Sunday, November 28, 2021

ইসলাম নির্দেশিত যে সব চারিত্রিক অধ:পতনের কারণে সমাজিক মূল্যবোধ ধ্বংসের পথে

 ইসলাম চায় একটি ভালবাসা পূর্ণ, শান্তিময়, মানবিক ও সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা উপহার দিতে। তাই এর যাবতীয় উপায়-উপকরণ বলে দেয়া হয়েছে। তৎসঙ্গে যে সব কারণে দ্বন্দ্ব-কলহ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, সামাজিক অশান্তি, বিদ্বেষ, শত্রুতা এবং মানুষের নৈতিক অধঃপতন ঘটতে পারে সেসব বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

কিন্তু দুর্ভাগ্য জনক বাস্তবতা হল যে, বর্তমানে বহু মুসলিম কারণে-অকারণে বা ছোটখাটো বিষয়কে কেন্দ্র করে এসব নিকৃষ্ট স্বভাব-চরিত্র এবং নোংরা আচার-ব্যাবহারের পরিচয় দিচ্ছে। যার কারণে সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শান্তি, সম্মান ও শ্রদ্ধবোধ, বন্ধুত্বপূর্ণ সহবস্থানের মনোভাব, আস্থা, বিশ্বাস, সহমর্মিতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ। মানুষ হয়ে উঠছে অ সহিষ্ণু, পরস্পরের দুশমন, হিংস্র ও পশুতুল্য। (আল্লাহর নিকট এই পরিস্থিতি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।)

যাহোক, এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হল, ইসলামি শিক্ষার বিস্তার এবং ইসলাম নির্দেশিত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, নৈতিকতা এবং আচার-আচরণ চর্চা করা, বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা এবং ইসলাম প্রদত্ত নৈতিক সৌন্দর্যের রঙ্গিন আলোকচ্ছটায় সমাজের প্রতি কোণ, গৃহাঙ্গণ ও হৃদয়কে রাঙ্গিয়ে দেয়া। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।

নিম্নে ইসলামের পারস্পারিক আচরণ বিধি এবং সামাজিক মূল্যবোধ ও চরিত্র বিধ্বংসী বৈশিষ্ট্যগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হল:

✪ ১. কাউকে অনুমান নির্ভর কথা বলে কাউকে কষ্ট দেয়া, কারও প্রতি কু ধারণা পোষণ করা এবং তার অসাক্ষাতে গিবত ও সমালোচনা করা হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيراً مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ

“হে মুমিনগণ, তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ। এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভায়ের মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুত: তোমরা তো তা ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুল কারী ও পরম দয়ালু।” [সুরা হুজুরাত: ১২]

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
عن أبي هريرة -رضي الله عنه- عن النبي -صلى الله عليه وسلم- قال: «أتدرون ما الغِيبَةُ؟»، قالوا: الله ورسوله أعلم، قال: «ذكرُك أخاك بما يكره»، قيل: أرأيت إن كان في أخي ما أقول؟ قال: «إن كان فيه ما تقول فقد اغْتَبْتَهُ, وإن لم يكن فقد بَهَتَّهُ».
আবু হুরায়রা রা. থেকে মারফু সূত্রে বর্ণিত, “তোমরা কি জান, গিবত কী?
লোকেরা বলল, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালো জানেন।’
তিনি বললেন, “তোমার ভাই যা অপছন্দ করে, তাই তার পশ্চাতে আলোচনা করা।”
বলা হল, ‘আমি যা বলি, তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে, তাহলে আপনার বক্তব্য কী? (সেটাও কি গিবত হবে?)
তিনি বললেন, “তুমি যা বললে, তা যদি তার মধ্যে তা থাকে, তাহলেই তার গিবত করলে। আর তুমি যা বললে, তা যদি তার মধ্যে না থাকে, তাহলে তাকে অপবাদ দিলে।” (সহিহ মুসলিম)

✪ ২. এছাড়াও সলামের দৃষ্টিতে মুসলিমদের মাঝে পারস্পারিক সম্মানহানী, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, হিংসা-বিদ্বেষ, রাগারাগি, মারামারি, গালাগালি, জুলুম করা হারাম।
এ মর্মে কুরআন-হাদিসে যথেষ্ট সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। নিম্নে এ সংক্রান্ত কতিপয় হাদিস তুলে ধরা হল:

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الحَدِيثِ
وَلاَ تَحَسَّسُوا وَلاَ تَجَسَّسُوا وَلاَ تَنَافَسُوا، وَلاَ تَحَاسَدُوا وَلاَ تَبَاغَضُوا وَلاَ تَدَابَرُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللهِ إِخْوَاناً كَمَا أَمَرَكُمْ
المُسْلِمُ أَخُو المُسْلِمِ لاَ يَظْلِمُهُ وَلاَ يَخْذُلُهُ وَلاَ يَحْقِرُهُ التَّقْوَى هاهُنَا التَّقْوَى هاهُنَا وَيُشِيرُ إِلَى صَدْرِهِ
بحَسْبِ امْرِىءٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ المُسْلِمَ كُلُّ المُسْلِمِ عَلَى المُسْلِمِ حَرَامٌ : دَمُهُ وَعِرْضُهُ وَمَالُهُ
إنَّ اللهَ لاَ يَنْظُرُ إِلَى أَجْسَادِكُمْ وَلاَ إِلَى صُوَرِكُمْ وَلكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ
وَفِي رواية لاَ تَحَاسَدُوا، وَلاَ تَبَاغَضُوا وَلاَ تَجَسَّسُوا وَلاَ تَحَسَّسُوا وَلاَ تَنَاجَشُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللهِ إِخْواناً
وفي رواية لاَ تَقَاطَعُوا وَلاَ تَدَابَرُوا وَلاَ تَبَاغَضُوا وَلاَ تَحَاسَدُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللهِ إِخْواناً .
وَفِي رِواية وَلاَ تَهَاجَرُوا وَلاَ يَبِعْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَيْعِ بَعْضٍ.

[رواه مسلم بكلّ هذِهِ الروايات، وروى البخاريُّ أَكْثَرَهَا]

▪‘‘তোমরা কু ধারণা পোষণ করা থেকে বিরত থাক। কারণ কু ধারণা সব চাইতে বড় মিথ্যা কথা।
▪অপরের গোপনীয় দোষ খুঁজে বেড়ায়ও না।
▪গোয়েন্দাগিরি করো না।
▪একে অপরের সাথে (অসৎ কাজে) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করো না,
▪পরস্পরে হিংসা করো না,
▪পরস্পরে বিদ্বেষ পোষণ করো না,
▪একে অপরের বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন হয়ো না।
তোমরা আল্লাহর বান্দা, ভাই ভাই হয়ে যাও; যেমন তিনি তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সুতরাং
▪ সে তার প্রতি জুলুম করবে না,
▪ তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেবে না,
▪ এবং তাকে তুচ্ছ ভাববে না।
“আল্লাহ ভীতি এখানে রয়েছে… আল্লাহ ভীতি এখানে রয়েছে…” (এ কথা বলে তিনি নিজ বুকের দিকে ইঙ্গিত করলেন।)

(রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন,)

▪ কোন মুসলমান ভাইকে তুচ্ছ ভাবা একটি মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
▪ প্রত্যেক মুসলমানের রক্ত, সম্ভ্রম ও সম্পদ অপর মুসলমানের উপর হারাম।
▪ নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের দেহ ও আকার-আকৃতি দেখেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমল দেখেন।’’

💠 অন্য এক বর্ণনায় আছে, ‘তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, পরস্পরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করো না, অপরের গোয়েন্দাগিরি করো না, একে অপরের গোপনীয় দোষ খুঁজে বেড়ায়ও না, পরস্পরের পণ্যদ্রব্যের মূল্য বাড়িয়ে দিয়ো না। তোমরা আল্লাহর বান্দা, ভাই ভাই হয়ে যাও।’’

💠 আর এক বর্ণনায় আছে, ‘‘তোমরা পরস্পর সম্পর্ক-ছেদ করো না, একে অপরের বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন হইয়ো না, পরস্পরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করো না, পরস্পর হিংসা করো না। তোমরা আল্লাহর বান্দা, ভাই ভাই হয়ে যাও।’’

💠 অন্য আরও এক বর্ণনায় আছে, ‘‘তোমরা একে অন্যের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করো না এবং অপরের ক্রয়-বিক্রয়ের উপর ক্রয়-বিক্রয় করো না।’’ (এ সবগুলো ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন ৬৭০১-৬৭০৫ এবং এর অধিকাংশ বর্ণনা করেছেন বুখারি ৫১৪৩, ৬০৬৪, ৬০৬৬, ৬৭২৪)

✪ ৩. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন,

سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ

“মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেকি (পাপাচার) এবং তার সাথে লড়াই করা কুফরি।” [সহিহ মুসলিম]

✪ ৪. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেন,

« إنَّ دِماءكُمْ ، وَأمْوَالَكُمْ ، وأعْرَاضَكُمْ ، حَرَامٌ عَلَيْكُمْ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا » . (متفق عَلَيْهِ).

“নিশ্চয়ই তোমার পরস্পরের রক্ত (জীবন), ধন-সম্পদ ও মান-সম্মান পরস্পরের জন্য হারাম ও সম্মানের যোগ্য, তোমাদের আজকের এ দিনের সম্মানের মতই।” [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]

✪ ৫. তিনি আরও বলেন,

لا يَدْخُلُ الجَنَّةَ قَتَّاتٌ » (مُتَّفَقٌ عَلَيهِ)

“চোগলখোর তথা পর নিন্দাকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]

✪ ৬. তিনি আরও বলেছেন,

« سِبَابُ المُسْلِمِ فُسُوقٌ ، وَقِتالُهُ كُفْرٌ » . (مُتَّفَقٌ عَلَيهِ)
“মুসলিম ব্যক্তিকে গালি দেওয়া পাপ এবং তার বিরুদ্ধে লড়াই করা কুফরি।” [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
এ মর্মে আরও অসংখ্য হাদিস রয়েছে।
আমাদের উচিৎ, ইসলামের এই রত্নতুল্য দিক-নির্দেশনাগুলো নিজেরা অনুসরণ করা, পরিবারে চর্চা করা, শিশুদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া এবং সমাজে বিভিন্নভাবে প্রচার-প্রসারের ব্যবস্থা করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পারস্পারিক হিংসা-বিদ্বেষ, কু ধারণা, ছিদ্রান্বেষণ, অপবাদ, গিবত, চরিত্র গহন, গোপনীয়তা লঙ্ঘণ, ঝগড়া, মারামারি, কাটাকাটি ইত্যাদি নিকৃষ্ট স্বভাব-চরিত্র থেকে হেফাজত করুন এবং ইসলামি সুন্দর ও চারিত্রিক মাধুরী দ্বারা জীবন ও সমাজ গঠনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬◐◯◑▬▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

শিশুদের প্রতি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্নেহ, মমতা ও একগুচ্ছ স্নিগ্ধ ভালবাসা

 প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ ছিলেন এক মহান আদর্শ মানব। তিনি শুধু নবুওয়ত ও রিসালাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে নয় বরং সত্যিকার মানুষ হিসেবে তার মধ্যে যে মানবিক অনন্য সাধারণ গুণাবলীর সমাবেশ ঘটেছিলো তা নি:সন্দেহে বিশ্ববাসীর অনুসরণীয়-অনুকরণীয়। এ পর্যায়ে শিশুদের সাথে তাঁর কোমল আচরণ এবং স্নেহ, মমতা ও ভালবাসার এক অপূর্ব খণ্ড চিত্র দেখব ইনশাআল্লাহ।

◈ ১) জাবের ইবনে সামুরাহ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে ফজরের সালাদ আদায় করলাম। অতঃপর তিনি বাড়ির দিকে বের হলে আমিও তার সাথে বের হলাম। পথিমধ্যে তার সাথে কিছু বাচ্চার সাক্ষাৎ হল। তিনি তাদের এক এক করে প্রত্যেকের উভয় গালে হাত বুলাতে লাগলেন।

মাহমুদ রা. বলেন, তিনি আমার উভয় গালে হাত বুলালেন। আমি তার হাতের শীতল সুগন্ধিময় পরশ উপলব্ধি করলাম-যেন তার হাতের সাথে সুগন্ধি ব্যবসায়ীর সামগ্রীর ছোঁয়া লেগেছে।” (সহিহ মুসলিম)

◈ ২) উসামার প্রতি তাঁর ভালোবাসা:

উসামা ইবনে যায়েদ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ধরে তার এক রানে বসাতেন আর হাসানকে বসাতেন অন্য রানে। অতঃপর তাদের একত্র করতেন এবং বলতেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করো, কেননা আমি তাদের প্রতি দয়া করি।” (সহিহ বুখারি)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, “হে আল্লাহ, আমি তাদের ভালোবাসি। সুতরাং আপনিও তাদের ভালবাসুন।” (সহিহ বুখারি)

◈ ৩) মাহমুদ ইবনে রবী এর সাথে তাঁর কৌতুক:

মাহমুদ রা. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এক বারের পানি ছিটানোর কথা; ‘তিনি আমার চেহারায় বালতি থেকে পানি ছিটিয়েছেন। তখন আমার বয়স ছিল পাঁচ বছর যা আমার এখনও মনে আছে।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
তিনি এটা করেছেন কৌতুক বশত: বা বরকতস্বরূপ- যেমনটি তিনি সাহাবীদের সন্তানদের সাথে করতেন।

শাইখ ইবনে বায রহ. বলেন, “এটা কৌতুক ও উত্তম চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত।”

◈ ৪) শিশুদেরকে আদরের চুমু দেয়া:

◍ ক. আবু হুরায়রাহ রা. বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ইবনে আলীকে চুম্বন করেন তখন তার নিকট আকরা ইবন হাবেস তামীমী রা. বসা ছিল। আকরা রা. বললেন, “আমার ১০ সন্তান আছে। তাদের কাউকেই আমি চুম্বন করি না।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।” (সহিহ বুখারি)

◍ খ. আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “কিছু গ্রাম্য লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বলল, “তোমরা তোমাদের বাচ্চাদের চুমো খাও। আমরা তাদের চুমো খাই না।” নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তোমার অন্তরে দয়া উদ্রেক করা আমার পক্ষে সম্ভব নয় যদি আল্লাহ তা ছিনিয়ে নিয়ে থাকেন।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

◈ ৫. হাসান ও হুসাইন রা. এর সাথে তাঁর আদর পূর্ণ ব্যবহার:

◍ ক. হাসান ও হুসাইন রা. রাসূলের সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিলেন। এ ব্যাপারে ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাদের সম্পর্কে বলতে শুনেছি, “তারা আমার জন্য পৃথিবীর সুগন্ধিময় দুটি ফুল।” (সহিহ বুখারি)
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা আমাকে তাদের দান করেছেন এবং তাদের দিয়ে সম্মানিত করেছেন। সন্তানদেরকে চুম্বন করা হয় এবং সুঘ্রাণ নেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে তাদেরকে সুগন্ধময় ফুলের সাথে তুলনা করা হয়েছে।

◍ খ. আবু বাকরাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মিম্বারে আরোহণ অবস্থায় তার খুতবা শুনেছি, আর হাসান তার পাশে ছিল। তিনি একবার মানুষের দিকে তাকাচ্ছেন আরেকবার তার দিকে তাকাচ্ছেন এবং বলেছেন, “নিশ্চয়ই আমার এ সন্তান একজন নেতা হবে। সম্ভবত: আল্লাহ তাআলা তাকে দিয়ে মুসলিমদের বিশাল দু দলের মাঝে মীমাংসা করে দেবেন” (সহিহ বুখারি)
পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা তাকে দিয়ে মুআবিয়া রা. ও তার সাথীদের এবং আলী ইবনে আবি তালেব রা. এর অনুসারীদের ও তার সাথীদের মাঝে মীমাংসা করেন। তিনি খেলাফতের দায়িত্ব মুআবিয়া রা. এর জন্য ছেড়ে দেন। ফলে আল্লাহ তআলা তাঁর দ্বারা মুসলিমদেরকে রক্তপাত থেকে রক্ষা করেন।

◍ গ. বারা ইবনে আযেব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি হাসান ইবনে আলী রা.কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাঁধে দেখেছি এবং বলতে শুনেছি, “হে আল্লাহ, আমি তাকে ভালোবাসি। অতএব, আপনিও তাকে ভালবাসুন।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

◈ ৬) সেজদা অবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিঠে বাচ্চার আরোহণ:

শাদ্দাদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর থেকে বের হলেন মাগরিব বা এশার নামাজ পড়ানোর জন্য। হাসান রা. বা হুসাইন রা.কে তিনি বহন করছিলেন। অতঃপর তিনি সামনে গিয়ে তাকে রাখলেন। এরপর তিনি নামাজের মধ্যে একটি দীর্ঘ সেজদা করলেন।
আমার পিতা বলেন যে, ‘আমি আমার মাথা উত্তোলন করে দেখতে পেলাম সেজদা রত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাঁধে একটি শিশু। আমি আবার সেজদায় ফিরে এলাম। যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম নামাজ সম্পন্ন করলেন তখন লোকেরা বলল, “হে আল্লাহর রাসূল, নিশ্চয়ই আপনি নামাজের মধ্যে একটা দীর্ঘ সেজদা করেছেন-যে কারণে আমরা মনে করেছিলা যে, হয়তো কিছু একটা ঘটেছে অথবা আপনার কাছে ওহী এসেছে।”
তিনি বললেন, “এগুলোর কোনটাই হয় নি। তবে আমার সন্তান (হাসান রা./ হুসাইন রা) আমার পিঠে আরোহণ করেছিলো। তাই আমি তার চাহিদা পূরণ না করে তাড়াহুড়ো করতে অপছন্দ করলাম।” (সুনানে নাসায়ী, মুসনাদে আহমদ)

◈ ৭) নামাজরত অবস্থায় যয়নব রা. এর মেয়েকে কোলে তুলে নেয়া:

আবু কাতাদা থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ পড়া অবস্থায় উমামা বিনতে যয়নবকে বহন করছিলেন। যখন তিনি সেজদা করতেন তখন তাকে রেখে দিতেন আর যখন দাঁড়াতেন তখন তাকে কোলে তুলে নিতেন।” (সহিহ বুখারি)

◈ ৮) শিশু বাচ্চারা কাঁদার সময় তাঁর নামাজ পড়া সংক্ষিপ্ত করা:

তিনি কোনও শিশু বাচ্চার কাঁদার আওয়াজ শুনলে সালাত সংক্ষিপ্ত করতেন। এ ব্যাপারে আবু কাতাদাহ রা. তার পিতা থেকে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “যখন আমি সালাতে দাঁড়াই তখন ইচ্ছা থাকে নামায দীর্ঘ করব। কিন্তু যখন কোনও শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনি, তখন তার মায়ের কষ্ট হবে ভেবে আমি নামাজ সংক্ষেপ করি।” (সহিহ বুখারি)

◈ ৯) উম্মে খালেদের সাথে হাবশী ভাষায় কৌতুক:

এ ব্যাপারে উম্মে খালেদ বিনতে খালেদ ইবনে সাঈদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি আমার বাবার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এলাম। তখন আমার গায়ে হলুদ রঙ্গের জামা ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘ছানাহ! ছানাহ!’’ এটি হাবশী ভাষার শব্দ যার অর্থ, চমৎকার! চমৎকার!

তিনি বলেন, “অতঃপর আমি নবুওয়তের মোহর নিয়ে খেলা করতে গেলাম। আমাকে আমার পিতা ধমক দিলেন।
কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তাকে ধমক দিও না।”
অতঃপর দুআ বললেন,
أَبلِي وأَخلِقي ثُمَّ أبلِي وَأخلِقي ثُمَّ أبلي وَأخلِقي
ক্ষয় কর এবং জীর্ণ কর, অতঃপর ক্ষয় কর এবং জীর্ণ কর, অতঃপর আবার ক্ষয় কর এবং জীর্ণ কর।’
আব্দুল্লাহ বলেন, অতঃপর সে মহিলা অনেকদিন জীবিত ছিল। এমনকি তার কথা বর্ণনা করা হতো (যে ওমুক দীর্ঘজীবী হয়েছে)। (সহিহ বুখারি)

অর্থাৎ বর্ণনাকারী তার দীর্ঘ জীবনের কথা বুঝিয়েছেন। অনেকে বলেছেন, উম্মে খালেদের মতো আর কেহ এত দীর্ঘ জীবন লাভ করে নি।

◈ ১০) আবু উমায়ের সাথে তার কৌতুক:

আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে প্রিয় ছিল আমার এক ভাই, তার নাম আবু উমায়ের। আমার মনে আছে, সে যখন এমন শিশু যে মায়ের বুকের দুধ ছেড়েছে মাত্র। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে আসতেন এবং বলতেন, “হে আবু উমায়ের, কি করেছে তোমার নুগায়ের?’
নুগায়ের হল এমন একটি ছোট পাখি যার সাথে আবু উমায়ের খেলা করত। নুগায়ের মারা গিয়েছিল। (সহিহ বুখারি)

◈ ১১) শিশু বাচ্চাদের সালাম দেয়া:

আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত যে, তিনি শিশু বাচ্চাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাদের সালাম দিতেন এবং বলতেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটি করতেন। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

◈ ১২) রাসূলের কোলে শিশুদের প্রস্রাব:

উম্মে কায়স বিনতে মিহসান থেকে বর্ণিত, তিনি তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে রাসূলের দরবারে এলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তার কোলে রাখলে, সে তার কোলে প্রস্রাব করে দিলো।
তারপর তিনি পানি নিয়ে আসতে বললেন এবং পানি ছিটিয়ে দিলেন এবং তা ধৌত করেন নি। (সহিহ বুখারি)

◈ ১৩) বড়দের ওপর শিশুদের অগ্রাধিকার দেয়া:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ডান পাশের শিশু ছেলেকে বড়দের আগে শরবত দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে সাহল ইবনে সা’দ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এক পেয়ালা শরবত আনা হল। তার থেকে তিনি শরবত পান করলেন এবং তার ডান পাশে ছিল দলের সবচেয়ে ছোট একটি ছেলে, আর বড়রা ছিল তার বাম পার্শ্বে। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হে ছেলে, তুমি কি আমাকে অনুমতি দেবে যে, আমি তা বড়দের আগে দেব?”

