Monday, June 15, 2026

কুরআনে বর্ণিত আসহাবে কাহফ বা গুহাবাসীর কাহিনী

 কুরআনে বর্ণিত আসহাবে কাহফ বা গুহাবাসীর ঘটনা

_______________
ঈসা (আ.)-এর যুগে প্রথম দিকে অধিকাংশ লোকই ছিলো মুশরিক। হক ও বাতিলের দ্বন্দ্ব চিরন্তণ সত্য। সবযুগেই তা বরাবরই মোকাবালা করতো। ঈসা (আ.)-এর যুগেও মুশরিক ও তাহওহীদপন্থীদের মাঝে শত্রুতা চরম পর্যায়ের ছিলো। তেমনিভাবে বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর যুগের মুশরিকরাও তাঁকে অসহ্য জ্বালাতন করেছে, কখনো শরীরে গবাদি পশুর বর্জ নিক্ষেপ করতো, কখনো চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখতো, আবার কখনো ঐতিহাসিক বিভিন্ন প্রশ্ন করে আটকানোর চেষ্টা করতো। তেমনি তিনটি ঘটনার কথা পবিত্র কুরআনের সূরা কাহফে উল্লেখ হয়েছে। সেই তিনটি ঘটনা নিয়ে বক্ষমান প্রবন্ধের অবতারণা।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তায়ালা যে সমস্ত ঘটনা উল্লেখ করেছেন, তার প্রত্যেকটি ঘটনাতেই আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। কিন্তু আমাদের অনেকেই সেই ঘটনাগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যাতে শিক্ষণীয় বস্তুগুলো সুস্পষ্ট হয়ে উঠে না। বক্তাগণ এ সমস্ত ঘটনা বলে শ্রোতাদেরকে কখনো হাসান আবার কখনো কাঁদান ঠিকই, কিন্তু যেই উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ্ ঘটনাগুলো উল্লেখ করেছেন, সেই সুমহান উদ্দেশ্যগুলো অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্টই থেকে যায। কুরআনে বর্ণিত আসহাফে কাহাফ বা গুহাবাসীর আশ্চর্যজনক ঘটনাও কুরআনের শিক্ষণীয় ঘটনাসমূহের অন্যতম একটি ঘটনা। এই ঘটনাটি নির্ভরযোগ্য কিছু গ্রন্থ অধ্যয়ন করে তার সারমর্ম আপনাদের খেদমতে উপস্থাপন করছি। আল্লাহ আমাদের সঠিক জ্ঞানার্জন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
প্রথম ঘটনা
সেই যুগে কোন এক ঈদের দিন জনগণ মূর্তি পূজার অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে বের হল। এতে তারা তাদের মূর্তিগুলোর নৈকট্য লাভের জন্য পশু যবাই বা অন্যান্য যা যা করার তাই করবে। কিন্তু তাদের সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত বংশের একজন যুবক মূর্তি পূজার এই মহড়া কোন ক্রমেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তারা যে সমস্ত কল্পিত মাবুদের উপাসনা করছিল, তা দেখে তিনি বিবেকের কাছে থমকে দাঁড়ালেন। সন্দেহ তাঁর মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল। তাঁর চিন্তা ও চেতনায় এক নতুন গতির সঞ্চার হল। তিনি জন সমাবেশ ত্যাগ করে চুপ করে বের হয়ে গেলেন। একটি গাছের নীচে গিয়ে পেরেশান হয়ে বসে রইলেন।
কিছুক্ষণ পর তার মতই আরেকজন যুবক এসে তার সাথে বসে পড়লেন। তার মনেও একই সন্দেহ। এক এক করে সাতজন যুবক এসে একত্রিত হলেন। সকলের মনে প্রশ্ন একটাই। নিজ হাতে গড়া কাঠের ও পাথরের মূর্তি কি করে আমাদের মাবুদ হতে পারে? কল্যাণ-অকল্যাণের ক্ষমতাই বা কোথায় পেল তারা? যিনি এই সুন্দর পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, এই আকাশ-বাতাস তৈরী করেছেন, যিনি আমাদের জীবন ও মরণের একমাত্র মালিক, তাঁকে বাদ দিয়ে এগুলোর এবাদত কি করে সম্ভব? এই সাতজনের মধ্যে কোন প্রকার রক্তের সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ঈমানের বন্ধনে তাদের একজন অন্যজনের সাথে আটকে গেলেন। তারা সকলেই এক বাক্যে পরস্পরের নিকট জাতির লোকদের মূর্তি পূজা ও শির্কের প্রতি মনের সন্দেহের কথা প্রকাশ করলেন। অতঃপর তারা মহা বিশ্বের মাঝে তাদের প্রখর দৃষ্টি ঘুরালেন। এতে তাদের অন্তরসমূহ তাওহীদের আলোয আলোকিত হয়ে উঠল এবং আল্লাহর মনোনিত দ্বীনের সন্ধান পেয়ে তাদের আত্মা এক অনাবিল প্রশান্তি লাভ করল। তারা সকলেই ঈমান গোপন রাখার উপর একমত হলেন। কারণ তাদের বাদশাহ ছিল মূর্তি পূজক, মুশরিক যে তার প্রজাদেরকে শিরক করতে বাধ্য করত।
তারা সমাজের অন্যান্য লোকদের সাথেই বাস করতে থাকলেন। কিন্তু তাদের প্রত্যেকেই যখন একাকী হন তখন আল্লাহর এবাদতের দিকে মনোনিবেশ করেন। কোন এক রাতে তারা যখন একত্রিত হলেন, তখন তাদের একজন নিচু আওয়াজে এবং পূর্ণ সতর্কতার সাথে বললেনঃ “হে আমার বন্ধুগণ! গতকাল আমি একটি খবর শুনেছি। এটি যদি সত্য হয়, (আমার ধারণাও তাই) তাহলে অচিরেই আমাদেরকে আমাদের দ্বীন হতে ফিরিয়ে রাখা হতে পারে অথবা আমাদের জীবন নাশ করা হতে পারে। আমি শুনলামঃ আমাদের ব্যাপারটি এখন আর বাদশাহর কাছে গোপন নয়, আমাদের দ্বীন ও আকীদাহর বিষয়টি এখন তার কাছে অস্পষ্ট নয়। যেই দ্বীনকে আমরা হৃদয়ে গেঁথে নিয়েছি এবং যা আমাদের চিন্তা-চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে, তা এখন বিপন্ন হওয়ার পথে। সুতরাং তোমরা চিন্তা কর এবং তোমাদের সিদ্বান্ত তোমরাই গ্রহণ কর।” দ্বিতীয়জন বললেনঃ খবরটি আমিও শুনেছি। তবে তা মুনাফেক এবং অজ্ঞদের অপপ্রচার মনে করে উড়িয়ে দিয়েছি। পরক্ষণেই খবরটির সত্যতা প্রমাণিত হল। তারা বললেনঃ আমরা আমাদের দ্বীনের উপর অবিচল থাকবো। যে বিপদই আসুক না কেন, তা মাথা পেতে মেনে নিবো। আল্লাহর সত্য দ্বীনকে জানার পর কোনভাবেই পূর্বের সেই মূর্তি পূজার দিকে ফেরত যাবো না।
গুজব এখন সত্যে পরিণত হল। বাদশাহ তাদের খবরটি জেনে ফেলল। তাদেরকে ঘর থেকে বের করে বাদশাহর দরবারে হাজির করা হল। বাদশাহ বললঃ তোমরা তোমাদের ব্যাপারটি গোপন রাখতে চেষ্টা করেছ। কিন্তু সফল হতে পার নি। আমি জানতে পেরেছি যে, তোমরা বাদশাহ এবং তার প্রজাদের ধর্ম ত্যাগ করেছ। তোমরা এমন এক নতুন ধর্মে প্রবেশ করেছ, যে সম্পর্কে আমি জানি না। কোথা থেকে তা তোমাদের আসল? আমি তোমাদেরকে কখনই এভাবে ছেড়ে দিবো না। আমি জানি তোমরা সম্ভ্রান্ত বংশের লোক। তাই অন্যরা তোমাদের কারণে বিভ্রান্ত হতে পারে। এমন আশঙ্কা যদি না থাকত তাহলে তোমাদেরকে বাঁধা প্রদান করতাম না।
যাই হোক, আমি তোমাদের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করতে চাচ্ছি না। তোমরা চিন্তা কর। হয় তোমরা আমার ধর্মে ফেরত আসবে অন্যথায় তোমাদের মাথাগুলো দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে।
কিন্তু তাদের অন্তরগুলোকে আল্লাহ মজবুত করে দিলেন। ঈমানকে শক্তিশালী করে দিলেন। তারা বললেনঃ হে বাদশাহ! আমরা এই দ্বীনে কারও অন্ধ অনুসরণ করে প্রবেশ করি নি, বাধ্য হয়েও নয় এবং অজ্ঞাত বশত:ও নয়। আমাদের সুস্থ বিবেক ও ফিতরাত আমাদেরকে ডাক দিয়েছে। আমরা সেই ডাকে সাড়া দিয়েছি। বিবেক আমাদেরকে আলোকিত করেছে। তার আলোতেই আমরা চলছি। আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তার কোন শরীক নেই। আমরা তাঁকে ছাড়া আর কাউকেই ডাকবো না। আর আমাদের জাতির লোকেরা অন্ধ হয়ে অন্যের তাকলীদ করে মূর্তি পূজা করছে, যে ব্যাপারে তাদের কাছে কোন দলীল-প্রমাণ নেই। এই হল আমাদের শেষ কথা। এখন আপনার যা খুশী করতে পারেন।
এরপর বাদশাহ বললঃ এবার যাও। আগামীকাল অবশ্যই আসবে। আমি তোমাদের ব্যাপারে ফয়সালা প্রদান করবো। তারা ফিরে এসে পরামর্শ করতে লাগলেন এবং প্রত্যেকেই স্বীয় মতের চাকা ঘুরাতে লাগলেন। তাদের একজন বললেনঃ বাদশাহ যেহেতু আমাদের ব্যাপারটি জেনেই ফেলেছে, তাই তার ধমকি ও হুমকির মধ্যে থেকে আমাদের কোন লাভ নেই। আমরা ঐ গুহার দিকে দ্বীন নিয়ে পালিয়ে যাবো। যদিও তা হবে এই প্রশস্ত দেশের তুলনায খুব অন্ধকার ও সংকীর্ণ। কিন্তু আমরা সেখানে প্রশস্ত মনে এক আল্লাহর এবাদত করতে পারবো, যা আমরা এই বিশাল রাজ্যে করতে পারছি না। এমন দেশে আমাদের বসবাস করাতে কোন কল্যাণ নেই, যেখানে আমরা নিরাপদে আমাদের আকীদাহ-বিশ্বাস অনুযায়ী দ্বীন পালন করতে পারি না এবং এমন দেশে আমাদের বসবাস করা ঠিক হবে না, যেখানে আমাদের সঠিক বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অন্য একটি বাতিল মত চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে।
সুতরাং সকলেই এই কথায় একমত হয়ে গেলেন। তারা সফর সামগ্রী তৈরী করে নিজ দেশ ছেড়ে এক অজানা পথের উদ্দেশ্যে দ্বীন নিয়ে হিজরত শুরু করলেন। পথে একটি কুকুর তাদের সাথী হয়ে গেল, একই পথে চলতে লাগল, তাদের সাথে ভালবাসার বন্ধনে আটকে গেল এবং তাদের প্রহরী হওয়ার দায়িত্ব পালনে নিজেকে নিজেই মনোনিত করল। ভালকে ভালবাসলে এবং সৎ লোকের সাহচর্যে গেলে আল্লাহর প্রিয় হওয়া যায়, এই প্রাণীটি হয়তবা তা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিল। দেশে যখন জুলুম-নির্যাতন করে, তখন পশু-পাখী পর্যন্ত অতিষ্ট হয়ে যায়। তারা এই জালেম হতে পরিত্রাণ চায়। কুকুরটিও সৎ লোকদের পথের হয়ে গেল। চলতে চলতে এক সময় তারা গুহায় পৌঁছে গেলেন। হয়তবা সেখানে তারা আল্লাহর দেয়া রিজিক থেকে ফল-ফলাদি পেয়ে গেলেন এবং ঝর্ণার পরিচ্ছন্ন মিষ্টি পানি পান করলেন। দীর্ঘ পথ চলার পর সফরের ক্লান্তি দূর করার জন্য পরিশ্রান্ত শরীর নিয়ে সেখানে তারা সামান্য বিশ্রামের নিয়েত গুহার মধ্যকার যমীনে মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন। শুয়ে পড়ার সাথে সাথেই হালকা ঘুম অনুভব করলেন এবং সেই হালকা ঘুমের পথ ধরেই গভীর নিদ্রা চলে আসল।
পরের দিন নির্দিষ্ট সময়ে বাদশাহর দরবারে হাজির না হওয়াতে তার লোকেরা তাদের অনুসন্ধানে বের হল। এমন কি তারা সেই গুহার দরজা পর্যন্ত পৌঁছে গেল। কিন্তু হিজরতের পথে মক্কার মুশরিকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর (রা.)-এর সন্ধানে বের হয়ে গারে ছাওর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েও যেভাবে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল আল্লাহ তায়ালা সেভাবেই তাদেরকে অন্ধ করে দিলেন।
এখানে ঘটে গেল আল্লাহ তায়ালার এক বিষ্ময়কর ঘটনা:
দিনের পর আসে রাত। রাতের পর দিন। পার হয়ে গেল বছরের পর বছর। যুবকগণ শুয়ে আছেন। গভীর নিদ্রা তাদেরকে আচ্ছন্ন করে আছে। বাইরের কর্ম ব্যস্ত জীবনের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই, আকাশে বিজলীর গর্জন, বাতাসের প্রচ-তা এবং পৃথিবীর কোন ঘটনাই তাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে নি। সূর্য উদিত হওয়ার সময় ডান পাশে হেলে গিয়ে গুহার ছিদ্র দিয়ে সামান্য আলো প্রবেশ করে এবং আল্লাহর হুকুমে তাদেরকে সামান্য আলো ও তাপ প্রদান করে। কিন্তু সূর্যের প্রখর উত্তাপ তাতে প্রবেশ করে না। আল্লাহর ইচ্ছায় তাদের শরীরকে হেফাজতের জন্য অস্ত যাওয়ার সময়ও সূর্য একটু বাম দিকে হেলে যায়। কুকুরটি তার দুই বাহু প্রসারিত করে বীরের মত প্রহরীর কাজে গুহার বাইরে অবস্থানরত।
তারা সেখানে মাঝে মাঝে ডানে বামে পার্শ্ব পরিবর্তন করছেন। কে আছে এমন যে এই দৃশ্য দেখে ভয পাবে না? গভীর নিদ্রায় তিনশ বছর আরো নয় বছর পার হয়ে গেল। এবার তারা ক্ষুধা ও পিপাসায় দুর্বল শরীর নিয়ে জাগ্রত হলেন। তারা ভাবলেন সময় বেশি অতিক্রম হয় নি এবং ইতিহাসের চাকা গুহার মুখেই থমকে রয়েছে। তাদের একজন বললেনঃ হে বন্ধুগণ! আমার মনে হয় এখানে আমরা দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে পার করেছি। তোমাদের মতামত কি?
অন্যজন বললেনঃ আমার মনে হয় পূর্ণ একদিন আমরা নিদ্রিত ছিলাম। কারণ যে ধরণের ক্ষুধা ও পিপাসা আমরা অনুভব করছি, তাতে তাই মনে হয়।
তৃতীয়জন বললেনঃ সকালে ঘুমিয়েছি। এই দেখো সূর্য এখনও ডুবে যায় নি। আমার মনে হয় একটি দিবসের কিয়দাংশই আমরা নিদ্রায় অতিক্রম করেছি।
চতুর্থজন বললেনঃ ছাড়ো এসব মতভেদ। আল্লাহই ভাল জানেন, আমরা কতকাল এখানে ঘুমিয়েছি। মূল কথা হচ্ছে আমার প্রচুর ক্ষুধা অনুভব হচ্ছে। মনে হচ্ছে কয়েক দিন যাবৎ না খেয়ে আছি। আমাদের একজনের উচিত এখনই শহরে গিয়ে কিছু খাদ্য ক্রয় করে নিয়ে আসুক। তবে তাকে অবশ্যই সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ লোকেরা যদি আমাদের অবস্থান সম্পর্কে জেনে ফেলে তবে তারা আমাদেরকে হত্যা করতে পারে কিংবা আমাদেরকে ফিতনায় ফেলে দ্বীন পালন থেকে বিরত রাখতে পারে। তাকে আরেকটি বিষয়ে সাবধান হতে হবে। কোনভাবেই যেন হারাম খাদ্য ক্রয় করা না হয়। সে জন্য সে যাচাই-বাছাই করে হালাল খাদ্যটিই ক্রয় করবে।
তাদের একজন সাবধানতা ও পূর্ণ সতর্কতার সাথে ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় শহরে প্রবেশ করলেন। তিনি দেখলেন কোন কিছুই আর আগের মত নেই। ঘরবাড়িগুলো পরিবর্তন হয়ে গেছে। পুরাতন পরিত্যাক্ত ঘরের স্থলে বিশাল প্রাসাদ শোভা পাচ্ছে। আগের রাজপ্রাসাদগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তিনি এখন যে সমস্ত চেহারা দেখছেন সেগুলো পরিচিত কোন লোকের চেহারা নয়। নদীর ¯্রােত আগের মতই চলছে বয়ে, পরিবর্তিত রূপ ধারণ করে ঘরবাড়ি ও বন-বনানী ঠিকই আছে। শুধু নেই আগের মানুষগুলো।
তার দৃষ্টি বিচলিত হল, এদিক সেদিক চোখ ঘুরানোতে লোকেরা সন্দেহ পোষণ করতে লাগল এবং তার চলার ভঙ্গিতে মানুষের সন্দেহ দানা বেঁধে উঠল। পরিশেষে লোকেরা তাকে ঘিরে ধরল। উপস্থিত লোকদের একজন তাকে জিজ্ঞেস করলঃ আপনি কি এখানে অন্য দেশ থেকে এসেছেন? এত চিন্তা করছেন কি নিয়ে? অনুসন্ধানই বা করছেন কী?
তিনি বললেনঃ আমি এখানে অপরিচিত কেউ নই। আমি কিছু খাদ্য ক্রয় করতে চাই। কিন্তু কোথায় তা বিক্রি হচ্ছে আমি তা জানি না। একজন লোক তার হাত ধরে খাদ্যের দোকানে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে তিনি রোপার তৈরী কয়েকটি দিরহাম বের করলেন। দোকানের মালিক দিরহামগুলো হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেনঃ এ তো তিনশ বছরের অধিক সময় আগের তৈরী সে ভাবল এই ব্যক্তি হয়ত কোন গুপ্তধন পেয়েছেন। সম্ভবতঃ এই দিরহামগুলো ছাড়াও তার কাছে বিপুল পরিমাণ দিরহাম রয়েছে। দোকানের মালিক বাজারের লোকদেরকে ডেকে একত্রিত করল।
এবার গুহাবাসী লোকটি বললেনঃ হে লোক সকল! দেখুন, আপনার যা ভাবছেন, বিষয়টি আসলে তেমন নয়। এই মূদ্রাগুলো লুকায়িত অসংখ্য সম্পদের কোন অংশ নয়। গতকাল মানুষের সাথে কোন এক লেনদেনের সময় তা আমার হস্তগত হয়েছে। আর এই তো আজ আমি তা দিয়ে কিছু খাদ্য ক্রয় করতে চাচ্ছি। আপনারা তাতে এত আশ্চর্যবোধ করছেন কেন? এর কোন কারণ তো আমি খুঁজে পাচ্ছি না। আর কেনই বা সন্দেহের উপর নির্ভর করে আমার বিরুদ্ধে গুপ্তধন পাওয়ার এবং তা লুকিয়ে রাখার অপবাদ দিচ্ছেন?
এই কথা বলে তাদের ব্যাপারটি মানুষের কাছে প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার ভয়ে তিনি স্থান ত্যাগ করতে চাইলেন। কিন্তু লোকেরা কিছুতেই তাকে ছেড়ে দিতে রাজি হল না। ভিড় ভেঙ্গে দিয়ে কিছু লোক একাকী তার সাথে নম্র ভাষায় কথা বলতে লাগল। কথা-বার্তার এক পর্যায়ে তারা যখন জানতে পারল যে, তিনি হচ্ছেন তিন শত নয় বছর পূর্বে জালেম ও কাফের বাদশাহর পাকড়াও থেকে পলায়নকারী সম্ভ্রান্ত বংশের সাত জন যুবকের একজন তখন তারা আরও আশ্চার্যান্বিত হল। তারা আরও জানতে পারল যে, তারা হলেন ঐ সমস্ত যুবক যাদের অনুসন্ধানে বাদশাহ সকল প্রচেষ্টাই করেছিল, কিন্তু তাদের কোন সন্ধান পাওয়া যায় নি। যুবকটি এবার আরও শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। কারণ এখন লোকেরা তাদের ব্যাপারটি জেনে ফেলেছে। তাই তিনি নিজের ও তাঁর সাথীদের জীবন নাশের ভয়ে পালাতে উদ্যোত হলেন। লোকদের মধ্যে হতে একজন বললঃ হে ভাই তুমি ভয় করো না। তুমি যেই জালেম বাদশাহর ভয় করছ, সে তো প্রায় তিনশ বছর আগেই ধ্বংস হয়েছে। এখন যিনি এই রাজ্যের বাদশাহ তিনি আপনিও আপনার সাথীদের মতই একজন মুমিন বান্দা। এবার বলুনঃ আপনার অন্যান্য সাথীগণ কোথায়?
যুবকটি এবার আসল ঘটনা জানতে পারলেন। ইতিহাসের সেই দীর্ঘ দূরত্বও তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন, যা তাকে মানব সমাজ থেকে আলাদা করে রেখেছে। তিনি বুঝতে পারলেনঃ এখন তিনি মানুষের মাঝে চলমান একটি ছায়া ব্যতীত আর কিছুই নন। এরপর তিনি লোকদের উদ্দেশ্যে বললেনঃ আমাকে গুহার অভ্যন্তরে বন্ধুদের কাছে যেত দাও। আমি তাদেরকে আমার ও আপনাদের অবস্থা সম্পর্কে সংবাদ দেব। তারা দীর্ঘক্ষণ যাবৎ আমার অপেক্ষায় আছেন। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, তারা আমার ব্যাপারে চিন্তিত আছেন।
তখনকার বাদশাহও তাদের খবরটি জেনে ফেললেন। তিনি গুহাবাসীদের সাথে সাক্ষাত করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন এবং দ্রুত গুহার দিকে চলে আসলেন। তিনি তাদেরকে উজ্জ্বল চেহারায় জীবিত অবস্থায় দেখতে পেলেন। তাদের সাথে মুসাফাহা ও আলিঙ্গন করলেন। তিনি তাদেরকে রাজপ্রাসাদে আহবান জানালেন এবং তথায় স্থায়ীভাবে বসবাসের আমন্ত্রণ জানালেন।
তারা সাফ জানিয়ে দিলেনঃ নতুনভাবে জীবন যাপনে আমাদের কোন আগ্রহ নেই। আমাদের ঘরবাড়িগুলো বিলীন হয়ে গেছে, পিতা-মাতা ও সন্তান-সন্তদির কেউ জীবিত নেই এবং আমাদের মাঝে এবং স্বাভাবিক জীবন-যাপনের মাঝে দীর্ঘ দিন যাবৎ কোন যোগসূত্রও নেই। সুতরাং এই পার্থিব জীবনের দিকে ফিরে গিয়ে আর লাভ কি? অতঃপর তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভের আবেদন করলেন, তাঁর কাছে ফেরত যাওয়াকেই পছন্দ করলেন এবং তাঁর প্রশস্ত রহমত দ্বারা তাদেরকে ঢেকে নিতে প্রার্থনা করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। দেহ থেকে তাদের প্রাণ চির দিনের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। কিছু তাদের কবরের উপর সৌধ নির্মাণ করার কথা বললো, কিন্তু অধিকাংশ লোক বললো না, আমরা তো তাদের অবস্থানের উপর মসজিদ নির্মাণ করবো। (সূরা কাহাফ: ২১)
এই ঘটনা থেকে কতিপয় শিক্ষা
১) তাওহীদকে মেনে নেওয়া মানুষের ফিতরাতি তথা সৃষ্টিগত স্বভাব। অর্থাৎ কোন মানুষকে যদি তার স্বভাজাত ধর্মের উপর ছেডে দেয়া হয় এবং বাইরের কোন গোমরাহ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তাকে বিভ্রান্ত না করে, তাহলে সে আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা দিবে, তারই এবাদত করবে এবং তাঁর এবাদতে অন্য কিছুকে শরীক করবে না। যেমনটি হয়েছেলি ঘটনায় বর্ণিত যুবকদের ক্ষেত্রে।
২) পৃথিবীতে তাওহীদ প্রতিষ্ঠায় যুবকদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
৩) মূর্তি পূজা, অলী-আওলীয়াদের পূজা এবং শির্কের পক্ষে কোন দলীল নেই।
৪) প্রয়োজনে সত্য গোপন করা জায়েয আছে। কিন্তু তা সকল সময়ের জন্য নয়।
৫) সাহসের সাথে তাওহীদের বাণী প্রকাশ্যে প্রচার করা জরুরী।
৬) নিজ দেশে দ্বীন পালন করতে গিয়ে ফিতনার ভয় থাকলে দ্বীন নিয়ে পলায়ন করা আবশ্যক।
৭) আসহাবে কাহাফের ঘটনা আল্লাহর বিশেষ একটি বড় নিদর্শন। তবে তার চেয়েও বড নিদর্শন হচ্ছে, আসমান-যমীন, চন্দ্র-সূর্যের সৃষ্টি এবং দিবা রাত্রির আগমণ ও প্রস্থান।
৮) বিপদাপদে একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করা এবং তাঁর দয়া কামনা করা জরুরী।
৯) কোন মতবাদ, মাজহাব ও আমল গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কারও অন্ধ অনুসরণ না করে দলীল অনুসন্ধান করা জরুরী।
১০) আল্লাহ্ তাআলা তাঁর বান্দাদের খেদমতের জন্য বড় বড় মাখলুককে বাধ্য করেন।
১১) একজন দাঈ প্রয়োজনে সতর্কতা অবলম্বন করবেন। বিশেষ করে যখন তাঁর পিছনে শত্রুরা ষড়যন্ত্র শুরু করে।
১২) সুখে-দুঃখে হালাল রুজী অনুসন্ধান করা জরুরী।
১৩) চিন্তা ও গবেষণা করে কুরআন ও কুরআনে বর্ণিত ঘটনাগুলো অধ্যয়ন করা উচিৎ।
১৪) বিনা প্রয়োজনে মতভেদ করা অর্থহীন। যেমন গুহাবাসীদের নাম, কুকুরটির নাম ও তার রং সম্পর্কে ঘাটাঘাটি করে কোন লাভ নেই।
১৫) ভবিষ্যতে কোন কাজ করতে ইচ্ছা করলে প্রথমে ইনশা-আল্লাহ্ বলতে হবে।
১৬) প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সত্যের উপর অবিচল থাকার গুরুত্ব অপরিসীম।
১৭) আসহাবে কাহাফের স্থান ও কাল কুরআন ও সহীহ হাদীছে উল্লেখ করা হয় নি। সুতরাং তা খুঁজে বেড়ানোতে আমাদের কোন লাভ নেই। ঘটনাটি ঐ প্রকার গায়েবের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে জানিয়েছেন। তবে তার স্থান ও কাল আমরা জানতে পারি নি।
১৮) নবী সাল্লাল্লাহু গায়েবের সকল খবর জানতেন না। যদি জানতেন, তাহলে অহীর অপেক্ষায় না থেকে প্রশ্ন করার সাথে সাথেই তাদেরকে ঘটনাটি বলে দিতেন।
১৯) আসহাবে কাহাফগণ যে গুহায় অবস্থান করেছিলেন তাও গায়েবের অন্তর্ভুক্ত। এর ঠিকানা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। কেউ যদি এর স্থান নির্দিষ্ট করে বলে সে আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনাকারীর অন্তর্ভুক্ত হবে।
২০) কারামতে আওলীয়া সত্য। তাতে বিশ্বাস করা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদাহর অন্তর্ভুক্ত।
২১) তাওহীদ ও শির্কের মধ্যে পার্থক্য করার যোগ্যতা অর্জন করা জরুরী। অন্যথায় তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা সম্ভব নয়।
২২) তিন শত নয় বছর পর তাদেরকে জীবিত করা এটাই প্রমাণ করে যে মৃত্যুর পর পুনরুত্থান সত্য, কিয়ামত সত্য। এতে কোন সন্দেহ নেই।
২৩) রূহ এবং দেহ উভয়েরই পুনরুত্থান হবে। কেননা আসহাবে কাহাফগণ এভাবেই জীবিত হয়েছিলেন।
২৪) রক্তের সম্পর্কের চেয়ে ঈমানের সম্পর্ক অধিক মজবুত হওয়া আবশ্যক। ঘটনায বর্ণিত যুবকদের মধ্যে রক্তের কোন সম্পর্ক না থাকলেও ঈমান ও তাওহীদের বন্ধনে তারা আবদ্ধ হয়ে একই পথের পথিক হয়ে যান।
২৫) হেদায়াত আল্লাহর পক্ষ হতে তাঁর বান্দার প্রতি বিরাট একটি নেয়ামত। বান্দার উচিত সর্ব অবস্থায় আল্লাহর কাছে হেদায়াত প্রার্থনা করা।
২৬) ঘরের মধ্যে কুকুর রাখা নিষিদ্ধ। তাই কুকুরটিকে গুহার বাইরে রাখা হয়েছিল।
২৭) ভাল লোকের সঙ্গে থাকলে ভাল হওয়া যায় এবং ভাল হিসেবে পরিচিতি পাওয়া যায়। কুকুরটি তাদের সাথে থাকার কারণে কুরআনে তার সেটির কথা উল্লেখিত হয়েছে। অপর পক্ষে অসৎ লোকের সঙ্গে থাকলে অসৎ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে নিরাপদ নয়।
২৮) কবরের উপর মসজিদ বা গম্বুজ নির্মাণ করা আমাদের শরীয়েত নিষিদ্ধ।
২৯) বাতিল পন্থীরা সন্দেহ এবং অনুমানের অনুসরণ করে থাকে। সঠিক কোন দলীল তাদের হাতে নেই।
৩০) বয়স বৃদ্ধি হলে এবং অভিজ্ঞতা দীর্ঘ হলেই মানুষ জ্ঞানী হয়ে যায় না। এই যুবকগণ বয়সে কম হলেও তারা সত্য উদঘাটনে সক্ষম হয়েছেন। অথচ সেই জাতির মধ্যে অসংখ্য বয়স্ক ও অভিজ্ঞ লোক থাকা সত্ত্বেও সঠিক পথের সন্ধান পায় নি।
৩১) এখান থেকে প্রমাণিত হয় যে সূর্য চলমান; স্থির নয়। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তুমি সূর্যকে দেখবে, যখন উদিত হয়, তাদের গুহা থেকে পাশ কেটে ডানদিকে চলে যায় এবং যখন অস্ত যায়, তাদের থেকে পাশ কেটে বামদিকে চলে যায়।
৩২) প্রহরী হিসেবে কুকুর প্রতিপালন করা জায়েয আছে।
৩৩) কোন বিষয়ে জ্ঞান না থাকলে তা আল্লাহর দিকে সোপর্দ করে বলতে হবে আল্লাহই ভাল জানেন।
৩৪) আল্লাহ কখনও দ্বীনের দাঈদের ঈমানী শক্তি পরীক্ষা করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে শত্রুদেরকে শক্তিশালী করে দেন। তখন দাঈদের উচিত ধৈর্য ধারণ করা।
৩৫) তারা সংখ্যায় ছিলেন সাত জন। কারণ আল্লাহ তাআলা প্রথম দু’টি সংখ্যার প্রতিবাদ করে তৃতীয়টির ক্ষেত্রে কিছুই বলেন নি। এতে বুঝা গেল শেষ সংখ্যাটিই সঠিক।
৩৬) যে ব্যক্তি ফতোয়া দেয়ার যোগ্য নয়, তার কাছে ফতোয়া চাওয়া ঠিক নয়।
৩৭) আসহাবে কাহাফের ঘটনা, পরকাল বিশ্বাসের সত্যতার এক উজ্জ্বল ও অকাট্ট প্রমাণ বিশেষ। আল্লাহ তায়ালা যেভাবে আসহাবে কাহাফকে এক দীর্ঘকাল পর্যন্ত মৃত্যুর মহানিদ্রায় নিমজ্জিত রাখার পরও পুনরুজ্জীবিত করে তুলেছেন, অনুরূপভাবে মৃত্যুর পরে পুনরায় জীবন দান করাও তাঁর কুদরতে সামান্যতমও অসম্ভব নয়।
এছাড়াও আরও অসংখ্য শিক্ষণীয় দিক আছে উক্ত ঘটনায়। যা হয়ত একজন দুজন মানুষের দ্বারা বের করা সম্ভব নয়। তাই সম্মানিত পাঠকদের নিকট অনুরোধ আপনার গভীরভাবে সূরা কাহাফ অধ্যয়ন করুন আরো অনেক শিক্ষা হয়ত বের করতে পারবেন। ইনশা আল্লাহ জাযাকুমুল্লাহু খাইরান। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দ্বীনের উপর অবিচল থাকার তওফীক দান করুন।

জান্নাতে হুরে ‘ইন’ কেমন হবে?

 

১) জান্নাতের অন্যান্য নিয়ামতের ন্যায় হুরে ঈনও একটি নিয়ামত হবে।

২) কোন কোন হুরে ইন ইয়াকুত ও মুক্তার ন্যায় লাল হবে।
৩) অতুলনীয় সুন্দরী সাথে সাথে হুরে ইনরা সতিত্ব ও লজ্জাশীলতায়ও নিজেরা নিজেদের তুলনীয় হবে।
৪) মানব হুরদেরকে ইতিপূর্বে অন্য কোন মানুষ স্পর্শ করেনি। জ্বিন হুরদেরকেও্ ইতিপুর্বে কোন জ্বীন স্পর্শ করেনি।
আল্লাহ তায়ালা বলেন– “ তথায় থাকবে আয়তনয়না রমণীগণ। কোন জ্বীন ও মানব পূর্বে যাদেরকে স্পর্শ করেনি। অতএব উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোন কোন অবদানকে অস্বীকার করবে? প্রবাল ও পরাগ সদৃশ নারীগণ। অতএব তোমরা উভয়ে তোমাদের পলনকর্তার কোন অবদানকে অস্বীকার করবে? (সূরা আর-রহমান-৫৫/৫৬-৫৯)
৫) হুরেরা এতটা লজ্জাশীল হবে যে ,স্বামী ব্যতিত আর কারো দিকে চোখ তুলে তাকাবে না।
৬)হুরেরা ডিমের ভিতর লুক্কায়িত পাতলা চামড়ার চেয়েও অধিক নরম হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন– তাদের নিকট থাকবে আয়তলোচনা তরুণীগণ যেন তারা সুরখ্যিত ডিম। ( সূরা সাফফাত ৩৭/৪৮-৪৯)
৭) জান্নাতের হুরেরা সুন্দর লাজুক চোখ বিশিস্টা, মোতির ন্যায় সাদা এবং তাদের স্বচ্চতা ও রং এত নিখুত হবে যেন সংরখ্যিত স্বর্ণালংকার।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- তথায় থাকবে আয়তনয়না হুরগণ। আবরণে রখ্যিত মোতির ন্যায়, তারা যা কিছু করত তার পুরস্কার স্বরুপ । (সূরা ওয়াক্বিয়া ৫৬/২২-২৪)
৮) হুরদের সাথে জান্নাতী পুরুষদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিয়ে হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- তাদেরকে বলা হবে তোমরা যা করতে তার প্রতিফল স্বরুপ তোমরা তৃপ্ত হয়ে পানাহার কর। তারা শ্রেনীবদ্ধ সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসবে। আমি তাদেরকে আয়তলোচনা হুরদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে দিব। (সূরা তূর ৫২/১৯-২০)
৯) হুরেরা তাদের স্বামীর সমবয়সী হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- তাদের নিকট থাকবে আয়ত নয়না সমবয়স্কা নারীগণ। তোমাদের এরই প্রতিশ্রুতি দেয়‍া হচ্ছে বিচার দিবসের জন্য। (সূরা ছোয়াদ ৩৮/৫২-৫৩)
১০) জান্নাতে স্বীয় স্বামিদের আনন্দ দানে হুরদের সঙ্গীত।
আনাস (রা:) থেকে বর্নিত। রসূলুল্লাহ (সা:) বলেন: জান্নাতে আকর্ষণীয় চক্ষুবিশিষ্টা হুরেরা সঙ্গীত পরিবেশন করবে এ বলে: আমরা সুন্দর এবং সতী ও সৎচরিত্রের অধিকারিনী ‍হুর। আমরা আমাদের স্বামিদের অপেক্ষায় অপেক্ষমান ছিলাম। ( ত্বাবারানী ,হাদিস নং -১৫৯৮) সুবহানআল্লাহ…..
১১) ঈমানদারদের জন্য জান্নাতের হুরদেরকে আল্লাহ বাছাই করে রেখেছেন।
মোয়াজ বিন জাবাল (রা:) থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন রসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: যখন কোন মহিলা তার স্বামীকে কোন কষ্ট দেয়, তখন আয়তনয়না হুরদের মধ্য থেকে মুমিন স্ত্রী বলবে যে, আল্লাহ তোমকে ধ্বংষ করুন, তাকে কষ্ট দিও না। সে অল্প দিনের জন্য তোমার নিকট আছে অতি শীঘ্রই সে তোমাদেরকে ছেড়ে চলে আসবে । (ইবনে মাযাহ, আলবানী ,১ম খন্ড, হা: নং১৬৩৭)
বুরাইদা (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন রসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন. আমি জান্নাতে প্রবেশ করার সময় এক যুবতি আমাকে অভ্যর্থনা জানাল, আমি তাকে বললাম, তুমি কার? সে বলল যে আমি যায়েদ বিন হারেসার জন্য। (ইবনে ‍আসাকের. সহীহ আল-জামে সগীর. আলবানী. হা: নং-৩৬১)

লেখা গুলো নেয়া হয়েছে ‍”জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা” মুহাম্মদ ইকবাল কিলানি রচিত বই থেকে। (তাওহীদ পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত)

আমার সবচেয়ে বড় শত্রু

 

ভূমিকা:

পৃথিবীতে একজন অত্যন্ত জ্ঞানী এবং অভিজ্ঞ সত্ত্বা আছে, যে আমাদের সাইকোলজি নিয়ে খেলা করে আমাদেরকে প্রতিদিন না বুঝে অন্যায় কাজে ডুবিয়ে রাখে, নিজেদের সাথে প্রতারণা করায় এবং আমাদের পরিবারে মধ্যে আগুন জালিয়ে দেয়। আমাদের জলদি উপলব্ধি করা দরকার সে কে। কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা আমাদের প্রতি মুহূর্তের সঙ্গী, আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু শয়তান সম্পর্কে অজ্ঞ থাকবো; সে কিভাবে কাজ করে, কিভাবে সে মানুষকে ধোঁকা দেয়, কিভাবে আমাদের চিন্তাকে প্রভাবিত করে – এগুলো না বুঝবো; ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা না জেনে, না বুঝে প্রতিনিয়ত তারই পরিকল্পনাগুলো সফল করতে বিনা পারিশ্রমিকে তার হয়ে কাজ করতে থাকবো।

শয়তানের মানুষকে ধীরে ধীরে শেষ করার কয়েকটি প্রধান পদ্ধতি হলঃ

১. নিজেকে যথেষ্ট ভালো মানুষ বলে বিশ্বাস করানো এবং নিজের অন্যায় কাজগুলো নিজেই যুক্তি দিয়ে ন্যায় কাজ বলে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া। যেমন – আপনি ঘুষ দিয়ে ভাবছেন সেটা কোনো দোষের কিছু না, কারণ আপনি নিজে তো ঘুষ খাচ্ছেন না। আর ঘুষ না দিলে তো আপনি কাজটা অন্য কোনো ভাবে করাতে পারতেন না। তাই এই ঘুষ দেওয়াটা নিশ্চয়ই হালাল। এভাবে আপনি ‘হালাল ঘুষ’ এর প্রচলন শুরু করেন। একইভাবে ধীরে ধীরে হালাল সুদ, হালাল লোণ, হালাল ইনস্যুরেন্স, হালাল লটারি – এরকম অনেক কিছুই হালাল হয়ে যাওয়া শুরু হয় আপনার কাছে। শয়তান যেভাবে আদমের (আ) সামনে নত না হওয়ার জন্য যুক্তিতর্ক দিয়ে আল্লাহকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে, সে যা করেছে সেটাই ঠিক, সেরকম আপনি যুক্তি দিয়ে আল্লাহকে বোঝানোর চেষ্টা করেন কোন হারামটা আসলে হারাম না। এভাবে আপনি শয়তানের দলের একজন হয়ে যান।

২. আরেকটি পদ্ধতি হল – ধর্মে কোন বাধ্যবাধকতা নেই – এটা বিশ্বাস করানো। আল্লাহর উপর বিশ্বাস থাকলেই হল। ধর্মীয় রীতিনীতি গুলো আসলে কিছু আনুষ্ঠানিকতা। সবার জন্য নামায, রোযা করা লাগে না। হজ্জ করতে গেলে যদি দেশে দুর্যোগ হয়, তখন পরিবারকে বাঁচাবে কে? মানুষকে যাকাত দিয়ে কি হবে? তারা তো আর যাকাত পেয়ে সচ্ছল হয়ে যাচ্ছে না। শয়তান নিজে যেমন ঠিকই আল্লাহকে বিশ্বাস করে, কিন্তু নামায, রোযা, যাকাত ইত্যাদি ধর্মীয় রীতিনীতি গুলো কিছুই মানে না, ঠিক সেভাবে সে আপনাকেও মানুষরূপী শয়তান বানিয়ে ফেলে।

৩. চাকরি, ব্যবসা, পড়ালেখা ইত্যাদি দৈনন্দিন কাজগুলোকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্বাস করানো এবং মনে করা যে – আল্লাহর সাথে আমার চুক্তি আছে, আল্লাহ আমাকে মাফ করে দিবে। যেমন – আমি একজন ডাক্তার! আমি মানুষের জীবন বাঁচাই! আমার নিশ্চয়ই পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ার দরকার নেই? আমি তো সেই সময়ে কয়েকজন রুগীর জীবন বাঁচাতে পারি। কোনটা বেশি জরুরি? নামায পড়া না মানুষের জীবন বাঁচানো? আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাকে মাফ করে দিবে।

৪. সবসময় টাকা পয়সা, সম্পত্তি, সুখ হারানোর ভয়ের মধ্যে রাখা। যেমন, আপনার এক গরিব আত্মীয় চিকিৎসার জন্য আপনার কাছে টাকা চাইতে আসলো, কিন্তু আপনি ভাবা শুরু করলেন – এই লোকটাকে কয়েক হাজার টাকা দিলে তো আমার বাড়ি কেনার জন্য জমানো সত্তুর লাখ টাকা কমে যাবে, আমার বাড়ি কেনা পিছিয়ে যাবে! কালকে যদি আমার চাকরি চলে যায়, তাহলে তো আর আমার বাড়ি কেনা হবে না? যদি এক মাস পরে বাড়ির দাম হঠাৎ করে বেড়ে যায়?

৫. নিজেকে দিয়ে অন্যায় করাতে না পারলে, কাছের মানুষদেরকে দিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে অন্যায় করানো। যেমন, আপনি বহুদিন চেষ্টার পর আজকে শেষ পর্যন্ত কু’রআন নিয়ে বসেছেন পড়ার জন্য, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনার স্বামী বা স্ত্রী এসে আপনাকে টিভিতে একটা অনুষ্ঠান দেখার জন্য তাগাদা দেওয়া শুরু করলো। অথবা আপনি অনেক আয়োজন করে বসেছেন একটা ইসলামিক আর্টিকেল পড়বেন, কিন্তু পড়া শুরু করতে না করতেই বন্ধুর ফোন – দোস্ত, চল্‌ কালকে ‘ইয়ে’ করতে যাই। শুরু হল আধা ঘণ্টা ফোনে কথা, তারপর রাতের খাওয়া, টিভি এবং ঘুম। আপনার আর সেদিন আর্টিকেল পড়া হল না। তার পর কয়েক সপ্তাহ পার হয়ে গেল, আপনি ভুলে গেলেন সেই আর্টিকেলের কথা।

 

৬. উপরের প্রত্যেকটা পদ্ধতি পড়ার সময় আপনার আশেপাশের কারও না কারও কথা মনে হচ্ছিল এবং আপনি মনে মনে ভাবছিলেন – তাইতো! এগুলো সবই দেখি ওর সাথে মিলে যায়!আপনার ভেতরে এই যে চিন্তাটা হচ্ছে, যেখানে আপনি মনে করছেন আপনার এই সমস্যাগুলোর কোনোটাই নেই, এগুলো সবই হচ্ছে আপনার আশেপাশের মানুষদের সমস্যা – এটা শয়তান আপনার ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সে সবদিক থেকে চেষ্টা করবে যেন আপনি কখনও মনে না করেন এই আর্টিকেলে যতগুলো সমস্যা আপনি শিখবেন, তার কোনটা আপনার ভেতরেও আছে।

শয়তানের মানুষকে বোকা বানানোর এই পদ্ধতি গুলো শয়তান হাজার হাজার বছর ধরে সফল ভাবে ব্যবহার করে আসছে। পৃথিবীতে বিলিয়ন মানুষকে সে প্রতিনিয়ত বোকা বানিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি তার সহযোগী হয়ে তার মহাপরিকল্পনা সফল করতে বিনা পারিশ্রমিকে তার হয়ে কাজ করতে না চান, তাহলে আসুন আমরা ভালো করে বোঝার চেষ্টা করি কিভাবে শয়তান কাজ করে।

শয়তান আসলে কি

প্রথমত, আমাদেরকে ভালো করে বুঝতে হবে ইবলিস এবং তার শয়তান বাহিনী আসলে কি ধরণের সত্তা এবং আল্লাহ তাদেরকে কতখানি ক্ষমতা দিয়েছেন এবং কি ধরণের খারাপ কাজ শয়তান আপনাকে দিয়ে করায়, আর কি ধরণের খারাপ কাজ আপনি নিজে আপনার নিজের প্রবৃত্তির কারণে করেন। প্রথমে শয়তানের সংজ্ঞা কি ভালো ভাবে জানা দরকারঃ

শয়তানঃ

মানুষ বা জ্বিন, যারা ইবলিস এবং তার উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করতে সাহায্য করে। ইবলিস এক মহা জ্ঞানী সত্তা। সে একজন জ্বিন ছিল, যাদেরকে আল্লাহ ﷻ মানুষ সৃষ্টি করার অনেক আগেই সৃষ্টি করেছিলেন [আল-হিজর ১৫:২৭]। সে আল্লাহর ﷻ ইবাদত করে এতটাই উপরে উঠতে পেরেছিল যে, আল্লাহ ﷻ তার সাথে কথা বলতেন এবং আল্লাহর ﷻ মহাপরিকল্পনার অনেক কিছুই সে জানতো। এছাড়াও সে তার যোগ্যতার কারণে আল্লাহর ﷻ কাছের সন্মানিত ফেরেশতাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিল।[৪] কিন্তু তারপর ঘটলো এক বিস্ময়কর ঘটনা, যার পর এত সন্মানিত এবং জ্ঞানী এক সত্তা তার সবকিছু হারিয়ে ফেললো। আমরা অনেকেই ছোট বেলায় ইবলিসের এই অবাধ্যতার ঘটনাটা শুনেছি এবং ভেবেছি – “ছি, ইবলিস কি বোকা, সে এত বড় ভুল কিভাবে করলো।” আবার অনেকে ভেবেছি – “আহারে বেচারা ইবলিস। আল্লাহ ﷻ  ইবলিসকে একটা ভুলের জন্য এত বড় শাস্তি দিল? এত বড় একজন সত্তাকে সারা জীবনের জন্য বের করে দিলো? শাস্তিটা বেশি হয়ে গেল না?” শুধু তাই না, এই ধারণা থেকে Devil Worshipper ‘শয়তান পূজারী ধর্ম’ তৈরি হয়ে গেছে, যার অনুসারীরা মনে করে সেদিন ইবলিসের সাথে অন্যায় করা হয়েছিল এবং তারা ইবলিসের উপাসনা করে এবং অপেক্ষা করছে কবে ইবলিসের সাথে ‘গডের’ শেষ যুদ্ধ হবে, যেদিন তারা ইবলিসের সহযোগিতা করবে।

আমাদের ভালো করে বোঝা দরকার সেদিন কী ঘটেছিল। ধরুন, আপনি আপনার চাকরি জীবনের প্রথম থেকে একটা কোম্পানিতে নিষ্ঠার সাথে কাজ করে আসছেন। গত ত্রিশ বছর কঠোর পরিশ্রম করে আপনি একজন মামুলি কেরানি থেকে আজকে কোম্পানির প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। আপনার সাথে কোম্পানির চেয়ারম্যানের অনেক ভালো সম্পর্ক, আপনি তার অনেক কাছের একজন মানুষ। কিন্তু হঠাৎ একদিন আপনার চেয়ারম্যান আপনাকে বলল যে, সদ্য অক্সফোর্ড থেকে গ্রাজুয়েট একজন তরুন ছেলে কালকে থেকে কোম্পানির প্রেসিডেন্ট হবে এবং আপনাকে তার অধীনে ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করতে হবে। আপনার অবস্থা তখন কী হবে? একজন সদ্য গ্রাজুয়েট হবে প্রেসিডেন্ট, আর আপনি যেখানে ত্রিশ বছর ধরে কোম্পানিতে কাজ করছেন, সেখানে আপনি হবেন তার অধীনে একজন কর্মচারী! আপনার সাথে এতো বড় অন্যায়?

আপাতত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, ইবলিসের এই প্রতিক্রিয়াটা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এখানে অনেক চিন্তার ব্যাপার আছে। প্রথমত, ইবলিসের আল্লাহর ﷻ অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা ছিল। আপনি, আমি নিজের চোখে আল্লাহকে দেখিনি, নিজের কানে আল্লাহকে শুনিনি। আমরা কোনো ফেরেশতাকেও কোনোদিন দেখিনি। আপনার-আমার পক্ষে আল্লাহ্‌র ﷻ প্রতি সম্পূর্ণ অবিচল, অটুট বিশ্বাস রাখাটা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু ইবলিস নিজে আল্লাহর সাথে কথা বলতে পারতো। এমনকি সে সন্মানিত ফেরেশতাদের সাথেও থাকতো। তার জন্য আল্লাহকে ﷻ প্রভু হিসেবে মেনে, কোনো ধরণের প্রশ্ন না করে, তাঁর আদেশ মেনে চলাটাই স্বাভাবিক ছিল। আল্লাহর ﷻ অবস্থান কত উপরে এবং সে কত নিচে; আল্লাহর ﷻ অস্তিত্ব যে কত ব্যাপক, তাঁর ক্ষমতা যে কত বিশাল এবং সে আল্লাহর ﷻ তুলনায় কত দুর্বল একজন মামুলি সৃষ্টি—এগুলো তার খুব ভালো ভাবে জানা থাকার কথা। সৃষ্টি জগতের মধ্যে আল্লাহর ﷻ প্রতি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসী এবং সবচেয়ে বেশি অনুগতদের মধ্যে একজন হওয়ার কথা তার। কিন্তু এই সবকিছু দেখার, শোনার এবং জানার পরেও, সে কিভাবে আল্লাহর ﷻ আদেশের উপর সোজা ‘না’ করে দিল, সেটা এক বিস্ময়কর ঘটনা। কু’রআনে পরে কয়েকটি সূরায় আল্লাহ ﷻ ইবলিসের সাথে সেদিন তাঁর যে কথোপকথন হয়েছিল, তা আমাদেরকে জানিয়েছেনঃ

আল্লাহ বললেন,

“ইবলিস, যাকে আমি নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি, তার প্রতি তুমি অনুগত হতে পারলে না কেন? তুমি কি তখন অহংকার করছিলে, নাকি তুমি নিজেকে মহিমান্বিতদের একজন মনে করো?” [সাদ ৩৮:৭৫]

স্রষ্টার কাছ থেকে এত কঠিন একটা প্রশ্ন সরাসরি শোনার পরে স্বাভাবিক ভাবেই ইবলিসের উচিৎ ছিল সাথে সাথে ক্ষমা চাওয়া এবং স্বীকার করা যে, সে বড় ভুল করে ফেলেছে, তাকে মাফ করে দেওয়া হোক। কিন্তু সে তা না করে উলটো আল্লাহকে ﷻ বোঝানোর চেষ্টা করলোঃ

সে বলল,

“আমি ওর থেকে বড়। আপনি আমাকে আগুন থেকে বানিয়েছেন, আর ওকে বানিয়েছেন মাটি থেকে।” [সাদ ৩৮:৭৬]

ইবলিস কিন্তু বলতে পারতো, “আমি আপনার কত বছর থেকে ইবাদত করছি, আপনার কত কাছের আমি, আপনার প্রতি কত অনুগত, আর আপনি আমাকে বলছেন নতুন একজনের কাছে নত হতে?” অথবা সে বলতে পারতো, “আমাকে কেন ওই নতুন সৃষ্টির প্রতি অনুগত হতে হবে, তা আমাকে বুঝিয়ে বলবেন কি, যাতে আমি নিজেকে বোঝাতে পারি?” সে এর কোনোটাই করেনি। সে কার মুখের উপর ‘না’ বলছে, কাকে যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছে—সেটা সে ভুলে গিয়েছিল।

ইবলিসের এই মানসিকতা কিছু মানুষের মধ্যেও আছে। যেমন, চৌধুরী সাহেব মনে করেন: পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া, ত্রিশটা রোজা রাখার আসলে কোনো দরকার নেই। এই সব নামায, রোজা শুধু ওই সব অর্ধ-শিক্ষিত, অল্প-জ্ঞানী ‘মোল্লা’ টাইপের মানুষদের জন্য দরকার, যারা এখনও তার মত চিন্তার গভীরতা এবং উপলব্ধির উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। সে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি পাওয়া একজন মানুষ। সৃষ্টিজগত, বিজ্ঞানের উপর কয়েক ডজন বই পড়েছেন। ডিসকভারি চ্যানেলে শখানেক ডকুমেন্টারি দেখেছেন। তিনি আল্লাহকে ﷻ যতটা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেন, সেটা সবাই পারে না। একারণেই তার মত মানুষদের এইসব গদ বাঁধা নামায, রোজার দরকার হয় না।

ইবলিস এবং এই চৌধুরী সাহেব টাইপের মানুষদের সমস্যা হচ্ছে: “আল্লাহ ﷻ প্রশ্নের ঊর্ধ্বে, সর্বশক্তিমান, একমাত্র প্রভু এবং আমি আল্লাহর ﷻ এক মামুলি দাস”—এটা তারা ঠিকভাবে নিজেকে বোঝাতে পারেনি। তারা আল্লাহকে ﷻ সৃষ্টিকর্তা মানে ঠিকই। কিন্তু তিনি যে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে একজন প্রভু—এটা মানে না।

ইবলিস শুধু আল্লাহর ﷻ সাথে যুক্তিতর্কই করেই শেষ করেনি, তার মধ্যে কখনই কোনো ধরণের অনুশোচনা ছিল না। সে প্রথমত আল্লাহর ﷻ আদেশ অমান্য করল, তারপর আল্লাহকেই ﷻ সে যুক্তি দিয়ে বোঝানোর মতো ঔদ্ধত্য দেখাল, তারপর সারা জীবন মানুষকে ভুল পথে নেবার জন্য প্রতিজ্ঞা করলো। কিন্তু একবারও সে তার অহংকারকে দমিয়ে আল্লাহকে ﷻ বলতে পারলো না, “ও আল্লাহ্‌, আমি ভুল করে ফেলেছি, আমাকে মাফ করে দিন, আমাকে আর একটা বার সুযোগ দিন।” তার অহংকার এতই বেশি ছিল যে, সে চিরকালের জন্য জাহান্নামে যেতেও রাজি ছিল, কিন্তু তারপরেও সে কারো কাছে মাথা নত করবে না। এখানেই মানুষ এবং ইবলিসের মধ্যে পার্থক্য। মানুষ ভুল করে আল্লাহ্‌র ﷻ  কাছে ক্ষমা চায়, যা আমরা আদম (আ) এর কাছ থেকে শিখেছি। কিন্তু একজন শয়তান ভুল করে আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমা চায় না।

আমরা ইবলিসের এই ঘটনা থেকে আর কিছু না শিখি, একটি জিনিস অন্তত আমাদের শেখা দরকার, সেটা হচ্ছে: অযৌক্তিক অহংকার না করা এবং অহংকারের চোটে অন্ধ হয়ে না যাওয়া। কত বার আমরা জীবনে মানুষের সাথে খামোখা তর্ক করেছি শুধুই তর্কে জেতার জন্য, এটা নিজের ভিতরে বোঝার পরেও যে, আমাদের যুক্তিতে, বোঝায় ভুল আছে? কতবার আমরা, বয়সে ছোট একজনের কাছে মাথা নত করবো না, এই অন্ধ অহংকারের ফলে অনেক ভালো উপদেশ, অনেক সাহায্য, সুযোগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি? কতবার আমরা স্ত্রী বা ছেলে-মেয়েদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করেও, কোনোদিন তাদের কাছে একটি বারও মাফ চাইনি, পাছে আমাদের খানদানি সন্মান চলে যায় ভেবে? কতবার আমরা নিচের পদের কর্মচারী, বাসার কাজের লোক, ড্রাইভারদের সাথে অন্যায় ব্যবহার করেছি, কিন্তু সেটা পরে এক সময় বোঝার পরেও—“ওরা সস্তা মাটির তৈরি, আমি দামি মাটির তৈরি”—এই অহংকার বোধ থেকে একটি বারও তাদের কাছে গিয়ে নিজেদের দোষ স্বীকার করিনি? আমরা যদি নিজেদের অহংকারকে গিলে ফেলে যেটা করা উচিত সেটা করতে না পারি, মানুষের কাছে মাফ চাওয়ার জায়গায় গিয়ে মাফ চেতে না পারি, যেখানে নিজের দোষ মেনে নেওয়া দরকার সেখানে নিজের দোষ মেনে নিতে না পারি, তাহলে ইবলিস যে কাজ করেছিল, আমরাও সেটাই করছি। আল্লাহ্‌ ﷻ তাকে যেই পরিণতি দিয়েছেন, আমাদেরকেও সেই পরিণতি দিবেন। তাহলেই ইবলিস এবং আমাদের সাথে ন্যায়বিচার করা হবে।

শয়তান কিভাবে আপনাকে শেষ করে

শয়তান কখনও আপনাকে এসে বলবে না, আমি শয়তান, আমি তোমাকে জাহান্নামে পুড়াতে চাই। আসো আমরা … করি। ইবলিস এবং জ্বিন শয়তানরা মানুষের কাছে অদৃশ্য প্রাণী। তারা সাইন্স ফিকশনের ভাষায় কোন এক ‘প্যারালাল ইউনিভার্সে’ বা ‘অন্য ডাইমেনশনে’ থাকে, যেখান থেকে তারা ঠিকই আমাদেরকে দেখতে পায়, কিন্তু আমরা তাদেরকে দেখতে পাই না বা কোন বৈজ্ঞানিক যন্ত্র দিয়ে সনাক্ত করতে পারি না।

সে এবং তার অনুসারিরা তোমাদেরকে তাদের জায়গা থেকে দেখতে পায়, কিন্তু তোমরা তাদেরকে দেখতে পাওনা। [আ’রাফ ৭:২৭]

শয়তান মানুষের অবচেতন মনে কুচিন্তা বা কুমন্ত্রণা ঢুকিয়ে দেয়। আপনি সাবধানে লক্ষ না করলে বুঝতে পারবেন না আপনার মনের গভীরে যে চিন্তা গুলো চলছে তার কোনটা আপনি আর কোনটা শয়তান।

সূরা নাসে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে বলেছেন কিভাবে শয়তান কাজ করেঃ

“তার অনিষ্ট থেকে, যে নিজেকে লুকিয়ে রেখে কুমন্ত্রণা দেয়, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে, জ্বিনের মধ্য থেকে এবং মানুষের মধ্য থেকে” [নাস – ১১৪:৪-৬]

শয়তান এমন কৌশলে আপনার মনে কু-চিন্তা, অসুস্থ কামনা ঢুকিয়ে দেয় যে, আপনি মনে করবেন সেগুলো আসলে আপনার নিজেরই চিন্তা-ভাবনা, নিজের আবেগ এবং অনুভুতি। যেহেতু আপনি সবসময় শয়তানের ব্যাপারে সাবধান থাকেন না, তাই কখন যে শয়তান আপনার মধ্যে তার কুমন্ত্রণা ঢুকিয়ে দিয়ে আপনাকে দিয়ে তার কাজ করানো শুরু করে দেয়, তা আপনি ভুলে যান।

একারণেই আল্লাহ্‌ আমাদেরকে সাবধান করেছেনঃ

“যারা আল্লাহ্‌র প্রতি সচেতন থাকে, যখনি তাদের মনে শয়তান কোন কু-চিন্তা দেয়, তারা সাথে সাথে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তখনি তারা পরিস্কার দেখতে পায় কি ঘটছে।” [আ’রাফ ৭:২০১]

আল্লাহ্‌ আমাদেরকে একটা চমৎকার ফর্মুলা শিখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে শয়তানকে প্রতিহত করতে হবে। যখনি অনুভব করা শুরু করবেন যে, আপনি যেই কাজটা করছেন তা করা ঠিক হচ্ছে না, সাথে সাথে আল্লাহ্‌র কথা মনে করুন,
মনে মনে বলুন: “আউ’যু বিল্লাহি মিনাশ শাইতা’নির রাজিম” – “আমি আল্লাহ্‌র কাছে সাহায্য চাই বিতারিত শয়তানের কাছ থেকে”
দ্রুত কোন কু’রআনের আয়াত মনে করার চেষ্টা করুন যেটা আপনার পরিস্থিতির সাথে মিলে যায়। যেমন আপনি কারও প্রতি দুর্বলতা অনুভব করছেন, এমন দিকে তাকাচ্ছেন যেদিকে আপনার তাকানোর কথা না, সাথে সাথে নিজেকে মনে করিয়ে দিন-

“বিশ্বাসী পুরুষদেরকে বল যেন তারা তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের গোপন অঙ্গকে সাবধানে রক্ষা করে, এটা তাদের জন্যই বেশি কল্যাণকর। আল্লাহ্‌ খুব ভালো করে জানেন তোমরা কি কর।  বিশ্বাসী নারীদেরকে বল যেন তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের গোপন অঙ্গকে সাবধানে রক্ষা করে …” [নুর ২৪:৩০]

তবে দরকারের সময় জরুরি কোন আয়াত মনে করাটা খুব কঠিন, যদি না আপনি নিয়মিত কিছু জরুরি আয়াত ঝালিয়ে না নেন। সেজন্য আমার এই আর্টিকেলটি পড়তে পারেন, যেখানে দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগে এরকম কিছু অসাধারণ উপদেশ সহ আয়াতের তালিকা রয়েছে। তবে আপনি যেন আল্লাহ্‌র উপদেশ মনে রাখতে না পারেন, সে জন্য শয়তান যথাসাধ্য চেষ্টা করবে, কারণ তার প্রথম সাফল্যের ঘটনা ছিল আদম (আ) ভুলিয়ে দেওয়া আল্লাহ্‌ তাকে কি করতে মানা করেছিলেন। শয়তানের মানুষকে দিয়ে খারাপ কাজ করানোর একটি মোক্ষম উপায় হলঃ

আপনাকে ভুলিয়ে দিবে আপনার কি করা উচিত না

ইনসান শব্দটির একটি অর্থ হল – যে ভুলে যায়। মানুষ ভুলে যায়, এটা তার একটা বিরাট দুর্বলতা। মানুষ যদি সবসময় সবকিছু মনে রাখতে পারতো, তাহলে সে আল্লাহ্‌র বাণী জানার পরেও খারাপ কাজ কমই করতো। আপনি যখন টিভি ছেড়ে হিন্দি সিরিয়াল দেখা শুরু করেন, তখন যদি সাথে সাথে শখানেক কু’রআনের আয়াত হুবুহু মনে পড়ে যায়, তাহলে আপনি নিশ্চয়ই আর টিভি দেখা চালিয়ে যেতে পারবেন না। আপনি যখনি ফেইসবুকে বসে খুঁজে দেখছেন আপনার ফ্রেন্ড লিস্টে কয়জন মেয়ে আছে এবং তাদের ছবিতে কোন ছেলেকে সাথে দেখা যায় কি না, তখন যদি সাথে সাথে আপনার কানে বাজতে থাকতোঃ

“বিশ্বাসী পুরুষদেরকে বল যেন তারা তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের গোপন অঙ্গকে সাবধানে রক্ষা করে, এটা তাদের জন্যই বেশি কল্যাণকর।” [নুর ২৪:৩০]

তাহলে আপনি নিশ্চয়ই সেটা চালিয়ে যেতেন না। মানুষ ভুলে যায়। দরকারের সময় যেটা মনে করা দরকার সেটা মনে করতে পারে না। আর এটা শয়তানের একটা বিরাট সুযোগ মানুষকে দিয়ে খারাপ কাজ করানোর। শয়তান যতভাবে পারে চেষ্টা করে আপনাকে আল্লাহ্‌র নিষেধ মনে রাখতে না দেবার, আপনার মাথায় রাজনীতি, মারামারি, ধর্ষণ, মন্ত্রীদের কোটি টাকা আত্মসাৎ, গত দশটি সিরিজের কোন খেলোয়াড়ের স্কোর কত, কোন তারকা কোন ধরণের সালওয়ার-কামিজ পছন্দ করে ইত্যাদি হাজারো ধরণের আবর্জনা তথ্য দিয়ে আপনার মস্তিস্ক ভরিয়ে ফেলা, যাতে করে আল্লাহ্‌ আপনাকে কি করতে বলেছেন এবং কি করতে মানা করেছেন, সেটা মনে রাখতে না পারেন। শয়তান আপনাকে প্রতিদিন সকালে খবরের কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলে – ‘যাও, মাথা ভর্তি ফালতু সব জিনিসপত্র ঢুকাও যেগুলো তোমার কোন কাজে আসবে না।’ আপনি হয়তো বছরে একটা ভালো আর্টিকেল বা বই পড়লেন, কিন্তু তারপর শয়তান আপনাকে দশটা মুভি দেখিয়ে আপনার ব্রেইনের কোটি কোটি নিউরন আবর্জনা দিয়ে ভরে ফেললো এবং যা কিছু ভালো শিখেছিলেন তার কিছুই যেন মস্তিষ্কে অবশিষ্ট না থাকে তার জন্য আরও বিশটা হিন্দি বা ইংরেজি সিরিয়াল ঢুকিয়ে দিলো। এরপর আপনি যখনি একা বসে থাকেন বা রাতে বিছানায় শুতে যান, আপনার তখন আর আল্লাহ্‌র কথা মনে পড়ে না বা কু’রআনের কোন বাণী কানে বাজে না বরং আপনার কানে বাজে মুভির ডায়ালগ, চোখ বন্ধ করলে কোন মুভির নাচ-গান বা মারামারির দৃশ্য ভেসে উঠে এবং আপনি মুখে কোন হিন্দি গান গুন গুন করতে থাকেন।

চেষ্টা করুন শয়তান যেন আপনাকে ভালো কথা, ভালো উপদেশ, কু’রআনের বাণী ভুলিয়ে দিতে না পারে। একারণেই আল্লাহ্‌ আমাদেরকে ৫ ওয়াক্ত নামায বুঝে শুনে, গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তে বলেছেন, যাতে করে আমরা ভালো জিনিসগুলো ভুলে না যাই। কিন্তু আপনি সেটা করতে পারেন না, কারণ শয়তান আপনাকে –

বিনোদনে ডুবিয়ে রাখে

এই যুগের প্রজন্মের এক ভয়াবহ সমস্যা দেখা দিয়েছে, যেটা আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন এতোটা খারাপ অবস্থা ছিল না। আজকালকার কিশোর, তরুণরা বাসায় এসে ঘণ্টা খানেক মোবাইল ফোনে গেম খেলে, তারপর ঘণ্টা খানেক এক্সবক্স/প্লেস্টেশন/নিন্টেন্ডো-উই, তারপর ঘণ্টা খানেক টিভি, তারপর ঘণ্টা খানেক ফেইসবুক, ইউটিউব, তারপর ঘণ্টা খানেক মোবাইলে বন্ধু-বান্ধবের সাথে বেহুদা আড্ডা মারে। এই সব শেষ হলে ঘুম, পরের দিন স্কুল/কলেজ/চাকরি এবং বাসায় এসে আবারো সেই মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম, টিভি, কম্পিউটার, ফোন। এতো কিছু করার পড়ে তাদের আর ভালো কিছু করার সময় থাকবে কোথায়? আগের প্রজন্মের যেমন মাদকাসক্তি ছিল, সেরকম আজকের প্রজন্মের ‘বিনোদনাসক্তি’ মহামারির পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। একদিন টিভি না দেখে এরা থাকতে পারে না। সকালে, বিকালে, রাতে কখন ফেইসবুকে যাবে, তার জন্য জান আকুপাকু করতে থাকে। মোবাইল ফোন নষ্ট হয়ে গেলে এরা ডিপ্রেশনে চলে যায়।

আজকাল আর শয়তানদেরকে বেশি কষ্ট করতে হয় না। মানুষ নিজেই নিজেকে ধ্বংস করার জন্য এতো ব্যবস্থা করে ফেলেছে যে, শয়তানরা আরামে বসে উপভোগ করতে থাকে কিভাবে একজন বাবা-মা তার সন্তানদেরকে মোবাইল ফোন কিনে দিয়ে শয়তানের কাজ করে দিচ্ছে। কিভাবে বাবা-মারা সমাজে নাক উঁচু রাখার জন্য সন্তানদেরকে খুনাখুনির ভিডিও গেম, নিজের ঘরে যা খুশি করার জন্য ব্যক্তিগত কম্পিউটার এবং অবাধ ইন্টারনেটের সংযোগ এনে দিয়ে সন্তানদেরকে মানুষ থেকে শয়তান বানিয়ে দিচ্ছে। মানব জাতিকে নৈতিকভাবে ধ্বংস করে মানুষরূপী শয়তান দিয়ে পৃথিবী ভরিয়ে ফেলার যে মহাপরিকল্পনা শয়তানের রয়েছে, তা বাস্তবায়নে অধিকাংশ মানুষ নিয়মিত নিষ্ঠার সাথে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করে যাচ্ছে।

আজকাল টিভি, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম ছাড়া মানুষ নিজেদেরকে ছোট মনে করে। মাত্র ৩০ বছর আগেও মানুষের এগুলো কিছুই ছিল না। কিন্তু আজকাল এগুলো না থাকলে এমন অবস্থা হয় যে, মানুষ নিজেদেরকে নিচু শ্রেণীর মনে করা শুরু করে। এর কারণ হল শয়তানের আরেকটি অন্যতম কৌশল –

আল্লাহ্‌র প্রতি কৃতজ্ঞ হতে না দেয়া

আল্লাহ্‌ যখন শয়তানকে তার সান্নিধ্য থেকে বের করে দিচ্ছিলেন, তখন শয়তান একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ শপথ করেছিল, যা থেকে তার মানুষকে ধ্বংস করার অন্যতম একটি প্রধান পদ্ধতি সম্পর্কে জানা যায়ঃ

(শয়তান বলল)

“আমি মানুষের কাছে আসব ওদের সামনে থেকে, ওদের পেছন থেকে, ওদের ডান দিক থেকে এবং ওদের বাম দিক থেকে। আপনি দেখবেন ওরা বেশিরভাগই কৃতজ্ঞ না।” [আ’রাফ ৭:১৭]

কু’রআনে আল্লাহ্‌ প্রায় ৬০টি আয়াতে কৃতজ্ঞতার গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন। এর মধ্যে একটি বিখ্যাত আয়াত হলঃ মনে পড়ে তোমাদের প্রভু কথা দিয়েছিলেন,

 

“যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তাহলে আমি তোমাদেরকে আরও দিতেই থাকবো। কিন্তু তোমরা যদি অকৃতজ্ঞ হও, তাহলে আমার শাস্তি কঠিন। [ইব্রাহিম ১৪:৭]

এখানে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে কথা দিয়েছেন যে, যদি আমরা কৃতজ্ঞ হই, তাহলে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে দিতেই থাকবেন।

নিশ্চয়ই শয়তান চাইবে না আপনি জীবনে আরও বেশি পান, আরও ভালো থাকেন। একারণে শয়তানের সবসময় চেষ্টা থাকে কিভাবে আপনাকে অসুস্থ বিনোদনে বুঁদ করে রাখা যায়, যেই বিনোদন আপনাকে কখনই পরিতৃপ্তি দেয় না। কিভাবে আপনাকে ভুলিয়ে দেওয়া যায় যে, আল্লাহ্‌র অনুগ্রহে আপনি জীবনে কত কিছুই না পেয়েছেন।

কেন আল্লাহ্‌ আমাদেরকে কৃতজ্ঞ হতে বলেন? তাঁর তো আমাদের কাছ থেকে কিছুই পাবার দরকার নেই। আমরা কৃতজ্ঞ হই আর না হই, তাতে তো তাঁর কোন লাভ নেই। তাহলে কৃতজ্ঞ হয়ে কি লাভ?

গত বছর টাইম ম্যাগাজিনের নভেম্বর সংখ্যায় একটি আর্টিকেল বের হয়েছে কৃতজ্ঞতার উপকারিতার উপরে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০০৩ সালে ২৬১৬ প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের উপরে গবেষণা করে দেখা গেছে, যারা অপেক্ষাকৃত বেশি কৃতজ্ঞ, তাদের মধ্যে মানসিক অবসাদ, দুশ্চিন্তা, অমূলক ভয়-ভীতি, অতিরিক্ত খাবার অভ্যাস এবং মদ, সিগারেট ও ড্রাগের প্রতি আসক্তির ঝুঁকি অনেক কম। আরেকটিগবেষণায় দেখা গেছে মানুষকে নিয়মিত আরও বেশি কৃতজ্ঞ হতে অনুপ্রাণিত করলে, মানুষের নিজের সম্পর্কে যে হীনমন্যতা আছে, নিজেকে ঘৃণা করা, নিজেকে সবসময় অসুন্দর, দুর্বল, উপেক্ষিত মনে করা – ইত্যাদি নানা ধরণের সমস্যা ৭৬% পর্যন্ত দূর করা যায়।

২০০৯ সালে ৪০১ জন মানুষের উপর গবেষণা করা হয় যাদের মধ্যে ৪০% এর ক্লিনিকাল স্লিপ ডিসঅর্ডার অর্থাৎ জটিল ঘুমের সমস্যা আছে। তাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ, তারা বেশি ঘুমাতে পারেন, তাদের ঘুম নিয়মিত হয়, রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েন এবং দিনের বেলা ক্লান্ত-অবসাদ কম থাকেন।

নিউইয়র্কের Hofstra University সাইকোলজির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ডঃ জেফ্রি ফ্রহ ১০৩৫ জন ১৪-১৯ বছর বয়সি শিক্ষার্থীর উপর গবেষণা করে দেখেছেন যারা কৃতজ্ঞ বেশি, তাদের পরীক্ষায় ফলাফল অপেক্ষাকৃত বেশি ভালো, সামাজিক ভাবে বেশি মেলামেশা করে এবং হিংসা ও মানসিক অবসাদে কম ভোগে।

Wall Street Journal একটি আর্টিকেলে বলা হয়েছেঃ

Adults who frequently feel grateful have more energy, more optimism, more social connections and more happiness than those who do not, according to studies conducted over the past decade. They’re also less likely to be depressed, envious, greedy or alcoholics. They earn more money, sleep more soundly, exercise more regularly and have greater resistance to viral infections.

এবার বুঝতে পারছেন কেন আল্লাহ্‌ আমাদেরকে প্রতিদিন ৫ ওয়াক্তে কমপক্ষে ১৭ বার বলতে বলেছেনঃ

আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামিন – সমস্ত প্রশংসা এবং ধন্যবাদ আল্লাহ্‌র যিনি সৃষ্টি জগতের প্রভু। [ফাতিহা ১:২]

আল্লাহ্‌ আমাদের প্রত্যেককে অসংখ্য নিয়ামত দিয়েছেন, কিন্তু তারপরেও আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ হই না। বরং সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকি কখন সেগুলো হারিয়ে ফেলব। আর এই কাজটা শয়তান করে আমাদেরকে –

সবসময় সন্মান, সম্পত্তি হারানোর ভয়ে রাখে

মানুষকে অভাবের ভয় দেখানোর পদ্ধতিটি শয়তান হাজার হাজার বছর থেকে সফল ভাবে প্রয়োগ করে আসছে। আজো কোটি কোটি মানুষ কাজ করতে করতে তাদের জীবন শেষ করে ফেলে যত পারা যায় সম্পত্তি জমানোর জন্য, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কবরে যায় নগ্ন হয়ে একটা সাদা চাঁদর জড়িয়ে; সমস্ত সম্পত্তি, উপাধি, ক্ষমতা পিছনে ফেলে। যাদের ঈমান দুর্বল, শয়তান তাদেরকে সবসময় এসব কিছু হারানোর ভয়ে রাখে, যাতে করে তারা আল্লাহ্‌র উপর ভরসা হারিয়ে ফেলে। যার ফলে মানুষ হয় কিপটা হয়ে জীবন পার করে, না হয় সম্পত্তি ধরে রাখার জন্য এমন কোন খারাপ কাজ নাই যেটা করে না, এমন কি সেটা ছাত্রলীগ বা ছাত্রদলের সোনার ছেলেদেরকে পোষার মতো জঘন্য কাজ করে হলেও।

শয়তানের এই পদ্ধতিকে আল্লাহ্‌ কু’রআনে বলেছেনঃ

শয়তান তোমাদেরকে অভাবের ভয় দেখায় এবং জঘন্য কাজের নির্দেশ দেয়, যেখানে আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে তাঁর ক্ষমা এবং অনুগ্রহের নিশ্চয়তা দেন। আল্লাহ্‌ সীমাহীন এবং তিনি সবকিছু জানেন। [বাকারাহ ২:২৬৮]

মানুষ মনে প্রাণে যা চায়, তাকে সেটা পাওয়ার লোভ দেখিয়ে ফাঁদে ফেলার পদ্ধতিটি শয়তান একদম প্রথম মানুষ আদম (আ) এর উপর থেকে চালিয়ে আসছে। সে আদম (আ) কে লোভ দেখিয়েছিল ঠিক যা তার পাবার আকাঙ্ক্ষা ছিলঃ

তারপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিয়ে বলল,

“আদম, আমি কি তোমাকে অনন্ত জীবন লাভের জন্য এক বৃক্ষের সন্ধান দিব এবং এক রাজত্ব যা কখনও শেষ হয় না?” [তাহা ২০:১২০]

শয়তান ভালো করে জানতো তখন আদমের (আ) ঠিক কি দরকার ছিল। আল্লাহ্‌ আদমকে (আ) অফুরন্ত খাবার এবং শান্তি দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরেও তার দুটা জিনিস ছিল না – অমরত্ব এবং চিরস্থায়ী রাজত্ব। সে জানতো যে সে একজন মানুষ এবং তাকে একদিন মারা যেতে হবে এবং তখন সে তার এই সব সুখ, অফুরন্ত খাবার, তার সঙ্গি – সবকিছু সে হারিয়ে ফেলবে। শয়তান খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছিল আদমকে কিসের কথা বললে সে আর লোভ সামলাতে পারবে না।

এখন আপনি মনে করতে পারেন – ‘আমি তো আর আদম না, আমাকে শয়তান কোন লোভ দেখায় না, আমি যা করি, নিজেই চিন্তা ভাবনা করে করি।’ কখনও এরকম হয়েছে – আপনি একটা নতুন গাড়ি বা বাড়ি কেনার জন্য সিদ্ধান্ত নিলেন। তার জন্য আপনি বাড়তি কাজ করা শুরু করলেন, চাকরির পাশাপাশি একটা ব্যবসা চালু করলেন, আপনার বাবা-মা, পরিবার, সন্তানদেরকে সময় না দিয়ে, তাদের চাওয়া-পাওয়া, আনন্দ, ভালবাসা উৎসর্গ করলেন আরেকটু বেশি আরাম, সুখ এবং নিরাপত্তার স্বপ্নের জন্য? দিনরাত কাজ করে নিজের শরীরের বারোটা বাজালেন, পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি করলেন, আপনার সন্তানদেরকে যখন সময় দেওয়ার কথা তখন সময় না দিয়ে তাদেরকে নষ্ট হয়ে যেতে দিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গিয়ে দেখা গেল আপনার ব্যবসাটা আর সফল হল না বা আপনার বাড়তি চাকরিটা বেশিদিন থাকলো না। মাঝখান থেকে আপনার আমও গেল, ছালাও গেল। কিন্তু এসব কিছু না করে আপনি যদি আপনার প্রথম চাকরিটা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতেন, আল্লাহ্‌র প্রতি আস্থা রাখতেন, কাজের বাইরে যতটুকু সময় পাচ্ছেন তা ইসলাম শিখে, নিজের পরিবারকে সময় দিয়ে পার করতেন, তাহলে হয়তো প্রথম চাকরিতেই আপনি পদোন্নতি পেতেন, সংসারে শান্তি পেতেন, নিজের এবং পরিবারের জন্য জান্নাত নিশ্চিত করতে পারতেন।

মনে রাখবেন শয়তান সবসময় আপনাকে আরও চাওয়ার, আরও পাবার জন্য উৎসাহ দিবে। আপনার জীবনে যতই থাকুক, আপনি আরও চাইবেন, আপনার সবসময় আরও কিছু পাবার একটা জেদ থাকবে। কারণ আপনি যখন আপনার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন, তখন আপনি ধিরস্থির হয়ে যাবেন এবং আল্লাহ্‌র কথা ভাবা শুরু করবেন। যার ফলে আপনার ভেতরে প্রশান্তি আসবে এবং তা আপনার পরিবারের মধ্যে ছড়িয়ে পরবে। তখন আপনার পরিবারের মধ্যে আর অশান্তি হবে না। আপনার ছেলে মেয়ে গুলো সুস্থ পরিবারে বড় হয়ে আদর্শ মানুষ হবে। তখন তারা সমাজের মধ্যে সুখ, শান্তি ছড়িয়ে দিবে। শয়তান কোনভাবেই চায় না এর কোনোটাই হোক। তাই যেভাবেই হোক শয়তান কখনও আপনাকে জীবনে ধিরস্থির হয়ে, নিজেকে নিয়ে ভাবার, আল্লাহকে নিয়ে ভাবার, পরিবারকে নিয়ে ভাবার সুযোগ হতে দিবে না। এর সবচেয়ে মোক্ষম উপায় হল, আপনাকে একটা নতুন মডেলের টয়োটা গাড়ি কেনার জন্য পাগল করে দেওয়া। একটা নতুন মডেলের Intel i7 ল্যাপটপ কিনে লোকজনকে দেখানোর জন্য অস্থির করে দেওয়া। ২০ ইঞ্চি টিভিটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফেলে দিয়ে একটা ৪০ ইঞ্চি টিভি কেনার জন্য তাগাদা দেওয়া, যেন আপনি আপনার প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধবের সামনে মুখ দেখাতে পারেন। শয়তানের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে আপনাকে:

আল্লাহ্‌র কথা ভুলিয়ে দেওয়া

কিছু মানুষ আছে যাদের উপর শয়তান পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে। এধরনের মানুষের চিন্তা-ভাবনা, কাজকর্ম, অনুভুতি, আবেগ – সবকিছুই শয়তানের দখলে চলে গেছে। এরা কথা বললে খারাপ কথা বলে যা শুনলে মানুষ কষ্ট পায়, বিভ্রান্ত হয়ে যায়, মানুষে মানুষে সমস্যা তৈরি হয়। এদের কাজগুলো বেশিরভাগই হারাম কাজ। যেমন টিভি দেখলে এরা দেখে তারকাদের সাক্ষাতকার, মিউজিক শো, ড্যান্স কম্পিটিশন, নানা ধরণের অসুস্থ সিরিয়াল। মুভি দেখলে দেখে সব মারামারি, খুনাখুনি, হরোর মুভি, না হয় হারাম প্রেম-ভালবাসা, পরকীয়ার মুভি। খবরের কাগজে এরা সব হারাম খবর পড়ে – কে কবে কাকে কি গালি দিলো, কে কাকে ধর্ষণ করলো, কোন মডেলের ছবিতে শরীরের কতখানি দেখা যায়। কম্পিউটারে বসলে এরা চুরি করা সফটওয়্যার ব্যবহার করে। ইন্টারনেটে গেলে এরা বেশিরভাগ সময় পর্ণ, সিনেমা, সিরিয়াল; না হয় ফেইসবুকে পরকীয়া, অবৈধ মেলামেশা, ডেটিং সাইটে মিথ্যা যোগ্যতা দিয়ে অন্যদেরকে পটানোর চেষ্টা করে। মোবাইল ফোনে বন্ধু বান্ধবের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গীবত, এর নামে ওকে লাগানো, গোপন খবর ফাঁস করে দেওয়া। এভাবে এরা প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠার পর থেকে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত যত ধরণের শয়তানী কাজ করা যায়, তার সবই করে। এরা তাদের মস্তিস্কের নিয়ন্ত্রণ শয়তানের হাতে দিয়ে দিয়েছে। তাদের চালকের আসনে আর তার বিবেক বসে নেই, বসে আছে শয়তান। এদের সম্পর্কে আল্লাহ্‌ বলেছেনঃ

শয়তান এদের উপরে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে এবং তাদেরকে আল্লাহ্‌র কথা ভুলিয়ে দিয়েছে। এরা শয়তানের দল। সাবধান! এই শয়তানের দল একদিন ধ্বংস হয়ে যাবেই। [মুজাদিলা ৫৮:১৯]

এই ধরণের মানুষদের সম্পর্কে সাবধান। আল্লাহ্‌ এদেরকে শয়তানের দল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এরা আর সাধারণ মানুষ নেই। আল্লাহ্‌র দৃষ্টিতে এরা মানুষরূপী শয়তান। সে আপনার বাবা-মা, ভাইবোন, ছেলে-মেয়ে যেই হোক না কেন, সাবধানে থাকবেন যেন তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে বা তাদের সাথে তাল মিলিয়ে থাকতে গিয়ে আপনি আল্লাহকে সন্তুষ্ট রাখার কথা ভুলে না জান, আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে কাজ করা শুরু না করেন। আপনাকে সবসময় মনে রাখতে হবে, আপনি পৃথিবীতে এসেছেন আল্লাহকে খুশি রেখে নিজে ভালো থাকার জন্য। আল্লাহ্‌র বিনিময়ে অন্যদেরকে খুশি রাখার জন্য নয়। তাই কখনও আপনার নষ্ট হয়ে যাওয়া স্বামী বা স্ত্রীর জন্য নিজের জীবন শেষ করে দিবেন না। কখনও বাবা-মার অন্যায়ের সমর্থনে  নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে শেষ করবেন না। মানুষরূপী শয়তান বসের হয়ে জঘন্য কাজ করে নিজের উপরে আল্লাহ্‌র আক্রমণ ডেকে আনবেন না। এদের কাছ থেকে সসন্মানে সরে আসুন,

কারণ আল্লাহ্‌ আমাদেরকে সাবধান করেছেন –

তুমি এমন কাউকে পাবে না যারা সত্যিই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ এবং শেষ বিচার দিনে বিশ্বাস করে, কিন্তু একই সাথে তাদেরকেও ভালবাসে যারা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যায়, যদিও কিনা তারা তাদেরই বাবা, ছেলে, ভাই বা নিজেদের কোন দল বা জাতির হয়। [মুজাদিলা ৫৮:২২]

source:Quraneralo.com

Translate