদিস নং ৩৩৮]।

তবে নাবালিকা মেয়ে অতিক্রম করলে নামায নষ্ট হয় না। একদা বানী আব্দুল মুত্তালিবের দু’টি ছোট মেয়ে মারামারি করতে করতে তাঁর সামনে এসে তাঁর হাঁটু ধরে ফেলল। তিনি উভয়কে দু’দিকে সরিয়ে দিলেন। আর এতে তিনি নামায ভাঙ্গলেন না। [আবূদাঊদ, সুনান ৭১৬, ৭১৭, নাসাঈ, সুনান ৭২৭]।

যেমন নিজের স্ত্রী বা কোন মহিলা নামাযীর সামনে ঢাকা নিয়ে অন্ধকারে ঘুমিয়ে থাকলে নামাযের কোন ক্ষতি হয় না। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) রাত্রে তাহাজ্জুদ পড়তেন, আর আয়েশা (রাঃ) তাঁর সামনে জানাযার লাশের মত শুয়ে ঘুমাতেন। [বুখারী ৫০৮, মুসলিম, সহীহ ৫১২, মিশকাত ৭৭৯]।

যেমন তিনি কখনো কখনো চাদরের ভিতর থেকে পায়ের দিকে চুপে চুপে নিজের প্রয়োজনে বের হয়ে যেতেন। এতেও তাঁর নামাযের কোন ক্ষতি হ্‌তো না। (ঐ) এক বর্ণনায় আছে, ‘তখন ঘরে বাতি ছিল না।’ [সহীহ বুখারী ৫১৩, সহীহ মুসলিম,৫১২]।

প্রকাশ যে, কোন মহিলা-নামাযীর সামনে বেয়ে (বিনা সুতরায়) কোন (সাবালিকা) মেয়ে পার হলেও নামায নষ্ট হয় না। [আব্দুর রাযযাক, মুসান্নাফ ২৩৫৬ মুহাল্লা ৪/১২, ২০,(নোট সালাতে মুবাশ্বির)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়,
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

পুরুষের মাথার চুল রাখার সুন্নাতী তরীকা

 প্রশ্ন: পুরুষের মাথার চুল রাখার সুন্নাতী তরীকা কি কি? চুলে সিঁথি করা এবং চুল লম্বা হলে রাবার ব্যান্ড ব্যবহার করা যাবে কি?

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পুরুষের মাথার চুল লম্বা ও খাটো উভয়টিই রাখা জায়েয। তবে চুলের নিদিষ্ট পরিমাপ আছে, সবচেয়ে বড় চুল হল কাঁধ বরাবর। এর চেয়ে বড় এবং বিভিন্ন স্টাইলে চুল রাখা রাসূল (ﷺ) এর তরীকার খিলাপ। যেমন: মাথার এক অংশ কামিয়ে ফেলা, অপর অংশে চুল রাখা। কোন বিধর্মীদের অনুকরণে চুল রাখা।কোন ফাসিক ব্যক্তির চুলের হেয়ার ষ্টাইল নকল করে চুল রাখা নাজায়েজ। চুল বড় বা ছোট করে রাখা ‘সুনানুয যাওয়ায়েদ’ বা ব্যবহারগত অতিরিক্ত সুন্নাত সমূহের অন্তর্ভুক্ত। যার উপর আমল করা উত্তম। তবে ছেড়ে দেওয়া অপছন্দনীয় নয়।’ (শরীফ জুরজানী, কিতাবুত তা‘রীফাত, বৈরূত ছাপা ১৪০৮/১৯৮৮ ‘সুন্নাতের বর্ণনা’ অনুচ্ছেদ, পৃঃ ১২২)।

বড় চুল তিন পদ্ধতিতে রাখা যায়,এটি মানুষের ব্যবহারগত অতিরিক্ত সুন্নাত সমূহের অন্তর্ভুক্ত।রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর মাথায় তিন ধরনের চুল থাকত। যেমনঃ

▪️[১] ওয়াফরা, যা কানের লতি পর্যন্ত [আবুদাঊদ হা/৪২০৬]।
▪️[২] লিম্মা, যা কাঁধের কাছাকাছি ঘাড়ের মধ্যস্থল পর্যন্ত ঝুলে পড়ত। [সহীহ মুসলিম হা/২৩৩৭]
▪️[৩] জুম্মা, সবচেয়ে বড় যা ঘাড়ের নীচ পর্যন্ত। [সুনানে নাসাঈ হা/ ৫০৬২, ৫০৬৬]।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর চুল সাধারণত জুম্মার চেয়ে ছোট এবং ওয়াফরার চেয়ে বড় থাকত। [ইবনু মাজাহ হা/৩৬৩৫]।

আয়েশা [রাঃ] থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি হায়েয [ঋতুবতী] অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর মাথার কেশ পরিপাটি করতাম। [মুসহীহ বুখারী, হা/২৯৫; নাসাঈ, হা/২৭৭সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/১৩৫৯ মিশকাত, হা/৪৪১৯]। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)চুল আঁচড়াবার সময় ডান দিক থেকে শুরু করতেন। [আবূ দাঊদ হা/৪১৬০]। তিনি তাঁর মাথার মাঝখানে সিঁথি করতেন। [আবূ দাঊদ হা/৪১৮৯, ইবনে মাজাহ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৩৬৩৩]।
.
আবু ইসহাক বলেন, আবু আব্দুল্লাহ [ইমাম আহমাদ] কে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল,যার মাথায় লম্বা চুল ছিল। তিনি বলেন, এটি উত্তম সুন্নাত। যদি আমরা সক্ষম হই,তাহলে আমরাও অনুরূপ লম্বা চুল রাখব। তিনি আরো বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জুম্মা চুল ছিল। তিনি আরো বলেন,রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর ৯ জন সাহাবীর লিম্মা চুল ছিল। ১০ জন সাহাবীর জুম্মা চুল ছিল। ইমাম আহমাদ নিজে মধ্যম সাইজের চুল রাখতেন। [ইবনু কুদামা, আল-মুগনী ১/৭৩-৭৪ পৃঃ চুল ছাঁটা ও মুন্ডনের হুকুম অনুচ্ছেদ]।

সাহাবী ওয়ায়েল বিন হুজর (রাঃ) একদিন লম্বা চুল নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে এলেন। তখন রাসূল (ﷺ) মাছি বসবে, মাছি বসবে বলে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন। ফলে তিনি ফিরে গিয়ে পরে চুল কেটে খাট করে এলেন। তখন রাসূল (ﷺ)বললেন, এটি সুন্দর (هذا أحسن)।[আবুদাঊদ হা/৪১৯০; ইবনু মাজাহ হা/৩৬৩৬; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী ১/৭৩-৭৪ পৃঃ]।

পূর্বে আমি উল্লেখ করেছি যে, পুরুষেরা মাথার মাঝখানে সিঁথি করতে পারে এটি মুস্তাহাব। এবং সিঁথি না করে ছেড়ে রাখা মকরূহ। যেহেতু তাতে আহলে কিতাবের সাদৃশ্য অবলম্বন করা হয়। অবশ্য চুল ছোট হলে সিঁথি না করে স্বাভাবিক অবস্থায় ছেড়ে রাখায় দোষ নেই। (শা’রুর রা’স ৫০ পৃঃ)।
.
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার কেশ নিম্নদেশে ঝুলিয়ে রাখতেন (অর্থাৎ প্রথমদিকে তিনি সিথি করতেন না)। আর মুশরিকরা তাদের মাথায় সিঁথি করত। পক্ষান্তরে আহলে কিতাব তাদের মাথার চুল ঝুলিয়ে রাখত। প্রথমদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে ব্যাপারে প্রত্যাদেশ না পেতেন, সেসব ব্যাপারে আহলে কিতাবদের অনুসরণ পছন্দ করতেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার কেশকে সিঁথি করতেন। (সহীহ বুখারী, হা/৩৫৫৮, নাসাঈ, হা/৫২৩৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬০৫ শামায়েলে তিরমিযি, হাদিস নং ২৫ ইবনু মাজাহ ৩৬৩২, মুসনাদে আহমাদ ২৩৬৪, মিশকাত হা/৪৪২৫) ।অপর বর্ণনায় রয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চুল বাবরী ছিল,তাতে সিঁথি হলে তিনি তা সিঁথি করতেন, না হলে ছেড়ে দিতেন। অতএব বিশুদ্ধ মত হলো,সিঁথি মুস্তাহাব। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৯১৭)।
.
পুরুষের চুলে ব্যান্ড, রাবার ব্যান্ড জুটি ইত্যাদি ব্যবহার করা শরীয়ত সম্মত নয়। কেননা এগুলো নারীদের সদৃশ হয়ে যায়। তাছাড়া যেহেতু পুরুষের চুল সোজা রাখার জন্য অন্য পদ্ধতিও রয়েছে। (টুপি পরিধান, নিয়মিত তৈল বা অন্য কিছু লাগিয়ে চুলের যত্ন নেওয়া ইত্যাদি)। সুতরাং ঘরে অথবা বাইরে কোথাও পুরুষের জন্য মহিলাদের সাদৃশ্য গ্রহণ বৈধ নয়। তাই মাথার লম্বা চুল বেঁধে রাখা মহিলাদের সাদৃশ্যগ্রহণ হওয়ায় তা করা পুরুষের জন্য জায়েজ হবে না। কেননা হাদিসে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লা’নত করেছেন নারীরূপী পুরুষ ও পুরুষরূপী নারীদের উপর এবং বলেছেন, তাদেরকে বের করে দাও তোমাদের ঘর হতে এবং তিনি অমুক অমুককে বের করে দিয়েছেন। (সহীহ বুখারী ২১৫২, ২১৫৪, ২২৩৩, মুসলিম ১৭০৩, ১৭০৪, তিরমিযী ১৪৩৩, ১৪৪০, আবু দাউদ ৪৪৬৯, ৪৪৭০, ইবনু মাজাহ ২৫৬৫, আহমাদ ৭৩৪৭, ৮৬৬৯, মালেক ১৫৬৪,বুলুগুল মারাম,১২১৮) উক্ত হাদীসের ব্যাখায় মুবারকপুরী (রহ,) তুহফাতুল আহওয়াহি গ্রন্থে বলেন, সুন্দর্য্যতা, পোশাক-আশাক, খেযাব, আওয়াজ, আকৃতি, কথাবার্তা, সহ সমস্ত নড়াচড়া ও উঠাবসায় পুরুষের জন্য মহিলার সাদৃশ্য গ্রহণ হারাম ও নাজায়েয। এবং হাদীসে সাদৃশ্য দ্বারা এই সর্বপ্রকার সাদৃশ্যই ধর্তব্য।(ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১৪৮০৫৯)।
.
এমনকি সালাতে ও পুরুষ তাদের চুল বেঁধে রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। সাঈদ ইবনু আবু সাঈদ আল-মাক্ববুরী থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুক্তদাস আবু রাফি‘কে হাসান ইবনু ‘আলী (রাঃ) এর পাশ দিয়ে যেতে দেখলেন। তখন তিনি [হাসান ইবনু ‘আলী (রাঃ)] গর্দানের পেছনে চুলের ঝুটি বেঁধে সলাত আদায় করছিলেন। আবূ রাফি’ (রাঃ) বাঁধন খুলে দিলে হাসান (রাঃ) তার প্রতি রাগের দৃষ্টিতে তাকালেন। আবূ রাফি বলেন, আগে সালাত আদায় শেষ করুন, রাগ করবেন না। কেননা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ এটা (চুলের ঝুটি) হচ্ছে শয়তানের ঘাঁটি বিশেষ, অর্থাৎ শয়তানের আড্ডাখানা। (সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং-৬৪৬)।
.
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীসের শেষাংশে বলা হয়েছে যে, وَلاَ نَكْفِتَ الثِّيَابَ وَالشَّعَرَ ‘এবং আমরা যেন সিজদাকালে আমাদের কাপড় ও চুল গুটিয়ে না নেই।’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা৮৮৭; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৮২৭ ‘সিজদা ও তার মাহাত্ম্য’ অনুচ্ছেদ; নায়লুল আওত্বার ৩/২২ পৃঃ)। উক্ত বিষয়টি পুরুষের জন্য খাছ,মহিলাদের জন্য নয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এই নিষেধাজ্ঞা না জানার কারণে অনেক পুরুষ মুসল্লী সালাতের সময়ে তাদের মাথার চুল বেঁধে নিতেন। একদা ইবনু আব্বাস (রাঃ) জনৈক বদরী সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনুল হারিছ (রাঃ) এর চুল খুলে দেন। (ইবনু মাজাহ, আবুদাঊদ, তিরমিযী, নায়লুল আওত্বার ৩/২৩৫ সহীহ ইবনু মাজাহ হা/৮৬১ সহীহ আবুদাঊদ হা/৬৪৬)। ইমাম শাওকানী উপরোক্ত হাদীস দু’টির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন,والحديثان يدلان علي كراهية صلاة الرجل وهو معقوص الشعر ‘হাদীস দু’টি পুরুষের জন্য চুল বাঁধা অবস্থায় সালাত আদায় করা মাকরূহ সাব্যস্ত করে। হাফেয ইরাকী বলেন, এটি পুরুষের জন্য খাছ, মেয়েদের জন্য নয়। কেননা তাদের চুলও সতরের অন্তর্ভুক্ত, যা সালাত অবস্থায় ঢেকে রাখা ওয়াজিব।
.
পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিষ্কার যে, চুল বড়-ছোট উভয় পদ্ধতিতেই রাখা জায়েজ। তবে সুন্দরভাবে রাখতে হবে এবং নিয়মিত চুলের পরিচর্যা করতে হবে। রাসূল (ﷺ) বলেন,‘যে ব্যক্তির চুল আছে, সে যেন তার যত্ন করে রাখে।’ (আবুদাউদ হা/৪১৬৩; মিশকাত হা/৪৪৫০; সহীহাহ হা/৫০০)।কোন অবস্থাতেই বেহায়াপনা করা যাবে না এবং অন্যদের অনুসরণ করা যাবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যারা অন্যদের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে,তারা তাদের মধ্যেই গণ্য হবে।’ (আবুদাঊদ হা/৪০৩১; মিশকাত হা/৪৩৪৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
________________________
উপস্থাপনায়,
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

নিজের চাচী-মামী বা দূর সম্পর্কের চাচী-মামী (আন্টি) কে বিয়ে করা যাবে কি

 প্রশ্ন: নিজের চাচী-মামী বা দূর সম্পর্কের চাচী-মামী (আন্টি) কে বিয়ে করা যাবে কি?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: আপন চাচার স্ত্রী (চাচী) এবং মামার স্ত্রী (মামী) আপনার জন্য মাহরাম নয়। অর্থাৎ চাচা/মামা যদি মারা যায় বা তাদেরকে তালাক দেয় তাহলে উক্ত চাচী/মামীকে বিয়ে করা জায়েজ। সুতরাং সর্বাবস্থায় চাচী ও মামী সাথে পর্দা রক্ষা করা ফরজ। আর দূর সম্পর্কের চাচী/মামী তো প্রশ্নাতীত ভাবেই মাহরাম নয়। কারণ এরা কেউই সুরা নিসা এর ২৩ নম্বর আয়াতে বর্ণিত যে সকল মহিলাদেরকে বিয়ে করা হারাম তাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং তাদেরকে শরিয়ত সম্মত পদ্ধতিতে বিয়ে করতে কোন বাধা নেই।

সুতরাং আপনার আপন চাচী, মামী বা দূর সম্পর্কীয় আন্টিকে যদি তার স্বামী তালাক দেয় অথবা তার স্বামী মারা যায় তাহলে আপনি চাইলে তাকে ইদ্দত পালনের পর ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক বিয়ে করতে পারেন। আল্লাহু আলম।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

বিবাহ করা সুন্নাত না ফরয এবং কেউ জীবনে বিবাহ না করার সিদ্ধান্ত নিলে কি গুনাহ হবে

 প্রশ্ন: বিবাহ করা সুন্নাত না ফরয? কেউ জীবনে বিবাহ না করার সিদ্ধান্ত নিলে কি গুনাহ হবে?

▬▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: ব্যক্তির অবস্থার আলোক বিয়ে করার বিধান ভিন্ন ভিন্ন হয়। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একই কথা। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে যার শক্তি-সামর্থ্য রয়েছে এবং নিজেকে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে নিরাপদ রাখার ক্ষমতা আছে, স্বাভাবিক ভাবে তার জন্য বিবাহ করা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, হে যুব সম্প্রদায়!তোমাদের মধ্যে যে বিবাহ করতে সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কারণ এটা তার দৃষ্টিকে অবনমিত রাখে,লজ্জাস্থানকে হেফাযত করে। যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে না তার উপর সিয়াম পালন করা কর্তব্য। কারণ এটা তার জন্য ঢালস্বরূপ। (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত হা/৩০৮০)। তবে একাকী জীবন-যাপনের চেয়ে বিবাহ করা উত্তম। কেননা ইসলামে সন্ন্যাসব্রত বা বৈরাগ্য নেই। (তিরমিজি ফিকহুস সুন্নাহ ৩/১৩০)। সুতরাং বিবাহ করা সুন্নাহ হলেও ক্ষেত্রবিশেষে কখনো বিবাহ করা ফরয আবার কখনো হারামও হতে পারে।যার অশ্লীল কর্মে লিপ্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে এবং যার শারীরিক শক্তিমত্তা, সক্ষমতা ও আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে এবং যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ ও পদস্খলনের আশংকা করে,তার জন্য বিবাহ করা ফরজ। (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা ১৮/ ৬)আল্লাহ বলেন, وَلْيَسْتَعْفِفِ الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحاً حَتَّى يُغْنِيَهُمْ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ ‘যাদের বিবাহের সামর্থ্য নেই,আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে।’ (সূরা নূর ২৪/৩৩)। কেননা আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং হারাম থেকে মুক্ত থাকা ওয়াজিব, যা বিবাহ ব্যতীত সম্ভব নয়।’ (সূরা নূর ৩৩)। আবার যার দৈহিক মিলনের সক্ষমতা ও স্ত্রীর ভরণ-পোষণের সামর্থ্য নেই তার জন্য বিবাহ করা হারাম। (ফিক্বহুস সুন্নাহ ৩/১৩১)। অনুরূপভাবে যিনি যুদ্ধের ময়দানে বা কাফির-মুশরিক দেশে যুদ্ধরত থাকেন তার জন্য বিবাহ হারাম। কেননা সেখানে তার পরিবারের নিরাপত্তা থাকে না। তদ্রূপ কোন ব্যক্তির স্ত্রী থাকলে এবং অন্য স্ত্রীর মাঝে ইনসাফ করতে না পারার আশংকা করলে দ্বিতীয় বিবাহ করা হারাম। যেমন আল্লাহ বলেন, فَإِنْ خِفْتُمْ أَلاَّ تَعْدِلُواْ فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ‘আর যদি আশংকা কর যে,সুবিচার করতে পারবে না তবে একজনকে অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীকে।’ (নিসা ৪/৩)। [ইবনে উসাইমিন রহঃ শরহুল মুমতে,১২/৯]।

◾কেউ জীবনে বিবাহ না করার সিদ্ধান্ত নিলে কি গুনাহ হবে?
___________________________________
কোন নারী-পুরুষের জন্য সারাজীবন বিবাহ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া শরীয়ত সম্মত নয়। কেননা বিবাহ ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধান। বিবাহ করা সমস্ত নবীদের সুন্নাহ এমনকি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে একাধিক বিয়ে করেছেন এবং তার উম্মতকে বিবাহ করতে উৎসাহিত করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন,তোমার পূর্বে আমরা অনেক রাসূল প্রেরণ করেছিলাম এবং তাদেরকে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দিয়েছিলাম।’ (সূরা রা‘দ ১৩/৩৮)। রাসূল ( ﷺ)-এর স্ত্রীদের নিকট আগত তিন ব্যক্তির এক ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত করার স্বার্থে বিবাহ না করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাসূল (ﷺ) বলেছেন, وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِىْ فَلَيْسَ مِنِّىْ ‘আমি নারীদেরকে বিবাহ করি (সুতরাং বিবাহ করা আমার সুন্নাত)। অতএব যে আমার সুন্নাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (বুখারী হা/৫০৬৩; মসুলিম হা/১৪০১; মিশকাত হা/১৪৫)। তাছাড়া বিবাহ না করে চিরকুমার ও নিঃসঙ্গ জীবন যাপনের অনুমতি ইসলামে নেই। সা‘আদ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) বলেন, রাসূল (ﷺ) উসমান ইবনু মাযঊনকে নিঃসঙ্গ জীবন যাপনের অনুমতি দেননি। তাকে অনুমতি দিলে আমরা নির্বীর্য হয়ে যেতাম।’ (বুখারী হা/৫০৭৩; মুসলিম, মিশকাত হা/৩০৮১)। আয়েশা (রাঃ) বলেন,‘নিশ্চয়ই রাসূল (ﷺ) নিঃসঙ্গ জীবন যাপনকে নিষেধ করেছেন।’ (সহীহ বুখারী হা/৫০৭৩; নাসাঈ হা/৩২১৩; মিশকাত হা/৩০৮১)।তাই কোন নারী-পুরুষ সার্বিক দিক থেকে সমর্থ হওয়া সত্ত্বেও রাসূল (ﷺ) এর সুন্নাতের প্রতি অনীহা ও অবহেলার কারণে বিয়ে পরিত্যাগ করে, তাহলে সে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ বা তরীকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কবিরা গুনাহগার হবে। (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৪৫)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সামর্থ্যবানদেরকে বিয়ে করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। (বুখারী, মিশকাত হা/৩০৮০)।
.
কিন্তু কোন নারী-পুরুষের যদি বিবাহ করার ইচ্ছা থাকা এবং সাধ্য অনুযায়ী সর্বদিক থেকে প্রচেষ্টা করা সত্বেও কোন কারণে বিয়ে করতে ব্যর্থ হয় বা বিশেষ কোন ওজর বা শারীরিক সমস্যার কারণে বিবাহ করতে না পারে তাহলে এতে তাদের কোন গুনাহ হবেনা ইনশাআল্লাহ।কারন, বিয়ে করার ক্ষেত্রে তার পক্ষ থেকে চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। আর আল্লাহ অন্তরের খবর জানেন। সে চেষ্টা করেছে তার চেষ্টা করার পরেও সম্ভব হয়নি। মহান আল্লাহ বলেন-আল্লাহ কারো উপর সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেন না। (সূরা বাকারা,২৮৬)। তিনি আরো বলেন, তুমি তোমার সাধ্য অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় কর।(সূরা তাগাবুন: ১৬)।
.
পরিশেষে, মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করার সাথে সাথে তার জীবন ধারণের জন্য কিছু চাহিদা দিয়েছেন এবং চাহিদা মিটানোর পদ্ধতিও বলে দিয়েছেন। মানব জীবনে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ন্যায় জৈবিক চাহিদাও গুরুত্বপূর্ণ। এই চাহিদা পূরণের জন্য ইসলাম বিবাহের বিধান দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদম (আঃ)-কে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন। পরবর্তী বংশ বৃদ্ধির জন্য হাওয়া (আঃ)-কে সৃষ্টি করে আদম (আঃ) এর সাথে বিবাহের ব্যবস্থা করেন। মানব জীবন প্রণালী পরিবর্তনের সাথে সাথে বিবাহের নিয়মেও পরিবর্তন ঘটেছে। অবশেষে শেষ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) জাহেলী যুগের সকল কুসংস্কার দূর করে নারীদেরকে বিবাহের মাধ্যমে মর্যাদা দান করেছেন। বিবাহ মানব বংশ রক্ষার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি চিরন্তন ব্যবস্থা। বিবাহ নবীগণের সুন্নাত। বিবাহ করার জন্য পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা নিসা: ৩, সূরা নূর: ৩২)। তাই ইসলামের বিধান এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত পালনের উদ্দেশ্যে বিয়ের চেষ্টা অব্যহত রাখা কতর্ব্য। আল্লাহ আমাদেরকে সাহায্য করুক। আমীন। আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী।
____________________
উপস্থাপনায়,
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

