Saturday, December 11, 2021

রিজিক এবং বিবাহ কি লাওহে মাহফুজে লিখিত আছে?

 উত্তর :-আল্লাহ তাআ’লা যেদিন কলম সৃষ্টি করেছেন, সেদিন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত মাখলুকাত সৃষ্টি হবে, সবই লাওহে মাহফূজে লিপিবদ্ধ আছে। আল্লাহ তাআ’লা কলম সৃষ্টি করে বললেন, লিখ। কলম বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমি কি লিখব? আল্লাহ তাআ’লা বললেন, কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু হবে সব লিখে ফেল। সে সময় কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু পৃথিবীর বুকে সংঘটিত হবে, কলম সব কিছুই লিখে ফেলল। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, ভ্রুন মাতৃগর্ভে চার মাস অতিবাহিত হওয়ার পর আল্লাহ তাআ’লা একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। ফেরেশতা তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দেন এবং লিখে দেন তার রিজিক, বয়স এবং তার কাজ অর্থাৎ সৌভাগ্যবান হবে না দুর্ভাগা হবে। রিজিক লিখা আছে এবং কিভাবে অর্জন করবে, তাও লিখা আছে। রিজিক অন্বেষণের সাথ সাথে রিজিক অন্বেষণের উপকরণও লিপিবদ্ধ আছে। আল্লাহ বলেনঃ

)هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمْ الْأَرْضَ ذَلُولًا فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِنْ رِزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ(

“তিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে সুগম করেছেন, অতএব তোমরা তাতে বিচরণ কর এবং তার দেয়া রিজিক আহার কর। তাঁরই কাছে পুনরুজ্জীবন হবে।” (সূরা মুলকঃ ১৫) রিজিক পাওয়ার এবং তা বৃদ্ধি হওয়ার অন্যতম মাধ্যম হল, পিতা-মাতার সাথে সৎ ব্যবহার করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

)مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ أَوْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ(

“যে ব্যক্তি চায় যে, তার রিজিক বাড়িয়ে দেয়া হোক এবং বয়স বাড়িয়ে দেয়া হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” রিজিক বৃদ্ধির আরো মাধ্যম হল তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ

)وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ(

“আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে নিস্কৃতির পথ বের করে দিবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিজিক দান করবেন।” (সূরা তালাকঃ ২-৩) এমন বলা যাবে না যে, রিজিক যেহেতু নির্ধারিত আছে, সুতরাং আমি এর উপকরণ অনুসন্ধান করব না। এটা বোকামীর পরিচয়। বুদ্ধিমানের পরিচয় হল রিজিক এর জন্য এবং দ্বীন্তদুনিয়ার কল্যাণ অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালানো। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

)الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ(

“বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের হিসাব নিল এবং পরকালের জন্য আমল করল। অক্ষম ও নির্বোধ সেই ব্যক্তি, যে নিজের কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করল এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে বসে থাকল।” রিজিক যেভাবে লিপিবদ্ধ আছে, বিবাহ করাও নির্ধারিত রয়েছে। এই পৃথিবীতে কে কার স্বামী বা স্ত্রী হবে, তাও নির্দিষ্ট রয়েছে। আসমানজমিনের কোন কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন নয়।

স্ত্রীর হক আদায় না করে তাকে আটকে রাখা প্রসঙ্গে

 প্রশ্ন : আমাদের এলাকায় এক ব্যক্তি দু’টি বিবাহ করেছেন। তিনি প্রথম স্ত্রীকে তার বাপের বাড়ীতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি তার সেই প্রথম স্ত্রীকে ভরণ-পোষণ প্রদান করেন না। তার সাথে কোন সম্পর্কও রাখেন না। আবার তাকে একেবারে বিদায়ও করছেন না।

এমতাবস্হায় সেই মহিলাটি প্রায় আট বৎসর যাবত তার বাপের বাড়ীতে দুঃখ-কষ্ট করে জীবনযাপন করছে। অন্যকোন জায়গায় বিবাহ বসারও তার উপায় নাই। প্রশ্ন হল–শরীয়তের বিধান মতে সেই ব্যক্তির হুকুম কী এবং এমন ব্যক্তি থেকে সেই মহিলার পরিত্রানের উপায় কী????

 

উত্তর শরীয়তে একাধিক বিবাহ করা বৈধ থাকলেও তা ঢালাওভাবে নয়। বরং অনেক শর্ত-শরায়েত রয়েছে। যেমন, সকলের ভরণ-পোষণ প্রদানের ক্ষমতা রাখা, সকলের যৌন চাহিদা মেটানোর উপর সক্ষম হওয়া, সকলের মাঝে ভরণ-পোষণ ও রাত্রি যাপন ইত্যাদিতে পূর্ণ সমতা রক্ষা করা ইত্যাদি। এ সমস্ত বিষয়ে সমতা রক্ষা করা ওয়াজিব। আর যদি কোন ব্যক্তি এ ওয়াজিব তরক করে, তাহলে সে ফাসিক হয়ে যায়–যার পরকালীন শাস্তি অনেক কঠিন। আর দুনিয়াবীভাবে তার বিহিত ব্যবস্থা করা অভিভাবকগণের কর্তব্য।

সুতরাং প্রশ্নে বর্ণিত উক্ত ব্যক্তি শরীয়তের দৃষ্টিতে ফাসিক ও অপরাধী বলে গণ্য হবেন। দুনিয়াতেও তার এ অপরাধের বিচার করতে হবে এবং পরকালীনও তিনি কঠিন শাস্তির ভাগী হবেন।

যদি সেই ব্যক্তি সেই স্ত্রীর হক কোনভাবে আদায় না করেন এবং স্ত্রী তার থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করতে চান, তাহলে তিনি বা তার উকিল তার স্বামী থেকে খোলা তালাক নিয়ে নিবেন। যদি স্বামী তাতেও রাজী না হন, তাহলে স্ত্রী এবং তার অভিভাবকগণ কোর্টের মাধ্যমে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ করতে পারেন। অথবা তারা কোন শরয়ী মুফতী বোর্ডের শরণাপন্ন হয়ে সমস্ত ঘটনা খুলে বললে তারা বিবাহ বিচ্ছিন্ন করার ব্যবস্হা দিতে পারবেন। (এজন্য ঢাকা বসুন্ধরা বা বেফাক মুফতী বোর্ড কিংবা অন্যকোন মুফতী বোর্ডের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে।)

[প্রমাণসমূহ : তাফসীরে মাজহারী, ২ : ২৫৭/ ফাতাওয়া শামী, ৩ : ৫৭৫/ আহসানুল ফাতওয়া, ৫ : ৪১১/ হীলায়ে নাজিযা, ৭৩

কোন কোন্ অঙ্গ দেখানো চলবে?

 উত্তর : স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কোন পর্দা নেই উভয়েই এক অপরের পোশাক।[1]

উভয়েই উভয়ের সর্বাঙ্গ দেখতে পারে। তবে সর্বদা নগ্ন পোশাকে থাকা উচিৎ নয়।[2]

মা-বেটার মাঝে পর্দা ও গোপনীয় কেবল নাভি হতে হাঁটু পর্যন্ত।

অন্যান্য নিকটাত্মীয়; যাদের সাথে চিরকালের জন্য বিবাহ হারাম তাদের সামনে পর্দা ও গোপনীয় হল গলা থেকে হাঁটু পর্যন্ত।[3]

অবশ্য কোন চরিত্রহীন এগানা পুরুষের কথায় বা ভাবভঙ্গিতে অশ্লীলতা ও কামভাব বুঝলে, মহিলা তার নিকটেও যথাসম্ভব অন্যান্য অঙ্গও পর্দা করবে।[4]

মহিলার সামনে মহিলার পর্দা নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত। মহিলা কাফের হলে তার সামনে হাত ও চেহারা ছাড়া অন্যান্য অঙ্গ খোলা বৈধ নয়। যেমন, কোন নোংরা ব্যভিচারী মেয়ের সামনেও নিজের সৌন্দর্য প্রকাশ করা উচিৎ নয়। অনুরূপ এমন কোন মহিলার সামনেও দেহসৌষ্ঠব খোলা নিষিদ্ধ; যে তার কোন বন্ধু বা স্বামীর নিকট অন্য মহিলার রূপচর্চা করে বলে জানা যায় বা আশঙ্কা হয়। এমন মহিলার সাথে মুসলিম মহিলার সখীত্ব বা বন্ধুত্বও বৈধ নয়।[5]

মা-বাপের চাচা ও মামা, মেয়ের চাচা ও মামা এবং মাহরাম। সুতরাং চাচাতো দাদো বা নানার সামনে পর্দা গলা থেকে হাঁটু পর্যন্ত।[6]

তালাকের পর ইদ্দত পার হয়ে গেলে ঐ স্বামী এই স্ত্রীর জন্য বেগানা হয়ে যায়। সুতরাং তার নিকটে পর্দা ওয়াজেব। তার ছেলে দেখতে এলে কোন অঙ্গ ঐ পুরুষকে দেখাবে না।

পালিত পুত্র থেকে পালয়িত্রী মায়ের এবং পালয়িতা বাপ থেকে পালিতা কন্যার পর্দা ওয়াজেব। প্রকাশ যে, ইসলামে এ ধরনের প্রথার কোন অনুমতি নেই।

অনুরূপ পাতানো ভাই-বোন, মা-বেটা, বাপ-বেটির মাঝে, পীর ভাই-বোন (?) বিয়াই-বিয়ান ও বন্ধুর স্বামী বা স্ত্রীর মাঝে পর্দা ওয়াজেব। যদিও তাদের চরিত্র ফিরিশ্তার মত হয়, তবুও দেখা দেওয়া হারাম। পর্দা হবে আল্লাহর ভয়ে তাঁর আনুগত্যের উদ্দেশে, মানুষের ভয়ে বা লোক প্রদর্শনের জন্য নয়। এতে মানুষের চরিত্র ও সম্মান বিচার্য নয়। সুতরাং লম্পট, নারীবাজ, পরহেযগার, মৌলবী সাহেব প্রভৃতি পর্দায় সকলেই সমান। আল্লাহর ফরয মানতে কোন প্রকারের লৌকিকতা ও সামাজিকতার খেয়াল অথবা কারো মনোরঞ্জনের খেয়াল নিশ্চয় বৈধ নয়।

দৃষ্টিহীন অন্ধ পুরুষের সামনে পর্দা নেই। অবশ্য মহিলাকে ঐ পুরুষ থেকে দৃষ্টি সংযত করতে হবে।[7]

পৃথক মহিলা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান না থাকলে বেপর্দায় ছেলেদের সাথে পাশাপাশি বসে শিক্ষা গ্রহণ বৈধ নয়। স্বামী-সংসার উদ্দেশ্য হলে বাড়িতে বসে বিভিন্ন জ্ঞানগর্ভ বই-পুস্তক পড়া এবং দ্বীন-সংসার শিখার শিক্ষাই যথেষ্ট। অন্যান্য শিক্ষার প্রয়োজনে যথাসম্ভব পর্দার সাথে শিখতে হবে। পর্দার চেষ্টা না করে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিলে অবশ্যই মেয়ে-অভিভাবক সকলেই পাপী হবে।[8]

চিকিৎসার প্রয়োজনে মহিলার জন্য ডাক্তার খোঁজা ওয়াজেব। লেডী ডাক্তার না পেলে অথবা যথাবিহিত চিকিৎসা তার নিকট না হলে বাধ্য হয়ে পুরুষ ডাক্তারের নিকট যেতে পারে। তবে শর্ত হল মহিলার সাথে তার স্বামী অথবা কোন মাহরাম থাকবে। একাকিনী ডাক্তার-রুমে যাবে না। পরন্তু ডাক্তারকে কেবল সেই অঙ্গ দেখাবে, যে অঙ্গ দেখানো প্রয়োজন। লজ্জাস্থান দেখলেও অন্যান্য অঙ্গ দেখানো অপ্রয়োজনে বৈধ হবে না।[9]

মহান আল্লাহ বলেন,

﴿فَاتَّقُوا اللهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ﴾

‘‘তোমরা আল্লাহকে যথাসম্ভব ভয় কর।’’ (সাধ্যমত ভয় করার চেষ্টা কর।)[10]

একাকিনী হলেও নামাযে আদবের লেবাস জরুরী। এই সময় কেবল চেহারা ও হাত খুলে রাখা যাবে। শাড়ি পরে বাহু-পেট-পিঠ-চুল বের হয়ে গেলে নামায হয় না। যেমন, সম্মুখে বেগানা পুরুষ থাকলে চেহারাও ঢাকতে হবে।[11]

সেলোয়ার-কামিস বা ম্যাক্সিতে নামায পড়লে চাদর জরুরী। কুরআন শরীফ পড়তে গিয়ে মাথা খুলে গেলে ক্ষতি নেই। এতে ওযুও নষ্ট হয় না।[12]

‘‘বৃদ্ধা নারী; যারা বিবাহের আশা রাখে না, তারা তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে যদি বহির্বাস খুলে রাখে, তাহলে তা দোষের নয়। তবে পর্দায় থাকাটাই তাদের জন্য উত্তম।’’[13] যেহেতু কানা বেগুনের ডোগলা খদ্দেরও বর্তমান।

পর্দায় থাকলে বাড়ির লোক ঠাট্টা করলে এবং কোন প্রকার অথবা সর্বপ্রকার সহায়তা না করলে মহিলার উচিৎ যথাসম্ভব নিজে নিজে পর্দা করা। এ ক্ষেত্রে হাল ছেড়ে বসা বৈধ নয়। কল-পায়খানা নেই বলে ওজর গ্রহণযোগ্য নয়। স্বামী পর্দায় থাকতে না দিলে চেষ্টার পরও যদি একান্ত নিরুপায় হয়ে বেপর্দা হতে হয়, তবুও যথাসাধ্য নিজেকে সংযত ও আবৃত করবে। আল্লাহ এ চেষ্টার অন্তর দেখবেন। যারা সহায়তা করে না বা বাধা দেয়, তাদের পাপ তাদের উপর।

পক্ষান্তরে বেগানা পুরুষ দেখে ঘর ঢুকলে বা মুখ ঢাকলে যারা হাসাহাসি করে, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে, কটাক্ষ হানে অথবা অসমীচীন মন্তব্য করে বা টিস্ মারে, শরয়ী পর্দা নিয়ে যারা উপহাস করে—তারা কাফের। এই পর্দানশীন মহিলারা কাল কিয়ামতে ঐ উপহাসকারীদেরকে দেখে হাসবে।[14]

সুতরাং মুমিন নারীর দুঃখ করা উচিৎ নয়, একাকিনী হলেও মন ছোট করা সমীচীন নয়। সত্যের জয় অবধারিত, আজ অথবা কাল। মরতে সকলকেই হবে, প্রতিফল সকলেই পাবে।

‘মরে না মরে না কভু সত্য যাহা, শত শতাব্দীর বিস্মৃতির তলে

নাহি মরে উপেক্ষায়, অপমানে হয় না চঞ্চল, আঘাতে না টলে।’

পর্দায় থাকার জন্য দেওর-ভরা সংসার থেকে পৃথক হয়ে আলাদা ঘর বাড়ি করার জন্য স্ত্রী যদি তার স্বামীকে তাকীদ করে, তবে তা স্বামীর মানা উচিৎ; বরং নিজে থেকেই হওয়া উচিৎ। বিশেষ করে তার ভাইরা যদি অসৎ প্রকৃতির হয়। ইসলামে এটা জরুরী নয় যে, চিরদিন ভাই-ভাই মিলে একই সংসারে থাকতে হবে। যা জরুরী তা হল, আল্লাহর দ্বীন নিজেদের জীবন ও পরিবেশে কায়েম করা, আপোষে ভ্রাতৃত্ব-বোধ ও সহায়তা-সহানুভূতি রাখা, সকলে মিলে পিতা-মাতার যথাসাধ্য সেবা করা। কিন্তু হায়রে! আল্লাহতে প্রেম ও বিদ্বেষ করতে গিয়ে মানুষের মাঝে মানুষকে দুশমন হতে হয়। হারাতে হয় একান্ত আপনকে। যেহেতু, আল্লাহর চেয়ে অধিক আপন আর কে?

পর্দা নিজের কাছে নয়। কোন ইঁদুর নিজের চোখ বন্ধ করে যদি মনে করে যে, সে সমস্ত বিড়াল থেকে নিরাপদ, তবে এ তার বোকামী নয় কি? তেঁতুল দেখে মুখে পানি আসা মানুষের এক প্রকৃতিগত দুর্দম সবভাব। অনুরূপ নারীর সৌন্দর্য দেখে বদ্খেয়াল ও কুচিন্তা আসাও মানুষের জন্য স্বাভাবিক। অতএব হাত, চোখ ও মুখের সামনে তেঁতুল থাকলে, তেঁতুলের টক গন্ধ নাকে এসে প্রবেশ করলে জিবে পানি আসাকে কেউ কি রুকতে পারবে? পর্দা না করে কি কামলোলুপতা ও ব্যভিচারের ছিদ্রপথ বন্ধ করা সম্ভব?

নারীর মোহনীয়তা, কমনীয়তা ও মনোহারিত্ব লুকিয়ে থাকে তার লজ্জাশীলতায়। নারীর লজ্জাশীলতা তার রূপ-লাবণ্য অপেক্ষা বেশী আকর্ষণীয়। প্রিয় নবী (সাঃ) বলেন,

مَا كَانَ الْفُحْشُ فِي شَيْءٍ قَطُّ إِلَّا شَانَهُ وَلَا كَانَ الْحَيَاءُ فِي شَيْءٍ قَطُّ إِلَّا زَانَهُ.

‘‘অশ্লীলতা বা নির্লজ্জতা যে বিষয়ে থাকে, সে বিষয়কে তা সৌন্দর্যহীন করে ফেলে; পক্ষান্তরে লজ্জাশীলতা যে বিষয়ে থাকে, সে বিষয়কে তা সৌন্দর্যময় ও মনোহর করে তোলে।’’[15]

সভ্য লেবাসের পর্দা থেকে বের হওয়া নারী-সবাধীনতার যুগে পর্দা বড় বিরল। এর মূল কারণ হল লজ্জাহীনতা। কেননা, লজ্জাশীলতা নারীর ভূষণ। ভূষণ হারিয়ে নারী তার বসনও হারিয়েছে। দ্বীনী সংযম নেই নারী ও তার অভিভাবকের মনে। পরন্তু সংযমের বন্ধন একবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে উদ্দাম-উচ্ছৃঙ্খলতা বন্যার মত প্রবাহিত হয়। তাতে সংস্কার, শিক্ষা, চরিত্র, সবই অনায়াসে ভেসে যায়। শেষে লজ্জাও আর থাকে না। বরং এই লজ্জাহীনতাই এক নতুন ‘ফ্যাশন’ রূপে ‘সভ্য’ ও ‘আলোক প্রাপ্ত’ নামে সুপরিচিতি লাভ করে। সত্যই তো, বগল-কাটা ব্লাউজ ও ছাঁটা চুল না হলে কি সভ্য নারী হওয়া যায়? আধা বক্ষঃস্থল, ভুঁড়ির ভাঁজ ও জাং প্রভৃতি গোপন অঙ্গে দিনের আলো না পেলে কি ‘আলোক প্রাপ্তা’ হওয়া যায়?!

বলাই বাহুল্য যে, মুসলিম নারী-শিক্ষার ‘সুবেহ সাদেক’ চায়, নারী-দেহের নয়। মুসলিম নারী-বিদ্বেষী নয়, নারী-শিক্ষার দুশমনও নয়। মুসলিম বেপর্দা তথা অশ্লীলতা ও ব্যভিচারের দুশমন। শিক্ষা, প্রগতি, নৈতিকতা তথা পর্দা সবই মুসলিমের কাম্য। আর পর্দা প্রগতির পথ অবরোধ করতে চায় না; চায় বেলেল্লাপনা ও নগ্নতার পথ রুদ্ধ করতে।

পক্ষান্তরে পর্দাহীনতা; আল্লাহ ও তাঁর রসূলের অবাধ্যতা।

পর্দাহীনতা; নগ্নতা, অসভ্যতা, অশ্লীলতা, লজ্জাহীনতা, ঈর্ষাহীনতা ও ধৃষ্টতা।

পর্দাহীনতা; সাংসারিক অশান্তি, ধর্ষণ, অপহরণ, ব্যভিচার প্রভৃতির ছিদ্রপথ।

পর্দাহীনতা; যৌন উত্তেজনার সহায়ক। মানবরূপী শয়তানদের চক্ষুশীতলকারী।

পর্দাহীনতা; দুষ্কৃতীদের নয়নাভিরাম।

পর্দাহীনতা; কেবল ধর্মীয় শৃঙ্খল থেকে নারী-সবাধীনতা নয়, বরং সভ্য পরিচ্ছদের ঘেরাটোপ থেকে নারীর সৌন্দর্য প্রকাশ ও দেহমুক্তির নামান্তর।

পর্দাহীনতা; কিয়ামতের কালিমা ও অন্ধকার।

পর্দাহীনতা; বিজাতীয় ইবলীসী ও জাহেলিয়াতি প্রথা। বরং সভ্য যুগের এই নগ্নতা দেখে জাহেলিয়াতের পর্দাহীনারাও লজ্জা পাবে।

বেপর্দার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে কোন পর্দা নেই।

[1] (সূরা আল-বাক্বারা (২) : ২৮৭) [2] (ফাতাওয়াল মারআহ, ইবনে উসাইমীন, আব্দুল্লাহ বিন আল-জিবরীন ৫৪পৃঃ, আল মারআতুল মুসলিমাহ, ওয়াহ্বী সুলাইমান আল-আলবানী ২৩৯পৃঃ) [3] (ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন ২/৭৭৪) [4] (ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন ২/৮৫০) [5] (ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন ২/৮৪১) [6] (ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন ২/৭৭১) [7] (ফাতাওয়াল মারআহ ৭২পৃঃ) [8] (ফাতাওয়াল মারআহ ৮৪পৃঃ) [9] (ইলা রাববাতিল খুদূর ১০৫-১০৬পৃঃ) [10] (সূরা আত্-তাগাবুন (৬৪) : ১৬) [11] (কিতাবুদ দাওয়াহ, ইবনে বায২/৯৪) [12] (ফাতাওয়াল মারআহ ৩৭, মাজাল্লাতুল বহুসিল ইসলামিয়্যাহ ১৫/২৮৪) [13] (আলকুরআন কারীম ২৪/৬০) [14] (আর-রাসাইলু অল ফাতাওয়ান নিসায়্যিাহ, ইবনে বায ৬০পৃঃ, ফাতাওয়াল মারআহ ৭৬পৃঃ) [15] (সহীহ তিরমিযী ১৬০৭নং, ইবনে মাজাহ) ।

কিছু প্রশ্ন-2

 আমার বাবা মা রাজি হয় না, এখন আমার পছন্দের ছেলেকে কি বিয়ে করতে পারব পরিবারের অনুমতি ছাড়া??

উত্তর-বিয়ের আকদ (চুক্তি) করানোর দায়িত্ব মেয়ের অভিভাবককে পালন করতে হবে। যেহেতু আল্লাহ তাআলা বিয়ে দেয়ার জন্য অভিভাবকদের প্রতি নির্দেশনা জারী করেছেন।

কুরান থেকে দলিল-

আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর তোমরা তোমাদের মধ্যে অবিবাহিত নারী-পুরুষদের বিবাহ দাও।”[সূরা নুর, ২৪:৩২]

হাদিস থেকে দলিল –

১-নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করবে তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল।” [হাদিসটি তিরমিযি (১০২১) ও অন্যান্য গ্রন্থকার কর্তৃক সংকলিত এবং হাদিসটি সহীহ]

২- অভিভাবক পুরুষ হতে হবে। দলীল হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী- “এক মহিলা আরেক মহিলাকে বিয়ে দিতে পারবে না। অথবা মহিলা নিজে নিজেকে বিয়ে দিতে পারবে না। ব্যভিচারিনী নিজে নিজেকে বিয়ে দেয়।”

[ইবনে মাজাহ (১৭৮২) ও সহীহ জামে (৭২৯৮)⁠⁠⁠⁠

যে স্বামী তার স্ত্রীর হক্ক আদায় করেনা, স্ত্রীকে অবহেলা ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, তার হক্ক থেকে বঞ্চিত করে, স্ত্রীকে মারধর ও জুলুম অত্যাচার করে, এমন জালেম বা অত্যাচারী স্বামীর জন্যে কি শাস্তি রয়েছে?

উত্তরঃ ইসলাম ধর্মে সব ধরণের জুলুম-অত্যাচার কঠোরভাবে হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এটা একটা ‘কবীরাহ গুনাহ’ বা মহাপাপ।

আল্লাহ সুবহা’নাহু তাআ’লা বলেন, “হে আমার বান্দারা! আমি আমার নিজের জন্যে জুলুম করা হারাম করে নিয়েছি এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও জুলুম হারাম করেছি। সুতরাং তোমরা একজন আরেকজনের উপর জুলুম করো না।”

সহিহ মুসলিমঃ ২৫৭৭; জামে তিরমিযি।

শুধু জুলুম নয়, জুলুমে সহযোগিতা করা এবং জালিমদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা ও ঘনিষ্ঠতা রক্ষা করাও হারাম। মানুষের ওপর জুলুম এমন এক ভয়াবহ গোনাহ, যার শাস্তি কোনো না কোনো উপায়ে দুনিয়ার জীবনেই শুরু হয়ে যায়। অহংকার ও গর্বের কারণে জালেমরা মনে করে, তাদেরকে কেউ কখনো পাকড়াও করবেনা। অথচ আল্লাহ তাদেরকে সতর্ক করে বলেছেন, “যালেমরা শীঘ্রই জানতে পারবে যে, তাদের গন্তব্যস্থল কেমন?” [সুরা আশ-শুআ’রাঃ ২২৭]

