Tuesday, September 15, 2026

যে শর্ত দিয়ে টাকা ধার দিলে সুদ হয়ে যায়

 প্রশ্ন: আমার স্বামীর বোন তাঁকে ৫ লাখ টাকা ধার দিতে চান, যা দিয়ে আমাদের বাড়ির (আমি ও আমার স্বামীর মালিকানাধীন, বোনের কোনো অংশ নেই) বাকি নির্মাণকাজ শেষ করা হবে। শর্ত হলো, বাড়ি ভাড়া দেওয়া হলে ভাড়ার অর্ধেক অংশ প্রতি মাসে বোন পাবেন এবং নির্দিষ্ট সময় শেষে দেওয়া ৫ লাখ টাকাও তাঁকে সম্পূর্ণ ফেরত দিতে হবে। আমরা আর্থিক সমস্যার কারণে শুধু ধার চেয়েছিলাম। কিন্তু বোন এই শর্তে টাকা দিতে রাজি হয়েছেন। এটি কি সুদ, নাকি বৈধ ব্যবসায়িক বিনিয়োগ? সুদ হলে কারণসহ জানাবেন।

🔸উত্তর: এই লেনদেন জায়েজ নয়। এটা সুদি কারবার। কারণ এখানে মূল লেনদেনটি একটি কর্জ বা ঋণ। আর ঋণের নিয়ম হলো, যত টাকা নেওয়া হয়েছে ঠিক ততটাই ফেরত দিতে হয়; কোনো বাড়তি সুবিধা গ্রহণ করা যাবে না। কিন্তু এখানে বোন কর্জ দেওয়ার শর্ত হিসেবে ভাড়ার একটা অংশও নিচ্ছেন আর সেইসঙ্গে নির্দিষ্ট সময় শেষে তাঁর সম্পূর্ণ মূলধনও ফেরত পাচ্ছেন। অর্থাৎ তিনি ঋণ দিয়ে নিশ্চিতভাবে বাড়তি একটা লাভ পাচ্ছেন।
আর ফিকহের একটি প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি হলো:
كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبًا
“যে কর্জ থেকে ঋণদাতা অতিরিক্ত সুবিধা নেয় তা-ই সুদ।” তাই এই লেনদেনকে “ভাড়ার ভাগ” নাম দিলেও মূল বাস্তবতায় এটি সুদি লেনদেন, যা হারাম।
➧ কেউ কেউ মনে করতে পারেন, এটা হয়তো ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের (মুশারাকা) মতো কিছু অথবা পুঁজি-শ্রমের অংশীদারিত্বের (মুদারাবা) মতো কিছু। কিন্তু আসলে তা নয়।
কেননা—
◈ বৈধ ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব (মুশারাকা) হতে হলে, যিনি টাকা দিচ্ছেন তাঁর সেই সম্পদে প্রকৃত মালিকানা থাকতে হয় এবং লাভ-ক্ষতি উভয়ই তাঁকে ভাগাভাগি করতে হয়। কিন্তু এই বাড়িতে বোনের কোনো মালিকানা নেই। আর ক্ষতি হলেও তিনি তার ভাগী হচ্ছেন না; শুধু লাভের অংশ নিচ্ছেন।
◈ আবার পুঁজি-শ্রমের ভিত্তিতে ব্যবসা (মুদারাবা) হতে হলে, পুঁজিদাতার মূলধন ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারে না; কোনো কারণে ক্ষতি হলে আর্থিক ক্ষতি সম্পূর্ণটা তাঁকেই বহন করতে হয়। কিন্তু এখানে বোনকে নির্দিষ্ট সময়ে সম্পূর্ণ মূলধন ফেরত দেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ এখানে তাঁর পুঁজি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত। সুতরাং এটি বৈধ লেনদেন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই এমন লেনদেন থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। এক্ষেত্রে করণীয় হলো, বোন যদি চান, তাহলে সহায়তার উদ্দেশ্যে কোনো ফায়দা গ্রহণের শর্ত আরোপ ছাড়াই কর্জ দেবেন। এক্ষেত্রে তিনি শুধু প্রদত্ত মূলধন ফেরত নেবেন। অতিরিক্ত কোনো মুনাফা বা সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন না। অথবা লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যবসার উদ্দেশ্যে অর্থ বিনিয়োগ করবেন (মুদারাবা)। অন্যথায় এভাবে ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
❑ ফতওয়ায়ে বিন বায: ফায়দা দেওয়ার শর্তে ঋণ নেওয়ার হুকুম
প্রশ্ন: এক যুবক ঋণগ্রস্ত। সে একটি ব্যাংকে গিয়ে এই শর্তে দশ হাজার রিয়াল ঋণ নেয় যে, এক বছর পর বারো হাজার রিয়াল ফেরত দেবে। এটা কি সুদ? এতে কি সে গুনাহগার হবে?
উত্তর: “হ্যাঁ, এটি নিশ্চিতভাবেই সুদ। ব্যাংক থেকে দশ হাজার রিয়াল ঋণ নিয়ে বারো হাজার রিয়াল ফেরত দেওয়ার শর্ত করা স্পষ্ট সুদের অন্তর্ভুক্ত। এতে আলেমদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। চাই এই লেনদেন ব্যাংকের সাথে হোক কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির সাথে—সব ক্ষেত্রে তা সমানভাবে হারাম। ইসলামে বাড়তি কিছু ফেরত দেওয়ার শর্তে ঋণ নেওয়া বা দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তা বাড়তি পরিমাণের পরিমাণ মাত্র এক দিরহাম হলেও। তবে কেউ যদি কোনো শর্ত ছাড়া ঋণ নেয় এবং পরিশোধের সময় স্বেচ্ছায় কোনো চাপ বা পূর্বপ্রত্যাশা ছাড়া কিছু বেশি ফেরত দেয় তবে তা জায়েজ। কারণ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«إِنَّ خِيَارَكُمْ أَحْسَنُكُمْ قَضَاءً»
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে ঋণ পরিশোধে সবচেয়ে উদার।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬০১]
নবি করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেও যখন কারো কাছ থেকে ঋণ নিতেন পরিশোধের সময় তার চেয়ে উত্তম ও বেশি কিছু ফেরত দিতেন।”
প্রশ্ন: কিন্তু যদি নির্দিষ্ট কোনো অঙ্ক নির্ধারণ না করে আগে থেকেই অলিখিত কোনো চুক্তি বা বাড়তি দেওয়ার ইঙ্গিত থাকে তবে তার বিধান কী?
উত্তর: “এমন অলিখিত বোঝাপড়া বা মনস্তাত্ত্বিক প্রত্যাশাও জায়েজ নয়। মুখে বা কাগজে নির্দিষ্ট করে লেখা না থাকলেও যদি বাড়তি কিছু দেওয়ার পূর্বশর্ত বা ইঙ্গিত থেকে থাকে তবে অতিরিক্ত কোনো কিছুই দেওয়া যাবে না। সে ক্ষেত্রে যত টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল ঠিক ততটাই ফেরত দিতে হবে।”
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
(দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব)।

No comments:

Post a Comment

Translate