Thursday, October 16, 2025

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইলমের শহর ও আলী তার দরজা এই বর্ননার সনদ কি হাসান

ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইলমের শহর ও আলী (রা.) তার দরজা”।’ এ কথাটি আমাদের সমাজে বিভিন্ন ওয়াজ-মাহফিলে পথভ্রষ্ট বক্তাদের মুখে শোনা যায়। এমনকি কিছু ইসলামি বই-পুস্তকেও উল্লেখ করা হয় এবং সাধারণ মানুষও মাঝে মাঝে উদ্ধৃত করে। অথচ দুঃখজনকভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বক্তা বা লেখক এ কথাটি রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে প্রমাণিত কি না তার সত্যতা যাচাই করেন না।এতে কোনো সন্দেহ নাই যে, প্রখ্যাত সাহাবী আলী ইবনু আবি তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের একজন, হেদায়েতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের অন্তর্ভুক্ত এবং ইসলামের চতুর্থ খলিফা। তিনি এমন মহৎ সাহাবি, যাকে প্রকৃত মুমিন ছাড়া কেউ আন্তরিকভাবে ভালোবাসতে পারে না, আর মুনাফিক ছাড়া কেউ ঘৃণা করতে পারে না।তবে মনে রাখা জরুরি আলী (রা.) কিংবা অন্য কোনো নেককার বান্দার মর্যাদা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ যেভাবে নির্ধারণ করেছেন, তার বাইরে গিয়ে অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরা শরিয়তে অনুমোদিত নয়। কারণ, সৎকর্মশীলদের প্রতি ভালোবাসায় বাড়াবাড়ি মানুষকে বিদ‘আতে নিমজ্জিত করে এবং শেষ পর্যন্ত শিরকের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয় যেমনটা ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ ﷺ স্পষ্ট সতর্ক করে দিয়েছেন:“তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি থেকে সাবধান হও। নিশ্চয়ই পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছিল তাদের এই বাড়াবাড়ির কারণেই।”(সুনানে নাসায়ি হা/৩০৫৭, ইবনে মাজাহ হা/ ৩০২৯; ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদিসটি সহিহ বলেছেন)
.
❑ নিম্নে মূল হাদিস, তার উৎস এবং মান সম্পর্কে জগদ্বিখ্যাত হাদিস বিশারদগণের মতামত তুলে ধরা হলো:
.
যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুফাসসিরকুল শিরোমণি, উম্মাহ’র শ্রেষ্ঠ ‘ইলমী ব্যক্তিত্ব, সাহাবী ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) [মৃত: ৬৮ হি.] থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أَنَا مَدِينَةُ الْعِلْمِ وَعَلِيٌّ بَابُهَا ، فَمَنْ أَرَادَ الْعِلْمَ فَلْيَأْتِهِ مِنْ بَابِهِ
“আমি হলাম, ইলম বা জ্ঞানের শহর আর আলি তার দরজা। যে ব্যক্তি ইলম অর্জনের ইচ্ছে করে সে যেন তার দরজা দিয়ে প্রবেশ করে।” অর্থাৎ আলি রা. এর সূত্রে ইলম অর্জন করে।”(বর্ননাটির উৎস: আল মুজামুল কাবীর, হা/১১০৬১, মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪৬৩৭, ইবনে হিব্বান তার মাজরুহিন কিতাবে, ১/১৩০, ইবনে আদি তার তারিখ কিতাবে ৩/৬৫৫, উকাইলি তার যুয়াফা কিতাবে, ৩/১৪৯, কানযুল উম্মাল, হা/৩২৮৯০, সুনানে তিরমিজি/৩৭২৩ ইত্যাদি।]
.
তাহক্বীক: এই বর্ণনাটি বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখিত হলেও তার কোনো সূত্রই সহীহ নয়; বরং অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে এটি হাদীসের নামে রটানো মিথ্যা ও বানোয়াট। ইমাম বুখারী, আবু হাতিম, ইয়াহিয়া বিন সায়ীদ,যাহাবি (রাহিমাহুল্লাহ) প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ হাদিসটিকে ভিত্তিহীন ও জাল বলে উল্লেখ করেছেন।(বিস্তারিত জানতে দেখুন:ইবনুল জাওযী, আল-মাউদূ‘আত ১/২৬১-২৬৫; সুয়ূতী, আল-লাআলী ১/৩২৮-৩৩৬; মোল্লা আলী কারী, আল-আসরার, ৭১-৭২ পৃষ্ঠা নং ২৫১, সাখাবী, আল-মাকাসিদ, পৃষ্ঠা নং ১১৪-১১৬, যারকানী, মুখতাসারুল মাকাসিদ, পৃষ্ঠা নং ৬৯)
.
আমরা এখানে কয়েকজনের কথা উল্লেখ করছি’ যেমন: উকাইলী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:لَا يَصِحُّ فِي هَذَا الْمَتْنِ حَدِيثٌ “এই মর্মে কোনো হাদীসই সহীহ নয়।”(আয যু‘আফা; ৩/১৪৯)
.
ইবনুল কায়সারানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:هَذَا الْحَدِيثُ مِمَّا ابْتَكَرَهُ أَبُو الصَّلْتِ الهروي، وَالْكَذَبَةُ عَلَى مِنْوَالِهِ نَسَجُوا “এই হাদীসটি আবুস সালাত হারাউয়ি নিজেই উদ্ভাবন করেছে, আর মিথ্যাবাদীরা তার ধারা অনুসরণ করে রচনা করেছে।”(তাযকিরাতুল হুফফায পৃষ্ঠা: ১৩৭)
.
আবু বকর ইবনুল আরাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:هُوَ حَدِيثٌ بَاطِلٌ، النَّبِيُّ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – مَدِينَةُ عِلْمٍ وَأَبْوَابُهَا أَصْحَابُهَا؛ وَمِنْهُمْ الْبَابُ الْمُنْفَسِحُ، وَمِنْهُمْ الْمُتَوَسِّطُ عَلَى قَدْرِ مَنَازِلِهِمْ فِي الْعُلُومِ “এটি একটি বাতিল হাদীস। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন জ্ঞানের নগরী, আর তার দরজাগুলো হলেন সাহাবীগণ। তাঁদের মধ্যে আছেন কেউ প্রশস্ত দরজার মতো, আবার কেউ আছেন মধ্যম অবস্থায় তাদের জ্ঞানে অবস্থান অনুযায়ী।” (আহকামুল কুরআন; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৮৬)
.
ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:ذكر هذا الحديث ابن الجوزي في الموضوعات من طرق عدة، وجزم ببطلان الكل، وتابعه الذهبي وغيره”এই হাদীসটিকে ইবনুল জাওযী একাধিক সূত্রসহ আল‌ মাওযু‘আত‌ এ উল্লেখ করেছেন এবং সবকিছুরই বাতিল হওয়া নিশ্চিত করেছেন।ইমাম যাহাবী ও অন্যান্যরাও তাকে সমর্থন করেছেন।” (ফাওয়িদুল মাজমুআহ পৃষ্ঠা: ৩৪৯)
.
ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর আয যুআফাহ (হাদীস নং ২৯৫৫)-এ বলেছেন: “মাওযুআ (অর্থাৎ জাল হাদীস)। এ হাদীসটি তিরমিযী তাঁর সুনান (৩৭২৩) এ আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে মারফূ‘ আকারে এ বর্ণনায় এনেছেন: সুনান (৩৭২৩) কিন্তু ইমাম তিরমিযী এর পরেই মন্তব্য করেছেন: “এটি একটি গরীব (অপরিচিত) ও মুনকার (মনগড়া) হাদিস। তিনি আর আল ইলাল গ্রন্থে তিনি বলেছেন:سَأَلْتُ مُحَمَّدًا – يعني البخاري – عَنْهُ فَلَمْ يَعْرِفْهُ, وَأَنْكَرَ هَذَا الْحَدِيثَ “আমি মুহাম্মাদকে (অর্থাৎ ইমাম বুখারীকে) এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি একে চিনতে পারেননি এবং এ হাদীসটিকে অস্বীকার করেছেন।”(আল ইলাল পৃষ্ঠা: ৩৭৫)
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:
وَأَمَّا حَدِيثُ ( أَنَا مَدِينَةُ الْعِلْمِ ) فَأَضْعَفُ وَأَوْهَى ، وَلِهَذَا إنَّمَا يُعَدُّ فِي الْمَوْضُوعَاتِ الْمَكْذُوبَاتِ وَإِنْ كَانَ التِّرْمِذِيُّ قَدْ رَوَاهُ . وَلِهَذَا ذَكَرَهُ ابْنُ الْجَوْزِيِّ فِي الْمَوْضُوعَاتِ وَبَيَّنَ أَنَّهُ مَوْضُوعٌ مِنْ سَائِرِ طُرُقِهِ . وَالْكَذِبُ يُعْرَفُ مِنْ نَفْسِ مَتْنِهِ ؛ لَا يَحْتَاجُ إلَى النَّظَرِ فِي إسْنَادِهِ : فَإِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إذَا كَانَ مَدِينَةَ الْعِلْمِ ، لَمْ يَكُنْ لِهَذِهِ الْمَدِينَةِ إلَّا بَابٌ وَاحِدٌ ، وَلَا يَجُوزُ أَنْ يَكُونَ الْمُبَلِّغُ عَنْهُ وَاحِدًا ؛ بَلْ يَجِبُ أَنْ يَكُونَ الْمُبَلِّغُ عَنْهُ أَهْلَ التَّوَاتُرِ الَّذِينَ يَحْصُلُ الْعِلْمُ بِخَبَرِهِمْ لِلْغَائِبِ ، وَرِوَايَةُ الْوَاحِدِ لَا تُفِيدُ الْعِلْمَ إلَّا مَعَ قَرَائِنَ ، وَتِلْكَ الْقَرَائِنُ إمَّا أَنْ تَكُونَ مُنْتَفِيَةً ، وَإِمَّا أَنْ تَكُونَ خَفِيَّةً عَنْ كَثِيرٍ مِنْ النَّاسِ ، أَوْ أَكْثَرِهِمْ ؛ فَلَا يَحْصُلُ لَهُمْ الْعِلْمُ بِالْقُرْآنِ وَالسُّنَّةِ الْمُتَوَاتِرَةِ ؛ بِخِلَافِ النَّقْلِ الْمُتَوَاتِرِ: الَّذِي يَحْصُلُ بِهِ الْعِلْمُ لِلْخَاصِّ وَالْعَامِّ. وَهَذَا الْحَدِيثُ إنَّمَا افْتَرَاهُ زِنْدِيقٌ أَوْ جَاهِلٌ: ظَنَّهُ مَدْحًا؛ وَهُوَ مُطْرِقُ الزَّنَادِقَةِ إلَى الْقَدْحِ فِي عِلْمِ الدِّينِ – إذْ لَمْ يُبَلِّغْهُ إلَّا وَاحِدٌ مِنْ الصَّحَابَةِ .ثُمَّ إنَّ هَذَا خِلَافُ الْمَعْلُومِ بِالتَّوَاتُرِ؛ فَإِنَّ جَمِيعَ مَدَائِنِ الْمُسْلِمِينَ : بَلَغَهُمْ الْعِلْمُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ غَيْرِ طَرِيقِ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ “
“আর ‘আমি জ্ঞানের নগরী’ হাদিসটি অত্যন্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর;এই কারণেই এটিকে কেবল জাল ও মিথ্যা হাদিস হিসেবেই গণ্য করা হয়, যদিও তিরমিযি এটি বর্ণনা করেছেন। এই কারণেই ইবনুল জাওযি এটিকে তার ‘আল-মাওযু’আত’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন এবং দেখিয়েছেন যে এটি এর সকল সূত্রেই জাল। এর মিথ্যাবাদিতা মূল টেক্সট (মাতন) থেকেই বোঝা যায়; এজন্য এর সনদ যাচাই করারও প্রয়োজন পড়ে না; কারণ, যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘জ্ঞানের নগরী’ হন, তবে এই নগরীর কেবল একটি দরজা থাকা যুক্তিসঙ্গত নয়।তদুপরি, তাঁর পক্ষ থেকে দীন প্রচারের দায়িত্বও একজন মাত্র সাহাবীর ওপর সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; বরং আবশ্যক হলো তাঁর থেকে জ্ঞান প্রচারকারীরা হতে হবে তাওয়াতুরের পর্যায়ে পৌঁছানো বর্ণনাকারীগণ, যাদের খবরের মাধ্যমে অনুপস্থিত লোকদের নিকটও নিশ্চিত জ্ঞান পৌঁছে যায়। কেবল একজনের বর্ণনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত জ্ঞান দেয় না; বরং তা কেবল তখনই কার্যকর হয়, যখন বিশেষ কিছু আলামত যুক্ত থাকে। কিন্তু অনেক সময় সেই আলামতগুলো অনুপস্থিত থাকে, অথবা সেগুলো অধিকাংশ মানুষের কাছেই গোপন থেকে যায়। ফলে কুরআন ও সুন্নাহ মুতাওয়াতির (যা ব্যাপক সংখ্যক রাবী দ্বারা বর্ণিত) দ্বারা যে নিশ্চিত জ্ঞান পাওয়া যায়, তা এভাবে পাওয়া যায় না। এই হাদিসটি কোনো যিন্দীক (নাস্তিক) অথবা মূর্খ ব্যক্তিই রচনা করেছে—যে ভেবেছিল এটিকে নবী (ﷺ)-এর প্রশংসা হিসেবে উপস্থাপন করছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে এটি নাস্তিকদের জন্য দ্বীনের জ্ঞানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পথ খুলে দিয়েছে কারণ, এর দ্বারা বোঝানো হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে কেবল একজন সাহাবীই জ্ঞান প্রচার করেছেন। তাছাড়া এটি তো তাওয়াতুর দ্বারা প্রমাণিত সত্যেরও পরিপন্থী। কেননা সমগ্র মুসলিম জনপদে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে জ্ঞান পৌঁছেছে কেবল আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মাধ্যমেই নয়, বরং বহু অন্যান্য সাহাবীর বর্ণনার মাধ্যমেও।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৪১০-৪১১)
.
পরিশেষে, প্রিয় পাঠক উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইলমের শহর ও আলী (রা.) তার দরজা” এই বর্ণনার সনদ হাসান নয়; বরং অত্যন্ত দুর্বল কিংবা জাল। সম্ভবত আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহুর)-এর মর্যাদা ও মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে শিয়ারা এই হাদিসটি তৈরি করেছে। এমনকি এ উদ্দেশ্যে উক্ত হাদিস ছাড়াও তারা আরও বহু হাদিস তৈরি করেছে। প্রকৃতপক্ষে আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) অত্যন্ত মর্যাদাবান সাহাবি। তার মান-সম্মান প্রমাণের জন্য বহু বিশুদ্ধ হাদিস বিদ্যমান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সেগুলোই যথেষ্ট। সুতরাং এ জন্য কোনও জাল ও ভিত্তিহীন হাদিসের আদৌ প্রয়োজন নেই। আল্লাহ তাআলা জাল হাদিস রচনাকারীদেকে তাদের উপযুক্ত পাওনা বুঝিয়ে দিন। সুতরাং এই অপ্রমাণিত জাল ও বানোয়াট হাদিস সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করার উদ্দেশ্য ছাড়া তা বর্ণনা করা ও প্রচার করা হারাম ও কবিরা গুনাহ। কারণ জেনে-বুঝে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা/জাল হাদিস বর্ণনা করার পরিণতি জাহান্নাম। তাই তো রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বানোয়াট হাদিস বর্ণনার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী‎ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّداً فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত ভাবে আমার উপর মিথ্যা রোপ করল (মিথ্যা হাদিস বর্ণনা করল), সে যেন জাহান্নামে নিজের ঠিকানা করে নিলো।”(সহিহ বুখারী হা/ ৩৪৬১ মিশকাত হা/১৯৮) অপর বর্ননায় মুগীরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন,আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, يَقُولُ إِنَّ كَذِبًا عَلَيَّ لَيْسَ كَكَذِبٍ عَلَى أَحَدٍ مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنْ النَّارِ . আমার প্রতি মিথ্যারোপ করা অন্য কারো প্রতি মিথ্যারোপ করার মত নয়। যে ব্যক্তি আমার প্রতি মিথ্যারোপ করে সে যেন অবশ্যই তার ঠিকানা জাহান্নামে করে নেয়।”(সহীহ বুখারী হা/১২৯১, মুসলিম হা/৯৩৩)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:

জুয়েল মাহমুদ সালাফি। 

সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ তুসতারী রাহিমাহুল্লাহ এর কিছু নাসীহাহ

 1: সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ তুসতারী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত:২৮৩ হি.] বলেন, النَّاسُ كُلُّهُمْ سُكَارَى إِلَّا الْعُلَمَاءُ، وَالْعُلَمَاءُ كُلُّهُمْ حَيَارَى إِلَّا مَنْ عَمِلَ بِعِلْمِهِ، “আলেমগণ ছাড়া সকল মানুষ দিকভ্রান্ত। আর অর্জিত ইলম অনুযায়ী আমলকারী ছাড়া সকল আলেম দিশেহারা”।(আব্দুর রঊফ মুনাভী,ফায়যুল ক্বাদীর (মিসর: আল-মাকাবাতুত তিজারিইয়াহ আল-কুবরা, ১ম মুদ্রণ, ১৩৫৬হি.) ৫/৫১০) . এখানে সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ তুসতারী (রাহিমাহুল্লাহ) মানুষের জ্ঞান, অন্তরের অবস্থা ও আমলের পারস্পরিক সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মর্ম হলো—অধিকাংশ মানুষ দুনিয়ার মোহ, লোভ, কামনা-বাসনা ও নফসের খেয়ালের পেছনে ছুটতে ছুটতে প্রকৃত সত্য থেকে বিমুখ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় তারা হয়ে যায় মাতালের মতো—যারা না বাস্তবতাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারে, না সঠিক পথে অগ্রসর হতে সক্ষম হয়।কিন্তু আলেমগণ সাধারণ মানুষের তুলনায় অধিকতর সচেতন। তারা হক ও বাতিল, সত্য ও মিথ্যার ব্যবধান চিনতে পারে। তবুও কেবল জ্ঞান অর্জনই যথেষ্ট নয়; কারণ অনেক আলেমও দুনিয়ার চাপ, মতবিরোধ কিংবা অহংকারের কারণে পথ হারিয়ে ফেলতে পারেন।অতএব, প্রকৃত সফল আলেম তারা-ই, যারা প্রাপ্ত জ্ঞানকে আমলে রূপান্তরিত করে আল্লাহভীতির সাথে জীবন গড়ে তোলে। তারাই সত্যিকার অর্থে হেদায়াতপ্রাপ্ত; তারা বিভ্রান্ত মাতালের মতো নয়, বরং আল্লাহর সান্নিধ্যে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে অটল যাত্রী। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।

দ্বিতীয় বিবাহের ক্ষেত্রে কি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া আবশ্যক

 প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিবাহের ক্ষেত্রে কি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া আবশ্যক? যদি কেউ বলেন যে প্রথম স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ বৈধ নয়, তাহলে এই বিষয়ে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর:
.
প্রথমত দ্বিতীয় বিবাহ করার সময় প্রথম স্ত্রী থেকে অনুমতি নেওয়া আবশ্যক কিনা তা দুইটি ভিন্ন পরিস্থিতিতে বিবেচনা করা যেতে পারে।
.
▪️প্রথম অবস্থা: যদি কোনো নারী প্রথম বিবাহের সময় শর্তারোপ করেন যে, স্বামী জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর অন্য কোনো নারীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন না, কিংবা অন্ততপক্ষে তার অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারবেন না—এবং স্বামী যদি এ শর্ত মেনে নিয়ে তার সাথে বিবাহ সম্পাদন করেন, তাহলে এ শর্তের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা তার দায়িত্ব হবে। অতএব তিনি যদি স্ত্রীর সঙ্গে সমঝোতা ও অনুমতি ব্যতিরেকে দ্বিতীয় বিবাহ করেন, তবে তিনি একদিকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে গুনাহগার হবেন, অন্যদিকে প্রথম স্ত্রীর জন্য বৈবাহিক সম্পর্ক বাতিল (ফাসখ) করার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। ফলে স্ত্রী চাইলে স্বামীর সাথে বসবাস করতে পারেন অথবা বিচ্ছেদ নিতে পারেন। কারণ স্বামী তার চুক্তি লঙ্ঘন করেছেন অথচ পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন:”আর অঙ্গীকার পূর্ণ কর, নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”(সূরা বনি ইসরাইল: ১৭/৩৪)। অপর আয়াতে আল্লাহ বলেন,”হে মুমিনগণ, তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর।”(সূরা মায়েদাহ: ৫/১)।উক্ত আয়াতের তাফসিরে যায়দ ইবনে আসলাম (রহ.) বলেছেন, এখানে ঐসব চুক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যা মানুষ পরস্পরে একে অন্যের সাথে সম্পাদন করে। যেমন বিবাহ-শাদী ও ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি ইত্যাদি। [তাফসীরে বাগভী সূরা মায়েদার ১ নং আয়াতের তাফসির]। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘শর্তসমূহের মধ্যে যা পূর্ণ করার সর্বাধিক দাবী রাখে তা হল- সেই শর্ত যার দ্বারা তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের হালাল করেছ।’(সহীহ বুখারী, হা/২৭২১, ৫১৫১; মুসলিম, হা/১৪১৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৩০৪)।রাসূল (ﷺ) আরো বলেছেন, মুসলিমগণ তাদের পরস্পরের শর্তানুযায়ী কাজ করবে যদি তা হালাল হয়। (মুস্তাদরাক হাকেম হা/২৩১০ সহীহুল জামে‘ হা/৬৭১৫)। রাসূল (ﷺ) আরো বলেছেন, মুসলিমগণ পরস্পরের মধ্যে যে শর্ত করবে, তা অবশ্যই পালন করতে হবে। কিন্তু যে শর্ত ও চুক্তি হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করবে তা জায়েয হবে না।’(আবু দাঊদ হা/৩৫৯৪; তিরমিযী হা/১৩৫২; মিশকাত হা/২৯২৩)।
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,إذا اشترط لها أن لا يخرجها من دارها أو بلدها ، أو لا يسافر بها ، أو لا يتزوج عليها : فهذا يلزمه الوفاء به ، فإن لم يفعل فلها فسخ النكاح ، روي هذا عن عمر وسعد بن أبي وقاص وعمرو بن العاص رضي الله عنهم “যদি পাত্রী তার জন্য শর্ত দেয় যে বিবাহের পর স্বামী তাকে তার বাড়িতে রাখতে হবে অন্য কোথাও নিতে পারবে না, তার সাথে দূরে কোথাও ভ্রমন করবে না।স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করবেনা এবং সে তার সাথে কোন ষড়যন্ত্র করবেনা তাহলে তাকে অবশ্যই তা পূরণ করুন, এবং যদি তিনি তা না করেন, তবে স্ত্রীর বিবাহ বাতিল করার অধিকার রয়েছে।”(ইমাম ইবনে কুদামাহ আল-মুগনী; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৪৮৩)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:إذا اشترطت أن لا يتزوج عليها فإن هذا يجوز .وقال بعض العلماء : إنه لا يجوز ؛ لأنه حجر على الزوج فيما أباح الله له ، فهو مخالف للقرآن : (فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلاثَ وَرُبَاعَ) النساء/3 .فيقال في الجواب على ذلك : هي لها غرض في عدم زواجه ، ولم تعتد على أحد ، والزوج هو الذي أسقط حقه ، فإذا كان له الحق في أن يتزوج أكثر من واحدة ، أسقطه ، فما المانع من صحة هذا الشرط ؟! ولهذا ؛ فالصحيح في هذه المسألة ما ذهب إليه الإمام أحمد رحمه الله من أن ذلك الشرط صحيح“যদি স্ত্রী এই শর্ত আরোপ করেন যে স্বামী তার সঙ্গে বিবাহের বাইরে আর কোনো নারীকে বিবাহ করবেন না, তবে এটি বৈধ। যদিও কিছু আলেম বলেছেন যে এটি বৈধ নয়, কারণ এতে স্বামীকে এমন বিষয়ে বাধ্য করা হয়েছে যা আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য বৈধ। তারা কুরআনের আয়াত উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন:”অতএব তোমরা নারীদের মধ্যে তোমাদের পছন্দমতো বিয়ে করো– দুই, তিন অথবা চারজনকে।”(সূরা নিসা:৩) এই যুক্তির জবাবে বলা যায় যে, বহুবিবাহ না করার বিষয়ে স্ত্রীর আরোপিত শর্তের একটি উদ্দেশ্য রয়েছে এবং এতে তিনি কারও প্রতি কোনো অন্যায় করেননি। বরং স্বামী নিজেই তার বৈধ অধিকার ত্যাগ করেছেন। সুতরাং, যেহেতু স্বামী তার একাধিক স্ত্রীর অধিকার রাখতে পারার ক্ষমতা রাখে, কিন্তু স্বেচ্ছায় তা ত্যাগ করছেন,তাহলে এই শর্তের বৈধ হওয়ার পথে বাধা কোথায়?!অতএব,এই মাসয়ালার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য ও সঠিক মত হলো ইমাম আহমদের (রহঃ) মত: স্ত্রীর দ্বারা আরোপিত এই শর্ত বৈধ ও গ্রহণযোগ্য।”(ইবনু উসাইমীন; আশ-শারহুল মুমতি; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ২৪৩) [এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনাসহ আমরা স্বতন্ত্র একটি আর্টিকেল লিখবো ইনশাআল্লাহ]
.
▪️দ্বিতীয় অবস্থা: যদি কোনো নারী প্রথম বিবাহের সময় এমন কোনো শর্ত আরোপ না করেন যে—স্বামী তাঁর জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর অন্য কোনো নারীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন না—তাহলে দ্বিতীয় বিবাহের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া ওয়াজিব নয়। বরং স্বামী যদি শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম হন, তবে তাঁর জন্য দ্বিতীয় বিবাহ করা বৈধ,এতে কোনো আপত্তি নেই।অতএব, যদি কেউ এ দাবি করেন যে দ্বিতীয় বিবাহের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া আবশ্যক—তাহলে তাঁর দায়িত্ব হলো এ দাবির পক্ষে সুস্পষ্ট শরীয়তসম্মত দলিল উপস্থাপন করা। কেননা, শরীয়তের একটি মূলনীতি হলো: কোনো শর্ত আরোপকারীই তার প্রমাণ পেশ করবে। বিপরীতে, যে ব্যক্তি এ শর্তকে অস্বীকার করেন, তিনি মূলনীতির সাথেই একমত হচ্ছেন। আর মূলনীতি হলো: শর্ত তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তার প্রমাণ পাওয়া যায়; প্রমাণ ছাড়া নয়।কুরআন সুন্নাহ’র একাধিক স্থানে এই মূলনীতির দলিল পাওয়া যায়। এর মধ্যে প্রধান হলো: মহান আল্লাহ বলেন:وَ قَالُوۡا لَنۡ یَّدۡخُلَ الۡجَنَّۃَ اِلَّا مَنۡ كَانَ هُوۡدًا اَوۡ نَصٰرٰی ؕ تِلۡكَ اَمَانِیُّهُمۡ ؕ قُلۡ هَاتُوۡا بُرۡهَانَكُمۡ اِنۡ كُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ
“আর তারা বলে, ইয়াহুদী অথবা নাসারা ছাড়া অন্য কেউ কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না’। এটা তাদের মিথ্যা আশা। বলুন, “যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে তোমাদের প্রমাণ পেশ কর”।(সূরা বাকারা: ১১১) অপর আয়াতে মহান আল্লাহ আরও বলেন:أَمِ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ آلِهَةً ۖ قُلْ هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ ۖ هَٰذَا ذِكْرُ مَن مَّعِيَ وَذِكْرُ مَن قَبْلِي“তারা কি আল্লাহ ছাড়া উপাস্য গ্রহণ করেছে? বলুন: তোমরা তোমাদের প্রমাণ পেশ করো।”(সূরা আম্বিয়া: ২৪) এখানে মূর্তিপূজকদের দাবির খণ্ডনে সরাসরি তাদের কাছ থেকে প্রমাণ চাওয়া হয়েছে।
.
ইমাম তিরমিজি (রাহিমাহুল্লাহ) সুনানে তিরমিজিতে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন যার শিরোনাম হলো;باب مَا جَاءَ فِي أَنَّ الْبَيِّنَةَ عَلَى الْمُدَّعِي وَالْيَمِينَ عَلَى الْمُدَّعَى عَلَيْهِ
অর্থ: “বাদীর দায়িত্ব হচ্ছে সাক্ষ্য-প্রমাণ হাযির করা এবং বিবাদীর দায়িত্ব হচ্ছে শপথ করা। “অতঃপর তিনি হাদিস নিয়ে এসেছেন, আমর ইবনু শুআইব (রাহিমাহুল্লাহ) হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এক ভাষণে বলেছেনঃ:الْبَيِّنَةُ عَلَى الْمُدَّعِي وَالْيَمِينُ عَلَى الْمُدَّعَى عَلَيْهِ “বাদীর দায়িত্ব হচ্ছে সাক্ষী-প্রমাণ হাযির করা এবং বিবাদীর দায়িত্ব হচ্ছে শপথ করা।” (সুনানে তিরমিজি হা/১৩৪১; ইমাম আল-আলবানী ইরওয়ুল গালীল হা/১৯৩৮)
.
সহীহ বুখারীর অপর এক বর্ননায় এসেছে, ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: (لَوْ يُعْطَى النَّاسُ بِدَعْوَاهُمْ لاَدَّعَى نَاسٌ دِمَاءَ رِجَالٍ وَأَمْوَالَهُمْ وَلَكِنَّ الْيَمِينَ عَلَى الْمُدَّعَى عَلَيْهِ) “যদি লোকের দাবি অনুসারে তাদের দিয়ে দেয়া হতো তবে কোন কোন লোক অপর ব্যক্তির জান-মাল দাবি করে বসতো। তাই বিবাদীর জন্য শপথ নেয়ার বিধান রয়েছে।”(সহীহ বুখারী হা/৪৫৫২; সহীহ মুসলিম হা/৪৫৬৭)
.
বিশেষত ইসলামি শরিয়ত সুস্পষ্টভাবে বিবাহসংক্রান্ত বহু শর্ত নির্ধারণ করেছে। কিন্তু সেই শর্তগুলোর কোথাও উল্লেখ নেই যে, দ্বিতীয় বিবাহ করতে হলে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি আবশ্যক। বরং বাস্তবে দেখা যায়,রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একাধিক বিবাহ করেছেন, অথচ কোথাও প্রমাণ পাওয়া যায় না যে তিনি তাঁর স্ত্রীদের কারও অনুমতি নিয়েছিলেন। একইভাবে, সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) একাধিক বিবাহ করেছেন, কিন্তু তাঁদের ক্ষেত্রেও এ ধরনের কোনো অনুমতির শর্তের উল্লেখ নেই।অতএব, শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি সুস্পষ্ট প্রমাণ যে দ্বিতীয় বিবাহ করতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া ফরজ নয়। তবে সন্দেহাতীতভাবে উত্তম ও শোভনীয় হলো—যদি কেউ দ্বিতীয় বিবাহ করতে চায়, তবে সে আগে প্রথম স্ত্রীকে অবহিত করবে এবং তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করবে। কারণ, এতে পারিবারিক শান্তি-সৌহার্দ্য বজায় থাকে এবং পরিণতিও ইতিবাচক হয়। তবে এটিকে ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক বিধান বলা যাবে না।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে যখন দ্বিতীয় বিয়েতে প্রথম স্ত্রীর সম্মতি আবশ্যক কিনা তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তারা উত্তর দিয়েছিলেন:
ليس بفرض على الزوج إذا أراد أن يتزوج ثانية أن يرضي زوجته الأولى ، لكن من مكارم الأخلاق وحسن العشرة أن يطيِّب خاطرها بما يخفف عنها الآلام التي هي من طبيعة النساء في مثل هذا الأمر ، وذلك بالبشاشة وحسن اللقاء وجميل القول وبما تيسّر من المال إن احتاج الرضى إلى ذلك “
“স্বামী যদি দ্বিতীয় বিয়ে করতে চান, তবে প্রথম স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করা তার জন্য ফরয (আবশ্যিক) নয়। তবে এটি নিঃসন্দেহে সদাচরণ ও উত্তম চরিত্রের অংশ যে, স্বামী এমনভাবে তার মনকে প্রফুল্ল করার চেষ্টা করবেন, যাতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্ত্রীর স্বাভাবিক দুঃখ-কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়। আর তা হতে পারে— হাসিমুখে ভালো ব্যবহার, আন্তরিক ও কোমল কথাবার্তা, এবং প্রয়োজনে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু আর্থিক অনুগ্রহ প্রদানের মাধ্যমে।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ৫৩)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “যদি কোনো পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায়, তবে তার কি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া শর্ত? এবং তার অজান্তে বিয়ে করলে তার বিধান কী?
উত্তরে শাইখ বলেন:
أعتقد أنه لو استأذن منها لأبت أن يتزوج ، ولكن ليس من شرط النكاح أن يستأذن الزوجة الأولى بل حتى لو استأذنها وأَبَتْ فله الحق أن يتزوج ، ولكن مع هذا أرى أنه ينبغي أن يشاورها ويقنعها حتى تقتنع بذلك وتطمئن ، ويبين العلة التي من أجلها يريد أن يتزوج ، فإذا جاءتها الزوجة الجديدة جاءتها وهي على اطمئنانٍ بها وعلى علمٍ بها وعلى رضىً بها ، وحينئذٍ يمكن أن تعيش الزوجتان عيشةً حميدة بدون تنافرٍ ولا تباغض ، فمن أجل مراعاة هذه الفوائد ينبغي أن يستأذنها ويخبرها ، وأما أن يكون ذلك واجباً فليس بواجب ” .فسئل الشيخ”: لو أخفى عنها هذا الزواج ؟ فأجاب : ” لا حرج عليه ” .
“আমি মনে করি যে, যদি সে (স্বামী) তার কাছ থেকে (প্রথম স্ত্রীর কাছ থেকে) অনুমতি চাইত, তাহলে হয়তো সে (স্ত্রী) তার (স্বামীর দ্বিতীয়) বিয়েতে অসম্মতি জানাতো। তবে প্রথম স্ত্রীর কাছ থেকে অনুমতি চাওয়া বিবাহের শর্ত নয়; বরং স্বামী অনুমতি চাইলেও এবং সে (স্ত্রী) অসম্মতি জানালেও, তার (স্বামীর) বিয়ে করার অধিকার রয়েছে। তা সত্ত্বেও, আমি মনে করি তার উচিত হবে প্রথম স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করা এবং তাকে বোঝানো, যতক্ষণ না সে এতে সন্তুষ্ট ও আশ্বস্ত হয়। এবং সে যেন সেই কারণও পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করে, যার কারণে সে বিবাহ করতে চায়। ফলে, যখন নতুন স্ত্রী তার কাছে আসবে, তখন সে (প্রথম স্ত্রী) তা জানার পর, আশ্বস্ত মনে ও সন্তুষ্টি সহকারে তাকে গ্রহণ করবে।এর ফলে দুই স্ত্রী শান্তিপূর্ণভাবে, কোনো বিরোধ বা বিদ্বেষ ছাড়া একসাথে জীবনযাপন করতে পারবে। সুতরাং এসব কল্যাণকর ফলাফল অর্জনের জন্য স্বামীর উচিত হবে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি চাওয়া ও তাকে জানানো। কিন্তু একে যে ওয়াজিব (অবশ্য কর্তব্য) বলা যাবে না।”এরপর শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো: “যদি স্বামী দ্বিতীয় বিবাহটি প্রথম স্ত্রীর কাছ থেকে গোপন রাখে? তিনি উত্তর দিলেন: এতে তার উপর কোনো দোষ নেই।”(ইবনু উসাইমীন, ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব, শাইখের ওয়েবসাইট থেকে সংকলি) গৃহীত: ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া নং-২১৮৭৫৯)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অযু এবং গোসলে কতটুকু পানি খরচ করতেন

 প্রশ্ন: রাসূল (ﷺ) অযু এবং গোসলে কতটুকু পানি খরচ করতেন? সংক্ষেপে ওজুর বিশুদ্ধ সুন্নাতি পদ্ধতি জানতে চাই।

▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর রাসূল (ﷺ) অযু এবং গোসলে কতটুকু পানি খরচ করতেন এ বিষয়ে প্রখ্যাত সাহাবী আনাস ইবনু মালিক (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) [মৃত: ৯৩ হি.] বলেন,كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَتَوَضَّأُ بِالْمُدِّ وَيَغْتَسِلُ بِالصَّاعِ إِلَى خَمْسَةِ أَمْدَادٍ ‏.‏”রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম,এক মুদ্দ পানি দিয়ে ওজু করতেন, এবং এক সা’ থেকে পাঁচ মুদ্দ পরিমাণ পানি দিয়ে গোসল করতেন।”(সহীহ বুখারী হা/২০১;সহীহ মুসলিম হা/৬৩০) হাদীসে কানা’ (كان) শব্দটি প্রমাণ করে যে রাসূল (ﷺ) নিয়মিত এভাবেই পানি খরচ করতেন।
.
ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুল্লাহ) আম্মাজান আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোসল করতেন তিন মুদ অথবা তার নিকটবর্তী মুদ পানি ধারণ ক্ষমতা রাখে এমন পাত্র থেকে গোসল করতেন। অপর বর্ননায় আম্মিজান ‘আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহা) [মৃত: ৫৭/৫৮ হি.] বলেন,”আমি ও রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটা পাত্র থেকে পানি নিয়ে গোসল করতাম। যে পাত্রকে (اَلْفِرَقَ) ফিরাক বলা হয়, আর তাতে তিন (صَاعً) ‘সা’ (সাড়ে সাত কেজি) পরিমান পানি ধারণ ক্ষমতা রয়েছে।”(বুখারী হা/২০১, মুসলিম হা/ ৩২৫; ফাতহুল বারী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৭২)
.
“মুদ্দ” হলো “সা’”-এর এক-চতুর্থাংশ। এক সা’ প্রায় ২.৫ কেজি থেকে ৩ কেজি ওজনের সমান। এক মুদ্দ প্রায় ৬০০–৭০০ গ্রামের মত, এবং চার মুদ্দ মিলে এক সা’ হয়। লিটার অনুযায়ী হিসাব করলে, এক মুদ্দ প্রায় ০.৭৫ লিটার পানি সমান। সুতরাং,ওজুর জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ যে পরিমাণ পানি ব্যবহার করতেন, তা আনুমানিক ৬০০–৭০০ গ্রামের সমান। যেমনটি আমরা উল্লেখ করেছি,এটিকে সহজভাবে দুই হাতের পূর্ণ অঞ্জলির পানির পরিমাণের সঙ্গে তুলনা করাও সম্ভব।মূলকথা হলো صاع ‘সা’ ৫ মুদের বেশী হবে না এবং ৪ মুদের কম হবে না।
.
ফিরোজাবাদী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেনوالمُدُّ، بالضم: مِكْيالٌ، وهو رِطْلانِ، أو رِطْلٌ وثُلُثٌ، أو مِلْءُ كَفَّيِ الإِنسانِ المُعْتَدِلِ إذا مَلأَهُما وَمَدَّ يَدَهُ بهما، وبه سُمِّيَ مُدًّا، وقد جَرَّبْتُ ذلك فَوَجَدْتُهُ صحيحاً”মুদ্দ যেটি পেশ সহ উচ্চারিত হয়, একটি পরিমাপের একক। এটি দুই রিতল, অথবা এক রিতল ও এক-তৃতীয়াংশ,অথবা একজন মধ্যম আকৃতির মানুষের দুই হাতের পূর্ণ মুঠোর পরিমাণ, যা সে উভয় হাত ভরে ভরে টেনে ধরে।এ কারণেই এটিকে ‘মুদ্দ’ বলা হয়েছে।আমি নিজে তা পরীক্ষা করেছি এবং সঠিক পেয়েছি।”(আল-কামুস আল-মুহীত; পৃষ্ঠা: ৩১৮)
.
জেনে রাখা উচিত যে, অযু ও গোসলের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি শরিয়তে বাধ্যতামূলকভাবে নির্ধারিত নেই। বরং প্রত্যেক ব্যক্তি তার প্রয়োজন অনুসারে পানি ব্যবহার করবে। তবে ওযু বা গোসলকারীর কর্তব্য হলো পানি ব্যবহারে সংযম অবলম্বন করা এবং অপচয় থেকে বিরত থাকা। বিশেষ করে অযুর ক্ষেত্রে “এক মুদ্দ” পানিতে সীমাবদ্ধ থাকা আবশ্যক নয়। বরং করণীয় হলো প্রতিটি অঙ্গকে তিনবার ধোয়া এবং এমনভাবে ধোয়া যাতে অযুর অঙ্গ গুলো পূর্ণভাবে পানিতে ভিজে যায়।অযু করতে গিয়ে যদি কখনো এক মুদ্দের বেশি পানি ব্যবহৃত হয়ে যায়—বিশেষত নলকূপ বা কল থেকে অযু করার সময়, যেখানে ঠিক মুদ্দের হিসাব মেনে চলা প্রায় অসম্ভব—তাহলেও এতে কোনো দোষ নেই। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন প্রতিটি অঙ্গ তিনবারের বেশি ধোয়া না হয়। কারণ তিনবারের বেশি ধোয়া অপচয় ও সীমালঙ্ঘনের অন্তর্ভুক্ত।যেমন-আমর ইবনু শু‘আয়ব (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি (দাদা) বলেন যে,جَاءَ أَعْرَابِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْأَلُهُ عَنِ الْوُضُوءِ فَأَرَاهُ ثَلَاثًا ثَلَاثًا ثُمَّ قَالَ: «هَكَذَا الْوُضُوءُ فَمَنْ زَادَ عَلَى هَذَا فَقَدْ أَسَاءَ وَتَعَدَّى وَظَلَمَ”এক বেদুঈন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তাঁকে উযু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায়, তিনি তাকে তিন তিনবার করে (উযূর প্রতিটি অঙ্গ ধুয়ে) দেখালেন। অতঃপর বললেন, এই হলো ওযূ। যে ব্যক্তি এর চেয়ে বাড়িয়ে করলো সে মন্দ করলো, সীমালঙ্ঘন করলো ও যুলম করলো।”(সুনানে নাসায়ী হা/১৪০, ইবনু মাজাহ হা/৪২২, সিলসিলা সহীহাহ হা/২৯৭০)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,يشترط في غسل الأعضاء جريان الماء عليها، فإن أمسه الماء ولم يجر: لم تصح طهارته اتفق عليه الأصحاب …..”অঙ্গ ধোওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত হলো এর উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়া। যদি পানি শুধু স্পর্শ করে কিন্তু প্রবাহিত না হয়, তবে তার পবিত্রতা (ওজু বা গোসল) সহীহ হবে না এ ব্যাপারে সকল আসহাব একমত।”(নববী আল মাজমূ খণ্ড: ১;পৃষ্ঠা: ৪৯১)
.
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেছেন:أجمع المسلمون على أن الماء الذي يجزئ في الوضوء والغسل غير مقدر، بل يكفي فيه القليل والكثير؛ إذا وجد شرط الغَسل، وهو جريان الماء على الأعضاء”সমস্ত মুসলিম ঐকমত্যে পৌঁছেছেন যে, ওজু ও গোসলে যে পানি যথেষ্ট হবে তার কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ শরীয়তে বেঁধে দেওয়া হয়নি। বরং অল্প বা বেশি যেকোনো পরিমাণেই যথেষ্ট হবে, শর্ত এই যে পানি অঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে হবে।”(শারহু সহীহ মুসলিম; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২০)
.
তিনি সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যায় আরও বলেছেন:”أَجْمَعَ الْعُلَمَاءُ عَلَى كَرَاهَةِ الزِّيَادَةِ عَلَى الثَّلَاثِ ، وَالْمُرَادُ بِالثَّلَاثِ الْمُسْتَوْعِبَةِ لِلْعُضْوِ، وَأَمَّا إِذَا لَمْ تَسْتَوْعِبِ الْعُضْوَ إِلَّا بِغَرْفَتَيْنِ ، فَهِيَ غَسْلَةٌ وَاحِدَةٌ”আলেমগণ সর্বসম্মত যে, তিনবারের (ধোয়া) বেশি করা মাকরূহ। আর তিনবার বলতে বোঝানো হচ্ছে যে, তিনবারে পুরো অঙ্গ ধোয়া হয়ে গেছে। কিন্তু যদি একটি অঙ্গ পূর্ণ ধোয়া না হয় একবারে, বরং দুইবার পানি নেওয়ার মাধ্যমে অঙ্গ ভিজে যায়, তবে সেটি একবার ধোয়ার গণ্য হবে।”(শারহুন নববী আলা মুসলিম; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১০৯)
.
শাইখ আবু উমর দুবইয়ান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেছেন:
أما بالنسبة للعدد، فالزيادة على الثلاث: إن لم تكن محرمة، فهي مكروهة كراهة شديدة؛ لأنه قد ورد النهي عن الزيادة على الثلاث، وهو أكثر ما فعله رسول الله – صلى الله عليه وسلم -.وأما بالنسبة لمقدار الماء المستعمل في الوضوء، فلم يأت حد من الشرع، بحيث لا يتجاوزه الإنسان، والناس يختلفون في هذا بدانة ونحافة، والمياه في عصرنا تأتي عن طريق الصنابير التي تدفع الماء دفعاً، لا يمكن معه التقيد بالمقدار الوارد؛ إلا أن يأخذ الإنسان الماء في إناء، ويغلق الصنبور، وقد لا يتوفر الإناء في كل مكان. والأحاديث الواردة في مقدار وضوء النبي – صلى الله عليه وسلم – كلها تدل على أن كمية الماء ليس فيها حد بمقدار معين، وإنما الأمر تقريبي”
“সংখ্যার ক্ষেত্রে তিনবারের বেশি করা যদি হারামও না হয়, তবে তা খুবই মাকরূহে তাহরীমী,কারণ তিনবারের বেশি করা থেকে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবচেয়ে বেশি তিনবারই করেছেন। পানির পরিমাণের ক্ষেত্রে: শরীয়তে ওজুর পানির কোনো নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়নি, যা অতিক্রম করা যাবে না। মানুষের দেহ মোটা-পাতলা ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় এ ব্যাপারে পার্থক্য ঘটে। আমাদের যুগে পানি আসে টিউবওয়েল/ট্যাপ দিয়ে, যেখান থেকে পানি প্রবাহিত হয়, এতে করে নির্দিষ্ট পরিমাণের সাথে মিলানো সম্ভব হয় না। তবে কেউ যদি পাত্রে পানি নিয়ে কল বন্ধ করে নেয়, তাহলে তা সম্ভব। কিন্তু সব জায়গায় পাত্র পাওয়া যায় না।রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওজুর পানির পরিমাণ সংক্রান্ত হাদিসগুলো সবই প্রমাণ করে যে, পানির কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই,বরং এটি আনুমানিক বিষয়।”(মাওসুয়াতুত ত্বহারাত; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৩৬৮)
.
▪️সংক্ষেপে ওজুর বিশুদ্ধ সুন্নাতি পদ্ধতি কি:
.
অযুর মুস্তাহাব পদ্ধতি: যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহতে বর্ণিত হয়েছে; ওযুর বিস্তারিত পদ্ধতি নিম্নরূপ:-অযুর ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সর্বাগ্রে অন্তরে ওজুর নিয়ত করবেন। ওজুর আগে মিসওয়াক করতে পারেন; যা একটি সুন্নাতি আমল। এরপর ‘বিসমিল্লাহ’ বলবেন। তারপর দু হাতের কব্জি ধৌত করবেন তিনবার। কব্জিদ্বয় তিনবার ধৌত করা, প্রথমে ডান হাতের কব্জি ধৌত করা এবং দু হাতের আঙুলসমূহ খিলাল করা সুন্নাত। এরপর ডান হাতে পানি নিয়ে তিনবার কুলি করবেন এবং ডান হাতে পানি নিয়ে তিনবার নাকে পানি দেবেন। এক অঞ্জলি পানি দিয়েই একসাথে কুলি করতে ও নাকে পানি দিতে পারবেন; আবার কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়ার জন্য আলাদাভাবেও পানি নিতে পারবেন উভয়ই বৈধ। আর নাকে পানি দেওয়ার পর নাক ঝাড়বেন বাম হাত দিয়ে। এরপর তিনবার মুখমণ্ডল ধৌত করবেন। ঘন দাড়ি থাকলে দাড়ি খিলাল করবেন; এক অঞ্জলি পানি নিয়ে দাড়ি ঘষার মাধ্যমে খিলাল করবেন। এরপর তিনবার কনুই সহকারে দুই হাত ধৌত করবেন,কনুই পর্যন্ত। এক্ষেত্রে ডান হাত আগে ধৌত করা সুন্নাত। এরপর দুই হাতে পানি নেওয়ার পর পানি ফেলে দিয়ে ভেজা দুই হাত দ্বারা সমগ্র মাথা একবার মাসেহ করবেন; মাথার সামনের দিকের চুল যেখানে শুরু হয়েছে সেখান থেকে নিয়ে মাথার পেছনে ঘাড়ের শেষভাগ পর্যন্ত মাসেহ করবেন। দুই কানের ওপরে থাকা চুলবিহীন সাদা অংশও মাসেহ করবেন। এরপর নতুন করে পানি নিয়ে পানিভেজা হাত দিয়ে একবার দুই কান মাসেহ করবেন। একসাথে দুই কান মাসেহ না করে প্রথমে ডান কান এরপরে বাম কান মাসেহ করা সুন্নাত। কান মাসেহের সময় তর্জনী আঙুল দিয়ে কানের ছিদ্রের অংশ মাসেহ করবেন এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে কানের পৃষ্ঠদেশ মাসেহ করবেন। এরপর তিনবার টাখনু সহকারে দুই পা ধৌত করবেন, টাখনু পর্যন্ত। প্রথমে ডান পা ধৌত করা সুন্নাত। পা ধোয়ার সময় পায়ের আঙুলগুলো খিলাল করা সুন্নাত। সুতরাং বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুল দিয়ে ডান পায়ের আঙুলগুলো খিলাল করবেন; ডান পায়ের কনিষ্ঠ আঙুল থেকে শুরু করে ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি পর্যন্ত,এরপর বাম পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি থেকে শুরু করে বাম পায়ের কনিষ্ঠ আঙুল পর্যন্ত খিলাল করবেন।পুরুষ ও মহিলার ওযু করার পদ্ধতিতে কোন পার্থক্য নেই।ওযু সমাপ্ত করার পর এই দোয়া বলা মুস্তাহাব: আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহ। সাথে যোগ করতে পারেন আল্লাহুম্মাজ আলনি মিনাত্তা ওয়াবীন ওয়াজ আলনি মিনাল মুতাতাহ্হিরীন। সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লা আনতা আসতাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইক। (অর্থ-“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো হক্ব ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও অন্তর্ভুক্ত করুন। হে আল্লাহ! আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি। আমি সাক্ষ্য দেই যে, আপনি ছাড়া কোনো হক্ব ইলাহ নেই, আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আপনার নিকট তাওবা করছি।)(হাদিসগুলো দেখুন;সহিহ মুসলিম, ত্বহারাত ৩৪৫; সহিহুত তিরমিযি হা/৪৮) ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) হাদিসটিকে ‘সহিহ’ আখ্যায়িত করেছেন] (বিস্তারিত দ্রষ্টব্য:মারয়ি বিন ইউসুফ আল-কারামি, দালিলুত তালিব লি নাইলিল মাতালিব, তাহকিক: আবু কুতাইবা আল-ফারিয়াবি (রিয়াদ: দারু তাইবা, ১ম প্রকাশ, ১৪২৫ হি./২০০৪ খ্রি.), পৃষ্ঠা:১১-১২; মানসুর বিন ইউনুস আল-বুহুতি,আর-রওদুল মুরবি বি শারহি জাদিল মুস্তাকনি, তাহকিক খালিদ আল-মুশাইকিহ, আব্দুল আজিজ ;আল-ইদান ও আনাস আল-ইয়াতামা (কুয়েত: দারু রাকায়িজ; ১ম প্রকাশ; ১৪৩৮ হি.);খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১১২-১১৪ ও ১২৪-১২৭; আল-কুআইমি; ফাইদুল জালিল; খন্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৬৬-৭৬ অযু সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন: বই সালাতের শর্তাবলি এবং ফরজ-ওয়াজিবসমগ্র। ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব আত-তামিমি আন-নাজদি (রাহিমাহুল্লাহ)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

Monday, September 29, 2025

মসজিদে প্রবেশ করে দুই রাকাত সালাত আদায় না করা পর্যন্ত বসা নিষিদ্ধ

 হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে প্রবেশকারী ব্যক্তিকে দুই রাকাত সালাত আদায় করার আগে বসতে নিষেধ করেছেন।

নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“إِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمْ الْمَسْجِدَ فَلَا يَجْلِسْ حَتَّى يُصَلِّيَ رَكْعَتَيْنِ”
“যখন তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করবে, তখন সে যেন দুই রাকাত সালাত আদায় না করা পর্যন্ত না বসে।” [সহিহ মুসলিম, হা/৭১৪]
বরং নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমার দিন খুতবা দেওয়ার সময় এক ব্যক্তিকে দেখলেন যে, সে বসে পড়ছে। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন,
“أَصَلَّيْتَ؟
‘তুমি কি সালাত আদায় করেছ?’
সে বলল, ‘না।’
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
“قُمْ فَصَلِّ رَكْعَتَيْنِ وَتَجَوَّزْ فِيهِمَا
‘তুমি ওঠো এবং দ্রুত দুই রাকাত সালাত আদায় করো।’ [সহিহ মুসলিম]
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বসার বা খুতবা শোনার অনুমতি দেননি যতক্ষণ না সে দুই রাকাত সালাত আদায় করে। তবে তিনি তাকে দ্রুত সালাত আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে সে খুতবা শুনতে পারে। কারণ খুতবা শোনা ওয়াজিব।
এ কারণেই যদি কোনো ব্যক্তি অন্যের সাথে কথা বলে- এমনকি সৎ কাজের আদেশও দেয় তবে সে জুমার প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হবে। কারণ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“إِذَا قُلْتَ لِصَاحِبِكَ أَنْصِتْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَالْإِمَامُ يَخْطُبُ فَقَدْ أَلْغَوْتَ”
“যখন তুমি তোমার সঙ্গীকে জুমার দিন ইমাম খুতবা দেওয়ার সময় ‘চুপ করো’ বলবে, তখন তুমি অনর্থক কাজ করলে।” [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
সুতরাং যখনই তোমাদের কেউ দিনের বা রাতের যে কোনো সময় মসজিদে প্রবেশ করবে তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশ পালনার্থে এবং তার নিষেধ থেকে বিরত থাকার জন্য দুই রাকাত সালাত আদায় না করে বসবে না।
-আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ.
শাইখের বক্তব্যের ভিডিও (বাংলা ক্যাপশন সহ)
ভিডিও বক্তব্য থেকে অনুবাদ:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

Translate