Friday, June 20, 2025

এক মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের কতটি অধিকার বা হক রয়েছে

 প্রশ্ন: এক মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের কতটি অধিকার (হক) রয়েছে? এই অধিকারসমূহ পালন করার শারঈ বিধান কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী মুহাম্মদের প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।অতঃপর:এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের যেসব অধিকার রয়েছে, সে সম্পর্কে হাদীসে দুটি প্রসিদ্ধ বর্ণনা পাওয়া যায়। একটিতে পাঁচটি এবং অন্যটিতে ছয়টি হকের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো:
১. সালামের জবাব দেওয়া
২. রোগীকে দেখতে যাওয়া
৩. জানাযার সঙ্গে যাওয়া
৪. নিমন্ত্রণ গ্রহণ করা
৫. হাঁচির জবাব দেওয়া
৬. উপদেশ চাইলে তা প্রদান করা
.
দলিল হচ্ছে,আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: إِذَا لَقِيتَهُ فَسَلِّمْ عَلَيْهِ وَإِذَا دَعَاكَ فَأَجِبْهُ وَإِذَا اسْتَنْصَحَكَ فَانْصَحْ لَهُ وَإِذَا عَطَسَ فَحَمِدَ اللَّهَ فَسَمِّتْهُ وَإِذَا مَرِضَ فَعُدْهُ وَإِذَا مَاتَ فَاتَّبِعْهُ.“এক মুসলিমের উপর অন্য মুসলিমের হক পাঁচটি: ১) সালামের জবাব দেওয়া, ২) অসুস্থকে দেখতে যাওয়া, ৩) লাশের অনুসরণ করা, ৪) নিমন্ত্রণ গ্রহণ করা, ৫) হাঁচির জবাব দেওয়া।”(সহীহ বুখারী হা/১২৪০; ও সহীহ মুসলিম হা/২১৬২) অপর বর্ননায় আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ سِتٌّ قِيلَ مَا هُنَّ يَا رَسُولَ اللَّهِ: قَالَ إِذَا لَقِيتَهُ فَسَلِّمْ عَلَيْهِ وَإِذَا دَعَاكَ فَأَجِبْهُ وَإِذَا اسْتَنْصَحَكَ فَانْصَحْ لَهُ وَإِذَا عَطَسَ فَحَمِدَ اللَّهَ فَسَمِّتْهُ وَإِذَا مَرِضَ فَعُدْهُ وَإِذَا مَاتَ فَاتَّبِعْهُ.“এক মুসলিমের উপর অপর মুসলিমের হক ছয়টি।” জিজ্ঞাসা করা হলো: হে আল্লাহর রাসূল, সেগুলো কী কী? তিনি বললেন: “সাক্ষাৎ হলে তাকে সালাম দিবে। সে তোমাকে নিমন্ত্রণ করলে তুমি সাড়া দিবে। তোমার কাছে উপদেশ চাইলে তাকে উপদেশ দিবে। সে হাঁচি দিয়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়লে তুমি ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলবে। সে অসুস্থ হলে তুমি তাকে দেখতে যাবে। সে মারা গেলে তুমি তার পিছে পিছে যাবে।”(সহীহ মুসলিমে হা/২১৬২)
.
ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وَالْمُرَادُ بِقَوْلِهِ: (حَقُّ الْمُسْلِمِ) أَنَّهُ لَا يَنْبَغِي تَرْكُهُ وَيَكُونُ فِعْلُهُ إمَّا وَاجِبًا أَوْ مَنْدُوبًا نَدْبًا مُؤَكَّدًا شَبِيهًا بِالْوَاجِبِ الَّذِي لَا يَنْبَغِي تَرْكُهُ، وَيَكُونُ اسْتِعْمَالُهُ فِي الْمَعْنَيَيْنِ مِنْ بَابِ اسْتِعْمَالِ الْمُشْتَرَكِ فِي مَعْنَيَيْهِ، فَإِنَّ الْحَقَّ يُسْتَعْمَلُ فِي مَعْنَى الْوَاجِبِ، كَذَا ذَكَرَهُ ابْنُ الْأَعْرَابِيِّ، وَكَذَا يُسْتَعْمَلُ فِي مَعْنَى الثَّابِتِ وَمَعْنَى اللَّازِمِ وَمَعْنَى الصِّدْقِ وَغَيْرِ ذَلِكَ وَقَالَ ابْنُ بَطَّالٍ: الْمُرَادُ بِالْحَقِّ هُنَا الْحُرْمَةُ وَالصُّحْبَةُ.”এক মুসলিমের উপর অন্য মুসলিমের ‘হক’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: যা ত্যাগ করা অনুচিত। যা পালন করা ওয়াজিব কিংবা এমন তাগিদপূর্ণ মুস্তাহাব যা ওয়াজিবের সদৃশ, যা ত্যাগ করা উচিত নয়। এখানে এই শব্দটি দ্বৈত অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি এক শব্দ বিভিন্নার্থে ব্যবহৃত হওয়া শ্রেণীয়। কেননা ‘হক’ শব্দটি ওয়াজিব (আবশ্যক) অর্থে ব্যবহৃত হয় যেমনটি বলেছেন ইবনুল আ’রাবী। এছাড়াও শব্দটি সাব্যস্ত, অনিবার্য ও সত্য অর্থেও ব্যবহৃত হয়। ইবনু বাত্তাল বলেন: এখানে ‘হক’ দ্বারা উদ্দেশ্য সম্মান ও সাহচর্য।”(শাওকানী; নাইলুল আওত্বার; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২১)
.
ওয়াজিব ও মুস্তাহাবের বিবেচনা থেকে এক মুসলিমের উপর অন্য মুসলিমের হকসমূহ:
.
এক মুসলিমের উপর অন্য মুসলিমের অধিকারগুলোর মধ্যে কোনটি ওয়াজিবে-আইন। তথা প্রত্যেক ব্যক্তির উপর সেটি পালন করা আবশ্যকীয়। যদি কেউ পালন না করে তাহলে সে গুনাহগার হবে। আর কোনটি ওয়াজিবে-কিফায়াহ। তথা কিছু মানুষ পালন করলে অন্যেরা আর গুনাহগার হবে না। আর কোনটি মুস্তাহাব; ওয়াজিব নয়। কোন মুসলিম সেটি পালন না করলে গুনাহগার হবে না। সবগুলো ধারাবাহিকভাবে জানার চেষ্টা করব।
.
❑ (১)- যদি শুধু একজনকে সালাম দেয়া হয় তাহলে সালামের জবাব দেয়া তার উপর ওয়াজিব। আর যদি একদল মানুষকে সালাম দেওয়া হয় তাহলে সালামের জবাব দেয়া ফরযে-কিফায়াহ। আর শুরুতে সালাম দেওয়ার মূলবিধান সুন্নত। আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ গ্রন্থে এসেছে:” ابْتِدَاءُ السَّلاَمِ سُنَّةٌ مُؤَكَّدَةٌ، لِقَوْلِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَفْشُوا السَّلاَمَ بَيْنَكُمْ وَيَجِبُ الرَّدُّ إِنْ كَانَ السَّلاَمُ عَلَى وَاحِدٍ. وَإِنْ سَلَّمَ عَلَى جَمَاعَةٍ فَالرَّدُّ فِي حَقِّهِمْ فَرْضُ كِفَايَةٍ، فَإِنْ رَدَّ أَحَدُهُمْ سَقَطَ الْحَرَجُ عَنِ الْبَاقِينَ، وَإِنْ رَدَّ الْجَمِيعُ كَانُوا مُؤَدِّينَ لِلْفَرْضِ، سَوَاءٌ رَدُّوا مَعًا أَوْ مُتَعَاقِبِينَ، فَإِنِ امْتَنَعُوا كُلُّهُمْ أَثِمُوا لِخَبَرِ؛ حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ خَمْسٌ: رَدُّ السَّلاَمِ…”সালাম দেওয়া সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা সালামের প্রসার কর।” একজনকে সালাম দেয়া হলে সালামের জবাব দেয়া তার উপর ওয়াজিব। আর একদল মানুষকে সালাম দেওয়া হলে তখন তাদের সবার উপর এর জবাব দেওয়া ফরযে-কিফায়াহ। অর্থাৎ যদি একজন জবাব দেয় বাকিদের উপর থেকে আবশ্যকতা মওকূফ হয়ে যাবে। আর যদি সবাই জবাব দেয় তাহলে সবাই ফরয আদায় করেছে বলে গণ্য হবে; চাই তারা এক সাথে জবাব দিক কিংবা একজনের পর অন্যজন জবাব দিক। আর যদি সবাই বিরত থাকে তাহলে তারা সবাই গুনাহগার হবে। কারণ হাদীসে আছে: এক মুসলিমের উপর অন্য মুসলিমের হক পাঁচটি: সালামের জবাব দেওয়া…।(আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ; খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৩১৪)
.
❑ (২)- অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া ফরযে-কিফায়াহ।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:وعيادة المريض فرض كفاية، لابد أن يعود المسلمون أخاهم، وإذا عاده واحد منهم حصلت به الكفاية، وقد تكون فرض عين إذا كان المريض من الأقارب وعدت عيادته من الصلة؛ فإن صلة الأرحام واجبة، فتكون فرض عين “অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া (ইয়াদাহ বা সান্ত্বনা প্রদান) ফরযে-কিফায়াহ। কোনো মুসলিম ভাই অসুস্থ হলে মুসলিমদের উচিত তাকে দেখতে যাওয়া। যদি কারো পক্ষ থেকে একজন এটি আদায় করে, তাহলে বাকি সবার পক্ষ থেকে দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি ফরজে ‘আইন’ও হয়ে যেতে পারে—যেমন, যদি রোগী আত্মীয়স্বজনদের অন্তর্ভুক্ত হন এবং তাকে দেখতে যাওয়াটা আত্মীয়তার সম্পর্ক সংরক্ষণ (صلة الرحم) হিসেবে গণ্য হয়; কেননা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ওয়াজিব। সুতরাং এ অবস্থায় রোগীকে দেখতে যাওয়াটা ফরজে ‘আইন’ হয়ে যাবে।”(ইবনু উসাইমীন,
মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ১০৮৫; শারহু রিয়াদিস সালিহিন; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৫৯৫-৫৯৭)
.
অসুস্থ মানুষকে দেখতে যাওয়া বা তার সেবা করা যেমন মুসলমানের উপর ওয়াজিব, তেমনি এর বিশেষ ফযীলত রয়েছে। রাসূল (ﷺ) বলেন,”আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ ছিলাম, তুমি আমাকে দেখতে আসনি। সে বলবে, হে প্রভু! কিভাবে আমি আপনাকে দেখতে যাব, আপনি তো সারা জাহানের পালনকর্তা? তিনি বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল? তুমি তাকে দেখতে যাওনি। তুমি কি জানতে না যে, তুমি যদি তাকে দেখতে যেতে, তাহ’লে অবশ্যই তুমি আমাকে তার কাছে পেতে?”।(সহীহ মুসলিম হা/২৫৬৯; মিশকাত হা/১৫২৮)। রাসূল ﷺ) আরো বলেন,”যে ব্যক্তি রোগীকে দেখার জন্য যায়, আসমান থেকে একজন ফেরেশতা তাকে লক্ষ্য করে বলে, ধন্য তুমি, ধন্য হোক তোমার এ পথ চলা। জান্নাতে তুমি একটি গৃহ তৈরী করে নিলে”।(তিরমিযী হা/২০০৮; মিশকাত হা/৫০১৫; সহীহুত তারগীব হা/২৫৭৮)। তিনি আরো বলেন, ‘যে মুসলিম সকাল বেলায় কোন অসুস্থ মুসলিমকে দেখতে যায়, তার জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত সত্তুর হাযার ফেরেশতা দো‘আ করতে থাকে। যদি সে তাকে সন্ধ্যায় দেখতে যায়, তার জন্য সত্তর হাযার ফেরেশতা সকাল পর্যন্ত দু‘আ করতে থাকে এবং তার জন্য জান্নাতে একটি বাগান তৈরী হয়’ (তিরমিযী হা/৯৬৯)। তিনি বলেন, ‘কোন মুসলিম যখন তার অন্য কোন মুসলিম ভাইয়ের রোগের খবর জানার জন্য যায়, সে না ফেরা পর্যন্ত জান্নাতের খুরফার মধ্যে অবস্থান করে। জিজ্ঞাসা করা হ’ল, হে আল্লাহর রাসূল! খুরফাহ কী? তিনি বললেন, জান্নাতের ফল-পাড়া’ (মুসলিম হা/২৫৬৮; মিশকাত হা/১৫২৭)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি রোগীর সাথে সাক্ষাৎ করতে যায়, সে রহমতের মধ্যে বিচরণ করতে থাকে। অতঃপর সে যখন (রোগীর নিকটে) বসে যায়, তখন রহমতে স্থিতিশীল হয়ে যায় (আহমাদ হা/১৪২৯৯; সিলসিলা সহীহাহ হা/২৫০৪)।
.
❑ (৩)- জানাযায় উপস্থিত হওয়া:
.
মুসলিম মাইয়্যেতের উপর জানাযার নামায পড়া ফর্যে কিফায়াহ (অর্থাৎ কিছু লোক তা পালন করলে বাকী লোকের কোন পাপ হয়না এবং কেউই পালন না করলে সকলেই পাপী হয়। কারণ, এ নামায পড়তে আল্লাহর নবী (ﷺ) আদেশ করেছেন। যায়দ বিন খালেদ জুহানী বলেন, খাইবারের দিন নবী (ﷺ) এর এক সাহাবী মারা গেলে সকলে তাকে খবর দিলেন। কিন্তু তিনি বললেন, “তোমাদের সঙ্গীর জানাযা তোমরা পড়।” এ কথা শুনে সকলের চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। কারণ বর্ণনা করে তিনি বললেন, “তোমাদের ঐ সাথী আল্লাহর পথে খেয়ানত করে মারা গেছে…।”(আবু দাউদ হা/২৩৩৫; ইবনে মাজাহ হা/২৮৩৮; মুসনাদে আহমাদ হা/২০৮৬) অবশ্য দুই প্রকার মাইয়্যেতের জানাযা এ নির্দেশের আওতাভুক্ত নয়। অর্থাৎ তাদের জানাযা পড়া ওয়াজেব নয়; তবে বিধেয় বটে। প্রথম হল নাবালক শিশু। কারণ নবী (ﷺ) তার শিশু পুত্র ইব্রাহীম এর জানাযা পড়েন নি। মা আয়েশা (রাঃ) বলেন, নবী (ﷺ) এর পুত্র ১৮ মাস বয়সে মারা যায়। তিনি তার জানাযা পড়েন নি।”(আবু দাউদ হা/ ২৭৭২ মুসনাদে আহমাদ হা/২৫১০১; আবু দাউদ হা/২৭২৯) আর দ্বিতীয় হল শহীদ। কেননা নবী (ﷺ) উহুদ প্রভৃতি যুদ্ধের শহীদদের জানাযা পড়েন নি বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। অবশ্য তার নামায না পড়াটা উক্ত ধরনের মাইয়্যেতের অবিধেয় হওয়ার নির্দেশ দেয় না। বরং নিম্নোক্ত শ্রেণীর মাইয়্যেতের জানাযা পড়া ওয়াজেব না হলেও পড়া উচিত।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন,
صلاة الجنازة فرض كفاية إذا قام بها البعض سقطت عن الباقين ، وإذا تركها الجميع وهم يعلمون أثموا ، ولا خصوصية للرجال بذلك ، بل الرجال والنساء في مشروعية الصلاة على الجنازة سواء ، وإن كان الأصل في مباشرة ذلك للرجال ، لكن ليس للمرأة أن تتبع الجنازة لما ثبت من قول أم عطية : ( نهينا عن اتباع الجنائز ، ولم يعزم علينا ) رواه البخاري ومسلم ، وفي رواية : ( نهانا رسول الله صلى الله عليه وسلم … ) الحديث .
জানাযার নামায ফরযে কিফায়া। যদি কিছু লোক সেটা আদায় করে অন্যদের উপর থেকে সেটা মওকুফ হয়ে যায়। আর যদি জেনেশুনে সকলে বর্জন করে তাহলে সকলে গুনাহগার হয়। এ বিধান পুরুষদের জন্য খাস নয়। বরং মৃত ব্যক্তির জানাযার নামায আদায়ের ক্ষেত্রে নর-নারী উভয়ের জন্য বিধান সমান। যদিও মূলত: পুরুষেরাই এ আমলটি করে থাকে। তবে কোন নারী মৃতব্যক্তির অনুগমণ করবে না (কবরস্থানে যাবে না)। যেহেতু উম্মে আতিয়্যা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: “আমাদেরকে মৃতব্যক্তির অনুগমণ করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। তবে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়নি।”[সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম] অপর এক বর্ণনায় এসেছে: “রাসূলুল্লাহ্‌সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে….নিষেধ করেছেন”।(আল-হাদিস; ফাতওয়া লাজনাতুদ দাইমাহ; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১৪০৪০)
.
❑ (৪)- আর নিমন্ত্রণে সাড়া দেয়া:
.
যে প্রকার দাওয়াতে সাড়া দেওয়ার ব্যাপারে মুসলিম আদিষ্ট সে দাওয়াতকে আলেমরা দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন। এক: বিবাহের দাওয়াত। দুই: বিবাহের দাওয়াত ছাড়া অন্যান্য দাওয়াত। সুতরাং যদি সেটা বিয়ের ওলীমার দাওয়াত হয় তাহলে অধিকাংশ মাযহাব মতে কোন শরয়ি ওজর ছাড়া সাড়া দেওয়া ওয়াজিব। আর যদি ওলীমা ছাড়া অন্য কোন উপলক্ষ্য হয় তাহলে অধিকাংশ মাযহাব মতে সাড়া দেওয়া মুস্তাহাব। তবে নিমন্ত্রণে সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত রয়েছে। বনু ‘উমার (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:(إِذَا دُعِيَ أَحَدُكُمْ إِلَى الْوَلِيمَةِ فَلْيَأْتِهَا) “যখন তোমাদের কাউকে ওয়ালীমার দা’ওয়াত দেয়া হয়, সে যেন ঐ দা’ওয়াতে সাড়া দেয়”।(সহিহ বুখারী হা/৫১৭৩; সহিহ মুসলিম, হা/ ৩৪০১) অপর বর্ণনায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি দা‘ওয়াত বর্জন করল সে আল্লাহ ও তার রসূলের নাফরমানী করল।’’(সহীহ মুসলিম হা/১০৬, ১৪৩১)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন, “يقول العلماء رحمهم الله : إنه تجب إجابة دعوة العرس في أول مرة ، أي أول وليمة إذا عيَّنه سواء بنفسه ، أو بوكيله ، أو ببطاقة يرسلها إليه ، بشرط ألا يكون في الوليمة منكر ، فإن كان فيها منكر ففيه تفصيل : إن كان إذا حضر أمكنه منع المنكر وجب عليه الحضور ، وإن كان لا يستطيع فإنه لا يجوز له أن يحضر” “আলেমগণ (আল্লাহ তাদের উপর রহম করুন) বলেন: বিয়ের প্রথম দাওয়াত কবুল করা ওয়াজিব। অর্থাৎ প্রথম ওয়ালিমার। যদি নিমন্ত্রণকারী কিংবা তার প্রতিনিধি কিংবা কার্ড পাঠানোর মাধ্যমে ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্টভাবে দাওয়াত দেয়া হয়। তবে শর্ত হচ্ছে এ অনুষ্ঠানে যেন শরিয়ত গর্হিত কোন কিছু না থাকে। আর যদি এ অনুষ্ঠানে শরিয়ত গর্হিত কোন কিছু থাকে তাহলে এর হুকুম ব্যাখ্যাসাপেক্ষ: যদি ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে এ গর্হিত কাজে নিষেধ করা সম্ভবপর হয় তাহলে এ ব্যক্তির জন্য (ঐ ওয়ালিমায়) উপস্থিত হওয়া ওয়াজিব। আর যদি উপস্থিত হয়ে এ গর্হিত কাজে বাধা দেয়া সম্ভবপর না হয় তাহলে এ ব্যক্তির জন্য উপস্থিত হওয়া জায়েজ নয়”।(ইবনু উসাইমীন, লিকা আল-বাব আল-মাফতুহ: ১৩/১৩৩)
.
জেনে রাখা ভালো যে,ওয়ালিমার দাওয়াত পেলে উপস্থিত হওয়া ওয়াজিব হলেও কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে এ ওয়াজিব দায়িত্বটি অব্যাহতি পেতে পারে। অর্থাৎ কিছু যুক্তিসঙ্গত ওযরের (অজুহাত/কারণ) ভিত্তিতে দাওয়াতে না যাওয়া জায়েয (অনুমোদিত) হয়। নিচে এমন কিছু ওযরের বিবরণ দেওয়া হলো, যেগুলোর কারণে দাওয়াতে উপস্থিত হওয়া থেকে বিরত থাকা বৈধ গণ্য হবে।
.
(১).খাদ্য সন্দেহযুক্ত হওয়া, (২).খাদ্যানুষ্ঠানে যদি শুধু ধনীদের খাস করে দাওয়াত করা হয় এবং গরীবদের বর্জন করা হয়, (৩).সেখানে এমন লোক আছে যে উপস্থিত সভ্যদের কষ্ট দেয়, (৪).সেখানে এমন সব লোক বসবে যাদের সাথে বসা উচিত নয়, (৫).দাওয়াতকারী তার অনিষ্টতা চাপা দেয়ার জন্য কিংবা তার যশ খ্যাতি প্রকাশের লোভে দাওয়াত করেছে, (৬).দাওয়াতকারী তার বাতিল ও নিষিদ্ধ কর্মের সমর্থন আদায় বা সাহায্যের জন্য দাওয়াত করছে, (৭). কিংবা সেখানে নিষিদ্ধ কর্ম হয়ে থাকে যেমন মদ্যপান, অশ্লীল গান-বাজনা ও খেল-তামাশা ইত্যাদি, (৮).এমনকি বিছানাও যদি রেশমীর বিছানা হয় এ জাতীয় অনুষ্ঠানের দাওয়াত বর্জন করা বৈধ। বর্তমানের দাওয়াতী অনুষ্ঠানগুলোতে কোনো না কোনো দিক থেকে এ জাতীয় কর্মকান্ড হয়েই থাকে। সুতরাং এ জাতীয় অনুষ্ঠানে যোগদান না করার ওযর বিদ্যমান এবং গ্রহণযোগ্য।(বিস্তারিত জানতে দেখুন, ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হা: ৫১৭৩, নববী; শারহে মুসলিম ৯ম/১০ম খন্ড, হা/১৪২৯; মিরকাতুল মাফাতীহ)
.
❑ (৫)- হাঁচির জবাব দেওয়া:
.
হাঁচির জবাব দেওয়ার হুকুম প্রসঙ্গে আহালুল আলেমের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ গ্রন্থে রয়েছে:”وَهَذَا التَّشْمِيتُ سُنَّةٌ عِنْدَ الشَّافِعِيَّةِ.وَفِي قَوْلٍ لِلْحَنَابِلَةِ وَعِنْدَ الْحَنَفِيَّةِ هُوَ وَاجِبٌ.وَقَالَ الْمَالِكِيَّةُ، وَهُوَ الْمَذْهَبُ عِنْدَ الْحَنَابِلَةِ بِوُجُوبِهِ عَلَى الْكِفَايَةِ. وَنُقِلَ عَنِ الْبَيَانِ أَنَّ الأَشْهَرَ أَنَّهُ فَرْضُ عَيْنٍ، لِحَدِيثِ ” كَانَ حَقًّا عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ سَمِعَهُ أَنْ يَقُولَ لَهُ: يَرْحَمُكَ اللَّهُ “‘শাফেয়ীদের মতে হাঁচির জবাব দেওয়া সুন্নহ। হাম্বলীদের এক মতে এবং হানাফীদের মতে এটি ওয়াজিব। মালেকীদের মেত এবং হাম্বলীদের মাযহাবের মতে: হাঁচির জবাব দেওয়া ওয়াজিবে-কিফায়াহ। আল-বায়ান গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে যে: প্রসিদ্ধ মতানুসারে এটি ফরযে-আইন। কারণ হাদীসে আছে: যে মুসলিমই এটি (হাঁচির পরে আলহামদুলিল্লাহ) শুনতে পাবে তার জন্য ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলা ‘হক্ক’ তথা আবশ্যকীয়।” (আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা; ২২)
.
শক্তিশালী মত হলো: কেউ যদি হাঁচিদাতাকে আলহামদুলিল্লাহ পড়তে শুনে তার জন্য হাঁচির জবাব দেওয়া ওয়াজিব। কারণ ইমাম বুখারী বর্ণনা করেন: আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ হাঁচি পছন্দ করেন, আর হাই তোলা অপছন্দ করেন। কেউ যদি হাঁচি দিয়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে তাহলে এটি শুনতে পেয়েছে এমন প্রত্যেক মুসলিমের জন্য হাঁচির জবাব দেওয়া ‘হক্ক’ তথা আবশ্যকীয়।”(সহীহ বুখারী হা/৬২২৩)
ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন:وَقَدْ تَقَدَّمَ حَدِيث أَبِي هُرَيْرَة وَفِيهِ فَإِذَا عَطَسَ أَحَدكُمْ، وَحَمِدَ اللَّه، كَانَ حَقًّا عَلَى كُلّ مُسْلِم سَمِعَهُ أَنْ يَقُول: يَرْحَمك اللَّه . وَتَرْجَمَ التِّرْمِذِيّ عَلَى حَدِيث أَنَس ( بَاب مَا جَاءَ فِي إِيجَاب التَّشْمِيت بِحَمْدِ الْعَاطِس) وَهَذَا يَدُلّ عَلَى أَنَّهُ وَاجِب عِنْده، وَهُوَ الصَّوَاب، لِلْأَحَادِيثِ الصَّرِيحَة الظَّاهِرَة فِي الْوُجُوب مِنْ غَيْر مُعَارِض وَاَللَّه أَعْلَم.”ইতঃপূর্বে আবু হুরাইরার হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে যাতে রয়েছে: “তোমাদের কেউ যদি হাঁচি দেয় এবং আল্লাহর প্রশংসা করে তাহলে তা শুনতে পেয়েছে এমন প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ইয়ারহামুকাল্লাহ বলা ‘হক্ক’ তথা আবশ্যকীয়।”তিরমিযী আনাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের পরিচ্ছেদের শিরোনাম দেন এভাবে: ‘হাঁচিদাতার আলহামদুলিল্লাহ বলার জবাব প্রদানের আবশ্যকতা প্রসঙ্গে যা বর্ণিত হয়েছে সে সংক্রান্ত পরিচ্ছেদ’। এই নামকরণ প্রমাণ করে যে হাঁচির জবাব দেয়া তার কাছে ওয়াজিব। এটাই সঠিক অভিমত। কারণ আবশ্যকতার পক্ষে সুস্পষ্ট হাদীসসমূহ রয়েছে, যেগুলোর বিপরীতে কোন হাদিস নেই। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।”
.
এ বিষয়ক হাদিসগুলোর মধ্যে রয়েছে: আবু হুরাইরার হাদীস, যা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।এছাড়াও তাঁর থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদীস রয়েছে: “এক মুসলিমের উপর অপর মুসলিমের পাঁচটি হক ওয়াজিব।” সেগুলো ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। আরো রয়েছে সালেম ইবনে উবাইদের হাদীস, যেখানে আছে: ‘তার কাছে যে থাকবে সে যেন বলে: ইয়ারহামুকাল্লাহ’। আরো রয়েছে: তিরমিযী কর্তৃক সংকলিত আলী (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “এক মুসলিমের উপর অন্য মুসলিমের ছয়টি সদ্ব্যবহারের বিষয় আছে: (১) তার সাথে দেখা হলে তাকে সালাম করবে, (২) নিমন্ত্রণ করলে তাতে সাড়া দিবে, (৩) সে হাঁচি দিলে উত্তর দিবে (তার আলহামদুলিল্লাহর উত্তরে বলবে ইয়ারহামুকাল্লাহ), (৪) সে রোগাক্রান্ত হলে তাকে দেখতে যাবে, (৫) সে মারা গেলে তার লাশের অনুসরণ করবে এবং (৬) নিজের জন্য যা ভালোবাসে তার জন্যেও সেটাকে ভালোবাসবে।” তিরমিযী বলেন: হাদীসটি হাসান। একাধিক সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে। কেউ কেউ এ হাদিসের এক বর্ণনাকারী আল-হারেস আল-আ’ওয়ার এর সমালোচনা করেছেন। এ বিষয়ে আবু হুরাইরা (রাঃ), আবু আইয়ুব (রাঃ), আল-বারা (রাঃ) এবং আবু মাসউদ (রাঃ) থেকেও হাদীস বর্ণিত হয়েছে।আরো রয়েছে: তিরমিযী কর্তৃক সংকলিত আবু আইয়ুব (রাঃ) এর বর্ণিত হাদীস: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের কেউ যখন হাঁচি দিবে তখন সে যেন বলে: আলহামদুলিল্লাহ। এর সাথে যেন বলে: ‘আলা কুল্লি হাল’। যে ব্যক্তি তার জবাব দিবে সে যেন বলে: ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’। আবার হাঁচিদাতা যেন বলে: ‘ইয়াহদীকুমুল্লাহু ওয়া ইউসলিহু বালাকুম’।”
এ হাদিসগুলোর মধ্যে হাঁচির জবাব দেয়া ওয়াজিব হওয়ার পক্ষে চার ধরনের প্রমাণ রয়েছে: এক: হাঁচির জবাব দেওয়ার আবশ্যকতা দ্ব্যর্থহীন সুস্পষ্ট শব্দে তথা ‘ওয়াজিব’ শব্দ ব্যবহার করে উল্লেখ করা; যা কোনো ধরনের ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না। দুই: ‘হক’ শব্দ ব্যবহার করার মাধ্যমে আবশ্যক করা। তিন: على অব্যয়টির প্রত্যক্ষ অর্থ ‘ওয়াজিব’ আরোপ করা। চার: নির্দেশ প্রদান। এই ধরনগুলো ছাড়া অন্যভাবেও বহু ওয়াজিব সাব্যস্ত করা হয়েছে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।(হাশিয়াতু ইবনুল কাইয়্যিম ‘আলা সুনানি আবি দাউদ খণ্ড;১৩;পৃষ্ঠা;২৫৯) তিনি ইবনু কাইয়ুম আরো বলেন: فَظَاهِرُ الْحَدِيثِ الْمَبْدُوءِ بِهِ: أَنَّ التَّشْمِيتَ فَرْضُ عَيْنٍ عَلَى كُلِّ مَنْ سَمِعَ الْعَاطِسَ يَحْمَدُ اللَّهَ، وَلَا يُجْزِئُ تَشْمِيتُ الْوَاحِدِ عَنْهُمْ، وَهَذَا أَحَدُ قَوْلَيِ الْعُلَمَاءِ، وَاخْتَارَهُ ابن أبي زيد، وَأَبُو بَكْرِ بْنُ الْعَرَبِيِّ الْمَالِكِيَّانِ، وَلَا دَافِعَ لَهُ.”প্রথম হাদীসটির প্রত্যক্ষ মর্ম: যে ব্যক্তিই হাঁচিদাতাকে ‘আলহামদু লিল্লাহ’ বলতে শুনবে তার জন্য এর জবাব দেওয়া ফরযে-আইন (ব্যক্তিক ফরয)। তাই সবার পক্ষ থেকে একজনে হাঁচির জবাব দেওয়া যথেষ্ট হবে না। এটি আলেমদের দুটো অভিমতের একটি। মালেকী আলেম আবু যাইদ ও আবু বকর ইবনুল আরাবী এটি বাছাই করেছেন। এই মতকে প্রতিহতকারী কিছু নেই।”(যাদুল মা’আদ; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৪৩৭)
.
❑ (৬).তার কাছে উপদেশ চাইলে সে উপদেশ দিবে:
.
উপদেশ দেয়ার হুকুমের ক্ষেত্রে মতভেদ থাকলেও শক্তিশালী মত হলো এটি ওয়াজিবে কিফায়াহ। ইবনু মুফলিহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:” وَظَاهِرُ كَلَامِ أَحْمَدَ وَالْأَصْحَابِ وُجُوبُ النُّصْحِ لِلْمُسْلِمِ، وَإِنْ لَمْ يَسْأَلْهُ ذَلِكَ، كَمَا هُوَ ظَاهِرُ الْإِخْبَارِ…”ইমাম আহমদ ও তাঁর সাথীদের কথার প্রত্যক্ষ মর্ম হলো: কোন মুসলিমকে সু-পরামর্শ দেওয়া আবশ্যক, যদিও সে নিজের থেকে পরামর্শ না চায়; যেমনটি হাদীসের প্রত্যক্ষ মর্ম থেকে বোধগম্য …(ইবনু মুফলিহ ‘আল-আদাবুশ শারইয়্যাহ; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩০৭)
.
মোল্লা আলী ক্বারী হানাফি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
(وَإِذَا اسْتَنْصَحَكَ)‘
অর্থাৎ সে যদি তোমার কাছে উপদেশ চায় তাহলে তুমি উপদেশ দিবে। তথা আবশ্যকীয় বিশ্বাস করে দিবে। অনুরূপভাবে সে উপদেশ না চাইলেও তাকে উপদেশ দেওয়া আবশ্যক।”(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ২১৩)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি, (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম:৭৭৩ হি: মৃত:৮৫২ হি:] বলেন:” وَقَدْ تَبَيَّنَ أَنَّ مَعْنَى الْحَقِّ هُنَا الْوُجُوب، خلافًا لقَوْل بن بَطَّالٍ الْمُرَادُ حَقُّ الْحُرْمَةِ وَالصُّحْبَةِ وَالظَّاهِرُ أَنَّ الْمُرَادَ بِهِ هُنَا وُجُوبُ الْكِفَايَةِ‘এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে এখানে ‘হক’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ওয়াজিব হওয়া। এটি ইবনু বাত্তালের বক্তব্যের বিপরীত, যিনি বলেছেন সম্মান ও সাহচর্যের অধিকার। প্রত্যক্ষ অর্থ হলো এখানে ‘হক’ দ্বারা ওয়াজিবে-কিফায়াহ উদ্দেশ্য।”(ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১১৩) আরো বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১৭৮৬৩৯)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

নাপাকি লেগে থাকা কাপড় পড়ে সালাত আদায় করার শারঈ হুকুম

 প্রশ্ন: যদি কারো কাপড়ে নাপাকি (নাজাসাত) লেগে থাকে, তাহলে সে অবস্থায় সালাত আদায় করার শারঈ হুকুম কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী মুহাম্মদের প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর সর্বপ্রথম যে বিষয়টি জেনে রাখা জরুরি তা হচ্ছে নাপাকী থেকে পবিত্রতা অর্জন করা সালাত শুদ্ধতার একটি শর্ত। যদি কারো পোশাকে নাপাকী লেগে থাকে এবং সে তা পরিষ্কার না করেই সালাত আদায় করে, তবে তার সালাত শুদ্ধ হবে না; বরং তা বাতিল গণ্য হবে। কেননা সে এমন এক অবস্থায় সালাত আদায় করেছে যা শরীয়তের বিধানবিরুদ্ধ এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যা আদেশ করেছেন, তা থেকে বিচ্যুত। এই প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীনে কোনো নতুন কিছু উদ্ভাবন করল যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য।’’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম) মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় আছে, ‘‘যে ব্যক্তি এমন কোনো কাজ করল, যাতে আমাদের নির্দেশ নেই, তা বর্জনীয়।’’(সহীহ বুখারী: ২৬৯৭; মুসলিম: ১৭১৮; আবূ দাউদ: ৪৬০৬; ইবনু মাজাহ: ১৪) “অতএব কেউ যদি নাপাক পোশাকে সালাত আদায় করে, তবে সে এমন একটি পদ্ধতিতে ইবাদত করেছে, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে অগ্রাহ্যযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। এই বিধান নারী পুরুষ উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। এই বিষয়টি পরিস্কার ভাবে বুঝার জন্য বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন। আমরা এই বিষয়টি তিনটি পয়েন্টে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।
.
❑ প্রথমত: পবিত্রতা দুই প্রকার: (১). হাদাস (নাপাক অবস্থা) থেকে পবিত্রতা এবং (২).নাজাস (নাপাক বস্তু) থেকে পবিত্রতা।
(১)। হাদাস (নাপাক অবস্থা) থেকে পবিত্রতা: এটি আবার দুই ধরনের যথা: গুরু হাদাস ও লঘু হাদাস থেকে পবিত্রতা। যে ব্যক্তি হাদাসগ্রস্ত (যে ব্যক্তির ওযু নেই) অবস্থায় নামায পড়ে আলেমদের ইজমার ভিত্তিতে তার নামায সঠিক নয়। আবু হুরায়রা (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: “তোমাদের কারো ওযু ভঙ্গ হলে; ওযু না-করা অবধি আল্লাহ্‌ তার নামায কবুল করেন না।”(সহীহ বুখারী হা/৬৯৫৪)
.
(২)। নাজাস থেকে পবিত্রতা। যে ব্যক্তি জেনেশুনে স্মরণ থাকা অবস্থায় কোন নাপাকি নিয়ে সালাত পড়ে তার সালাত সহিহ নয়। জেনে রাখা ভাল যে সালাত আদায়কারীর জন্য তিনটি স্থানের নাপাকি দূর করা আবশ্যক:
.
প্রথম স্থান: নিজ দেহ। সালাত আদায়ের পূর্বে সালাত আদায়কারীর দেহ সম্পূর্ণরূপে পবিত্র থাকা আবশ্যক। শরীরের কোনো অংশে নাপাকি থাকলে তা সালাতের জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণিত একটি সহিহ হাদীসে। তিনি বলেন:”নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুটি কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তখন তিনি বললেন: “নিশ্চয় এ দুজনকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, তবে কোন কবিরা গুনাহর কারণে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে না। তাদের একজন চোখলখুরী করে বেড়াত। অপরজন পেশাব থেকে নিজেকে পবিত্র রাখত না…।”(সহিহ মুসলিম, হা/২৯২) এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, শরীর পবিত্র রাখা শুধু সালাতের জন্যই নয়, বরং দুনিয়া ও আখিরাতে শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
.
দ্বিতীয় স্থান: পোশাক। সালাত আদায়ের পূর্বে নামাযীর পোশাক সম্পূর্ণরূপে পবিত্র থাকা আবশ্যক। এর সপক্ষে প্রমাণ রয়েছে আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ) এর হাদিসে তিনি বলেন: “একবার এক নারী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল: আমাদের কেউ যখন তার পোশাকে হায়েযগ্রস্ত হয় তখন সে কি করবে; সে ব্যাপারে অবহিত করুন। তিনি বললেন: খসে ফেলে দিবে। এরপর পানি দিয়ে ঘষে ধুয়ে ফেলবে এবং তাতে নামায পড়বে।”(সহিহ বুখারী হা/২২৭)
.
তৃতীয় স্থান: সালাত পড়ার স্থান। সালাত আদায়ের পূর্বে সালাত আদায়ের স্থানও পবিত্র থাকা আবশ্যক। এর সপক্ষে প্রমাণ রয়েছে আনাস বিন মালিক (রাঃ) এর হাদিসে তিনি বলেন: “একবার এক বেদুঈন এসে মসজিদের এক প্রান্তে পেশাব করে দিল। লোকেরা তাকে ধমকালো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে নিষেধ করলেন। যখন সে পেশাব শেষ করল তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বড় এক বালতি পানি আনার ও পেশাবের উপর ঢেলে দেয়ার নির্দেশ দিলেন।”(সহিহ বুখারী হা/২২১)
.
❑ দ্বিতীয়ত: যখন কাপড়ে নাপাকী লেগে যায় তখন তার তিনটি অবস্থা হতে পারে:
.
(১).যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে কাপড়ের কোনো নির্দিষ্ট স্থানে নাজাসাত (অপবিত্রতা) লেগেছে, তাহলে অবশ্যই ওই নির্দিষ্ট স্থানটুকু ধুয়ে ফেলতে হবে।
.
(২).যদি প্রবল ধারণা হয় যে, নাজাসাত (অপবিত্রতা) পোশাকের নির্দিষ্ট কোনো একটি স্থানে লেগেছে, তবে ওই স্থানটুকুও ধুয়ে ফেলতে হবে।
.
(৩).যদি সন্দেহ থাকে যে কোথায় নাপাকী লেগেছে, একাধিক স্থানের সম্ভাবনা থাকে, তাহলে ওই ক্ষেত্রে প্রথমে অনুসন্ধান করতে হবে এরপর নিজের প্রবল ধারণা অনুযায়ী যে স্থানে নাপাকি লেগেছে বলে মনে হয়, শুধু সেই স্থানটি ধুয়ে ফেলাই যথেষ্ট হবে।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন: ইবনু উসাইমীন; আশ-শারহুল মুমতি, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২২১)
.
❑ তৃতীয়ত: কাপড়ে নাজাসাত (অপবিত্রতা) থাকা অবস্থায় সালাত আদায়কারীর দুটি অবস্থা হতে পারে।
.
(১).যদি কোনো ব্যক্তি নিশ্চিত জানার পরও নাজাসাত (অপবিত্র) কাপড়ে সালাত আদায় করে তাহলে তার ঐ সালাত শুদ্ধ হবে না। তাকে পুনরায় পবিত্র কাপড়ে সালাত আদায় করতে হবে। এর কারণ সালাতের শর্তসমূহের মধ্যে একটি হলো পোশাক পবিত্র থাকা। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, আসমা বিনতে আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত একটি সহিহ হাদীসে এসেছে:”একবার এক নারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল: আমাদের কেউ যদি হায়েয (মাসিক রক্ত) দ্বারা তার কাপড় অপবিত্র করে ফেলে, সে অবস্থায় সে কী করবে? তিনি উত্তরে বললেন: সে যেন তা খুঁটে ফেলে, এরপর পানি দিয়ে ঘষে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলে, তারপর ঐ কাপড়ে সালাত আদায় করে।”(সহিহ বুখারী, হা/২২৭) এই হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কাপড় পবিত্র না থাকলে সালাত আদায় করা জায়েয নয়, বিশেষত যদি তা জানা থাকে। তাই অপবিত্রতা সম্পর্কে জেনে বুঝে সালাত আদায় করলে, তা বৈধ হবে না এবং তা পুনরায় আদায় করা আবশ্যক।
.
(২).যদি কেউ অজান্তে বা ভুলক্রমে এমন পোশাক পরিধান করে সালাত আদায় করে যাতে নাপাকি (নাজাসাত) লেগে ছিল কিংবা জানার পর ভুলে গেছে অতঃপর সালাত সম্পন্ন করার পর জানা গেল যে, কাপড়ে নাপাকি ছিল। অথবা কাপড়ে নাপাকি থাকার কথা আগে থেকেই জানতো কিন্তু ভুলে গিয়েছে। সালাত শেষ হওয়ার পর সেকথা স্মরণ হল। তবে অধিকাংশ আলেমের বিশুদ্ধ মতে তার সালাত সহিহ হয়েছে; তা পুনরায় আদায় করার প্রয়োজন নেই। কেননা সে তো এই নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হয়েছে না জেনে অথবা ভুলক্রমে। আর আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেছেন,رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا“হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা যদি ভুলে যাই বা ভুলক্রমে কোন কিছু করে ফেলি তবে আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না।” (সূরা বাক্বারা: ২৮৬) “আল্লাহ্ বলেন, আমি তাই করলাম।” অর্থাৎ পাকড়াও করলাম না। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) এই অভিমতকে অধিকাংশ আলেমের অভিমত হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং নিজে এই অভিমতকে নির্বাচন করেছেন।(নববী আল-মাজমু; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৬৩) আর এই মাসয়ালায় খাস একটি দলিলও রয়েছে। সেটি হলো একদা রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুতা নিয়ে সালাত আদায় করছিলেন, কিন্তু তাতে ছিল নাপাকি। তিনি তা জানতেন না। জিবরীল (আঃ) সে ব্যাপারে তাঁকে অবহিত করলে নামায চলাবস্থায় তিনি তা খুলে ফেললেন। এক্ষেত্রে তিনি নতুন করে সালাত আদায় করেননি।(হাদিসটি দেখুন আবু দাউদ হা/৬৫০; মুসনাদ আহমাদ হা/৪৬, ৪০০; মিশকাত হা/৭৬৬) সুতরাং যদি এটি সালাতের প্রথম অংশকে বাতিল না করে থাকে তাহলে অবশিষ্ট সালাতও  বাতিল করবে না। আর এ থেকে প্রমাণিত হয় সালাত অবস্থায় যদি নাপাকির ব্যাপারে জানতে পারে, তবে সালাত অবস্থাতেই উহা বিদূরীত করার চেষ্টা করবে যদি উহা বিদূরীত করতে গিয়ে সতর ঢেকে রাখার ক্ষেত্রে কোন অসুবিধা না হয়। অনুরূপভাবে যদি ভুলে যায় আর সালাতরত অবস্থায় তা স্মরণ হয়, তবে সতরের ক্ষেত্রে কোন অসুবিধা না হলে সালাত না ভেঙ্গেই উক্ত কাপড় খুলে ফেলবে। কিন্তু যদি সালাত শেষ হওয়ার পর স্মরণ হয় বা নাপাকি সম্পর্কে জানতে পারে, তবে সালাত বিশুদ্ধ হবে ফিরিয়ে পড়ার দরকার হবে না।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] হাম্বলি মাযহাব এর বিখ্যাত গ্রন্থ জাদিল মুস্তাকনির ব্যাখায় বলেন:
وقوله: (أو نَسيَها) أي: نَسيَ أنَّ النَّجاسة أصابته ، ولم يذكر إلا بعد سلامه فعليه الإعادة على كلام المؤلِّف ؛ لإخلاله بشرط الصَّلاة ؛ وهو اجتناب النجاسة ، فهو كما لو صَلَّى محدثاً ناسياً حدثه.
ومثل ذلك لو نسيَ أن يغسلها .
والرَّاجح في هذه المسائل كلِّها : أنه لا إعادة عليه سواء نسيها ، أم نسي أن يغسلها ، أم جهل أنها أصابته ، أم جهل أنها من النَّجاسات ، أم جهل حكمها ، أم جهل أنها قبل الصَّلاة ، أم بعد الصلاة .
والدَّليل على ذلك : القاعدة العظيمة العامة التي وضعها الله لعباده وهي قوله: ( لا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْساً إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ رَبَّنَا لا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا ) وهذا الرَّجُل الفاعل لهذا المحرَّم كان جاهلاً أو ناسياً ، وقد رفع الله المؤاخذة به ، ولم يبقَ شيء يُطالب به .
وهناك دليل خاصٌّ في المسألة ، وهو أنَّ رسول الله صلى الله عليه وسلم حين صَلَّى في نعلين وفيهما قَذَرٌ ؛ وأعلمه بذلك جبريل لم يستأنف الصَّلاة ، وإذا لم يُبْطِل هذا أولَ الصَّلاة ، فإنه لا يُبْطِلُ بقيَّة الصَّلاة “
গ্রন্থকারের বক্তব্য: “ভুলে গেছে”: অর্থাৎ নাপাকি যে লেগেছে সেটি ভুলে গেছে এবং সালাম ফেরানোর পূর্বে তার মনে পড়েনি; তাহলে গ্রন্থকারের মতানুযায়ী তাকে পুনরায় সালাত পড়তে হবে। যেহেতু ‘নাপাকি দূর করা’ শীর্ষক সালাতের শর্তটি এতে লঙ্ঘিত হয়েছে। তাই এ ব্যক্তির অবস্থা এমন যে ব্যক্তি ওযু ভাঙ্গার কথা ভুলে গিয়ে ওযু ছাড়া সালাত পড়ে ফেলেছে এবং ঐ ব্যক্তির মত যে ব্যক্তি নাপাকি ধোয়ার কথা ভুলে গিয়েছিল। এ সবকটি মাসয়ালায় অগ্রগণ্য অভিমত হলো: পুনরায় সালাত পড়া তার উপর আবশ্যক নয়; হোক সে ব্যক্তি নাপাকি লাগার কথা ভুলে গেছেন কিংবা নাপাকি ধোয়ার কথা ভুলে গেছেন কিংবা নাপাকি যে লেগেছে সেটাই জানত না; কিংবা সেগুলো যে, নাপাকি সেটাই জানত না; কিংবা নাপাকির হুকুম জানত না; কিংবা নাপাকিটা কি সালাতের আগের, না পরের সেটা জানত না। এর সপক্ষে দলিল হলো সেই মহান সাধারণ মূলনীতি যা আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দাদের জন্য প্রণয়ন করেছেন: “আল্লাহ্‌ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কাজ চাপিয়ে দেন না। সে যা (ভাল) উপার্জন করে তার সুফল সে পায়, আবার যা (মন্দ) উপার্জন করে তার কুফলও সে ভোগ করে। হে আমাদের প্রভু! আমরা যদি ভুলে যাই কিংবা ভুল করি তাহলে আমাদেরকে শাস্তি দিবেন না।”[সূরা বাক্বারা, ২: ২৮৬] এই হারাম কাজ যে লোক করেছে সে অজ্ঞ ছিল কিংবা বিস্মৃতিগ্রস্ত ছিল। এমন লোককে পাকড়াও করা থেকে আল্লাহ্‌ নিস্তার দিয়েছেন। সুতরাং তার উপর কোন কিছু আরোপ করার বাকী নেই। এই মাসয়ালায় খাস একটি দলিলও রয়েছে। সেটি হলো যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন দুইটি জুতা পরে সালাত আদায় করলেন যে জুতাতে ময়লা ছিল এবং জিব্রাইল আলাইহিস সালাম তাঁকে বিষয়টি অবহিত করলেন তখন তিনি নতুনভাবে সালাত শুরু করলেন না। যদি এটি সালাতের প্রথম অংশকে বাতিল না করে থাকে তাহলে অবশিষ্ট সালাতকেও বাতিল করবে না।”(ইমাম ইবনু উসামীন আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২৩২) থেকে সমাপ্ত]
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল:”যদি কোনো ব্যক্তি জানে যে তার শরীর বা পোশাকে নাপাকী (নাজাসাত) লেগেছে, কিন্তু তা সালাতের সময় ভুলে যায় এবং সালাত শেষ হওয়ার পর স্মরণ করে তাহলে তার ঐ সালাতের হুকুম কী?
জবাবে শাইখ বলেন:
:إذا كان على بدن الإنسان أو ثوبه نجاسة فنسي ذلك ولم يذكر إلا بعد الصلاة فصلاته صحيحة؛ لعموم قوله سبحانه: رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا [البقرة:286]، وصح عن رسول الله ﷺ أن الله سبحانه قال: قد فعلت.ولما ثبت عنه ﷺ أنه في بعض صلواته صلى في نعليه فأتاه جبرائيل فأخبره أن بهما خبثا فخلعهما، ولم يعد أول صلاته، وقال عليه الصلاة والسلام لأصحابه: إذا أتى أحدكم الصلاة فليقلب نعليه، فإن وجد بهما أذى فليزله ثم ليصل فيهما، فدل ذلك على أن المصلي إذا لم يعلم بالنجاسة في ثوبه أو نعله أو في مصلاه إلا بعد الصلاة، أو لم يذكر ذلك إلا بعد الصلاة، فإن صلاته صحيحة، بخلاف الحدث فإنه إذا صلى وهو محدث ناسيًا فإن صلاته غير صحيحة، وعليه أن يعيدها لقول النبي ﷺ: لا تقبل صلاة أحدكم إذا أحدث حتى يتوضأ, متفق على صحته، وقول النبي ﷺ: لا تقبل صلاة بغير طهور ولا صدقة من غلول أخرجه مسلم في صحيحه، والله ولي التوفيق.
“যদি কোনো ব্যক্তির দেহে বা পোশাকে নাপাকী (নাজাসাত) লেগে থাকে এবং সে তা ভুলে যায় এবং সালাত শেষে তা স্মরণ হয়, তাহলে তার সালাত শুদ্ধ। কারণ আল্লাহর এ সাধারণ বাণীর অন্তর্ভুক্ত:﴿رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا﴾(অর্থাৎ) ‘হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই বা ভুল করি, তাহলে আমাদেরকে পাকড়াও করো না।’ (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬) এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে সহীহ হাদীসে প্রমাণিত যে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “(আমি তা করেছি।)” [অর্থাৎ আমি এই দোআ কবুল করেছি।] আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে প্রমাণিত আছে যে, তিনি একদা জুতা পায়ে দিয়ে সালাত আদায় করেছিলেন, অতঃপর জিবরাঈল (আ.) এসে তাঁকে জানালেন যে, জুতাদ্বয়ে অপবিত্র কিছু লেগে আছে। তখন তিনি তা খুলে ফেলেন এবং প্রথম দিকের (আদায় করা) সালাত পুনরায় পড়েননি। তিনি সাহাবীদের বললেন:“তোমাদের কেউ যখন সালাতে আসে, সে যেন তার জুতাদ্বয় উল্টে দেখে; যদি তাতে কোনো ময়লা দেখে, তাহলে তা দূর করুক, তারপর সে তা পরেই সালাত আদায় করুক।”(আবু দাউদ হা/৬৫০) এ থেকে প্রমাণিত হয়, যদি কোনো সালাত আদায়কারী তার পোশাক, জুতা বা সালাতের স্থান নাপাক হওয়ার বিষয়টি সালাতের পূর্বে না জানে, বা সালাতের পরে স্মরণ হয়, তাহলে তার সালাত শুদ্ধ। তবে হাদাস (অজু ভঙ্গ) ভিন্ন বিষয়।যদি কেউ অজু ছাড়াই ভুলবশত সালাত আদায় করে, তাহলে তার সালাত সহীহ হবে না এবং তাকে তা পুনরায় আদায় করতে হবে। কেননা, নবী ﷺ বলেছেন:“তোমাদের কেউ যখন অজু ভঙ্গ করে, তার সালাত কবুল হবে না যতক্ষণ না সে ওযু করে।”(এ হাদীস দু’জন ইমাম বুখারী ও মুসলিম একমত হয়ে বর্ণনা করেছেন) আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:“পবিত্রতা ছাড়া কোনো সালাত গ্রহণযোগ্য নয়, এবং গনীমতের খিয়ানতের ধন-সম্পদ থেকে কোনো সদকা (যাকাত) কবুল হয় না।”(এটি ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন হা/২২৪) আল্লাহই তাওফীক দানকারী।”(বিন বায; মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ২৯; পৃষ্ঠা: ১০৯)
.
আর যদি কেউ নাপাকী সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে (অর্থাৎ জানত না),তাহলে করনীয় কি এ বিষয়ে শাইখ ইবনু বায (রহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হলে জবাবে তিনি বলেন:إذا كان لم يعلم نجاستها إلا بعد الفراغ من الصلاة فصلاته صحيحة، لأن النبي صلى الله عليه وسلم لمَّا أخبره جبريل وهو في الصلاة أن في نعليه قذَراً خلعهما ولم يُعد أول الصلاة. وهكذا لو علمها (أي النجاسة) قبل الصلاة ثم نسي فصلى فيها ولم يذكر إلا بعد الصلاة، لقول الله عز وجل: (ربنا لا تؤاخذنا إن نسينا أو أخطأنا)…أما إذا شك في وجود النجاسة في ثوبه وهو في الصلاة لم يجز له الانصراف منها سواء كان إماماً أو منفرداً وعليه أن يتم صلاته.”)ব্যক্তি যদি সালাত শেষ হওয়ার পর নাপাকীর বিষয়টি জানতে পারে, তাহলে তার সালাত সহীহ (সঠিক)। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সালাতে ছিলেন, তখন জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে জানালেন যে, তাঁর জুতার মধ্যে নাপাকী রয়েছে। তখন তিনি জুতা খুলে ফেলেন, কিন্তু সালাতের শুরু থেকে তা পুনরায় পড়েননি।”
একইভাবে যদি কেউ সালাত আদায়ের আগে জানতো যে তার কাপড়ে নাপাকী আছে, কিন্তু পরে ভুলে যায় এবং সে পোশাকেই সালাত  আদায় করে ফেলে, তারপর সালাত শেষে মনে পড়ে তাহলেও তার সালাত শুদ্ধ। এর দলীল হলো আল্লাহ তাআলার বাণী:“হে আমাদের রব! যদি আমরা ভুল করি কিংবা ভুলে যাই, তবে আমাদেরকে পাকড়াও করো না।”(সূরা আল-বাকারা: ২৮৬) আর যদি কেউ সালাতের মধ্যে সন্দেহ করে যে তার কাপড়ে (বা শরীরে) নাপাকী আছে কি না, তাহলে তার জন্য সালাত ভেঙে ফেলা বৈধ নয়; সে ইমাম হোক বা একাকী সালাত আদায়কারী। বরং তার উপর কর্তব্য হচ্ছে সালাত সম্পন্ন করা।”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ৩৯৬-৩৯৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

কৃষি জমি বন্ধক রাখা কি জায়েজ

 প্রশ্ন: কৃষি জমি বন্ধক রাখা কি জায়েজ? অর্থাৎ যে টাকা নিয়ে জমি বন্ধক রাখা হয়েছে, সে টাকা ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত টাকা প্রদানকারী জমি ভোগ করবে। অতঃপর টাকা দিলে জমি ফেরত দিবে এভাবে জমি বন্ধক রাখা কি জায়েজ?

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী মুহাম্মদের প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর “কৃষিজমি বন্ধক রাখার পদ্ধতির মধ্যে সাধারণত দুটি রীতি পরিলক্ষিত হয় এর একটিকে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে বৈধ গণ্য করা হয়, আর অপরটি শরিয়তের দৃষ্টিতে স্পষ্টরূপে হারাম।”
.
▪️প্রথম পদ্ধতি: কৃষি জমি বন্ধকদাতা ও বন্ধকগ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিদিষ্ট একটি জমি ব্যবহার করার চুক্তি করা, এই চুক্তির আওতায়, নির্ধারিত মেয়াদে বন্ধকগ্রহীতা তথা চাষাবাদকারী জমিটি চাষাবাদ করে জমির ফসল একাই ভোগ করেন, আর বন্ধকদাতা তথা জমির মালিক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তিকৃত ঋণের অর্থ গ্রহণ করেন। অতঃপর নির্ধারিত মেয়াদ শেষে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী জমির মালিক ঋণকৃত সম্পূর্ণ টাকা বন্ধকগ্রহীতা তথা চাষাবাদকারী কে ফিরত দিলে চাষাবাদকারী জমির মালিককে তার জমি ফেরত দেয় এর মাঝে কেটে যাওয়া সময়ে টাকার মালিক তথা চাষাবাদকারী জমিটা একাই ভোগ করে। এই ধরনের চুক্তি ইসলামী শরীয়তের পরিপন্থী এবং সুদের সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় এটা জায়েজ নয় বরং আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে এই ধরনের বন্ধক হারাম।
.
সুদের পরিচয়ে ইসলামের সর্বসম্মত একটি মূলনীতি হল, القرض الذي يؤدي إلى نفع مشترط للمقرض؛ فهو ربا “ঋণ দানকারীর শর্তসাপেক্ষ সুবিধার ফলস্বরূপ ঋণকে সুদ বলে।” অর্থাৎ ঋণদাতার সাথে যদি এ মর্মে শর্ত থাকে যে, ঋণের বিনিময়ে সে ফায়দা/সুবিধা গ্রহণ করবে বা তাকে ফায়দা/সুবিধা দেয়া হবে তাহলে তা সুদ বলে গণ্য হবে। এ ব্যাপারে একটি হাদিস রয়েছে। তা হল প্রখ্যাত সাহাবী আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন: كُلُّ ‌قَرْضٍ ‌جَرَّ مَنْفَعَةً، فَهُوَ رِبًا ‘যে ঋণ মুনাফা বয়ে আনে, সেটাই এক প্রকার সূদ”।(বায়হাকী; আস সুনানুল কুবরা; ১১/২৯৪ হা/১১০৩৭) এ হাদিসটি সনদের বিচারে দুর্বল হলেও এর মর্মার্থটা সঠিক।(ইবনু উসাইমীন; আশ শারহুল মুমতি; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ১০৮-১০৯) আর হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুদগ্রহণকারী, সুদদাতা, সুদের লেখক, সুদের সাক্ষীদ্বয় সকলকে লানত করেছেন এবং বলেছেন: তারা সবাই সমান।”(সহিহ মুসলিম হা/১৫৯৮)।
.
দুঃখজনক হলেও সত্যি জমি বন্ধকের এই পদ্ধতিটাই আমাদের সমাজে বেশি চলে।অথচ আলেমরা এই মর্মে ইজমা করেছেন যে, যে ঋণ ঋণদাতাকে কোন প্রকার উপকার দেয় সেটাই সুদ। হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন:
وَكُلُّ قَرْضٍ شَرَطَ فِيهِ أَنْ يَزِيدَهُ ، فَهُوَ حَرَامٌ بِغَيْرِ خِلَافٍ ، قَالَ ابْنُ الْمُنْذِرِ : أَجْمَعُوا عَلَى أَنَّ الْمُسَلِّفَ إذَا شَرَطَ عَلَى الْمُسْتَسْلِفِ زِيَادَةً أَوْ هَدِيَّةً ، فَأَسْلَفَ عَلَى ذَلِكَ : أَنَّ أَخْذَ الزِّيَادَةِ عَلَى ذَلِكَ رَبًّا .وَقَدْ رُوِيَ عَنْ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ ، وَابْنِ عَبَّاسٍ ، وَابْنِ مَسْعُودٍ ، أَنَّهُمْ نَهَوْا عَنْ قَرْضٍ جَرَّ مَنْفَعَةً
“যে ঋণে বৃদ্ধির শর্ত করা হয়েছে সেটা হারাম হওয়ার ব্যাপারে দ্বিমত নেই। ইবনুল মুনযির বলেন: তারা (আলেমগণ) এই মর্মে ইজমা করেছেন যে, ধারদাতা যদি ধারগ্রহীতার কাছে অতিরিক্ত বা উপহারের শর্ত করে এবং সেটার উপর ভিত্তি করে ধার দেয়; তাহলে অতিরিক্ত অংশ গ্রহণ করা সুদ বলে গণ্য হবে। উবাই ইবনে কা‘ব (রাঃ), ইবনে আব্বাস (রাঃ), ইবনে মাসউদ (রাঃ) প্রমুখ থেকে বর্ণিত আছে যে, তারা এমন ঋণ থেকে নিষেধ করেছেন যেটা কোনো প্রকার উপকার দেয়।”(ইবনু কুদামাহ আল-মুগনী; খন্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২৪০)।
.
ইমাম কুরতুবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত দলিলের ভিত্তিতে মুসলিমগণ এ বিষয়ে একমত হয়েছেন যে ঋণের ভিত্তিতে কোনো শর্তসাপেক্ষ অতিরিক্ত কিছু আদায় করাকে সুদ বলা হয়, হোক না তা এক মুঠো পশুখাদ্য বা একটি শস্যদানা মাত্র; যেমনটি ইবনু মাসঊদ (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেছেন।…ঋণগ্রহীতা ঋণদাতাকে কোনো উপহার দিতে পারবে না, আর ঋণদাতার পক্ষেও তা গ্রহণ করা বৈধ নয় যদি না তাদের মধ্যে এমন উপহার লেনদেন পূর্ব থেকেই প্রচলিত থাকে।”(তাফসীর কুরতুবী; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২২৫-২২৬)।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন,” ঋণদাতার জন্য ঋণগ্রহীতার নিকট ঋণ প্রদানের বিনিময়ে লাভবান হওয়ার শর্তারোপ করা জায়েয নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبًا”এমন প্রত্যেকটি ঋণ যা লাভ আনয়ন করে সেটিই সূদ’। আলেমগণ এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। সুতরাং ঋণ প্রদানের বিনিময়ে জমি থেকে উৎপন্ন ফসল দ্বারা লাভবান হওয়া জায়েয নয়। কেননা বন্ধকের উদ্দেশ্যে হল মালের নিরাপত্তা ও ঋণ আদায়ে সহায়তা করা, লাভবান করা নয়।”(ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ; খণ্ড: ১৪; পৃষ্ঠা: ১৭৭-১৭৮)।
.
▪️দ্বিতীয় পদ্ধতি: কৃষি জমি বন্ধকদাতা ও বন্ধকগ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিদিষ্ট একটি জমি ব্যবহার করার চুক্তি করা, এই চুক্তির আওতায়, নির্ধারিত মেয়াদে জমি বন্ধকগ্রহীতা তথা চাষাবাদকারী জমিটি চাষাবাদ করে ফসল ভোগ করবে বা তার যে কোনও বৈধ প্রয়োজনে জমিটি ব্যবহার করবে। আর বন্ধকদাতা তথা জমির মালিক চুক্তিকৃত অর্থ গ্রহণ করে ভোগ করবে। তারপর চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হলে বন্ধকগ্রহীতা (অর্থ দাতা চাষাবাদকারী) বন্ধকদাতা তথা জমির মালিক-কে তার জমি ফেরত দিবে। কিন্তু জমির মালিক তাকে কোন টাকা (পূর্ণ অথবা কিছু কম) ফেরত দিবে না কিংবা চাষাবাদকারীও জমির মালিকের কাছে তার প্রদত্ত কোনও অর্থও দাবী করতে পারবে না। বরং উভয় পক্ষই চুক্তি অনুযায়ী তাদের দায়-দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন। এভাবে জমি লিজ/ভাড়া দেয়া হলে তা হবে হালাল এবং শরিয়ত সম্মত। এই ধরনের চুক্তি ইসলামে বৈধ হওয়ার ব্যাপারে আলেমদের মাঝে কোনো মতভেদ নেই। সাধারণত গ্রামাঞ্চলে এটি “খাই-খালাসি” নামে পরিচিত। তবে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে জমি বা পুকুর কেবল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভাড়ায় বা লিজে দেওয়া যাবে, কিন্তু স্থায়ীভাবে বিক্রয়ের মতো কোনো চুক্তি করা যাবে না, যা পরবর্তীতে সুদ বা হারাম লেনদেনে রূপ নিতে পারে।
.
জমি বা পুকুর লিজ দেওয়া ও নেওয়া দাতা এবং গ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বৈধ। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাফি’ বিন খাদিজ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “‏ إِنَّمَا يَزْرَعُ ثَلاَثَةٌ رَجُلٌ لَهُ أَرْضٌ فَهُوَ يَزْرَعُهَا وَرَجُلٌ مُنِحَ أَرْضًا فَهُوَ يَزْرَعُ مَا مُنِحَ وَرَجُلٌ اسْتَكْرَى أَرْضًا بِذَهَبٍ أَوْ فِضَّةٍ ‏”‏ ‏.‏ “তিন ব্যাক্তি জমি চাষাবাদ করবে। যথা: (১).যার জমি আছে সে তা চাষাবাদ করবে, (২).যাকে ধারে জমি দান করা হয়েছে সে তার চাষাবাদ করবে এবং (৩).যে ব্যক্তি নগদ সোনা-চাঁদি দ্বারা অর্থাৎ নগদ টাকায় জমি ভাড়া নেয়।”(সহীহ বুখারি হা/১২৮৬; সহীহ মুসলিম হা/১৫৪৬) অপর বর্ননায় নাফি’ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ ইবনু ‘উমার (রাঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সময়ে এবং আবূ বকর, ‘উমার, উসমান (রাঃ) মু’আবিয়া (রাঃ)-এর শাসনের শুরু ভাগে নিজের ক্ষেতে বর্গাচাষ করতে দিতেন।”(সহিহ বুখারী হা/২৩৪৩) আরেক বর্ননায় আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার(রদিয়াল্লাহু আনহু ) হতে বর্ণিত, নবী করীম (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খায়বার বাসীদেরকে উৎপাদিত ফল বা ফসলের অর্ধেক ভাগের শর্তে জমি বর্গা দিয়েছিলেন”(সহীহ বুখারী, হা/২৩২৮ ‘চাষাবাদ’ অধ্যায়)। অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে,أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَفَعَ إِلَى يَهُوْدِ خَيْبَرَ نَخْلَ خَيْبَرَ وَأَرْضَهَا عَلَى أَنْ يَّعْتَمِلُوْهَا مِنْ أَمْوَالِهِمْ وَلِرَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَطْرُ ثَمَرِهَا”রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খায়বারের বাগান ও যমীন খায়বারের ইহুদীদেরকে দিয়েছিলেন। তারা নিজেদের অর্থে তাতে চাষাবাদ করবে। আর রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ফল ও ফসলের অর্ধেক পাবেন (সহীহ মুসলিম হা/১৫৫১; মিশকাত হা/২৯৭২) সহীহ বুখারীতে আরো এসেছে, ‘রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খায়বারকে ইহুদীদের দিয়েছিলেন। তারা তাতে পরিশ্রম করবে ও শস্য ফলাবে এবং সেখানে যা উৎপাদিত হবে, তারা তার অর্ধেক পাবে”(সহীহ বুখারী হা/২২৮৫; মিশকাত হা/২৯৭২) এ থেকে সুস্পষ্ট যে, ইসলামে নির্দিষ্ট শর্ত ও পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে জমি লিজ বা ভাড়া দেওয়া বৈধ ও অনুমোদিত। এটি অর্থের বিনিময়ে হতে পারে, আবার উৎপাদিত ফসল ভাগাভাগির মাধ্যমেও হতে পারে। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

আক্বীদাগত বিষয়গুলো সঠিক ভাবে না জেনেও কিভাবে নিজের আক্বীদা বিশুদ্ধ ও নিরাপদ রাখা যায়

পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর আমাদের মধ্যে যারা এখনো বিশুদ্ধ ও সুদৃঢ় আক্বীদা সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে পারেনি, তারা যেন খালেস নিয়তে বিশুদ্ধ আক্বীদার ইলম অর্জনের পথে অগ্রসর হওয়ার পাশাপাশি ইমাম শাফি‘ঈ (রাহিমাহুল্লাহ) এর অনুসৃত ছোট্ট একটি মূলনীতি দৃঢ়ভাবে অন্তরে ধারণ করে চলে যাতে আমাদের আক্বীদা নিরাপদ ও সঠিক থাকে।”
.