ছেলেটি বলল, “হে আল্লাহর রাসূল, আপনার অনুগ্রহ লাভের ব্যাপারে আমি অন্য কাউকে আমার উপর প্রাধান্য দেব না।”

অতএব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকেই প্রথমে দিলেন। (সহিহ বুখারি)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি ছেলেটিকে বললেন: “তুমি কি আমাকে অনুমতি দিবে এদের দেয়ার।”
ছেলেটি বলল, “না। আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার কাছ থেকে কিছু লাভ করার ব্যাপারে অন্য কাউকে প্রাধান্য দেব না।”

বর্ণনাকারী বলেন অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাতে তা রাখলেন।”
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রকৃত অনুসারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬◍❂◍▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

জিহাদের হুকুম ও প্রকারভেদ

 মূলঃ শায়খ মুহাম্মাদ সালিহ আল মুনাজ্জিদ

অনুবাদঃ মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনার
.
প্রশ্নঃ
বর্তমান সময়ে শারিরীকভাবে সক্ষম সকল মানুষের জন্য কি জিহাদ ফরয হয়ে গেছে?
.
উত্তরঃ
সকল প্রশংসা আল্লাহর।
.
▪ প্রথমতঃ
জিহাদের বিভিন্ন প্রকার আছে। এর কিছু প্রকার আছে যা প্রতিটি ব্যক্তির জন্য আলাদাভাবে ওয়াজিব বা জরুরী। আর কিছু প্রকার আছে যা পুরো জাতির জন্য সামষ্টিকভাবে জরুরী – যদি কিছু মানুষ আদায় করে তাহলে অন্যরা দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়। আর কিছু প্রকারের জিহাদ আছে যা মুস্তাহাব।
.
জিহাদুন নাফস (নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ) এবং জিহাদুশ শাইত্বন (শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ) প্রতিটি ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব। মুনাফিক এবং কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ এবং জুলুম ও বিদআতের নেতৃত্বদানকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ পুরো জাতির জন্য সামষ্টিকভাবে জরুরী। কোনো কোনো পরিস্থিতিতে শারিরীক জিহাদ (অর্থাৎ লড়াই) সক্ষম সকল ব্যক্তির জন্য ব্যক্তিগতভাবে ওয়াজিব হয়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতিগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হল।
.
ইবনুল কাইয়িম(র.) বলেছেন,
জিহাদ চার প্রকারের। জিহাদুন নাফস (নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ), জিহাদুশ শাইত্বন (শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ), কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ এবং মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ।
.
জিহাদুন নাফস (নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ) চার প্রকারের। যথাঃ
.
১। হেদায়েত এবং সত্য দ্বীন (ইসলাম) শেখার জন্য জিহাদ বা সংগ্রাম করা। কেননা এটি ব্যতিত ইহকাল ও পরকালে কেউ সুখ বা সাফল্য অর্জন করতে পারে না। যদি এটি বাদ পড়ে, তাহলে ইহকাল ও পরকালে তার আমল নষ্ট হয়ে যাবে এবং সে ধ্বংস হয়ে যাবে।
২। যে ইলম অর্জন করা হয়েছে, সে অনুযায়ী আমলের জন্য সংগ্রাম করা। আমল ব্যতিত শুধুমাত্র ইলম অর্জন যদিও কোনো ক্ষতির কারণ নয়; কিন্তু তা কোনো উপকারও করে না।
৩। মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বানের জন্য সংগ্রাম করা। যারা ইসলাম সম্পর্কে জানে না, তাদেরকে জানানো। তা না হলে একজন ব্যক্তি আল্লাহ্‌ যে হেফায়েত ও প্রমাণ নাজিল করেছেন, তা গোপনকারী হিসাবে গণ্য হবেন। এবং তার ইলম তাকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না।
৪। মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকার পথে মানুষের অপমান ও বিভিন্ন কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সংগ্রাম করা। এ সমস্ত কিছুকে আল্লাহর জন্য সহ্য করা।
.
যদি কেউ এই চারটি প্রকারের সবগুলো পূর্ণ করে, তাহলে সে একজন ‘রব্বানী’ {দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ যাঁরা ইলম অনুযায়ী আমল করেন এবং অন্যের নিকটেও প্রচার করেন; দেখুন সুরা আলি ইমরান ৩ : ৭৯} হিসাবে গণ্য হবে। সালাফগণ এ ব্যাপারে একমত যে, কোনো আলেম ‘রব্বানী’ হিসাবে গণ্য হবেন না যদি না তিনি হক জানেন, সে অনুযায়ী আমল করেন এবং অন্যকে তা শিক্ষা দেন। যাঁর ইলম আছে, তা শিক্ষা দেন এবং সে অনুযায়ী আমল করেন – আসমানী রাজ্যে তিনি মহান বলে গণ্য হবেন।
.
শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ ২ প্রকারের।
.
১। ঈমানকে নাড়িয়ে দিতে পারে এমন সংশয় ও সন্দেহকে প্রতিরোধ করা।

