নিম্নোক্ত হাদিসটি আমাদের দেশে খুবই প্রসিদ্ধ:
যাহোক, নিম্নে এ হাদিসটির গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের অভিমত ও বিশ্লেষণ তুলে ধরা হল:
নিম্নোক্ত হাদিসটি আমাদের দেশে খুবই প্রসিদ্ধ:
যাহোক, নিম্নে এ হাদিসটির গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের অভিমত ও বিশ্লেষণ তুলে ধরা হল:
প্রশ্ন: সালাবা নামক এক সাহাবির কথা শুনা যায়, যিনি এক মহিলাকে গোসল রত অবস্থায় দেখেছিলেন। অতঃপর, তিনি গুনাহের ভয়ে কান্না করতে করতে পাহাড়ে চলে গিয়েছিলেন। এই কাহিনীটা কি সত্য?
উত্তর: সাহাবি সালাবা বিন আব্দুর রহমান আল আনসারি রা. কোনও এক গোসল রত নারীকে দেখে ফেলার কারণে কাঁদতে কাঁদতে পাহাড়ে চলে যাওয়া বিষয়ে একটি ঘটনা ফেসবুকে যথেষ্ট ভাইরাল। ঘটনার আগে-পরে জোড়-তালি লাগিয়ে এবং রং মাখিয়ে একেকজন একেকভাবে পোস্ট করছে। এ হাদিসটি মূলত: বর্ণিত হয়েছে, হিলয়াতুল আওয়ালিয়া [৯/৩২৯-৩৩১] এবং মারিফাতুস সাহাবা [১/৪৯৮] ইত্যাদি গ্রন্থে।
কিন্তু বাস্তবতা হল, বিজ্ঞ হাদিছ বিশারদগণের দৃষ্টিতে এটি موضوع বা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন ঘটনা। কারও মতে জইফ।
ইবনুল জাওযী রাহ. এ কাহিনীটিকে তার বিখ্যাত বানোয়াট হাদিস সংকলন আল মাউযুআত الموضوعات [৩/১২১] এবং সুয়ুতী রাহ. তার “আল লাআলি আল মাসনুয়া” اللآلئ المصنوعة في الأحاديث الموضوعة গ্রন্থে ‘বানোয়াট হাদিস’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মুহাদ্দিস ইবনে ইরাক আল কিনানি এটিকে জইফ/দুর্বল বলেছেন। [দ্রষ্টব্য: তানযিহুশ শরিয়াহ ২/২৮৩]
বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে যে সকল ভূমিকম্প দেখা যায়, নি:সন্দেহে তা আল্লাহর এক প্রকার নিদর্শন। তিনি এর মাধ্যমে বান্দাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করতে চান। যেমন: তিনি বলেন,
وَمَا نُرْسِلُ بِالْآيَاتِ إِلا تَخْوِيفًا
وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ
مَا أَصَابَكَ مِنْ حَسَنَةٍ فَمِنَ اللَّهِ وَمَا أَصَابَكَ مِنْ سَيِّئَةٍ فَمِنْ نَفْسِكَ
فَكُلًّا أَخَذْنَا بِذَنْبِهِ فَمِنْهُمْ مَنْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِ حَاصِبًا وَمِنْهُمْ مَنْ أَخَذَتْهُ الصَّيْحَةُ وَمِنْهُمْ مَنْ خَسَفْنَا بِهِ الْأَرْضَ وَمِنْهُمْ مَنْ أَغْرَقْنَا وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ
“শেষ পর্যন্ত প্রত্যেককে আমি তার অপকর্ম ও গুনাহের জন্য পাকড়াও করি। তারপর তাদের কারোর ওপর আমি পাথর বর্ষণকারী বাতাস প্রবাহিত করি এবং কাউকে একটি প্রচণ্ড বিস্ফোরণ আঘাত হানে। আবার কাউকে আমি ভূমিকম্পের মাধ্যমে ভূমি ধস দিয়ে ভূগর্ভে প্রোথিত করি এবং কাউকে (বন্যা-জলোচ্ছ্বাস-প্লাবন প্রভৃতির মাধ্যমে) পানিতে ডুবিয়ে দিই। আল্লাহ তাদের প্রতি জুলুমকারী ছিলেন না, কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করছিল। [আনকাবুত: ৪০]
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِنْ كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
“যদি জনপদসমূহের অধিবাসীরা ঈমান আনতো এবং তাকওয়া অবলম্বন করতো, তাহলে আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকত সমূহের দুয়ার খুলে দিতাম। কিন্তু তারা তো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কাজেই তারা যে অপকর্ম করে যাচ্ছিলো তার জন্য আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি।” [আরাফ: ৯৬]
ওমর বিন খাত্তাব রা.-এর যুগে মদিনায় ভূমিকম্প হলে তিনি মানুষকে ওয়াজ-নসিহত করেছিলেন। এতে তিনি বলেছিলেন,
প্রশ্ন: প্রথমে কন্যা সন্তান হওয়া বরকতের কারণ”-এ কথাটি কি সঠিক? ইসলামে কন্যা সন্তানের মর্যাদা কী?
উত্তর: কন্যা সন্তান অত্যন্ত ফজিলত পূর্ণ কিন্তু প্রথমে কন্যা সন্তান হওয়া বরকতের কারণ কথাটি ঠিক নয়। প্রথমে কন্যা সন্তান হওয়া বরকতের কারণ-এ মর্মে কিছু হাদিস পাওয়া যায় কিন্তু সেগুলো একটিও বিশুদ্ধ নয়। বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণ সেগুলোর কোন কোনটিকে জঈফ আর কোন কোনটিকে মউজু বা বানোয়াট হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। ইমাম সাখাবি তার মাকাসেদে হাসানাহ গ্রন্থে, সুয়ুতি কাশফুল খাফা গ্রন্থে এবং আলবানি সিলসিলা যঈফা গ্রন্থে এ সব জাল-জঈফ হাদিস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সুতরাং আমাদের কর্তব্য, হাদিস যাচায়-বাছায় করা ছাড়া সেগুলো প্রচার না করা। সাবধান!
❑ ইসলামে কন্যা সন্তানের মর্যাদা:
অনেক ভাইকে দেখা যায়, কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তারা বেজায় নাখোশ হন। তারা কি ভেবে দেখেছেন তাদের এ মনোভাব কাদের সঙ্গে মিলে যায়? কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তাতে রুষ্ট হওয়া মূলত জাহেলি চরিত্রের প্রকাশ, আল্লাহ তাআলা যার সমালোচনা করেছেন পবিত্র কুরআনে।
◈ আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِٱلۡأُنثَىٰ ظَلَّ وَجۡهُهُۥ مُسۡوَدّٗا وَهُوَ كَظِيمٞ – يَتَوَٰرَىٰ مِنَ ٱلۡقَوۡمِ مِن سُوٓءِ مَا بُشِّرَ بِهِۦٓۚ أَيُمۡسِكُهُۥ عَلَىٰ هُونٍ أَمۡ يَدُسُّهُۥ فِي ٱلتُّرَابِۗ أَلَا سَآءَ مَا يَحۡكُمُونَ
“আর যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়; তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায়। আর সে থাকে দুঃখ ভারাক্রান্ত। তাকে যে সংবাদ দেয়া হয়েছে, সে দুঃখে সে কওমের থেকে আত্মগোপন করে। অপমান সত্ত্বেও কি একে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে? জেনে রেখ, তারা যা ফয়সালা করে, তা কতই না মন্দ!” [সূরা নাহল: ৫৮-৫৯]। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যাদের বড় ভালোবাসতেন। মেয়েরা ছিল তাঁর আদরের দুলালী। আজীবন তিনি কন্যাদের ভালো বেসেছেন এবং কন্যা সন্তান প্রতিপালনে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
◈ আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«مَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ حَتَّى تَبْلُغَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنَا وَهُوَ وَضَمَّ أَصَابِعَهُ»
“যে ব্যক্তি সাবালক হওয়া পর্যন্ত দুটি কন্যার ভার বহন করবে কিয়ামতের দিন আমি আর সে আবির্ভূত হব। একথা বলে তিনি তার হাতের দুই আঙ্গুল একসঙ্গে করে দেখান।” [মুসলিম: ৬৪৬৮]
◈ আয়েশা সিদ্দিকা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
جَاءَتْنِى امْرَأَةٌ وَمَعَهَا ابْنَتَانِ لَهَا فَسَأَلَتْنِى فَلَمْ تَجِدْ عِنْدِى شَيْئًا غَيْرَ تَمْرَةٍ وَاحِدَةٍ فَأَعْطَيْتُهَا إِيَّاهَا فَأَخَذَتْهَا فَقَسَمَتْهَا بَيْنَ ابْنَتَيْهَا وَلَمْ تَأْكُلْ مِنْهَا شَيْئًا ثُمَّ قَامَتْ فَخَرَجَتْ وَابْنَتَاهَا فَدَخَلَ عَلَىَّ النَّبِىُّ -صلى الله عليه وسلم- فَحَدَّثْتُهُ حَدِيثَهَا فَقَالَ النَّبِىُّ -صلى الله عليه وسلم: «مَنِ ابْتُلِىَ مِنَ الْبَنَاتِ بِشَىْءٍ فَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ كُنَّ لَهُ سِتْرًا مِنَ النَّارِ»
“আমার কাছে এক মহিলা এলো। তার সঙ্গে তার দুই মেয়ে। আমার কাছে সে কিছু প্রার্থনা করল। সে আমার কাছে একটি খেজুর ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না। আমি তাকে সেটি দিয়ে দিলাম। সে তা গ্রহণ করল এবং তা দুই টুকরো করে তার দুই মেয়ের মাঝে বণ্টন করে দিল। তা থেকে সে কিছুই খেল না। তারপর সে ও তার মেয়ে দুটি উঠে পড়ল এবং চলে গেল। ইত্যবসরে আমার কাছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন। আমি তাঁর কাছে ওই মহিলার কথা বললাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “যাকে কন্যা দিয়ে কোনও কিছুর মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয় আর সে তাদের প্রতি যথাযথ আচরণ করে, তবে তা তার জন্য আগুন থেকে রক্ষাকারী হবে।” [মুসলিম: ৬৮৬২]
কন্যা সন্তান প্রতিপালনে শুধু পিতাকেই নয়; ভাইকেও উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। বোনের কথাও বলা হয়েছে হাদিসে। যেসব ভাই মনে করেন, মেয়ে বা বোনের পেছনে টাকা খরচ করলে ভবিষ্যতের তার কোনও প্রাপ্তি নেই তারা আসলে ভুলের মধ্যে আছেন।
◈ আবু সাঈদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«لَا يَكُونُ لِأَحَدٍ ثَلَاثُ بَنَاتٍ، أَوْ ثَلَاثُ أَخَوَاتٍ، أَوْ ابْنَتَانِ، أَوْ أُخْتَانِ، فَيَتَّقِي اللهَ فِيهِنَّ وَيُحْسِنُ إِلَيْهِنَّ إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَ»
“কারও যদি তিনটি মেয়ে কিংবা বোন থাকে অথবা দুটি মেয়ে বা বোন থাকে আর সে তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে এবং তাদের সঙ্গে সদাচার করে, তবে সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে।” [মুসনাদ আহমদ: ১১৪০৪; বুখারি, আদাবুল মুফরাদ: ৭৯]
◈ আবু সাঈদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَنْ كَانَ لَهُ ثَلاَثُ بَنَاتٍ أَوْ ثَلاَثُ أَخَوَاتٍ أَوِ ابْنَتَانِ أَوْ أُخْتَانِ فَأَحْسَنَ صُحْبَتَهُمْ ، وَصَبَرَ عَلَيْهِنَّ وَاتَّقَى اللَّهَ فِيهِنَّ دَخَلَ الْجَنَّةَ.»
“যার তিন মেয়ে অথবা তিনটি বোন কিংবা দুটি মেয়ে বা দুটি বোন রয়েছে, সে তাদের সঙ্গে সদাচার করে এবং তাদের (বিবিধ সমস্যায়) ধৈর্য ধারণ করে আর তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে, সে জান্নাতে যাবে।” [মুসনাদ হুমাইদি: ৭৭২]
কন্যা সন্তান প্রতিপালনে যাতে বৈষম্য না করা হয়, বস্তুবাদী ব্যক্তিরা যাতে হীনমন্যতায় না ভোগেন, তাই তাদের কন্যা প্রতিপালনে ধৈর্য ধরার উপদেশ দেয়া হয়েছে। শোনানো হয়েছে পরকালে বিশাল প্রাপ্তির সংবাদ।
◈ আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَنْ كَانَتْ لَهُ ثَلاثُ بَنَاتٍ فَصَبَرَ عَلَى لأْوَائِهِنَّ، وَعَلَى ضَرَّائِهِنَّ دَخَلَ الْجَنَّةَ، زَادَ فِي رِوَايَةِ مُحَمَّدِ بْنِ يُونُسَ: فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَاثْنَتَيْنِ ؟ قَالَ: وَاثْنَتَيْنِ، قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَوَاحِدَةً؟ قَالَ: وَوَاحِدَةً»
“যার তিনটি কন্যাসন্তান থাকবে এবং সে তাদের কষ্ট-যাতনায় ধৈর্য ধরবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (মুহাম্মদ ইবনে ইউনুসের বর্ণনায় এ হাদিসে অতিরিক্ত অংশ হিসেবে এসেছে) একব্যক্তি প্রশ্ন করলো, হে আল্লাহর রাসূল, যদি দু জন হয়? উত্তরে তিনি বললেন, দু জন হলেও। লোকটি আবার প্রশ্ন করলো, যদি একজন হয় হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, একজন হলেও।” [বাইহাকি, শুয়াবুল ঈমান : ৮৩১১]
◈ আউফ বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَنْ كَانَ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ يُنْفِقُ عَلَيْهِنَّ حَتَّى يَبِنَّ أَوْ يَمُتْنَ كُنَّ لَهُ حِجَابًا مِنَ النَّارِ»
“যার তিনটি মেয়ে রয়েছে, যাদের ওপর সে অর্থ খরচ করে বিয়ে দেওয়া বা মৃত্যু পর্যন্ত, তবে তারা তার জন্য আগুন থেকে মুক্তির কারণ হবে।” [বাইহাকি, শুয়াবুল ঈমান: ৮৩১২]
◈ আউফ বিন মালেক আশজায়ী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«مَا مِنْ عَبْدٍ يَكُونُ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ فَيُنْفِقُ عَلَيْهِنَّ حَتَّى يَبِنَّ أَوْ يَمُتْنَ إِلَّا كُنَّ لَهُ حِجَابًا مِنَ النَّارِ» فَقَالَتِ امْرَأَةٌ: يَا رَسُولَ اللهِ، وَاثْنَتَانِ ؟ قَالَ: «وَاثْنَتَانِ»
“যে বান্দার তিনটি মেয়ে রয়েছে, যাদের ওপর সে অর্থ খরচ করে বিয়ে দেওয়া অথবা মৃত্যু পর্যন্ত, তবে তারা তার জন্য আগুন থেকে মুক্তির কারণ হবে। তখন এক মহিলা বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আর দুই মেয়ে? তিনি বললেন, “দুই মেয়েও”।”[বায়হাকি, শুয়াবুল ঈমান: ৮৩১৩]
◈ আবু আম্মার আউফ বিন মালেক রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«أَنَا وَامْرَأَةٌ سَفْعَاءُ الْخَدَّيْنِ كَهَاتَيْنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ” وَجَمَعَ بَيْنَ أُصْبُعَيْهِ السَّبَّابَةِ وَالْوُسْطَى ” امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ آمَتْ مِنْ زَوْجِهَا، حَبَسَتْ نَفْسَهَا عَلَى أَيْتَامِهَا حَتَّى بَانُوا أَوْ مَاتُوا »
“আমি এবং গাল মলিন কারী মহিলা কিয়ামতের দিন এভাবে উঠবো।” এ কথা বলে তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুল একত্রিত করে দেখান। (আর গাল মলিন কারী হলেন) “ওই মহিলা যিনি সুন্দরী ও সুবংশীয়া, তার স্বামী মারা গিয়েছেন। তথাপি তিনি তার এতিম সন্তানদের জন্য তাদের বিয়ে বা মরণ পর্যন্ত নিজেকে (কারো সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া থেকে) বিরত রেখেছেন”। [মুসনাদ আহমদ : ২৪০৫২; আবু দাউদ : ৫১৫১; বুখারি, আদাবুল মুফরাদ: ৫১৪৯]
[যেসব মহিলা স্বামী মারা যাবার পর এতিম সন্তানদের পেছনেই জীবন কাটিয়ে দেন, তারা সাধারণত নিজের সৌন্দর্য চর্চার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করার অবকাশ পান না। তাদের ওপর দিয়ে বরং অনেক ঝক্কি-ঝামেলা যায় বলে চেহারার স্বাভাবিক লাবণ্য বজায় থাকে না। “গাল মলিন কারী” বলে সেদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। ]
◈ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَكُونُ لَهُ ابْنَتَانِ فَيُحْسِنُ إِلَيْهِمَا مَا صَحِبَهُمَا وَصَحِبَتَاهُ إِلَّا أَدْخَلَتَاهُ الْجَنَّةَ»
“যে কোনও মুসলিমের দুটি মেয়ে থাকবে আর সে তাদের সঙ্গে সদাচার করতে যতদিন সে তাদের সঙ্গে থাকবে এবং তারা যতদিন তার সঙ্গে থাকবে, তবে তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।” [বাইহাকি, শুয়াবুল ঈমান: ৮৩১৪; মুসনাদে আবী ইয়ালা: ২৫৭১, সহিহ ইবনে মাজাহ: ২৯৭৫]
◈ মুহাম্মদ ইবনে মুনকাদির থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“«مَنْ كَانَتْ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ أَوْ أَخَوَاتٍ فَكَفَّهُنَّ وَأَوَاهُنَّ وَرَحِمَهُنَّ دَخَلَ الْجَنَّةَ “، قَالُوا: أَوِ اثْنَتَانِ ؟ قَالَ: ” أَوِ اثْنَتَانِ “، قَالَ: حَتَّى ظَنَنَّا أَنَّهُمْ لَوْ قَالُوا: أَوْ وَاحِدَةً قَالَ: أَوْ وَاحِدَةً »
“যার তিন তিনটি কন্যা অথবা বোন আছে আর সে তাদের থেকে অনিষ্ট থেকে রক্ষা করে, তাদের আশ্রয় দেয় এবং তাদের ওপর দয়া করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”। সাহাবীরা বললেন, আর দু জন? তিনি বললেন, দু জনও। বর্ণনাকারী বলেন, এমনকি আমরা মনে করলাম যদি তারা বলতেন, আর একজন? তবে তিনি বলতেন, আর একজনও।” [বাইহাকী, শুয়াবুল ঈমান: ৮৩১৫]
◈ উকবা বিন আমর জুহানি রা. থেকে বর্ণিত, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,
“«مَنْ كَانَ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ فَصَبَرَ عَلَيْهِنَّ، فَأَطْعَمَهُنَّ وَسَقَاهُنَّ وَكَسَاهُنَّ كُنَّ لَهُ حِجَابًا مِنَ النَّار»
“যার তিনটি কন্যা সন্তান থাকে আর সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধরে, তাদেরকে খাওয়ায়, পান করায় এবং তাদের পোশাকের ব্যবস্থা করে, তবে সে কন্যারা তার জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হবে।” [বাইহাকী, শুয়াবুল ঈমান: ৮৩১৭; মুসনাদ আহমদ: ১৭৪০৩; আবী ইয়া”লা, মুসনাদ: ১৭৬৪]
মনে রাখতে হবে, আজ যে অবিবেচক পিতা কন্যা সন্তান দেখে রাগান্বিত হচ্ছেন, কন্যার মাকে যাচ্ছে তাই গালমন্দ করছেন, কাল তিনি এর জন্য আফসোস করতে পারেন। ছেলেদের অবাধ্যতায় অতিষ্ঠ এ পিতাকে এ মেয়েই একদিন আমোদিত ও সার্থক পিতা বানাতে পারে। আমরা ভুলে যাই স্থূল দৃষ্টিতে অনেক কিছু মন্দ মনে হলেও অনেক সময় তা মঙ্গল বয়ে আনে। এ দিকে ইঙ্গিত করেই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَإِن كَرِهۡتُمُوهُنَّ فَعَسَىٰٓ أَن تَكۡرَهُواْ شَيۡٔٗا وَيَجۡعَلَ ٱللَّهُ فِيهِ خَيۡرٗا كَثِيرٗا
প্রশ্ন: আমার আপুর স্বামী আর শাশুড়ি খারাপ মানুষ হওয়ায় ছয় মাস আগে ডিভোর্স হয়। চলতি মাসে আমারও ডিভোর্স হয়। কারণ আমার মধ্যে শুচিবায়ু রোগ থাকায় তারা আমাকে ‘পাগল’ বলে আখ্যা দেয়! এখন লোকজন আমাকে অনেক খারাপ ও নিচুমানের কথাবার্তা বলছে। দু বোনের জন্য মা-বাবাও অসুস্থ হয়ে গেছে। আমার প্রশ্ন হলো, আল্লাহ কি আছেন? আল্লাহ থাকলে সাহায্য করছেন না কেন? বিয়ে যদি আল্লাহর হুকুমে হয় তাহলে বিয়ে ভঙ্গ হওয়াটা আল্লাহ আটকাতে পারেননি কেন? আমাদেরতো কেউ বিয়ে করবে না। এখন কী করবো? সমাজের কেউ কথা বলছে না। আপনজনরা অনেক অপমান করছে। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করছেন না কেন?
উত্তর: আমরা আপনাদের দুই ডিভোর্সি বোনের জন্য অনেক অনেক সমবেদনা জানাচ্ছি এবং দুআ করছি, তিনি যেন আপনাদেরকে ধৈর্য ধারণের তাওফিক দেন ও কল্যাণের উপরে মৃত্যু অবধি প্রতিষ্ঠিত রাখেন। আমিন।
অতঃপর আপনাদের বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটেছে এ জন্য ‘আল্লাহ আছেন কিনা’ এমন সংশয় প্রকাশ করা কি কোন ইমানদারের জন্য শোভনীয়? পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার বিয়ে বিচ্ছেদ হচ্ছে। অতীতেও হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে। এসবের পেছনে অবশ্যই কিছু কারণ থাকে। সেজন্য কি আল্লাহকে দোষারোপ করা যায়?
▪️ মানুষের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহর বাণী:
মানুষকে আল্লাহ কত চমৎকার দেহবায়ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন! অতঃপর তাকে খাদ্য-পানীয় ও আলো-বাতাস ও অসংখ্য-অগণিত নেয়ামত দ্বারা প্রতিপালন করেছেন। তাঁর অবাধ্যতা করার পরেও তিনি বান্দার অসংখ্য পাপাচার ক্ষমা করে দেন এবং তাকে দয়া ও মমতা দিয়ে পরিবেষ্টন করে রাখেন। তারপরেও মানুষ নিজেদের কৃতকর্মকে আল্লাহর দোষ হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়! এর থেকে বড় অকৃতজ্ঞতা ও ধৃষ্টতা আর কী হতে পারে?
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَأَمَّا ٱلۡإِنسَٰنُ إِذَا مَا ٱبۡتَلَىٰهُ رَبُّهُۥ فَأَكۡرَمَهُۥ وَنَعَّمَهُۥ فَيَقُولُ رَبِّيٓ أَكۡرَمَنِ وَأَمَّآ إِذَا مَا ٱبۡتَلَىٰهُ فَقَدَرَ عَلَيۡهِ رِزۡقَهُۥ فَيَقُولُ رَبِّيٓ أَهَٰنَنِ
“মানুষ তো এরূপ যে, তার রব যখন তাকে পরীক্ষা করেন এবং সম্মান ও অনুগ্রহ দান করে তখন সে বলে, ‘আমার রব আমাকে সম্মানিত করেছেন। আর যখন তাকে পরীক্ষা করেন এবং তার রিজিক সংকুচিত করেন তখন সে বলে, ‘আমার রব আমাকে হীন করেছেন!” [সূরা আল ফজর: ১৫ ও ১৬]
তিনি আরো বলেন,
إِنَّ ٱلۡإِنسَٰنَ خُلِقَ هَلُوعًا- إِذَا مَسَّهُ ٱلشَّرُّ جَزُوعٗا – وَإِذَا مَسَّهُ ٱلۡخَيۡرُ مَنُوعًا
“নিশ্চয় মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অতিশয় অস্থিরচিত্তরূপে। যখন বিপদ তাকে স্পর্শ করে সে হয় হা-হুতাশকারী। আর যখন কল্যাণ তাকে স্পর্শ করে সে হয় অতি কৃপণ।” [সূরা মাআরিজ ১৯, ২০, ২১]
▪️এখন করণীয়:
মনে রাখতে হবে, বিয়ে করা যেমন আল্লাহর হুকুম তেমনি উভয় পক্ষের মিলমিশ না হলে ডিভোর্স দেওয়াও আল্লাহর বিধান। সুতরাং কেউ যদি আল্লাহর বিধান মেনে শরিয়তসম্মত কারণে ডিভোর্স দেয় তাহলে তো কোন সমস্যা নেই। কিন্তু যদি জুলুম করে তবে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই জালিমের বিচার করবেন। নিশ্চয়ই তিনি সব চেয়ে বড় ন্যায়বিচারক। আপনাদের পূর্ব স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য জীবন থাকলে হয়তোবা আপনাদের জীবনের জন্য আরও বড় ক্ষতির কারণ হতো। আপনারা আরও বড় ফিতনায় পতিত হতেন। সে কারণে আল্লাহ আপনাদেরকে সেখান থেকে রক্ষা করেছেন এবং আপনাদের জন্য যা কল্যাণকর তিনি তাই করবেন ইনশাআল্লাহ। প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহর পরিকল্পনা সম্পর্কে আমরা কেউই অবহিত নই।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
“আর তোমাদের কাছে হয়তো কোন একটা বিষয় পছন্দসই নয় অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয়তোবা কোন একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর। বস্তুতঃ আল্লাহই জানেন, তোমরা জান না। [সূরা বাকারা: ২১৬]
ভুলে গেলে চলবে না যে, মানব জীবনের ভালো-মন্দ সব কিছু আল্লাহর তকদিরের ভিত্তিতে সংঘটিত হয়-এর উপরে বিশ্বাস করা ঈমানের ছয়টি রোকন বা স্তম্ভের একটি। সুতরাং আল্লাহর ফায়সালার উপর বিশ্বাস রাখা এবং তাতে একজন মুক্তিকামী মুসলিমের জন্য আবশ্যক। তাই আপনাদের দুঃখজনক এই পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করুন। ধৈর্যের মধ্যেই মানুষের জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
বিপদে ধৈর্য হারাবেন না, হতাশ হবেন না, সাহস হারাবেন না। মুমিন কখনো হতাশ হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تَا۟یۡـَٔسُوا۟ مِن رَّوۡحِ ٱللَّهِۖ إِنَّهُۥ لَا یَا۟یۡـَٔسُ مِن رَّوۡحِ ٱللَّهِ إِلَّا ٱلۡقَوۡمُ ٱلۡكَـٰفِرُونَ
“এবং আল্লাহর রহমত হতে তোমরা নিরাশ হয়ো না। কারণ আল্লাহর রহমত হতে কেউই নিরাশ হয় না, কাফির সম্প্রদায় ছাড়া। [সূরা ইউসুফ: ৮৬]
ইমানদার ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য হলো, সে সর্বাবস্থায় আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকে এবং তাঁর প্রতি আরো বেশি মনোযোগী হয় এবং নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে। এ ভাবে সে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এগিয়ে যায়। আল্লাহ তৌফিক দান করুন। আমিন।