Thursday, March 24, 2022

দুআ কবুল হওয়ার উদ্দেশ্যে সুরা ইয়াসিন খতম করার আমল কি হাদিস সম্মত

 দুআ কবুল বা মনের ইচ্ছা পূরণের উদ্দেশ্যে সূরা ইয়াসিন খতম করার বিধান এবং সূরা ইয়াসিনের ফজিলতে বর্ণিত হাদিসগুলোর অবস্থা

▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
প্রশ্ন: দুআ কবুল হওয়ার উদ্দেশ্যে সুরা ইয়াসিন খতম করার আমল কি হাদিস সম্মত?
আরও জানতে চাই, হাদিসের আলোকে সূরা ইয়াসিনের ফজিলত কতটুকু?
উত্তর:
প্রচলিত আছে যে, “সূরাটি ৪১ বার পাঠ করার পর দুআ করার পূর্বে ১১ বার দরুদে ইবরাহিম পাঠ করতে হয়। তারপর দুআ করলে আল্লাহ দুআ কবুল করেন।” কিন্তু এটা দলিল বহির্ভূত ও বানোয়াট কথা। এটি বিদআতিদের তৈরি করা ওজিফা।

প্রকৃতপক্ষে দুআ কবুল বা মনের ইচ্ছা পূরণের জন্য সূরা ইয়াসিন খতম করার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোনও হাদিস নেই। কোনও সাহাবি থেকেও তা প্রমাণিত হয় নি। তাই তো বিশ্ববিখ্যাত আলেমে দীন সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বায রাহ. বলেন,
أن قراءة سورة يس لقضاء الأعمال بدعة
“কার্যসিদ্ধির উদ্দেশ্যে সূরা ইয়াসিন পাঠ করা বিদআত।”

❑ বানোয়াট হাদিস দ্বারা দলিল পেশ!

ইচ্ছা পূরণ, জীবনের নানা সঙ্কট নিরসন বা উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সহজ করণের ক্ষেত্রে সূরা ইয়াসিন খতম করার ব্যাপারে নিম্নোক্ত হাদিসটি পেশ করা হয়:
يس لما قرئت له
“যে উদ্দেশ্যে সূরা ইয়াসিন পাঠ করা হবে তা পূরণ করা হয়।” বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে মিথ্যাচার। এটি আদতে কোনও হাদিস নয়।

✪ ইমাম সাখাবি বলেন, لا أصل له بهذا اللفظ “এই শব্দে বর্ণিত হাদিসটির কোনও ভিত্তি নেই।” [আল মাকাসিদুল হাসানা, হা/৭৪১]-
✪ কাজি যাকারিয়া বায়যাবির হাশিয়াতে বলেন, “এটি বানোয়াট।” [যেমনটি রয়েছে কাশফুল খাফা গ্রন্থে ২/২২১৫]
✪ মোল্লা আলি কারি হানাফি রহ বলেন, قيل لا أصل له أو بأصله موضوع “বলা হয়েছে, এর কোনও ভিত্তি নাই বা মূলত: এটি বানোয়াট।” [আল আসরুল মারফুআহ, ৩৭৭]
✪ শাইখ আলবানি বলেন, এটি বানোয়াট হাদিস। [যাইফুত তারগীব, ৮৮৫]

◯ ইবনে কাসির রাহ. বলেন, কতিপয় আহলে ইলম বলেছেন,
” أنَّ مِن خصائص هذه السورة أنها لا تُقرَأ عند أمر عسير إلا يسره الله تعالى
এই সূরা (সূরা ইয়াসিন) এর অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হল, যে কোনও কঠিন পরিস্থিতিতে এটি পাঠ করা হবে আল্লাহ তা সহজ করে দিবেন।” [তাফসিরে ইবনে কাসির, ৩/৭৪২] কিন্তু এ কথার পক্ষেও কোনও হাদিস বা সাহাবিদের বক্তব্য কিংবা আমল নেই। এভাবে যদি দীনের বিষয়ে দলিল ছাড়া মানুষের মতামত, ফতোয়া, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি গ্রহণ করা হয় তাহলে ইসলামের প্রকৃত রূপ পরিবর্তিত হয়ে যাবে। (আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। আমিন।)

❑ সূরা ইয়াসিন এর ফজিলতে বর্ণিত কোনও হাদিসই সহিহ নয়:

প্রকৃতপক্ষে সূরা ইয়াসিনের ফজিলতে যে সব হাদিস বর্ণিত হয়েছে বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে সেগুলো একটিও সহিহ নয়।

এ বিষয়ে যে সকল হাদিস আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত আছে সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপ:
১. إن لكل شيء قلبا ، وقلب القرآن يس
“প্রতিটি বস্তুর অন্তর আছে। আর কুরআনের অন্তর হল সূরা ইয়াসিন।”
২. من قرأها فكأنما قرأ القرآن عشر مرات
“যে সূরা ইয়াসিন একবার পাঠ করল সে যেন সমস্ত কুরআন দশবার পাঠ করল।”
৩. من قرأ سورة ( يس ) في ليلة أصبح مغفورا له
“যে ব্যক্তি রাতে সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করবে সে ভোরে উঠবে ক্ষমা প্রাপ্ত অবস্থায়।”
৪. من داوم على قراءتها كل ليلة ثم مات مات شهيدا
“যে ব্যক্তি প্রতিনিয়ত সূরা ইয়াসিন পাঠ করবে অতপর মৃত্যু বরণ করবে যাবে সে শহিদ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করবে ।”
৫. من دخل المقابر فقرأ سورة ( يس ) ، خفف عنهم يومئذ ، وكان له بعدد من فيها حسنات
“যে ব্যক্তি গোরস্তানে প্রবেশ করে সূরা ইয়াসিন পাঠ করবে সে দিন কবর বাসীদের শাস্তি লাঘব করা হবে এবং পাঠকারীর জন্য কবরে যত লাশ আছে তাদের সমপরিমাণ সওয়াব লেখা হবে।”
বিজ্ঞ হাদিস বিশারদগণের দৃষ্টিতে এ হাদিসগুলো একটিও সহিহ নয়।
[দ্রষ্টব্য: ইবনুল জাওযী রচিত বিখ্যাত বানোয়াট হাদিস সংকলন আল মাউযুআত ২/৩১৩, শাওকানি রচিত আল ফাওয়ায়েদুল মাজমূআহ, হা/ ৯৭৯, ৯৪২]

মনে রাখতে হবে, যদি এ সূরা খতম করে দুআ করলে তা কবুলের নিশ্চয়তা থাকতো তাহলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উম্মতকে এই মর্যাদা পূর্ণ এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আমলটি থেকে বঞ্চিত করতেন না।

সুতরাং আমাদেরকে এ সব বানোয়াট ও বিদআতি
আমল থেকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলা তৌফিক দান করুন। আমিন।

❑ দুআ কবুলের জন্য বিশুদ্ধ হাদিস সম্মত আমল:

আপনি কুরআনের যেখান থেকে সুবিধা হয় পাঠ করে অথবা নফল নামাজ, রোজা, দান-সদকা ইত্যাদি নেক আমল করার পর এসকল নেক আমলের ওসিলা ধরে আল্লাহর কাছে দুআ করতে পারেন। নেক আমলের ওসিলায় দুআ করলে তা কবুলের সম্ভাবনা থাকে। যেমন: এভাবে বলা, হে আল্লাহ আমার কুরআন খতম, কুরআন তিলাওয়াত, নামাজ, রোজা ও দান-সদকার ওসিলায় আমার দুআ কবুল করো, আমার সমস্যা দূর করে দাও, আমাকে সুস্থতা দান করো, আমাকে বিপদ থেকে রক্ষা করো ইত্যাদি।

এছাড়াও দুআর শর্তাবলি ঠিক রেখে দুআ কবুলের অধিক সম্ভাবনাময় সময় ও ক্ষেত্রগুলোর প্রতি লক্ষ্য রেখে দুআ করবেন। যেমন: ভোর রাতে, যে কোনও সালাতে সেজদা অবস্থায়, রোজা অবস্থায়, ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে, সফর অবস্থায়, আজান ও একামতের মাঝামাঝি সময়, জুমার দিন আসরের পর থেকে মাগরিবের মাঝামাঝি সময় ইত্যাদি। অনুরূপভাবে পিতামাতা ও নেককার-পরহেজগার ব্যক্তিদের দুআ নেওয়ার চেষ্টা করবেন। তাহলে আশা করা যায়, আল্লাহর রাব্বুল আলামিন দুআ কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

রমযানের দিনের বেলায় স্ত্রীর সাথে যা কিছু করা জায়েয

 প্রশ্ন: রমযানের দিনের বেলায় স্ত্রীর পাশে ঘুমানো কি স্বামীর জন্য জায়েয?

উত্তর:

আলহামদুলিল্লাহ।

হ্যাঁ; এটি জায়েয। বরঞ্চ স্বামীর জন্য সহবাস ব্যতীত বা বীর্যপাত ব্যতীত নিজের স্ত্রীকে উপভোগ করা জায়েয আছে।

ইমাম বুখারি (১৯২৭) ও মুসলিম (১১০৬) আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোযা রেখে স্ত্রীকে চুম্বন করতেন; স্ত্রীর সাথে মুবাশারা (আলিঙ্গন) করতেন। এবং তিনি ছিলেন তাঁর যৌনাকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে সক্ষম ব্যক্তি।

সিন্দি বলেন:

তাঁর কথা: ইউবাশিরু (يباشر) বা মুবাশারা করতেন এ কথার অর্থ হচ্ছে- স্ত্রীর চামড়ার সাথে তার চামড়া ছোঁয়ানো। যেমন- গালের উপর গাল রাখা এবং এ জাতীয় কিছু।

উদ্দেশ্য হচ্ছে- চামড়ার সাথে চামড়া লাগানো। এখানে মুবাশারা দ্বারা- সহবাস উদ্দেশ্য নয়।

শাইখ উছাইমীনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:

রোযাদার স্বামীর জন্য রোযাদার স্ত্রীর সাথে কি কি করা জায়েয?

উত্তরে তিনি বলেন:

ফরজ রোযা পালনকারী স্বামীর জন্য তার স্ত্রীর সাথে এমন কিছু করা জায়েয হবে না; যাতে করে তার বীর্যপাত হয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সব মানুষ এক রকম নয়। কারো বীর্যপাত দ্রুত হয়ে যায়; আবার কারো ধীরে ধীরে হয় এবং সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা রাখে। যেমনটি আয়েশা (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে বলেছেন যে, তিনি ছিলেন স্বীয় যৌন চাহিদা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে সক্ষম ব্যক্তি।

আবার কিছু লোক আছে যারা নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না; তার বীর্যপাত দ্রুত হয়ে যায়। এমন ব্যক্তি ফরজ রোযা পালনকালে তার স্ত্রীকে চুম্বন করা, আলিঙ্গন করা ইত্যাদির মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ হওয়া থেকে তাকে সাবধান থাকতে হবে। আর যদি ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে জানে যে, সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে তাহলে তার জন্য স্ত্রীকে চুম্বন করা ও জড়িয়ে ধরা জায়েয আছে; এমনকি ফরয রোযার মধ্যেও। তবে, সাবধান! সহবাসের ব্যাপারে সাবধান! রমযান মাসে যার উপর রোযা রাখা ফরজ সে যদি সহবাসে লিপ্ত হয় তাহলে তার উপর পাঁচটি বিষয় অবধারিত হবে:

এক: গুনাহ।

দুই: রোযা ভেঙ্গে যাওয়া।

তিন: দিনের অবশিষ্ট অংশ পানাহার ও সহবাস থেকে বিরত থাকা ফরজ। যে কোন ব্যক্তি কোন শরয়ি ওজর ছাড়া রমযানের রোযা ভঙ্গ করবে তার উপর বিরত থাকা ও সেদিনের রোযা কাযা করা ফরজ।

চার: সেদিনের রোযা কাযা করা ফরয। কারণ সে ব্যক্তি একটি ফরয ইবাদত নষ্ট করেছে; যার কারণ তার উপর এ ইবাদত কাযা করা ফরজ।

পাঁচ: কাফফারা দেয়া। এ কাফফারা হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন কাফফারা: একজন কৃতদাস আযাদ করা। কৃতদাস না পেলে লাগাতর দুইমাস রোযা রাখা। সেটাও করতে না পারলে ষাটজন মিসকীনকে খাবার খাওয়ানো।

আর যদি রোযাটি ফরজ রোযা হয় তবে রমযান ছাড়া অন্য কোন মাসে; যেমন যে ব্যক্তি রমযানের কাযা রোযা পালন করছে; এমন রোযা ভঙ্গ করলে দুইটি বিষয় অবধারিত হবে: গুনাহ ও রোযাটি কাযা করা। আর যদি রোযাটি নফল রোযা হয় তাহলে কোন কিছু আবশ্যক হবে না। সমাপ্ত

https://islamqa.info/bn/49614

যে সব কারণে সিয়াম বিনষ্ট হয় না (১২টি)

 নিম্নে যে সব কারণে সিয়াম ভঙ্গ হয় না সেগুলো উল্লেখ করা হল:

◍ ১. ভুলক্রমে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করে ফেললে সিয়াম ভঙ্গ হয় না। এরূপ কারো ঘটলে মনে পড়ার সাথে সাথে বিরত হবে এবং সিয়ামে বহাল থাকবে। তার জন্য কাযা ও কাফফারা কিছুই নেই।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

إِذَا نَسِيَ فَأَكَلَ وَشَرِبَ فَلْيُتِمَّ صَوْمَهُ فَإِنَّمَا أَطْعَمَهُ اللَّهُ وَسَقَاهُ

“যে ব্যক্তি সিয়াম অবস্থায় ভুলক্রমে কিছু খেয়ে বা পান করে ফেলে সে যেন তার সিয়াম পূর্ণ করে। কেননা আল্লাহই তাকে খাইয়েছেন ও পান করিয়েছেন।” [বুখারি হাদিস নং ১৯৩৩, মুসলিম, হাদিস নং ১১৫৫]

সূর্য অস্তমিত গেছে এই ধারণা করে ভুলক্রমে কেউ যদি ইফতার করে ফেলে, পরে বুঝতে পারে যে, সূর্য ডুবে নি, তাহলে সে তাৎক্ষণিক পানাহার থেকে বিরত হবে। অত:পর সূর্য অস্ত গেলে ইফতার করবে। তার রোযা বিশুদ্ধ হবে। কোন অসুবিধা হবে না। কেননা আল্লাহ বলেছেন,

رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا

“হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা যদি ভুল করে ফেলি বা করতে ভুলে যাই, তবে আমাদের পাকড়াও করো না”। [সূরা বাকারা: ২৮৬]

◍ ২. যেসব ইনজেকশন দ্বারা খাদ্য ও পানীয়ের কাজ হয়না-যেমন: জ্বর, ব্যথা, কাটা-পোড়া, ক্ষুধার কারণে নয় এমন দুর্বলতা ইত্যাদি রোগের জন্য যেসব ইনজেকশন করা হয় (পেশী, চামড়া বা শিরার ইনজেকশন) তাতে সিয়ামের কোন ত্রুটি হবে না, কারণ তা খাদ্য ও পানীয় কাজ করে না।

অনুরূপভাবে ডায়াবেটিসের জন্য ইনসুলিন ইনজেকশন, দাঁতের চিকিৎসার জন্য অবশ করার ইনজেকশন প্রভৃতির কারণেও সিয়ামের ক্ষতি হবে না।

◍ ৩. মিলনের মাধ্যমে জুনবী হোক বা স্বপ্নদোষের মাধ্যমে-উভয় অবস্থায় গোসল না করেই সিয়ামের নিয়ত ও সাহুর গ্রহণ করতে পারবে, এতে সিয়ামের কোন ত্রুটি হবেনা। তবে ফজরের সালাতের পূর্বে অবশ্যই গোসল করে নিবে। আয়েশা (রাঃ) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বপ্নদোষের মাধ্যমে নয়, স্ত্রী সঙ্গমের মাধ্যমে জানাবত (নাপাক) অবস্থায় ফজর করতেন। অতঃপর গোসল করতেন ও সিয়াম পূর্ণ করতেন। [বুখারি হাদিস নং ১৯২৬]

◍ ৪. রোযা অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে, রোগ, ভয়-ভীতি বা মানসিক দুর্বলতার কারণে (জাগ্রত অবস্থায় উত্তেজনা ব্যতীত) বীর্যপাত হলে সিয়ামের কোন অসুবিধা হবে না। কেননা এতে তার কোন হাত নেই।

◍ ৫. ইচ্ছাকৃত নয় রোগের কারণে বমি হলে সিয়ামের কোন ত্রুটি হবে না। [দলিল ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে]

◍ ৬. শরীর থেকে রক্ত বের হলে বা শিঙ্গা লাগালে সিয়াম নষ্ট হবে না। সিয়াম অবস্থায় শিঙ্গা লাগানো ও অপারেশন করা যায়। উক্ত অবস্থায় অধিক দুর্বলতার কারণে সিয়াম ভাঙ্গার অনুমতি থাকার কথা ভিন্ন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরাম অবস্থায় ও সিয়াম রত অবস্থায় শিঙ্গা লাগিয়েছেন। [বুখারি হাদিস নং ১৯৩৮ ও ১৯৩৯] কিন্তু একটি হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি শিঙ্গা লাগায় এবং যাকে লাগানো হয় উভয়েরই সিয়াম ভেঙ্গে যায়। উহা বুখারির উপরোক্ত হাদিস এবং দারাকুতনী, বায়হাকী ও ত্বাবরানীর বর্ণিত হাদিসের মাধ্যমে মনসুখ হয়ে গেছে। [দেখুন: মুহাল্লা ৬/২০৫ পৃঃ ইরয়াউল গালীল ৪/৭২-৭৫, আছসিয়াম ওয়া রমাযান ২২৪-২২৬ পৃঃ।]

অনুরূপভাবে জখমের কারণে রক্ত বের হওয়া, ব্লাড টেস্টের জন্য রক্ত দেয়া, দাঁত থেকে রক্ত বের হওয়া বা দাঁত উঠানোর সময় রক্ত বের হলে সিয়ামের ক্ষতি হবে না।

◍ ৭. স্ত্রীকে চুম্বন দেয়া ও হাল্কা বিনোদন করার অনুমতি আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বিনা স্বতন্ত্রতার সহিত এ সবের বৈধতা সাব্যস্ত হয়েছে। তবে ঐ লোকদের জন্য যারা কামপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। [বুখারি হাদিস নং ১৯২৭, ১৯২৮, ১৯২৯ ও আস সিয়াম ২২৮-২২৯ পৃঃ। শেষোক্ত গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।]

◍ ৮. মলদ্বার, লিঙ্গের ছিদ্র দিয়ে ঔষধ প্রবেশ করালে সিয়াম নষ্ট হবে না। এমনিভাবে পেটের ভিতর পাকস্থলীর বাইরে, মাথা ফেটে গেলে, মাথার ভিতর ওষুধ প্রবেশ করালে সিয়াম ভঙ্গ হবে না। [আস সিয়াম ২৩১-২৩৪ পৃঃ।]

◍ ৯. চোখে কাজল ব্যবহার করলে, চোখে-কানে ওষুধের ফোটা দিলে, হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের জন্য নাকে ভাপ নেয়া, ইনহেলার বা অক্সিজেন গ্রহণ করা, নারীদের মেকআপ ব্যবহার প্রভৃতিতে সিয়াম নষ্ট হবে না।

◍ ১০. পানি দ্বারা কুলি করা ও নাকে পানি দিয়ে পরিষ্কার করাতে সিয়ামের ত্রুটি হয়না। তবে বেশী করে গড়গড়া করে কুলি করবে না। এসব করতে যেয়ে নাক বা গলা দিয়ে ভুলক্রমে কিছু প্রবেশ করলে সিয়াম নষ্ট বা মাকরূহ হবে না। বিভিন্ন সাহাবি ও তাবেঈ থেকে এরূপ সাব্যস্ত হয়েছে। [আস সিয়াম ২৩৪-২৩৬ পৃঃ]

◍ ১১. পানি দ্বারা বেশী বেশী গোসল করলে, বা গরমের কারণে মাথায় বেশী বেশী পানি ঢাললে, সাঁতার কাটলে, পানিতে ডুব দিলে কোন অসুবিধা নেই। আতর ও ফুলের সুগন্ধি নিলে বা মাখলে, তৈল, ক্রিম ইত্যাদি ব্যবহার করলে, সিঁথি করলে সিয়ামের কোন অসুবিধা হয় না।

গড়গড়া করার জন্য ঔষধ ব্যবহার করলে, মিসওয়াক ও টুথপেস্ট ব্যবহার করলে, থুথু বা কফ গিলে ফেললে সিয়ামের কোন ক্ষতি হবে না।

◍ ১২. মহিলারা খানা পাকানোর সময় তরকারীর বিভিন্ন অবস্থা যাচায়ের জন্য প্রয়োজন থাকলে জিহ্বা দ্বারা পরীক্ষা করতে পারে। বিভিন্ন সাহাবি ও তাবেঈ থেকে এসবের বৈধতা সাব্যস্ত হয়েছে বিষয়গুলি [দলিলসহ দেখুন: আস সিয়াম ২৩৪- ২৩৭পৃঃ]
▬▬▬▬◐✪◑▬▬▬▬
উৎস:
রমজান ও সিয়াম কোর্স
মুহা আবদুল্লাহ আল কাফী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
[দাঈ, দক্ষিণ জেদ্দা ইসলামী দাওয়া সেন্টার-সৌদি আরব]।
সম্পাদনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
[দাঈ, জুবাইল দাওয়অ এন্ড গাইডন্সে সেন্টার, সৌদি আরব]।

সবরের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

 সবর বা ধৈর্য ধারণ করা আকিদার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। জীবনে বিপদ-মুসিবত নেমে এলে অস্থিরতা প্রকাশ করা যাবে না। বরং ধৈর্য ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি আল্লাহর নিকট প্রতিদান পাওয়ার আশা করতে হবে।

◈ ইমাম আহমদ রহ. বলেন, “আল্লাহ তায়ালা কুরআনে নব্বই স্থানে সবর সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।”

◈ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
الصبر ضياء
“সবর হল জ্যোতি।” (মুসনাদ আহমদ ও মুসলিম)

◈ উমর রা. বলেন, “সবরকে আমরা আমাদের জীবন-জীবিকার সর্বোত্তম মাধ্যম হিসেবে পেয়েছি।” (সহিহ বুখারি)
◈ আলী রা. বলেন, “ঈমানের ক্ষেত্রে সবরের উদাহরণ হল দেহের মধ্যে মাথার মত।” এরপর আওয়াজ উঁচু করে বললেন, “যার ধৈর্য নাই তার ঈমান নাই।”
◈ আবু সাঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَا أَعْطَى اللَّهُ أَحَدًا مِنْ عَطَاءٍ أَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ

“আল্লাহ তায়ালা ধৈর্যের চেয়ে উৎকৃষ্ট এবং ব্যাপকতর দান কাউকে দেন নি।” (সুনান আবু দাউদ, অনুচ্ছেদ: নিষ্কলুষ থাকা। সহিহ)

❑ সবরের প্রকারভেদ:

সবর তিন প্রকার। যথা:

✪ ১. আল্লাহর আদেশের উপর সবর করা।
✪ ২. আল্লাহর নিষেধের উপর সবর করা।
✪ ৩. বিপদাপদে সবর করা।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَمَنْ يُؤْمِنْ بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ

“আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোন বিপদ আসে না। আর যে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে তিনি তাঁর অন্তরকে সঠিক পথের সন্ধান দেন।” (সূরা তাগাবুন: ১১)

আলকামা বলেন, “আল্লাহ তায়ালা ‘যার অন্তরকে সঠিক পথের সন্ধান দেন’ সে হল ঐ ব্যক্তি যে বিপদে পড়লে বিশ্বাস করে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। ফলে বিপদে পড়েও সে খুশি থাকে এবং সহজভাবে তাকে গ্রহণ করে।”

অন্য মুফাসসিরগণ উক্ত আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, “যে ব্যক্তি বিপদে পড়লে বিশ্বাস রাখে যে এটা আল্লাহর ফায়সালা মোতাবেক এসেছে। ফলে সে সবর করার পাশাপাশি পরকালে এর প্রতিদান পাওয়ার আশা রাখে এবং আল্লাহর ফয়সালার নিকট আত্মসমর্পণ করে আল্লাহ তায়ালা তার অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন, আর দুনিয়ার যে ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে তার বিনিময়ে তিনি তার অন্তরে হেদায়েত এবং সত্যিকার মজবুত একিন দান করেন। যা নিয়েছেন তার বিনিময় দান করবেন।”

সাঈদ বিন জুবাইর রা. বলেন, “যে ব্যক্তি ঈমান আনে আল্লাহ তার অন্তরকে হেদায়েত দেন।” এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, অর্থাৎ সে কোন ক্ষয়-ক্ষতি ও বিপদের সম্মুখীন হলে বলে ‘ইন্নাল্লিাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেঊন’ অর্থাৎ আমরা আল্লাহর জন্যই আর তাঁর নিকটই ফিরে যাব। (সূরা বাকারা: ১৫৬)

উক্ত আয়াতে প্রমাণিত হয় যে, আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। আরও প্রমাণিত হয় যে, ধৈর্য ধরলে অন্তরের হেদায়াত অর্জিত হয়।

❑ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধৈর্যের প্রয়োজনীয়তা:

প্রতিটি পদক্ষেপে মুমিনের ধৈর্যের প্রয়োজন। আল্লাহর নির্দেশের সামনে ধৈর্যের প্রয়োজন। আল্লাহর পথে দাওয়াতের ক্ষেত্রে ধৈর্যের প্রয়োজন। কারণ, এ পথে নামলে নানা ধরণের কষ্ট ও বিপদের মুখোমুখি হতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ… وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِاللَّهِ

“তোমার প্রভুর পথে আহবান কর হেকমত এবং ভাল কথার মাধ্যমে। আর সর্বোত্তম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর। তোমার প্রভু তো সব চেয়ে বেশি জানেন, কে তাঁর পথ থেকে বিপথে গেছে আর তিনিই সব চেয়ে বেশি জানেন কারা সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন।…আর ধৈর্য ধর। ধৈর্য ধর কেবল আল্লাহর উপর।” (সূরা নাহল: ১২৫-১২৭)

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে গেলেও চরম ধৈর্যের পরিচয় দেয়া প্রয়োজন। কারণ, এ পথে মানুষের পক্ষ থেকে নান ধরণের যাতনার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা লোকমান সম্পর্কে বলেন, (তিনি তার সন্তানকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন):
يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ

“হে বৎস, নামাজ প্রতিষ্ঠা কর, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ কর। আর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধারণ কর। বিপদে ধৈর্য ধরণ করা তো বিশাল সংকল্পের ব্যাপার।” (সূরা লোকমান: ১৭)

মুমিনের ধৈর্যের প্রয়োজন জীবনের নানান বিপদ-মুসিবত, কষ্ট ও জটিলতার সামনে। সে বিশ্বাস করে যত সংকটই আসুক না কেন সব আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে। ফলে সে তা হালকা ভাবে মেনে নেয়। বিপদে পড়েও খুশি থাকে। এ ক্ষেত্রে ক্ষোভ, হতাশা ও অস্থিরতা প্রকাশ করে না। নিজের ভাষা ও আচরণকে সংযত রাখে। কারণ, সে আল্লাহর প্রতি গভীরভাবে বিশ্বাসী। সে তকদিরকে বিশ্বাস করে। তকদীরকে বিশ্বাস করা ঈমানের ছয়টি রোকনের একটি।

তকদিরের উপর ঈমান রাখলে তার অনেক সুফল পাওয়া যায়। তন্মধ্যে একটি হল, বিপদে ধৈর্য ধারণ। সুতরাং কোন ব্যক্তি বিপদে সবর না করলে তার অর্থ হল, তার কাছে ঈমানের এই গুরুত্বপূর্ণ খুঁটিটি অনুপস্থিত। অথবা থাকলেও তা খুব নড়বড়ে। ফলে সে বিপদ মুহূর্তে রাগে-ক্ষোভে ধৈর্যহীন হয়ে পড়ে। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খবর দিয়েছেন যে, এটা এমন এক কুফরি মূলক কাজ যা আকিদার মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করে।

❑ বিপদ-আপদের মাধ্যমে বান্দার গুনাহ মোচন হয়:

আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদেরকে বিভিন্ন বালা-মুসিবত দেন এক মহান উদ্দেশ্যে। তা হল এসবের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বান্দার গুনাহ মোচন করে থাকেন। যেমন: আনাস রা. বর্ণিত হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدِهِ الْخَيْرَ عَجَّلَ لَهُ الْعُقُوبَةَ فِي الدُّنْيَا وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدِهِ الشَّرَّ أَمْسَكَ عَنْهُ بِذَنْبِهِ حَتَّى يُوَافِيَ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

“আল্লাহ যখন কোন বান্দার কল্যাণ চান তখন দুনিয়াতেই তাকে শাস্তি দেন। কিন্তু বান্দার অকল্যাণ চাইলে তিনি তার গুনাহের শাস্তি থেকে বিরত রেখে কিয়ামতের দিন তার যথার্থ প্রাপ্য দেন।” (সহিহ তিরমিযি-আলবানি, হা/২৩৯৬)

ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, “বিপদ-মুসিবত হল নেয়ামত। কারণ এতে গুনাহ মাফ হয়। বিপদে ধৈর্য ধারণ করলে তার প্রতিদান পাওয়া যায়। বিপদে পড়লে আল্লাহর কাছে আরও বেশি রোনাজারি করতে হয়। তার নিকট আরও বেশি ধর্না দিতে হয়। আল্লাহর নিকট নিজের অভাব ও অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরার প্রয়োজন হয়। সৃষ্টি জীব থেকে বিমুখ হয়ে এক আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হয়।…বিপদের মধ্যে এ রকম অনেক বড় বড় কল্যাণ নিহিত রয়েছে।

বিপদে পড়লে যদি গুনাহ মোচন হয়, পাপরাশী ঝরে যায় তবে এটা তো বিশাল এক নেয়ামত। সাধারণভাবে বালা-মসিবত আল্লাহর রহমত ও নেয়ামত লাভের মাধ্যম। তবে কোন ব্যক্তি যদি এ বিপদের কারণে এর থেকে আগের থেকে আরও বড় গুনাহের কাজে জড়িয়ে পড়ে তবে তা দ্বীনের ক্ষেত্রে তার জন্য বিশাল ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, কিছু মানুষ আছে যারা দরিদ্রতায় পড়লে বা অসুস্থ হলে তাদের মধ্যে মুনাফেকি, ধৈর্য হীনতা, মনোরোগ, স্পষ্ট কুফুরী ইত্যাদি নানান সমস্যা সৃষ্টি হয়। এমনকি অনেকে কিছু ফরয কাজ ছেড়ে দেয়। অনেকে বিভিন্ন হারাম কাজে লিপ্ত হয়। ফলে দ্বীনের ক্ষেত্রে তার বড় ক্ষতি হয়ে যায়। সুতরাং এ রকম ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিপদ না হওয়াই কল্যাণকর। মুসীবতের কারণে নয় বরং মুসীবতে পড়ে তার মধ্যে যে সমস্যা সৃষ্টি তার কারণে বিপদ না আসাই তার জন্য কল্যাণকর।
পক্ষান্তরে বিপদ-মুসীবত যদি কোন ব্যক্তির মধ্যে ধৈর্য ও আনুগত্য সৃষ্টি করে তবে এই মুসীবত তার জন্য দ্বীনের ক্ষেত্রে বিশাল নেয়ামতে পরিণত হয়….।”

❑ বিপদ-আপদ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বান্দার ধৈর্যের পরীক্ষা নেন:

বিপদ দিয়ে আল্লাহ পরীক্ষা করেন কে ধৈর্যের পরিচয় দেয় এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকে পক্ষান্তরে কে ধৈর্য হীনতার পরিচয় দেয় ও আল্লাহর সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

إِنَّ عِظَمَ الْجَزَاءِ مَعَ عِظَمِ الْبَلَاءِ وَإِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ قَوْمًا ابْتَلَاهُمْ فَمَنْ رَضِيَ فَلَهُ الرِّضَا وَمَنْ سَخِطَ فَلَهُ السَّخَطُ

“বিপদ যত কঠিন হয় পুরস্কারও তত বড় হয়। আল্লাহ কোন জাতিকে ভালবাসলে তাদেরকে পরীক্ষা করেন। সুতরাং যে তাতে সন্তুষ্ট থাকে আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান আর যে তাতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান।” (সহিহ তিরমিযি-আলবানি, হা/২৩৯৬)

অত্র হাদিসে আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় দিক রয়েছে। যেমন:

✪ ১. বান্দা যেমন আমল করবে তেমনই প্রতিদান পাবে। “যেমন কর্ম তেমন ফল।”
✪ ২. এখানে আল্লাহর একটি গুনের পরিচয় পাওয়া যায়। তা হল ‘সন্তুষ্ট হওয়া’। আল্লাহ তায়ালার অন্যান্য গুনের মতই এটি একটি গুন। অন্য সব গুনের মতই এটিও আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য হবে যেমনটি তার জন্য উপযুক্ত হয়।
✪ ৩. অত্র হাদিসে জানা গেল যে, আল্লাহ তায়ালা এক বিশাল উদ্দেশ্যে বান্দা উপর বিপদ-মসিবত দিয়ে থাকেন। তা হল তিনি এর মাধ্যমে তার প্রিয়পাত্রদেরকে পরীক্ষা করেন।
✪ ৪. এখানে তকদীরের প্রমাণ পাওয়া যায়।
✪ ৫. মানব জীবনে যত বিপদাপদই আসুক না কেন সব আসে আল্লাহর তকদীর তথা পূর্ব নির্ধারিত ফয়সালা অনুযায়ী।
✪ ৬. এখান থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, বিপদ নেমে আসলে ধৈর্যের সাথে তা মোকাবেলা করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি মহুর্তে প্রতিটি বিপদের মুখে আল্লাহর নিকটই ধর্না দিতে হবে এবং তার উপরই ভরসা রেখে পথ চলতে হবে।

❑ ধৈর্যের পরিণতি প্রশংসনীয়:

জীবনের সকল কষ্ট ও বিপদাপদে আল্লাহ তায়ালা নামায ও সবরের মাধ্যমে তাঁর নিকট সাহায্য চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, এতেই মানুষের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। ধৈর্যের পরিণতি প্রশংসনীয়। আল্লাহ তায়ালা খবর দিয়েছেন যে, তিনি ধৈর্যশীলদের সাথেই থাকেন। অর্থাৎ তাদেরকে তিনি তাদের সাহায্য করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা নামায ও সবরের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য অনুসন্ধান কর। নিশ্চয় আল্লাহ সবর কারীদের সাথে থাকেন।” (সূরা বাকরা: ১৫৩)

এখান থেকে ধৈর্য ধারণ করার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা যায়। মুমিন ব্যক্তির জন্য জীবনের প্রতিটি পদে পদে ধৈর্যের পরিচয় দেয়া দরকার। এই সবরের মাধ্যমে আকীদা ও বিশ্বাস দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ধৈর্য ধারণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
সবরের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:
মূল: ড. শাইখ সালিহ ফাউযান আল ফাউযান (হাফিযাহুল্লাহ)।
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

উঁচু আওয়াজে অতিরিক্ত হাসার কুফল

 প্রশ্ন: আমি শুনেছি যে, বেশি হাসলে নাকি আন্তর কঠিন হয়ে যায়। এটা কি সহীহ?

উত্তর:
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, উচ্চশব্দে বেশি পরিমাণে হাসলে মন মরে যায় এবং চেহারার উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়ে যায়। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إيَّاك وكثرةَ الضَّحك؛ فإنَّه يميت القلبَ، ويذهب بنورِ الوجه
“উচ্চ আওয়াজে হাসা থেকে সাবধান থাকো। কেননা এতে অন্তর মরে যায় এবং মুখ মণ্ডলের উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়ে যায়।” (মুসনাদ আহমদ প্রমূখ। শাইখ আলবানী এটিকে সহীহ বলেছেন)

এখানে উদ্দেশ্য হল, বেশি পরিমাণে অট্টহাসি দেয়া। এটি বিভিন্ন দিক দিয়ে ক্ষতিকর। তবে মাঝে-মধ্যে উঁচু আওয়াজে হাসা দোষণীয় নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনও কখনও উঁচু আওয়াজে হেসেছেন। কিন্তু তিনি অধিকাংশ সময় মুচকি হাসতেন।

🌀 উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন: “যে ব্যক্তি বেশি পরিমাণে আওয়াজ করে হাসে তার ব্যক্তিত্ব বোধ কমে যায়।”

🌀 ইমাম মাওয়ারদী তার বিখ্যাত আদাবুদ দ্বীন ওয়াদ দুনিয়া গ্রন্থ বলেন:
“উঁচু আওয়াজে হাসার অভ্যাস মানুষকে গুরুত্বপূর্ণ কাজে অমনোযোগী করে দেয়, বিভিন্ন সমস্যা ও সংকটের মুহুর্তে মনকে বিক্ষিপ্ত ও ভীত-ত্রস্ত করে আর যে অধিক পরিমাণে উঁচু আওয়াজে হাসে তার আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তিত্ব বোধ থাকে না…।”

🌀 বৈজ্ঞানিকভাবেও প্রমাণিত হয়েছে, অট্টহাসি মানুষের হার্ট এ্যাটাকের অন্যতম কারণ। কারণ মানুষ যখন হো হো করে অট্টহাসি হাসে তখন তার শীরা-উপশিরায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং দেহের রক্তচাপ বেড়ে যায়। এটি বেশি মাত্রায় হলে হঠাৎ হার্ট এ্যাটাক করে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।

তাই হাসির ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। বিশেষ করে মৃদ হাসি মানুষের ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। মনিষীগণ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য মুচকি হাসিকে অন্যতম উপায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এটি দেহ ও মন উভয়ের জন্যই ভালো। তাই তো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিসে মুচকি হাসিকে সদকা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
আবু যর রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
تبسمك في وجه أخيك لك صدقة
“তোমার অপর ভাইয়ের সম্মুখে তুমি মুচকি হাসি দিলে, তা সদকা হিসেবে পরিগণিত হবে।” (সহীহ তিরমিযী, হা/১৯৫৬) এবং তিনি নিজেও অধিকাংশ সময় মুচকি হাসতেন এবং হাসি-খুশি জীবন যাপন করতেন।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬🌐🔸🌐▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব

Translate