Saturday, February 5, 2022

ওজুতে সন্দেহ সৃষ্টি করা বা ওজু নষ্ট করার জন্য ‘ওয়ালহান’ নামক শয়তান নিযুক্ত থাকা সংক্রান্ত হাদিসটি সহিহ নয়

 ওজুতে সন্দেহ সৃষ্টি করা বা ওজু নষ্ট করার জন্য وَلْهَان ‘ওয়ালহান’ নামক শয়তান নিযুক্ত থাকার ব্যাপারে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞ হাদিস বিশারদগণের দৃষ্টিতে তা সহিহ নয়। সুতরাং জঈফ বা দুর্বল হাদিস দ্বারা এমন গায়েব (অদৃশ্য) বিষয়ের কোনও বিধান সাব্যস্ত করা সঙ্গত নয়।

নিম্নে এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদিসটি উল্লেখ পূর্বক সে সম্পর্কে বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের মতামত উপস্থাপন করা হল:

✪ হাদিসটি হল:
إنَّ للوُضوءِ شَيْطانًا يقالُ له: الوَلَهانُ، فاتَّقوا وَسْواسَ الماءِ
“ওজুর জন্য একটি শয়তান নির্ধারিত রয়েছে। এর নাম হল, ওয়ালহান। সুতরাং তোমরা পানির ব্যাপারে সন্দেহ প্রবণতা থেকে বেঁচে থাকবে।” [ইবনে মাজাহ, হা/৪২১, তিরমিজী, হা/৫-আল মাদানী প্রকাশনী]

✪ হাদিসটির মান: এটি জইফ (দুর্বল)

নিম্নে এ প্রসঙ্গে মুহাদ্দিসদের মতামত তুলে ধরা হল:

◈ ইমাম আবু ঈসা তিরমিযী রাহ. বলেন,

“উবাই ইবনে কাব রা. থেকে বর্ণিত এই হাদিসটি غريب
“হাদিস বিশারদগণের দৃষ্টিতে এ হাদিসটির সনদ শক্তিশালী এবং সহীহ নয়। কারণ, খারিজা ব্যতীত আর কেউ এটিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত মুসনাদ তথা অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় বর্ণনা করেছেন বলে আমাদের জানা নেই।”

তিনি আরও বলেন,
ولا يصح في هذا الباب عن النبي صلى الله عليه وسلم شيء ، وخارجة ليس بالقوي عند أصحابنا ، وضعفه ابن المبارك
“আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এই বিষয়ে সহীহ কিছু বর্ণিত নেই।
আমাদের সাথীদের (মুহাদ্দিসগণের নিকট) খারিজা শক্তিশালী রাবী (বর্ণনা কারী) বলে স্বীকৃত নন। ইবনে মুবারক তাঁকে জঈফ (দুর্বল) বলে আখ্যায়িত করেছেন।”

◈ এই খারিজা কে হাফেজ ইবনে হাজার রাহ. متروك (পরিত্যাজ্য) আর ইবনে মাঈন كذاب (মিথ্যুক) বলেছেন।
[সূত্র: মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) অধ্যায়-৩: পাক-পবিত্রতা, পরিচ্ছেদ: ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ: ওজুর নিয়ম-কানুন]

◈ আবু যুরআ রাযী বলেন,
رفعه إلى النبي صلى الله عليه وسلم منكر
“এ হাদিসটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত মারফু সূত্রে বর্ণনা করার বিষয়টি منكر” [আল ইলাল, ১/১৮৬]

➤ এ ছাড়াও প্রায় সকল মুহাদ্দিস এ হাদিসটিকে জইফ (দুর্বল) বলেছেন। যেমন:

◈ ইবনে ইরাক আল কিনানি [তানযিহুশ শারিয়াহ ২/৭২]
◈ বাগাভী [শারহুস সুন্নাহ ১/৩৬৭]
◈ নওবী [আল খুলাসা ১/১১৭]
◈ শাইখ আলবানি বলেন, এটি অত্যধিক দুর্বল। [জইফ ইবনে মাজাহ/ ৮৭]
◈ শুয়াইব আরনাবুতও আলবানির অনুরূপ মত ব্যক্ত করেছেন। [তাখরিজুল মুসনাদ, হা/২১২৩৮ للوُضوءِ شَيطانٌ يُقالُ له: الوَلْهانُ، فاتَّقوهُ، أو قال: فاحْذَروهُ.]

◍ দুটি জ্ঞাতব্য বিষয়:

ক. ওয়ালহান শব্দের অর্থ: অত্যধিক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, অত্যধিক দু:খ, কষ্ট ও দু:শ্চিন্তার ফলে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য, কিংকর্তব্যবিমূঢ় ইত্যাদি।
খ. বলা হয়ে থাকে যে, ‘ওয়ালহান’ শয়তানের একটি নাম। কিন্তু এ মর্মে হাদিসটি সহিহ বলে সাব্যস্ত না হওয়ায় এটিকে শয়তানের নাম হিসেবে প্রমাণ করার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

হোটেল-রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে ওয়েটারকে বখশিশ দেওয়া কি ঘুসের অন্তর্ভুক্ত?

 প্রশ্ন: রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে যে ওয়েটা আমাদেরকে আপ্যায়ন করায় তাকে খুশি হয়ে আমরা কিছু বখশিশ দিয়ে থাকি। এটা কি ঘুসের অন্তর্ভুক্ত?

উত্তর:
একজন ওয়েটার (Waiter) হোটেল-রেস্তোরাঁয় কাস্টমারকে অভ্যর্থনার পাশাপাশি খাবারের অর্ডার নেয়া, খাবার পরিবেশন করা ও তাদের সুবিধা-অসুবিধার দিকে খেয়াল রাখার কাজ করেন। আপনি হোটেল-রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে যদি ওয়েটারকে কিছু টাকা বখশিশ দেওয়ার মাধ্যমে হোটেল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বহির্ভূত অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ বা খাবারের বিল কম দেখানো অথবা এমন বাড়তি কিছু সুবিধা গ্রহণ করেন-যা মূলত: অনুমোদিত নয় (অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ বিষয়টা জানলে আপত্তি করবে) তাহলে তাকে বখশিশ দেওয়া এবং ওয়েটারের তা গ্রহণ করা-উভয়টাই অন্যায়। কারণ তা ঘুস। সুতরাং উভয়ের জন্যই তা হারাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

لعَن اللهُ الرَّاشيَ والمُرتشيَ
“ঘুস দাতা ও ঘুস গ্রহীতা উভয়ের উপর আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন।” [ইবনে হিব্বান, সহীহুল জামে হা/৫০৯]
পাশাপাশি এর মাধ্যমে রেস্তোরাঁর মালিককে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। অর্থাৎ এটি অন্যের হক নষ্ট করারও শামিল-যা নি:সন্দেহে কবিরা গুনাহ।

কিন্তু আপনি যদি যথারীতি খাবার গ্রহণের পর ওয়েটারকে খুশি হয়ে স্বেচ্ছায় কিছু টাকা বখশিশ দেন তাহলে তাতে দোষের কিছু নেই। বরং আপনি যদি একজন গরিব মানুষকে খুশি করা বা আর্থিক সহযোগিতা করার নিয়তে তা দেন তাহলে এতে সওয়াবও পাবেন ইনশাআল্লাহ।

প্রখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হল, সব চেয়ে উত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেন,

أفضلُ الأعمالِ أن تُدْخِلَ على أخيكَ المؤمنِ سُروراً أو تقضيَ عنهُ دَيناً ، أو تُطْعِمَهُ خُبزاً

“সবচেয়ে উত্তম আমল হল, তোমার কোন ইমানদার ভাইয়ের অন্তরে আনন্দ সঞ্চার করা বা তার ঋণ পরিশোধ করা বা তাকে একটি রুটি খাওয়ানো।” [সহীহুল জামে, আলবানী, হা/১০৯৬] এমনকি সে যদি অমুসলিমও হয় তারপরও সওয়াব রয়েছে।

এটি আপনার বদান্যতা এবং উত্তম চরিত্রেরও বহিঃপ্রকাশ।

এমনকি এই টাকা পেয়ে পরবর্তীতে যেন সে আপনাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে বা ভালোভাবে সার্ভ করে (যা মূলত: ওয়েটারের দায়িত্ব বরং কর্তৃপক্ষ সাধারণত: তা ওয়েটারদের থেকে প্রত্যাশা করে)-এ উদ্দেশ্য থাকলেও সমস্যা নেই। কিন্তু এ নিয়ত থাকলে দানের সওয়াব পাওয়া যাবে না। কিন্তু অন্যায়ভাবে কোন সুবিধা লাভ করার উদ্দেশ্য হলে এই লেনদেন অবশ্যই বৈধ নয়।

❑ শাইখ বিন বায রহ.:

প্রশ্ন: আমি একজন ডাক কর্মচারী। আমি যখন প্রাপকের নিকট চিঠির খাম বা মানি অর্ডারটি হস্তান্তর করি, তখন তিনি আমাকে কিছু টাকা দেন। এটি কি এমন উপহার হিসেবে বিবেচিত হবে যা আমার গ্রহণ করার অধিকার আছে? নাকি এটাকে ঘুষ বলে গণ্য হবে?
উত্তরে শাইখ ইবনে বায রাহ. বলেন,
“এতে কোনও সমস্যা আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ এই কাজটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই কথার অন্তর্ভুক্ত:
مَنْ صَنَعَ إِلَيْكُمْ مَعْرُوفاً فَكَافِئُوهُ
“যে তোমাদের উপকার করবে, তোমরা তাকে পুরস্কৃত করো।” [আবু দাউদ, নাসায়ী-সহিহ]

তিনি আরও বলেছেন,
كُلُّ مَعْرُوفٍ صَدَقَةٌ
“প্রতিটি ভালো কাজ সদকা।” হাদিসটি ইমাম বুখারি তার সহিহ বুখারিতে বর্ণনা করেছেন। (এটি সহিহ মুসলিমেও বর্ণিত হয়েছে)
আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এই সহায়তা ডাক কর্মচারীকে প্রাপকের কাছে যথাসম্ভব দ্রুত তাদের লেনদেন পৌঁছে দিতে উৎসাহিত করবে। আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।” [উৎস: শাইখের অফিসিয়াল ওয়েব সাইট]
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

সাম্প্রদায়িকতা কী? ইসলাম “সাম্প্রদায়িকতা’ ও ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ সম্পর্কে কী বলে?

 প্রশ্ন: সাম্প্রদায়িকতা কী? ইসলাম “সাম্প্রদায়িকতা’ ও ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ সম্পর্কে কী বলে?

উত্তর:
সাম্প্রদায়িকতা (Sectarianism) অর্থ: ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, জাতি, গোষ্ঠী, ভাষা, দেশ, অঞ্চল, লিঙ্গ, দল ইত্যাদি দিক-বিবেচনায় অন্যায়-অবিচারকে সমর্থন করা এবং অপর পক্ষের ক্ষতি সাধন করা। অন্য কথায় এটা হল, গ্রুপবাজি বা গোষ্ঠী তন্ত্র। এর বিপরীতটাই অসাম্প্রদায়িকতা।
ইসলামে এ জাতীয় সাম্প্রদায়িকতা বা গোষ্ঠী তন্ত্রের কোনও স্থান নেই। বরং ইসলাম সবসময় এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং সাম্য ও ন্যায়-নীতির পক্ষে অবস্থান করে। সুতরাং ইসলামের দৃষ্টিতে সাম্প্রদায়িকতা অবশ্যই হারাম।

▪️ইসলাম নিজের নিকটাত্মীয়ও যদি অপরাধ করে তবুও তাকে শাস্তি দিতে বলে। তাই তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُهَا
“তাঁর শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! যদি ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদও চুরি করতো, আমি তারও হাত কেটে দিতাম।” [সুনান আন-নাসায়ী, অধ্যায়: ৪৭/ চোরের হাত কাটা-সহিহ]
সুবহানাল্লাহ! পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষের মুখ থেকে এমন ইনসাফ দীপ্ত শক্ত ঘোষণা সত্যি ইসলামের বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা প্রমানের পাশাপাশি স্বজন প্রীতি, গোষ্ঠী প্রীতি এবং অন্যায়-অবিচারের পথকে রুদ্ধ করে দেয়।
▪️ইসলাম নিজের জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর বিপক্ষে গেলেও সত্য ও ন্যায়ের কথা বলার নির্দেশ দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَىٰ
“যখন তোমরা কথা বলবে তখন ইনসাফ করবে যদিও তা নিকটাত্নীয়ের ব্যাপারে হয়।” [সূরা আনআম: ১৫২]

▪️নির্যাতিত ব্যক্তি ন্যায় বিচার পাবে যদিও সে অমুসলিম হয় এবং অপরাধী শাস্তি পাবে যদিও সে মুসলিম হয়।

▪️ইসলাম জাতি ও গোষ্ঠীগত সাম্প্রদায়িকতাকে ‘জাহেলিয়াত’ বলে আখ্যায়িত করেছে। যেমন: হাদিসে এসেছে,
সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রাহ. বলেন যে, আমর রাহ. জাবির রা. কে বলতে শুনেছেন,
আমরা এক যুদ্ধে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে ছিলাম। তখন একজন মুহাজির সাহাবি এক আনসারি সাহাবির পশ্চাদ্দেশে আঘাত করেছিল।
সে সময় আনসারি সাহাবি চীৎকার করে বলল: হে আনসাররা (তোমরা কে কোথায় আছো, ছুটে আসো)! অন্য দিকে মুহাজির ব্যক্তি ডাক দিল, হে মুহাজিরগণ! (তোমরা কে কোথায় আছো ছুটে আসো)।
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
‏ مَا بَالُ دَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ؟
“কী ব্যাপার! জাহেলি যুগের মতো হাঁক-ডাক করছ কেন?”
তারা বলল, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! একজন মুহাজির একজন আনসারির পশ্চাতে আঘাত করেছে। তখন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
‏دَعُوهَا فَإِنَّهَا مُنْتِنَةٌ ‏
“তোমরা এ ধরনের হাঁক-ডাক পরিত্যাগ করো। কেননা তা দুর্গন্ধময় (নিন্দনীয়) কাজ।” [সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ৪৬। সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও শিষ্টাচার, পরিচ্ছেদ: ১৬. ভাইকে সাহায্য করা জালিম হোক কিংবা মাজলুম হোক] এ মর্মে আরও হাদিস আছে।

▪️অন্য হাদিসে এসেছে,

لَيْسَ مِنَّا مَنْ دَعَا إِلَى عَصَبِيَّةٍ وَلَيْسَ مِنَّا مَنْ قَاتَلَ عَلَى عَصَبِيَّةٍ وَلَيْسَ مِنَّا مَنْ مَاتَ عَلَى عَصَبِيَّةٍ ). وهو حديث ضعيف كما قال الألباني في ضعيف أبي داود
“যে ব্যক্তি আসাবিয়াহ তথা গোষ্ঠীগত গোঁড়ামির দিকে ডাকে বা গোত্রের দিয়ে আহ্বান করে লোক-জন জমায়েত করে করে সে আমার দলভুক্ত নয়। আর ঐ ব্যক্তিও আমাদের দলভুক্ত নয় যে গোষ্ঠীগত গোঁড়ামির ভিত্তিতে যুদ্ধ করে এবং সেও নয় যে গোষ্ঠীগত গোঁড়ামি উপর মারা যায়।”
[সুনান আবু দাউদ, ৩৬/ শিষ্টাচার, পরিচ্ছেদ: ১২২. দল প্রীতি বা পক্ষপাতিত্ব-দুর্বল, মিশকাত হা/ ৪৯০৭, গায়াতুল মারাম, হা/ ৩০৪।]
এ হাদিসটি জঈফ হলেও তার মমার্থটা সহিহ হাদিস দ্বারা সমর্থিত-যেমনটি উপরের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

▪️ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَلَا إِنَّ رَبَّكُمْ وَاحِدٌ وَإِنَّ أَبَاكُمْ وَاحِدٌ ، أَلَا لَا فَضْلَ لِعَرَبِيٍّ عَلَى أَعْجَمِيٍّ وَلَا لِعَجَمِيٍّ عَلَى عَرَبِيٍّ وَلَا لِأَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ وَلَا أَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ إِلَّا بِالتَّقْوَى
“হে লোক সকল! তোমাদের প্রতিপালক এক এবং তোমাদের পিতা এক (আদম আ.)।
শুনে রাখো, আরবির উপর অনারবির এবং অনারবির উপর আরবির, কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের এবং শ্বেতাঙ্গের উপর কৃষ্ণাঙ্গের কোন শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নেই। শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা আছে তো কেবল ‘তাকওয়া’ (আল্লাহ ভীতি)’র ভিত্তিতে।”
(মুসনাদে আহমদ, হা/২২৩৯১, সিলসিলা সহিহা, ৬/১৯৯)

▪️ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত যে, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। বললেন,

“হে লোক সকল! আল্লাহ্ তাআলা জাহেলি যুগের অন্ধ অহমিকা এবং পিতৃপুরুষদের নিয়ে গর্ব করার প্রথা ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন। মানুষ হল দু ধরনের।
– এক প্রকার হল সৎ, পরহেজগার এবং আল্লাহর নিকট মর্যাদাবান।
– আরেক প্রকার হল অসৎ, বদবখন এবং আল্লাহর নিকট নিকৃষ্ট।
মানুষ হল আদম-এর সন্তান। আল্লাহ্ তা’আলা আদমকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,
يا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
“হে মানুষ, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে। পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে। যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাবান যে অধিক আল্লাহভীরু। আল্লাহ্ সবকিছু জানেন। সব খবর রাখেন [সূরা হুজুরাত ৪৮: ১৩]।
মোটকথা ইসলাম হল, ন্যায়-ইনসাফ ভিত্তিক জীবনাদর্শের নাম। এখানে সাম্প্রদায়িকতা, স্বজনপ্রীতি, দল বা গোষ্ঠীপ্রীতির কোনও স্থান নেই। সুতরাং যারা ইসলামকে সাম্প্রদায়িক বলে গালমন্দ করে তারা মূলত ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ বিদ্বেষবশত বলে। ইসলামের প্রকৃত পরিচয় ও সৌন্দর্য সম্পর্কে তারা নিতান্তই অজ্ঞ। আল্লাহ তাদেরকে সুপথ দেখান। আমিন।
আল্লাহু আলাম।
-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল-

কোনও দুআয় ৪০ জন ব্যক্তি আমিনবললে তা কি কবুল হয়?

 প্রশ্ন: নিউজ ফিডে দেখা যাচ্ছে যে, ৪০ জন ‘আমিন’ বললে নাকি দুআ কবুল হয় -এটা কতটুক সত্য?

উত্তর:
বাস্তবেই এমন স্ট্যাটাসে ফেসবুক ভরপুর। ফেসবুকে উক্ত হাদিস তুলে ধরে কেউ বিয়ের জন্য, কেউ মনের মানুষকে পাওয়ার জন্য, কেউ পরীক্ষায় পাসের জন্য…এভাবে একেকজন একেক উদ্দেশ্যে দুআ চাচ্ছে। আর জনগণ কমেন্ট অপশন ‘আমিন’ এর জোয়ারে ভাসিয়ে দিচ্ছে!
অথচ এটা একটা ভ্রান্ত কথা। এমন কোনও হাদিস নেই যে, চল্লিশ জন ব্যক্তি কোনও দুআয় ‘আমিন’ বললে তা কবুল হয়ে যাবে। তাহলে তো আমাদের দেশের বড় বড় ওয়াজ মাহফিল, মিলাদ মাহফিল, দুআ মাহফিল এবং মসজিদে নামাজের পরে সম্মিলিত দুআয় যত মানুষ শরিক হয় তাদের কোন দুআই বাদ যেত না; সবই কবুল হয়ে যেতো।
আমরা বলি না যে, ফেসবুকের মাধ্যমে দুআ চাওয়া নাজায়েজ। কিন্তু ৪০জন ব্যক্তি আমিন বললে দুআ কবুল হওয়ার কোনও হাদিস নেই।
এই সব বানোয়াট হাদিসকে কেন্দ্র করেই আমাদের দেশের তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতিমায় লক্ষ লক্ষ মানুষ নামাজ না পড়লেও ‘আখেরি মুনাজাতে’ শরিক হওয়ার জন্য তোলপাড় লাগিয়ে দেয়!
এই সব বানোয়াট হাদিস দ্বারাই অনেকেই সম্মিলিত দুআ সাব্যস্ত করার চেষ্টা করে।
আল্লাহ আমাদেরকে দীনের সঠিক জ্ঞান দান করুন এবং ক্ষমা করুন। আমিন।
▬▬▬✪✪✪▬▬▬
-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল-

গোরস্থানে কবরের মাটি সমান করে তার উপর মসজিদ নির্মাণ বা সম্প্রসারণ এবং তাতে সালাত আদায়ের বিধান

 প্রশ্ন: আমাদের গ্রামের মসজিদের পাশে কবর ছিল। তো মসজিদ বড় করার জন্য জায়গার মালিকের অনুমতি নিয়ে কবরস্থানের মাটি সমান করে তার উপর মসজিদ বড় করা হয়েছে। এখন ওই মসজিদে কি নামাজ শুদ্ধ হবে? কয়েকজন আলেম হাদিস গ্রন্থের দলিল দেখিয়ে বলেছেন যে, এখানে নামাজ হবে। এখন আপনাদের কাছেও এ বিষয় জানতে চাই কুরআন-হাদিসের আলোকে।

উত্তর:
কবরস্থানের কবরের মাটি সমান করে তার উপর মসজিদ নির্মাণ করলে বা মসজিদ সম্প্রসারণ করলে সে মসজিদ বা সম্প্রসারিত স্থানে সালাত শুদ্ধ হবে না। কারণ—

◈ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
أَلاَ فَلاَ تَتَّخِذُوا الْقُبُورَ مَسَاجِدَ إِنِّي أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ
“সাবধান! তোমরা কবরসমূহকে মসজিদ বা সেজদার স্থান বানাবে না। আমি এরূপ করতে তোমাদেরকে নিষেধ করছি।” [সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী), অধ্যায়: ৫। মসজিদ ও সালাতের স্থানসমূহ, পরিচ্ছেদ: ৩. কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ, মসজিদে ছবি বানানো, কবরকে সেজদার স্থান নির্ধারণ করার প্রতি নিষেধাজ্ঞা]

◈ জাবির রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنْ يُجَصَّصَ الْقَبْرُ وَأَنْ يُقْعَدَ عَلَيْهِ وَأَنْ يُبْنَى عَلَيْهِ ‏.‏
“রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের উপর চুনা লাগানো, তার উপর বসা, কবরের উপর গৃহনির্মাণ বা পাকা করতে নিষেধ করেছেন।” [সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ১২/ জানাজা সম্পর্কিত, পরিচ্ছেদ: ২৬. কবর পাকা করার নিষেধাজ্ঞা]

❑ কোন পরিস্থিতিতে কবরস্থানে মসজিদ নির্মাণ বা সম্প্রসারণ করা বৈধ?

পরিস্থিতি যদি এমন হয় যে, মসজিদে মুসল্লিদের স্থান সংকুলান না হওয়ার কারণে তা সম্প্রসারণ করা নিতান্ত জরুরি হয়ে পড়েছে কিন্তু মসজিদের পার্শ্বে কবর থাকার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না আর অন্য দিকে মসজিদ বাড়ানোর মত জায়গাও নাই। তাহলে এমন জরুরি প্রয়োজন বশত: মসজিদ সম্প্রসারণের জন্য কবরস্থানের যতটুকু জায়গা প্রয়োজন ততটুকু স্থান থেকে কবরগুলো খনন করে অত্যন্ত সম্মানের সাথে মৃত মানুষের লাশ বা অবশিষ্ট হাড়-হাড্ডি যা পাওয়া যায় সেগুলো অন্য কোনও কবরস্থানে দাফন করতে হবে। তারপর উক্ত স্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও মাটি সমান করে সেখানে মসজিদ সম্প্রসারণ করা বৈধ হবে।

স্মর্তব্য যে, মুসলিম ব্যক্তির কবরের সম্মান বজায় রাখা জরুরি। কারণ মৃত ব্যক্তির কবর মূলত তার জন্যই ওয়াকফ কৃত স্থান। সুতরাং তাতে কারও হস্তক্ষেপ করা বৈধ নয়। কিন্তু একান্ত জরুরি প্রয়োজনে হলে এবং বিকল্প কোনও উপায় না থাকলে কবর খনন করে তার লাশ বা অবশিষ্ট হাড়-হাড্ডি অন্য কোথাও কবর খনন করে সেখানে স্থানান্তরিত করার পর তদস্থলে মসজিদ নির্মাণ, মসজিদ সম্প্রসারণ অথবা বসত বাড়ি নির্মাণ বা অন্যান্য কাজে লাগানো জায়েজ আছে।
কিন্তু লাশ বা লাশের অবশিষ্টাংশ অন্যত্র স্থানান্তরিত না করে সে অবস্থায় শুধু কবরের মাটি সমান করে তার উপর মসজিদ নির্মাণ করা জায়েজ নয়। বরং এমনটি করা হলে উক্ত মসজিদে সালাত আদায় করা বৈধ নয় বরং তা ভেঙ্গে ফেলা আবশ্যক। এমনটি বড় আলেমদের ফতোয়া।

❑ সৌদি স্থায়ী ফতোয়া কমিটির ফতোয়া:

প্রশ্ন: আমাদের শহরের মাঝখানে একটি পুরানো কবরস্থান ছিল। পৌরসভা তার ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে তদস্থলে একটি আবাসিক এলাকা ও সীমিত আয়ের লোকদের জন্য ভবন নির্মাণ করেছে। কিন্তু সেখানে একটি বিশাল এলাকা রয়ে যাওয়ায় সৎ ও দানশীল ব্যক্তিরা সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন-যেন এলাকার বাসিন্দারা তাতে নামাজ পড়তে পারে।
মসজিদটি নির্মিত হওয়ার পর এই মসজিদে নামায পড়া জায়েজ আছে কি না তা নিয়ে শহরের মানুষের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় এবং তারা সমর্থক ও বিরোধী দু ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই মসজিদের হুকুম কি? এটা কি ধ্বংস করা জরুরি না কি রাখা যাবে? এই মসজিদে নামায জায়েজ কি না?
উত্তর:
“الأرض التي بني عليها مسجد إذا كانت خالية من القبور صحت الصلاة فيها ، وإلا فيجب هدم المسجد الذي بني عليها” انتهى
الشيخ عبد العزيز بن عبد الله بن باز ، الشيخ عبد الرزاق عفيفي ، الشيخ عبد الله بن غديان .
” فتاوى اللجنة الدائمة ” ( 1 / 418 ، 419 )
“যে জমিতে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে তা যদি কবর মুক্ত হয় তাহলে তাতে সালাত শুদ্ধ হবে। অন্যথায় ঐ মসজিদ ভেঙ্গে ফেলতে হবে যা কবরের উপর নির্মাণ করা হয়েছ।”
উত্তর প্রদানে:
১. শাইখ আব্দুল আযিয বিন বায রাহ.
২. শাইখ আব্দুর রাযযাক আফিফি রাহ.
৩. ও শাইখ আব্দুল্লাহ গুদাইয়ান রাহ.
[ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা, ১/৪১৮ ও ৪১৯]

অবশ্য হারবি তথা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত কাফির-মুশরিকদের কবর খনন করা এবং তার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করত: মাটি সমান করে তার উপর মসজিদ নির্মাণ করা অথবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা বৈধ। কারণ তাদের কবরের কোনও সম্মান নেই। যেমনটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় হিজরত করার পর সেখানে মসজিদে নববি নির্মাণ করেছেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ أَنَسٍ قَدِمَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الْمَدِينَةَ وَأَمَرَ بِبِنَاءِ الْمَسْجِدِ فَقَالَ يَا بَنِي النَّجَّارِ ثَامِنُونِي فَقَالُوا لاَ نَطْلُبُ ثَمَنَهُ إِلاَّ إِلَى اللهِ فَأَمَرَ بِقُبُورِ الْمُشْرِكِينَ فَنُبِشَتْ ثُمَّ بِالْخِرَبِ فَسُوِّيَتْ وَبِالنَّخْلِ فَقُطِعَ فَصَفُّوا النَّخْلَ قِبْلَةَ الْمَسْجِدِ
আনাস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় এসে মসজিদ নির্মাণের আদেশ দেন। অতঃপর বলেন, “হে বনী নাজ্জার! আমার নিকট হতে মূল্য নিয়ে (জমি) বিক্রি করো।
তারা বললেন, আমরা এর মূল্য কেবল আল্লাহর নিকটই চাই।
এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে মুশরিকদের কবর খুঁড়ে ফেলা হল, ধ্বংসাবশেষ সমতল করা হল, খেজুর গাছগুলো কেটে ফেলা হল। কেবল মসজিদের কিবলার দিকে কিছু খেজুর গাছ সারিবদ্ধভাবে রাখা হল।” [সহীহ বুখারি (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৯/ মদিনার ফযিলত, পরিচ্ছেদ: ২৯/১. মদিনা হারাম (পবিত্র স্থান) হওয়া]
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬✪✪✪▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলিল।
(লিসান্স, মদিনা ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়)
দাঈ, জুবাইল দাওয়া এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate