Wednesday, December 8, 2021

মৃত স্বামী বা স্ত্রীকে দেখতে ও গোসল করাতে না দেয়া ও মৃত্যু সংবাদ প্রচার

 জাল হাদীছের কবলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্বলাত- এর অংশবিশেষ

শায়খ মুযাফফর বিন মুহসিন

কুধারণা চালু আছে যে, স্বামী বা স্ত্রী কেউ মারা গেলে অপরের জন্য তালাক হয়ে যায়। তাই তাকে গোসল দেয়া কিংবা দেখতে দেয়া নাজায়েয। সমাজে উক্ত অভ্যাস ব্যাপকভাবে প্রচলিত। কথিত আলেমরাও এ ফৎওয়া জারি করে রেখেছেন। অথচ এটা মূর্খতা ও সুন্নাতের বিরুদ্ধাচরণ। কারণ উক্ত মর্মে স্পষ্ট সহিহ হাদীছ এসেছে। মৃত স্বামী বা স্ত্রীকে

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ رَجَعَ رَسُوْلُ اللهِ مِنَ الْبَقِيْعِ فَوَجَدَنِىْ وَأَنَا أَجِدُ صُدَاعًا فِىْ رَأْسِىْ وَأَنَا أَقُوْلُ وَارَأْسَاهُ فَقَالَ بَلْ أَنَا يَا عَائِشَةُ وَارَأْسَاهُ ثُمَّ قَالَ مَا ضَرَّكِ لَوْ مِتِّ قَبْلِىْ فَقُمْتُ عَلَيْكِ فَغَسَّلْتُكِ وَكَفَّنْتُكِ وَصَلَّيْتُ عَلَيْكِ وَدَفَنْتُكِ.

আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ﷺ) বাক্বীউল গারক্বাদ থেকে যখন ফিরে আসলেন, তখন তিনি আমাকে মাথার যন্ত্রণা অবস্থায় পেলেন। আমি বলছিলাম, হ্যায় আমার মাথা ব্যথা! তখন রাসূল (ﷺ) বলছিলেন, আয়েশা! বরং আমার মাথায় ব্যথা হয়েছে। অতঃপর তিনি বলেন, তোমার কোন সমস্যা নেই। তুমি যদি আমার পূর্বে মারা যাও তবে আমি তোমার পাশে থাকব, তোমাকে গোসল দিব, তোমাকে কাফন পরাব এবং তোমার জানাযার স্বলাত আদায় করব।[1]

عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ غَسَّلْتُ أَنَا وَعَلِىٌّ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ فَاطِمَةَ بِنْتَ رَسُوْلِ اللهِ

আসমা বিনতে উমাইস (রাঃ) বলেন, আমি এবং আলী (রাঃ) রাসূল (ﷺ)-এর কন্যা ফাতেমাকে গোসল দিয়েছি।[2] অন্য দিকে আয়েশা (রাঃ) বলেন, لَوِ اسْتَقْبَلْتُ مِنْ أَمْرِىْ مَا اسْتَدْبَرْتُ مَا غَسَّلَهُ إِلاَّ نِسَاؤُهُ ‘পরে যা জানলাম তা যদি আগে জানতাম, তবে রাসূল (ﷺ)-কে তাঁর স্ত্রীরা ছাড়া কেউ গোসল দিতে পারত না’।[3]

অতএব স্বামী আগে মারা গেলে স্ত্রী, কিংবা স্ত্রী আগে মারা গেলে স্বামী উভয় উভয়কে গোসল দেয়ার বেশী হকদার। এর বিরুদ্ধাচরণ করার অর্থই হল শরী‘আতের মর্যাদা নষ্ট করা। মৃত্যুর পর সম্পদের ভাগাভাগি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, অথচ তাকে দেখতে পারবে না, গোসল দিতে পারবে না কেন? এগুলো স্রেফ মূর্খতা।

[1]. ইবনু মাজাহা হা/১৪৬৫, পৃঃ ১০৫, ‘জানাযা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৯; সনদ হাসান, ইরওয়াউল গালীল হা/৭০০, ৩/১৬০ পৃঃ।
[2]. হাকেম হা/৪৭৬৯; বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা হা/৬৯০৭; বায়হাক্বী, মা‘রেফাতুস সুনান ওয়াল আছার হা/২১৫৭; দারাকুৎনী হা/১৮৭৩; সনদ হাসান, ইওয়াউল গালীল হা/৭০১।
[3]. আবুদাঊদ হা/৩১৪১, ২/৪৪৮ পৃঃ, ‘জানাযা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩২; সনদ হাসান, ইরওয়াউল গালীল হা/৭০২, ৩/১৬২ পৃঃ।

 (৪) মারা যাওয়ার পর চুল, নখ ইত্যাদি কাটা :

 মারা যাওয়ার পর মৃত ব্যক্তির চুল-নখ কাটা উচিত নয়। এটি বহুল প্রচলিত বিদ‘আত। ঐভাবেই দাফন করতে হবে। এর পক্ষে যে বর্ণনাটি রয়েছে তা যঈফ।

عَنْ سَعْدِ بْنِ مَالِكٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ إِنَّهُ غَسَّلَ مَيْتًا فَدَعَا بِالْمُوْسَى فَحَلَقَ عَانَتَهُ.

সা‘দ বিন মালেক (রাঃ) বলেন, তিনি একদা এক মৃত ব্যক্তিকে গোসল দিচ্ছিলেন, তখন তিনি খুর নিয়ে আসালেন এবং নাভীর নীচের লোম কেটে দিলেন।[1]

তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি যঈফ। কারণ আবু ক্বেলাব নামে একজন রাবী আছেন, যার সাথে সা‘দ ইবনু মালেকের সাক্ষাৎ হয়নি। অথচ তার থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।[2]

জ্ঞাতব্য : মৃত ব্যক্তিকে গোসলের পূর্বে কুলুখ করানো, খিলাল করা, পেট টিপে ও উঠা বসা করিয়ে ময়লা বের করা এগুলো সব বিদ‘আতী প্রথা। এ সমস্ত কুসংস্কার থেকে সাবধান থাকতে হবে।

[1]. মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক হা/৪২৩৫; মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ ৩/২৪৭।
[2]. তানক্বীহুল কালাম ফিল আহাদীছিয যঈফাহ ফী মাসাইলিল আহকাম, পৃঃ ৪৭৫।

 (৫) সাত কিংবা পাঁচ কাপড়ে কাফন পরানো :

পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য তিন কাপড়ে কাফন পরানোই সহিহ হাদীছ সম্মত। মহিলাদেরকে পাঁচ কিংবা সাত কাপড়ে কাফন দেয়ার যে বর্ণনা প্রচলিত আছে, তা সহিহ নয়।

 (أ) عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَلِىٍّ ابْنِ الْحَنَفِيَّةِ عَنْ أَبِيْهِ أَنَّ النَّبِىَّ كُفِّنَ فِىْ سَبْعَةِ أَثْوَابٍ

(ক) মুহাম্মাদ ইবনু আলী তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সাত কাপড়ে কাফন দেয়া হয়েছিল।[1]

তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি যঈফ। এর সনদে ইবনু আক্বীল নামে একজন ত্রুটিপূর্ণ রাবী আছে।[2]

 (ب) عَنْ لَيْلَى بِنْتِ قَانِفٍ الثَّقَفِيَّةِ قَالَتْ كُنْتُ فِيْمَنْ غَسَّلَ أُمَّ كُلْثُوْمٍ بِنْتَ رَسُوْلِ اللهِ عِنْدَ وَفَاتِهَا فَكَانَ أَوَّلُ مَا أَعْطَانَا رَسُوْلُ اللهِ الْحِقَاءَ ثُمَّ الدِّرْعَ ثُمَّ الْخِمَارَ ثُمَّ الْمِلْحَفَةَ ثُمَّ أُدْرِجَتْ بَعْدُ فِى الثَّوْبِ الآخِرِ قَالَتْ وَرَسُوْلُ اللهِ جَالِسٌ عِنْدَ الْبَابِ مَعَهُ كَفَنُهَا يُنَاوِلُنَاهَا ثَوْبًا ثَوْبًا.

(খ) লায়লা ইবনু কানেফ বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মেয়ে উম্মে কুলছূমের মৃত্যুর পর যারা গোসল দিয়েছিল, তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। রাসূল (ﷺ) আমাদের প্রথম দিলেন তহবন্দ। তারপর দিলেন জামা, তারপর উড়না, তারপর চাদর দিলেন। অতঃপর সবশেষে একটি কাপড় দ্বারা তাকে ঢেকে দেয়া হল। তিনি বলেন, এমতাবস্থায় রাসূল (ﷺ) দরজায় বসেছিলেন। তার কাছে কাপড় ছিল। তিনি সেখান থেকে একটি একটি করে দিচ্ছিলেন।[3]

তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি যঈফ। এর সনদে নূহ বিন হাকীম ছাক্বাফী নামে এক অপরিচিত রাবী আছে।[4] উল্লেখ্য যে, রাসূল (ﷺ)-এর কন্যার কাফন পরানোর সময় পাঁচ কাপড় দেয়া হয়েছিল মর্মে জাওযাক্বী অতিরিক্ত যে অংশটুকু করেছেন তা যঈফ ও মুনকার।[5] অনুরূপ হাসান বছরীর উক্তিতে পাঁচ কাপড়ে কাফন দেওয়ার যে কথা বর্ণিত হয়েছে, এই বর্ণনার আলোকে সেটাও যঈফ।[6]

[1]. আহমাদ হা/৭২৮ ও ৮০১ ১/৯৪।
[2]. সিলসিলা যঈফাহ হা/৫৮৪৪; তানক্বীহুল কালাম, পৃঃ ৪৭৮।
[3]. আবুদাঊদ হা/৩১৫৭, ২/৪৫০ পৃঃ, ‘জানাযা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩৬; আহমাদ হা/২৭১৭৯, ৬/৩৮০।
[4]. ইরওয়াউল গালীল হা/৭২৩, ৩/১৭৩ পৃঃ; যঈফ আবুদাঊদ হা/৩১৫৭, পৃঃ ৪৮৩; আহকামুল জানায়েয, পৃঃ ৫৮ وأما حديث ليلى بنت قائف الثقفية في تكفين ابنته في خمسة أبواب فلا يصح إسناده لان فيه نوح بن حكيم الثقفي وهو مجهول كما قال الحافظ ابن حجر; বিস্তারিত আলোচনা দ্রঃ সিলসিলা যঈফাহ হা/৫৮৪৪।
[5]. ফাৎহুল বারী ‘জানাযা’ অধ্যায়, ১৫ নং অনুচ্ছেদের আলোচনা দ্রঃ; বিস্তারিত আলোচনা দ্রঃ সিলসিলা যঈফাহ হা/৫৮৪৪।
[6]. قَالَ الْحَسَنُ الْخِرْقَةُ الْخَامِسَةُ تَشُدُّ بِهَا الْفَخِذَيْنِ وَالْوَرِكَيْنِ تَحْتَ الدِّرْعِ -বুখারী ১/১৬৮ পৃঃ, ‘জানাযা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৫।

 তিন কাপড়ে কাফন দেয়ার সহিহ হাদীছ :

 عَنْ عَائِشَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْها أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ كُفِّنَ فِىْ ثَلاَثَةِ أَثْوَابٍ لَيْسَ فِيْهَا قَمِيْصٌ وَلاَ عِمَامَةٌ .