শাইখুল ইসলাম নাসিরুল হাদীস ফাক্বীহুল মিল্লাত ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইদরীস আশ-শাফি‘ঈ আল-মাক্কী (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৫০ হি: মৃত: ২০৪ হি.] বলেছেন,
, آمَنْتُ بِاللَّهِ، وبِمَا جَاءَ عَنِ اللَّهِ، عَلَى مُرَادِ اللَّهِ، وَآمَنْتُ بِرَسُوْلِ اللَّهِ، وَبِمَا جَاءَ عَنْ رَسُوْلِ اللَّهِ، عَلَى مُرَادِ رَسُولِ اللَّهِ
“আমি আল্লাহর উপর এবং যা কিছু আল্লাহর পক্ষ হতে এসেছে তাতে আল্লাহর উদ্দেশ্য অনুযায়ী অর্থের উপরে ঈমান আনলাম। আমি আল্লাহর রাসূলের এবং যা কিছু তাঁর পক্ষ হতে এসেছে তাতে আল্লাহর রাসূলের উদ্দেশ্য অনুযায়ী অর্থের উপরে ঈমান আনলাম।”(ইমাম বায়হাক্বী, মানাকিবুশ শাফি‘ঈ খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪১৫; ইবনু কুদামাহ লুম’আতুল ই’তিক্বাদ পৃষ্ঠা: ৭; ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৩৫৪; ইবনু উসাইমীন; শারহু আকীদাতুল ওয়াসিতীয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৭৬)।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
ما تَضَمَّنَهُ كلامُ الإِمامِ الشافعيِّ:تَضَمَّنَ كلامُ الإِمامِ الشافعيِّ مَا يأتي:
1- الإِيمانُ بما جاءَ عن اللهِ تعالَى في كتابِهِ المُبينِ على ما أرادَهُ اللهُ مِنْ غيرِ زِيادَةٍ ، وَلا نَقْصٍ ، ولا تَحْرِيفٍ .
2- الإِيمانُ بما جاءَ عنْ رسولِ اللهِ صلَّى اللهُ عليهِ وسلَّمَ في سُنَّةِ رسولِ اللهِ صلَّى اللهُ عليهِ وسلَّمَ على ما أرادَهُ رسولُ اللهِ صلَّى اللهُ عليهِ وسلَّمَ مِنْ غيرِ زيادةٍ ، ولا نَقْصٍ ، ولا تحريفٍ .
وفي هذا الكلامِ ردٌّ على أهلِ التأويلِ وأهلِ التمثيلِ ؛ لأنَّ كلَّ واحدٍ منهم لم يُؤْمِنْ بما جاءَ عن اللهِ ورسولِهِ على مرادِ اللهِ ورسولِهِ ؛ فإنَّ أهلَ التأويلِ نَقَصُوا ، وأهلَ التمثيلِ زَادُوا
ইমাম শাফি‘ঈ (রাহিমাহুল্লাহ) এর বক্তব্যে নিম্নের বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
(১). আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর স্বীয় সুস্পষ্ট কিতাবে যা এসেছ, কোন (زِيادَةٍ), বাড়তি, (نَقْصٍ) কমতি,
ও (تَحْرِيفٍ) বিকৃতি করা ছাড়াই আল্লাহর উদ্দেশ্য অনুযায়ী অর্থে তার উপর ঈমান আনা।
(২). রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর পক্ষ থেকে তাঁর স্বীয় হাদীসে যা এসেছে, কোন (زِيادَةٍ), বাড়তি, (نَقْصٍ) কমতি,
ও (تَحْرِيفٍ) বিকৃতি করা ছাড়াই রাসূল (ﷺ) এর উদ্দেশ্য অনুযায়ী অর্থে তার উপর ঈমান আনা।
.
এই বক্তব্যে তাওয়ীলপন্থী (আল্লাহর গুণাবলীতে ভুল ব্যাখ্যা আরোপকারীগণ) এবং তামসীলপন্থীদের (আল্লাহর গুণাবলীকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করা ব্যক্তিগণ) বিরুদ্ধে খণ্ডন রয়েছে; কারণ এদের কেউই আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যা এসেছে, তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্য অনুযায়ী ঈমান আনেনি। বরং তাওয়ীলপন্থীরা কমিয়ে দিয়েছে (অর্থাৎ আল্লাহর গুণাবলীর প্রকৃত অর্থ বিকৃত করেছে), আর তামসীলপন্থীরা বাড়িয়ে দিয়েছে (অর্থাৎ আল্লাহর গুণাবলীর সাথে সৃষ্টির সাদৃশ্য স্থাপন করেছে)।”(ইবনু উসাইমীন; শারহু লুমআতিল ই’তিকাদ: https://www.afaqattaiseer.net/…/showthread.phpt=300&utm…)
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ডের বর্তমান গ্র্যান্ড মুফতী প্রথিতযশা মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ আলুশ শাইখ (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৬২ হি./১৯৪৩ খ্রি.] বলেছেন:
كلامُ الإمامِ الشَّافعيِّ واضحٌ ، وقد استدلَّ به المؤوِّلةُ ؛ بأنَّ الشَّافعيَّ – رحمَهُ اللهُ – لا يعلم معانيَ تلك الآياتِ والأحاديثِِ الَّتي في الصِّفاتِ فقال : (آمنت باللهِ وبما جاء عن اللهِ على مرادِ اللهِ، وآمنت برسولِ اللهِ – صلى اللهُ عليه وسلم – وما جاء عن رسولِ اللهِ على مرادِ رسولِ اللهِ صلَّى الله عليه وسلَّم ) .
فقالوا : هذا يعني أنَّه أحالَ المعنى على مرادِ من تكلَّم به ، وهذا يدلُّ على أنَّهُ لم يفهمِ المعنى ؛ وهو الإمامُ الشَّافعيُّ .
والجوابُ : أنَّه لم يُردْ ذلك ، وإنَّما هذا إيمان مجمل ، فنحنُ نقول كما قال الإمامُ الشَّافعيُّ : (آمنَّا باللهِ، وبما جاء عن اللهِ، فيما علمنا وما لم نعلمْ، على مرادِ الله) هذا يقتضي تمامَ التَّسليمِ وتمامَ الامتثالِ لما أُمرْنا به، كذلك آمنَّا برسولِ اللهِ – صلى اللهُ عليهِ وسلم – وبما جاء عن رسولِ اللهِ – صلى اللهُ عليهِ وسلم – على مرادِ رسولِ اللهِ -صلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ- ما علمنا من النُّصوصِ وما لم نعلمْ .
فهذا إيمانٌ مجملٌ ، معناه أنَّنَا لا نتركُ شيئا ممَّا جاء عن اللهِ ولا عن رسولِ الله -صلَّى الله عليه وسلَّم- إلا ونحن مؤمنون به ، ما علمنا منه وما لم نعلمْ ، كلٌّ من عندِ ربِّنَا .
والشَّافعيّ – رحمه اللهُ – قال هذه الكلمةَ اتِّباعاً لما أمر اللهُ – جلَّ وعلا – به في كتابه ؛ حيثُ قال: {والرَّاسخون في العلمِ يقولونَ آمنَّا به كلٌّ من عندِ ربِّنَا} فما علمنا معناه واضحٌ الإيمانُ به ، وما جهلنا معناه واشتبَهَ علينا نقولُ : آمنَّا به على مرادِ ربِّنا – جلَّ وعلا – وعلى مرادِ رسولِنَا – صلَّى اللهُ عليه وسلَّم – حتَّى نسألَ فيه أهلَ العلمِ ، فإذا سألنا فيه أهلَ العلمِ وبيَّنُوا لنا معاني الكتابِ والسّنَّةِ ، هنا نعتقدُ المعنى كما نعتقدُ في الألفاظِ.
“ইমাম শাফি‘ঈর বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার।কিন্তু কিছু মুআওয়্যিলা (অর্থবিকৃতিকারী) তাঁর এই বক্তব্যকে দলীল হিসেবে পেশ করেছে যে, ইমাম আশ শাফি‘ঈ সিফাতসংক্রান্ত সেসব আয়াত ও হাদীস্ত্রের অর্থ জানতেন না। একারণেই তিনি (শাফি‘ঈ) বলেছেন,”আমি আল্লাহর উপর এবং যা কিছু আল্লাহর পক্ষ হতে এসেছে তাতে আল্লাহর উদ্দেশ্য অনুযায়ী অর্থের উপরে ঈমান আনলাম। আমি আল্লাহর রাসূলের এবং যা কিছু তাঁর পক্ষ হতে এসেছে তাতে আল্লাহর রাসূলের উদ্দেশ্য অনুযায়ী অর্থের উপরে ঈমান আনলাম।” তারা (আহলুত-তা’উইল) বলেছে: এ কথার অর্থ হলো, তিনি (ইমাম শাফি‘ঈ)-এর অর্থ আল্লাহ ও রাসূলের উদ্দেশ্যের উপর ন্যস্ত করে দিয়েছেন এটা প্রমাণ করে যে, তিনি (শাফি‘ঈ) অর্থ বুঝতে পারেননি। অথচ তিনি ইমাম শাফি‘ঈ! এর জবাব হলো, তিনি (ইমাম শাফি‘ঈ) এমনটি উদ্দেশ্য করেননি। বরং এটিই ঈমান মুজমাল (إیمان مُجْمَل) তথা সাধারণ ঈমান। অতএব ইমাম শাফি‘ঈর মত আমরাও বলি, আমরা আল্লাহর উপর ও তাঁর পক্ষ যা এসেছে তাতে ঈমান এনেছি। যা আমরা জেনেছি ও যা জানতে পারিনি সকলটুকুতেই। আর তা আল্লাহর উদ্দেশ্য অনুযায়ী। এটিই পূর্ণাংগ আত্মসমর্পনকে নির্দেশ করে। তেমনি নির্দেশ করে আমাদের প্রতি আদেশকৃত বিষয়ে পূর্ণাংগ অনুসরণকে। একইরূপে আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর রাসূল ও তাঁর পক্ষ যা এসেছে তার উপর। আর তা রাসূলুল্লাহ এ এর উদ্দেশ্য অনুযায়ী। এসবের যা কিছু আমরা নস (আয়াত-হাদীস) তথা ভাষ্যে জানতে পেরেছি অথবা যা জানতে পারিনি, সব ক্ষেত্রেই। এটিই ঈমান মুজমাল তথা সাধারণ ঈমান। এর অর্থ হচ্ছে: আমরা আল্লাহ হতে ও আল্লাহর রাসুল হতে যা কিছু এসেছে, এসবের যা কিছু আমরা জানি বা যা কিছু জানিনা, তার কোন কিছুতেই ঈমান না এনে উল্টো তরক করব না।ইমাম শাফি‘ঈ (রাহিমাহুল্লাহ) এই বক্তব্যটি দিয়েছেন—আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর কিতাবে যে আদেশ দিয়েছেন তা অনুসরণ করে। যেমন আল্লাহ বলেন:(وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ يَقُولُونَ آمَنَّا بِهِۦ كُلٌّۭ مِّنْ عِندِ رَبِّنَا)”আর যারা জ্ঞানে সুগভীর তারা বলে, আমরা এগুলোতে ঈমান রাখি, সবই আমাদের রবের কাছ থেকে এসেছে।”(সূরা আলে ইমরান: ৩/৭) সুতরাং যার অর্থ আমরা জানি, তাতে আমাদের ঈমান সুস্পষ্ট। আর যার অর্থ আমাদের কাছে অজ্ঞাত ও যার অর্থ নিয়ে সংশয় রয়েছে, সেক্ষেত্রে আমরা বলি, আমরা এতে ঈমান এনেছি আমাদের রব জাল্লা ওয়া আলা এর উদ্দেশ্য অনুযায়ী ও আমাদের রাসূল এর উদ্দেশ্য অনুযায়ী। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা আহলুল ইলম তথা আলেমদের কাছ থেকে এ সম্পর্কে প্রশ্ন না করি। সুতরাং যদি এ সম্পর্কে আমরা আহলুল ইলমকে জিজ্ঞেস করি ও তাঁরা আমাদের আল কিতাব ও সুন্নাহর অর্থ ব্যাখ্যা করে দেন, তখন আমরা এর অর্থ ঠিক সেভাবে বিশ্বাস করি, যেভাবে এর শব্দমালা এসেছে।”(সালিহ বিন আবদিল আযীয বিন মুহাম্মাদ আলুশ শায়খ, শারহু লুমআতিল ই’তিকাদ, পৃষ্ঠা: ৪২-৪৩)।
.
পরিশেষে প্রিয় পাঠক! আকীদা ও ঈমানের ক্ষেত্রে সঠিক পথ অনুসরণের প্রকৃত রূপ এই যে একজন মু’মিনের কর্তব্য হলো, সে আল্লাহ তা’আলার প্রতি এবং বিশুদ্ধ দলিলের পভিত্তিতে তাঁর পক্ষ থেকে আগত প্রতিটি বিষয়ে নির্ভেজাল ও পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করবে যেভাবে তা বুঝেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর সাহাবায়ে কিরাম, এবং তাঁদের অনুগামী সৎ পূর্বসূরি সালাফগণ। এই বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার বিকৃতি, বাড়াবাড়ি, কল্পনাপ্রসূত ব্যাখ্যা কিংবা মনগড়া মতামতের স্থান নেই। বরং আল্লাহ যেভাবে তা বোঝাতে চেয়েছেন, সেভাবেই সরলতা ও বিনয় সহকারে, নির্ভেজালভাবে তা গ্রহণ করাই হচ্ছে প্রকৃত ঈমানের দাবি। তদ্রূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমান এবং তাঁর পক্ষ থেকে আগত প্রতিটি সত্য বাণী বিশেষ করে সহীহ হাদীসসমূহ যেগুলোর মধ্যে আকীদাসংক্রান্ত বিষয়াবলিও রয়েছে সেগুলোও গ্রহণ করতে হবে পূর্ণ ঈমান ও অনুগত্যের সাথে। যেভাবে তা বুঝিয়েছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং যেভাবে বুঝেছেন তাঁর সাহাবায়ে কিরাম এবং তাঁদের অনুগামী সৎ পূর্বসূরি সালাফগণ। এক্ষেত্রে নিজস্ব যুক্তি, অনুমান বা ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা দ্বারা নয়; বরং সম্পূর্ণরূপে নববী ব্যাখ্যা ও উদ্দেশ্য অনুসরণ করেই ঈমানকে শুদ্ধ, সঠিক ও মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:

জুয়েল মাহমুদ সালাফি। 

ইসলামি ব্যাংকে অর্থ জমা রেখে লভ্যাংশ ভোগ করা যাবে কি

 প্রশ্ন: সুদী ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের মধ্যে পার্থক্য কি? ইসলামি ব্যাংকে অর্থ জমা রেখে লভ্যাংশ ভোগ করা যাবে কি?

▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর:বাণিজ্যিক ব্যাংকের সুদভিত্তিক লেনদেন এবং ইসলামী ব্যাংকের বৈধ লেনদেনের পার্থক্য হচ্ছে;
.
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মূলত যে সুদভিত্তিক ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল,যা নিঃসন্দেহে হারাম। এই ব্যবস্থার ভিত্তি হলো ঋণ প্রদান ও গ্রহণের মাধ্যমে সুদ অর্জন। একদিকে, ব্যাংক গ্রাহকদেরকে সুদের বিনিময়ে ঋণ প্রদান করে। অপরদিকে, গ্রাহকগণ যখন ব্যাংকে অর্থ জমা রাখে, তখন তারা ব্যাংককে সুদের বিনিময়ে ঋণ প্রদান করে।সুদের বিনিময়ে ঋণ প্রদান,যা কুরআন সুন্নাহ এবং এই উম্মতের ইজমা তথা সর্বসম্মত মতে স্পষ্ট হারাম।হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ,শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন:وَكُلُّ قَرْضٍ شَرَطَ فِيهِ أَنْ يَزِيدَهُ ، فَهُوَ حَرَامٌ بِغَيْرِ خِلَافٍ ، قَالَ ابْنُ الْمُنْذِرِ : أَجْمَعُوا عَلَى أَنَّ الْمُسَلِّفَ إذَا شَرَطَ عَلَى الْمُسْتَسْلِفِ زِيَادَةً أَوْ هَدِيَّةً ، فَأَسْلَفَ عَلَى ذَلِكَ : أَنَّ أَخْذَ الزِّيَادَةِ عَلَى ذَلِكَ رَبًّا .وَقَدْ رُوِيَ عَنْ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ ، وَابْنِ عَبَّاسٍ ، وَابْنِ مَسْعُودٍ ، أَنَّهُمْ نَهَوْا عَنْ قَرْضٍ جَرَّ مَنْفَعَةً “যে ঋণের মধ্যে ঋণের চেয়ে বেশি পরিশোধ করার শর্তারোপ করা হয় কোন মতভেদ ছাড়া সেটা সুদ। ইবনুল মুনযির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: তারা (আলেমগণ) এই মর্মে ইজমা করেছেন যে, ধারদাতা যদি ধারগ্রহীতার কাছে অতিরিক্ত বা উপহারের শর্ত করে এবং সেটার উপর ভিত্তি করে ধার দেয়; তাহলে অতিরিক্ত অংশ গ্রহণ করা সুদ বলে গণ্য হবে। উবাই ইবনে কা‘ব (রাঃ), ইবনে আব্বাস (রাঃ), ইবনে মাসউদ (রাঃ) প্রমুখ থেকে বর্ণিত আছে যে, তারা এমন ঋণ থেকে নিষেধ করেছেন যেটা কোন প্রকার উপকার দেয়।”(ইবনু কুদামাহ আল-মুগনী’ খন্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২৪০)। সুদী লেনদেনের নানান রূপ রয়েছে। যথা: (১).সুদী ঋণ প্রদান ও গ্রহণ।(২).এক মুদ্রার সাথে অন্য মুদ্রা বিনিময়ের (মুদ্রার বদলে মুদ্রা বিক্রি) ক্ষেত্রে একটি বা উভয়টি প্রদানে বিলম্ব করা। (৩).অতিরিক্ত পরিমাণে কিংবা বিলম্ব করে স্বর্ণের সাথে স্বর্ণ বিনিময় করা। (৪).কিছু বিষয় যা মূলত সুদী ঋণ। যেমন: বিল ডিসকাউন্টিং, সঞ্চয়ী হিসাব, সুদ অথবা উপহার হিসেবে বিনিময় পাওয়া যায় এমন বিনিয়োগ সনদ, কিস্তিতে বিক্রির ক্ষেত্রে বিলম্বের জরিমানা, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে অর্থ উত্তোলন।
.
অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকগুলো শরিয়তসম্মত ও বৈধ লেনদেনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। যেমন: ক্রয়-বিক্রয় (বাই), মুদারাবা (অংশীদারভিত্তিক মুনাফাভাগ), এবং মুশারাকা (অংশীদারিত্ব)। এসব পদ্ধতির মাধ্যমে তারা বিনিয়োগ করে এবং মুনাফা অর্জন করে। এছাড়াও, ইসলামী ব্যাংক মানি ট্রান্সফার ফি, মুদ্রা বিনিময় হারে পার্থক্য এবং মানি এক্সচেঞ্জ কার্যক্রম থেকে বৈধভাবে উপকৃত হয়। সুদভিত্তিক এবং শরিয়তসম্মত লেনদেনের মাঝে পার্থক্য করা এবং এ ধরনের লেনদেন করার ক্ষেত্রে ব্যাংক কীভাবে উপকৃত হয়, তার একটি সরল উদাহরণ হলো: কাস্টমার (গ্রাহক) যদি তার অর্থ থেকে উপকৃত হতে চায়, অর্থ বৃদ্ধি করতে চায় তাহলে সে বাণিজ্যিক সুদী ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবে অর্থ জমা করে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক তাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ সুদ দেয়। সাথে মূলধনের নিশ্চয়তাও প্রদান করে। এটি আসলে ব্যাংকের কাছে গ্রাহকের দেওয়া একটি সুদী ঋণ। এর বিপরীতে ব্যাংক সেই জমাকৃত অর্থ আরেকজন গ্রাহককে সুদের ভিত্তিতে ঋণ হিসেবে প্রদান করে। ফলে ব্যাংক একটি দিক থেকে সুদে ঋণ গ্রহণ করে, অন্যদিকে সুদে ঋণ প্রদান করে এবং এই দুইয়ের মধ্যকার সুদের ব্যবধান থেকেই সে মুনাফা অর্জন করে।
.
অপরদিকে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ পদ্ধতি হলো ইসলামী ব্যাংকগুলো গ্রাহকের নিকট থেকে অর্থ গ্রহণ করে শরিয়ত অনুমোদিত কোনো ব্যবসা, নির্মাণ প্রকল্প অথবা অনুরূপ কার্যক্রমে মুদারাবা ভিত্তিতে তা বিনিয়োগ করা। এই প্রক্রিয়ায় একটি শর্ত থাকে যে, প্রকল্পটি লাভজনক হলে ব্যাংক গ্রাহককে লাভের একটি নির্দিষ্ট অংশ প্রদান করবে। একইভাবে, শ্রমদাতা বা ব্যবস্থাপনার পক্ষ হিসেবে ইসলামী ব্যাংকও লাভের একটি অংশ গ্রহন করবে। প্রকল্প থেকে অর্জিত লাভই ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত আয়। বাস্তবে, কখনো কখনো এই হালাল লাভ সুদভিত্তিক ব্যাংকের হারাম আয়ের চেয়েও বহুগুণে বেশি হয়ে থাকে। তবে মুদারাবায় একটি স্বাভাবিক ঝুঁকি থাকে। উপযুক্ত ও লাভজনক প্রকল্প নির্বাচন করা, সেটির কার্যকারিতা নিরীক্ষণ করা, এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যবেক্ষণে শ্রম ব্যয় করতে হয়। ইসলামী ব্যাংক ও সুদভিত্তিক ব্যাংকের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো একদিকে হারাম সুদ, অন্যদিকে বৈধ মুদারাবা; যেখানে একজন গ্রাহক অর্থ হারাতেও পারেন, কারণ এতে মূলধনের নিশ্চয়তা থাকে না। তবে, প্রকল্পটি লাভজনক হলে তিনি হালাল আয় লাভ করেন।
সারসংক্ষেপে ইসলামী ব্যাংকের সামনে লাভ অর্জনের বহু বৈধ ও ন্যায্য পথ খোলা রয়েছে। এ কারণেই এসব ব্যাংকের প্রসার ঘটছে এবং দ্রুত বিকাশ লাভ করছে। এমনকি কিছু অমুসলিম দেশও ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা গ্রহণ বা প্রয়োগের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, কারণ এই ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক লাভ পাওয়া যায় এবং সুদভিত্তিক পদ্ধতির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব হয় যা অর্থনৈতিক ধ্বংস ও ব্যক্তিগত ক্ষতির অন্যতম কারণ।
.
▪️ইসলামি ব্যাংকে অর্থ জমা রেখে লভ্যাংশ ভোগ করার বিধান কি?
.
❑ প্রথমত: প্রথমেই মনে রাখা জরুরি, শুধুমাত্র কোনো ব্যাংকের নামের সঙ্গে ‘ইসলামী’ শব্দ সংযুক্ত করলেই সেটি ইসলামী ব্যাংক হয়ে যায় না। ইসলামী ব্যাংক বলতে মূলত সেইসব ব্যাংককেই বোঝায়, যারা পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলামি শরীয়তের বিধি-বিধান ও নীতিমালা অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো ব্যাংকের নাম ইসলামি না হলেও, যদি তা শরীয়ত সম্মতভাবে পরিচালিত হয়, তবে তাকেও ইসলামী ব্যাংক হিসেবে গণ্য করা যাবে। সুতরাং শুধু নাম নয় মূল পরিচয় লুকিয়ে থাকে কার্যপদ্ধতি ও নীতিমালায়। অতএব যদি কোনো ব্যাংক “ইসলামী ব্যাংক” হিসেবে পরিচিত হলেও বাস্তবে সুদভিত্তিক লেনদেন বা শরিয়ত পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকে, তবে তা প্রকৃত অর্থে ইসলামী ব্যাংক নয়। এমন প্রতিষ্ঠানের সাথে লেনদেন করা, সেখানে অর্থ জমা রাখা জায়েজ নয়। কারণ এতে হারাম কার্যক্রমে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করা হয়। অথচ আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন:”তোমরা ন্যায় ও তাকওয়ার পথে একে অপরকে সাহায্য করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সাহায্য কোরো না।”(সূরা মায়িদা, আয়াত: ২)। অন্যদিকে যদি কোনো ব্যাংক সত্যিকারের ইসলামী আদর্শ মেনে চলে অর্থাৎ কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর আলোকে পরিচালিত হয় এবং সুদ ও হারাম লেনদেন থেকে পুরোপুরি দূরে থাকে তাহলে সে ব্যাংকের সাথে লেনদেন করা, অর্থ জমা রাখা এবং ব্যবসা করা জায়েয। বরং তা প্রশংসনীয়ও। কারণ এমন উদ্যোগ হালাল ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকাশ ঘটায় এবং সুদনির্ভর সমাজব্যবস্থার বিকল্প গড়ে তুলতে সহায়ক হয়।
.
❑ দ্বিতীয়ত: বর্তমানে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকসমূহ ঠিক কোন শরঈ নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এ বিষয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই। ফলে এসব ব্যাংকে অর্থ জমা রেখে সেখান থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ সম্পূর্ণরূপে হালাল না হারাম এই ব্যাপারে নির্দিষ্টভাবে মত প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে দেশের সুপরিচিত একদল আলেমের মতে, বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকসমূহ মূলত মুদারাবা ভিত্তিক লাভ-লোকসানে অংশীদারিত্বের নীতিতে পরিচালিত হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁরা এসব ব্যাংকে অর্থ আমানত রেখে প্রাপ্ত লভ্যাংশকে শরিয়তসম্মত মনে করেন। তবে একথাও সঠিক যে বাংলাদেশের কোনো ব্যাংকই সম্পূর্ণভাবে সুদমুক্ত নয়। যদিও কিছু ব্যাংক নিজেদেরকে ‘ইসলামী ব্যাংক’ বলে দাবি করে, বাস্তবে তারা শতভাগ শরীয়াহ্‌নির্ভর নয়। কারণ প্রতিটি ব্যাংকই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত নীতিমালার অধীন, যা সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোর সাথে গভীরভাবে জড়িত। ইসলামী ব্যাংকগুলো যে খাতে বিনিয়োগ করে, সে সম্পর্কেও গ্রাহকদেরকে পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তথ্য সরবরাহ করা হয় না। অনেক সময় বিনিয়োগের প্রকৃত খাত গোপন রাখা হয় অথবা সে বিনিয়োগ সুদের সাথে সম্পৃক্ত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যাংক তৃতীয় পক্ষ হিসেবে একটি পণ্য নির্দিষ্ট মূল্যে ক্রয় করে, অতঃপর তা কিস্তিতে অধিক মূল্যে গ্রাহকের নিকট বিক্রি করে এটি প্রকৃত অর্থে সুদেরই একটি কৌশলগত রূপ। শরীয়াহ মতে এই ধরনের লেনদেন সন্দেহজনক। আর ইসলামী শরী‘আতের স্থিরীকৃত নীতিমালাসমূহের মধ্যে রয়েছে,إذا اجتَمَع الحلالُ والحرامُ غُلِّبَ الحرامُ “যখন কোন বিষয়ে হালাল ও হারামের মাসআলা একত্রিত হয়, তখন হারামের মাসআলা প্রাধান্য পায়’। অর্থাৎ সেটাকে হারাম বলে গণ্য করতে হবে।” নবী (ﷺ) বলেন إِنَّ الْحَلَالَ بَيِّنٌ وَإِنَّ الْحَرَامَ بَيِّنٌ وَبَيْنَهُمَا مُشْتَبِهَاتٌ لَا يَعْلَمُهُنَّ كَثِيْرٌ مِنَ النَّاسِ فَمَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ اسْتَبْرَأَ لِدِيْنِهِ وَعِرْضِهِ وَمَنْ وَقَعَ فِي الشُّبُهَاتِ وَقَعَ فِي الْحَرَامِ “নিশ্চয় হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। আর উভয়ের মাঝে রয়েছে সন্দেহজনক বিষয়। অনেক মানুষই সেগুলোর বাস্তবতা জানে না। যে ব্যক্তি এসব সন্দেহজনক বিষয় থেকে দূরে থাকে, সে তার দ্বীন ও মর্যাদাকে নিরাপদে রাখে, আর যে লোক সন্দেহজনক বিষয়ে পতিত হবে, সে হারামের মধ্যে লিপ্ত হয়ে পড়বে’ (বুখারী, হা/৫২, ২০৫১; সহীহ মুসলিম হা/১৫৯৯)। রাসূল (ﷺ) আরো বলেন, دَعْ مَا يَرِيْبُكَ إِلَى مَا لَا يَرِيْبُكَ فَإِنَّ الصِّدْقَ طُمَأْنِيْنَةٌ وَإِنَّ الْكَذِبَ رِيْبَةٌ “যে বিষয়ে তোমার সন্দেহ হয়, তা ছেড়ে দিয়ে যাতে সন্দেহের সম্ভাবনা নেই তা গ্রহণ কর। যেহেতু সত্য হল স্বস্তি এবং মিথ্যা হল সন্দেহপূর্ণ” (তিরমিযী হা/২৫১৮; নাসাঈ হা/৫৭১১)। এই কারণে শরীয়াহ্‌সম্মত লভ্যাংশের আশায় এ ধরনের ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগ করাও যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ ও শঙ্কাস্পদ। একজন ধর্মভীরু মুসলমানের উচিত এসব বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং পরিপূর্ণ হালাল উৎস নিশ্চিত করে তবেই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। তাই আমি আমাদের পাঠকদের উদ্দেশ্যে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক মুদারাবা ভিত্তিক বিনিয়োগ কখন শরীয়তসম্মত হয় তা বোঝার জন্য নিচে কয়েকটি মৌলিক শর্ত উপস্থাপন করছি। আপনারা যারা ইসলামি ব্যাংকে মুদারাবা পদ্ধতিতে অর্থ জমা রাখতে চান, তারা অবশ্যই নিম্নোক্ত বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেবেন।
.
❑ তৃতীয়ত: আমানতের পরিচয় ও তার প্রকারভেদ:
.
অমানত বলতে এমন বস্তু বা সম্পদকে বোঝানো হয়, যা কারো কাছে কেবল সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে জমা রাখা হয় কোনো প্রকার লেনদেন বা ব্যবহার করার অধিকার না দিয়ে। হোটেল কিংবা অনুরূপ স্থানে ‘লকার’ নামে যেসব নিরাপদ সংরক্ষণব্যবস্থা থাকে, সেগুলো এই সংজ্ঞার আওতাভুক্ত। কোনো কোনো ব্যাংকেও এ ধরনের লকার-সেবা থাকতে পারে। অপরদিকে, প্রচলিত অর্থে যেটিকে ‘ব্যাংকিং আমানত’ বলা হয়, তা আসলে এই সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ, ব্যাংক কেবল জমাকৃত অর্থ সংরক্ষণ করে না; বরং সেই অর্থকে বিভিন্ন লেনদেন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করে। এই হলো আমানতের মৌলিক ধারণা। আর হুকুমের দিক থেকে ব্যাংকে (ডিপোজিট) আমানত দুই প্রকার: (১).লাভবিহীন আমানত ও (২).সঞ্চয়ী আমানত।
.
(১).লাভবিহীন আমানত বা (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট): এটাকে চাহিবামাত্র প্রদেয় আমানত কিংবা চলতি হিসাব বলা হয়। এর বৈশিষ্ট্য হল গ্রাহক ব্যাংকে তার অর্থ জমা রাখবেন এবং যখন ইচ্ছা তখন উত্তোলন করতে পারবেন। তবে কোন লাভ পাবেন না। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরণের লেনদেনে কোন আপত্তি নেই। যেহেতু এটি প্রকৃতপক্ষে গ্রাহকের কাছ থেকে ব্যাংকের ঋণ গ্রহণ। কিন্তু যদি ব্যাংকটি সুদি ব্যাংক হয় তাহলে এমন ব্যাংকে অর্থ জমা রাখা জায়েয নয়। যেহেতু সুদি ব্যাংক এ অর্থ থেকে উপকৃত হবে এবং এ অর্থের মাধ্যমে তার হারাম কর্মকাণ্ডগুলোকে মজবুত করবে। তবে কোন গ্রাহকের যদি তার অর্থ ব্যাংকে সংরক্ষণ করার প্রয়োজন হয় এবং অন্য কোন ইসলামী ব্যাংক না পান সেক্ষেত্রে তার সম্পদ সুদি ব্যাংকে সংরক্ষণ করলে গুনাহ হবে না।
.
(২).সঞ্চয়ী আমানত বা (ইনভেস্টমেন্ট ডিপোজিট): এই প্রকার আমানতের বৈশিষ্ট্য হল গ্রাহক নির্দিষ্ট মুনাফার প্রত্যাশায় একটি নির্ধারিত সময়ের জন্য ব্যাংকে অর্থ জমা রাখেন। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে তিনি চুক্তি অনুযায়ী মুনাফা গ্রহণ করেন। এই ধরণের আমানতের কিছু বৈধ (জায়েয) পদ্ধতি রয়েছে, আবার কিছু পদ্ধতি শরিয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ (হারাম)। জায়েয পদ্ধতির মধ্যে হল গ্রাহক ও ব্যাংকের মধ্যকার চুক্তিটি মুদারাবা চুক্তি হওয়া। অর্থাৎ ব্যাংক নির্দিষ্ট আনুপাতিক লাভ দেয়ার বিপরীতে মুবাহ (শরিয়ত অনুমোদিত) প্রজেক্টসমূহে আমানতের অর্থ বিনিয়োগ করা। লাভ হলে নির্দিষ্ট অনুপাতে উভয় পক্ষ তা ভাগ করে নেয়। আবার লস হলেও উভয় পক্ষ তা বহন করা। এই চুক্তির গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণের উপর শর্তগুলো হল:
.
(১)। ব্যাংক কর্তৃক মুবাহ খাতগুলোতে অর্থ বিনিয়োগ করা। যেমন উপকারী প্রজেক্টগুলো বাস্তবায়ন, আবাসন তৈরী, ইত্যাদি। সুদি ব্যাংক বা সিনেমা হল প্রতিষ্ঠা করা কিংবা অস্বচ্ছল লোকদেরকে সুদভিত্তিক ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে অর্থ বিনিয়োগ করা জায়েয হবে না। তাই ব্যাংক কি কি খাতে বিনিয়োগ করে সেটা জানা আবশ্যক।
.
(২)। মূলধন ফেরত দেয়ার গ্যারান্টি না দেয়া। অর্থাৎ লোকসান হলে ব্যাংক গ্রাহকের মূলধন ফেরত দেয়ার দায় গ্রহণ না করা; যতক্ষণ না ব্যাংকের পক্ষ থেকে কসুরের কারণে লোকসান না হয় এবং ব্যাংকই এ লোকসানের প্রধান কারণ না হয়। কেননা যদি মূলধন ফেরত দেয়ার গ্যারান্টি দেয়া হয় এমন চুক্তি প্রকৃতপক্ষে ঋণের চুক্তি। অতিরিক্ত যে মুনাফা আসে সেটি সুদ হিসেবে গণ্য হবে।
.
(৩)। শুরু থেকে লাভ নির্দিষ্ট থাকা ও চুক্তিতে উল্লেখিত থাকা। তবে লাভ নির্দিষ্ট করতে হবে লভ্যাংশের সাধারণ অনুপাতের ভিত্তিতে; মূলধন থেকে নয়। উদাহরণত: এক পক্ষ পাবে লাভের এক তৃতীয়াংশ কিংবা অর্ধেক কিংবা ২০%। অবশিষ্টাংশ পাবে অপর পক্ষ। যদি লাভ অজ্ঞাত ও অনির্দিষ্ট থাকে তাহলে এমন চুক্তি সঠিক হবে না। ফিকাহবিদ আলেমগণ উল্লেখ করেছেন যে, লাভের অনুপাত অজ্ঞাত থাকলে মুদারাবা চুক্তি নষ্ট হয়ে যায়।
.
কাতার ভিত্তিক ফাতওয়া বোর্ড ইসলাম ওয়েব’ এর আলিমগণ বলেন,”সূদমুক্ত ইসলামী ব্যাংকে অর্থ বিনিয়োগ করা শরী‘আতের দৃষ্টিতে আপত্তিকর নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যাংক ইসলামী শরী‘আতের মূলনীতি অনুযায়ী উক্ত বিনিয়োগকৃত অর্থের উপর কাজ করবে বা তাকে বৈধ ও হালাল ব্যবসায় লাগাবে এবং বিনিয়োগকারীকে মূলধনের গ্যারান্টি দিবে না (অর্থাৎ লাভ-লোকসান ও ক্ষতির)। অতঃপর লাভ হলে তা চুক্তি অনুপাতে উভয়ের মধ্যে বণ্টন করে নিবে। চুক্তিপত্রে লাভের শতাংশ উল্লেখ থাকা অপরিহার্য। উপরিউক্ত শর্তানুযায়ী বিনিয়োগ করা এবং লভ্যাংশ গ্রহণ করা বৈধ।(ইসলাম ওয়েব, ফৎওয়া নং-২৭৮৬৪৭)।
.
❑ চতুর্থত: মুদারাবার হারাম পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে:
(১)। মূলধন ফেরত দেয়ার গ্যারান্টি দেয়া। উদাহরণত: গ্রাহক ১০০ মুদ্রা আমানত রাখল; যাতে করে তার মূলধন ফেরত দেয়ার গ্যারান্টিসহ সে ১০ মুদ্রা মুনাফা পায়। এটি সুদভিত্তিক ঋণ। অধিকাংশ ব্যাংকে এ লেনদেন চলে। এ ধরণের লেনদেনকে আমানত কিংবা ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেট কিংবা সঞ্চয়ী বই নামে অভিহিত করা হয়। এ মুনাফা বিভিন্ন মেয়াদে বিতরণ করা হয় কিংবা লটারীর মাধ্যমে বিতরণ করা হয়; যেমনটি করা হয় ‘সি’ ক্যাটাগরীর ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রে। উল্লেখিত সব লেনদেন হারাম।
.
(২)। ব্যাংক কর্তৃক হারাম প্রজেক্টগুলোতে অর্থ বিনিয়োগ করা। যেমন- সিনেমা হল বানানো, পর্যটন ভিলেজ তৈরী করা; যেসব ভিলেজে শরিয়ত গর্হিত কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়, পাপের সয়লাব ঘটে। এমন ব্যাংকে বিনিয়োগ করা হারাম। যেহেতু এর মাধ্যমে পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা হয়।ব্যাংকগুলো যে ধরণের আমানতগুলোর লেনদেন করে সেগুলোর ব্যাপারে এটাই সার কথা।
.
ওআইসি-এর অধিভুক্ত ‘ইসলামী ফিকাহ একাডেমী’ এর সিদ্ধান্তে এসেছে যে:
” أولاً : الودائع تحت الطلب (الحسابات الجارية) سواء أكانت لدى البنوك الإسلامية أو البنوك الربوية هي قروض بالمنظور الفقهي ، حيث إن المصرف المتسلم لهذه الودائع يده يد ضمان لها ، هو ملزم شرعا بالرد عند الطلب .
ولا يؤثر على حكم القرض كون البنك (المقترض) ، مليئاً .
ثانياً : إن الودائع المصرفية تنقسم إلى نوعين بحسب واقع التعامل المصرفي :
أ‌- الودائع التي تدفع لها فوائد ، كما هو الحال في البنوك الربوية ، هي قروض ربوية محرمة ، سواء أكانت من نوع الودائع تحت الطلب (الحسابات الجارية) ، أم الودائع لأجل ، أم الودائع بإشعار ، أم حسابات التوفير .
ب‌- الودائع التي تسلم للبنوك الملتزمة فعليا بأحكام الشريعة الإسلامية بعقد استثمار على حصة من الربح هي رأس مال مضاربة ، وتنطبق عليها أحكام المضاربة (القراض) في الفقه الإسلامي التي منها عدم جواز ضمان المضارب ( البنك ) لرأس مال المضاربة “
এক: চাহিবামাত্র প্রদেয় (চলতি হিসাব) আমানতগুলো ইসলামী ব্যাংকসমূহে হোক কিংবা সুদি ব্যাংকসমূহে হোক ইসলামী ফিকাহর দৃষ্টিতে এগুলো ঋণ। এই আমানতগুলোর উপর গ্রহণকারী ব্যাংকের কর্তৃত্ব হচ্ছে ফেরত দেয়ার গ্যারান্টিযুক্ত কর্তৃত্ব। গ্রাহক চাহিবামাত্র ব্যাংক আমানতের এ অর্থ ফেরত দিতে আইনত বাধ্য। ব্যাংক (ঋণগ্রহীতা) সামর্থ্যবান হওয়ায় এ ঋণের হুকুমের উপর কোন প্রকার প্রভাব পড়বে না।
দুই: ব্যাংকিং সেক্টরে বিদ্যমান লেনদেনের ভিত্তিতে ব্যাংকিং আমানত দুই ধরণের:
ক. যে আমানতগুলোর বিপরীতে মুনাফা দেয়া হয়। সুদি ব্যাংকগুলোতে যা বিদ্যমান। এ ঋণগুলো সুদভিত্তিক ও হারাম; চাই সেগুলো চাহিবামাত্র প্রদেয় (চলতি হিসাব) শ্রেণীর আমানত হোক কিংবা মেয়াদী আমানত হোক কিংবা নোটিশসহ আমানত হোক কিংবা সঞ্চয়ী হিসাব হোক।
খ. যে ব্যাংকগুলো বাস্তবে ইসলামী শরিয়ার বিধিবিধান মেনে চলে সে সব ব্যাংকে বিনিয়োগের চুক্তিতে মুদারাবার মূলধন হিসেবে যে আমানতগুলো জমা করা হয়; এই শর্তে যে লভ্যাংশের একটি ভাগ গ্রাহক পাবে। এমন আমানতগুলোর ক্ষেত্রে ইসলামী ফিকাহ শাস্ত্রে উল্লেখিত মুদারাবার বিধিবিধানগুলো প্রযোজ্য। যে বিধানগুলোর মধ্যে রয়েছে যে, মুদারিব (ব্যাংক) এর জন্য মুদারাবার মূলধনের গ্যারান্টি দেয়া নাজায়েয।”(মাজাল্লাতুল মাজমায়িল ফিকহ; সংখ্যা: ৯; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৯৩১; আরো বিস্তারিত জানতে দেখুন ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১১৩৮৫১; ১৫১৩৬৬)।
.
মহান আল্লাহ আমাদেরকে বৈধ পথে উপার্জন করা এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমীন! (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Translate