ইমাম ও মুক্তাদীর দাঁড়াবার স্থান ও নিয়ম এবং মুক্তাদীর সংখ্যা হিসাবে ইমাম ও মুক্তাদীর দাঁড়ানোর সঠিক পদ্ধতি

 প্রশ্ন: ইমাম ও মুক্তাদীর দাঁড়াবার স্থান ও নিয়ম এবং মুক্তাদীর সংখ্যা হিসাবে ইমাম ও মুক্তাদীর দাঁড়ানোর সঠিক পদ্ধতি কি?

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: মহান আল্লাহ তা‘আলা মানবজাতিকে একমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন (সূরা যারিয়াত: ৫৬) সুতরাং মানুষের কর্তব্য হ’ল ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য হাছিলের চেষ্টা করা। আর সালাত আল্লাহর নৈকট্য লাভের সবচেয়ে বড় মাধ্যম এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ বলেন, তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং রুকূকারীদের সাথে রুকূ‘ কর’ (সূরা বাক্বারাহ ২/৪৩)। অর্থাৎ জামা‘আতে সালাত আদায় কর। রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা বলেন,বান্দা যে সকল ইবাদত পালনের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করে তন্মধ্যে ফরয ইবাদত আমার নিকট অধিক প্রিয়’ (সহীহ বুখারী হা/৬৫০২; মিশকাত হা/২২৬৬)।

জামা‘আতে সালাত আদায় করার সময় কাতারে কেউ আগে-পিছে সরে থাকলে তাকে বরাবর হতে বলা, এমন কি নিজে কাছে গিয়ে কাতার সোজা করা ইমামের কর্তব্য। আর যতক্ষণ পর্যন্ত না কাতার পূর্ণ রুপে সোজা হয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত নামায শুরু করা উচিৎ নয়। (আলমুমতে’,শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৩/১৬)।ইমাম ছাড়া কম পক্ষে একজন নামাযী হলে জামাআত গঠিত হবে; চাহে সে নামাযী জ্ঞানসম্পন্ন শিশু হোক অথবা মহিলা।মহানবী (ﷺ) ইবনে আব্বাসকে নিয়ে জামাআত করে (তাহাজ্জুদ) নামায পড়েছেন।তিনি সফরে উদ্যত দুইজন লোককে বলেছিলেন, “নামাযের সময় উপস্থিত হলে তোমাদের একজন আযান দেবে এবং তোমাদের মধ্যে যে বড় সে ইমামতি করবে।” (সহীহ বুখারী ৬৩০)।

◾মুক্তাদীর সংখ্যা হিসাবে ইমাম ও মুক্তাদীর দাঁড়ানোর সঠিক পদ্ধতি হল:
_______________________________________
(১)। ইমামের সাথে মাত্র একজন মুক্তাদী (পুরুষ বা শিশু) হলে উভয়ে একই সাথে সমানভাবে দাঁড়াবে; ইমাম বাঁয়ে এবং মুক্তাদী হবে ডানে। এ ক্ষেত্রে ইমাম একটু আগে এবং মুক্তাদী একটু পিছনে আগাপিছা হয়ে দাঁড়াবে না। ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে মহানবী (ﷺ) নিজের বরাবর দাঁড় করিয়েছিলেন। (সহীহ বুখারী ৬৯৭)। মৃত্যুরোগের সময় তিনি আবু বাক্‌র (রাঃ)-এর বাম পাশে তাঁর বরাবর এসে বসেছিলেন। (সহীহ বুখারী, ১৯৮) নাফে বলেন, একদা আমি কোন নামাযে আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাঃ)-এর পিছনে দাঁড়ালাম,আর আমি ছাড়া তাঁর সাথে অন্য কেউ ছিল না। তিনি আমাকে তাঁর হাত দ্বারা তাঁর পাশাপাশি বরাবর করে দাঁড় করালেন।’ (মালেক, মুঅত্তা ১/১৫৪)। অনুরুপ বর্ণিত আছে হযরত উমার (রাঃ) কর্তৃকও। এ জন্যই ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে উক্ত বিষয়ক পরিচ্ছেদ বাঁধার সময় বলেন, ‘দুজন হলে (মুক্তাদী) ইমামের পাশাপাশি তার বরাবর ডান দিকে দাঁড়াবে।’ (সহীহ বুখারী ৬৯৭, সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ২৫৯০ নং, ৬/১৭৫-১৭৬) জ্ঞাতব্য যে, একক মুক্তাদীর ইমামের ডানে দাঁড়ানো সুন্নত বা মুস্তাহাব। অর্থাৎ যদি কেউ ইমামের বামে দাঁড়িয়ে নামায শেষ করে,তাহলে ইমাম-মুক্তাদী কারো নামাযের কোন ক্ষতি হবে না। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৩৭৫, সালাতুল জামাআতি হুকমুহা অআহকামুহা, ডক্টর সালেহ সাদলান ১১১পৃ:)।

(২)। মুক্তাদী ২ জন বা তার বেশী (পুরুষ) হলে ইমামের পশ্চাতে কাতার বাঁধবে।জাবের (রাঃ) বলেন, একদা মহানবী (ﷺ) মাগরিবের নামায পড়ার জন্য দাঁড়ালেন। এই সময় আমি এসে তাঁর বাম দিকে দাঁড়ালাম। তিনি আমার হাত ধরে ঘুরিয়ে তাঁর ডান দিকে দাঁড় করালেন। ইতিমধ্যে জাব্বার বিন সাখার (রাঃ) এলেন। তিনি তাঁর বাম দিকে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি আমাদের উভয়ের হাত ধরে ধাক্কা দিয়ে তাঁর পশ্চাতে দাঁড় করিয়ে দিলেন।(সহীহ মুসলিম, আবূদাঊদ, সুনান, মিশকাত ১১০৭) উল্লেখ্য
যে,দুই জন মুক্তাদী যদি ইমামের ডানে-বামে দাঁড়িয়ে নামায পড়ে তাহলে নামাযের কোন ক্ষতি হবে না। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৩৭০)। নামায হয়ে যাবে, কারণ ইবনে মাসঊদ আলক্বামাহ্‌ ও আসওয়াদের মাঝে দাঁড়িয়ে ইমামতি করেছেন এবং তিনি নবী (ﷺ) কে ঐরুপ দাঁড়াতে দেখেছেন।(আবুদাঊদ, সুনান, ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ৫৩৮)। অবশ্য মহানবী (ﷺ) এর সাধারণ সুন্নাহ্‌ হল,তিন জন হলে একজন সামনে ইমাম এবং দুই জনের পিছনে কাতার বাঁধা। পক্ষান্তরে আগে-পিছে জায়গা না থাকলে তো এক সারিতে দাঁড়াতে বাধ্যই হবে।

(৩)। মুক্তাদী একজন মহিলা হলে (সে নিজের স্ত্রী হলেও) ইমাম (স্বামীর) পাশাপাশি বরাবর না দাঁড়িয়ে তার পিছনে দাঁড়াবে। (আদাবুয যিফাফ, আলবানী ৯৬পৃ: দ্র:)।

(৪)। মুক্তাদী দুই বা ততোধিক পুরুষ হলে এবং একজন মহিলা হলে, ইমামের পিছনে পুরুষরা কাতার বাঁধবে এবং মহিলা সবশেষে একা দাঁড়াবে। একদা হযরত আনাস (রাঃ)-এর ঘরে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইমামতি করেন। আনাস (রাঃ) ও তাঁর ঘরের এক এতীম দাঁড়ান নবী (ﷺ) এর পিছে এবং তাঁর আম্মা দাঁড়ান তাঁদের পিছে (একা)। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ১১০৮-১১০৯নং)

(৫)। মুক্তাদী একজন শিশু ও একজন বা একাধিক পুরুষ হলে শিশুও পুরুষদের কাতারে শামিল হয়ে দাঁড়াবে।

(৬)। মুক্তাদী দুই বা দুয়ের অধিক পুরুষ, শিশু ও মহিলা হলে, ইমামের পিছনে পুরুষরা, অতঃপর শিশুরা এবং সবশেষে মহিলারা কাতার বাঁধবে।মহানবী (ﷺ) বলেন, “পুরুষদের শ্রেষ্ঠ কাতার হল প্রথম কাতার এবং নিকৃষ্ট কাতার হল সর্বশেষ কাতার। আর মহিলাদের শ্রেষ্ঠ কাতার হল সর্বশেষ কাতার এবং নিকৃষ্ট কাতার হল প্রথম কাতার।” (মুসলিম, আহমাদ, মুসনাদ, সুনানু আরবাআহ (আবূ দাঊদ, তিরমিযী,ও ইবনে মাজাহ্‌ মিশকাত ১০৯২) প্রকাশ থাকে যে,শিশু ছেলেদের পৃথক কাতার করার কোন সহীহ দলীল নেই। তাই শিশু ছেলেরাও পুরুষদের সঙ্গে কাতার করতে পারে। (তামামুল মিন্নাহ্‌, আলবানী ২৮৪পৃ:)।

(৭)। ইমামের সামনে কাতার বেঁধে নামায হয় না। অবশ্য ভিড়ের সময় ইমামের সামনে ছাড়া কোন দিকে জায়গা না থাকলে নিরুপায় অবস্থায় নামায হয়ে যাবে (আলমুমতে’,শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৩৭২-৩৭৩) প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে, জুমুআহ ও ঈদের নামাযের জামাআতে যদি এত ভিঁড় হয় যে সিজদার জন্য জায়গা না পাওয়া যায়, তাহলে সামনের মুসল্লীর পিঠে সিজদা করে নামায সম্পন্ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জায়গা নেই বলে অপেক্ষা করে দ্বিতীয় জামাআত কায়েম করা যাবে না। একদা হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) খুতবায় বলেন,‘ভিঁড় বেশী হলে তোমাদের একজন যেন অপরজনের পিঠে সিজদা করে।’ (আহমাদ, মুসনাদ ১/৩২, বায়হাকী ৩/১৮২-১৮৩, আব্দুর রাযযাক, মুসান্নাফ ৫৪৬৫, ৫৪৬৯নং, তামামুল মিন্নাহ্‌, আলবানী ৩৪১পৃ:)।

(৮)। ইমামের নিকটবর্তী দাঁড়াবে জ্ঞানী লোকেরা। যাতে তাঁরা ইমামের কোন ভুল চট করে ধরে দিতে পারেন এবং ইমাম নামায পড়াতে পড়াতে কোন কারণে নামায ছাড়তে বাধ্য হলে তাঁদের কেউ জামাআতের বাকী কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। বলা বাহুল্য, সাধারণ মূর্খ মানুষদের ইমামের সরাসরি পশ্চাতে দাঁড়ানো উচিৎ নয়। জ্ঞানী (আলেম-হাফেয-ক্বারী) মানুষদের জন্য ইমামের পার্শ্ববর্তী জায়গা ছেড়ে রাখা উচিৎ।মহানবী (ﷺ) বলেন, “সেই লোকদেরকে আমার নিকটবর্তী দাঁড়ানো উচিৎ,যারা জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান লোক। অতঃপর তারা যারা তাদের চেয়ে কম জ্ঞানের। অতঃপর তারা যারা তাদের থেকে কম জ্ঞানের। আর তোমরা বাজারের ফালতু কথা (হৈচৈ) থেকে দূরে থাক।” (মুসলিম আবূদাঊদ, মিশকাত ১০৮৯)।

(৯)। সামনের কাতারে জায়গা থাকতে পিছনে একাকী দাঁড়িয়ে নামায পড়লে নামায হয় না।এক ব্যক্তি কাতারের পিছনে একা দাঁড়িয়ে নামায পড়লে মহানবী (ﷺ) তাকে নামায ফিরিয়ে পড়তে বললেন। (আবু দাঊদ, সুনান ৬৮২, তিরমিযী, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান)।তিনি বলেন,“যে ব্যক্তি কাতারের পিছে একা নামায পড়ে, সে যেন নামায ফিরিয়ে পড়ে।” (ইবনে হিব্বান,সহীহ) অতএব যদি কোন ব্যক্তি জামাআতে এসে দেখে যে, কাতার পরিপূর্ণ, তাহলে সে কাতারে কোথাও ফাঁক থাকলে সেখানে প্রবেশ করবে। নচেৎ সামান্যক্ষণ কারো অপেক্ষা করে কেউ এলে তার সঙ্গে কাতার বাঁধা উচিৎ। সে আশা না থাকলে বা জামাআত ছুটার ভয় থাকলে (মিহ্‌রাব ছাড়া বাইরে নামায পড়ার সময়) যদি ইমামের পাশে জায়গা থাকে এবং সেখানে যাওয়া সম্ভব হয়, তাহলে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াবে এবং এ সব উপায় থাকতে পিছনে একা দাঁড়াবে না। পরন্তু কাতার বাঁধার জন্য সামনের কাতার থেকে কাউকে টেনে নেওয়া ঠিক নয়। এ ব্যাপারে যে হাদীস এসেছে তা সহীহ ও শুদ্ধ নয়।(যইফ জামে ২২৬১নং)।তাছাড়া এ কাজে একাধিক ক্ষতিও রয়েছে। যেমন: যে মুসল্লীকে টানা হবে তার নামাযের একাগ্রতা নষ্ট হবে, প্রথম কাতারের ফযীলত থেকে বঞ্চিত হবে, কাতারের মাঝে ফাঁক হয়ে যাবে, সেই ফাঁক বন্ধ করার জন্য পাশের মুসল্লী সরে আসতে বাধ্য হবে, ফলে তার জায়গা ফাঁক হবে এবং শেষ পর্যন্ত প্রথম বা সামনের কাতারের ডান অথবা বাম দিককার সকল মুসল্লীকে নড়তে-সরতে হবে। আর এতে তাদের সকলের একাগ্রতা নষ্ট হবে। অবশ্য হাদীস সহীহ হলে এত ক্ষতি স্বীকার করতে বাধা ছিল না। তদনুরুপ ইমামের পাশে যেতেও যদি অনুরুপ ক্ষতির শিকার হতে হয়,তাহলে তাও করা যাবে না। ঠিক তদ্রুপই জায়গা না থাকলেও কাতারের মুসল্লীদেরকে এক এক করে ঠেলে অথবা সরে যেতে ইঙ্গিত করে জায়গা করে নেওয়াতেও ঐ মুসল্লীদের নামাযের একাগ্রতায় বড় ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। সুতরাং এ কাজও বৈধ নয়।

বলা বাহুল্য, এ ব্যাপারে সঠিক ফায়সালা এই যে, সামনে কাতারে জায়গা না পেলে পিছনে একা দাঁড়িয়েই নামায হয়ে যাবে। কারণ, সে নিরুপায়। আর মহান আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে ভার দেন না। (লিকাউবাবিল মাফতূহ্‌,ইবনে উষাইমীন ২২৭পৃ:) প্রকাশ থাকে যে, মহিলা জামাআতের মহিলা কাতারে জায়গা থাকতে যে মহিলা পিছনে একা দাঁড়িয়ে নামায পড়বে তারও নামায পুরুষের মতই হবে না।(আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৩৮৭)। পক্ষান্তরে পুরুষদের পিছনে একা দাঁড়িয়ে মহিলার নামায হয়ে যাবে।

