ভূমিকা: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক। যিনি তাঁর সুস্পষ্ট গ্রন্থ পবিত্র কুরআনে বলেন, وَ قُوۡمُوۡا لِلّٰہِ قٰنِتِیۡنَ ‘তোমরা বিনীতভাবে আল্লাহর জন্য দণ্ডায়মান হও’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৩৮)। আল্লাহ তা‘আলা সালাত সম্পর্কে বলেন,لَکَبِیۡرَۃٌ اِلَّا عَلَی الۡخٰشِعِیۡنَ وَ اِنَّہَا “নিশ্চয় বিনয়ীগণ ছাড়া সালাত অন্যদের উপর কঠিন’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ৪৫)। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক মুত্তাক্বীদের ইমাম ও বিনয়ীদের সরদার মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর এবং তাঁর পরিবারবর্গ ও সকল সাহাবীর উপর। অতঃপর নিশ্চয় সালাত দ্বীন-ইসলামের কার্যগত রুকনসমূহের মাঝে সবচেয়ে বড় রুকন। সালাতে একাগ্রতা ও বিনয়াবনত অর্জন করা মুখ্য উদ্দেশ্য এবং ইসলামী শরী‘আতের প্রকৃত চাহিদা। পক্ষান্তরে আল্লাহর শত্রু ইবলীস বানী আদমকে পথভ্রষ্ট ও বিপদগ্রস্ত করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে অঙ্গীকার করেছে যে,ثُمَّ لَاٰتِیَنَّہُمۡ مِّنۡۢ بَیۡنِ اَیۡدِیۡہِمۡ وَ مِنۡ خَلۡفِہِمۡ وَ عَنۡ اَیۡمَانِہِمۡ وَ عَنۡ شَمَآئِلِہِمۡ” অতঃপর আমি পথভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে তাদের সম্মুখ দিয়ে, পেছন দিয়ে, ডান দিক দিয়ে এবং বাম দিক দিয়ে আসব’ (সূরা আল-আ‘রাফ: ১৭)।যে কোনো কাজে সফলতার মূল শর্ত হলো মনোযোগ ও একনিষ্ঠতা; আর সালাতের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজনীয়তা সর্বাধিক। কারণ ইবাদতের আসল স্বাদ আস্বাদনের জন্য একাগ্রতার কোনো বিকল্প নেই। দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হলো এই ব্যস্ত ও যান্ত্রিক যুগে মনোযোগ সহকারে সালাত আদায় ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ একাগ্রতা বিহীন সালাত প্রায়শই দায়সারা একটি শারীরিক ব্যায়ামে পরিণত হয় যা হৃদয়ে সঞ্চারিত করে না প্রভুর সান্নিধ্যের প্রশান্তি, জাগায় না নেকীর পথে অগ্রসর হওয়ার অনুপ্রেরণা, এবং বাধা হয়ে দাঁড়ায় না অশ্লীলতা ও অন্যায়ের পথে।এমন পরিস্থিতি আজ আমাদের মাঝে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এই হাদীসকে এক কঠিন বাস্তবে পরিণত করেছে—أَوَّلُ شَيْءٍ يُرْفَعُ مِنْ هذِهِ الأُمَّةِ الْخُشُوعُ، حَتَّى لَا تَرَى فِيهَا خَاشِعًا“এই উম্মতের মধ্য থেকে সর্বপ্রথম যে জিনিস উঠিয়ে নেওয়া হবে তা হলো খুশূ‘ (সালাতের একাগ্রতা), এমনকি তুমি তাদের মধ্যে কোনো একাগ্রচিত্ত মুছল্লি খুঁজে পাবে না।”(ত্বাবারাণী; সহীহুল জামে‘ হা/২৫৬৯) তাছাড়া শয়তানের মূল চক্রান্ত ও উদ্দেশ্য হল মানুষকে যেকোন উপায়ে অন্য মনষ্ক করে সালাত থেকে দূরে রাখা এবং মুছল্লির মাঝে বিভিন্ন ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা সৃষ্টি করে সালাতের মত মহান ইবাদতের প্রকৃত স্বাদ ও বিশাল সওয়াব থেকে বঞ্চিত রাখা। যাতে করে সালাত আদায়ের সওয়াব নষ্ট হয়ে যায়।তাই এইবিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন আবশ্যক।আল্লাহ তা‘আলা বলেন,قَدۡ اَفۡلَحَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ, الَّذِیۡنَ ہُمۡ فِیۡ صَلَاتِہِمۡ خٰشِعُوۡنَ “অবশ্যই মুমিনগণ সফলকাম হয়েছে। যারা নিজেদের ছালাতে একনিষ্ট’ (সূরা আল-মুমিনূন: ১-২)। অর্থাৎ যারা ভীত-সন্ত্রস্ত এবং প্রশান্ত হৃদয় নিয়ে সালাতে স্থির থাকে। আর সালাতে খুশূ‘ বা একাগ্রতার অর্থ হল- প্রশান্ত থাকা, নিশ্চিন্ত থাকা, ধীরস্থিরতা অবলম্বন করা, সুস্থির থাকা, বিনয়ী থাকা এবং গাম্ভীর্যতা অবলম্বন করা। মূলত আল্লাহর ভয় ও তাঁর সম্পর্কে যথাযথ সচেতনতা বান্দাকে সালাতে একাগ্রতা অবলম্বন করতে উৎসাহ যোগায় এবং খুশূ‘-একাগ্রতা অর্জনে সহযোগিতা করে। আর খুশূ‘ বা একাগ্রতার প্রকৃত রূপ হল- মহান আল্লাহর সামনে বান্দার অন্তরকে বিনম্র, হীন ও অপমানিত অবস্থায় দাঁড় করানো।
Tuesday, August 19, 2025
শারঈ দৃষ্টিকোন থেকে সালাতের মধ্যে নড়াচড়া করার বিধান কি
.
শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তাভাবনা করলে সালাতের মধ্যে নড়াচড়া বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে; নড়াচড়ার ধরন ও প্রকৃতির ওপর নির্ভর করেই এর হুকুম নির্ধারিত হবে।”
.
সালাতের মধ্যে নড়াচড়ার হুকুম সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] উল্লেখ করেন যে প্রয়োজন ছাড়া নামাযে নড়াচড়া করার মূলবিধান মাকরূহ। তবে এই নড়াচড়া পাঁচ ভাগে বিভক্ত:
القسم الأول : حركة واجبة.
القسم الثاني : حركة محرمة.
القسم الثالث : حركة مكروهة.
القسم الرابع : حركة مستحبة.
القسم الخامس : حركة مباحة.
فأما الحركة الواجبة : فهي التي تتوقف عليها صحة الصلاة ، مثل أن يرى في غترته نجاسة ، فيجب عليه أن يتحرك لإزالتها ويخلع غترته ، وذلك لأن النبي صلى الله عليه وسلم أتاه جبريل وهو يصلي بالناس فأخبره أن في نعليه خبثاً فخلعها صلى الله عليه وسلم وهو في صلاته واستمر فيها [ رواه أبو داود 650 ، وصححه الألباني في الإرواء 284 ] .
ومثل أن يخبره أحد بأنه اتجه إلى غير القبلة ؛ فيجب عليه أن يتحرك إلى القبلة .
وأما الحركة المحرمة : فهي الحركة الكثيرة المتوالية لغير ضرورة ؛ لأن مثل هذه الحركة تبطل الصلاة ، وما يبطل الصلاة فإنه لا يحل فعله ؛ لأنه من باب اتخاذ آيات الله هزواً .
وأما الحركة المستحبة : فهي الحركة لفعل مستحب في الصلاة ، كما لو تحرك من أجل استواء الصف ، أو رأى فرجة أمامه في الصف المقدم فتقدم نحوها وهو في صلاته ، أو تقلص الصف فتحرك لسد الخلل ، أو ما أشبه ذلك من الحركات التي يحصل بها فعل مستحب في الصلاة ؛ لأن ذلك من أجل إكمال الصلاة ، ولهذا لما صلى ابن عباس رضي الله عنهما مع النبي صلى الله عليه وسلم ، فقام عن يساره أخذ رسول الله صلى الله عليه وسلم برأسه من ورائه فجعله عن يمينه . [ متفق عليه ]
وأما الحركة المباحة : فهي اليسيرة لحاجة ، أو الكثيرة للضرورة ، أما اليسيرة لحاجة فمثلها فعل النبي صلى الله عليه وسلم حين كان يصلي وهو حامل أمامة بنت زينب بنت رسول الله صلى الله عليه وسلم وهو جدها من أمها فإذا قام حملها ، وإذا سجد وضعها [ البخاري 5996 ومسلم 543 ]
وأما الحركة الكثيرة للضرورة : فمثالها الصلاة في حال القتال ؛ قال الله تعالى : (حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلاةِ الْوُسْطَى وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ* فَإِنْ خِفْتُمْ فَرِجَالاً أَوْ رُكْبَاناً فَإِذَا أَمِنْتُمْ فَاذْكُرُوا اللَّهَ كَمَا عَلَّمَكُمْ مَا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ) البقرة/238-239 ؛ فإن من يصلي وهو يمشي لا شك أن عمله كثير ولكنه لما كان للضرورة كان مباحاً لا يبطل الصلاة .
وأما الحركة المكروهة : فهي ما عدا ذلك وهو الأصل في الحركة في الصلاة ، وعلى هذا نقول لمن يتحركون في الصلاة إن عملكم مكروه ، منقص لصلاتكم ، وهذا مشاهد عند كل أحد فتجد الفرد يعبث بساعته ، أو بقلمه ، أو بغترته ، أو بأنفه ، أو بلحيته ، أو ما أشبه ذلك ، وكل ذلك من القسم المكروه إلا أن يكون كثيراً متوالياً فإنه محرم مبطل للصلاة .
وقد ذكر رحمه الله أيضا أن الحركة المبطلة للصلاة ليس لها عدد معين ، وإنما هي الحركة التي تنافي الصلاة ، بحيث إذا رؤى هذا الرجل فكأنه ليس في صلاة ، هذه هي التي تبطل؛ ولهذا حدده العلماء رحمهم الله بالعرف ، فقالوا : ” إن الحركات إذا كثرت وتوالت فإنها تبطل الصلاة ” ، بدون ذكر عدد معين ، وتحديد بعض العلماء إياها بثلاث حركات ، يحتاج إلى دليل ؛ لأن كل من حدد شيئاً بعدد معين ، أو كيفية معينة ، فإن عليه الدليل ، وإلا صار متحكماً في شريعة الله .
প্রথম প্রকার: ওয়াজিব নড়াচড়া
দ্বিতীয় প্রকার: হারাম নড়াচড়া
তৃতীয় প্রকার: মাকরূহ নড়াচড়া
চতুর্থ প্রকার: মুস্তাহাব নড়াচড়া
পঞ্চম প্রকার: জায়েয নড়াচড়া
ওয়াজিব নড়াচড়া: যে নড়াচড়ার উপর সালাতের বিশুদ্ধতা নির্ভর করে। যেমন: (সালাতে শুরু করার পর) সে যদি তার মাথার রুমালে নাপাকি দেখতে পায় তাহলে সেটি খুলে ফেলার জন্য নড়াচড়া করা ওয়াজিব। এর দলীল হচ্ছে: একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (জুতা পায়ে) সালাতের ইমামতি করছিলেন। এমন সময়ে জিবরীল আলাইহিস সালাম এসে তাঁকে সংবাদ দিলেন, তাঁর জুতায় নাপাকী রয়েছে। তিনি সালাত পড়া অবস্থাতেই জুতা খুলে ফেললেন এবং সালাতে চালিয়ে গেলেন।(হাদীসটি আবু দাউদ হা/৬৫০) বর্ণনা করেন আর শাইখ আলবানী ইরওয়া গ্রন্থে হা/২৮৪) এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেছেন) অনুরূপভাবে কেউ যদি তাকে জানায় যে সে কিবলার দিকে নয়; অন্য দিকে মুখ করে আছে, তাহলে তার জন্য কিবলার দিকে মুখ ফেরানো ওয়াজিব।
.
হারাম নড়াচড়া: প্রয়োজন ছাড়া লাগাতার অধিক পরিমাণে নড়াচড়া করা। কারণ এ ধরনের নড়াচড়া সালাত বিনষ্ট করে দেয়। আর যা সালাত নষ্ট করে দেয় তা করা জায়েয নেই। কারণ এটি আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার নামান্তর।
.
মুস্তাহাব নড়াচড়া: সালাতে মুস্তাহাব কিছু করার জন্য নড়াচড়া করা। যেমন: কাতার সোজা করার জন্য নড়াচড়া করা। সালাতরত অবস্থায় সামনের কাতারে ফাঁকা স্থান দেখতে পেয়ে সেটি পূর্ণ করার জন্য সামনের কাতারে চলে যাওয়া অথবা কাতারে ফাঁকা স্থান সৃষ্টি হলে সেটি পূরণ করতে নড়াচড়া করা। এ ধরণের অন্য যে কোন নড়াচড়া যার মাধ্যমে নামাযের কোন একটি মুস্তাহাব আমল সম্পাদিত হয়। কারণ এই নড়াচড়া সালাতেকে পরিপূর্ণ করার জন্য। তাই ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সালাত পড়ছিলেন তখন তিনি বামপাশে দাঁড়ালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মাথা ধরে তাকে পেছন দিয়ে ঘুরিয়ে ডানপাশে নিয়ে এলেন।[বুখারী ও মুসলিম]
.
জায়েয নড়াচড়া: আর এটি হলো প্রয়োজনে সামান্য নড়াচড়া অথবা জরুরী কারণে বেশি নড়াচড়া করা। প্রয়োজনে সামান্য নড়াচড়ার উদাহরণ হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন উমামা বিনতে যাইনাব বিনতে রাসূলুল্লাহকে বহন করে সালাত পড়তেন। তিনি উমামার নানা ছিলেন। দাঁড়ানো অবস্থায় তিনি তাকে বহন করতেন। আর সিজদায় গেলে তাকে নামিয়ে রাখতেন।[হাদীসটি বুখারী হা/৫৯৯৬; ও মুসলিম হা/৫৪৩) বর্ণনা করেন) আর জরুরী কারণে বেশি নড়াচড়ার উদাহরণ হলো যুদ্ধরত অবস্থায় সালাত পড়া। আল্লাহ তাআলা বলেন:“তোমরা সালাতের প্রতি যত্নবান হবে; বিশেষতঃ মধ্যবর্তী সালাতের প্রতি। আর আল্লাহর উদ্দেশ্যে তোমরা বিনীতভাবে দাঁড়াবে। তোমরা যদি ভয় করো তাহলে হেঁটে কিংবা আরোহী অবস্থায় সালাত আদায় করবে। যখনই নিরাপদ হবে তখন তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করবে ঠিক যেভাবে তিনি তোমাদেরকে শিখিয়েছেন, যা তোমরা পূর্বে জানতে না।”(সূরা বাকারা: ২৩৮-২৩৯) হেঁটে সালাত পড়া নিঃসন্দেহে সালাতে বেশি নড়াচড়ার অন্তর্ভুক্ত। তবে সেটি জরুরী প্রয়োজনের কারণে হওয়ায় বৈধ এবং এতে সালাত বাতিল হবে না।
.
মাকরূহ নড়াচড়া: উপর্যুক্ত নড়াচড়া ছাড়া সব ধরনের নড়াচড়া মাকরূহ। সালাতে নড়াচড়ার এটাই মূল বিধান। সুতরাং যারা সালাতে নড়াচড়া করে তাদেরকে আমরা বলব: আপনাদের কাজটি মাকরূহ তথা অপছন্দনীয়। এটি আপনাদের সালাতে ঘাটতি সৃষ্টি করে। এমনটি প্রত্যেকের মাঝে দেখা যায়। দেখবেন কেউ তার ঘড়ি নিয়ে, কলম নিয়ে, মাথার রুমাল নিয়ে, নাক নিয়ে, দাড়ি নিয়ে বা এরূপ অন্য কিছু নিয়ে অযথা খেলতামাশা করছেন। এগুলো সবই অপছন্দনীয় নড়াচড়ার অন্তর্ভুক্ত। তবে যদি লাগাতার ও অতিরিক্ত হয়ে যায় তাহলে সেটি হারাম হবে এবং সালাতকে নষ্ট করে দিবে। এছাড়া তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে সালাতকে বাতিলকারী নড়াচড়ার কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। বরং সেটা এমন নড়াচড়া যা সালাতের পরিপন্থী। যে নড়াচড়া দেখলে মনে হবে এই ব্যক্তি সালাতে নেই, এ ধরণের নড়াচড়া নামাযকে বাতিল করে দেয়। তাই আলেমরা উরফ তথা প্রথার মাধ্যমে বিষয়টি নির্ধারণ করেছেন। তারা বলেছেন: ‘নড়াচড়া বেশি পরিমাণে এবং লাগাতার হলে সালাত বাতিল হয়ে যায়।’ তারা কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করেননি। কিছু আলেমগণ যে, এটাকে ‘তিন’ সংখ্যায় সীমাবদ্ধ করেছেন এর পক্ষে দলীল প্রয়োজন। কারণ যে কেউ কোন নির্দিষ্ট সংখ্যা বা নির্দিষ্ট ধরন নির্ধারণ করলে এর সপক্ষে দলীল প্রদান করা তার উপর আবশ্যক। নতুবা সে আল্লাহর শরীয়তে স্বেচ্ছাচারিতাকারী বলে গণ্য হবে।”(ইবনু উসাইমীন,মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল,খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ৩০৯-৩১১)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে নামাযে বেশি বেশি নড়াচড়া করে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে কিনা? এবং এর থেকে উত্তরণের উপায় কী? তিনি উত্তর দেন:
( السنة للمؤمن أن يقبل على صلاته ويخشع فيها بقلبه وبدنه ، سواء كانت فريضة أو نافلة ، لقول الله سبحانه : ( قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ * الَّذِينَ هُمْ فِي صَلاتِهِمْ خَاشِعُون ) المؤمنون/1-2 ، وعليه أن يطمئن فيها ، وذلك من أهم أركانها وفرائضها ، لقول النبي صلى الله عليه وسلم للذي أساء في صلاته ولم يطمئن فيها : ( ارجع فصلِّ فإنك لم تصل ) ، فعل ذلك ثلاث مرات ، فقال الرجل : يا رسول الله ، والذي بعثك بالحق لا أحسن غير هذا فعلمني ، فقال النبي صلى الله عليه وسلم : ( إِذَا قُمْتَ إِلَى الصَّلاةِ فَأَسْبِغْ الْوُضُوءَ ، ثُمَّ اسْتَقْبِلْ الْقِبْلَةَ فَكَبِّرْ ، وَاقْرَأْ بِمَا تَيَسَّرَ مَعَكَ مِنْ الْقُرْآنِ ، ثُمَّ ارْكَعْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ رَاكِعًا ثُمَّ ارْفَعْ رَأْسَكَ حَتَّى تَعْتَدِلَ قَائِمًا ، ثُمَّ اسْجُدْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ سَاجِدًا ، ثُمَّ ارْفَعْ حَتَّى تَسْتَوِيَ وَتَطْمَئِنَّ جَالِسًا ، ثُمَّ اسْجُدْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ سَاجِدًا ، ثُمَّ ارْفَعْ حَتَّى تَسْتَوِيَ قَائِمًا ، ثُمَّ افْعَلْ ذَلِكَ فِي صَلاتِكَ كُلِّهَا ) متفق عليه ، وفي رواية لأبي داود قال فيها : ( ثم اقرأ بأم القرآن ، وبما شاء الله ) .
وهذا الحديث الصحيح يدل على أن الطمأنينة ركن في الصلاة ، وفرض عظيم فيها ، لا تصح بدونه ، فمن نقر صلاته فلا صلاة له ، والخشوع هو لب الصلاة وروحها ، فالمشروع للمؤمن أن يهتم بذلك ، ويحرص عليه .
أما تحديد الحركات المنافية للطمأنينة وللخشوع بثلاث حركات فليس ذلك بحديث عن النبي صلى الله عليه وسلم ، وإنما ذلك كلام لبعض أهل العلم ، وليس عليه دليل يعتمد .
ولكن يكره العبث في الصلاة ، كتحريك الأنف واللحية والملابس والاشتغال بذلك ، وإذا كثر العبث أبطل الصلاة ، وأما إذا كان قليلا عرفا ، أو كان كثيرا ولم يتوال ، فإن الصلاة لا تبطل به ، ولكن يشرع للمؤمن أن يحافظ على الخشوع ، ويترك العبث ، قليله وكثيره ، حرصا على تمام الصلاة وكمالها .
ومن الأدلة على أن العمل القليل والحركات القليلة في الصلاة لا تبطلها ، وهكذا العمل والحركات المتفرقة غير المتوالية ، ما ثبت عن النبي صلى الله عليه وسلم ، أنه فتح الباب يوما لعائشة وهو يصلي [ أبو داود 922 والنسائي 3/11 والترمذي 601 ، وحسنه الشيخ الألباني في صحيح الترمذي 601] .
وثبت عنه من حديث أبي قتادة رضي الله عنه أنه صلى ذات يوم بالناس ، وهو حامل أمامة بنت ابنته زينب ، فكان إذا سجد وضعها ، وإذا قام حملها
“মুমিনের জন্য সুন্নাহ হলো সালাতে শরীর ও মন নিয়ে প্রবেশ করা; হোক সেটা ফরয সালাত কিংবা নফল সালাত। কারণ আল্লাহ বলেছেন:“অবশ্যই মুমিনরা সফল হয়েছে, যারা তাদের সালাতে বিনয়াবনত।”(সূরা মুমিনূন: ১-২) তার উচিত সালাতে প্রশান্ত ও স্থির হওয়া। কারণ এই স্থিরতা সালাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ও ফরয কাজ। যে ব্যক্তি ধীরস্থিরতা ছাড়া সালাত পড়েছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছিলেন: “তুমি ফিরে গিয়ে সালাত পড়ো; কারণ তুমি সালাত পড়োনি।” তিনি এই কথা তিন বার বলেছিলেন। লোকটি বলল: হে আল্লাহর রাসূল! যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার শপথ: আমি এর চেয়ে ভালোভাবে সালাত পড়তে জানি না। আমাকে শিখিয়ে দিন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “যখন তুমি সালাতে দাঁড়ানোর ইচ্ছা করবে তখন প্রথমে তুমি পূর্ণভাবে অযু করবে। তারপর কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে তাকবীর বলবে। তারপর কুরআন থেকে যতটুকু তেলাওয়াত করা তোমার পক্ষে সহজ হয় তিলাওয়াত করবে। তারপর তুমি রুকূ করবে এবং রুকুতে গিয়ে স্থির হবে। তারপর মাথা উঠাবে এবং ঠিক সোজা হয়ে দাঁড়াবে। তারপর সিজদাহ করবে এবং সিজদায় গিয়ে স্থির হবে। তারপর আবার মাথা তুলবে এবং স্থিরভাবে বসবে। এরপর আবার সিজদা দিবে এবং সিজদায় গিয়ে স্থির হবে। এরপর উঠে গিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াবে। এরপর ঠিক এভাবেই তোমার সালাতের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করবে।”(হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেন। আবু দাউদের বর্ণনায় আছে: ‘তারপর ফাতিহা এবং আল্লাহ যতটুকু চান ততটুকু তেলাওয়াত করবে’) এই সহিহ হাদীস প্রমাণ করে যে ধীরস্থিরতা সালাতের স্তম্ভ ও গুরুত্বপূর্ণ ফরয। এটি ছাড়া সালাত শুদ্ধ হয় না। যে ব্যক্তি সালাতে ঠোকর দেয় তার সালাত হয় না। সালাতে খুশু-খুযু সালাতের সারবস্তু ও প্রাণ। সুতরাং মুমিনের উচিত এটাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং এ ব্যাপারে সচেতন থাকা। তবে ধীরস্থিরতা ও মনোযোগ নষ্টকারী নড়াচড়াকে তিন সংখ্যাতে সীমাবদ্ধ করা এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোনো হাদীস নেই। এটি কিছু আলেমের বক্তব্য। এর পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো দলীল নেই। তবে সালাতে অনর্থক কাজ করা মাকরূহ। যেমন: নাক, দাড়ি, কাপড়-চোপড় নাড়াচাড়া করা এবং তা নিয়ে ব্যস্ত থাকা। অনর্থক কাজ বেশি হলে সালাত বাতিল হয়ে যায়। আর যদি কম পরিমাণে হয় অথবা বেশি হলেও লাগাতার না হয় তাহলে সালাত বাতিল হয় না। তবে মুমিনের উচিত খুশু-খুযু রক্ষা করা এবং কম হোক বা বেশি হোক অনর্থক কাজ ছেড়ে দেওয়া; সালাত পরিপূর্ণ করার উদ্দেশ্যে। অল্প কাজে, সামান্য নড়াচড়ায় বা বিচ্ছিন্ন নড়াচড়ায় যে সালাত বাতিল হয় না এর দলীল হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদীস: তিনি একদিন সালাতরত অবস্থায় আয়েশার জন্য দরজা খুলে দিয়েছিলেন।[আবু দাউদ হা/৯২২; তিরমিযী হা/৬০১)। শাইখ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) সহীহুত তিরমিযীতে হা/৬০১) হাদীসটি হাসান বলেছেন) আবু কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, একদিন তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মানুষদের নিয়ে সালাত পড়ার সময়ে তার মেয়ের মেয়ে (নাতনি) উমামা বিনতে যাইনাবকে বহন করেছিলেন। সিজদায় গেলে নামিয়ে রাখতেন, আর উঠে দাঁড়ালে বহন করতেন।”(ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ১৬২-১৬৪) পরিশেষে বলব, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে যেন সালাতের ব্যাপারে যত্নবান হওয়ার তাওফীক্ব দান করেন এবং সাথে সাথে সালাত আদায়ের মাধ্যমে আমাদেরকে জান্নাতে দাখিল করে নেন। আমীন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।
হায়েজ নেফাস অবস্থায় নারীরা তালীমী বৈঠক সহ বিভিন্ন কারণে মসজিদে অবস্থান করতে পারবে কি
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি। অতঃপর হায়েজ অবস্থায় নারীরা মসজিদে প্রবেশ বা অবস্থান করতে পারবে কিনা এই মাসালায় আহলুল আলেমগনের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে, চার মাযহাবের (হানাফি, মালিকি, শাফিঈ ও হাম্বলি) ফকীহদের অধিকাংশের মতে, হায়েজ (ঋতুমতী) মহিলার জন্য মসজিদে অবস্থান করা বৈধ নয়।কিন্তু বিশেষ প্রয়োজনে অপবিত্র অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করতে পারবে অথবা মসজিদের উপর দিয়ে পারাপার করতে পারবে। মসজিদ হলো আসমানের নিচে জমিনের ওপর অবস্থিত এক পবিত্র স্থান, যেখানে আল্লাহর ইবাদত সম্পাদিত হয়। এজন্য সেখানে শুধুমাত্র পবিত্র ও পরিশুদ্ধ ব্যক্তিরাই উপস্থিত থাকতে পারবেন। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন,“হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা যখন নেশার অবস্থা থেকে পুরোপুরি মুক্ত না হও, ততক্ষণ পর্যন্ত সালাতের কাছে যেও না, যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি যা বলছো তা বুঝতে পারছ না; এবং অপবিত্র অবস্থায়ও নামাজের কাছে যেও না, যদি না তুমি পথচারী হও এবং গোসল করো।” (সূরা নিসা; আয়াত: ৪৩) উক্ত আয়াতের তাফসীরে হাফিয ইবনে কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, অনেক ইমাম এ আয়াত দ্বারা এ কথার উপর প্রমাণ পেশ করেন যে, গোসল ফরয হওয়া ব্যক্তির জন্য মসজিদে অবস্থান করা হারাম। তবে তার জন্য মসজিদ ত্যাগ করার জন্য অতিক্রম করা বৈধ। অনুরূপভাবে ঋতুবর্তী ও নিফাসগ্রস্ত মহিলার বিধানও একই।(তাফসীরে ইবনে কাসীর, নিসা ৪৩নং আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য)
.
এ ব্যাপারে চার মাজহাবসহ জমহুর আলেমগন দলীল হিসেবে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে উম্মে ‘আতিইয়া (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস পেশ করেন উম্মু আতিয়্যা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, যুবতী, পর্দানশীন ও ঋতুবতী মহিলারা ঈদগাহের উদ্দেশ্যে বের হবে এবং ভাল স্থানে ও মুমিনদের দাওয়াতে অংশ গ্রহণ করবে। অবশ্য ঋতুবতী মহিলারা ঈদগাহ হতে দূরে থাকবে। হাফসা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম ঋতুবতীও কি বেরুবে? তিনি বললেন, সে কি ‘আরাফাতে ও অমুক অমুক স্থানে উপস্থিত হবে না?’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩২৪, ৯৭১, ৯৭৪; সহীহ মুসলিম হা/৮৯০; রিসালাতুদ-দিমা‘ত তাবি‘ইয়াহ লিন্নিসা, পৃ. ৫২-৫৫)। এই হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হায়েজগস্থ মহিলাকে ঈদের মুসাল্লায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত রেখেছেন এবং সেখানে না যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন কারণ ঈদগাহ মসজিদের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, হায়েজ অবস্থায় নারীর জন্য মসজিদে প্রবেশ করা নিষিদ্ধ। তাঁরা এ মতকে সমর্থন করার জন্য আরও কিছু হাদীস পেশ করার চেষ্টা করেছেন; তবে সেগুলো দুর্বল হওয়ায় দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। এর মধ্যে একটি হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই বাণী:“আমি হায়েজ বা জুনুব (অপবিত্র) ব্যক্তির জন্য মসজিদ হালাল করিনি।”কিন্তু শাইখ আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) এ হাদীসকে দুর্বল বলেছেন (যঈফ আবু দাউদ হা/২৩২; মাসালাটি সম্পর্কে ফকীহদের মতামত জানতে দেখুন:সারাখসির রচিত “আল-মাবসুত” গ্রন্থে খণ্ড;৩ পৃষ্ঠা;১৫৩;হাশিয়াতুদ দাসূকী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৭৩; নববী আল-মাজমূ‘ খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩৮৮; ইবনু কুদামাহ আল-মুগনী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৯৫)
.
হাম্বলী মাহাজাবের বিখ্যাত গ্রন্থ কাশশাফুল ক্বিনায় এসেছে:
” ويحرم على الجنب اللبث في المسجد لقوله تعالى : ( ولا جنبا إلا عابري سبيل حتى تغتسلوا ) ، إلا أن يتوضأ ، لما روى سعيد بن منصور عن عطاء بن يسار قال : رأيت رجالا من أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم يجلسون في المسجد وهم مجنبون إذا توضئوا وضوء الصلاة . قال في “المبدع” : إسناده صحيح ، ولأن الوضوء يخفف حدثه فيزول بعض ما يمنعه . قال الشيخ تقي الدين ( شيخ الإسلام ابن تيمية ) : وحينئذ فيجوز أن ينام في المسجد حيث ينام غيره “
“জুনুবী (অপবিত্র) ব্যক্তির জন্য মসজিদে অবস্থান করা হারাম। যেহেতু আল্লাহ্ তাআলা বলেন: “এবং (দৈহিক) অপবিত্র অবস্থায়ও না, যতক্ষণ না গোসল কর।”(সূরা নিসা,আয়াত:৪৩) তবে ওযু করে নিয়ে অবস্থান করতে পারবে। যেহেতু আতা বিন ইয়াসার থেকে সাঈদ বিন মানসুর বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের কিছু লোককে এমন দেখেছি যে, তারা ওযু করে নিয়ে অপবিত্র অবস্থায় মসজিদে বসে থাকতেন। আল-মুবদি গ্রন্থে বলেন: এর সনদ সহিহ। এবং যেহেতু ওযুকরণ অপবিত্রতাকে কিছুটা হালকা করে। ফলে কিছু নিষেধাজ্ঞা দূর হয়ে যায়। শাইখ তাক্বী উদ্দিন (শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া) বলেন: সেক্ষেত্রে মসজিদে ঘুমানো জায়েয হবে যেভাবে অন্যেরা সেখানে ঘুমায়।” (পরিমার্জিতভাবে সমাপ্ত;কাশ্শাফুল ক্বিনা খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৪৮; দেখুন: আল-শারহুল মুমতি’ খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৫৭)
.
وسئل الشيخ محمد المختار الشنقيطي حفظه الله: هل يجوز للمرأة إذا جاءتها الحيضة أن تحضر الدرس وتجلس عند الدرج، أو عند موضع الأحذية -أكرمكم الله- وهي عند مصلى النساء. أي: داخل الباب من جهة المصلى أو من جهة المسجد؟
فأجاب: ” المرأة الحائض لا تدخل إلى المسجد إذا كانت حال حيضها؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم قال لعائشة: ناوليني الخُمرة [نوع من الفراش]، فقالت: إني حائض، قال: إن حيضتك ليست في يدك، فدل على أن الأصل عدم دخول الحائض، بدليل أن أم المؤمنين عائشة رضي الله عنها لما قال لها: ناوليني الخُمرة؛ قالت: إني حائض، فامتنعت من الدخول واعتذرت بكونها حائضاً، فدل على أن هذا كان معمولاً به في زمان النبي صلى الله عليه وسلم، لأنها لا تنشئ الأحكام من عندها، وقد قال لها عليه الصلاة والسلام ذلك صريحاً في قوله: اصنعي ما يصنع الحاج، غير أن لا تطوفي بالبيت حينما حاضت في حجة الوداع، فالذي على المرأة أن تلتزم به: أن لا تدخل مسجداً إذا كانت حائضة والله يأجرها ويكتب ثوابها…وفي هذه الحالة تجلس خارج المسجد عند باب المسجد وتسمع، لكن لا تدخل، ولها أن تدني رأسها وتصغي ” انتهى مختصرا من “شرح زاد المستقنع”.
ড.মুহাম্মাদ মুখতার বিন মুহাম্মাদ আল-আমীন শানক্বীতি (রাহিমাহুল্লাহ)-এর নিকট প্রশ্ন করা হয়েছিল:“কোনো মহিলার হায়েজ শুরু হলে, সে কি মসজিদে দারস শুনতে বা শিক্ষাসভায় অংশগ্রহণ করতে পারবে? বিশেষ করে, যদি সে মসজিদের মহিলাদের নামাজকক্ষের ঠিক পাশে যেমন সিঁড়ির ধাপের কাছে বা জুতার তাকের পাশে বসে থাকে, তাহলে এর হুকুম কী হবে?” তিনি জবাবে বলেন:
المرأة الحائض لا تدخل إلى المسجد إذا كانت حال حيضها؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم قال لعائشة: ناوليني الخُمرة [نوع من الفراش]، فقالت: إني حائض، قال: إن حيضتك ليست في يدك، فدل على أن الأصل عدم دخول الحائض، بدليل أن أم المؤمنين عائشة رضي الله عنها لما قال لها: ناوليني الخُمرة؛ قالت: إني حائض، فامتنعت من الدخول واعتذرت بكونها حائضاً، فدل على أن هذا كان معمولاً به في زمان النبي صلى الله عليه وسلم، لأنها لا تنشئ الأحكام من عندها، وقد قال لها عليه الصلاة والسلام ذلك صريحاً في قوله: اصنعي ما يصنع الحاج، غير أن لا تطوفي بالبيت حينما حاضت في حجة الوداع، فالذي على المرأة أن تلتزم به: أن لا تدخل مسجداً إذا كانت حائضة والله يأجرها ويكتب ثوابها…وفي هذه الحالة تجلس خارج المسجد عند باب المسجد وتسمع، لكن لا تدخل، ولها أن تدني رأسها وتصغي “
হায়েজ অবস্থায় নারীর জন্য মসজিদে প্রবেশ করা নিষিদ্ধ। কারণ নবী করিম ﷺ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-কে বলেছেন, “আমাকে খুমরা (এক ধরনের মাদুর) এগিয়ে দাও।” আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা জবাব দিয়েছিলেন, “আমার হায়েজ চলছে।” তখন নবী (ﷺ) বলেছেন, “তোমার মাসিক তো তোমার হাতে নয়।” এ থেকে স্পষ্ট হয় যে মূল বিধান হলো মাসিক অবস্থায় নারী মসজিদে প্রবেশ করবে না। কারণ উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নিজেই নবী ﷺ-এর নির্দেশ অনুসরণ করে মসজিদে প্রবেশ থেকে বিরত ছিলেন এবং তাঁর অজুহাত ছিল মাসিক হওয়া। এটি প্রমাণ করে যে এই বিধান নবী ﷺ-এর যুগ থেকেই কার্যকর ছিল, কারণ নবী ﷺ নিজের থেকে কোনো শরীয়ত বিধান প্রণয়ন করতেন না, বরং তিনি আল্লাহর নির্দেশনা অনুসারে চলতেন। অতিরিক্তভাবে, নবী ﷺ হজ্বের বিদায়ে যখন মাসিক ছিলেন, তখন তিনি আদেশ দিয়েছিলেন, “হজযাত্রী যা করে, তুমি ও করো; তবে কেবল কাবা তাওয়াফ করবে না।” অর্থাৎ মাসিক অবস্থায় তিনি নিজেও মসজিদে কিছু কিছু কার্যকলাপ থেকে বিরত ছিলেন।সুতরাং নারীর করণীয় হলো যদি সে মাসিক থাকে, তবে সে মসজিদে প্রবেশ করবে না। আল্লাহ তাআলা তার জন্য সওয়াব নির্দিষ্ট করবেন এবং তার আমল কবুল করবেন।এই অবস্থায় নারীর জন্য গ্রহণযোগ্য হলো মসজিদের বাইরে, দরজার কাছে বা পাশের স্থানে বসে দারস শুনা। এতে কোনো সমস্যা নেই। সে চাইলে মনোযোগ দিয়ে মাথা নিচু করে দারস শুনতে পারবে।”(শারহু আলা জাদিল মুস্তাকনি থেকে সংক্ষিপ্ত আরও দেখুন ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-২৭৩৩৪৪)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল; যদি কোন মহিলা হায়েজ অবস্থায় শুধু খুতবা শোনার জন্য মসজিদে প্রবেশ করে এর শারঈ হুকুম কী? উত্তরে তারা বলেন:
لا يحل للمرأة أن تدخل المسجد وهي حائض أو نفساء…أما المرور فلا بأس، إذا دعت إليه الحاجة، وأمن تنجيسها المسجد، لقوله تعالى: وَلا جُنُباً إِلا عَابِرِي سَبِيلٍ حَتَّى تَغْتَسِلُوا النساء/43. والحائض في معنى الجنب؛ ولأنه أمر عائشة أن تناوله حاجة من المسجد وهي حائض
“হায়েয বা প্রসব পরবর্তী রক্তস্রাব (নেফাস) অবস্থায় নারীদের জন্য মসজিদে প্রবেশ করা জায়েয নয়.. তবে যদি প্রয়োজন হয় এবং নিশ্চিত হয় যে মসজিদের মেঝেতে রক্তের ফোঁটা পড়বে না, তাহলে শুধু অতিক্রম করার অনুমতি আছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর জুনুবী (অপবিত্র) ব্যক্তিও শুধু পথ অতিক্রম করার জন্য যেতে পারবে।”(সূরা নিসা:৪৩) হায়েয অবস্থায় নারীরা জুনুবী (অপবিত্র) ব্যক্তির মতই বিধানের অন্তর্ভুক্ত, কারণ নবী (ﷺ) আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-কে হায়েয অবস্থায় মসজিদ থেকে কিছু আনতে বলেছিলেন।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ২৭২)
.
প্রিয় পাঠক! স্থায়ী কমিটির আলেমগন যে হাদীসটির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন সে হাদীসটি হচ্ছে, আম্মিজান ‘আইশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহা) [মৃত: ৫৭/৫৮ হি.] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, “মসজিদ থেকে আমার জায়নামাযটি (হাত বাড়িয়ে) নিয়ে এসো”। তিনি বলেন, আমি বললাম, আমি তো ঋতুবতী। তিনি বললেনঃ তোমার হায়িয তো তোমার হাতে নয়।” (সহীহ মুসলিম হা/৫৭৬) অপর বর্ননায় আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ই‘তিকাফরত অবস্থায় মসজিদ থেকে বললেন, ‘হে আয়েশা! আমাকে কাপড়টা এগিয়ে দাও’। তিনি বলেন, আমি যে ঋতুমতী! জবাবে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘ঋতু তো তোমার হাতে লাগে নেই’। তারপর আমি তা এনে দিলাম”।(সহীহ মুসলিম, হা/২৯৯)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল প্রশ্ন: হায়েজগ্রস্থ মহিলা কি মসজিদে অনুষ্ঠিত যিকর-মজলিসে অংশ নিতে পারবে? উত্তরে শাইখ বলেন;
المرأة الحائض لا يجوز لها أن تمكث في المسجد ، وأما مرورها بالمسجد فلا بأس به ، بشرط أن تأمن تلويث المسجد مما يخرج منها من الدم ، وإذا كان لا يجوز لها أن تبقى في المسجد ، فإنه لا يحل لها أن تذهب لتستمع إلى حلق الذكر وقراءة القرآن ، اللهم إلا أن يكون هناك موضع خارج المسجد يصل إليه الصوت بواسطة مكبر الصوت ، فلا بأس أن تجلس فيه لاستماع الذكر ، لأنه لا بأس أن تستمع المرأة إلى الذكر وقراءة القرآن كما ثبت عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه كان يتكئ في حجر عائشة ، فيقرأ القرآن وهي حائض ، وأما أن تذهب إلى المسجد لتمكث فيه لاستماع الذكر ، أو القراءة ، فإن ذلك لا يجوز ، ولهذا لما أُبلغ النبي عليه الصلاة والسلام في حجة الوداع ، أن صفية كانت حائضا قال : ( أحابستنا هي ؟ ) ظن صلى الله عليه وسلم ، أنها لم تطف طواف الإفاضة فقالوا إنها قد أفاضت ، وهذا يدل على أنه لا يجوز المكث في المسجد ولو للعبادة . وثبت عنه أنه أمر النساء أن يخرجن إلى مصلى العيد للصلاة والذكر ، وأمر الحيض أن يعتزلن المصلى
“নারী হায়েজ অবস্থায় মসজিদে অবস্থান করতে পারবে না। তবে তার মসজিদ দিয়ে অতিক্রম করায় কোনো অসুবিধা নেই শর্ত হলো, তার থেকে যে রক্ত নির্গত হচ্ছে, তা দ্বারা মসজিদ নাপাক হওয়ার আশঙ্কা না থাকে। আর যখন তার মসজিদে অবস্থান করা বৈধ নয়, তখন তার পক্ষে ওয়াজ-মহফিল বা কুরআন তিলাওয়াত শোনার উদ্দেশ্যে মসজিদে যাওয়া হালাল নয়। হ্যাঁ, যদি মসজিদের বাইরে এমন কোনো জায়গা থাকে যেখানে মাইক্রোফোনের মাধ্যমে শব্দ পৌঁছে যায়, তবে সেখানে বসে যিকির শোনায় অসুবিধা নেই। কারণ নারীর পক্ষে যিকির ও কুরআন তিলাওয়াত শোনা বৈধ যেমন প্রমাণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশার (রাঃ) কোলে হেলান দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন, অথচ তিনি তখন হায়েজ অবস্থায় ছিলেন। কিন্তু মসজিদে গিয়ে সেখানে অবস্থান করে যিকির বা কুরআন শোনা এটি বৈধ নয়। এ কারণেই বিদায় হজে যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে খবর দেওয়া হলো যে, সাফিয়া (রাঃ) হায়েজগ্রস্ত হয়েছেন, তখন তিনি বললেন “أحابستنا هي؟” (তিনি কি আমাদের আটকে রাখবেন)? অর্থাৎ তিনি (ﷺ) ভেবেছিলেন যে, সাফিয়া (রাঃ) এখনও তাওয়াফে ইফাযাহ করেননি। তখন সাহাবারা বললেন তিনি ইতিমধ্যে তাওয়াফে ইফাযাহ করে নিয়েছেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইবাদতের উদ্দেশ্যেও মসজিদে অবস্থান করা বৈধ নয়। এছাড়াও প্রমাণিত আছে যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নারীদেরকে ঈদের নামাজ ও যিকিরের জন্য ঈদগাহে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু হায়েজগ্রস্থ নারীদেরকে নামাজের স্থান থেকে দূরে থাকতে বলেছেন।”(ইবনু উসাইমীন; ফাতাওয়া আত-তাহারাহ, পৃষ্ঠা: ২৭৩)
.
শাইখ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, “মাসিক বা ঋতুস্রাবের সময় মহিলাদের জন্য মসজিদে বসে খুত্ববাহ শোনা অনুমোদিত নয়। কারণ ঋতুবতী মহিলার মসজিদে প্রবেশ করা বৈধ নয়, তবে তিনি পাশ দিয়ে যাতায়াত করতে পারেন। পক্ষান্তরে তিনি যদি মসজিদের সাথে সংযুক্ত বা কাছাকাছি কোন স্থানে বসে খুত্ববা শুনতে চান, তাহলে তাতে কোন অসুবিধা নেই, কারণ এই ক্ষেত্রে তিনি মসজিদে প্রবেশ করছেন না’ (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৩৩৬৪৯)।
.
পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে, ঋতুস্রাবগ্রস্ত মহিলার জন্য জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মসজিদে প্রবেশ করা জায়েয নয়। তবে বিশেষ প্রয়োজনে একদিক থেকে অপরদিকে অতিক্রম করতে পারে। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।
সফর এবং কসর সম্পর্কে বিস্তারিত
প্রশ্ন: সফর এবং কসর কাকে বলে? সফর কত প্রকার ও কি কি? কতটুকু দূরত্বে সফর করলে সালাত কসর করা বৈধ?
▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি। অতঃপর: سفر আরবী এক বচনের শব্দ। বহুবচনে أسفار। আভিধানিক অর্থ হল- ভ্রমণ, যাত্রা, প্রস্থান, রওয়ানা ইত্যাদি। আর যিনি সফর করেন তাকে বলা হয় মুসাফির। ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে সফরের সংজ্ঞা: সফর বলতে একজন ব্যক্তি যখন তার শহরের সীমানা ছেড়ে ৮৮.৭ কিলোমিটার (প্রায় ৮৯ কিমি) বা তার চেয়ে বেশি দূরত্বের ভ্রমণে যায়, তখন তাকে শরীয়ত অনুযায়ী মুসাফির (ভ্রমণকারী) বলা হয়। এ অবস্থায় তার জন্য কিছু বিধান সহজ করা হয়, যেমন: চার রাকাতের ফরজ নামাজ কসর করে দুই রাকাআত পড়া। রোজা রাখা না রাখার অনুমতি ইত্যাদি।
.
সফর বা ভ্রমণের প্রকারভেদ: সফর বা ভ্রমণকে কুরআন-হাদীছের আলোকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়।
(১).হারাম বা নিষিদ্ধ সফর। (২).মাকরূহ বা অপসন্দনীয় সফর। (৩). মুবাহ বা জায়েয সফর।(৪). মুস্তাহাব বা পসন্দনীয় সফর। (৫). ওয়াজিব বা আবশ্যকীয় সফর।
.
(১).হারাম বা নিষিদ্ধ সফর: এটি এমন সফর যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদেশ-নিষেধের বিরোধিতা করে কিংবা শরিয়তে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ কাজ সম্পাদনের উদ্দেশ্যে করা হয়। যেমন: কুরআন ও সহীহ হাদীসে যেসব কাজ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে, সেগুলো করতে কোনো স্থানে গমন করা; অথবা এমন কোনো স্থানে সফর করা, যেখানে মহামারী (plague) শুরু হয়েছে যা শরীয়তে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।রাসূল (ﷺ) বলেন: “যদি তোমরা শুনতে পাও (কোন স্থানে মহামারী আক্রান্ত হয়েছে) তাহ’লে সেখানে যেয়ো না। আর তোমরা যেখানে আছ সেখানে আক্রান্ত হ’লে সেখান থেকে বের হয়ো না”।(বুখারী হা/৫৭২৮-৩০) এছাড়া কোন মহিলার মাহরাম ছাড়া সফর করা। রাসূল (ﷺ) বলেন,”মহিলারা মাহরাম (যার সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ) ব্যতীত অন্য কারো সাথে সফর করবে না। মাহরাম কাছে নেই এমতাবস্থায় কোন মহিলার নিকট কোন পুরুষ গমন করতে পারবে না”।(বুখারী হা/১৮৬২; মুসলিম হা/১৩৪১)
.
(২).মাকরূহ বা অপসন্দনীয় সফর: এটি সেই সফর, যা ইসলামী আদর্শ অনুসরণ না করে সম্পাদিত হয়। যেমন রাতের বেলা একা সফর করা, অথবা তিন জনের বেশি হলে তাদের মধ্য থেকে কাউকে আমীর (দলনেতা) নিযুক্ত না করা।ইবনু ওমর (রাঃ) নবী করীম (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন:”যদি লোকেরা একা সফরে কি ক্ষতি আছে তা জানত, যা আমি জানি, তবে কোন আরোহী রাতে একাকী সফর করত না”।(সহীহ বুখারী হা/২৯৯৮)
.
(৩).মুবাহ বা বৈধ সফর: এমন সফর যা দুনিয়ার বৈধ ও হালাল কাজের উদ্দেশ্যে করা হয় যেমন বিশ্রাম বা মানসিক প্রশান্তির জন্য ভ্রমণ, ব্যবসায়িক প্রয়োজনে সফর, কিংবা কোনো দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে সফর ইত্যাদি।
.
(৪).মুস্তাহাব বা পছন্দনীয় সফর: এটি এমন একটি সফর, যা মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী এবং মসজিদে আকসা-এ সফর করার উদ্দেশ্যে করা হয়। রাসূল (ﷺ) বলেন:”মসজিদুল হারাম, মসজিদুর রাসূল (ছাঃ) এবং মসজিদুল আক্বছা (বাইতুল মাক্বদিস) তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না”।(বুখারী হা/১১৮৯; মুসলিম হা/৮২৭) ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,”উপদেশ গ্রহণের জন্য, পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ধ্বংসাবশেষ ও তাদের স্মৃতিসমূহ দেখার জন্য সফর করা মুস্তাহাব”।(তাফসীরে কুরতুবী, সূরা আন‘আম-১১ নং আয়াতে তাফসীর দ্রষ্টব্য)
.
(৫).ওয়াজিব বা অবশ্যিক সফর: এটি সেই সফর, যা আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কোন নির্দেশ পালনের উদ্দেশ্যে করা হয়। যেমন হজ্জ আদায়ের জন্য মক্কায় সফর করা, কিংবা মুসলিম শাসক যদি জিহাদের নির্দেশ দেন, তবে তার নির্দেশনা পালনার্থে জিহাদের ময়দানে রওনা হওয়া ইত্যাদি। যেমন আল্লাহ বলেন,وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوْكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَّأْتِيْنَ مِنْ كُلِّ فَجٍّ عَمِيْقٍ- ‘আর তুমি জনগণের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা প্রচার করে দাও। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সকল প্রকার (পথশ্রান্ত) কৃশকায় উটের উপর সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত হ’তে’ (সূরা হজ্জ: ২২/২৭)। ফরয ইলম অর্জন করার জন্য যে কোন স্থানে ভ্রমণ করা।রাসূল (ﷺ) বলেন,”কোন ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের জন্য কোন পথ অবলম্বন করলে,আল্লাহ এই অসীলায় তার জন্য জান্নাতের একটি পথ সুগম করে দেন”।(ইবনু মাজাহ হা/২২৩; তিরমিযী হা/২৬৪৬; সহীহুল জামি‘ হা/৬২৯৮)
.
অপরদিকে ক্বসর (قصر) আরবী শব্দ। এর অর্থ সংক্ষিপ্ত করা, কমানো ইতাদি। পারিভাষিক অর্থে চার রাক‘আত বিশিষ্ট সালাত দু’রাক‘আত করে পড়াকে ক্বসর বলে। অর্থাৎ যোহর, আসর ও এশার এই তিন ওয়াক্ত ফরজ সালাত ৪ রাক‘আতের পরিবর্তে ২ রাক‘আত আদায় করা। ফজর ও মাগরিবের সালাতে কছর নেই। সফরে সালাত ক্বসর করা জায়েজ এটি কুরআন-সুন্নাহ এবং সালাফদের ইজমা (সম্মিলিত ঐক্যমত) রয়েছে। কুরআন সুন্নাহ থেকে দলিল হচ্ছে,আল্লাহ তা‘আলা বলেন:وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِي الأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَقْصُرُواْ مِنَ الصَّلاَةِ إِنْ خِفْتُمْ أَن يَفْتِنَكُمُ الَّذِينَ كَفَرُواْ إِنَّ الْكَافِرِينَ كَانُواْ لَكُمْ عَدُوّاً مُّبِيناً-“যখন তোমরা সফর কর, তখন তোমাদের সালাতে ক্বছর করায় কোন দোষ নেই। যদি তোমরা আশংকা কর যে, কাফেররা তোমাদেরকে উত্যক্ত করবে। নিশ্চয়ই কাফেররা তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু”।(সূরা নিসা/১০১)। উক্ত আয়াত থেকে যদিও এই কথা বুঝা যায় যে, কেবল ভয়ের সময় সালাত কসর করা বৈধ, তবুও ভয় ছাড়া নিরাপদ সময়েও কসর করা যায়। মহানবী (ﷺ) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-গণ ভয়-অভয় উভয় অবস্থাতেই কসর করেছেন বলে প্রমাণিত। প্রখ্যাত সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) [মৃত: ৭৩ হি.] বলেন,صَحِبْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَكَانَ لاَ يَزِيدُ فِي السَّفَرِ عَلَى رَكْعَتَيْنِ، وَأَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ وَعُثْمَانَ كَذَلِكَ- رضى الله عنهم “আমি রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম,তিনি সফরে দু’রাক‘আতের অধিক সালাত আদায় করতেন না। আবূ বকর, ওমর ও উসমান (রাঃ)-এরও এই রীতি ছিল।”(সহীহ বুখারী হা/১১০২) অপর বর্ননায় যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ,মুফাসসিরকুল শিরোমণি, সাহাবী ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) [মৃত: ৬৮ হি.] বলেন:فَرَضَ اللَّهُ الصَّلَاةَ عَلَى لِسَانِ نَبِيِّكُمْ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْحَضَرِ أَرْبَعًا وَفِي السَّفَرِ رَكْعَتَيْنِ وَفِي الْخَوْف رَكْعَة “আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের নবী (ﷺ)-এর যবানীতে মুক্বীম অবস্থায় চার রাক‘আত, সফরকালে দু’রাক‘আত এবং ভয়ের সময় এক রাক‘আত সালাত ফরয করেছেন”।(সহীহ মুসলিম হা/৬৮৭; নাসাঈ হা/১৫৩২; মুসনাদে আহমাদ হা/২২৯৩; মিশকাত হা/১৩৪৯)
.
সফর অবস্থায় কসরের বিধান মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা কছর করতেন। তাই কছর করাই উত্তম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কসর হলো সাদাক্বা, যা আল্লাহ তোমাদের জন্য সাদাক্বা করেছেন। সুতরাং তোমরা তার সাদাক্বা গ্রহণ করো’ (সহীহ মুসলিম, হা/৬৮৬)। আর আল্লাহর দেওয়া ছাড় গ্রহণ করাই উত্তম। কিন্তু কেউ কসর না করলে সে সুন্নাত পরিত্যাগ করল, তবে সে গুনাহগার হবে না। আর সফরে সালাত কসর করা জায়েজ এই মর্মে ইজমা বর্ননা করেছেন শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন:قصر الصلاة للمسافر سنة مؤكدة لا ينبغي تركها ، باتفاق الأئمة ، إلا ما يُحكى عن الشافعي في أحد قوليه : أن الإتمام أفضل ، ولكن الصحيح من مذهبه : أن القصر أفضل .وانظر”মুসাফিরের জন্য সালাত কসর করা (চার রাকাআতের সালাত দুই রাকাআত পড়া) একটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা, যা পরিত্যাগ করা উচিত নয় এ বিষয়ে ইমামগণের ঐকমত্য রয়েছে। তবে ইমাম শাফেয়ীর একটি বক্তব্যে ব্যতিক্রম পাওয়া যায়, যেখানে তিনি বলেছেন: পূর্ণভাবে সালাত আদায় করাই উত্তম। তবে তাঁর মাজহাব অনুযায়ী সঠিক মত হচ্ছে কসর করাই উত্তম।”(ইমাম নববী আল-মাজমু‘ খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২১৮-২২৩) হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,ولا خلاف بين الأئمة في قصر الصلاة في السفر”সফরে সালাত কসর করার ব্যাপারে ইমামদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই।”(ইবনু কুদামা, আল-মুগনি, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২৭৪)।
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
প্রশ্ন: কতটুকু দূরত্বে সফর করলে সালাত কসর করা বৈধ এবং এর সময়সীমা কতদিন?
.
.
সফরে সালাত কসর করে আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট দূরত্ব কত হওয়া উচিত এই বিষয়ে কুরআন ও সহীহ হাদীসে কোনো সুস্পষ্ট পরিমাণ বা দূরত্ব উল্লেখিত হয়নি।তাই এ বিষয়ে উলামায়ে কিরামের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। সাধারণভাবে তাঁদের মতামত দুটি প্রধান অভিমত হিসেবে পরিগণিত।
.
(১).একদল আলেমের মতে শরিয়তে অনুমোদিত সফর হলো প্রচলিত অর্থে ভ্রমণ, যার দূরত্ব অন্তত প্রায় ৮০ কিমি (৪৮ মাইল)। এই দূরত্ব বা তার বেশি ভ্রমণে মুসাফিরের জন্য রুখসত (ছাড়) গুলো বৈধ যেমন, তিনদিন তিনরাত মোজার উপর মাসেহ, চার রাকাআত বিশিষ্ট সালাত দুই রাকাতে (কসর) আদায়, দুই ওয়াক্তের সালাত একত্রে জমা করে আদায় করা, এবং রমজানের রোযা ভঙ্গ করা।সুতরাং মুসাফির ব্যক্তি যে স্থানের উদ্দেশ্যে সফর করেছেন সে স্থানে পৌঁছে যদি সেখানে চারদিনের বেশি সময় অবস্থান করার নিয়ত করেন তাহলে তিনি সফরকালীন ছাড়গুলো গ্রহণ করবেন না,বরং পরিপূর্ণ সালাত আদায় করবেন। কিন্তু যদি চারদিন বা তার চেয়ে কম সময় অবস্থান করার নিয়ত করেন তাহলে তিনি সফরকালীন ছাড়গুলো গ্রহণ করতে পারেন।আর যে মুসাফির কোন একটি স্থানে অবস্থান করছেন; অথচ তিনি জানেন না যে, কখন তার প্রয়োজন শেষ হবে এবং তিনি সেখানে অবস্থানের জন্য সুনির্দিষ্ট কোন সময় নির্ধারণ করেননি; এভাবে তিনি যদি দীর্ঘদিন সেখানে থেকে যান তবুও তিনি সফরকালীন ছাড়গুলো গ্রহণ করতে পারবেন।সাহাবাদের মধ্যে এ ব্যাপারে বিভিন্ন মত পরিলক্ষিত হয়। তবে প্রখ্যাত সাহাবী ইবনে আব্বাস ও ইবনে উমার (রাঃ) ৪৮ মাইল দূরে গিয়ে কসর করতেন এবং সিয়াম রাখতেন না। জেনে রাখা ভাল যে,এই সফর পায়ে হেঁটে হোক অথবা উটের পিঠে, সাইকেলে হোক বা বাসে-ট্রেনে, পানি-জাহাজে হোক অথবা এরোপ্লেনে, কষ্টের হোক অথবা আরামের, বৈধ কোন কাজের জন্য হলে তাতে কসর বৈধ।পাশাপাশি দূরবর্তী সফর থেকে যদি একদিনের ভিতরেই ফিরে আসে অথবা নিকটবর্তী সফরে ২/৩ দিন অবস্থান করে তবুও তাতে কসর-জমা চলবে।(মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্যাহ্; খণ্ড: ২০; পৃষ্ঠা: ১৫৭; এবং ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৯৯)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,مَذْهَبُ أَبِي عَبْدِ اللَّهِ (يعني الإمام أحمد) أَنَّ الْقَصْرَ لا يَجُوزُ فِي أَقَلِّ مِنْ سِتَّةَ عَشَرَ فَرْسَخًا، وَالْفَرْسَخُ: ثَلاثَةُ أَمْيَالٍ، فَيَكُونُ ثَمَانِيَةً وَأَرْبَعِينَ مِيلا. وَقَدْ قَدَرَهُ ابْنُ عَبَّاسٍ، فَقَالَ: مِنْ عُسْفَانَ إلَى مَكَّةَ، وَمِنْ الطَّائِفِ إلَى مَكَّةَ، وَمِنْ جُدَّةَ إلَى مَكَّةَ.فَعَلَى هَذَا تَكُونُ مَسَافَةُ الْقَصْرِ يَوْمَيْنِ قَاصِدَيْنِ. وَهَذَا قَوْلُ ابْنِ عَبَّاسٍ وَابْنِ عُمَرَ. وَإِلَيْهِ ذَهَبَ مَالِكٌ، وَاللَّيْثُ، وَالشَّافِعِيُّ ا“আবু আব্দুল্লাহ (অর্থাৎ ইমাম আহমাদ) এর মত হল ১৬ ফারসাখ এর কম দূরত্বে ক্বসর (সালাত সংক্ষিপ্ত করা) জায়েয নয়। এক ফারসাখ হল তিন মাইল। সুতরাং ১৬ ফারসাখ দূরত্ব হল ৪৮ মাইল। ইবনু আব্বাস (রা.) এই দূরত্ব নির্ধারণ করেছেন। তিনি বলেছেন: এই দূরত্ব উসফান থেকে মক্কা পর্যন্ত, তায়েফ থেকে মক্কা পর্যন্ত, জেদ্দা থেকে মক্কা পর্যন্ত। এর উপর ভিত্তি করে বলা যায়, ক্বসর (সালাত সংক্ষিপ্ত করা) বৈধকারী দূরত্ব হল সেই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে দুই দিনের ভ্রমণ। এটি হল ইবনু আব্বাস ও ইবনু উমর এর মত। এই মতটি গ্রহণ করেছেন ইমাম মালেক, আল-লাইস ও শাফেয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) প্রমুখ।’’(ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৪৮)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন,”যে সফরের মধ্যে সফরের ছাড়গুলো গ্রহণ করা শরিয়তসম্মত সেটা হচ্ছে প্রচলিত প্রথায় যেটাকে সফর বলা হয়। এর পরিমাণ হচ্ছে প্রায় ৮০ কিঃমিঃ। যে ব্যক্তি এ পরিমাণ বা এতোর্ধ দূরত্ব অতিক্রমের উদ্দেশ্য নিয়ে সফরে বের হবে সে ব্যক্তি সফরের ছাড়গুলো গ্রহণ করতে পারবেন; যেমন- মোজার ওপর তিন দিন তিন রাত মাসেহ করা, দুই ওয়াক্তের সালাত একত্রে আদায় করা ও নামাযগুলো কসর (সংখ্যাহ্রাস) করে আদায় করা, রমযানের রোযা না রাখা। এ মুসাফির ব্যক্তি যদি কোন স্থানে চারদিনের বেশি সময় অবস্থান করার নিয়ত করেন তাহলে তিনি আর সফরের ছাড়গুলো গ্রহণ করতে পারবেন না। যদি তিনি চারদিন বা এর চেয়ে কম সময় অবস্থানের নিয়ত করেন তাহলে সফরের ছাড়গুলো গ্রহণ করতে পারবেন। আর যে মুসাফির কোন এক স্থানে অবস্থান করছেন কিন্তু তিনি জানেন না যে, কখন তার প্রয়োজন শেষ হবে এবং অবস্থানের জন্য কোন সময় তিনি নির্দিষ্ট করেননি তিনিও সফরের ছাড়গুলো গ্রহণ করতে পারবেন; এমনকি সে অবস্থান অনেক দীর্ঘ হলেও। এক্ষেত্রে স্থলপথে সফর ও জল পথে সফরের মাঝে কোন পার্থক্য নেই।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৯৯)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] সফরের দূরত্ব সম্পর্কে বলেন:الذي عليه جمهور أهل العلم أن ذلك يقدر بنحو ثمانين كيلو تقريبا بالنسبة لمن يسير في السيارة، وهكذا الطائرات، وفي السفن والبواخر، هذه المسافة أو ما يقاربها تسمى سفرا، وتعتبر سفرا في العرف فإنه المعروف بين المسلمين، فإذا سافر الإنسان على الإبل، أو على قدميه، أو على السيارات، أو على الطائرات، أو المراكب البحرية، هذه المسافة أو أكثر منها فهو مسافر“অধিকাংশ আলেম যে মতের উপর রয়েছেন তা হচ্ছে- যারা গাড়িতে, প্লেনে, জাহাজে, স্টিমারে ভ্রমণ করে তাদের ক্ষেত্রে এই দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার ধরে হিসাব করা।এই দূরত্ব বা তার কাছাকাছি দূরত্বে ভ্রমণকে (শরিয়তের দৃষ্টিতে) সফর বলা হবে এবং মুসলিমদের মাঝে প্রচলিত প্রথা অনুসারেও তা সফর হিসেবে বিবেচিত। অতএব কেউ যদি উটে করে অথবা পায়ে হেঁটে অথবা গাড়িতে অথবা প্লেনে অথবা সামুদ্রিক যানে করে এই দূরত্ব বা তার বেশি অতিক্রম করে তবে সে মুসাফির হিসেবে গণ্য হবে।”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ২৬৭)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে প্রশ্ন করা হয় :ক্বসর (সালাত সংক্ষিপ্ত করা) বৈধকারী দূরত্ব সম্পর্কে এবং ভাড়ায়চালিত গাড়িচালক ৩০০ কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করলে সে কি সালাত ক্বসর (সালাত সংক্ষিপ্ত) করবে? তাঁরা উত্তরে বলেন:مقدار المسافة المبيحة للقصر ثمانون كيلو متر تقريبا على رأي جمهور العلماء، ويجوز لسائق سيارة الأجرة أو غيره أن يصليها قصرا؛ إذا كان يريد قطع المسافة التي ذكرناها في أول الجواب أو أكثر منها.“অধিকাংশ ‘আলেমের রায় অনুসারেক্বসর (সালাত সংক্ষিপ্ত করা) বৈধকারীদূরত্বের পরিমাণ হল প্রায় ৮০ কিলোমিটার। তাই ভাড়ায়চালিত গাড়িচালক অথবা অন্যদের জন্য এক্ষেত্রে সালাত সংক্ষিপ্ত করা জায়েয। যদি সে এ উত্তরের প্রথমে উল্লেখিত দূরত্ব বা তার চেয়ে বেশি পথ অতিক্রমের নিয়তে বের হয়।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৯০)
.
(২).অন্যদিকে কিছু ‘আলেম এই মত ব্যক্ত করেন যে, ইসলামি শরীয়তে সফরের কোন নির্দিষ্ট দূরত্ব নির্ধারণ করা হয়নি। বরং এ ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রথার উপরে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। প্রচলিত প্রথায় একজন মানুষ যতদূর গমন করলে সফর হিসেবে বিবেচনা করা হয় সেটাই সফর হিসেবে বিবেচিত হবে। যার উপর ভিত্তি করে একজন মুসাফিরের জন্য দুই সালাত জমা করে আদায়,ক্বসর (সালাত সংক্ষিপ্ত) করাও সিয়াম ভঙ্গ করা ইত্যাদি বিধিবিধান প্রযোজ্য হয়। এই মতটি অধিক বিশুদ্ধ এবং নিরাপদ। এমনকি এ মতটি বহু গবেষক আলেম বেছে নিয়েছেন; তাঁদের মধ্যে আছেন ইবনু কুদামাহ আল-মাকদিসি ও শাইখুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ, ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুমুল্লাহ)সহ আরও অনেকে।আহালুল আলেমদের মধ্যে ইমাম ইবনে হাযম (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ), শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ্ (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম ইবনে ক্বুদামাহ্ (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ), আল্লামাহ্ শানক্বিত্বী (রাহিমাহুল্লাহ),ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) ও ইমাম আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,”সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মতানুযায়ী যে কোন ধরনের সফরে ক্বছর করা জায়েয, যতক্ষণ পর্যন্ত তাকে সফর বলা হবে, চাই সে সফর দীর্ঘায়িত হোক বা সংক্ষিপ্ত, এর কোন নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। কেননা কুরআন ও সহীহ হাদীসের মধ্যে সফরের কোন নির্দিষ্ট দূরত্ব ও সময় নির্ধারণ করা হয়নি। তাই এ ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রথার উপরে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। প্রচলিত প্রথায় একজন মানুষ যতদূর গমন করলে সফর হিসাবে বিবেচনা করা হয় সেটাই সফর হিসাবে বিবেচিত হবে। যার উপর ভিত্তি করে একজন মুসাফিরের জন্য দুই সালাত জমা ও ক্বসর করবে (আল-মাহাল্লা, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৬-২১; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৬৮; আল-মাজমূঊ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩২৫; মাজমুউল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ, ২৪তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৫, ৩৫, ৪৮, ৪৯; আল-ইখতিয়ারাতুল ফিক্বহিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৪৩৪; আল-মুগনী, ২য় খণ্ড,পৃষ্ঠা: ১৯০; যাদুল মা‘আদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪৬৩; আস-সাইলুল জারার, পৃষ্ঠা: ১৮৮; আযওয়াউল বায়ান, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৭৩; আশ-শারহুল মুমতি‘, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৫১-৩৫৩; সিলসিলা সহীহাহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩১১)।
.
এই মতের পক্ষে দলিল হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তোমরা যখন দেশ-বিদেশে সফর করবে, তখন যদি তোমাদের আশংকা হয় যে, কাফিররা তোমাদেরকে বিপন্ন করবে, সেক্ষেত্রে সালাত ক্বসর করাতে তোমাদের কোন দোষ নেই। নিশ্চয় কাফিররা তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু (সূরা আন-নিসা: ১০১)। ঈসা বিন হাফস বিন ‘আসিম (রাহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবনু ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেছেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম, তিনি সফরে দু’ রাক‘আতের অধিক আদায় করতেন না। আবূ বাকর, ‘উমার ও ‘উসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)-এর একই রীতি ছিল (সহীহ বুখারী, হা/১১০২; সহীহ মুসলিম, হা/৬৮৯)।ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,”এখানে সফরকে কোন নির্দিষ্ট দূরত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়নি। বরং সাধারণ সফরের কথা বলা হয়েছে (আল-মাজমূঊ, ৪র্থ খণ্ড: পৃষ্ঠা: ৩২৬)।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:وَالْحُجَّةُ مَعَ مَنْ جَعَلَ الْقَصْرَ وَالْفِطْرَ مَشْرُوعًا فِي جِنْسِ السَّفَرِ وَلَمْ يَخُصَّ سَفَرًا مِنْ سَفَرٍ. وَهَذَا الْقَوْلُ هُوَ الصَّحِيحُ“যারা যে কোন ধরনের সফরে ক্বসর (সালাত সংক্ষিপ্ত) করা ও সিয়াম ভঙ্গ করাকে শরিয়তসম্মত মত দিয়েছেন, বিশেষ কোন সফরের সাথে নির্দিষ্ট করেননি দলীল তাঁদের পক্ষেই এবং এটাই সঠিক মত।”(ইবনু তাইমিয়া; আল-ফাতাওয়া খণ্ড: ২৪; পৃষ্ঠা: ১০৬)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: মুসাফির ব্যক্তি কতটুকুদূরত্বের ক্ষেত্রে সালাত ক্বসর (সংক্ষিপ্ত করা) করতে পারবে এবং ক্বসর না করে দুই সালাত একত্রিত করা জায়েয কিনা। তিনি উত্তরে বলেন:
المسافة التي تقصر فيها الصلاة حددها بعض العلماء بنحو ثلاثة وثمانين كيلو مترا، وحددها بعض العلماء بما جرى به العرف أنه سفر وإن لم يبلغ ثمانين كيلو مترا، وما قال الناس عنه: إنه ليس بسفر، فليس بسفر ولو بلغ مائة كيلو متر. وهذا الأخير هو اختيار شيخ الإسلام ابن تيمية رحمه الله ، وذلك لأن الله تعالى لم يحدد مسافة معينة لجواز القصر وكذلك النبي صلى الله عليه وسلم لم يحدد مسافة معينة.وقال أنس بن مالك رضي الله عنه: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا خَرَجَ مَسِيرَةَ ثَلاثَةِ أَمْيَالٍ أَوْ ثَلاثَةِ فَرَاسِخَ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ. رواه مسلم (691).وقول شيخ الإسلام ابن تيمية رحمه الله تعالى أقرب إلى الصواب.ولا حرج عند اختلاف العرف فيه أن يأخذ الإنسان بالقول بالتحديد؛ لأنه قال به بعض الأئمة والعلماء المجتهدين، فلا بأس به إن شاء الله تعالى، أما مادام الأمر منضبطا فالرجوع إلى العرف هو الصواب.
“সালাত ক্বসর (সংক্ষিপ্ত) করার দূরত্বকে কিছু আলেম প্রায় ৮৩ কিলোমিটারে নির্দিষ্ট করেছেন। আবার কিছু আলেম প্রচলিত প্রথার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। সফরের দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার না হলেও মানুষ যদি এটাকে সফর গণ্য করে তাহলে সেটা সফর। আর মানুষ যেটাকে সফর হিসেবে গণ্য করে না সেটা ১০০ কিলোমিটার দূরত্বে হলেও সফর নয়। শেষের এই মতটি শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বেছে নিয়েছেন। কেননা আল্লাহ তা‘আলা সালাত ক্বসর করা বৈধ হওয়ার জন্য কোন নির্দিষ্ট দূরত্ব নির্ধারণ করেননি। একইভাবে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও কোন নির্দিষ্ট দূরত্ব নির্ধারণ করেননি। আনাস ইবনে মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন “রাসূলুল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিন মাইল অথবা তিন ফারসাখ দূরত্বের পথে বের হলে সালাত দুই রাকাত আদায় করতেন (অর্থাৎ সালাত সংক্ষিপ্ত করতেন)।”(হাদিসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন হা/৬৯১) শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহর এই বক্তব্যটি সঠিকতর।প্রচলিত প্রথায় দ্বিমত দেখা গেলে যদি কোন ব্যক্তি নির্দিষ্ট দূরত্বের মতটি (অর্থাৎ প্রথম মতটি) গ্রহণ করেন এতে দোষের কিছু নেই। কারণ এটি অনেক ইমাম ও মুজতাহিদ ‘আলেমগণের বক্তব্য। তাই এতে কোন সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ্। আর যদি প্রচলিত প্রথায় স্পষ্ট দিক নির্দেশনা পাওয়া যায় তবে তা অনুসারে আমল করাই সঠিক।”(ফাতওয়া আরকানুল ইসলাম পৃষ্ঠা: ৩৮১)
.
.
সফরে সালাত কসর বা একত্রিত করা এবং রোজা ভঙ্গ করার শর্তাবলী নিয়ে ইমামদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। তবে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জমহুর (বৃহৎ সংখ্যক) আলেমদের অধিক গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী, যিনি সফরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবেন, তিনি তার নিজ শহরের জনবসতি এলাকা বা নগর সীমা অতিক্রম না করা পর্যন্ত সালাত কসর, একত্রিতকরণ এবং রোজা ভঙ্গের ছাড় পাওয়ার অধিকারী নয়। অর্থাৎ, যাত্রা শুরুর পর যখন সে তার শহরের জনবসতি এলাকা পেরিয়ে বাহিরে প্রবেশ করবে, তখনই তার উপর সফরের বিধি-নিষেধ এবং সফর সংক্রান্ত ছাড় (রুকসাত) প্রযোজ্য হবে। কেননা সহীহ হাদিস থেকে জানা যায়, মহানবী (ﷺ) যখন কোনো শহর বা জনপদ ত্যাগ করতেন, তখনই কসর সালাত শুরু করতেন এর আগে নয়। যেমন আনাস (রাঃ) বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর সাথে মক্কা থেকে মদিনার পথে মদীনায় যোহরের ৪ রাকআত এবং যুল-হুলাইফা (মদীনা থেকে প্রায় ৬ মাইল দূরে) পৌঁছে আসরের ২ রাকআত সালাত পড়তাম। (সহীহ বুখারী, হা/হা/১০৮৯) সুতরাং, সফরের ক্ষেত্রে শহর বা গ্রাম ত্যাগ করার আগেই কসর সালাতশুরু করা যাবে না। সালাতের নির্ধারিত সময় এসে গেলে যদি সফরে থাকেন, তাহলে পথেই কসর সালাত আদায় করতে পারেন। আর যদি সফরের সময় সালাতের সময় শেষে বাসায় ফিরে আসেন, তাহলে বাড়িতে পূর্ণ সালাত আদায় করতে হবে। যখন সফর শুরু করে শহরের বাইরে পৌঁছান যেমন বিমানবন্দর, স্টেশন বা বাস স্ট্যান্ডে তখন থেকে কসর সালাত চালু থাকবে। সেখানে কসর সালাত আদায়ের পর যদি কোন কারণে প্লেন বা গাড়ি না এসে বাধাগ্রস্ত হন এবং বাড়ি ফিরতে হয়, তবুও ওই কসর সালাত পুনরায় পূর্ণ পড়তে হবে না। আরও কথা হলো, যদি সফররত অবস্থায় প্লেন বা গাড়ি মুসাফিরের নিজ শহর বা গ্রাম অতিক্রম করেও যাত্রা চালিয়ে যায়, তবুও বিমানবন্দর বা স্টেশন বা বাস-স্ট্যান্ডে কসর সালাত আদায় বৈধই হবে।(বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইমাম ইবনু উসামীন আশ-শারহুল মুমতি‘,আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৫১৪-৫২৩; ইবনু উসামীন লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-৭৯)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ,শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,ليس لمن نوى السفر القصر حتى يخرج من بيوت قريته، ويجعلها وراء ظهره. وبهذا قال مالك، والشافعي، والأوزاعي، وإسحاق، وأبو ثور، وحكي ذلك عن جماعة من التابعين. وحكي عن عطاء، وسليمان بن موسى، أنهما أباحا القصر في البلد لمن نوى السفر,قال ابن المنذر: أجمع كل من نحفظ عنه من أهل العلم، أن للذي يريد السفر أن يقصر الصلاة إذا خرج من بيوت القرية التي يخرج منها” ا”যে ব্যক্তি সফরের ইচ্ছা পোষণ করে, সে তখনই সালাত কসর করতে পারে যখন সে নিজের গ্রামের (অথবা শহরের) ঘরবাড়ি থেকে বের হয়ে যায় এবং সেগুলোকে পেছনে ফেলে আসে। এই মত মালিক, শাফঈ, আওজাঈ, ইসহাক এবং আবু সাওর সহ অনেক ইমামদের। এছাড়া তাবেঈদের একদল আলেমও এ অবস্থান গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে, আতা ও সুলায়মান ইবন মূসা শহরের ভেতর থেকেই সফর ইচ্ছুক ব্যক্তির জন্য কসর করার অনুমতি দিয়েছেন। ইবনুল মুনযির বলেন: “আমরা যে আলেমদের কথা সংরক্ষণ করেছি, তারা সবাই একমত যে, যে ব্যক্তি সফরের উদ্দেশ্যে গ্রামের ঘরবাড়ি অতিক্রম করবে, তখন তার জন্য সালাত কসর করা বৈধ।”(ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৯১) ইমাম নববি (রাহিমাহুল্লাহ) ও অনুরূপ কথা বলেছেন।(নববী; আল মাজমূ; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২২৮)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেন: আল্লাহর জন্য সমস্ত প্রশংসা, আর আল্লাহর রাসূলের ওপর শান্তি ও দোয়া বর্ষিত হোক।অতঃপর; অধিকাংশ আলেমের মতে, ভ্রমণকারী শহরের সীমানা অতিক্রম করার পরই সালাত কসর করে আদায় করতে পারবে। এর প্রমাণ হলো, নবী ﷺ মদীনা থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত কসর শুরু করতেন না। এরপর তিনি দুই রাকআত সালাত আদায় করতেন। মূল বিবেচ্য বিষয় হলো কাজ কখন সম্পাদিত হচ্ছে। সুতরাং, যদি মুয়াজ্জিন যোহর বা আসরের আযান দেয় এবং ভ্রমণকারী শহরের সীমানা অতিক্রম করে, তবে তার উচিত চার রাকআতের সালাত কসর করে দুই রাকআত আদায় করা। কারণ এখানে আসল বিষয় হলো কাজ সম্পাদনের সময়কাল শহর ত্যাগের সময় নয় যেহেতু সালাত আদায়ের সময় সে ভ্রমণ অবস্থায় রয়েছে।” (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ও মাকালাত মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১২, পৃষ্ঠা: ২৯৮)
.
.
যখন কোনো মুসাফির (ভ্রমণকারী) তার নিজ শহর বা স্থায়ী বসবাসের এলাকায় প্রবেশ করে, তখন সফরের বিশেষ বিধান আর প্রযোজ্য থাকে না, বরং বাতিল হয়ে যায় এবং সে মুকীম (অবস্থানকারী) হিসেবে গণ্য হবে। সে নিজ শহরে স্থায়ীভাবে থাকার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করুক, কিংবা কেবলমাত্র অতিক্রম করার জন্য, অথবা কোনো প্রয়োজনে যেকোনো কারণে হোক না কেন, তা প্রযোজ্য। সফরের বিধান শেষ হওয়ার মানে হচ্ছে, সে সেই জায়গায় ফিরে এসেছে যেখান থেকে সালতের কসর শুরু করেছিল। অতএব, যদি সে তার শহরের কাছাকাছি এসে পৌঁছায় আর সালাতের সময় হয়ে যায়, তবে সে তখনও মুসাফির বিবেচিত হবে যতক্ষণ না সে নিজ শহরে প্রবেশ করে।(বিস্তারিত জানতে দেখুন; আল মাওসুয়াতুল ফিক্বহিয়্যাহ; খণ্ড: ২৭; পৃষ্ঠা: ২৮৭)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: আমি ভ্রমণে ছিলাম এবং ভ্রমণ থেকে ফেরার সময় নিয়ত করেছিলাম যে, আমি আমার বাসায় পৌঁছে যোহর ও আসরের নামাজ জমা (একত্র) করে আদায় করব। এখন প্রশ্ন হলো, আমি কি এই দুই নামাজ কসর করে পড়তে পারব? আমি কিন্তু আসরের পর বাসায় পৌঁছেছি। উত্তরে তাঁরা বলেছিলেন:إذا وصل المسافر إلى بلده ، فإنه لا يجوز له قصر الصلاة ؛ لانتهاء السفر بدخوله إلى بلده ، ولو كانت الصلاة قد وجبت عليه قبل وصوله ؛ لأن العبرة بحالة أداء الصلاة، لا بحالة وجوبها عليه في هذه الحالة”যখন একজন মুসাফির তার নিজ শহরে পৌঁছে যায়, তখন তার জন্য নামাজ কসর করা জায়েজ নেই। কারণ, সে তার শহরে প্রবেশ করার মাধ্যমে মুসাফির হওয়া শেষ হয়ে গেছে। যদিও সে সালাত তার ওপর ফরজ হয়েছিল শহরে পৌঁছানোর আগে, তবুও বিচার হবে সালাত আদায়ের সময় অবস্থার ওপর, ফরজ হওয়ার সময়ের ওপর নয়। (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমাহ; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৪৪৯)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: যদি কেউ তার পরিবার থেকে দূরে এমন এক জায়গায় যায় যেখানে সে থেকে যাওয়ার (স্থায়ী হওয়ার) নিয়ত করে এবং আগের শহরে ফেরার কোনো ইচ্ছা না থাকে, তারপর কোনো এক সময় সে তার পরিবারকে দেখতে আগের শহরে ফিরে আসে তাহলে সে কি নিজেকে মুসাফির মনে করবে?
উত্তরে শাইখ বলেন:إذا خرج الإنسان عن وطنه الأول بنية الاستقرار في البلد الثاني فإنه إذا رجع إلى وطنه الأول يكون مسافراً ، ما دام على نيته الأولى ، والدليل على ذلك : أن الرسول عليه الصلاة والسلام كان وطنه الأول مكة ولما فتح مكة قصر وفي حجة الوداع قصر .السائل : يا شيخ وإن كان في نفس هذا البلد – بلده الأول – زوجته وأولاده ؟ الشيخ : إي : نعم . حتى وإن كان زوجته وأولاده فيه “যদি কেউ নিজের প্রথম শহর (মূল বাসস্থান) ছেড়ে দ্বিতীয় শহরে স্থায়ীভাবে থাকার নিয়তে চলে যায়, তাহলে সে যখন তার প্রথম শহরে ফিরে আসে, তখনো সে মুসাফির হিসেবে গণ্য হবে যতক্ষণ না তার সেই প্রথম নিয়ত পরিবর্তিত হয়। এর প্রমাণ হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রথম শহর ছিল মক্কা, এবং তিনি যখন মক্কা বিজয়ের সময় ফিরে আসেন, তখন তিনি সালাত কসর করেছিলেন, হজ্জ্বে বিদায়ের সময়ও কসর করেছিলেন। প্রশ্নকারী জিজ্ঞেস করলেন: হে শাইখ! যদি ঐ শহরেই তার স্ত্রী-সন্তান বসবাস করে, তাহলেও? শাইখ উত্তর দিলেন: হ্যাঁ, তাহলেও। এমনকি যদি তার স্ত্রী ও সন্তানরাও সেখানে থাকে, তবুও সে মুসাফিরই থাকবে।”(ইবনু উসাইমীন; লিক্বাউল বাবিল মাফতুহ; ২৩/৮২)
.
.
জমহুর উলামাদের বিশুদ্ধ মত অনুসারে,যদি কোনো মুসাফির ৪ দিনের বেশি সময়ের জন্য অবস্থান করার নিয়ত করে, তাহলে সে সালাতগুলো পূর্ণ সংখ্যায় (কাদাহ পূর্ণ করে) আদায় করবে। অন্যদিকে, যদি কোনো মুসাফির সফরে গিয়ে নির্দিষ্ট কোনো দিনের অবস্থানের সংকল্প না করে, অর্থাৎ যেই কাজে গিয়েছে সেটি শেষ হয়ে গেলে ফিরে আসার নিয়ত থাকে, অথবা পথে কোনো বাধা বা অসুবিধা দেখা দিলে সেই বাধা কাটিয়ে ওঠা পর্যন্ত নামায কসর করে আদায় করা জায়েজ। দলিল মহানবী ﷺ) একবার একটি সফরে ১৯ দিন ছিলেন এবং ততদিন সালাত কসর করেছেন।(সহীহ বুখারী হা/১০৮০) আনাস (রাযি.) শুআনূতে দুই বছর অবস্থান করেছিলেন এবং সে সময়ও কসর নামায আদায় করে গিয়েছিলেন। (মুওয়াত্ত্বা মালেক খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৪৮৮; ফিকহুস সুন্নাহ; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২৮৬) আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাযি. শুআনূতে বরফের কারণে ছয় মাস পর্যন্ত আযার বাইজানে আটকা পড়ে ছিলেন এবং ততদিন কসর করে নামায আদায় করেছিলেন। (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক; ২/৪৩৩৯, বায়হাকী খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৫২) অন্যদিকে, বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে গিয়ে বসবাস শুরু করলে যেমন ব্যবসা, চাকুরি বা পড়াশোনার জন্য দীর্ঘদিন অবস্থান করা হয়, তখন আর কসর নামায চলবে না। তবে যদি কোনো সফরকারী নির্দিষ্ট দিনের অবস্থানের সংকল্প নিয়ে না থাকে, এবং কাজ শেষ না হয়, ততদিন পর্যন্ত সে মুসাফিরই এবং কসর নামায করতে পারে। এজন্য ৪ কিংবা তারও অধিক দিনের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত স্থায়ী বসবাসের নিয়ত না করে, ততদিন সে সফরকারীই গণ্য। এখানে এক ব্যতিক্রমমূলক দৃষ্টিকোণ হলো, যারা প্রতিদিন ভাড়া গাড়ি, বাস, ট্রেন বা প্লেনে যাতায়াত করেন, তারা ও মুসাফির হিসেবে গণ্য হবেন এবং তাদের জন্যও নামায কসর করা যথাযথ।”( বিস্তারিত জানতে দেখুন; ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪০৬-৪০৭; মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্যাহ; ২২/১০৩; ইবনু উসাইমীন; আশ শারহুল মুমতি; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৫৩২-৫৩৯)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেনمَنْ لَمْ يُجْمِعْ الْإِقَامَةَ مُدَّةً تَزِيدُ عَلَى إحْدَى وَعِشْرِينَ صَلَاةً، فَلَهُ الْقَصْرُ، وَلَوْ أَقَامَ سِنِينَ، مِثْلُ أَنْ يُقِيمَ لِقَضَاءِ حَاجَةٍ يَرْجُو نَجَاحَهَا، أَوْ لِجِهَادِ عَدُوٍّ، أَوْ حَبَسَهُ سُلْطَانٌ، أَوْ مَرَضٌ، وَسَوَاءٌ غَلَبَ عَلَى ظَنِّهِ انْقِضَاءُ الْحَاجَةِ فِي مُدَّةٍ يَسِيرَةٍ، أَوْ كَثِيرَةٍ، بَعْدَ أَنْ يَحْتَمِلَ انْقِضَاؤُهَا فِي الْمُدَّةِ الَّتِي لَا تَقْطَعُ حُكْمَ السَّفَرِ.قَالَ ابْنُ الْمُنْذِرِ: أَجْمَعَ أَهْلُ الْعِلْمِ أَنَّ لِلْمُسَافِرِ أَنْ يَقْصُرَ مَا لَمْ يُجْمِعْ إقَامَةً، وَإِنْ أَتَى عَلَيْهِ سِنُونَ”যে ব্যক্তি ২১ ওয়াক্ত সালাতের চেয়ে বেশি সময় অবস্থানের মনস্থির করেনি সে ব্যক্তি কসর করতে পারেন। এমনকি তিনি যদি কোন কাজ শেষ করার তাগিদে কিংবা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে কিংবা শাসক তাকে আটক রাখার কারণে কিংবা অসুস্থতার কারণে বছরের পর বছর থেকে যান তবুও। কসরের সময়ের চেয়েও কম সময়ের মধ্যে কাজটি নিষ্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকার পর যদি স্বল্প সময়ে কিংবা বেশি সময়ে কাজটি নিষ্পন্ন হওয়ার প্রবল ধারণা হয় তবুও হুকুমে হেরফের হবে না। ইবনুল মুনযির (রহঃ) বলেন: আলেমগণ ইজমা করেছেন যে, মুসাফির যদি মুকীম হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেয় তাহলে সে যদি বছর বছর থেকে যায় তবুও সে মুসাফির।”(ইবনে কুদামাহ আল-মুগনি’ খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২১৫)
.
.
যখন কোনো মুসাফির কোনো মুকীম (অবস্থানকারী) এর পিছনে সালাত আদায় করবে তখন মুসাফিরের উপর কর্তব্য হবে সে সালাতটি পূর্ণরূপে আদায় করা। সে সালাতের শুরু থেকে পেলো নাকি কেবল এক রাকা‘আত পেলো অথবা দুই রাকা‘আত বা তিন রাকা‘আত পেলো এতে কোনো তারতম্য হবে না। তখন মুসাফিরের জন্য কসর করা জায়েয হবে না। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যেমনটি বুখার ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে;إنما جعل الإمام ليؤتم به فلا تختلفوا عليه“ইমাম তো নির্ধারণ করা হয়েছে তাকে অনুসরণ অনুকরণ করার জন্য, সুতরাং তোমরা তার সাথে ভিন্নমত করো না”।(সহীহ বুখারী হা/৭২২) তাছাড়া ইমাম মুসলিম ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন, যখন তাক জিজ্ঞেস করা হলো, মুসাফিরের বিধান এমন কেনো যে সে যখন একা পড়ে তখন কসর করে কিন্তু (মুকীম) ইমামের পিছনে চার রাকা‘আত পড়ে? তখন তিনি বললেন,«تلك هي السنة”এটাই হচ্ছে সুন্নাহ তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ”। তাছাড়া জামাতের সাথে সালাত আদায় করা অন্যদের মত মুসাফিরের ওপরও ওয়াজিব।(বিস্তারিত জানতে দেখুন ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৮২৬৫৮)।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: যদি একজন ব্যক্তি জেদ্দায় ভ্রমণ করে, উদাহরণস্বরূপ, তাকে কি তার নামায সংক্ষিপ্ত করার অনুমতি দেওয়া হবে নাকি তাকে মসজিদে জামাতের সাথে সালাত আদায় করতে হবে? তিনি জবাবে বলেন:إذا كان المسافر في الطريق فلا بأس ، أما إذا وصل البلد فلا يصلي وحده ، بل عليه أن يصلي مع الناس ويتم ، أما في الطريق إذا كان وحده وحضرت الصلاة فلا بأس أن يصلي في السفر وحده ويقصر الرباعية اثنتين”
“মুসাফির যদি পথেই থাকে তবে তাতে কিছু আসে যায় না, তবে যদি সে তার গন্তব্যে পৌঁছে থাকে তবে তার নিজের নামায পড়া উচিত নয়, বরং তাকে লোকদের সাথে জামআতে সালাত আদায় করতে হবে এবং পূর্ণরূপে সালাত আদায় করতে হবে। কিন্তু যদি সে রাস্তায় থাকে এবং একা থাকে এবং সালাতের সময় হয়ে যায়, তবে তার নিজের সালাত পড়া এবং সফর অবস্থায় সালাত সংক্ষিপ্ত করে চার রাকাআত সালাত দুই রাকাআত পড়ায় কোন দোষ নেই।”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ খন্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ২৯৭)
.
সৌদি সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: শাইখ আমি যদি সফরে থাকি এবং সালাতের আযান শুনতে পাই, তাহলে কি আমাকে মসজিদে সালাত আদায় করতে হবে? আমি যেখানে অবস্থান করছি সেখানে যদি সালাত পড়ি, তাতে কি দোষ আছে? যদি আমার সফরের সময়কাল টানা চার দিনের বেশি হয়, তাহলে আমি কি আমার সালাত সংক্ষিপ্ত করব নাকি পূর্ণ আদায় করব?
তিনি উত্তর দিলেনঃ “আপনি যেখানে অবস্থান করছেন সেখানে যদি আপনি আযান শুনতে পান, তাহলে আপনাকে মসজিদে উপস্থিত হতে হবে, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন এক ব্যক্তিকে বলেছিলেন যে তার কাছে বাড়িতে সালাত আদায়ের অনুমতি চেয়েছিল। রাসূল ﷺ তাকে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কি আযান শুনতে পাও? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহলে সালাতে এসো।(মুসলিম হা/৬৫৩; নাসাঈ হা/৮৫০; মিশকাত হা/১০৫৪) এবং নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বহু সংখ্যক সাহাবী হতে বর্ণিত আছে, তারা বলেছেন, যে ব্যক্তি আযান শুনার পরও জামা’আতে উপস্থিত হয়নি তার কোন সালাত নেই।(অর্থাৎ তার সালাত সহীহ নয়), একমাত্র যার একটি অজুহাত রয়েছে সে ব্যক্তি ছাড়া।(সুনানে তিরমিজি হা/২১৭ সনদ সহীহ) শরীয়তে এমন কোন প্রমাণ নেই যে এই বিধানটি শুধুমাত্র সফরকারীর জন্য প্রযোজ্য, যদি না মসজিদে যাওয়া আপনার সফরে কিছু সমস্যা সৃষ্টি করে, যেমন আপনার বিশ্রাম ও ঘুমের প্রয়োজন হলে এবং আপনি যেখানে আছেন সেখানে সালাত পড়তে চান। এমনভাবে থাকা যাতে আপনি ঘুমাতে পারেন, অথবা আপনি ভয় পাচ্ছেন যে আপনি মসজিদে গেলে ইমাম সালাত পড়তে দেরি করবেন এবং আপনি চলে যেতে চান এবং আপনি ভয় পাচ্ছেন যে আপনি ট্রেন বা প্লেন মিস করতে পারেন। (উসাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খন্ড: ১৫; পৃষ্ঠা: ৪২২)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬◐✪◑▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।
সহীহ হাদীস দ্বারা কি কুরআনের কোনো আয়াতের হুকুম রহিত করা বা কোনো সাধারণ বিধানকে নির্দিষ্ট করা সম্ভব
প্রশ্ন: সহীহ হাদীস দ্বারা কি কুরআনের কোনো আয়াতের হুকুম রহিত (নাসিখ) করা বা কোনো সাধারণ বিধানকে নির্দিষ্ট (মুকাইয়্যাদ) করা সম্ভব?
▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি। অতঃপর:
ইমাম খতীব বাগদাদী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর মূল্যবান গ্রন্থ “আল কিফায়াহ ফী ‘ইলমির-রিওয়ায়াহ পৃষ্ঠা: ২৩-এ একটি অধ্যায় রচনা করেছেন এই শিরোনামে:“আল্লাহর কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহর হুকুম সমমর্যাদার, এবং এ দুটোর অনুসরণ করা ওয়াজিব ও দায়িত্বস্বরূপ এরপর তিনি হাদীস উল্লেখ করেন: মিকদাম ইবনু মাদীকারিব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সাবধান! খুব শীঘ্রই এমন ব্যক্তির আগমন ঘটবে যে, সে তার সুসজ্জিত গদিতে হেলান দিয়ে বসে থাকবে, তখন তার নিকট আমার কোন হাদীস পৌছলে সে বলবে, আমাদের ও তোমাদের সামনে তো আল্লাহ তা’আলার কিতাবই আছে। আমরা তাতে যা হালাল পাব সেগুলো হালাল বলে মেনে নিব এবং যেগুলো হারাম পাব সেগুলো হারাম বলে মনে নিব। সাবধান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা হারাম ঘোষণা করেছেন তা আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক হারামকৃত বস্তুর মতোই হারাম।” (তিরমিযী হা/২৬৬৪; সিলসিলাহ সহীহা হা/২৮৭০ সনদ হাসান)।
.
আর সুন্নাহ হচ্ছে আল্লাহর কিতাব, কুরআনে যা সংক্ষেপে এসেছে, তা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে; যা সাধারণভাবে এসেছে, তা নির্দিষ্ট করে দেয়; যা মুক্ত তথা অবাধভাবে বলা হয়েছে, তাকে সীমাবদ্ধ করে; এবং কুরআনের কোন আয়াত রহিতকারী (নাসিখ), আর কোনটি রহিত (মানসুখ)—তাও স্পষ্ট করে দেয়।তাই তাবেঈদের ইমাম মাখহূল (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:القرآن أحوج إلى السنة من السنة إلى القرآن “সুন্নাহ যতটা না কুরআনের মুখাপেক্ষী, কুরআন বরং সুন্নাহর অধিক মুখাপেক্ষী।”(আল কিফায়াহ, পৃষ্ঠা: ৩০)
.
ইবনুন নাজ্জার ফাতূহী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
يخصَّصُ الكتابُ ببعضه ، وبالسنة مطلقا ، سواء كانت متواترة أو آحاد :مثال تخصيص الكتاب بالسنة – حتى مع كونها آحادا ، عند أحمد ومالك والشافعي رضي الله عنهم – : قوله سبحانه وتعالى : ( وأحل لكم ما وراء ذلكم )، فإنه مخصوص بقوله صلى الله عليه وسلم : ( لا تنكح المرأة على عمتها ، ولا على خالتها ) متفق عليه ، ونحوه تخصيص آية السرقة بما دون النصاب ، وقتل المشركين بإخراج المجوس ، وغير ذلك .
قال ابن مفلح : وعند الحنفية إن كان خص بدليل مجمع عليه جاز ، وإلا فلا . وقيل : بالوقف . وقيل : يجوز ولم يقع “
কুরআনের এক অংশকে অপর অংশ দ্বারা নির্দিষ্ট করা যায়, এবং সুন্নাহ দ্বারা নির্দিষ্ট করা যায় তা হাদীস মুতাওয়াতির হোক বা আহাদ হোক,উভয় অবস্থায়ই। উদাহরণ: কুরআনে আল্লাহ বলেন:”উল্লিখিত নারীগণ ব্যতীত আর সকলকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে…”।(সূরা নিসা: ২৪) এই সাধারণ বিধানকে রাসূল (ﷺ)-এর এই হাদীস দ্বারা নির্দিষ্ট করা হয়েছে: এক নারীর সঙ্গে তার ফুফু বা খালাকে একসাথে বিয়ে করো না। (সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত।) এর অনুরূপ আরও উদাহরণ রয়েছে, যেমন চুরির আয়াতকে মালের পরিমাণ নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট করা এবং কাফের হত্যার আয়াতকে অগ্নি উপাসকদের (মজুসদের) ব্যতিক্রম করা ইত্যাদি। ইবনু মুফলিহ বলেন: হানাফী মাযহাব মতে, যদি এটি এমন প্রমাণ দ্বারা নির্দিষ্ট করা হয় যে বিষয়ে সকলের ইজমা তথা ঐকমত্য আছে, তবে তা বৈধ; আর না হলে কেউ কেউ বিরত থাকার কথা বলেছেন,কেউ বলেছেন বৈধ তবে বাস্তবে এমন হয়নি।”(শারহুল কাওকাবুল মুনীর; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩৫৯-৩৬৩)
.
ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: আল-কুরআনুল কারীমকে ‘খবরুল-ওয়াহিদ’ (একজন বর্ণনাকারীর বর্ণিত হাদীস) দ্বারা খাস (বিশেষ) করা যাবে কি না এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে: জামহুর আলেমগণ: তারা বলেন, এটি সর্বদা বৈধ। কিছু হানাবিলা (حنابلة): তারা বলেন, এটি একেবারেই বৈধ নয়। ইমাম গাযযালী ‘আল-মুনখুল’ গ্রন্থে এই মতটি মুতাযিলা ফেরকার পক্ষ থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবনু বুরহান এটি কিছু কালামবিদ ও ফকীহদের থেকে বর্ণনা করেছেন। আবুল হুসাইন ইবনু কাত্তান একদল ইরাকি আলেমের পক্ষ থেকেও এই মতটি উল্লেখ করেছেন। কারখী: তিনি বলেন, কুরআনের সাধারণ নির্দেশ (عام) যদি আগে থেকেই কোনো আলাদা দলীল দ্বারা খাস (বিশেষ) করা হয়ে থাকে তা সে দলীল কাত’ঈ (নিশ্চিত) হোক বা ظني (ধারণাপ্রসূত) তাহলে খবরুল-ওয়াহিদ দিয়ে খাস করা যাবে। কিন্তু যদি তা কোনো সংযুক্ত দলীল (مثل الاستثناء বা الشرط) দ্বারা খাস করা হয়ে থাকে, বা আদৌ খাস করা না হয়ে থাকে তবে খবরুল-ওয়াহিদ দ্বারা খাস করা যাবে না। কাযী আবু বকর: তিনি এই ব্যাপারে ‘ওয়াকফ’ অর্থাৎ নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেছেন (না বৈধ বলেছেন, না অবৈধ)।ইমাম ফখরুদ্দিন রাজী তার ‘আল-মাহসূল’ গ্রন্থে জামহুরদের মতের সমর্থনে দলীল হিসেবে বলেছেন:”আল্লাহর কিতাবের সাধারণ হুকুম (عام) ও খবরুল-ওয়াহিদ দুটিই দলীল। কিন্তু খবরুল-ওয়াহিদ হচ্ছে সাধারণ হুকুমের তুলনায় বেশি নির্দিষ্ট তাই খবরুল-ওয়াহিদকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।” ইবনুস সামআনী এই জায়েজ হওয়ার পক্ষে সাহাবাদের ইজমা (সামূহিক সম্মতি) দ্বারা দলীল দিয়েছেন। যেমন:তাঁরা আল্লাহর বলেন:”আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে তোমাদেরকে অসিয়ত করেন.. (সূরা নিসা: ১১) এই আয়াতকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর এই হাদীস দ্বারা খাস করেছেন:”إنا معشر الأنبياء لا نورث”(‘আমরা নবীগণ উত্তরাধিকারী রাখি না।’) তেমনি তাঁরা মুসলমানদের উত্তরাধিকারকে সীমিত করেছেন এই হাদীসের মাধ্যমে:”لا يرث المسلم الكافر”(‘মুসলমান কাফেরের উত্তরাধিকারী হয় না।’) তাঁরা এই আয়াত فاقتلوا المشركين (অতএব, মুশরিকদের হত্যা করো।(সূরা তওবা: ৫) এই আয়াতকে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ
(রাযি.)-থেকে বর্ণিত, মাজুসদের (অগ্নিপূজকদের) বিষয়ে আগত হাদীস দ্বারা খাস করেছেন। এরকম আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে। এছাড়াও স্পষ্ট একটি দলীল হলো: আল্লাহর পক্ষ থেকে বারবার এমন নির্দেশ এসেছে যে, তাঁর নবীর অনুসরণ করতে হবে কোনো সীমাবদ্ধতা ছাড়া। সুতরাং যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে কোনো দলীল পাওয়া যায়, তখন তা মান্য করা ফরজ। যদি তা কুরআনের কোনো সাধারণ হুকুমের বিরোধিতা করে, তাহলে عام (সাধারণ) হুকুমকে خاص (বিশেষ) হাদীসের আলোকে ব্যাখ্যা করাই কর্তব্য। কারণ, কুরআনের সাধারণ নির্দেশ কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর প্রয়োগ করা হবে এ ধারণাটি ‘ظني’ অর্থাৎ ধারণার উপর ভিত্তি করে, নিশ্চিত নয়। এজন্য সহীহ ‘আহাদ’ হাদীস দ্বারা খাস করায় কোনো বাধা নেই।”(ইরশাদুল ফুহূল; পৃষ্ঠা: ২৬৭–২৮৬)
.
আল্লামা আল আমীন শানক্বীতি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: اعلم أن التحقيق أنه يجوز تخصيص المتواتر بأخبار الآحاد ؛ لأن التخصيص بيان ، وقد قدمنا أن المتواتر يبيَّن بالآحاد ، قرآنًا أو سنة “জেনে রাখো, সঠিক মত হলো মুতাওয়াতির (নিশ্চিতভাবে প্রচলিত) দলীলকে ‘খবরুল-ওয়াহিদ’ দ্বারা খাস করা বৈধ। কারণ, খাস করা মানেই ব্যাখ্যা করা,আর আমরা আগেই বলেছি যে, মুতাওয়াতির দলীলকে আহাদ হাদীস দ্বারাও ব্যাখ্যা করা বৈধ তা কুরআন হোক বা সুন্নাহ।”(মুযাক্কিরা ফি উসূলিল ফিকহ: ২২২)
.
প্রথম মত: আহাদ হাদীসের দ্বারা কুরআনের আয়াত নাসখ (বাতিল বা রহিত) করা বৈধ নয় এটাই অধিকাংশ উসূলবিদের মতামত। বরং ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আর-রিসালাহ (পৃষ্ঠা ১০৬–১০৯)-এ এবং ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) উভয়েই মত দিয়েছেন যে, কুরআনের আয়াতকে এমনকি মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারাও নাসখ রহিত করা জায়েয নয়।এই মতকে ইমাম ইবনু কুদামাহ এবং ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ ও সমর্থন করেছেন। এই বিষয়ে অধিক বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যাবে ইমাম যারকশী আল-শাফি‘ঈর গ্রন্থ আল-বাহরুল মুহীত (খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ২৬২–২৭২)-এ।
দ্বিতীয় মত: আহাদ হাদীস দ্বারা কুরআনের আয়াত নাসখ করা জায়েজ। এই মত কিছু হানাফি উসূলবিদ গ্রহণ করেছেন, যেমন ” (৩/৬২)” গ্রন্থে রয়েছে। এটি সুবকী তাঁর “জামউল জাওয়ামি” (পৃষ্ঠা: ৫৭) গ্রন্থে গ্রহণ করেছেন, যেখানে তিনি বলেন: “কুরআন দ্বারা কুরআন ও সুন্নাহ নাসখ হয়, আর সুন্নাহ দ্বারা কুরআনও। বলা হয়েছে: আহাদ দ্বারা নাসখ জায়েজ নয়। আর সত্য হলো নাসখ কেবল মুতাওয়াতির দ্বারাই ঘটেছে। এটি আল্লামা মুহাম্মাদ আল আমীন শানকিতি (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতও,
.
মুহাম্মাদ আল আমীন শানকিতি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
الذي يظهر لنا أنه الصواب : هو أن أخبار الآحاد الصحيحة يجوز نسخ المتواتر بها إذا ثبت تأخرها عنه ، وأنه لا معارضة بينهما ; لأن المتواتر حق ، والسنة الواردة بعده إنما بينت شيئا جديدا لم يكن موجودا قبل ، فلا معارضة بينهما البتة لاختلاف زمنهما .
فقوله تعالى : ( قل لا أجد في ما أوحي إلي محرما على طاعم يطعمه إلا أن يكون ميتة أو دما مسفوحا أو لحم خنزير فإنه رجس أو فسقا أهل لغير الله به فمن اضطر غير باغ ولا عاد فإن ربك غفور رحيم )
يدل بدلالة المطابقة دلالة صريحة على إباحة لحوم الحمر الأهلية ; لصراحة الحصر بالنفي والإثبات في الآية في ذلك .
فإذا صرح النبي صلى الله عليه وسلم بعد ذلك يوم خيبر في حديث صحيح بأن لحوم الحمر الأهلية غير مباحة ، فلا معارضة البتة بين ذلك الحديث الصحيح ، وبين تلك الآية النازلة قبله بسنين ; لأن الحديث دل على تحريم جديد ، والآية ما نفت تجدد شيء في المستقبل كما هو واضح .
فالتحقيق – إن شاء الله – هو جواز نسخ المتواتر بالآحاد الصحيحة الثابت تأخرها عنه ، وإن خالف فيه جمهور الأصوليين “
“আমাদের কাছে যেটি সঠিক মনে হয়,তা হলো: সহীহ ‘আহাদ’ হাদীস দ্বারা ‘মুতাওয়াতির’ দলীলকে নাসখ (বাতিল বা রহিত) করা বৈধ, যদি তা প্রমাণিত হয় যে ঐ ‘আহাদ’ হাদীসটি ‘মুতাওয়াতির’ দলীলের পরে অবতীর্ণ হয়েছে। এতে কোনো দ্বন্দ্ব বা বিরোধ নেই; কারণ মুতাওয়াতির দলীল তো সত্য এবং তার পরবর্তী সুন্নাহ কেবল একটি নতুন হুকুম বা বিধান জানাচ্ছে, যা পূর্বে ছিল না। ফলে, উভয়ের মধ্যে কোনো বিরোধের অবকাশ নেই, কারণ তারা সময় ও প্রেক্ষিতভেদে অবতীর্ণ হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ,আল্লাহ তাআলার এই বাণী: “বলুন, আমার প্রতি যে ওহী হয়েছে তাতে, লোকে যা খায় তার মধ্যে আমি কিছুই হারাম পাই না, মৃত, বহমান রক্ত ও শুকরের মাংস ছাড়া।কেননা এগুলো অবশ্যই অপবিত্র অথবা যা অবৈধ, আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য উৎসর্গের কারণে। তবে যে কেউ অবাধ্য না হয়ে এবং সীমালংঘন না করে নিরুপায় হয়ে তা গ্রহণে বাধ্য হয়েছে, তবে নিশ্চয় আপনার রব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”(সূরা আন‘আম, আয়াত: ১৪৫) এই আয়াত সরাসরি ও স্পষ্টভাবে গৃহপালিত গাধার মাংস বৈধ হওয়াকে প্রমাণ করে; কারণ এই আয়াতে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ জিনিসগুলোকে নির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অতঃপর বহু বছর পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বার যুদ্ধের দিন, একটি সহীহ হাদীসে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে গৃহপালিত গাধার মাংস খাওয়া হারাম তাহলে এই হাদীস ও পূর্বের কুরআনি আয়াতের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। কারণ হাদীসটি একটি নতুন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এসেছে, এবং আয়াতটি ভবিষ্যতে নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা অবতীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনাকে নাকচ করেনি যা স্পষ্ট।সুতরাং সঠিক গবেষণালব্ধ মতামত ইনশাআল্লাহ হলো, মুতাওয়াতির (আয়াত) কে সহীহ আহাদ দ্বারা নাসখ (বাতিল) করা বৈধ, যদি সহীহভাবে প্রমাণিত হয় যে, ঐ হাদীসটি মুতাওয়াতির দলীলের পরে এসেছে যদিও অধিকাংশ উসূলবিদ এতে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।”(আজওয়াউল ঈমান; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৪৫১-৪৫২)
.
আবু হামিদ মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ আল-গাজালি আত-তুসি,(রাহিমাহুল্লাহ) “আল মুস্তাসফা” গ্রন্থে বলেন:وأما نسخ القرآن بالسنة فنسخ الوصية للوالدين والأقربين بقوله صلى الله عليه وسلم: ألا لا وصية لوارث. لأن آية الميراث لا تمنع الوصية للوالدين والأقربين إذ الجمع ممكن…কুরআনের আয়াতের হুকুমকে সুন্নাহ দ্বারা নাসখ (বাতিল/প্রতিস্থাপন) করার উদাহরণ হলো মৃত্যুর সময় পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য ওসিয়ত করার বিষয়ে কুরআনের নির্দেশকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণী দ্বারা নাসখ ধরা:সাবধান! উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য কোনো ওসিয়ত নেই।”(ইবনু মাজাহ হা/২৭১৪) কারণ, কুরআনের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আয়াতে ওয়ারিস পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য নির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণ করা হলেও,তা ওসিয়ত দেয়ার নিষেধাজ্ঞা প্রমাণ করে না।বরং উভয় হুকুমকে একত্রে গ্রহণ করাও সম্ভব..।”(গাজালি আল মুস্তাসফা; পৃষ্ঠা: ১০০)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:সুন্নাহ কি কুরআনকে নাসখ (বাতিল) করতে পারে নাকি পারে না?
উত্তরে শাইখ বলেন:
:السنة تخصصه، أو تقيد مطلقه، ولا تنسخه عند أهل العلم، والنسخ يختلف فيه العلماء في معناه، فعند السلف والقدماء يسمون التخصيص نسخًا، وهذا يقع في السنة تنسخ بمعنى تخصص، وتقيد. أما أنها ترفع حكم الآية بالكلية الذي هو المصطلح الأخير عند الأصوليين، فإن السنة لا ترفع أحكام القرآن، وإنما تخصص، قد تكون الآية عامة، فتأتي السنة فتخصص كما في قوله -جل وعل-ا: يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ [النساء:11] هذه الآية خصصها قول النبي ﷺ: لا يرث المسلم الكافر فهي عامة مقيدة مخصصة بهذا الحديث مع آيات أخرى بالمعنى.
“সুন্নাহ কুরআনের কোনো হুকুমকে তাখসীস (নির্দিষ্ট) করে অথবা কুরআনের মুক্ত হুকুমকে তাক্বয়ীদ (সীমাবদ্ধ) করে। কিন্তু তা কুরআনের হুকুমকে নাসখ (সম্পূর্ণভাবে বাতিল) করে না আহলুল ইলমদের মতে। ‘নাসখ’ শব্দের অর্থ ও প্রয়োগ বিষয়ে আলেমদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। সলফে সালিহীন ও প্রাচীন উসূলবিদদের কাছে ‘তাখসীস’ (নির্দিষ্টকরণ)-কেও ‘নাসখ’ বলা হতো। এই অর্থে বলা যায়, সুন্নাহ কখনো কখনো (কুরআনকে) নাসখ করে (অর্থাৎ, তা তাখসীস ও তাক্বয়ীদ করে।)” কিন্তু পরবর্তীকালের উসূলবিদদের পরিভাষায় ‘নাসখ’ বলতে বোঝানো হয়: কোনো আয়াতের হুকুম সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করে দেওয়া। এই অর্থে সুন্নাহ কুরআনের হুকুমকে বিলুপ্ত করে না। বরং এটি কোনো আয়াতকে নির্দিষ্ট করে দেয়।উদাহরণস্বরূপ,আল্লাহ তাআলা বলেন;يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ “আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে তোমাদেরকে অসিয়ত করছেন।”(সূরা আন-নিসা: ১১) এই আয়াতটি সাধারণভাবে সকল সন্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:«لا يَرِثُ المسلمُ الكافرَ“মুসলিম কাফেরের উত্তারাধিকারী হয় না”(সহীহ বুখারী হা/৬৭৬৪) এই হাদীসটি ঐ আয়াতের সাধারণতা কমিয়ে দিয়েছে; অর্থাৎ এই হাদীস দ্বারা সেই আয়াতকে সীমাবদ্ধ ও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এমন আরও কিছু আয়াত রয়েছে, যেগুলোকে অর্থের দিক দিয়ে হাদীস দ্বারা নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।”(বিন বায অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফাতওয়া নং-৩৫৩৭) এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া-১৩৮৭৪২)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬◐✪◑▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।
Subscribe to:
Posts (Atom)