সেই গন্তব্যস্থল, শেষ বিচারের দিন জালেমদের কি অবস্থা হবে তার বর্ণনাঃ

“(হে নবী!) জালেমদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আপনি কখনো আল্লাহ উদাসীন রয়েছে বলে মনে করবেন না। আল্লাহ তো তাদেরকে শুধু একটা নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত ছাড় দিয়েছেন, যেদিন চক্ষুগুলো বিস্ফোরিত হবে, আর জালেমরা মাথা ঊর্ধ্বমুখী করে উঠিপড়ি করে দৌড়াতে থাকবে। তাদের চোখ তাদের নিজেদের দিকে আর ফিরবে না, এবং তাদের হৃদয়গুলো দিশেহারা হয়ে যাবে। মানুষকে আল্লাহর আজাব চলে আসার দিন সম্পর্ক সাবধান করে দিন, যে দিন তাদের কাছে আজাব চলে আসবে। আর জালেমরা সেদিন বলবে, হে আমাদের রব্ব! আমাদেরকে একটু সময়ের জন্য অবকাশ দিন, তাহলে আমরা আপনার ডাকে সাড়া দেব (অন্যের ওপর জুলুম করব না) এবং রাসুলদের অনুসরণ করব। (আল্লাহ তখন বলবেন) তোমরা কি ইতিপূর্বে কসম খেয়ে বলতে না যে, তোমাদের পতন নেই! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে,তোমরা তো তাদের বাসস্থানেই বাস করছ এবং সেসব জালেমের সঙ্গে আমি কেমন আচরণ করেছি, তা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। উপরন্তু আমি তোমাদের জন্য বহু উদাহরণ দিয়েছি।” [সুরা ইব্রাহীমঃ ৪২-৪৫]

জাহান্নামে জালেমদের অনেক ধরণের কঠিন শাস্তি রয়েছে। তার মাঝে জাহান্নামীদের মধ্যে সবচাইতে কম শাস্তি যাকে দেওয়া হবে, তার শাস্তির ধরণ লক্ষ্য করলেই স্পষ্ট হবে জাহান্নাম কি কঠিন জায়গা।

সাহাবী নুমান বিন বশীর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি,“কেয়ামতের দিন জাহান্নামীদের মাঝে সবচে সহজ ও হালকা শাস্তি দেওয়া হবে যে ব্যক্তির, সে হল তার পায়ের তলাতে দু’টো জ্বলন্ত অঙ্গার থাকবে যার কারণে তার মাথার মগজ ছোট মুখ বিশিষ্ট হাড়ির ন্যায় উথলাতে থাকবে।”

সহীহ বুখারীঃ ৬৫৬২, সহীহ মুসলিমঃ ২১৩।

আর সেখানে চিন্তা করুন জালেমদের শাস্তি কত কঠিন হবে যেখানে স্বয়ং আল্লাহ পূর্বেই তাঁর বান্দাদেরকে এই বলে সতর্ক করে দিয়েছেনঃ

“নিশ্চয় যারা জালেম, তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” [সুরা ইব্রাহীমঃ ২২]

আল্লাহ আমাদেরকে কারো উপর জুলুম অত্যাচার করা এবং জুলুম অত্যাচারের শিকার হওয় থেকে রক্ষা করুন, আমাদেরকে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা করুন, আমিন।

বিবাহের পর স্ত্রীর জন্য শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, না নিজ পিতা-মাতার সেবা করা অধিক জরূরী? এছাড়া স্বামী এবং নিজ পিতা-মাতার আদেশ-নিষেধের মাঝে বৈপরীত্য দেখা দিলে কার আদেশ-নিষেধ অগ্রাধিকার পাবে?

উত্তরঃ-প্রত্যেক সন্তানের জন্য তার পিতা-মাতার সেবাযত্ন করাই সর্বাগ্রে জরূরী (ইসরা ১৭/২৩)।

স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তার শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর খেদমতে বাধ্য করা উচিৎ নয়। তবে অবশ্যই তাদের সাথে সদাচরণ করা কর্তব্য। স্বামী এবং পিতা-মাতা উভয়ের আদেশ-নিষেধ মেনে চলা স্ত্রীর জন্য ওয়াজিব। তাই সাধ্যমত উভয়কে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করবে।

এরপরেও যদি উভয়ের আদেশ-নিষেধের মাঝে বৈপরীত্য দেখা দেয়, সেক্ষেত্রে বৈষয়িক বিষয়ে স্বামীর আদেশকে অগ্রগণ্য করতে হবে। কেননা বিবাহের পূর্ব পর্যন্ত নারীরা পিতা-মাতার নিয়ন্ত্রণাধীনে থাকে। কিন্তু বিবাহের পর তারা স্বামীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সুতরাং সেসময় স্বামীর আদেশ-নিষেধ মান্য করাই তার জন্য অগ্রগণ্য হবে।

রাসূল (ছাঃ) বলেন, আমি যদি কাউকে কোন মানুষের সিজদা করার আদেশ দিতাম, তাহ’লে স্ত্রীকে তার স্বামীর সামনে সিজদা করতে বলতাম (আবুদাউদ হা/২১৪০; মিশকাত হা/৩২৫৫)। তিনি বলেন, ক্বিয়ামতের দিন সর্বাধিক শাস্তি প্রাপ্ত হবে দু’ধরনের মানুষ। তাদের একজন হ’ল, অবাধ্য স্ত্রী (তিরমিযী হা/৩৫৯, সনদ ছহীহ)।

তবে উভয়ে উভয়ের অধিকারের প্রতি যত্নশীল থাকতে হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমাদের উত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর নিকটে উত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের নিকটে উত্তম’

(তিরমিযী, দারেমী, মিশকাত হা/৩২৫২)।

কেউ যদি হারাম রিলেশন থেকে ফিরে আসতে চায় তখন অপরজন বলে ; ওয়াদা ভঙ্গ করা যায় না,কারো মন ভাংগা মসজিদ ভাংগার সমান ইত্যাদি।এর জবাবে সে কি বলতে পারে?
উত্তর : এগুলো বাজে কথা। প্রবৃত্তি পুজারীদের কথা। এসব কথার সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা থেকে ফিরে আসলে তাওবা করলে আল্লাহ খুশি হন। আর মন রক্ষার যুক্তি দেখিয়ে হারাম কাজ চালু রাখলে শয়তান খুশি হয়। আপনার কার খুশি দরকার?
রাসূল সা. বলেন, “স্রষ্টার নাফরমানী করে সৃষ্টির কারো কথা মানা যাবে না।” (তিরমিযী)
…..Shaikh Abdullah Al Kafi


প্রশ্ন: বখশিশ দেয়া সম্পর্কে শরী‘আতের নির্দেশনা কি?

উত্তর :
মানুষের কোন কাজ দেখে খুশী হয়ে তাকে কিছু প্রদান করার নাম বখশিশ। এটা শরী‘আতে জায়েয। রাবী‘আ বিন কা‘ব আসলামী (রাঃ)-এর কাজের উপর খুশী হয়ে রাসূল (ছাঃ) বলেছিলেন, তুমি আমার কাছে চাও (মুসলিম হা/৪৮৯)। আমর ইবনে সালামা বিন ক্বায়েস (রাঃ) বলেন, আমাকে আমার (বাল্য অবস্থায় ইমামতিতে খুশী হয়ে) মুছল্লীরা একটি জামা উপহার দিয়েছিলেন। তাতে আমি খুব খুশী হয়েছিলাম’ (বুখারী, মিশকাত হা/১১২৬)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা পরস্পরকে হাদিয়া দাও ও মহববত বৃদ্ধি কর’ (ছহীহুল জামে‘ হা/৩০০৪)।

গ্রহীতার কামনা ব্যতীত নিয়োগকর্তা খুশী হয়ে কিছু প্রদান করলে তা প্রদান এবং গ্রহীতার গ্রহণ উভয়টিই জায়েয। রাসূল (ছাঃ) বলেন, কারো নিকটে তার মুসলিম ভাইয়ের পক্ষ থেকে যদি কোন হাদিয়া আসে, অথচ তার প্রতি তার কোন কামনা নেই, এক্ষেত্রে তা ফিরিয়ে না দিয়ে সে যেন তা গ্রহণ করে। কারণ এটা এমন রিযিক, যা আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য ব্যবস্থা করেছেন (আহমাদ; ছহীহাহ হা/১০০৫)।

তবে যদি নিয়োগকর্তা কোন মন্দ উদ্দেশ্য হাছিলের জন্য প্রদান করে, তাহলে তা ঘুষের পর্যায়ভুক্ত হবে। রাসূল (ছাঃ) ঘুষ দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের উপর লা‘নত করেছেন (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৩৭৫৩)।

নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য মজুরীর উপরে কিছু কামনা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নবী করীম (ছাঃ) বলেন, আমরা যাকে অর্থের বিনিময়ে কোন কাজে নিয়োজিত করি, তার অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করলে তা হবে আত্মসাৎ (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৩৭৪৮)।

রাসূল (ছাঃ) জনৈক ব্যক্তিকে যাকাত আদায়ের জন্য কর্মচারী হিসাবে নিয়োগ করলে সে এসে বলল যে, এগুলি জমাকৃত যাকাত এবং এগুলি আমাকে দেওয়া হাদিয়া। এ ঘটনা শুনে ক্রুদ্ধ হয়ে রাসূল (ছাঃ) বলেন, কর্মকর্তাদের কি হ’ল যে তারা এরূপ বলছে! সে তার পিতা-মাতার বাড়িতে বসে থেকে দেখুক তো কে তাকে হাদিয়া দেয়? যে সত্তার হাতে আমার জীবন তার কসম! যা কিছুই সে গ্রহণ করবে ক্বিয়ামতের দিন তা কাঁধে নিয়ে সে হাযির হবে (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৭৭৯)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘কর্মচারীর হাদিয়া গ্রহণ আত্মসাৎ স্বরূপ’ (আহমাদ, ছহীহুল জামে‘ হা/৭০২১)।

তাওবা এবং ইসতিগফার এর মধ্যে কি কোন পার্থক্য আছে?

আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার দুটি দিক রয়েছে: (১) তাওবা এবং (২) ইসতিগফার।

তাওবা অর্থ ফিরে আসা বা প্রত্যাবর্তন করা এবং ইসতিগফার, আস্তাগফিরুল্লাহ বলার অর্থ ক্ষমা প্রার্থনা করা।
উভয়ের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
ইসতিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা, তাওবা বা ফিরে আসার একটি অংশ।
কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনার আলোকে যে কোনো পাপ থেকে তাওবার অর্থ ও শর্ত নিম্নরূপ:
(১) পাপ পরিত্যাগ করা এবং আর কখনো পাপ না করার আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা
(২) পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া
(৩) পাপের সাথে কোনো মানুষের বা সৃষ্টির অধিকার জড়িত থাকলে তা ফেরত দেওয়া
অথবা ক্ষমা চেয়ে নেয়া
(৪) মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া
শর্তগুলি পূরণ করে তাওবা করলে মুমিন সকল পাপের ক্ষমার নিশ্চিত আশা করতে পারেন। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া তাওবার একটি প্রকাশ। তবে অন্যান্য শর্তগুলো পূরণ ছাড়া শুধু ইসতিগফার বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়াতে পরিপূর্ণ তাওবা হয় না।

কেউ যদি শর্তগুলো পূরণ না করে বলেন: ‘আমি তাওবা করছি’ তাহলে তা অতিরিক্ত একটি মিথ্যাচার বলে গণ্য হয় এবং পাপের বোঝা বাড়ে। কারণ বান্দা বলছেন যে, আমি আল্লাহর কাছে ফিরে আসছি, অথচ কার্যত তিনি ফিরে আসছেন না। তিনি আল্লাহর নির্দেশ মত বান্দার হক্ক ফিরিয়ে দেননি এবং পুনরায় পাপ না করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন নি। কাজেই ফিরে আসার বিষয়ে তার ঘোষণাটি মিথ্যা ও পাপ বলে গণ্য।
★★???????★★
[ডঃ খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর-রাহে বেলায়াত-
– পৃ- ৪৯]

✔#প্রশ্ন : পুরুষেরা মাথার মাঝখানে সিঁথি করতে পারে কি? কয় পদ্ধতিতে চুল রাখা যায়?
–
♥উত্তর : পুরুষেরা মাথার মাঝখানে সিঁথি করতে পারে (বুখারী হা/৫৯১৭; মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৪৪২৫) । আর মাথার চুল লম্বা রাখা বা ছোট করে রাখা উভয়টিই জায়েয। এটি ‘সুনানুয যাওয়ায়েদ’ বা অভ্যাসগত সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের সুন্নাতকে প্রতিষ্ঠা করা ভাল। তবে ছেড়ে দেওয়া অপসন্দনীয় নয়’
(শরীফ জুরজানী, কিতাবুত তা‘রীফাত, বৈরূত ছাপা ১৪০৮/১৯৮৮ ‘সুন্নাতের বর্ণনা’ অনুচ্ছেদ, পৃঃ ১২২) ।
বড় চুল তিন পদ্ধতিতে রাখা যায়। যথা (১) ওয়াফরা, যা কানের লতি পর্যন্ত (আবুদাঊদ হা/৪২০৬) (২) লিম্মা, যা ঘাড়ের মধ্যস্থল পর্যন্ত
(মুসলিম হা/২৩৩৭) (৩) জুম্মা, যা ঘাড়ের নীচ পর্যন্ত (নাসাঈ হা/৫০৬৬) ।
ছাহাবী ওয়ায়েল বিন হুজর (রাঃ) একদিন লম্বা চুল নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে এলেন। তখন রাসূল (ছাঃ) মাছি বসবে, মাছি বসবে বলে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন। ফলে তিনি ফিরে গিয়ে পরে চুল কেঁটে খাট করে এলেন। তখন রাসূল (ছাঃ) এটি সুন্দর ( ﻫﺬﺍ ﺃﺣﺴﻦ ) (আবুদাঊদ হা/৪১৯০; ইবনু মাজাহ হা/৩৬৩৬; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী ১/৭৩-৭৪ পৃঃ চুল ছাটা ও মুন্ডনের হুকুম অনুচ্ছেদ)।
#আত-তাহরীক: আগষ্ট 2012

তাওহীদের মৌলিক উপাদান (রুকন) তথা ﻻ ﺇﻟﻪ ﺇﻻ ﻟﻠﻪ ‘র মৌলিক উপাদান

 রুকন হচ্ছে এমন বিষয়, যার অনুপস্থিতিতে অন্য একটি বিষয়ের অনুপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে উঠে। রুকন অবশ্যই মূল বিষয়টির অন্তর্গত হওয়া চাই। যেহেতু রুকন কোন জিনিসের আভ্যন্তরীণ বা ভেতরের বিষয়, সেহেতু শুদ্ধ হওয়ার বিষয়টি এর উপর নির্ভরশীল। অতএব কোন জিনিসের রুকন ব্যতীত তা সহীহ বা শুদ্ধ হয় না। রুকন কি জিনিস, এটা জানার পর আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে যে, যে তাওহীদ আল্লাহ তায়ালা আপনার ওপর ওয়াজিব করে দিয়েছেন, সে তাওহীদেরও সালাতের মতোই রুকন আছে। সালাত যেমন তার রুকন যথা- তাকবীরে তাহরিমা, র�কু, সেজদা, শেষ বৈঠক ইত্যাদি আদায় করা ব্যতীত শুদ্ধ হয় না, কোনো ব্যক্তি যদি সালাতের কোনো রুকন বাদ দেয় তাহলে তার সালাত যেমন ভাবে বাতিল হয়ে যায়, তেমনি ভাবে কোনো ব্যক্তি যদি তাওহীদের কোনো একটি রুকন বাদ দেয়, তাহলে সে ব্যক্তিও আল্লাহর একত্বে বিশ্বাসী ব্যক্তিতে পরিণত হতে পারবে না। এমতাবস্থায় কলেমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ‘ তার কোনো কাজে আসবে না, সে আর মুসলিম থাকবে না বরং সে কাফেরে পরিণত হয়ে যাবে।