(১০)। ইমাম মুক্তাদী থেকে উঁচু জায়গায় দাঁড়াতে পারে না। কারণ মহানবী (ﷺ) কর্তৃক এরুপ দাঁড়ানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।(আবুদাঊদ,সুনান ৬১০-৬১১, হাকেম, মুস্তাদরাক, মিশকাত ১৬৯২, জামে ৬৮৪২) একদা হুযাইফা (রাঃ) মাদায়েনে একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে লোকেদের ইমামতি করতে লাগলেন। তা দেখে আবু মাসঊদ (রাঃ) তাঁর জামা ধরে টেনে তাঁকে নিচে নামিয়ে দিলেন। নামাযের সালাম ফেরার পর তিনি হুযাইফাকে বললেন, ‘আপনি কি জানেন না যে, এরুপ দাঁড়ানো নিষিদ্ধ?’ তিনি বললেন ‘জী হ্যাঁ, যখনই আপনি আমাকে টান দিলেন, তখনই আমার মনে পড়ে গেল।’ (আবুদাঊদ, সুনান ৫৯৭ ইবনে হিব্বান, সহীহ)।

অবশ্য শিক্ষা দেওয়ার জন্য উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে নামায পড়ানো যায়। যেমন নবী মুবাশ্‌শির (ﷺ) মিম্বরের উপর খাড়া হয়ে নামায পড়ে সাহাবাদেরকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। (বুখারী ৩৭৭নং, মুসলিম, সহীহ)। আর এই হাদীসকে ভিত্তি করেই উলামাগণ বলেন, মিম্বরের এক সিড়ি পরিমাণ (প্রায় একহাত) মত উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে ইমামতি করলে দোষাবহ্‌ নয়।(মাজমূআতু রাসাইল ফিস স্বালাহ্‌ ১০০পৃ:, আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৪২৪-৪২৬) পক্ষান্তরে মুক্তাদী ইমাম থেকে উঁচু জায়গায় দাঁড়াতে পারে। হযরত আবু হুরাইরা নিচের ইমামের ইক্তেদা করে মসজিদের ছাদের উপর জামাআতেনামায পড়েছেন। (শাফেয়ী, বায়হাকী, বুখারী তা’লীক)।

(১১)। প্রথম কাতারে দাঁড়িয়ে নামায পড়ার পৃথক মাহাত্ম আছে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, “লোকেরা যদি আযান ও প্রথম কাতারে নিহিত মাহাত্ম জানত, তাহলে তা অর্জন করার জন্য লটারি করা ছাড়া আর অন্য কোন উপায় না পেলে তারা লটারিই করত।” (বুখারী ৬১৫নং, মুসলিম, সহীহ ৪৩৭নং)। তিনি বলেছেন, “অবশ্যই আল্লাহ প্রথম কাতার ও সামনের কাতারসমূহের প্রতি রহ্‌মত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ তাদের জন্য দুআ করে থাকেন।” (মুসনাদে আহমাদ, সহিহ তারগিব,৪৮৯)
একদা তিনি সাহাবাদেরকে পশ্চাদপদ হতে দেখে বললেন, তোমরা অগ্রসর হও এবং আমার অনুসরণ কর। আর তোমাদের পিছনের লোক তোমাদের অনুসরণ করুক। এক শ্রেণীর লোক পিছনে থাকতে চাইবে, ফলে আল্লাহ তাদেরকে (নিজ রহ্‌মত থেকে) পিছনে ফেলে দেবেন।” (সহীহ মুসলিম, মিশকাত ১০৯০) আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, “কোন সম্প্রদায় প্রথম কাতার থেকে পিছনে সরে আসতে থাকলে অবশেষে আল্লাহ তাদেরকে জাহান্নামে পশ্চাদ্ববর্তী করে দেবেন।” অর্থাৎ জাহান্নামে আটকে রেখে সবার শেষে জান্নাত যেতে দেবেন, আর সে প্রথম দিকে জান্নাত যেতে পারবে না।(আউনুল মা’বূদ ২/২৬৪নং, আবূ দাউদ, ইবনে খুযাইমাহ্‌, ইবনে হিব্বান, সহীহ তারগীব ৫০৭)

(১২)। প্রথম কাতারে ডান দিকের জায়গা অপেক্ষাকৃত উত্তম। সাহাবী বারা বিন আযেব বলেন, ‘আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর ডান দিকে দাঁড়াবার চেষ্টা করতাম। যাতে তিনি আমাদের দিকে মুখ করে ফিরে বসেন।’ (মুসলিম, সহীহ ৭০৯, আবূদাঊদ, সুনান ৬১৫নং)।

(১৩)। ইমামের ডানে-বামে লোক যেন সমান-সমান হয়। অতএব কাতার বাঁধার সময় তা খেয়াল রাখা সুন্নত। যেহেতু ২ জন মুক্তাদী হলে এবং আগে-পিছে জায়গা না থাকলে একজন ইমামের ডানে ও অপরজন বামে দাঁড়াতে হয়। তাছাড়া ইমামের কাছাকাছি দাঁড়ানোরও ফযীলত আছে। সুতরাং সাধারণভাবে ইমামের ডান দিকে দাঁড়ানো উত্তম নয়। যেমন ইমামের বাম দিকে লোক কম থাকলে ডান দিকে দাঁড়ানো থেকে বাম দিকে দাঁড়ানো উত্তম। কারণ তখন বাম দিকটা ইমামের অধিক কাছাকাছি। পক্ষান্তরে ডানে-বামে যদি লোক সমান সমান থাকে,তাহলে বামের থেকে ডান দিক অবশ্যই উত্তম। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৩/১৯)।

(১৪)। (বিরল মাসআলায়) যদি কোন স্থান-কালে কোন জামাআতের দেহে সতর ঢাকার মত লেবাস না থাকে তাহলে ইমাম সামনে না দাঁড়িয়ে কাতারের মাঝে দাঁড়াবে। অবশ্য ঘন অন্ধকার অথবা মুক্তাদীরা অন্ধ হলে বিবস্ত্র ইমাম সামনে দাঁড়াবে। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৩৮৯) নোট সালাতে মুবাশ্বির আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
___________________________
উপস্থাপনায়,
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Translate