Tuesday, March 22, 2022

কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম কোন নবীকে কাপড় পরানো হবে

 প্রশ্ন: কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম কোন নবীকে কাপড় পরানো হবে?

উত্তর:
কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম ইবরাহিম আ. কে কাপড় পরিধান করানো হবে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّكُمْ مَحْشُورُونَ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلاً (كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيْدُهُ) الآيَةَ وَإِنَّ أَوَّلَ الْخَلاَئِقِ يُكْسَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِبْرَاهِيمُ
“নিশ্চয়ই তোমাদের হাশর করা হবে নগ্ন পা, নগ্ন দেহে ও খতনা বিহীন অবস্থায়। আয়াত: كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيْدُهُ “আল্লাহ বলেন, যেভাবে আমি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে আবার সৃষ্টি করব।” [সূরা আম্বিয়া: ১০৫]
আর কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম ইবরাহিম আ.-কে পোশাক পরিধান করানো হবে।” [সহীহ বুখারী, অধ্যায়: ৮১/ সদয় হওয়া, পরিচ্ছেদ: ৮১/৪৫. হাশরের অবস্থা কেমন হবে]
ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত আছে যে,
أن إبراهيم يؤتى له بكرسي على يمين العرش، فيكسى حلة تشرئب إليه أعناق البشر
“আরশের ডান দিকে ইবরাহিম আ. এর জন্য একটি কুরসি (চেয়ার) আনা হবে। এরপর তাকে এমন উন্নত পোশাক পরানো হবে যা মানুষ ঘাড় উঁচু করে দেখবে।” [বায়হাকী-কিতাবুল আসমা ওয়াস সিফাত ২/২৭৬, হা/৮৩৯]

আলেমগণ বলেছেন, এর কারণ হতে পারে, তিনি একমাত্র নবী যাকে কাফের সম্প্রদায় অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছিলো উলঙ্গ অবস্থায়। তাই আল্লাহ তাআলা এর প্রতিদান হিসেবে কিয়ামতের দিন তাঁকে এই মর্যাদায় ভূষিত করবেন। এ বিষয়ে আরও একাধিক মতের মধ্যে এটি সর্বাধিক সঠিক বলে নির্ভরযোগ্য আলেমগণ মত ব্যক্ত করেছেন।
আল্লাহু আলাম।

▬▬▬✪✪✪▬▬▬

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

স্বামী মৃত্যুবরণ করলে নাকফুল, কানের দুল, হাতের চুড়ি, মালা ইত্যাদি খুলে ফেলা কি শিরক

 প্রশ্ন: স্বামী মৃত্যুবরণ করলে নাক ফুল, কানের দুল, হাতের চুড়ি, মালা ইত্যাদি খুলে ফেলা কি শিরক? এ প্রথা না কি হিন্দুদের থেকে এসেছে। এ কথা কি সঠিক?

উত্তর:
স্বামী মৃত্যুবরণ করলে ইদ্দত পালনের সময় নাক ফুল, কানের দুল, হাতের চুড়ি, মালা ইত্যাদি সৌন্দর্য বর্ধক অলংকারাদি ব্যবহার করা জায়েজ নাই। কেউ আগে থেকে ব্যবহার করলে তা খুলে রাখবে। ইদ্দত অতিক্রম করার পরে পুনরায় সেগুলো পরতে পারে। কিন্তু এগুলো খুলে ফেলাকে শিরক বলা বা হিন্দু রীতি বলা মারাত্মক বাতিল ও ভ্রান্ত কথা। এমন কথা বলা জায়েজ নাই। কোনও আলেম এমন কথা বলে থাকলে তা অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী উম্মে সালামা রা. সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
الْمُتَوَفَّى عَنْهَا زَوْجُهَا لَا تَلْبَسُ الْمُعَصْفَرَ مِنَ الثِّيَابِ، وَلَا الْمُمَشَّقَةَ، وَلَا الْحُلِيَّ، وَلَا تَخْتَضِبُ، وَلَا تَكْتَحِلُ
“কোনও মহিলার স্বামী মারা গেলে সে রঙ্গিন পোশাক, কারুকার্য খচিত জামা ও অলংকার পরবে না, খিজাব (চুল, হাত বা শরীরের অন্য কোথাও কলপ) ও সুরমা ব্যবহার করবে না।” [সুনানে আবু দাউদ, অধ্যায়: ৭/ তালাক, পরিচ্ছেদ: ৪৬. ইদ্দত পালন কারিনী ইদ্দতকালে যা বর্জন করবে]

❑ এ ব্যাপারে নিম্নে সম্মানিত ফকিহদের অভিমত তুলে ধরা হল:

◍ বিখ্যাত ফকিহ ইমাম ইবনে আব্দুল বার রাহ. [মৃত্যু: ৪৬৩ হি.] বলেন,
”وأما الحلي والخاتم وما فوقه فلا يجوز للحاد لبسه
“গহনা, আংটি এবং তার উপরে যা আছে, ইদ্দত পালনকারী নারীর জন্য পরিধান করা জায়েজ নয়।” [আল কাফি ফী ফিকহি আহলিল মাদিনাহ, ২/৬২২]

◍ আবু ইসহাক শিরাজি রাহ. [মৃত্যু: ৩৯৩] বলেন,
والإحداد : أن تترك الزينة ، فلا تلبس الحلي
“মহিলাদের শোক পালন হল, সাজসজ্জা পরিত্যাগ করা। সুতরাং গহনা পরিধান করবে না…।” [আত তানবিহ, ১/২০১]

◍ অনুরূপভাবে বিখ্যাত হানাফি ফকিহ আবুল লাইস সামরকান্দি [মৃত্যু: ৩৭৩ হি.]ও মহিলাদের অলঙ্কার পরিধান থেকে বিরত থাকার কথা বলেছেন। [তুহফাতুল ফুকাহা, ২/২৫১]
قال السمرقندي في تحفة الفقهاء (2 / 251): “تَفْسِير الْإِحْدَاد : هُوَ الاجتناب عَن جَمِيع مَا يتزين بِهِ النِّسَاء من الطّيب ، وَلبس الثَّوْب الْمَصْبُوغ ، والمطيب بالعصفر والزعفران ، والاكتحال ، والادهان ، والامتشاط وَلبس الْحلِيّ والخضاب ، وَنَحْو ذَلِك ” انتهى.

◍ আধুনিক যুগের বিশিষ্ট ফকিহ সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বায বলেন,
الأمر الثالث: عدم الحلي، لا تلبس الحلي لا الذهب ولا الفضة ولا ولا الماس ولا الخواتيم كلها لا تلبس شيء، وإذا كانت عليها تزيلها؛ لأن الرسول
ﷺ نهى عن لبس الحلي للمحادة.
“তৃতীয়ত: অলংকার ব্যবহার না করা। স্বর্ণ-রৌপ্য ডায়মন্ড আংটি ইত্যাদি কোন কিছু ব্যবহার করবে না। এগুলো তার শরীরে থাকলে খুলে ফেলবে। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শোক পালনকারিণী নারীর জন্য অলংকার ব্যবহার নিষেধ করেছেন।”

সুতরাং কোনও মহিলার স্বামী মারা গেলে ইদ্দত পালন কালীন সময় (গর্ভবতী না হলে চার মাস দশ দিন আর গর্ভবতী হলে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত) কোনও ধরণের সাজসজ্জা গ্রহণ, মেহেদি ও রং এর ব্যবহার, কানের দুল, নাকের ফুল, হাতের চুরি, গলার মালা ইত্যাদি পরিধান করা বৈধ নয়। কেউ পরে থাকলে তা খুলে ফেলবে। এটাই ইসলামের বিধান।

আল্লাহ আমাদেরকে দীনের সঠিক জ্ঞান দান করুন এবং সব ধরণের বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
▬▬▬✪✪✪▬▬▬

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

ধূমপায়ী স্বামীর সাথে ঘরসংসার করার বিধান

 প্রশ্ন: স্বামী ধূমপান করে। কিন্তু স্ত্রী তাকে বুঝানোর পরেও তা পরিত্যাগ করে না। এমন স্বামীর সাথে ঘরসংসার করা কি জায়েজ?

উত্তর:
➤ প্রথমত: ইসলামের দৃষ্টিতে ধূমপান হারাম। কারণ তা একটি নিকৃষ্ট বস্তু। আর তা শুধু ধূমপানকারী ব্যক্তির জন্যই ধ্বংসাত্মক নয় বরং তার স্ত্রী-পরিবার, সহকর্মী এবং পরিবেশের জন্যও হুমকি। ধূমপান সরাসরি ধূমপানকারীর নিজের ক্ষতি করে আর পরোক্ষভাবে তার নিকটস্থ লোকদের ক্ষতি করে।

❑ ধূমপানের পরোক্ষ ক্ষতি:

স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীগণ বলে, “একটা সিগারেটের গোড়া (ফিলটার) পুড়তে থাকার সময় যে ধোঁয়া বের হয় তা ধূমপায়ীর টেনে নেওয়া ধোঁয়াটুকুর চেয়ে ক্ষতিকর, কেননা এই ধোঁয়াটুকু কোনো রকম ছাঁকাছাঁকির ভেতর দিয়ে যায় না। আর এই ধোঁয়ায় থাকা বস্তুকণাগুলোও অনেক ছোট হয়। ফলে সেগুলো অনেক বেশি সময় ধরে বাতাসে ভেসে বেড়ায় এবং মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে।’ এভাবেই পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতিকর প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা দিলেন ভারতের কোকিলাবেন ধিরুভাই আম্বানি হাসপাতাল এবং মেডিকেল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক এসপি রায়।

এই জাতীয় পরোক্ষ ধূমপান ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ, শ্বাসনালীসংক্রান্ত হাঁপানি, স্থায়ী শ্বাসকষ্ট, নানা ধরনের অ্যালার্জি এবং ফুসফুসের অন্যান্য রোগের জন্যও দায়ী বলে জানিয়েছেন গ্লোবাল হসপিটালসের মেডিকেল অঙ্কোলজি বিভাগের চিকিত্সক নিলেশ লোকেশ্বর। ধূমপায়ীদের স্ত্রী বা স্বামী এবং কর্মক্ষেত্রে ধূমপানের ক্ষেত্রে সহকর্মীরা এ ধরনের অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। এ ছাড়া নারী ও শিশুরা বরাবরই ধূমপান জনিত রোগের ঝুঁকিতে বেশি পড়ে।”

প্রতিবেদনে আও বলা হয়,

‘বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ৬০ লাখ মানুষ মারা যায় কোনো না কোনোভাবে তামাকজনিত নানা অসুস্থতার কারণে। আর এর মধ্যে প্রায় ছয় লাখ মানুষ ধূমপায়ী না হয়েও মারা যায় পরোক্ষ ধূমপানজনিত কারণে।” [দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকা]

➤ ২য়ত: ধূমপায়ী স্বামীকে এর ভয়াবহতা, ক্ষয়-ক্ষতি ও ইসলামে তা হারাম হওয়ার বিষয়টি বুঝানোর চেষ্টা করতে হবে, ধূমপানে নিষেধ করতে হবে এবং নানাভাবে তা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতে হবে। অত:পর সে যদি এই বদভ্যাস পরিত্যাগ করে এবং তার আচার-আচরণ ভালো হয় ও দীনমূখী হয় তাহলে তার সাথে সংসার অব্যাহত রাখায় আপত্তি নাই। কিন্তু সে যদি তা পরিত্যাগ না করে বরং আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত থাকে এবং তার সাথে ঘর সংসার করার কারণে স্ত্রী তার নিজের ও সন্তানদের স্বাস্থ্যগত, দীনদারিত্ব ও চারিত্রিক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করে এবং নানা চেষ্টার পরও তাকে এ পথ থেকে ফেরানো সম্ভব না হয় তাহলে খোলা তালাকের মাধ্যমে তার থেকে সংসার ভঙ্গ করা জায়েজ আছে।

বিশিষ্ট ফকিহ আল্লামা আব্দুল্লাহ বিন বায রাহ. এক প্রশ্নের উত্তরে ধূমপানের ক্ষতিকারিতা ও ইসলামে তা হারাম হওয়া প্রসঙ্গে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপনের পর ধূমপায়ী স্বামীর সাথে ঘর সংসার করার ব্যাপারে বলেন,
نوصيك بعدم مطالبته بالطلاق إذا كان يصلي وسيرته طيبة وترك التدخين، أما إن استمر على المعصية فلا مانع من طلب الطلاق
“আপনাকে আমরা উপদেশ দিব তালাক না চাওয়ার জন্য যদি সে নামাজ পড়ে, তার আচার-আচরণ ভালো হয় এবং ধূমপান ত্যাগ করে। কিন্তু যদি আল্লাহর নাফরমানি অব্যাহত রাখে তাহলে তালাক চাইতে বাধা নেই।” (শাইখের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট)
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬✪✪✪▬▬▬

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

মহিলাদের মুখে নিকাব পরিধান করার বিধান কী এবং এ ক্ষেত্রে চোখের কী পরিমাণ খোলা রাখা জায়েজ

 প্রশ্ন: অনেক সময় দেখা যায়, ফরসা বা সুন্দর চোখ বিশিষ্ট নারী কালো বোরখা পরিধান করে শুধু দুটি চোখ খোলা রাখে। এমন নারীকে খুব আকর্ষণীয় লাগে। এতে তার সৌন্দর্য যেন আরও বেশি প্রকাশ পায়। এ ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিতে নারীদের নিকাব পরিধান করার বিধান কী এবং রাস্তা চলাচলের জন্য চোখের কতটুকু খোলা রাখা জায়েজ?

উত্তর:
নিম্নে দুটি পয়েন্টের উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তর প্রদান করা হল:

◯ ক. ইসলামের দৃষ্টিতে মহিলাদের মুখে নিকাব পরিধান করার বিধান কী?

ইসলামের দৃষ্টি মহিলাদের মুখে নিকাব পরিধান করা জায়েজ। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে, হজ ও ওমরার ইহরাম অবস্থায় মহিলারা মুখে নিকাব পরিধান করবে না। যেমন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَا تَنْتَقِبْ الْمَرْأَةُ الْمُحْرِمَةُ ، وَلَا تَلْبَسْ الْقُفَّازَيْنِ
“ইহরাম কারীনী মুখে নিকাব এবং হাতে হাত মোজা পরিধান করবে না।” [সহিহ বুখারি, অধ্যায়: ২২/ হজ, পরিচ্ছেদ: ১১৫৫. মুহরিম পুরুষ ও মহিলার জন্য নিষিদ্ধ সুগন্ধি সমূহ। আয়েশা রা. বলেন, মুহরিম নারী ওয়ারস কিংবা জাফরানে রঞ্জিত কাপড় পরিধান করবে না]

উল্লেখ্য যে, এ অবস্থায় তারা নেকাব ও হাত মোজা পরিধান না করলেও মাথার ওড়না উপর থেকে ফেলে মুখমণ্ডল এবং হাতের লম্বা আস্তিন দ্বারা হাতের কব্জি দ্বয় পরপুরুষ থেকে ঢেকে রাখবে।

এ হাদিস থেকে বুঝা গেল, ইহরাম ছাড়া অন্য অবস্থায় নিকাব পরিধান করা জায়েজ।

◯ খ. নিকাব কাকে বলে এবং চোখের কী পরিমাণ খোলা রাখা জায়েজ?

