Monday, October 23, 2023

ইসলামের দৃষ্টিতে শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্বামীর পরিবারের সেবার বিধান

 ইসলামের দৃষ্টিতে শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্বামীর পরিবারের সেবার বিধান এবং সকল পরিবারের প্রতি বিশেষ বার্তা

প্রশ্ন: ইসলামের দৃষ্টিতে স্ত্রীর জন্য কি শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা বাধ্যতামূলক?

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: ইসলামের দৃষ্টিতে স্ত্রী তার স্বামীর মা, বাবা, ভাই-বোন ইত্যাদির কারও সেবা করতে বাধ্য নয়। তবে শ্বশুর-শাশুড়ি এবং তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সেবা করা একদিকে যেমন স্বামীর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ অন্যদিকে নেকির কাজ তাতে কোন সন্দেহ নাই। কোন স্ত্রী যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তার শ্বশুর-শাশুড়ি বা তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের খেদমত করে তবে আল্লাহ তাকে আখিরাতে পুরষ্কার প্রদান করবেন ইনশাআল্লাহ। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে যে যত বেশি মানুষের উপকার করবে সে তত বেশি উত্তম। বিশেষ করে যখন রোগ-ব্যাধি, শারীরিক অক্ষমতা, বয়োঃবৃদ্ধ হওয়া ইত্যাদি কারণে শশুর-শাশুড়ির প্রতি যত্ন নেওয়ার বিশেষ প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন কারণে মানুষ একে অন্যের সেবা বা সহযোগিতার মুখাপেক্ষী হয়।

এক্ষেত্রে স্বামীদেরও উচিত,‌ আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় তার শ্বশুর-শাশুড়িদের প্রতি যথাসম্ভব সুদৃষ্টি রাখা এবং প্রয়োজন দেখা দিলে যথাসম্ভব তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা। এতে তিনিও আল্লাহর কাছে পুরস্কৃত হবেন ইনশাআল্লাহ।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللهِ تَعَالَى أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ وَأَحَبُّ الأَعْمَالِ إِلَى اللهِ تَعَالَى سُرُورٌ تُدْخِلُهُ عَلَى مُسْلِمٍ أَوْ تَكَشِفُ عَنْهُ كُرْبَةً أَوْ تَقْضِي عَنْهُ دَيْنًا أَوْ تَطْرُدُ عَنْهُ جُوعًا, وَلأَنْ أَمْشِيَ مَعَ أَخِ فِي حَاجَةٍ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَعْتَكِفَ فِي هٰذَا الْمَسْجِدِ – يَعْنِي مَسْجِدَ الْمَدِينَةِ – شَهْرًا وَمَنَ كَفَّ غَضَبَهُ سَتَرَ اللهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ كَظَمَ غَيْظَهُ وَلَوْ شَاءَ أَنْ يُمْضِيَهُ أَمْضَاهُ مَلأَ اللهُ قَلْبَهُ رَجَاءً يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَنْ مَشَى مَعَ أَخِيهِ فِي حَاجَةٍ حَتّٰـى يُثْبِتَهَا لَهُ أَثْبَتَ اللهُ قَدَمَهُ يَوْمَ تَزُولُ الأَقْدَامِ وَإِنَّ سُوَّء الْخُلُقِ لَيُفْسِدُ الْعَمَلَ كَمَا يُفْسِدُ الْخَلّ الْعَسَل

“আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হল সে ব্যক্তি যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল হল, একজন মুসলিমের অন্তরে আনন্দ প্রবেশ করানো অথবা তার দুখ-কষ্ট লাঘব করা, অথবা তার পক্ষ থেকে তার ঋণ পরিশোধ করা ও তার ক্ষুধা নিবারণ করা। আর আমার এই মসজিদে (মদিনার মসজিদে নববীতে) একমাস ব্যাপী ইতিকাফ করার থেকে আমার একজন ভাইয়ের কোনও প্রয়োজন মেটানোর জন্য তার সাথে গমন করা আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়। যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সংবরণ করবে আল্লাহ তার দোষ-ত্রুটি গোপন করবেন। যে ব্যক্তি ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করবে অথচ সে ইচ্ছা করলে তা প্রয়োগ করতে পারত, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার অন্তরকে সন্তুষ্ট করবেন। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য তার সাথে গমন করবে এবং তা পূরণ করে দেবে, আল্লাহ সেদিন তার পদযুগলকে সুদৃঢ় রাখবেন, যে দিন মানুষের পাগুলো পিছলে যাবে। আর মন্দ চরিত্র আমলকে নষ্ট করে যেমন সিরকা (ভিনেগার) মধুকে নষ্ট করে দেয়।” [সহিহ তারগিব, হা/২০৯০, সিলসিলা সহীহা, হা/৯০৬, সহীহুল জামে, হা/১৭৬]
◆ আমাদের সমাজে শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করাকে একজন নারীর প্রশংসনীয় দিক বিবেচনা করা হয়। তাই সামাজিক এই সুন্দর রীতিটি বজায় রাখার ব্যাপারে আমাদের সচেষ্ট হওয়া উচিৎ।

◆ তাছাড়া এটাও মনে রাখা দরকার যে, একজন মহিলার জীবনেও একদিন এমন সময় আসতে পারে যখন তার পুত্রবধূর সেবার প্রয়োজন দেখা দিবে। তাই সে যদি এখন সন্তুষ্ট চিত্তে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তার শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করে তবে সে যখন শাশুড়ি হবে তখন আশা করা যায়, তার পুত্রবধূরা তার সেবা করবে।

❑ সৌদি আরবের ফতোয়া বোর্ডকে শাশুড়িকে সহায়তা করার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তারা বলেন,

ليس في الشرع ما يدل على إلزام الزوجة أن تساعد أم الزوج ، إلا في حدود المعروف ، وقدر الطاقة ؛ إحساناً لعشرة زوجها ، وبرّاً بما يجب عليه بره

“শরিয়তে এমন কিছু নেই যা নির্দেশ করে যে, স্ত্রী স্বামীর মাকে সাহায্য করতে বাধ্য। তবে স্বামীর প্রতি ইহসান এবং তার প্রতি অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্যপরায়ণতার স্বার্থে যতটুকু সামাজিকতার সীমার মধ্যে পড়ে সেটা ভিন্ন কথা।” [ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ, ১৯/২৬৪ ও ২৬৫]

❑ আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ. কে প্রশ্ন করা হয়, স্ত্রীর উপর কি স্বামীর মা’র কোনও হক আছে?

তিনি উত্তরে বলেন,

لا ، أم الزوج ليس لها حق واجب على الزوجة بالنسبة للخدمة ؛ لكن لها حق مِن المعروف ، والإحسان ، وهذا مما يجلب مودة الزوج لزوجته ، أن تراعي أمه في مصالحها ، وتخدمها في الأمر اليسير ، وأن تزورها من حين لآخر ، وأن تستشيرها في بعض الأمور ، وأما وجوب الخدمة : فلا تجب ؛ لأن المعاشرة بالمعروف تكون بين الزوج والزوجة .

“না, খেদমতের ব্যাপারে স্ত্রীর ওপর স্বামীর মায়ের কোনও হক নেই সামাজিকতা ও ইহসানের হক ছাড়া। এ জিনিসটা স্ত্রীর প্রতি স্বামীর প্রেম-ভালোবাসা সৃষ্টি যে, সে তার মায়ের প্রতি যত্ন নেয়, সাধারণ ছোটখাটো বিষয়ে সেবা করে, সময়ে সময়ে তার সাথে দেখা করে এবং তার বিভিন্ন বিষয়ে তার নিকট পরামর্শ নেয়। কিন্তু খেদমত আবশ্যক হওয়ার ব্যাপারে কথা হল, তা আবশ্যক নয়। কারণ সততা ও কল্যাণের সাথে দাম্পত্য জীবন হবে কেবল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে।” [লিকাআতুল বাবিল মাফতুহ, পৃষ্ঠা নং ৬৮, প্রশ্ন নং ১৪]

❂❂ আমাদের সামাজিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে পরিবারগুলোর প্রতি বিশেষ বার্তা:

যদি পুত্রবধূ তার শ্বশুর-শাশুড়ির এতটুকু সেবা করে বা কোনোভাবে তার উপকার করে তাহলে তাদের কর্তব্য, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করা এবং তার কাজের মূল্যায়ন করা। স্বামীর কর্তব্য, স্ত্রীর এ কাজের জন্য কৃতজ্ঞতা আদায়ের পাশাপাশি তার প্রশংসা করা এবং তার প্রতি আরও বেশি আন্তরিকতা, যত্ন, সম্মান ও ভালোবাসা বৃদ্ধি করা। মাঝে মধ্যে এ জন্য তাকে আলাদা উপহার দেওয়াও ভালো। এতে সে খুশি হবে এবং আরও বেশি সেবা দিতে উৎসাহ বোধ হবে। স্বামীদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

مَنْ لَم يَشْكُرِ اَلناسَ لَمْ يَشْكُرِ اللهِ

“যে ব্যক্তি (উপকারী) মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করল না, সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করল না।” [আহমদ, হ/১১২৮০, তিরমিযী ১৯৫৫-সহিহ]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

تَهَادُوا تَحَابُّوا

“তোমরা উপহার বিনিময় কর তাহলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে।’’ [বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/ ৫৯৪, সহীহুল জামে’, হা/ ৩০০৪]

কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, আমাদের সমাজে শ্বশুর-শাশুড়ি সহ পরিবারের সকল সদস্যের প্রতি পুত্রবধূর পক্ষ থেকে সেবা পাওয়াকে ‘অধিকার’ মনে করা হয়। যার কারণে তার এহেন ত্যাগ ও সেবাকে যথার্থ মূল্যায়ন তো করা হয়ই না বরং তার কাজে সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি হলে তার সাথে নানা অপমান সুলভ আচরণ করা হয়, তার প্রতি নানাভাবে জুলুম-অত্যাচার করা হয় ও কষ্ট দেওয়া হয়। যা সামাজিক ভাবে যেমন অমানবিক আচরণ তেমনি শরিয়তের দৃষ্টিতেও হারাম।

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

«الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يَخْذُلُهُ وَلَا يَحْقِرُهُ التَّقْوَى هَهُنَا» . وَيُشِير إِلَى صَدره ثَلَاث مرار بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ: دَمُهُ ومالهُ وَعرضه

“এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। কোনও মুসলিম অপর মুসলিমের ওপর অবিচার করবে না, তাকে অপদস্থ করবে না এবং অবজ্ঞা করবে না। আল্লাহ ভীতি এখানে! এ কথা বলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের বুকের দিকে তিনবার ইঙ্গিত করে বললেন, একজন মানুষের জন্য এতটুকু অন্যায়ই যথেষ্ট যে, সে নিজের মুসলিম ভাইকে হেয় জ্ঞান করবে। এক মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের রক্ত, ধন-সম্পদ ও মান-সম্মান হারাম।” [সহিহ মুসলিম]

❖ শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি অহংকার করা বা তাদের প্রতি কষ্ট দায়ক আচরণ করা হারাম:

এর বিপরীতেও আমাদের সমাজে আরেকটি কষ্ট দায়ক চিত্র দেখা যায়। তাহলো, কতিপয় মহিলা শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-যোগ্যতা, সৌন্দর্য বা বাবার বাড়ির অর্থ-সম্পদ বা বংশগত গৌরবের কারণে তার শ্বশুর-শাশুড়ি বা স্বামীর পরিবারকে অবজ্ঞা করে, তাদেরকে নানাভাবে অপমান সুলভ কথা বলে ও কষ্ট দেয়। এটিও হারাম।
অনুরূপভাবে অনেক স্বামীও তার শশুর-শাশুড়ির সাথে অসদাচরণ করে বা তাদেরকে অপমান-অপদস্থ করে। এটিও হারাম।

সর্বাবস্থায় শ্বশুর-শাশুড়ি সম্মান ও শ্রদ্ধা পাওয়া হকদার। কেননা তারা বয়সে বড়। আর বয়োঃবৃদ্ধ, মুরুব্বি বা বড়দেরকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করা ইসলামি শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

ﻟَﻴْﺲَ ﻣِﻨَّﺎ ﻣَﻦْ ﻟَﻢْ ﻳَﺮْﺣَﻢْ ﺻَﻐِﻴﺮَﻧَﺎ ﻭَﻳُﻮَﻗِّﺮْ ﻛَﺒِﻴﺮَﻧَﺎ

“যে ছোটদেরকে দয়া এবং বড়দেরকে শ্রদ্ধা করেনা সে আমাদের দলভুক্ত নয়।“ [তিরমিযী, সহিহুল জামে, হা/৫৪৪৫]

সুতরাং প্রতিটি মহিলার জন্য তার শ্বশুর-শাশুড়ি ও তার স্বামীর পরিবারের বড়দের প্রতি যথার্থ সম্মান-শ্রদ্ধা করা এবং ছোটদের প্রতি দয়া ও স্নেহশীল আচরণ করা আবশ্যক। কোন অবস্থায় কাউকে হেয় বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, অহংকার প্রদর্শন, অসম্মান জনক আচরণ করা বা কষ্ট দেওয়া জায়েজ নেই। নারী-পুরুষ সকলের জন্য একই কথা প্রযোজ্য।

▪️প্রশ্ন: পুত্র সন্তানকে জীবিকা অর্জনের জন্য বাইরে থাকতে হয়। কন্যা সন্তানও বিয়ের পরে শ্বশুর বাড়ি চলে যায়। এ অবস্থায় পুত্রবধূও যদি শ্বশুর-শাশুড়িকে দেখাশুনা না করে তাহলে বৃদ্ধ মানুষগুলোকে কে দেখাশুনা করবে?
উত্তর:
আল্লাহ তাআলা পিতামাতার সেবা করাকে তার সন্তানদের জন্য অপরিহার্য করেছেন; পুত্রবধূর জন্য নয়। সুতরাং স্বামী পিতামাতার সেবা এবং তার জীবন-জীবিকার মধ্যে সমন্বয় সাধন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে যদি তিনি তার এ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে না পারেন তাহলে এ ক্ষেত্রে একজন ভালো মনের দ্বীনদার স্ত্রী তার স্বামীর অবস্থা বিবেচনা করে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এবং স্বামীকে সহায়তার স্বার্থে তার শ্বশুর-শাশুড়ির যথাসাধ্য সেবা দিবে। এতে আল্লাহ তাকে পুরস্কৃত করবেন ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান ও বুঝ দান করুন এবং তাঁর নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনার তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি পুত্রবধূ ও জামাইদের দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং শ্বশুর-শাশুড়িকে খুশি করার ১০ উপায়

নিম্নে শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি পুত্রবধূ এবং জামাইদের কর্তব্য সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো:

১. শ্বশুর-শাশুড়ি অত্যন্ত সম্মান এবং শ্রদ্ধার পাত্র। সুতরাং চাই স্বামী হোক বা স্ত্রী হোক-সকলের কর্তব্য, তাদের শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি যথার্থ সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে আচরণ করা। কারণ তারা বয়সে বড় বা বয়স্ক মুরুব্বি। আর হাদিসে বয়সে বড় ও মুরব্বিদেরকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করার নির্দেশ এসেছে। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

ﻟَﻴْﺲَ ﻣِﻨَّﺎ ﻣَﻦْ ﻟَﻢْ ﻳَﺮْﺣَﻢْ ﺻَﻐِﻴﺮَﻧَﺎ ﻭَﻳُﻮَﻗِّﺮْ ﻛَﺒِﻴﺮَﻧَﺎ

“যে ছোটদেরকে দয়া এবং বড়দেরকে শ্রদ্ধা করে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়।“ [তিরমিযী, সহিহুল জামে, হা/৫৪৪৫]।
যে পিতা-মাতার মাধ্যমে আপনি আপনার জীবন সঙ্গী অথবা সঙ্গিনীকে পেয়েছেন তাদেরকে ভালোবাসা এবং সম্মান ও শ্রদ্ধা করার মাধ্যমে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করা হয়।
২. স্ত্রী যেভাবে স্বামীর পিতা-মাতাকে সম্মান-শ্রদ্ধা করে স্বামীরও কর্তব্য, স্ত্রীর পিতা-মাতাকে সম্মান এবং শ্রদ্ধা করা। এটি স্ত্রীর প্রতিও ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার শামিল।
৩. বয়সে বড় বা বয়োবৃদ্ধ-মুরব্বিদের সাথে উত্তম আচরণ করা একজন মুসলিমের উন্নত চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। এর বিপরীতটা হল, নিতান্তই অসৎ চরিত্রের প্রমাণ।

৪. প্রতিটি মানুষের উচিৎ, তাদের শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে নরম ও সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা। তাদের সাথে কর্কশ, কষ্টদায়ক ও অশালীন বাক্য সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য।
৫. আপনার কোন কথা বা আচরণে তারা কষ্ট পেলে তাদের নিকট ক্ষমা চাওয়া জরুরি। ক্ষমা চাওয়া ও ক্ষমা করা উভয়টি মানুষের মহত্ত্বের লক্ষণ।
৬. তারা কোনোভাবে কষ্ট দিলে সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া কর্তব্য। কারণ বয়োবৃদ্ধ অবস্থায় রোগ-ব্যাধি, ঘুম সমস্যা, জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে মানুষের ধৈর্য শক্তি হ্রাস পায় এবং মন-মানসিকতা কিছুটা খিটমিটে হয়ে যায়। তাই এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখা উচিৎ।
৭. বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, হৃদ্‌রোগ, স্মৃতি ভ্রম, ক্যানসার ইত্যাদি রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই ছেলেমেয়েদের পাশাপাশি পুত্রবধূ বা জামাইদের উচিত, যথাসাধ্য তাদের শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

৮. বার্ধক্যে মানুষের রুচির পরিবর্তন ঘটে, দেখা দেয় হজমের সমস্যা। খাদ্য গ্রহণে অনীহা হয়। তাই তাদের রুচির প্রতি খেয়াল রেখে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার-দাবারের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখা কর্তব্য।
৯. বয়স বাড়তে থাকলে মানুষের ঘুমের অসুবিধা দেখা দেয়। ঘুম কম হয় বা রাতে ঘুম আসে না। তাই তাদের আরাম দায়ক ঘুমের দিকটি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

১০. তাদের পোশাক-আশাক, বিছানা, ঘর, ঘরের আসবাব-পত্র ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুন্দরভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখা উচিত।

১১. তাদের একাকীত্ব কাটাতে তাদের সঙ্গ দেওয়া এবং তাদের পাশে বসে কিছু সময় দ্বীন ও দুনিয়াবি বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা বলা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

১২. প্রয়োজন দেখা দিলে তাদের ওজু, গোসল ও ইবাদত-বন্দেগিতে সাহায্য করা কর্তব্য।
১৩. শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে জোরপূর্বক যৌতুক বা বিভিন্ন ধরনের উপহার-উপঢৌকন দাবি করা এবং তার না পেলে তাদের প্রতি অসদাচরণ করা শুধু হীন চরিত্রের পরিচায়ক নয় বরং তা প্রচলিত আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ এবং শরিয়তে দৃষ্টিতে হারাম।
১৪. কোন জামাই কিংবা পুত্রবধূর জন্য তার শ্বশুর-শাশুড়ির উপরে অহংকার প্রকাশ করা বা তাদেরকে কোনোভাবে খাটো করা জায়েজ নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-গরিমা, বংশগত আভিজাত্য ও মর্যাদা ইত্যাদি কারণে অনেক পুত্রবধূ বা জামাই তাদের শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি উপরে অহংকার ও দাম্ভিকতা সুলভ আচরণ করে এবং নানাভাবে তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করে। যা কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

১৫. সর্বোপরি তারা যদি আর্থিক, শারীরিক, মানসিক বা সামাজিক ইত্যাদি কোন ভাবে অশান্তি বা কষ্টে থাকে তাহলে তা লাঘব করার চেষ্টা করা এবং তাদেরকে খুশি রাখার চেষ্টা করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ।

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللهِ تَعَالَى أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ وَأَحَبُّ الأَعْمَالِ إِلَى اللهِ تَعَالَى سُرُورٌ تُدْخِلُهُ عَلَى مُسْلِمٍ أَوْ تَكَشِفُ عَنْهُ كُرْبَةً أَوْ تَقْضِي عَنْهُ دَيْنًا أَوْ تَطْرُدُ عَنْهُ جُوعًا, وَلأَنْ أَمْشِيَ مَعَ أَخِ فِي حَاجَةٍ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَعْتَكِفَ فِي هٰذَا الْمَسْجِدِ – يَعْنِي مَسْجِدَ الْمَدِينَةِ – شَهْرًا وَمَنَ كَفَّ غَضَبَهُ سَتَرَ اللهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ كَظَمَ غَيْظَهُ وَلَوْ شَاءَ أَنْ يُمْضِيَهُ أَمْضَاهُ مَلأَ اللهُ قَلْبَهُ رَجَاءً يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَنْ مَشَى مَعَ أَخِيهِ فِي حَاجَةٍ حَتّٰـى يُثْبِتَهَا لَهُ أَثْبَتَ اللهُ قَدَمَهُ يَوْمَ تَزُولُ الأَقْدَامِ وَإِنَّ سُوَّء الْخُلُقِ لَيُفْسِدُ الْعَمَلَ كَمَا يُفْسِدُ الْخَلّ الْعَسَل

“আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হল সে ব্যক্তি যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল হল, একজন মুসলিমের অন্তরে আনন্দ প্রবেশ করানো অথবা তার দুখ-কষ্ট লাঘব করা, অথবা তার পক্ষ থেকে তার ঋণ পরিশোধ করা ও তার ক্ষুধা নিবারণ করা।
আর আমার এই মসজিদে (মদিনার মসজিদে নববীতে) একমাস ব্যাপী ইতিকাফ করার থেকে আমার একজন ভাইয়ের কোনও প্রয়োজন মেটানোর জন্য তার সাথে গমন করা আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়। যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সংবরণ করবে আল্লাহ তার দোষ-ত্রুটি গোপন করবেন। যে ব্যক্তি ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করবে অথচ সে ইচ্ছা করলে তা প্রয়োগ করতে পারত, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার অন্তরকে সন্তুষ্ট করবেন। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য তার সাথে গমন করবে এবং তা পূরণ করে দেবে, আল্লাহ সেদিন তার পদযুগলকে সুদৃঢ় রাখবেন, যে দিন মানুষের পাগুলো পিছলে যাবে। আর মন্দ চরিত্র আমলকে নষ্ট করে যেমন সিরকা (ভিনেগার) মধুকে নষ্ট করে দেয়।” [সহিহ তারগিব, হা/২০৯০, সিলসিলা সহীহা, হা/৯০৬, সহীহুল জামে, হা/১৭৬]

১৬. এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, আজ যদি কেউ শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে খারাপ ব্যবহার করে তাহলে সম্ভাবনা আছে, এর বদলা হিসেবে সে যদি ভবিষ্যতে শ্বশুর-শাশুড়ি হয় তাহলে তার জামাই/পুত্রবধূর পক্ষ থেকে খারাপ আচরণের শিকার হবে। যেমনটি বলা হয়,
كَمَا تَدِينُ تُدَانُ ، وَكَمَا تَزرَعُ تَحصُدُ
“যেমন কর্ম করবে তেমন ফল পাবে, যেমন চাষ করবে তেমন ফসল পাবে।” [ইকতিযাউল ইলমিল আমাল-খতিব বাগদাদি, পৃষ্ঠা নং ৯৮]
▪️বিশেষ দ্রষ্টব্য, ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তানদের জন্য পিতা-মাতার সেবা-শুশ্রূষা, অর্থ খরচ করা ও দেখভাল করা ফরজ। কিন্তু পুত্রবধূ বা জামাইয়ের জন্য তা ফরজ না হলেও অত্যন্ত নেকির কাজ। ‌তাই তাদের কর্তব্য, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যথাসাধ্য শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা ও সাহায্য-সহযোগিতা করার মাধ্যমে অবারিত নেকি অর্জনের চেষ্টা করা।
আর শ্বশুর-শাশুড়ির কর্তব্য, যদি তাদের পুত্রবধূ বা জামাই তাদেরকে কোনভাবে সাহায্য-সহযোগিতা ও উপকার করে তাহলে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। কারণ যে মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করে না সে আল্লাহরও কৃতজ্ঞতা আদায় করে না।
আল্লাহ তাআলা তওফিক দান করুন। আমিন।

🔸শ্বশুর-শাশুড়িকে খুশি করার ১০ উপায়:

প্রশ্ন: শ্বশুর-শ্বশুর-শাশুড়ির মন খুশি রাখতে কী করণীয়?
উত্তর:
১. মনে রাখা কর্তব্য যে, মানুষের সাথে সুন্দর আচরণ, নরম ভাষায় কথা বলা, ধৈর্যের সাথে সেবা ও সহযোগিতা করা, রাগ নিয়ন্ত্রণ করা, খারাপ আচরণের জবাব খারাপ আচরণের মাধ্যমে না দেওয়া-এগুলো হল, মানুষের মন জয় করার স্বীকৃত মূলমন্ত্র।
সুতরাং আপনি যদি আপনার শ্বশুর-শাশুড়িকে খুশি রাখতে চান তাহলে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এ সকল গুণ ও আচরণ প্র্যাকটিস করুন। এতে আপনি তাদের প্রিয় হয়ে উঠবেন।

২. তাদের পক্ষ থেকে খারাপ আচরণের সম্মুখীন হলে প্রতিশোধ পরায়ণ না হয়ে সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দিবেন এবং আল্লাহর নিকট তাদের হেদায়েতের জন্য দুআ করবেন।
৩. দূরে থাকলে তাদের সাথে নিয়মিত ফোনে যোগাযোগ রাখুন এবং খোঁজ-খবর নিন।
৪. বিভিন্ন বিষয়ে তার থেকে পরামর্শ নিন এবং বিশেষ ক্ষেত্রে তাদেরকে পরামর্শ দিন।
৫. তাদের সামনে অথবা তাদের অনুপস্থিতে তাদের জন্য আল্লাহর নিকট দুআ করুন।
৬. সম্ভব হলে, তাদেরকে অর্থিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করার পাশাপাশি কিছু উপহার দিন। উপহার মানুষের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
৭. তাদের প্রশংসনীয় দিকগুলো তুলে ধরে তাদের প্রশংসা করুন।
৮. তারা আপনার কোনও উপকার করলে কৃতজ্ঞতা আদায় করুন।
৯. তাদের সুখে সুখী হোন এবং তাদের দুঃখে দুঃখী হন।
১০. মাঝেমধ্যে কিছু সময়ের জন্যে হলেও তাদের নিকট সময় কাটানো এবং তাদের সেবা-যত্ন করুন। এতে আল্লাহ আপনার উপর সন্তুষ্ট হবেন এবং আখিরাতে এর উত্তম বিনিময় দান করবেন। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব। 

Friday, October 20, 2023

হযরত শোয়াইব আঃ এর জীবনী

 হযরত শোআয়েব (আ:)১৩. হযরত শো‘আয়েব (আলাইহিসসালাম)সূচীপত্রহযরত শো‘আয়েব (আঃ)-এরদাওয়াতকওমে শো‘আয়েব-এর ধর্মীয় ও সামাজিকঅবস্থা এবং দাওয়াতের সারমর্মশো‘আয়েব (আঃ)-এরদাওয়াতের ফলশ্রুতিশিক্ষণীয় বিষয় সমূহআহলেমাদইয়ানের উপরে আপতিত গযবের বিবরণ।আল্লাহরগযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রধান ৬টি প্রাচীন জাতিরমধ্যেপঞ্চম জাতি হ’ল ‘আহলে মাদইয়ান’। ‘মাদইয়ান’হ’ল লূত সাগরের নিকটবর্তী সিরিয়া ও হিজাযেরসীমান্তবর্তী একটি জনপদের নাম। যা অদ্যাবধিপূর্ব জর্ডনের সামুদ্রিক বন্দর ‘মো‘আন’ ( ﻣﻌﺎﻥ )-এরঅদূরে বিদ্যমান রয়েছে। কুফরী করা ছাড়াও এইজনপদের লোকেরা ব্যবসায়ের ওযন ও মাপেকম দিত, রাহাজানি ও লুটপাট করত। অন্যায়পথেজনগণের মাল-সম্পদ ভক্ষণ করত।[1] ইয়াকূত হামাভী(মৃঃ ৬২৬/১২২৮খৃঃ) বলেন, ইবরাহীম-পুত্র মাদইয়ানেরনামে জনপদটি পরিচিত হয়েছে।[2] হযরতশো‘আয়েব(আঃ) এদের প্রতি প্রেরিতহয়েছিলেন। ইনি হযরত মূসা (আঃ)-এর শ্বশুর ছিলেন।কওমে লূত-এর ধ্বংসের অনতিকাল পরে কওমেমাদইয়ানের প্রতি তিনি প্রেরিত হন (হূদ ১১/৮৯)।চমৎকার বাগ্মিতার কারণে তিনি ( ﺧﻄﻴﺐ ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ )‘খাত্বীবুল আম্বিয়া’ (নবীগণের মধ্যে সেরাবাগ্মী) নামে খ্যাত ছিলেন।[3] আহলে মাদইয়ান-কে পবিত্র কুরআনে কোথাও কোথাও ‘আছহাবুলআইকাহ’ ( ﺍﺻﺤﺎﺏ ﺍﻷﻳﻜﺔ ) বলা হয়েছে। যার অর্থ‘জঙ্গলের বাসিন্দাগণ’। এটা বলার কারণ এই যে, এইঅবাধ্য জনগোষ্ঠী প্রচন্ড গরমে অতিষ্ট হয়েনিজেদের বসতি ছেড়ে জঙ্গলেআশ্রয় নিলেআল্লাহ তাদেরকে সেখানেই ধ্বংস করে দেন।এটাও বলা হয় যে, উক্ত জঙ্গলে ‘আইকা’ ( ﺍﻷﻳﻜﺔ )বলে একটা গাছকে তারা পূজা করত। যার আশপাশেজঙ্গল বেষ্টিত ছিল।মাদইয়ান ( ﻣﺪﻳﻦ ) ছিলেন হাজেরাওসারাহর মৃত্যুর পরে হযরত ইবরাহীমের আরববংশোদ্ভূত কেন‘আনী স্ত্রী ক্বানতূরাবিনতেইয়াক্বত্বিন ( ﻗﻨﻄﻮﺭﺍ ﺑﻨﺖ ﻳﻘﻄﻦ ) -এর ৬টি পুত্রসন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র।[4]উল্লেখ্য যে,হযরত শো‘আয়েব (আঃ) সম্পর্কে পবিত্রকুরআনের ১০টি সূরায় ৫৩টি আয়াতে বর্ণিতহয়েছে।[5]হযরত শো‘আয়েব (আঃ)-এর দাওয়াত:ধ্বংসপ্রাপ্ত বিগত কওমগুলোর বড় বড় কিছু অন্যায়কর্ম ছিল। যার জন্য বিশেষভাবে সেখানে নবীপ্রেরিত হয়েছিলেন। শো‘আয়েব-এরকওমেরওতেমনি মারাত্মক কয়েকটি অন্যায় কর্ম ছিল, যেজন্যখাছ করে তাদের মধ্য থেকে তাদের নিকটেশো‘আয়েব (আঃ)-কে প্রেরণ করা হয়। তিনি তাঁরকওমকে যে দাওয়াত দেন, তার মধ্যেইবিষয়গুলোর উল্লেখ রয়েছে। যেমন আল্লাহবলেন, ﻭَﺇِﻟَﻰ ﻣَﺪْﻳَﻦَ ﺃَﺧَﺎﻫُﻢْ ﺷُﻌَﻴْﺒﺎً ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺍﻋْﺒُﺪُﻭﺍﺍﻟﻠﻪَ ﻣَﺎ ﻟَﻜُﻢ ﻣِّﻦْ ﺇِﻟَـﻪٍ ﻏَﻴْﺮُﻩُ ﻗَﺪْ ﺟَﺎﺀﺗْﻜُﻢ ﺑَﻴِّﻨَﺔٌ ﻣِّﻦ ﺭَّﺑِّﻜُﻢْﻓَﺄَﻭْﻓُﻮﺍ ﺍﻟْﻜَﻴْﻞَ ﻭَﺍﻟْﻤِﻴﺰَﺍﻥَ ﻭَﻻَ ﺗَﺒْﺨَﺴُﻮﺍ ﺍﻟﻨَّﺎﺱَ ﺃَﺷْﻴَﺎﺀﻫُﻢْ ﻭَﻻَﺗُﻔْﺴِﺪُﻭﺍ ﻓِﻲ ﺍﻷَﺭْﺽِ ﺑَﻌْﺪَ ﺇِﺻْﻼَﺣِﻬَﺎ ﺫَﻟِﻜُﻢْ ﺧَﻴْﺮٌ ﻟَّﻜُﻢْ ﺇِﻥ ﻛُﻨﺘُﻢﻣُّﺆْﻣِﻨِﻴﻦَ- ﻭَﻻَ ﺗَﻘْﻌُﺪُﻭﺍ ﺑِﻜُﻞِّ ﺻِﺮَﺍﻁٍ ﺗُﻮﻋِﺪُﻭﻥَ ﻭَﺗَﺼُﺪُّﻭﻥَ ﻋَﻦﺳَﺒِﻴﻞِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻣَﻦْ ﺁﻣَﻦَ ﺑِﻬِﻮَﺗَﺒْﻐُﻮﻧَﻬَﺎ ﻋِﻮَﺟﺎً ﻭَﺍﺫْﻛُﺮُﻭﺍ ﺇِﺫْ ﻛُﻨﺘُﻢْﻗَﻠِﻴﻼً ﻓَﻜَﺜَّﺮَﻛُﻢْ ﻭَﺍﻧﻈُﺮُﻭﺍ ﻛَﻴْﻒَ ﻛَﺎﻥَ ﻋَﺎﻗِﺒَﺔُ ﺍﻟْﻤُﻔْﺴِﺪِﻳﻦَ – ﻭَﺇِﻥْﻛَﺎﻥَ ﻃَﺂﺋِﻔَﺔٌ ﻣِّﻨﻜُﻢْ ﺁﻣَﻨُﻮﺍ ﺑِﺎﻟَّﺬِﻱ ﺃُﺭْﺳِﻠْﺖُ ﺑِﻪِ ﻭَﻃَﺂﺋِﻔَﺔٌ ﻟَّﻢْﻳْﺆْﻣِﻨُﻮﺍ ﻓَﺎﺻْﺒِﺮُﻭﺍ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﺤْﻜُﻢَ ﺍﻟﻠﻪُ ﺑَﻴْﻨَﻨَﺎ ﻭَﻫُﻮَ ﺧَﻴْﺮُﺍﻟْﺤَﺎﻛِﻤِﻴﻦَ – ‏(ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ৮৫-৮৭)-‘আমি মাদইয়ানের প্রতিতাদের ভাই শো‘আয়েবকে প্রেরণ করেছিলাম।সে তাদের বলল, হে আমারসম্প্রদায়! তোমরাআল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদেরকোন উপাস্য নেই। তোমাদের কাছেতোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে সুস্পষ্টপ্রমাণ এসে গেছে। অতএবতোমরা মাপ ও ওযনপূর্ণ কর। মানুষকে তাদের মালামাল কম দিয়োনা।ভূপৃষ্ঠে সংস্কার সাধনের পরতোমরা সেখানেঅনর্থ সৃষ্টি করো না। এটাই তোমাদের জন্যকল্যাণকর, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও’। ‘তোমরাপথে-ঘাটে এ কারণে বসে থেকো না যে,ঈমানদারদের হুমকি দেবে, আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টিকরবে ও তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করবে। স্মরণকর, যখন তোমরা সংখ্যায় অল্প ছিলে, অতঃপরআল্লাহ তোমাদেরকে আধিক্য দান করেছেন এবংলক্ষ্য কর কিরূপ অশুভ পরিণতি হয়েছেঅনর্থকারীদের’। ‘আর যদি তোমাদের একদল ঐবিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে যা নিয়ে আমিপ্রেরিত হয়েছি এবং আরেক দল বিশ্বাস স্থাপন নাকরে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর যে পর্যন্ত নাআল্লাহ আমাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেন।কেননা তিনিই শ্রেষ্ঠ ফায়ছালাকারী’ (আ‘রাফ৭/৮৫-৮৭)।কওমে শো‘আয়েব-এর ধর্মীয় ওসামাজিক অবস্থা এবং দাওয়াতের সারমর্ম:উপরোক্তআয়াত সমূহে নিম্নোক্ত বিষয়গুলি প্রতীয়মান হয়।প্রথমতঃ তারা আল্লাহর হক ও বান্দার হক দু’টিই নষ্টকরেছিল। আল্লাহর হক হিসাবে তারা বিশ্বাসেরজগতে আল্লাহকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির পূজায় লিপ্তহয়েছিল কিংবা আল্লাহর সঙ্গে অন্যকে শরীককরেছিল। তারা আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে দিয়েছিল।দুনিয়াবী ধনৈশ্বর্যে ও বিলাস-ব্যসনে ডুবে গিয়েতারা আল্লাহরসত্তা ও গুণাবলী এবং তাঁর হক সম্পর্কেগাফেল হয়ে গিয়েছিল। সেই সাথে নিজেদেরপাপিষ্ঠ জীবনের মুক্তির জন্য বিভিন্ন সৃষ্টবস্ত্তকে শরীক সাব্যস্ত করে তাদের অসীলায়মুক্তি কামনাকরত। এভাবে তারা আল্লাহ ও তাঁর গযবেরব্যাপারে নিঃশংক হয়ে গিয়েছিল। সেকারণ সকলনবীর ন্যায় শো‘আয়েব (আঃ) সর্বপ্রথমআক্বীদা সংশোধনের জন্য ‘তাওহীদেইবাদত’-এর আহবান জানান। যাতে তারা সবদিক থেকে মুখফিরিয়ে স্রেফ আল্লাহর ইবাদত করে এবং সকলব্যাপারে স্রেফ আল্লাহর ও তাঁর নবীর আনুগত্যকরে। তিনি নিজের নবুঅতের প্রমাণ স্বরূপতাদেরকে মু‘জেযা প্রদর্শন করেন।যা স্বয়ংপ্রতিপালকের পক্ষ হ’তে ‘সুস্পষ্ট প্রমাণ’ রূপেতাঁরনিকটে আগমন করে।দ্বিতীয়তঃ তারা মাপ ওওযনে কম দিয়ে বান্দার হক নষ্ট করত। সেদিকেইঙ্গিত করে শো‘আয়েব (আঃ) বলেন, ‘তোমরামাপ ও ওযন পূর্ণ কর এবং মানুষের দ্রব্যাদিতে কমদিয়ে তাদের ক্ষতি করো না’ (আ‘রাফ ৭/৮৫)।আয়াতের প্রথমাংশে খাছভাবে মাপ ও ওযন পূর্ণ করারনির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং শেষাংশে সর্বপ্রকারহকে ত্রুটি করাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সে হকমানুষের ধন-সম্পদ, ইযযত-আবরূ বা যেকোনবস্ত্তর সাথে সম্পর্কযুক্ত হৌক না কেন। বস্ত্ততঃদ্রব্যাদির মাপ ও ওযনেকম দেওয়া যেমন মহাঅপরাধ, তেমনিকারু ইযযত-আবরূ নষ্ট করা, কারুপদমর্যাদা অনুযায়ী তাকে সম্মান না করা, যাদেরআনুগত্য করা যরূরী তাদের আনুগত্যে ত্রুটি করাঅথবা যাকে সম্মান করা ওয়াজিব তার সম্মানে ত্রুটিকরাইত্যাদি সবই এ অপরাধের অন্তর্ভুক্ত, যাশো‘আয়েব (আঃ)-এরসম্প্রদায় করত। সে সমাজেমানীরমান ছিল না বা গুণীর কদর ছিল না।তৃতীয়তঃ বলাহয়েছে, ‘তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করোনা, সেখানে সংস্কার সাধিত হওয়ার পর’ (আ‘রাফ ৭/৮৫)।অর্থাৎ আল্লাহ পৃথিবীকে যেভাবেআভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সবদিক দিয়ে সুন্দর ওসামঞ্জস্যশীল করে সৃষ্টি করেছেন, তোমরাতাতে ব্যত্যয় ঘটিয়ো না এবং কোনরূপ অনর্থ সৃষ্টিকরো না।চতুর্থতঃ তোমরা মানুষকে ভীতিপ্রদর্শন ও আল্লাহর পথে বাধা দানের উদ্দেশ্যেপথে-ঘাটে ওঁৎ পেতে থেকো না (আ‘রাফ৭/৮৬)। এর দ্বারা মাদইয়ান বাসীদের আরেকটিমারাত্মক দোষের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যে,তারা রাস্তার মোড়ে চৌকি বসিয়ে লোকদের কাছথেকে অবৈধভাবে চাঁদাআদায় করত ও লুটপাট করত।সাথে সাথে তারা লোকদেরকে শো‘আয়েব(আঃ)-এর উপরে ঈমান আনতে নিষেধ করতও ভয়-ভীতি প্রদর্শন করত। তারা সর্বদা আল্লাহর পথেবক্রতার সন্ধান করত’ (আ‘রাফ ৭/৮৬) এবং কোথাওঅঙ্গুলি রাখার জায়গা পেলে আপত্তি ও সন্দেহেরঝড় তুলে মানুষকে সত্যধর্ম হ’তে বিমুখ করারচেষ্টায় থাকত।মাদইয়ানবাসীদের আরেকটি দুষ্কর্মছিল যে, তারা প্রচলিত স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রারপার্শ্বহ’তে সোনা ও রূপার কিছু অংশ কেটেরেখে সেগুলো বাজারে চালিয়ে দিত।শো‘আয়েব (আঃ) তাদেরকে একাজ থেকেনিষেধ করেন।[6]পঞ্চমতঃ তাদের অকৃতজ্ঞতারবিষয়ে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলাহয়েছে যে, ‘স্মরণকর তোমরা যখন সংখ্যায় কম ছিলে, অতঃপর আল্লাহতোমাদের বংশবৃদ্ধি করে তোমাদেরকে একটিবিরাট জাতিতে পরিণত করেছেন’ (আ‘রাফ ৭/৮৬)।তোমরা ধন-সম্পদে হীন ছিলে, অতঃপরআল্লাহতোমাদের প্রাচুর্য দান করেছেন। অথচ তোমরাআল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ না হয়ে নানাবিধ শিরক ওকুফরীতে লিপ্ত হয়েছ। অতএব তোমরা সাবধানহও এবং তোমাদের পূর্ববর্তী কওমে নূহ, ‘আদ,ছামূদ ও কওমে লূত-এর ধ্বংসলীলার কথা স্মরণ কর(আ‘রাফ ৭/৮৬)। তাদের মর্মান্তিক পরিণাম ওঅকল্পনীয় গযবের কথা মনে রেখে হিসাব-নিকাশকরে পা বাড়াও।ষষ্ঠতঃ মাদইয়ানবাসীদের উত্থাপিতএকটি সন্দেহের জবাব দেওয়া হয়েছে। তারা বলতযে, ঈমানদারগণ যদি ভাল ও সৎ হয়, আর আমরা কাফিররাযদি মন্দ ও পাপী হই, তাহ’লে আমাদের উভয়দলের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা একরূপ কেন?কাফিররা অপরাধী হ’লে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের শাস্তিদিতেন। এর উত্তরে নবী বলেন, ﻓَﺎﺻْﺒِﺮُﻭﺍ ﺣَﺘَّﻰﻳَﺤْﻜُﻢَ ﺍﻟﻠﻪُ ﺑَﻴْﻨَﻨَﺎ ﻭَﻫُﻮَ ﺧَﻴْﺮُ ﺍﻟْﺤَﺎﻛِﻤِﻴﻦَ ، ‘অপেক্ষা করযতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের মাঝে ফায়ছালা করেনবস্ত্ততঃ তিনিই শ্রেষ্ঠ ফায়সালাকারী’ (আ‘রাফ ৭/৮৭)।অর্থাৎ আললাহ স্বীয় সহনশীলতা ও কৃপাগুণেপাপীদের অবকাশ দিয়ে থাকেন। অতঃপর তারা যখনচূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যায়, তখন সত্য ও মিথ্যার ফায়ছালানেমে আসে। তোমাদের অবস্থাও তদ্রূপ হবে।অবিশ্বাসী ও পাপীদের উপরে আল্লাহর চূড়ান্তগযব সত্বর নাযিল হয়ে যাবে। একই ধরনেরবক্তব্য উল্লেখিত হয়েছে সূরা হূদে (১১/৮৪-৮৬আয়াতে)।হযরত শো‘আয়েব (আঃ) একথাও বলেনযে,‘(আমার এ দাওয়াতের জন্য) আমি তোমাদেরকাছে কোন প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদানবিশ্বপালনকর্তাই দেবেন’ (শু‘আরা ২৬/১৮০)। তিনিবললেন, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর ও শেষদিবসের আশা রাখ। তোমরা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টিকরো না’ (আনকাবূত ২৯/৩৬)।শো‘আয়েব (আঃ)-এরদাওয়াতের ফলশ্রুতি :হযরত শো‘আয়েব (আঃ)-এরনিঃস্বার্থ ও আন্তরিকতাপূর্ণ দাওয়াত তাঁর উদ্ধতকওমের নেতাদের হৃদয়ে রেখাপাত করল না।তারাবরং আরও উদ্ধত হয়ে তাঁর দরদ ভরা সুললিত বয়ান ওঅপূর্ব চিত্তহারী বাগ্মীতার জবাবে পূর্ববর্তীধ্বংসপ্রাপ্ত কওমের পাপিষ্ঠ নেতাদের ন্যায়নবীকে প্রত্যাখ্যান করল এবং ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ওতাচ্ছিল্য করেবলল, ﺃَﺻَﻼَﺗُﻚَ ﺗَﺄْﻣُﺮُﻙَ ﺃَﻥْ ﻧَﺘْﺮُﻙَ ﻣَﺎ ﻳَﻌْﺒُﺪُﺁﺑَﺎﺅُﻧَﺎ ﺃَﻭْ ﺃَﻥْ ﻧَﻔْﻌَﻞَ ﻓِﻲ ﺃَﻣْﻮَﺍﻟِﻨَﺎﻣَﺎ ﻧَﺸَﺂﺀ ﺇِﻧَّﻚَ ﻟَﺄَﻧﺖَ ﺍﻟْﺤَﻠِﻴﻢُﺍﻟﺮَّﺷِﻴﺪُ – ‘তোমার ছালাত কি তোমাকে একথা শিখায়যে, আমরা আমাদের ঐসব উপাস্যের পূজা ছেড়েদিই, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা যুগ যুগ ধরে যেসবের পূজা করে আসছে? আর আমাদের ধন-সম্পদে ইচ্ছামত আমরা যা কিছু করে থাকি, তা পরিত্যাগকরি? তুমি তো একজন সহনশীল ও সৎ ব্যক্তি’ (হূদ১১/৮৭)। অর্থাৎ তুমি একজন জ্ঞানী, দূরদর্শী ওসাধু ব্যক্তি হয়ে একথা কিভাবে বলতে পার যে,আমরা আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসাদেব-দেবীর পূজা ও শেরেকী প্রথা সমূহপরিত্যাগ করি এবং আমাদের আয়-উপাদানে ও রূযী-রোজগারে ইচ্ছামত চলা ছেড়ে দেই। আয়-ব্যয়ে কোন্টা হালাল কোন্টাহারাম তা তোমার কাছথেকে জেনে নিয়ে কাজ করতে হবে এটা কিকখনো সম্ভব হ’তে পারে? তাদের ধারণা মতেতাদের সকল কাজ চোখ বুঁজে সমর্থন করা ওতাতে বরকতের জন্য দো‘আ করাই হ’ল সৎ ও ভালমানুষদের কাজ। ঐসব কাজে শিরক ও তাওহীদ, হারামও হালালের প্রশ্ন তোলা কোন ধার্মিক (?) ব্যক্তিরকাজ নয়।দ্বিতীয়তঃ তারা ইবাদাত ও মু‘আমালাতকেপরস্পরের প্রভাবমুক্ত ভেবেছিল। ইবাদতকবুলের জন্য যে রূযী হালাল হওয়া যরূরী, একথাতাদের বুঝে আসেনি। সেজন্য তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে হালাল-হারামের বিধান মানতে রাযী ছিল না।যদিও ছালাত আদায়ে কোন আপত্তি তাদের ছিল না।কেননা দেব-দেবীর পূজা সত্ত্বেও সৃষ্টিকর্তাহিসাবে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও স্বীকৃতি সবারইছিল (লোকমান ৩১/২৫)। তাদের আপত্তি ছিল কেবলএকখানে যে, সবকিছু ছেড়ে কেবলমাত্রআল্লাহর ইবাদত করতে হবে এবং দুনিয়াবীক্ষেত্রে আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-নিষেধমেনেচলতে হবে। তারা ধর্মকে কতিপয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমিত মনে করত এবংব্যবহারিক জীবনে তার কোন দখল দিতেপ্রস্ত্তত ছিল না। শো‘আয়েব (আঃ) অধিকাংশ সময়ছালাত ও ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন বলে তাকেবিদ্রূপ করে কোন কোন মূর্খ নেতা এরূপ কথাওবলে ফেলে যে, তোমার ছালাত কি তোমাকেএসব আবোল-তাবোল কথা-বার্তা শিক্ষা দিচ্ছে?কওমের লোকদের এসব বিদ্রূপবান ও রূঢ় মন্তব্যসমূহে বিচলিত না হয়ে অতীব ধৈর্য ও দরদেরসাথে তিনি তাদের সম্বোধন করে বললেন, ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎﻗَﻮْﻡِ ﺃَﺭَﺃَﻳْﺘُﻢْ ﺇِﻥْ ﻛُﻨْﺖُ ﻋَﻠَﻰ ﺑَﻴِّﻨَﺔٍ ﻣِﻦ ﺭَّﺑِّﻲ ﻭَﺭَﺯَﻗَﻨِﻲ ﻣِﻨْﻪُﺭِﺯْﻗًﺎ ﺣَﺴَﻨًﺎ ﻭَﻣَﺎ ﺃُﺭِﻳْﺪُ ﺃَﻥْ ﺃُﺧَﺎﻟِﻔَﻜُﻢْ ﺇِﻟَﻰ ﻣَﺎ ﺃَﻧْﻬَﺎﻛُﻢْ ﻋَﻨْﻪُ ﺇِﻥْﺃُﺭِﻳْﺪُ ﺇِﻻَّ ﺍﻹِﺻْﻼَﺡَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺖُ ﻭَﻣَﺎ ﺗَﻮْﻓِﻴْﻘِﻲْ ﺇِﻻَّ ﺑِﺎﻟﻠﻪِ ﻋَﻠَﻴْﻪِﺗَﻮَﻛَّﻠْﺖُ ﻭَﺇِﻟَﻴْﻪِ ﺃُﻧِﻴْﺐُ – ﻭَﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﻻَ ﻳَﺠْﺮِﻣَﻨَّﻜُﻢْ ﺷِﻘَﺎﻗِﻲْ ﺃَﻥﻳُّﺼِﻴْﺒَﻜُﻢْ ﻣِﺜْﻞُ ﻣَﺎ ﺃَﺻَﺎﺏَ ﻗَﻮْﻡَ ﻧُﻮْﺡٍ ﺃَﻭْﻗَﻮْﻡَ ﻫُﻮْﺩٍ ﺃَﻭْ ﻗَﻮْﻡَﺻَﺎﻟِﺢٍ ﻭَﻣَﺎ ﻗَﻮْﻡُ ﻟُﻮْﻁٍ ﻣِﻨْﻜُﻢْ ﺑِﺒَﻌِﻴْﺪٍ- ﻭَﺍﺳْﺘَﻐْﻔِﺮُﻭﺍ ﺭَﺑَّﻜُﻢْﺛُﻤَّﺘُﻮْﺑُﻮْﺍ ﺇِﻟَﻴْﻪِ ﺇِﻥَّ ﺭَﺑِّﻲ ﺭَﺣِﻴْﻢٌ ﻭَﺩُﻭْﺩٌ – ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻳَﺎ ﺷُﻌَﻴْﺐُ ﻣَﺎﻧَﻔْﻘَﻪُ ﻛَﺜِﻴﺮًﺍ ﻣِّﻤَّﺎ ﺗَﻘُﻮْﻝُ ﻭَﺇِﻧَّﺎ ﻟَﻨَﺮَﺍﻙَ ﻓِﻴْﻨَﺎ ﺿَﻌِﻴْﻔًﺎﻭَﻟَﻮْﻻَ ﺭَﻫْﻄُﻚَﻟَﺮَﺟَﻤْﻨَﺎﻙَ ﻭَﻣَﺎ ﺃَﻧْﺖَ ﻋَﻠَﻴْﻨَﺎ ﺑِﻌَﺰِﻳْﺰٍ- ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺃَﺭَﻫْﻄِﻲْ ﺃَﻋَﺰُّﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَﺍﺗَّﺨَﺬْﺗُﻤُﻮْﻩُ ﻭَﺭَﺍﺀَﻛُﻢْ ﻇِﻬْﺮِﻳًّﺎ ﺇِﻥَّ ﺭَﺑِّﻲْ ﺑِﻤَﺎﺗَﻌْﻤَﻠُﻮْﻥَ ﻣُﺤِﻴْﻂٌ – ﻭَﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺍﻋْﻤَﻠُﻮْﺍ ﻋَﻠَﻰ ﻣَﻜَﺎﻧَﺘِﻜُﻢْ ﺇِﻧِّﻲْﻋَﺎﻣِﻞٌ ﺳَﻮْﻑَ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ، ﻣَﻦ ﻳَّﺄْﺗِﻴﻪِ ﻋَﺬَﺍﺏٌ ﻳُّﺨْﺰِﻳْﻪِ ﻭَﻣَﻦْ ﻫُﻮَﻛَﺎﺫِﺏٌ ﻭَﺍﺭْﺗَﻘِﺒُﻮْﺍ ﺇِﻧِّﻲ ﻣَﻌَﻜُﻢْ ﺭَﻗِﻴْﺐٌ – ‏( ﻫﻮﺩ ৮৮-৯৩)-‘হেআমার জাতি! তোমরা কি মনে কর আমি যদি আমারপালনকর্তার পক্ষ হ’তে সুস্পষ্ট দলীলের উপরেকায়েম থাকি, আর তিনি যদি নিজের তরফ থেকেআমাকে (দ্বীনী ও দুনিয়াবী) উত্তম রিযিক দানকরে থাকেন, (তবে আমি কি তাঁর হুকুম অমান্যকরতে পারি?)। আর আমি চাই না যে, আমিতোমাদেরকে যে বিষয়ে নিষেধ করি, পরেনিজেই সে কাজে লিপ্ত হই। আমি আমার সাধ্যমততোমাদের সংশোধন চাই মাত্র। আর আমার কোনইক্ষমতা নেই আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত। আমি তাঁরউপরেইনির্ভর করি এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাই’ (৮৮)।‘হে আমার জাতি! আমার প্রতি হঠকারিতা করে তোমরানিজেদের উপরে নূহ, হূদ বা ছালেহ-এর কওমেরমত আযাব ডেকে এনো না। আর লূতের কওমেরঘটনা তো তোমাদের থেকে দূরে নয়’ (৮৯)।‘তোমরা তোমাদের প্রভুর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনাকর ও তাঁর দিকেই ফিরে এস। নিশ্চয়ই আমারপালনকর্তা অতীব দয়ালু ও প্রেমময়’ (৯০)। ‘তারাবলল, হে শো‘আয়েব! তোমার অত শত কথাআমরা বুঝি না। তোমাকে তো আমাদের মধ্যকারএকজন দুর্বল ব্যক্তি বলে আমরা মনে করি। যদিতোমার জাতি-গোষ্ঠীর লোকেরা না থাকত,তাহ’লে এতদিন আমরা তোমাকে পাথর মেরে চূর্ণকরে ফেলতাম। তুমি আমাদের উপরে মোটেইপ্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি নও’ (৯১)। ‘শো‘আয়েববলল, হে আমার কওম! আমার জ্ঞাতি-গোষ্ঠী কিতোমাদের নিকটে আল্লাহর চেয়ে অধিকক্ষমতাশালী? অথচ তোমরা তাঁকে পরিত্যাগ করেপিছনে ফেলে রেখেছ? মনে রেখতোমাদের সকল কার্যকলাপ আমার পালনকর্তারআয়ত্তাধীন’ (৯২)। ‘অতএব হে আমার জাতি!তোমরা তোমাদের স্থানে কাজ কর, আমিওকাজকরে যাই। অচিরেই তোমরা জানতে পারবেকার উপরে লজ্জাষ্কর আযাব নেমে আসে, আরকে মিথ্যাবাদী। তোমরা অপেক্ষায় থাক, আমিওঅপেক্ষায় রইলাম’ (হূদ ১১/৮৮-৯৩)।জবাবে ‘তাদেরদাম্ভিক নেতারা চূড়ান্তভাবে বলে দিল, ﻟَﻨُﺨْﺮِﺟَﻨَّﻚَ ﻳَﺎﺷُﻌَﻴْﺐُ ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮﺍ ﻣَﻌَﻚَ ﻣِﻦْ ﻗَﺮْﻳَﺘِﻨَﺎ ﺃَﻭْ ﻟَﺘَﻌُﻮﺩُﻥَّ ﻓِﻲﻣِﻠَّﺘِﻨَﺎ – ‘হে শো‘আয়েব! আমরা অবশ্যইতোমাকে ও তোমার সাথী ঈমানদারগণকে শহরথেকে বের করে দেব অথবা তোমরাআমাদের ধর্মে প্রত্যাবর্তন করবে’ (আ‘রাফ৭/৮৮)। তারা আরও বলল, ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﺃَﻧْﺖَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺴَﺤَّﺮِﻳﻦَ- ﻭَﻣَﺎﺃَﻧْﺖَ ﺇِﻟَّﺎ ﺑَﺸَﺮٌ ﻣِﺜْﻠُﻨَﺎ ﻭَﺇِﻥْ ﻧَﻈُﻨُّﻚَ ﻟَﻤِﻦَ ﺍﻟْﻜَﺎﺫِﺑِﻴﻦَ – ﻓَﺄَﺳْﻘِﻂْﻋَﻠَﻴْﻨَﺎ ﻛِﺴَﻔًﺎ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀِ ﺇِﻥْ ﻛُﻨْﺖَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺼَّﺎﺩِﻗِﻴﻦَ – ‏( ﺍﻟﺸﻌﺮﺍﺀ187-185 )-‘নিঃসন্দেহে তুমি জাদুগ্রস্তদের অন্যতম’।‘তুমি আমাদের মত একজন মানুষ বৈ কিছুই নও।আমাদের ধারণা তুমি অবশ্যই মিথ্যাবাদীদেরঅন্তর্ভুক্ত’। ‘এক্ষণে যদি তুমি সত্যবাদী হও, তবেআকাশের কোন টুকরা আমাদের উপরে ফেলেদাও’ (শো‘আরা ২৬/১৮৫-১৮৭)। শো‘আয়েব (আঃ)তখন নিরাশ হয়ে প্রথমে কওমকে বললেন, ﻗَﺪِﺍﻓْﺘَﺮَﻳْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻠﻪِ ﻛَﺬِﺑﺎً ﺇِﻥْ ﻋُﺪْﻧَﺎ ﻓِﻲ ﻣِﻠَّﺘِﻜُﻢ ﺑَﻌْﺪَ ﺇِﺫْ ﻧَﺠَّﺎﻧَﺎﺍﻟﻠﻪُ ﻣِﻨْﻬَﺎ ﻭَﻣَﺎ ﻳَﻜُﻮﻥُ ﻟَﻨَﺎ ﺃَﻥْ ﻧَﻌُﻮﺩَ ﻓِﻴﻬَﺎ ﺇِﻻَّ ﺃَﻥ ﻳَّﺸَﺂﺀَ ﺍﻟﻠﻪُﺭَﺑُّﻨَﺎ ﻭَﺳِﻊَ ﺭَﺑُّﻨَﺎ ﻛُﻞَّ ﺷَﻲْﺀٍ ﻋِﻠْﻤﺎً ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻠﻪِ ﺗَﻮَﻛَّﻠْﻨَﺎ ‏(ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ৮৯)-‘আমরা আল্লাহর উপরে মিথ্যারোপকারী হয়েযাব যদি আমরা তোমাদের ধর্মে ফিরে যাই। অথচআল্লাহ আমাদেরকে তা থেকে মুক্তি দিয়েছেন।ঐ ধর্মে ফিরে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়,তবে যদি আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ সেটা চান।আমাদের পালনকর্তা স্বীয় জ্ঞান দ্বারা প্রত্যেকবস্ত্তকে বেষ্টন করে আছেন। (অতএব)আল্লাহর উপরেই আমরাভরসা করলাম।’অতঃপর তিনিআল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে বললেন, ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﺍﻓْﺘَﺢْﺑَﻴْﻨَﻨَﺎ ﻭَﺑَﻴْﻦَ ﻗَﻮْﻣِﻨَﺎ ﺑِﺎﻟْﺤَﻖِّ ﻭَﺃَﻧﺖَ ﺧَﻴْﺮُ ﺍﻟْﻔَﺎﺗِﺤِﻴﻦَ – ‘হেআমাদের পালনকর্তা! আমাদের ও আমাদেরকওমের মধ্যে তুমি যথার্থ ফায়ছালা করে দাও। আরতুমিই তো শ্রেষ্ঠ ফায়ছালাকারী’ (৮৯)। ‘তখন তারকওমের কাফের নেতারা বলল, ﻭَﻗَﺎﻝَ ﺍﻟْﻤَﻸُ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَﻛَﻔَﺮُﻭﺍ ﻣِﻦْ ﻗَﻮْﻣِﻪِ ﻟَﺌِﻦِ ﺍﺗَّﺒَﻌْﺘُﻢْ ﺷُﻌَﻴْﺒﺎً ﺇِﻧَّﻜُﻢْ ﺇِﺫﺍً ﻟَّﺨَﺎﺳِﺮُﻭﻥَ -যদি তোমরা শো‘আয়েবের অনুসরণ কর, তবেতোমরা নিশ্চিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে’ (আ‘রাফ৭/৮৯-৯০)।অতঃপর শো‘আয়েব (আঃ) স্বীয়কওমের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। এ বিষয়েআল্লাহ বলেন, ﻓَﺘَﻮَﻟَّﻰ ﻋَﻨْﻬُﻢْ ﻭَﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﻟَﻘَﺪْ ﺃَﺑْﻠَﻐْﺘُﻜُﻢْﺭِﺳَﺎﻻَﺕِ ﺭَﺑِّﻲ ﻭَﻧَﺼَﺤْﺖُ ﻟَﻜُﻢْ ﻓَﻜَﻴْﻒَ ﺁﺳَﻰ ﻋَﻠَﻰ ﻗَﻮْﻡٍﻛَﺎﻓِﺮِﻳﻦَ – ‏(ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ৯৩)-‘অনন্তর তিনি তাদের কাছথেকে প্রস্থান করলেন এবং বললেন, হে আমারসম্প্রদায়! আমি তোমাদেরকেআমার প্রতিপালকেরপয়গাম পৌছে দিয়েছি এবং তোমাদের উপদেশদিয়েছি। এখন আমি কাফেরদের জন্যআর কিভাবেসহানুভূতি দেখাব’ (আ‘রাফ ৭/৯৩)।শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ:হযরত শো‘আয়েব (আঃ) ও তাঁর কওমেরনেতাদের মধ্যকার উপরোক্ত কথোপকথনেরমধ্যে নিম্নোক্ত শিক্ষণীয় বিষয়গুলি ফুটে ওঠে।যেমন:(১) শো‘আয়েব (আঃ) একটি সম্ভ্রান্তগোত্রের মর্যাদাবান ব্যক্তি ছিলেন। নবুঅতেরসম্পদ ছাড়াও তিনি দুনিয়াবী সম্পদে সমৃদ্ধিশালীছিলেন। বস্ত্ততঃ সকল নবীই স্ব স্ব যুগেরসম্ভ্রান্ত বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তারাউচ্চমর্যাদাশীল ব্যক্তি ছিলেন। (২) কওমেরনেতারা ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মীয় বিধি-বিধানমানতে প্রস্ত্তত থাকলেও বৈষয়িক জীবনেধর্মীয় বাধা-নিষেধ মানতেরাযী ছিল না (৩)আল্লাহকে স্বীকার করলেও তাদের মধ্যেঅসীলা পূজা ও মূর্তিপূজার শিরকের প্রাদুর্ভাবঘটেছিল (৪) বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসারসমপূজা ছেড়ে নির্ভেজাল তাওহীদের সংস্কারধর্মী দাওয়াত তারা কবুল করতে প্রস্ত্তত ছিল না (৫)মূলতঃ দুনিয়া পূজা ও প্রবৃত্তি পূজারকারণেই তারা শিরকীরেওয়াজ এবং বান্দার হক বিনষ্টকারী অপকর্মসমূহের উপরে যিদ ধরেছিল।(৬) প্রচলিত কোনঅন্যায় রসমের সঙ্গে আপোষ করে তা দূর করাসম্ভবনয়। বরং শত বাধা ও ক্ষতি স্বীকার করেহ’লেও স্রেফ আল্লাহর উপরে ভরসা করেআপোষহীনভাবে সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়াইপ্রকৃত সমাজ সংস্কারকের কর্তব্য (৭) সংস্কারককেসর্বদা স্পষ্ট দলীলের উপরে কায়েম থাকতেহবে (৮) তাকে অবশ্যই ধৈর্যশীল ও প্রকৃতসমাজদরদী হ’তে হবে (৯) কোনরূপ দুনিয়াবীপ্রতিদানের আশাবাদী হওয়া চলবে না (১০) সকলব্যাপারে কেবল আল্লাহর তাওফীক কামনা করতেহবে এবং প্রতিদান কেবল তাঁর কাছেই চাইতে হবে(১১) শিরক-বিদ‘আত ও যুলুম অধ্যুষিত সমাজেতাওহীদের দাওয়াতের মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রমচালিয়ে যাওয়াকে দুনিয়াদার সমাজনেতারা ‘ফাসাদ’ ও‘ক্ষতিকর’ মনে করলেও মূলতঃ সেটাই হ’ল ‘ইছলাহ’বা সমাজ সংশোধনের কাজ। সকল বাধা উপেক্ষাকরেতাওহীদের দাওয়াত দিয়ে যাওয়াই হ’ল সংস্কারকেরমূল কর্তব্য (১২) চূড়ান্ত অবস্থায় আল্লাহর নিকটেইফায়ছালা চাইতে হবে।আহলে মাদইয়ানের উপরেআপতিত গযবের বিবরণ :হযরত শো‘আয়েব (আঃ)-এর শত উপদেশ উপেক্ষা করে যখন কওমেরনেতারা তাদের অন্যায় কর্মসমূহ চালিয়ে যাবারব্যাপারে অনড় রইল এবং নবীকে জনপদ থেকেবের করেদেবার ও হত্যা করার হুমকি দিল ওসর্বোপরি হঠকারিতা করে তারা আল্লাহর গযবপ্রত্যক্ষ করতে চাইল, তখন তিনি বিষয়টি আল্লাহরউপরে সোপর্দ করলেন এবং কওমেরনেতাদের বললেন, ﻭَﺍﺭْﺗَﻘِﺒُﻮْﺍ ﺇِﻧِّﻲ ﻣَﻌَﻜُﻢْ ﺭَﻗِﻴْﺐٌ ‘(ঠিকআছে), তোমরা এখন আযাবের অপেক্ষায় থাক।আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষায় রইলাম’ (হূদ১১/৯৩)।বলা বাহুল্য, আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় চিরন্তনবিধান অনুযায়ী শো‘আয়েব (আঃ) ও তাঁর ঈমানদারসাথীগণকে উক্ত জনপদ হ’তে অন্যত্র নিরাপদেসরিয়ে নিলেন। অতঃপর জিবরীলের একগগণবিদারী নিনাদে অবাধ্য কওমের সকলেনিমেষে ধ্বংস হয়ে গেল। এ বিষয়ে আল্লাহবলেন, ﻭَﻟَﻤَّﺎ ﺟَﺎﺀَ ﺃَﻣْﺮُﻧَﺎ ﻧَﺠَّﻴْﻨَﺎ ﺷُﻌَﻴْﺒﺎً ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮْﺍ ﻣَﻌَﻪُﺑِﺮَﺣْﻤَﺔٍ ﻣِّﻨَّﺎ ﻭَﺃَﺧَﺬَﺕِ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﻇَﻠَﻤُﻮْﺍ ﺍﻟﺼَّﻴْﺤَﺔُ ﻓَﺄَﺻْﺒَﺤُﻮْﺍ ﻓِﻲﺩِﻳَﺎﺭِﻫِﻢْ ﺟَﺎﺛِﻤِﻴْﻦَ- ﻛَﺄَﻥ ﻟَّﻢْ ﻳَﻐْﻨَﻮْﺍﻓِﻴﻬَﺎ ﺃَﻻَ ﺑُﻌْﺪﺍً ﻟِّﻤَﺪْﻳَﻦَ ﻛَﻤَﺎﺑَﻌِﺪَﺕْ ﺛَﻤُﻮْﺩُ- ‏(ﻫﻮﺩ ৯৪-৯৫)-‘অতঃপর যখন আমারআদেশ এসে গেল, তখন আমি শো‘আয়েব ওতার ঈমানদার সাথীদের নিজ অনুগ্রহে রক্ষা করলাম।আর পাপিষ্ঠদের উপর বিকট গর্জন আপতিত হ’ল।ফলে তারা নিজেদের ঘরে উপুড় হয়ে মরেপড়ে রইল’। ‘(তারা এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হ’ল) যেন তারাকখনোই সেখানে বসবাস করেনি। সাবধান! ছামূদজাতির উপর অভিসম্পাতের ন্যায় মাদইয়ানবাসীরউপরেও অভিসম্পাত’ (হূদ ১১/৯৪-৯৫)। যদিও তারাদুনিয়াতে মযবুত ও নিরাপদ অট্টালিকায় বসবাস করত।আছহাবে মাদইয়ানের উপরে গযবের ব্যাপারেকুরআনে ﻇُﻠَّﺔٌ (শো‘আরা ১৮৯), ﺭَﺟْﻔَﺔٌ (হূদ ৯৪),ﺻَﻴْﺤَﺔٌ (আ‘রাফ ৮৮) তিন ধরনের শব্দ ব্যবহৃতহয়েছে। যার অর্থ মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, বিকট নিনাদ,ভূমিকম্প। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন,আহলে মাদইয়ানের উপরে প্রথমে সাতদিন এমনভীষণ গরম চাপিয়ে দেওয়া হয় যে, তারা দহনজ্বালায় ছটফট করতে থাকে। অতঃপরআল্লাহ তা‘আলাএকটি ঘন কালো মেঘমালা পাঠিয়ে দিলেন, যার নীচদিয়ে শীতল বায়ু প্রবাহিত হচ্ছিল। তখন কওমেরলোকেরা ঊর্ধ্বশ্বাসে সেখানে দৌড়ে এল।এভাবে সবাই জমা হবার পর হঠাৎ ভূমিকম্প শুরু হ’ল এবংমেঘমালা হ’তে শুরু হল অগ্নিবৃষ্টি। তাতে মানুষ সবপোকা-মাকড়ের মত পুড়ে ছাই হ’তে লাগল। ইবনুআববাস (রাঃ) ওমুহাম্মাদ বিন কা‘ব আল-কুরাযী বলেন,অতঃপর তাদের উপর নেমে আসে এক বজ্রনিনাদ।যাতে সব মরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল’।[7] এভাবেকোনরূপ গ্রেফতারী পরোয়ানা ও সিপাই-সান্ত্রীর প্রহরা ছাড়াই আল্লাহদ্রোহীরা সবাইপায়ে হেঁটে স্বেচ্ছায় বধ্যভূমিতে উপস্থিত হয়এবং চোখের পলকে সবাই নিস্তনাবুদ হয়ে যায়।মক্কা থেকে সিরিয়া যাওয়ার পথেএসব ধ্বংসস্থলনযরে পড়ে। আল্লাহ বলেন, ﻭَﻛَﻢْ ﺃَﻫْﻠَﻜْﻨَﺎ ﻣِﻦْ ﻗَﺮْﻳَﺔٍﺑَﻄِﺮَﺕْ ﻣَﻌِﻴْﺸَﺘَﻬَﺎ ﻓَﺘِﻠْﻚَ ﻣَﺴَﺎﻛِﻨُﻬُﻢْ ﻟَﻢْ ﺗُﺴْﻜَﻦ ﻣِّﻦ ﺑَﻌْﺪِﻫِﻢْ ﺇِﻟَّﺎﻗَﻠِﻴْﻼً ﻭَﻛُﻨَّﺎ ﻧَﺤْﻦُ ﺍﻟْﻮَﺍﺭِﺛِﻴﻦَ ، ‘এসব জনপদ ধ্বংস হওয়ার পরপুনরায় আবাদ হয়নি অল্প কয়েকটি ব্যতীত।অবশেষে আমরাই এ সবের মালিক রয়েছি’ (ক্বাছাছ২৮/৫৮)। তিনি বলেন, ﺇِﻥَّ ﻓِﻲ ﺫَﻟِﻚَ ﻵﻳَﺎﺕٍ ﻟِّﻠْﻤُﺘَﻮَﺳِّﻤِﻴْﻦَ ،‘নিশ্চয়ই এর মধ্যে চিন্তাশীলদের জন্যনিদর্শনসমূহ রয়েছে’ (হিজর ১৫/৭৫)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)যখন এসব স্থান অতিক্রম করতেন, তখন আল্লাহরভয়ে ভীত হয়ে পড়তেন ও সওয়ারীকে দ্রুতহাঁকিয়ে নিয়ে স্থান অতিক্রম করতেন।[8] অথচএখনকার যুগের বস্ত্তবাদী লোকেরা এসবস্থানকে শিক্ষাস্থল না বানিয়ে পর্যটন কেন্দ্রেরনামে তামাশার স্থলে পরিণত করেছে। আল্লাহআমাদের সুপথ প্রদর্শন করুন- আমীন!ওয়াহাব বিনমুনাবিবহ বলেন, শু‘আয়েব (আঃ) ও তাঁর মুমিন সাথীগণমক্কায় চলে যান ও সেখানে মৃত্যুবরণ করেন। কা‘বাগৃহের পশ্চিম দিকে দারুন নাদওয়া ও দার বনু সাহ্মেরমধ্যবর্তী স্থানে তাদের কবর হয়’।[9] তবে এইসকল বর্ণনার ভিত্তি সুনিশ্চিত নয়। আর থাকলেওসেগুলি সবই এখন নিশ্চিহ্ন এবং সবই বায়তুল্লাহরচতুঃসীমার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ সর্বাধিক অবগত।[1]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/১৭৩।[2]. মু‘জামুলবুলদান, বৈরুত : দার ছাদের, ১৯৭৯), ৫/৭৭ পৃঃ, ।[3].আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/১৭৩।[4]. ইবনু কাছীর,আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ ১/১৬৪ পৃঃ।[5]. যথাক্রমে সূরাআ‘রাফ ৭/৮৫-৯৩=৯; তওবাহ ৯/৭০; হূদ ১১/৮৪-৯৫=১২;হিজর ১৫/৭৮-৭৯; হজ্জ ২২/৪৪;শো‘আরা২৬/১৭৬-১৯১=১৬; ক্বাছাছ ২৮/২৩-২৮=৬; আনকাবূত২৯/৩৬-৩৭; ছোয়াদ ৩৮/১৩-১৫=৩; ক্বাফ ৫০/১৪।সর্বমোট = ৫৩টি।[6]. তাফসীরে কুরতুবী, হূদ৮৭।[7]. তাফসীর ইবনে কাছীর, শো‘আরা ১৮৯;কুরতুবী, ঐ।[8]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫১২৫‘শিষ্টাচার’ অধ্যায়, ‘যুলুম’ অনুচ্ছেদ।[9]. আল-বিদায়াহওয়ান নিহায়াহ ১/১৭৯।

Friday, September 29, 2023

কি ঘটেছিল কারবালায়? কারা হুসাইন (রা:) কে হত্যা করেছে?

 কি ঘটেছিল কারবালায়? কারা হুসাইন (রা:) কে হত্যা করেছে?

(কারবালার ঘটনা সম্পর্কে একটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ-যা অনেক ভুল ধারণা ভেঙ্গে দিবে ইনশাআল্লাহ)
এই প্রবন্ধে যে সকল বিষয় আলোচিত হয়েছে সেগুলো হল:
১) ভূমিকা
২) কারবালার প্রান্তরে রাসূলের দৌহিত্র হুসাইন (রা:) নিহত হওয়ার প্রকৃত ঘটনা।
৩) ফুরাত নদীর পানি পান করা থেকে বিরত রাখার কিচ্ছা।
৪) কারবালার প্রান্তরে হুসাইনের সাথে আরও যারা নিহত হয়েছেন।
৫) কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত ধারণা ঠিক নয়।
৬) হুসাইন (রা.) বের হওয়া ন্যায় সংগত ছিল কি?
৭) কারবালার ঘটনাকে আমরা কিভাবে মূল্যায়ন করব?
৮) মৃত ব্যক্তির উপর বিলাপ করার ক্ষেত্রে শিয়া মাজহাবের মতামত।
৯) আশুরার দিনে আমাদের করণীয় কী?
১০) শিয়াদের বর্ণনায় আশুরার রোজা।
১১) আশুরার দিনে মাতম করার ভিত্তি কোথায়?
১২) হুসাইন (রা.) হত্যায় ইয়াজিদ কতটুকু দায়ী?
১৩) তাহলে কে হুসাইন (রা:)কে হত্যা করল?
১৪) হুসাইন (রা.) হত্যাকারী নির্ধারণে ইবনে উমর (রা:)এর অভিমত।
১৫) হুসাইন (রা.) এর ভাষণই প্রমাণ করে যে ইয়াজিদ তাঁর হত্যার জন্য সরাসরি দায়ী নয়।
১৬) আলী বিন হুসাইন (রা.) তাঁর পিতা হুসাইনকে হত্যার জন্য কুফা বাসীদেরকে দায়ী করেছেন?
১৭) হুসাইন রা. এর মাথা কোথায় গিয়েছিল?
১৮) যেমন কর্ম তেমন ফল।
 ১৯) ইয়াজিদ সম্পর্কে একজন মুসলিমের ধারণা কেমন হওয়া উচিত।
২০) উপসংহার।

১) ভূমিকা:
প্রশংসা মাত্রই আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর পরিবার এবং সকল সাহাবীর উপর।
সৌভাগ্যবান শহীদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৌহিত্র সায়্যেদ হেসাইন বিন আলী (রা:)এর কারবালার প্রান্তরে শহীদ হওয়াকে কেন্দ্র করে অনেক ঘটনাই প্রসিদ্ধ রয়েছে। আমাদের বাংলাদেশের অনেক মুসলিমের মধ্যে এ বিষয়ে বিরাট বিভ্রান্তি রয়েছে। দেশের রাষ্ট্র প্রতি, প্রধান মন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতাগণ, ইসলামী বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ এ দিন উপলক্ষে জাতির সামনে প্রতিবছর বিশেষ বাণী তুলে ধরেন। রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে থাকে। এ দিন আমাদের দেশে সরকারী ছুটি থাকে। তাদের সকলের কথা ঘুরে ফিরে একটাই। স্বৈরাচারী, জালেম, নিষ্ঠুর ও নরপশু ইয়াজিদের হাতে এ দিনে রাসূলের দৌহিত্র ইমাম হুসাইন নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। এ জন্য এটি একটি পবিত্র দিন। বিশেষ একটি সম্প্রদায় এ দিন উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। বিষাদসিন্ধু নামক একটি উপন্যাস পড়ে বা এর কিছু বানোয়াট ও কাল্পনিক কাহিনী শুনে সুন্নি মুসলিমগণও এ বিষয়ে ধুম্রজালে আটকা পড়েছেন।
জাতির ভুল-ভ্রান্তি সংশোধনের জন্য আজ আমি এ বিষয়ে সঠিক ও গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য প্রকাশ করার কাজে অগ্রসর হতে বাধ্য হলাম। মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে সংক্ষিপ্ত আকারে একটি ভূমিকা পেশ করতে চাই। মন দিয়ে ভূমিকাটি পড়লে মূল বিষয় বুঝতে সহজ হবে বলে আমার বিশ্বাস। আমি আরও বিশ্বাস করি যে, আমার লেখাটি পড়ে এ বিষয়ে অনেকের আকীদাহ সংশোধন হবে। আর যারা বিষয়টি নিয়ে সংশয়ে আছেন, তাদেরও সংশয় কেটে যাবে ইনশাআল্লাহ।
ইমাম ইবনে কাছীর (র:) বলেন: প্রতিটি মুসলিমের উচিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৌহিত্র সায়্যেদ হেসাইন বিন আলী (রা:)এর কারবালার প্রান্তরে শহীদ হওয়ার ঘটনায় ব্যথিত হওয়া ও সমবেদনা প্রকাশ করা। তিনি ছিলেন মুসলিম জাতির নেতা ও ইমামদের অন্যতম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সর্বশ্রেষ্ঠ কন্যা ফাতেমার পুত্র ইমাম হুসাইন (রা:) একজন বিজ্ঞ সাহাবী ছিলেন। তিনি ছিলেন একধারে এবাদত গুজার, দানবীর এবং অত্যন্ত সাহসী বীর। হাসান ও হুসাইনের ফজিলতে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে একাধিক সহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। অন্তর দিয়ে তাদেরকে ভালবাসা ঈমানের অন্যতম আলামত এবং নবী পরিবারের কোন সদস্যকে ঘৃণা করা ও গালি দেয়া মুনাফেকির সুস্পষ্ট লক্ষণ। যাদের অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত কেবল তারাই ইমাম হুসাইন বা নবী পরিবারের পবিত্র সদস্যদেরকে ঘৃণা করতে পারে।

আহলে সুন্নত ওয়াল জামআতের আকীদাহ অনুযায়ী ইমাম হুসাইন বা অন্য কারও মৃত্যুতে মাতম করা জায়েজ নেই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল মুসলিম জাতির বিরাট একটি গোষ্ঠী ইমাম হুসাইনের মৃত্যুতে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে থাকে। যারা হুসাইনের মৃত্যু ও কারবালার ঘটনা নিয়ে বাড়াবাড়ি করেন, তাদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন করা খুবই যুক্তিসংগত মনে করছি। যে সমস্ত সুন্নি মুসলিম সঠিক তথ্য না জানার কারণে এ ব্যাপারে সন্দিহান ও বিভ্রান্তিতে আছেন তাদের কাছেও আমার একই প্রশ্ন। প্রশ্নগুলো ভালভাবে উপলব্ধি করতে পারলেই প্রকৃত ঘটনা বুঝা খুব সহজ হবে ইনশা-আল্লাহ।
প্রথম প্রশ্ন: হুসাইনের পিতা এবং ইসলামের চতুর্থ খলীফা আলী বিন আবু তালেব (রা:) হুসাইনের চেয়ে অধিক উত্তম ছিলেন। তিনি ৪০ হিজরী সালে রমযান মাসের ১৭ তারিখ জুমার দিন ফজরের নামাযের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার সময় আব্দুর রাহমান মুলজিম খারেজীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। তারা হুসাইনের মৃত্যু উদযাপনের ন্যায় তাঁর পিতার মৃত্যু উপলক্ষে মাতম করে না কেন?
দ্বিতীয় প্রশ্ন: আহলে সুন্নত ওয়াল জামআতের আকীদাহ অনুযায়ী উসমান বিন আফ্ফান ছিলেন আলী ও হুসাইন (রা:)এর চেয়ে অধিক উত্তম। তিনি ৩৬ হিজরী সালে যুল হজ্জ মাসের আইয়ামে তাশরীকে স্বীয় বাস ভবনে অবরুদ্ধ অবস্থায় মাজলুম ভাবে নিহত হন। ন্যায় পরায়ণ এই খলীফাকে পশুর ন্যায় জবাই করা হয়েছে। তারা তাঁর হত্যা দিবসকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠান করে না কেন?
তৃতীয় প্রশ্ন: এমনভাবে খলীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা:) উসমান এবং আলী (রা:) থেকেও উত্তম ছিলেন। তিনি ফজরের নামাযে দাঁড়িয়ে কুরআন তেলাওয়াত করছিলেন এবং মুসলমানদেরকে নিয়ে জামআতের ইমামতি করছিলেন। এমন অবস্থায় আবু লুলু নামক একজন অগ্নি পূজক তাঁকে দুই দিকে ধারালো একটি ছুরি দিয়ে আঘাত করে। সাথে সাথে তিনি ধরাশায়ী হয়ে যান এবং শহীদ হন। লোকেরা সেই দিনে মাতম করে না কেন?
চতুর্থ প্রশ্ন: ইসলামের প্রথম খলীফা এবং রাসূলের বিপদের দিনের সাথী আবু বকরের মৃত্যু কি মুসলিমদের জন্য বেদনাদায়ক নয়? তিনি কি রাসূলের পরে এই উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন না? তার মৃত্যু দিবসে তারা তাজিয়া করে না কেন?
পঞ্চম প্রশ্ন: সর্বোপরি নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়া ও আখেরাতে সমস্ত বনী আদমের সরদার। আল্লাহ্‌ তায়ালা তাঁকে অন্যান্য নবীদের ন্যায় স্বীয় সান্নিধ্যে উঠিয়ে নিয়েছেন। সাহাবীদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর চেয়ে অধিক বড় আর কোন মুসীবত ছিল না। তিনি ছিলেন তাদের কাছে স্বীয় জীবন, সম্পদ ও পরিবার-পরিজনের চেয়েও অধিক প্রিয়। তারপরও তাদের কেউ রাসূলের মৃত্যুতে মাতম করেন নি। হুসাইনের প্রেমে মাতালগণকে রাসূলের মৃত্যু দিবসকে উৎসব ও শোক প্রকাশের দিন হিসেবে নির্ধারণ করতে দেখা যায় না কেন?
ষষ্ঠ প্রশ্ন: সর্বশেষ প্রশ্ন হচ্ছে হুসাইনের চেয়ে বহুগুণ বেশী শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের মৃত্যু দিবসকে বাদ দিয়ে ইমাম হুসাইনের মৃত্যুকে বেছে নিয়ে এত বাড়াবাড়ি শুরু করা হল কেন? এর উত্তর আমার এই লেখার শেষ পর্যায়ে উলে¬খ করেছি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লেখাটি পাঠ করলে উত্তরটি সহজেই বোধগম্য হওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ সর্বোপরি ইসলামে কারও জন্ম দিবস বা মৃত্যু দিবস পালন করার এবং কারও মৃত্যুতে মাতম করা, উচ্চ স্বরে বিলাপ করা এবং অন্য কোন প্রকার অনুষ্ঠান করার কোন ভিত্তি নেই। শুধু তাই নয় এটি একটি জঘন্য বিদআত, যা পরিত্যাগ করা জরুরী। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা তাঁর কোন সাহাবী কারও জন্ম দিবস বা মৃত্যু দিবস পালন করেন নি।

২) কারবালার প্রান্তরে রাসূলের দৌহিত্র হুসাইন (রা:) নিহত হওয়ার প্রকৃত ঘটনা:
৬০ হিজরিতে ইরাক বাসীদের নিকট সংবাদ পৌঁছল যে, হুসাইন (রা:) ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া হাতে বয়াত করেন নি। তারা তাঁর নিকট চিঠি-পত্র পাঠিয়ে জানিয়ে দিল যে ইরাক বাসীরা তাঁর হাতে খেলাফতের বয়াত করতে আগ্রহী। ইয়াজিদকে তারা সমর্থন করেন না বলেও সাফ জানিয়ে দিল। তারা আরও বলল যে, ইরাক বাসীরা ইয়াজিদের পিতা মুয়াবিয়া (রা:)এর প্রতিও মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। চিঠির পর চিঠি আসতে লাগল। এভাবে পাঁচ শতাধিক চিঠি হুসাইন (রা:)এর কাছে এসে জমা হল।
প্রকৃত অবস্থা যাচাই করার জন্য হুসাইন (রা:) তাঁর চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকীলকে পাঠালেন। মুসলিম কুফায় গিয়ে পৌঁছলেন। গিয়ে দেখলেন, আসলেই লোকেরা হুসাইনকে চাচ্ছে। লোকেরা মুসলিমের হাতেই হুসাইনের পক্ষে বয়াত নেওয়া শুরু করল। হানী বিন উরওয়ার ঘরে বয়াত সম্পন্ন হল।
সিরিয়াতে ইয়াজিদের নিকট এই খবর পৌঁছা মাত্র বসরার গভর্নর উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদকে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য পাঠালেন। ইয়াজিদ উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদকে আদেশ দিলেন যে, তিনি যেন কুফা বাসীকে তার বিরুদ্ধে হুসাইনের সাথে যোগ দিয়ে বিদ্রোহ করতে নিষেধ করেন। সে হুসাইনকে হত্যা করার আদেশ দেন নি।
উবাইদুল্লাহ কুফায় গিয়ে পৌঁছলেন। তিনি বিষয়টি তদন্ত করতে লাগলেন এবং মানুষকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন। পরিশেষে তিনি নিশ্চিত হলেন যে, হানী বিন উরওয়ার ঘরে হুসাইনের পক্ষে বয়াত নেওয়া হচ্ছে।
অতঃপর মুসলিম বিন আকীল চার হাজার সমর্থক নিয়ে অগ্রসর হয়ে দ্বিপ্রহরের সময় উবাইদুল্লাহ বিন জিয়াদের প্রাসাদ ঘেরাও করলেন। এ সময় উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদ দাঁড়িয়ে এক ভাষণ দিলেন। তাতে তিনি ইয়াজিদের সেনা বাহিনীর ভয় দেখালেন। তিনি এমন ভীতি প্রদর্শন করলেন যে, লোকেরা ইয়াজিদের ধরপাকড় এবং শাস্তির ভয়ে আস্তে আস্তে পলায়ন করতে শুরু করল। ইয়াজিদের ভয়ে কুফা বাসীদের পলায়ন ও বিশ্বাস ঘাতকতার লোমহর্ষক ঘটনা জানতে চাইলে পাঠকদের প্রতি ইমাম ইবনে তাইমীয়া (র:) কর্তৃক রচিত মিনহাজুস সুন্নাহ বইটি পড়ার অনুরোধ রইল। যাই হোক কুফা বাসীদের চার হাজার লোক পালাতে পালাতে এক পর্যায়ে মুসলিম বিন আকীলের সাথে মাত্র তিন জন লোক অবশিষ্ট রইল। সূর্য অস্ত যাওয়ার পর মুসলিম বিন আকীল দেখলেন, হুসাইন প্রেমিক আল্লাহর একজন বান্দাও তার সাথে অবশিষ্ট নেই। এবার তাকে গ্রেপ্তার করা হল। উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদ তাকে হত্যার আদেশ দিলেন। মুসলিম বিন আকীল উবাইদুল্লাহএর নিকট আবেদন করলেন, তাকে যেন হুসাইনের নিকট একটি চিঠি পাঠানোর অনুমতি দেয়া হয়। এতে উবাইদুল্লাহ রাজী হলেন। চিঠির সংক্ষিপ্ত বক্তব্য ছিল এ রকম:
“হুসাইন! পরিবার-পরিজন নিয়ে ফেরত যাও। কুফা বাসীদের ধোঁকায় পড়ো না। কেননা তারা তোমার সাথে মিথ্যা বলেছে। আমার সাথেও তারা সত্য বলেনি। আমার দেয়া এই তথ্য মিথ্যা নয়।” অতঃপর যুল হজ্জ মাসের ৯ তারিখ আরাফা দিবসে উবাইদুল্লাহ মুসলিমকে হত্যার আদেশ প্রদান করেন। এখানে বিশেষভাবে স্মরণ রাখা দরকার যে, মুসলিম ইতিপূর্বে কুফা বাসীদের ওয়াদার উপর ভিত্তি করে হুসাইনকে আগমনের জন্য চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠির উপর ভিত্তি করে যুলহাজ্জ মাসের ৮ তারিখে হুসাইন (রা:) মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলেন। অনেক সাহাবী তাঁকে বের হতে নিষেধ করেছিলেন। তাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর, আব্দুল্লাহ বিন আমর এবং তাঁর ভাই মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফীয়ার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ইবনে উমর হুসাইনকে লক্ষ্য করে বলেন: হুসাইন! আমি তোমাকে একটি হাদীছ শুনাবো। জিবরীল (আঃ) আগমন করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুনিয়া এবং আখিরাত- এ দুটি থেকে যে কোন একটি গ্রহণ করার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। তিনি দুনিয়া বাদ দিয়ে আখিরাতকে বেছে নিয়েছেন। আর তুমি তাঁর অংশ। আল্লাহর শপথ! তোমাদের কেউ কখনই দুনিয়ার সম্পদ লাভে সক্ষম হবেন না। তোমাদের ভালর জন্যই আল্লাহ তোমাদেরকে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস থেকে ফিরিয়ে রেখেছেন। হুসাইন তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন এবং যাত্রা বিরতি করতে অস্বীকার করলেন। অতঃপর ইবনে উমর হুসাইনের সাথে আলিঙ্গন করে বিদায় দিলেন এবং ক্রন্দন করলেন।
সুফীয়ান ছাওরী ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ইবনে আব্বাস (রা:) হুসাইনকে বলেছেন: মানুষের দোষারোপের ভয় না থাকলে আমি তোমার ঘাড়ে ধরে বিরত রাখতাম।
বের হওয়ার সময় আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা:) হুসাইনকে বলেছেন: হোসাইন! কোথায় যাও? এমন লোকদের কাছে, যারা তোমার পিতাকে হত্যা করেছে এবং তোমার ভাইকে আঘাত করেছে?
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা:) বলেছেন: হুসাইন তাঁর জন্য নির্ধারিত ফয়সালার দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছেন। আল্লাহর শপথ! তাঁর বের হওয়ার সময় আমি যদি উপস্থিত থাকতাম, তাহলে কখনই তাকে যেতে দিতাম না। তবে বল প্রয়োগ করে আমাকে পরাজিত করলে সে কথা ভিন্ন। (ইয়াহ্-ইয়া ইবনে মাঈন সহীস সূত্রে বর্ণনা করেছেন)
যাত্রা পথে হুসাইনের কাছে মুসলিমের সেই চিঠি এসে পৌঁছল। চিঠির বিষয় অবগত হয়ে তিনি কুফার পথ পরিহার করে ইয়াজিদের কাছে যাওয়ার জন্য সিরিয়ার পথে অগ্রসর হতে থাকলেন। পথিমধ্যে ইয়াজিদের সৈন্যরা আমর বিন সাদ, সীমার বিন যুল জাওশান এবং হুসাইন বিন তামীমের নেতৃত্বে কারবালার প্রান্তরে হুসাইনের গতিরোধ করল। হুসাইন সেখানে অবতরণ করে আল্লাহর দোহাই দিয়ে এবং ইসলামের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনটি প্রস্তাবের যে কোন একটি প্রস্তাব মেনে নেওয়ার আহবান জানালেন।
হুসাইন বিন আলী (রা:) এবং রাসূলের দৌহিত্রকে ইয়াজিদের দরবারে যেতে দেয়া হোক। তিনি সেখানে গিয়ে ইয়াজিদের হাতে বয়াত গ্রহণ করবেন। কেননা তিনি জানতেন যে, ইয়াজিদ তাঁকে হত্যা করতে চান না। অথবা তাঁকে মদিনায় ফেরত যেতে দেয়া হোক।
অথবা তাঁকে কোন ইসলামী অঞ্চলের সীমান্তের দিকে চলে যেতে দেয়া হোক। সেখানে তিনি মৃত্যু পর্যন্ত বসবাস করবেন এবং রাজ্যের সীমানা পাহারা দেয়ার কাজে আত্ম নিয়োগ করবেন। (ইবনে জারীর হাসান সনদে বর্ণনা করেছেন)
ইয়াজিদের সৈন্যরা কোন প্রস্তাবই মানতে রাজী হল না। তারা বলল: উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদ যেই ফয়সালা দিবেন আমরা তা ব্যতীত অন্য কোন প্রস্তাব মানতে রাজী নই। এই কথা শুনে উবাইদুল্লাহএর এক সেনাপতি (হুর বিন ইয়াজিদ) বললেন: এরা তোমাদের কাছে যেই প্রস্তাব পেশ করছে তা কি তোমরা মানবে না? আল্লাহর কসম! তুর্কী এবং দায়লামের লোকেরাও যদি তোমাদের কাছে এই প্রার্থনাটি করত, তাহলে তা ফেরত দেয়া তোমাদের জন্য বৈধ হত না। এরপরও তারা উবাইদুল্লাহএর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতেই দৃঢ়তা প্রদর্শন করল। সেই সেনাপতি ঘোড়া নিয়ে সেখান থেকে চলে আসলেন এবং হুসাইন ও তাঁর সাথীদের দিকে গমন করলেন। হুসাইনের সাথীগণ ভাবলেন: তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করতে আসছেন। তিনি কাছে গিয়ে সালাম দিলেন। অতঃপর সেখান থেকে ফিরে এসে উবাইদুল্লাহএর সৈনিকদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাদের দুইজনকে হত্যা করলেন। অতঃপর তিনিও নিহত হলেন। (ইবনে জারীর হাসান সনদে বর্ণনা করেছেন)
সৈন্য সংখ্যার দিক থেকে হুসাইনের সাথী ও ইয়াজিদের সৈনিকদের মধ্যে বিরাট ব্যবধান ছিল। হুসাইনের সামনেই তাঁর সকল সাথী বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে নিহত হলেন। অবশেষে তিনি ছাড়া আর কেউ জীবিত রইলেন না। তিনি ছিলেন সিংহের মত সাহসী বীর। কিন্তু সংখ্যাধিক্যের মুকাবিলায় তার পক্ষে ময়দানে টিকে থাকা সম্ভব হল না। কুফা বাসী প্রতিটি সৈনিকের কামনা ছিল সে ছাড়া অন্য কেউ হুসাইনকে হত্যা করে ফেলুক। যাতে তার হাত রাসূলের দৌহিত্রের রক্তে রঙ্গিন না হয়। পরিশেষে নিকৃষ্ট এক ব্যক্তি হুসাইনকে হত্যার জন্য উদ্যত হয়। তার নাম ছিল সীমার বিন যুল জাওশান। সে বর্শা দিয়ে হুসাইনের শরীরে আঘাত করে ধরাশায়ী করে ফেলল। অতঃপর ইয়াজিদ বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে তিনি শাহাদাত অর্জনের সৌভাগ্য লাভ করেন।
বলা হয় এই সীমারই হুসাইনের মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। কেউ কেই বলেন: সিনান বিন আনাস আন্ নাখঈ নামক এক ব্যক্তি তাঁর মাথা দেহ থেকে আলাদা করে। আল্লাহই ভাল জানেন।

৩) ফুরাত নদীর পানি পান করা থেকে বিরত রাখার কিচ্ছা:
বেশ কিছু গ্রন্থ তাকে ফুরাত নদীর পানি পান করা থেকে বিরত রাখার ঘটনা বর্ণনা করে থাকে। আর বলা হয় যে, তিনি পানির পিপাসায় মারা যান। এ ছাড়াও আরও অনেক কথা বলে মানুষকে আবেগময় করে যুগে যুগে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে এবং মূল সত্যটি উপলব্ধি করতে তাদেরকে বিরত রাখার হীন ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এ সব কাল্পনিক গল্পের কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। ঘটনার যতটুকু সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে আমাদের জন্য ততটুকুই যথেষ্ট। কোন সন্দেহ নেই যে, কারবালার প্রান্তরে হুসাইন নিহত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বেদনা দায়ক। ধ্বংস হোক হুসাইনের হত্যাকারীগণ! ধ্বংস হোক হুসাইনের হত্যায় সহযোগীরা! আল্লাহর ক্রোধ তাদেরকে ঘেরাও করুক। আল্লাহ্‌ তায়ালা রাসূলের দৌহিত্র শহীদ হুসাইন এবং তাঁর সাথীদেরকে আল্লাহ তায়ালা স্বীয় রহমত ও সন্তুষ্টি দ্বারা আচ্ছাদিত করুক।

৪) কারবালার প্রান্তরে হুসাইনের সাথে আরও যারা নিহত হয়েছেন:
• আলী (রা:)এর সন্তানদের মধ্যে থেকে আবু বকর, মুহাম্মাদ, উসমান, জাফর এবং আব্বাস।
• হোসাইনের সন্তানদের মধ্যে হতে আবু বকর, উমর, উসমান, আলী আকবার এবং আব্দুল্লাহ।
• হাসানের সন্তানদের মধ্যে হতে আবু বকর, উমর, আব্দুল্লাহ এবং কাসেম।
• আকীলের সন্তানদের মধ্যে হতে জাফর, আব্দুর রাহমান এবং আব্দুল্লাহ বিন মুসলিম বিন আকীল।
• আব্দুল্লাহ বিন জাফরের সন্তানদের মধ্যে হতে আউন এবং আব্দুল্লাহ। ইতি পূর্বে উবাইদুল্লাহ বিন জিয়াদের নির্দেশে মুসলিম বিন আকীলকে হত্যা করা হয়। আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট হোন। আমীন

৫) কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত ধারণা ঠিক নয়:
হুসাইন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুতে আকাশ থেকে রক্তের বৃষ্টি হওয়া, সেখানের কোন পাথর উঠালেই তার নীচ থেকে রক্ত প্রবাহিত হওয়া এবং কোন উট জবাই করলেই তা রক্তে পরিণত হয়ে যাওয়ার ধারণা মিথ্যা ও বানোয়াট। মুসলমানদের আবেক ও অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলে তাদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্যই এ সমস্ত বানোয়াট ঘটনা বলা হয়ে থাকে। এগুলোর কোন সহীহ সনদ নেই।
ইমাম ইবনে কাছীর (র:) বলেন: হুসাইনের মৃত্যুর ঘটনায় লোকেরা উল্লেখ করে থাকে যে, সে দিন কোন পাথর উল্টালেই রক্ত বের হত, সে দিন সূর্যগ্রহণ হয়েছিল, আকাশের দিগন্ত লাল হয়ে গিয়েছিল এবং আকাশ থেকে পাথর বর্ষিত হয়েছিল। এসব কথা সন্দেহ মূলক। প্রকৃত কথা হচ্ছে, এগুলো বিশেষ একটি গোষ্ঠীর বানোয়াট ও মিথ্যা কাহিনী ছাড়া আর কিছুই নয়। তারা বিষয়টিকে বড় করার জন্য এগুলো রচনা করেছে।
কোন সন্দেহ নেই যে, কারবালার ময়দানে সপরিবারে হুসাইনের শাহাদাত বরণ একটি বিরাট ঘটনা। কিন্তু তারা এটিকে কেন্দ্র করে যে মিথ্যা রচনা করেছে, তার কোনটিই সংঘটিত হয় নি।
ইসলামের ইতিহাসে হুসাইনের মৃত্যুর চেয়ে অধিক ভয়াবহ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। সে সমস্ত ঘটনায় উপরোক্ত বিষয়গুলোর কোনটিই সংঘটিত হয় নি। হুসাইনের পিতা আলী (রা:) আব্দুর রাহমান মুলজিম খারেজীর হাতে নির্মম ভাবে নিহত হন। সকল আলেমের ঐকমতে হুসাইনের চেয়ে আলী (রা:) অধিক শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত ছিলেন। তার শাহাদাতের দিন কোন পাথর উল্টালেই রক্ত বের হয় নি, সে দিন সূর্যগ্রহণ হয় নি, আকাশের দিগন্ত লাল হয়ে যায় নি এবং আকাশ থেকে পাথরও বর্ষিত হওয়ারও কোন প্রমাণ নেই।
উসমান বিন আফফান (রা:)এর বাড়ি ঘেরাও করে বিদ্রোহীরা তাঁকে হত্যা করে। তিনি মজলুম অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে এসবের কোনটিই সংঘটিত হয় নি। উসমান (রা:)এর পূর্বে খলীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনুল খাত্তাব ফজরের নামাযে দাঁড়ানোর সময় নির্মমভাবে নিহত হন। এই ঘটনায় মুসলিমগণ এমন মুসীবতে পড়েছিলেন, যা ইতিপূর্বে কখনও পড়েন নি। তাতে উপরোক্ত লক্ষণগুলো দেখা যায় নি।
আল্লাহর সর্বশেষ্ঠ বান্দা সমগ্র নবী-রাসূলের সরদার রাহমাতুল লিল আলামীন মৃত্যু বরণ করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে এমন কিছু সংঘটিত হয় নি। যেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিশু পুত্র ইবরাহীম মৃত্যু বরণ করেন, সেদিন সূর্যগ্রহণ লেগেছিল। লোকেরা বলতে লাগল: ইবরাহীমের মৃত্যুতে আজ সূর্যগ্রহণ হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূর্যগ্রহণের নামায আদায় করলেন এবং খুতবা প্রদান করলেন। খুতবায় তিনি বর্ণনা করলেন যে, সূর্য এবং চন্দ্র কারও মৃত্যু বা জন্ম গ্রহণের কারণে আলোহীন হয় না। এগুলো আল্লাহর নিদর্শন। তিনি এগুলোর মাধ্যমে তাঁর বান্দাদেরকে ভয় দেখিয়ে থাকেন।

৬) হুসাইনের বের হওয়া ন্যায় সংগত ছিল কি?
বিজ্ঞ সাহাবীদের মতে কুফার উদ্দেশ্যে হুসাইনের বের হওয়াতে কল্যাণের কোন লক্ষণ পরিলক্ষিত হয় নি। এ জন্যই অনেক সাহাবী তাঁকে বের হতে নিষেধ করেছেন এবং তাঁকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তিনি বিরত হন নি। কুফায় যাওয়ার কারণেই ঐ সমস্ত জালেম ও স্বৈরাচারেরা রাসূলের দৌহিত্রকে শহীদ করতে সক্ষম হয়েছিল। তার বের হওয়া এবং নিহত হওয়াতে যে পরিমাণ ফিতনা ও ফসাদ সৃষ্টি হয়েছিল, মদিনায় অবস্থান করলে তা হওয়ার ছিল না। কিন্তু মানুষের অনিচ্ছা সত্ত্বেও আল্লাহর নির্ধারিত ফয়সালা ও তকদীরের লিখন বাস্তবে পরিণত হওয়া ছাড়া ভিন্ন কোন উপায় ছিল না। হুসাইনের হত্যায় বিরাট বড় অন্যায় সংঘটিত হয়েছে, কিন্তু তা নবীদের হত্যার চেয়ে অধিক ভয়াবহ ছিল না। আল্লাহর নবী ইয়াহ-ইয়া (আঃ)কে পাপিষ্ঠরা হত্যা করেছে। জাকারিয়া (আঃ)কেও তাঁর জাতির লোকেরা নির্মমভাবে শহীদ করেছে। এমনি আরও অনেক নবীকে বনী ইসরাইলরা কতল করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

قل قد جاءكم رسل من قبلي بالبينات وبالذي قلتم فلم قتلتموهم إن كنتم صادقين

“তুমি তাদের বলে দাও, তোমাদের মাঝে আমার পূর্বে বহু রসূল নিদর্শনসমূহ এবং তোমরা যা আবদার করেছ তা নিয়ে এসেছিলেন, তখন তোমরা কেন তাদেরকে হত্যা করলে যদি তোমরা সত্য হয়ে থাক।” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৩)
এমনভাবে উমর, উসমান ও আলী (রা:)কেও হত্যা করা হয়েছে। সুতরাং তাঁর হত্যা কাণ্ড নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করার কোন যুক্তি নেই।

৭) কারবালার ঘটনাকে আমরা কিভাবে মূল্যায়ন করব?
যে মুসলিম আল্লাহকে ভয় করে তার জন্য হুসাইনের নিহত হওয়ার ঘটনা স্মরণ করে বিলাপ করা, শরীর জখম করা, গাল, মাথা ও বুক থাবড়ানো বা এ রকম অন্য কিছু করা জায়েজ নেই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

ليس منا من لطم الخدود و شق الجيوب

“যে ব্যক্তি মুসীবতে পড়ে নিজ গালে চপেটাঘাত করল এবং শরীরের কাপড় ছিঁড়ল, সে আমাদের দলের নয়।” (বুখারী)
তিনি আরও বলেন:
“মুসীবতে পড়ে বিলাপকারী, মাথা মুন্ডনকারী এবং কাপড় ও শরীর কর্তনকারীর সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন:

إن النائحة إذا لم تتب فإنها تلبس يوم القيامة درعاً من جرب و سربالاً من قطران

“মৃত ব্যক্তির উপর বিলাপকারী যদি তওবা না করে মারা যায়, তাকে কিয়ামতের দিন খাঁজলীযুক্ত (লোহার কাঁটাযুক্ত) কোর্তা পড়ানো হবে এবং আলকাতরার প্রলেপ লাগানো পায়জামা পড়ানো হবে।” (মুসলিম)
তিনি আরও বলেন:

أربع في أمتي من أمر الجاهلية لا يتركونهن: الفخر في الأحساب و الطعن في الأنساب و الاستسقاء بالنجوم و النياحة

“আমার উম্মতের মধ্যে জাহেলী যুগের চারটি স্বভাব বিদ্যমান রয়েছে। তারা তা ছাড়তে পারবে না।
(১) বংশ মর্যাদা নিয়ে গর্ব করা,
(২) মানুষের বংশের নাম তুলে দুর্নাম করা,
(৩) তারকারাজির মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করা এবং
(৪) মৃত ব্যক্তির উপর বিলাপ করা। তিনি আরও বলেন: মানুষের মাঝে দুটি জিনিষ রয়েছে, যা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত। মানুষের বংশের বদনাম করা এবং মৃত ব্যক্তির উপর বিলাপ করা।” (মুসলিম)
তিনি আরও বলেন:

النياحة من أمر الجاهلية و إن النائحة إذا ماتت و لم تتب قطع الله لها ثيابا من قطران و درعاً من لهب النار

“মৃত ব্যক্তির উপর বিলাপ করা জাহেলিয়াতের অন্তর্ভুক্ত। বিলাপকারী যদি তওবা না করে মারা যায়, তাকে কিয়ামতের দিন আল্লাহ আলকাতরার প্রলেপ লাগানো জামা পড়াবেন এবং অগ্নি শিখা দ্বারা নির্মিত কোর্তা পরাবেন।” (ইবনে মাজাহ)
একজন বিবেকবান মুসলিমের উপর আবশ্যক হচ্ছে সে এ ধরণের মুসীবতের সময় আল্লাহর নির্দেশিত কথা বলবে। আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেন:

الذين إذا أصابتهم مصيبة قالوا إنا لله وإنا إليه راجعون

“যখন তাঁরা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয়ই আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তারই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো।” (সূরা বাকারাঃ ১৫৬)
হুসাইনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আলী বিন হুসাইন, মুহাম্মাদ এবং জাফর জীবিত ছিলেন। তাদের কেউ হুসাইনের মৃত্যুতে মাতম করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। তারা ছিলেন আমাদের হেদায়েতের ইমাম ও আদর্শ।
বিলাপ করা, গাল ও বুকে চপেটাঘাত করা বা এ জাতীয় অন্য কোন কাজ কখনই এবাদত হতে পারে না। আশুরার দিনে ক্রন্দনের ফজিলতে যে সমস্ত বর্ণনা উল্লেখ করা হয় তার কোনটিই বিশুদ্ধ নয়। বিলাপ করা জাহেলী জামানার আচরণ বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে তা থেকে বিরত থাকার আদেশ দিয়েছেন।

৮) মৃত ব্যক্তির উপর বিলাপ করার ক্ষেত্রে শিয়া মাজহাবের মতামত:
বিলাপ থেকে বিরত থাকার আদেশ শুধু সুন্নি মুসলিম বা বনী উমাইয়াদের জন্য নয় কিংবা এটি কেবল তাদেরই আচরণ নয় যে, শিয়ারা তা গ্রহণ করতে পারেন না; বরং আহলে বাইতের কথাও তাই। আহলে সুন্নত এবং শিয়া উভয় শ্রেণীর নিকটই মৃত ব্যক্তির উপর বিলাপ করা নিষিদ্ধ।
শিয়া আলেম ইবনে বাবুওয়াই আল-কুম্মী বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
বিলাপ করা জাহেলী জামানার কাজ। (দেখুন শিয়াদের কিতাব: من لايحضره الفقيه)
মাজলেসী থেকে অপর বর্ণনায় এসেছে,

النياحة عمل الجاهلية

অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির উপর উচ্চ স্বরে রোদন করা জাহেলিয়াতের কাজ। (দেখুন: বিহারুল আনওয়ার ১০/৮২)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এ ধরণের নিষেধাজ্ঞার কারণেই আহলে সুন্নত ওয়াল জামআতের লোকেরা যে কোন মুসীবতের সময় মাতম ও বিলাপ করা থেকে বিরত থাকেন।

৯) আশুরার দিনে আমাদের করণীয় কীঃ
সুন্নি মুসলিমগণ এই দিনে রোজা রাখেন। কারণ এটি এমন একটি দিন যাতে আল্লাহ তায়ালা মুসা ও তাঁর জাতির লোকদেরকে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফেরাউন সম্প্রদায়কে পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছেন। আহলে সুন্নত ওয়াল জামআতের লোকেরা মনে করেন, খালেস দিলে রোজা অবস্থায় হুসাইনের জন্য দুয়া করা জাহেলী জামানার আচরণের মত মাতম ও বিলাপ করার চেয়ে অনেক উত্তম। এ দিনে রোজাদারের জন্য দুটি কল্যাণ রয়েছে। একটি হচ্ছে সম্মানিত দিনে রোজা রাখার ফযিলত আর অন্যটি হচ্ছে, রোজা অবস্থায় দুয়া করার ফজিলত। এই দুআর একটি অংশ বা সম্পূর্ণটাই তিনি ইচ্ছা করলে হুসাইনের জন্য করতে পারেন।
আশুরার দিনে রোজা রাখার ফজিলতে যা বর্ণিত হয়

“আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় আগমন করে দেখলেন ইহুদীরা আশুরার দিন রোজা রাখছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: এটি কোন রোজা। তারা উত্তর দিল যে, এটি একটি বিরাট পবিত্র দিন। এদিনে আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাইলকে তাদের শত্র“দের কবল থেকে পরিত্রাণ দিয়েছেন। তাই মুসা (আঃ) এ দিন রোজা রেখেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন: তাদের চেয়ে মুসা (আঃ)এর সাথে আমার সম্পর্ক অধিক। সুতরাং তিনি রোজা রাখলেন এবং সাহাবীদেরকে রোজা রাখার আদেশ দিয়েছেন।” (বুখারী)

“আয়েশা (রা:) বলেন: আইয়ামে জাহেলিয়াতেও কুরাইশরা আশুরার রোজা রাখত। রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালামও এ দিনে রোজা রাখতেন। মদিনায় হিজরত করে এসেও তিনি এ দিন রোজা রেখেছেন এবং লোকদেরকে রোজা রাখার আদেশ দিয়েছেন। যখন রমাযানের রোজা রাখা ফরজ করা হল তখন আশুরার রোজা ছেড়ে দিলেন। সুতরাং তখন থেকে যার ইচ্ছা রোজা রাখত আর যার ইচ্ছা রোজা রাখা ছেড়ে দিত।” (বুখারী)
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) হতে আরও বর্ণিত হয়েছে যে,

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আশুরার রোজা রাখলেন এবং রোজা রাখার আদেশ দিলেন, তখন সাহাবীগণ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! এটি তো এমন একটি দিন, যাতে ইয়াহুদ-নাসারারাও সম্মান করে। তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: আগামী বছর ইনশা-আল্লাহ্‌ নয় তারিখেও রোজা রাখবো। কিন্তু আগামী বছর আসার আগেই তিনি ইন্তেকাল করেছেন। (বুখারী)

১০) শিয়াদের বর্ণনায় আশুরার রোজা:
আলী বিন আবু তালেব (রা:) বলেন:

صوموا العاشوراء ، التاسع والعاشر ، فإنّه يكفّر الذنوب سنة

তোমরা আশুরার অর্থাৎ নয় এবং দশ তারিখে রোজা রাখো। কেননা ইহা পূর্বের এক বছরের গুনাহকে মোচন করে দেয়। (দেখুন: الاستبصار ২/১৩৪ (الحر العاملي في وسائل الشيعة৭/৩৩৭)
জাফর (রা:) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে,
আশুরার রোজা এক বছরের গুনাহর কাফফারা স্বরূপ।

১১) আশুরার দিনে মাতম করার ভিত্তি কোথায়?
বর্তমানে আশুরার দিনে হুসাইনীয়াত নামে যে অনুষ্ঠান, মাতম, বুক ও গাল থাবড়ানো, উচ্চ স্বরে ক্রন্দন এবং বিলাপ করে থাকে তার কোন ভিত্তি নেই। আহলে বাইতের মাজহাবেও তার কোন দলীল নেই এবং সর্বোপুরি ইসলামী আকীদার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। শিয়ারা যেহেতু বলে থাকে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা হালাল করেছেন কিয়ামত পর্যন্ত তা ছাড়া অন্য কিছু হালাল নয় এবং তিনি যা হারাম করেছেন কিয়ামত পর্যন্ত তা ছাড়া অন্য কিছু হারাম নেই সেহেতু তাদের কাছে প্রশ্ন হল: আপনারা যদি উপরোক্ত কথাটি বিশ্বাস করেন তাহলে বাক্যটির বাস্তবায়ন কোথায়? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক নিষিদ্ধ জাহেলী জামানার একটি অভ্যাসকে আপনারা ইসলাম ও আহলে বাইতের নিদর্শন নির্ধারণ করেছেন কেন?
আশ্চর্যের কথা হচ্ছে তাদের মাশায়েখগণ আশুরার দিনে মাতম ও হায় হুসাইন হায় হুসাইন বলে চিৎকার করাকে আল্লাহর নিদর্শন বলে উল্লেখ করে নিম্নের আয়াতটিকে দলীল হিসেবে পেশ করে থাকেন। আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেন:

ذَلِكَ وَمَنْ يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِنْ تَقْوَى الْقُلُوبِ

এটা শ্রবণযোগ্য। কেউ আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে তা তো তার হৃদয়ের অল্লাহ্ভীতি প্রসূত। (সূরা হজ্জ: ৩২)
অতএব তারা বিলাপ করা, গাল ও বুক থাবড়ানো, আল্লাহর বান্দা ও রাসূলের সাহাবীদেরকে গালাগালি করাকে আল্লাহর সম্মানিত নিদর্শন মনে করেই করে থাকেন। এর চেয়ে অধিক মূর্খতা আর কি হতে পারে?
আরও আশ্চর্যের কথা হচ্ছে আশুরার রোজার ব্যাপারে সুস্পষ্ট হাদীছ থাকা সত্ত্বেও এগুলোকে তারা জেনেও না জানার ভান করে থাকেন। অপর পক্ষে তাদের আলেমগণ এই বর্ণনাগুলোকে বারবার আহলে সুন্নত ও বনী উমাইয়াদের বানানো বলে অপবাদ দিয়ে থাকেন। তারা আরও বলেন যে, বনী উমাইয়াগণ হুসাইনের মৃত্যু উপলক্ষে অনুষ্ঠান করার জন্য এই রোজার প্রচলন করেছেন। (নাউযুবিল্লাহ্) অথচ সুন্নি ও শিয়া উভয় মাজহাবের হাদীছের কিতাবেই এই রোজার ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর পবিত্র পরিবার এবং সাহাবীগণ আশুরার রোজা রেখেছেন। তিনি মুসলিমদেরকে রোজা রাখার আদেশ দিয়েছেন।
এখন তাদের কাছে প্রশ্ন হল: যে ব্যক্তি আশুরার দিনে রোজা রেখে, জিকির-আজকার করে, কুরআন তেলাওয়াত করে এবং অন্যান্য এবাদতের মাধ্যমে এই দিন অতিবাহিত করে সে হুসাইনের মৃত্যুতে আনন্দের অনুষ্ঠান করল? না যে ব্যক্তি মানুষের মাঝে গোশত, খাদ্য-পানীয় এবং অন্যান্য বস্তু বিতরণ করল এবং বিভিন্ন শির্কী কবিতা আবৃতি করে রাত পার করে দিল সে হুসাইনের মৃত্যু উদযাপন করল? মূলত: তাদের কথার মধ্যে সুস্পষ্ট স্ববিরোধীতা রয়েছে।

১২) হুসাইনের হত্যায় ইয়াজিদ কতটুকু দায়ী?
প্রথমেই বলে নিতে চাই যে আমার এই কথা ইয়াজিদের পক্ষে উকালতি করার জন্য নয়; বরং মূল সত্যকে বিশ্বের সকল বাংলাভাষী মুসলিমের সামনে তুলে ধরার জন্যে।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া (র:) বলেন: সকল মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকের ঐকমতে ইয়াজিদ বিনম মুয়াবিয়া হুসাইনকে হত্যার আদেন দেন নি। বরং তিনি উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদকে চিঠির মাধ্যমে আদেশ দিয়েছিলেন যে, তিনি যেন ইরাকের জমিনে হুসাইনকে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে বাঁধা দেন। এতটুকুই ছিল তার ভূমিকা। বিশুদ্ধ মতে তার কাছে যখন হুসাইন নিহত হওয়ার খবর পৌঁছল তখন তিনি আফসোস করেছেন। ইয়াজিদের বাড়িতে কান্নার ছাপ প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি হুসাইন পরিবারের কোন মহিলাকে বন্দী বা দাসীতে পরিণত করেন নি; বরং পরিবারের সকল সদস্যকে সম্মান করেছেন। সসম্মানে হুসাইন পরিবারের জীবিত সদস্যদেরকে মদিনায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন।
যে সমস্ত রেওয়াতে বলা হয়েছে যে, ইয়াজিদ আহলে বাইতের মহিলাদেরকে অপদস্থ করেছেন এবং তাদেরকে বন্দী করে দামেস্কে নিয়ে বেইজ্জতি করেছেন, তার কোন ভিত্তি নেই। বনী উমাইয়াগণ বনী হাশেমকে খুব সম্মান করতেন। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ যখন ফাতেমা বিনতে আব্দুল্লাহ বিন জাফরকে বিয়ে করলেন তখন আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান এই বিয়ে মেনে নেন নি। তিনি হাজ্জাজকে বিয়ে বিচ্ছিন্ন করার আদেশ দিয়েছেন।
শুধু তাই নয় হুসাইন হত্যার জন্য দায়ী উবাইদুল্লাহ বিন জিয়াদের কাছে যখন হুসাইনের পরিবারের মহিলাদেরকে উপস্থিত করা হল তখন তিনি আলাদাভাবে তাদের জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করলেন এবং তাদের ভরণ-পোষণ ও পরিধেয় বস্ত্রের ব্যবস্থা করলেন। (ইবনে জারীর হাসান সনদে বর্ণনা করেছেন)
ঐতিহাসিক ইজ্জত দাররুযা বলেন: হুসাইন হত্যার জন্য ইয়াজিদকে সরাসরি দায়ী করার কোন দলীল নেই। তিনি তাঁকে হত্যার আদেশ দেন নি। তিনি যেই আদেশ দিয়েছেন, তার সার সংক্ষেপ হচ্ছে, তাঁকে ঘেরা করা হোক এবং তিনি যতক্ষণ যুদ্ধ না করবেন ততক্ষণ যেন তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ না করা হয়।
ইমাম ইবনে কাছীর (র:) বলেন: এটি প্রায় নিশ্চিত যে ইয়াজিদ যদি হুসাইনকে জীবিত পেতেন, তাহলে তাঁকে হত্যা করতেন না। তাঁর পিতা মুআভীয়া (রা:) তাকে এ মর্মে অসীয়তও করেছিলেন। ইয়াজিদ এই কথাটি সুস্পষ্টভাবেই ঘোষণা করেছিলেন।

১৩) তাহলে কে হুসাইনকে হত্যা করল:
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কে হুসাইনকে হত্যা করল। সুন্নি মুসলিমগণ? আমীর মুআভীয়া? ইয়াজিদ বিন মুআভীয়া? না অন্য কেউ?
উত্তরটি মেনে নেওয়া অনেক মুসলিমের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হলেও তা প্রকাশ না করে পারছি না। প্রকৃত ও সঠিক তথ্য হল শিয়াদের একাধিক কিতাব বলছে যে, শিয়ারাই (ইরাক বাসীরাই) হুসাইনকে হত্যা করেছে।
সায়্যেদ মুহসিন আল-আমীন বলেন: বিশ হাজার ইরাক বাসী হুসাইনের পক্ষে বয়াত নেয়। পরবর্তীতে তারা তাঁর সাথে খেয়ানত করেছে, তাঁর বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করেছে এবং তাঁকে হত্যা করেছে। (দেখুন: আয়ানুশ শিয়া ১/৩৪)

১৪) হুসাইনের হত্যাকারী নির্ধারণে ইবনে উমর (রা:)এর অভিমত:
ইবনে আবী নু’ম হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন:

আমি একদা আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের নিকট উপস্থিত ছিলাম। তখন একজন লোক তাঁকে মশা হত্যা করার হুকুম জানতে চাইল। তিনি তখন লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কোন দেশের লোক? সে বলল: ইরাকের। ইবনে উমর (রা:) তখন উপস্থিত লোকদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: তোমরা এই লোকটির প্রতি লক্ষ্য কর। সে আমাকে মশা হত্যা করার হুকুম জিজ্ঞেস করছে। অথচ তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাতিকে হত্যা করেছে। আর আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, এরা দুজন (হাসান ও হুসাইন) আমার দুনিয়ার দুটি ফুল। (বুখারী, হাদীছ নং- ৫৯৯৪) অন্য বর্ণনায় মশার স্থলে মাছির কথা এসেছে।

১৫) হুসাইনের ভাষণই প্রমাণ করে যে ইয়াজিদ তাঁর হত্যার জন্য সরাসরি দায়ী নয়:
হুসাইন (রা:) নিহত হওয়ার পূর্বে ইরাক বাসীদেরকে ডেকে বলেছেন: তোমরা কি পত্রের মাধ্যমে আমাকে এখানে আসতে আহবান করো নি? আমাকে সাহায্য করার ওয়াদা করো নি? অকল্যাণ হোক তোমাদের! যেই অস্ত্র দিয়ে আমরা ও তোমরা মিলে ইসলামের শত্র“দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি এখন সেই অস্ত্র তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে চালাতে যাচ্ছে। মাছি যেমন উড়ে যায় তেমনি তোমরা আমার পক্ষে কৃত বয়াত থেকে সড়ে যাচ্ছ, পোঁকা-মাকড়ের ন্যায় তোমরা উড়ে যাচ্ছ এবং সকল ওয়াদা-অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছ। ধ্বংস হোক এই উম্মতের তাগুতের দলেরা! (দেখুন আল-ইহতেজাজ লিত্ তাবরুসী)
ইমাম হুসাইনের এই ভাষণের কোন স্থানেই তিনি ইয়াজিদকে দায়ী করেন নি। ঘুরেফিরে ভাষণটি এই কথার প্রমাণ করে যে, তাঁর করুন পরিস্থিতির জন্য ইরাক বাসীগণই।
অতঃপর হুর বিন ইয়াজিদ নামক হুসাইনের একজন সমর্থক কারবালার প্রান্তরে দাড়িয়ে ইরাক বাসী সৈনিকদেরকে ডাক দিয়ে বললেন: তোমরা কি এই নেককার বান্দাকে এখানে আসতে আহবান করো নি? তিনি যখন তোমাদের কাছে এসেছেন তখন তোমরা তাঁকে পরিত্যাগ করেছ এবং তাঁকে হত্যা করার জন্য তাঁর শত্রুতে পরিণত হয়েছ। আর তিনি এখন তোমাদের হাতে বন্দী হয়েছেন। আল¬াহ যেন কিয়ামতের দিন তোমাদের পিপাসা না মেটান এবং তার উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করেন! (দেখুন: الإرشاد للمفيد ২৩৪ ، إعلام الورى بأعلام الهدى)
এই পর্যায়ে হুসাইন তাঁর পূর্বের সমর্থকদের বিরুদ্ধে একটি বদদুআ করলেন। তিনি বলেন:

“হে আল্লাহ! আপনি যদি তাদের হায়াত দীর্ঘ করেন, তাহলে তাদের দলের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করে দিন। তাদেরকে দলে দলে বিচ্ছিন্ন করে দিন। তাদের শাসকদেরকে তাদের উপর কখনই সন্তুষ্ট করবেন না। তারা আমাদেরকে সাহায্য করবে বলে ডেকে এনেছে। অতঃপর আমাদেরকে হত্যা করার জন্য উদ্যত হয়েছে।
হুসাইনের এই দুয়া প্রমাণ করে যে, ইয়াজিদ প্রত্যক্ষভাবে হুসাইনের হত্যায় জড়িত ছিল না। কেননা তিনি দুয়ায় বলেছেন: হে আল্লাহ! আপনি তাদের শাসকদেরকে তাদের উপর কখনই সন্তুষ্ট করবেন না। এ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, ইরাক বাসীগণ (শিয়াগণ) উমাইয়া শাসকদের সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় হুসাইনের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে এবং তাঁর সাথে খেয়ানত করেছে। বাস্তবে তাই হয়েছে। পরবর্তীতে উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদকেও নির্মম ও নিকিৃষ্টভাবে হত্যা করা হয়েছে।

১৬) আলী বিন হুসাইন তাঁর পিতা হুসাইনকে হত্যার জন্য কুফা বাসীদেরকে দায়ী করেছেন?
শিয়া ঐতিহাসিক ইয়াকুবী বলেন: আলী বিন হুসাইন যখন কুফায় প্রবেশ করলেন তখন দেখলেন কুফার মহিলারা হুসাইন হত্যার বেদনায় ক্রন্দন এবং বিলাপ করছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ এরা কি আমাদের হত্যায় বিলাপ করছে? তাহলে আমাদেরকে হত্যা করল কে? অর্থাৎ তারা ব্যতীত আমাদের পরিবারের লোক ও আত্মীয়দেরকে অন্য কেউ হত্যা করে নি (দেখুন: তারিখে ইয়াকুবে ১/২৩৫)
উপরে বর্ণিত পৃষ্ঠা নাম্বারসহ তাদের কিতাবগুলোর তথ্য প্রমাণ করে যে, যারা নিজেদরোকে হুসাইনের সমর্থক ও প্রেমিক বলে দাবী করেন, তারাই তাঁকে হত্যা করেছেন। অতঃপর এই মারাত্মক অপরাধের জ্বালা অন্তর থেকে দূর করার জন্য তারাই পরবর্তীতে কেঁদে বুক ভাসিয়েছেন এবং যাদের কান্না আসে নি, তারাও অযথা কান্নার ভান করেছেন। এই খেলা-তামাশা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এবং এখনও চলছে। তাদের অনুসারীরা এখনও হুসাইনের জানাজা বহন করছেন।
হুসাইনের মৃত্যুতে রোদন করা যদি আহলে বাইতের প্রতি তাদের প্রকৃত ভালবাসার প্রমাণ হয়, তাহলে হুসাইনের প্রতি তাদের ভালবাসা সত্য হলে তারা হামজাহ (রা:)এর মৃত্যুতে রোদন করে না কেন?
হুসাইনের উপর তাদের এই কান্না যদি আহলে বাইতের প্রতি অগাধ ভালবাসার কারণেই হত, তাহলে শহীদদের সরদার রাসূলের চাচা হামজা (রা:)এর মৃত্যুতে তারা ক্রন্দন করে না কেন? তাঁকে যে নির্মমভাবে ও পাশবিকতার হত্যা করা হয়েছে, হুসাইন হত্যার পাশবিকতার চেয়ে তা কোন অংশে কম নয়। সায়্যেদ হামজাকে হত্যা করে তাঁর পেট ফেরে কলিজা বের করা হয়েছে। তারা কেন এই হত্যাকাণ্ডের জন্য বাৎসরিক মাতম করে না? তাদের বুক ও চেহারায় আঘাত করে না কেন? কাপড় টেনে ছিঁড়ে না কেন? প্রতি বছর যখন উহুদ যুদ্ধের দিন ও তারিখ আসে তখন তলোয়ার খেলায় মেতে উঠে না কেন? সায়্যেদ হামজাহ কি আহলে বাইতের একজন সম্মানিত সদস্য নন? এখানেই শেষ নয়; রাসূলের মৃত্যুর চেয়ে অধিক বড় কোন মুসীবত আছে কি? তাঁর মৃত্যুতে তাদের ক্রন্দন ও মাতম কোথায়? সচেতন পাঠকদেরকেই এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করে নিতে হবে এবং কারও আকীদায় ত্রুটি থাকলে লেখাটি পড়েই তা সংশোধন করে নিতে হবে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, তাদের কাছে হুসাইনই সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কি কারণে তাদের কাছে এত প্রিয়? উত্তর পূর্বে উল্লেখ করেছি। সেটিই আসল কারণ? না ইমাম হুসাইন কর্তৃক একজন পারস্য মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন, তাই এত ভালবাসা? উভয়টিই এর কারণ হতে মানা কোথায়? হুসাইন ও তাঁর পিতা আলী বিন আবু তালিব সম্পর্কে তাদের অন্যান্য আকীদাহ-বিশ্বাসের দিকে না গিয়ে এখানেই ছেড়ে দিলাম।

১৭) হুসাইন রা. এর মাথা কোথায় গিয়েছিল?
দামেস্কে ইয়াজিদের দরবারে হুসাইনের মাথা প্রেরণের বর্ণনা সহীহ সূত্রে প্রমাণিত হয় নি। বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, তিনি কারবালার প্রান্তরে শহীদ হয়েছেন। তাঁর সম্মানিত মাথা কুফার গভর্নর উবাইদুল্লাহ বিন জিয়াদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। আনাস বিন মালিক (রা:) বলেন: হুসাইনের মাথা উবাইদুল্লাহ এর কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি তাঁর মাথাকে একটি থালার মধ্যে রেখে একটি কাঠি হাতে নিয়ে তা নাকের ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন এবং তাঁর সৌন্দর্য দেখে সম্ভবত বেখেয়ালে কিছুটা বর্ণনাও করে ফেলেছিলেন। হাদীছের শেষের দিকে আনাস (রা:) বলেন: হুসাইন (রা:) ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সবচেয়ে বেশী সাদৃশ্যপূর্ণ। (বুখারী)
অন্য বর্ণনায় আছে, আনাস (রা:) বলেন: আমি উবাইদুল্লাহকে বললাম, তোমার হাতের কাঠি হুসাইনের মাথা থেকে উঠিয়ে ফেল। কারণ আমি তোমার কাঠি রাখার স্থানে রাসূলের পবিত্র মুখ দিয়ে চুমু খেতে দেখেছি। এতে কাঠি সংকোচিত হয়ে গেল। (দেখুন: ফতহুল বারী ৭/৯৬)
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, এরপর কোথায় হুসাইনের কবর হয়েছে এবং তাঁর মাথা কোথায় গিয়েছে, তা সঠিক সূত্রের মাধ্যমে জানা যায় নি। প্রকৃত ও সঠিক জ্ঞান আল্লাহর নিকটেই।

১৮) যেমন কর্ম তেমন ফল:
পরবর্তীতে আল-আশতার নাখয়ীর হাতে উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদ নির্মমভাবে নিহত হন। যখন নিহত হলেন তখন তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে মসজিদে রাখা হল। তখন দেখা গেল একটি সাপ এসে মাথার চারপাশে ঘুরছে। পরিশেষে উবাইদুল্লাহ বিন জিয়াদের নাকের ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে মুখ দিয়ে বের হল। ফের মুখ দিয়ে প্রবেশ করে নাকের ছিদ্র দিয়ে তিনবার বের হতে দেখা গেল। (দেখুন: তিরমিযী, ইয়াকুব বিন সুফীয়ান)

১৯) ইয়াজিদ সম্পর্কে একজন মুসলিমের ধারণা কেমন হওয়া উচিত:
তাফসীর, হাদীছ, আকীদা, এবং ইতিহাস ও জীবনীর কিতাবগুলো অধ্যয়ন করে যতদূর জানতে পেরেছি, তাতে দেখা যায় সালফে সালেহীনের নিকট গ্রহণযোগ্য এবং অনুকরণীয় কোন ইমামের কিতাবে ইয়াজিদের উপর লানত করা বৈধ হওয়ার কথা আজ পর্যন্ত খুঁজে পাই নি। কেউ তার নামের শেষে রাহিমাহুল্লাহ বা লাআনা হুল্লাহ- এ দু’টি বাক্যের কোনটিই উল্লেখ করেন নি। সুতরাং তিনি যেহেতু তার আমল নিয়ে চলে গেছেন, তাই তার ব্যাপারে আমাদের জবান দরাজ করা ঠিক নয়। তাকে গালাগালি করাতে আমাদের ক্ষতি ছাড়া আর কিছু অর্জিত হবে না। তার আমল নিয়ে তিনি চলে গেছেন। আমাদের আমলের হিসাব আমাদেরকেই দিতে হবে। তার ভাল মন্দ আমলের হিসাব তিনিই দিবেন।
ইমাম যাহাবী ইয়াজিদের ব্যাপারে বলেন:

لانسبه ولانحبه

অর্থাৎ “আমরা তাকে গালি দিবো না এবং ভালও বাসবো না।” মদ পান করা, বানর নিয়ে খেলা করা, ফাহেশা কাজ করা এবং আরও যে সমস্ত পাপ কাজের অপবাদ ইয়াজিদের প্রতি দেয়া হয়, তা সহীহ সূত্রে প্রমাণিত নয়। তবে তাঁর চেয়ে হুসাইন যে বহু গুণে শ্রেষ্ঠ ছিলেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
সুতরাং তিনি মুসলিম ছিলেন। তার জীবনের শেষ মুহূর্তে আমরা যেহেতু উপস্থিত ছিলাম না, তাই তার ব্যাপারটি আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়াই অধিক নিরাপদ। তা ছাড়া বুখারী শরীফের একটি হাদীছে তার ক্ষমা পাওয়ার প্রতি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেখানে আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: আমার উম্মতের একটি দল কুস্তুনতীনিয়ায় যুদ্ধ করবে। তাদেরকে ক্ষমা করা দেয়া হবে। জানা যাচ্ছে, ইয়াজিদ বিন মুআভীয়া ছিলেন সেই যুদ্ধের সেনাপতি। আর হুসাইন তাতে সাধারণ সৈনিক হিসেবে শরীক ছিলেন। সুতরাং ইয়াজিদও ক্ষমায় শামিল হতে পারে। আল্লাহই ভাল জানেন।

২০) উপসংহার:
হুসাইনরে মৃত্যু নিয়ে লোকেরা তিনভাগে বিভক্ত। একদলের মতে তিনি অন্যায়ভাবে মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্ট করার জন্য ইয়াজিদের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। তাই তাঁকে হত্যা করা সঠিক ছিল। তারা বুখারী শরীফের এই হাদীছ দিয়ে দলীল দেয়ার চেষ্টা করে থাকেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

من جاءكم وأمركم على رجل واحد يريد أن يفرق جماعتكم فاقتلوه

“একজন শাসকের সাথে তোমরা ঐক্যবদ্ধ থাকা অবস্থায় যদি তোমাদের জামআতে বিভক্তি সৃষ্টির জন্য কেউ আগমন করলে তাকে হত্যা করো।” (বুখারী)
তারা বলেন: মুসলিমরা ইয়াজিদের শাসনের উপর ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। হুসাইন এসে সেই ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করেছেন। সুতরাং তাঁকে হত্যা করা যুক্তিসংগত হয়েছে।
অন্যদল মনে করেন হুসাইনই ছিলেন খেলাফতের একমাত্র হকদার। তাঁর আনুগত্য করা ব্যতীত অন্য কারও অনুসরণ করা বৈধ ছিল না। জামআত, জুমআসহ ইসলামের কোন কাজই তাঁর পিছনে বা তাঁর নিয়োগ কৃত প্রতিনিধি ছাড়া অন্য কারও অনুসরণ করে সম্পাদন করলে তা বাতিল হবে। এমন কি তাঁর অনুমতি ব্যতীত শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করাও বৈধ ছিল না। এমনি আরও অনেক কথা। এই দলের কথার সমর্থনে কোন সুস্পষ্ট দলীল খুঁজে পাওয়া যায় নি।
আর উপরোক্ত উভয় দলের মাঝখানে হচ্ছে আহলে সুন্নত ওয়াল জামআতের মাজহাব। তাঁরা উপরের দুটি মতের কোনটিকেই সমর্থন করেন না। বরং তাঁরা বলেন: হুসাইন মজলুম ও শহীদ অবস্থায় নিহত হয়েছেন। তিনি মুসলিম জাতির নির্বাচিত আমীর বা খলীফা ছিলেন না। সুতরাং দ্বিতীয় মতের পোষণকারীদের কথা ঠিক নয়।
আর যারা বুখারী শরীফের হাদিছকে দলীল হিসেবে পেশ করে হুসাইনকে হত্যা করা বৈধ হওয়ার কথা বলে থাকেন তাদের দলীল গ্রহণ সঠিক নয়। হাদীছ কোনভাবেই তাদের কথাকে সমর্থন করে না। কারণ তিনি যখন তাঁর চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকীলের চিঠি পেলেন তখন খেলাফতের দাবী ছেড়ে দিয়ে ইয়াজিদের সৈনিকদের কাছে তিনটি প্রস্তাব পেশ করেছেন।
• সিরিয়ায় গিয়ে তাঁকে ইয়াজিদের সাথে সাক্ষাত করতে দেয়া হোক।
• অথবা তাকে মুসলিম রাজ্যের কোন সীমান্তের দিকে যেতে দেয়া হোক।
• অথবা তাঁকে মদিনায় ফেরত যেতে দেয়া হোক।
কিন্তু তারা কোন প্রস্তাবই মেনে নেয় নি। বরং তারা তাঁকে আত্ম সমর্পণ করে তাদের হাতে বন্দী হওয়ার প্রস্তাব করল। অস্ত্র ফেলে দিয়ে তাদের পাল্টা প্রস্তাব মেনে নেওয়া হোসাইনের উপর মোটেই ওয়াজিব ছিল না। সুতরাং তিনি বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করাকেই বেছে নিলেন এবং ইয়াজিদের বিরাট বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সাহসিকতা ও বীরত্ব প্রদর্শন করে শাহাদাত বরণ করলেন।
পরিশেষে বলতে চাই যে, হুসাইনের মৃত্যু ও কারবালার ঘটনা নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করা কোন মুসলিমের কাজ হতে পারে না। এই হত্যা কাণ্ডের ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অন্যান্য মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড থেকে আলাদা কোন ঘটনা নয়। এ জাতিয় সকল ঘটনাকে সমানভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। বিষাদসিন্ধু মুসলিমদের কোন মূলনীতির গ্রন্থ নয়। এটি একটি কাল্পনিক উপন্যাস মাত্র। তা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মুসলিম জাতি ঐতিহাসিকভাবে একটি প্রমাণিত সত্যকে বাদ দিয়ে কাল্পনিক কাহিনীকে কখনই সত্য হিসাবে গ্রহণ করতেপারে না।

هذا وصلى الله على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين
রচনায়: শাইখ আব্দুল্লাহ শাহেদ মাদানী
জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদী আরব।

Translate