Sunday, March 26, 2023

জিকির

 শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

আভিধানিক অর্থ :-স্বরণ করা, মনে করা, উল্লেখ করা, বর্ণনা করা।

পারিভাষিক অর্থ :-শরীয়তের আলোকে জিকির বলা হয়, মুখে বা অন্তরে আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা এবং প্রশংসা করা, পবিত্র কুরআন পাঠ করা, আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা, তার আদেশ-নিষেধ পালন করা, তার প্রদত্ত নেয়ামত ও সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। ইমাম নববী রহ. বলেন :-জিকির কেবল তাসবীহ, তাহলীল, তাহমীদ ও তাকবীর ইত্যাদিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আনুগত্যের সাথে প্রত্যেক আমলকারীই জিকিরকারী হিসেবে বিবেচিত। আল্লাহ তাআলার জিকির এমন এক মজবুত রজ্জু যা সৃষ্টিকে স্রষ্টার সাথে সম্পৃক্ত করে। তাঁর সান্নিধ্য লাভের পথ সুগম করে। মানুষকে উত্তম আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত করে। সরল ও সঠিক পথের উপর অবিচল রাখে। এ-কারণে আল্লাহ তাআলা মুসলিম ব্যক্তিকে দিবা-রাত্রে গোপনে-প্রকাশ্যে জিকির করার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا ﴿41﴾ وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا ﴿42﴾ (الأحزاب)
মুমিনগণ তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর। এবং সকাল বিকাল আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা কর। [সূরা আহযাব ৪১,৪২]

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন :—
وَاذْكُرْ رَبَّكَ فِي نَفْسِكَ تَضَرُّعًا وَخِيفَةً وَدُونَ الْجَهْرِ مِنَ الْقَوْلِ بِالْغُدُوِّ وَالْآَصَالِ وَلَا تَكُنْ مِنَ الْغَافِلِينَ ﴿205﴾ الأعراف
তোমরা প্রতিপালককে মনে মনে সবিনয় ও সশংকচিত্তে অনুচ্চস্বরে প্রত্যুষে ও সন্ধ্যায় স্মরণ করবে এবং তুমি উদাসীন হবে না। [সূরা আরাফ ২০৫]

জিকিরের ফজিলত ও উপকারিতা
ইবনুল আরবী রহ. বলেন :— এ এক বড় অধ্যায় যেখানে জ্ঞানীরা হয়রান দিশেহারা হয়ে পড়েছে। কারণ, এর রয়েছে অনেক উপকারিতা, ইমাম ইবনুল কাইয়ুম রহ. স্বরচিত الوابل الصيب من الكلم الطيب গ্রন্থে সত্তুরের অধিক উপকার উল্লেখ করেছেন। নিম্নে কয়েকটির বিবরণ দেয়া হল।

১- ইহকাল ও পরকালে অন্তরে প্রশান্তি ও স্থিরতা লাভ: আল্লাহ তাআলা বলেন :—
الَّذِينَ آَمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ. الرعد:28
যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয় ; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়। (সূরা রাদ : ২৮)

২- আল্লাহর জিকির সবচেয়ে বড় ও সর্বোত্তম ইবাদত: কেননা আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করা হচ্ছে ইবাদতের আসল লক্ষ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ ﴿45﴾ العنكبوت
আর আল্লাহর স্মরণই তো সর্বশ্রেষ্ঠ। তোমরা যা কর আল্লাহ তা জানেন। [সূরা আনকাবুত ৪৫]

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন:
وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا ﴿35﴾ (الأحزاب)
এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও অধিক স্মরণকারী নারী – এদের জন্য আল্লাহ রেখেছেন ক্ষমা ও মহা প্রতিদান। [সূরা আহযাব ৩৫]

আবুদ্দারদা রা. থেকে বর্ণিত: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন :-
ألا أنبئكم بخير أعمالكم، وأزكاها عند مليككم، وأرفعها في درجاتكم، وخير لكم من إعطاء الذهب والورق، ومن أن تلقوا عدوكم فتضربوا أعناقهم ويضربوا أعناقكم ، قالوا بلى يا رسول الله، قال: ذكر الله. (رواه الترمذى:3299)
আমি কি তোমাদেরকে এমন এক আমল সম্পর্কে অবহিত করব না, যা তোমাদের অধিপতির নিকট সবচেয়ে উত্তম ও পবিত্র, এবং তোমাদের মর্যাদা অধিক বৃদ্ধিকারী, এবং তোমাদের জন্য স্বর্ণ-রূপা দান করা ও দুশমনের মুখোমুখি হয়ে তোমরা তাদের গর্দানে বা তারা তোমাদের গর্দানে আঘাত করার চেয়ে উত্তম ? তারা বলল :হ্যাঁ ইয়া রাসূলুল্লাহ ! তিনি বললেন :-জিকরুল্লাহ (আল্লাহর জিকির বা স্মরণ)। (তিরমিজি:৩২৯৯)

৩- আল্লাহর জিকিরকারী, তাঁর নিদর্শনাবলী থেকে শিক্ষা লাভকারী: তারাই বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন। আল্লাহ তাআলা বলেন :—
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآَيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ ﴿190﴾ الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ ﴿191﴾ آل عمران
আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবস ও রাত্রির পরিবর্তনে নিদর্শনাবলী রয়েছে বোধশক্তি সম্পন্ন লোকের জন্য, যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহর স্মরণ করে … [সূরা আলে -ইমরান ১৯০- ১৯১]

৪- আল্লাহর জিকির সুরক্ষিত দুর্গ: বান্দা এ-দ্বারা শয়তান থেকে রক্ষা পায়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : ইয়াহইয়া বিন জাকারিয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসরাঈল-তনয়দেরকে বলেছেন :—
وآمركم أن تذكروا الله، فإن مثل ذلك مثل رجل خرج العدو في أثره سراعا، حتى إذا أتى على حصن حصين فأحرز نفسه منهم، كذلك العبد لا يحرز نفسه من الشيطان إلا بذكر الله .(رواه أحمد في مسنده:2790)
এবং আমি তোমাদেরকে আল্লাহর জিকিরের আদেশ দিচ্ছি, কারণ এর তুলনা এমন এক ব্যক্তির ন্যায় যার পিছনে দুশমন দৌড়ে তাড়া করে ফিরছে, সে সুরক্ষিত দুর্গে প্রবেশ করে নিজকে রক্ষা করেছে। অনুরূপ, বান্দা আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে শয়তান থেকে সুরক্ষা পায়। (আহমদ:২৭৯০)

৫- জিকির মানুষের ইহকাল ও পরকালের মর্যাদা বৃদ্ধি করে : আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন :-
كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يسير في طريق مكة، فمر على جبل يقال له جمدان، فقال: سيروا – هذا جمدان- سبق المفردون قال: وما المفردون، يا رسول الله ؟ قال: الذاكرين الله كثيرا والذاكرات . رواه مسلم في صحيحه:4834
মক্কার একটি রাস্তায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাঁটছিলেন। জুমদান নামক পাহাড় অতিক্রম করার সময় বললেন: তোমরা চল,-এটা জুমদান-মুফাররাদুন অর্থাৎ একক গুণে গুণান্বিতরা এগিয়ে গেছে তিনি জিজ্ঞেস করলেন :ইয়া রাসূলুল্লাহ মুফাররদূন অর্থাৎ একক গুণে গুণান্বিত কারা ? জওয়াবে তিনি বললেন :-আল্লাহকে বেশি করে স্মরণকারী নারী-পুরুষ। (মুসলিম:৪৮৩৪)

৬- জিকিরের কারণে ইহকাল ও পরকালে জীবিকা বৃদ্ধি পায় : আল্লাহ তাআলা নূহ আ. এর কথা বিবৃত করে বলেন :—
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا ﴿10﴾ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا ﴿11﴾ وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا ﴿12﴾ نوح
বলেছি, তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনি তো মহা ক্ষমাশীল। [১০] তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন। [১১] তিনি তোমাদেরকে সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা। [১২] [সূরা নূহ]

উল্লেখ্য যে, ইস্তিগফার জিকিরের বিশেষ প্রকার হিসেবে বিবেচিত।

জিকিরের প্রকারভেদ
জিকির অন্তর দ্বারা হতে পারে, জিহ্বা দ্বারা হতে পারে, বা এক সঙ্গে উভয়টা দ্বারাও হতে পারে। এর বিভিন্ন প্রকার রয়েছে, নিচে কিছু উল্লেখ করা হল :-

১. কুরআনে করিম পাঠ করা : এ হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর নাজিলকৃত আল্লাহ তাআলার কালাম। আল্লাহর কালাম বিধায় সাধারণ জিকির-আজকারের চেয়ে কোরআন পাঠ করা উত্তম। আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ রা: থেকে বর্ণিত : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন :-
من قرأ حرفا من كتاب الله فله به حسنة، والحسنة بعشر أمثالها، لا أقول (ألم) حرف، ولكن ألف حرف، ولام حرف، وميم حرف. ( رواه الترمذي:2735)
যে কিতাবুল্লাহর একটি অক্ষর পড়ল তার জন্য এর বিনিময়ে একটি নেকি অবধারিত। এবং তাকে একটি নেকির দশ গুণ ছাওয়াব প্রদান করা হবে। আমি বলছি না আলিফ লাম মীম একটি অক্ষর বরং আলিফ একটি অক্ষর, এবং লাম একটি অক্ষর, এবং মীম একটি অক্ষর। (তিরমিজি:২৭৩৫)

২. মৌখিক জিকির : যেমন তাসবীহ, তাহলীল, তাহমীদ ও তাকবীর ইত্যাদি পড়া, যা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।

৩. প্রার্থনা : এটা বিশেষ জিকির, কেননা এ-দ্বারা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ হয়, ইহকাল ও পরকালের প্রয়োজন পূরণ হয়।

৪. ইস্তিগফার করা : আল্লাহ তাআলা নূহ আ.-এর কথা বিবৃত করে বলেন :-
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا ﴿10﴾ نوح
বলেছি, তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনি তো মহা ক্ষমাশীল। [সূরা নূহ ১০]

৫. অন্তর দিয়ে আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করা: এটা অন্যতম বড় জিকির। আল্লাহ তাআলা বলেন :-
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآَيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ ﴿190﴾ الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ ﴿191﴾
আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবস ও রাত্রির পরিবর্তনে নিদর্শনা বলী রয়েছে বোধশক্তি সম্পন্ন লোকদের জন্য, যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহর স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করে ও বলে হে আমদের প্রতিপালক ! তুমি এগুলো নিরর্থক সৃষ্টি করনি, তুমি পবিত্র, তুমি আমাদেরকে অগ্নি-শাস্তি হতে রক্ষা কর। [সূরা আলে ইমরান১৯০,১৯১]

৬. রকমারি ইবাদতের অনুশীলন করা : যেমন সালাত কায়েম, জাকাত প্রদান, পিতা-মাতার সাথে অমায়িক আচরণ, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা, জ্ঞানার্জন ও অপরকে শিক্ষাদান-ইত্যাদি। কেননা, সৎকর্মের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহকে স্মরণ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন :—
َأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي ﴿14﴾ طه
এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর। [সূরা তা-হা ১৪]

জিকিরের সময়সূচি
জিকির দু ভাগে বিভক্ত :—

১. সাধারণ জিকির : যার কোন নির্দিষ্ট সময় বা স্থান নেই। বিশেষ কিছু সময় বা স্থান ব্যতীত যে কোন সময়ে বা স্থানে এ সব জিকির করার অবকাশ আছে।

২. বিশেষ জিকির : যা বিশেষ সময়, অবস্থা ও পাত্র অনুসারে করা হয়। নিচে এমন কিছু সময়, অবস্থা ও স্থানের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হল যার সাথে বিশেষ বিশেষ জিকিরের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
• সকাল-বিকাল : এর সময় হচ্ছে ফজর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত, আছরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত।
• ঘুমানো ও ঘুম থেকে উঠার সময়।
• ঘরে প্রবেশের সময়।
• মসজিদে প্রবেশ ও মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময়।
• অসুস্থতার সময়।
• বিপদাপদ ও পেরেশানীর সময়।
• সফরের সময়।
• বৃষ্টি বর্ষণের সময়।

জিকিরের কতিপয় নমুনা
১. সাধারণ জিকির : সামুরা বিন জুনদব থেকে বর্ণিত : তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন :
أحب الكلام إلى الله أربع: سبحان الله، والحمد لله، ولا إله إلا الله، والله أكبر، لا يضرك بأيهن بدأت (رواه مسلم:3985)
আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় কথা চারটি : সুবহানাল্লাহ, আলহাম্‌দু লিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবর, যে কোন একটি দ্বারাই আরম্ভব করা যেতে পারে। (মুসলিম:৩৯৮৫)

২. সকাল-বিকালের জিকির : আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন :-
من قال حين يصبح وحين يمسي: سبحان الله وبحمده مائة مرة، لم يأت أحد يوم القيامة بأفضل مما جاء به إلا أحد قال مثل ما قال أو زاد عليه . رواه مسلم في صحيحه:4858
যে সকাল এবং বিকালে সুবহানাল্লাহ ওয়া বিহামদিহী একশত বার বলবে, যে এ-রকম বা এর অতিরিক্ত বলবে, কিয়ামত দিবসে এর চেয়ে উত্তম কেউ কিছু আনয়ন করতে পারবে না। (সহীহ মুসলিম:৪৮৫৮)

৩. বিপদের মুহূর্তে জিকির : আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিপদের সময় বলতেন :-
لا إله إلا الله العظيم الحليم، لا إله إلا الله رب العرش العظيم، لا إله إلا الله رب السموات ورب الأرض ورب العرش الكريم (رواه مسلم:4909)
আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, যিনি সুমহান, সহিষ্ণুবান, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই যিনি মহান আরশের রব, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই যিনি আকাশসমূহের রব, এবং ভূমির রব এবং সম্মানিত আরশের রব। (সহীহ মুসলিম:৪৯০৯)

মোদ্দা কথা, বর্ণিত ফজিলত ও প্রতিশ্রুত পুরস্কার হাসিল করার অভীষ্ট লক্ষ্যে উল্লেখিত ও অনুল্লেখিত প্রয়োজনীয় জিকিরসমূহ মুখস্থ করে নিয়মিত পড়া প্রত্যেক মুসলমানের উচিত।

অনুবাদক : নুমান বিন আবুল বাশার
সম্পাদক : আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান
সূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ
ওয়েব গ্রন্থনা : আবুল কালাম আযাদ আনোয়ার /ভাষাগত সম্পাদনা : কাউসার বিন খালেদ /সার্বিক যত্ন : আবহাছ এডুকেশনাল এন্ড রিসার্চ সোসাইটি, বাংলাদেশ।
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না কিন্তু।

কুরআন-সুন্নাহ থেকে নির্বাচিত দু’আ

 আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

কুরআন-সুন্নাহ থেকে নির্বাচন করে ব্যাপক অর্থ বোধক এবং একান্ত প্রয়োজনীয় কতিপয় দুয়া এবং সেগুলোর অর্থ (বেশ কিছু দুয়ার বাংলা উচ্চারণ সহ) প্রদান করা হল। এ দুয়াগুলো আমরা আল্লাহ তায়ালার নিকট মুনাজাত করার সময়, সকাল- সন্ধ্যায় কিংবা অন্য যে কোন সময় পাঠ করতে পারি। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমীন।

১) رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাঁও ওয়া ফিল্ আখিরাতি হাসানাতাঁও ওয়াকিনা আযাবান্নার। অর্থঃ “হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদিগকে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ দান কর এবং আমাদেরকে দোযখের আযাব হতে রক্ষা কর।” (সূরা বাকারা- ২০১)

২)  “হে আমাদের প্রতিপালক! যদি আমাদের ভ্রম হয় অথবা ত্রুটি হয় তজ্জন্যে আমাদেরকে ধৃত করবেন না, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যেরূপ গুরুভার অর্পণ করেছিলেন, আমাদের উপর তদ্রূপ ভার অর্পণ করবেন না; হে আমাদের প্রভু, যা আমাদের শক্তির অতীত ঐরূপ ভার বহনে আমাদেরকে বাধ্য করবেন না এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন ও আমাদেরকে মার্জনা করুন এবং আমাদের উপর দয়া করুন; আপনিই আমাদের অভিভাবক। অতএব কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করুন। (সূরা বাকারা- ২)

 ৩) رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا রাব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া র্যুরিয়্যাতিনা কুররাতা আয়ুনিন্। ওয়াজ্ আলনা লিল মুাত্তাকীনা ইমামা। অর্থঃ “হে আমাদের পরওয়ারদেগার! আমাদের স্ত্রীদের ও সন্তানদেরকে আমাদের জন্যে চোখের শীতলতা স্বরূপ করে দাও এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্যে আদর্শ স্বরূপ করে দাও।” (সূরা ফুরক্বান- ৭৪)
 ৪) رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنْ الْخَاسِرِينَ রাব্বানা যালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা ওয়া তারহামনা লানা কূনান্না মিনাল খাসেরীন। অর্থঃ “হে আমাদের প্রভু! আমরা আমাদের নফসের উপর যুলুম করেছি, তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না কর, আমাদের প্রতি করুণা না কর তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।” (সূরা আ‘রাফ- ২৩)
 ৫) رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا إنَّهاَ ساَءَتْ مُسْتَقَرًّ وَمُقاَماً রাব্বানাছরিফ ‘আন্না আযাবা জাহান্নামা, ইন্না আযাবাহা কানা গারামা, ইন্নাহা সাআত মুস্তার্ক্বারাও ওয়া মুকামা। অর্থঃ হে আমাদের রব! আমাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তি হটিয়ে দাও। নিশ্চয় এর শাস্তি নিশ্চিত বিনাশ। বসবাস ও আবাসস্থল হিসেবে তা কত নিকৃষ্ট জায়গা। (সূরা ফুরক্বান- ৬৫)
 ৬) رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ. রাব্বানা লা তুযিগ্ কুলূবানা বা‘দা ইয হাদায়তানা, ওয়া হাব লানা মিন লাদুনকা রাহমাতান ইন্নাকা আনতাল ওয়াহ্হাব। অর্থ: “হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের হেদায়াত দানের পর আমাদের হৃদয়কে বক্র করে দিও না। আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান কর। নিশ্চয় তুমিই অধিক দানকারী।” (সূরা আল ইমরান- ৮)
 ৭) رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভ্রাতাদেরকে ক্ষমা করুন। আর মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তো দয়াদ্র, পরম দয়ালু।” (সূরা হাশর- ১০)
 ৮) رَبَّناَ زِدْناَ عِلْماً وَألْحِقْناَ بَالصاَّلِحِيْنَ “হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি করে দাও এবং আমাদেরকে নেককারদের অন্তর্ভূক্ত কর।”
 ৯) اللهمَّ إنِّيْ أعُوْذُ بِكَ مِنْ عَذاَبِ جَهَنَّمَ، وَمِنْ عَذاَبِ الْقَبْرِ، وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْياَ وَالْمَمَاتِ، وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيْحِ الدَّجاَّلِ “হে আল্লাহ্! নিশ্চয় আমি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি জাহান্নামের শাস্তি থেকে, কবরের আযাব থেকে, জীবন-মৃত্যুর ফিৎনা থেকে এবং মাসীহ দাজ্জালের ফিৎনা থেকে।”
 ১০) اللهمَّ إنِّيْ أعُوْذُ بِكَ مِنْ الْهَمِّ وَالْحُزْنِ، وأعُوْذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسْلِ، وَمِنَ الْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وأعُوْذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ، وَقَهْرِ الرِّجاَلِ “হে আল্লাহ্! আমি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা থেকে, তোমার কাছে আশ্রয় কামনা করছি অপরাগতা ও অলসতা থেকে, কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকে এবং আশ্রয় চাচ্ছি ঋণের বোঝা ও মানুষের বলপ্রয়োগ থেকে। ”
 ১১) اللهمَّ إنِّيْ أعُوْذُ بِكَ أنْ أرَدَّ إلىَ أرْذَلِ الْعُمْرِ. “হে আল্লাহ্! তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি অতিবার্ধক্যে পৌঁছা থেকে।”
 ১২) اللهم إنَّا نَسْأَلُكَ خَشْيَتَكَ فِيْ الْغَيْبِ وَالشَّهاَدَةِ، وَنَسْأَلُكَ كَلِمَةَ الْحَقِّ فِيْ الرِّضاَ وَالْغَضَبِ، وَنَسْأَلُكَ الْقَصْدَ فِيْ الْغِنَى وَالْفَقْرِ، وَنَسْأَلُكَ نَعِيْماً لاَ يَنْفَدُ، وَنَسْأَلُكَ قُرَّةَ عَيْنٍ لاَ تَنْقَطِعْ، وَنَسْأَلُكَ الرِّضاَ بَعْدَ الْقَضَاءِ، وَنَسْألُكَ بَرْدَ الْعَيْشِ بَعْدَ الْمَوْتِ، ونسألُكَ لَذَّةَ النَّظَرِ إلى وَجْهِكَ الْكَرِيْمِ، وَالشَّوْقَ إلىَ لِقاَئِكَ، فِيْ غَيْرِ ضَراَّءَ مَضَرَّةٍ وَلاَ فِتْنَةٍ مُضِلَّةٍ “হে আল্লাহ্! গোপনে ও প্রকাশ্যে সর্বাবস্থায় তোমাকে যেন ভয় করতে পারি। সন্তুষ্টি এবং ক্রোধের অবস্থায় সত্য কথা বলার তাওফীক চাই। তোমার কাছে কামনা করি অভাব ও প্রাচুর্যের মধ্যপন্থা। তোমার কাছে প্রার্থনা করি এমন নেআমতের যা কখনো শেষ হবে না, প্রার্থনা করছি এমন চক্ষু শীতলকারী বিষয় যা বিচ্ছন্ন হবে না। তক্বদীরের উপর সন্তুষ্ট হওয়ার তাওফীক চাই। মৃত্যুর পর সুখী জীবন চাই এবং কামনা করি তোমার সম্মানিত চেহারার প্রতি দৃষ্টিপাত করার আনন্দ, তোমার সক্ষাত লাভের আকর্ষণ যাতে কোন ক্ষতি নেই, নেই কোন বিভ্রান্তিকারী ফিৎনা।”
 ১৩) اللهم زَيِّناَّ بِزِيْنَةِ الْإيْمَانِ، وَاجْعَلْناَ هُداَةً مُهْتَدِيْنَ “হে আল্লাহ্ আমাদেরকে ঈমানের সাজে সজ্জিত কর। আর আমাদেরকে কর হেদায়াতকারী যার দ্বারা অন্যরা হেদায়াত লাভ করতে পারে।”
 ১৪) اللهم إناَّ نَسْأَلُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفاَفَ وَالْغِنىَ “হে আল্লাহ্! আমরা চাই তোমার কাছে হোদয়াত, তাক্বওয়া, পবিত্রতা ও অভাবমুক্তি।”
 ১৫) اللهم آتِ أنْفُسَناَ تَقْوَاهاَ، وَزَكِّهاَ أنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكاَّهاَ، أنْتَ وَلِيُّهاَوَمَوْلاَهاَ “হে আল্লাহ্ আমাদের আত্মাকে দান কর তাক্বওয়া, তাকে পবিত্র কর। তুমিই তাকে উত্তম পবিত্রকারী। তুমিই তার বন্ধু, অভিভাবক।”
 ১৬) اللهمَّ فَقِّهْناَ فِيْ الدِّيْنِ “হে আল্লাহ্! আমাদেরকে দ্বীনের বিষয়ে গভীর জ্ঞান দান কর।”
 ১৭) اللهمَّ إناَّ نَعُوْذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لاَ يَنْفَعُ، وَقَلْبٍ لاَ يَخْشَعُ، وَنَفْسٍ لاَ تَشْبَعٍ، وَدَعْوَةٍ لاَ يُسْتَجاَبُ لَهاَ “হে আল্লাহ্! আমরা তোমার কাছে আশ্রয় কামনা করি এমন জ্ঞান থেকে যা কোন উপকার দেয় না, এমন হৃদয় থেকে যা ভীত হয় না, এমন আত্মা থেকে যা পরিতৃপ্ত হয় না এবং এমন দুআ থেকে যা কবুল করা হয় না।”
 ১৮) اللهمَّ إناَّ نَعُوْذُ بِكَ مِنْ زَوَالِ نِعْمَتِكَ وَتَحَوُّلِ عاَفِيَتِكَ، وَفُجاَءَةِ نِقْمَتِكَ، وَجَمِيْعِ سَخَطِكَ হে আল্লাহ্! তোমার কাছে আশ্রয় কামনা করছি- তোমার নেআমতের সমাপ্তি থেকে, তোমার ক্ষমা বন্ধ হয়ে যাওয়া থেকে, তোমার পক্ষ থেকে হঠাৎ শাস্তি আসা থেকে এবং তোমার যাবতীয় ক্রোধ থেকে।
 ১৯) اللهمَّ أصْلِحْ لَناَ دِيْنَناَ الذِّيْ هُوَ عِصْمَةُ أمْرِناَ، وَأصْلِحْ لَناَ دُنْياَناَ التِّيْ فِيْهاَ مَعاَشُناَ، وَأصْلِحْ لَناَ آخِرَتَناَ التِّيْ إلَيْهاَ مَعاَدُناَ، وَاجْعَلِ الْحَياَةَ زِياَدَةً لَناَ فِيْ كُلِّ خَيْرٍ، وَاجْعَلِ الْمَوْتَ رَاحَةً لَناَ مِنْ كُلِّ شَرٍّ হে আল্লাহ্! তুমি আমাদের দ্বীনকে সংশোধন করে দাও যা আমাদের সকল বিষয়কে রক্ষাকারী। সংশোধন কর আমাদের দুনিয়াকে যাতে রয়েছে আমাদের জীবিকা। সংশোধন কর আমাদের আখেরাত যা আমাদের শেষ ঠিকানা। সবধরণের কল্যাণে আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করে দাও। আর মৃত্যুকে কর সবধরণের অকল্যাণ থেকে নিস্তার স্বরূপ।
 ২০) اللهمَّ ألْهِمْناَ رُشْدَناَ وَقِناَ شَرَّ أنْفُسِناَ হে আল্লাহ্! আমাদেরকে সঠিক পথের তাওফীক দাও এবং আমাদের বাঁচাও স্বীয় আত্মার অনিষ্ট থেকে।’
 ২১) اللهمَّ رَحْمَتَكَ نَرْجُوْا، فَلاَ تَكِلْناَ إلىَ أنْفُسِناَ طَرْفَةَ عَيْنٍ، وأصْلِحْ لَناَ شَأْنَناَ كُلَّهُ، لاَ إلَهَ إلاَّ أنْتَ হে আল্লাহ্! তোমার করুণা কামনা করি, সুতরাং এক পলকের জন্য আমাদেরকে নিজের উপর ছেড়ে দিও না। আমাদের প্রতিটি বিষয় সংশোধন করে দাও। তুমি ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই।
 ২২) اللهم إناَّ نَسْأَلُكَ فِعْلَ الْخَيْراَتِ، وَتَرْكِ الْمُنْكَراَتِ، وَحُبَّ الْمَساَكِيْنَ، وَأنْ تَغْفِرَ لَناَ وَتَرْحَمَناَ، وَإذاَ أرَدْتَ بِعِباَدِكَ فِتْنَةً فَتَوَفِّناَ إلَيْكَ غَيْرَ مَفْتُوْنِيْنَ হে আল্লাহ্! আমরা তোমার কাছে প্রার্থনা করি ভাল কাজ করা, খারাপ কাজ পরিত্যাগ করা ও মিসকীনদেরকে ভালবাসার তাওফীক। আর তুমি আমাদেরকে ক্ষমা কর ও দয়া কর। তোমার বান্দাদের যদি ফিৎনায় ফেলতে চাও তবে তা থেকে মুক্তি প্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত করে আমাদের মৃত্যু দাও।
 ২৩) اللهمَّ نَسْأَلُكَ حُبَّكَ، وَحُبَّ مَنْ يُحِبُّكَ، وَحُبَّ الْعَمَلِ الذِّيْ يُقَرِّبُناَ إلَيْكَ হে আল্লাহ্! তোমার কাছে প্রার্থনা করি তোমার ভালবাসা, তোমাকে যে ভালবাসে তার ভালবাসা এবং এমন আমলের প্রতি ভালবাসা যা তোমার নৈকট্য প্রদান করবে।
 ২৪) اللهمَّ حَبِّبْ إلَيْناَ الْإيْماَنَ وَزَيِّنْهُ فِيْ قُلُوْبِناَ، وَكَرِّهْ إلَيْناَ الْكُفْرَ وَالْفُسُوْقَ وَالْعِصْياَنَ، وَاجْعَلْناَ مِنَ الرَّاشِدِيْنَ হে আল্লাহ্! ঈমানকে আমাদের কাছে প্রিয় বস্তু কর, তা আমাদের অন্তরে সুসজ্জিত কর। আর কুফরী, ফাসেকী এবং নাফারমানীকে আমদের কাছে ঘৃণিত বিষয় কর।
 ২৫) اللهمَّ إناَّ نَعُوْذُ بِكَ مِنْ جَهْدِ الْبَلاَءِ، وَدَرْكِ الشَّقاَءِ، وَسُوْءِ الْقَضاَءِ، وَشَماَتَةِ الْأَعْداَءِ “হে আল্লাহ্! আশ্রয় প্রার্থনা করি অসহনীয় কঠিন বিপদ থেকে, দুর্ভাগ্যবান হওয়া থেকে, মন্দ ফায়সালা থেকে এবং (আমার বিপদে) শত্রুদের হাঁসা-হাঁসি থেকে।”
 ২৬) اللهمَّ اقْسِمْ لَناَ مِنْ خَشْيَتِكَ ماَ تَحُوْلُ بِهِ بَيْنَناَ وَبَيْنَ مَعْصِيَتِكَ، وَمِنْ طاَعَتِكَ ماَ تُبَلِّغُناَ بِهِ جَنَّتَكَ، وَمِنَ الْيَقِيْنِ ماَ تُهَوِّنُ بِهِ عَلَيْناَ مَصاَئِبَ الدُّنْياَ، وَمَتِّعْناَ بِأَسْماَعِناَ وَأَبْصاَرِناَ وَقُوَّاتِناَ ماَ أحْيَيْتَناَ، واَجْعَلْهاَ الواَرِثَ مِناَّ، واَجْعَلْ ثَأْرَناَ عَلىَ مَنْ ظَلَمَناَ، وَانْصُرْناَ عَلىَ مَنْ عاَداَناَ، وَلاَ تَجْعَلِ الدُّنْياَ أَكْبَرَ هَمِّناَ، وَلاَ تَجْعَلْ مُصِيْبَتَناَ فِيْ دِيْنِناَ، وَلاَ تُسِلِّطْ عَلَيْناَ بِذُنُوْبِناَ مَنْ لاَ يَخاَفُكَ وَلاَ يَرْحَمُناَ “হে আল্লাহ্! তোমার ভয় থেকে কিছু অংশ আমাদের মাঝে বণ্টন করে দাও- যা তোমার নাফারমানী ও আমাদের মাঝে বাঁধাদানকারী হবে। তোমার আনুগত্য থেকে এমন কিছু দান কর- যা তোমার জান্নাতে পৌঁছে দিবে, এমন বিশ্বাস দান কর- যার দ্বারা আমাদের উপর দুনিয়ার সব ধরণের বিপদ হালকা অনুভব হবে। আমাদেরকে যত দিন জীবিতি রাখবে ততদিন আমাদের কান, চোখ ও শক্তি দ্বারা আমাদেরকে উপকৃত কর এবং আমাদের মধ্যে থেকে এগুলোর উত্তরাধিকারী বানাও। আমাদের উপর যারা অত্যাচার করে তাদের থেকে প্রতিশোধ নাও এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য কর। দুনিয়াকে আমাদের চিন্তা-ফিকিরের বস্তু বানিয়ে দিও না, দ্বীনী বিষয়ে আমাদেরকে বিপদে ফেলিও না। আমাদের পাপের কারণে এমন ব্যক্তিকে আমাদের কর্তৃত্বকারী করো না যে তোমাকে ভয় করে না এবং আমাদের উপর দয়া করে না।”
 ২৭) اللهمَّ إناَّ نَسْأَلُكَ مُوْجِباَتِ رَحْمَتِكَ وَعَزاَئِمَ مَغْفِرَتِكَ، وَالْغَنِيْمَةِ مِنْ كُلِّ بِرٍّ، وَالسَّلاَمَةِ مِنْ كُلِّ شَرٍّ، وَالْفَوْزَ باِلْجَنَّةِ، وَالنَّجاَةَ مِنْ النَّارِ হে আল্লাহ্! আমরা তোমার কাছে প্রার্থনা করি, তোমার রহমতের আবশ্যকতা, তোমার ক্ষমার দৃঢ়তা, প্রত্যেকটি সৎকাজের গণীমত, প্রত্যেক অমঙ্গল থেকে নিরাপত্তা, জান্নাতের বিজয় এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি।
 ২৮) اللهمَّ مُقَلِّبَ الْقُلُوْبِ ثَبِّتْ قُلُوْبَناَ عَلىَ دِيْنِكَ- اللهمَّ مُصَرِّفَ الْقُـلُوْبِ صَرِّفْ قُلُوْبَناَ عَلىَ طاَعَتِكَ অর্থ: “হে অন্তকরণের পরিবর্তনকারী আল্লাহ্! আমাদের অন্তরকে তোমার দ্বীনের উপর অটল অবিচল রাখ। হে হৃদয় সমূহের পরিবর্তনকারী আল্লাহ্! আমাদের হৃদয়গুলোকে তোমার আনুগত্যের দিকে ফিরিয়ে দাও।”
 ২৯) اللهمَّ أعِنَّا عَلىَ ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِباَدَتِكَ হে আল্লাহ্! আমাদেরকে সাহায্য কর তোমার যিকির করতে, তোমার কৃতজ্ঞতা করতে এবং সুন্দরভাবে তোমার ইবাদত করতে।
 ৩০) اللهمَّ أحْسِنْ عاَقِبَتَناَ فِيْ الأُمُوْرِ كُلِّهاَ، وَأَجِرْناَ مِنْ خِزْيِ الدُّنْياَ وَعَذاَبِ الآخِرَةِ “হে আল্লাহ্! আমাদের প্রতিটি বিষয়ের শেষ পরিণতি সুন্দর কর। আর আমাদেরকে দুনিয়ার লাঞ্ছনা ও আখেরাতের শাস্তি থেকে আশ্রয় দান কর।
 ৩১) اللهمَّ لاَ تَدَعْ لَناَ ذَنْباً إلاَّ غَفَرْتَهُ، وَلاَ عَيْباً إلاَّ سَتَرْتَهُ، وَلاَ هَمّاً إلاَّ فَرَّجْتَهُ، وَلاَ دَيْناً إلاَّ قَضَيْتَهُ، وَلاَ حاَجَةً مِنْ حَواَئِجِ الدُّنْياَ وَالآخِرَةِ هِيَ لَكَ رَضًى وَلَناَ صَلاَحٌ إلاَّ قَضَيْتَهاَ ياَ أرْحَمَ الرَّاحِمِيْنَ “হে আল্লাহ্! আমাদের প্রত্যেকটি গুনাহ ক্ষমা করে দাও প্রত্যেকটি ত্রুটি গোপন করে দাও. প্রত্যেকটি দুশ্চিন্তা দূর করে দাও, সব ঋণ পরিশোধ করে দাও। আর দুনিয়া বা আখেরাতের যে কোন প্রয়োজন যাতে তোমার সন্তুষ্টি রয়েছে ও আমাদের তাতে কল্যাণ রয়েছে তা আমাদের জন্য ফায়সালা করে দাও হে দয়াশীলদের মধ্যে সর্বাধিক দয়াবান।
 ৩২) اللهمَّ إناَّ نَسْأَلُكَ مِنَ الْخَيْرِ كُلِّهِ عاَجِلِهِ وَآجِلِهِ، ماَ عَلِمْناَ مِنْهُ وَماَ لَمْ نَعْلَمْ، وَنَعُوْذُ بِكَ مِنَ الشَّرِّ كُلِّهِ عاَجِلِهِ وَآجِلِهِ، ماَ عَلِمْناَ مِنْهُ وَماَ لَمْ نَعْلَمْ আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকা মিনাল খাইরে কুল্লিহি আজেলিহি ওয়া আজিলিহ্ মা আলিমনা মিনহু অমা লাম না’লাম। ওয়া নাঊযুবিকা মিনাশ্ শাররি কুল্লিহি আ’জেলিহি ওয়া আজিলিহ, মা আলিমনা মিনহু অমা লাম না’লাম। অর্থঃ হে আল্লাহ আমরা আপনার কাছে বর্তমান ও ভবিষ্যতের যাবতীয় কল্যাণ- যা আমরা জানি এবং জানি না- তা সবই প্রার্থনা করছি। বর্তমান ও ভবিষ্যতের যাবতীয় অকল্যাণ- যা আমরা জানি এবং জানি না- তার সবগুলো থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
 ৩৩)اللهمَّ صَلِّ عَلىَ مُحَمَّدٍ وَعَلىَ آلِ مُحَمَّدٍ كَماَ صَلَّيْتَ عَلىَ إبْراَهِيْمَ وَعَلىَ آلِ إبْراَهِيْمَ، إنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ، وَباَرِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَماَ باَرَكْتَ عَلىَ إبْراَهِيْمَ وَعَلىَ آلِ إبْراَهِيْمَ، إنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ আল্লাহুম্মা ছাল্লি আ’লা মুহাম্মাদ ওয়া আ’লা আলি মুহাম্মাদ। কামা ছাল্লায়তা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। ওয়া বারেক আলা মুহাম্মাদ ওয়া আ’লা আলি মুহাম্মাদ কামা বারাকতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।
===================
অনুবাদ: মুহাঃ আবদুল্লাহ্ আল কাফী
সম্পাদনা: আব্দুল্লাহিল হাদী

Wednesday, March 22, 2023

রমজান ও পরবর্তী সময়ে করণীয়

 রোজার তাৎপর্য :

রোজা ইসলামের চতুর্থ স্তম্ভ এবং ইসলামি শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ এবাদত। আল্লাহ তাআলা বলেন :—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ﴿১৮৩﴾ البقرة
হে ইমানদারগণ ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। সূরা বাকারা : ১৮৩
উল্লেখিত আয়াতে রোজা ফরজ হওয়ার সাথে সাথে এর উদ্দেশ্য সম্পর্কেও জানতে পারি। আর তা হল তাকওয়া অর্জন। সুতরাং বুঝতে হবে শুধুমাত্র দিনের বেলায় পানাহার বর্জন করার নামই রোজা নয় বরং রোজা হল পানাহার বর্জন করার সাথে সাথে সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সর্ব প্রকার পাপাচার, অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রেখে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় আজ রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানা না থাকার কারণে যেভাবে আমাদের নৈতিক পরিবর্তন হওয়ার কথা ছিল সেভাবে হচ্ছে না। তাই আমরা সংক্ষিপ্তাকারে কোরআন ও হাদিসের আলোকে রোজার তাৎপর্যও বিভিন্ন মাসআলা-মাসায়েল তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রচেষ্টাকে কবুল করুন এবং যাদের সহায়তায় আমরা এ কাজ করেছি আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ দান করুন।

রোজার সংজ্ঞা :
ইসলামি পরিভাষায় রোজা হল সেহরির শেষ সময় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার, যৌনক্রিয়া ও রোজার পরিপন্থী যাবতীয় কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা।
রোজার হুকুম :
সমস্ত উম্মত এ কথার উপর ঐকমত্য পোষণ করেন যে, রমজান মাসের রোজা ফরজ। যদি কোন ব্যক্তি শরয়ি ওজর ছাড়া রোজা রাখা হতে বিরত থাকে, তাহলে সে কবিরা গুনাহে লিপ্ত হল। রোজা ফরজ হওয়ার প্রমাণ—আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন :—
فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ ﴿১৮৫﴾ البقرة
কাজেই তোমাদের মাঝে যে লোক মাসটি পাবে, সে যেন রোজা রাখে। সূরা বাকারা-১৮৫
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :—
بني الإسلام على خمس: شهادة أن لا إله إلا الله وأن محمدا رسول الله و إقام الصلاة و إيتاء الزكاة و صوم رمضان وحج البيت إن استطاع إليه سبيلا . متفق عليه 
ইসলামের স্তম্ভ ৫টি :—একথার সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত আর কোন ইলাহ বা মাবুদ নেই। মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। নামাজ কায়েম করা। জাকাত আদায় করা। রমজানের রোজা রাখা। হজ করা। মুসলিম

মাহে রমজানের ফজিলত
* এ মাসে আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক রজনিতে অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :—
ولله عتقاء من النار، وذلك كل ليلة. أخرجه الترمذي
এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। তিরমিজি
* এ মাসেই আল্লাহ তাআলা জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেন এবং জাহান্নামের দরজা সমূহ বন্ধকরে দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :—
إذا جاء رمضان فتحت أبواب الجنة، وأغلقت أبواب النار، وصفدت الشياطين رواه مسلم
‘যখন রমজান মাসের আগমন ঘটে তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদের আবদ্ধ করা হয়।’ মুসলিম
* এ মাসের মাঝেই রয়েছে কদরের রাত, যে রাতের এবাদত হাজার মাসের এবাদতের চেয়েও উত্তম। আল্লাহ তাআলা বলেন :—
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ ﴿৩﴾ القدر
লাইলাতুল কদর সহস্র মাস অপেক্ষা উত্তম [৩ কদর]। এ মাসেই আল্লাহ তাআলা মহা গ্রন্থ পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :—
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآَنُ ﴿১৮৫﴾ البقرة
‘রমজান মাস, এতে নাজিল হয়েছে আল-কোরআন।

রোজার ফজিলত
 * আল্লাহ অন্যান্য আমলের তুলনায় রোজার আমলকে বিশেষ শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং আল্লাহ স্বয়ং রোজার প্রতিদান দেবেন বলে ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তাআলা হাদিসে কুদসিতে বলেন :—
كل عمل ابن آدم له إلا الصيام فإنه لي وأنا أجزي به. رواه مسلم
‘মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য হয়ে থাকে, কিন্তু সিয়াম শুধু আমার জন্য, আমিই তার প্রতিদান দেব।’ মুসলিম
* রোজা পালনে গুনাহ মাফ হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :—
من صام رمضان إيمانا و احتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه متفق عليه
ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় যে ব্যক্তি রোজা পালন করে তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মাফ হয়ে যায়। বোখারি, মুসলিম
* রোজা কিয়ামতের দিন রোজাদারের জন্য সুপারিশ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :—
الصيام والقرآن يشفعان للعبد يوم القيامة، يقول الصيام أي رب منعته الطعام والشهوات بالنهار فشفعني فيه، و يقول القرآن منعته النوم بالليل فشفعني فيه، قال: فيشفعان (رواه أحمد )
রোজা এবং কোরআন কিয়ামত দিবসে বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, হে রব ! আমি তাকে পানাহার ও কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখেছি। সুতরাং তুমি তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ কর। আহমদ
* রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশকের চেয়েও অধিক পছন্দনীয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :—
والذي نفس بيده لخلوف فم الصائم أطيب عند الله من ريح المسك رواه الشيخان
ঐ সত্তার কসম ! যার হাতে মোহাম্মদের জীবন, রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশকের চেয়েও অধিক পছন্দনীয়। বোখারি, মুসলিম
* রোজা দোজখের আগুন থেকে বাঁচার জন্য ঢাল স্বরূপ।
إنما الصيام جنة يستجن به العبد من النار مسند أحمد
নিশ্চয় রোজা ঢাল স্বরূপ, এ-দ্বারা বান্দা জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পায়। আহমদ
রোজার উপকারিতা
* তাকওয়া অর্জন।
* শয়তানের কর্তৃত্ব দুর্বল হয়। কারণ যখনই মানুষ কম খায় তখন তার প্রবৃত্তির চাহিদা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে সে গুনাহের কাজ হতে বিরত থাকে।
* গুনাহ-পাপাচার থেকে অঙ্গ -প্রত্যঙ্গের সংরক্ষণ করে।
* ধৈর্যের অনুশীলন : কারণ রমজান মাস ধৈর্যের মাস।
* রোজা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
* রোজা জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য ঢাল স্বরূপ।
* রোজা গরিব দু:খীদের দু:খ-দুর্দশা অনুধাবন করতে এবং তা লাঘবে এগিয়ে আসতে ধনীদের উৎসাহ জোগায়।
রোজা ভঙ্গের কারণসমূহ
১। সহবাস : কেউ রোজাবস্থায় সহবাস করলে রোজা ভেঙে যাবে এবং তার ওপর কাজা ও কাফ্ফারা উভয়টিই ওয়াজিব হবে।
কাফ্ফারা হল একাধারে দুইমাস রোজা রাখা অথবা এক জন গোলাম আজাদ করা কিংবা ৬০ জন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো।
২। রমজান মাসের দিনের বেলায় ইচ্ছাকৃত পানাহার। আল্লাহ তাআলা বলেন :—
وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ﴿১৮৭﴾ البقرة
আর পানাহার কর যতক্ষণ না কালো রেখা থেকে ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার দেখা যায়। সূরা বাকারা:১৮৭
৩। সহবাস ছাড়া অন্য যে কোন পন্থায়—যেমন : চুম্বন,স্পর্শকরণ ও হস্তমৈথুন—ইত্যাদির মাধ্যমে বীর্যপাত ঘটানো।
৪। পানাহারের বিকল্প উপায় গ্রহণ করা, যেমন: রক্ত গ্রহণ স্যালাইন গ্রহণ, এমন ইঞ্জেকশন যা আহারের কাজ করে যথা—গ্লুকোজ ইঞ্জেকশন।
৫। ইচ্ছাকৃত বমি করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:—
من استقاء عمدا فليقض. رواه مسلم
যে ইচ্ছাকৃত বমি করে সে যেন পরবর্তীতে রোজা কাজা করে। মুসলিম
৬। মহিলাদের হায়েজ (ঋতুস্রাব) ও নেফাস (প্রসব জনিত রক্তক্ষরণ) হওয়া, এমনকি ইফতারের কিছু সময় পূর্বে হলেও রোজা ভেঙে যাবে।
যে সব কারণে রোজা ভঙ্গ হয়না
● ভুলবশত পানাহার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:—
من نسي و هو صائم فأكل أو شرب فليتم صومه فأنما أطعمه الله وسقاه. متفق عليه
 যদি কোন ব্যক্তি রোজা অবস্থায় ভুলবশত পানাহার করে ফেলে সে যেন তার রোজা পূর্ণ করে, কেননা আল্লাহই তাকে পানাহার করিয়েছেন।
● অনিচ্ছাকৃত বমি করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:—
من ذرعه القيء فليس عليه شيء.
 যার অনিচ্ছাকৃত বমি হয়েছে তার রোজা কাজা করার প্রয়োজন নেই। মুসলিম
● রোজা অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে।
● রোগের কারণে উত্তেজনা ব্যতীত বীর্য নির্গত হলে।
● স্ত্রী চুম্বন অথবা আলিঙ্গন করার কারণে রোজা ভঙ্গ হবে না।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোজা অবস্থায় তাকে চুম্বন করতেন। বোখারি,মুসলিম
কিন্তু যে ব্যক্তি চুম্বন বা আলিঙ্গনের কারণে উত্তেজিত হয়ে নিজেকে সংযত রাখতে পারবে না, তার জন্য স্ত্রী চুম্বন ও আলিঙ্গন করা মাকরূহ।
রোজার মধ্যে করণীয়
● সেহরি খাওয়া এবং বিলম্বে সেহরি খেতে চেষ্টা করা। কারণ সেহরি খাওয়া রাসূলের সুন্নত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :—
تسحروا فإن في السحور بركة. رواه البخاري
তোমরা সেহরি খাও, কারণ সেহরির মাঝে বরকত রয়েছে। (বুখারী)
● যথাসম্ভব সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করা, বিলম্ব না করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :—
لا يزال الناس بخير ما عجلوا الفطر. رواه البخارى
মানুষ ঐ সময় পর্যন্ত কল্যাণের উপর থাকবে যতক্ষণ তারা শীঘ্র (বিলম্ব না করে) ইফতার করবে। বোখারি
● কল্যাণমূলক কাজ বেশি বেশি করা।
● বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত এবং আল্লাহর জিকির করা।
● কম খাওয়া, কম ঘুমানো।
● গরিব-দু:খী অসহায় মানুষের খোঁজ খবর নেয়া এবং তাদের প্রতি সহানুভূতি ও দয়া করা।
● ধৈর্যের অনুশীলন করা।
● দুনিয়ার ব্যস্ততা কমিয়ে আখেরাতের প্রতি ধাবিত হতে চেষ্টা করা।
● জান্নাতের প্রার্থনা করা এবং জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি চাওয়া।
● বেশি বেশি করে আল্লাহর নিকট দোয়া-মুনাজাত করা এবং গুনাহ মাফের জন্য কান্নাকাটি করা।
● রোজাদারকে ইফতার করানো।
● রমজান মাসের মধ্যে ওমরা পালন করা।
● এতেকাফ করা।
রমজানের শেষ দশকের ফজিলত
আল্লাহ তাআলা শেষ নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উম্মতকে কিছু উত্তম মৌসুম বা সময়ের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন, এর দ্বারা বান্দার মন-প্রাণ আল্লাহর দিকে ধাবিত হয়, ফলে সে নেক আমল করতে আগ্রহী হয়।এমন উত্তম মৌসুম হচ্ছে রমজান মাসের শেষ দশক। এ দিনগুলোতে বান্দা ইচ্ছা করলে তার চেষ্টার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করে নিতে পারে। আর সেটা সম্ভব হবে বেশি বেশি নেক আমল দ্বারা, যেমনটি করতেন আমাদের নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। উম্মুল মোমিনীন আয়েশা (রা.)থেকে বর্ণিত :—
كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يجتهد في العشر الأواخر ما لا يجتهد في غيره. رواه مسلم
রমজান মাসের শেষ দশকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত বেশি এবাদত করেছেন যা অন্য সময়ে করেননি। মুসলিম। আয়েশা (রা.) আরো বর্ণিত—
أن النبي صلى الله عليه وسلم كان يجتهد بالعمل الصالح فيها أكثر من غيرها (صحيح مسلم)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশকে অন্য সময়ের চেয়ে বেশি করে আমলে সালেহ করতেন। অর্থাৎ বেশি বেশি করে কোরআন তিলাওয়াত, নামাজ, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে রাত জাগতেন। তারপর সেহরি খেতেন। অন্য আরেকটি হাদিসে বর্ণিত: আয়েশা রা. বলেন :—
أنه صلى الله عليه وسلم كان إذا دخل العشر، وأحيا الليل، وأيقظ أهله، وجد و شد المئزر. رواه البخاري ومسلم
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশকে রাত জেগে এবাদত করতেন এবং পরিবারবর্গকেও জাগিয়ে নিতেন। এবং এবাদতে পূর্ণ রূপে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। বোখারি, মুসলিম
রমজানের শেষ দশকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতেকাফ করতেন এবং এ এতেকাফের জন্য মসজিদের নির্জন স্থান বেছে নিয়ে ল্লাহর নৈকট্য হাসিলের চেষ্টা করতেন। এমনকি দাওয়াত, তালিম ও জিহাদের মত গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বে ও এতেকাফ করতেন। ইবনে উমর রা.-এর হাদিস তা প্রমাণ করে। তিনি বলেন:—
كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يعتكف العشر الأواخر من رمضان. رواه مسلم
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ করতেন। মুসলিম।
এ ছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকাতুল ফিতর আদায় করতে আদেশ করতেন।
এতেকাফ
এতেকাফ একটি গুরুত্বপূর্ণ এবাদত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকালের পূর্ব-পর্যন্ত নিয়মিত এতেকাফ করেছেন। পরবর্তীতে তাঁর সাহাবিগণ এ ধারা অব্যাহত রেখেছেন।
বর্তমানে মুসলিম উম্মাহর মাঝে এ ব্যাপারে শিথিলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। যা মোটেই কাম্য নয়। অনেকের এ বিষয়ে ন্যূনতম ধারণাও নেই। বিলুপ্ত-প্রায় এ আমলটির মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ আবারও যেন পূর্বের ধারায় ফিরে আসতে পারে সেজন্য কিছু আলোচনা করা হলো।
এতেকাফের সংজ্ঞা
একাগ্রচিত্তে আল্লাহ তাআলার এবাদতের উদ্দেশ্যে বিশেষ পন্থায়, বিশেষ নিয়তে মসজিদে অবস্থান নেয়াকে এতেকাফ বলে।
এতেকাফের হুকুম
রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ করা সুন্নত। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ ﴿১২৫﴾ البقرة
আমি ইবরাহীম ও ইসমাইলকে নির্দেশ দিয়েছি, তোমরা আমার ঘর পবিত্র করবে তাওয়াফকারী, এতেকাফকারী ও রুকু-সেজদাকারীদের জন্যে। সূরা বাকারা-১২৫
উম্মুল মোমিনীন আয়েশা (রা.) বলেন—
كان النبي صلى الله يعتكف فى العشر الأواخر من رمضان حتى توفاه الله عزوجل ثم أزواجه من بعده .(رواه البخارى ومسلم)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকালের পূর্ব-পর্যন্ত রমজানের শেষ দশকে নিয়মিত এতেকাফ করতেন। তার পরে তাঁর স্ত্রী-গণ এতেকাফ করতেন। বোখারি, মুসলিম।
এতেকাফের তাৎপর্য
এতেকাফের অনেক তাৎপর্য রয়েছে। যেমন :—
● আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক সুদৃঢ়করণ।
● অহেতুক কথা ও কুপ্রবৃত্তির তাড়না থেকে সংযত থাকা।
লাইলাতুল কদর তালাশ করা
এটিই ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এতেকাফের মূল লক্ষ্য। বিশিষ্ট সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি রা.-এর হাদিস তাই প্রমাণ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—
إني اعتكفت العشر الأول ألتمس هذه الليلة، ثم اعتكفت العشر الأوسط، ثم أتيت فقيل لي: إنها في العشر الأواخر، فمن أحب منكم أن يعتكف فليعتكف، فاعتكف الناس معه.
আমি এ রজনি তালাশ করতে গিয়ে প্রথম দশকে এতেকাফ করেছি। অত:পর দ্বিতীয় দশকে। পরে আমাকে বলা হল যে এ রজনি শেষ দশকে। অতএব তোমাদের মাঝে যে এতেকাফ করতে চায় সে যেন তা করে। এর পর লোকেরা তাঁর সাথে এতেকাফ করেছে। মুসলিম।

মসজিদে অবস্থানের অভ্যাস গড়া
এতেকাফের মাধ্যমেই বান্দা স্বীয় হৃদয় মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত করণের উপায় খুঁজে পায় এবং তা অভ্যাসে পরিণত করতে সক্ষম হয়। যে সাত শ্রেণির লোকেরা আরশের ছায়ার নীচে আশ্রয় পাবে—তাদের মধ্যে এক শ্রেণি হচ্ছে :—

رجل قلبه معلق في المساجد. البخاري
এমন ব্যক্তি যার হৃদয় মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত থাকে। বোখারি, মুসলিম।
দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্তি ও বিলাসিতা পরিত্যাগ করা :
এতেকাফকারী তার দুনিয়াবী ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকে এবং এতেকাফস্থলে দুনিয়ার ভোগ সামগ্রী থেকে নিরাসক্ত হয়ে কেমন যেন অপরিচিত হয়ে যায় ঐ পথিকের ন্যায় যে গাছের ছায়ায় কিছু সময় বিশ্রাম নেয়ার পর তা ত্যাগ করে চলে যায়।
ক্ষতিকর বদ-অভ্যাস ও কুপ্রবৃত্তি দুরিকরণে নিজেকে তৈরিকরণ।
এতেকাফের বিশেষ কিছু আহকাম
এতেকাফস্থলে প্রবেশ করা ও বের হওয়ার সময় :
রমজানের শেষ দশকের এতেকাফকারীর জন্যে উত্তম হল, বিশ তারিখের সূর্যাস্তের পূর্বেই এতেকাফ স্থলে প্রবেশ করা। কেননা এতেকাফের মূল লক্ষ্য হল লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান, যা শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর একুশতম রাত এরই অন্তর্ভুক্ত।
মসজিদ হতে বের হওয়ার বিধান:
* এতেকাফকারী যদি বিনা ওজরে মসজিদ থেকে পূর্ণ শরীর সহ বের হয়ে যায় তাহলে সর্বসম্মতিক্রমে তার এতেকাফ বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি শরীরের অংশ বিশেষ বের হয় তাহলে অসুবিধা নেই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও এতেকাফ অবস্থায় স্বীয় মাথা বের করে দিতেন। মা আয়েশা (রা.) নিজ কক্ষে থেকেই রাসূলুল্লাহর মাথা ধুয়ে দিতেন। অতি প্রয়োজনীয় বিষয় যেমন ওজু, গোসল, পানাহার, প্রস্রাব, পায়খানা ইত্যাদি কাজের জন্যে সর্বসম্মতিক্রমে বের হওয়া জায়েজ। যদি উল্লেখিত বিষয়াদি মসজিদের ভিতরে বসেই সম্পন্ন করা সম্ভব হয় তাহলে বের হওয়া যাবে না। এতেকাফ যদি এমন মসজিদে হয়, যাতে জুমআর নামাজ হয় না, তাহলে জুমআর জন্য জামে মসজিদে গমন করা ওয়াজিব।
*ওয়াজিব নয় এমন এবাদত যেমন জানাজায় অংশ গ্রহণ, অসুস্থকে দেখতে যাওয়া ইত্যাদি উদ্দেশ্যে বের হওয়া জায়েজ নেই।
এতেকাফকারীর জন্য অনুমোদিত এবাদত :
সব ধরনের এবাদতই এতেকাফকারীর জন্য অনুমোদিত। যেমন, নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া, ইসতেগফার, সালামের উত্তর দেয়া, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ, ফতোয়া প্রদান, ইলম শিক্ষা ইত্যাদি। এতেকাফকারীর জন্য পর্দা টানিয়ে লোকজন থেকে নিজেকে আড়াল করে নেয়া মোস্তাহাব। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতেকাফ করেছেন একটি তুর্কি তাঁবুতে যার প্রবেশ দ্বার ছিল একটি পাটি। মুসলিম
এতেকাফকারী প্রয়োজনীয় বিছানা-পত্র কাপড় ইত্যাদি সাথে নিয়ে নিবে। যাতে মসজিদ হতে বেশি বের হতে না হয়। এতেকাফকারীর জন্য মসজিদের ভেতরে পানাহার, ঘুমানো, গোসল, সাজগোজ, সুগন্ধি ব্যবহার, পরিবার-পরিজনের সাথে কথোপকথন ইত্যাদি সবই বৈধ। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন সীমাতিরিক্ত না হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এতেকাফস্থলে তাঁর পতœীগণের সাক্ষাৎ ও কথোপকথন হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।

এতেকাফকারীর জন্য নিষিদ্ধ কাজসমূহ
*অতিরিক্ত কথা ও ঘুম, অহেতুক-কাজে সময় নষ্ট, মানুষের সাথে বেশি বেশি মেলা-মেশা ইত্যাদি কাজ যা এতেকাফের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে ব্যহত করে।
*ক্রয় বিক্রয় : কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন। (সহি মুসলিম) তবে একান্ত প্রয়োজন হলে ভিন্ন কথা। যেমন এতেকাফকারী নিজের পরিবারের খাদ্য জোগান দেয়ার উদ্দেশ্যে মসজিদের বাইরে ক্রয়-বিক্রয় করলে তাতে অসুবিধা নেই।
*কামভাব সহ স্ত্রী আলিঙ্গন : কেননা তা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম।
*বায়ু নি:সরণ : এটি মসজিদের আদবের পরিপন্থী। তাই পারতপক্ষে এ কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত।
লাইলাতুল কদর
কদর শব্দের অর্থ:
১। সম্মান করা : বিভিন্ন ফজিলতের কারণে এই রজনি সম্মানের অথবা যে ব্যক্তি উদ্যাপন করে সে সম্মানের পাত্র।
২। সংকীর্ণ করা: এ রজনিতে অধিক-হারে ফেরেস্তাগণের অবতরণ ও তাদের বিচরণের ফলে পৃথিবী সংকীর্ণ হয়ে পড়ে।
৩। নির্ধারণ করা : এ রজনিতে পরবর্তী বছরের ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়।
লাইলাতুল কদরের ফজিলত
১। উক্ত রজনিতে মহান রব্বুল আলামিন কোরআনুল করিম অবতীর্ণ করেন, আল্লাহ তাআলা বলেন :—
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ ﴿১﴾ القدر
‘নিশ্চয়ই আমি একে (কোরআন) অবতীর্ণ করেছি কদর রজনিতে।’
ইবনে আব্বাস রা. বলেন, মহান আল্লাহ এ রজনিতেই লওহে মাহফুজ হতে প্রথম আসমানের বাইতুল ইজ্জতে পূর্ণ কোরআন নাজিল করেন। অত:পর তেইশ বছর সময়ে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম )-এর উপর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন পর্বে নাজিল করেন।
২। উক্ত রজনি হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ ﴿৩﴾ القدر
‘লাইলাতুল কদর সহস্র মাস অপেক্ষা উত্তম।’
অর্থাৎ উক্ত রজনিতে এবাদত করা তিরাশি বছর চার মাস এবাদত করার চেয়ে উত্তম।
৩। উক্ত রজনি বরকতময়। আল্লাহ তাআলা বলেন:—
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ ﴿৩﴾ الدخان
 ‘নিশ্চয় আমি একে অবতীর্ণ করেছি মুবারক তথা বরকতময় রজনিতে।’
৪। এ রজনিতে ফেরেস্তাগণ এবং জিবরাইল আমিন অবতীর্ণ হন। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন—
تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ ﴿৪﴾ القدر
 ‘এতে প্রত্যেক কাজের জন্য ফেরেস্তাগণ এবং রুহ (জিবরাইল) অবতীর্ণ হয় তাদের প্রতি পালকের নিদেশক্রমে।’ সূরা কদর
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : কদর রজনি সাতাশ অথবা উনত্রিশ তারিখের রজনি এবং নিশ্চয়ই ফেরেস্তাগণ ঐ রজনিতে পৃথিবীতে ছোট কঙ্করের সংখ্যার চেয়েও অধিক হারে অবতীর্ণ হয়।
৫। উক্ত রজনি শান্তির রজনি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:—
سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ ﴿৫﴾ القدر
‘শান্তিই শান্তি উক্ত রজনি উষার অভ্যুদয় পর্যন্ত।’ সূরা কদর
৬। উক্ত রজনিতে এক বছরের ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়। মহান আল্লাহ বলেন :—
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِينَ ﴿৩﴾ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ ﴿৪﴾ الدخان
নিশ্চয় আমি কোরআনকে একটি বরকতপূর্ণ রজনিতে অবতীর্ণ করি আর নিশ্চয় আমি ভয় প্রদর্শনকারী। এই রজনিতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়। সূরা দুখান : ৪
৭। উক্ত রজনি মাগফেরাতের রজনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : যে ব্যক্তি কদর রজনিতে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় এবাদতে অতিবাহিত করে তার অতীতের গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়।
৮। উক্ত রজনিতে শয়তান বের হয় না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :—‘এ রজনিতে শয়তানের বের হওয়ার অনুমতি নেই।’
৯। উক্ত রজনির সম্মানার্থে মহান রাব্বুল আলামিন একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাজিল করেছেন।
লাইলাতুল কদর তালাশ করা
রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর তালাশ করা মোস্তাহাব তবে তা বে-জোড় রজনিতে হওয়া প্রায় নিশ্চিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:—
تحروا ليلة القدر في الوتر من العشر الأواخر. رواه البخاري ৪/২৫৯.
তোমরা লাইলাতুল কদর তালাশ কর রমজানের শেষ দশকের বে-জোড় রজনিগুলোতে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন:
التمسوها في العشر الأواخر من رمضان، في تاسعة تبقى في سابعة تبقى في خامسة تبقى (البخاري)
তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর তালাশ কর। তা ঊনত্রিশ তারিখে হতে পারে, সাতাশ তারিখেও হতে পারে আবার পঁচিশ তারিখেও হতে পারে। (বোখারি)
তবে লাইলাতুল কদর হাসিল করার জন্য রমজানের শেষ দশকের প্রত্যেক রজনিতে এবাদত করা প্রয়োজন। এতেকাফ করতে পারলে আরো উত্তম।
বি:দ্র: লাইলাতুল কদর এ বেশি বেশি এবাদত, জিকিরও দোয়া করা মোস্তাহাব এবং বিশেষভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত দোয়া—
اَللّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ كَرِيمٌ، تُحِبُّ العَفوَ فَاعفُ عَنِّي. رواه الإمام أحمد والترمذي 
(আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন কারীমুন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নী) হে আল্লাহ ! আপনি ক্ষমাশীল, দয়াময়। ক্ষমাকে ভালোবাসেন তাই আমাকে ক্ষমা করুন। (আহমদ, তিরমিজি)
ফিতরার বিধান
ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত :—
فرض رسول الله صلى الله عليه وسلم زكاة الفطر طهرة للصائم من اللغو والرفث وطعمة للمساكين، فمن أداها قبل الصلاة فهي زكاة مقبولة، ومن أداها بعد الصلاة فهي صدقة من الصدقات. رواه أبوداود.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোজাদারকে অহেতুক অশালীন কথা ও কাজ থেকে পবিত্র করা এবং অসহায় মানুষের আহার জোগান দেয়ার উদ্দেশ্যে জাকাতুল ফিতর-এর বিধান প্রবর্তন করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি ফিতরা ঈদের নামাজের পূর্বে আদায় করে
সেটি গ্রহণযোগ্য হয় এবং যে ঈদের নামাজের পর আদায় করে তা অন্যান্য সাধারণ সদকার মত হয়ে যায়। (আবু দাউদ )
যাদের উপর ফিতরা ওয়াজিব
জাকাতুল ফিতর প্রত্যেক মুসলমানের উপর ওয়াজিব। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)বলেন :—
فرض رسول الله صلى الله عليه وسلم زكاة الفطر صاعا من تمر، أو صاعا من شعير، على العبد والحر، والذكر والأنثى، والصغير والكبير، من المسلمين، وأمر بها أن تودى قبل خروج الناس إلى الصلاة. رواه مسلم
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ‘সা খেজুর বা এক সা’ যবের পরিমাণ জাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন। (এক সা‘=দুই কেজি চল্লিশ গ্রাম) মুসলমান, গোলাম-আজাদ, নারী-পুরুষ ছোট-বড়, সবার উপর এবং ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে এটা আদায় করার আদেশ প্রদান করেন। (মুসলিম)
প্রত্যেক মুসলমান তার নিজের, স্বীয় স্ত্রীর এবং যাদের ভরন পোষণের দায়িত্ব তার উপর ন্যস্ত তাদের পক্ষ থেকেও ফিতরা আদায় করবে, যদি তারা অক্ষম হয়। ঈদের দিন ও রাতের খরচের অতিরিক্ত সম্পদ যে ব্যক্তির কাছে থাকবে তার উপর ফিতরা ওয়াজিব।
যে সকল জিনিস দ্বারা ফিতরা আদায় করা যায় : ইবনে উমর (রা:) থেকে বর্ণিত :—
فرض رسول الله صلى الله عليه وسلم زكاة الفطر من رمضان، صاعا من تمر، أو صاعا من شعير. رواه البخاري ومسلم
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সা’ পরিমাণ খেজুর বা এক সা’ পরিমাণ যব রমজানের জাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন। (বোখারি, মুসলিম)
এগুলো তখনকার খাদ্য ছিল যেমন আবু সাঈদ খুদরি রা. বলেন :
كنا نخرج يوم الفطر صاعا من طعام، وكان طعامنا الشعير والزبيب والأقط والتمر. رواه البخاري.
আমরা আমাদের খাবার দ্বারা ফিতরা আদায় করতাম তখনকার সময়ে আমাদের খাবার ছিল যব, কিশমিশ, পনির, খেজুর। (বোখারি)
ফিতরা আদায়কাল:
আদায় করার সময় দু’টি : ১-উত্তম সময় ২-জায়েজ সময়।
১-ফিতরা আদায় করার উত্তম সময় হচ্ছে ঈদের দিন সকালে ঈদের নামাজের পূর্বে। ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন—
أن النبي صلى الله عليه وسلم أمر بزكاة الفطر قبل خروج الناس إلى الصلاة. رواه مسلم
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের নামাজে বেরোবার পূর্বেই ফিতরা আদায় করার আদেশ প্রদান করেন। এ কারণে ঈদুল ফিতরের নামাজ একটু বিলম্বে পড়া মোস্তাহাব। ঈদের এক বা দু’ দিন পূর্বে আদায় করা জায়েজ। যেমনটি করেছেন ইবনে উমর রা.। (সহি বোখারি)
ফিতরা আদায়ের স্থান
ফিতরা নিজ এলাকার অসহায় লোকদের মাঝে বণ্টন করতে হয়। ঋণ পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তিও প্রয়োজন অনুসারে ফিতরা গ্রহণ করতে পারবে। একজন দরিদ্রকে একাধিক লোকের ফিতরা দেয়া যেতে পারে। আবার একাধিক দরিদ্র লোকের মাঝেও একভাগ ফিতরা বণ্টন করা যেতে পারে। দরিদ্র ব্যক্তি অন্য লোকের কাছ থেকে গ্রহণ করে নিজের ফিতরা আদায় করতে পারবে।
ঈদের আদব ও আহকাম
ঈদ শব্দের অর্থ বারবার ফিরে আসা। ঈদের দিন আল্লাহ তাআলা অনেকগুলো অনুগ্রহ যেমন নিষেধ করার পর আবার দিনে পানাহারের অনুমতি প্রদান, ফিতরা আদায় করার সুযোগ দান ইত্যাদি বার বার ফিরে আসে।
ঈদের বিধান আমাদের জন্য আল্লাহর রহমত ও দয়া স্বরূপ। আনাস রা. থেকে বর্ণিত—
أن النبي صلى الله عليه وسلم قدم المدينة ولهم يومان يلعبون فيهما فقال: ما هذان اليومان؟ قالوا: كنا نلعب فيهما في الجاهلية، فقال صلى الله عليه وسلم: إن الله قد أبدلكم بهما خيراً منهما، يوم الأضحى ويوم الفطر. رواه أبو داود.
যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করলেন, তখন মদিনাবাসীর জন্য দু’টি নির্ধারিত দিন ছিল, যাতে তারা খেলাধুলা ও আনন্দ-ফুর্তি করত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে দু’টি দিন সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা উত্তর দিল আমরা জাহেলি যুগে এ দু’টি দিনে খেলাধুলা করতাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তোমাদের জন্যে ঐ দু’টি দিনকে আরো উত্তম দিন দ্বারা পরিবর্তন করে দিয়েছেন। তাহল ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা।
এ দু’টি দিনের কিছু আদব ও আহকাম রয়েছে :—
১-ঈদের দিন গোসল করা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া মোস্তাহাব। সাঈদ ইবনে মুসাইয়িব রা. বলেন :—
سنة الفطر ثلاث: المشي إلى المصلى، والأكل قبل الخروج، والاغتسال. رواه الفريابي وصححه الألباني
ঈদুল ফিতরের দিন তিনটি কাজ করা সুন্নত। ইদগাহের দিকে পায়ে হেঁটে যাওয়া। বের হওয়ার পূর্বে কিছু আহার করা ও গোসল করা। (ফারয়াবী, আলবানী একে সহি বলেছেন)
২-দু’ ঈদের দিন রোজা রাখা হারাম। আবু হুরায়রারা থেকে বর্ণিত
أن رسول الله صلى الله عليه وسلم نهى عن صيام يومين: يوم الأضحى، ويوم الفطر.رواه مسلم
 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’দিনে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন।ঈদুল ফিতরের দিন ঈদুল আজহার দিন। (মুসলিম)
-দু’ ঈদের রাত আরম্ভ হওয়ার পর থেকে ঈদের নামাজ পর্যন্ত উচ্চ:স্বরে তাকবীর বলা—
ثبت أن النبي صلى الله عليه وسلم كان يخرج يوم الفطر فيكبر حتى يأتي المصلى، وحتى يقضي الصلاة، فإذا قضى الصلاة، قطع التكبير. رواه ابن أبي شيبة وصححه الألباني.
একথা প্রামাণ্য যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে পৌঁছে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত তাকবীর বলতেন। যখন নামাজ আদায় করতেন, তার পর আর তাকবীর বলতেন না। (ইবনে আবী শাইবাহ, আলবানী একে সহি বলেছেন।)
-ঈদের নামাজ পড়া ওয়াজিব। আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ﴿২﴾ الكوثر
আপনি আপনার প্রভুর জন্য নামাজ পড়–ন এবং কুরবানি করুন। (সূরা কাউসার)
-ঈদের নামাজের পূর্বে ও পরে ইদগাহে কোন নফল নামাজ নেই।
-সাহাবায়ে কেরামগণ ঈদের দিন শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন এবং বলতেন :—
تَقَبَّلَ اللهُ مِنَّا وَمِنكَ. ( حسنه ابن حجر في الفتح)
আমদের পক্ষ হতে এবং তোমার পক্ষ হতে আল্লাহ কবুল করুন। (ইবনে হাজার একে হাসান বলেছেন।)
-আত্মীয়তা বজায় রাখা ও নিকট আত্মীয়দের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া।
শাওয়াল মাসের রোজা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের রোজার পর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখতেন। আবু আইয়ুব আল আনসারি রা. হতে বর্ণিত: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
من صام رمضان، ثم أتبعه ستا من شوال كان كصيام الدهر. رواه مسلم.
যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অত:পর শাওয়ালে ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন (পূর্ণ) এক বছর রোজা রাখল। (মুসলিম)
আবু আইয়ুব আল আনসারি(রা.) এ হাদিসের বিশ্লেষণ করে বলেছেন:—
صيام رمضان بعشرة أشهر، وصيام ستة أيام بشهرين، فذلك صيام السنة.
রমজানের রোজার বিনিময়ে দশ মাস এবং শাওয়ালের রোজার বিনিময় দু’ মাস—মোট এক বছরের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে।
কেননা একটি সৎকাজের বিনিময় হচ্ছে দশ নেকি যা কোরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।
মাসআলাঃ যে ব্যক্তি শাওয়ালের রোজা রাখবে সে প্রথমে রমজানের কাজা আদায় করে নিবে, যদি তার দায়িত্বে রমজানের কাজা থেকে থাকে। এরপর শাওয়ালের রোজা রাখবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদিসে এর প্রমাণ রয়েছে।
মাসআলাঃ শাওয়ালের ছয় রোজা ধারাবাহিকভাবে অথবা বিরতি দিয়েও রাখতে পারবে।
রমজান অতিক্রান্ত হলে
আমরা বিদায় জানাচ্ছি মাহে রমজানকে। এই তো বিদায় দিচ্ছি কোরআন তিলাওয়াত, তাকওয়ার অনুশীলন, ধৈর্য, জিহাদ, রহমত, মাগফিরাত ও মুক্তি লাভের মুবারক মাসটিকে। তাহলে কি আমরা প্রকৃত তাকওয়া অর্জন করতে পেরেছি? আমরা কি সর্ব-প্রকার জিহাদে নিজেদেরকে অভ্যস্ত করতে পেরেছি। রহমত, মাগফিরাত ও মুক্তি লাভের উপযোগী আমল করার চেষ্টা করেছি?
রমজানের শিক্ষা
মাহে রমজান একটি ঈমানী পাঠশালা, সারা বছরের পাথেয় উপার্জন, সারা জীবনের মাকসাদকে শানিত করার জন্যে এটি একটি রুহানি ময়দান। যে ব্যক্তি মাহে রমজানে নিজেকে সংশোধন করতে পারল না সে আর কখন নিজের জীবন গঠন করবে ?
মাহে রমজানই এমন একটি প্রতিষ্ঠান যাতে আমরা নিজেদের আমল, শরিয়ত পরিপন্থী আচার ব্যবহার পরিত্যাগ ও চরিত্র সংশোধন করে নিতে পারি। আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ ﴿১১﴾ الرعد
নিশ্চয়ই আল্লাহ ঐ পর্যন্ত কোন জাতির পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদেরকে পরিবর্তন করে নেয়। (রা’দ: ১১)
যদি তুমি সত্যিকার অর্থে রমজান পেয়ে লাভবান হয়ে থাক আর মোত্তাকিদের গুনাবলী অর্জন করে রোজা, তারাবির নামাজ সম্পাদন করে থাক, তাহলে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা কর। তার শোকর আদায় কর এবং তার কাছে মৃত্যু পর্যন্ত অটল থাকার তাওফীক কামনা কর।
তুমি ঐ নারীর মত হয়ও না, যে নাকি সুতা দিয়ে সুন্দর করে সুয়াটার বুনল, যখন তা তাকে আকৃষ্ট করল, তখন একটি একটি করে সুতা খুলে ফেলতে লাগল। মানুষ তার সম্পর্কে কী মন্তব্য করবে? রমজান শেষে যে পুনরায় গুনাহের দিকে ফিরে গিয়ে নেক আমল ছেড়ে দেয়, তার অবস্থাতো ঐ নারীর মতই। আনুগত্য ও মুনাজাতের স্বাদ পাওয়ার পরেও পুনরায় গুনাহ ও অপরাধের দিকে কীভাবে ফিরে যায়?
সুহৃদয় পাঠক বর্গ ! আমরা রমজানে আল্লাহর সাথে যে ওয়াদা করেছি তা ভঙ্গ করার অনেক চিত্র সমাজে ফুটে উঠেছে। যেমন :
১। ঈদের দিনেই জামাতে নামাজ আদায় ছেড়ে দেয়া। তারাবির মত সুন্নত নামাজে মসজিদ ভরা মুসল্লি থাকার পর এখন ফরজ নামাজের সময়ই মুসল্লির সংখ্যা খুব কমে যাওয়া।
২। গান-বাদ্য ও সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়া।
৩। বেহায়া ও বেলেল্লাপনার সাথে হাট-বাজারে ও পার্কে ছেলে- মেয়েদের সহাবস্থান—ইত্যাদি।
তাহলে কি এভাবেই আমরা মাহে রমজানকে বিদায় জানাব ?
এত বড় নেয়ামতের এটাই কি শোকর আদায়, এটাই কি আমল কবুল হওয়ার নিদর্শন ? নিশ্চয় নয়। বরং এটা আমল কবুল না হওয়ার আলামত। কেননা প্রকৃত রোজাদার ঈদের দিন রোজা ছেড়ে দিয়ে আনন্দিত হবে এবং রোজা পূর্ণ করার তাওফীক পাওয়ার দরুন তার প্রতিপালকের প্রশংসা করবে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। সাথে সাথে এই ভয়ে কাঁদবে যে, না জানি আমার রোজা কবুল হয়নি। আমাদের পূর্বসূরীগণ মাহে রমজানের পর ছয় মাস পর্যন্ত আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে রোজা কবুল হওয়ার দোয়া করতেন। আমল কবুল হওয়ার
আলামত হল, পূর্ববর্তী অবস্থার চেয়ে বর্তমান অবস্থা উন্নত হওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন :—
وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ ﴿৯৯﴾ الحجر
মৃত্যু পর্যন্ত তোমার রবের এবাদত কর। (সূরা আল-হিজর:৯৯) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :—
قل آمنت بالله ثم استقم. رواه مسلم
বল বিশ্বাস স্থাপন করলাম আল্লাহর প্রতি, এবং অবিচল থাক। (মুসলিম)
সত্যিকার মোমিন বান্দা সর্বদাই আল্লাহর এবাদত করবে। কোন নির্দিষ্ট মাস, জায়গা অথবা জাতির সাথে মিলে আমল করবে না, বরং সর্বদা সে এবাদত করবে। মোমিন বান্দা মনে করবে যিনি রমজানের প্রভু তিনি অন্যান্য সকল মাসেরও প্রভু। তিনি সকল কাল ও স্থানের প্রভু। রমজান শেষ হয়ে গেলেও শাওয়ালের ছয় রোজা, আশুরা, আরাফা, সোমবার, বৃহস্পতিবার ইত্যাদি নফল রোজা রয়েছে। তারাবীহের নামাজ শেষ হয়ে গেলেও তাহাজ্জুদ নামাজ বাকি আছে সারা বছর। অতএব নেক আমল সব সময় সব জায়গাতেই করা যায়। হে ভাই ! তুমি নেক আমলের চেষ্টা করতে থাক। অলসতা কর না। যদি তুমি নফল আদায় করতে না চাও, তাহলে কমপক্ষে ফরজ ওয়াজিব ছেড়ে দিয়ো না। যেমন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দ্বীনের উপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন!
সমাপ্ত
সংকলন : আবুল কালাম আজাদ
تأليف: أبو الكلام أزاد
সম্পাদনা : নুমান আবুল বাশার
مراجعة: نعمان أبو البشر
সূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব

Translate