//
তাওহীদের দুটি রুকন (মৌলিক উপাদান) তাওহীদের প্রথম রুকন বা মৌলিক বিষয় হচ্ছে “কুফর বিত ত্বাগুত বা তাগুতকে অস্বীকার করা”। আর দ্বিতীয় রুকন বা মৌলিক বিষয় হচ্ছে “ঈমান বিল্লাহ বা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা”। এর প্রমাণ হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালার নিম্মোক্ত বানীঃ “যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করলো আর আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলো, সে এমন এক শক্ত রজ্জু ধারণ করলো যা কখনো ছিড়ে যাবার নয়”। (আল-বাক্বারাহ ২: ২৫৬)
//
ﺎ ﻣ ﺑ ﻠ উপরোক্ত আয়াতের ﻓﻤﻦ ﻳﻜﻔﺮ ﺍﻟﻄﺎﻏﻮﺕ হচেছ ১ম রোকন, ﺆﻥ ﺑ ﮦ ﻝ হচেছ ২য় রোকন এবং ﺍﻟﻌﺮﻭﺓ ﺍﻟﻮﺛﻘﻰ (শক্ত রজ্জু) বলতে কলেমা কে বুঝানো হয়েছে। আর এটাই মূলতঃ তাওহীদের কলেমা।
//
সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদীসে রাস�ল (সঃ) ইরশাদ করেছেনঃ “যে ব্যক্তি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বললো আর আল্লাহ ছাড়া অন্য সকল উপাস্যকে অস্বীকার করলো তার জান ও মাল পবিত্র “(অর্থাৎ কাফেরদের জান ও মালের মতো গনিমতের মাল নয়।) এবং তার হিসাবের ভার আল্লাহর ওপরই ন্যস্ত (অর্থাৎ মনের কুফরীর বিচার আল্লাহই করবেন।)
//
প্রথম রুকনঃ তাগুতকে অস্বীকার করা
প্রিয় পাঠক ! (আল্লাহ আপনাকে সঠিক পথের দিশা দান কর�ন) আপনাকে জেনে রাখতে হবে যে, তাগুতের কুফরী ব্যতীত একজন বান্দা কখনো “মুওয়াহ্যিদ” (আল্লাহর একত্বে বিশ্বাসী) হতে পারে না। আর তাগুত কি জিনিস তা জানা ব্যতীত, তাগুতকে অস্বীকার করা কখনো সম্ভব নয়।
//
তাগুত এর আভিধানিক সংজ্ঞাঃ তাগুত শব্দের অর্থ হচ্ছে সীমালংঘনকারী, আল্লাহদ্রোহী, বিপথে পরিচালনাকারী। তাগুত শব্দটি আরবী (তুগইয়ান) শব্দ থেকে উৎসারিত, যার অর্থ সীমালংঘন করা, বাড়াবাড়ি করা, স্বেচ্ছাচারিতা। শব্দের ক্রিয়ামূল (ত্বগা) এবং বহুবচন । যেমন পানির একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে। নূহ (আঃ) এর সময় যখন জলোচ্ছাস হয়েছিল তখন পানি তার এ সীমা অতিক্রম করেছিল, এ ঘটনাকে কোরআনে এভাবে বলা হয়েছেঃ ‘‘যখন জ্বলোচ্ছাস হয়েছিল তখন আমি তোমাদেরকে চলন্ত নৌযানে আরোহন করিয়েছিলাম”। (সূরা, হাক্কা-৬৯:১১)
কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতায়ালা সাধারণ সীমালংঘন এবং সুনির্দিষ্ট সীমালংঘনের বর্ণনা দিতে ব্যবহার করেছেন। যেমন সাধারন সীমালংঘন অর্থে কোরআনে ক্রিয়াটি ব্যবহৃত হয়েছে-
ﻛَﻼَّ ﺇِﻥَّ ﺍﻹِْﻧﺴَﺎﻥَ ﻟَﻴَﻄْﻐَﻰ অর্থাৎ “বস্তুত মানুষতো সীমালংঘন ( ﻟَﻴَﻄْﻐَﻰ লা ইয়াতগা) করেই থাকে।” (সূরা, ‘আলাক- ৯৬:৬)
//
ﺃَﻻَّ ﺗَﻄْﻐَﻮْﺍ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻤِﻴﺰَﺍﻥِ “যাতে তোমরা সীমালংঘন ( ﺗَﻄْﻐَﻮ লা তাতগা) না কর মানদন্ডে।” (সূরা, আর রাহমান-৫৫:৮)
সুনির্দিষ্ট সীমালংঘন অর্থে ক্রিয়াটি ব্যবহৃত হয়েছে (হালাল খাবার সম্পর্কে): “তোমাদিগকে আমি যা দিয়েছি তা থেকে পবিত্র বস্তুসমূহ খাও এবং সীমালংঘন করো না, তাহলে তোমাদের উপর আমার ক্রোধ নেমে আসবে এবং যার উপর আমার ক্রোধ নেমে আসবে সে ধ্বংস হয়ে যায়।” (সূরা, ত্ব-হাঃ ৮১)
//
যারা অবিশ্বাসী হয়ে সীমালংঘন করে আল্লাহ তাদের জন্যও এ ক্রিয়া ব্যবহার করেছেন। যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যকে রব এবং ইলাহ (ইবাদতের যোগ্য) হিসেবে গ্রহন করে সীমালংঘন করেছে কোরআনে সে কাফিরদেরকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা (ত্বা-গি-ন) বলেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ “আর সীমালংঘনকারীদের (লিত ত্বাগিন) জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট পরিণাম।” (সূরা, ছোয়াদ-৩৮:৫৫) “প্রকাশ করা হবে জাহান্নাম, অনন্তর যে সীমালংঘন করে এবং পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দেয়।” (সূরা, নাযিয়াত-৭৯: ৩৬-৩৮) অর্থাৎ “ছামুদ সম্প্রদায় অবাধ্যতায় (বি ত্বাগওয়াহা~) অস্বীকার করেছিল।” (সূরা, শামস-৯১:১১)
আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তাগুতকে বর্জনের অপরিহার্যতা
প্রত্যেক ব্যক্তির এই জ্ঞান থাকা উচিৎ যে,সমস্ত জীব ও জড়ের সূচনা ও কর্তৃত্ব মহান আল্লাহর।
সালাত, যাকাত বা অন্যান্য ইবাদতের পূর্বে যে দৃঢ় ব্যাপার মহান আল্লাহ আদম (আঃ) এর সন্তানদের আদেশ করেছেন তা হল আল্লাহ তা’য়ালা একত্বের প্রতি ঈমান আনয়ন করা এবং অন্য সমস্ত উপাস্যগুলোকে (তাগুত) পরিত্যাগ ও অস্বীকার করা।
এর জন্যই আল্লাহ জীব সৃষ্টি করলেন, নবীদের প্রেরণ করলেন, আসমানী কিতাবগুলো নাযিল করলেন এবং আদেশ দিলেন জিহাদ ও শাহাদাতের। এর জন্যই মহান আল্লাহর বান্দা ও শয়তানের অনুসারীদের মধ্যে রয়েছে শত্রুতা আর এর দ্বারাই মুসলিম জাতি ও সঠিক খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “আমি সৃষ্টি করেছি জ্বিন এবং মানুষকে এইজন্য যে, তারা আমারই ইবাদত করবে।” (সূরা-যারিয়াত: ৫৬) এর অর্থ একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করা। তিনি আরও বলেনঃ “আল্লাহর ইবাদত করিবার ও তাগুতকে বর্জন করবার নির্দেশ দিবার জন্য আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি।” (সূরা-নাহল: ৩৬)
কোন ইলাহ নাই আল্লাহ ব্যতীত (আক্ষরিক কোন উপাস্য বা ইবাদতের যোগ্য কোন কিছু বা কেউ নাই একমাত্র আল্লাহ ছাড়া), এই বিশ্বাস হচ্ছে ইসলামের মূল বা ভিত্তি। এই বিশ্বাসের অবর্তমানে কোন দাওয়া, জিহাদ, সালাত, সওম, যাকাত বা হজ্জ কিছুই গ্রহণযোগ্য হবে না। কোন ব্যক্তিকেই জাহান্নামের আগুন থেকে বাচাঁনো যাবে না যদি না সে এই ভিত্তির প্রতি ঈমান না এনে থাকে। কারণ এটাই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর বান্দাদের প্রতি আদেশকৃত অলঙ্ঘনীয় ভিত্তি। এই ভিত্তির অবর্তমানে দ্বীন-ইসলামের অন্যান্য স্তম্ভগুলো কোন ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুন হতে নিরাপদে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ “—-যে তাগুতকে অস্বীকার করবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে সে এমন এক মযবুত হাতল ধরবে যা কখনও ভাঙ্গবে না। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা-বাকারা:২৫৬)
মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ “যারা ত্বাগুতের ইবাদত হতে দূরে থাকে এবং আল্লাহর অভিমূখী হয়, তাদের জন্য আছে সুসংবাদ। অতএব সুসংবাদ দাও আমার বান্দাদেরকে।” (সূরা-যুমার:১৭) লক্ষ্য করুন কেমন করে আল্লাহ
তা’আলা তাঁর নিজের প্রতি ঈমান আনার পূর্বে সকল (মিথ্যা) উপাস্যদের অস্বীকার ও অবিশ্বাস করার কথা বলেছেন, যেমন তিনি ঈমান আনয়নের পূর্বে কুফরকে ত্যাগ করার কথা বলেছেন।
//
