Wednesday, August 6, 2025

তাওবা সম্পর্কে বিস্তারিত

 প্রশ্ন: তাওবা শব্দের প্রকৃত অর্থ কী? একনিষ্ঠ হৃদয়ে গীবতসহ সমস্ত গুনাহ থেকে ফিরে আসার উদ্দেশ্যে আল্লাহর নিকট খাঁটি ও গ্রহণযোগ্য তাওবার শর্তসমূহ এবং সঠিক পদ্ধতি কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
▪️প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি। অতঃপর তওবা শব্দের অর্থ হচ্ছে আল্লাহ্‌র দিকে ফিরে আসা, গুনাহ ত্যাগ করা, গুনাহকে অপছন্দ করা, নেক কাজে কসুর হওয়ার জন্য অনুতপ্ত হওয়া।কুরআন ও সুন্নাহর পরিভাষায় তওবার অর্থ বিগত গোনাহের জন্যে অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে তার ধারে কাছে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা। যে কেউ তওবা করলে আল্লাহ্‌ তার তওবা কবুল করেন। তওবাকারীদের কাফেলা চলমান থাকবে।পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় ঘটার পূর্ব পর্যন্ত এ কাফেলা থামবে না।কেউ তওবা করে ডাকাতি থেকে, কেউ তওবা করে যৌনাঙ্গের পাপ থেকে, কেউ তওবা করে মদ্যপান থেকে, কেউ তওবা করে মাদকদ্রব্য থেকে, কেউ তওবা করে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে, কেউ তওবা করে নামায না-পড়া থেকে কিংবা জামাতে হাজিরে অলসতা করা থেকে, কেউ তওবা করে পিতামাতার অবাধ্যতা থেকে, কেউ তওবা করে সুদ-ঘুষ থেকে, কেউ তওবা করে চুরি থেকে, কেউ তওবা করে মানুষ হত্যা করা থেকে, কেউ তওবা করে অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করা থেকে, কেউ তওবা করে সিগারেট খাওয়া থেকে। প্রত্যেক পাপ থেকে আল্লাহ্‌র কাছে তওবাকারীকে স্বাগতম।খাঁটি তওবার মাধ্যমে সে যেন নবজাতক শিশুর মত হয়ে গেল।কারন আল্লাহ্‌ তাআলার রহমত অবারিত, বান্দার প্রতি তাঁর দয়া সর্বব্যাপী। তিনি সহিষ্ণু; তাৎক্ষণিকভাবে আমাদেরকে পাকড়াও করেন না, শাস্তি দেন না, কিংবা ধ্বংস করে দেন না। বরং আমাদেরকে সময় দেন। তিনি তাঁর নবীকে নির্দেশ দিয়েছেন যাতে করে তিনি তাঁর মহানুভবতার ঘোষণা দেন: “বলে দিন, ‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ! আল্লাহ্‌র রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ্‌ তো সব গুনাহ মাফ করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু”।[সূরা যুমার, ৩৯: ৫৩] আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা সবাই আল্লাহ্‌র কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফল হও।”[সূরা নূর, ২৪:৩ ১] আল্লাহ্‌ তাআলা আরও বলেন: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্‌র কাছে খাঁটি তওবা কর।”[সূরা আত্‌তাহরীম, ৬৬: ৮] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাদেম হামযার পিতা আনাস বিন মালেক আল-আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের কেউ মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া উট খুঁজে পেয়ে যতটা খুশি হয়, নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবাতে এর চেয়েও বেশি খুশি হন।”[সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম]আব্দুর রহমানের পিতা আব্দুল্লাহ্‌ বিন উমর বিন আল-খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: “নিশ্চয় আল্লাহ্‌ তাআলা ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার তওবা কবুল করেন যতক্ষণ পর্যন্ত না গড়গড় শব্দ (মৃত্যুর যন্ত্রণা) শুরু হয়।”[সুনানে তিরমিযি: ৩৫৩৭]
.
হাদিসে সাঈদের পিতা সাদ বিন মালিক বিন সিনান আল-খুদরি (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের মাঝে এমন এক লোক ছিল যে নিরানব্বইজন মানুষকে হত্যা করেছে। সে ঐ সময়কার সবচেয়ে জ্ঞানবান ব্যক্তির অনুসন্ধান করল। তাকে একজন ধর্মযাজককে দেখিয়ে দেয়া হল। সে ধর্মযাজকের কাছে এসে বলল: আমি নিরানব্বই জন মানুষকে হত্যা করেছি; আমার জন্য কি তওবার সুযোগ আছে? ধর্মযাজক বলল: না। তখন সে উক্ত ধর্মযাজককে হত্যা করে একশজন পূর্ণ করল। এরপর সে সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি কে আছে তার সন্ধান করল? তখন তাকে একজন ধর্মীয় পণ্ডিতকে দেখিয়ে দেয়া হল। সে (পণ্ডিতকে) বলল যে, সে একশজন মানুষকে হত্যা করেছে; তার জন্যে কি তওবা করার সুযোগ আছে? তিনি বললেন: হ্যাঁ। তার তওবা কবুলের পথে কে প্রতিবন্ধক হতে পারে? তুমি অমুক স্থানে চলে যাও। সেখানে কিছু লোক আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত আছে। তুমিও তাদের সঙ্গে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত হও এবং কখনও তোমার নিজ দেশে ফিরে যাবে না। কেননা, সেটা খুব খারাপ জায়গা। লোকটি নির্দেশিত স্থানের দিকে রওয়ানা হয়ে গেল। অর্ধেক পথ অতিক্রম করার পর তার মৃত্যুর সময় হয়ে গেল। তখন তাকে নিয়ে রহমতের ফেরেশতা ও আযাবের ফেরেশতাদের মধ্যে বিতর্ক দেখা দিল। রহমতের ফেরেশতারা বলল: লোকটি তওবা করে অন্তর থেকে আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছে। আর আযাবের ফেরেশতারা বলল: লোকটি কখনো কোন পুণ্যের কাজ করেনি। এ সময় একজন ফেরেশতা মানুষের বেশে হাজির হল। তারা এ ব্যক্তিকে তাদের মাঝে বিচারক হিসেবে মেনে নিল। তিনি বললেন: তোমরা উভয় দিকের জায়গা মেপে দেখ। যে দিকের ভূমি কম হবে এ লোক তার ভাগের হিসেবে গণ্য হবে। তখন তারা জায়গা মেপে দেখল যে, ঐ ব্যক্তি যে স্থানের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল সে স্থানের কাছাকাছি। ফলে রহমতের ফেরেশতারা লোকটির প্রাণ কেড়ে নিল।”[সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম] সহিহ মুসলিমের এক বর্ণনায় এসেছে যে, “ঐ ব্যক্তি নেককারদের গ্রামের দিকে এক বিঘত এগিয়ে ছিল। ফলে তাকে নেককার গ্রামের অধিবাসী হিসেবে গণ্য করা হয়”।(সহীহ মুসলিম হা/২৭১৬) সহিহ বুখারীর অপর এক বর্ণনায় এসেছে যে:“আল্লাহ্‌ তাআলা এ ভাগের ভূমির কাছে প্রত্যাদেশ করলেন যে, তুমি নিকটবর্তী হয়ে যাও এবং ঐ ভাগের ভূমির কাছে প্রত্যাদেশ করলেন যে, তুমি দূরে যাও। লোকটি বলল: তোমরা এ দুই ভূমির মধ্যবর্তী জায়গা মেপে দেখ। মেপে পাওয়া গেল যে, নেককারদের গ্রামের দিকে এক বিঘত কাছে। তখন তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হল।”(সহীহ বুখারী
হা/৩৪৭০) সহিহ মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় এসেছে যে,“ঐ ব্যক্তি তার বুক দিয়ে ঐ স্থানের দিকে আগাচ্ছিল।”(সহীহ মুসলিম হা/২৭৬৬)
.
▪️দ্বিতীয়ত: তাওবাহ্ খাঁটি হওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। সে শর্তসমূহ পূরণ না করে তাওবাহ্ করলে সে তাওবাহ্ খাঁটি তাওবাহ্ হবে না আর তা আল্লাহর নিকট কবূলও হবে না। শর্তাবলীর সংখ্যা সর্বনিম্ন ৩টি আর সর্বোচ্চ ৬টি। যদি গুনাহের সম্পর্ক শুধু আল্লাহর (অবাধ্যতার) সঙ্গে থাকে এবং কোন মানুষের অধিকারের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না থাকে, তাহলে এ ধরনের তাওবাহ্ ক্ববূলের জন্য ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) ও সাউদী আরবের সাবেক গ্রান্ড মুফতী শাইখ ‘আবদুল ‘আযীয বিন ‘আবদুল্লাহ বিন বায (রহিমাহুল্লাহ) সহ অনেক আলিমের মতে শর্ত ৩টি। তবে কোন গুনাহ যদি মানুষের অধিকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় তাহলে আরও একটি শর্ত বেড়ে তা হয়ে যাবে ৪টি। তবে সাউদী আরবের আরেক বিখ্যাত ‘আলিম শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতে তাওবার শর্ত মোট ৫টি। তবে মানুষের অধিকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুনাহ থেকে তাওবাহ্ করার জন্য অতিরিক্ত ১টি শর্ত যোগ হবে। তা হলো পাওনাদারকে তার হক বা অধিকার ফিরিয়ে দেয়া। সুতরাং যদি এগুলোর মধ্যে একটি শর্তও বাদ পড়ে, তাহলে সেই তাওবাহ্ খাঁটি তাওবাহ্ হবে না। নিম্নে ঐ সকল শর্ত সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো :
.
(১).তাওবাহ্ একমাত্র আল্লাহর জন্য হতে হবে এবং আল্লাহর কাছে করতে হবে।
(২).গুনাহর কাজ করার জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হতে হবে।
(৩).যে গুনাহ হতে তাওবাহ্ করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে।
(৪).ভবিষ্যতে এই গুনাহ আর না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করতে হবে।
(৫).নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাওবাহ্ করতে হবে।
(৬).মানুষের অধিকার তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে।
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,
أن كلَّ من ارتكب معصيةً لزمه المبادرةُ إلى التوبة منها، والتوبةُ من حقوق الله تعالى يُشترط فيها ثلاثة أشياء: أن يُقلع عن المعصية في الحال، وأن يندمَ على فعلها، وأن يَعزِمَ ألاّ يعود إليها. والتوبةُ من حقوق الآدميين يُشترط فيها هذه الثلاثة، ورابع: وهو ردّ الظلامة إلى صاحبها أو طلب عفوه عنها والإِبراء منها، فيجبُ على المغتاب التوبة بهذه الأمور الأربعة، لأن الغيبة حقّ آدمي، ولا بدّ من استحلاله مَن اغتابَه،
“পাপে লিপ্ত প্রত্যেক ব্যক্তির অবশ্য করণীয় হল অনতিবিলম্বে তওবা করা। আর আল্লাহর অধিকাররের সাথে সম্পৃক্ত পাপ থেকে তওবা করার শর্ত তিনটি:
(১) কৃত পাপকর্ম থেকে নিবৃত্ত হওয়া।
(২) কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
(৩) ভবিষ্যতে সেই গুনাহ না করার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প করা।
আর বান্দার সাথে সম্পৃক্ত গুনাহ থেকে তওবা করার ক্ষেত্রে আরো একটি শর্ত যুক্ত হবে, সেটা হ’ল-
(৪) যার অধিকার নষ্ট করা হয়েছে তাকে তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে দায়মুক্ত হয়ে যাওয়া। সুতরাং গীবতকারীকে উপরিউক্ত চারটি শর্ত মেনে তওবা করা ওয়াজিব। কেননা গীবত বান্দার সাথে সংশ্লিষ্ট পাপ। সেজন্য যার গীবত করা হয়েছে তার কাছ থেকেই দায়মুক্ত হওয়া আবশ্যক”।(ইমাম নববী, আল-আযকার, পৃষ্ঠা: ৩৪৬)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন:
قَالَ العلماءُ: التَّوْبَةُ وَاجبَةٌ مِنْ كُلِّ ذَنْب، فإنْ كَانتِ المَعْصِيَةُ بَيْنَ العَبْدِ وبَيْنَ اللهِ تَعَالَى لاَ تَتَعلَّقُ بحقّ آدَمِيٍّ، فَلَهَا ثَلاثَةُ شُرُوط:
أحَدُها: أنْ يُقلِعَ عَنِ المَعصِيَةِ. والثَّانِي: أَنْ يَنْدَمَ عَلَى فِعْلِهَا.والثَّالثُ: أنْ يَعْزِمَ أَنْ لا يعُودَ إِلَيْهَا أَبَدًا. فَإِنْ فُقِدَ أَحَدُ الثَّلاثَةِ لَمْ تَصِحَّ تَوبَتُهُ. وإنْ كَانَتِ المَعْصِيةُ تَتَعَلقُ بآدَمِيٍّ فَشُرُوطُهَا أرْبَعَةٌ: هذِهِ الثَّلاثَةُ، وأنْ يَبْرَأ مِنْ حَقّ صَاحِبِها، فَإِنْ كَانَتْ مالًا أَوْ نَحْوَهُ رَدَّهُ إِلَيْه، وإنْ كَانَت حَدَّ قَذْفٍ ونَحْوَهُ مَكَّنَهُ مِنْهُ أَوْ طَلَبَ عَفْوَهُ، وإنْ كَانْت غِيبَةً استَحَلَّهُ مِنْهَا، ويجِبُ أنْ يَتُوبَ مِنْ جميعِ الذُّنُوبِ، فَإِنْ تَابَ مِنْ بَعْضِها صَحَّتْ تَوْبَتُهُ عِنْدَ أهْلِ الحَقِّ مِنْ ذلِكَ الذَّنْبِ، وبَقِيَ عَلَيهِ البَاقي. وَقَدْ تَظَاهَرَتْ دَلائِلُ الكتَابِ، والسُّنَّةِ، وإجْمَاعِ الأُمَّةِ عَلَى وُجوبِ التَّوبةِ
“আলেমগণ বলেছেন: প্রত্যেক গুনাহ থেকে তাওবা করা ওয়াজিব (অবশ্য পালনীয় কর্তব্য)। যদি গুনাহটি আল্লাহ তা‘আলার হক (অধিকার) সংক্রান্ত হয় এবং তাতে কোনো মানুষের হক সংশ্লিষ্ট না থাকে, তাহলে তাওবার তিনটি শর্ত পূরণ করা আবশ্যক:
(১).গুনাহ পরিত্যাগ করা।
(২).কৃত গুনাহর জন্য আন্তরিক অনুতপ্ত হওয়া।
(৩).ভবিষ্যতে ঐ গুনাহে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।
এই তিন শর্তের একটি শর্তও যদি অনুপস্থিত থাকে, তাহলে তাওবা সহীহ (গ্রহণযোগ্য) হবে না। আর যদি গুনাহটি কোনো মানুষের হকের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়, তাহলে উপরোক্ত তিনটি শর্তের সঙ্গে আরও একটি চতুর্থ শর্ত সংযুক্ত হবে, তা হলো: ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির হক আদায় করে তাকে মুক্ত করা। যদি তা সম্পদ বা এ জাতীয় কিছু হয়, তাহলে তা মালিককে ফিরিয়ে দিতে হবে। আর যদি তা অপবাদ বা মানহানিকর কথা হয়, তবে তাকে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে অথবা তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।আর যদি তা গীবত হয়ে থাকে, তাহলে তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। এছাড়াও, প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত সকল গুনাহ থেকে তাওবা করা। তবে কেউ যদি কিছু গুনাহ থেকে তাওবা করে, তাহলে আহলুস-সুন্নাহর নিকট তা গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ সে গুনাহসমূহের তাওবাকারী হিসেবে গণ্য হবে যদিও অন্যান্য গুনাহ থেকে এখনো দায়মুক্ত হয়নি। আর কুরআন, সুন্নাহ ও মুসলিম উম্মাহর ইজমা (ঐক্যমত) দ্বারা তাওবার আবশ্যকতা প্রমাণিত হয়েছে।”(বিন বায; মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ২৯৮; আরও দেখুন; অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, ফাতওয়া নং-৫৬১/০২)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেন:
وذكر العلماء أن التوبة النصوح هي التي جمعت خمسة شروط :
1- أن تكون خالصة لله عز وجل .
2- أن يكون نادماً حزنا على ما سلف من ذنبه , يتمنى أنه لم يحصل منه .
3- أن يقلع عن المعصية فوراً ، فإن كانت المعصية بفعل محرم تركه في الحال , وإن كانت المعصية بترك واجب فعله في الحال , وإذا كانت المعصية فيما يتعلق بحقوق الخلق لم تصح التوبة منها حتى يتخلص من تلك الحقوق .
4- أن يعزم على أن لا يعود في المستقبل إلى المعصية .
5- أن لا تكون بعد انتهاء وقت قبول التوبة , كما سبق .
আলেমগণ উল্লেখ করেছেন যে,”তাওবাতুন নাসূহ” হলো সেই তাওবাহ যা নিম্নোক্ত পাঁচটি শর্ত পূরণ করে—
(১).তা যেন আল্লাহর জন্যই খালিস (বিশুদ্ধভাবে নিবেদিত) হয়: (অর্থাৎ তাওবাহটি একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে কোনো লোক দেখানো বা দুনিয়াবি উদ্দেশ্যে নয়)।
(২).ব্যক্তি নিজের পূর্ববর্তী গোনাহের জন্য সত্যিকারের অনুতপ্ত ও দুঃখিত থাকবে, এমনকি তার অন্তরে এই আকাঙ্ক্ষা থাকবে—ইশ! যদি এ গোনাহ সে কখনও না করতো!
(৩).সে যেন অবিলম্বে সেই গুনাহ ত্যাগ করে যদি গুনাহটি কোনো হারাম কাজ করে থাকে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই তা ছেড়ে দেবে; আর যদি গুনাহটি কোনো ফরয (আবশ্যিক) কাজ পরিত্যাগ করার মাধ্যমে হয়ে থাকে, তাহলে তা সঙ্গে সঙ্গেই আদায় করবে। আর যদি গুনাহটি মানুষের হক বা অধিকার সংক্রান্ত হয়ে থাকে, তাহলে সেই তওবা তখনো শুদ্ধ হবে না যতক্ষণ না সে মানুষের সেই অধিকার থেকে নিজেকে মুক্ত করে না নেয়।
(৪).ভবিষ্যতে সেই পাপে আর ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা।( অর্থাৎ তাওবাহকারী ব্যক্তির মনে দৃঢ় ইচ্ছা ও প্রতিজ্ঞা থাকতে হবে যে, সে ভবিষ্যতে আর কখনও সেই গোনাহে লিপ্ত হবে না।
(৫).তাওবাহ এমন সময় যেন না হয় যখন তওবার দরজা বন্ধ হয়ে গেছে যেমন ইতঃপূর্বে তা স্পষ্ট করা হয়েছে।(অর্থাৎ তওবা করতে হবে মৃত্যু শুরু হওয়ার পূর্বে এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় শুরু হওয়ার আগে।”(ইমাম ইবনু উসাইমীন; মাজালিসু শারহি রামাদান’ পৃষ্ঠা: ১৪৩; ইবনু উসাইমীন লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-৫৩/৭৩)
.
একনিষ্ঠ হৃদয়ে গীবতসহ সমস্ত গুনাহ থেকে ফিরে আসার উদ্দেশ্যে আল্লাহর নিকট খাঁটি ও গ্রহণযোগ্য তাওবার শর্তসমূহ ৬ টি। এই ৬ টি শর্ত নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
(১).তাওবাহ্ একমাত্র আল্লাহর জন্য হতে হবে এবং আল্লাহর কাছে করতে হবে: খাঁটি তাওবাহ্ কেবল আল্লাহর জন্যই হতে হবে।
আল্লাহর ভয় ও সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কারো খাতিরে যেমন লোক দেখানো, প্রশংসা কুড়ানো, কারো চাপে, মন রক্ষায় বা স্বার্থ উদ্ধারের জন্য—তাওবাহ্ করলে তা কবুল হবে না, বরং নতুন গুনাহর কারণ হতে পারে। তাওবাহ্ হলো আল্লাহর কাছে সরাসরি নিজের গুনাহর জন্য ক্ষমা চাওয়া, নিঃস্বার্থ অন্তরে ফিরে আসা। কোনো পাদ্রী, পীর, মাশায়েখ বা পুরোহিত কারো কাছেই তাওবাহ্ করার সুযোগ নেই; তারা কারো গুনাহ মাফ করতে পারে না। ইসলামে পাপ মোচনের একমাত্র পথ আল্লাহর দরবারে আন্তরিক তাওবাহ্। হ্যাঁ, আলেমগণ তাওবাহ্ করার পদ্ধতি শেখাতে বা পরামর্শ দিতে পারেন; কিন্তু ক্ষমা চাওয়ার কাজটি একান্তই ব্যক্তির আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়। শুধু মুখে কিছু বললেই হয় না, বরং তা হতে হবে হৃদয় নিঃসৃত, গুনাহ থেকে সরে দাঁড়ানোর দৃঢ় সংকল্পসহ।
.
(২). গুনাহের কাজ করার জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হতে হবে: গুনাহ করার পর তা থেকে তাওবাহ্ করতে চাইলে তাওবাকারীকে অবশ্যই তার কৃতকর্মের জন্য অন্তর থেকে অনুতপ্ত ও লজ্জিত হতে হবে। অপরাধকর্মের কারণে লজ্জিত হওয়া খাঁটি তাওবার শর্ত। তাইতো নাবী ﷺ বলেছেন :النَّدَمُ تَوْبَةٌ ‘‘অনুতপ্ত হওয়াই হল তাওবার মূল বিষয়।’’(ইবনু মাজাহ হা/৪২৫২) কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত না হয়ে, অনুতপ্ত না হয়ে যত তাওবাই করা হোক তা আল্লাহ গ্রহণ করবেন না।ইসলামের নীতিমালায় প্রসিদ্ধ নীতি হলো, ‘পাপকাজ করে লজ্জিত হলে পাপ কমে যায়। আর পুণ্য কাজ করে গর্ববোধ করলে পুণ্য বাতিল হয়ে যায়।’ যে পাপ কাজ করে, সে সাধারণ মানুষ। যে পাপ করে অনুতপ্ত হয়, সে নেককার মানুষ; কিন্তু যে পাপ করে তা প্রকাশ করে বেড়ায়, সে শয়তানের অনুসারী। রাসূল (ﷺ) বলেন:“আমার উম্মতের সব গুনাহ মাফ করা হবে, তবে যারা প্রকাশ্যে পাপ করে তাদের নয়।”(সহীহ বুখারী হা/৬০৬৯) তাই পাপ হলে গোপন রাখুন, লজ্জিত হন, এবং একান্তভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান তবেই তাওবা কবুলের আশা করা যায়।
.
(৩).যে গুনাহ হতে তাওবাহ্ করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে: যে ব্যক্তি কোনো গুনাহ থেকে তাওবাহ্ করতে চায়, তার প্রথম করণীয় হলো সেই গুনাহ সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করা। এটি খাঁটি তাওবার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। যদি কেউ কোনো ফরয ইবাদত যেমন যাকাত না দেয়ার গুনাহ থেকে তাওবাহ্ করতে চায়, তাহলে তাকে আগে পূর্বের হিসাব অনুযায়ী যাকাত আদায় করতে হবে। কারণ যাকাত আল্লাহ ও গরীবের হক কেবল তাওবাহ্ করলেই গরীবের হক আদায় হয় না। একইভাবে পিতা-মাতার অবাধ্যতা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকরণ, মদ্যপান, ধূমপান বা সুদের মতো হারাম কাজ ত্যাগ করে, সংশ্লিষ্টদের হক আদায় করে তাওবাহ্ করতে হবে। সুদের সম্পদ থাকলে তা হালাল অর্থ থেকে আলাদা করে সওয়াবের নিয়ত ছাড়াই কল্যাণমুখী কাজে ব্যয় করতে হবে।(বিস্তারিত জানতে দেখুন ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-২৬১১৯) সুতরাং তাওবার পরও যদি কেউ সেই গুনাহ চালিয়ে যায়, তাহলে তা আল্লাহর সঙ্গে ঠাট্টা করার নামান্তর। এটি এমন, যেমন কেউ পা ধুয়ে আবার ময়লায় রেখে দেয় এতে ধোয়ার কোনো অর্থ থাকে না।এ প্রসঙ্গে একটি শিক্ষণীয় কাহিনি রয়েছে: এক ব্যক্তি দুর্গন্ধযুক্ত কুয়ার পানি পবিত্র করতে বারবার পানি তুলেও ব্যর্থ হচ্ছিল। পরে জানা গেল, কুয়ার তলদেশে একটি মৃত বিড়াল ছিল। যতক্ষণ না পচা-গলা সেই মৃতদেহ সরানো হলো, ততক্ষণ পানি বিশুদ্ধ হয়নি। এই গল্প কাল্পনিক হলেও এর মাধ্যমে স্পষ্টভাবেই বোঝা গেল যে, কুয়ার মধ্যে বিড়ালের পচা-গলা দেহ রেখে কুয়ার পানিকে দুর্গন্ধমুক্ত ও পবিত্র করার চেষ্টা করা আর পাপরত অবস্থায় তাওবাহ্ ও ইস্তিগফার করা প্রায় একই কথা। পাপে রত অবস্থায় তাওবাহ্ ও ইস্তিগফার করার কী মূল্য হতে পারে? মদ খেতে খেতে ‘তাওবা-তাওবা’ বললে, ব্যভিচারে লিপ্ত থাকা অবস্থায় ‘আস্তাগফিরুল্লাহ-আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়লে কী লাভ হতে পারে? তাই আগে পাপ বর্জন করতে হবে, তারপর তাওবাহ্ করতে হবে। তবেই সেই তাওবাহ্ কবূল হবে। নয়তো তা হবে পন্ডশ্রম। তবে ইস্তিগফার সবসময়ই করতে থাকতে হবে।
.
(৪).ভবিষ্যতে এই গুনাহ আর না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করতে হবে: খাঁটি তাওবাহ্ করার জন্য কৃত গুনাহর জন্য লজ্জিত হয়ে গুনাহ বর্জন করলেই হবে না। ভবিষ্যতে আর এই গুনাহ না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করতে হবে। যদি তাওবাহ্ করার সময় মনে মনে নিয়ত থাকে যে সুযোগ পেলে আবার ঐ গুনাহর কাজ করবো তাহলে সেই তাওবার কোন গুরুত্ব আল্লাহর কাছে নেই। সেই তাওবাহ্ কোন তাওবাই নয়। যেমন কোন ব্যক্তি অঢেল অর্থ-সম্পত্তির মালিক। এমতাবস্থায় সে ক্ষমতাধর নারী নিয়ে যেনা-ব্যভিচার করার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে বিদেশ গেলো। হঠাৎ কোন এক কারণে তার অর্থ-সম্পদ শেষ হয়ে সে নিঃস্ব হয়ে পড়লো। তখন সে তাওবাহ্ করতে লাগলো। অথচ তার মনে আকাঙ্খা আছে যে, সে যদি আবার অর্থ-সম্পদের মালিক হতে পারে তাহলে সে আবার যেনা করবে। মদ পান করবে। তাহলে তার এই তাওবাহ্ আল্লাহর নিকট কবূল হবে না। তার তাওবাহ্ হচ্ছে অপারগের তাওবাহ্। কোন পাপ কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে তা থেকে তাওবাহ্ করলে তা তাওবাহ্ হয় না। তবে যৌবন বয়সে করা পাপের তাওবাহ্ বৃদ্ধকালে করলে আশা করা যায় আল্লাহ কবূল করবেন। কারণ সে হয়তো যৌবনকালে বুঝতে পারেনি। বৃদ্ধকালে নিজের অপরাধের কথা বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়ে তাওবাহ্ করলে সেই তাওবাও আল্লাহ কবূল করবেন, ইনশা-আল্লা-হ।তবে কখনো কখনো পাপ পুনরায় না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও যদি আবার তা করে ফেলে, তাহলে বলা যাবে না যে, পাপীর আগের তাওবাহ্ কবূল হয়নি, তা বাতিল হয়ে গেছে। কারও আগের তাওবাহ্ কবূল হওয়ার পরও সে আবার পাপে লিপ্ত হতে পারে। তখন সে আবার তাওবাহ্ করবে। ভবিষ্যতে পাপ না করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয়ার পরও যদি অনিচ্ছা সত্ত্বে বারবার সে পাপে লিপ্ত হয়ে যায় তাহলে সে বারবারই তাওবাহ্ করবে। তবে মনে রাখতে হবে পাপী ব্যক্তি কোন অবস্থায় সেই পাপে লিপ্ত হয়েছে তা কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা জানেন। তাই আল্লাহকে ফাঁকি দিয়ে তাওবাহ্ করা যায় না। সাধারণভাবে কেউ যদি অনিচ্ছকৃত বা না জেনে গুনাহ করে আল্লাহর কাছে মাফ চায়, আবার গুনাহ করে মাফ চায় আল্লাহ ক্ষমা করবেন। সে কথাই নাবী (ﷺ) হাদীসে কুদসীতে বর্ণনা করেন।তিনি বলেন:”কোন বান্দা একটি পাপ করে বলল, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার পাপ ক্ষমা কর।’ তখন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আমার বান্দা একটি পাপ করেছে, অতঃপর সে জেনেছে যে, তার একজন রব আছেন, যিনি পাপ ক্ষমা করেন অথবা তা দিয়ে পাকড়াও করেন।’ অতঃপর সে আবার পাপ করল এবং বলল, ‘হে আমার রব! তুমি আমার পাপ ক্ষমা কর।’ তখন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আমার বান্দা একটি পাপ করেছে, অতঃপর সে জেনেছে যে, তার একজন রব আছেন, যিনি পাপ ক্ষমা করেন অথবা তা দিয়ে পাকড়াও করেন।’ আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করলাম। সুতরাং সে যা ইচ্ছা করুক।’’(সহীহুল বুখারী হা/ ৭৫০৭; সহীহ মুসলিম হা/৭১৬২) এই হাদীসে “সে যা ইচ্ছা করুক’ কথার অর্থ হল, সে যখন এরূপ করে; অর্থাৎ পাপ করে সাথে সাথে তাওবাহ্ করে এবং আমি তাকে মাফ করে দেই, তখন সে যা ইচ্ছা করুক, তার কোন চিন্তা নেই। যেহেতু তাওবাহ্ পূর্বকৃত পাপ মোচন করে দেয়। অবশ্য একই পাপ জেনেশুনে বারবার করলে অথবা তাওবার সময় পাপ বর্জনের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা না করলে সে ক্ষমার যোগ্য নাও হতে পারে। মহান আল্লাহ বলেছেন, আর যারা কোন অশ্লীল কাজ করলে অথবা নিজেদের প্রতি যুল্ম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে, অতঃপর তাদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর আল্লাহ ছাড়া কে গুনাহ ক্ষমা করবে? আর তারা যা করেছে, জেনে শুনে তারা তার পুনরাবৃত্তি করে না।’’(সূরা আলে ইমরান: ১৩৫) তাই, আসল তাওবাহ্ হলো আল্লাহকে ফাঁকি না দিয়ে, আন্তরিক অনুতাপে ভবিষ্যতে পাপ না করার প্রতিজ্ঞা করে গুনাহ ছেড়ে দেওয়া। আর তাওবাহ্ করেও যদি আবার পাপ হয়ে যায়, তবে আলস্য না করে আবার তাওবাহ্ করতে হবে।কোন অবস্থাতেই গুনাহর উপর অটল থাকা যাবে না। কারণ কেউ জানে না সে কখন মৃত্যুবরণ করবে, আদৌ সে তাওবার সুযোগ পাবে কিনা।
.
(৫).নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাওবাহ্ করতে হবে: তাওবাহ্ করার নির্ধারিত সময় আছে। আর তাওবার নির্ধারিত সময় দুই ধরনের: (এক). প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাওবার সর্বশেষ সময় হচ্ছে তার মৃত্যু। তাই মৃত্যু আসার আগেই তাওবাহ্ করতে হবে। (দুই).সকল মানুষের জন্য তাওবাহ্ করার সর্বশেষ সময় হচ্ছে ক্বিয়ামাতের আলামত হিসেবে পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত। তাই সাধারণভাবে পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়ার আগেই তাওবাহ্ করতে হবে।মূলত পাপ করার পরক্ষণেই তাওবাহ্ করা উচিত। অনেকে শেষ জীবনে দাড়ি-চুল পাকলে পরে তাওবাহ্ করবেন বলে অপেক্ষায় থাকে, অবহেলা করে। কিন্তু হঠাৎ মৃত্যু এসে যাওয়ায় সে আর তাওবার সুযোগ পায় না।মহান আল্লাহ বলেছেন:‘নিশ্চয় তাদের তাওবাহ্ কবূল করা আল্লাহর দায়িত্ব যারা অজ্ঞতাবশতঃ মন্দ কাজ করে। তারপর অনতিবিলম্বে তারা তাওবাহ্ করে। অতঃপর আল্লাহ এদের তাওবাহ্ কবূল করবেন আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, অতিপ্রজ্ঞাময়। আর তাওবাহ্ নেই তাদের, যারা অন্যায় কাজসমূহ করতে থাকে, অবশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু এসে যায়, তখন বলে, আমি এখন তাওবাহ্ করলাম; আর তাওবাহ্ তাদের জন্য নয়, যারা কাফির অবস্থায় মারা যায়; আমরা এদের জন্যই তৈরী করেছি যন্ত্রণাদায়ক ‘আযাব।”(সূরা আন্ নিসা: ১৭-১৮) হাদিসে রাসূল ﷺ বলেছেন; “নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা বান্দার তাওবাহ্ সে পর্যন্ত কবূল করবেন, যে পর্যন্ত তার প্রাণ কণ্ঠাগত না হয় (অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে ঘ্যার ঘ্যার করা শুরু করে)।(মুসনাদ আহমাদ হা/৬১৬০; জামি‘ আত তিরমিযী হা/৩৫৩৭) পক্ষান্তরে, মহান আল্লাহর ‘আযাব দেখার পরে করা তাওবাও কোন উপকারে আসবে না। মৃত্যুর সময় ফির‘আওনের ঈমান তার কোন উপকার করেনি। সুতরাং কেউ আল্লাহর ‘আযাব গ্রাস করার মুহূর্তে তাওবাহ্ করলে তা তার কোন উপকারে আসবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন; তারপর তারা যখন আমার ‘আযাব দেখল তখন বলল, ‘আমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলাম, আর যাদেরকে আমরা তার সাথে শরীক করতাম তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করলাম’। সুতরাং তারা যখন আমার ‘আযাব দেখল তখন তাদের ঈমান তাদের কোন উপকার করল না। এটা আল্লাহর বিধান, তাঁর বান্দাদের মধ্যে চলে আসছে। আর তখনই ঐ ক্ষেত্রে কাফিররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’’(সূরা আল মু’মিন/গাফির ৪০: ৮৪-৮৫) তাই মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হওয়ার বা পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বেই গুনাহ থেকে তাওবাহ্ করতে হবে। আগামীকাল নয়, আজই এখনই তাওবাহ্ করতে হবে।
.
(৬).মানুষের অধিকার তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে: যদি কোন গুনাহর সম্পর্ক কোন মানুষের অধিকারের সাথে হয়, তাহলে যার অধিকার নষ্ট হয়েছে, তার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে অথবা ক্ষমা চেয়ে তার সাথে মিটমাট করে নিতে হবে। যদি অবৈধ পন্থায় কারো মাল বা অন্য কিছু গ্রহণ-হরণ করে থাকে, তাহলে তা মালিককে ফিরিয়ে দিতে হবে। আর যদি কারো উপর মিথ্যা অপবাদ দেয় অথবা অনুরূপ কোনো দোষ করে থাকে, তাহলে জমহুর ওলামাদের মতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে শাস্তি নিতে নিজেকে পেশ করতে হবে অথবা তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। যার প্রতি যুল্ম করা হয়েছে, তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে গিয়ে বলতে হবে, ভাই/বোন! আমি আপনার উপর মিথ্যা অপবাদ দিয়েছি বা আপনার গীবত করে আপনার সম্মান নষ্ট করেছি বা যুলুম করেছি। এখন আমি আমার ভুল বুঝতে পেরে তাওবাহ্ করছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। এভাবে যত মানুষের সাথে সম্পৃক্ত গুনাহ করেছে তত মানুষের কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। তবে গীতের ক্ষেত্রে যার গীবত করা হয়েছিল তিনি যদি সেটা না জানেন তাহলে সরাসরি তার গিয়ে গীবতের কথা স্বীকার না করে বরং তার কল্যানের জন্য আল্লাহর কাছে দু’আ করা,তার ভাল গুনাবলি অন্যদের সামনে বলা অধিক উত্তম।আর যদি সেই ব্যক্তি মারা গিয়ে থাকে তাহলে তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে, অর্থ-সম্পদ হরণ করে থাকলে তা ঐ ব্যক্তির উত্তরাধিকারের নিকট পৌঁছে দিবে, তার পক্ষ থেকে দান-সদাক্বাহ্ করবে এবং নিজে বেশি বেশি করে সৎ কাজ/সাওয়াবের কাজ করে সাওয়াব বাড়িয়ে নেবে। কেননা ঐ যার অধিকার নষ্ট করেছে সে ব্যক্তি যদি জাহান্নামী হয় তাহলে সে ক্বিয়ামাতের মাঠে এই ব্যক্তির কাছে তার অধিকার ফেরত চাইতে পারে। তখন তাকে সাওয়াব দিয়ে প্রতিদান দিতে হবে। রাসূল (ﷺ) বলেছেন: ‘‘যদি কোন ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি তার সম্ভ্রম বা অন্য কিছুতে কোন যুলুম ও অন্যায় করে থাকে, তাহলে সেদিন আসার পূর্বেই সে যেন আজই তার নিকট হতে (ক্ষমা চাওয়া অথবা প্রতিশোধ/পরিশোধ দেয়ার মাধ্যমে) নিজেকে মুক্ত করে নেয়; যে দিন (ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য) না দীনার হবে না দিরহাম, টাকা-পয়সা, মাল-ধন (সেদিন) যালেমের নেক ‘আমল থাকলে তার যুল্ম অনুপাতে নেকী তার নিকট থেকে কেটে নিয়ে (মাযলুমকে দেয়া) হবে। পক্ষান্তরে যদি যদি তার নেকি না থাকে (অথবা নিঃশেষ হয়ে যায়) তাহলে তার বাদীর (মাযলূমের) গুনাহ নিয়ে তার ঘাড়ে চাপানো হবে।’’(সহীহুল বুখারী হা/২৪৪৯; জামি‘ আত তিরমিযী হা/২৪১৯) আর কেউ যদি কোন বান্দার হক নষ্ট করে কিন্তু যার হক নষ্ট করেছে শত চেষ্টা করেও তাওবাহ্ করার সময় তাকে খুঁজে না পায় বা তার কাছে পৌঁছতে না পারে তাহলে আশা করা যায় আল্লাহ তা‘আলা গুনাহকারীকে মাফ করবেন। ইন-শা-আল্লাহ। উল্লেখ্য যে, আল্লাহর হক নষ্ট করার গুনাহ থেকে তাওবাহ্ করার জন্য প্রথম ৫টি শর্ত যথেষ্ট। তবে আল্লাহর হকের মধ্যে কিছু হক আছে যা তাওবার মাধ্যমে মাফ হয় না সেগুলো কাযা আদায় করে হক পূরণ করতে হয়। যেমন, সলাত, সিয়াম ইত্যাদি। উপরে উল্লিখিত সকল সকল শর্ত পালন করে যে পাপী তাওবাহ্ করবে, তার তাওবাহ্ হবে খাঁটি তাওবাহ্। এই তাওবাই আল্লাহ চান এবং তিনি এই তাওবাই গ্রহণ করেন। বিশুদ্ধ তাওবাহ্ হল ব্যভিচারের অপরাধে অপরাধী মা‘ইয বিন মালিক এর মত তাওবা। যার ব্যাপারে নাবী (ﷺ) বলেছিলেন :لَقَدْ تَابَ تَوْبَةً لَوْ قُسِمَتْ بَيْنَ أُمَّةٍ لَوَسِعَتْهُمْ‘‘সে এমন তাওবাহ্ করেছে যে, যদি তা একটি জাতির মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হত, তাহলে সকলের জন্য তা যথেষ্ট হত।’’(সহীহ মুসলিম হা/৪৫২৭) বিশুদ্ধ তাওবার উদাহরণ স্বরূপ ব্যভিচারের অপরাধে অপরাধী জুহায়নাহ্ গোত্রের নারীটির তাওবার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। যার ব্যাপারে রাসূল ﷺ বলেছেন :لَقَدْ تَابَتْ تَوْبَةً لَوْ قُسِمَتْ بَيْنَ سَبْعِينَ مِنْ أهْلِ المَدِينَةِ لَوَسِعَتْهُمْ‘‘এই মহিলাটি এমন বিশুদ্ধ তাওবাহ্ করেছে যদি তা মদীনার ৭০ জন লোকের মধ্যে বণ্টন করা হত তাহলে তা তাদের জন্য যথেষ্ট হত।’’(সহীহ মুসলিম হা/ ৪৫২৯) বিশুদ্ধ তাওবাহ্ হল, যার পরে গুপ্ত ও প্রকাশ্যভাবে ‘আমলে কোন প্রকার পাপের আচরণ থাকবে না। যে তাওবাহ্ তাওবাকারীকে বিলম্বে ও অবিলম্বে সাফল্য দান করে। বিশুদ্ধ তাওবাহ্ হল তাই, যার পরে তাওবাকারী বিগত অপরাধ জীবনের জন্য কান্না করে, পুনরায় সেই অপরাধ যেন ঘটে না যায় তার জন্য ভীত-আতঙ্কিত ও সতর্ক থাকে, অসৎসঙ্গীদের সংসর্গ বর্জন করে এবং সৎসঙ্গীদের সাহচর্য অবলম্বন করে। আল্লাহ আমাদেরকে যাবতীয় পাপকর্ম থেকে হেফাজতে রাখুন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর কুফু সম্পর্কে বিস্তারিত

 প্রশ্ন: কুফু অর্থ কি? বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর ‘কুফু’ কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি। অতঃপর আরবি (كُفُو) ‘কুফু’ শব্দের অর্থ সমান, সমতা, সাদৃশ্য, সমকক্ষতা ইত্যাদি। ইসলামী পরিভাষায় বর-কনের দ্বীন-দুনিয়ার যাবতীয় কিছুতে সমান সমান বা কাছাকাছি হওয়াকে “কুফু” বলে। অথবা বিয়ের ক্ষেত্রে বর ও কনের মধ্যে দ্বীনদারিতা, সামাজিক মর্যাদা, আচার-আচরণ, নৈতিকতা, সম্পদ, বংশগৌরব ও ব্যক্তিগত রুচিসহ বিভিন্ন বিষয়ে সামঞ্জস্য বা সমতা।বিয়ের ক্ষেত্রে “কুফু” একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:تَخَيَّرُوا لِنُطَفِكُمْ وَانْكِحُوا الْأَكْفَاءَ وَأَنْكِحُوا إِلَيْهِمْ“তোমরা ভবিষ্যত বংশধরদের স্বার্থে উত্তম নারী গ্রহণ করো এবং ‘কুফু’ বিবেচনায় বিবাহ করো, আর বিবাহ দিতেও ‘কুফুর’ প্রতি লক্ষ্য রাখো।’’(ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ১৯৬৮; হাদিসটি বিশুদ্ধ)
.
▪️বিয়ের ক্ষেত্রে কুফু (সামঞ্জস্যতা) রক্ষা করা কেন জরুরি?
.
বিবাহের ক্ষেত্রে “কুফু” বা সামঞ্জস্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ, সুখী, সুন্দর ও মধুর দাম্পত্য জীবনের অন্যতম শর্ত হলো পাত্র-পাত্রীর মধ্যে চারিত্রিক, ধর্মীয় ও মানসিক দিক থেকে সামঞ্জস্যতা বা কুফু বিদ্যমান থাকা। কারণ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির, বিপরীত চরিত্রের নারী-পুরুষ একত্রে বসবাস করলেও দাম্পত্যজীবনে প্রকৃত শান্তি ও ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা হতে পারে না।যেমন, একজন মুত্তাকী, পরহেযগার ও নেককার ব্যক্তি (নারী পুরুষ) যদি কোনো ব্যভিচারী, চরিত্রহীন ও দুরাচারীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তাহলে তাদের মাঝে পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা ও বোঝাপড়া গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে।আর পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা এই বিষয়ে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন:اَلزَّانِیۡ لَا یَنۡکِحُ اِلَّا زَانِیَۃً اَوۡ مُشۡرِکَۃً ۫ وَّ الزَّانِیَۃُ لَا یَنۡکِحُہَاۤ اِلَّا زَانٍ اَوۡ مُشۡرِکٌ ۚ وَ حُرِّمَ ذٰلِکَ عَلَی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ”ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারিণী অথবা মুশরিক নারীকেই বিবাহ করে, আর ব্যভিচারিণী নারীকে বিবাহ করে কেবল ব্যভিচারী বা মুশরিক পুরুষ। এটি মুমিনদের জন্য হারাম করা হয়েছে।”(সূরা আন-নূর: ৩) এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, নেককার ও চরিত্রবান মুমিন ব্যক্তি কখনোই ব্যভিচারী ও পথভ্রষ্ট ব্যক্তির সমকক্ষ হতে পারে না; এবং দাম্পত্যজীবনে তাদের মধ্যে ‘কুফু’ বা সামঞ্জস্যতা থাকে না। অপর আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:اَفَمَنۡ کَانَ مُؤۡمِنًا کَمَنۡ کَانَ فَاسِقًا ؕؔ لَا یَسۡتَوٗنَ”যে ব্যক্তি ঈমানদার, সে কি ফাসিকের মত হতে পারে? তারা কখনো সমান নয়।”(সূরা আস-সাজদাহ: ১৮) এই আয়াতগুলো আমাদেরকে দাম্পত্য জীবনের জন্য উপযুক্ত জীবনসঙ্গী বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করে, যার মধ্যে দ্বীন, চরিত্র ও শালীনতার অনুপম গুণাবলি বিদ্যমান। কারণ ভালোবাসা, শান্তি ও সুখ তখনই টেকসই হয়,যখন দু’জন মানুষের মধ্যে অন্তরের ও চারিত্রিক সামঞ্জস্য থাকে।
.
তাছাড়া একজন ধার্মিক ও পরহেযগার নারী-পুরুষ এবং একজন গুনাহগার ও অবাধ্য নারী পুরুষের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাভাবনা ও জীবনধারায় বিপুল ফারাক থাকে যা সংসার জীবনে সংঘাত ও অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দ্বীনদারির উপস্থিতি থাকলে বংশমর্যাদা, সামাজিক অবস্থান কিংবা অন্যান্য পার্থিব ব্যবধান ধীরে ধীরে মানিয়ে নেওয়া যায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে বংশমর্যাদা বা সামাজিক সামঞ্জস্যের বিষয়গুলো একেবারে অপ্রাসঙ্গিক। বরং আজকের সময়ে প্রকৃত দ্বীনদার মানুষের অভাব এতটাই প্রকট যে, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় রাখতে এসব বিষয়ও পরিমিত গুরুত্বের দাবিদার। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য শর্ত হচ্ছে দ্বীন ও চরিত্রের বিশুদ্ধতা। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার “কুফু” বা উপযুক্ততা বিবাহ বৈধ হওয়া বা না হওয়ার শর্ত নয়; বরং এটি একটি উত্তম ও পরামর্শযোগ্য দিক মাত্র। কুফুর শর্ত পূর্ণ না হলেও বিয়ে শরীয়তে দৃষ্টিতে বৈধ। তবে অনেক সময় কুফুর প্রতি অমনোযোগিতা মানুষকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, একজন কুরআনের হাফিজা ও পরহেযগার নারীর বিয়ে যদি এমন একজন পুরুষের সঙ্গে হয়, যে দাড়ি কামাতে অভ্যস্ত, হারাম উপার্জনে লিপ্ত এবং ইসলামের নির্দেশাবলিকে তুচ্ছজ্ঞান করে তাহলে সেই নারীকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। হয়তো তাকে বলা হবে আধুনিক পোশাক পরতে, গান-বাজনায় অংশ নিতে বা ইসলামী জীবনদর্শন থেকে সরে আসতে।অন্যদিকে, কোনো ধর্মভীরু পুরুষ যদি এমন কোনো নারীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়, যে তার দ্বীনদারিতে বাধা দেয়, হারাম পথে উপার্জনের জন্য তাকে প্ররোচিত করে, বা মা-বাবার হক আদায়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তাহলে সেই সংসার হবে পাপ, কলহ ও অন্তরজ্বালায় পূর্ণ এক ঘোর অন্ধকার। এই কারণেই বিবাহের পূর্বে দ্বীন, চরিত্র, চিন্তাধারা, জীবনদর্শন ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের মধ্যে সামঞ্জস্যতা তথা কুফুর বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করা একান্ত প্রয়োজন। নচেৎ পারিবারিক সুখ-শান্তি ও দ্বীনি স্থিরতার স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে।
.
▪️পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে কোন কোন ক্ষেত্রে কুফু বিবেচনা করতে হবে?
.
শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়েতে বংশীয় কুফুর গুরুত্ব সম্পর্কে মতবিরোধ রয়েছে।অধিকাংশ আলেমগন চারটি বিষয়কে কুফুর অন্তর্ভূক্ত বলেছেন। সেগুলো হলো: দ্বীনদারি, স্বাধীন হওয়া (ক্রীতদাস না হওয়া), বংশমর্যাদা এবং পেশা। তাঁদের মতে, অতি উচ্চ বংশের কারও সাথে একদম নিচু বংশের কারও বিবাহ দেওয়া উচিত নয়। এমনকি সাহাবীগণের মাঝেও এসব কারণে অমিল হয়েছে (তবে সেটি কিছু সাহাবীর ক্ষেত্রে হয়েছে)। যেমন: নবীজির মুক্ত দাস যায়েদ (রা.)-এর সাথে কুরাইশ বংশের রমণী যাইনাব (রা.)-এর বিবাহ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ তাঁদের রুচি ভিন্ন ভিন্ন ছিলো।
.
পক্ষান্তরে আলেমদের অন্যদল প্রথম মতের বিরোধিতা করে বলেছেন যে,কুফু হবে দ্বীনদারিতার ক্ষেত্রে অর্থাৎ দ্বীনি কুফু ছাড়া কোন কুফু নেই। এই মতের অনুসারীগণ হলেন প্রখ্যাত সাহাবী উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহু), ইবনু মাসঊদ (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা), মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন, উমার ইবনু আব্দুল আযীয, ইমাম মালিক, ইমাম আহমাদ,শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ ও ইবনু ক্বাইয়িম (রাহিমাহুমুল্লাহ) প্রমুখ। দলিলের আলোকে এই মতটিই সবচেয়ে বিশুদ্ধ। ইতিহাসে সেরা তিনজন ধনী সাহাবির একজন কুরাইশ বংশের আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.)-এর বোনকে নবিজি বিয়ে দেন দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়া বিলাল (রা.)-এর সাথে। এমন অসম বিবাহের ঘটনা সাহাবিগণের মাঝে অনেক ছিলো। মূল বিষয় হলো: দ্বীনদারি ঠিক থাকলে অন্য কিছু সেভাবে ম্যাটার করে না। অল্প কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটে। সেজন্য নবিজি দ্বীনদারিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। হাদীসে রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,‘‘তোমরা যে ছেলের দ্বীনদারি ও চরিত্রের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে পারবে, সে যদি প্রস্তাব দেয়, তাহলে তার কাছে (তোমাদের মেয়েকে) বিয়ে দিয়ে দাও। যদি তা না করো, তবে পৃথিবীতে মহাবিপর্যয় সৃষ্টি হবে।’’ সাহাবীগণ বলেন, ‘যদি তার মাঝে কিছু ত্রুটি থাকে?’ নবীজি তখন আগের কথারই পুনরাবৃত্তি করেন। (ইমাম তিরমিযি, আস-সুনান: ১০৮৫; হাদিসটি হাসান সহিহ) অপর বর্ননায় এসেছে বিদায় হজ্বের ভাষণে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন, ‘‘মনে রেখো! আরবের ওপর কোনো অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং অনারবের ওপরও কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোনো কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করা যায় কেবল তাকওয়া তথা আল্লাহ-ভীতির মাধ্যমে।’’ [ইমাম আহমাদ, আল-মুসনাদ: ২৩৪৮৯; হাদিসটি সহিহ]
.
তাছাড়া বংশীয় সমতার ব্যাপারে কোন সহীহ হাদীস পাওয়া যায় না। বরং এর বিপরীতে এমন অনেক ঘটনা ও রেওয়ায়েত পাওয়া যায়, যার দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, রাসূল (ﷺ) ও সাহাবীদের যুগে বংশীয় সমতা লক্ষণীয় বিষয় ছিল না। ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) (১৯৪-২৫৬ হি./৮১০-৮৭০ খ্রি.) তাঁর ছহীহুল বুখারীতে بَابُ الْأَكْفَاءِ فِى الدِّيْنِ ‘স্বামী ও স্ত্রী একই দ্বীনভুক্ত হওয়া’ শীর্ষক শিরোনাম নির্ধারণ করেছেন। সেখানে তিনি চারটি হাদীছ উপস্থাপন করে প্রমাণ করেছেন যে, বংশীয় সমতা গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং তাক্বওয়া, দ্বীনদারিতাই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,”আবূ হুযাইফাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ইবনু উতবাহ ইবনু রাবি‘আ ইব‌নু আবদে শামস, যিনি বদ‌রের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ‌ (ﷺ)-এর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন, তিনি সালিমকে পালক পুত্র হিসাবে গ্রহণ করেন এবং তার সঙ্গে তিনি তাঁর ভাতিজী ওয়ালীদ ইব‌নু উতবাহ ইবনু রাবি‘আর কন্যা হিন্দাকে বিয়ে দেন। সে ছিল এক আনছারী মহিলার আযাদকৃত দাস”।(সহীহ বুখারী, হা/৫০৮৮) আবার মিক্বদাদ ইবনু আসওয়াদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সহধর্মিণী ছিলেন যুবা‘আহ বিনতে যুবাইর (রাযিয়াল্লাহু আনহা)। অথচ তিনি ছিলেন অভিজাত বংশের সম্ভ্রান্ত মেয়ে।(সহীহ বুখারী, হা/৫০৮৯) এমনকি দারিদ্র্যতা কুফুর ক্ষেত্রে বাধা তাও ঠিক নয়। যেমন সাহল (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,”এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ‌ (ﷺ)-এর নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিল। তখন তিনি (সাহাবীবর্গকে) বললেন, তোমাদের এর সম্পর্কে কী ধারণা? তারা উত্তর দিলেন, যদি কোথাও কোন মহিলার প্রতি এ লোকটি বিয়ের প্রস্তাব দেয়, তার সঙ্গে বিয়ে দেয়া যায়। যদি সে সুপারিশ করে, তাহলে সুপারিশ গ্রহণ করা হয়, যদি কথা বলে, তবে তা শোনা হয়। রাবী বলেন, অতঃপর নবী করীম (ﷺ) চুপ করে থাকলেন। এরপর সেখান দিয়ে একজন গরীব মুসলিম অতিক্রম করতেই রাসূলুল্লাহ‌ (ﷺ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এ ব্যক্তি সম্পর্কে তোমাদের কী ধারণা? তারা জবাব দিলেন, যদি এ ব্যক্তি কোথাও বিয়ের প্রস্তাব করে, তার সাথে বিয়ে দেয়া হয় না। যদি কারও জন্য সুপারিশ করে, তবে তা গ্রহণ করা হয় না। যদি কোন কথা বলে, তবে তা শোনা হয় না। তখন রাসূলুল্লাহ‌ (ﷺ) বললেন, দুনিয়া ভর্তি ঐ ধনীদের চেয়ে এ দরিদ্র লোকটি উত্তম”।(সহীহ বুখারী, হা/৫০৯১)
.
ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ)-সহ অনেক আলিম কেবল দ্বীনদারির ক্ষেত্রে বর-কনের মাঝে সমতাবিধানকে জরুরি বলেছেন। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] কুফু সম্পর্কে বলেন, وَعِفَّةٌ فَلَيْسَ فَاسِقٌ كُفْءَ عَفِيْفَةٍ ‘চারিত্রিক নিষ্কলুষতার সাথে নাফরমানীর কোন কুফু নেই”(যাকারিয়া মুহাম্মাদ ইবনু যাকারিয়া আল-আনছারী আশ-শাফেঈ, মাবহাজুত তুল্লাবি ফী ফিক্বহি ইমাম আশ-শাফেঈ পৃষ্ঠা: ১৮৩) কুফুর আলোচনায় অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, وَالْمُبْتَدِعُ مَعَ السُّنِّيَّةِ كَالْفَاسِقِ مَعَ الْعَفِيْفَةِ ‘চারিত্রিক নিষ্কলুষতার সাথে নাফরমানীর যেমন কোন কুফু নেই। অনুরূপভাবে সুন্নাহপন্থীদের সাথে বিদ‘আতীদের কোন কুফু নেই”( মুগনীউল মুহতাজ, ৩য় খণ্ড; পৃষ্ঠা: ১৬৬) ইমাম ইবনু কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত:৬২০ হি.] বলেন,والكفء ذو الدين والمنصب “কুফু হল দ্বীন ও সম্মান-মর্যাদার’।(মাওক্বিফু আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা‘আতি মিন আহলিল হাওয়া ওয়াল বিদাঈ, ১ম খণ্ড; পৃষ্ঠা: ৩৮৫)
.
আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ,আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনু কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা,(রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] তাঁর বিখ্যাত ‘যাদুল মা‘আদ’ গ্রন্থে الكفاءة في النكاح ‘বিবাহের ক্ষেত্রে সমতা’ এর বিধানাবলী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, বিবাহের ক্ষেত্রে দ্বীনই মূলত কুফু বা সমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু। সুতরাং দ্বীনদারিতার উপর ভিত্তি করে মুসলিম নারী-পুরুষের মাঝে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। কেননা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদাপন্থী যদি বিদ‘আতী কোন ছেলে বা মেয়ের সাথে বিবাহ সম্পন্ন হয়, তাহলে দ্বীন মানার ক্ষেত্রে উভয়ের মাঝে বিস্তর পার্থক্য পরিলক্ষিত হবে। যা পারিবারিক সুখ-শান্তি ও দাম্পত্যময় জীবনের জন্য চরম অন্তরায়। অনুরূপভাবে দ্বীন মানার ক্ষেত্রে ব্যাপক সমস্যার সৃষ্টি হবে। মূলত তাক্বওয়া, পরহেযগারিতা তথা দ্বীনদারিতাই হলো বিবাহের ক্ষেত্রে কুফু বা সমতা। অতঃপর তিনি নিম্নোক্ত দলীলগুলো উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ اِنَّا خَلَقۡنٰکُمۡ مِّنۡ ذَکَرٍ وَّ اُنۡثٰی وَ جَعَلۡنٰکُمۡ شُعُوۡبًا وَّ قَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوۡا ؕ اِنَّ اَکۡرَمَکُمۡ عِنۡدَ اللّٰہِ اَتۡقٰکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَلِیۡمٌ خَبِیۡرٌ.”হে মানুষ! আমরা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহ‌র নিকট সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকী। নিশ্চয় আল্লাহ‌ সবকিছু জানেন, সমস্ত খবর রাখেন’ (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)। অন্যত্র তিনি বলেন, اِنَّمَا الۡمُؤۡمِنُوۡنَ اِخۡوَۃٌ ‘মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই’ (সূরা আল-হুজুরাত: ১০)। তিনি আরো বলেন, وَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَ الۡمُؤۡمِنٰتُ بَعۡضُہُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ‘মুমিন নর ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু’ (সূরা আত-তাওবাহ: ৭১)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, فَاسۡتَجَابَ لَہُمۡ رَبُّہُمۡ اَنِّیۡ لَاۤ اُضِیۡعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِّنۡکُمۡ مِّنۡ ذَکَرٍ اَوۡ اُنۡثٰی ۚ بَعۡضُکُمۡ مِّنۡۢ بَعۡضٍ ‘অতঃপর তাদের প্রতিপালক তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে বলেন, ‘আমি তোমাদের মধ্যে কর্মনিষ্ঠ কোন নর অথবা নারীর কর্ম বিফল করি না; তোমরা একে অপরের অংশ’ (সূরা আলে ‘ইমরান: ১৯৫)। হাদীছে এসেছে,لَا فَضْلَ لِعَرَبِىٍّ عَلَى أَعْجَمِىٍّ وَلَا لِعَجَمِىٍّ عَلَى عَرَبِىٍّ وَلَا لأَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ وَلَا أَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ إِلَّا بِالتَّقْوَى اَلنَّاسُ مِنْ آدَمَ وَآدَمَ مِنْ تُرَابٍ.”আযমীদের উপর আরবীদের কোন মর্যাদা নেই। আরবীদের উপর আযমীদেরও কোন মর্যাদা নেই। কালোর উপর লালের এবং লালের উপর কালোর কোন মর্যাদা নেই, তাক্বওয়া ব্যতীত। মানুষ আদম থেকে আর আদম মাটি থেকে” (আলী ইবনু আলী ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আবিল ঈয আল-হানাফী, শারহুল আক্বীদাতিত ত্বাহাবিয়্যাহ, তাহক্বীক্ব: মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানী (বৈরূত: আল-মাকতাবুল ইসলামী, ২য় সংস্করণ, ১৪১৪ হি.), হা/৪০৬) অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, আবূ হাতিম আল-মুযানী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِيْنَهُ وَخُلُقَهُ فَأَنْكِحُوْهُ إِلَّا تَفْعَلُوْا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِى الْأَرْضِ وَفَسَادٌ.”তোমরা যে লোকের দ্বীনদারী ও নৈতিক চরিত্র দ্বারা সন্তুষ্ট আছ, তোমাদের নিকট যদি সে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, তবে তার সাথে (তোমাদের পাত্রীর) বিয়ে দাও। তা না করলে পৃথিবীতে ফিতনা-ফাসাদ ও বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়বে”(তিরমিযী, হা/১০৮৫, সনদ হাসান) আরো বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইবনু ক্বাইয়িম আল-জাওযিয়্যাহ, যাদুল মা‘আদ ফী হাদই খায়রিল ‘ইবাদ (বৈরূত: মুওয়াসসাসাতুর রিসালাহ, ২৭শ সংস্করণ, ১৪১৫ হি./১৯৯৪ খ্রি.), ৫ম খণ্ড; পৃষ্ঠা: ১৫৯-১৬০ শায়খ মুহাম্মাদ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ, ফাতাওয়া সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৬৫৫১০)
.
পরিশেষে প্রিয় পাঠক! বিবাহের ক্ষেত্রে যেখানে ছেলে-মেয়ের দ্বীনদারিতাই মূলত কুফু। সেখানে আক্বীদার বিষয়টি আরো জোরালোভাবে মূল্যায়ন করা কর্তব্য। কারণ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের পথের একজন মেয়ের সাথে বিদ‘আতপন্থী কোনো ছেলের বিয়ে হলে, তা দাম্পত্য জীবনে দ্বীনী সংঘাত, অন্তরদ্বন্দ্ব ও কলহ সৃষ্টি করবে।সহীহ আক্বীদা ও আমলের পরিবেশ নষ্ট হবে, সন্তানরাও সঠিক দীন থেকে বঞ্চিত হবে। এমন সম্পর্ক হৃদয়কে বিদ‘আতের গন্ধে ব্যাধিগ্রস্ত করে দেয় এবং আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তাই বিবাহে অবশ্যই সুদৃঢ় আক্বীদা ও সহীহ মানহাজকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।প্রখ্যাত তাবি‘ তাবি‘ঈ, আহলুস সুন্নাহ’র শ্রেষ্ঠ ‘আলিম, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ফুদ্বাইল বিন ‘ইয়াদ্ব (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৮৭ হি.] বলেছেন,مَنْ أَحَبَّ صَاحِبَ بِدْعَةٍ أَحْبَطَ اللهُ عَمَلَهُ وَأَخْرَجَ نُوْرَ الْإِسْلَامِ مِنْ قَلْبِهِ، وَمَنْ زَوَّجَ كَرِيْمَتَهُ مِنْ مُبْتَدِعٍ فَقَدْ قَطَعَ رَحِمَهَا، وَمَنْ جَلَسَ مَعَ صَاحِبِ بِدْعَةٍ لَمْ يُعْطَ الْحِكْمَةَ، وَإِذَا عَلِمَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ رَجُلٍ أَنَّهُ مُبْغِضٌ لِصَاحِبِ بِدْعَةٍ رَجَوْتُ أَنْ يَغْفِرَ اللهُ لَهُ.”যে ব্যক্তি বিদ‘আতীকে ভালোবাসে আল্লাহ তা‘আলা তার আমলকে ধ্বংস করে দেন এবং তার অন্তর থেকে ইসলামের জ্যোতিকে বের করে দেন। আর যে কোন বিদ‘আতীর কন্যাকে বিবাহ করে তার প্রতি রহম বা আল্লাহর দয়া কেটে যায়। যে বিদ‘আতীর সাথে উপবেশন করে তাকে হেকমত বা প্রজ্ঞা দান করা হয় না। আর আল্লাহ তা‘আলা যখন কোন ব্যক্তির ব্যাপারে জানেন যে, সে বিদ‘আতীর সাথে বিদ্বেষপরায়ণ, আমি আশা করি আল্লাহ তা‘আলা তাকে ক্ষমা করে দিবেন”।(আল-জামিঊ লি আহকামিল কুরআন, ৭ম খন্ড; পৃষ্ঠা: ১৩) বিদ‘আতীদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের ইমামগণ কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। যেমন ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত;১৭৯ হি.] বলেন, لَا يُنْكَحُ أَهْلُ الْبِدَعِ وَلَا يُنْكَحُ إلَيْهِمْ وَلَا يُسَلَّمُ عَلَيْهِمْ وَلَا يُصَلَّى خَلْفَهُمْ وَلَا تُشْهَدُ جَنَائِزُهُمْ ‘বিদ‘আতীকে বিয়ে করা যাবে না। তাদের সাথে কাউকে বিয়ে দেয়া যাবে না, তাদেরকে সালাম দেয়া যাবে না, তাদের পিছনে ছালাত আদায় করা যাবে না এবং তাদের জানাযায় অংশগ্রহণ করবে না”।(মালিক ইবনু আনাস, আল-মুদাওয়ানাতু (বৈরূত: দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪১৫ হি./১৯৯৪ খ্রি.); ১ম খণ্ড; পৃষ্ঠা: ১৭৭) ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, مَنْ لَمْ يَرْبَعْ بِعَلِّي ابْنِ أَبِي الطَّالِبِ فِي الخِلَافَةِ فَلَا تُكَلِّمُوْهُ وَلَا تَنَاكِحُوُهْ ‘যারা আলী ইবনু আবী তালিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর খেলাফতকালে তাঁর সাথে থাকেনি তার সাথে তোমরা কথা বলবে না এবং তার সাথে বিবাহ করবে না”।(আবুল হুসাইন ইবনু আবূ ই‘আলা, মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ, ত্বাবাক্বাতুল হানাবালাহ (বৈরূত: দারুল মা‘আরিফাহ, তাবি), ১ম খণ্ড; পৃষ্ঠা: ৪৫)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

কারো জীবন বাঁচাতে গিয়ে যদি নিজের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে তাহলে কী করণীয়

 প্রশ্ন: কারো জীবন বাঁচাতে গিয়ে যদি নিজের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে তাহলে কী করণীয়? খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি মাসআলা।

▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি। অতঃপর যখন কোনো মানুষের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে, তখন তাকে রক্ষার সামর্থ্য রাখে এমন প্রতিটি ব্যক্তির ওপর তার প্রাণ বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা ওয়াজিব (অবশ্যক কর্তব্য)। এমনকি কেউ যদি সালাতে রত থাকে, তবুও তাকে সেই সালাত ভেঙে উদ্ধারে অগ্রসর হতে হবে যদিও এতে সালাতের সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে সেই সালাত কাযা করতে হবে। কারণ, ইসলামে মানুষের প্রাণের গুরুত্ব অতুলনীয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—”ومن أحياها فكأنما أحيا الناس جميعًا“যে কেহ কোনো প্রাণ বাঁচায়, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই বাঁচিয়ে দিল।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩২) ইসলাম এতটাই মানবকেন্দ্রিক যে, কোনো ব্যক্তি যদি খাদ্যাভাবে মৃত্যুর সম্মুখীন হয়, তবে তার জন্য সাময়িকভাবে হারাম খাদ্যও হালাল করে দেওয়া হয়েছে শুধু প্রাণ রক্ষার স্বার্থে। তবে যদি কাউকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে সে আত্মত্যাগ জায়েয নয়। কারণ শরিয়ত কাউকে নিজের জান-মালের নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়ে অন্যের প্রতি এমনভাবে অগ্রাধিকার দিতে অনুমতি দেয়নি, যাতে সে নিজেই ধ্বংসের পথে ধাবিত হয়। উদাহরণস্বরূপ একজন ডুবন্ত মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে যদি কেউ নিজেই ডুবে যায়, অথবা নিজেও অনাহারে ক্লিষ্ট থাকা অবস্থায় অন্য ক্ষুধার্তকে তার প্রয়োজনীয় খাদ্য দিয়ে দেয় এমন যে খাদ্য ছাড়া সে নিজেও জীবন রক্ষা করতে পারবে না তাহলে এরূপ আত্মত্যাগ শরিয়তসম্মত নয়। কারণ ইসলামে প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর সর্বপ্রথম কর্তব্য হলো নিজের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। আল্লাহ তা’আলা বলেন,وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ“আর তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না।” (সূরা বাকারা: ১৯৫)আর এ কারণে আল্লাহর দরবারে তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে না। কেননা আল্লাহ তা’আলা বলেন,فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ“অতএব, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যতটুকু তোমাদের সাধ্যের মধ্যে থাকে।” (সূরা তাগাবুন: ১৬) হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশ দিয়েছেন যে,لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ “নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না; অন্যের ক্ষতি করাও যাবেনা”(মুসনাদে আহমাদ হা/২২২৭২, সিলসিলা সহীহা হা/২৫০)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন:
” وإذا اشتدت المخمصة في سنة المجاعة ، وأصابت الضرورة خلقا كثيرا ، أو كان عند بعض الناس قدر كفايته وكفاية عياله ، لم يلزمه بذله للمضطرين ، وليس لهم أخذه منه ; لأن ذلك يفضي إلى وقوع الضرورة به ، ولا يدفعها عنهم . وكذلك إن كانوا في سفر ومعه قدر كفايته من غير فضلة ، لم يلزمه بذل ما معه للمضطرين … لأن هذا مفض به إلى هلاك نفسه ، وهلاك عياله ، فلم يلزمه ، كما لو أمكنه إنجاء الغريق بتغريق نفسه . ولأن في بذله إلقاء بيده إلى التهلكة ، وقد نهى الله عن ذلك”
“যখন দুর্ভিক্ষের বছরগুলিতে খাদ্যাভাব চরমে পৌঁছায়, এবং বহু মানুষের উপর তা বিপর্যয় ডেকে আনে, কিংবা কারো কাছে নিজের এবং নিজের পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য থাকে তবে সে বাধ্য নয় যে, তা দরিদ্রদের দিয়ে দেবে। এমনকি দরিদ্ররাও তার কাছ থেকে সেটা জোর করে নিতে পারবে না। কারণ, এতে করে তার নিজের উপরই সংকট দেখা দেবে, অথচ তাদের সমস্যাও এতে পুরোপুরি দূর হবে না। একইভাবে, যদি তারা সফরে থাকে এবং তার কাছে নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট খাবার থাকে কিন্তু অতিরিক্ত কিছু না থাকে তাহলে সে বাধ্য নয় তার খাবার দরিদ্রদের দিয়ে দিতে কারণ এতে নিজের এবং পরিবারের ধ্বংস ডেকে আনা হয়, তাই তা তার উপর আবশ্যক নয়। যেমন: কেউ যদি ডুবে যাওয়া একজনকে বাঁচাতে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেয়ার পরিস্থিতিতে পড়ে, তাহলে সেটাও তার জন্য আবশ্যক নয়। আর এটা এই কারণেও বৈধ নয় যে এতে নিজের হাত দিয়ে নিজেকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করা হয়, অথচ আল্লাহ তা নিষেধ করেছেন। সুতরাং, নিজে ডুবে গিয়ে কাউকে বাঁচানো বৈধ নয়। তেমনি, খাবার বা পানীয়ের মাধ্যমে অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া বৈধ নয়, যদি এতে নিজের ধ্বংস ঘটে।”(ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী,খন্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৪২১)
.
শারহু মুনতাহাল ইরাদাত গ্রন্থে বলা হয়েছে: (ومن لم يجد) ما يسد رمقه (إلا طعام غيره : فربه المضطر ، أو الخائف أن يُضطر : أحق به) ؛ لمساواته الآخر في الاضطرار ، وانفراده بالملك؛ أشبه غير حالة الاضطرار .(وليس له) أي: رب الطعام إذا كان كذلك (إيثاره)، أي: غيره به؛ لئلا يلقي بيده إلى التهلكة”যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় পড়ে যে, তার ক্ষুধা নিবারণের (অর্থাৎ শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত টিকে থাকার) জন্য নিজের কোনো খাবার নেই এবং কেবল অন্যের খাবারই রয়েছে তাহলে যদি সে চরম প্রয়োজনগ্রস্ত হয় কিংবা আশঙ্কা করে যে, খুব শিগগিরই সে প্রয়োজনের মুখে পড়বে তবে সে ঐ খাবারের প্রতি অধিক হকদার হবে। “কারণ, যেমন করে সে (খাদ্য চাওয়া ব্যক্তি) প্রয়োজনে পড়েছে, তেমনি মালিক নিজেও সেই প্রয়োজনে পড়েছে। কিন্তু মালিকের একচেটিয়া অধিকার রয়েছে ঐ খাদ্যের উপর, যা তাকে প্রয়োজনের বাইরে অন্য কোনো পরিস্থিতির মতোই অধিকারী করে তোলে। সুতরাং মালিকের জন্য বৈধ নয় যে, সে অন্য কাউকে তা দিয়ে নিজের জীবনকে নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।”(শারহু মুনতাহা আল-ইরাদাত, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩১৪)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
إذا اضطر إلى مال الغير، فإن صاحب المال إن كان مضطراً إليه فهو أحق به.مثاله: رجل معه خبزة وهو جائع وصاحبه جائع، وليس معه خبز، فالصاحب محتاج إلى عين مال الغير، لكن الغير ـ أيضاً ـ محتاج إليه، ففي هذه الحال لا يحل للصاحب أن يأخذ مال الغير؛ لأن صاحبه أحق به منه .
ولكن هل يجوز لصاحبه أن يؤثره أو لا؟
الجواب: المذهب أن الإيثار في هذه الحال لا يجوز، وقد سبق لنا قاعدة في ذلك، وهي أن الإيثار بالواجب غير جائز، ومن أمثلتها في باب التيمم إذا كان الإنسان ليس معه من الماء إلا ما يكفي لطهارته، ومعه آخر يحتاج إلى ماءٍ فلا يعطيه إياه والثاني يتيمَّم؛ لأن هذا إيثار بالواجب، والإيثار بالواجب حرام.
وعلى هذا : فإذا كان صاحب الطعام محتاجاً إليه، يعني مضطراً إليه ، كضرورة الصاحب: فإنه لا يجوز أن يؤثر به الصاحب؛ لأن هذا يجب عليه أن ينقذ نفسه، وقد قال النبي عليه الصلاة
والسلام: ابدأ بنفسك ، فلا يجوز أن يؤثر غيره؛ لوجوب إنقاذ نفسه من الهلكة قبل إنقاذ غيره، هذا هو المشهور من المذهب.
وذهب ابن القيم ـ رحمه الله ـ إلى أنه يجوز في هذه الحال أن يؤثر غيره بماله .ولكن المذهب في هذا أصح، وأنه لا يجوز، اللهم إلا إذا اقتضت المصلحة العامة للمسلمين أن يؤثره، فقد نقول: إن هذا لا بأس به، مثل لو كان هذا الصاحب المحتاج رجلاً يُنتفع به في الجهاد في سبيل الله، أو رجلاً عالماً ينفع الناس بعلمه، وصاحب الماء المالك له، أو صاحب الطعام رجل من عامة المسلمين، فهنا قد نقول: إنه في هذه الحال، مراعاة للمصلحة العامة: له أن يؤثره، وأما مع عدم المصلحة العامة فلا شك أنه يجب على الإنسان أن يختص بهذا الطعام الذي لا يمكن أن ينقذ به نفسه، وصاحبه”
“যদি কেউ অপরের সম্পদের প্রতি বাধ্য হন (অর্থাৎ, জীবন রক্ষার জন্য অপরের সম্পদ নিতে বাধ্য হন), তাহলে যদি সেই সম্পদের মালিকও তা গ্রহণে বাধ্য হন, তবে মালিকেরই এতে অধিকার বেশি। উদাহরণস্বরূপ: একজন মানুষের কাছে একটি রুটি আছে এবং সে ক্ষুধার্ত। তার সাথের আরেকজনও ক্ষুধার্ত, কিন্তু তার কাছে রুটি নেই। অর্থাৎ, সাথের লোকটি অপরের রুটির প্রতি প্রয়োজনে পড়েছে। কিন্তু অপরজনও ঠিক একইভাবে এই রুটির প্রয়োজন অনুভব করছে। এমতাবস্থায়, সাথের লোকটির জন্য অপরের রুটি নেওয়া বৈধ নয়; কারণ, রুটির মালিক তার চেয়ে বেশি হকদার। তবে প্রশ্ন হলো: রুটির মালিক কি অপরজনকে এই রুটি নিজের ওপর প্রাধান্য দিয়ে দিতে পারবে?
উত্তর: মাযহাব অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে প্রাধান্য (إيثار) দেওয়া বৈধ নয়। পূর্বে আমরা একটি মূলনীতি আলোচনা করেছি: “যে কাজ ফরজ, তা অন্যের জন্য ত্যাগ করা বৈধ নয়”।এর একটি উদাহরণ হলো তায়াম্মুম (মাটি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন): যদি কারো কাছে এতটুকু পানি থাকে যা কেবলমাত্র তার নিজের অজুর জন্য যথেষ্ট,এবং তার সাথের একজনেরও পানি প্রয়োজন হয় তবে সে সেই পানিটি তাকে দিতে পারবে না। বরং দ্বিতীয়জন তায়াম্মুম করবে। কারণ, এটি ফরজ কাজ অন্যকে প্রাধান্য দিয়ে ত্যাগ করা, আর তা হারাম।
এই ভিত্তিতে, যদি খাবারের মালিক নিজেও এ খাবারের চরমভাবে প্রয়োজনমুখী হন যেমন তা দিয়ে তার জীবন বাঁচাতে হয়, তাহলে তার জন্য সেই খাবার কাউকে দিয়ে দেওয়া বৈধ নয়। বরং তার জন্য আবশ্যক যে, সে নিজেই তা গ্রহণ করে নিজের জীবন রক্ষা করবে। কেননা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:“তোমার নিজের থেকে শুরু করো।” অতএব, নিজের জান বাঁচানো অন্যের জান বাঁচানোর চেয়ে অধিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। এটাই হলো (হাম্বলী) মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত। তবে ইমাম ইবনু কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন এই অবস্থায় একজন নিজের সম্পদ অন্যকে দিয়ে দিতে পারে,অর্থাৎ ইসার তথা অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া বৈধ)। কিন্তু মাযহাবের বক্তব্যই অধিক বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য যা হলো: এমন অবস্থায় ইসার (নিজের উপর অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া) বৈধ নয়। তবে একটি ব্যতিক্রম হতে পারে যদি মুসলিম সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের স্বার্থে কাউকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রয়োজন হয়। তখন বলা যায় এতে কোনো সমস্যা নেই। যেমন: যদি সেই ক্ষুধার্ত ব্যক্তি এমন কেউ হন যিনি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে অংশ নেন, কিংবা এমন একজন আলেম যিনি তার জ্ঞানের দ্বারা সমাজ উপকৃত করে থাকেন, আর খাবারের মালিক হন সাধারণ এক ব্যক্তি তাহলে এ জাতীয় ক্ষেত্রে সামষ্টিক কল্যাণ বিবেচনায় প্রাধান্য দেওয়া বৈধ হতে পারে। কিন্তু যদি কোনো সামষ্টিক কল্যাণের দিক বিবেচনায় না থাকে, তাহলে নিঃসন্দেহে ব্যক্তির জন্য আবশ্যক হবে যে, সে নিজেই সেই খাবার খেয়ে নিজের জীবন রক্ষা করবে।” (ইমাম ইবনু উসামীন আশ-শারহুল মুমতি, আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ১৫; পৃষ্ঠা: ৪০)
.
শাফেয়ী মাযহাবের বক্তব্য হলো: যদি কোনো মুসলমান এমন কিছু পায় যা তার জীবন রক্ষা করতে পারে এবং সে বাধ্যগত অবস্থায় থাকে, তবে সে তা অপর এক মুসলমানকে দিতে পারবে—অর্থাৎ তাকে নিজের উপর প্রাধান্য দিতে পারবে। তবে যদি সেই ব্যক্তি অমুসলিম হয়, তাহলে তাকে নিজের উপর প্রাধান্য দেওয়া বৈধ নয়।শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,
إذا وجد المضطر طعاما حلالا لغيره فله حالان.أحدهما: أن يكون مالكه حاضرا. فإن كان مضطرا إليه، فهو أولى به، وليس للأول أخذه منه إذا لم يفضل عن حاجته …فإن آثر المالك غيره على نفسه، فقد أحسن. قال الله تعالى: (وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ) .وإنما يؤثر على نفسه مسلما.فأما الكافر فلا يؤثره، حربيا كان أو ذميا، وكذا لا يؤثر بهيمة على نفسه”
“যদি কোনো বিপদাপন্ন ব্যক্তি এমন কোনো হালাল খাদ্য খুঁজে পায় যা অপর একজনের মালিকানাধীন, তবে এর দুটি অবস্থা হতে পারে:
(১) যদি মালিক উপস্থিত থাকেন এবং তিনিও সেই খাদ্যের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে থাকেন (অর্থাৎ তিনিও বিপদগ্রস্ত), তবে মালিকই এ খাদ্যের অধিক হকদার। তখন অপর ব্যক্তি তা জোরপূর্বক গ্রহণ করতে পারবে না।
(২) তবে যদি মালিক নিজে ক্ষুধার্ত বা প্রয়োজনীয় অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও অপর ব্যক্তিকে নিজের ওপর অগ্রাধিকার দেন, তাহলে এটি একটি মহান কর্ম হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন:“তারা নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়।” (সূরা আল-হাশর: ৯) তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, এই প্রাধান্য দেওয়া কেবল মুসলমানের ক্ষেত্রে বৈধ; কোনো কাফের হোক সে যুদ্ধরত (হারবী) অথবা অমুসলিম নাগরিক (যেমন: জিম্মি) কিংবা কোনো পশুর জন্য নিজেকে বঞ্চিত করা বৈধ নয়।”(রওযাতুত-তালিবীন; পৃষ্ঠা: ৩; পৃষ্ঠা: ২৮৫; নববী আল মাজমু; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৪৫)
.
পরিশেষে, উপর্যুক্ত আলোচনার ভিত্তিতে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, কোনো মুসলমানের জন্য বৈধ নয় যে, সে অন্য একজনকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজের জীবনকে নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে। উদাহরণস্বরূপ কেউ যদি সাঁতার জানে না, তবুও একজন ডুবন্ত ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য পানিতে ঝাঁপ দেয় তাহলে তা বৈধ নয়, কারণ এতে নিজের জীবন হুমকির মুখে পড়ে। অনুরূপভাবে যদি কেউ সাঁতার জানে ঠিকই, তবে ডুবন্ত ব্যক্তি তাকে আঁকড়ে ধরার কারণে তার নিজের মৃত্যুর আশঙ্কা হয় তাহলে তার জন্য নিজেকে সেই ব্যক্তির কবল থেকে মুক্ত করে নেওয়া এবং প্রয়োজনে তাকে ছেড়ে দেওয়া বৈধ হবে এমনকি যদি এতে ডুবন্ত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে। কারণ এমন পরিস্থিতিতে নিজের জীবন রক্ষা করাই সর্বাগ্রে আবশ্যক, তা সে ডুবন্ত ব্যক্তি মুসলিম হোক বা অমুসলিম। বরং প্রকৃত কথা হলো নিজের জীবন রক্ষা করা শরিয়তের দৃষ্টিতে একটি ফরজ (আবশ্যিক কর্তব্য)। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আর তোমরা স্বহস্তে নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না।”(সূরা আল-বাকারা: ১৯৫) তবে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ) এবং তাঁর অনুসারী একদল আলেমের মতে, যদি বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি একজন মুসলমান হন এবং তাকে বাঁচানো সম্ভব হয় তাহলে নিজের ওপর তাকেই প্রাধান্য দেওয়া বৈধ হবে। ইমাম শাফেয়ী (রহিমাহুল্লাহ) এর মাযহাবেও এটিই গ্রহণযোগ্য মত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে বিবেকবান, ভারসাম্যপূর্ণ ও শরিয়তসম্মতভাবে মানবিক দায়িত্ব পালনের তাওফিক দান করুন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬◐✪◑▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

কেউ কোনো দুর্ঘটনা বা হামলা বা দুর্যোগে আহত হওয়ার ফলে যদি তার সাহায্যের প্রয়োজন হয় তাহলে আশে পাশের অন্যান্য মুসলিমদের করণীয়

 প্রশ্ন: কোনো ব্যক্তি যদি সড়ক দুর্ঘটনা, হামলা বা দুর্যোগে আহত হয় এবং এর ফলে তার সাহায্যের প্রয়োজন হলে আশে পাশের অন্যান্য মুসলিমদের করণীয় কী?

▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি। অতঃপর যে ব্যক্তি তাৎক্ষণিক ধ্বংস বা মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে যেমন দুর্ঘটনা, হামলা বা কোনো বিপর্যয়ে পড়ে প্রাণনাশের ঝুঁকিতে থাকে তাহলে তাকে বাঁচানো সক্ষম ব্যক্তির জন্য আবশ্যিক (ওয়াজিব)। এমনকি ব্যক্তি সালাত রত অবস্থায় থাকলেও সালাত ভঙ্গ করে প্রাণ রক্ষার চেষ্টা করতে হবে যদিও সালাতের সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। উদ্ধার কাজ শেষ করার পর উক্ত সালাত কাজা পড়তে হবে। কেননা ইসলামে মানুষের প্রাণ রক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ তাআলা বলেন:مَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَآ أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا“আর যে মানুষের প্রাণ বাঁচালো,সে যেন সকল মানুষকে বাঁচালো।”(সূরা মায়িদাহ: ৩২) ইমাম জাসসাস এই আয়াতের তাফসীরে বলেন:وعلى كل أحد أن ينجي غيره إذا خاف عليه التلف مثل أن يرى إنسانا قد قصده غيره بالقتل أو خاف عليه الغرق وهو يمكنه تخليصه”যদি কেউ দেখে অন্য কেউ তাকে হত্যা করতে যাচ্ছে, বা সে ডুবে যাচ্ছে আর সে যদি তাকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়, তাহলে তার দায়িত্ব তাকে উদ্ধার করা।”(ইসলাম ওয়েব ফাতওয়া নং-১১৪৭৮৩) হাদিসে রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে যে কোন ব্যক্তি তার ভাইয়ের কোন উপকার করতে সমর্থ হলে সে যেন তা করে।”(সহিহ মুসলিম হা/৫৬২২) অপর বর্ননায় রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমার ভাইকে সাহায্য কর। সে জালিম হোক অথবা মজলুম হোক। এক লোক বলল, হে আল্লাহ্‌র রসূল! মজলুম হলে তাকে সাহায্য করব তা তো বুঝলাম। কিন্তু জালিম হলে তাকে কিভাবে সাহায্য করব? তিনি বললেন: তাকে অত্যাচার থেকে বিরত রাখবে। আর এটাই হল তার সাহায্য।”(সহিহ বুখারী হা/৬৯৫২)
.
তবে, যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে সহায়তা করতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে, তাহলে সে গুনাহগার হিসেবে পরিগণিত হবে। কাশফুল ক্বিনা’ গ্রন্থে বলা হয়েছে:ولو وجد آدميا معصوما في هلكة ، كغريق : لزمه – مع القدرة – إنقاذه) من الهلكة”যদি কোনো নিরাপরাধ (হত্যা করা নিষিদ্ধ) মানুষকে ধ্বংসের মুখে পাওয়া যায়, যেমন: একজন ডুবন্ত ব্যক্তি, তাহলে তার পক্ষে যদি সক্ষমতা থাকে, তবে তার জন্য তাকে ধ্বংস থেকে বাঁচানো আবশ্যক।”(কাশফুল ক্বিনা খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩১৪)
.
আর শরিয়তে ‘মা‘সুম (যার জান রক্ষা করা অপরিহার্য) বলতে বুঝানো হয় সেই ব্যক্তি যার জীবন শরিয়ত অনুযায়ী সুরক্ষিত। অর্থাৎ, যার ওপর অন্যায়ভাবে আঘাত হানা হারাম। মুসলিমদের পাশাপাশি, অমুসলিমদের মধ্যেও কিছু শ্রেণি যেমন মুসলিম, জিম্মী (ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসরত চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিক), মুআহাদ (চুক্তিভিত্তিক শান্তিপূর্ণ কাফির) এবং মুস্তাআ’মান (যাকে মুসলিম রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিয়েছে)। এই শ্রেণির লোকদের প্রাণ রক্ষা আবশ্যক। তবে যারা এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত নয়। যেমন: কাফির শত্রু, ধর্মত্যাগী (মুরতাদ), শরিয়ত অনুযায়ী রজমযোগ্য বিবাহিত ব্যভিচারী তাদের জীবন রক্ষা করা শরিয়তের দৃষ্টিতে আবশ্যক নয়। “কাশশাফুল ক্বিনাআ’” গ্রন্থে বলা হয়েছে:”(ويجب رد كافر معصوم) بذمة أو هدنة أو أمان (عن بئر ونحوه) كحية تقصده (ك) رد (مسلم) عن ذلك ، بجامع العصمة .(و) يجب (إنقاذ غريق ونحوه) كحريق (فيقطع الصلاة لذلك) ، فرضا كانت أو نفلا .وظاهره: ولو ضاق وقتها، لأنه يمكن تداركها بالقضاء، بخلاف الغريق ونحوه ؛ (فإن أبى قطعها) ، أي الصلاة لإنقاذ الغريق ونحوه : أثم”কাফির যদি মাসুম হয় (যেমন জিম্মি, চুক্তিবদ্ধ বা নিরাপত্তা প্রাপ্ত), তাকে কূপে পড়া বা সাপ দংশনের মতো বিপদ থেকে বাঁচানো ওয়াজিব যেমনটি একজন মুসলমানকে বাঁচানো ওয়াজিব, কারণ উভয়ই মাসুম। এমনকি কেউ যদি সালাতে থাকে, তবুও (যদি সে পারত) তাহলে ডুবে যাওয়া ব্যক্তি বা আগুনে আটকে পড়া কাউকে উদ্ধার করা তার জন্য ওয়াজিব। সালাত ফরজ হোক বা নফল, তাও কাটতে হবে এই উদ্ধারের জন্য। যদি সালাতের সময় সংকীর্ণও হয়, তাও তাকে সালাত ভেঙে উদ্ধার করতে হবে, কারণ সালাত পরে কাজা করা সম্ভব, কিন্তু ডুবে যাওয়া বা আগুনে পড়া ব্যক্তি রক্ষা পাবে না। যদি কেউ তাও না করে, তাহলে সে গুনাহগার হবে। তাই যদি কেউ এমন অবস্থায় থাকে যে সে সালাতে আছে অথবা রোজা রাখছে এবং কাউকে উদ্ধার করতে হলে তাকে সালাত ভাঙতে হবে বা রোজা ভেঙে ফেলতে হবে, তবুও তা করা ফরজ, এবং তা না করলে সে গুনাহগার হবে।”(কাশশাফুল ক্বিনাআ’ খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৮০)
.
আল-মাওসুআতুল ফিক্বহিয়্যাহ” গ্রন্থে বলা হয়েছে:” إغاثة الغريق والعمل على إنجائه من الغرق : واجب على كل مسلم ، متى استطاع ذلك .يقول الفقهاء : يجب قطع الصلاة لإغاثة غريق إذا قدر على ذلك، سواء أكانت الصلاة فرضا أم نفلا ، وسواء استغاث الغريق بالمصلي ، أو لم يعيّن أحدا في استغاثته ، حتى ولو ضاق وقت الصلاة ؛ لأن الصلاة يمكن تداركها بالقضاء ، بخلاف الغريق “ডুবে যাওয়া ব্যক্তি বা এজাতীয় বিপদের শিকার কারো সাহায্য করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর আবশ্যক, যদি সে তা করতে সক্ষম হয়। এমনকি যদি সে সালাতে থাকে, ফরজ হোক বা নফল এবং এমনকি যদি ডুবে যাওয়া ব্যক্তি তার কাছ থেকে সাহায্য চায় বা চায় না তবুও তাকে সালাত ছেড়ে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ সালাত পরে কাজা করা যায়, কিন্তু একজন মানুষ মারা গেলে তাকে ফিরিয়ে আনা যায় না।এই বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে ভিন্নমত আছে যে, কেউ যদি উদ্ধার না করে তাহলে তার ওপর কী বিধান প্রযোজ্য হবে।”(আল-মাওসুআতুল ফিক্বহিয়্যাহ খণ্ড: ৩১; পৃষ্ঠা: ১৮৩)
.
ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
لا شك أن إنقاذ الغريق من أهم الواجبات على كل قادر على إنقاذه ، فإذا أخذ في إنقاذه ، فتعلق به حتى خشي على نفسه أن يغرق مثله : فليس عليه في هذه الحالة وجوب ، لا شرعا ، ولا عقلا، فيخلص نفسه منه ، ويدعه، سواء كان قد أشرف على النجاة أم لا، بل ظاهر قوله تعالى: ( وَلا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ ) [البقرة: 195]، أنه يجب عليه تخليص نفسه.والآية هذه ، وإن كانت واردة على سبب خاص ، كما في سن أبي داود وغيرهما ؛ فالاعتبار بعموم اللفظ ، لا بخصوص السبب ، كما تقرر في الأصول ، وهو الحق”
“এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ডুবন্ত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা সামর্থবান ব্যক্তির উপর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব (অবশ্যপালনীয়) এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু উদ্ধার করতে গিয়ে যদি আশঙ্কা থাকে যে, ডুবন্ত ব্যক্তি তাকে জাপটে ধরবে এবং সেও তার মতোই ডুবে মরবে তাহলে এই অবস্থায় তার জন্য এটি ওয়াজিব নয় শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকেও নয় বা জ্ঞান-বুদ্ধির বিচারেও নয়। এই অবস্থায় সে তাকে ছেড়ে নিজেকে রক্ষা করবে। চাই তার বাঁচার সম্ভাবনা থাকুক অথবা না থাকুক। বরং মহান আল্লাহর বাণী: “আর তোমরা নিজেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না।” (সূরা বাকারা: ১৯৫) এর প্রকাশ্য অর্থ এটাই যে, ডুবন্ত ব্যক্তিকে ছেড়ে নিজেকে রক্ষা করা তার জন্য ওয়াজিব। যদিও আয়াতটি একটি নির্দিষ্ট ঘটনা উপলক্ষে নাজিল হয়েছে যেমনটি আবু দাউদসহ বিভিন্ন হাদীসগ্রন্থে বর্ণিত তবুও উসূলুল ফিকহের মূলনীতির আলোকে স্বীকৃত সত্য হলো, কুরআনের আয়াতে ব্যবহৃত সাধারণ ভাষা ও শব্দরূপই বিধান নির্ধারণে মুখ্য; নাজিল হওয়ার বিশেষ কারণ নয়। এটাই বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মত।”(আস সাইলুল জাররা মুন্তাফিক আলা হাদাইকুল আজহার, পৃষ্ঠা নং ৮৯২)
.
সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেন:إنه يجب على المرء المسلم إذا رأى أخاه المسلم في أمر يُخشَى منه الهلاك، يجب عليه أن يسعى لإنقاذه بكل وسيلة،حتى إنه لو كان صائمًا صيام الفرض في رمضان، وحصل شيء يُخشَى منه الهلاك على أخيه المسلم، واضطر إلى أن يُفطِرَ لإنقاذه، فإنه يفطر لإنقاذه، وعلى هذا فإذا مررت بحادث سيارة، ورأيت الناس في حال يُخشَى عليهم من التَّلَفِ أو من تضاعف الضرر، فإنه يجب عليك إنقاذهم بقدر ما تستطيع، ولو أن تحمِلَ النساء، وإن لم يكن معهن محارم؛ لأن هذه ضرورة”؛”যদি কোনো মুসলমান তার ভাইকে এমন বিপদে দেখে যা তার ধ্বংসের আশঙ্কা তৈরি করে তাহলে তাকে অবশ্যই উদ্ধার করতে হবে যেকোনো উপায়ে। এমনকি যদি সে রমজানের ফরজ রোজায় থাকে এবং তার ভাই বিপদের মধ্যে পড়ে আর তাকে উদ্ধার করতে গেলে রোজা ভেঙে ফেলতে হয়, তাহলেও সে রোজা ভেঙে ফেলবে। যেমন কেউ গাড়ি দুর্ঘটনা দেখতে পেলো এবং মানুষ মারাত্মক বিপদের মধ্যে আছে তখন তোমার ওপর ফরজ হয়ে যায় তাদের উদ্ধার করা, যতটুকু সম্ভব। এমনকি যদি তোমাকে মহিলাদের গাড়িতে তোলাও লাগে, যদিও তাদের সাথে কোনো মাহরাম নেই তবুও সেটা বৈধ, কারণ এটি জরুরি অবস্থা। (ইবনু উসাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ১৫৯)
.
অতএব উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে কোনো মুসলিম দুর্ঘটনা, হামলা বা দুর্যোগে আহত হলে তাকে সাহায্য করা উপস্থিত মুসলিমদের ওপর ওয়াজিব হয়ে যায় যদি তারা সক্ষম হয়। সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অবহেলা করা বড় গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এমনকি জীবন রক্ষা করতে সালাত ভঙ্গ করাও বৈধ। যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে সাহায্য, চিকিৎসা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসলামী দায়িত্ব। আল্লাহ আমাদের সকলকে মানবিক দায়িত্ব পালনে যত্নবান করুন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬◐✪◑▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

সালাতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ও চতুর্থ রাকআতের সিজদাহ থেকে কিভাবে দাঁড়াতে হবে

 প্রশ্ন: সালাতে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ রাকআতের সিজদাহ থেকে কিভাবে দাঁড়াতে হবে? একটি দলিল ভিত্তিক পর্যালোচনা।

▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি। অতঃপর সিজদা থেকে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ রাকাআতে উঠে দাঁড়ানোর পদ্ধতি কেমন হবে? এই বিষয়ে আহালুল আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এই বিষয়ে দুটি মত রয়েছে।
▪️প্রথম মতামত: সালাতে সিজদা থেকে দাঁড়ানোর সময় হাঁটুতে ভর দেওয়া উত্তম। হাত দিয়ে ভর দেওয়া তখনই জায়েয, যখন ব্যাক্তি বৃদ্ধ, দুর্বল বা অসুস্থ হওয়ায় দাঁড়াতে কষ্ট হয়। এই অভিমত গ্রহণ করেছেন হানাফি ও হাম্বলি মাজহাব, একই মত পোষণ করেছেন ইমাম দাঊদ আয-জাহিরি। এ মতের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ), ইমাম আব্দুল আযীয ইবন বায (রহিমাহুল্লাহ) এবং ইমাম মুহাম্মাদ ইবন উসাইমিন (রহিমাহুল্লাহ)। যেসব আলেম হাতের ওপর ভর না দিয়ে দাঁড়ানোকে উত্তম মনে করেন, তারা সাহাবায়ে কেরামের আমল, মানুষের স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ওঠে দাঁড়ানোর অভ্যাস, এবং উটের মতো ভর দিয়ে ওঠা থেকে বারণ করার হাদীসকে দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেন।” এই মতের পক্ষে দলিল হচ্ছে, আব্দুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ ইবনু জাবির (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:আমি ইবনু মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু)-কে লক্ষ করলাম, তিনি (প্রথম রাকাআতের) সিজদার পর বসতেন না; বরং তিনি পায়ের পাতার ওপর ভর করে উঠে দাঁড়াতেন।”(ইমাম ইবনু আবী শাইবা,আল-মুসান্নাফ হা/২৮২৫; মাসায়েলে ইমাম আহমেদ ইবনু হাম্ভল ইবনে হানীর রেওয়াত হা/৯১১) অপর রিওয়ায়াতে এসেছে: তিনি বলেন: আমি নামাজে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু)-কে লক্ষ্য করলাম। দেখলাম, তিনি (সিজদা থেকে উঠার সময়) বসতেন না; বরং প্রথম ও দ্বিতীয় রাকাআতে তিনি পায়ের আঙুলের উপর ভর করে সরাসরি দাঁড়িয়ে যেতেন।”(ইমাম ইবনু আবী শাইবা, আল-মুসান্নাফ হা/২৪৮৩)
.
এই দলীলগুলো থেকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়: প্রথমত: এখানে বর্ণনা করা হয়েছে যে ইবনু মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) পায়ের আঙুলের গোড়ালির উপর ভর দিয়ে উঠে যেতেন অর্থাৎ, তিনি উঠার সময় জমিনে হাত দিয়ে ভর দিতেন না। দ্বিতীয়ত: হাতের তুলনায় হাঁটু আগে তুলে উঠা মানুষের স্বাভাবিক নড়াচড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কারণ যখন একজন মানুষ মাটি থেকে উঠে, তখন শরীরের উপরের অংশ আগে উঠে এবং তারপর নিচের অংশ উঠে। তৃতীয়ত: হাতের আগে হাঁটু তুলে ওঠা পদ্ধতি উটের ওঠার পদ্ধতির থেকে ভিন্ন, কারণ উট উঠার সময় প্রথমে দুই পা তোলে আর তার হাত বা পায়ের সামনে অংশ মাটিতে থাকে।এবং এটি সেই পদ্ধতি, যার থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেকে বিরত রেখেছেন এবং যা থেকে তিনি নিষেধ করেছেন।
.
▪️দ্বিতীয় মতামত: সালাতে সিজদা থেকে উঠে দাঁড়ানোর সময় হাতের উপর ভর দিয়ে দাঁড়ানো মুস্তাহাব। এই মত গ্রহণ করেছেন মালিকি মাজহাব, শাফেয়ি মাজহাব, এবং এটি সালাফদের একটি দলের মত। এমনকি এটি বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম আলবানী (রহিমাহুল্লাহ)-এর মনোনীত মত। যারা দাঁড়ানোর সময় হাতের উপর ভর দেওয়াকে মুস্তাহাব মনে করেন, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল এবং শরিয়তের সহজতা ও সহনশীলতার দিকটি সামনে রাখেন। এই মতের পক্ষের আলেমগন ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসকে দলিল হিসেবে পেশ করেন। হাদীসটি বুখারীর ৮২৪ নম্বর হাদীসে এসেছে ‎আবু কিলাবা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইব্‌নু হুয়াইরিস (রাঃ) এসে আমাদের এ মসজিদে আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করেন। তিনি বললেন, আমি তোমাদের নিয়ে সালাত আদায় করব। এখন আমার সালাত আদায়ের কোন ইচ্ছা ছিল না, তবে আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখেছি তা তোমাদের দেখাতে চাই। আইয়ুব (রহঃ) বলেন, আমি আবূ কিলাবা (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, তাঁর [মালিক ইব্‌নু হুয়াইরিস (রাঃ)-এর] সালাত কীরূপ ছিল? তিনি [আবূ কিলাবা (রহঃ)] বলেন, আমাদের এ শায়খ অর্থাৎ আমর ইবনু সালিমা (রহঃ)-এর সালাতের মতো। আইয়ুব (রহঃ) বললেন, শায়খ তাকবীর পূর্ণ বলতেন এবং যখন দ্বিতীয় সিজদা হতে মাথা উঠাতেন তখন বসতেন, অতঃপর মাটিতে ভর দিয়ে দাঁড়াতেন।”(সহিহ বুখারী হা/৮২৪) এই হাদীসের আলোকে তারা বলেন, এভাবে মাটির উপর ভর নিয়ে দাঁড়ানো সালাতের বিনয় ও একাগ্রতাকে আরও গভীর করে তোলে, সালাত আদায়কারীকে স্বস্তি দেয় এবং অস্থিরতা ও পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কমিয়ে দেয়।”
.
▪️তৃতীয়ত: যারা সিজদা থেকে উঠার সময় হাতের উপর ভর দেওয়া উত্তম বলে মত প্রকাশ করেছেন, তাঁদের মধ্যেও এ ভর দেওয়ার ধরন কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। মালিকি ও শাফিঈ ইমামদের মতে, উঠার সময় হাতের তালু ও আঙুলের পৃষ্ঠভাগ (পেটভাগ) দিয়ে মাটি স্পর্শ করে ভর দিতে হবে; হাত মুঠো করা যাবে না। অন্যদিকে, কিছু আলেম যাঁদের মধ্যে বিগত শতাব্দীর অন্যতম প্রখ্যাত মুজাদ্দিদ ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) উল্লেখযোগ্য তাঁরা মত দিয়েছেন যে, হাত মুঠো করে আঙুলের উপর ভর দিয়ে উঠা অধিক উত্তম। তিনি একে ‘আজন’-এর (আটার খামির মাখানোর) ভঙ্গির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তারা দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন, আল-আরযাক ইবনে কায়েস (রহঃ) বলেন: আমি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)-কে সালাতে “আটা মাখানোর মতো” উঠতে দেখেছি, তিনি দাঁড়ানোর সময় হাতের উপর ভর দিতেন। আমি বললাম: “হে আবু আব্দুর রহমান! আপনি কী করছেন?” তিনি বললেন: “আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে সালাতে এভাবেই (আটা মাখানোর ভঙ্গিতে) উঠতে দেখেছি।”(ত্বাবারাণী, মু’জামুল আওসাত্ব ৪/২১৩, হা/৪০০৭; সিলসিলা সাহীহাহ ৬/৩৮০, ৩৮২ হা/২৬৭৪; সিলসিলা যঈফাহ ২/৩৯১-৩৯২ পৃষ্ঠা; সিফাতু সলাতিন নাবী ﷺ পৃষ্ঠা/১৫৫) অন্য এক বর্ণনায় আছে: নবী ﷺ সালাতে আজন করতেন; অর্থাৎ দাঁড়ানোর সময় দুই হাতে ভর দিতেন।” তাহক্বীক হাদীসটি বিশুদ্ধতা নিয়ে মহাদ্দিসগণের মধ্যে মতাবেদ রয়েছে, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: رواه أبو إسحاق الحربي بسندٍ صالح، ومعناه عند البيهقي بسند صحيح “এই হাদিস আবু ইসহাক আল হারবী একটি গ্রহণযোগ্য সানাদে বর্ণনা করেছেন, আর বায়হাকীর বর্ণনায় এটি একটি সহিহ সানাদে এসেছে। (ইমাম আলবানী সিফাতু সালাতিন নাবী, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৮২৪) অপরদিকে জমহুর আলেমগন হাদিসটি দুর্বল বলেছেন। কারন হাদিসটির সনদে হাইসাম ইবনে ইমরান আছেন, যিনি অজ্ঞাত (মাজহুল)।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাস করা হয়েছিল: আমি মুগনিল মুহতাজ ইলা মা‘রিফাতি মা‘আনি আলফায আল-মিনহাজ কিতাবে (যা শাইখ মুহাম্মাদ আশ-শারবীনী রচিত) একটি হাদীস পড়েছি যেখানে ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত হয়েছে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায থেকে উঠার সময় তাঁর হাত জমিনে এমনভাবে রাখতেন যেভাবে আটার মাখুনে (অর্থাৎ হাতের তালু ও আঙুল ভাঁজ করে) রাখে। এই হাদীসের সনদ কতটুকু সহীহ? এবং এর অর্থ কী? আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।”
তিনি উত্তরে বলেন:المعروف أنه ليس بصحيح، والإنسان يعتمد كيف شاء على يديه على بطونها، أو على ظهورها، يعتمد حيث شاء، هذا هو الأصل، وإذا اعتمد على ركبتيه إذا كان قويًا نشيطًا فهو أفضل، وإن احتاج للأرض اعتمد على الأرض ببطون يديه، أو بظهور أصابعه، كل ذلك لا حرج فيه، والحمد لله، الأمر في هذا واسع، وأما كونه على صفة العاجن فليس عليه دليل صحيح.”বিশ্বস্ত মত অনুযায়ী, এই হাদীসটি সহীহ নয়। মানুষ চাইলেই যেভাবে সুবিধা হয়, সেভাবেই (সালাত থেকে উঠে দাঁড়ানোর সময়) হাত ব্যবহার করে ভর নিতে পারে হাতের তালুতে ভর দিয়ে হোক, কিংবা হাতের পিঠে ভর দিয়ে হোক, যেমন ইচ্ছা তেমনভাবে ভর নিতে পারে। এটাই মূলনীতি। আর যদি কেউ শক্তিশালী ও সক্রিয় হয়, তাহলে হাঁটুর উপর ভর করে উঠা উত্তম। আর যদি মাটির উপর ভর নেওয়ার প্রয়োজন হয়, তাহলে হাতের তালুর উপর ভর দিয়ে উঠা বা আঙ্গুলের পিঠে ভর দিয়ে উঠা সবই বৈধ। আলহামদুলিল্লাহ, এ ব্যাপারে শরীয়তে প্রশস্ততা আছে। আর “আটা মেখে এমনভাবে দাঁড়ানো” (يعني: صفة العاجن গুটিয়ে হাঁটু টেনে হাত দিয়ে উঠে দাঁড়ানো) এই রকম কায়দার পক্ষে কোন সহীহ দলিল নেই।”(বিন বায অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফাতওয়া নং-৯১৩৬)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে বলেন:
أن النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم ( كان إذا أراد أن يقوم اعتمد على يديه ) ولكن هل هو كصفة العاجن أم لا؟ هذا ينبني على صحة الحديث الوارد في ذلك، وقد أنكر النووي رحمه الله في المجموع صحة هذا الحديث، أي: أنه يقوم كالعاجن، وبعض المتأخرين صححه.وعلى كلٍ فالذي يظهر من حال النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم أنه يجلس، لأنه كبر وأخذه اللحم، فكان لا يستطيع النهوض تماماً من السجود إلى القيام، فكان يجلس ثم إذا أراد أن ينهض ويقوم اعتمد على يديه ليكون ذلك أسهل له، هذا هو الظاهر من حال النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم، ولهذا كان القول الراجح في هذه الجلسة -أعني: جلسة الاستراحة- التي يسميها العلماء جلسة الاستراحة أنه إن احتاج إليها لكبر أو ثقل أو مرض أو ألم في ركبتيه أو ما أشبه ذلك فليجلس، ثم إن احتاج إلى أن يعتمد عند القيام على يديه فليعتمد على أي صفة كانت، سواء اعتمد على ظهور الأصابع، يعني: جمع أصابعه هكذا واعتمد عليها أو على راحته، أو غير ذلك، المهم إذا احتاج إلى الاعتماد فليعتمد، وإن لم يحتج فلا يعت
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সেজদা থেকে উঠে দাঁড়াতে চাইতেন, তখন তিনি তাঁর হাতের উপর ভর করে দাঁড়াতেন। কিন্তু তিনি এই ভরটি কীভাবে নিতেন তা কি আটার খামির মাখানো ব্যক্তির ভঙ্গিতে, অর্থাৎ হাতের আঙুলের পিঠে ভর দিয়ে, নাকি তালু দিয়ে এই বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। এ সংক্রান্ত যে হাদীসটি আছে, তার প্রামাণিকতা নির্ভরযোগ্য কি না, সে নিয়েও আলেমদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম নববী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর গ্রন্থ আল-মাজমু‘-তে এই হাদীসটির সহীহ হওয়া অস্বীকার করেছেন, অর্থাৎ তিনি একে সহীহ মনে করেননি। তবে পরবর্তী যুগের কিছু মুহাদ্দিস এই হাদীসকে সহীহ বলেছেন। তবে সামগ্রিক বিবেচনায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের বাস্তব অবস্থান ও বার্ধক্যকালীন অবস্থা থেকে ধারণা করা যায় যে, তিনি সেজদা থেকে সরাসরি না উঠে আগে বসতেন, এরপর দাঁড়ানোর সময় হাতের উপর ভর নিতেন যাতে দাঁড়ানো সহজ হয়। কারণ বয়স বৃদ্ধি, শরীর ভারী হয়ে যাওয়া ও দুর্বলতা এইরূপ কায়দার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে। এই বিষয়কে কেন্দ্র করেই ফিকহবিদদের কাছে ‘জালসাতুল ইস্তিরাহা’ অর্থাৎ বিশ্রামের বসা বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হলো, কেউ যদি বার্ধক্য, শরীরের ভার, হাঁটুর ব্যথা বা কোনো ধরনের অসুস্থতার কারণে সরাসরি দাঁড়াতে না পারেন, তাহলে তিনি বসে বিশ্রাম নিতে পারেন এবং প্রয়োজনে হাতের উপর ভর নিয়ে দাঁড়াতে পারেন তা হাতের তালু দিয়েই হোক, আঙুলের পিঠ দিয়েই হোক কিংবা অন্য কোনো উপায়ে। এতে কোনো সমস্যা নেই। মূল কথা হলো, শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী হাতের উপর ভর দিয়ে দাঁড়ানো জায়েয। আর যদি সে প্রয়োজন না থাকে, তবে ভর না নিয়ে দাঁড়ানোতেও কোনো অসুবিধা নেই।”(ইবনু উসাইমীন, লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, সাক্ষাৎকার নং-৬৫)
.
অপরদিকে হানাবিলা (হাম্বলি মাজহাব) মতে,নামাজে দাঁড়ানোর সময় হাঁটুতে ভর দেওয়া উত্তম।হাত দিয়ে ভর দেওয়া তখনই জায়েয, যখন বৃদ্ধ, দুর্বল বা অসুস্থ হওয়ায় দাঁড়াতে কষ্ট হয়। হাফিয যাইনুদ্দীন আবুল ফারজ ‘আব্দুর রহমান বিন শিহাব যিনি ইবনু রজব আল-হাম্বালী আল-বাগদাদী নামে প্রসিদ্ধ রাহিমাহুল্লাহ [জন্ম: ৭৩৬ হি. মৃত: ৭৯৫ হি:] বলেছেন:
وقد اختلف العلماء في القائم إلى الركعة الثانية من صلاة: كيف يقوم؟
فقالت طائفة: يعتمد بيديه على الأرض، كما في حديث مالك بن الحويرث هذا…
وهو قول مالك والشافعي وإسحاق.
وروي عن أحمد، أنه كان يفعله، وتأوله القاضي أبو يعلى وغيره على أنه فعله لعجز وكبر.
وقد روي عن كثير من السلف، أنه يعتمد على يديه في القيام إلى الركعة الثانية، منهم: عمر، وعبادة بن نسي، وعمر بن عبد العزيز، ومكحول، والزهري، وقال: هو سنة الصلاة -، وهو قول الاوزاعي وغيره، ورخص فيه قتادة…
والأكثرون على أنه لا تلازم بين الجلسة والاعتماد، فقد كان من السلف من يعتمد ولا يجلس للاستراحة، منهم: عبادة بن نسي، وحكاه عن أبي ريحانة الصحابي…
ولا يبعد إذا قلنا: إن جلسة الاستراحة فعلها تشريعا للأمة، أن يكون الاعتماد فعله كذلك “
“দ্বিতীয় রাকাআতে উঠার সময় কীভাবে উঠবে এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একদল আলেম বলেছেন উঠার সময় মাটিতে দুই হাত রেখে ভর দিয়ে ওঠা উত্তম; যেমনটি সাহাবি মালিক ইবনু হুয়াইরিস (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু)-এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এ অভিমত ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম ইসহাক (রাহিমাহুমুল্লাহ)-এর। এমনকি ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর পক্ষ থেকেও এ মতের সমর্থন পাওয়া যায়, যদিও ক্বাযী আবু ইয়ালা ও অন্যান্য আলেমরা এটিকে বার্ধক্যজনিত দুর্বলতার কারণে তাঁর ব্যক্তিগত আমল বলে ব্যাখ্যা করেছেন। এছাড়া বহু সালাফ, সাহাবি ও তাবেঈন থেকেও বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁরা দ্বিতীয় রাকাআতে উঠার সময় হাত দিয়ে মাটিতে ভর দিতেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন: উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু), উবাদাহ ইবন নুসাই, উমর ইবনু আবদুল আজিজ, মাখুল এবং ইমাম যুহরী (রহিমাহুল্লাহ)। ইমাম যুহরী বলেন: “এটি সালাতের একটি সুন্নাহ।” এ মতের পক্ষেই ইমাম আওযায়ীসহ আরও অনেক আলেমের অভিমত রয়েছে। কাতাদা (রহিমাহুল্লাহ) এ বিষয়ে কিছুটা ছাড় দিয়েছেন। বেশিরভাগ আলেমের মতে, বসা এবং হাত দিয়ে ভর দেওয়া এই দুটি কাজের মধ্যে আবশ্যিক কোনো সম্পর্ক নেই। সালাফদের মধ্যে অনেকেই এমন ছিলেন যারা হাত দিয়ে ভর দিতেন কিন্তু বসতেন না। যেমন: উবাদাহ ইবনু নুসাই এবং তিনি সাহাবি আবু রাইহানা (রাযি.) সম্পর্কেও এমন বলেছেন…আর আমরা যদি বলি: বসা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষ থেকে উম্মতের জন্য শরিয়তস্বরূপ আমল তাহলে বলা অসম্ভব নয় যে, হাতের উপর ভর দেওয়াও তেমনি শরিয়তস্বরূপ আমল ছিল।”―(ইবনু রজব আল-হাম্বালী, ফাতহুল বারী শারহু সাহীহিল বুখারী; খন্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ২৯১)
.
ইবনু বাত্তাল (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
“اختلف العلماء في اعتماد الرجل على يديه عند القيام، فروى عن ابن عمر أنه كان يعتمد على يديه إذا أراد القيام، ويروى مثله عن مكحول، وعطاء، ومسروق، والحسن، وهو قول الشافعي، وأحمد.
ورأت طائفة أن لا يعتمد على يديه إلا أن يكون شيخا كبيرا أو مريضا، وروى ذلك عن على بن أبى طالب، وبه قال النخعي، والثوري، وكره الاعتماد ابن سيرين.
وقال الشافعي: كان عمر، وعلى وأصحاب رسول الله ينهضون في الصلاة على صدور أقدامهم، وعن ابن مسعود مثله”
“ইমামগণ ও ফিকহবিদগণ নামাজে সিজদা থেকে উঠার সময়—অর্থাৎ দাঁড়ানোর সময় হাতের ওপর ভর দেওয়ার বৈধতা নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি দাঁড়াতে চাইলে নিজের হাতের উপর ভর দিতেন। অনুরূপভাবে মাকহুল, আতা, মাসরূক ও হাসান বসরি(রহিমাহুমুল্লাহ)-এর থেকেও একই ধরনের আমল বর্ণিত হয়েছে। এই অভিমত ইমাম শাফিঈ ও ইমাম আহমদ (রহিমাহুমুল্লাহ)-এরও মতানুযায়ী। অন্যদিকে, আরেক দল আলেমের মতে যারা বলেন হাতের উপর ভর দিয়ে দাঁড়ানো উচিত নয়; তবে বৃদ্ধ বা দুর্বল ব্যক্তি এর ব্যতিক্রম। এ মত আলী ইবনু আবি তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, এবং নাখাঈ, সুফিয়ান সাওরি প্রমুখ আলেমগণ এ মতকে সমর্থন করেছেন। এমনকি ইবনু সীরিন (রহিমাহুল্লাহ) হাতের উপর ভর দিয়ে উঠা অপছন্দ করতেন।ইমাম শাফিঈ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: “উমর, আলী ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনেক সাহাবী নামাজে সিজদা থেকে উঠার সময় পায়ের আঙুলের উপর ভর করে দাঁড়াতেন।” অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায় ইবনু মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকেও।”(ইবনু বাত্তাল, শারহু সহীহুল বুখারী খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৪৪০)
.
ইবনু কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) বিস্তারিতভাবে আলোচনা করে বলেন:
ينهض إلى القيام على صدور قدميه معتمدا على ركبتيه، ولا يعتمد على يديه. قال القاضي: لا يختلف قوله، أنه لا يعتمد على الأرض، سواء قلنا: يجلس للاستراحة أو لا يجلس. وقال مالك، والشافعي: السنة أن يعتمد على يديه في النهوض؛ لأن مالك بن الحويرث قال في صفة صلاة رسول الله – صلى الله عليه وسلم – ، إنه لما رفع رأسه من السجدة الثانية استوى قاعدا، ثم اعتمد على الأرض . رواه النسائي. ولأن ذلك أعون للمصلي. ولنا ما روى وائل بن حجر، قال: رأيت رسول الله – صلى الله عليه وسلم – إذا سجد وضع ركبتيه قبل يديه، وإذا نهض رفع يديه قبل ركبتيه رواه النسائي، والأثرم، وفي لفظ: وإذا نهض نهض على ركبتيه، واعتمد على فخذيه . وعن ابن عمر، قال: نهى رسول الله – صلى الله عليه وسلم – أن يعتمد الرجل على يديه إذا نهض في الصلاة . رواهما أبو داود، وقال علي كرم الله وجهه: إن من السنة في الصلاة المكتوبة، إذا نهض الرجل في الركعتين الأوليين، أن لا يعتمد بيديه على الأرض، إلا أن يكون شيخا كبيرا لا يستطيع . رواه الأثرم. وقال أحمد: بذلك جاء الأثر عن رسول الله – صلى الله عليه وسلم – وعن أبي هريرة، أن النبي – صلى الله عليه وسلم – كان في الصلاة ينهض على صدور قدميه . رواه الترمذي. وقال: يرويه خالد بن إلياس. قال أحمد: ترك الناس حديثه. ولأنه أشق فكان أفضل، كالتجافي والافتراش. وحديث مالك محمول على أنه كان من النبي – صلى الله عليه وسلم – لمشقة القيام عليه لضعفه وكبره، فإنه قال – عليه السلام -: إني قد بدنت، فلا تسبقوني بالركوع ولا بالسجود.
“সালাতে সিজদা থেকে উঠে দাঁড়ানোর সময় তাকে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এবং হাঁটুর সাহায্যে দাঁড়াতে হবে; হাতের ওপর ভর দেওয়া উচিত নয়। কাযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: এই বিষয়ে ইমামদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই যে, সালাত আদায়কারী মাটিতে হাত রাখবে না সে ‘ইসতিরাহা’ (বিশ্রামের জন্য বসা) করুক আর না-ই করুক। মালিক ও শাফেয়ি (রহিমাহুমাল্লাহ) বলেন: হাতের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ানো সুন্নত। কারণ, মালিক ইবনে হুয়াইরিস (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) বর্ণনা করেছেন: “নবী ﷺ যখন তিনি প্রথম রাকআতে দ্বিতীয় সিজদা থেকে মাথা ওঠাতেন, তখন সোজা হয়ে বসতেন। তারপর মাটিতে ভর দিয়ে দাঁড়াতেন।(এই হাদীস নাসাঈ হা/১১৫৩ বর্ণনা করেছেন)।কারণ এতে নামাজি সহজে দাঁড়াতে পারেন।
আমাদের দলিল হলো: ওয়াইল ইবনে হুজর (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দেখেছি, তিনি সিজদায় যাওয়ার সময় হাঁটু আগে রাখতেন এবং উঠার সময় হাত আগে উঠাতেন।” (এই হাদীস নাসাঈ ও আহমাদ বর্ণনা করেছেন)। অন্য এক বর্ণনায় আছে:”তিনি হাঁটু ব্যবহার করে উঠে দাঁড়াতেন এবং উরুর ওপর ভর দিতেন।”ইবনে উমর (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেন:”নবী ﷺ নিষেধ করেছেন যে, সালাতে দাঁড়ানোর সময় পুরুষ যেন হাতে ভর না দেয়।”আলী (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেন:”ফরজ সালাতে যখন কেউ দ্বিতীয় রাকাআতের পর দাঁড়াতে চায়, সে যেন হাতে ভর না দেয়; তবে যদি সে বৃদ্ধ হয়, তাহলে সে ব্যতিক্রম।”(এই বর্ণনাটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন।) ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: এই মাসআলায় সাহাবিদের পক্ষ থেকে একাধিক হাদীস এসেছে। আবু হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত আছে যে,”নবী ﷺ সালাতে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে উঠতেন।”(এই হাদীস তিরমিযী বর্ণনা করেছেন)। তবে হাদীসটির বর্ণনাকারী খালিদ ইবনে ইলিয়াস সম্পর্কে ইমাম আহমাদ বলেন: মানুষ তাঁর হাদিস বর্জন করেছে। কারণ, পায়ের ভর দিয়ে উঠা বেশি কষ্টকর, তাই তা উত্তম, যেমন সিজদায় শরীর খোলা রাখা। মালিক ইবনে হুয়াইরিসের বর্ণনাটি তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যদি ধরে নেওয়া হয় যে, নবী ﷺ বৃদ্ধ বা দুর্বলতার কারণে ভিন্নভাবে দাঁড়িয়েছেন, যেমন তিনি বলেছিলেন: আমি মোটা হয়ে গেছি, কাজেই তোমরা রুকু বা সিজদার সময় আমাকে অতিক্রম করো না (অগ্রাহ্য করো না)।”(ইবনু কুদামাহ আল মুগনী খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২১৫)
.
▪️চতুর্থত: সিজদা থেকে উঠার সময় হাতের উপর ভর দেওয়ার ধরন কেমন হওয়া উচিত? এই মতভেদটি মূলত “আজন” শব্দটির প্রকৃত অর্থ ও এর প্রয়োগ পদ্ধতি বোঝার পার্থক্য থেকেই উদ্ভূত হয়েছে।
.
ইবনুস সালাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “এই (আজন) শব্দটি অনেককে বিভ্রান্ত করেছে। কেউ কেউ শব্দটি ভুল করে “আ’জিয” (অক্ষম ব্যক্তি) পড়ে, আবার কেউ কেউ সঠিক উচ্চারণে “আজন” পড়লেও ভুলভাবে বুঝে নেয় যে, এটি আটা মাখানোর ভঙ্গি তখন তারা হাতের আঙুল মুঠো করে, একত্র করে ভর দেয় এবং হাতের তালু মাটি থেকে তুলে রাখে, যা আসলে সঠিক নয়। ইবনু রজব হাম্বলি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: কিছু আলেম ব্যাখ্যা করেছেন যে, এখানে ‘আজন’ বলতে বোঝানো হয়েছে বৃদ্ধ মানুষ যেভাবে দুই হাতের তালুর ওপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়; এটি রুটির খামির মাখানোর ভঙ্গি নয়। ফাতহুল বারী; খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ২৯৩)
.
শায়খ আবু ফুরাইহান জামাল বিন ফুরাইহান আল-হারিসী বলেন:
“فعلى اختلاف تفسير أهل اللغة والحديث لمعنى “العَجْنُ فِي الصَّلَاةِ” ؛ يظهر لي والله أعلم أنه لا يُشدد في ذلك ولا يُشترط الالتزام والمواضبة على هيئة معينة في النهوض إلى الركعة معتمداً على اليدين سواء النهوض على أليتي الكف – أي : الكفّين منبسطة – أو مقبوضة أصابع كفية ومضمومة ، فالأمر واسع حتى يأتينا نصٌ مرفوع أو في حكم المرفوع يفسر لنا صفة “العجن في الصلاة” .
“যদিও আরবি ভাষাবিদ ও হাদিস বিশারদদের মধ্যে ‘নামাজে আজন (العَجْنُ في الصلاة)’ এর অর্থ নির্ধারণে মতভেদ রয়েছে, তবে আমার দৃষ্টিতে (আল্লাহই ভালো জানেন) এটি স্পষ্ট যে এ বিষয়ে কঠোরতা অবলম্বন করা উচিত নয়। নামাজে দাঁড়ানোর সময় হাতের ওপর ভর দেওয়ার নির্দিষ্ট কোনো কায়দাকে আবশ্যক মনে করাও সঠিক নয় চাই তা হাত দুটি খোলা রেখে হোক, অথবা আঙুলগুলো মুঠো করে একত্রিত করে হোক। এই বিষয়টি উন্মুক্ত ও সহজসাধ্য, যতক্ষণ পর্যন্ত এমন কোনো সহিহ, স্পষ্ট মারফূ হাদিস পাওয়া না যায় যা সালাতে ‘আজন’ এর প্রকৃত রূপ নির্ধারণ করে দেয়। সুতরাং এ ধরনের বিষয় নামাজকে নষ্ট করে না; বরং ইমামদের মধ্যে যে মতভেদ রয়েছে, তা হলো সালাতে দাঁড়ানোর সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি কোনটি তা নির্ধারণ নিয়ে।”
.
শায়খ বকর আবু জাইদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
وقال الشيخ بكر أبو زيد: ” وصفة العجن بأن يقوم المصلي من ركعة إلى أخرى على هيئة العاجن، وهو أن يجمع يديه ويتكئ على ظهورهما عند القيام كحال من يعجن العجين. وهذه: هيئة أعجمية، ليست سنة شرعية…ثم العجن له صفتان في لغة العرب: المذكورة، والثانية ببسط الكفين على الأرض، كما هو معروف من حال النساء عند عجن العجين. ومتى كان التشبه بالنساء، أو العمل حال العجز سنة من سنن الهدى…. مع أن الحديث ضعيف لا تقوم به الحجة، وترك التسنن به “.
“সালাতে ‘আজন’ বলতে বোঝানো হয় রাকাআতের মধ্যে দাঁড়ানোর সময় এমনভাবে হাতের ওপর ভর দেওয়া, যেন কেউ আটা মাখাচ্ছে।অর্থাৎ, হাতগুলো মুঠো করে তার ওপর ভর দেওয়া। এই ভঙ্গি আরবের ঐতিহ্যে নেই; বরং এটি আজমী (বিদেশী) রীতির অংশ, এটা কোনো সুন্নত নয়। আরবি ভাষায় ‘আজন’ শব্দের দুই অর্থ আছে (১) হাত খোলা রেখে হাতের তালুতে ভর দেওয়া (যেমন নারীরা ময়দা মাখানোর সময় করে), (২) আঙুলগুলো মুঠো করে ভর দেওয়া। তাই যখন এই ভঙ্গি নারীদের মতো বা দুর্বলতার কারণে করা হয়, তখন তাকে সুন্নত বলা যায় না। বিশেষ করে যদি হাদিস দুর্বল হয়, তা দিয়ে সুন্নতের প্রমাণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়”।(সূত্র: আল-ফিকহুল ওয়াযিহ মাযহাব ও প্রবল মত অনুযায়ী, ‘যাদুল মুস্তাকনি’ সালাত অধ্যায়; আরও দেখুন ‘লা জদীদ ফী আহকাম আস-সালাহ’, পৃষ্ঠা: ৪৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬◐✪◑▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

Translate