● বিশিষ্ট ভাষাবিদ, ফকিহ, মুহাদ্দিস ও ইলমুর রিজাল শাস্ত্রবীদ আবু উবায়েদ আল কাসেম বিন সাল্লাম (মৃত্যু: ২২৪ হি.) আরবের নিকাবের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন,
هو الذي يبدو منه محجر العين
“(আরবি মহিলাদের) নিকাব হল, এমন জিনিস যা পরিধান করলে চোখের পাতা দ্বয় প্রকাশিত হয়।”

● ইমাম রামলি আশ শাফেয়ী বলেন,
حرم النظر إلى المنتقبة التي لا يبين منها غير عينيها ومحاجرها
“এমন নিকাব ধারী মহিলার দিকে তাকানো জায়েজ নাই যার কেবল চোখ ও চোখের পাতা দ্বয় ছাড়া আর কিছু প্রকাশিত নয়।” [নিহায়াতুল মুহতাজ ৬/১৮৮]

আর নিকাব পরিধান করা হলে, রাস্তা চলাচলের স্বার্থে দু চোখ (ভ্রূ’র নিম্নাংশ ও গালের উপরিভাগ) খোলা রাখা জায়েজ আছে। তবে শর্ত হল, ইচ্ছাকৃত ভাবে যেন চোখের ভ্রূ দ্বয় কিংবা চোখের নিচে গালের কোনও অংশ অতিরিক্ত প্রকাশ না করা হয়।

মোটকথা, নিকাব পরিধানকারী নারীর জন্য পরপুরুষদের সামনে ইচ্ছাকৃতভাবে চোখের ভ্রু বা গালের কিয়দংশ প্রকাশ করা জায়েজ নয়। আর নিকাব পরিধান করার ক্ষেত্রে চোখের পাপড়ি দ্বয় আকর্ষণীয়ভাবে সাজ-সজ্জা করা থেকেও বিরত থাকা অপরিহার্য। কিন্তু নিকাবধারী নারী যদি চোখের পাপড়ি ও ভ্রূকে আকর্ষণীয়ভাবে সাজসজ্জা করে বাইরে বের হয় তাহলে তা তাকে মানুষের নিকট আরও আকর্ষণীয় করে ফুটিয়ে তোলে, বিশেষ করে সুন্দরী নারীদেরকে- যা ফিতনা সৃষ্টির অন্যতম কারণ। এটি আল্লাহ তাআলা কর্তৃক পরপুরুষদের সামনে নারীদের সৌন্দর্য প্রকাশ করার নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের শামিল। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ ۖ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَىٰ عَوْرَاتِ النِّسَاءِ ۖ
“…তারা যেন যা সাধারণত: প্রকাশমান তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নি পুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ, ও বালক, যারা নারীদের গোপনাঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো আছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে…।” [সূরা নূর: ৩১ নং আয়াত]
আল্লাহু আলাম।
[অধিকাংশ তথ্য নেওয়া হয়েছে islamqa থেকে]

▬▬▬✪✪✪▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

মাংস-গোশত বিতর্ক নিতান্ত অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন

 প্রশ্ন: গোস্ত/গোশত নাকি মাংস? মাংস শব্দ দ্বারা নাকি মায়ের অংশ বুঝায়? হিন্দুরা মাংস বলে তাই নাকি মুসলিমদের জন্য এই শব্দ ব্যবহার করা হারাম? এ ব্যাপারে সঠিক ব্যাখ্যা জানতে চাই।

উত্তর:
ইসলামের দৃষ্টিতে বাংলা ভাষায় মাংস অথবা গোস্ত/গোশত-এ দুটি শব্দের যে কোনটি ব্যবহারে কোনও আপত্তি নাই। যারা এ বিষয়ে বিতর্ক করে তাদের ব্যাখ্যা ও যুক্তিগুলো নিতান্ত কুযুক্তি ও ভ্রান্ত ব্যাখ্যা ছাড়া কিছু নয়।

❑ এ শব্দ দ্বয়ের আভিধানিক বিশ্লেষণ:

উৎপত্তিগতভাবে মাংস শব্দটি সংস্কৃত। অর্থ: “প্রাণীর দেহের হাড় ও চামড়ার মধ্যবর্তী শরীরের অংশবিশেষ।” [ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, পৃ. ৯৬৮]
আর গোস্ত/গোশত শব্দটি ফারসি (گوشت-যা উর্দুতেও ব্যবহৃত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে এ দুটি শব্দই বাংলা ভাষায় আত্তীকরণ ঘটেছে। যার ফলে একই অর্থে উভয় শব্দই বাংলা ভাষায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

❑ বিশিষ্ট বাংলা ভাষা গবেষক, এ বিষয়ে বহু গ্রন্থ প্রণেতা ও শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. মোহাম্মদ আমীন গোশত, মাংস ও মাংশ শব্দ সমূহের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন:

◆ গোশত: ফারসি গোশত অর্থ জীবদেহের অভ্যন্তরে হাড়কে আবৃত করে রাখে এমন নরম কোমল পেশি বা কোষগুচ্ছ, জীবদেহের অভ্যন্তরস্থ হাড় এবং চামড়ার মধ্যবর্তী নরম ও কোমল অংশ, মাংস।
◆ মাংস: সংস্কৃত মাংস অর্থ জীবদেহের অভ্যন্তরস্থ হাড় এবং চামড়ার মধ্যবর্তী নরম ও কোমল অংশ, গোশত (কোরবানির মাংস), মাস , মানুষের আহার্য মনুষ্যেতর প্রাণীর আমিষ বা পলল। চর্যাপদেও শব্দটির বাংলা বানান মাস (মাংস); আপণা মাসে হরিণা বৈরী।
◆ মাংশ: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে মাংশ বানানের কোনো শব্দ নেই। অনেকে বলেন মাংশ মানে মায়ের অংশ, কীভাবে বলেন জানি না। শব্দটি কোথায় পেয়েছেন তাও জানি না। যাদের বাংলা সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা আছে তারা এমন বলতে পারেন না। যাই হোক, হয়তো মাংশ মানে মায়ের অংশ বলেই অভিধানে এমন শব্দ নেই। এবং কেউ (বাংলা বানান জানেন) মাংশ লেখেন না। চর্যাযুগেও ছিল না। [draminbd]

❑ হিন্দুরা মা তথা গরুর অংশ বুঝাতে ‘মাংস’ বলে-এ কথা কি ঠিক?

‘হিন্দুরা মা তথা গরুর অংশ বুঝাতে ‘মাংস’ বলে’-এটা সম্পূর্ণ ভুল কথা। কারণ তারা কেবল গরুর গোশতের ক্ষেত্রেই ‘মাংস’ শব্দ ব্যবহার করে না বরং ছাগল, হাস, মুরগি বা পাখির গোশতের ক্ষেত্রেও ‘মাংস’ শব্দ ব্যবহার করে কিন্তু ছাগল, হাস, মুরগি ইত্যাদি তো তাদের তাদের ‘মা’ নয়।

তাছাড়া বানান দেখুন। সঠিক বানান হল, মাংস; মাংশ নয়। বরং মাংশ শব্দটি বাংলা অভিধানে কোথাও নেই। সুতরাং ‘মাংস’ শব্দের বানান ‘মাংশ’ লেখা যেমন ভুল তেমনি ‘মায়ের (গরুর) অংশ’ ব্যাসবাক্যে সন্ধিবিচ্ছেদ করাটাও ভুল। যারা এমনটি বলে তারা নিতান্তই অজ্ঞতা বশত: বলে। সুতরাং বাংলা ব্যাকরণের দিক থেকেও এটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা।

মোটকথা, মাংস-গোশত বিতর্ক নিতান্ত অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন।
▬▬▬✪✪✪▬▬▬

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate