Thursday, March 24, 2022

সেহেরির সময়ে পড়তে হয় ইসলামী শরিয়তে এমন কোন দুআ আছে কী?

 প্রশ্ন: স্কুলে অধ্যয়নকালে আমি মনে করতাম যে, শুধু ইফতারের সময় বিশেষ দুআ আছে; সেহেরির সময়ে নয়। কারণ সেহেরির সময় নিয়্যত করা হয়; আর নিয়্যতের স্থান হলো অন্তর। তবে আমার স্বামী আমাকে বলেছেন যে, সেহেরির সময়ও বিশেষ দুআ আছে। আশা করি বিষয়টি স্পষ্ট করবেন- এই কথা সঠিক কিনা?

উত্তর:

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

হ্যাঁ, হাদিসে এমন কিছু দোয়া বর্ণিত হয়েছে যে দোয়াগুলো একজন রোজাদার ইফতারের সময় তথা রোজা ভাঙ্গার সময় পড়বেন। যেমন রোজাদার বলবেন:

ذَهَبَ الظَّمَأُ وَ ابْتَلَّتِ العُرُوْقُ وَ ثَبَتَ الأَجْرُ إنْ شَاءَ الله

“পিপাসা দূরীভূত হল, শিরা-উপশিরা সিক্ত হল এবং আল্লাহ চাহেত সওয়াব সাব্যস্ত হল।’’ এছাড়াও রোজাদার তার পছন্দমত যে কোন দুআ করতে পারেন। এই দোয়া করার কারণ এই নয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের আদর্শ (সুন্নাহ) হতে সুনির্দিষ্টভাবে এ ক্ষেত্রে কোন উদ্ধৃতি আছে। বরং এজন্য যে, এটি একটি ইবাদতের সমাপ্তি পর্ব। এ ধরনের সময়ে একজন মুসলমানের দুআ করা শরিয়তসম্মত।

শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহকে প্রশ্ন করা হয়েছিল:

ইফতারের সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত মাসনুন (সুন্নাহতে প্রমাণিত) দুআ আছে কি? এই দোয়া করার সময়ই বা কখন? একজন রোজা পালনকারী কি মুয়াজ্জিনের সাথে আযান পুনরাবৃত্তি করবেন; নাকি তার ইফতার চালিয়ে যেতে থাকবেন ?

উত্তরে তিনি বলেন :

“নিঃসন্দেহে ইফতারের সময় দু‘আ কবুলের সময়। কারণ এটি একটি ইবাদত পালনের শেষ মুহূর্ত। তাছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইফতারের সময় রোজাদার দুর্বল থাকে। আর মানুষ যত বেশি দুর্বল থাকে ও অন্তর যত নরম থাকে সে তত বেশি আল্লাহর প্রতি অনুগত ও বিনয়ী  হয়। ইফতারের সময়ের মাসনূন দুআ হল:

اَللهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَ عَلَى رِزْقِك أَفْطَرْتُ

‘‘হে আল্লাহ আমি আপনার জন্য রোজা পালন করলাম এবং আপনার দেয়া রিযিক দ্বারা ইফতার করলাম।’’
এ বিষয়ে আরও একটি দোয়া নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত হয়েছে:

ذَهَبَ الظَّمَأُ وَ ابْتَلَّتِ العُرُوْقُ وَ ثَبَتَ الأَجْرُ إنْ شَاءَ الله

‘‘পিপাসা দূরীভূত হল, শিরা উপশিরা সিক্ত হল এবং আল্লাহ চাহেত সওয়াব সাব্যস্ত হল
এই হাদীসদ্বয় সাব্যস্তের ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকলেও আলেমগণের কেউ কেউ এই হাদিসদুটোকে হাসান হাদিস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যাই হোক, আপনি  ইফতারের সময় এই দুআ দুটি পড়তে পারেন অথবা অন্য যে কোন দুআ করতে পারেন। এটি দোয়া কবুল হওয়ার মুহূর্ত।” সমাপ্ত [মাজমূ ফাতাওয়া  আশ-শাইখ ইবনে উছাইমীন (প্রশ্ন নং ১৯/৩৪১)]

“পিপাসা দূরীভূত হল…” ও “হে আল্লাহ, আপনার জন্য রোজা পালন করলাম…” এই দুই হাদীসের তাখরীজ (সনদ-বিশ্লেষণ) জানতে দেখুন (26879) নং প্রশ্নের উত্তর। সেখানে প্রথম হাদিসটির “যয়ীফ (দুর্বল) হওয়া ও দ্বিতীয় হাদিসটির “হাসান” (মধ্যমমান) হওয়ার বর্ণনা রয়েছে এবং সেখানে দুআ সংক্রান্ত শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ এর ফতোয়াও উল্লেখ করা হয়েছে।

পক্ষান্তরে সেহেরির সময় পড়তে হয় এমন কোন বিশেষ দুআ নেই। শরীয়তসম্মত হল, খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলে বা আল্লাহর নামে শুরু করা এবং খাওয়া শেষে আলহামদুলিল্লাহ পড়ে তাঁর প্রশংসা করা, যেমনটি সব খাওয়ার বেলায় করা হয়।

তবে যে ব্যক্তি রাতের এক তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হওয়ার পর সেহেরি খায় তিনি এমন একটি সময় পান যে সময়ে আল্লাহ তাআলা অবতরণ করেন এবং যে সময়ে দোয়া কবুল হয়। আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

( يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ : مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ ، مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ ، مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ ). رواه البخاري ( 1094 ) ومسلم ( 758 )

‘‘রাতের শেষ তৃতীয়াংশ বাকি থাকতে আমাদের মহান রব্ব দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। অবতরণ করে তিনি বলতে থাকেন: ‘কে আমার কাছে দোয়া করবে? আমি তার দোয়া কবুল করব। কে আমার কাছে প্রার্থনা করবে? আমি তাকে দান করব। কে আমার কাছে ইসতিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দিব।”[হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী (১০৯৪) ও মুসলিম (৭৫৮)] সুতরাং এ সময়ে দুআ করা যেতে পারে। যেহেতু এটি দুআ কবুলের সময়; সেহরির সময় হিসেবে নয়।

আর নিয়্যতের স্থান হচ্ছে অন্তর। জিহ্বা দ্বারা নিয়্যত উচ্চারণ করা- শরিয়তসম্মত নয়। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেছেন: যে ব্যক্তি মনে মনে সংকল্প করলো যেসে পরের দিন রোজা পালন করবে, তবে তার নিয়্যতকরা হয়ে গেলো’’ (37643) ও (22909) নং প্রশ্নের উত্তর দেখুন।

আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।

https://islamqa.info/bn/65955

রমজান মাসে কোন আমলটি উত্তম- কুরআন তেলাওয়াত; নাকি নামায আদায়?

 প্রশ্ন: রমজানের দিনের বেলায় কোন আমলটি উত্তম- কুরআন তেলাওয়াত; নাকি নফল নামায আদায়?

উত্তর :

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ ছিল তিনি রমজান মাসে বিভিন্ন ধরণের ইবাদত বেশি বেশি পালন করতেন। রমজানের রাতে জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁর সাথে কুরআন অধ্যয়ন করতেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনিতেই সবচেয়ে বেশি দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। এর সাথে জিবরাঈল (আঃ) যখন তাঁর সাথে দেখা করতেন তখন তিনি বহমান বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল হয়ে যেতেন। তাঁর দানশীলতা সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পেত রমজান মাসে। এ মাসে তিনি বেশি বেশি দান-সদকা করতেন, অন্যের প্রতি ইহসান করতেন, কুরআন তেলাওয়াত করতেন, নামায আদায় করতেন, যিকির ও ইতিকাফ করতেন। এই মহান মাসে এসব ইবাদত পালন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ।

কিন্তু কুরআন তেলাওয়াত ও নফল নামায আদায় দুটোর মধ্যে কোনটাকে প্রাধান্য দেয়া হবে এটি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ভিন্ন হতে পারে। এর সঠিক মূল্যায়ন আল্লাহ করবেন; কারণ তিনি সর্ববিষয়ে জ্ঞাত। [শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায  রচিত আল জওয়াবুস্‌ সহীহ মিন আহকামি সালাতিল লাইলি ওয়াত তারাউয়ীহ (পৃঃ ৪৫) শীর্ষক বই হতে সংকলিত ]

বিশেষ কোন একটা আমল নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির জন্য উত্তম হতে পারে। আবার অন্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে অন্য কোন আমল উত্তম হতে পারে। এটি নির্ভর করবে কোন আমলটি ব্যক্তিকে আল্লাহর অধিক নৈকট্য হাছিল করিয়ে দেয়। কোন কোন মানুষ নফল নামায পড়াকালে বেশ খুশুখুযু অবলম্বন করতে পারেন। যার ফলে অন্য আমলের তুলনায় এ আমলের মাধ্যমে তিনি আল্লাহ তাআলার নৈকট্য বেশি হাছিল করতে পারেন। তাই এ আমল পালন করা তার জন্য অধিক উত্তম।

আল্লাহই  সবচেয়ে ভালো জানেন।

শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ।।

রোজাদারের জন্য যে সুন্নতগুলো পালন করা মুস্তাহাব

 প্রশ্ন: রোজার সুন্নতগুলো কি কি?

উত্তর :

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

রোজা একটি মহান ইবাদত। সওয়াবের আশাবাদী রোজাদারের সওয়াব আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “বনি আদমের প্রত্যেকটি কাজের সওয়াব তার নিজের জন্য; রোজা ছাড়া। রোজা আমার জন্য; আমিই রোজার প্রতিদান দিব।”[সহিহ বুখারী (১৯০৪) ও সহিহ মুসলিম (১১৫১)]

রমজানের রোজা ইসলামের একটি রোকন। রোজা ফরজ হোক অথবা নফল হোক একজন মুসলমানের রোজা পালনে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত; যাতে সে আল্লাহর কাছ থেকে উপযুক্ত প্রতিদান পেতে পারে।

রোজার অনেক সুন্নত রয়েছে। যেমন-

এক:

রোজাদারকে কেউ গালি দিলে অথবা তার সাথে ঝগড়া করলে এর বিনিময়ে তার সাথে ভাল ব্যবহার করে বলবে: “আমি রোজাদার”।

দুই:

রোজাদারের জন্য সেহেরী খাওয়া সুন্নত। সেহেরীর মধ্যে বরকত রয়েছে।

তিন:

অনতিবিলম্বে ইফতার করা সুন্নত; আর দেরিতে সেহরী খাওয়া সুন্নত।

চার:

কাঁচা খেজুর দিয়ে ইফতার করা; কাঁচা খেজুর না পেলে শুকনো খেজুর দিয়ে; শুকনো খেজুরও না পেলে পানি দিয়ে ইফতার করা সুন্নত।

পাঁচ:

ইফতারের সময় এই দোয়াটি পড়া

“ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ، وَثَبَتَ الْأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ”

“তৃষ্ণা দূর হয়েছে; শিরাগুলো সিক্ত হয়েছে এবং প্রতিদান সাব্যস্ত হয়েছে; ইনশাআল্লাহ”।

এ সংক্রান্ত দলিলগুলো জানতে 39462 নং প্রশ্নের জবাব দেখুন।

ছয়:

রোজাদারের বেশি বেশি দু’আ করা মুস্তাহাব। দলিল হচ্ছে- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “তিন ব্যক্তির দু’আ ফিরিয়ে দেয়া হয় না। ন্যায়পরায়ণ শাসক। রোজাদার; ইফতার করার পূর্ব পর্যন্ত। মজলুমের দু’আ।

মুসনাদে আহমাদ (৮০৪৩), মুসনাদ কিতাবের পাঠোদ্ধারকারী সম্পাদকগণ হাদিসটিকে অন্যান্য সহায়ক সনদ ও হাদিসের ভিত্তিতে ‘সহিহ’ বলেছেন।

ইমাম নববী (রহঃ) বলেছেন:

রোজাদারের জন্য রোজাপালনকালে নিজের জন্য, প্রিয় মানুষের জন্য এবং সকল মুসলমানের দুনিয়া ও আখেরাতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দু’আ করা মুস্তাহাব।[আল-মাজমু (৬/৩৭৫)]

সাত:

রোজার দিন নিম্নোক্ত বিষয়গুলো পালন করা মুস্তাহাব:

–      মসজিদে বসে বসে কুরআন তেলাওয়াত করা ও আল্লাহর যিকির করা।

–      শেষ দশদিন ইতিকাফ করা।

–      তারাবীর নামায আদায় করা।

–      বেশি বেশি দান সদকা করা।

–      পরস্পর কুরআন অধ্যয়ন করা। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন শ্রেষ্ঠ বদান্য মানুষ। তিনি সবচেয়ে বেশি বদান্য হতেন রমজান মাসে; যখন জিব্রাইল (আঃ) তাঁর সাথে সাক্ষাত করতেন। জিব্রাইল (আঃ) প্রতি রাতে তাঁর সাথে সাক্ষাত করতেন এবং একে অপরকে কুরআন পাঠ করে শুনাতেন। নিশ্চয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুক্ত বাতাস চেয়ে অধিক বদান্য ছিলেন।”

-অনর্থক ও বেহুদা কাজে সময় নষ্ট না করা; যা তার রোজার উপর প্রভাব ফেলতে পারে যেমন অতিরিক্ত ঘুম, অতিরিক্ত ঠাট্টা মশকরা ইত্যাদি। নানা রকম খাবারদাবার নিয়ে ব্যতিব্যস্ত না হওয়া। কারণ রোজা পালনকালে এগুলো তাকে অনেক নেকীর কাজ করা থেকে বিরত রাখবে।

আর জানতে দেখুন  12468 ও 26869 নং প্রশ্নোত্তর।

আল্লাহই ভাল জানেন।

https://islamqa.info/bn/222064

ইফতারকালে পঠিতব্য দোয়া

 প্রশ্ন: যে হাদিসগুলোর ব্যাপারে আলেমগণ বলেছেন “যায়িফ বা দুর্বল” সেসব হাদিস দিয়ে দোয়া করার হুকুম কি?

১. ইফতারের সময়: ‘আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু, ওয়া আলা রিযকিকা আফতারতু’ (অর্থ হে আল্লাহ্‌, আমি আপনার জন্যই রোযা রেখেছি এবং আপনার দেয়া রিযিক দিয়ে ইফতার করছি।)
২. ‘আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌। আসতাগফিরুল্লাহ্‌। আসআলুকাল জান্নাহ, ওয়া আউজু বিকা মিনান্নার’Ñ এ দোয়াটি পড়া কি শরিয়তসম্মত, জায়েয নাকি জায়েয নয়? নাকি মাকরূহ? নাকি শুদ্ধ নয়; হারাম?

উত্তর:

আলহামদুলিল্লাহ।

এক:

আপনি ইফতারের যে দোয়াটি উল্লেখ করেছেন সেটি একটি দুর্বল হাদিসে এসেছে। হাদিসটি সুনানে আবু দাউদ গ্রন্থে মুয়ায বিন যাহরা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তার কাছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে পৌঁছেছে যে, যখন কেউ ইফতার করে তখন সে যেন বলে, আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু, ওয়া আলা রিযকিকা আফতারতু” (অর্থ- হে আল্লাহ্‌, আমি আপনার জন্য রোযা রেখেছি। এবং আপনার দেয়া রিযিক দিয়ে ইফতার করছি।)

তবে এ দোয়ার পরিবর্তে সুনানে আবু দাউদ গ্রন্থে ইবনে উমর (রাঃ) থেকে যে দোয়াটি বর্ণিত হয়েছে সেটাই যথেষ্ট। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ইফতার করতেন তখন বলতেন: “যাহাবায যামাউ, ওয়াব তাল্লাতিল উরুক্বু ও ছাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ্‌।” (অর্থ- তৃষ্ণা দূর হয়ে গেল, শিরা-উপশিরা সিক্ত হল এবং ইনশাআল্লাহ্‌, সওয়াব সাব্যস্ত হল” [আলবানী ‘সহিহ আবু দাউদ গ্রন্থে’ হাদিসটিকে হাসান আখ্যায়িত করেছেন]

দুই:

রোযাদারের জন্য রোযা অবস্থায় ও ইফতারকালীন সময়ে দোয়া করা মুস্তাহাব। দলিল হচ্ছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমরা বললাম: ইয়া রাসূলুল্লাহ্‌, যখন আমরা আপনাকে দেখি আমাদের অন্তরগুলো কোমল হয়ে যায় এবং আখেরাতমুখী হয়ে উঠি। আর আমরা যখন আপনার সাক্ষাত থেকে চলে যাই তখন দুনিয়া আমাদেরকে আকৃষ্ট করে, আমরা নারী ও সন্তানে মুগ্ধ হই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: তোমরা আমার কাছে থাকাকালে যে অবস্থায় থাক সর্বদা যদি সে অবস্থায় থাকতে তাহলে ফেরেশতারা তাদের হাত দিয়ে তোমাদের সাথে মুসাফাহা করত, তোমাদের বাড়ীতে গিয়ে তোমাদের সাথে সাক্ষাত করত। আর যদি তোমরা গুনাহ না করতে তাহলে আল্লাহ্‌ তোমাদের বদলে এমন এক কওমকে নিয়ে আসতেন যারা গুনাহ করত; যাতে করে আল্লাহ্‌ তাদেরকে ক্ষমা করতে পারেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা বললাম: হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আমাদেরকে জান্নাতের বিবরণ দিন, জান্নাতের ভবনগুলো কেমন হবে? তিনি বলেন: একটি ইট হবে স্বর্ণের, অপরটি হবে রৌপ্যের। প্লাস্টার হচ্ছে- উত্তম সুঘ্রাণের মিসক দিয়ে। কংকর হবে মুক্তা ও নীলকান্তমণির। মাটি হবে জাফরানের। যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে সে সেখানে নেয়ামত ভোগ করবে; কখনও দুর্ভোগে পড়বে না। চিরদিন সেখানে থাকবে; কখনও মৃত্যুবরণ করবে না। তার পোশাকাদি পুরাতন হবে না। তার যৌবন শেষ হবে না। তিন ব্যক্তির দোয়া ফেরত দেয়া হয় না: ন্যায়পরায়ন শাসক, রোযাদার ব্যক্তি ইফতার করা অবধি এবং মজলুম ব্যক্তি। মজলুমের দোয়া মেঘের উপরে বহন করা হয়, মজলুমের দোয়ার জন্য আসমানের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়। রব্ব বলতে থাকেন: আমার গৌরবের শপথ, কিছু সময় পরে হলেও আমি তোমাকে সাহায্য করব।” [মুসনাদে আহমাদের তাহকীক এর মধ্যে শুয়াইব আরনাউত হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন]

সুনানে তিরমিযির রেওয়ায়েতে (২৫২৫) এসেছে, “রোযাদার ইফতার করাকালে…”[আলবানী সহিহুত তিরমিযি গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন]

অতএব, আপনি আল্লাহ্‌র কাছে জান্নাত প্রার্থনা করতে পারেন, জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতে পারেন, ইসতিগফার করতে পারেন, শরিয়ত অনুমোদিত যে কোন দোয়া করতে পারেন। তবে, আপনি প্রশ্নে যে ভাষ্যে দোয়াটি উল্লেখ করেছেন “আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আসতাগফিরুল্লাহ্‌, আসআলুকাল জান্নাহ, ওয়া আউযুবিকা মিনান্নার” এ ভাষায় আমরা দোয়াটি পাইনি।

আল্লাহ্‌ ভাল জানেন।

ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব।।

একটি সংশয়ের জবাবঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেনো সেই গামেদি বংশের জিনা কারীনী মহিলাকে পাথর মেরে মৃত দণ্ড দিয়েছিলেন যদিও তিনি তওবা করেছিলেন?

 প্রশ্ন: আমরা জানি, আদম আ. যে ভুল করেছিলেন তার জন্য তওবা করেছেন। আর আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, কেউ অন্যায় করার পর খাস দিলে তওবা করলে আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করবেন।

তাহলে আমার প্রশ্ন হল, হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এক মহিলা এসে ব্যভিচারের শাস্তি গ্রহণ করতে চাইলে যখন তার শিশুটি মায়ের দুধ ছাড়া অন্য খাবার খাওয়ার উপযুক্ত হল তখন ওই মহিলাটিকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা হল ব্যভিচারের শাস্তি স্বরূপ।
ওই নারী তো অনুতপ্ত ছিলেন। আর তার কৃত কর্মের জন্য অবশ্যই তিনি তওবাও করেছিলেন। তারপরও কেনও তাকে এই শাস্তি দেয়া হল?

উত্তর:
বিষয়টি সংক্ষেপে বলছি, আশা করি বুঝতে পারবেন।
বান্দা যখন আল্লাহর এবাদতে ত্রুটি-বিচ্যুতি করে, আল্লাহর হক নষ্ট করে করে তখন সে আল্লাহর নিকট তওবা করলে তিনি ইচ্ছে করলে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। কেননা এটি তার হকের সাথে সংশ্লিষ্ট। যেমন কেউ যদি সালাত পরিত্যাগ করে, রোজা ছেড়ে দেয়, আল্লাহর সাথে শরিক করে.. ইত্যাদি নানা ধরণের গুনাহ করার পর আল্লাহর নিকট লজ্জিত ও অনুতপ্ত হৃদয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি চাইলে তাকে ক্ষমা করে দেন।

কিন্তু যে বিষয়গুলো বান্দার হক এর সাথে সংশ্লিষ্ট বা দেশের মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করে বা যে সকল অপরাধের কারণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেসব বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে দুনিয়াতেই শাস্তি মূলক ব্যবস্থার ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে মানুষ মানুষের ক্ষতি সাধন কিংবা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির করার দুঃসাহস দেখাবে না। ফলে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষের জীবন হবে নিরাপদ ও শান্তিময়।

এ জন্যে এ সব ক্ষেত্রে দুনিয়াবী আইনে অরাধীকে শাস্তির মুখোমুখি করা হয়। আর তা বাস্তবায়ন করা মহান আল্লাহরই নির্দেশ।
যেমন কেউ যদি কাউকে হত্যা করে তাহলে সে যদি আল্লাহর নিকট তওবা করে তবুও দুনিয়াবি শাস্তি থেকে সে রেহাই পাবে না যতক্ষণ না নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীগণ তাকে ক্ষমা করে।
ঠিক তদ্রূপ কেউ যদি সমাজে জিনা-ব্যভিচারের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তাহলে সে ক্ষেত্রে কেবল আল্লাহর নিকট তওবা যথেষ্ট নয় বরং তাকে দুনিয়াবী ফৌজদারি আইনের মুখোমুখি হতে হবে-যেন অন্য মানুষ এ ধরণের অপকর্ম করার দুঃসাহস দেখাতে না পারে।

এ সকল অপরাধে অপরাধী খাঁটি অন্তরে তওবা করলে আখিরাতের শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে পারে আল্লাহ যদি তার তওবা কবুল করেন। কিন্তু তওবা দ্বারা দুনিয়ার এ সকল শাস্তি মাফ হবে না।
কেননা আল্লাহ তাআলা নিজেই কোরআনে এই সকল অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এর ব্যতিক্রম করার কারও কোনও সুযোগ নেই।
আশা করি বুঝতে পেরেছেন। আল্লাহু আলাম।

হাদিস থেকে গামেদি মহিলার ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পড়তে এই লিংকে ক্লিক করুন:
▬▬▬🌐🔰🌐▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দল্লাহিল হাদী আব্দুল জলীল মাদানী
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব

Translate