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ)-কে তিনটি কাপড়ে কাফন দেয়া হয়েছিল। তাতে জামা এবং পাগড়ী ছিল না।[1]

অতএব পুরুষ নারী উভয়কে তিন কাপড়ে কাফন দিতে হবে। এর বেশী নয়। কারণ মহিলাদেরকে পাঁচ কাপড়ে কাফন দেয়া সম্পর্কে কোন সহিহ বর্ণনা নেই।

 عَنْ رَاشِدِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ قَالَ عُمَرُ يُكَفَّنُ الرَّجُلُ فِىْ ثَلاَثَةِ أَثْوَابٍ لاَ تَعْتَدُوْا إنَّ اللهَ لاَ يُحِبُّ الْمُعْتَدِيْنَ.

রাশেদ বিন সা‘দ বলেন, ওমর (রাঃ) বলেছেন, পুরুষ ব্যক্তিকে তিন কাপড়ে কাফন দিতে হবে। সীমা লংঘন করা যাবে না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমা লংঘনকারীদের পসন্দ করেন না।[2] আলবানী (রহঃ) বলেন,

 وَمِمَّا لاَ شَكَّ فِيْهِ أَنَّ النِّسَاءَ فِىْ ذَلِكَ كَالرِّجَالِ لِأَنَّهُ الْأَصْلَ كَمَا يُشْعَرُ بِذَلِكَ قَوْلِهِ إِنَّمَا النِّسَاءُ شَقَائِقُ الرِّجَالِ.

‘এতে কোন সন্দেহ নেই যে, মহিলারাও এ বিষয়ে পুরুষদের ন্যায়। কারণ পুরুষই মূল। যেমন রাসূল (ﷺ)-এর বক্তব্য দ্বারা বুঝা যায়। ‘মহিলারা মূলতঃ পুরুষদেরই খন্ড’।[3] আবুবকর (রাঃ)-এর অছিয়তটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ।[4]

[1]. সহিহ বুখারী হা/১২৭২, ১/১৬৯ পৃঃ, (ইফাবা হা/১১৯৭, ২/৩৭০ পৃঃ); সহিহ মুসলিম হা/২২২৫; মিশকাত হা/১৬৩৫, পৃঃ ১৪৩; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১৫৪৭, ৪/৪৯ পৃঃ।
[2]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/১১১৬৪, সনদ সহিহ, সিলসিলা যঈফাহ হা/৫৮৪৪-এর আলোচনা দ্রঃ।
[3]. সিলসিলা যঈফাহ হা/৫৮৪৪-এর আলোচনা দ্রঃ; তিরমিযী হা/১১৩; মিশকাত হা/৪৪১।
[4]. সহিহ বুখারী হা/১৩৮৭, ১/১৮৬ পৃঃ, (ইফাবা হা/১৩০৪, ২/৪২৯ পৃঃ), ‘জানাযা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৯৪। আয়েশা (রাঃ) বলেন, فَنَظَرَ إِلَى ثَوْبٍ عَلَيْهِ كَانَ يُمَرَّضُ فِيهِ بِهِ رَدْعٌ مِنْ زَعْفَرَانٍ فَقَالَ اغْسِلُوْا ثَوْبِى هَذَا وَزِيدُوا عَلَيْهِ ثَوْبَيْنِ فَكَفِّنُونِى فِيهَا قُلْتُ إِنَّ هَذَا خَلَقٌ قَالَ إِنَّ الْحَىَّ أَحَقُّ بِالْجَدِيدِ مِنَ الْمَيِّتِ إِنَّمَا هُوَ لِلْمُهْلَةِ فَلَمْ يُتَوَفَّ حَتَّى أَمْسَى مِنْ لَيْلَةِ الثُّلاَثَاءِ وَدُفِنَ قَبْلَ أَنْ يُصْبِحَ ।

 (৬) কালেমা পড়া ব্যক্তির জানাযা পড়া :

 দ্বীন ইসলামের আরকান ও আহকাম পালন না করলে এবং স্বলাত আদায় না করে শুধু কালেমা পড়ে মারা গেলে তার জানাযা পড়তে হবে, এরূপ কোন বিধান শরী‘আতে নেই। যে কোনদিন স্বলাত আদায় করেনি এবং রাসূল (ﷺ)-এর আদর্শ মোতাবেক জীবন যাপন করেনি, তার উপর জানাযা পড়তে হবে কেন? কবরে রাখার সময় রাসূল (রাঃ)-এর ত্বরীকায় ছিল বলে কেন সাক্ষী দিতে হবে? এর পক্ষে যে হাদীছ বর্ণিত হয়েছে, তা যঈফ।

عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلُّوْا عَلَى مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَصَلُّوْا خَلْفَ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ.

ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলেছে, তার জানাযার স্বলাত পড়। অনুরূপ তার পিছনেও স্বলাত আদায় কর।[1]

তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি নিতান্তই যঈফ। এর সনদে ওছমান বিন আব্দুর রহমান নামে একজন যঈফ রাবী আছে। ইবনু মাঈন তাকে মিথ্যুক বলেছেন।[2] উল্লেখ্য যে, তাদের মত লোকেরাই তাদের জানাযা পড়বে। কোন দ্বীনী আলেম ও পরহেযগার ব্যক্তি তার স্বলাতে হাযির হবে না।[3]

[1]. দারাকুৎনী হা/১৭৮১ ও ১৭৮২।
[2]. বিস্তারিত দ্রঃ ইরওয়াউল গালীল হা/৫২৭, ২/৩০৫ পৃঃ- وهذا سند واه جدا عثمان بن عبد الرحمن هو الزهري الوقاصي متروك وكذبه ابن معين।
[3]. বুখারী হা/২২৮৯, ১/৩০৫ পৃঃ, (ইফাবা হা/২১৪৪, ৪/১৩২ পৃঃ); মিশকাত হা/২৯০৯, পৃঃ ২৫২, ‘ক্রয়-বিক্রয়’ অধ্যায়, ‘ইফলাস’ অনুচ্ছেদ; বুখারী হা/৪২৩৪, ‘মাগাযী’ অধ্যায়, ‘খায়বারের যুদ্ধ’ অনুচ্ছেদ-৩৮; মুসলিম হা/৩২৫; মিশকাত হা/৩৯৯৭।

 (৭) তাকবীর দেওয়ার সময় একবার হাত উত্তোলন করা :

 জানাযার স্বলাত আদায়ের সময় প্রত্যেক তাকবীরেই দুই হাত উত্তোলন করা দলীল সম্মত। একবার হাত উত্তোলন করার হাদীছ যঈফ।

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهُ كَبَّرَ عَلَى جَنَازَةٍ فَرَفَعَ يَدَيْهِ فِى أَوَّلِ تَكْبِيْرَةٍ وَوَضَعَ الْيُمْنَى عَلَى الْيُسْرَى.

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একদা জানাযার স্বলাত পড়ালেন। তিনি প্রথম তাকবীরে হাত তুললেন এবং ডান হাত বাম হাতের উপর রাখলেন।[1]

তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি যঈফ। ইমাম তিরমিযী বলেন,

هَذَا حَدِيْثٌ غَرِيْبٌ لاَ نَعْرِفُهُ إِلاَّ مِنْ هَذَا الْوَجْهِ وَاخْتَلَفَ أَهْلُ الْعِلْمِ فِى هَذَا فَرَأَى أَكْثَرُ أَهْلِ الْعِلْمِ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِىِّ وَغَيْرِهِمْ أَنْ يَرْفَعَ الرَّجُلُ يَدَيْهِ فِى كُلِّ تَكْبِيرَةٍ عَلَى الْجَنَازَةِ وَهُوَ قَوْلُ ابْنِ الْمُبَارَكِ وَالشَّافِعِىِّ وَأَحْمَدَ وَإِسْحَاقَ وَقَالَ بَعْضُ أَهْلِ الْعِلْمِ لاَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ إِلاَّ فِىْ أَوَّلِ مَرَّةٍ وَهُوَ قَوْلُ الثَّوْرِىِّ وَأَهْلِ الْكُوْفَةِ.

‘এই হাদীছ গরীব। উক্ত সূত্র ছাড়া আর অন্য কোন সূত্র আমাদের জানা নেই। আলেমগণ উক্ত বিষয়ে মতানৈক্য করেছেন। ছাহাবায়ে কেরাম এবং অন্যান্যদের অধিকাংশই মনে করেন, মুছল্লী জানাযার প্রত্যেক তাকবীরেই দুই হাত উত্তোলন করবে। আর এটাই ইবনুল মুবারক, শাফেঈ, আহমাদ, ইসহাক্ব-এর বক্তব্য। আর কতিপয় আলেম বলেন, মাত্র একবার হাত উত্তোলন করবে। আর এটা ছাওরী এবং কূফাবাসীর বক্তব্য’।[2]

জ্ঞাতব্য : জানাযার প্রত্যেক তাকবীরে দুই হাত উত্তোলন করতে হবে মর্মে রাসূল (ﷺ) থেকে কোন সহিহ হাদীছ নেই।[3] তবে অনেক ছাহাবী থেকে সহিহ আছার বর্ণিত হয়েছে। তাই প্রত্যেক তাকবীরেই হাত উত্তোলন করা উচিত।

عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّهُ كَانَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ عَلَى كُلِّ تَكْبِيْرَةٍ مِنْ تَكْبِيْرِ الْجَنَازَةِ

ইবনু ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি জানাযার প্রত্যেক তাকবীরে দুই হাত উত্তোলন করতেন।[4] ইমাম বুখারী (রহঃ)ও উক্ত আছারের বিষয়টি ইঙ্গিত করেছেন।[5]

[1]. তিরমিযী হা/১০৭৭, ১/২০৬ পৃঃ; দারাকুৎনী ২/৭৭।
[2]. তিরমিযী হা/১০৭৭, ১/২০৬ পৃঃ-এর আলোচনা।
[3]. সিলসিলা যঈফাহ হা/১০৪৫।
[4]. বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা হা/৭২৪৩; সুনানুছ ছুগরা হা/৮৬৬; সনদ সহিহ, আহকামুল জানাইয, পৃঃ ১১৭- نعم روى البهقي (৪ / ৪৪) بسند صحيح عن ابن عمر أنه كان يرفع يديه على كل تكبيرة من تكبيرات الجنازة فمن كان يظن أنه لا يفعل ذلك إلا بتوقيف من النبي صلى الله عليه وسلم فله أن يرفع।
[5]. সহিহ বুখারী হা/১৩২২-এর আলোচনা দ্রঃ, ‘জানাযা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫৬, ১/১৭৮ পৃঃ, (ইফাবা হা/১২৪৪-এর আলোচনা, ২/৩৯৬; ফাৎহুল বারী ৩/২৪৫ পৃঃ। শায়খ বিন বায উক্ত হাদীছ সম্পর্কে বলেন, وهى مقبولة على الراجح عند أئمة الحديث ويكون ذلك دليلا على شرعية رفع اليدين فى تكبيرات الجنازة।

 (৮) মৃত্যু ব্যক্তির কোন অঙ্গের উপর জানাযা করা :

 অনেক স্থানে মৃতের অঙ্গের উপর জানাযা পড়ার ফৎওয়া দেয়া হয়। অথচ উক্ত মর্মে যে সমস্ত বর্ণনা প্রচলিত আছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।

عَنِ الشَّعْبِىِّ قَالَ بَعَثَ عَبْدُ الْمَلِكِ بْنِ مَرْوَانَ بِرَأْسِ عَبْدِ اللهِ بْنِ الزُّبَيْرِ إَلِى ابْنِ حَازِمٍ بِخُرَاسَانَ فَكَفَّنَهُ وَ صَلَّى عَلَيْهِ.

শা‘বী বলেন, আব্দুল মালেক বিন মারওয়ান আব্দুল্লাহ বিন যুবাইরের মাথা পাঠান ইবনু হাযেমের কাছে। তিনি তার কাফন পরান ও জানাযা করেন।[1]

তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি যঈফ। এর সনদে ছায়েদ বিন মুসলিম নামে যঈফ ও পরিত্যক্ত রাবী আছে।[2] ইমাম শা‘বী বলেন, সে ভুল করেছে। তিনি মাথার উপর জানাযা পড়েননি।[3]

 عَنْ أَبِىْ أَيُّوْبَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ صَلَّى عَلَى رِجْلٍ.

আবু আইয়ূব (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি পায়ের উপর জানাযা পড়েছিলেন।[4] অন্য বর্ণনায় রয়েছে,عَنْ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ صَلَّى عَلَى عِظَامٍ بِالشَّامِ ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি সিরিয়ায় হাড়ের উপর জানাযা পড়েছিলেন।[5]

তাহক্বীক্ব উক্ত বর্ণনাগুলোর সহিহ কোন ভিত্তি নেই।[6]

[1]. হাকেম হা/৬৩৪১, ৩/৫৫৩।
[2]. তানক্বীহুল কালাম, পৃঃ ৪৯০।
[3]. أخطأ لا يصلى على الرأس -হাকেম হা/৬৩৪১, ৩/৫৫৩।
[4]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/১২০২৪, ৩/৩৬৫।
[5]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, ১২০২৫, ৩/৩৬৫।
[6]. দ্রঃ তানক্বীহুল কালাম ফিল আহাদীছিয যঈফাহ ফী মাসাইলিল আহকাম, পৃঃ ৪৯০-৪৯১; ইরওয়াউল গালীল হা/৭১৫, ৩/১৬৯ পৃঃ।

 (৯) মসজিদে জানাযা পড়তে নিষেধ করা :

প্রয়োজনে মসজিদে জানাযা পড়া যায়। অথচ অনেকে বাধা দিয়ে থাকে। এখানেও যঈফ হাদীছের ভূমিকা আছে।

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ مَنْ صَلَّى عَلَى جَنَازَةٍ فِى الْمَسْجِدِ فَلاَ شَىْءَ عَلَيْهِ.

আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি মসজিদে জানাযা পড়বে তার জন্য কোন কিছুই নেই। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তার উপর কিছুই নেই।[1]

তাহক্বীক্ব : উক্ত বর্ণনার সনদে ছালেহ মাওলা তাওআমাহ নামে একজন রাবী আছে সে দুর্বল। ইমাম আহমাদও তাকে যঈফ বলেছেন।[2] বরং প্রয়োজনে মসজিদে জানাযার স্বলাত আদায় করা যাবে। যেমন-

عَنْ أَبِىْ سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ أَنَّ عَائِشَةَ لَمَّا تُوُفِّىَ سَعْدُ بْنُ أَبِى وَقَّاصٍ قَالَتِ ادْخُلُوْا بِهِ الْمَسْجِدَ حَتَّى أُصَلِّىَ عَلَيْهِ فَأُنْكِرَ ذَلِكَ عَلَيْهَا فَقَالَتْ وَاللهِ لَقَدْ صَلَّى رَسُولُ اللهِ عَلَى ابْنَىْ بَيْضَاءَ فِى الْمَسْجِدِ سُهَيْلٍ وَأَخِيهِ.

আবু সালামা বিন আব্দুর রহমান হতে বর্ণিত, যখন সা‘দ বিন আবী ওয়াক্কাছ মারা গেলেন, তখন আয়েশা (রাঃ) বললেন, তোমরা তার লাশ মসজিদে নিয়ে আস; যাতে আমি জানাযা পড়তে পারি। এতে তার প্রতি অস্বীকৃতি জানান হলে তিনি বলেন, নিশ্চয় রাসূল (ﷺ) বায়যার দুই সন্তান সুহাইল ও তার ভাইয়ের জানাযা মসজিদে পড়েছিলেন।[3]

[1]. আবুদাঊদ হা/৩১৯১, ২/৪৫৪ পৃঃ; ইবনু মাজাহ হা/১৫১৭; আহমাদ ৫/৪৫৫।
[2]. আলবানী, আছ-ছামারুল মুস্তাত্বাব, পৃঃ ৭৬৬।
[3]. মুসলিম হা/২২৯৮, ১/৩১২ পৃঃ, ‘জানাযা’ অধ্যায়, ‘মসজিদে জানাযা পড়া’ অনুচ্ছেদ-৩৪, (ইফাবা হা/২১২৩); মিশকাত হা/১৬৫৬, পৃঃ ১৪৫; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১৫৬৭, ৪/৫৭ পৃঃ।

 (১০) মৃত্যু সংবাদ প্রচার করা :

মৃত্যু সংবাদ প্রচার করা জাহেলী আদর্শ। এ ব্যাপারে রাসূল (ﷺ) কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। হুযায়ফাহ (রাঃ) বলেন, يَنْهَى عَنِ النَّعْيِ রাসূল (ﷺ) মৃত্যু সংবাদ প্রচার করতে নিষেধ করতেন।[1] মৃত্যু সংবাদ প্রচারের নামে শোক প্রকাশ করে কোন লাভ হয় না। শুধু লোক দেখানোই হয়। তার প্রমাণ হল, সব জানাযাতে লোকের সংখ্যা এক রকম হয় না। কারো জানাযায় হাযার হাযার লোক হয়, আবার কারো জানাযায় একশ’ লোকও জুটে না। অথচ সব মাইয়েতের জন্যই মাইকিং করা হয়। সুতরাং এতে কোন ফায়েদা নেই। এটা মূলতঃ ব্যক্তির প্রসিদ্ধি ও গুণের কারণ। তাছাড়া শুভাকাঙ্খী হলে এমনিতেই সে মৃত্যু সংবাদ শুনতে পাবে, মাইকিং করে জানানো লাগবে না।

উল্লেখ্য যে, মারা যাওয়ার পূর্বে প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত তার উত্তরসূরী ও আত্মীয়-স্বজনকে অছিয়ত করে যাওয়া, যেন তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিদ‘আতী কর্মকান্ড অনুষ্ঠিত না হয়। বিশেষ করে বিলাপ করা ও বিভিন্ন কথার মাধ্যমে শোক প্রকাশ করা। কারণ সাবধান করে না গেলে বা এর প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে এ জন্য তাকে কবরে শাস্তি দেওয়া হবে। রাসূল (ﷺ) বলেন,

أَلاَ تَسْمَعُوْنَ إِنَّ اللهَ لاَ يُعَذِّبُ بِدَمْعِ الْعَيْنِ وَلاَ بِحُزْنِ الْقَلْبِ وَلَكِنْ يُعَذِّبُ بِهَذَا وَأَشَارَ إِلَى لِسَانِهِ أَوْ يَرْحَمُ وَإِنَّ الْمَيِّتَ يُعَذَّبُ بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ. وَكَانَ عُمَرُ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ يَضْرِبُ فِيْهِ بِالْعَصَا وَيَرْمِىْ بِالْحِجَارَةِ وَيَحْثِى بِالتُّرَابِ.

‘তোমরা কি শুননি, নিশ্চয়ই আল্লাহ চোখের কান্না ও অন্তরের চিন্তার কারণে শাস্তি দিবেন না; বরং তিনি শাস্তি দিবেন এর কারণে। অতঃপর তিনি তার জিহবার দিকে ইঙ্গিত করলেন। অথবা তার উপর রহম করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মাইয়েতকে তার পরিবারের কান্নার কারণে শাস্তি দেন। ওমর (রাঃ) এ জন্য লাঠিপেটা করতেন, পাথর মারতেন এবং মাটি নিক্ষেপ করতেন।[2]

[1]. তিরমিযী হা/৯৮৬, ১/১৯২ পৃঃ; ইবনু মাজাহ হা/১৪৭৬, পৃঃ ১০৬, ‘জানাযা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৪, সনদ হাসান।
[2]. সহিহ বুখারী হা/১৩০৪, ১/১৭৪ পৃঃ, (ইফাবা হা/১২২৬, ২/৩৮৭ পৃঃ); সহিহ মুসলিম হা/২১৭৬; মিশকাত হা/১৭২৪; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১৬৩২, ৪/৮৪, ‘জানাজা’ অধ্যায়।

>>>কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ Hadithonlinebd.com<<<

জানাযায় সূরা ফাতিহা না পড়া ও মৃত ব্যক্তি ভাল ছিল কি-না জিজ্ঞেস করা

 জাল হাদীছের কবলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্বলাত- এর অংশবিশেষ

শায়খ মুযাফফর বিন মুহসিন

 মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে জনগণের কাছে এ ধরণের স্বীকারোক্তি নেওয়া শরী‘আত সম্মত নয়। তবে মানুষ নিজেদের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছায় যা বলবে সেটাই মৃত ব্যক্তির জন্য গৃহীত হবে। খারাপ মন্তব্য হোক বা ভাল হোক।[1] ফেরেশতাগণ এর প্রতি আমীন বলেন।[2] তবে মৃত ব্যক্তির গুণ উল্লেখ করা সম্পর্কে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ। জানাযায় সূরা ফাতিহা না

عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ اذْكُرُوْا مَحَاسِنَ مَوْتَاكُمْ وَكُفُّوْا عَنْ مَسَاوِيْهِمْ.

‘তোমরা তোমাদের মৃত ব্যক্তিদের উত্তম কার্যসমূহ উল্লেখ করবে এবং তাদের মন্দকর্ম উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকবে’।[3]

তাহক্বীক্ব : উক্ত বর্ণনা যঈফ ও মুনকার। ইমাম তিরমিযী হাদীছটি বর্ণনা করে বলেন, هَذَا حَدِيْثٌ غَرِيْبٌ سَمِعْتُ مُحَمَّدًا يَقُوْلُ عِمْرَانُ بْنُ أَنَسٍ الْمَكِّىُّ مُنْكَرُ الْحَدِيْثِ ‘এই হাদীছটি গরীব। আমি ইমাম বুখারীকে বলতে শুনেছি যে, ইমরান ইবনে আনাস আল-মাক্কী পরিত্যক্ত রাবী’।[4] সুতরাং উক্ত অভ্যাস সত্বর পরিত্যাজ্য।

[1]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, বুখারী হা/১৩৬৭, ১/১৮৩ পৃঃ, (ইফাবা হা/১২৮৩, ২/৪১৮ পৃঃ); মিশকাত হা/১৬৬২।
[2]. মুসলিম হা/২১৬৮ ও ২১৬৯, ১/৩০০ পৃঃ, (ইফাবা হা/১৯৯৮), ‘জানাযা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-২; মিশকাত হা/১৬১৭ ও ১৬১৯, পৃঃ ১৪১।
[3]. আবুদাঊদ হা/৪৯০০, ২/৬৭১ পৃঃ, ‘আদব’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫০; মিশকাত হা/১৬৭৮, পৃঃ ১৪৭।
[4]. যঈফ তিরমিযী হা/১০১৯, ১/১৯৮ পৃঃ।

 (১২) জানাযার স্বলাতে ছানা পড়া :

অধিকাংশ মানুষ জানাযার স্বলাতে ছানা পড়ে থাকে। অথচ ছানা পড়ার পক্ষে কোন দলীল নেই।

 (১৩) জানাযার স্বলাতে সূরা ফাতিহা না পড়া :

অন্যান্য স্বলাতের ন্যায় জানাযার স্বলাতেও সূরা ফাতিহা পড়া রাসূল (ﷺ) ও ছাহাবায়ে কেরামের অব্যাহত আমল। সূরা ফাতিহা ছাড়া কোন স্বলাতই হবে না মর্মে অনেক সহিহ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানাযার স্বলাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করে না। অথচ রাসূল (ﷺ) থেকে এর বিপক্ষে কোন সহিহ হাদীছ নেই। যে সমস্ত বর্ণনা বাজারে প্রচলিত আছে, সেগুলো বিভিন্ন ছাহাবী, তাবেঈ, তাবে তাবেঈদের নামে বর্ণিত হয়েছে। যেমন-

عَنْ نَافِعٍ أَنَّ عَبْدَ اللهِ بْنَ عُمَرَ كَانَ لَا يَقْرَأُ فِى الصَّلَاةِ عَلَى الْجَنَازَةِ.

নাফে’ আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি জানাযার স্বলাতে ক্বিরাআত পড়তেন না।[1] অন্য বর্ণনায় এসেছে,قَالَ سَالِمٌ لاَ قِرَاءَةَ عَلَى الْجِنَازَةِ সালেম বলেন, জানাযার স্বলাতে কোন ক্বিরাআত নেই।[2] ইমাম মালেক (রহঃ)-কে সূরা ফাতিহা পড়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,لَيْسَ ذَلِكَ بِمَعْمُوْلٍ بِهِ بِبَلَدِنَا إنَّمَا هُوَ الدُّعَاءُ أَدْرَكْتُ أَهْلَ بَلَدِنَا عَلَى ذَلِكَ ‘আমাদের শহরে এর প্রতি আমল নেই। এটা মূলতঃ দু‘আ। আমাদের শহরবাসীকে এর উপরই পেয়েছি’।[3]

জ্ঞাতব্য : ‘মাযহাবীদের স্বরূপ সন্ধানে’ বইয়ে উক্ত বর্ণনাকে পরিবর্তন করে নিম্নরূপে উল্লেখ করা হয়েছে- قراءة الفاتحة ليس معمولا بها فى بلدنا فى صلاة الجنازة। অতঃপর মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বার উদ্ধৃতি পেশ করা হয়েছে। অথচ উক্ত শব্দে কোন বর্ণনাই নেই এবং মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বার মধ্যেও নেই।[4] হাদীছ পরিবর্তনের সাহস থাকার কারণেই এমনটি সম্ভব হয়েছে।

 عَنِ ابْنِ مَسْعُوْدٍ أَنَّهُ سُئِلَ عَنْ صَلَاةِ الْجَنَازَةِ هَلْ يُقْرَأُ فِيْهَ؟ فَقَالَ لَمْ يُوَقِّتْ لَنَا رَسُوْلُ اللهِ قَوْلًا وَلَا قِرَاءَةً وَفِىْ رِوَايَةٍ دُعَاءً وَلَا قِرَاءَةً كَبِّرْ مَا كَبَّرَ الْإِمَامُ وَاخْتَرْ مِنْ أَطْيَبِ الْكَلَامِ مَا شِئْت وَفِىْ رِوَايَةٍ وَاخْتَرْ مِنْ الدُّعَاءِ أَطْيَبَهُ وَرُوِيَ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ وَابْنِ عُمَرَ أَنَّهُمَا قَالَا لَيْسَ فِيْهَا قِرَاءَةُ شَيْءٍ مِنْ الْقُرْآنِ وَلِأَنَّهَا شُرِعَتْ لِلدُّعَاءِ.

ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তাকে একদা জানাযার স্বলাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল যে, উহাতে ক্বিরাআত করতে হবে কি? তিনি উত্তরে বলেন, রাসূল (ﷺ) আমাদের জন্য কোন কথা ও ক্বিরাআত নির্দিষ্ট করেননি। অন্য বর্ণনায় এসেছে, দু‘আ ও ক্বিরাআত নির্দিষ্ট করেননি। সুতরাং ইমাম যেমন ক্বিরাআত করেন তেমন তুমি ক্বিরাআত করবে এবং তোমার ইচ্ছানুযায়ী উত্তম কথা বলবে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, উত্তম দু‘আ বলবে। আব্দুর রহমান বিন আওফ ও ইবনু ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তারা বলেছেন, জানাযার স্বলাতে কুরআন হতে কোন ক্বিরাআত নেই। কারণ উহা দু‘আর জন্য বিধিবদ্ধ।[5]

তাহক্বীক্ব : উক্ত মর্মে আরো অনেক বর্ণনা বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বার মধ্যে। কিন্তু কোন বর্ণনা রাসূল (ﷺ) থেকে আসেনি। এগুলো সহিহ হাদীছ সমূহের বিরোধী হওয়ায় তা গ্রহণযোগ্য নয়।

জ্ঞাতব্য : মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বার মধ্যে সূরা ফাতিহা পড়ার বিপক্ষে বর্ণনা পেশ করার পূর্বে সূরা ফাতিহা পড়ার পক্ষে ১১টি বর্ণনা পেশ করা হয়েছে।[6] কিন্তু ‘মাযহাব বিরোধীদের স্বরূপ সন্ধানে’ বইয়ে শুধু বিপক্ষের বর্ণনাগুলো উল্লেখ করা হয়েছে।[7] অতঃপর লেখা হয়েছে, ‘এছাড়া আরো অসংখ্য হাদীস এবং সাহাবী ও তাবেয়ীদের আছার বর্ণিত আছে যা, এই ছোট্ট কলেবরে উল্লেখ করা সম্ভব না। যার দ্বারা প্রমাণিত হয় জানাযায় সূরা ফাতিহা না পড়াই সুন্নত। এবং পড়া সুন্নতের পরিপন্থি যা গায়রে মুকাল্লিদগণ করে থাকেন। সম্মানিত পাঠক! আপনারাই ফয়সালা করুন এটা কি হাদীসের উপর আমল? না হাদীসের বিরোধীতা’।[8]

সুধী পাঠক! তথ্য গোপন করে শরী‘আতের নামে এভাবে যদি মিথ্যাচার করা হয়, তাহলে সরলপ্রাণ সাধারণ মুসলিমরা কোথায় যাবে? উদ্ভট বর্ণনাগুলো পেশ করে প্রতিনিয়ত কোটি কোটি মুসলিমকে এভাবেই ধোঁকা দেয়া হচ্ছে। নিম্নে বর্ণিত হাদীছ ও আছারগুলো লক্ষ্য করলেই আশা করি তাদের ধোঁকাবাজি আরো প্রমাণিত হবে ইনশাআল্লাহ।

[1]. মুওয়াত্ত্বা মালেক হা/৪৮১, ১/২১।
[2]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/১১৫৩২, ৩/২৯৯।
[3]. আল-মুদাওয়ানাহ ১/৪৪২ পৃঃ।
[4]. মাযহাব বিরোধীদের স্বরূপ সন্ধানে, পৃঃ ৩১৬।
[5]. বাদায়েউছ ছানাঈ ১/৩১৩; মুগনী ২/২৮৫।
[6]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/১১৫১১-১১৫২১।
[7]. ঐ, পৃঃ ৩১৬-৩১৯।
[8]. ঐ, পৃঃ ৩১৯।

 জানাযার স্বলাতে সূরা ফাতিহা পড়ার সহিহ হাদীছ সমূহ :

রাসূল (ﷺ) এবং ছাহাবায়ে কেরাম জানাযার স্বলাতে সূরা ফাতিহা পড়তেন। এর পক্ষে অনেক হাদীছ বর্ণিত হয়েছে।

 عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ النَّبِيَّ قَرَأَ عَلَى الْجَنَازَةِ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ.

ইবনু আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) জানাযার স্বলাতে সূরা ফাতিহা পড়েছেন।[1]

উল্লেখ্য, উক্ত হাদীছটি সনদগতভাবে দুর্বল। তবে এর পক্ষে সহিহ বুখারীতে হাদীছ থাকার কারণে শায়খ আলবানী (রহঃ) এই সনদকে সহিহ বলেছেন এবং সহিহ তিরমিযী ও সহিহ ইবনে মাজার মধ্যে উল্লেখ করেছেন।[2] ইমাম তিরমিযীও একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন,

حَدِيْثُ ابْنِ عَبَّاسٍ حَدِيْثٌ لَيْسَ إِسْنَادُهُ بِذَلِكَ الْقَوِيِّ إِبْرَاهِيْمُ بْنُ عُثْمَانَ هُوَ أَبُو شَيْبَةَ الْوَاسِطِيُّ مُنْكَرُ الْحَدِيْثِ وَالصَّحِيْحُ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَوْلُهُ مِنْ السُّنَّةِ الْقِرَاءَةُ عَلَى الْجَنَازَةِ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ.

‘ইবনু আববাসের হাদীছের সনদ নির্ভরযোগ্য নয়। এর মাঝে ইবরাহীম বিন ওছমান আছে। আর সে হল আবু শায়বাহ আল-ওয়াসেত্বী। অস্বীকৃত রাবী’। সহিহ হল, ইবনু আববাস বর্ণিত হাদীছ। তার বক্তব্য হল- ‘জানাযায় সূরা ফাতিহা পাঠ করা সুন্নাত’। অতঃপর ইমাম তিরমিযী (রহঃ) নিম্নের হাদীছটি উল্লেখ করেন,

عَنْ طَلْحَةَ بْنِ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَوْفٍ أَنَّ ابْنَ عَبَّاسٍ صَلَّى عَلَى جَنَازَةٍ فَقَرَأَ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ فَقُلْتُ لَهُ فَقَالَ إِنَّهُ مِنْ السُّنَّةِ أَوْ مِنْ تَمَامِ السُّنَّة.

ত্বালহা বিন আব্দুল্লাহ বিন আউফ হতে বর্ণিত, ইবনু আববাস (রাঃ) একদা জানাযার স্বলাত পড়ালেন। তাতে তিনি সূরা ফাতিহা পড়েন। আমি তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এটা সুন্নাত অথবা সুন্নাতের পূর্ণতা।[3] নিম্নের হাদীছটি সহিহ বুখারীতে এসেছে,

عَنْ طَلْحَةَ بْنِ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَوْفٍ قَالَ صَلَّيْتُ خَلْفَ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا عَلَى جَنَازَةٍ فَقَرَأَ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ قَالَ لِيَعْلَمُوْا أَنَّهَا سُنَّةٌ.

ত্বালহা বিন আব্দুল্লাহ বিন আওফ (রাঃ) বলেন, আমি একদা ইবনু আববাস (রাঃ)-এর পিছনে জানাযার স্বলাত আদায় করলাম। তাতে তিনি সূরা ফাতিহা পাঠ করেন। অতঃপর তিনি বলেন, তারা যেন জানতে পারে সূরা ফাতিহা পাঠ করা সুন্নাত।[4] অন্য হাদীছে সূরা ফাতিহার সাথে অন্য একটি সূরা পাঠ করার কথা এসেছে,

عَنْ طَلْحَةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَوْفٍ قَالَ صَلَّيْتُ خَلْفَ ابْنِ عَبَّاسٍ عَلَى جَنَازَةٍ فَقَرَأَ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ وَسُوْرَةٍ وَجَهَرَ حَتَّى أَسْمَعَنَا فَلَمَّا فَرَغَ أَخَذْتُ بِيَدِهِ فَسَأَلْتُهُ فَقَالَ سُنَّةٌ وَحَقٌّ.

ত্বালহা বিন আব্দুল্লাহ বিন আওফ (রাঃ) বলেন, আমি একদা ইবনু আববাস (রাঃ)-এর পিছনে জানাযার স্বলাত আদায় করলাম। তাতে তিনি সূরা ফাতিহা এবং অন্য একটি সূরা পাঠ করলেন। তিনি ক্বিরাআত জোরে পড়ে আমাদের শুনালেন। তিনি যখন স্বলাত শেষ করলেন তখন আমি তাকে উক্ত বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এটা সুন্নাত এবং হক্ব। [5]

عَنْ رَجُلٍ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِىِّ أَنَّ السُّنَّةَ فِى الصَّلاَةِ عَلَى الْجَنَازَةِ أَنْ يُكَبِّرَ الإِمَامُ ثُمَّ يَقْرَأُ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ بَعْدَ التَّكْبِيرَةِ الأُولَى سِرًّا فِىْ نَفْسِهِ ثُمَّ يُصَلِّى عَلَى النَّبِىِّ وَيُخْلِصُ الدُّعَاءَ لِلْجَنَازَةِ فِى التَّكْبِيْرَاتِ لاَ يَقْرَأُ فِىْ شَىْءٍ مِنْهُنَّ ثُمَّ يُسَلِّمُ سِرًّا فِىْ نَفْسِهِ. وَزَادَ الْأَثْرَمُ السُّنَّةُ يَفْعَلُ مَنْ وَرَاءَ الْإِمَامِ مِثْلَ مَا يَفْعَلُ إِمَامُهُمْ.

রাসূল (ﷺ)-এর জনৈক ছাহাবী থেকে বর্ণিত আছে যে, নিশ্চয় সুন্নাত হল-জানাযার স্বলাতে ইমাম তাকবীর দিবেন এবং প্রথম তাকবীরের পর নীরবে মনে মনে সূরা ফাতিহা পাঠ করবেন। অতঃপর বাকী তাকবীরগুলোতে রাসূল (ﷺ)-এর উপর দরূদ পড়বেন। তারপর মৃত ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্টভাবে দু‘আ করবেন। সেই তাকবীরগুলোতে কোন কিছু পাঠ করবে না। অতঃপর নীরবে সালাম ফিরাবেন। আছরাম অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম যা করবেন মুক্তাদীরাও তা-ই করবে।[6]

عَنِ الزُّهْرِيِّ قَالَ سَمِعْتُ أَبَا أُمَامَةَ يُحَدِّثُ سَعِيْدَ بْنَ الْمُسَيَّبِ قَالَ مِنَ السُّنَّةِ فِي الصَّلاَةِ عَلَى الْجِنَازَةِ أَنْ تَقْرَأَ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ ثُمَّ تُصَلِّيَ عَلَى رَسُوْلِ اللهِ ثُمَّ يُخْلِصَ الدُّعَاءَ لِلْمَيِّتِ حَتَّى يَفْرُغَ وَلاَ تَقْرَأَ إِلاَّ مَرَّةً وَاحِدَةً ثُمَّ تُسَلِّمَ فِيْ نَفْسِكِ.

যুহরী বলেন, আবু উমাম (রাঃ)-কে সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব-এর নিকট হাদীছ বর্ণনা করতে শুনেছি যে, জানাযার স্বলাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা সুন্নাত। অতঃপর রাসূল (ﷺ)-এর উপর দরূদ পাঠ করবে। তারপর মাইয়েতের জন্য একনিষ্ঠচিত্তে দু‘আ করবে। প্রথম তাকবীর ছাড়া অন্য সময়ে কিছু পাঠ করবে না। তারপর তুমি সালাম ফিরাবে।[7]

জ্ঞাতব্য : সূরা ফাতিহা না পড়ার আমল মূলতঃ ইরাকের কূফায় আবিষ্কার হয়েছে। সহিহ সুন্নাহ্র সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। যেমনটি ইমাম তিরমিযী উল্লেখ করেছেন।[8] উল্লেখ্য যে, জানাযার স্বলাতে সূরা ফাতেহা পাঠ করার বিরুদ্ধে একশ্রেণীর আলেম বিরাট প্রতারণা ও ধোঁকাবাজিরও আশ্রয় নিয়েছেন। যেমন মাওলানা আব্দুল মতিন প্রণীত ‘দলিলসহ স্বলাতের মাসায়েল’ বইয়ে কিছু যঈফ, জাল ও মিথ্যা বর্ণনা পেশ করে পাঠক সমাজকে ধোঁকা দেয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু উক্ত সহিহ হাদীছগুলো তার চোখে পড়েনি। তিনি গোপন করেছেন।[9] চোখ থেকেও তিনি অন্ধত্বের পরিচয় দিয়েছেন (সূরা আ‘রাফ ১৭৯)। আল্লাহ হেদায়াত দান করুন- আমীন!!

[1]. সহিহ তিরমিযী হা/১০২৬, ১/১৯৮-৯৯ পৃঃ; মিশকাত হা/১৬৭৩, পৃঃ ১৪৬; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১৫৮৩, ৪/৬৪ পৃঃ, ‘জানাযা’ অধ্যায়, ‘জানাযার সাথে গমন ও জানাযার স্বলাত’ অনুচ্ছেদ।
[2]. তিরমিযী হা/১০২৬, ১/১৯৯ পৃঃ; ইবনু মাজাহ হা/১৪৯৫, পৃঃ ১০৭, ‘জানাযা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-২২।
[3]. তিরমিযী হা/১০২৭-এর আলোচনা, ১/১৯৮-৯৯ পৃঃ।
[4]. সহিহ বুখারী হা/১৩৩৫, ১/১৭৮ পৃঃ, (ইফাবা হা/১২৫৪, ২/৪০০ পৃঃ), ‘জানাযা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৬৫; মিশকাত হা/১৬৫৪, পৃঃ ১৪৫; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১৫৬৫, ৪/৫৬ পৃঃ।
[5]. নাসাঈ হা/১৯৮৭, ১/২১৮ পৃঃ, ‘জানাযা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৭৭; আবুদাঊদ হা/৩১৯৮, ২/৪৫৬ পৃঃ।
[6]. বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা হা/৭২০৯; সনদ সহিহ, ইওয়াউল গালীল হা/৭৩৪; আহকামুল জানাইয, পৃঃ ১২১; বায়হাক্বী, সুনানুছ ছুগরা হা/৮৬৮; ত্বাহাবী হা/২৬৩৯।
[7]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/১১৪৯৭; ইরওয়াউল গালীল হা/৭৩৪-এর আলোচনা দ্রঃ, ৩/১৮১ পৃঃ।
[8]. তিরমিযী হা/১০২৭, ১/১৯৯ পৃঃ-এর আলোচনা দ্রঃ- وَقَالَ بَعْضُ أَهْلِ الْعِلْمِ لاَ يُقْرَأُ فِى الصَّلاَةِ عَلَى الْجَنَازَةِ إِنَّمَا هُوَ ثَنَاءٌ عَلَى اللهِ وَالصَّلاَةُ عَلَى النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالدُّعَاءُ لِلْمَيِّتِ وَهُوَ قَوْلُ الثَّوْرِىِّ وَغَيْرِهِ مِنْ أَهْلِ الْكُوفَةِ.।
[9]. মাওলানা আব্দুল মতিন, দলিলসহ স্বলাতের মাসায়েল, পৃঃ ১৫২-১৫৭।

 (১৪) মৃত ব্যক্তিকে কবরে চিত করে শোয়ানো :

মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখার সময় চিত করে শোয়ানো এবং বুকের উপর হাত জোড় করে রাখার যে রেওয়াজ প্রচলিত আছে, তার শারঈ কোন ভিত্তি নেই। বরং তাকে ডান কাতে রাখতে হবে এবং হাত স্বাভাবিকভাবে থাকবে। সাময়িক মৃত্যু বা ঘুমানোর সময় ডান কাতে ঘুমাতে হয়।[1] চিত হয়ে ঘুমানোর কোন বিধান নেই। অথচ চির দিনের জন্য কবরে শোয়ানোর সময় মৃত ব্যক্তিকে কেন চিত করে শোয়ানো হয়? নিম্নের হাদীছটি লক্ষণীয়-

عَنْ جَابِرٍ قَالَ سَأَلْتُ الشَّعْبِيَّ عَنِ الْمَيِّتِ يُوَجَّهُ لِلْقِبْلَةِ قَالَ إِنْ شِئْتَ فَوَجِّهْ وَإِنْ شِئْتَ فَلاَ تُوَجِّهْ لَكِنِ اجْعَلِ الْقَبْرَ إِلَى الْقِبْلَةِ قَبْرُ رَسُوْلِ اللهِ وَقَبْرُ عُمَرَ وَقَبْرُ أَبِيْ بَكْرٍ إِلَى الْقِبْلَةِ.

জাবের বলেন, আমি শা‘বী (রহঃ)-কে মৃত ব্যক্তিকে ক্বিবলামুখী করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম? তিনি বললেন, চাইলে ক্বিবলামুখী কর, না হয় না কর। তবে কবরে ক্বিবলামুখী করে রাখো। কারণ রাসূল (ﷺ), আবুবকর, ওমর (রাঃ)-কে কবরে ক্বিবলামুখী করে রাখা হয়েছে।[2] ইবনু হাযম আন্দালুসী (৩৮৪-৪৫৬ হিঃ) বলেন,

وَيُجْعَلُ الْمَيِّتُ فِىْ قَبْرِهِ عَلَى جَنْبِهِ الْيَمِيْنِ وَوَجْهُهُ قُبَالَةَ الْقِبْلَةِ … عَلَى هَذَا جَرَى عَمَلُ أَهْلِ الإِسْلاَمِ مِنْ عَهْدِ رَسُوْلِ اللهِ إِلَى يَوْمِنَا هَذَا وَهَكَذَا كُلُّ مَقْبَرَةٍ عَلَى ظَهْرِ الأَرْضِ.

‘মৃত ব্যক্তিকে কবরে ডান পাশে রাখবে। আর মুখটাকে ক্বিবলার দিকে করে রাখবে।.. রাসূল (ﷺ)-এর যুগ থেকে আমাদের এই যুগ পর্যন্ত মুসলিমদের এই আমল জারি আছে। পৃথিবীর বুকে প্রত্যেক কবর এমনই হয়’।[3] শায়খ আব্দুল আযীয বিন আব্দুললাহ বিন বায (রহঃ) এক প্রশ্নের জবাবে বলেন,

إِنَّ الْمَيِّتَ يُوْضَعُ مِنْ جِهَةِ رِجْلَىَ الْقَبْرِ ثُمَّ يُسَلُّ إِلَى جِهَةِ رَأْسِهِ عَلَى جَنْبِهِ الْأَيْمَنِ مُسْتَقْبِلاَ الْقِبْلَةِ هَذَا هُوَ الْأَفْضَلُ وَالسُّنَّةُ.

‘মাইয়েতকে কবরের দুই পায়ের দিক থেকে রাখবে। অতঃপর ক্বিবলামুখী করে ডান পাশে রাখবে। এটাই উত্তম এবং সুন্নাত।[4] কবরে মৃত ব্যক্তির হাত কোথায় থাকবে মর্মে ইসহাক্ব ইবনু রাহওয়াইহ (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, পার্শ্বে থাকবে।[5]

[1]. সহিহ বুখারী হা/২৪৭, ১/৩৮ পৃঃ, হা/৬৩১১, ৬৩১৫; সহিহ মুসলিম হা/৭০৬৪ ও ৭০৬৭; মিশকাত হা/২৩৮৪, ২৩৮৫।
[2]. মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক হা/৬০৬১।
[3]. ইবনু হাযম আন্দালুসী, আল-মুহাল্লা ৫/১৭৩ পৃঃ; আলবানী, আহকামুল জানাইয, পৃঃ ১৫১।
[4]. আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায, মাজমূউ ফাতাওয়া ১৩/১৯০ পৃঃ; ফাতাওয়া লাজনা দায়েমাহ ৮/৪২৬ পৃঃ, ‘জানাযা’ অধ্যায়, ‘দাফনের পদ্ধতি’ অনুচ্ছেদ; তালখীছুল হাবীর ২/৩০১ পৃঃ।
[5]. قلت لإسحاق إذا وضع الميت في اللحد كيف يصنع بيده؟ قال: تحت جنبه- মাসাইলে ইমাম আহমাদ ও ইসহাক্ব ইবনু রাহওয়াইহ, ফাতাওয়া নং ৩৪০৩।

 (১৫) মাটি দেয়ার সময় ‘মিনহা খালাক্বনা-কুম… দু‘আ পড়া :

 মাটি দেওয়ার সময় সাধারণ দু‘আ হিসাবে শুধু ‘বিসমিল্লাহ’ বলবে।[1] এ সময় ‘মিনহা খালাক্বনা-কুম’.. দু‘আ পড়ার শারঈ কোন ভিত্তি নেই। তবে কবরে লাশ রাখার সময় উক্ত দু‘আ পড়া সম্পর্কে মুসনাদে আহমাদে যে হাদীছ বর্ণিত হয়েছে, তা নিতান্তই যঈফ; বরং কেউ জাল বলেছেন।

(أ) عَنْ أَبِىْ أُمَامَةَ قَالَ لَمَّا وُضِعَتْ أُمُّ كُلْثُوْمٍ ابْنَةُ رَسُوْلِ اللهِ فِى الْقَبْرِ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ( مِنْهَا خَلَقْنَاكُمْ وَفِيْهَا نُعِيْدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أُخْرَى) قَالَ ثُمَّ لاَ أَدْرِىْ أَقَالَ بِسْمِ اللهِ وَفِىْ سَبِيْلِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ أَمْ لاَ..

(ক) আবু উমামা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ﷺ)-এর কন্যা উম্মু কুলছূমকে যখন কবরে রাখা হয়, তখন রাসূল (ﷺ) বলেছিলেন, ‘মিনহা খালাক্বনা-কুম ওয়া ফীহা নুঈদুকুম ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা’। অতঃপর তিনি ‘বিসমিল্লা-হি ওয়া ফী সাবীলিল্লা-হি ওয়া ‘আলা মিল্লাতি রাসূলিল্লা-হি’ বললেন কি-না আমি জানি না।[2]

তাহক্বীক্ব : উক্ত বর্ণনা যঈফ কিংবা জাল। এর সনদে আলী ইবনু যায়েদ ইবনু জুদ‘আন ও উবায়দুল্লাহ বিন যাহ্র নামে দুইজন পরিত্যক্ত রাবী আছে।[3]

 (ب) عَنْ سَعِيْدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ قَالَ حَضَرْتُ ابْنَ عُمَرَ فِىْ جِنَازَةٍ فَلَمَّا وَضَعَهَا فِى اللَّحْدِ قَالَ بِسْمِ اللهِ وَفِىْ سَبِيْلِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ فَلَمَّا أُخِذَ فِىْ تَسْوِيَةِ اللَّبِنِ عَلَى اللَّحْدِ قَالَ اللَّهُمَّ أَجِرْهَا مِنَ الشَّيْطَانِ وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ اللَّهُمَّ جَافِ الأَرْضَ عَنْ جَنْبَيْهَا وَصَعِّدْ رُوْحَهَا وَلَقِّهَا مِنْكَ رِضْوَانًا قُلْتُ يَا ابْنَ عُمَرَ أَشَىْءٌ سَمِعْتَهُ مِنْ رَسُوْلِ اللهِ أَمْ قُلْتَهُ بِرَأْيِكَ قَالَ إِنِّىْ إِذًا لَقَادِرٌ عَلَى الْقَوْلِ بَلْ شَىْءٌ سَمِعْتُهُ مِنْ رَسُوْلِ اللهِ .

(খ) সাঈদ ইবনু মুসাইয়াব (রাঃ) বলেন, আমি একদা ইবনু ওমর (রাঃ)-এর সাথে এক জানাযায় উপস্থিত হয়েছিলাম। যখন জানাযাকে লাহাদে রাখা হল তখন তিনি বললেন, ‘বিসমিল্লা-হি ওয়া ফী সাবীলিল্লা-হি ওয়া ‘আলা মিল্লাতি রাসূলিল্লা-হি’। অতঃপর যখন লাহাদে ইট দেয়া শুরু হল তখন তিনি বললেন, ‘আল্লাহুম্মা আজিরহা মিনাশ শায়ত্ব-নির রজীম ওয়া মিন আযাবিল কবরি। আল্লা-হুম্মা জাফিল আরযা আন জানবাইহা ওয়া ছাই‘য়িদ রূহাহা ওয়া লাক্কিহা মিনকা রিযওয়ানা’। আমি বললাম, হে ইবনু ওমর (রাঃ)! আপনি কি এটা রাসূল (ﷺ) থেকে শুনেছেন না নিজে থেকেই বললেন? তিনি বললেন, আমি কি কোন কথা বলার সাধ্য রাখি? বরং আমি এটি রাসূল (ﷺ)-এর কাছে শুনেছি। [4]

তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি যঈফ। এর সনদে হাম্মাদ ইবনু আব্দুর রহমান নামে প্রসিদ্ধ যঈফ রাবী আছে।[5]

জ্ঞাতব্য : প্রচলিত আছে যে, প্রথম মুষ্টিতে বলতে হবে ‘মিনহা খালাক্বনা-কুম’ দ্বিতীয় মুষ্টিতে বলতে হবে ‘ওয়া ফীহা নুঈদুকুম’ এবং তৃতীয় মুষ্টিতে বলতে হবে ‘ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা’। উক্ত দাবীর পক্ষে কোন দলীল নেই।

[1]. মুসলিম হা/৮৫২; মিশকাত হা/৪৫৬; বুখারী হা/৫৬২৩; মুসলিম হা/৫৩৬৬; মিশকাত হা/৪২৯৪।
[2]. মুসনাদে আহমাদ হা/২২২৪১।
[3]. আহমাদ ৫/২৫৪; তাক্বরীবুত তাহযীব, পৃঃ ৪০১; ডঃ আব্দুল করীম বিন আব্দুল্লাহ আল-খাযীর, আল-হাদীছুয যঈফ ওয়া হুকমুল ইহতিজাজি বিহী (রিয়াযঃ দারুল মুসলিম, ১৯৯৭/১৪১৭), পৃঃ ২৮৩-৮৪।
[4]. ইবনে মাজাহ হা/১৫৫৩, পৃঃ ১১১, ‘জানাযা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩৮।
[5]. যঈফ ইবনে মাজাহ হা/১৫৫৩।

 

>>>কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ Hadithonlinebd.com<<<

জানাযার স্বলাতের পর কিংবা দাফনের পর মুনাজাত করা ও দাফন করার পর করণীয়

 জানাযার স্বলাত পর কিংবা দাফনের পর মুনাজাত করা ও দাফন করার পর করণীয়

জাল হাদীছের কবলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্বলাত- এর অংশবিশেষ
শায়খ মুযাফফর বিন মুহসিন

মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর এবং বর্তমানে নতুন করে চালু হওয়া জানাযার সালাম ফিরানোর পর পরই সম্মিলিত যে মুনাজাত চলছে, শরী‘আতে তার কোন ভিত্তি নেই। মূলত জানাযাই মৃত ব্যক্তির জন্য বিশেষ দু‘আ। প্রচলিত পদ্ধতিকে জায়েয করার জন্য যে বর্ণনা পেশ করা হয় তা জাল। যেমন-

 (أ) عَنْ حُسَيْن بْن وَحْوَحٍ الْأَنْصَارِيّ وَهُوَ بِمُهْمَلَتَيْنِ بِوَزْنِ جَعْفَر أَنَّ طَلْحَة بْن الْبَرَاء مَرِضَ فَأَتَاهُ النَّبِيُّ يَعُوْدُهُ فَقَالَ إِنِّي لَا أُرَى طَلْحَة إِلَّا قَدْ حَدَثَ فِيهِ الْمَوْت فَآذِنُوْنِىْ بِهِ وَعَجِّلُوْا فَلَمْ يَبْلُغ النَّبِيّ بَنِي سَالِم بْنِ عَوْفٍ حَتَّى تُوُفِّيَ وَكَانَ قَالَ لِأَهْلِهِ لَمَّا دَخَلَ اللَّيْلَ إِذَا مُتُّ فَادْفِنُوْنِىْ وَلَا تَدْعُوْا رَسُوْلَ اللهِ فَإِنِّىْ أَخَافُ عَلَيْهِ يَهُوْدَ أَنْ يُصَابَ بِسَبَبِىْ فَأُخْبِرَ النَّبِيّ حِيْنَ أَصْبَحَ فَجَاءَ حَتَّى وَقَفَ عَلَى قَبْرِهِ فَصَفَّ النَّاسُ مَعَهُ ثُمَّ رَفَعَ يَدَيْهِ فَقَالَ اللهُمَّ اِلْقَ طَلْحَةَ يَضْحَكْ إِلَيْكَ وَتَضْحَكْ إِلَيْهِ.

(ক) হুসাইন বিন ওয়াহওয়াহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, ত্বালহা ইবনু বারা একদা অসুস্থ হয়ে পড়ে। ফলে রাসূল (ﷺ) তাকে দেখতে এসে বললেন, ত্বালহা মৃত্যুর রোগে আক্রান্ত হয়েছে। সুতরাং তোমরা আমাকে তার মৃত্যুর খবর জানাবে। কিন্তু তারা তাড়াহুড়া করল। রাসূল (ﷺ) বণী সালেম বিন আওফের নিকট না পৌঁছতেই সে মারা গেল। সে তার পরিবারকে আগেই বলেছিল আমি রাত্রে মৃত্যুবরণ করলে তোমরা আমাকে দাফন করবে। রাসূল (ﷺ)-কে ডেকো না। কারণ আমি আশংকা করছি আমার কারণে তিনি ইহুদী কর্তৃক আক্রান্ত হতে পারেন। অতঃপর সকাল হলে রাসূল (ﷺ)-কে সংবাদ দেওয়া হল। ফলে তিনি এসে তার কবরের পাশে দাঁড়ান এবং লোকেরাও তাঁর সাথে কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়ায়। তারপর তিনি তাঁর দু’হাত তুললেন এবং দু‘আ করলেন, হে আল্লাহ! ত্বালহার জন্য বংশধর অবশিষ্ট রাখুন, যার জন্য সে আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে আর আপনিও তার প্রতি সন্তষ্ট হবেন।[1]

তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি জাল। উক্ত হাদীছের শেষাংশ অর্থাৎ ‘অতঃপর তিনি দু‘হাত তুললেন এবং দু‘আ করলেন….এই কথাটুকু ত্বাবারাণী ব্যতীত অন্য কোন হাদীছ গ্রন্থে নেই। এটি সহিহ হাদীছের সরাসরি বিরোধী। কারণ উক্ত হাদীছ অন্যান্য হাদীছ গ্রন্থেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কোথাও ঐ অংশ নেই। বিশেষ করে হাদীছটি সহিহ বুখারীতে প্রায় ৮ জায়গায় এসেছে কিন্তু কোন স্থানে ঐ অতিরিক্ত অংশ নেই।[2] দাফনের পর মুনাজাত করা

দ্বিতীয়ত : উক্ত বর্ণনার সনদে অনেক ত্রুটি রয়েছে। ইবনুল কালবী (রহঃ) বলেন, বর্ণনাটি মুরসাল হিসাবে যঈফ। কারণ হাদীছটি সাঈদ বিন উরওয়াহ থেকে হুছাইন বিন ওয়াহওয়াহ বর্ণনা করেছে। অথচ উভয়ের সাথে কোনদিন সাক্ষাৎ হয়নি।[3]

 (ب) عَنْ أَبِيْ وَائِلٍ عَنْ عَبْدِ اللهِ قَالَ وَاللهِ لَكَأَنِّيْ أَرَى رَسُوْلَ اللهِ فِيْ غَزْوَةِ تَبُوْكَ وَهُوَ فِيْ قَبْرِ عَبْدِ اللهِ ذِي الْبِجَادَيْنِ وَأَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ يَقُولُ أَدْنِيَا مِنِّيْ أَخَاكُمَا فَأَخَذَهُ مِنْ قِبَلِ الْقِبْلَةِ حَتَّى أَسْنَدَهُ فِيْ لَحْدِهِ ، ثُمَّ خَرَجَ النَّبِيُّ وَوَلَّاهُمَا الْعَمَلَ فَلَمَّا فَرَغَ مِنْ دَفْنِهِ اسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ رَافِعًا يَدَيْهِ يَقُولُ اللهُمَّ إِنِّيْ أَمْسَيْتُ عَنْهُ رَاضِيًا فَارْضَ عَنْهُ وَكَانَ ذَلِكَ لَيْلًا فَوَاللهِ لَقَدْ رَأَيْتُنِي وَلَوَدِدْتُ أَنِّي مَكَانَهُ.

(খ) আবী ওয়ায়েল (রাঃ) আব্দুল্লাহ (ইবনু মাসঊদ) (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি যেন এখনো তাবূক যুদ্ধে রাসূল (ﷺ)-কে আব্দুল্লাহ যিল বিজাদাইন (যিন নাজাদাইন)-এর কবরের মধ্যে দেখছি। আবুবকর ও ওমর (রাঃ)ও সেখানে আছেন। রাসূল (ﷺ) তাদেরকে বলছেন, তোমাদের ভাইকে আমার নিকটে নিয়ে আস। অতঃপর তিনি তাকে ধরে কবরের লাহদে রাখলেন। তারপর তিনি বের হলেন এবং বাকী কাজ সমাপ্তির জন্য তাঁদের দুইজনকে বললেন। যখন তিনি দাফন সমাপ্ত করলেন, তখন ক্বিবলামুখী হয়ে দুই হাত তুলে বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমি তার উপর সন্তুষ্ট হয়েই সকাল করেছি, সুতরাং আপনিও তার প্রতি সন্তুষ্ট হউন’। রাবী বলেন, এটা ছিল রাত্রের ঘটনা। আল্লাহর কসম! আমি নিজে নিজে ভাবছিলাম, যদি তার স্থানে আজ আমি হতাম!। [4]

তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটির বেশ কিছু সূত্র থাকলেও সূত্রগুলো যঈফ।[5] এর সনদে আববাদ ইবনু আহমাদ আল-আরযামী নামে একজন মাতরূক বা পরিত্যক্ত রাবী আছে।[6] এছাড়া হাদীছটিতে দলবদ্ধ মুনাজাত করার প্রমাণ নেই। কারণ আবুবকর ও ওমর (রাঃ) সেখানে উপস্থিত থাকলেও তাঁদের হাত তোলার কথা উল্লেখ নেই।

 মৃতকে দাফন করার পর করণীয় :

মূলত জানাযাই দু‘আ। সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা ও গ্রাম্য মৌলভীদের দু‘আর অর্থ না জানার কারণে দাফনের পর প্রচলিত এই বিদ‘আত চালু আছে। তারা যে দু‘আগুলো পড়ে থাকেন সেগুলো সবই নিজেদের উদ্দেশ্যে পড়েন। তাতে মৃত ব্যক্তির কোন লাভ হয় না। অবুঝ লোকেরা কেবল ‘আমীন’ ‘আমীন’ বলে তাড়াহুড়া করে চলে আসে। অথচ এ সময় প্রত্যেককেই দীর্ঘক্ষণ ধরে মাইয়েতের জন্য ইস্তিগফার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন হাদীছে এসেছে-

عَنْ عُثْمَانَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قاَلَ كَانَ النَّبِىُّ إِذَا فَرَغَ مِنْ دَفْنِ الْمَيِّتِ وَقَفَ عَلَيْهِ فَقَالَ اِسْتَغْفِرُوْا لِأَخِيْكُمْ ثُمَّ سَلُوْا لَهُ بِالتَّثْبِيْتِ فَإنَّهُ الآنَ يُسْأَلُ.

ওছমান (রাঃ) বলেন, রাসূল (ﷺ) যখন মোর্দাকে দাফন করে অবসর গ্রহণ করতেন, তখন তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে বলতেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর, তাঁর জন্য কবরে স্থায়ীত্ব চাও (অর্থাৎ সে যেন ফেরেশতাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে)। এখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে’।[7] অন্য বর্ণনায় এসেছে, ছাহাবী আমর ইবনুল ‘আছ মুমূর্ষু অবস্থায় তার সন্তানদেরকে বলেছিলেন,

فَإِذَا دَفَنْتُمُوْنِىْ فَشَنُّوْا عَلَىَّ التُّرَابَ شَنًّا ثُمَّ أَقِيْمُوْا حَوْلَ قَبْرِىْ قَدْرَ مَا يُنْحَرُ جَزُوْرٌ وَيُقَسَّمُ لَحْمُهَا حَتّى أَسْتَأنِسَ بِكُمْ وَأَعْلَمَ مَاذَا أَُرَاجِعُ بِهِ رُسُلَ رَبِّىْ.

‘যখন তোমরা আমাকে দাফন করবে, তখন আমার উপর ধীরে ধীরে মাটি দিবে। অতঃপর আমার কবরের পার্শ্বে অবস্থান করবে, যতক্ষণ একটি উট যবহে করে তার গোশত বন্টন করতে সময় লাগে। যাতে আমি তোমাদের কারণে স্বস্তি লাভ করি এবং আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত ফেরেশতাগণের কী উত্তর দিব তা যেন জানতে পারি’।[8]

অতএব সুন্নাত হল দাফনের পর উপস্থিত প্রত্যেকেই মাইয়েতের জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। এ সময় মাইয়েতের জন্য নিম্নের দু‘আগুলো বার বার পড়বে : (ক) اللهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَثَبِّتْهُ

‘আল্ল-হুম্মাগ্ফির লাহূ ওয়া ছাবিবতহু। অর্থঃ ‘হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন এবং তাকে (প্রশ্নোত্তরে ও ঈমানের উপর) অটল রাখুন’।[9] (খ) اللهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ আল্ল-হুম্মাগফিরলাহু ওয়ারহামহু ইন্নাকা আংতাল গফূরুর রহীম। অর্থঃ ‘হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন এবং তার প্রতি রহম করুন। নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল দয়ালু’।[10]

اللهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْفَعْ دَرَجَتَهُ فِي الْمَهْدِيِّيْنَ وَاخْلُفْهُ فِىْ عَقِبِهِ فِى الْغَابِرِيْنَ وَاغْفِرْ لَنَا وَلَهُ يَا رَبَّ الْعَالَمِيْنَ وَافْسَحْ لَهُ فِىْ قَبْرِهِ وَنَوِّرْ لَهُ فِيْهِ.

(গ) আল্ল-হুম্মাগ্ফির্ লাহু ওয়ার্ফা‘ দারাজাতহূ ফিল মাহ্দিইয়ীনা। ওয়াখ্লুফহূ ফী ‘আক্বিবিহি ফিল গ-বিরীন, ওয়াগ্ফির্ লানা ওয়া লাহূ ইয়া রববাল ‘আ-লামীন। ওয়াফসাহ লাহূ ফী ক্বব্রিহী ওয়া নাবিবর লাহূ ফীহি। অর্থঃ ‘হে আল্লাহ! আপনি তাকে মাফ করে দিন। হেদায়াত প্রাপ্তদের মধ্যে তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করুন এবং তার পিছনে যারা রয়ে গেল তাদের জন্য আপনি প্রতিনিধি হন। হে জগৎ সমূহের প্রতিপালক! আপনি আমাদেরকে ও তাকে ক্ষমা করুন। তার কবর প্রশস্ত করে দিন এবং তার জন্য কবরকে আলোকিত করুন’।[11] উক্ত মর্মে বিস্তারিত আলোচনা দেখুনঃ ‘শারঈ মানদন্ডে মুনাজাত’ বই।

[1]. ত্বাবারাণী, মু‘জামুল কবীর হা/৩৪৭৩; ফাযযুল বি‘আ হা/২৮; ফাৎহুল বারী ৩/১৫২, হা/১২৪৭-এর ব্যাখ্যা দ্রঃ, ‘জানাযা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫।
[2]. সহিহ বুখারী হা/৮৫৭, ১২৪৭, ১৩১৯, ১৩২১, ১৩২২, ১৩২৬, ১৩৩৬ ও ১৩৪০, ১/১৬৭ ও ১৭৮-৭৯ পৃঃ।
[3]. لَاتَثْبُتُ لَهُمَا صَحْبَةٌ -ইবনু হাজার আসক্বালানী, আল-ইছাবাহ ফী তাময়ীযিছ ছাহাবাহ, ২/২৬১-২৬২ পৃঃ ও ৯/১০৩ পৃঃ, রাবী নং- ৭৭৪৫; যঈফ আবুদাঊদ হা/৩১৫৯; মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানী, সিলসিলা যঈফাহ হা/৩২৩২; আলবানী, তাহক্বীক্ব মিশকাত হা/১৬২৫ পৃঃ ।
[4]. মুসনাদে বাযযার হা/১৭০৬; আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আওলিয়া ১/১২২ পৃঃ; মা‘রেফাতুছ ছাহাবা হা/৪১০৫; ছাফওয়াতুছ ছাফওয়া ১/৬৭৯; ফাৎহুল বারী ১১/১৭৩ পৃঃ, হা/৬৩৪৩-এর আলোচনা।
[5]. মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী, মিরক্বাতুল মাফাতীহ ৪/৭৫ পৃঃ, হা/১৭০৬-এর আলোচনা দ্রঃ-ذكر فيه ما اتفقوا على ضعفه।
[6]. মাজমাউয যাওয়ায়েদ হা/১৫৯৮৩।
[7]. সহিহ আবুদাঊদ হা/৩২২১, ২/৪৫৯ পৃঃ, ‘কবর স্থান থেকে ফিরার সময় মাইয়েতের জন্য ইস্তিগফার করা’ অনুচ্ছেদ, সনদ সহিহ; মিশকাত হা/১৩৩, পৃঃ ২৬।
[8]. সহিহ মুসলিম হা/৩৩৬, ১/৭৬, ‘ঈমান’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫৬, (ইফাবা হা/২২১), মিশকাত হা/১৭১৬, পৃঃ ১৪৯; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১৬২৪, ৪/৭৯ পৃঃ, ‘জানাযা’ অধ্যায়, ‘মৃতকে দাফন করা’ অনুচ্ছেদ।
[9]. আবুদাঊদ হা/৩২২১, ২/৪৫৯ পৃঃ; সনদ সহিহ; মিশকাত হা/১৩৩, পৃঃ ২৬; সাঈদ ইবনু আলী আল-কাহতানী, হিছনুল মুসলিম, অনুবাদ : মোহাঃ এনামুল হক (ঢাকা : ৭৮, উত্তর যাত্রাবাড়ী, মে ২০০১), পৃঃ ২১৫, দু‘আ নং ১৬২।
[10]. আবুদাঊদ হা/৩২০২, ২/৪৫৭ পৃঃ, ‘জানাযা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৬০।
[11]. সহিহ মুসলিম হা/২১৬৯ (৯২০), ১/৩০১ পৃঃ, (ইফাবা হা/১৯৯৯), ‘জানাযা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪; মিশকাত হা/১৬১৯, পৃঃ ১৪১; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১৫৩১, ৪/৩৫ পৃঃ, ‘জানাযা’ অধ্যায়।

 

>>>কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ Hadithonlinebd.com<<<

Translate