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এই শব্দগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলার একত্ববাদের আদেশ দিয়েছেন যা কিনা ইসলামের এই মজবুত ভিত্তির গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতির দিকে লক্ষ্য আরোপ করে। অতএব, সকল (মিথ্যা) উপাস্যদের চরম মাত্রায় অস্বীকার করা ব্যতীত মহান আল্লাহর প্রতি একনিষ্ট ঈমান পোষণ করা যায় না। তাগুতকে চেনার পর নিশ্চয়ই তাগুতকে অস্বীকার করার অপরিহার্যতা কি বুঝতে পারছেন। কারণ এটা অসম্ভব যে, কোন ব্যাপারে বিশ্বাস করা, যতক্ষন না এ বিশ্বাসের বিপরীত কিছুকে অস্বীকার ও অবিশ্বাস করা হয়। উদাহরণস্বরুপ কেউ যদি দাবী করে, ‘আমি এক ইলাহকে বিশ্বাস করি।’
অত:পর সে বলল, ‘আমি দুই ইলাহকে বিশ্বাস করি’। ঐ ব্যক্তির দ্বিতীয় উক্তি প্রথম স্বীকারোক্তিকে মিথ্যায় পরিণত করে বা অস্বীকার করে। কারণ দ্বিতীয় উক্তি প্রথম উক্তির সম্পূর্ণ বিপরীত। এর অর্থ হচ্ছে তার একটা দাবী মিথ্যা অথবা উভয়টিই মিথ্যা। এজন্যই ঐরকম উক্তি সত্যকে মিথ্যা এবং অগ্রহনযোগ্য করে দেয়। সুনিশ্চিত সত্য একটা ব্যাপারে দু‘টি বিপরীতমুখী দিক থাকতে পারে না, যা ঐ নিশ্চিত বিষয়কে অস্বীকার করে।
//
তাগুতকে অস্বীকার করা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের অনিবার্য দাবী। তাওহীদের প্রথম রুকনই হচ্ছে তাগুতকে অস্বীকার করা, সুতরাং তাগুতকে বর্জন না করলে আল্লাহর প্রতি ঈমানের দাবী হবে অর্থহীন। ঈমানের প্রথম স্তম্ভ আল্লাহকে বিশ্বাস করা এবং দৃঢ়ভাবে ঘোষনা দেয়া । প্রথম অংশ অস্বীকার করে দ্বিতীয় অংশ এর বিরোধী বা বিপরীত কোন কিছুকে।
//
নিচের আয়াতটি এ বিষয়টি স্পষ্ট করে দেয় যে, ত্বাগুতকে মেনে নেয়া এককভাবে আল্লাহর ইবাদত করার সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক জাতির নিকট রাসুল প্রেরণ করেছি আল্লাহর ইবাদত করার এবং তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দেবার জন্য।” (সূরা, নাহল-১৬:৩৬) সুতরাং যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করল না সে নবীদের মূল দাওয়াতকে অস্বীকার করল এবং মূলতঃ আল্লাহর ইবাদত করতে অস্বীকার করল। কারণ প্রত্যেক নবী তাদের কওমকে তাগুতের ইবাদতকে পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর ইবাদত করার আহবান জানিয়েছিলেন।
//
এখন কেউ যদি নিজেকে ঈমানদার দাবী করে তাকে অবশ্যই তাগুতকে বর্জন করতে হবে। কারণ যে কালেমার স্বীকৃতি দিয়ে সে ইসলামে এসেছে সে কলিমার প্রথমাংশ ঘোষণা করার মাধ্যমে যাবতীয় বাতিল মা‘বুদকে অর্থাৎ তাগুত বর্জনের দৃঢ় ঘোষণা দিয়েছে এবং দ্বিতীয় অংশ ঘোষণার মাধ্যমে একমাত্র আল্লাহকে ইলাহ হিসাবে মেনে নিয়েছে। সুতরাং তাগুতকে বর্জন না করলে ঈমানের দাবী মিথ্যা প্রমানিত হবে। যারা এই তাগুতদের মানে তারা আল্লাহকে মানতে পারে না, আর যারা আল্লাহকে মানে তারা তাগুতদের মানতে পারে না।
তবে হ্যাঁ, এমন অনেক ব্যক্তি আছে আল্লাহকে মানে আবার তাগুতদেরকেও মানে, কিন্তু আসলে যে আল্লাহকে মানা হয় না এ বোধ তাদের নেই। আর বর্তমানে অধিকাংশ লোকদের অবস্থাই এরকম।
//
উদাহরণস্বরূপ, কোরআন মাজীদে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘য়ালা ঐ ব্যক্তির ঈমানের মূল্যহীনতার কথা বলেছেন যে ব্যক্তি নিজেকে ঈমানদার দাবী করে আবার তাগুতের কাছে বিচার-ফায়সালা চায়, আল্লাহ তা‘য়ালা বলেনঃ “আপনি কি তাদেরকে দেখেন নি, যারা দাবী করে যে, আপনার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল করা হয়েছে তার প্রতি তারা ঈমান আনয়ন করেছে। তারা বিরোধপূর্ণ বিষয়কে ফয়সালার জন্য তাগুতের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি তাকে (তাগুতকে) অমান্য করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (আন-নিসাঃ ৬০)
যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে কিংবা আল্লাহর পাশাপাশি তাগুতের ইবাদত করে তাদের উপর আল্লাহর লানৎ বর্ষিত হবে। আল্লাহতা‘য়ালা বলেন- “তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা কিতাবের কিছু অংশ প্রাপ্ত হয়েছে, যারা মান্য করে প্রতিমা ও শয়তানকে এবং কাফেরদেরকে বলে যে, এরা মুসলমানদের তুলনায় অধিকতর সরল সঠিক পথে রয়েছে। এরা হলো সে সমস্ত লোক, যাদের উপর লা’নত করেছেন আল্লাহ তা’আলা স্বয়ং। বস্তুতঃ আল্লাহ যার উপর লা’নত করেন তুমি তার কোন সাহায্যকারী খুঁজে পাবে না”। (সূরা নিসা ৪:৫১-৫২)
পূর্ববর্তী জাতি যারা তাগুতের ইবাদত করেছিল তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেনঃ “বলুনঃ আমি তোমাদেরকে বলি, তাদের মধ্যে কার মন্দ প্রতিফল রয়েছে আল্লাহর কাছে? যাদের প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন, যাদের প্রতি তিনি ক্রোধাম্বিত হয়েছেন, যাদের কতককে বানর ও শুকরে রূপান্তরিত করে দিয়েছেন এবং যারা শয়তানের আরাধনা করেছে, তারাই মর্যাদার দিক দিয়ে নিকৃষ্টতর এবং সত্যপথ থেকেও অনেক দূরে।” (সূরা মায়েদাহ-৫:৬০)
আর যারা তাগুতের ইবাদতকে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহ তাদের সুসংবাদ প্রদান করেনঃ
“যারা শয়তানী শক্তির পূজা-অর্চনা থেকে দূরে থাকে এবং আল্লাহ অভিমুখী হয়, তাদের জন্যে রয়েছে সুসংবাদ। অতএব, সুসংবাদ দিন আমার বান্দাদেরকে।যারা মনোনিবেশ সহকারে কথা শুনে, অতঃপর যা উত্তম, তার অনুসরণ করে। তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।” (সূরা যুমার ৩৯:১৭-১৮)
যারা তাগুতের ইবাদতকে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহ তাদের ওয়ালী হবেনঃ “যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ তাদের অভিভাবক। তাদেরকে তিনি বের করে আনেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে। আর যারা কুফরী করে তাদের অভিভাবক হচ্ছে তাগুত। তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। এরাই হলো দোযখের অধিবাসী, চিরকাল তারা সেখানেই থাকবে”। (সূরা বাকারা ২:২৫৭)
তাগুত শব্দের শর‘য়ী সংজ্ঞা
এখানে আমরা আলোচনা করব তাগুত শব্দের শার’য়ী অর্থ নিয়ে তা, এজন্য যে কোরআন-সু্ন্নাহয় যখন কোন শব্দ ব্যবহৃত হয় তখন তার একটা নির্দিষ্ট শার’য়ী অর্থ দাড়ায়। তাগুত শব্দটি আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত ওহী দ্বারা সাব্যস্ত, যা আক্বীদার সাথে সম্পৃক্ত। তাগুত’ এর ভাষাগত মূল (ত্বা-গি-ন) এর মত একই রকম মূল হলেও তাগুত হচ্ছে সীমালংঘনের সুনির্দিষ্ট ধরণ। সীমালংঘন করলেই ত্বাগুত হয়ে যায় না, যেমন আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন পবিত্র (হালাল) খাবার খাওয়ার জন্য এবং এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি বা সীমালংঘন না করার জন্য (সূরা, ত্ব-হা ২০:৮১)।
এখন কেউ যদি হারাম খায় তাহলে সে ত্বাগুত হয়ে যাবে না, বরং সে অবাধ্য হবে। এরকম অন্যান্য পাপের ক্ষেত্রেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এ ধরনের পাপ বা সীমালংঘন কুফর, শিরক্, নিফাক্ পর্যন্ত পৌছতে পারে কিন্তু এ কারণে কেউ ত্বাগুত হয়ে যায় না। বরং ত্বাগুত হবে ঐ রকম সীমালংঘনের ক্ষেত্রে যখন কোন ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর সাথে শরীক্ করে। সুতরাং একথা সুস্পষ্ট, যে আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত করে সে মুশরিক কিন্তু সে ত্বাগুত নয়। আল্লাহ তাকে ত্বা-গি-ন বলেছেন। আর তাগুত হচ্ছে সে যে নিজেকে (মিথ্যা) রব এবং ইলাহ (অর্থাৎ ইবাদতের যোগ্য) বানিয়ে নেয়। এজন্যই সব তাগুতেরা ত্বা-গি-ন কিন্তু সব ত্বা-গি-নেরা তাগুত নয়।
//
যে ব্যক্তি আল্লাহর অধিকার, গুনাবলী, কার্যাবলী ও সত্তার দাবীতে সীমালংঘন করে সে তাগুত। আল্লাহ ব্যতীত যে কেউ ইবাদত গ্রহন করে বা দাবী করে সে তাগুত এবং যে কেউ আল্লাহর গুনাবলী দাবী করে সেও ত্বাগুত। তাগুত হচেছ সেই ব্যক্তি যে নিজের প্রতি আল্লাহর কার্যাবলী বা গুনাবলী আরোপ করে।
যেমন ফেরাউন আল্লাহ দ্রোহী হয়েছিল এবং সীমালংঘন করেছিল, আল্লাহ সার্বভৌমত্বের মালিক অথচ সে নিজে মিসরের সার্বভৌমত্ব দাবী করেছিল। সে লোকদেরকে জড়ো করে ভাষণ দিয়েছিল যা কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছেঃ “ফেরাউন তার জাতির উদ্দেশ্যে (এক) ভাষণ দিলো। সে বললো, মিশরের সার্বভৌমত্ব কি আমার নয়? তোমরা কি দেখছো না যে, এই নদীগুলো আমার (রাজত্বের) অধীনেই বয়ে চলছে——–।” (সূরা যুখরুফ ৪৩:৫১)
//
আল্লাহতা‘য়ালা তাকে ‘ত্বাগা’ বলেছেন সূরা ত্বাহার ২৪ নং আয়াতে এবং মুসা (আঃ) কে নির্দেশ দিয়েছিলেন তার কাছে যাওয়ার জন্য- “ফেরাউনের নিকট যাও, সে তো সীমালংঘন করেছে।” শরীয়তের পরিভাষায়, এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই তাগুত যে, আল্লাহদ্রোহী হয়েছে এবং সীমালংঘন করেছে, আর আল্লাহর কোনো হককে নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করেছে এবং এমন বিষয়ে নিজেকে আল্লাহর সাথে সমকক্ষ বানিয়েছে, যা একমাত্র আল্লাহর জন্য খাস।
সুস্পষ্ট ভাবে তাগুত এর অর্থ হচ্ছে, কোন মাখলুক (সৃষ্টি) নিন্মোক্ত তিনটি বিষয়ের যে কোন একটি বিষয়কে (আল্লাহর স্থলে) নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করাঃ-কোন মাখলুক (সৃষ্টি) কর্তৃক আল্লাহতা‘য়ালার কার্যাবলীর যে কোন কার্য সম্পাদনের বিষয়টি নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করা।
যেমন সৃষ্টি করা, রিজিক দান অথবা শরীয়ত (বিধান) রচনা। এসব বিষয়গুলো সম্পাদনের ব্যাপারকে যে ব্যক্তি নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করবে (অর্থাৎ কেউ যদি বলে, আমি সৃষ্টি করি,আমি বিধান দেই) সেই তাগুত ।
কোন মাখলুক (সৃষ্টি) আল্লাহতা‘য়ালার কোন সিফাত বা গুন কে নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করা। যেমন ইলমে গায়েব জানা। যদি কেউ তা করে (অর্থাৎ বলে আমি এলমে গায়েব জানি) তাহলে তাকে তাগুত হিসেবে গন্য করা হবে।
যে কোন ইবাদত মাখলুক কর্তৃক (বা সৃষ্টির) এর উদ্দেশ্যে সম্পাদন করা । যেমনঃ দোয়া, মানত, নৈকট্য লাভের জন্য পশু জবাই অথবা বিচার ফায়সালা চাওয়া। যদি (কোন মাখলুক) এসব ইবাদত গ্রহন করে, দাবীকরে, আকাঙ্খা করে অথবা (নিজের জন্য) সম্পাদন করে, তাহলে সেই তাগুত।
এমনকি কেউ তার জন্য ইবাদত নিবেদন করলে যদি সে নীরব থাকে তাহলেও সে ত্বাগুত বলে গন্য হবে, যতক্ষন পর্যন্ত না সে নিজেকে এ থেকে পবিত্র ও মুক্ত করে নেয় এবং এ হক্ আল্লাহর একথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়।
উপরোক্ত যে তিনটি বিষয়ে আলোচনা করেছি, তার যে কোন একটি যদি কেউ নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করে বা নিজের জন্য সম্পাদন করে তাহলে সে তাগুত হিসেবে গন্য এবং নিজেকে আল্লাহর সমকক্ষ করে নিল। ইমাম আত্ তাবারী (রহঃ) বলেন, “আল্লাহর দেয়া সীমালংঘনকারী মাত্রই তাগুত বলে চিহ্নিত, যার অধীনস্থ ব্যক্তিরা চাপের মুখে তার ইবাদত করে বা তাকে তোষামোদ করার জন্য বা তার আনুগত্য প্রকাশ করার জন্য তার ইবাদত করে। এ (তাগুত) উপাস্যটি মানুষ কিংবা শয়তান বা মূর্তি অথবা অন্য যেকোন বস্তু হতে পারে।” (তাফসীরে তাবারী, ইফাবা/৫ম খন্ড, ২৫৬ নং আয়াতের তাফসীর)
//
আল্লামা ড: মুহাম্মদ তকীউদ্দীন হেলালী ও আল্লামা ড: মুহাম্মদ মুহসিন খান কর্তৃক অনুদিত কুরআন মাজীদের ইংরেজী অনুবাদের সূরা বাকারার ২৫৬ নং আয়াতে উল্লেখিত ‘তাগুত’ শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে- “ The word ‘Taaghoot’ covers a wide range of meaning: it means everything worshipped other that Allah, i.e. all false deities. It may be satan, devils,idols, stones, sun, stars, human beings.” অর্থাৎ “তাগুত” শব্দটি বিস্তৃত অর্থ বোঝায়ঃ এটার অর্থ আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত করা হয়। যেমন সকল মিথ্যা উপাস্য; এটা শয়তান, মৃত ব্যক্তির আত্মা, মুর্তি, পাথর, সূর্য, তারকা, অথবা কোন মানুষও হতে পারে। (The Noble Qur’an .English Translation , পৃষ্ঠা ৫৮)
সাইয়্যেদ কুতুব (রহ:) বলেন, “তাগুত বলতে সেইসব ব্যক্তি ও ব্যবস্থাকে বোঝায় যেগুলো ঐশী দ্বীন এবং নৈতিক, সামাজিক ও আইন-শৃঙ্খলাকে অবমাননা করে এবং আল্লাহ নির্দেশিত বা তার দেয়া দিক-নির্দেশনা থেকে উদ্ভুত নয় এমন সব মূল্যবোধ ও রীতিনীতির ভিত্তিতে এই জীবন ব্যবস্থা পরিচালনা করে।” (তাফসীরে ফি যিলালিল কোরআন)
ইমাম মালেক (রহ:) তাগুতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেনঃ “এমন প্রত্যেক জিনিসকেই তাগুত বলা হয়, আল্লাহ তা‘য়ালাকে বাদ দিয়ে যার ইবাদত করা হয়।” (ফতহুল ক্বাদীর, আল্লামা শওক্বানী) এ সংজ্ঞাটি উত্তম এবং ব্যাপক অর্থজ্ঞাপক। আল্লাহ ব্যতীত যারই ইবাদত করা হয় সেই এ সংজ্ঞার অন্তর্ভূক্ত। যেসব উপাস্যকে ‘তাগুত’ হিসেবে গন্য করা হয় সেগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ
=মূর্তি, এমন সব কবর, গাছ, পাথর ও অচেতন পদার্থ যে গুলোর উপাসনা করা হয়;
=আল্লাহর আইন ব্যাতীত এমন সব আইন যার মাধ্যমে বিচার ফায়সালা চাওয়া হয়;
=এমনসব বিচারক তাগুতের অন্তর্ভূক্ত যারা আল্লাহর আইনের বিরোধী আইনদ্বারা মানুষের মধ্যে বিচার ফায়সালা করে;
=শয়তান, যাদুকর, গনক (যারা ইলমে গায়েবের ব্যাপারে কথা বলে);
উপাস্য হতে যে রাজী;
=যারা আইন রচনা বা মানুষের জন্য হালাল-হারাম নির্ধারণ করে কিংবা করার অধিকার রাখে বলে মনে করে;
প্রধান প্রধান তাগুত
তাগুতের সংখ্যা অনেক। তবে পাঁচ ধরণের তাগুত নেতৃত্বের আসনে রয়েছেঃ
১. গায়রুলাহর ইবাদতের দিকে আহবানকারী শয়তান;
২. আল্লাহর আইন পরিবর্তনকারী জালেম শাসক;
৩. আল্লাহ তা‘য়ালার নাযিলকৃত বিধান ছাড়া যে বিচার-ফায়সালা করে;
৪. আল্লাহ ব্যতীত যে ব্যক্তি এলমে গায়েব জানে বলে দাবী করে;
৫. আল্লাহ ছাড়া যার ইবাদত করা হয় এবং সে এই ইবাদত গ্রহণে রাজি বা খুশি থাকে।⁠⁠⁠⁠

Translate