২। নিজ খারাপ প্রবৃত্তি ও কামনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা।
.
এখানে প্রথম জিহাদটি হয় ইয়াকিন বা দৃঢ় বিশ্বাসের দ্বারা। আর পরেরটি হয় ধৈর্যের দ্বারা। আল্লাহ্‌ বলেছেন,
وَجَعَلنا مِنهُم أَئِمَّةً يَهدونَ بِأَمرِنا لَمّا صَبَروا ۖ وَكانوا بِآياتِنا يوقِنونَ
অর্থঃ আর আমি তাদের মধ্য হতে নেতাদেরকে মনোনিত করেছিলাম যারা আমার নির্দেশ অনুসারে সৎপথ প্রদর্শন করত, যখন তারা ধৈর্য ধারণ করতো। আর তারা ছিল আমার নিদর্শনাবলীতে দৃঢ় বিশ্বাসী।
(আল কুরআন, সাজদাহ ৩২ : ২৪)
.
আল্লাহ্‌ আমাদেরকে জানাচ্ছেন যে, নের্তৃত্ব অর্জিত হয় ধৈর্য এবং দৃঢ় বিশ্বাসের দ্বারা। ধৈর্য কামনাকে দমন করে, দৃঢ় বিশ্বাস সংশয়কে দমন করে।
.
কাফির এবং মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ চার প্রকার।
যথাঃ অন্তর দ্বারা, জবানের দ্বারা, সম্পদ দ্বারা এবং জীবনের দ্বারা। কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ শারিরীকভাবে লড়াইয়ের সাথে অধিক সম্পৃক্ত, অপরদিকে মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ ভাষা ও চিন্তার প্রয়োগের সাথে অধিক সম্পৃক্ত।
.
জুলুম ও বিদআতের নেতৃত্বদানকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ তিন প্রকারের। যথাঃ
.
১। হাতের দ্বারা (অর্থাৎ শারিরীক জিহাদ বা লড়াই), যদি কেউ সক্ষম হয়। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে জিহ্বা দ্বারা (অর্থাৎ কথা বা ভাষার দ্বারা)। আর যদি তা-ও সম্ভব না হয় তাহলে অন্তর দ্বারা (অর্থাৎ মন্দকে ঘৃণা করা এবং তাকে ভুল মনে করা)।
.
এই হচ্ছে ১৩ প্রকারের জিহাদ।
.
مَنْ مَاتَ وَلَمْ يَغْزُ، وَلَمْ يُحَدِّثْ نَفْسَهُ بِغَزْوٍ، مَاتَ عَلَى شُعْبَةِ نِفَاقٍ
যে ব্যাক্তি জিহাদ না করে মারা গেল বা তার মনে যুদ্ধের বাসনা জাগলো না, তার মৃত্যু হলো নিফাকের একটি অংশ (জিহাদ বিমুখ হওয়া)-এর উপর। (সহীহ মুসলিম ১৯১০)
[যাদুল মাআদ ৩/৯-১১]
.
শায়খ আব্দুল আজিজ ইবন বাজ(র.) বলেছেন,
“জিহাদ বিভিন্ন প্রকারের হতে পারেঃ জীবন দ্বারা, সম্পদ দ্বারা, দুআ করার দ্বারা, শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা প্রদানের দ্বারা, যে কোনো উপায়ে উত্তম কাজে সহায়তা করার দ্বারা। জিহাদের সব থেকে বড় ধরন হচ্ছে আপন সত্ত্বা দ্বারা জিহাদ (অর্থাৎ নিজে গমন করা ও লড়াই করা)। এরপরে রয়েছে সম্পদ দ্বারা জিহাদ করা, বক্তব্যের দ্বারা জিহাদ করা এবং অন্যদেরকে দিকনির্দেশনা দেয়া। কিন্তু আপন সত্ত্বা দ্বারা জিহাদ হচ্ছে এর মধ্যে জিহাদের সর্বোচ্চ ধরন।”
[ফাতাওয়া শায়খ ইবন বাজ ৭/৩৩৪, ৩৩৫]
.
▪দ্বিতীয়তঃ
মুসলিম উম্মাহ কী অবস্থায় রয়েছে এর উপর ভিত্তি করে কাফিরদের বিরুদ্ধে শারিরীকভাবে জিহাদ (বা লড়াই) এর বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে। ইবনুল কাইয়িম(র.) বলেছেন,
.
“প্রথম যে জিনিসটি মহামহিম প্রভু তাঁর [মুহাম্মাদ (ﷺ)] উপর নাজিল করেছিলেন তা হলঃ তাঁর প্রভুর নামে পাঠ করা যিনি সৃষ্টি করেছেন [اقرَأ بِاسمِ رَبِّكَ الَّذي خَلَقَ]। এটিই ছিল তাঁর নবুয়তে সূচনা, যেখানে আল্লাহ্‌ তাঁকে পাঠ করতে বলেছিলেন কিন্তু তখনও প্রচার করার নির্দেশ দেননি। এরপরে তিনি নাজিল করলেন,
يا أَيُّهَا المُدَّثِّرُ
قُم فَأَنذِر
অর্থঃ হে বস্ত্রাবৃত! ওঠো, সতর্কবাণী প্রচার করো।
(আল কুরআন, মুদ্দাসসির ৭৪ : ১-২)
.
সুতরাং তিনি নবী হলেন একটি শব্দ اقرَأ এর দ্বারা এবং রাসুল হলেন এই শব্দগুলো দ্বারাঃ يا أَيُّهَا المُدَّثِّرُ।
এরপর আল্লাহ্‌ তাঁকে তাঁর কাছের আত্মীয়দের নিকট সতর্কবাণী প্রচারের নির্দেশ দেন। এরপর তাঁর গোত্রকে, এরপর সকল আরবকে এবং এরপর সমগ্র মানবজাতির প্রতি সতর্কবাণী প্রচারের নির্দেশ দেন। নবুয়তের শুরুর সময় থেকে দশ বছর ধরে তিনি ক্রমাগত তাদের নিকট প্রচারকাজ চালিয়ে যান। এ সময় তিনি তাদের সাথে কোনো যুদ্ধ করেননি, জিজিয়াও চাননি। তাঁকে এ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছিলো। ধৈর্য ও সহনশীলতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছিলো।
অতঃপর তাঁকে হিজরত করার অনুমতি দেয়া হয়। এবং যুদ্ধ করার অনুমতি দেয়া হয়। ”
এরপর তাঁকে আদেশ দেয়া হয় তাদের সঙ্গে লড়তে যারা তাঁর সঙ্গে লড়ে। এবং তাদের সাথে লড়াই হতে বিরত থাকতে যারা তাঁর সঙ্গে লড়াই করে না এবং এমন কিছু থেকে বিরত থাকে।
.
এরপর আল্লাহ তাঁকে আদেশ দেন মুশরিকদের সঙ্গে লড়তে যাতে দ্বীন শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য হয়ে যায়।
তাঁকে জিহাদের আদেশ দেবার পর থেকে কাফিরদেরকে তিনটি শ্রেণীতে নির্দিষ্ট করা যায়। চুক্তিবদ্ধ, যুদ্ধরত এবং আহলুয যিম্মাহ (ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম)।
[যাদুল মাআদ ৩/১৫৯]
.
▪তৃতীয়তঃ
কাফিরদের বিরুদ্ধে হাত দ্বারা (শারিরীক) জিহাদের বিধান হচ্ছে, তা ফরযে কিফায়াহ।
.
ইবন কুদামাহ(র.) বলেছেন,
“জিহাদ হচ্ছে ফরযে কিফায়াহ। যদি কিছু ব্যক্তি তা আদায় করে তাহলে অন্যরা দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়।”
ফরযে কিফায়াহ মানে হচ্ছে, যদি যথেষ্ট সংখ্যক ব্যক্তি এটি আদায় না করে তাহলে সবাই গুনাহগার হবে। কিন্তু যদি যথেষ্ট সংখ্যক ব্যক্তি তা আদায় করে, তাহলে বাকিরা দায় থেকে মুক্ত হবে। প্রথমে এই বক্তব্য সবার জন্য, যেভাবে ফরযে আইন হয়। কিন্তু ফরযে কিফায়াহর ক্ষেত্রে, যদি যথেষ্ট পরিমাণ লোক এটি পালনের জন্য পদক্ষেপ নেয়, তাহলে অন্যরা দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে যায়। যা ফরযে আইনের ক্ষেত্রে হয় না। ফরযের আইনের ক্ষেত্রে একজন পালন করলে অন্য কারো দায়মুক্তি হয় না। জিহাদ ফরযে কিফায়াহ, আমভাবে এটাই আহলুল ইলমদের অভিমত। ”
[আল মুগনী ৯/১৬৩]
.
শায়খ আব্দুল আজিজ ইবন বাজ(র.) বলেছেন,
“আমরা ইতিমধ্যেই একাধিকবার আলোচনা করেছি যে, জিহাদ ফরযে কিফায়াহ, ফরযে আইন নয়। সকল মুসলিমেরই কর্তব্য হচ্ছে অন্য ভাইদের সাহায্যে নিজ সত্ত্বা (দৈহিকভাবে যোগ দিয়ে), অর্থ, অস্ত্র, দাওয়াহ এবং উপদেশ দ্বারা জিহাদ করা। যদি তাদের মধ্যে যথেষ্ট সংখ্যক ব্যক্তি (লড়াই করতে) বের হয়, তাহলে অন্যরা পাপ থেকে মুক্ত হয়। আর যদি তাদের সকলেই এ থেকে বিরত থাকে, তাহলে সবাই গুনাহগার হয়।
.
মামলাকাহ (সৌদি আরব), আফ্রিকা, মাগরিব (উত্তর আফ্রিকা) এবং এর কাছের ও দূরের মুসলিমদের তাদের সাধ্যানুযায়ী শক্তি ব্যয় করা কর্তব্য (যদি এসব জায়গায় জিহাদ হয়)। যদি এর একটি, দুইটি, তিনটি অথবা এর চেয়ে বেশি দেশ তাদের দায়িত্ব পালন করে, তাহলে অন্যরা দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়।
তারা সাহায্য ও সমর্থনের হকদার। তাদেরকে তাদের শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্য করা অপরিহার্য কেননা তারা মজলুম। আল্লাহ সকল মুসলিমকে জিহাদের নির্দেশ দিয়েছেন। তারা ততক্ষন পর্যন্ত আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়বে যতক্ষন না তাদের ভাইয়েরা বিজয়ী হয়। যদি তারা এ থেকে বিরত হয় তবে তারা পাপী বলে গণ্য হবে। আর যদি যথেষ্ট সংখ্যক ব্যক্তি এর জন্য দাঁড়িয়ে যায় – তাহলে বাকিরা পাপ থেকে মুক্ত হয়।
[ফাতাওয়া শায়খ ইবন বাজ ৭/৩৩৫]
.
▪চতুর্থতঃ
কাফিরদের বিরুদ্ধে দৈহিক জিহাদ চারটি ক্ষেত্রে ওয়াজিব বা জরুরী হয়ে যায়,
.
১। যখন মুসলিমরা জিহাদের পরিস্থিতিতে উপনিত হয়
২। যখন শত্রুরা কোনো মুসলিম ভুখণ্ডে আক্রমণ করে
৩। যখন ইমাম (শাসক) জনগণকে (জিহাদের জন্য) একত্রিত করেন, তাদেরকে অবশ্যই সাড়া দিতে হবে
৪। যখন কোনো ব্যক্তির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এবং তিনি ব্যতিত অন্য কেউ সেই কাজ করতে সক্ষম না হন
.
শায়খ ইবন উসাইমিন(র.) বলেছেন,
জিহাদ জরুরী হয়ে যাবে এবং ফরযে আইন হয়ে যাবে যদি কোনো ব্যক্তি এমন স্থানে উপস্থিত থাকে যেখানে কিতাল বা লড়াই চলছে। এটি প্রথম পরিস্থিতি যার জন্য জিহাদ ব্যক্তিগতভাবে জরুরী হয়ে যায়। যেমনটি আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوهُمُ الْأَدْبَارَ
وَمَن يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِّقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَىٰ فِئَةٍ فَقَدْ بَاءَ بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ ۖ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ
অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন কাফির বাহিনীর সম্মুখীন হবে তখন তাদের মোকাবিলা করা হতে কখনোই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবেনা।
আর যে ব্যক্তি সেদিন তাদেরকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে তাহলে সে আল্লাহর গযব নিয়ে ফিরে আসবে। তবে যুদ্ধের জন্য (কৌশলগত) দিক পরিবর্তন অথবা নিজ দলে আশ্রয় গ্রহণের জন্য হলে ভিন্ন কথা এবং তার আবাস জাহান্নাম। আর সেটি কতইনা নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল।
(আল কুরআন, আনফাল ৮ : ১৫-১৬)
.
নবী(ﷺ) আমাদের জানিয়েছেন যে, যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা ধ্বংসাত্মক কাজগুলোর একটি। তিনি বলেছেন, তোমরা ৭ ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে বেচে থাকো। এবং তিনি সে (৭ টি ধ্বংসাত্মক ) বিষয়ের মধ্য হতে (১ টি) যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করাও উল্লেখ্য করেছে। এটাই সর্বসম্মত মত, তবে আল্লাহ ২ ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম করেছেন (অর্থাৎ শাস্তি দেবেন না)।
.
১। যুদ্ধের কৌশল হিসাবে (পিছু হটা), যাতে একজন ব্যক্তি চলে গিয়ে বাড়তি শক্তি-সাহায্য নিয়ে ফিরে আসতে পারে।
২। যখন কাউকে বলা হয় যে, মুসলিমদের অন্য একটি দল এই জায়গায় আছে এবং তারা হেরে যাচ্ছে। আর তখন সে পিছু হটে ঐ দলে যোগ দেয় যাতে তাদের শক্তিবৃদ্ধি হয়। এক্ষেত্রে একটি শর্ত রয়েছে – সে যেই দলে ছিলো, এর দ্বারা সেই দল যেন কোনো ঝুঁকির মুখে না পড়ে। যদি এর দ্বারা ঐ দল ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে তার জন্য অন্য দলে যোগ দেয়া জায়েজ নয়। সেক্ষেত্রে এটি (জিহাদ) তার জন্য ফরযে আইন এবং তার জন্য যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করা বৈধ নয়।
.
দ্বিতীয় পরিস্থিতি হলো (জিহাদ ফরযে আইন হবার জন্য), যখন কোনো শহর শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়। তখন সে শহরকে রক্ষার জন্য লড়াই করতে হবে। কেননা যখন কোনো শহরকে অবরোধ করা হয় তখন একে রক্ষার জন্য লড়াই ছাড়া উপায় থাকে না। শত্রুরা শহরের কাউকে ঢুকতে দেয় না বা শহর থেকে কাউকে বেরোতে দেয় না, জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ বা অন্য কোনো জিনিস ঐ শহরে পৌঁছাতে দেয় না। এই পরিস্থিতিতে সেই শহরের অধিবাসীদের জন্য জরুরী হচ্ছে নিজ শহর রক্ষার জন্য যুদ্ধ করা।
.
তৃতীয় পরিস্থিতি হলো, যখন তাদের ইমাম (শাসক) সকলকে একত্রিত হবার আদেশ দেন। ইমাম হচ্ছেন একটি রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের অধিকারী। এক্ষেত্রে তাঁর জন্য সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ইমাম হওয়া জরুরী নয়। কেননা বহুকাল ধরে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ইমামত (অর্থাৎ খিলাফত) নেই। নবী(ﷺ) বলেছেন, “তোমরা শোনো এবং আনুগত্য করো, যদিও তোমাদের উপর কোনো হাবশী কৃতদাসকে শাসক নিযুক্ত করা হয়”। সুতরাং যদি কোনো ব্যক্তি শাসক হন, তাঁর কথা শুনতে হবে এবং তাঁর আদেশ মেনে চলতে হবে।
[শারহুল মুমতি ৮/১০-১২]
.
.
মূল ফতোয়ার লিঙ্কঃ
ইংরেজিঃ https://islamqa.info/en/20214/
আরবিঃ https://islamqa.info/ar/20214/

জান্নাতের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

 নিম্নে কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক জান্নাতের সংক্ষিপ্ত বিবরণ পেশ করা হল:

🔶 সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন,

أَعْدَدْتُ لِعِبَادِيَ الصَّالِحِينَ مَا لَا عَيْنٌ رَأَتْ وَلَا أُذُنٌ سَمِعَتْ وَلَا خَطَرَ عَلَى قَلْبِ بَشَرٍ

“আমি আমার সৎকর্ম শীল বান্দাদের জন্য এমন সব সামগ্রী প্রস্তুত করে রেখেছি যা কোন মনব চক্ষু অবলোকন করে নি কিংবা কোন মানব মনে যার কল্পনাও উদ্রেক হয় নি।” [সহীহ বুখারী হা/৩০০৫ ও মুসলিম, হা/৫০৫০ (হাদীসে কুদসী) ]

🔶 সহীহ বুখারীতে আরও বর্ণিত হয়েছে, আবু হারায়রা রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

مَوْضِعُ سَوْطٍ فِي الْجَنَّةِ خَيْرٌ مِنْ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا

“জান্নাতের এক ধনুক সমপরিমাণ স্থান দুনিয়া ও তম্মধ্যস্থিত সবকিছু থেকে উত্তম।” [সহীহ বুখারী, অনুচ্ছেদ: জান্নাতের বিবরণ এবং জান্নাত সৃষ্টি করা হয়েছে। হা/৩০১১]

🔸 সহীহ বুখারীতে সাহল বিন সাদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি,

مَوْضِعُ سَوْطٍ فِي الْجَنَّةِ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا

“জান্নাতের এক ছড়ি সমপরিমাণ স্থান দুনিয়া ও তম্মধ্যস্থিত সব কিছু হতে উত্তম।” (সহীহ বুখারী)

🔰 জগত বিখ্যাত মনিষী ইমাম ইবনে কাইয়েম র. বলেন, যে গৃহ আল্লাহ স্বহস্তে নির্মাণ করার পর তা তাঁর প্রিয় বান্দা-বান্দীদেরর জন্য আবাসস্থল হিসেবে নির্ধারণ করেছেন এবং রহমত ও সন্তোষ দ্বারা পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন সে গৃহের কিভাবে মূল্য পরিমাপ করা যায়?

জান্নাতের নির্মাণশৈলী ও উপকরণ সামগ্রী:
আপনি যদি জান্নাতের নির্মাণশৈলী ও উপকরণ সামগ্রী সম্পর্কে জানতে চান তাহলে নিম্নে তা উপস্থাপন করছি:
🌼 জান্নাতের মাটি কুস্তরী ও জাফরান সমৃদ্ধ।
🌼 জান্নাতের ছাদে আল্লাহর আরশ অবস্থিত।
🌼 জান্নাতের নুড়ি পাথর গুলো এক একটি মহামূল্যবান মনি-মুক্তা।
🌼 প্রাসাদের প্রতিটি ইট স্বর্ণের তৈরি।
🌼 বৃক্ষরাজির গোড়া গুলো সাধারণ কাঠ নয় বরং স্বর্ণ ও রৌপ্যের তৈরি।
🌼 এগুলোর ফল-ফলাদি মটকার মত বড়, মাখনের চেয়ে নরম এবং মধুর চেয়ে মিষ্টি।
🌼 এগুলোর পত্র-পল্লব মসৃণ কাপড়ের চেয়ে সুন্দর।
🌼 এর নদী-প্রস্রবণ কোনটি দুধের, যার সাধ পরিবর্তন হয় না। কোনটি শরাবের যা পানকারীদের রসনা তৃপ্ত করবে। আর কোনটি পরিষ্কার-স্বচ্ছ মধুর।
🌼 এর খাদ্য সামগ্রী হল জান্নাতিদের পছন্দ মাফিক বিচিত্র ধরণের ফলমূল ও নানা জাতের পাখির মাংস।
🌼 পানীয় হল তাসনীম ( সুমধুর পানীয় বিশেষ) যানজবীল (আদা) ও কর্পূর মিশ্রিত।
🌼 জান্নাতের প্রাসাদগুলোর দুই দরজার চৌকাঠের মধ্যে চল্লিশ বছরের পথের ব্যবধান।
🌼 এর মধ্যস্থিত বৃক্ষরাজির ছায়ার দৈর্ঘ্য হচ্ছে, একেকটি বৃক্ষের ছায়াতলে একজন দ্রুত গতি সম্পন্ন ঘোড়া সওয়ার এক হাজার বছর ধরে দ্রুত বেগে ঘোড়া ছুটিয়েও অতিক্রম করতে পারবে না।
🌼 এর পরিধি হল, একজন নিম্ন মর্যদার অধিকারী জান্নাতী তার রাজত্বের পরিসীমা, খাট-পালং, প্রাসাদ এবং বাগ-বাগিচার ভিতর দিয়ে দু হাজার বছর চলতে পারবে।
🌼 জান্নাতের তাঁবু এবং গম্বুজগুলো মণি-মুক্তার তৈরি। প্রতিটি তাঁবুর ভিতরের প্রশস্ততা ষাট মাইলের পথ।
🌼 আর জান্নাতিদের পরিধেয় হল, স্বর্ণ খচিত রেশমি পোশাক।
🌼 তাদের স্ত্রীগণ হবে উন্নত বক্ষা, সমবয়স্কা তরুণী। যাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে যৌবনের সুধা প্রবহমান। গোলাপের পাপড়ি এবং আপেল সদৃশ গণ্ডদেশ। ডালিম সদৃশ উন্নত বক্ষদেশ। মনি-মুক্তা সদৃশ সারিবদ্ধ দন্তরাজি। পাতলা, কমনীয় ও আকর্ষণীয় কোমর। মুখ মণ্ডলের সৌন্দর্য ছটায় যেন চন্দ্র-সূর্য প্রবাহিত হয় আর মৃদু হাসিতে যেন বিদ্যুৎ চমকায়। এরা তারুণ্যে সকলেই সমবয়স্কা। তাদের সৌন্দর্য যেন আকাশের চন্দ্র-সূর্য কেও হার মানায়।

পরিশেষে দুয়া করি, মহান আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদেরকে তার প্রিয়ভাজন বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত করে চিরসুখের নীড় জান্নাতের অধিবাসী হওয়ার তওফীক দান করেন। তিনি সর্ব শ্রোতা ও দুয়া কবুল কারী।
———————
তওবা জান্নাতের সোপান
অনুবাদ ও গ্রন্থনা:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
(লিসান্স: মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব)।
দাঈ জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

ওসিলা এর সঠিক অর্থ: বাঁচুন পীরপন্থী ও মাজারপূরজারীদের অপব্যাখ্যা থেকে

 আল্লাহ তাআলা বলেন,

يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَابْتَغُوٓا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ وَجٰهِدُوا فِى سَبِيلِهِۦ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“হে ঈমানদাগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, (আনুগত্য ও সন্তোষজনক আমলের মাধ্যমে) তাঁর নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান কর এবং তাঁর পথে জিহাদ কর, যাতে তোমরা সফলতা লাভ করতে পার।” (সূরা মায়িদা: ৩৫)

❑ উক্ত আয়াতের তাফসির:

আল্লাহ তাআলা মু’মিনদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন তাঁকে ভয় করার এবং তাঁর কাছে ওসিলা বা নৈকট্য অন্বেষণ করার।
ওসিলা (الوسيلة) এর আভিধানিক অর্থ হল মাধ্যম ও নৈকট্য। [আন-নিহায়াহতু ফী গারীবিল হাদিস ওয়াল আসার ৫/১৮৫, লিসানুল আরব ১১/৭২৪]

উপরে উল্লেখিত উভয় অর্থেই ওসিলা শব্দটি ব্যবহার হয়। তবে সাহাবি, তাবেঈ ও বিশিষ্ট মুফাসসিরগণ এ আয়াতে ওসিলা শব্দটিকে মাধ্যম অর্থে ব্যবহার না করে “নৈকট্য” অর্থে ব্যবহার করেছেন। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, الوسيلة অর্থ القربة বা নৈকট্য। কাতাদাহ রাহ. বলেন,

تقربوا إليه بطاعته والعمل بما يرضيه

“আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য ও যেসব কাজে তিনি খুশি হন, তার দ্বারা তাঁর নৈকট্য হাসিল কর।” [ইবনে কাসির, ৩/১২৪]

তাই আয়াতের অর্থ হল: হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর এবং তাঁর আনুগত্য ও সৎ আমলের মাধ্যমে নৈকট্য অন্বেষণ কর।

❑ কুরআনে বর্ণিত ‘ওসিলা’ শব্দের অপব্যাখ্যা:

এক শ্রেণির নামধারী মুসলিম ইসলামকে ব্যবসার বস্তু বানিয়ে নিজের জীবনোপকরণ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। আর অপর শ্রেণি ধর্মীয় জ্ঞানের অভাবে তাদের ব্যবসাকে ভাল মনে করে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সহজ কথায় ওসীলার দোহাই দিয়ে পীর-মুরিদীর ব্যবসা চালু করেছে।

সেসব নামধারী ধর্মীয় ব্যবসায়ীগণ বলে: শুধু ঈমান ও আমলের দ্বারা সাধারণ মানুষের পক্ষে আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য হাসিল করা সম্ভব নয় বরং একজন পীরের হাতে বাইআত নিতে হবে।

বান্দা যখন গুনাহ করতে করতে চরম পর্যায়ে চলে যায় তখন আল্লাহ তাআলা ও বান্দার মাঝে আড়াল সৃষ্টি হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা সে বান্দার গুনাহ ক্ষমা করতে চান না। পীর সাহেবের অনুনয়-বিনিয়ের কারণে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেন। জনৈক পীর সাহেব অত্র আয়াতের তাফসীরে তার বইতে লিখেছেন: “আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের জন্য একজন পীরের হাতে বাইআত কর।”(নাউযুবিল্লাহ)

মূলত কোন পীর, গাউস-কুতুব, বাবা, খাজার হাতে বাইআত করা অথবা মাজারে গিয়ে ওসিলা তালাশ করা সম্পূর্ণ শিরকি ও বিদআতি কাজ-যা মক্কার তৎকালীন মুশরিকরা করত। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَي اللّٰهِ زُلْفٰي
“আমরা তো এদের উপাসনা এজন্য করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দেয়।” (সূরা যুমার ৩৯:৩)

❑ শরিয়তসম্মত ওসিলা তিন প্রকার:

◈ ১. আল্লাহ তাআলার সুন্দর নাম ও গুণাবলীর ওসিলায় দুআ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلِلہِ الْاَسْمَا۬ئُ الْحُسْنٰی فَادْعُوْھُ بِھَا

“আল্লাহর জন্য রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা তাঁকে সে সকল নামেই ডাক।”(সূরা আরাফ ৭:১৮০)

অনুরূপ সহীহ হাদিসে এসেছে:

يا حَيُّ يا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيثُ

“হে চিরঞ্জীব! হে সবকিছুর ধারক! আমি তোমার রহমতের ওসীলায় সাহায্য কামনা করছি।” (নাসায়ী হা: ৩৫২৪, সহীহ)

◈ ২. সৎ আমলের দ্বারা ওসীলা করা। যেমন ঈমান, সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ্জ ইত্যাদি।

সহীহ হাদিসে এসেছে- একদা বানী ইসরাইলের তিন ব্যক্তি পথে চলছিল, ঝড় বৃষ্টির কারণে তারা একটি পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত গুহায় আশ্রয় নেয়। পাহাড়ের চূড়া থেকে একটি পাথর গড়িয়ে পড়ে তাদের গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেলে তারা পরস্পর বলতে লাগল,

إِنَّهُ لَا يُنْجِيْكُمْ مِنْ هَذِهِ الصَّخْرَةِ إِلَّا أَنْ تَدْعُوا اللّٰهُ بِصَالِحِ أَعْمَالِكُمْ

“তোমাদের সৎ আমলের ওসিলায় আল্লাহ তা‘আলাকে আহ্বান না করা ব্যতীত এ পাথর থেকে তোমাদের মুক্তির কোন উপায় নেই।” [সহীহ বুখারি হা: ২২৭২, সহীহ মুসলিম হা: ২৭৪৩] মানুষ তার কৃত শরিয়তসম্মত আমলের ওসিলায় আল্লাহ তা‘আলার কাছে মুক্তি ও সাহায্য চাইবে।

◈ ৩. কোন ব্যক্তির দুআর মাধ্যমে ওসিলা করা। তবে শর্ত হল:

■ ১. ব্যক্তি জীবিত থাকতে হবে।
■ ২. ব্যক্তি নেককার ও মুত্তাকি হতে হবে।
■ ৩. উপস্থিত থাকতে হবে।

যেমন সাহাবিগণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইন্তেকালের পর তাঁর চাচা আব্বাস রা.-এর দু‘আর ওসীলায় আল্লাহ তাআলার কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করতেন। (সহীহ বুখারি হা: ১০১০)

অতএব কোন মৃত ব্যক্তির ওসিলা গ্রহণ করা, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সত্ত্বা দ্বারা ওসিলা তালাশ করা, তার সম্মান ও মর্যাদা দ্বারা ওসিলা তালাশ করা ও কোন বুজুর্গ ব্যক্তি, কবর বা মাজারের ওসিলা তালাশ করা বিদআত এবং পর্যায়ক্রমে তা শিরকে পৌঁছে দেয়া।

❑ আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:

■ ১. সর্বদা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করা আবশ্যক।
■ ২. ঈমান ও সৎ আমল দ্বারা ওসীলা গ্রহণ করা শরীয়তসম্মত।
■ ৩. শর্ত সাপেক্ষে জীবিত ব্যক্তির ওসিলা গ্রহণ বৈধ।
■ ৪. সমাজে প্রচলিত ওসিলার অপব্যাখ্যা ও পীর-মুরিদির অসারতা সম্পর্কে জানলাম।
■ ৫. কিয়ামতের দিন শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য কোন প্রকার বিনিময় দেয়া যাবে না।
[উৎস: ফাতহুল মাজিদ]
▬▬▬◍❂◍▬▬▬
সংকলন ও গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate