Friday, April 22, 2022

পহেলা বৈশাখ পালনের বিধান এবং এ উপলক্ষে সরকারী নির্দেশে আমাদের করণীয়

 প্রশ্ন: ‘পহেলা বৈশাখ’ উপলক্ষে পান্তা-ইলিশ খাওয়া যাবে কি? বর্তমান সরকার এ উৎসব উপলক্ষে ছাত্র/ছাত্রী ও শিক্ষকদেরকে স্কুল-কলেজে উপস্থিত থাকা ও তা পালন করা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী?

উত্তর:
ইসলামে মুসলিমদের জন্য দুটি জাতীয় উৎসবের দিন নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। একটি হল, ঈদুল আজহা অপরটি হল, ঈদুল ফিতর। এ দুটি ছাড়া মুসলিমদের জন্য ৩য় কোন আনন্দ-উৎসব জাতীয়ভাবে উদযাপন করার সুযোগ নেই।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় আগমন করে দেখলেন, মদিনা বাসী খেলা-ধুলার মধ্য দিয়ে দুটি দিবস উদযাপন করে থাকে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ দুটি দিবস কী?

তারা বলল, এ দুটি দিবস জাহেলি যুগে আমরা খেলা-ধুলার মধ্য দিয়ে উদযাপন করতাম। তিনি বললেন,
إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا يَوْمَ الْأَضْحَى وَيَوْمَ الْفِطْرِ
“আল্লাহ তোমাদের জন্য এর থেকে উত্তম দুটি দিবসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। একটি হল, ঈদুল আজহা এবং অপরটি হল, ঈদুল ফিতর।” [সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ৯৫৯ সনদ-সহীহ, আলবানি]
উপরোক্ত হাদিস থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, ইসলামি শরিয়তে ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর ব্যতিরেকে জাতীয়ভাবে তৃতীয় কোন ঈদ বা উৎসব পালনের সুযোগ নেই। অথচ দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, আমাদের মুসলিম সমাজে বর্তমানে কত ধরণের ঈদ-উৎসব জমজমাট ভাবে পালন করা হচ্ছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। যেমন: ঈদে মিলাদুন নবী বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্ম উৎসব। বরং এটাকে ‘সকল ঈদের শ্রেষ্ঠ ঈদ’ বলে জোরেশোরে প্রচার করা হচ্ছে। যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদিসের সুস্পষ্ট বিরোধী। অনুরূপভাবে তথাকথিত পহেলা বৈশাখ, খৃষ্ট নববর্ষ, এপ্রিল ফুল, বড় দিন (Xmas Day) ইত্যাদি অগণিত উৎসব আমদের মুসলিমগণ অবলীলায় পালন করে যাচ্ছে কিন্তু একবারও চিন্তা করে দেখে না যে, আসলে এগুলোর উৎস কোথায়? এসব মূলত: হিন্দু ও খৃষ্টানদের থেকে আমদানিকৃত সংস্কৃতি যার সাথে মুসলমানের কোন সম্পর্ক থাকতে পারে না।

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-বলে গেছেন,
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
“যে ব্যক্তি অন্য কোন জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করল সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” [আবু দাউদ হাদিস নং ৩৫১২, সনদ-সহীহ, আলবানী]
সুতরাং আমাদের সমাজে ইদানীং পহেলা বৈশাখ পালনের যে মহা আয়োজন দেখা যাচ্ছে এর সাথে মুসলিমদের কোন সম্পর্ক নেই। বরং এ সব অনুষ্ঠান উপলক্ষে যা কিছু দেখা যাচ্ছে সেগুলো অধিকাংশ হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির সাথে সংগতিপূর্ণ।

তাই এ উপলক্ষে কোন ধরণের অনুষ্ঠান করা, শুভেচ্ছা বিনিময় করা, কথিত প্রভাত ফেরী ও মঙ্গল শোভা যাত্রায় অংশ গ্রহণ করা, পণ্যটা-ইলিশ খাওয়া এ সব জাহেলিয়াত পূর্ণ কাজ। এগুলোতে কোন মুসলিম সন্তানের অংশ গ্রহণ করা বৈধ নয়।

সরকার যদি অন্যায় ভাবে মুসলিমদের উপর কোন অনৈসলামিক অনুষ্ঠান চাপিয়ে দেয় তাহলে তা মান্য করা যাবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
“স্রষ্টার অবাধ্যতায় সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না।” [মুসনাদ আহমদ-সহীহ] বরং আইন সঙ্গত পন্থায় তার প্রতিবাদ করতে হবে। কিন্তু যদি প্রতিবাদ করার ক্ষমতা না থাকে বা অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ না করলে জান-মালের ক্ষতির আশংকা থাকে তাহলে ঘৃণা সহকারে তাতে অংশ গ্রহণ করা যাবে। এটুকু হল ঈমানের সর্ব নিম্ন আলামত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহীহ হাদিসে বলেছেন,
«مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ»
“তোমাদের মধ্যে যে অন্যায় দেখবে সে যেন তা তার হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর যদি হাত দিয়ে বাধা না দিতে পারে তবে যেন মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর যদি মুখ দিয়ে বাধা না দিতে পারে তবে যেন অন্তর দিয়ে বাধা দেয়, আর এটি হলো দুর্বল ঈমানের পরিচয়।” [সহিহ মুসলিম, হা/৪৯]
আল্লাহ আমাদেরকে সব ধরণের বিজাতীয় সংস্কৃতি ও অন্ধ অনুকরণ থেকে রক্ষা করুন। আমীন।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

সহবাসের সময় আজান হলে কী করণীয়?

 প্রশ্ন: সহবাসের সময় আজান হলে কী করণীয়?

উত্তর:
স্ত্রী সহবাসের সময় আজান শুনলে স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করবে। তবে এ সময় মুখে উচ্চারণ করে আজানের জবাব দেয়া সমীচীন নয়।
ইমাম নওবি রহ. বলেন,
ويكره للقاعد على قضاء الحاجة أن يذكر الله تعالى بشيء من الاذكار فلا يسبح ولا يهلل ولا يرد السلام ولا يشمت العاطس ولا يحمد الله تعالى اذا عطس ولا يقول مثل ما يقول المؤذن. قالوا وكذلك لا يأتي بشيء من هذه الأذكار في حال الجماع، وإذا عطس في هذه الاحوال يحمد الله تعالى في نفسه ولا يحرك به لسانه. وهذا الذي ذكرناه من كراهة الذكر في حال البول والجماع هو كراهة تنزيه لا تحريم فلا إثم على فاعله. انتهى.
“প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য বসা অবস্থায় সময় কোনও প্রকার আল্লাহর জিকর-আজকার করা মাকরুহ (অ পছন্দনীয়)। সুতরাং এ সময় মুখে উচ্চারণ করে ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (ইত্যাদি জিকির-আজকার) পাঠ করা, সালামের জবাব দেয়া, হাঁচির জবাব দেয়া, হাঁচি দিলে আল হামদুলিল্লাহ পাঠ করা এবং মুয়াজ্জিনের আজানের জবাব দেয়া যাবে না। এ অবস্থায় হাঁচি দিলে মনে মনে আল হামদুলিল্লাহ পাঠ করবে। জিহ্বা নাড়িয়ে উচ্চারণ করবে না।
উল্লেখিত বিষয়গুলো পেশাব-পায়খানা এবং স্ত্রী সহবাস রত অবস্থায় করা মাকরুহ তানযিহি; তাহরিমি নয়। সুতরাং কেউ তা করলেও গুনাহ হবে না।” (শরহে মুসলিম)
তবে রমজান মাসে ফজরের পূর্বে স্ত্রী সহবাস করার পর ফজরের আজান শুনার সাথে সাথে সহবাস থেকে বিরত হওয়া আবশ্যক। এর পরে সহবাস অব্যাহত রাখা জায়েজ নেই। অন্যথায় উক্ত রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং এ কারণে তওবা-ইস্তিগফারের পাশাপাশি কাফফারাও দিতে হবে।
তবে নফল রোজার ক্ষেত্রে স্ত্রী সহবাস বন্ধ করা আবশ্যক নয়। এ ক্ষেত্রে তা অব্যাহত রাখলে উক্ত রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। তবে সম্ভব হলে তা পরবর্তীতে কাজা করে নেয়া উত্তম। এতে কোনও কাফফারা নেই।

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

অমুসলিমদেরকে ইফতার বা সাধারণ খাবার খাওয়ানো যাবে কি

 প্রশ্ন : অমুসলিমদেরকে ইফতার বা সাধারণ খাবার খাওয়ানো যাবে কি?

উত্তর :
অমুসলিমদের সামনে ইসলামের উদারতা, সৌন্দর্য এবং মহানুভবতা প্রকাশ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি তাদের অন্তরকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার অন্যতম উপায়। সুতরাং ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে কোন অমুসলিমকে মুসলিমদের ইফতার খাওয়ার জন্য ডাকা জায়েজ রয়েছে। হতে পারে, এটি তার হেদায়েতের ওসিলা হয়ে যাবে।
অনুরূপভাবে যে কোন অভাবী বা নি:স্বকে খাদ্য খাওয়ানো বিরাট সওয়াবের কাজ। এ বিষয়ে কুরআন-হাদিসে বহু বক্তব্য এসেছে। তাই কোন গরিব-অসহায় কাফিরকে যদি ইফতারের খাবার দেওয়া হয় তাতেও সওয়াব রয়েছে ইনশাআল্লাহ যদি সে মুহারিব তথা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ লিপ্ত না হয়। তবে শর্ত হল তার সাথে আন্তরিক ভালবাসা পূর্ণ সম্পর্ক রাখা চলবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَّا يَنْهَاكُمُ اللَّـهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ ۚ إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
“দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে নি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করে নি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে ভালবাসেন।” (সূরা মুমতাহিনাহ: ৮)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِم بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُم مِّنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ ۙ أَن تُؤْمِنُوا بِاللَّـهِ رَبِّكُمْ
“হে মুমিনগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তারা যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তা অস্বীকার করছে। তারা রসূলকে ও তোমাদেরকে বহিষ্কার করে এই অপরাধে যে, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখ।” (সূরা মুমতাহিনাহ: ১)

মোটকথা, ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে কাফিরদেরকে ইফতার খাওয়ানো জায়েজ।
অনুরূপভাবে যে কোন অভাবী, গরিব-অসহায় মানুষকে-চাই সে মুসলিম হোক বা কাফির হোক- খাদ্যদানে সওয়াব রয়েছে।
তবে যদি কোন কাফির মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ লিপ্ত হয় বা ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে বা অভাবী না হয় তাহলে তাদেরকে ইফতার খাওয়ার জন্য ডাকা ঠিক নয়। বরং সে ক্ষেত্রে মুসলিম, দ্বীনদার ও নিকটাত্মীয়রা এই খাদ্য খাওয়ার বেশি হকদার। আল্লাহু আলাম।
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
(মদিনা ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব)
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সউদী আরব।।

Monday, April 11, 2022

মানুষের কষ্টদায়ক আচরণে ধৈর্য ধারণের ফযিলত এবং হিংসা-বিদ্বেষ ও রাগ সংবরণের উপায়

 প্রশ্ন: আমি যদি কারো ব্যবহারে কস্ট পাই বা কারো উপর বিরক্ত হই কিন্ত মুখে কিছু না বলি বা অন্তরে ও প্রতিশোধ নেয়ার ইচ্ছা না রাখি শুধু মনের মধ্যে কস্ট টা অনিচ্ছা সত্তেও থেকে যায়। এটা কি কারো জন্য মনে বিদ্বেষ রাখা হবে?

আসলে মনে বিদ্বেষ রাখা বলতে কি বুঝায়? এবং মনকে বিদ্বেষ মুক্ত রাখার জন্য আমাদের কী করা উচিৎ?
উত্তর:
আপনি যদি কারও আচরণে কষ্ট পান বা বিরক্ত হন আর তার প্রতিশোধ গ্রহণ না করে ধৈর্যের পরিচয় দেন এবং তার সাথে চলাফেরা অব্যহত রাখেন (যদিও মনে কষ্ট বিদ্যমান থাকে) তবে এতে গুনাহ হবে না এবং এটিকে ‘বিদ্বেষ’ও বলা যাবে না বরং এটি উন্নত চরিত্রের বর্হি:প্রকাশ।
প্রখ্যাত সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন:
(الْمُؤْمِنُ الَّذِي يُخَالِطُ النَّاسَ، وَيَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُمْ، خَيْرٌ مِنَ الَّذِي لا يُخَالِطُ النَّاسَ، وَلا يَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُمْ))

“যে ঈমানদার ব্যক্তি মানুষের সাথে মেলামেশা করে এবং তারা কষ্ট দিলে সবর করে ঐ ব্যক্তি থেকে উত্তম যে মানুষের সাথে মেলামেশা করে না এবং তাদের কষ্টদায়ক আচরণে ধৈর্য ধারণ করে না।”* (ইবনে মাজাহ ও তিরমিযী-সনদ হাসান)

❍ ❍ বিদ্বেষ অর্থ: ঈর্ষা, হিংসা, শত্রুতা-যেটা ভালোবাসার বিপরীত
কারও প্রতি রাগ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই রাগকে দমন করাই বিরত্বের পরিচায়ক।
পক্ষান্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ছাড়া কারও প্রতি হিংসা রাখা বা শত্রুতা ঠিক নয়। যে ব্যক্তি কেবল আল্লাহর জন্য কাউকে ভালবাসে আর আল্লাহর জন্যই কারো প্রতি শত্রুতা পোষণ করে হাদীসে তার বিশেষ মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে। যেমন:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ ) বলেন,
إِنَّ اللَّهَ يَقُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَيْنَ الْمُتَحَابُّونَ بِجَلَالِي الْيَوْمَ أُظِلُّهُمْ فِي ظِلِّي يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلِّي
‘‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, আমার মহত্ত্বের নিমিত্তে পরস্পর ভালবাসার সম্পর্ক স্থাপনকারীরা কোথায় ? আজ আমি তাদেরকে আমার বিশেষ ছায়ায় ছায়া দান করব। আজ এমন দিন, যে দিন আমার ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া নেই।’’
(মুসলিম, কিতাবুল বিররি ওয়াস-সিলাহ, হাদিস নং৪৬৫৫)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِنَّ أَحَبَّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ الْحُبُّ فِي اللَّهِ وَالْبُغْضُ فِي اللَّهِ

‘‘নিশ্চয় আল্লাহর নিকট শ্রেষ্ঠ আমল হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে ভালবাসা এবং শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কারো সাথে শত্রুতা রাখা।’’
(আহমদ, মুসনাদুল আনসার, হাদিস নং২০৩৪১)

✳ মনকে হিংসা ও বিদ্বেষ মুক্ত রাখার কতিপয় উপায়:
১) আল্লাহর নিকট দুআ করা
২) এ কথা মনে রাখা যে, যে ব্যক্তি হিংসা বা বিদ্বেষ করবে সে নিজেই নিজের ক্ষতি করবে।
৩) যার প্রতি হিংসা সৃষ্টি হবে, তার বরকতের জন্য আল্লাহর নিকট দুআ করা।
৪) এ কথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস রাখা যে, হিংসা দ্বারা কারও ক্ষতি করা সম্ভব নয়। কারণ, ভালো-মন্দ সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। হিংসা দ্বারা কেউ কারও ক্ষতি করতে পারবে না।
৫) কারও ক্ষতি সাধনের ইচ্ছা জাগ্রত হলে এ চিন্তা করা যে, কারো ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকাও একটি সদকার সওয়াব। (বুখারী ও মুসলিম)

✳ ক্রোধ/রাগ সংবরণের উপায়:

আবু যার (রাঃ) বর্ণিত এক হাদীছে ক্রোধ সংবরণের কৌশল বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ ক্রদ্ধ হবে তখন দাঁড়িয়ে থাকলে সে যেন বসে যায়। এতেও যদি তার রাগ দূর না হয় তাহ’লে সে যেন শুয়ে পড়ে’। (আহমাদ, তিরমিযী, আবূদাঊদ হা/৪৭৮২, মিশকাত, হা/৫১১৪)
অন্য হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, وَإِذَا غَضِبْتَ فَاسْكُتْ. ‘যখন তুমি ক্রদ্ধ হবে তখন চুপ থাকবে’। (আল-আদাবুল মুফরাদ হা/১৩২০)
সুলায়মান ইবনু ছুরাদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী (ছাঃ)-এর সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলাম। তখন দু’জন লোক গালাগালি করছিল। তাদের একজনের চেহারা লাল হয়ে গিয়েছিল এবং তার রগগুলো ফুলে গিয়েছিল।
তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, আমি এমন একটি দো‘আ জানি, যদি এই লোকটি তা পড়ে তবে তার রাগ দূর হয়ে যাবে। সে যদি পড়ে ‘আ‘উযুবিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রজীম’- (‘আমি বিতাড়িত শয়তানের কাছ থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি’) তবে তার রাগ চলে যাবে। তখন লোকেরা তাকে বলল, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, তুমি আল্লাহর নিকট শয়তান থেকে আশ্রয় চাও। সে (রাগে) বলল, আমি কি পাগল হয়েছি’ । (বুখারী হা/৩২৮২ ‘সৃষ্টি সূচনা’ অধ্যায়; মুসলিম হা/২৬১০)
ক্রোধ সংবরণ করার ফযীলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‌ বলেন, ‘যে ব্যক্তি বাস্তবায়ন করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও রাগ চেপে রাখে, ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টজীবের সামনে তাকে আহবান করে যে কোন হূর নিজের জন্য পসন্দ করার অধিকার দিবেন’। (ইবনু মাজাহ হা/৪১৮৬; তিরমিযী হা/২০২১)
আল্লাহ আমাদের অন্তরকে ক্ষতিকারণ রাগ এবং সকল প্রকার হিংসা-বিদ্বেষ থেকে হেফাযত করুন। আমীন।।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

খিটখিটে মেজাজ সমাধানে কিছু পরামর্শ

 প্রশ্ন: আমার মেজাজ সব সময় অনেক খিটখিটে হয়ে থাকে। সব সময় কেমন জানি রাগ উঠেই থাকে। আমি অনেক চেষ্টা করি তবুও কন্ট্রোল করতে পারি না। মেজাজ খারাপ হয়ে থাকে সব সময়। আমি কী করলে আমার খিটখিটে মেজাজ ভালো হবে? প্লিজ দয়া করে উত্তর টা দিবেন।

উত্তর:
আমাদের জানা দরকার যে, বিভিন্ন কারণে মানুষের মন-মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। যেমন: রোগ-ব্যাধি, ঘুম কম হওয়া, পারিবারিক সমস্যা, কর্মস্থলে বা বন্ধু-বান্ধবের সাথে ঘটে যাওয়া অপ্রত্যাশিত কোনও ঘটনা, মানসিক চাপ, অস্থিরতা, অশান্তি, দুঃখ-কষ্ট, টেনশন, মহিলাদের পিরিয়ড কালীন সময় ইত্যাদি। সুতরাং কী কারণে আপনার এমনটি ঘটছে তা চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

যদি শারীরিক রোগ-ব্যাধির কারণে এমনটি ঘটে তাহলে অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন। আর যদি কোন কারণে অতিরিক্ত মানসিক চাপ অনুভব করেন বা মানসিক অশান্তিতে থাকেন তাহলে তা চিহ্নিত করে তা থেকে মুক্তি লাভের উপায় খুঁজতে হবে। বিশেষ কোনও সমস্যা থাকলে তা দূর করার চেষ্টা করতে হবে। বিশেষ করে এই ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার এবং মানসিক প্রশান্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

❑ খিটখিটে মেজাজ মুহূর্তেই ভালো করবে চার খাবার:

দৈনিক কালের কণ্ঠ (অনলাইন) লিখেছে,
টাইমস অব ইন্ডিয়া প্রকাশ করেছে এমন কিছু খাবারের কথা, যা আপনার মেজাজ ভালো করে, তরতাজা ও উৎফুল্ল রাখতে সাহায্য করে। চলুন জেনে নেয়া যাক সে খাবারগুলো সম্পর্কে-

◍ চকলেট:

চকলেটে ফিনাইলিথ্যালাইমিনের বেশ কয়েকটি কার্যকর মিশ্রণ রয়েছে যা এন্ডোরফিন এবং আনন্ডামাইডকে বাড়ায়। চকলেট সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণা দেখায় যে, এটি মেজাজ এবং জ্ঞানকে উন্নত করতে পারে, পাশাপাশি এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস, আয়রন এবং ম্যাগনেসিয়ামের একটি সমৃদ্ধ উৎস।

◍ বাদাম:

আখরোট, চিনা বাদাম, পেস্তা, কিসমিসের আশ্চর্যজনক পুষ্টিমান রয়েছে। এগুলো অবশ্যই আপনার খাবারের তালিকায় যুক্ত করা উচিত। এগুলো ফাইবার, প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাটে পূর্ণ সুপার হেলথ খাবার।কাজু বাদাম এবং অন্যান্য বাদাম অল্প করে খান যাতে আপনার কার্ব এবং ক্যালোরি স্তর ঠিক থাকে। সকাল ১১টার দিকে একমুঠো মিশ্র বাদাম খাওয়ার চেষ্টা করুন। এটি স্বাস্থ্যকর নাস্তা। বাদামে আপনার মেজাজ, ত্বক এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদী সুবিধার জন্য ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে।

◍ ডিম:

আমরা সবাই বিভিন্ন পদ্ধতিতে রান্না করা ডিম খেতে পছন্দ করি। সুসংবাদ হল; ডিম খেলে আপনার মেজাজ ভালো থাকবে। ডিমে প্রোটিন, ভিটামিন ডি, বি ১২ বেশি থাকে এবং কোলিনযুক্ত থাকে, এটি এমন একটি পুষ্টি যা স্নায়ুতন্ত্রকে সমর্থন করে। যা আপনার মেজাজ ভালো রাখতে কাজ করে। এছাড়াও ডিম খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু এবং এটি খাওয়ার অনেক পদ্ধতি রয়েছে।

◍ অ্যাভোকাডো এবং বেল পেপার (ক্যাপসিকাম):

অ্যাভোকাডোর পুষ্টিকর ফ্যাট এবং সুপার ক্রিম যুক্ত টেক্সচার মেজাজ ভালো রাখার খাবার হিসেবে বিবেচিত। এতে ভিটামিন বি ৬, ভিটামিন বি ৫, ফাইবার, ভিটামিন ই, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ এই খাবার ভিটামিন এবং পুষ্টি নিউরোট্রান্সমিটার সংশ্লেষ করতে সাহায্য করে। রঙিন বেল পেপার (ক্যাপসিকাম) রাখুন খাবারের তালিকায়। এর মধ্যে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন সি বেশি রয়েছে যা মেজাজ উন্নত করতে ও সঙ্কট হ্রাস করতে সাহায্য করে।
আল্লাহ আপনার মানসিক অবস্থা ঠিক করে দিন এবং সমস্যা থেকে মুক্তি দান করুন- আমরা সে জন্য দোয়া করি। এছাড়াও নিম্নোক্ত লেখাগুলো পড়ার অনুরোধ করছি।।

▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate