Tuesday, August 4, 2026

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল ও রুটিওয়ালার গল্পটি বানোয়াট

 আমরা প্রায়ই বক্তাদের মুখে একটি সুন্দর কাহিনি শুনি এবং তা সোশ্যাল মিডিয়া ও ইন্টারনেট জগতে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে আছে। তা হলো, জগৎ বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এবং এক রুটিওয়ালার গল্প। এটি মূলত ইস্তেগফার বা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার ফজিলতে বর্ণনা করা হয়।

🔹ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নরূপ:
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) ইলম অন্বেষণের উদ্দেশ্যে সফরে থাকাকালীন কোন এক দূরের শহরে একটি মসজিদে রাত কাটানোর মনস্থ করলেন। কিন্তু দারোয়ান তাঁকে চিনতে না পেরে মসজিদ থেকে বের করে দেন। পরে এক রুটিওয়ালা তাঁকে আশ্রয় দেন। সম্মানিত ইমাম গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন যে, উক্ত রুটিওয়ালা কাজের ফাঁকে ফাঁকে সারারাত ইস্তিগফার করছেন। সকালে ইমাম আহমদ এর কারণ জানতে চাইলে রুটিওয়ালা বলেন, এই ইস্তিগফারের বদৌলতে তাঁর জীবনের সব দোয়া কবুল হয়েছে—শুধু একটি বাদে। আর তা হল, এই যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস এবং ফকিহ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলকে এক নজর দেখার দোয়া। তখন ইমাম নিজের পরিচয় দেন। এতে ইস্তিগফারের ফলাফল হিসেবে তার সারা জীবনের লালিত স্বপ্নটি বাস্তবায়িত হওয়ায় তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন। কাহিনিটি প্রায়ই ইবনুল জাওযি (রহ.)-এর নামে বলা হয় এবং একজন প্রসিদ্ধ ওয়ায়েজের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পেয়েছে। (তিনি হলেন, সৌদি আরবের বিখ্যাত বক্তা মুহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান আল আরিফি।যিনি বর্তমানে সৌদি জেলে বন্দি রয়েছেন) কিন্তু বাস্তবে যাচাই করলে দেখা যায়, এই কাহিনি ইবনুল জাওযি (রহ.)-এর কোনো গ্রন্থে পাওয়া যায় না।
▪️আরেকটি গল্প:
রুটিওয়ালার গল্পের কাছাকাছি একটি বর্ণনা ইবনুন নাজ্জার (রহ.) তাঁর ‘যাইলু তারিখি বাগদাদ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তবে সেখানে রুটিওয়ালা নয়; ইমাম আহমদ (রহ.) ও ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ (রহ.)-এর মধ্যকার একটি ঘটনার কথা বলা হয়েছে।
🔹গল্পটির সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নরূপ:
আব্বাসিয় খলিফা আল মামুনের শাসনামলে ‘মিহনাহ’ (কুরআন সৃষ্টি বিতর্ক)-এর সেই কঠিন ও সংকটময় সময়ে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) যখন সফরে বের হন তখন তিনি ভাবলেন, তাঁর এই কঠিন বিপদের খবর পেয়ে খুরাসানের বিখ্যাত মুহাদ্দিস বন্ধুবর ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রহ.) হয়তো সুদূর সফর অতিক্রম করে তাঁর সাথে দেখা করতে চলে আসবেন। পরম শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় বন্ধুকে এত বড় সফরের কষ্ট থেকে বাঁচাতে ইমাম আহমদ (রহ.) নিজেই তাঁর সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। ইমাম ইসহাক বিন রাহওয়াইহ (রহ.)-ও বন্ধু ইমাম আহমদের বিপদের কথা শুনে তাঁকে সাহায্য করা বা তাঁর সাথে দেখা করার জন্য খুরাসান থেকে বাগদাদের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন! কিন্তু সফরকালে ‘রেই’ শহরে পৌঁছে ইমাম আহমদ এক মসজিদে প্রবেশ করেন। এমন সময় তীব্র মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। ইশার সালাতের পরে মসজিদের পাহারাদার বা দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা তাঁকে মসজিদ থেকে বের হয়ে যেতে বলে। কারণ তারা মসজিদ বন্ধ করে দেবে। ইমাম আহমদ রহ. বলেন, “এটি আল্লাহর ঘর এবং আমি আল্লাহর বান্দা।” কিন্তু তারা কড়া ভাষায় সাফ জানিয়ে দেয় যে, তাঁকে বের হতেই হবে। অন্যথায় পা ধরে টেনে বের করা হবে। পরিস্থিতি বুঝে ইমাম শান্তভাবে সালাম জানিয়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে আসেন। বাইরে তখন প্রচণ্ড বৃষ্টি, বজ্রপাত ও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। ঘোর অন্ধকারে তিনি বুঝতে পারছিলেন না কোথায় যাবেন। এমন সময় এক ব্যক্তি একটি বাড়ি থেকে বের হয়ে তাঁকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ভাই, এই অসময়ে আপনি কোথায় যাচ্ছেন?” ইমাম বললেন, “আমি জানি না কোথায় যাচ্ছি।”
লোকটি তাঁকে নিজ ঘরে ডেকে নেন। তাঁর ভেজা কাপড় বদলে শুকনা পোশাক পরতে দেন এবং নামাজের জন্য পবিত্র হওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। এরপর একটি ঘরে বসিয়ে, যেখানে আগুনের উষ্ণতা ও খাবারের সুন্দর আয়োজন ছিল, তাঁকে আপ্যায়ন করেন।
আহারের পর লোকটি জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার বাড়ি কোথায়?” ইমাম উত্তর দিলেন, “বাগদাদে।” লোকটি পুনরায় প্রশ্ন করলেন, “আপনি কি আহমদ ইবনে হাম্বল নামের কাউকে চেনেন?” ইমাম আহমাদ রহ. জবাব দিলেন, “আমিই আহমদ ইবনে হাম্বল।”
তখন লোকটি আনন্দে ও বিস্ময়ে বলে উঠলেন, “আর আমিই ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ!” ইমাম যাহাবী (রহ.) তাঁর ‘সিয়ারু আ’লামিন নুবালা’ গ্রন্থে এই বর্ণনাটি উদ্ধৃত করে ইবনুল জাওযির দিকে সম্পর্কিত করেছেন। কিন্তু পরক্ষণেই একে মাউদু (জাল বা বানোয়াট) বলে মন্তব্য করেছেন। [সূত্র: ajurry com]
সুতরাং ‘ইমাম আহমদ বিন হাম্বল ও রুটিওয়ালার কাহিনি’ নামে যা ছড়িয়ে আছে তা ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। আর এর কাছাকাছি ‘ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এবং ইমাম ইসহাক বিন রাহাওয়াইহ : এর নামে যে বর্ণনাটি বাস্তবে পাওয়া যায় তাও সহিহ সনদে প্রমাণিত নয় বরং জাল বা বানোয়াট বলে প্রমাণিত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
​يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
​”হে ইমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।” [সুরা তাওবা:১১৯]
​রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
​كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
​”শোনা প্রতিটি কথা বলে বেড়ানোই একজন মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।” [সহিহ মুসলিম, মুকাদ্দিমা]
তাই কোনো কাহিনি বা কোন কিছুর ফজিলত ছড়ানোর আগে তার সত্যতা যাচাই করা আমাদের অপরিহার্য দায়িত্ব। শুধু শোনা কথায় বিশ্বাস করে তা ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। আল্লাহ তৌফিক দান করুন ।আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

সদকা নাকি উমরা কোনটা বেশি উত্তম

 প্রশ্ন: যদি একই সাথে দুটি কাজ করা সম্ভব না হয় তবে উমরা করা উত্তম নাকি গরিব-অসহায়দের মাঝে দান-সদকা করা বেশি ভালো?

উত্তর: সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর পরিবারবর্গ ও সহচরদের ওপর। অতঃপর-
▪️ সদকা যদি ফরজ হয় (যেমন: জাকাত, মানত, মানত ভঙ্গের কাফফারা, কসম ভঙ্গের কাফফারা ইত্যাদি) তবে তা আদায় করা নফল উমরার চেয়ে নিঃসন্দেহে অনেক বেশি উত্তম। তবে সাধারণ নিয়মে নফল সদকার চেয়ে নফল হজ ও উমরা করা উত্তম। কারণ উমরার মাধ্যমে অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি শারীরিক ইবাদত—যেমন: তাওয়াফ, সাঈ, জিকির, সালাত ও তালবিয়ার মতো একাধিক ইবাদত একসাথে পালনের সুযোগ হয়।
▪️তবে যদি আপনার আশেপাশে এমন সমস্যাগ্রস্থ মানুষ থাকে যাদের‌ নিকট বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদ বা অবলম্বন নেই কিংবা আপনার নিজের নিকটাত্মীয়রা অভাব-অনটনে ভুগছে অথচ তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করার পাশাপাশি উমরা আদায় করবেন -এমন সমন্বয় করাও আপনার দ্বারা সম্ভব না হয়—তবে এই অবস্থায় অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই বেশি উত্তম।
– হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কানজুদ দাকায়িক’-এ রয়েছে:
«حَجُّ النَّفْلِ أَفْضَلُ مِنَ الصَّدَقَةِ»
“সাধারণ দানের চেয়ে নফল হজ করা বেশি উত্তম।”[কানযুদ দাকায়িক]
– ইমাম মালেক (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, নফল হজ নাকি সদকা—কোনটি আপনার কাছে বেশি প্রিয়? তিনি জবাবে বলেন:
«الْحَجُّ، إِلَّا أَنْ تَكُونَ سَنَةُ مَجَاعَةٍ»
“হজ করাই উত্তম। তবে দেশ যদি দুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে যায় তবে দান করা উত্তম।”[মওয়াহিবুল জলীল]
– শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তার ‘আল ইখতিয়ারাত’ গ্রন্থে বলেছেন:
«وَأَمَّا إِذَا كَانَ لَهُ أَقَارِبُ مَحَاوِيجُ، فَالصَّدَقَةُ عَلَيْهِمْ أَفْضَلُ، وَكَذَا إِذَا كَانَ هُنَاكَ قَوْمٌ مُضْطَرُّونَ إِلَى نَفَقَتِهِ، فَأَمَّا إِذَا كَانَ كِلَاهُمَا تَطَوُّعًا، فَالْحَجُّ أَفْضَلُ، لِأَنَّهُ عِبَادَةٌ بَدَنِيَّةٌ مَالِيَّةٌ، وَكَذَا الْأُضْحِيَةُ وَالْعَقِيقَةُ أَفْضَلُ مِنَ الصَّدَقَةِ بِقِيمَةِ ذَلِكَ»
“কিন্তু কারও যদি অভাবগ্রস্ত আত্মীয়স্বজন থাকে তবে তাদের সাহায্য করাই বেশি উত্তম। একইভাবে যদি এমন লোকজন থাকে যে তারা তার আর্থিক সাহায্যের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল তাহলেও তাদের দান করা উত্তম। আর যদি দুটিই সাধারণ নফল কাজ হয় (অর্থাৎ কেউ চরম বিপদে নেই) তবে হজ করাই উত্তম। কারণ এটি একই সাথে শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত। ঠিক যেমন কুরবানি ও আকিকা করা অধিক উত্তম সেগুলোর মূল্য দান করে দেওয়ার চেয়ে।”[আল ইখতিয়ারাত]
– ইমাম শাওকানি (রহ.) ‘নাইলুল আওতার’ গ্রন্থে
«أَيُّ الأَعْمَالِ أَفْضَلُ؟ فَذَكَرَ الإِيمَانَ، ثُمَّ الْجِهَادَ، ثُمَّ الْحَجَّ»
“কোন আমলটি সবচেয়ে উত্তম? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইমানের কথা উল্লেখ করলেন, তারপর জিহাদ, এরপর হজের কথা।” [সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম] এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন:
«هُوَ حُجَّةٌ لِمَنْ فَضَّلَ حَجَّ النَّفْلِ عَلَى الصَّدَقَةِ»
“এটি সেই আলেমদের পক্ষে দলিল, যারা সাধারণ দানের চেয়ে নফল হজকে অগ্রাধিকার দেন।” [নাইলুল আওতার]
বর্তমান যুগে মুসলিম উম্মাহর বাস্তব পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, তীব্র সংকট ও অভাবের মুখে থাকা মানুষের সংখ্যা অগুনতি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বহু মুসলমান আজ খাদ্য, পানি ও বাসস্থানের মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে বারবার নফল উমরা বা হজ না করে সেই অর্থ বিপন্ন মানুষের সেবায় ব্যয় করা নিঃসন্দেহে বেশি সওয়াব ও অগ্রগণ্য।
والله أعلم
(আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন)
🔶 ইসলাম ওয়েব-এর আরেকটি ফতওয়ায় বলা হয়েছে, “ইসলামে বারবার হজ ও উমরা করার এবং একটির পর আরেকটি আদায় করার বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। হাদিসে এসেছে, এটি মানুষের দারিদ্র্য দূর করে এবং গুনাহ মিটিয়ে দেয়। তিরমিজি, নাসায়ি ও ইবনে মাজাহ-তে বর্ণিত হাদিসে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«تَابِعُوا بَيْنَ الحَجِّ وَالعُمْرَةِ، فَإِنَّهُمَا يَنْفِيَانِ الفَقْرَ وَالذُّنُوبَ كَمَا يَنْفِي الكِيرُ خَبَثَ الحَدِيدِ وَالذَّهَبِ وَالفِضَّةِ، وَلَيْسَ لِلحَجَّةِ المَبْرُورَةِ ثَوَابٌ إِلاَّ الجَنَّةُ»
“তোমরা বারবার হজ ও উমরা পরপর আদায় করো। কারণ এ দুটো দারিদ্র্য ও গুনাহকে এমনভাবে দূর করে দেয়, যেভাবে কামারের হাপর লোহা, সোনা ও রুপার ময়লা দূর করে পরিষ্কার করে দেয়। আর কবুল হজের প্রতিদান তো জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।” [সহিহুল জামে]
এ ছাড়া আরও অনেক দলিল রয়েছে, যা হজের মর্যাদা, গুনাহ মাফের শক্তি এবং মর্যাদা বৃদ্ধির কথা প্রমাণ করে। সাধারণ নফল দান-সদকার চেয়ে হজ ও ওমরা আদায় করা বেশি উত্তম। তবে নিকটাত্মীয়দের মধ্যে যদি কেউ আর্থিক সংকটে থাকে তাহলে ভিন্ন কথা।” (অর্থাৎ সেক্ষেত্রে বারবার নফল হজ বা উমরা আদায় করার থেকে আর্থিক সংকটে নিপতিত ও বিপদগ্রস্ত এই মানুষগুলোর জন্য সাহায্য-সহযোগিতা করা অধিক উত্তম এবং এতে বেশি সওয়াব রয়েছে।)
💢 সারাংশ: সাধারণ ও স্বাভাবিক অবস্থায় নফল উমরা বা হজ করাই বেশি উত্তম। তবে যদি নিকটাত্মীয় বা আশেপাশের মানুষ চরম অভাব-অনটন বা সংকটে থাকে তখন উমরার চেয়ে তাদের মাঝে দান-সদকা করাই অধিক উত্তম। মহান আল্লাহ আমাদেরকে যথাসাধ্য গরিব-অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি অধিক পরিমাণে নফল ওমরা ও হজ আদায়ের তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

ইমাম রুকুতে চলে গেছেন অথচ আপনার সূরা ফাতিহা শেষ হয়নি তখন কী করবেন

 অনেক সময় কিছু ইমাম (আল্লাহ তাদেরকে হেদায়েত করুন) সিররি বা নিচুস্বরে কিরাত পড়ার সালাতে এত দ্রুত সূরা ফাতিহা পাঠ করে রুকুতে চলে যান যে, পেছনে যে সব মুক্তাদি সূরা ফাতিহা পাঠ করে তারা তা শেষ করতে পারে না। এমতবস্থায় সে মুক্তাদি কী করবে?

— সে কি একা একা সূরা ফাতিহা পাঠ করে তারপর রুকুতে যাবে ইমাম রুকু থেকে উঠে গেলেও? অতঃপর পরে সে রাকাতটা ইমামের সালাম ফেরানোর পর একাকী উঠে কাজা পড়ে নিবে? (যেহেতু অধিক বিশুদ্ধ মতে ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা পড়া সালাতের রোকন। তা ছাড়া সালাত শুদ্ধ হবে না।)
— নাকি যতটুকু পড়া হয়েছে ততটুকু পড়েই ইমামের সাথে রুকুতে শরিক হবে?
— আর এমনটি করলে কি তার ঐ রাকাতটি শুদ্ধ বলে গণ্য হবে নাকি হবে না?
এসব বিষয়ে অনেক মুসল্লি দ্বিধান্বিত থাকে। তাই এই বহুল জিজ্ঞাসিত সমস্যার সঠিক সমাধান উপস্থাপন করা হলো, যুগের তিন শ্রেষ্ঠ আলেম তথা শাইখ উসাইমিন (রাহ.), শাইখ বিন বায (রাহ.) এবং শাইখ আলবানি (রাহ.)-এর দলিল ভিত্তিক ফতওয়ার আলোকে:
তার আগে আমাদের জানা কর্তব্য যে, সূরা ফাতিহা পাঠ করা ইমাম, মুক্তাদি ও একাকী সালাত আদায়কারী—প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই প্রতি রাকাতেই একটি রোকন (অপরিহার্য অংশ)। ফকিহগণের নিকট এটিই সর্বাধিক অগ্রগণ্য মত। এর সপক্ষে প্রমাণ হলো, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিম্নোক্ত হাদিসটি:
“مَنْ صَلَّى صَلَاةً لَمْ يَقْرَأْ فِيهَا بِأُمِّ الْقُرْآنِ فَهِيَ خِدَاجٌ -ثَلَاثًا- غَيْرُ تَمَامٍ”
“যে ব্যক্তি এমন সালাত আদায় করল যাতে সে উম্মুল কুরআন (সূরা ফাতিহা) পাঠ করল না তার সেই সালাত ত্রুটিপূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ—অসম্পূর্ণ।” [সহিহ মুসলিম: ৩৯৫, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত]
এ ছাড়াও এ মর্মে আরও বহু হাদিস রয়েছে। তবে এই বিধান থেকে কেবল একটি ক্ষেত্র ব্যতিক্রম আর তা হলো ‘মাসবুক’ (দেরিতে জামাতে আসা মুক্তাদি), যদি সে ইমামকে রুকু অবস্থায় পায়।
❒ শাইখ ইবনে উসাইমিন (রাহ.) বলেন:
«هَذَا الَّذِي ذَكَرْنَاهُ ـ وَهُوَ أَنَّ قِرَاءَةَ الْفَاتِحَةِ رُكْنٌ فِي حَقِّ كُلِّ مُصَلٍّ: الْإِمَامِ، وَالْمَأْمُومِ، وَالْمُنْفَرِدِ. وَلَا يُسْتَثْنَى مِنْهَا إِلَّا مَسْأَلَةٌ وَاحِدَةٌ، وَهِيَ الْمَسْبُوقُ إِذَا أَدْرَكَ إِمَامَهُ رَاكِعاً، أَوْ قَائِماً وَلَمْ يَتَمَكَّنْ مِنْ قِرَاءَةِ الْفَاتِحَةِ ـ هَذَا هُوَ الَّذِي دَلَّتْ عَلَيْهِ الْأَدِلَّةُ الشَّرْعِيَّةُ.
فَإِذَا قَالَ قَائِلٌ: مَا الدَّلِيلُ عَلَى اسْتِثْنَاءِ هَذِهِ الصُّورَةِ؟
فَالْجَوَابُ: الدَّلِيلُ عَلَى ذَلِكَ حَدِيثُ أَبِي بَكْرَةَ الثَّابِتُ فِي صَحِيحِ الْبُخَارِيِّ حَيْثُ أَدْرَكَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ رَاكِعٌ، فَأَسْرَعَ وَرَكَعَ قَبْلَ أَنْ يَصِلَ إِلَى الصَّفِّ، ثُمَّ دَخَلَ فِي الصَّفِّ، فَلَمَّا انْصَرَفَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الصَّلَاةِ سَأَلَ مَنِ الْفَاعِلُ؟ فَقَالَ أَبُو بَكْرَةَ: أَنَا، فَقَالَ: زَادَكَ اللَّهُ حِرْصاً وَلَا تَعُدْ، وَلَمْ يَأْمُرْهُ بِقَضَاءِ الرَّكْعَةِ الَّتِي أَدْرَكَ رُكُوعَهَا، دُونَ قِرَاءَتِهَا، وَلَوْ كَانَ لَمْ يُدْرِكْهَا لَكَانَتْ قَدْ فَاتَتْهُ، وَلَأَمَرَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِقَضَائِهَا، كَمَا أَمَرَ الْمُسِيءَ فِي صَلَاتِهِ أَنْ يُعِيدَهَا، فَلَمَّا لَمْ يَأْمُرْهُ بِقَضَائِهَا عُلِمَ أَنَّهُ قَدْ أَدْرَكَ الرَّكْعَةَ، وَسَقَطَتْ عَنْهُ قِرَاءَةُ الْفَاتِحَةِ، فَهَذَا دَلِيلٌ مِنَ النَّصِّ.
وَالْمَعْنَى يَقْتَضِي ذَلِكَ: لِأَنَّ هَذَا الْمَأْمُومَ لَمْ يُدْرِكِ الْقِيَامَ الَّذِي هُوَ مَحَلُّ الْقِرَاءَةِ، فَإِذَا سَقَطَ الْقِيَامُ سَقَطَ الذِّكْرُ الْوَاجِبُ فِيهِ وَهُوَ الْقِرَاءَةُ» انْتَهَى مِنْ “الشَّرْحِ الْمُمْتِعِ” (٣/ ٢٩٨).
“আমরা যা উল্লেখ করেছি—অর্থাৎ সূরা ফাতিহা পাঠ করা ইমাম, মুক্তাদি ও একাকী সালাত আদায়কারী প্রতিটি মুসল্লির জন্যই একটি রোকন। এ নিয়ম থেকে কেবল একটি মাসআলাই ব্যতিক্রম। তা হলো, মাসবুক ব্যক্তি যদি ইমামকে রুকু অবস্থায় পায় কিংবা এমন অবস্থায় পায় যে ফাতিহা পড়ার সুযোগ পায়নি। (অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে সূরা ফাতিহা না পড়লেও সালাত শুদ্ধ হবে) শরয়ি দলিলগুলো মূলত এই বিধানটিই নির্দেশ করে।
কেউ যদি প্রশ্ন করেন: এই ব্যতিক্রমী বিধানের দলিল কী?
এর উত্তর হলো: এর দলিল হলো সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আবু বাকরা (রা.)-এর প্রসিদ্ধ হাদিস। তিনি এসে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে রুকু অবস্থায় পেয়েছিলেন। তাই তিনি তাড়াহুড়ো করে নামাজের কাতারে পৌঁছার আগেই রুকু করে ফেলেন এবং পরে কাতারে গিয়ে শামিল হন।
সালাত শেষে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে এমন করেছ?’
আবু বাকরা (রা.) বললেন, ‘আমি।’
তখন তিনি বললেন:
«زَادَكَ اللَّهُ حِرْصًا، وَلَا تَعُدْ»
“আল্লাহ তোমার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিন। তবে আর এমন করো না।”
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে সেই রাকাতটি পুনরায় আদায় করার নির্দেশ দেননি। অথচ তিনি কেবল রুকু পেয়েছিলেন; ফাতিহা পড়ার সুযোগ পাননি। যদি তিনি সেই রাকাত না পেতেন তবে তা তাঁর ছুটে যেত এবং নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে তা কাজা করার নির্দেশ দিতেন—যেমন সালাতে ভুল কারী ব্যক্তিকে (মুসিউস সালাত) তিনি সালাত পুনরায় পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যেহেতু তিনি তাঁকে কাজা করার নির্দেশ দেননি তাই প্রমাণিত হলো যে, তিনি রাকাতটি পেয়ে গেছেন এবং তাঁর ওপর থেকে সূরা ফাতিহা মাফ হয়ে গেছে। এটি একটি স্পষ্ট নস বা শরয়ি দলিল।
আর অর্থের দিক থেকেও বিষয়টি যৌক্তিক। কারণ এই মুক্তাদি কিয়াম বা দাঁড়ানোর অবস্থাটাই পায়নি, যা মূলত কিরাত বা পাঠ করার মূল স্থান। সুতরাং যখন কিয়ামই রহিত হয়ে গেল তখন তার সাথে সম্পৃক্ত ওয়াজিব জিকির তথা কিরাতও রহিত হয়ে গেল।” — সমাপ্ত, “আশ শারহুল মুমতি” (৩/২৯৮) থেকে সংগৃহীত [Islamqa info]
শাইখকে আরও প্রশ্ন করা হয়—
এক ব্যক্তি জামাতে এমন সময় শরিক হলো, যখন ইমাম তাকবিরে তাহরিমা শেষ করে সূরা ফাতিহা পাঠ সম্পন্ন করেছেন। এরপর সে নিজে ফাতিহা পড়া শুরু করল। কিন্তু মাঝপথে ইমাম রুকুতে চলে গেলেন—তাহলে এই মুক্তাদি কি ইমামের সাথে রুকুতে চলে যাবে, নাকি নিজের মতো করে ফাতিহা পাঠ শেষ করবে?
উত্তরে তিনি বলেন, কোনও মুক্তাদি যখন জামাতে এমন সময় প্রবেশ করল যখন ইমাম রুকুতে যাওয়ার উপক্রম করেছেন, আর ওই মুক্তাদি তখনও পূর্ণ ফাতিহা পড়ার সুযোগ পায়নি—তখন দেখতে হবে যে তার কতটুকু বাকি আছে। যদি মাত্র এক বা দুই আয়াত বাকি থাকে, যা দ্রুত পড়ে নিয়ে ইমামকে রুকুতে ধরে ফেলা সম্ভব তবে সে তা-ই করবে (অর্থাৎ ফাতিহা শেষ করে রুকুতে যাবে)।
আর যদি এর চেয়ে বেশি অংশ বাকি থাকে, যা পড়তে গেলে ইমামকে রুকুতে পাওয়া যাবে না তবে সে ফাতিহা অসমাপ্ত রেখেই ইমামের সাথে রুকুতে শরিক হয়ে যাবে। [al-eman]
❒ আল্লামা শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায (রাহ.):
ইমাম রুকুতে চলে গেছেন অথচ মুসল্লি সূরা ফাতিহা শেষ করতে পারেননি—এখন মুক্তাদির কী করণীয়?
প্রশ্ন: আমাদের এক ভাই জানতে চেয়েছেন: ইমাম রুকুতে চলে গেলেন অথচ আমি তখনও সূরা ফাতিহা সম্পূর্ণ করতে পারিনি। এই অবস্থায় আমি কি ইমামের সাথে রুকুতে চলে যাব, নাকি ফাতিহা শেষ করব? আর মুক্তাদির ওপর থেকে কখন সূরা ফাতিহা মাফ হয়ে যায়?
উত্তর:
إِذَا كَانَ لَمْ يَبْقَ إِلَّا شَيْءٌ يَسِيرٌ، كَالْآيَةِ وَالْآيَتَيْنِ يُكْمِلُ، وَإِذَا كُنْتَ تَخْشَى أَنْ يَرْفَعَ؛ فَارْكَعْ، وَيَسْقُطْ عَنْكَ مَا بَقِيَ، كَمَا لَوْ جِئْتَ وَالْإِمَامُ قَدْ رَكَعَ؛ تَرْكَعُ وَتَسْقُطُ عَنْكَ الْفَاتِحَةُ، لَوْ جَاءَ الْمَأْمُومُ وَالْإِمَامُ رَاكِعٌ؛ رَكَعَ مَعَهُ، وَأَجْزَأَهُ، أَجْزَأَتْهُ الرَّكْعَةُ كَمَا فِي صَحِيحِ الْبُخَارِيِّ مِنْ حَدِيثِ أَبِي بَكْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّهُ جَاءَ وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَاكِعٌ؛ فَرَكَعَ دُونَ الصَّفِّ، ثُمَّ دَخَلَ فِي الصَّفِّ، فَلَمَّا سَلَّمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَهُ: «زَادَكَ اللَّهُ حِرْصًا، وَلَا تَعُدْ» وَلَمْ يَأْمُرْهُ بِقَضَاءِ الرَّكْعَةِ.
وَهَذَا قَوْلُ الْأَئِمَّةِ الْأَرْبَعَةِ جَمِيعًا، أَنَّ مَنْ أَدْرَكَ الْإِمَامَ رَاكِعًا أَجْزَأَتْهُ الرَّكْعَةُ، وَسَقَطَتْ عَنْهُ الْفَاتِحَةُ، فَهَكَذَا إِذَا قَرَأَ أَوَّلَهَا، ثُمَّ خَافَ مِنْ فَوَاتِ الرَّكْعَةِ؛ يَرْكَعُ، وَلَا يَضُرُّهُ ذَلِكَ، وَهَكَذَا لَوْ نَسِيَهَا الْمَأْمُومُ، أَوْ كَانَ جَاهِلًا؛ سَقَطَتْ عَنْهُ، وَأَجْزَأَتْهُ صَلَاتُهُ مَعَ الْإِمَامِ.
بِخِلَافِ الْمُفْرِدِ وَالْإِمَامِ فَإِنَّهَا لَا تُجْزِئُهُ، لَوْ سَهَا عَنْهَا، أَوْ جَهِلَهَا؛ لَابُدَّ مِنْ قِرَاءَتِهَا؛ لِأَنَّهَا رُكْنُ صَلَاتِهِ، أَمَّا الْمَأْمُومُ فَهِيَ فِي حَقِّهِ وَاجِبَةٌ مَعَ الذِّكْرِ، وَمَعَ الْعِلْمِ، بِدَلِيلِ أَنَّهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يَأْمُرْ أَبَا بَكْرَةَ الثَّقَفِيَّ بِالْإِعَادَةِ لَمَّا جَاءَ وَالْإِمَامُ رَاكِعٌ، نَعَمْ
“সূরা ফাতিহা থেকে যদি মাত্র এক বা দুই আয়াত বাকি থাকে তবে তা পড়ে নেওয়া ভালো। তবে যদি আশঙ্কা হয় যে, ইমাম রুকু থেকে মাথা তুলে ফেলবেন তবে দেরি না করে সাথে সাথে রুকুতে চলে যাবে; বাকি অংশটুকু মাফ হয়ে যাবে। যেমন—কোনও মুসল্লি মসজিদে এসে পেলেন যে ইমাম রুকুতে চলে গেছেন। তখন তিনি ইমামের সাথেই রুকুতে শরিক হয়ে যাবেন এবং তাঁর ওপর থেকে ফাতিহা মাফ হয়ে যাবে। এর পক্ষে দলিল রয়েছে সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আবু বাকরা (রা.)-এর ঘটনা। তিনি এসে দেখলেন যে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন রুকুতে আছেন তখন তিনি কাতারে পৌঁছানোর আগেই পেছনের দিকে রুকু করে ফেলেন। এরপর কাতারে গিয়ে যোগ দেন। সালাত শেষে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বললেন,
«زَادَكَ اللَّهُ حِرْصًا، وَلَا تَعُدْ»
“আল্লাহ তোমার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিন, তবে আর এমন করো না।” [সহিহ বুখারি] নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে সেই রাকাত পুনরায় পড়ার নির্দেশ দেননি। চার মাজহাবের ইমামগণের সর্বসম্মত অভিমত হলো:
—যে ব্যক্তি ইমামকে রুকু অবস্থায় পেল তার ওই রাকাত আদায় হয়ে গেল এবং তার থেকে সূরা ফাতিহা মাফ হয়ে গেল।
– ঠিক তেমনিভাবে, কেউ যদি ফাতিহার কিঞ্চিৎ অংশ পড়ার পর রাকাত ছুটে যাওয়ার ভয়ে রুকুতে চলে যায় তাতে তার কোনও সমস্যা নেই।
– একইভাবে কোনও মুক্তাদি যদি ভুলবশত ফাতিহা না পড়ে অথবা এ বিধান না জানার কারণে না পড়ে তবে তার থেকেও তা মাফ হয়ে যাবে এবং ইমামের সাথে তার সালাত শুদ্ধ হয়ে যাবে।
➧ তবে একা সালাত আদায়কারী (মুনফারিদ) এবং ইমামের হুকুম ভিন্ন। তারা যদি ভুলে যান কিংবা না জেনে ছেড়ে দেন তবুও তাঁদের জন্য ফাতিহা পড়া জরুরি। কারণ এটি তাঁদের সালাতের রোকন (অপরিহার্য অংশ)। পক্ষান্তরে মুক্তাদির ক্ষেত্রে তা স্মরণ থাকা ও জানার শর্তে ওয়াজিব। এর বড় প্রমাণ তো সেটাই, যেখানে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবু বাকরা সাকাফি (রা.)-কে রাকাত পুনরায় পড়ার হুকুম দেননি। অথচ তিনি ইমামকে রুকু অবস্থায় পেয়েছিলেন।”
ফতওয়া প্রদানে: আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায (রাহ.)।
সাবেক প্রধান মুফতি এবং সভাপতি, সিনিয়র স্কলার পরিষদ, সৌদি আরব।
❒ আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন আলবানি (রাহ.):
আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন আলবানি রাহ.-এর ফতওয়ার সারাংশ নিম্নরূপ:
কোনও মুক্তাদির যদি প্রবল ধারণা হয় যে, একটু দ্রুত পড়লে সে সূরা ফাতিহা সম্পূর্ণ করতে পারবে এবং ইমাম রুকু থেকে ওঠার আগেই তাকে রুকুতে গিয়ে ধরে ফেলতে পারবে তবে সে ফাতিহা শেষ করেই রুকুতে যাবে।
আর যদি তার প্রবল ধারণা হয় যে, ফাতিহা সম্পূর্ণ করতে গেলে ইমামের রুকু ছুটে যাবে তবে সে আর অপেক্ষা করবে না; যতটুকু পড়তে পেরেছে ততটুকুই থামিয়ে দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ইমামের সাথে রুকুতে শরিক হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে ফাতিহা অসম্পূর্ণ থাকলেও তার সালাতে কোনও সমস্যা হবে না। শাইখ আলবানি (রাহ.) এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন যে, সালাতে রুকু পাওয়া নিয়ে সকল মুসলিম আলেম একমত যে এটি সালাতের একটি অপরিহার্য রোকন; রুকু না করলে রাকাতই আদায় হবে না। এর বিপরীতে, মুক্তাদির ওপর সূরা ফাতিহা পাঠ করা ওয়াজিব কি না—এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে বেশ মতভেদ রয়েছে। যেমন—হানাফি মাজহাবের মতে, মুক্তাদি ইমামের পেছনে চুপ থাকবে এবং কোনও কিছুই (না ফাতিহা, না অন্য কিছু) পড়বে না। যদিও শাইখ আলবানি হানাফিদের এই মতটিকে দুর্বল (মারজুহ) মনে করেন এবং “যে ব্যক্তি ফাতিহা পড়েনি তার সালাত হয়নি”—এই হাদিসটিকেই সঠিক মনে করেন তবুও তিনি মনে করেন এই হাদিসটি একেবারে ব্যতিক্রমহীন নয়। কারণ একাধিক সাহাবি থেকে প্রমাণিত আছে যে, দেরিতে জামাতে আসা মুক্তাদি (মাসবুক) যদি ইমামকে রুকু অবস্থায় পায় তবে সে ফাতিহা পড়তে না পারলেও ওই রাকাত তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। এ কারণেই এই হাদিসটিকে “আম মাখসুস” العامِّ المخصوص বা এমন একটি সাধারণ হুকুম বলা হয় যার নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম রয়েছে। অর্থাৎ নবিজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদিস—”যে ব্যক্তি ফাতিহা পড়েনি, তার সালাত হয়নি”—এটি মূলত সাধারণ একটি নিয়ম। তবে মাসবুক বা দেরিতে আসা ব্যক্তি যখন ইমামকে রুকুতে পান তখন তিনি ফাতিহা পড়ার সুযোগ না পেলেও তাঁর রাকাত আদায় হয়ে যায়। সাহাবিদের আমল দ্বারা প্রমাণিত এই ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ নিয়মের ভেতর এটি একটি নির্দিষ্ট ছাড়। তাই আপনার যদি মনে হয় যে ফাতিহা শেষ করতে গেলে ইমাম রুকু থেকে মাথা তুলে ফেলবেন, তবে আর দেরি না করে সাথে সাথে রুকুতে চলে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে; অসম্পূর্ণ ফাতিহা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

লোবানের পরিচয় ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা এবং লোবান খাওয়ার ব্যাপারে কতিপয় হাদিস

 নিম্নে লোবানের পরিচয় এবং তার স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন উপকারিতা উল্লেখ করার পর এ সংক্রান্ত বর্ণিত হাদিস ও আসার সমূহের সংক্ষিপ্ত তাহকিক পেশ করা হল:

❑ লোবান বা কন্দুর পরিচয়:
লোবান হলো, এক ধরণের সুগন্ধযুক্ত প্রাকৃতিক আঠা বা রজন, যা প্রধানত ‘বোসওয়েলিয়া’ (Boswellia) প্রজাতির গাছের ছাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। এটি দেখতে কিছুটা স্বচ্ছ পাথরের টুকরো বা স্ফটিকের মতো এটি অতি প্রাচীন একটি ঔষধি উপাদান। সাধারণত লোবান পুড়িয়ে সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ঘরবাড়িতে লোবান পোড়ালে এর সুগন্ধি ধোঁয়া বাতাসের দুর্গন্ধ দূর করার পাশাপাশি পরিবেশ জীবাণুমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। এটি আগরবাতি এবং আতরেও ব্যবহৃত হয়। সাধারণত ওমান, ইয়েমেন, সোমালিয়া ও ভারতে ভালো জাতের লোবান পাওয়া যায়।
❑ লোবানের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা:
• কফ ও সর্দি-কাশি উপশম: লোবানের বাষ্প বা নির্যাস বুক ও গলার জমে থাকা কফ পরিষ্কার করতে এবং হাঁপানি বা সর্দির অস্বস্তি কমাতে বেশ কার্যকর।
• বাতের ব্যথা ও প্রদাহ কমানো: এতে শক্তিশালী প্রদাহ রোধী (anti-inflammatory) উপাদান রয়েছে, যা হাড়ের জোড়ায় বাত বা প্রদাহজনিত ব্যথা উপশমে সাহায্য করে।
• মানসিক প্রশান্তি ও চাপ হ্রাস: এর প্রাকৃতিক সুগন্ধ মস্তিষ্কের স্নায়ুকে শিথিল করে, যা মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও অনিদ্রা দূর করতে বেশ সহায়ক।
• মুখের স্বাস্থ্য রক্ষা: লোবান চিবানোর অভ্যাস মুখের ভেতরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে, দুর্গন্ধ দূর করে এবং মাড়ি মজবুত রাখে।
• ত্বকের বার্ধক্য রোধ: লোবানের তেল বা নির্যাস ত্বকের বলিরেখা ও বয়সের ছাপ দূর করে ত্বককে সতেজ ও উজ্জ্বল রাখতে ব্যবহৃত হয়।
• পরিবেশ বিশুদ্ধিকরণ: ঘরবাড়িতে লোবান পোড়ালে এর সুগন্ধি ধোঁয়া বাতাসের দুর্গন্ধ দূর করার পাশাপাশি পরিবেশ জীবাণুমুক্ত রাখতে সাহায্য করে।
➧ উল্লেখ্য যে, লোবান ও ধূপ এক নয়। লোবান হলো নির্দিষ্ট গাছের প্রাকৃতিক সুগন্ধি আঠা, যা পোড়ালে ধূপের মতো সুগন্ধি ধোঁয়া দেয়। তাই সবাই একে ধূপ বললেও, বাজারের সাধারণ সব ধূপ খাঁটি লোবান নয়।
❑ লোবান খাওয়ার ব্যাপারে বর্ণিত হাদিস কি শুদ্ধ?
প্রশ্ন: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি কখনো বলেছেন:
أَكْلُ اللَّبَانِ يُورِثُ الْحِفْظَ وَيُذْهِبُ النِّسْيَانَ وَيَقْطَعُ الْبَلْغَمَ
“লোবান বা কন্দুর খাওয়া স্মরণশক্তি বাড়ায়, ভুলে যাওয়ার সমস্যা দূর করে এবং কফ বিনাশ করে”? এ কথাটি কি তাঁর থেকে সহিহ সূত্রে প্রমাণিত?
উত্তর: সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য, আর দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর। এরপর বক্তব্য হলো━ “আল মুজামুল ওয়াসিত” (২/৮১৪) গ্রন্থে লোবানের পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে: “এটি সুগন্ধযুক্ত উদ্ভিদের একটি প্রজাতি, যা থেকে আঠা বা রজন নির্গত হয় এবং একে ‘কন্দুর’ বলা হয়।” আর আল্লামা ইবনে মুফলিহ আল হাম্বলি “আল আদাব আশ শারইয়্যাহ” (২/৪০৩) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, একে “হাসা লুবান” বা লোবানের কঙ্কর বা দানা’ও বলা হয়।
(লোবান বা কন্দুর যখন গাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় তখন এটি শুকিয়ে ছোট ছোট স্বচ্ছ দানা, পাথর বা স্ফটিকের টুকরোর মতো আকার ধারণ করে। দেখতে অনেকটা ছোট নুড়ি পাথরের মতো লাগার কারণেই একে আরবিতে “হাসা লোবান” বা লোবানের দানা বলা হয়ে থাকে।) হাদিসে এই গাছ বা উপাদানের কোনও উল্লেখ পাওয়া যায়নি। কোনও মুহাদ্দিস এর কোনও সনদ বর্ণনা করেননি এবং হাদিসের কোনও প্রামাণ্য গ্রন্থেই এর কোনও মূল বা সনদ আমাদের নজরে আসেনি। অবশ্য আব্দুল মালিক ইবনে হাবিব আল কুরতুবি (মৃত্যু: ২৩৮ হিজরি) খাদ্য ও চিকিৎসা ভিত্তিক তাঁর একটি ছোট গ্রন্থে (পৃষ্ঠা: ৪১) কোনও ধরনের সনদ বা সূত্র ছাড়াই এটি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন:
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
“أكل اللبان يُورث الْحِفْظ وَيذْهب النسْيَان وَيقطع البلغم”
“লোবান খাওয়া স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করে, ভুলে যাওয়া দূর করে এবং কফ দূর করে।” অতঃপর তিনি নিজেই এর ব্যাখ্যায় বলেছেন: “লোবান খাওয়া কফ দূর করে আর যে জিনিসই কফ দূর করে সেটিই ভুলে যাওয়া দূর করে এবং স্মরণশক্তি বাড়ায়।”
তবে হাদিস শাস্ত্রের মূলনীতি অনুযায়ী, কোনও বর্ণনাকে সহিহ বা গ্রহণযোগ্য প্রমাণ করার জন্য এ ধরনের বক্তব্য যথেষ্ট নয়। বরং এর সঠিক সনদ ও উৎস খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত এটি ঝুলন্ত বা ভিত্তিহীন কথাই থেকে যায়। যেহেতু কথাটি প্রমাণিত নয় তাই কারো পক্ষ থেকেই এটি হাদিস হিসেবে বর্ণনা করা বা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর চালিয়ে দেওয়া কিছুতেই জায়েজ নয়। কারণ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন:
“مَنْ يَقُلْ عَلَيَّ مَا لَمْ أَقُلْ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ”
“যে ব্যক্তি আমার পক্ষ থেকে এমন কোনও কথা বলে যা আমি বলিনি, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।” [সহিহ বুখারি: ১০৯]
আল্লাহু আলাম। (সবকিছু ভালো জানেন একমাত্র আল্লাহ)। [Islamqa info]
❑ লোবান সংক্রান্ত অন্যান্য হাদিসগুলো সংক্ষিপ্ত তাহকিক:
উপরে লোবানের ব্যাপারে একটি হাদিসের ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণের মতামত দেওয়া হয়েছে। নিম্নে আরও কয়েকটি হাদিস ও আসারের সংক্ষিপ্ত তাহকিক পেশ করা হলো:
✪ ১. ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর আসার:
“عليكم باللبانِ فإنه يمسحُ الحزنَ من القلبِ كما يمسحُ الأصبعُ العرَقَ عن الجبينِ وإنه يشدُّ القلبَ ويزيدُ في العقلِ ويُذَكِّي الذهنَ ويجلو البصرَ ويُذهبُ النسيانَ”
“তোমরা লোবান ব্যবহার করো; কেননা তা হৃদয় থেকে দুশ্চিন্তা দূর করে, যেভাবে আঙুল কপাল থেকে ঘাম মুছে ফেলে। এটি হৃদয়কে মজবুত করে, বুদ্ধিমত্তা বাড়ায়, মেধা তীক্ষ্ণ করে, দৃষ্টিশক্তি পরিষ্কার করে এবং ভুলে যাওয়া দূর করে।”
➧ এ হাদিসটি দুর্বল। কারণ এর সনদে মুহাম্মদ ইরাহিম ইবনে আমর ইবনে ইউসুফ রয়েছেন। মুহাদ্দিস ইবনে মানদাহ বলেছেন, “তিনি মুনকার বা আপত্তিকর হাদিস বর্ণনা করতেন।”
আর আলি ইবনে যানজওয়াইহ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, “আমি তাঁকে চিনি না।” [ইবনে ইরাক আল কিনানি, তানজিহুশ শারিয়াহ ২/২৬২]
✪ ২. আলি রা.)-এর উক্তি: (জইফ বা দুর্বল)
“عليكم باللبان فإنه يشجع القلب ويذهب بالنسيان”
“তোমরা লোবান ব্যবহার করো; কেননা তা হৃৎপিণ্ডকে সবল করে এবং বিস্মৃতি বা ভুলে যাওয়ার সমস্যা দূর করে।”
➧ এটিও দুর্বল। এই উক্তটি আবু নুয়াইম তার আত ত্বিব্বুন নব্বীতে দু জায়গায় বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তার উল্লেখিত সনদও দুর্বল (মুনকার)। এতে সুলাইমান ইবনে সালমাহ ও ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আল আত্তার-এর মতো দুর্বল ও মাতরূক রাবি (মুহাদ্দিসগণের নিকট পরিত্যক্ত ও অগ্রহণযোগ্য বর্ণনাকারী) রয়েছেন। এর আরেকটি সনদও রয়েছে। কিন্তু সেটাও দুর্বল।
৪. আলি (রা.) এর নামে লুবানের তেল মালিশ সংক্রান্ত বর্ণনা: (জাল বা বানোয়াট)
“ادَّهِنوا بالِّلبانِ فإنه أحظى لكم عند نسائِكم”
“তোমরা লোবান দ্বারা তেল মালিশ করো। কেননা এটি স্ত্রীদের কাছে তোমাদের আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।”
➧ এই বর্ণনাটি মউজু বা জাল। এটি আহলে বাইত (আলি রা. এর) নামে মিথ্যাচার। এর শায়েখ বা বর্ণনাকারীগণ অপরিচিত। এর আদভী একজন কাযযাব বা মিথ্যুক বর্ণনাকারী। [ইবনুল কায়সারানি, যখিরাতুল হুফফাজ (১/২৬০]
সারাংশ: লোবান ঔষধি গুণ সম্পন্ন ও অত্যন্ত উপকারী বস্তু। কিন্তু এর উপকারিতা সম্পর্কে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে কোনও হাদিস বা কোনও সাহাবি থেকে এর সংক্রান্ত বিশুদ্ধ সূত্রে আসার সাব্যস্ত হয়নি।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

Sunday, July 26, 2026

স্বামীর আনুগত্য করার আবশ্যকতা এবং তার অনুমতি ছাড়া বাইরে যাওয়ার বিধান

 প্রশ্ন: একজন মহিলা কুরআন-হাদিস অনুযায়ী চলার চেষ্টা করেন এবং পর্দাও করেন। কিন্তু বাইরে যাওয়ার জন্য স্বামীর আদেশ মানতে চান না। যেমন: স্বামীর নিষেধ সত্ত্বেও ভাইয়ের পাত্রী দেখার জন্য বাড়ি থেকে চলে গেল। তার দাবি, আমি আম্মার সাথে গিয়েছি। এটা আমার জন্য অনুমতি আছে। কিন্তু স্বামী এতে রাজি নয়।

প্রশ্ন হল, এভাবে উক্ত মহিলার জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে ইসলাম কী বলে? এ ক্ষেত্রে স্বামীর করণীয় কি?

উত্তর:

স্ত্রীর জন্য স্বামীর আনুগত্য করা ফরয যদি তা গুনাহের কাজ বা সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো কাজের নির্দেশ না হয়।
সুতরাং স্ত্রীর জন্য জরুরি হল, বিশেষ কোনো কাজে বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হলে স্বামীর নিকট অনুমতি নেয়া। স্বামী অনুমতি দিলে পরিপূর্ণ পর্দা সহকারে এবং নিজেকে ফিতনা থেকে হেফাযতে রেখে স্ত্রী বাইরে যেতে পারে। দূরে কোথাও যাওয়ার দরকার হলে অবশ্যই তার পিতা, ভাই ইত্যাদি মাহরাম পুরুষের সাথে যাবে। কিন্তু স্বামী যদি তাকে যেতে নিষেধ করে তাহলে স্ত্রীর জন্য তা লঙ্ঘন করা বৈধ নয়। অন্যথায় সে স্বামীর ‘অবাধ্য’ হিসেবে গণ্য হবে এবং গুনাহগার হবে।

পারিবারিক শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই এই আনুগত্য করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা পুরুষকে পরিবারের মূল পরিচালনার দায়িত্ব এবং স্ত্রীর উপর কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা অর্পণ করেছেন। (সূরা নিসা: ৩৪ নং আয়াত)।

সুতরাং স্ত্রী যদি এই আনুগত্যের বিষয়টিকে উন্মুক্ত হৃদয়ে গ্রহণ না করে তাহলে পরিবারিক শৃঙ্খলা ভেঙ্গে যেতে বাধ্য। আল্লাহ হেফাজত করুন। আমীন।

জ্ঞাতব্য যে, ইসলামের বিধান হল, কোন স্ত্রী যদি স্বামীর ‘অবাধ্য’ হয় বা তার আনুগত্য করতে অস্বীকার করে তাহলে তার জন্য স্ত্রীর ভরণ-পোষণ দেয়া বন্ধ করার অধিকার রয়েছে।

🌀 ইসলামে স্বামীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তার আনুগত্যের বিষয়টি নিম্নোক্ত হাদিস থেকে সুষ্পষ্ট ভাবে প্রতিভাত হয়:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِغَيْرِ اللهِ لأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا وَالَّذِى
نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لاَ تُؤَدِّى الْمَرْأَةُ حَقَّ رَبِّهَا حَتَّى تُؤَدِّىَ حَقَّ زَوْجِهَا وَلَوْ سَأَلَهَا نَفْسَهَا وَهِىَ عَلَى قَتَبٍ لَمْ تَمْنَعْهُ-
“যদি আমি কাউকে নির্দেশ দিতাম আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে সিজদা করার, তাহ’লে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করার জন্য।ঐ সত্তার শপথ করে বলছি যার হাতে আমার জীবন, মহিলারা ঐ পর্যন্ত আল্লাহর হক আদায় করতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে স্বামীর হক আদায় না করে, এমনকি স্বামী যদি যাত্রা পথে ঘোড়ার পৃষ্ঠেও তাকেও আহবান করে তখনও তাকে বাধা না দেয়।” (ইবনে মাজাহ হা/১৮৫৩; সহীহাহ হা/১২০৩।)
সুতরাং স্ত্রীর জন্য স্বামীর অবাধ্যতা করে বাইরে কোথাও যাওয়া জায়েয নয় যদি নিজের বাবা-মা বা আত্মীয় স্বজনের বাড়ি হোক না কেন।

🌀 এর দলিল হল, বিখ্যাত ইফকের ঘটনায় মা আয়েশা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট তার বাবা-মার কাছে যাওয়ার অনুমতি চাওয়ার হাদিস:
তিনি বলেন:
أتأذن لي أن آتي أبوي
“(হে আল্লাহর রাসূল,) আপনি কি আমাকে আমার বাবা-মার কাছে যাওয়ার অনুমতি দিবেন?” (সহিহ বুখারী ও মুসলিম)

ইরাকী বলেন, আয়েশা রা. এ কথা থেকে বুঝা গেল, স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার পিতামাতার বাড়িতে যাবে না।” (ত্বরবুত তাসরীব ৮/৫৮)

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রা. এক বিবাহিত মহিলার ব্যাপারে বলেন-যার মা অসুস্থ ছিল:
طاعة زوجها أوجب عليها من أمها ، إلا أن يأذن لها
” মা’র চেয়ে স্বামীর কথার আনুগত্য করা তার জন্য অধিক অপরিহার্য। তবে স্বামী যদি তাকে অনুমতি দেয় তাহলে ভিন্ন কথা।” (শারহু মুনতাহাল ইরাদাত ৩/৪৭)

সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি বলেন:
لا يجوز للمرأة الخروج من بيت زوجها إلا بإذنه ، لا لوالديها ولا لغيرهم ؛ لأن ذلك من حقوقه عليها ، إلا إذا كان هناك مسوغ شرعي يضطرها للخروج
“কোন মহিলার জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাড়ির বাইরে যাওয়া জায়েয নয়। পিতামাতা বা অন্য কারো নিকট নয়। কারণ এটি তার উপর স্বামীর হক। অবশ্য যদি শরিয়ত সম্মত বিশেষ কোনো কারণ থাকে তাহলে ভিন্ন কথা।” (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা ১৯/১৬৫)

তবে স্বামীর কর্তব্য হল, সময়-সুযোগ ও প্রয়োজন বুঝে স্ত্রীকে মাঝে-মধ্যে তার পিতামাতা ও অন্যান্য মাহরাম নিকটাত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার অনুমতি দেয়া যদি এতে ক্ষয়-ক্ষতি ও ফেতনার আশঙ্কা না করে।

অবশ্য একান্ত জরুরি অবস্থায় স্বামীর অনুমতি ছাড়াও বাইরে যাওয়া জায়েয আছে। যেমন, বাড়িতে থাকা যদি তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ হয়, ঘর ভেঙ্গে পড়ে, জরুরি চিকিৎসা, ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাদ্য সামগ্রী ক্রয় ইত্যাদি।

পরিশেষে বলব, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিশ্বাস, ভালবাসা ও সুসম্পর্ক বজায় রেখে যে কোনো সমস্যা সমাধান করা যায়। এগুলো দাম্পত্য জীবনে অপরিহার্য দাবী। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের চাহিদা ও হক আদায় করবে এবং প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রাখবে। তাহলে মতবিরোধ সৃষ্টি হওয়া থেকে রক্ষা পাবে ইনশাআল্লাহ।

তবে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ হলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও দাম্পত্য জীবনের বৃহত্তর স্বার্থে উভয়কে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে এবং যথাসম্ভব দ্রুত সমাধান করতে হবে। তাহলে দুজনের দাম্পত্য জীবন ভরে থাকবে অবারিত সুখ, শান্তি ও অনাবিল ভালোবাসায় ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমীন।
▬▬▬💠💠▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

Translate