Saturday, February 22, 2025

প্রচলিত তাবলীগ জামাতকে না বলার ১৩টি কারণ

নিম্নে ভারতের মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘তাবলীগ জামাত’কে ‘না’ বলার বা প্রত্যাখ্যান করার অসংখ্য কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও গুরুতর ১২টি কারণ উল্লেখ করা হলো:

◈ ১. তাবলিগ জামাতের অবস্থা হল, ঘরের ফাউন্ডেশন মজবুত ভাবে তৈরি না করে ডেকোরেশন নিয়ে ব্যস্ত থাকার মত বা ভঙ্গুর ঘরকে মজবুত ভিত্তির উপরে নির্মাণ করার পরিবর্তে কোনমতে ঠেকা দিয়ে রাখার মত কিংবা যে গাছের শেকড়ে ঘুণ ধরেছে তার মূল সমস্যা বাদ দিয়ে গাছের আগায় পানি ঢালার মত। কেননা মানুষের আকিদা সংশোধন, শিরক, বিদআত, ইসলামবিরোধী নানা মতবাদ, ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার থেকে এদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, লম্বা দাড়ি রাখা, মাথায় পাগড়ি পরা, লম্বা জুব্বা পরা, বোরকা পরা, মিসওয়াক করা, চিল্লায় বের হওয়া ইত্যাদি।

◈ ২. চতুর্দিকে শিরকের জমজমাট আসর, মানুষ কবর পূজায় লিপ্ত ও বিভিন্ন বাতিল দল ও ফিরকায় দিশেহারা। কিন্তু এসব ব্যাপারে তাদের কোন বক্তব্য নেই। কেননা এসব বিষয়ে কথা বললে নাকি সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে!

◈ ৩. মানুষ বিদআত, কুসংস্কার ও অপসংস্কৃতির অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছে। কিন্তু সেদিকে তাদের ভ্রুক্ষেপ নেই। কারণ এসব বিষয়ে কথা বললে নাকি ‘হাজার বছরের ঐক্য’ নষ্ট হবে এবং মানুষের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও ঝগড়া সৃষ্টি হবে।

◈ ৪. এই জামাতের ভিত্তি জাহালত বা মূর্খতার উপরে প্রতিষ্ঠিত। ফলে মানুষকে দ্বীনী ইলম বা ইসলামের বিশুদ্ধ জ্ঞানান্বেষণের দিকে উৎসাহিত করার চেয়ে তাদের কথিত ‘চিল্লা’য় বের হওয়ার জন্য উৎসাহিত করাই তাদের অন্যতম প্রধান কাজ।

ফলশ্রুতিতে মূর্খরা মাথায় পাগড়ি বেঁধে ফাজায়েলের কিতাব নিয়ে জনগণের সামনে ওয়াজ করতে দাঁড়িয়ে যায়।তারপর স্বভাবতই ইসলাম সম্পর্কে উল্টাপাল্টা ও ভুলভাল ব্যাখ্যা দিতে শুরু করে।
অনুরূপভাবে দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ মহিলারাও পাড়ায়-মহল্লায় দ্বীন সম্পর্কে সাধারণ মহিলাদের মাঝে ইসলাম সম্পর্কে নানা ভ্রান্ত ও বিদআতি কথাবার্তা প্রচারে নিয়োজিত রয়েছে। অথচ ইসলাম সম্পর্কে কথা বলা এবং আমল করার পূর্বে ইলম (জ্ঞান) অর্জন করা ফরজ।

◈ ৫. দ্বীনী ইলম অর্জনে অনীহা ও গুরুত্বহীনতা:

যার কারণে আপনি দেখবেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাবলিগের একজন মুরুব্বি যে, ১০-১৫ বা ২০ বছর ধরে তাবলিগের মেহনতের সাথে জড়িত তাকে যদি ইসলামের প্রাথমিক এবং মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় তাহলে তার উত্তর দিতে ব্যর্থ হবে। যেমন:

– ইসলাম ও ইমান কাকে বলে?
– ইসলাম এবং ইমানের রোকন কয়টি ও কী কী?
– দ্বীনে স্তর কয়টি ও কী কী?
– ইবাদত কাকে বলে?
– ইবাদতের রোকন কয়টি ও কী কী?
– ইবাদত কবুলের শর্তাবলী কয়টি ও কী কী?
– ইমান ভঙ্গের কারণগুলো কী কী?
– ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর সঠিক অর্থ এবং এর শর্তাবলী কয়টি ও কী কী?
– এছাড়াও শিরক, কুফর, নিফাক, উসিলা, শাফাআত ইত্যাদি। বিষয়টি আপনারা নিজেরাই পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

◈ ৬. উদ্ভট কিচ্ছা-কাহিনী এবং জাল-জইফ হাদিস বর্ণনা:

এই মূর্খদের ওয়াজ বা বয়ানের মূল ভিত্তি হলো, বুজুর্গদের বুজুর্গির বর্ণনা, উদ্ভট স্বপ্ন, কিচ্ছা-কাহিনী, জাল-জইফ হাদিসের বয়ান এবং ভিত্তিহীন ফজিলতের ফুলঝুরি। অথচ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে মিথ্যা হাদিস বর্ণনার পরিণতি জাহান্নাম।

◈ ৭. সংস্কার ও সংশোধনে অনীহা:

তাবলিগ জামাতের প্রধান সিলেবাস ফাজায়েল নামক কিতাবগুলো অসংখ্য ভ্রান্ত কথাবার্তা, জাল-জইফ হাদিস এবং ইসলামের অপব্যাখ্যা দিয়ে পরিপূর্ণ। এসব কিতাবের ভুল-ভ্রান্তি সম্পর্কে সচেতন করে এ পর্যন্ত বিভিন্ন ভাষায় শত শত গ্রন্থ রচিত হলেও তারা মোটেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করে না‌। বরং তারা উল্টো সংস্কার প্রত্যাশীদেরকে গালাগালি, নানা অপবাদ ও তির্যক বাক্যবাণে জর্জরিত করে ছলে-বলে-কৌশলে ভুলগুলোকেই সঠিক প্রমাণের অপচেষ্টায় লিপ্ত!

◈ ৮. দলাদলি, কোন্দল ও রক্তপাত:

এই জামাতটি বর্তমানে দুই ভাগে (জুবায়ের পন্থী ও সাদ পন্থী) বিভক্ত হয়ে একে অপরের সাথে চরম কোন্দলে লিপ্ত হয়েছে। মসজিদ ভাগাভাগি, মসজিদে মারামারি, এক মসজিদে দু গ্রুপের আলাদা আলাদা জামাত, একই ময়দানে আলাদা আলাদা ইজতিমা। এমনকি একদল আরেক দলকে কাফের বা ইহুদি-খ্রিষ্টানের দালাল বলেও আখ্যায়িত করছে। সর্বোপরি টঙ্গীর ইজতেমা মাঠে দুই গ্রুপের লোমহর্ষক রক্তাক্ত মারামারি জাতিকে স্তম্ভিত করেছে।

◈ ৯. এদের মাধ্যমে কিছু মানুষ দাড়ি ছেড়েছে, মাথায় টুপি পরেছে, মহিলারা বোরকা পরেছে, নামাজি হয়েছে, নানা পাপকর্ম থেকে ফিরে এসেছে তা ঠিক। কিন্তু শিরক যুক্ত ইমান এবং বিদআত যুক্ত আমল আল্লাহর কাছে কোনই কাজে লাগবে না সে ব্যাপারে তারা নিতান্তই বেখবর। তাই তো আল্লাহ বলেছেন,

قُلۡ هَلۡ نُنَبِّئُكُم بِٱلۡأَخۡسَرِینَ أَعۡمَـٰلًا
ٱلَّذِینَ ضَلَّ سَعۡیُهُمۡ فِی ٱلۡحَیَوٰةِ ٱلدُّنۡیَا وَهُمۡ یَحۡسَبُونَ أَنَّهُمۡ یُحۡسِنُونَ صُنۡعًا

“(হে নবী আপনি বলুন), আমি কি তোমাদেরকে সেসব মানুষের ব্যাপারে বলবো যারা আমলের দিক দিয়ে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত? তারা হল, সে সব লোক, যাদের কর্ম প্রচেষ্টা দুনিয়ার জীবনেই বাতিল যায় অথচ তারা মনে করে যে, তারা ভালো কাজ করেছে!” [সূরা কাহফ: ১০৩ ও ১০৪]

◈ ১০. এই জামাতটি নিজেদের টাকায় দাওয়াতি কাজ করে বলে গর্ব করে। কিন্তু তারা নিজেদের টাকায় মূলত: বিদআত প্রচারে লিপ্ত। নিজে বিদআত করার চেয়ে বিদআত প্রচারের ভয়াবহতা বেশি। কারণ এর দ্বারা যত মানুষ বিদআতি কাজ করবে তাদের প্রত্যেকের সমপরিমাণ গুনাহ প্রচারকারীর আমলনামায় লিপিবদ্ধ করা হবে।

◈ ১১. কুরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যা:

তাবলিগ জামাত জি/হাদের আয়াতগুলোকে তাদের কথিত চিল্লা ও গাশতের পক্ষে ব্যবহার করে, ‘চিল্লা’র জন্য নির্ধারিত ৩ দিন, ৪০ দিন (এক চিল্লা), ১২০ দিন (তিন চিল্লা) বা ১ সাল ইত্যাদির পক্ষে কুরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যা করে এগুলোকে বৈধ প্রমাণের চেষ্টা, টঙ্গীর মাঠে এক ওয়াক্ত নামাজের ফজিলত ৪৯ কোটি গুণ সওয়াবের বর্ণনা, তিন বার টঙ্গীর ইজতিমায় শরিক হলে এক হজের সমপরিমাণ সওয়াব বা এটিকে ‘গরিবের হজ’ বলা। (সাধারণ কিছু মূর্খ এমন কথা বললেও তাবলিগ জামাতের কেন্দ্র থেকে এর প্রতিবাদ বা সংশোধনী মূলক বক্তব্য করা হয়েছে বলে জানা যায় না)।

◈ ১২. তথাকথিত ‘আখেরি মুনাজাত’:

টঙ্গী ইজতেমার বিশেষ আকর্ষণ হল, ‘আখেরি মুনাজাত’। বাস্তবতা হলো, অসংখ্য মুসলিম এখন ফরজ সালাত আদায়ের চাইতে আখেরি মুনাজাতে যোগদান করাকেই অধিক গুরুত্ব দেয়। আখেরি মুনাজাতে শরিক হওয়ার জন্য নামাজি, বেনামাজি, ঘুষখোর, সন্ত্রাসী, বিদআতি, দুষ্কৃতিকারী ইত্যাদি মানুষ দলে দলে টঙ্গীর ময়দানের দিকে ছুটতে থাকে। কেউ ট্রেনের ছাদে, কেউ বাসের হ্যান্ডল ধরে, নৌকায় বসে, পিক আপ প্রভৃতির মাধ্যমে ইজতিমায় যোগদান করে। স্বয়ং রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে, প্রধানমন্ত্রী গণভবনে, বিরোধীদলীয় নেত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীগণও সেখানে গিয়ে আঁচল পেতে প্রার্থনা করেন। টিভিতে সরাসরি এই মুনাজাত সম্প্রচারিত হয়। রেডিও শুনে রাস্তার ট্রাফিকগণও হাত তুলে আমিন আমিন বলতে থাকে। সে দিন ঢাকা শহরে অফিস-আদালতে অঘোষিত ছুটি পালিত হয়। কারণ তাদের বিশ্বাস, এই আখেরি মুনাজাতে অংশ গ্রহণ করতে পারলে জীবনের সব গুনাহ মোচন হয়ে যায়! অথচ এভাবে নিয়ম করে সম্মিলিত মুনাজাত করাই বিদআত (দ্বীনের মধ্যে নব আবিষ্কৃত কাজ)। আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আমিন।

◈ ১৩. উম্মতের শ্রেষ্ঠ মুহাক্কিক সালাফি আলেমগণ -যেমন: শাইখ বিন বায, শাইখ উমাইমিন, শাইখ আলবানি, শাইখ সালেহ আল ফাওযান প্রমুখ-তাবলিগ জামাতের সাথে বের হওয়া, তাদের বই পড়া এবং তাদের ইজতিমায় শরিক হওয়াকে হারাম বলেছেন এবং উম্মতকে এ ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
লেখক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি

দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব। 

সহজ-সরল ও কোমল স্বভাবের মানুষের জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম এবং নম্রতা ও কঠোরতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান কেমন হওয়া উচিৎ

প্রশ্ন: নিম্নের হাদিসটির ভাবার্থ কী এবং হাদিসটি কি সহিহ? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি সহজ-সরল ও কোমল হবে, সে ব্যক্তির জন্য আল্লাহ জাহান্নামকে হারাম করে দেবেন।” [সহিহ আল-জামি: ৬৪৮৪] এবং নম্রতা ও কঠোরতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান কেমন হওয়া উচিৎ?

উত্তর: নিম্নে সংক্ষেপে উপরোক্ত প্রশ্নদ্বয়ের উত্তর দেওয়া হলো:

প্রবীণ সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

حُرِّمَ عَلَى النَّارِ كُلُّ هَيِّنٍ لَيِّنٍ سَهْلٍ قَرِيبٍ مِنْ النَّاسِ

“জাহান্নামের আগুনের জন্য হারাম যে ব্যক্তি শান্ত-শিষ্ট, নম্র, সহজ-সরল চরিত্রের অধিকারী হবে আর মানুষের কাছাকাছি অবস্থান করবে।” [তিরিমিজি-২৪৮৮, ইবনে হিব্বান-৪৬৯, মুসনাদে আহমদ- সহিহ]। অন্য এক হাদিসে এসেছে, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

أَلَا أُخْبِرُكم بمَن يَحْرُمُ على النَّارِ، وبمَن تَحْرُمُ عليه النَّارُ؟ على كلِّ قريبٍ هيِّنٍ سهْلٍ.

“আমি কি তোমাদের এমন ব্যক্তির কথা জানাবো, যে জাহান্নামের ওপর হারাম এবং যার ওপর জাহান্নাম হারাম? সে হলো প্রতিটি নিকটবর্তী (মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে), কোমল স্বভাবের ও সহজ-সরল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তি।” [সুনান তিরমিজি: ২৪৮৮, সহিহ হাদিস]

অর্থাৎ আমি কি তোমাদের এমন ব্যক্তির কথা জানাবো, যে আগুন (জাহান্নাম) থেকে রক্ষা পাবে, অথবা আগুন যার থেকে দূরে থাকবে? সে হলো—প্রতিটি মানুষের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখা, তাদের সঙ্গে কল্যাণের আসনে বসা এবং যথাসাধ্য তাদের সঙ্গে নম্রতা ও ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে সম্পর্ক রাখা। আর সে হলো প্রতিটি সহনশীল, কোমল স্বভাবের এবং মানুষের সঙ্গে সহজ-সরল আচরণকারী ব্যক্তি।

❂ উক্ত হাদিসদ্বয় থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:

১. উত্তম চরিত্রের গুরুত্ব এবং এটি জাহান্নাম থেকে রক্ষার উপায়।
২. মানুষের সঙ্গে সদাচরণ করা, সহজ-সরল আচরণ করা এবং তাদের প্রয়োজন পূরণে সহযোগিতা করা প্রশংসনীয়।
৩. উত্তম চরিত্র ও সুন্দর আচরণ ঈমানের অংশ।
৪. দাঈ বা আহ্বানকারীর জন্য উৎসাহমূলক ভাষা ব্যবহার করা উচিত, যা মানুষকে সত্য গ্রহণ ও তাতে দৃঢ় থাকার প্রতি উদ্বুদ্ধ করবে।
৫. শিক্ষার্থী বা শ্রোতাকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি মনোযোগী করা উচিত।

মোটকথা, যে ব্যক্তি স্বভাবগতভাবে শান্ত-শিষ্ট হবে, উগ্র হবে না, কঠিন ও রূঢ় স্বভাবের হবে না, সহজ-সরল হবে, জটিলতা ও কুটিলতা মুক্ত হবে, নরম ও কোমল স্বভাবের অধিকারী হবে, সে আল্লাহর বিধানের কাছে সহজে আত্মসমর্পণ করবে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শে নিজেকে বিলিয়ে দেবে, মানুষের কল্যাণে কাজ করবে, তার চেহারায় হাসির ঝিলিক লেগে থাকবে, তার মুখের ভাষা হবে কোমল এমন উন্নত চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারীদের জন্য মহান আল্লাহ জাহান্নামের আগুন হারাম করে দেবেন।

❑ রাগ করা বা কঠোরতা অবলম্বনের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান কী হওয়া উচিত?

পরিস্থিতি ও অবস্থার আলোকে নম্রতা ও কঠোরতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। কারণ প্রত্যেকটি জিনিসের নির্দিষ্ট একটি ক্ষেত্র আছে। উপরোক্ত গুণ ও বৈশিষ্ট্যগুলো সাধারণ জীবনযাত্রা,পারস্পারিক লেনদেন ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একজন মুমিনের মধ্যে থাকা উচিত। তবে অবস্থা ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী কখনো কঠোর হতে হয়। কখনো শক্তি প্রয়োগ করতে হয়। কখনো রাগ করতে হয়। যেখানে নম্রতা দেখানোর জায়গা, সেখানে কঠোরতা অবলম্বন করলে কোনো উপকার হয় না। আবার কঠোর হওয়ার জায়গায় নম্রতা দেখালে আরও বেশি ক্ষতি হয়। আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন থেকে এই শিক্ষা পাই।

➧ উল্লেখ্য যে, এখানে একজন মুমিনের স্বভাব, ব্যক্তিত্ব আচরণের কথা বলা হয়েছে। সুতরাং একজন এমন সৎ ও উত্তম চরিত্রের মানুষের জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম। কিন্তু যার মধ্যে আদৌ ইমান নেই অথবা খাঁটি মুমিনের বৈশিষ্ট্যগুলো তার মধ্যে অনুপস্থিত তার মুক্তি পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ আখিরাতে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ইমান ও আমলে সালেহ (সৎকর্ম) থাকা অপরিহার্য শর্ত। তারপর তার অন্যান্য গুণ-বৈশিষ্ট্য বিচার্য হবে।

❂ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নম্রতা ও কঠোরতা:

আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন, দয়ালু ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী। আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّـهِ لِنتَ لَهُمْ ۖ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ

“আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন; পক্ষান্তরে আপনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।” [সূরা আলে ইমরান: ১৫৯]
তিনি বহু হাদিসে রাগ করতে নিষেধ করেছেন। অন্যদিকে এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহর বিধান লঙ্ঘিত হলে তিনি এত বেশি রাগ করতেন যে, তখন তাঁর সামনে যাওয়ার কারও সাহস হতো না।

– একবার এক কুরাইশি নারীর চুরির ঘটনায়, যখন তাঁর কাছে তাকে সম্ভ্রান্ত বংশের নারী হিসেবে ক্ষমা করে দেওয়ার আবেদন করা হলো, তখন তিনি রাগতস্বরে বক্তৃতায় বললেন:

أمَّا بَعْدُ؛ فإنَّما أهْلَكَ النَّاسَ قَبْلَكُمْ: أنَّهُمْ كانُوا إذا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ، وإذا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ أقامُوا عليه الحَدَّ، والذي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بيَدِهِ، لو أنَّ فاطِمَةَ بنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ، لَقَطَعْتُ يَدَها.

“অতঃপর, শুনো, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে এই কারণে যে, তাদের মধ্যে কোনো সম্মানিত ব্যক্তি চুরি করলে তাকে ছাড় দেওয়া হতো, আর যদি কোনো দুর্বল ব্যক্তি চুরি করত, তবে তার ওপর (শাস্তির) হদ প্রয়োগ করা হতো। আল্লাহর কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, আমি তার হাত কেটে দিতাম।”

এরপর তিনি সেই নারীর জন্য হুকুম দিলেন, এবং তার হাত কেটে ফেলা হলো। [সহিহ বুখারি: ৬৭৮৮, সহিহ মুসলিম: ১৬৮৮]

– আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: “নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার কাছে প্রবেশ করলেন, তখন ঘরে একটি পর্দা ছিল, যাতে ছবি আঁকা ছিল। এটি দেখে তাঁর চেহারা পরিবর্তিত হয়ে গেল। এরপর তিনি সেই পর্দাটি ছিঁড়ে ফেললেন এবং বললেন: ‘কিয়ামতের দিনে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে তাদের, যারা এইসব (জীবিত প্রাণীর) ছবি অঙ্কন করে।’” (সহিহ বুখারি: ৫৯৫৪, সহিহ মুসলিম: ২১০৭)

এ ছাড়াও আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখন কোথায় কেন রাগ করেছেন সে ব্যাপারে অনেক হাদিস রয়েছে। কিন্তু তিনি ব্যক্তিগত কারণে রাগ করতেন না।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

مُّحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ ۚ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ

“মুহাম্মাদ আল্লাহর রসুল, আর যারা তাঁর সঙ্গে আছে, তারা কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পর দয়ালু।” [সূরা ফাতহ: ২৯]

উপসংহার:
অন্যায় প্রতিরোধ করতে হলে কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে। আর মানুষের সঙ্গে লেনদেনে নম্র, সহজ-সরল ও সদাচারী হওয়া উচিত। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল

দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব। 

কাউকে জাহান্নামি বলার ভয়াবহতা এবং স্বামী যদি স্ত্রীকে এমন কথা বলে তাহলে স্ত্রীর কী করণীয়

 প্রশ্ন: কোন স্ত্রী যদি সিয়াম পালন রত অবস্থায় হক কথা বলার কারণে তার স্বামী তাকে একাধিক বার বদদু্আ দেয় (তার অজ্ঞতার কারণে) “তুই জাহান্নামি”। তাহলে কি সত্যিই সে জাহান্নামে যাবে? জান্নাত-জাহান্নাম দেওয়ার একমাত্র মালিক তো শুধু আল্লাহ। বান্দা কে বলার? সে ক্ষেত্রে উক্ত স্ত্রীর কী করণীয় একটু বলবেন? উল্লেখ্য যে, উক্ত স্বামী তার স্ত্রীর মুখ নি:সৃত কোনও নসিহা কখন‌ই সহ্য করতে পারে না। আর স্ত্রীও হক কথা না বলে থাকতে পারে না।

উত্তর: একথা সঠিক যে, জান্নাত ও জাহান্নাম দেওয়ার একমাত্র মালিক আল্লাহ তাআলা। বান্দা কারও জন্য জান্নাত বা জাহান্নাম নিশ্চিত করতে পারে না। কোনও ব্যক্তি যদি “তুই জাহান্নামি” বলে বদদুআ করে তা কখনোই আল্লাহর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে না। অর্থাৎ এ কারণে স্ত্রী জাহান্নামি হয়ে যাবে-একথা সঠিক নয়। এটা অবশ্যই একটি দুঃখজনক কথা এবং খারাপ আচরণ।

❑ স্ত্রীর সাথে খারাপ আচরণ করা, তাকে গালি দেওয়া ও তাকে বদদুআ দেওয়া কতটা নিকৃষ্ট কাজ?

◈ ১. কারও প্রতি বদদুআ করা ইসলামি আচার-আচরণে শোভন নয়। এ ধরণের আচরণ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চরিত্র ও আদর্শ পরিপন্থী।

আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,

لَمْ يَكُنْ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَاحِشًا وَلاَ لَعَّانًا وَلاَ سَبَّابًا

“রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অশালীন ভাষী, লানত কারী (অভিসম্পাত কারী) ও গালিবাজ ছিলেন না।” [সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন), অধ্যায়: ৭৮/ আচার-ব্যবহার, পরিচ্ছেদ: ৭৮/৪৪. গালি ও অভিশাপ দেওয়া নিষিদ্ধ]

◈ ২. বিশেষ স্ত্রীদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে এমন কথাবার্তা আল্লাহর নির্দেশ লঙ্ঘণ এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদর্শ পরিপন্থী বিষয়।

❂ আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّـهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا

“নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন-যাপন কর। অতঃপর যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে হয়ত তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ, অনেক কল্যাণ রেখেছেন।” [সূরা নিসা: ১৯]

❂ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« لاَ يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً ( أي : لا يبغض و لا يكره ) إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِىَ مِنْهَا آخَرَ »

“কোন মুমিন পুরুষ কোনও মুমিন নারীকে ঘৃণা ও অপছন্দ করবে না; যদি সে তার কোনও স্বভাবকে অপছন্দ করেও, তাহলে সে তার অপর একটি স্বভাবকে পছন্দ করবে।” [সহিহ মুসলিম]

❂ তিনি আরও বলেন,

اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ ، فَإِنَّ المَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ ، وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ فِي الضِّلَعِ أَعْلاَهُ ، فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسَرْتَهُ، وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ ، فَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ

‘‘তোমরা স্ত্রীদের সাথে ভাল ব্যবহার করবে। কেননা মহিলাকে বাম পাঁজরের হাড় হতে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড় সবচেয়ে বাঁকা হয়। যদি তুমি তা সোজা করতে চেষ্টা কর তাহলে তা ভেঙ্গে যাবে। আর যদি সেভাবেই ছেড়ে দাও তাহলে সর্বদা বাঁকাই থাকবে। সুতরাং তাদের সাথে সৎ ব্যবহার করতে থাক।’’ [সহিহ বুখারি, হা/৩০৮৪]

❑ কাউকে ‘তুই জাহান্নামি’ বলা কবিরা গুনাহ:

‘আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না’, ‘আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করবেন না’, ‘তুই জান্নাতে যাবি না’, ‘তুই জাহান্নামে যাবি’ ‘তুই জাহান্নামি’ নির্দিষ্টভাবে কোনও ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে এ জাতীয় কথাবার্তা বলা কবিরা গুনাহ (বড় পাপ)। কেননা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর এটা উপর নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া এবং আল্লাহর ব্যাপারে অনধিকার চর্চার শামিল। তা ছাড়া এটি আল্লাহর দয়াশীলতা ও ক্ষমার প্রতি অজ্ঞতারও বহিঃপ্রকাশ।

হাদিসে এসেছে, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

أنَّ رَجُلًا قالَ: واللَّهِ لا يَغْفِرُ اللَّهُ لِفُلانٍ، وإنَّ اللَّهَ تَعالَى قالَ: مَن ذا الذي يَتَأَلَّى عَلَيَّ أنْ لا أغْفِرَ لِفُلانٍ، فإنِّي قدْ غَفَرْتُ لِفُلانٍ، وأَحْبَطْتُ عَمَلَكَ، أوْ كما قالَ

“জনৈক ব্যক্তি অন্য এক ব্যক্তি সম্পর্কে মন্তব্য করল, যে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না। তার এ মন্তব্য শুনে আল্লাহ তাআলা বললেন, “এমন কে আছে যে আল্লাহর উপর আগ বাড়িয়ে কসম করে বলে যে, তিনি উমুককে ক্ষমা করবেন না। আমি ঐ ব্যক্তিকেই ক্ষমা করে দিলাম আর তোমার সমস্ত আমল বাতিল করে দিলাম।” [সহিহ মুসলিম]

❑ স্বামীর কর্তব্য:

◆ ১. স্ত্রী যদি তাকে কোনও ভালো উপদেশ, সৎ পরামর্শ বা ভুল সংশোধনী দেয় তাহলে তার কর্তব্য, স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তা গ্রহণ করা। কেননা প্রকৃত বন্ধু ও কল্যাণকামী সেই যে আপনার ভুলগুলো ধরিয়ে দেয় এবং আপনার কল্যাণের জন্য সদুপদেশ দেয়।
মনে রাখতে হবে, কেউ যদি হক বা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে তাহলে তা হলো, অহংকারের আলামত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

الكِبْرُ : بَطَرُ الْـحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ

“অহংকার হল, সত্য প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।” [সহিহ মুসলিম]

আর অহংকারের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لاَ يَدْخُلُ الْـجَنَّةَ مَنْ كَانَ في قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ

“যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার রয়েছে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।” [সহিহ মুসলিম]

এ ছাড়াও কুরআনের অনেক আয়াত ও হাদিসে অহংকারীর ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখিত হয়েছে।

◆ ২. স্বামীর জন্য আরও করণীয় হলো, নিজের অসংলগ্ন আচরণ ও এমন জঘন্য কথা বলার কারণে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি স্ত্রীর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। ভুল করার পর স্ত্রীর নিকট ক্ষমা চাইলে স্বামীর সম্মান ক্ষুণ্ণ হয় না বরং স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসা, সম্মান ও আস্থা বৃদ্ধি পায়। এটা সুখ-শান্তিপূর্ণ দাম্পত্য এবং একটা সুন্দর পরিবারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

❑ স্বামীর এহেন আচরণে স্ত্রীর করণীয়:

❂ ১. সবর বা ধৈর্য ধারণ করা: স্ত্রীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্বামীর খারাপ আচরণ এবং অশালীন শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া। স্বামীর কাছ থেকে এমন কথা শোনার পর, তার বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হওয়া বা প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে শান্ত থেকে পরিস্থিতি সামলানোটা গুরুত্বপূর্ণ।

মহান আল্লাহ সবর কারীকে অপরিসীম পুরষ্কারে ভূষিত করবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ

“ধৈর্যশীলদেরকেই তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেওয়া হবে কোন হিসাব ছাড়াই।” [সূরা যুমার: ১০]

তিনি আরও বলেন,

وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

“আর তোমরা ধৈর্য ধর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” [সূরা আনফাল: ৪৬]

তাছাড়া রাগ নিয়ন্ত্রণকারীদের সম্পর্কেও আল্লাহ প্রশংসা করেছেন। এটিকে তিনি মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দেখুন: সূরা আলে ইমরান-এর ১৩৪ নাম্বার আয়াতের ব্যাখ্যা।

❂ ২. স্বামীর পরিবর্তনের জন্য আল্লাহর নিকট দুআ করা:

স্ত্রীর উচিত স্বামীর জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করা যেন, আল্লাহ তাকে হেদায়েত দেন এবং সংশোধন করে দেন। একজন ইমানদার স্ত্রী কখনও স্বামীর জন্য বদদুআ করবেন না বরং তাকে ভালোর দিকে ফিরিয়ে আনার জন্য দুআর পাশাপাশি চেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। আল্লাহ মানুষের মনের নিয়ন্ত্রণ কারী। সুতরাং দুআর বরকতে হয়ত তিনি তার বক্র অন্তরকে পরিবর্তন করে দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

❂ ৩. গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার সময় সতর্কতা অবলম্বন:

স্ত্রীর উচিত, এমন সময় হক কথা বলার চেষ্টা করা যখন স্বামী সুস্থ মস্তিষ্কে মনোযোগ দিয়ে কথা শুনতে প্রস্তুত থাকেন। যদি স্বামী নসিহা (উপদেশ) গ্রহণ করতে না চান তবে পরিস্থিতি ও সময় বুঝে নরম ভাষায় কথাগুলো বলার চেষ্টা করা উচিত। এ ছাড়া, মাঝে মাঝে সরাসরি না বলে এমন পন্থায় কথা বলা যেতে পারে যাতে তার কাছে সঠিক বার্তাটা পৌঁছানো যায় কিন্তু স্বামী ক্ষুব্ধ না হন।

৪. স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা:

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যত ভালো হবে, ততই সুন্দরভাবে হক কথা বলার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা যায়। তাই একে অপরের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা, পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা বৃদ্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ।

অবশ্য এ ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের পক্ষ থেকে চেষ্টা থাকা কর্তব্য।

পরিশেষে বলব, স্বামী যদি স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে ‘তুই জাহান্নামি’ বা ‘জান্নাত তোর জন্য হারাম’ কিংবা এ জাতীয় কথা বলে তাহলে তার এসব বদদুআ বা হারাম কথাবার্তার কারণে স্ত্রীর জীবনে কোনও প্রভাব ফেলবে না। কারণ আল্লাহই বান্দার শেষ পরিণতির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অধিকারী; কোনও মানুষ নয়। আল্লাহ কাকে ক্ষমা করবেন আর কাকে করবেন না-এটা একান্তই তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। কোনও মানুষ তা জানে না কার পরিণতি কী হবে। বরং এ কারণে স্বামী নিজেই গুনাহগার বলে সাব্যস্ত হবে। তবে স্ত্রীর উচিত, তার আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করা, সর্বোচ্চ ধৈর্যের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে পারিবারিক বিষয়গুলো সমাধান করার চেষ্টা করা এবং স্বামীর হেদায়েতের জন্য দুআ করা। নিশ্চয় আল্লাহ হেদায়েতের মালিক। আল্লাহু আলাম।

▬▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

শাবান মাসে নফল রোজা রাখার সুন্নতি নিয়ম এবং অর্ধ শাবানের পর রোজা রাখা বিধান

 প্রশ্ন: শাবান মাসে নফল রোজা রাখার সুন্নতি নিয়ম কী? অর্ধ শাবানের পর কি রোজা রাখা নিষিদ্ধ?

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি পুরো শাবান মাসটাই রোজা রাখতেন?
উত্তর: নিম্নে এ দুটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:

❑ ক. শাবান মাসে নফল রোজা রাখার সুন্নতি নিয়ম:

শাবান মাসে অধিক পরিমাণে নফল রোজা রাখা মোস্তাহাব। পুরো শাবান মাস রাখা ঠিক নয়। অর্থাৎ শাবান মাসকে রোজা রাখার মাধ্যমে রমজানের সাথে যুক্ত করা উনুচিত।

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আমল থেকে আমরা শাবান মাসে রোজা রাখার সুন্নতি পদ্ধতি পাই।

১. আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,

لَمْ يَكُنْ النَّبِيُّ -صلى الله عليه وسلم- يَصُومُ شَهْرًا أَكْثَرَ مِنْ شَعْبَانَ، فَإِنَّهُ كَانَ يَصُومُ شَعْبَانَ كُلَّهُ، وَكَانَ يَقُولُ: خُذُوا مِنْ الْعَمَلِ مَا تُطِيقُونَ فَإِنَّ اللَّهَ لا يَمَلُّ حَتَّى تَمَلُّوا، وَأَحَبُّ الصَّلاةِ إِلَى النَّبِيِّ -صلى الله عليه وسلم- مَا دُووِمَ عَلَيْهِ وَإِنْ قَلَّتْ، وَكَانَ إِذَا صَلَّى صَلاةً دَاوَمَ عَلَيْهَا

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসের চেয়ে অধিক রোজা আর কোনও মাসে রাখতেন না। তিনি (প্রায়) পুরো শাবান মাস রোজা রাখতেন। তিনি বলতেন, “তোমরা এমন আমল গ্রহণ করো যা তোমাদের সাধ্যের মধ্যে থাকে। কারণ আল্লাহ তাআলা বিরক্ত হন না যতক্ষণ না তোমরা বিরক্ত হও।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এমন নামাজই পছন্দনীয় যা নিয়মিতভাবে আদায় করা হয় যদিও তা স্বল্প হয়। তাঁর নিয়ম ছিল, যখন তিনি কোনও নামাজ পড়তেন নিয়মিতভাবে তা পড়তেন। [বুখারি, কিতাবুস্‌ সাওম। মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম]

২. আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,

كان رسول الله صلَّى الله عليه وسلَّم يصوم حتى نقولَ: لا يُفطر، ويُفطر حتى نقول: لا يَصوم، فما رأيتُ رسول الله صلَّى الله عليه وسلَّم استكملَ صِيامَ شهرٍ إلاَّ رمضان، وما رأيتُه أكثرَ صيامًا منه في شعبان

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন (নফল) রোজা রাখতে শুরু করতেন তখন আমরা বলতাম যে, তিনি রোজা রাখা আর বাদ দিবেন না। আবার যখন রোজা বাদ দিতেন তখন আমরা বলতাম যে, তিনি আর রোজা করবেন না। তবে তাঁকে রমজান ছাড়া পরিপূর্ণভাবে অন্য কোনও মাসে রোজা রাখতে দেখিনি এবং শাবান মাসের চেয়ে অন্য কোনও মাসে এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি।” [বুখারি, কিতাবুস্‌ সাওম। মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম]

❂ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি পূরো শাবান মাস ব্যাপী রোজা রাখতেন?

উপরোক্ত হাদিসে রয়েছে, মা জননী আয়েশা রা. বলেছেন, “তাঁকে রমজান ছাড়া পরিপূর্ণভাবে অন্য কোনও মাসে রোজা রাখতে দেখিনি।” এ হাদিসের সমার্থবোধক আরেকটি হাদিসে এসেছে,

فَإِنَّهُ كَانَ يَصُومُ شَعْبَانَ كُلَّهُ

“রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরো শাবান রোজা রাখতেন।” [সহিহ বুখারি]

এর ব্যাখ্যা মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, এ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, প্রায় পুরো মাস। অর্থাৎ আরবি ভাষায় সামান্য বাকি থাকলেও তাকে ‘সম্পূর্ণ’ হিসেবে উল্লেখ করার রীতি প্রসিদ্ধ। এ ব্যাখ্যাটিকে সমর্থন করে নিম্নোক্ত হাদিসটি:

বুখারি (১৯৭০) ও মুসলিম (১১৫৬) হাদিসে আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন,

انَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ شَعْبَانَ كُلَّهُ، يَصُومُ شَعْبَانَ إِلا قَلِيلا

“রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরো শাবান মাসই রোজা রাখতেন অল্প কিছু দিন ছাড়া।” (সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এই শব্দগুলো রয়েছে।)

ইমাম নওয়াবি রহ. বলেন, “আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর বক্তব্য ‘তিনি শাবান মাসে প্রায় পুরো মাসই রোজা রাখতেন’ এবং “তিনি শাবান মাসে অল্প কিছু দিন ছাড়া সব দিন রোজা রাখতেন”—এই দ্বিতীয় বক্তব্যটি প্রথম বক্তব্যের ব্যাখ্যা। এটি স্পষ্ট করে যে, ‘পুরো মাস’ বলতে তিনি মাসের বেশিরভাগ সময় বোঝাচ্ছেন।”

❑ প্রশ্ন: শাবান মাস অর্ধাংশ অতিবাহিত হওয়ার পর কি নফল রোজা রাখা নিষিদ্ধ?

উত্তর: আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

إِذَا انْتَصَفَ شَعْبَانُ فَلا تَصُومُو

“শাবান মাস অর্ধেক হয় গেলে তোমরা রোজা রাখিও না।” [মুসনাদ আহমদ (২/৪৪২), আবু দাউদ, অনুচ্ছেদে, এমনটি করা অর্থাৎ অবিচ্ছিন্নিভাবে শাবান ও রমজান দু মাস রোজা রাখা অনুচিত। শাইখ আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। দ্রষ্টব্য: সহিহ তিরমিজি, হা/৫৯০]

এ হাদিসের অর্থ হল, যে ব্যক্তি শাবান মাসের প্রথম থেকে রোজা রাখেনি সে যেন অর্ধ শাবানের পর আর রোজা শুরু না করে করে। তবে যে ব্যক্তি শাবান মাসের শুরু থেকে রোজা রেখেছে সে রাখতে পারে।

অনুরূপভাবে যার উপর গত বছরের রোজা কাজা আছে অথবা যার প্রতি সোম ও বৃহ:বার রোজা রাখা অভ্যাস সেও পনের তারিখের পর রাখতে পারে। যেমন হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

‏ لاَ تَقَدَّمُوا الشَّهْرَ بِيَوْمٍ وَلاَ بِيَوْمَيْنِ إِلاَّ أَنْ يُوَافِقَ ذَلِكَ صَوْمًا كَانَ يَصُومُهُ أَحَدُكُمْ

“রমজান মাস আগমনের একদিন বা দুই দিন পূর্ব থেকে তোমরা (নফল) সিয়াম পালন করবে না। হ্যাঁ, যদি বা তোমাদের কারো পূর্ব (অভ্যাস অনুসারে) সিয়াম পালনের দিনে পড়ে যায় তবে সে দিনের সিয়াম পালন করতে পার।” [বুখারি ও মুসলিম]

তাছাড়া পূর্বোল্লিখিত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায় পুরো শাবান মাস রোজা পালন করতেন।

উল্লেখ্য যে, “শাবান মাস অর্ধেক হয় গেলে তোমরা রোজা রাখিও না।” অনেক মুহাদ্দিস এ হাদিসটিকে জইফ (দুর্বল) বলেছেন। যেমন: আহমদ বিন হাম্বল ও ইবনে মাইন বলেন, মুনকার। আর জইফ বলেছেন, বাইহাকি, তাহাবি প্রমূখ-যেমনটি উল্লেখ করেছেন ইবনে হাজার তার ফাতহুল বারি গ্রন্থে।

কিন্তু সহিহ ধরা হলেও সকল হাদিস সামনে রাখলে উপরোক্ত ব্যাখ্যার আলোকে অর্ধ শাবানের পরও রোজা রাখা জায়েজ প্রমাণিত হয়। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

মাহরাম কাকে বলে এবং সৎ বাবা কি মাহরাম

 উত্তর: ইসলামে মাহরাম বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝায়,‌ যার সাথে চিরস্থায়ীভাবে বিবাহ হারাম বা নিষিদ্ধ।

ফকিহগণ বলেন,

المحرَم للمرأة هو : كل مَن تحرم عليه على التأبيد لقرابة أو رضاع أو مصاهرة

“একজন মহিলার জন্য মাহরাম হলো, প্রত্যেক
ঐ ব্যক্তি যার সাথে স্থায়ীভাবে বিবাহ হারাম (নিষিদ্ধ) রক্তের সম্পর্ক, দুধ সম্পর্ক বা বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে।”
উদাহরণ:
– রক্তের সম্পর্ক: বাবা, ছেলে, ভাই, চাচা, মামা ইত্যাদি।
– দুধ সম্পর্ক: দুধ ভাই, দুধ বাবা ইত্যাদি।
– বৈবাহিক সম্পর্ক: শ্বশুর, স্বামীর ছেলে (অন্য স্ত্রীর গর্ভজাত) ইত্যাদি।

এদের সাথে বিবাহ স্থায়ীভাবে হারাম।

🔸সৎ বাবা বলতে কী বোঝায়?

কোন মেয়ের জন্মদাতা পিতা যদি মারা যান বা তিনি তার মাকে তালাক দেন। অত:পর তার মা অন্য কোন পুরুষের সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন তাহলে মায়ের ২য় স্বামী হলো, ঐ মেয়ের সৎ বাবা।

🔸সৎ বাবার সাথে কখন বিয়ে নাজায়েজ আর কখন জায়েজ?

ক. মায়ের ২য় স্বামী (সৎ বাবা) মাহরাম হবে যদি তার মা এবং তার সৎ বাবা বিয়ের পর সহবাস করে বা তারা নির্জন ঘরে অবস্থান করে।
সুতরাং এ ক্ষেত্রে তাদের মাঝে কোন পর্দা রক্ষা করা আবশ্যক নয় এবং তার সাথে চিরকালের জন্য বিবাহ বন্ধন হারাম। (অর্থাৎ শরিয়তের দৃষ্টিতে তিনি তার জন্মদাতা পিতার অনুরূপ)

খ. কিন্তু সহবাস বা নির্জনে যাওয়ার পূর্বেই যদি সৎ বাবা কোন কারণে তার মাকে তালাক দিয়ে দেন অথবা তার মা মারা যান তাহলে সে ক্ষেত্রে এই মেয়ের সাথে উক্ত সৎ বাবার বিয়ে বৈধ।

এ মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَرَبَائِبُكُمُ اللَّاتِي فِي حُجُورِكُم مِّن نِّسَائِكُمُ اللَّاتِي دَخَلْتُم بِهِنَّ فَإِن لَّمْ تَكُونُوا دَخَلْتُم بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ

“এবং (আরও বিয়ে করা হারাম) তোমরা যাদের সাথে সহবাস করেছ সে স্ত্রীদের কন্যাদেরকে যারা তোমাদের লালন-পালনে আছে। তবে যদি তাদের সাথে সহবাস না করে থাক, তবে এ বিবাহে তোমাদের কোন গুনাহ নেই।” [সূরা নিসা: ২৩]

▪️ইমাম ইবনে কাসির রহ. বলেন,

أما أم المرأة فإنها تحرم بمجرد العقد على ابنتها ، سواء دخل بها أو لم يدخل . وأما الربيبة وهي بنت المرأة فلا تحرم بمجرد العقد على أمها حتى يدخل

“একজন মহিলার মা কেবল তার মেয়ের সঙ্গে আকদ (বিয়ে) সম্পন্ন হলেই হারাম হয়ে যায়, সে স্ত্রী সহবাস করুক বা না করুক। কিন্তু সৎকন্যা (স্ত্রীর পূর্বের স্বামী থেকে জন্ম নেওয়া মেয়ে) কেবল তার মায়ের সঙ্গে আকদের মাধ্যমে হারাম হয় না যতক্ষণ না দুখুল (প্রবেশ) হয় (অর্থাৎ তারা সহবাসে লিপ্ত হয় কিংবা বা দুজন একলা ঘরে অবস্থান করে।)”

▪️ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন,

جمهور السلف ذهبوا إلى أن الأم تحرم بالعقد على الابنة ، ولا تحرم الابنة إلا بالدخول بالأم ؛ وبهذا قول جميع أئمة الفتوى بالأمصار

“সালাফদের অধিকাংশের মতে, মায়ের হারাম হওয়া মেয়ের সঙ্গে কেবল আকদের মাধ্যমেই সংঘটিত হয়। কিন্তু মেয়ে (সৎকন্যা) হারাম হয় না যতক্ষণ না তার মায়ের সঙ্গে দুখুল (প্রবেশ) হয় (অর্থাৎ তারা সহবাসে লিপ্ত হয় কিংবা বা দুজন একলা ঘরে অবস্থান করে)। এটাই সমস্ত ফকিহগণের মত।”
الله أعلم
-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি

Translate